রিপুর প্রভাব ও শয়তানের শত্রুতা
📚মুকাশাফাতুল-কুলুব ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)
বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ লোকের কাজ হচ্ছে,-ক্ষুধা ও ক্ষুৎসাধনার মাধ্যমে রিপুর তাড়না ও কাম উত্তেজনাকে সমূলে বিনাশ করে দেওয়া। কেননা খোদার দুশমন শয়তানকে ধ্বংস করার জন্য ক্ষুৎসাধনাই হচ্ছে প্রধান হাতিয়ার। পাপিষ্ঠ শয়তান প্রবৃত্তির সাধ-অভিলাষ ও অধিক পানাহারকেই কেন্দ্র করে মানুষকে বিভ্রান্ত করে থাকে। হুযুর আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেনঃ "শয়তান মানুষের রন্ধ্রে রন্ধ্রে রক্তের ন্যায় প্রবহমান হয়, সুতরাং তোমরা শয়তানের এ প্রবাহপথকে ক্ষুৎসাধনার দ্বারা বন্ধ করে দাও"।
কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তা'আলার অধিক নিকটবর্তী হবে সেই ব্যক্তিই, – যে দুনিয়াতে ক্ষুধা ও তৃষ্ণার যন্ত্রণা সহ্য করেছে। বস্তুতঃ অধিক ভোজনস্পৃহা আদম সন্তানকে মারাত্মক ধ্বংসের দিকে ঠেলে নেয়।
হযরত আদম ও হাওয়া আলাইহিমাস সালাম চিরশান্তির আবাস জান্নাত থেকে বরখাস্ত হয়ে এই অশান্তির জগতে পতিত হয়েছেন, -এর পিছনেও কারণ ছিল ভোজনস্পৃহা। আল্লাহ্ তা'আলা তাঁদেরকে বেহেস্তের একটি নির্দিষ্ট ফল খেতে নিষেধ করেছিলেন, তখন একমাত্র অধিক ভোজনস্পৃহার কারণেই তাঁরা উক্ত নির্দেশ পালন করতে পারেন নাই। ফলে, তাঁদের লজ্জাবরণ সংরক্ষিত থাকে নাই। মোটকথা, উদরই হচ্ছে মানুষের সর্ববিধ পাপাচারের উৎস ও ধ্বংসের মূল কারণ।
জনৈক বুযুর্গ বলেছেন : 'যে ব্যক্তি স্বীয় রিপুর কাছে পরাজিত হলো, সে প্রবৃত্তির হাতে বন্দী হয়ে গেল। তার অন্তর হিত-কল্যাণ থেকে বঞ্চিত থাকবে। যে ব্যক্তি স্বীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের যমীনে স্বেচ্ছাচারিতার পানি সিঞ্চন করলো, সে মূলতঃ আপন অন্তঃকরণে লাঞ্ছনা ও আক্ষেপের বৃক্ষ রোপণ করল।'
আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর কুদরতে তিন প্রকার মাখলুক সৃষ্টি করেছেন: এক,-ফেরেশতা। এঁদেরকে তিনি বিবেক-বুদ্ধি দিয়েছেন; কিন্তু কামভাব দেন নাই। দ্বিতীয়, জীব-জন্তু। এদেরকে কামভাব দিয়েছেন; কিন্তু বিবেক- বুদ্ধি দেন নাই। তৃতীয় প্রকার হচ্ছে মানব। এদেরকে আল্লাহ্ তা'আলা বিবেক- বুদ্ধি এবং কামভাব উভয়টাই দান করেছেন। এদের মধ্যে যারা নিজেদের বিবেক-বুদ্ধিকে বলবান করে কামরিপু ও যথেচ্ছাচারিতাকে দুর্বল ও পরাজিত করতে পেরেছে, তারা ফেরেশতা অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ। আর যাদের বিবেক- বুদ্ধি রিপুর কাছে পরাজয় বরণ করেছে, তারা হিংস্র জীব-জানোয়ারের চাইতেও নিকৃষ্ট।
হযরত ইব্রাহীম খাওয়াস (রহঃ) বলেন, -'একদা আমি 'লাকাম' পর্বতে অবস্থান করছিলাম। তখন একটি আনারের প্রতি আমার দৃষ্টি পড়ায় অন্তরে সেটি খাওয়ার আকাংখা সৃষ্টি হলো। আনারটি হাতে নিয়ে বিদীর্ণ করে সামান্য স্বাদ গ্রহণ করার পর টক হওয়ার কারণে সেটি ফেলে দিলাম। অতঃপর পথ চলাকালে একজন লোকের প্রতি আমার দৃষ্টি পড়লো; লোকটি রাস্তায় নেহায়েত অসহায় অবস্থায় পড়ে আছে আর অজস্র ভীমরুল তাকে আচ্ছন্ন করে রয়েছে। আমি তাকে সালাম প্রদান করলে সে উত্তরে বললো : 'ওয়াআলাইকুমুস