বুধবার, ১২ মার্চ, ২০২৫

এখলাস (৪) এখলাসের স্বরূপ



এখলাস (পর্ব – ৪)

📚এহইয়া উলুমিদ্দিন  ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.) 


এখলাসের স্বরূপ —

প্রত্যেক বস্তুর মধ্যে অন্য বস্তুর সংমিশ্রণ থাকা সম্ভব। কোন বস্তু অন্য বস্তুর সংমিশ্রণ থেকে মুক্ত ও পবিত্র হলে,তাকে বলা হয় ‘খালেস’ বা খাঁটি। 

আল্লাহ তা'আলা বলেন : “গোবর ও রক্তের মাঝখান থেকে নির্গত খাঁটি দুধ, যা পানকারীদের জন্যে সুপেয়।”

অতএব দুধের মধ্যে গোবর ও রক্তের সংমিশ্রণ না থাকাই হচ্ছে দুধের খাঁটিত্ব। এখলাস অর্থ খাঁটি করা এবং এর বিপরীত হচ্ছে এশরাক অর্থাৎ শরীক করা। এ থেকে বুঝা যায়, যে মুখলেস নয়, সে মুশরেক। তবে শিরকের অনেক স্তর রয়েছে। তাওহীদের ক্ষেত্রে এখলাসের বিপরীত হচ্ছে উপাস্যতায় এশরাক। শিরকের মত এখলাসও কিছু গোপন এবং কিছু প্রকাশ্য। শিরক ও এখলাসের স্থান হচ্ছে অন্তর। নিয়তের মাধ্যমে উভয়টি অন্তরে উপস্থিত হয়। একটি মাত্র উদ্দেশ্য নিয়ে যে কাজ সম্পাদিত হয় এবং তাতে অন্য কোন উদ্দেশ্যের মিশ্রণ না থাকে, তাই এখলাস হওয়া উচিত। উদাহরণতঃ কেউ শুধু ‘রিয়া’ তথা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে দান-খয়রাত করল অথবা শুধু আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে দান। আভিধানিক দিক দিয়ে উভয়টিকেই এখলাস বলা হবে। কেননা এতে এক উদ্দেশ্যের সাথে অন্য কোন উদ্দেশ্যের সংমিশ্রণ নেই। কিন্তু পরিভাষায় কেবল আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে দান করাকেই এখলাস বলা হয। রিয়ার উদ্দেশ্যে কোন সৎকাজ করা ধ্বংসের কারণ হয়ে থাকে। এখানে তা আমাদের আলোচ্য বিষয় নয়। এখানে আমরা বর্ণনা করতে চাই যে, নৈকট্য লাভের নিয়তের সাথে ‘রিয়া’ অথবা অন্য কোন মানসিক আনন্দ লাভের উদ্দেশ্য সংমিশ্রিত থাকলে তার বিধান কি হবে? 


উদাহরণতঃ কেউ নৈকট্য লাভের নিয়তে রোযা রাখে কিন্তু সাথে সাথে চিকিৎসার খাতিরে পরহেযের উপকারও হয়ে যায়। অথবা কেউ হজ্জ করে যাতে দেশ ভ্রমণের আনন্দও অর্জিত হয়ে যায়। কিংবা শত্রুর অনিষ্ট থেকে নিরাপত্তা হাসিল হয়ে যায়। অথবা কেউ তাহাজ্জুদ পড়ে যাতে রাত্রি জাগরণের মাধ্যমে চোর-ডাকাতের উপদ্রব থেকে হেফাযতও হয়ে যায়। অথবা কেউ উযু করে যাতে হাত পায়ের ময়লা দূর হয়ে যায় এবং দেহ ঠাণ্ডা থাকে। এসব ক্ষেত্রে নৈকট্য লাভের সাথে অন্যান্য উদ্দেশ্য সংমিশ্রিত থাকার কারণে আমলসমূহ এখলাস বহির্ভূত হয়ে যাবে এবং এসব আমলকে আল্লাহর জন্যে খাঁটি বলা যাবে না। 

কিন্তু মানুষের কোন কাজ ও এবাদত এ জাতীয় মানসিক আনন্দমুক্ত থাকে না। তাই বলা হযেছে, যে ব্যক্তি সারা জীবনে খাঁটি ভাবে আল্লাহর জন্যে একটি মুহূর্তও পাবে, সে মুক্তি পেয়ে যাবে। কেননা, এখলাস অত্যন্ত দুর্লভ বস্তু। মনকে উপরোক্ত রূপ মিশ্রণ থেকে মুক্ত রাখা প্রায় অসম্ভব। নিরেট নৈকট্য লাভের নিয়ত সেই ব্যক্তির জন্যে কল্পনা করা যায়, যে আল্লাহর পাগলপারা আশেক, আখেরাতের চিন্তায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত এবং এ ধরনের পার্থিব মহব্বতের জন্যে যার অন্তরে বিন্দু পরিমাণও অবকাশ নেই। এমনকি, খানাপিনার প্রতিও কোন আকর্ষণ নেই। এগুলোর প্রয়োজন প্রস্রাব-পায়খানার প্রয়োজনের বেশী নয়। এরূপ ব্যক্তি আহার, পান, প্রস্রাব-পায়খানা ইত্যাদি সকল কাজের ক্ষেত্রে খাঁটি আমলকারী ও সঠিক নিয়ত বিশিষ্ট হবে। এমনকি, সে এই নিয়তে ঘুমাবে যাতে পরবর্তী এবাদতের জন্যে শক্তি ও স্বাচ্ছন্দ্য অর্জিত হয়। এমতাবস্থায় তার নিদ্রাও এবাদতে পরিণত হয়ে যাবে। 

যে ব্যক্তি এরূপ নয়, তার আমলে এখলাসের উপস্থিতি খুবই বিরল হবে। এ থেকে এখলাস অর্জনের এই উপায় জানা যায় যে, জৈবিক বাসনা ভেঙ্গে চুরমার করতে হবে, দুনিয়ার লোভ-লালসা ছিন্ন করতে হবে এবং অন্তরে আখেরাতের চিন্তাই প্রবল রাখতে হবে।

এমন অনেক আমল রয়েছে, যেগুলোতে মানুষ শ্রম স্বীকার করে এবং একান্ত ভাবে আল্লাহর নৈকট্য লাভের ধারণা পোষণ করে অথচ এটা মানুষের একটা বিভ্রান্তি। কেননা, এতে বিপদের কারণ তাদের জানা থাকে না। 

উদাহরণতঃ জনৈক বুযুর্গ বলেন : আমি ত্রিশ বছরের নামায কাযা পড়েছি। এগুলো আমি মসজিদের প্রথম সারিতে পড়েছিলাম, কাযার কারণ, একদিন ওযরবশত আমার মসজিদে যেতে বিলম্ব হয়ে যায়। ফলে, আমি দ্বিতীয় সারিতে নামায পড়লাম এবং মনে মনে খুব লজ্জিত হলাম যে, মুসল্লীরা আমাকে দ্বিতীয় সারিতে দেখেছে। এই লজ্জা থেকে জানতে পারলাম, লোকেরা আমাকে যে প্রথম সারিতে দেখত, তাতে আমি আন্তরিকভাবে খুশী ও আনন্দিত হতাম। অথচ পূর্বে বিষয়টি টের পাইনি।

বলা বাহুল্য, এটা এমন একটি সূক্ষ্ম ও গোপন বিষয়, যা থেকে আমল কমই মুক্ত থাকে এবং প্রত্যেকেই এটা টেরও পায় না। আল্লাহ যাদেরকে তাওফীক দেন, তাদের কথা ভিন্ন। যারা এ থেকে গাফেল, তারা আখেরাতে নিজের সৎ আমলসমূহকে গোনাহ আকারে দেখতে পাবে। নিম্নোক্ত দু'টি আয়াতে এরূপ লোকদের কথাই বুঝানো হয়েছে- 

—“আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের জন্যে এমন বিষয় প্রকাশ পাবে, যার ধারণা তারা করত না এবং নিজের উপার্জিত কর্মের গোনাহ তাদের দৃষ্টিগোচর হবে।”

—“আমি তোমাদেরকে তাদের কথা কি বলব, যারা আমলের দিক দিয়ে খুবই ক্ষতিগ্রস্ত! তারা এমন লোক, যাদের সকল প্রচেষ্টা পার্থিব জীবনেই সীমিত; অথচ তারা মনে করে তারা চমৎকার কাজ করছে।”


আলেম সমাজই এই ফেতনায় সর্বাধিক পতিত। তাদের অধিকাংশের ইলম চর্চায় যে প্রেরণাটি কাজ করে, তা হচ্ছে শ্রেষ্ঠত্বের আনন্দ এবং তারীফ ও প্রশংসা-প্রীতি। শয়তান তাদের সামনে সত্যকে গোপন করে দেয় এবং বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে যে, তোমার উদ্দেশ্য তো খোদায়ী ধর্মের প্রচার ও প্রসার এবং শরীয়তে মুহাম্মদীর পক্ষ থেকে বিরোধীদেরকে প্রতিহত করা। ওয়ায়েযরা জনসাধারণকে এবং শাসকবর্গকে উপদেশ দিয়ে আল্লাহ তা'আলার প্রতি অনুগ্রহ প্রকাশ করে। 


সাধারণ মানুষ তাদের উপদেশ মেনে নিলে এবং তাদের প্রতি মনোযোগী হলে তারা আহলাদে আটখানা হয়ে যায়। তারা বলে আমরা এজন্য আনন্দিত যে, আল্লাহ তা'আলা ধর্মের সাহায্যের কাজে আমাদেরকে নিয়োজিত করেছেন। অথচ তাদের মত অন্য কোন কর্মী সৃষ্টি হয়ে গেলে, সে তাদের চেয়ে ভাল ওয়ায করলে এবং মানুষ তার প্রতি মনোযোগী হলে তারা তাকে সহ্য করতে পারে না এবং মনে মনে দুঃখিত হয়। 


এখন প্রশ্ন, যদি দ্বীনের খাতিরেই তারা ওয়ায করত, তবে তাদের অবস্থা এমন হয় কেন? এক্ষেত্রে তো তাদের আরও খুশী হওয়া উচিত ছিল এবং আল্লাহ তা'আলার শোকর করা দরকার ছিল যে, তিনি দ্বীনের একাজে অন্যকে নিযুক্ত করেছেন। ফলে, তাদের একাজে পরিশ্রম করতে হচ্ছে না। কিন্তু শয়তান এরপরও তাদেরকে ছাড়ে না এবং বলে তোমাদের দুঃখ এজন্য নয় যে, মানুষ তোমাদেরকে ছেড়ে অন্যের ওয়ায শুনছে; বরং দুঃখ এজন্যে যে, তোমরা সওয়াব লাভে বঞ্চিত হয়েছ। অর্থাৎ, মানুষ তোমাদের ওয়ায দ্বারা সৎপথে আসলে তোমাদের সওয়াব হত। এই সওয়াব না পাওয়ার জন্যে দুঃখ করা খারাপ নয়,ভাল। কিন্তু তারা জানে না যে, সত্যের আনুগত্য এবং উত্তম ব্যক্তিকে কাজের দায়িত্ব দিলে আখেরাতে সওয়াব বেশী হয় একা নিজে করার তুলনায়। যদি এরূপ দুঃখ করা প্রশংসনীয় হত, তবে হযরত আবু বকর (রা.) যখন খলীফা নিযুক্ত হয়েছিলেন, তখন হযরত ওমর (রাঃ)-ও দুঃখ করতেন। কেননা, জনগণের কল্যাণ সাধনের দায়িত্ব পালন করা অপরিসীম সওয়াবের কাজ। কিন্তু হযরত ওমর (রা.) হযরত আবু বকর (রা.)-এর খেলাফতপ্রাপ্তিতে আনন্দিতই হয়েছিলেন। কারণ, তিনি জানতেন, হযরত আবু বকর (রা.) তাঁর চেয়ে শ্রেষ্ট। 


জানি না, আজকাল আলেমগণ এ জাতীয় বিষয়সমূহে আনন্দিত হয় না কেন?  যারা নফসের চক্রান্ত সম্পর্কে বিশেষ ওয়াকিফহাল, তারাই শয়তানের ধোকা সম্পর্কে জানে ও বুঝে।


সারকথা, এখলাসের স্বরূপ জানা ও তদনুযায়ী আমল করা একটি অথৈ সমুদ্র। এতে উত্তীর্ণ হওয়ার মত লোক খুবই বিরল। কোরআনে আছে, “(শয়তান বলেছিল,) তোমার এখলাস বিশিষ্ট বান্দগণ ছাড়া আমি সবাইকে বিভ্রান্ত করে ছাড়ব।”


বলা বাহুল্য, এখানে উপরোক্ত বিরল লোকদের ব্যতিক্রম প্রকাশ করা হয়েছে। অতএব বান্দার উচিত এসব সূক্ষ্ম বিষয়াদি হৃদয়ঙ্গম করার কাজে সদা তৎপর থাকা। অন্যথায় সে অজান্তেই শয়তানের দলে ভিড়ে যাবে।


পরবর্তী পর্ব—

এখলাস সম্পর্কে মনীষীগণের উক্তি 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...