আত্মাকে সৃষ্টি করিয়া এই রাজ্য, সৈন্য ও দেহরূপ বাহন এইজন্য প্রদান করা হইয়াছে যে, ইহা জড়জগত হইতে সর্বোচ্চ ইল্লীন পর্যন্ত আরোহণ করিবে। কেহ যদি এই মহাদানের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ বন্দেগীর কর্তব্য পালন করিতে ইচ্ছা করে তবে তাহাকে বাদশাহের ন্যায় স্বীয় সিংহাসনে উপবেশন পূর্বক একমাত্র আল্লাহ্কে তাহার লক্ষ্যস্থল ও কিবলা করিয়া লইতে হইবে এবং পরকালকে আপন স্থায়ী বাসস্থান ও দুনিয়াকে পান্থশালা বিবেচনা করিতে হইবে। তৎপর শরীরকে বাহন, হস্ত পদকে খেদমতগার, বুদ্ধিকে উযীর, লোভকে ধন-রক্ষক, ক্রোধকে কোতওয়াল এবং ইন্দ্রিয়গণকে গুপ্তচর বানাইয়া প্রত্যেককে পরজগতের সংবাদ সংগ্রহে নিযুক্ত রাখা কর্তব্য। মস্তিষ্কের সম্মুখ ভাগে যে চিন্তাশক্তি আছে ইহা সংবাদ সংগ্রহকারী চরগণের অধিনায়ক এবং চরগণ প্রত্যেকটি সংবাদ এই অধিনায়কের নিকট উপস্থিত করে তাহার পর মস্তিষ্কের পশ্চাৎভাগে যে স্মরণশক্তি আছে তাহা ঐ সংগৃহীত সংবাদসমূহের রক্ষক এবং সে উহা অধিনায়ক চিন্তাশক্তির নিকট হইতে লইয়া হিফাজতে রাখে ও উপযুক্ত সময়ে বুদ্ধি রূপে উযীরের নিকট পেশ করে। এইরূপ সংগৃহীত সংবাদ অনুসারে উযীর দেহ-রাজ্যের কার্য পরিচালনা করে এবং বাদশাহের পরকাল-সফরের উপায় অবলম্বনে তৎপর থাকে। উযীর যদি দেখিতে পায় যে, ক্রোধ, লোভ ইত্যাদি পরিচালকদের মধ্যে কেহ বাদশাহের বিদ্রোহী হইয়াছে, অধীনতা বর্জন করিয়াছে ও ডাকাতি করিতে ইচ্ছা করিয়াছে, তবে বুদ্ধিরূপ উযীর তাহাদিগকে দমন করিবার চেষ্টা করে এবং তাহাদিগকে অধীন করিয়া লইবার জন্য তাহাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হয়, কিন্তু তাহাদিগকে একেবারে মারিয়া ফেলিবার ইচ্ছা করে না । কারণ, উহাদের অভাবে দেহ-রাজ্যের কার্য কখনও সুচারুরূপে চলে না । এইজন্য নানা উপায়ে উহাদিগকে এমনভাবে বশীভূত করে উহারা যেন আত্মার গন্তব্যপথে রন্ধ ও সাহায্যকারী হয়। শত্রু না হয়ে বরং মিত্রের ন্যায় সঙ্গী থাকে, চুরি ডাকাতি না করে এইরূপ বন্দোবস্ত করিতে পারিলে আত্মা সৌভাগ্যবান হয়, আল্লাহ্ প্রদত্ত অসীম অনুগ্রহের হক আদায় করিবার উপযোগী হইয়া উঠে এবং তাহার বন্দেগী করিয়া তৎপরিবর্তে উপযুক্ত সময়ে আল্লাহর নিকট মহা পুরস্কার পাইয়া থাকে। অপরপক্ষে উক্তরূপ বন্দোবস্ত না করিয়া উহার বিপরীত কাজ করিতে আত্মা বিদ্রোহী, ডাকাত ও শত্রুদলের সহিত মিলিত হইয়া নিমকহারাম ও দুর্ভাগ্যগ্রস্ত হইয়া পড়ে এবং অবশেষে তাহাকে এই গর্হিত কার্যের জন্য কঠিন শাস্তি ভোগ করিতে হয় ।
মঙ্গলবার, ৮ এপ্রিল, ২০২৫
আত্মদর্শন (১২) শরীর, আত্মা ও তাহার সৈন্যদের তুলনামূলক পরিচয়
শরীর, আত্মা ও তাহার সৈন্যদের তুলনামূলক পরিচয়
আত্মার সমস্ত সৈন্যের পরিচয় বহু বিস্তৃত। তথাপি মোটামুটি বুঝাইবার জন্য একটি উপমা দেওয়া যাইতেছে। শরীর যেন একটি শহর; হস্ত-পদ ইত্যাদি প্রত্যেকে এক একটি ব্যবসায়ী। লোভ এই শহরের খাজনা আদায়কারী তহশীলদার; ক্রোধ কোতওয়াল; আত্মা বাদশাহ এবং বুদ্ধি উযীর। আপন রাজ্যের সুবন্দোবস্ত করিতে বাদশাহের ঐসকল কর্মচারীর সাহায্যের প্রয়োজন হয়। কিন্তু তহশীলদার লোভ, বড় মিথ্যাবাদী এবং স্বীয় অধিকারের অতিরিক্ত কর্ম করিয়া বসেও বুদ্ধিরূপ উযীরের আদেশ অমান্য করে। সে রাজস্বের বাহানায় রাজ্যের সকল ধন সর্বদা আত্মসাৎ করিয়া লইতে চায়। কোতওয়াল ক্রোধ বড় দুষ্ট, বদমেজাজ ও তেজীয়ান। খুন-জখম করিতে সে বড় ভালবাসে। অপরাপর বাদশাহ যেমন সব কার্যে স্বীয় মন্ত্রীর সহিত পরামর্শ করেন, মিথ্যাবাদী ও লোভী তহশীলদারগণকে কানমলা দিয়া সোজা করিয়া রাখেন, মন্ত্রীর পরামর্শের বিপরীত তাহাদের কোন কথাই শ্রবণ করেন না, দুষ্ট সীমা অতিক্রমকারীদিগকে দমন রাখবার জন্য কোতওয়াল নিযুক্ত করেন, আবার কোতওয়ালকেও দমন রাখেন, আইনের বাহিরে একপদও যাইতে দেন না এবং সর্বপ্রকার রাজ্যে সুশৃঙ্খলা স্থাপন করেন, তদ্রূপ আত্মারূপ বাদশাহর স্বীয় দেহ রাজ্যের শাসনকার্যে বুদ্ধিরূপ মন্ত্রীর পরামর্শ গ্রহণ করিলে এবং লোভ ও ক্রোধকে দমন করত উহাদিগকে বুদ্ধির অধীন করিয়া রাখিলে এইরূপ শৃঙ্খলার সহিত নির্বাহ হইলে আত্মা সৌভাগ্যের পথে চলিয়া নির্বিঘ্নে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করিতে পারে । অপর পক্ষে ক্রোধ ও লোভ যদি বুদ্ধিকে বন্দী করিয়া গোলাম বানাইয়া রাখে তবে দেহ-রাজ্য ও হতভাগ্য বাদশাহ উভয়ই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। যাহা বলা হইল তাহাতে বুঝা গেল যে, দেহরক্ষার জন্য আল্লাহ্ ক্রোধ ও লোভ সৃষ্টি করিয়াছেন। পানাহার গ্রহণ করিয়া দেহরক্ষার জন্য লোভের সৃষ্টি এবং শত্রু হইতে আত্মরক্ষার জন্য ক্রোধের সৃষ্টি হইয়াছে। ক্রোধ ও লোভ দুইটিই শরীরের খেদমতগার। পানাহার শরীরের খোরাক চক্ষু, কর্ণ ইত্যাদি ইন্দ্রিয়সমূহ বহন করিবার জন্য শরীরের সৃষ্টি হইয়াছ । সুতরাং শরীর এই সকল ইন্দ্রিয়ের খাদেম। আবার আত্মার পক্ষে প্রদীপের কার্য করিবে বলিয়া বুদ্ধির সৃষ্টি হইয়াছে যেন এই প্রদীপের আলোকে আত্মা আল্লাহর মহান দরবার দর্শন করিতে পার । ইহাই আত্মার জন্য বেহেশত। এই হিসাবে বুদ্ধি আবার আত্মার খাদেম । আল্লাহর অনুপম সৌন্দর্য দর্শনের জন্যই আত্মার সৃষ্টি হইয়াছে । আত্মা যখন আল্লাহর সৌন্দর্য দর্শনে একেবারে বিভোর হইয়া পড়ে তখন সে তাঁহার উপযুক্ত বান্দা বলিয়া পরিগণিত হয়। এই মর্মেই আল্লাহ্ বলেন : “আর একমাত্র আমার ইবাদত করিবার জন্যই জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করিয়াছি ।”
মানব প্রকৃতিতে চতুর্বিধ স্বভাব
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)
বিবাহ (৩৫) কন্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ
বিবাহ (পর্ব – ৩৫) 📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.) কন্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...
-
অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ৮) এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) অহংকারের প্রতিকার ও বিনয় অর্জনের উপায় উপরোক্ত আলোচনা থেকে জানা গেল যে,...
-
অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ৫) এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) অহংকারের স্বরূপ ও তার লাভ-লোকসান— অহংকার দু'প্রকার। একটি বাহ্যিক, অপ...
-
অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ৩) এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) অহংকারের নিন্দা — পবিত্র কোরআনুল কবিমে বহু স্থানে আল্লাহ তা'আলা ...

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন