মঙ্গলবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৫

তত্ত্বদর্শন (১৪) রোগ-শোক প্রদানের কারণ ও রোগ নির্ণয়ের বিভিন্ন মত



আল্লাহ-পরিচয় (তত্ত্বদর্শন) পর্ব – ১৪
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

রোগ-শোক প্রদানের কারণ ও রোগ নির্ণয়ের বিভিন্ন মত 
যদি কাহারও মানসিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়া দুনিয়া হইতে সে মুখ ফিরাইয়া লয় - দুঃখ ও অনুতাপ তাহাকে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলে দুনিয়ার নিয়ামত তাহার নিকট খারাপ বোধ হয় এবং অন্তিমকালের চিন্তা-ভাবনা তাহাকে ঘিরিয়া লয় তখন চিকিৎসকগণ বলিবেন : মস্তিষ্ক বিকৃতিতে এ ব্যক্তি অসুস্থ হইয়া পড়িয়াছে। এক প্রকার ভেষজ পদার্থের পাঁচন ইহার ঔষধ। প্রকৃতিবাদিগণ তাহার সম্বন্ধে বলিবেন : শীতকালের শুষ্ক বায়ুর কারণে মস্তিষ্কে শুষ্কতা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইয়া তাহার এ রোগ জন্মিয়াছে। বসন্তের স্নিগ্ধ বায়ু : মস্তিষ্কে প্রবেশ করত ইহাকে আর্দ্র না করিলে এ রোগ সারিবে না। জ্যোতির্বিদগণ বলিবেন  : এই ব্যক্তির উন্মাদনা রোগ হইয়াছে। বুধ গ্রহের সহিত মঙ্গল গ্রহের অশুভ সংক্রমণ হইয়া এই দুই গ্রহের কুদৃষ্টি তাহার উপর পড়িয়াছে বলিয়াই এ রোগের উৎপত্তি হইয়াছে৷ চন্দ্র-সূর্য বা অন্য কোন শুভ গ্রহের সহিত সংক্রমণ হইয়া তাহার উপর ইহার শুভ-দৃষ্টি না পড়িলে এ রোগ দূর হইবে না। চিকিৎসক, প্রকৃতিবাদী ও জ্যোতির্বিদ তাহাদের নিজ নিজ চিন্তাধারা অনুযায়ী এ ব্যক্তি সম্বন্ধে ঠিকই বলিয়াছেন। তাঁহাদের জ্ঞানের দৌড় এ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। কিন্তু প্রকৃত কথা এই যে, সেই রোগাক্রান্ত ব্যক্তির জন্য আল্লাহ্’র দরবার হইতে সৌভাগ্যের আদেশ হইল। তদানুসারে বুধ ও মঙ্গল গ্রহকে তিনি অনুমতি করিলেন যেন ইহারা একত্রে উদিত হইয়া তাঁহার অন্যতম পিয়াদা বায়ুকে শুষ্কতার ফাঁদের সাহায্যে ঐ ব্যক্তির মস্তিষ্ক শুষ্ক করিয়া ফেলিবার ইঙ্গিত করে, দুনিয়ার সুখ-শান্তি হইতে তাহার মুখ ফিরাইয়া লয় এবং অনুতাপ ও ভয়ের চাবুক মারিয়া তাহাকে আল্লাহর দরবারের দিকে লইয়া যায়। চিকিৎসা শাস্ত্র, প্রকৃতিবিদ্যা ও জ্যোতির্বিদ্যা এ সম্বন্ধে কোন খবরই রাখে না। বরং এই খবর একমাত্র পয়গম্বরগণের 
ইলমে নবুয়তরূপ মহারত্নের অসীম সমুদ্র হইতে পাওয়া যায়। পয়গম্বরগণের জ্ঞান-সমুদ্র বিশ্ব-জগতের সমস্ত রাজ্য এবং আল্লাহ্’র কর্মচারী ও ভৃত্যদিগকে ঘিরিয়া রহিয়াছে। আর তাদের কে কোন্ কাজে নিযুক্ত আছে, কাহার আদেশে পরিচালিত হয় এবং সৃষ্টিকে কোন্ দিকে লইয়া যায় ও কোন্ দিকে যাইতে বাধা দেয়- এ সমুদয় কেবল পয়গম্বরগণই জানেন। তথাপি উপরোক্ত তিন শ্রেণীর পণ্ডিতগণ যাহা করেন তাহা এক হিসাবে সত্য বটে। তবে পার্থক্য এই যে, বিশ্বজগতের বাদশাহ্, তাহার বিশাল রাজ্য, প্রধান প্রধান কর্মচারী ও ভৃত্যগণের সংবাদ তাহারা কিছুই রাখেন না। তাহারা এমন মূর্খ পল্লীবাসীর ন্যায় যে বাদশাহের দরবারে উপস্থিত হইয়া তাঁহার সৈন্যসামন্ত, প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং তাঁহার কর্মচারীবৃন্দকে দেখিয়া বলে “আমি বাদ্‌শাহকে দেখিয়াছি।” তাহার এরূপ উক্তি এক হিসাবে সত্য। কারণ, সে বাদশাহের দরবারকে বাদশাহের সহিত সংযোগ করিয়া দিয়াছে। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার তাহার উক্তির বিপরীত ছিল। কেননা, সে বাদশাহের দরবারের গোলামকে দেখিয়া তাহাকেই বাদশাহ বলিয়া মনে করিয়াছিল। 
ফলকথা, আল্লাহ্ মানুষকে বিপদাপদ, রোগ, উন্মাদনা ও কষ্ট দ্বারা নিজের দিকে আহবান করিতেছেন এবং বলিতেছেন ইহা রোগ নহে, বরং ইহা আমার দয়ারূপ ফাঁদ। এই ফাঁদ দ্বারা আমি আমার বন্ধুগণকে আমার দিকে আকর্ষণ করিয়া লই। অর্থাৎ “আল্লাহ্ পয়গম্বরগণকে বড় বড় বিপদে নিপতিত করিয়াছেন এবং অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র বিপদ ওলীদের উপর দিয়াছেন। তৎপর তাঁহার বান্দাগণের মর্যাদার তারতম্য অনুসারে লঘু হইতে লঘুতর বিপদে তাহাদিগকে ফেলিয়াছেন।” এই সকল লোকগণের সম্বন্ধেই হাদীসে আল্লাহ্’র উক্তি উদ্ধৃত হইয়াছে : “আমি পীড়িত হইয়াছিলাম; কিন্তু তুমি আমার সেবা-শুশ্রুষা কর নাই।” 
মানব দেহের অভ্যন্তরে যে বাদ্‌শাহী চলিয়াছে তাহা প্রথম উদাহরণে বর্ণিত হইল এবং দেহের বাহিরে যে বাদশাহী চলিয়াছে তৎসম্বন্ধে দ্বিতীয় উদাহরণে প্রকাশ পাইল। 
নিজকে চিনিলেই মানব দেহের বাহিরের বাদশাহী সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করা যায়। এই জন্যই আত্ম-দর্শন প্রথমে বর্ণিত হইয়াছে। 

পরবর্তী পর্ব —
আল্লাহর মা'রিফাতের সমষ্টিরূপে চারিটি বাক্যের ব্যাখ্যা

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...