সালাম হে ইব্রাহীম! আমি চমকিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি আমাকে কিভাবে চিনতে পারলেন? লোকটি বললো, যে আল্লাহকে চিনতে পেরেছে তার কাছে গোপন ও অপরিচিত বলতে কিছু নাই। আমি বললাম, আল্লাহর সাথে আপনার অতি রহস্যপূর্ণ অবস্থা আমি লক্ষ্য করেছি; আপনি কি ভীমরুলের আক্রমণ থেকে নিরাপত্তার জন্য দো'আ করেন নাই? অতঃপর লোকটি বললো, -আমিও আপনার বিশেষ রহস্যময় অবস্থা প্রত্যক্ষ করেছি; আপনি কি আনার ফলের লোভ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মোনাজাত করেন নাই? শুনুন, ভীমরুলের উৎপীড়ন-যন্ত্রণা শুধু ইহকাল পর্যন্তই সীমাবদ্ধ, আর আনারের প্রতি লোলুপ দৃষ্টির প্রায়শ্চিত্ত আখেরাতেও ভোগ করতে হবে। ভীমরুল কেবল দৈহিক যন্ত্রণা দিতে পারে; কিন্তু লোভ- লালসা অন্তরাত্মাকে ক্ষত-বিক্ষত করে ফেলে। একথা শুনার পর আমি সেখান থেকে প্রস্থান করলাম।'
বস্তুতঃ রিপুর তাড়না ও যথেচ্ছাচারিতা বাদশাহকে গোলামে পরিণত করে এবং ধৈর্য ও সংযম গোলামকে বাদশাহর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে। এ প্রসঙ্গে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম ও যুলায়খার জীবনালেখ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, হযরত ইউসুফ (আঃ) ধৈর্য ও সংযমশীলতার ফলশ্রুতিতে মহান সম্রাট ও শাসনকর্তার মর্যাদা লাভ করেছিলেন। আর যুলায়খা শুধুমাত্র কাম-প্রবৃত্তির অনুসরণের পরিণতিতে জঘন্যভাবে হেয় প্রতিপন্ন হয়েছেন। কারণ যুলায়খা হযরত ইউসুফকে ভালবাসতে গিয়ে ধৈর্য-সহিষ্ণুতা ও সংযমের পরিচয় দিতে পারেন নাই।
আবুল হাসান রাযী (রহঃ) স্বীয় পিতাকে মৃত্যুর দুই বৎসর পর স্বপ্নে দেখলেন যে, তিনি আলকাতরার পোষাক পরিহিত অবস্থায় আছেন। জিজ্ঞাসা করলেন: 'আব্বাজান! আপনার অবস্থা দোযখবাসীদের ন্যায় দেখা যাচ্ছে, এর কারণ কি?' পিতা বললেন,- 'হে পুত্র! আমার রিপু ও কুপ্রবৃত্তি আমাকে দোযখে ঠেলে দিয়েছে। প্রিয় পুত্র। নফস ও প্রবৃত্তির ব্যাপারে তুমি কখনো গাফেল হয়ো না; সদা সতর্ক ও সচেতন থেকে এহেন শত্রু হতে আত্মরক্ষা করার চেষ্টা কর। কেননা আজকে আমার এ দুর্দশার কারণই হচ্ছে ইবলীস, দুনিয়ার মোহ, প্রবৃত্তির অনুসরণ এবং কাম-বাসনা চরিতার্থকরণ। এরই ফলশ্রুতিতে আমি ধ্বংস ও বিনাশের এই অতল গহ্বরে নিক্ষিপ্ত হয়েছি। নিজের দুর্ভাগ্য আমি নিজেই টেনে এনেছি, জেনেশুনে শত্রুকে প্রশ্রয় দিয়েছি। ফলে, আমি নাজাতের কোনই আশা করতে পারছি না।'
হযরত হাতেম আছাম্ম (রহঃ) বলেন, 'প্রবৃত্তি আমার সীমান্ত রেখা, জ্ঞান-বিদ্যা আমার অস্ত্র, পাপ আমার লাঞ্ছনা ও অপমান, শয়তান আমার শত্রু এবং রিপু আমার প্রতারক ও প্রবঞ্চনাকারী।'
জনৈক বুযুর্গ বলেছেন: 'জিহাদ তিন প্রকারে বিভক্ত : এক,- পথভ্রষ্ট ও বাতিলপন্থীদের বিরুদ্ধে যুক্তি-প্রমাণের মাধ্যমে জিহাদ করা। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেছেনঃ "তাদের সাথে বিতর্ক করুন সম্ভাবে"।(নাহল : ১২৫)
দ্বিতীয় প্রকার হচ্ছে,-কাফের ও মুশরিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা; এটা স্পষ্ট যুদ্ধ। যেমন কুরআন পাকে ইরশাদ হয়েছে : "তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করে।" (মায়িদাহঃ ৫৪)
তৃতীয়,-রিপু ও কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে জিহাদ করা। যেমন আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেছেনঃ "যারা আমার উদ্দেশ্যে জিহাদ (সাধনা) করে, তাদেরকে অবশ্যই আমার পথে পরিচালিত করবো"।(রুম: ৬৯)
এই মর্মে হুযুর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন : "রিপুর বিরুদ্ধে জিহাদ করাই হচ্ছে উত্তম জিহাদ।"
সাহাবায়ে কেরাম কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদ সম্পন্ন করে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে প্রত্যাবর্তন করার পর বলতেনঃ "আমরা ক্ষুদ্রতম জিহাদ সমাপন করে বৃহত্তম জিহাদে (প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে) প্রত্যাবর্তন করেছি"। প্রবৃত্তি ও শয়তানের বিরুদ্ধাচরণকে 'বৃহত্তম জিহাদ' নামে অভিহিত করার তাৎপর্য হচ্ছে,-কাফেরের বিরুদ্ধে জিহাদ করার ব্যাপারটা একান্ত সাময়িক; কিন্তু শয়তান, কাম-প্রবৃত্তি ইত্যাদি মানুষের সার্বক্ষণিক শত্রু, হর-হামেশা মানুষের সাথে এদের বিসম্বাদ লেগেই থাকে। এছাড়া কাফেরের বিরুদ্ধে জিহাদকারী ব্যক্তি শত্রুকে স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করতে পারে; কিন্তু নফস ও শয়তান মানুষের চোখে ধরা পড়ে না। আর একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, দৃশ্যমান শত্রুর চাইতে অদৃশ্য শত্রু মারাত্মক ও ধ্বংসাত্মক হয় বেশী। এছাড়া আরও একটি কারণ হচ্ছে, -শয়তান সরাসরি রিপু ও কুপ্রবৃত্তিকে তোমার বিরুদ্ধে সাহায্য করে; আর এক্ষেত্রে রিপুই হচ্ছে সকল অনিষ্ট ও স্বেচ্ছাচারিতার মূল। পক্ষান্তরে কাফের তোমার রিপু বা নফসের পক্ষে সাহায্যকারী নয়। এতদ্ব্যতীত আরও কারণ হচ্ছে যে, কোন কাফেরকে তুমি হত্যা করতে সক্ষম হলে গণীমতের মাল ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা লাভ করবে; আর যদি কোন কাফেরের হাতে তুমি নিহত হও, তা'হলে শাহাদতের মর্যাদা ও জান্নাত লাভ করবে। সুতরাং এখানে উভয় দিকেই তোমার স্বার্থ ও কল্যাণ রয়েছে। পক্ষান্তরে শয়তানকে হত্যা করার ক্ষমতা তোমার নাই; অথচ তোমাকে ধ্বংস করার ক্ষমতা শয়তানের আছে। খোদা না করুন যদি শয়তান তোমাকে ধ্বংস করে ফেলে, তা'হলে তুমি চিরশাস্তির ফাঁদে পড়ে গেলে। সুতরাং এখানে উভয় দিকেই তোমার ক্ষতি ও ধ্বংস অনিবার্য। এজন্যেই বুযুর্গানে দ্বীন বলেছেন : 'যুদ্ধক্ষেত্রে যার ঘোড়া পলায়ন করে, সে শত্রুর হাতে বন্দী হয়, আর শয়তানের ফাঁদে পড়ে যার ঈমান বিলুপ্ত হয়, সে আল্লাহর আযাব ও গজবে গ্রেফতার হয়। অনুরূপ যে ব্যক্তি কাফেরের হাতে বন্দী হয়, তার হস্তদ্বয় জিঞ্জীর দিয়ে গলার সাথে বেধে দেওয়া হয় না, তার পদদ্বয় বাঁধা হয় না, তার উদর অভুক্ত থাকে না। কিন্তু আল্লাহর আযাব ও গজবে গ্রেফতার ব্যক্তির অবস্থা খুবই করুণ, খুবই মারাত্মক, তার মুখমণ্ডল কালো অন্ধকার করে দেওয়া হয়, হস্তদ্বয় লোহার শিকল দিয়ে গলার সাথে বেঁধে দেওয়া হয়, পায়ে আগুনের বেড়ী পরিয়ে দেওয়া হয়, অগ্নি পান করানো হয়, অগ্নি খাওয়ানো হয়, অগ্নির পোষাক পরানো হয়।'
পরবর্তী পর্ব

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন