মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর, ২০২৪

হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (১৮) সংগঠন উদ্ভাবন পদ্ধতি



মানব সমাজের বিভিন্ন সংগঠন - ১

📚 হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (পর্ব- ১৮)
✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)

সংগঠন উদ্ভাবন পদ্ধতি 
জেনে রাখুনমানুষ খানা-পিনা,বিয়ে-শাদীগ্রীষ্মে-বর্ষায় ছত্রছায়া গ্রহণশৈত্যে গরম কাপড় ব্যবহার ইত্যাকার চাহিদায় সবাই সমান। আল্লাহ তাআলা বিশেষ অনুগ্রহ করে সব শ্রেণীকেই যার যার এ ধরনের প্রয়োজন পূরণের জন্য প্রকৃতিগত ইলহাম’ করে রেখেছেন। তাই তারা জানতে পায়কি করে কোন উপায়ে সে সব প্রয়োজন মিটাতে হবে। এ গুণগত দিক থেকে সবাই একাকার। কিন্তু যদি কেউ প্রকৃতিগত ভাবেই পংগু ও দুর্বল হয় এবং কোন চাহিদা না-ই থাকেসেটা স্বতন্ত্র কথা। 
লক্ষ্য করুনমৌমাছি জানে কোন গাছে কি ফুল বা ফল খেতে হবেকিভাবে মধু আহরণ করতে হবেকোথায় কিরূপ ঘর বানাতে হবে। অন্য পাখী জানেকোথা থেকে তাকে খাদ্য ও পানি সংগ্রহ করতে হবে। বিড়াল বা বাজ দেখলে পালাতে জানে। জানে তার প্রয়োজনের পথে অন্তরায় দেখলে তা দূর করার সংগ্রাম চালাতে। যৌন মিলন পদ্ধতিও তাদের অজানা নেই। নিরাপদে বসবাসের জন্য পাহাড়ের টিলায় কিংবা উঁচু গাছে বাসা বাঁধতে হবে তাও জানে। বাসায় ডিম দিয়ে কিভাবে তা হেফাজত করতে হবে তাও বুঝে। মোট কথাএ সব ব্যাপারে প্রত্যেক শ্রেণীর স্বতন্ত্র পদ্ধতি জানা রয়েছে। শ্রেণীগত স্বাতন্ত্র্যের ভিত্তিতে প্রত্যেক শ্রেণীকেই প্রকৃতিগতভাবেই প্রয়োজনীয় জ্ঞান দান করা হয়। 

এভাবেই আল্লাহ তাআলা মানুষকে তাদের প্রয়োজন মিটাবার ও কল্যাণ সাধনের ক্ষেত্রে সহজতর পথ উদ্ভাবনের জন্য বিশেষ জ্ঞান দান করেছেন। যেহেতু মানব জাতি অন্যান্য জাতি থেকে বড়তাই তার শ্রেষ্ঠত্ব অনুসারে তাকে তিনটি অতিরিক্ত জিনিস দেয়া হল। 
প্রথমতমানুষ কিছু করতে চাইলে সব দিক বিচার-বিবেচনা করেই তা চায়। পক্ষান্তরে চতুষ্পদ জীব শুধু প্রাকৃতিক তাগাদা দ্বারা পরিচালিত হয়। যেমন ক্ষুধাতৃষ্ণাযৌনস্পৃহা ইত্যাকার ব্যাপার। অথচ মানুষ জৈবিক প্রয়োজন ছাড়াই বুদ্ধি বৃত্তির প্রেরণার কাজ করে। কখনও তারা নগর ও রাষ্ট্র সুশাসন পদ্ধতি প্রবর্তনে উদ্যোগী হয়। কখনও তারা চরিত্র উন্নয়ন কিংবা আত্ম সংশোধনের প্রয়াস চালায়। কখনও পরকালের শাস্তির ভয়ে সংযত জীবনে অভ্যস্ত হয়। কখনও মানুষের কাছে মর্যাদা প্রতিষ্ঠা লাভের আকাঙ্ক্ষী হয়। 

দ্বিতীয়তমানুষ তার প্রয়োজন মিটানোর পদ্ধতিটি শালীন ও সুন্দর করতে চায়। অথচ চতুষ্পদ জীব যে কোন ভাবে তার প্রয়োজন মিটায়। মানুষ প্রয়োজন পূরণের ক্ষেত্রে রুচি ও আনন্দের তাগাদাদা অনুভব করে। যেমনসে সুন্দরী স্ত্রীসুস্বাদু খাদ্যউত্তম পোশাক ও সুরম্য ভবন পছন্দ করে। 

তৃতীয়তএমন কিছু মানুষও রয়েছেনযারা জ্ঞানগত উৎকর্ষের ফলে অনেক ভাল ভাল কল্যাণপ্রদ ব্যাপার নিয়ে ভাবেন ও তা অনুসরণে প্রয়াসী হন। এরূপ একদল মানুষও রয়েছে যারা জ্ঞানী লোকদের উদ্ভাবিত ব্যবস্থা ও অনুসৃত পদ্ধতি পছন্দ করে। কিন্তু নিজে তার উদ্ভাবন ক্ষমতা রাখে না। তারা কোন জ্ঞানীর বিশেষ উদ্ভাবন নিজের মোটামুটি জ্ঞানের অনুকূল পেয়ে তা অনুসরণ করতে আগ্রহী হয়। ক্ষুৎ-পিপাসা কাতর অনেক ব্যক্তিকে দেখতে পাবেন তারা নিজেরা তা জুটিয়ে নিতে না পেরে বেশ কষ্ট পেতে থাকেকিন্তু যখন তা সরবরাহ করা হয়অমনি অত্যন্ত আগ্রহ সহকারে তা যথারীতি নেবার জন্য প্রয়াসী হয়। ঘটনাক্রমে কোন উপযুক্ত জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তি যদি এ অবস্থায় পড়েনতা হলে তিনি খাবার যোগ্য তরি-তরকারী নির্বাচন করে তার চাষ করবেনপানি সেচে যত্ন নেবেনকেটে-কুটে পরিস্কার করে খেয়ে নিবেন এবং পরবর্তী সময়ে খাবার জন্য কিছু জমিয়ে রাখবেন। এমন কি ফসলের ক্ষেত থেকে পানি দূরে থাকলে পয়ঃপ্রণালী কেটে পানি আনয়নের ব্যবস্থা করবেন কিংবা পুকুর কেটে নেবেন অথবা মশক বানিয়ে ডোংগা তৈরী করে কাজ চালাবেন। এ ভাবে খাদ্য উৎপাদন প্রয়াসের তিনি সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর প্রণালী উদ্ভাবন করবেন। এ ব্যক্তির উদ্ভাবিত এ পদ্ধতি স্বভাবতই উক্ত ক্ষুৎ-পিপাসা কাতর ব্যক্তিরা আগ্রহভরে অনুসরণ করবে। 
তেমনি কোন অজ্ঞ ব্যক্তি কাঁচা ফসল বা তরকারী খেয়ে পেট নষ্ট করবে। তাই সে তা এমন উপায়ে খেতে আগ্রহী হবে যাতে পেট খারাপ না হয়। কিন্তু সে পথ তো তার জানা নেই। অবশেষে সে এ ক্ষেত্রে কোন অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে পেল। তিনি পাকাতে জানেনপিষতে জানেনভুনতে জানেন ও ভাজতে জানেন। তাই অজ্ঞ ব্যক্তিটি আগ্রহ ভরেই এ সব উদ্ভাবন অনুসরণ করবে এবং এ ক্ষেত্রে তার জ্ঞানের প্রসারতাও বেড়ে যাবে। 
এ দুটো উদাহরণের আলোকেই আপনি মানুষের অন্যান্য প্রয়োজন পূরণের ব্যাপারটি অনুমান করুন। মানুষ সমস্যায় ভুগেছে। তাদের এক জ্ঞানী ব্যক্তি ভেবে-চিন্তে সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করেছেন। অন্যান্য মানুষ সেটা অনুসরণ করেছে। এ ভাবেই চলে এসেছে মানুষের প্রয়োজন পূরানোর ব্যবস্থাটি। তাই তার প্রয়োজন পূরণের প্রকৃতিগত জ্ঞানের সাথে এ সব অর্জিত বাড়তি জ্ঞান মিলে কল্যাণ অর্জনের বিপুল জ্ঞান ভাণ্ডার সৃষ্টি হয়েছে। সে সব নিয়মিত অনুসরণ করে তারা পূর্ণ মাত্রায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এমন কি সে সব পদ্ধতিতে তারা জীবন ধারণের স্বাভাবিক রীতিতে পরিণত করেছে এবং সেগুলো তাদের বাঁচা-মরার প্রশ্নের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। 
মোট কথামানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসের মতই প্রকৃতিগত জ্ঞান উক্ত তিন ব্যাপারের সাথে সম্পূর্ণ অবিচ্ছেদ্য। মানুষের জন্য মৌলিক শ্বাস-প্রশ্বাস অপরিহার্য। শিরা থাকলে তা নড়া যেমন অপরিহার্যএও তেমনি। তবে শক্তি ও দুর্বলতা ভেদে শিরা সঞ্চালনে ক্ষিপ্রতা ও মন্থরতা আসে। সেরূপ শ্বাস-প্রশ্বাসও। তবে শ্বাস-প্রশ্বাস দীর্ঘ বা হ্রস্ব করা মানুষের ইচ্ছাধীন। 
উক্ত তিনটি ব্যাপার সব মানুষের ভেতর সমানে পাওয়া যায় না। স্বভাববুদ্ধি ও অনুভূতির পার্থক্যের কারণে সিদ্ধান্ত গ্রহণপছন্দ-অপছন্দ এবং ভাল-মন্দ বিচার ও অনুসরণের ক্ষেত্রে পার্থক্য দেখা দেয়। তা ছাড়া চিন্তা-ভাবনার সুযোগ-সুবিধার তারতম্যের কারণেও মানুষের অবস্থায় তারতম্য আসে। এ কারণেই জীবন ধারা অনুসরণের দুটো সীমারেখা নির্দিষ্ট করা হয়েছে। 
প্রথমটি থেকে সাধারণ ও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মানবগোষ্ঠীও বাদ থাকতে পারে না। মরুর বেদুঈনপার্বত্য জাতি ও সভ্যজগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন মনুষ্য সমাজ এ প্রাথমিক স্তরের জীবন ধারার অন্তর্ভুক্ত। 

দ্বিতীয় ধারায় সভ্য জগতের বড় বড় শহর ও বস্তির বাসিন্দারা অন্তর্ভুক্ত। সেখানে উন্নত চরিত্র ও মনীষা জন্ম নেয়। সে সব শহরে বিভিন্ন মত ও পথের মানুষ বাস করে। জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় উপাদানের প্রাচুর্য থাকেসেখানে বিভিন্ন মুখী অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান অর্জিত হয়। সে সব জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার আলোকে বিভিন্ন মূলনীতি ও আইন প্রণীত হয়। সেখানকার অধিবাসীরা গুরুত্ব সহকারে সেগুলো অনুসরণ করে চলে। এ জীবন ধারার উন্নততম পর্যায় হল রাষ্ট্র ব্যবস্থা। রাষ্ট্রপতিকে কেন্দ্র করে সমবেত হন বিভিন্ন সমাজের জ্ঞানী-গুণীবৃন্দ। তিনি তাঁদের পরামর্শে বিভিন্ন কল্যাণপ্রদ ও সঠিক উপায়-উপকরণের উদ্ভব ঘটান। এ পর্যায়টিকেই আমরা জীবন ধারার দ্বিতীয় স্তর বলে থাকি। 
এ দ্বিতীয় স্তর যখন পূর্ণ হয়ে যায়তখন উন্নয়নের তৃতীয় স্তর প্রয়োজনীয় হয়ে দেখা দেয়। তা এইযখন মানবমণ্ডলী একত্রে তাদের কাজ-কারবার চালায় তখন পরস্পরের ভেতর কার্পণ্যলালসাহিংসাঅবহেলামান্যতা ও অমান্যতা জনিত দ্বন্দ্বের বীজ দেখতে পায়। সেগুলো স্বভাবকেও প্রভাবিত করতে উদ্যোগী হয় এবং পরিণামে তাদের ভেতর দ্বন্দ্ব-বিভেদ দেখা দেয়। তাদের ভেতর কলুষ বাসনার লোকও দেখা দেয়। এমনকি স্বভাবগত খুনী ও দাংগাবাজ লোকের উদ্ভব ঘটে। তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের রীতি-নীতি ও বিধি-বিধান হয় মেনে নিতে চায় নানয় মেনে নেবার ক্ষমতা রাখে না কিংবা কেউ তাদের তা মানাতে সাহসী হয় না। তাই মানুষ কোন ইনসাফগার শাসক বা বিচারক নির্বাচন করতে বাধ্য হয়। তিনি যেন অপরাধীকে শাস্তি দেনবিদ্রোহীকে দমন করেনসবার কাছ থেকে কর আদায় করে সমাজের সার্বজনীন কল্যাণ ও সংস্কারের কাজে ব্যয় করেন। 
এ তৃতীয় স্তরের উন্নয়ন থেকেই চতুর্থ স্তরে উন্নীত হবার তাগাদা সৃষ্টি হয়। তা এভাবে যেদেশে দেশে যখন শাসক নিযুক্ত হয়ে যায়তখন ধন-সম্পদের চাবিকাঠি তাঁর মুঠোয় চলে যায়। ফলে সবল ও বিচক্ষণ লোকেরা তাঁর পাশে ভিড় জমায়! তাদের ভেতর কার্পণ্যসংকীর্ণতালোভ-লালসা ও হিংসা-বিদ্বেষের জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে। তার ফলে তাদের ভেতর শুরু হয় ঝগড়াফাসাদ ও রক্তারক্তি। তখন শাসকরা বাধ্য হয় এ পারস্পরিক দ্বন্দ্ব এড়াবার জন্য একজন আন্তর্জাতিক নেতা বা খলীফা নির্বাচন করতে। কিংবা এমন একটি আন্তর্জাতিক শক্তির আওতায় সংঘবদ্ধ হতে যাকে উপেক্ষা করা বা ঘায়েল করা কারো পক্ষে সহজসাধ্য নয়। তা করতে হলে অনেক দেশ বা জাতি মিলে করতে হয় এবং অসংখ্য লোক ও অজস্র ক্ষয়-ক্ষতি স্বীকার করেই তা করতে হয়। বলা বাহুল্যএরূপ আন্তর্জাতিক মহাযুদ্ধের সম্ভাবনা সর্বাধিক কম এবং দীর্ঘকাল পরে হয়ত তা সম্ভব হতে পারে। 
এ খেলাফত বা আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রয়োজন সব দেশ ও জাতির জন্য সমান নয়। দেশবাসীর অবস্থা ভেদে তা দেখা দেয়। যে জাতি রূঢ় স্বভাবের এবং নৈতিকতা বর্জিততাদের প্রয়োজন সর্বাধিক।পক্ষান্তরে যারা শালীনউদার ও মহানুভব তাদের প্রয়োজন খুবই কম। 
এখন আমি আপনাদের মানবীয় জীবন ধারার বিভিন্ন রীতি-নীতি ও অধ্যায়ের তালিকা সম্পর্কে অবহিত করব। উত্তম চরিত্রের প্রকৃষ্ট জাতির জ্ঞানী-গুণীদের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা থেকে তা পাওয়া গেছে। তাঁরা এগুলোকে সর্ববাদি সম্মত নীতি হিসেবে মেনে নিয়েছেন। তাঁদের সমসাময়িক কিংবা কাছাকাছি কালের কেউই এগুলো সম্পর্কে দ্বিমত পোষন করেন নি। এখন আপনাদের সামনে যা কিছু পেশ করা হচ্ছেঅনুধাবন করুন।
------------

পরবর্তী পর্ব
মানব সমাজের বিভিন্ন সংগঠন -২
প্রথম সংগঠন 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...