মঙ্গলবার, ১৭ জুন, ২০২৫

বিবাহ (১০) বিবাহের পঞ্চম উপকারিতা



বিবাহ (পর্ব – ১০) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

বিবাহের পঞ্চম উপকারিতা–
এতে নফসের বিরুদ্ধে সাধনা করা হয়।
কেননাপরিবার-পরিজনের হক আদায় করাতাদের আচার-আচরণ মনের বিরোধী হলেও সবর করাতাদের জন্যে কষ্ট করাতাদের সংশোধনের চেষ্টা করাতাদেরকে ধর্মের পথ বলেদেয়াতাদের খাতিরে হালাল উপার্জনে অক্লান্ত শ্রম স্বীকার করা এবং তাদের লালনপালন করাএসবই অত্যন্ত মহত্বপূর্ণ কাজ। কেননাএগুলো প্রজাপালন  রাজ্যশাসন তুল্য। স্ত্রী ও পুত্র-পরিজন হচ্ছে প্রজা। প্রজার হেফাযত উচ্চস্তরের কাজ। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন– “ন্যায়পরায়ণ শাসকের একদিন সত্তর বছর এবাদত অপেক্ষাউত্তম”।
বলাবাহুল্যযে ব্যক্তি নিজের  অপরের সংশোধনে আত্মনিয়োজিতসে সেই ব্যক্তির চেয়েউত্তমযে কেবল নিজের সংশোধনে মশগুল। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি উৎপীড়ন সহ্য করেসেতার মত নয়যে নিজেকে স্বাচ্ছন্দ্য  আরামে মত্ত রাখে। মোট কথাস্ত্রী-পুত্র পরিজনের চিন্তাভাবনা করআল্লাহর পথে জেহাদ করার মতই। তাই বিশরে হাফী (রহ.বলেছিলেনইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল আমার উপর তিন বিষয়ে শ্রেষ্ঠত্ব রাখেন। তন্মধ্যে একটিতিনি নিজের জন্যে  অপরের জন্যে হালাল রুজি অন্বেষণ করেন। এক হাদীসে এরশাদ হয়েছেমানুষ পরিবার-পরিজনের জন্যে যা ব্যয় করে তা খয়রাত তুল্য। মানুষ সেই লোকমারও সওয়াব পায় যা সে তার স্ত্রীর মুখে তুলে দেয়। এক বুযুর্গ জনৈক আলেমের কাছে বললেনআল্লাহতাআলা আমাকে প্রত্যেক আমল থেকে কিছু অংশ দিয়েছেনএমন কিহজ্জ জেহাদ ইত্যাদি থেকেও। আলেম বললেনতোমাকে আবদালের আমল তো দেয়াই হয়নি। বুযুর্গ জিজ্ঞেস করলেনআবদালের আমল কি?  উত্তর হলহালাল উপার্জন করা এবং পরিবার-পরিজনের জন্যে ব্যয় করা। 
ইবনে মোবারক যখন তাঁর ভাইদের সাথে জেহাদে ছিলেনতখন একদিন বললেনতোমরা সেইআমল জান কিযা আমাদের এই জেহাদ অপেক্ষা উত্তমতারা বললেননাআমরা জানি না।তিনি বললেনআমি জানি। প্রশ্ন হলসেটা কিতিনি বললেনযে ব্যক্তি সন্তানওয়ালা হওয়া সত্ত্বেও কারও কাছে কিছু চায় নারাতে জেগে ছা-বাচ্চাদেরকে তৃপ্ত দেখে এবং তাদেরকে আপন কাপড় দ্বারা ঢেকে দেয়তার আমল আমাদের এই জেহাদের চেয়ে উত্তম। 
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: 
"যার নামায় ভাল হয়পরিবার-পরিজন বেশী হয়অর্থসম্পদ কম হয় এবং যে মুসলমানদের পশ্চাৎ নিন্দা করে নাসে জান্নাতে আমার সাথে থাকবে।"
অন্য এক হাদীসে আছে- "নিশ্চয় আল্লাহ্ তা'আলা তিনি- নিঃস্বসংযমীপরিজনশীলকে ভালবাসেন।
হাদীসে আরও আছে- "বান্দার গোনাহ অনেক হয়ে গেলে আল্লাহ তা'আলা তাকে পরিবার-পরিজনের চিন্তায় লিপ্ত করে দেনযাতে তার গোনাহ দূর হয়ে যায়।" 
জনৈক পূর্ববর্তী বুযুর্গ বলেনকিছু গোনাহ এমন আছেতাঁর কাফফারা পরিবার-পরিজন ছাড়া অন্য কিছু নয়।  সম্পর্কে এক হাদীসে আছেকিছু গোনাহ এমন আছেযা জীবিকা উপার্জনের চিন্তা ছাড়া অন্য কোন কিছু দূর করতে পারে না।
রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন
"যে ব্যক্তির তিনটি কন্যা সন্তান থাকে এবং সে তাদের ভরণপোষণ করে  ততদিন তাদের দেখাশোনা করেযতদিন আল্লাহ্ তাদেরকে স্বনির্ভর করে না দেনআল্লাহ তাআলা তার জন্যে নিশ্চিতরূপে জান্নাত ওয়াজিব করে দেনকিন্তু সে ক্ষমার অযোগ্য কোন গোনাহ করলে ভিন্নকথা।"
কথিত আছেজনৈক বুযুর্গ তার স্ত্রীর সাথে খুব সম্প্রীতি সহকারে বসবাস করতেন। অবশেষে একদিন স্ত্রী মারা গেল। লোকেরা তাঁকে দ্বিতীয় বিবাহ করতে বললে তিনি বললেননাআমার মানসিক শান্তির জন্যে একজনই যথেষ্ট ছিল। এর কিছুদিন পর বুযুর্গ বললেনস্ত্রীর মৃত্যুর এক সপ্তাহ পরে আমি স্বপ্নে দেখলামযেন আকাশের দরজা উন্মুক্ত করে কিছু লোক অবতরণ করছে এবং একে অপরের পেছনে শূন্যে চলে আসছে। যখন একজন আমার নিকটে নামেতখন আমাকে দেখে তার পেছনের জনকে বলেঅলক্ষুণে  ব্যক্তিই। পেছনের জন বলেহাঁ।এমনিভাবে তৃতীয় জন চতুর্থ জনকে বলে এবং সে হাঁ বলে। আমি ভয়ে তাদেরকে ব্যাপার কি জিজ্ঞেস করতে পারি না। অবশেষে সকলের পরে এক বালক আমার কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় আমি বললামঃ মিয়াসে হতভাগা কেযার দিকে তোমরা ইশারা করছবালকটি বললসে তুমি। আমি বললামএর কারণ কিসে বললযারা আল্লাহর পথে জেহাদ করেআমরা তাদের আমলের সাথে তোমার আমল উপরে নিয়ে যেতামকিন্তু এক সপ্তাহ ধরে আমাদের প্রতি আদেশ হয়েছে যাতে আমরা তোমার আমল জেহাদে পশ্চাৎপদ ব্যক্তিদের আমলের সাথে লিপিবদ্ধ করি। আমরা জানি না তুমি নতুন কি কান্ড করেছযার কারণে এই আদেশ হয়েছে। এর পর সেই বুযুর্গ তার সঙ্গীদেরকে বিবাহ করিয়ে দিতে বললেন এবং অবশিষ্ট জীবন স্ত্রী-পরিজনের সাথে অতিবাহিত করলেন।
বর্ণিত আছেকিছু লোক পয়গম্বর হযরত ইউনুস (আ.)-এর গৃহে মেহমান হল। তিনি মেহমানদের আদর আপ্যায়নের জন্যে যখন অন্দরে আসা-যাওয়া করতেনতখনই স্ত্রী তাঁর সাথে দুর্ব্যবহার করত এবং কটু কথা বলতকিন্তু তিনি চুপ থাকতেন। 
মেহমানরা তাঁর এই সহনশীলতা দেখে অবাক হল। তিনি বললেনঅবাক হবেন না। কেননাআমি আল্লাহ তাআলার কাছে প্রার্থনা করেছিলামপরকালে আমাকে যে শাস্তি দেয়ার আছে তা দুনিয়াতেই দিয়ে দিন। এতে এরশাদ হলতোমার শান্তি অমুক ব্যক্তির কন্যা। তাকে বিবাহ করে নাও। সেমতে আমি তাকে বিবাহ করেছি। আপনারা যে দুর্ব্যবহার দেখলেনতাতে আমি সবর করি। এসব বিষয়ে সবর করলে ক্রোধ দমিত এবং অভ্যাস সংশোধিত হয়। কেননাযে ব্যক্তি একা অথবা কোন সদাচারীর সঙ্গী হয়ে থাকেতার নফসের মালিন্য ফুটে উঠে না এবং অভ্যন্তরীণ নষ্টামি প্রকাশ পায় না। তাই  ধরনের ঝামেলায় ফেলে নিজেকে পরীক্ষা করা এবং সবরের অভ্যাস গড়ে তোলা আধ্যাত্ম পথের পথিকের জন্যে অপরিহার্য। এতে তার অভ্যাস সুষম এবং অন্তর নিন্দনীয় বিষয়াদি থেকে পাক-সাফ হয়ে যাবে। 
পরিবার পরিজনের জন্যে সবর করাও একটি এবাদত। মোট কথাএটাও বিবাহের একটি উপকারিতাকিন্তু  থেকে কেবল দু'প্রকার ব‍্যক্তিই উপকৃত হতে পারে- (যেসাধনাকঠোর পরিশ্রম  চরিত্র সংশোধনের ইচ্ছা করেতার জন্যে এর মাধ্যমে সাধনার পথ জানা হয়ে যাওয়া বিচিত্র নয়। অথবা
(যে ব্যক্তি চিন্তাভাবনা  অন্তরের গতিবিধি থেকে মুক্ত এবং কেবল বাহ্যিক অঙ্গ প্রত্যঙ্গেরদ্বারা নামায, রোযাহজ্জ ইত্যাদি করে নেয়এরূপ ব্যক্তির জন্যে স্ত্রীপরিবার পরিজনের জন্যেহালাল উপার্জন এবং তাদের লালন পালন দৈহিক এবাদতের চেয়ে উত্তম। 
কেননাদৈহিক এবাদতের ফায়দা অপরে পায় না। আর যে ব্যক্তি মূল মজ্জার কি দিয়ে সংশোধিত  মচরিত্রের অধিকারী

অথবা পূর্ব সাধনার কারণে যার অভ্যাস মার্জিততার জন্যে এই উপকারিতার উদ্দেশ‍্যে বিবাহকরা জরুরী নয়। কেননাপ্রয়োজনীয় সাধনা ও কঠোর পরিশ্রম তার অর্জিতই রয়েছে। 


পরবর্তী পর্ব —
বিবাহের কারণে সৃষ্ট বিপদাপদ 





কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...