প্রখ্যাত ফকীহ আবু লাইছ সমরকন্দি (রহঃ) বলিয়াছেন, প্রত্যেক লোকের সহিত দুইজন ফেরেশতা থাকেন। তাহারা দিন-রাত সেই লোকের তত্ত্বাবধান করেন। তাহারা তাহার নিশ্বাস-প্রশ্বাস, নেক-বদ, ন্যায়-অন্যায়, আনন্দ-তামাসা ইত্যাদি প্রত্যেক কৃতকার্য লিখিয়া রাখেন। যেমন, আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন, “আর নিশ্চয়ই তোমাদের সহিত দুইজন তত্ত্বাবধানকারী রহিয়াছেন।” তাহারা প্রতিদিন সকাল-বিকাল তাহার কৃতকার্য আল্লাহর নিকট পেশ করেন। তাহা ছাড়া ১৫ই শাবান রাত্রে, শবে বরাত ও শবে কদরের রাত্রে পূর্ণ বৎসরের আমলনামা জমায়েত করা হয় আর বাহুল্য বাক্যগুলি নিশ্চিহ্ন করিয়া শীলমোহর করতঃ সযত্নে রাখা হয়।
যখন বান্দার জান কবজ শুরু হয়, তখন সেইগুলি একত্রিত করতঃ মৃত্যুর পর কণ্ঠহারের মত গলায় ঝুলাইয়া দেওয়া হয়। কবরে উহা তাহার গলায় ঝুলিতে থাকে। যেমন, আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন, “আর প্রত্যেক লোকের আমলনামা তাহার গলায় লটকাইয়া দেওয়া আমাদের উপর অপরিহার্য করিয়াছি।” অর্থাৎ প্রত্যেকের আমলনামা প্রকৃতই তাহার গলায় ঝুলাইয়া দেওয়া হয়। হার এবং তৌক যেমন গলার সৌন্দর্য পরিবর্ধিত করে তেমনি আমলনামাও উহাতে পরান হয়। রোজ কিয়ামতে আল্লাহ বান্দার আমলনামা প্রকাশ করিবেন। সে তাহার আমলনামা খোলা দেখিতে পাইবে। তখন তাহাকে বলা হইবে যে, তুমি উহা পাঠ কর। সে উহা পাঠ করতঃ নিজের কৃত নেক-বদ দেখিয়া নিজের সম্পর্কে ভালমন্দ কল্পনা করিতে সক্ষম হইবে।
রোজ কিয়ামতে যখন আল্লাহ পাক হিসাব-নিকাশ লইতে ইচ্ছা করিবেন, তখন , শিলাবৃষ্টির ন্যায় প্রত্যেকের আমলনামা তাহার উপর পতিত হইবে। তখন ফেরেশ্তা ঘোষণা করিবেন, “হে অমুক! তুমি নিজের আমলনামা ডাহিন হাতে গ্রহণ কর। হে অমুক! তুমি নিজের আমলনামা বামহাতে গ্রহণ কর। হে অমুক! তুমি নিজের আমলনামা পিছনের দিক হতে বামহাতে গ্রহণ কর।” সেদিন পুণ্যবান বান্দাই কেবল ডাহিন হাতে তাহার আমলনামা লাভ করিবে। গুনাহ্গার পাপী বামহাতে আমলনামা পাইবে। আর কাফের বেদ্বীন পশ্চাৎ দিক হইতে আমলনামা গ্রহণ করিবে। যেমন, আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন, “সুতরাং যাহার আমলনামা ডাহিন হাতে দেওয়া হইবে, তাহার হিসাব সহজে তাড়াতাড়ি হইবে এবং সে আনন্দিতচিত্তে স্বীয় পরিবার-পরিজনদের নিকট প্রত্যাবর্তন করিবে।” এই হিসাবে দেখা যায় হাশর মাঠে মানুষ তিন শ্রেণীতে বিভক্ত হইবে। কাফের বেদ্বীন বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্তশীল হইবে। ধর্মপ্রাণ মুমিন বান্দাদের হিসাব অতি তাড়াতাড়ি হইবে, গুনাহগারদের হিসাব অত্যন্ত কঠিনভাবে শেষ হইবে এবং শাস্তি ভোগ করতঃ পরিণামে চিরস্থায়ী দোযখ হইতে মুক্তি পাইবে।
নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হইতে আরও বর্ণিত আছে যে, “মানুষ ঐ পর্যন্ত আল্লাহর সামনে দাঁড়াইয়া থাকিবে, যে পর্যন্ত না আল্লাহ তাহাকে জিজ্ঞাসা করিবেন, “হে বান্দা! তুমি কত বয়স পাইয়াছ এবং উহা কি কাজে খরচ করিয়াছ?”
তারপর আল্লাহ তাহার আমলনামা পরীক্ষা করিয়া তাহাকে জিজ্ঞাসা করিবেন, “বল, ইহাতে যাহা আছে, এই , সমস্তই তুমি করিয়াছ, না আমার ফেরেশ্তাগণ ইচ্ছামত নিজেরা ইহা লিখিয়াছে।” বান্দা বিনয়ের সহিত উত্তর করিবে, “না, আল্লাহ! আমি নিজেই এই সমস্ত কাজ করিয়াছি।” পরিশেষে আল্লাহ তাহাকে বলিবেন, “হে বান্দা! পৃথিবীতে আমি এই সমস্ত গোপন রাখিয়াছি! যাও, আজ আমি তোমাকে মাফ করিলাম। আজ তুমি নির্বিঘ্নে বেহেশতে দাখিল হও। আজ সমস্তই মাফ করিয়া দিলাম।" আল্লাহর করুণায় এই ব্যক্তি জিজ্ঞাসাবাদের পর মুক্তি পাইবে! আর যাহার হিসাব সহজ হইবে, তাহার সম্পর্কে আল্লাহ পাক ঘোষণা করিয়াছেন যে, “যাহার আমলনামা ডাহিন হাতে দেওয়া হইবে, তাহার হিসাব অতি তাড়াতাড়ি হইবে। এই সম্পর্কে কেহ হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)কে জিজ্ঞাসা করিল, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! সহজ হিসাব কিরূপ হইবে?" উত্তরে আঁ হযরত (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন, “বান্দা তাহার আমলনামার দিকে চাহিয়া থাকিবে আর তখনই তাহাকে ক্ষমা করিয়া দেওয়া হইবে।” হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, রোজ কিয়ামতে আল্লাহ পাক মুমিন বান্দাদের সঙ্গে এমন আচরণ করিবেন, যেমন হযরত ইউছুফ (আঃ) স্বীয় ভাইদের সহিত করিয়াছিলেন। তিনি তাহাদিগকে বলিয়াছিলেন, “আজ তোমাদের দোষ ধরা হইবে না।” অনুরূপভাবে আল্লাহ পাক বলিবেন, “হে আমার বান্দা! তুমি দুনিয়াতে কি কাজ করিয়াছ জান?” উত্তরে 'জানি' অথবা 'জানিনা' বলিবার সাহস কাহারও হইবে না। আরও আছে যে, আল্লাহ পাক যখন হিসাব-নিকাশে মনোনিবেশ করিবেন, আল্লাহ পাকের পক্ষ হইতে কেহ উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করিবেন, “হে কোরায়েশ বংশীয় নবী! আজ আপনি কোথায়?” ইহা শ্রবণান্তে নবী পাক (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরশের নীচে গমন করিয়া আল্লাহর এত তারীফ ও তাস্বীহ পড়িবেন যে সমস্ত সৃষ্ট প্রাণী আশ্চর্যান্বিত হইবে। তারপর হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) নিজ উম্মতদিগকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত না করার জন্য আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করিবেন। আল্লাহ পাক তাঁহার উম্মতগণকে হাজির করিতে নির্দেশ দিবেন। হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাহাদিগকে তখনই আল্লাহর সামনে উপস্থিত হইতে বলিবেন। তাহারা তখনই নিজ নিজ কবরের উপরে দাঁড়াইয়া থাকিবে। সেই অবস্থায়ই আল্লাহ তাহাদের হিসাব লওয়া শুরু করিবেন। তন্মধ্যে যাহাদের হিসাব আল্লাহ সহজ করিবেন তাহাদের উপর তিনি ক্রোধান্বিত হইবেন না। তাহাদের গুণাহগুলিকে তিনি তাহাদের আমলনামার ভিতরে এবং নেকগুলিকে উহার উপরে রাখিবেন এবং তাহাদের মস্তকে হীরা ও মণিমুক্তা খচিত একটি তাজ ও প্রত্যেককে সত্তরটি বেহেশ্তী পোশাক পরিধান করাইবেন। তাহা ছাড়া সোনা, রূপা ও মতির তিনটি কঙ্কন দ্বারাও তাহাদিগকে সৌন্দর্য মন্ডিত করিবেন। তারপর তাহারা স্বীয় মুমিন ভ্রাতৃগণের সহিত দেখা করিতে যাইবে, কিন্তু তাহারা তাহাদিগকে চিনিতে অক্ষম হইবে। তখন তাহাদের ডাহিন হাতে আমলনামা চমকাইতে থাকিবে। উহাতে তাহাদের পুণ্যকর্মাদি ও দোযখের আযাব হইতে নিস্তার লাভের সুসংবাদের সঙ্গে অনন্তকাল বেহেশতে অবস্থানের হুকুম লেখা থাকিবে। তাহারা স্বীয় বন্ধুদিগকে জিজ্ঞাসা করিবেন, “তোমরা কি আমাকে চিনিতে পার নাই? আমি অমুকের তনয় অমুক। আল্লাহ পাক আমাকে মর্যাদা দান করিয়াছেন, দোযখের শাস্তি হইতে পরিত্রাণ দিয়াছেন এবং অনন্তকাল বেহেশতে অবস্থান করিবার এজাজত দিয়াছেন।”

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন