মঙ্গলবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৫

তত্ত্বদর্শন (৭) আল্লাহর ইচ্ছার প্রভাব প্রকাশের ক্রমিক ধারা



আল্লাহ-পরিচয় (তত্ত্বদর্শন) পর্ব – ৭
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

আল্লাহর ইচ্ছার প্রভাব প্রকাশের ক্রমিক ধারা
তোমার দেহ-রাজ্যের উপর তোমার বাদশাহী ও প্রভুত্ব কিরূপে চলিতেছে, ইহা তুমি অবগত না হইলে বিশ্বজগতের একমাত্র বাদশাহ আল্লাহ্ তা'আলা কিরূপে স্বীয় বিশাল রাজ্য চালাইতেছেন, তাহা কখনও তুমি বুঝিতে পারিবে না। সুতরাং প্রথমেই তুমি নিজকে চিন এবং তোমার প্রত্যেকটি কাজ সম্বন্ধে অবগত হও। 
দৃষ্টান্তস্বরূপ মনে কর, তুমি ‘বিসমিল্লাহ’ শব্দটি কাগজে লিখিতে চাও। প্রথমে লেখার ইচ্ছাটি তোমার মধ্যে উদিত হয়। তৎপর হৃদয়ে এক প্রকার আলোড়নের সৃষ্টি হয়। কিন্তু তোমার বক্ষঃস্থলের বামপার্শ্বে 'দিল' নামক যে একখণ্ড গোশত আছে ইহাতে এই আলোড়নের সৃষ্টি হয় না। বরং হৃদপিণ্ড হইতে এক প্রকারের অতি সূক্ষ্ম পদার্থ উহাকে আলোড়িত করিয়া মস্তিষ্কের দিকে ছুটিয়া যায়। দেহতত্ত্ববিদগণ এই সূক্ষ্ম পদার্থকে রূহ বা জীবন বলেন৷ এই জীবনই সর্বপ্রকার অনুভব ও গতিবিধির শক্তি বহন করিয়া থাকে। এই জীবন পূর্ববর্ণিত আত্মা হইতে স্বতন্ত্র পদার্থ। ইহা জীব-জন্তুর মধ্যেও আছে। ইহা মৃত্যুর অধীন। অপর পক্ষে আত্মা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র পদার্থ; জীব-জন্তুর মধ্যে ইহা নাই এবং ইহা অমর। কারণ, কেবল এই আত্মাই আল্লাহর মারিফাতের স্থান। 
যাহা হউক, সেই জীবনী-শক্তি মস্তিষ্কে উপস্থিত হইয়া ইহার প্রথম কুঠরি কল্পনার স্থানে ‘বিসমিল্লাহ্' শব্দের আকৃতি উৎপন্ন করে। তাহার পর মস্তিষ্ক হইতে এক প্রকার ক্রিয়াশক্তি স্নায়ু পথে অঙ্গুলির অগ্রভাগে উপস্থিত হয়। মস্তিষ্ক হইতে বহির্গত হইয়া স্নায়ুসকল শরীরের সর্বত্র পরিব্যাপ্ত হইয়া রহিয়াছে এবং উহার কতকগুলি সূত্রবৎ অঙ্গুলীর অগ্রভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত আছে। ক্ষীণ ব্যক্তির বাহুতে ঐ প্রকার স্নায়ু-সূত্র বাহির হইতেই দেখা যায়। মোটকথা, মস্তিষ্ক হইতে বহির্গত সেই ক্রিয়াশক্তি স্নায়ুগুলিকে, স্নায়ুগুলি আবার অঙ্গুলির অগ্রভাগকে এবং অঙ্গুলির অগ্রভাগ কলমকে চালিত করে ফলে চক্ষের সাহায্যে মস্তিষ্কের খেয়াল কুঠরিতে পূর্ব হইতে অঙ্কিত ছবির অনুরূপ ‘বিসমিল্লাহ্’ লিখিত হয় এই কার্যে দর্শনশক্তির আবশ্যকতা অত্যধিক। 
মানবের প্রত্যেক কার্যের প্রথমে ইহার ইচ্ছা যেমন তাহার মনে উদিত হয় তদ্রূপ আল্লাহর প্রত্যেক কার্যের আরম্ভও তাঁহার ইচ্ছা বা অভিপ্রায় গুণের মধ্যে হইয়া থাকে; লিখিবার ইচ্ছা যেমন প্রথমে তোমার মনে উদ্ভব হইয়া ক্রমে তদ্‌পথে অন্যান্য স্থানে পৌঁছিয়াছিল, সেইরূপ আল্লাহর ইচ্ছার প্রভাব প্রথমে আরশে উৎপন্ন হইয়া ক্রমে অন্যান্য স্থানে পৌছিয়া থাকে। তেজসদৃশ যে সূক্ষ্ম পদার্থ তোমার ইচ্ছার প্রভাবকে হৃদ্‌পিণ্ডের স্নায়ুপথে মস্তিষ্কে পৌঁছাইয়া থাকে উহাকে যেমন জীবনী-শক্তি বলা হয় তদ্রূপ আল্লাহ্’র ইচ্ছার প্রভাবকে যে পরম শক্তি আরশ হইতে কুর্সী পর্যন্ত পৌঁছাইয়া থাকে উহাকে ফেরেশতা ও রুহুল কুদ্দুস বলা হয়। হৃদপিণ্ডের প্রভাব যেমন মস্তিষ্কে সংক্রামিত হয় এবং মস্তিষ্ক হৃদপিণ্ডের শাসনে ও আজ্ঞাধীনে পরিচালিত তদ্রূপ আল্লাহর নমুনা মানুষ নিজের মধ্যেও দেখিতে পায়। কারণ, প্রাণের মূল যাহাকে আমরা দিল বা রূহ্ বলি তাহাও মানব-কল্পনার অতীত। ইহাকে রূপায়িত করিবার উদ্দেশ্যে যত প্রকারের আকার ও গুণাবলী মানুষের কল্পনায় উদিত হয়, আত্মা উহার সবকিছু হইতেই পবিত্র। কেননা, আত্মার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও বেধ কিছুই নাই এবং ইহা বিভাজ্যও নহে। যে বস্তুর দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও বেধ নাই এবং যাহা বিভক্তও হইতে পারে না তাহার কোন বর্ণ থাকাও অসম্ভব। যে বস্তুর দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও বেধ নাই এবং যাহা অবিভাজ্য তাহা কল্পনায়ও উদিত হইতে পারে না। কারণ, যে বস্তু বা যাহার সমজাতীয় বস্তু চক্ষু দেখিতে পায় কেবল তাহাই কল্পনায় আসে। বর্ণ ও আকৃতি ব্যতীত অন্য কিছুই কল্পনাও দৃষ্টিপথে উদিত হয় না। 'অমুক জিনিস কেমন ?' এই প্রশ্নের উত্তরে লোকে ইহাই মনে করে যে, সেই জিনিসের আকৃতি ও বর্ণ কি প্রকার- ছোট কি বড়। যে জিনিসের আকৃতি, বর্ণ ক্ষুদ্রত্ব ও বৃহত্ত্ব নাই তৎসম্বন্ধে ‘ইহা কি প্রকার’ এরূপ প্রশ্ন করা বৃথা। যে পদার্থে 'কি প্রকার প্রশ্নের অধিকার নাই তাহা জানিতে চাহিলে স্বীয় আত্মার দিকে লক্ষ্য কর। দেখিবে, একমাত্র আত্মাই আল্লাহর মারিফাতের স্থান- ইহা বিভক্ত হয় না; ইহার আকার-প্রকার, দৈর্ঘ্য-প্রস্থ ও বর্ণ কিছুই নাই।' আত্মা কি প্রকার; পদার্থ- এ প্রশ্ন কেহ করিলে ইহাই উত্তর হইবে যে, ইহাতে এমন প্রশ্নের কোন অধিকার নাই। তুমি যখন স্বীয় আত্মাকে ধারণা ও কল্পনার অধিকারমুক্ত বলিয়া বুঝিতে পারিবে তখন ইহা ভালরূপেই বুঝিতে পারিবে যে, আল্লাহর আকৃতি, প্রকৃতি ও বর্ণাদি প্রভৃতি বাহ্য গুণাবলী হইতে আরও বহুগুণে পবিত্র। 
অনেকে হয়ত বিস্মিত হইবে যে, এমন আকৃতি-প্রকৃতিবিহীন বস্তু কি রূপে বিরাজমান থাকিতে পারে? তাহারা নিজ আত্মা সম্বন্ধে চিন্তা করিয়া দেখে না যে, ইহা আকার-প্রকারবিহীন অবস্থায় বিদ্যমান রহিয়াছে। মানব নিজের মধ্যে অনুসন্ধান করিলে সহস্র রকমের আকার-প্রকারবিহীন বস্তু দেখিতে পাইবে বেদনা, ক্রোধ, প্রেম, আস্বাদ ইত্যাদি সহস্র প্রকার নিরাকার বস্তু তাহার মধ্যে রহিয়াছে। অথচ এই সমস্ত কি, কেমন, কি প্রকার জানিতে চাহিলে সে কখনও জানিতে পারিবে না। কারণ, ইহাদের বর্ণ বা আকার কিছুই নাই। ক্রোধাদি নিরাকার গুণগুলিতে যেমন 'কেমন’ ? কি প্রকার ? প্রশ্নের অধিকার নাই, অথচ ইহারা বিদ্যমান আছে তদ্রূপ আরও  এমন বহু বস্তু মৌজুদ আছে যাহাতে  - ‘কেমন ?’ ও ‘কি প্রকার ?' প্রশ্ন করা চলে না । শত চেষ্টা করিলেও শব্দ, আস্বাদ বা গন্ধের মূলতত্ত্ব কেহই অবগত হইতে পারিবে না। কারণ, ‘কেমন ?' ‘কি প্রকার ?' প্রশ্নগুলি খেয়ালের অধীন। দর্শনেন্দ্রিয়ের সাহায্য ব্যতীত উহা অবগত হওয়া যায় না। সুতরাং বস্তুটি  ‘কেমন?’  ‘কি প্রকার?' এই সকল প্রশ্নের উত্তর একমাত্র দর্শনের পর খেয়ালে সঞ্চিত জ্ঞান হইতেই দেওয়া যাইতে পারে। যে বস্তুর উপর কর্ণের অধিকার আছে তাহাতে চক্ষের কোন অধিকার নাই; যেমন কর্ণ শব্দ শ্রবণ করে, চক্ষু শ্রবণ করে না । বরং শব্দের প্রকৃত অবস্থা অবগত হওয়া সম্ভব নহে। কারণ, কর্ণ দ্বারা যেমন বর্ণ ও আকৃতি অবগত হওয়া যায় না। চক্ষুর দ্বারাও তদ্রূপ শব্দ বুঝা যায় না । এইরূপ, যে বস্তু অন্তরে অনুভূত হয় এবং বুদ্ধিতে বুঝা যায়, বাহ্য ইন্দ্রিয়গুলি তাহা অনুভব করিতে ও বুঝিতে পারে না । চক্ষু, কর্ণ ইন্দ্রিয়গুলি কেবল জড়পদার্থের আকার-প্রকার, অবস্থা বুঝিতে পারে, জড়াতীত পদার্থের উপর এই সকল ইন্দ্রিয়ের কোনই অধিকার নাই। এই সমস্ত কথা গভীর চিন্তার বিষয়। ইহার বিস্তারিত বিবরণ দর্শনশাস্ত্রে আছে। এ স্থলে যতটুকু বলা হইল, ইহাই এ গ্রন্থে যথেষ্ট ।

পরবর্তী পর্ব —
আল্লাহ কল্পনা ও ধারণার বহির্ভূত 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...