মানব সমাজের বিভিন্ন সংগঠন - ৮
আন্তঃরাষ্ট্রিক নীতিমালা
এ অধ্যায়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রের পারস্পরিক সম্পর্ক বিষয়ক নীতিমালা আলোচিত হবে। কি করে বিভিন্ন রাষ্ট্রের মাঝে সুসম্পর্ক বহাল রাখা যায় সেটাই এ নীতিমালার লক্ষ্য। এ নীতির মাধ্যমে বিভিন্ন রাষ্ট্রের ও জাতির ভেতরে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক কায়েম হবে। যেহেতু প্রত্যেক রাষ্ট্রই স্বাধীন ও তার শাসকই রাষ্ট্রের সব কিছুর অধিকর্তা, তাই স্বভাবতঃই তার ভাণ্ডারে সম্পদ পুঞ্জিভূত হয় এবং লোভী ও উচ্চাভিলাষী লোক তার সভাসদ হয়। ফলে বিভিন্ন স্বভাব ও দক্ষতার শাসকমণ্ডলীর ভেতর মতানৈক্য ও দ্বন্দ্ব দেখা যায়। যে শাসক নিজকে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী দেখতে পায়, সে শাসক অপেক্ষাকৃত দুর্বল শাসকদের উপর জোর-জুলুম চালাতে চায়। এমন কি তা দখল করে নেয়ার জন্য লালায়িত হয়। তাছাড়া সম পর্যায়ের হলেও পারস্পরিক ঈর্ষা থেকে ছোক-খাট বিষয় নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। কখনও সীমান্ত ভূখণ্ড নিয়ে, কখনও বা সম্পদ আহরণ নিয়ে এ দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। এ সবের ফলে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে যুদ্ধ-বিগ্রহ দেখা দেয়। এ কারণেই একজন খলীফার প্রয়োজন অপরিহার্য হয়ে যায়।
খলীফা বলতে সেই লোকটিকে বুঝায়, যার কাছে সৈন্য-সামন্ত ও যুদ্ধ সরঞ্জাম এত বেশী রয়েছে যে, তার দিকে কারো হাত বাড়ানো স্বভাবতঃই অসম্ভব। কারণ তার রাষ্ট্রে হস্তক্ষেপ করতে হলে অনেক রাষ্ট্রও তাদের সেনা সম্পদ একত্র করে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তবে হয়ত তা কিছুটা ভাবা যায়। অথচ তার বিরুদ্ধে সব রাষ্ট্র একত্র করা সাধারণ এক অভাবনীয় ব্যাপার।
রাষ্ট্রবর্গের যখন কোন খলীফা নির্ধারিত হয়ে যায় এবং তার মাধ্যমে উত্তম নীতি ও চরিত্র পরিশীলিত হয়, বিদ্রোহীরা অনুগত হয়ে যায় ও শাসকবর্গ তাকে মেনে নেয়, তখন আল্লাহর নিয়ামত পরিপূর্ণভাবে আত্মপ্রকাশ করে। সব রাষ্ট্রে স্বস্তি দেখা দেয় এবং জনগণ আশ্বস্ত হয়ে যায়। খলীফাকে তখন শুধু হিংস্র প্রকৃতির লোকদের শায়েস্তা করতে হয় যারা জনগণের সম্পদ লুটে খায় আর তাদের সন্তানদের কয়েদী বানিয়ে থাকে। তিনি তাদের উৎপাত-উৎপীড়নের মূলোৎপাটন ঘটিয়ে জনগণকে তাদের ক্ষতি ও ভীতি থেকে মুক্ত করেন।
এ কারণেই বনী-ইসরাঈলরা তাদের নবীর কাছে আবেদন করেছিল যে, ‘আমাদের জন্য একজন বাদশাহ পাঠান, তাহলে আমরা আল্লাহর পথে জেহাদে অবতীর্ণ হতে পারব’। যখন প্রকৃতি পূজারী হিংস্র প্রকৃতির লোকগুলো বদ অভ্যেসের বশবর্তী হয়ে দেশে ফেতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করে, তখন তার প্রতিকার ব্যবস্থা সম্পর্কে আল্লাহ পাক নবীদের সরাসরি কিংবা পরোক্ষভাবে এ কথাই জানিয়ে দেন যে, প্রথমে তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি নির্মূল করতে হবে। তাতেও তারা সংশোধিত না হলে তাদের হত্যা করতে হবে। এ ধরনের লোক সমাজ দেহের বিষাক্ত অংগটির মতই আশংকাজনক হয়ে থাকে। তখন খলীফার কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায় তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এ ব্যবস্থা সম্পর্কে আল্লাহ বলেনঃ "আল্লাহ পাক যদি একদল দ্বারা অন্য দলকে শায়েস্তা না করতেন, তা হলে তারা গীর্জা, মসজিদ সব কিছুই বিধ্বস্ত করত"। (সূরা হাজ্জ্বঃ ৪০)
এ অধ্যায়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রের পারস্পরিক সম্পর্ক বিষয়ক নীতিমালা আলোচিত হবে। কি করে বিভিন্ন রাষ্ট্রের মাঝে সুসম্পর্ক বহাল রাখা যায় সেটাই এ নীতিমালার লক্ষ্য। এ নীতির মাধ্যমে বিভিন্ন রাষ্ট্রের ও জাতির ভেতরে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক কায়েম হবে। যেহেতু প্রত্যেক রাষ্ট্রই স্বাধীন ও তার শাসকই রাষ্ট্রের সব কিছুর অধিকর্তা, তাই স্বভাবতঃই তার ভাণ্ডারে সম্পদ পুঞ্জিভূত হয় এবং লোভী ও উচ্চাভিলাষী লোক তার সভাসদ হয়। ফলে বিভিন্ন স্বভাব ও দক্ষতার শাসকমণ্ডলীর ভেতর মতানৈক্য ও দ্বন্দ্ব দেখা যায়। যে শাসক নিজকে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী দেখতে পায়, সে শাসক অপেক্ষাকৃত দুর্বল শাসকদের উপর জোর-জুলুম চালাতে চায়। এমন কি তা দখল করে নেয়ার জন্য লালায়িত হয়। তাছাড়া সম পর্যায়ের হলেও পারস্পরিক ঈর্ষা থেকে ছোক-খাট বিষয় নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। কখনও সীমান্ত ভূখণ্ড নিয়ে, কখনও বা সম্পদ আহরণ নিয়ে এ দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। এ সবের ফলে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে যুদ্ধ-বিগ্রহ দেখা দেয়। এ কারণেই একজন খলীফার প্রয়োজন অপরিহার্য হয়ে যায়।
খলীফা বলতে সেই লোকটিকে বুঝায়, যার কাছে সৈন্য-সামন্ত ও যুদ্ধ সরঞ্জাম এত বেশী রয়েছে যে, তার দিকে কারো হাত বাড়ানো স্বভাবতঃই অসম্ভব। কারণ তার রাষ্ট্রে হস্তক্ষেপ করতে হলে অনেক রাষ্ট্রও তাদের সেনা সম্পদ একত্র করে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তবে হয়ত তা কিছুটা ভাবা যায়। অথচ তার বিরুদ্ধে সব রাষ্ট্র একত্র করা সাধারণ এক অভাবনীয় ব্যাপার।
রাষ্ট্রবর্গের যখন কোন খলীফা নির্ধারিত হয়ে যায় এবং তার মাধ্যমে উত্তম নীতি ও চরিত্র পরিশীলিত হয়, বিদ্রোহীরা অনুগত হয়ে যায় ও শাসকবর্গ তাকে মেনে নেয়, তখন আল্লাহর নিয়ামত পরিপূর্ণভাবে আত্মপ্রকাশ করে। সব রাষ্ট্রে স্বস্তি দেখা দেয় এবং জনগণ আশ্বস্ত হয়ে যায়। খলীফাকে তখন শুধু হিংস্র প্রকৃতির লোকদের শায়েস্তা করতে হয় যারা জনগণের সম্পদ লুটে খায় আর তাদের সন্তানদের কয়েদী বানিয়ে থাকে। তিনি তাদের উৎপাত-উৎপীড়নের মূলোৎপাটন ঘটিয়ে জনগণকে তাদের ক্ষতি ও ভীতি থেকে মুক্ত করেন।
এ কারণেই বনী-ইসরাঈলরা তাদের নবীর কাছে আবেদন করেছিল যে, ‘আমাদের জন্য একজন বাদশাহ পাঠান, তাহলে আমরা আল্লাহর পথে জেহাদে অবতীর্ণ হতে পারব’। যখন প্রকৃতি পূজারী হিংস্র প্রকৃতির লোকগুলো বদ অভ্যেসের বশবর্তী হয়ে দেশে ফেতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করে, তখন তার প্রতিকার ব্যবস্থা সম্পর্কে আল্লাহ পাক নবীদের সরাসরি কিংবা পরোক্ষভাবে এ কথাই জানিয়ে দেন যে, প্রথমে তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি নির্মূল করতে হবে। তাতেও তারা সংশোধিত না হলে তাদের হত্যা করতে হবে। এ ধরনের লোক সমাজ দেহের বিষাক্ত অংগটির মতই আশংকাজনক হয়ে থাকে। তখন খলীফার কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায় তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এ ব্যবস্থা সম্পর্কে আল্লাহ বলেনঃ "আল্লাহ পাক যদি একদল দ্বারা অন্য দলকে শায়েস্তা না করতেন, তা হলে তারা গীর্জা, মসজিদ সব কিছুই বিধ্বস্ত করত"। (সূরা হাজ্জ্বঃ ৪০)
আল্লাহ পাক যদি একদল দ্বারা অন্য দলকে শায়েস্তা না করতেন, তা হলে তারা গীর্জা, মসজিদ সব কিছুই বিধ্বস্ত করত।
আল্লাহ পাক এ কারণেই বলেছেন, “তাদের বিরুদ্ধে ততক্ষণ অভিযান অব্যাহত রাখ যতক্ষণ না ফেতনা-ফাসাদ নির্মূল হয়।
ধন-সম্পদ ও লোক-লশকর ছাড়া খলীফার পক্ষে বিদ্রোহী শাসকদের প্রভাব-প্রতিপত্তি নির্মূল করা সম্ভব নয়। তাই খলীফাকে অবশ্যই যুদ্ধ-বিগ্রহ ও সাজ-সরঞ্জাম সম্পর্কে পারদর্শী ও ওয়াকিফহাল হতে হবে। তেমনি তাকে যুদ্ধ ও সন্ধির রীতি-নীতিও ভালভাবে জানতে হবে। কাদের থেকে রাজস্ব আদায় করতে হবে আর কাদের ওপর জিযিয়া ধার্য করতে হবে তাও জানতে হবে।
খলীফাকে প্রথমে স্থির করতে হবে, কেন তিনি যুদ্ধে নামবেন? তিনি কি কোন প্রকার জুলুম বন্ধ করার জন্য অভিযান চালাবেন না, জালিমকে নিপাত করার জন্য যুদ্ধ করবেন? এ ক্ষেত্রে তাঁর কয়েকটি উদ্দেশ্য হতে পারে। হয় সেরূপ শাসকের দম্ভ চূর্ণ করে অনুগত রাখঅ, নয় ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের নায়ককে নির্মূল করে অন্যান্যদের সংযত করা, কিংবা তাকে বন্দী করে শিক্ষা দেয়া, অথবা দেশ ও সম্পদ করায়ত্ত করা, কিংবা সে দেশের জনগণকে তার বিরুদ্ধে লাগিয়ে দেয়া ও তাদের সহায়তা করা।
মূলতঃ খলীফার জন্যে এর চেয়ে বেশী জড়িয়ে পড়া ঠিক নয়। কারণ, আপনজনদের বিরাট এক দলকে রণাংগনে নিঃশেষ করে সম্পদের পাহাড় জমানো খলীফার কাজ হতে পারে না। খলীফার জন্য ফরয হচ্ছে দেশবাসীর অন্তর জয় করা। প্রত্যেকটি কল্যাণের কাজ সম্পর্কে তার ধারণা থাকবে। প্রতিটি ব্যক্তির অবস্থা জেনে নিয়ে তার থেকে তার চাইতে বেশী কিছু আশা করা যাবে না। জ্ঞানী ও নেতৃত্বের অধিকারী লোকদের মর্যাদা দিতে হবে। তাদের উৎসাহ জাগিয়ে ও প্রয়োজনে ভীতি প্রদর্শন করে জিহাদের জন্যে উদ্ধুদ্ধ করতে হবে।
খলীফার প্রথম লক্ষ্য থাকবে আওতাধীন রাষ্ট্রসমূহে অনৈক্য সৃষ্টি করে তাদের বিক্ষিপ্ত করে রাখা। তাহলেই তারা দুর্বল ও সন্ত্রস্ত থাকবে। এমনকি তারা তাঁর সামনে এরূপ অসহায় হয়ে থাকবে যে, নিজে স্বাধীন ভাবে কোন ষড়যন্ত্র করার সাহস দেখাবে না। যখন তাদের এ অবস্থা দেখা দেবে তখন সহজেই তাদের সে সব ব্যবস্থা মানিয়ে নেয়া যাবে না যুদ্ধ করে মানাতে হত। এর পরেও যদি তাদের কেউ কখনো ফাসাদ সৃষ্টি করতে চায়, তা হলে তার ওপর কর ও জিযিয়ার ভারী বোঝা চাপিয়ে দিতে হবে এবং তার সমর শক্তি এরূপ দুর্বল করে দিতে হবে যাতে আর কখনও বিদ্রোহ সম্পর্কে ভাবতেও না পারে।
খলীফাকে যেহেতু বিভিন্ন মন মেজাজ ও চরিত্রের লোকেরা জিম্মাদার হতে হয়, তাই তাঁকে অবশ্যই সচেতন ও সতর্ক দৃষ্টি সম্পন্ন হতে হবে। তাঁর গোয়েন্দা বিভাগ যেসব তথ্য সংগ্রহ করবে, তার আলোকে তাকে অত্যন্ত দূরদর্শীতার সাথে কাজ চালাতে হবে। যদি জানতে পায় যে, একদল সৈন্য বিদ্রোহ করার জন্য সংঘবদ্ধ হয়েছে অমনি তার বিরুদ্ধে আরেক দল এমন সৈন্য নিয়োগ করতে হবে যারা কোন মতেই তাদের সাথে এক মত হতে পারবে না। যদি কাউকে তিনি খেলাফতের অভিলাষী বলে জানতে পান তো সংগে সংগে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে দুর্বল করে দিবেন।
খলীফার জন্য জরুরী হল জনগণকে তার অনুগামী ও মংগলকামী বানিয়ে নেয়া। এ ক্ষেত্রে শুধু তাঁকে মেনে নিচ্ছে এতটুকুতেই তৃপ্ত হলে চলবে না; বরং মেনে নেয়ার সুস্পষ্ট নজীরও পেশ করতে হবে। তাহলে তার প্রভাব জনগণের ওপর পড়বে। যেমন খলীফার জন্যে প্রকাশ্য মজলিসে দোয়া করা, বড় বড় সভা-সমিতিতে তাকে সম্মান দেখানো ও খলীফার নির্দেশ নিজেদের অন্তরে এরূপ অংকিত করে নেয়া যেভাবে একালের মুদ্রার খলীফার নাম অংকিত হয়ে থাকে। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
পরবর্তী পর্ব
মানব সমাজের বিভিন্ন সংগঠন - ৯
সার্বজনীন মানবিক মৌলনীতি
সার্বজনীন মানবিক মৌলনীতি

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন