সোমবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৫

হজ্জ (১৯) হজ্জের নিগূঢ় তত্ত্ব



হজ্জ (পর্ব – ১৯)

📚সৌভাগ্যের পরশমনি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী(রহ.)

হজ্জের নিগূঢ় তত্ত্ব 

হজ্জের কার্যাবলী সম্বন্ধে উপরে যাহা বর্ণিত হইল তাহা উহার বাহ্য আবরণ মাত্র। ইহাদের প্রত্যেকটির এক একটি রহস্য  গূঢ় তত্ত্ব রহিয়াছে। উপদেশ গ্রহণ  পরকালের বিষয় স্মরণ করাই উহাদের মূল উদ্দেশ্য। বাস্তব কথা এই আল্লাহ্ মানুষকে এরূপে সৃষ্টি করিয়াছেন যেসে তাহার সমস্ত ক্ষমতা আল্লাহর উপর সমর্পণ করিয়া না দিলে পূর্ণ সৌভাগ্য লাভ করা তাহার পক্ষে একেবারে অসম্ভব। ইহা দর্শন পরিচ্ছেদে বর্ণিত রহিয়াছে। আরও বর্ণিত হইয়াছে যেপ্রবৃত্তির অনুসরণই মানুসের ধ্বংসের কারণ। প্রবৃত্তির নির্দেশ অনুসারে চলিলে মানুষের কোন কর্মই শরীয়তানুযায়ী হইতে পারে না। সুতরাং প্রবৃত্তির আজ্ঞাবহ ব্যক্তি প্রবৃত্তিরই গোলামআল্লাহর বান্দা হইয়া তাঁহার বিধানমতে চলিলেই চিরস্থায়ী সৌভাগ্য লাভ করা যাইতে পারে। ইহা ছাড়া সৌভাগ্য লাভের কোন উপায় নাই। এইজন্য পূর্ববর্তী প্রত্যেক নবীর উম্মতের প্রতিই চির কৌমার্য  সন্ন্যাসব্রত অবলম্বনের নির্দেশ ছিল। এই কারণেই তখনকার ইবাদতকারীগণ মানুষের সংশ্রব পরিত্যাগ করত পর্বতগুহায় আশ্রয় লইতেন এবং কঠোর সাধনায় সারা জীবন কাটাইয়া দিতেন। লোকে রাসূলে মাকবুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর নিকট নিবেদন করিল-“হে আল্লাহর রাসূলআমাদের ধর্মে কি চির কৌমার্য ও সন্ন্যাসব্রত নাই?” তিনি উত্তরে বলিলেন-“উহার পরিবর্তে আমাদের প্রতি জিহাদে  হজ্জের নির্দেশ দেওয়া হইয়াছেন।” সুতরাং দেখা গেলআল্লাহ্ এই উম্মতকে সন্ন্যাসব্রতের পরিবর্তে হজ্জের নির্দেশ প্রদান করিয়াছে। কারণইহাতে কঠোর সাধনার উদ্দেশ্য পূর্ণ হয় এবং আত্মা সংশোধনমূলক উপদেশও পাওয়া যায়। কেননা আল্লাহ্ কা'বা শরীফকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করিয়াছেনইহাকে নিজের সহিত সম্বন্ধযুক্ত করিয়াছেন  রাজপ্রাসাদের সমতুল্য বানাইয়াছেনইহার চতুর্দিকের স্থানকে পবিত্র বলিয়া ঘোষণা করিয়াছেন এবং ইহার সম্মানার্থে উহার সীমার মধ্যে কোন প্রাণী শিকার  কোন বৃক্ষ কর্তন হারাম করিয়াছেন। আরাফার ময়দানকে রাজপ্রাসাদের সম্মুখবর্তী দরবারভূমির ন্যায় নির্ধারণ করত কা'বা শরীফের সামনে রাখিয়াছেন যেন সর্বদিক হইতে বিশ্বের মানুষ আল্লাহর পবিত্র গৃহে আগমন করিতে পারে। যদিও কোন নির্দিষ্ট স্থানে  কা'বাগৃহে বাস করারূপ অপবাদ হইতে আল্লাহ্ একেবারে পবিত্র তথাপি মানুষের হৃদয়ে যখন প্রেমাবেগ প্রবল  দুর্দমনীয় হইয়া উঠে এবং মিলনের অভিপ্রায় সীমাহীন হইয়া দাঁড়ায়তখন প্রিয়জনের সহিত সম্বন্ধযুক্ত বস্তুকে সে প্রাণের সহিত ভালবাসে।এইজন্যই আল্লাহর প্রেমে মত্ত মুসলমানগণ নিজ নিজ স্ত্রী-পুত্র পরিবারসুখের বাসস্থান  ধনসম্পদ ত্যাগ করত বিপদসঙ্কুল অরণ্যভীষণ সমুদ্র অতিক্রমপূর্বক প্রকৃত বান্দার ন্যায় অকৃত্রিম বন্ধু ও একমাত্র প্রভু মহান আল্লাহর দ্বারে উপস্থিত হইয়া থাকে।


হজ্জের আদিষ্ট কার্যগুলির মধ্যে কঙ্কর নিক্ষেপসাফা-মারওয়া পাহাড়ের মধ্যস্থলে দৌড় প্রভৃতি অবশ্য যুক্তির সাহায্যে বুদ্ধি দ্বারা বুঝা যায় না। বুদ্ধির আওতাভুক্ত বিষয়গুলির মধ্যে প্রবৃত্তির কিছু নাকিছু সম্পর্ক থাকে। কেননাকর্মের ফলকে হিতকর বলিয়া বিবেচনা করিলেই মানুষ উহা করিতে আগ্রহান্বিত হয় এবং কর্মটি হিতকর হওয়াই তাহার কার্য সম্পাদনের কারণ হইয়া পড়ে। যেমন সেজানেযাকাত প্রদানের মধ্যে অভাবগ্রস্তদের প্রতি সহায়তা  সৌজন্য প্রদর্শন আর নামাযে আল্লাহর সম্মুখে দীনতা-হীনতা প্রকাশ রহিয়াছে এবং রোযা দ্বারা কুপ্রবৃত্তি দমিত  শয়তানের শক্তি খর্ব হয়। বুদ্ধির নির্দেশানুসারে মানুষ এই সকল কার্য সম্পন্ন করে বলিয়া মনে হওয়া অসম্ভব নহে। কিন্তুলাভ-লোকসানের প্রতি একেবারেই ভ্রূক্ষেপ না করিয়া প্রভুর আদেশ পাওয়ামাত্রই কাজ সম্পন্ন করাকেই প্রকৃত বন্দেগী বলে। কঙ্কর নিক্ষেপ  সাফা-মারওয়া পাহাড়ের মধ্যস্থলে দৌড় এই শ্রেণীর কার্য। কেননাশুধু প্রভুর আদেশ মান্য করা ব্যতীত অন্য কোন কারণে এরূপ কার্য কেহই করিতে পারেনা। এইজন্যই রাসূলে মাকবুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হজ্জ সম্বন্ধে বিশেষভাবে বলিয়াছেন- “হজ্জকে প্রকৃত সত্যযথার্থ বন্দেগী  সত্যিকারের দাসত্ব জ্ঞান করিয়া ইহার জন্য আপনার দরবারে উপস্থিত হইলাম।হজ্জকে তিনি সত্যিকারের দাসত্ব  বন্দেগী আখ্যা দিয়েছেন। হজ্জের মধ্যে  প্রকার কার্যগুলির কোন যুক্তি নির্ণয় করিতে না পারিয়া কতক লোক হয়রান হইয়া পড়িয়াছে। এই হয়রানি তাহাদের অজ্ঞতার কারণেই ঘটিয়াছে। কেননা ইহার প্রকৃত অবস্থা তাহারা অবগত নহে। বিনা উদ্দেশ্যই যে হজ্জের উদ্দেশ্যইহা তাহারা বুঝিতে পারে নাই। বিনাউ দ্দেশ্যেবিনা কারণে একমাত্র আল্লাহর দাসত্বের জন্যই হজ্জ। প্রবৃত্তি বা বুদ্ধিকে ইহার মধ্যে হস্তক্ষেপ করিতে দেওয়া উচিত নহে। তাহা করিতে পারিলে সকল কার্যেই মানুষ নিজেকে একমাত্র আল্লাহর নিকট সমর্পণ করিতে সমর্থ হইবে। কারণনিজের অস্তিত্ব ভুলিয়া একেবারে অক্ষম  অসহায় অবস্থায় নিজেকে আল্লাহর নিকট সম্পূর্ণরূপে উৎসর্গ করাতেই মানুষের পরম সৌভাগ্য নিহিত রহিয়াছে। তখন সমস্ত কার্যে তাহার লক্ষ্য একমাত্র আল্লাহ্  তাঁহার আদেশের দিকেই থাকিবে।


পরবর্তী পর্ব —
হজ্জের উপদেশ 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...