মঙ্গলবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৫

তত্ত্বদর্শন (৯) পার্থিব প্রকৃতির প্রকারভেধ



আল্লাহ-পরিচয় (তত্ত্বদর্শন) পর্ব – ৯
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

পার্থিব প্রকৃতির প্রকারভেধ
পার্থিব প্রকৃতি চারি প্রকার, যথা- উষ্ণতা, শীতলতা, আর্দ্রতা ও শুষ্কতা। কলম যেমন কালিকে আলোড়িত, বিক্ষিপ্ত ও সঙ্কুচিত করিলে 'বিসমিল্লাহ্' শব্দ লিখিত হয়, উষ্ণতা ও শীতলতা তদ্রূপ পানি, মাটি ও অন্যান্য উপাদানকে আলোড়িত বিক্ষিপ্ত ও সঙ্কুচিত করিলে দৃশ্যমান আকৃতি সকল গঠিত হয়। কলমের সাহায্যে কাগজের উপর কালি ছড়াইয়া দিলে কাগজ যেমন সেই কালি চোষণ করে অদ্রূপ আর্দ্রতা জড়পদার্থের মূল উপাদানসমূহকে ভিজাইয়া উহার সাহায্যে আকৃতি গঠন করিলে শুষ্কতা সেই আকৃতি রক্ষা করে। পদার্থসকল যাহাতে নিজ নিজ আকৃতি পরিত্যাগ করিতে না পারে, এইজন্যই শুষ্কতা সর্বদা প্রহরীর ন্যায় কাজ করে। তরলতা না থাকিলে আকৃতি গঠিত হইতে পারিত না; আবার শুষ্কতা না থাকিলে মূর্তি সকলের আকৃতি রক্ষা পাইত না। কলম আপন গতিবিধি ও কার্য শেষ করিলে যেমন দেখা যায় যে পূর্ব হইতে চক্ষুর সাহায্যে মস্তিষ্কে অঙ্কিত চিত্রের ন্যায় ‘বিসমিল্লাহ্' শব্দ লিখিত হইয়াছে তদ্রূপ উষ্ণতা ও আর্দ্রতা কর্তৃক জড়পদার্থের অন্যান্য উপাদানগুলি আলোড়িত হইলে ফেরেশতাগণের সাহায্যে এ জগতে লওহে মাহফুজে অঙ্কিত ছবির ন্যায় প্রাণী ও উদ্ভিদের মূর্তি গঠিত হয়। প্রত্যক্ষ ইচ্ছার প্রভাব যেমন প্রথমে তোমার মনে আরম্ভ হইয়া ক্রমে দেহের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে বিস্তারিত হয়, সেইরূপ জড়জগতের প্রতিটি কার্য ও ঘটনার মূল আল্লাহর ইচ্ছা আরশে সূত্রপাত হয়। ইচ্ছার প্রভাব প্রথমে মনে গৃহীত হয়। তৎপর অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ উহা গ্রহণ করিয়া থাকে। এইজন্য লোকে মনকে তোমার সহিত সম্বন্ধযুক্ত বলিয়া মনে করে এবং বিশ্বাস করে যে, তুমি মনে বাস করিয়া থাক। তদ্রূপ সকলের উপর আল্লাহর প্রভুত্ব যখন আরশের মাধ্যমে পরিচালিত হয় তখন লোকে মনে করে আল্লাহ্ আরশে অবস্থান করেন। মনের উপর তুমি প্রবল হইয়া বসিলে দেহ- রাজ্যের সমস্ত কার্য যেমন সূচারুরূপে সম্পন্ন হইতে থাকে, তদ্রূপ আল্লাহ্ যখন সৃষ্টি হইতেই আরশের উপর প্রবল প্রভু হইয়া বসিলেন ও আরশ আল্লাহর সমস্ত অভিপ্রায়ের অধীন হইয়া পড়িল তখন বিশ্বজগতের সমস্ত কার্য সুচারুরূপে নির্বাহ হইতে লাগিল । এই মর্মেই আল্লাহ্ বলেন  : “তৎপর আরশকে আল্লাহ্ নিজ আধিপত্যের অধীন করিলে জাগতিক কার্যাবলী সুচারুরূপে চলিতে লাগিল ।” তিনিই সকল কাজের সুব্যবস্থা করিয়া থাকেন ৷ 
মানবদেহে আল্লাহর রাজ্যের নমুনা উপরে যাহা বর্ণিত হইল তদ্‌সমুদয়ই সত‍্য। চক্ষুষ্মান সাধক ওলিগণ কাশফের দ্বারা উহা অবগত হইয়াছেন এবং যথার্থই তাঁহারা জানেন যে, আল্লাহ্ আদমকে নিজের অনুরূপ করিয়া সৃষ্টি করিয়াছেন। কারণ, বাদশাহকে বাদশাহ ব্যতীত অপর কেহই চিনিতে পারে না। আল্লাহ্ তোমাকে তোমার দেহ-রাজ্যের বাদশাহ্ করিয়া না বানাইলে এবং তাঁহার স্বীয় মহাসাম্রাজ্যের এক সংক্ষিপ্ত নমুনা তোমাকে দান না করিলে তুমি বিশ্বজগতের প্রভু আল্লাহ্কে কখনই চিনিতে পারিতে না। অতএব যিনি তোমাকে সৃষ্টি করিয়াছেন, তোমাকে বাদশাহের মর্যাদা দান করিয়াছেন এবং স্বীয় রাজ্যের নমুনাস্বরূপ তোমাকে একটি রাজ্য প্রদান করিয়াছেন, সেই বিশ্বপ্রভু আল্লাহর নিকট তোমার কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। তোমার দিল আরশতুল্য, দিল হইতে নিঃসৃত তোমার জীবনী-শক্তি ইসরাফীলসদৃশ; এইরূপ মস্তিষ্ক - কুর্সী; মস্তিষ্কের খেয়াল-কুঠরি - লওহে মাহফূজ; চক্ষু, কর্ণ ইত্যাদি ইন্দ্রিয়গুলির-শক্তি- ফেরেশতা; মস্তিষ্কের বহির্গত হইয়া সর্বদেহে পরিব্যপ্ত হইয়াছে, সেই বিন্দু সকল গ্রহ-নক্ষত্র; অঙ্গুলী, কলম ও কালি প্রকৃতিস্বরূপ। আল্লাহ্ তোমার আত্মাকে কল্পনাতীত ও নিরাকাররূপে সৃষ্টি করিয়া সমস্ত অঙ্গ-প্রতঙ্গের উপর বাদশাহ্ করিয়া দিয়াছেন এবং তোমাকে সতর্ক করিয়া বলিয়াছেন- “খবরদার, স্বীয় অস্তিত্ব ও বাদশাহী ভুলিও না। ভুলিলে তোমার সৃষ্টিকর্তা আল্লাহকে ভুলিয়া ফেলিবে।” এইজন্যই বলা হইয়াছে- “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ আদমকে তাহার আকৃতির অনুরূপ সৃষ্টি করিয়াছেন। অতএব, হে মানব, নিজকে চিন। তাহা হইলেই তোমার প্রভু আল্লাহ্‌কে চিনিবে।” 

পরবর্তী পর্ব —
আত্ম-জ্ঞান ও বিশ্ব-জ্ঞান 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...