মানব জীবনের উদ্দেশ্য
এখানে প্রশ্ন হইতে পরে মানুষের মধ্যে যখন ইতর প্রাণীর স্বভাব, শয়তানের স্বভাব ও ফেরেশতার স্বভাব বিদ্যমান আছে তখন কিরূপে জানিব যে, ফেরেশতার স্বভাবই মানুষের আসল গুণ উহা ব্যতীত আর সকল গুণ ও স্বভাবই নৈমিত্তিক ? আবার কেমন করিয়াই বা বুঝিব যে, মানুষ কেবল ফেরেশতা স্বভাব অর্জনের জন্যই সৃষ্ট হইয়াছে অন্য গুণের জন্য নহে ? তবে শোন; তাহা হইলেই বুঝিবে, ইতর প্রাণী ও হিংস্র জন্তু অপেক্ষা মানুষ শ্রেষ্ঠ। আল্লাহ্ প্রত্যেক বস্তুর জন্য পূর্ণতার একটি শেষ সীমা নির্দিষ্ট করিয়া দিয়াছেন। এবং কেহই এই সীমা অতিক্রম করিয়া অধিকতর উন্নতি লাভ করিতে পারে না। আর যাহার উন্নতি যে সীমা পর্যন্ত নির্দিষ্ট করিয়া রাখিয়াছেন, সেই সীমা পর্যন্ত উন্নতি করিবার জন্যই তাহাকে সৃষ্টি করা হইয়াছে। একটি উপমা দ্বারা বিষয়টি বুঝাইয়া দেওয়া যাইতেছে। ঘোড়া গাধা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। কারণ, গাধা শুধু ভারবহনের জন্যেই সৃষ্ট, কিন্তু ঘোড়া গাধার ন্যায় ভারও বহন করিতে পারে, আবার যুদ্ধের সময় যোদ্ধাকে পৃষ্ঠে লইয়া তাহার ইঙ্গিত অনুসারে চলাফেরা করিবার ক্ষমতাও রাখে। এই জন্যই গাধা অপেক্ষা ঘোড়ার শ্রেষ্ঠত্ব অধিক। ঘোড়া যদি এই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করিতে না পারে তবে গর্দৰ্ভত্ব প্রাপ্ত হয় এবং তখন গর্দভের ন্যায় ভারবহন ছাড়া আর কিছুই করিতে পারে না। ইহা ঘোড়ার পক্ষে নিতান্ত ক্ষতি ও অধোগতি। তদ্রূপ কোন কোন লোক পানাহার, নিদ্রা ও স্ত্রীসম্ভোগের জন্যই মানব সৃষ্টি হইয়াছে মনে করিয়া কেবল এই সকল কার্যেই স্বীয় পরমায়ু ধ্বংস করে। আবার কোন কোন সম্প্রদায় আরবী তুর্কীদের ন্যায় মনে করে যে, অপরকে জয় করিয়া তাহাদের উপর প্রভুত্ব স্থাপন করাই মানব জীবনের উদ্দেশ্য। এই দুইটি মতই ভ্রমাত্মক। কেননা, পানাহার, স্ত্রীসম্ভোগ প্রবৃত্তির উত্তেজনায় সম্পন্ন হয়। এই প্রবৃত্তি ইতর জন্তুরও আছে। বরং উটের পানাহার শক্তি ও বাবুই পক্ষীর কাম-শক্তি মানুষের অপেক্ষা অনেক অধিক। এমতাবস্থায় পানাহার, মৈথুন কার্যে উন্নতি লাভই যদি মানব জীবনের উদ্দেশ্য হয় তবে কিরূপে মানুষকে উট ও বাবুই পক্ষী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ বলা যাইতে পারে ? অপর পক্ষে অন্যকে পরাজিত করা ক্রোধের কার্য হিংস্র জন্তুরও ক্রোধ আছে। অতএব নিকৃষ্ট প্রাণী ও হিংস্র জন্তুর প্রকৃতিতে যে ভাব আছে তাহা মানুষের মধ্যেও আছে। তবে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব কিসে? কেবল বুদ্ধির জন্যই মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব। বুদ্ধি আছে বলিয়াই মানুষ আল্লাহকে চিনিতে পারে এবং তাঁহার বিচিত্র শিল্প-নৈপুণ্য ও বিস্ময়কর কারিগরি জানিতে পারে। বুদ্ধিবলেই মানুষ নিজকে কাম, ক্রোধ ও লোভের হাত হইতে রক্ষা করিতে পারে। ইহাই ফেরেশতার স্বভাব। ইহার প্রভাবেই মানুষ পশু-পক্ষী প্রভৃতি সকলের উপর আধিপত্য স্থাপন করিতে পারে। বরং জগতে যাহা কিছু আছে সবই মানুষের জন্য নিয়মাধীন করা হইয়াছে, যেমন আল্লাহ্ বলেন : “আর যাহা কিছু আকাশে আছে এবং যাহা কিছু পৃথিবীতে আছে তৎসমুদয় তিনি তোমাদের জন্য নিয়মাধীন করিয়া দিয়াছেন ।”
মানুষের নিত্য ও অনিত্য গুণ

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন