হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, “বেহেশতের মধ্যে 'লোবা' নামক একজন হুর রহিয়াছে। দয়াময় আল্লহ্ তায়ালা তাহাকে মেশক, আম্বর, জাফরান ও কাফুর এই চারি প্রকার সুগন্ধি বস্তু দ্বারা পয়দা করিয়াছেন। তিনি এই সকল বস্তুকে আবেহায়াতের পানি দ্বারা গুলিয়াছেন। বেহেশতের সমস্ত হুরগণ তাহার প্রেমে মাতোয়ারা। সে যদি একবারও মহাসাগরে স্বীয় থুথু নিক্ষেপ করিত, তাহা হইলে সেই সাগরের লবণাক্ত পানি সুমিষ্ট হইয়া যাইত। আর তাহার বক্ষস্থলে এই কথাগুলি লিখিত থাকিবে, “কেহ যদি আমার মত পরমাসুন্দরী হুর লাভ করিতে আশা পোষণ করে তবে সে যেন আমার সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ পাকের এবাদত-বন্দেগীতে আত্মনিয়োগ করে।”
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, হযরত রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন যে, ‘আল্লাহ তায়ালা ‘জান্নাতুল আদন' পয়দা করিবার পর, হযরত জিব্রাইল (আঃ)কে ডাকিয়া নির্দেশ প্রদান করিলেন যে, তিনি যেন সেই সকল বস্তু পর্যবেক্ষণ করিয়া আসেন, যাহা তিনি উহাতে তাঁহার প্রিয় বান্দা ও আউলিয়ায় কেরামদের জন্য পয়দা করিয়াছেন। নির্দেশ মোতাবেক হযরত জিব্রাইল (আঃ) যখন 'জান্নাতুল আদনে' ঘুরিয়া ফিরিয়া দেখিতেছিলেন, তখন একজন হুর একটি সুন্দর মহল হইতে তাহাকে দেখিয়া হাসিয়া ফেলিলেন। তাহার সুবর্ণ দন্তরাজির উজ্জ্বল আলোকে “জান্নাতুল আদন' ঝলমল করিয়া ফুটিয়া উঠিল। এই উজ্জ্বল আলোক দর্শন করিয়া হযরত জিব্রাইল (আঃ) কে মাথা উত্তোলন করিতে অনুরোধ করিলেন। হযরত জিব্রাইল (আঃ) মস্তক উত্তোলন করিয়া হুরকে দেখিয়া বলিলেন, 'আপনার সৃষ্টিকর্তা প্রশংসনীয়।' হুর আরজ করিলেন, “হে আমিনুল্লাহ! আমিনুল্লাহ !! আমি কাহার জন্য সৃষ্টি হইয়াছি, তাহা আপনি অবগত আছেন?” হযরত জিব্রাইল (আঃ) উত্তর করিলেন, “না আমি তাহা অবগত নহি।” উক্ত হুর বলিলেন, “আল্লাহ পাক আমাকে ঐ পুণ্যবান বান্দার ভোগের জন্য পয়দা করিয়াছেন, যিনি নিজের কামনা-বাসনাকে আল্লাহ পাকের রেজামন্দির জন্য বিসর্জন দিয়া থাকেন।” অপর এক হাদীসে হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ ফরমাইয়াছেন, “পবিত্র মেরাজের রাত্রিতে আমি বেহেশতে একদল ফেরেশতাকে দেখিতে পাইলাম যে, তাহারা স্বর্ণ, রৌপ্য দ্বারা সুন্দর 'বালাখানা' তৈরী করিতেছে। অকস্মাৎ তাহারা নির্মাণ কার্য বন্ধ করিয়া দিলে আমি তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলাম, হে ফেরেশেতাগণ! সহসা নির্মাণ কার্য হইতে বিরত হইলে কেন? প্রত্যুত্তরে তাহারা বলিল, “আমাদের পুঁজি শেষ হইয়া গিয়াছে”, আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, 'কি তোমাদের পুঁজি?' তাহারা উত্তরে বলিল, “এই সুন্দর বালাখানার মালিক যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ পাকের এবাদতে মগ্ন থাকেন, ততক্ষণ আমরাও নির্মাণ কাজ চালাইয়া যাই। আর তিনি আল্লাহ তায়ালার এবাদত জিকির হইতে বিরত হইলে আমরাও নির্মাণ কাজ বন্ধ করিয়া দেই।” হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে “আল্লাহ পাকের অলী বান্দাগণ বেহেশতে ইচ্ছানুরূপ ফল ভক্ষণ করিবার পর আরও খাদ্য গ্রহণের আশা পোষণ করিবেন। তখন আল্লাহ তায়ালা আরও অধিক খাদ্য আনয়ন করিতে নির্দেশ দিবেন। আর তৎক্ষণাত সত্তর হাজার খেদমতগার তাহাদের সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত হইবে। তাহাদের প্রত্যেকের হাতে মোতি ও ইয়াকুতের সত্তর হাজার সুবর্ণ খাদ্যভান্ডার থাকিবে এবং প্রত্যেক খাদ্যভান্ডারে এক হাজার স্বর্ণের পেয়ালা থাকিবে। যেমন আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করিয়াছেন “আর তাহাদের আশে-পাশে স্বর্ণের খাদ্যভান্ডার ও পানপাত্র লইয়া খাদেমগণ বিচরণ করিবে। সেইগুলি প্রাণের কাম্য দ্রব্যসামগ্রীতে ভরপুর থাকিবে এবং চক্ষু জুড়াইয়া যাইবে এবং তোমরা উহাতে চিরকাল অবস্থান করিবে।” আর প্রত্যেক খাদ্যভান্ডারে সত্তর হাজার প্রকারের খাদ্যদ্রব্য থাকিবে। সেই সকল খাদ্যবস্তু আগুন দ্বারা পাক করা হইবে না, কিংবা কেহ পাক করে নাই বা কোন পাত্রে করাও হয় নাই বরং আল্লাহ পাকের নির্দেশেই সেইগুলি সৃষ্টি হইয়াছে। আল্লাহ পাকের অলী বান্দাগণও তাহাদের সহধর্মিনীগণ একত্রে পরমানন্দে পরিতৃপ্তির সহিত সেই সকল খাদ্যভান্ডার হইতে আহার গ্রহণ করিবেন। ভক্ষণ করিতে করিতে যখন তাহারা পরিতৃপ্তি লাভ করিবে, তখন একটি বেহেশতী পাখী উড়িয়া আসিবে। উহার হাড়গুলি উটের হাড়ের মত হইবে। ইহা স্বীয় পাখার উপর ভর করিয়া আল্লাহ তায়ালার অলী বান্দাগণের মাথার উপর বসিয়া বলিবে, “হে আল্লাহ পাকের অলী বান্দা! আপনি কি আমার টাটকা মাংস ভক্ষণ করিতে আগ্রহী? আমি নহরে ছাল্ছাবিল ও নহরে কাফুরের পানি পান করিয়াছি এবং বেবেতের বাগানে পরিভ্রমণ করিয়াছি। আর উহার অমৃত সুধা পান করিয়াছি।” আল্লাহ তায়ালার অলী বান্দাগণ উহা ভক্ষণ করিতে ইচ্ছা প্রকাশ করিবামাত্র আল্লাহ পাকের নির্দেশে উহা অলী বান্দার কামনা অনুসারে ভুনা হইয়া খাদ্যের বর্তনে আসিয়া পড়িবে। অলী আল্লাহগণ স্বীয় ইচ্ছানুরূপ ইহার সুস্বাদু মাংস ভক্ষণ করিবেন। কিছুক্ষণ পর সেই পাখী আল্লাহ পাকের অনুগ্রহে উড়িয়া চলিয়া যাইবে। শত খাইলেও বেহেশতের খাদ্যদ্রব্য শেষ হইবে না এবং এমন কি কমিবেও না। যেমন পবিত্র কুরআন শরীফ লোকে পাঠ করে, অন্যকে শিক্ষা দেয়, কিন্তু কোন অবস্থাতেই উহার পরিবর্তন কিংবা হ্রাস হয় না, তেমনি বেহেশতের খাদ্যদ্রব্য যত ভক্ষণই করা হউক না কেন, তাহা হ্রাস পাইবে না বা কমিবেও না।”
হাদীস শরীফে আছে, জনাব নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করিয়াছেন, “বেহেশতী বান্দাগণ পরমানন্দে পানাহার করিবে এবং বিবিধ প্রকারে উহার ফল ভক্ষণ ও আস্বাদন করিবে; কিন্তু সেই সকল খাদ্য উদরে পৌঁছিয়া হাওয়া হইয়া বাহির হইয়া যাইবে। সেই বাতাসে থাকিবে মেক ও কাফুরের সুগন্ধ। যেমন মাতৃগর্ভে শিশু প্রস্রাব পায়খানা করে না, এমনিই বাঁচিয়া থাকে।”
হে পরম করুণাময় ও অনন্ত ও দয়াময় আল্লাহ! আপনি আমাদিগকে জনাব হুযুর করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর এবং তাঁহার পরিবার-পরিজনদের উছিলায় মাফ করুন। হে সর্বশক্তিমান আল্লাহ! একমাত্র আপনি সমস্ত প্রশংসার উপযুক্ত । আমীন! আমীন!! আমীন!!!

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন