মঙ্গলবার, ১৭ জুন, ২০২৫

বিবাহ (১১) বিবাহের কারণে সৃষ্ট বিপদাপদ



বিবাহ (পর্ব – ১১)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

বিবাহের কারণে সৃষ্ট বিপদাপদ —

প্রথম বিপদ হালাল রুজি-রোজগারে অক্ষম হওয়া। এটা সর্বাধিক মারাত্মক বিপদ। কেননা, প্রত্যেকেই হালাল রুজি-রোজগার করতে পারে না, বিশেষতঃ বর্তমান যুগে যখন জীবন যাপন পদ্ধতি ক্রমশই অধঃপতিত হচ্ছে, তখন মানুষ বিবাহ করলে বিবাহের কারণে অর্থের অন্বেষণও বেশী হবে। সে হারাম দ্বারা পরিবার-পরিজনকে খাওয়াতে বাধ্য হবে। ফলে নিজেও ধ্বংস হবে এবং অন্যকেও ধ্বংস করবে। পক্ষান্তরে যে অবিবাহিত, সে এই বিপদ থেকে মুক্ত। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এরূপ হয় যে, পরিবার-পরিজন বিশিষ্ট ব্যক্তি মন্দ জায়গায় ঢুকে পড়ে এবং স্ত্রীর মনোবাঞ্ছা পূরণের পেছনে পড়ে ইহকালের বিনিময়ে স্বীয় পরকাল বিক্রি করে দেয়। 

এক হাদীসে আছে বান্দাকে দাঁড়িপাল্লার নিকটে দাঁড় করা হবে। তার কাছে পাহাড়সম পুণ্য থাকবে। তখন তাকে পরিবার পরিজনের দেখাশুনা ও খেদমত সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে এবং অর্থ সম্পদের অবস্থা জিজ্ঞেস করা হবে, কি উপায়ে উপার্জন করেছে এবং কিসে ব্যয় করেছে, অবশেষে এসব দাবী পূরণ তার সমস্ত পুণ্য নিঃশেষ হয়ে যাবে। তার কাছে কোন পুণ্যই থাকবে না। তখন ফেরেশতারা সজোরে বলবে- এই ব্যক্তির পরিবার-পরিজন দুনিয়াতে তার সমস্ত নেকী খেয়ে ফেলেছে। আজ সে তার আমলের বিনিময়ে বন্ধক হয়ে গেছে।

কথিত আছে, কেয়ামতে সর্বপ্রথম মানুষকে যারা জড়িয়ে ধরবে. তারা হবে তার পরিবার-পরিজন। তারা তাকে আল্লাহ্ তাআলার সামনে দাঁড় করিয়ে বলবে? ইলাহী, তার কাছ থেকে আপনি আমাদের প্রতিদান নিন। আমরা যা জানতাম না, সে আমাদেরকে তা বলেনি এবং আমাদের অজ্ঞাতে আমাদেরকে হারাম খাইয়েছে। এর পর তার কাছ থেকে প্রতিশোধ নেয়া হবে। 

জনৈক বুযুর্গ বলেন: আল্লাহ তাআলা যখন কোন বান্দা দ্বারা পাপ কাজ করাতে চান, তখন দুনিয়াতে তার উপর দংশনকারী আযাব চাপিয়ে দেন, যে তাকে দংশন করতে থাকে। 

রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: কোন ব্যক্তি পরিবার পরিজন মূর্খ হওয়ার চেয়ে বড় কোন গোনাহ্ নিয়ে আল্লাহ তাআলার কাছে যাবে না। মোট কথা, এ বিপদটি এমন ছড়িয়ে পড়েছে যে, এ থেকে কম লোকই মুক্ত হবে। হাঁ, যার কাছে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত অথবা হালাল উপায়ে উপর্জিত যথেষ্ট পরিমাণ ধন-সম্পদ রয়েছে এবং সে অল্পে তুষ্ট ও অধিক ধন-সম্পদ অন্বেষণ থেকে বিরত, সে এই বিপদ থেকে বেঁচে থাকতে পারে। 

ইবনে সালেম (রহ.)-কে কেউ বিবাহ করার ব্যাপারে প্রশ্ন করলে তিনি জওয়াব দিলেন: আমাদের এ যুগে বিবাহ করা তার জন্যেই উত্তম, যার কামস্পৃহা গাধার মত প্রবল। গাধা মাদীকে দেখলে শত পিটুনি খেয়েও তার কাছ থেকে সরে না। পক্ষান্তরে যার নফস তার আয়ত্তে থাকে, তার জন্যে বিবাহ না করা উত্তম।


বিবাহের দ্বিতীয় বিপদ হচ্ছে পরিবার-পরিজনের হক আদায় করতে, তাদের আচার অভ্যাসে সবর করতে এবং তাদের পীড়নে সহনশীল হতে অক্ষমতা। এ বিপদটি প্রথম বিপদের তুলনায় কম। কেননা, এতে সক্ষম হওয়া প্রথমটিতে সক্ষম হওয়ার তুলনায় সহজ। নারীদের সাথে সম্প্রীতি বজায় রাখা, তাদের হক আদায় করা, হালাল রুজি অন্বেষণের মত কঠিন নয়, কিন্তু এতে অবশ্য বিপদাশংকা আছে। কেননা, স্ত্রী, পুত্র-পরিজন প্রজাতুল্য। প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার প্রজাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।   

রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন - "মানুষ যাদের ভরণ পোষণ করে তাদের হক নষ্ট করা গোনাহগার হওয়ার জন্যে যথেষ্ট"। 

বর্ণিত আছে, যেব্যক্তির পরিবার-পরিজনের কাছ থেকে পলায়ন করে, সে সেই পলাতক গোলামের মত, যে তার প্রভুর কাছ থেকে পলায়ন করে। পরিবার পরিজনের মধ্যে ফিরে না আসা পর্যন্ত তার নামায রোযা কিছুই কবুল হয় না। 

আর যে ব্যক্তি তার পরিবার পরিজনের হক আদায় করতে অক্ষম, সে তাদের মধ্যে বিদ্যমান থাকলেও পলাতক গোলামেরই মত। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন – "তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নাম থেকে বাঁচাও"। এতে নিজেকে এবং পরিবার পরিজনকে জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে বলা হয়েছে। মানুষ কখনও নিজের হকও আীদায় করতে পারে না। এমতাবস্থায় বিবাহ করলে তার উপর দ্বিগুণ হক ওয়াজিব হয়ে যাবে। নিজের সাথে অন্যও শামিল হবে। এ কারণেই জনৈক বুযুর্গ বিবাহ করতে আপত্তি করেন এবং বলেন: আমি নিজেকে নিয়েই ব্যতিব্যস্ত। এর উপর অন্যকে কিরূপে সংযুক্ত করি। অনুরূপভাবে হযরত ইব্ররাহীম আদহাম বিবাহ করতে অস্বীকৃত হন এবং বলেন: আমি নিজের কারণে কোন মহিলাকে বিপদে ফেলতে চাই না। অর্থাৎ, তার হক আদায় করতে এবং তার উপকার করতে আমি অক্ষম। বিশরে হাফীও এমনি ওযর পেশ করে বলেছিলেন: আল্লাহ্ তাআলার এই উক্তি আমার বিবাহের পথে বাধা- "নারীদেরও তেমনি হক রয়েছে, যেমন তাদের কাছে অন্যের হক রয়েছে"।

সারকথা, এটাও একটা ব্যাপক বিপদ, যদিও প্রথম বিপদের তুলনায় এর ব্যাপকতা কম। এ বিপদ থেকে এমন ব্যক্তিই নিরাপদ থাকবে যে বিচক্ষণ, বুদ্ধিমান, নারী চরিত্র সম্পর্কে অভিজ্ঞ, তাদের কটু কথায় ধৈর্যশীল এবং তাদের হক আদায় করতে আগ্রহী, কিন্তু এখন তো অধিকাংশ লোক বির্বোধ, কটুভাষী, কঠোর স্বভাব এবং বেইনসাফ, যদিও নিজের জন্যে খুব ইনসাফ প্রত্যাশী। এরূপ লোকদের জন্যে অবিবাহিত থাকাই অধিক নিরাপদ।


বিবাহের তৃতীয় বিপদ, স্ত্রী-পুত্র পরিজন মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিরত রাখে এবং দুনিয়াদারীর দিকে ঝুঁকিয়ে দেয়। এ বিপদটি প্রথমোক্ত দু'বিপদের তুলনায় কম ব্যাপক। এ বিপদে মানুষের অবস্থা এই দাঁড়ায় যে, সে পরিবার পরিজনের জীবিকা নির্বাহের জন্যে অগাধ সাজ-সরঞ্জাম সঞ্চয় করতে ও তা রেখে যেতে সচেষ্ট হয়। বলাবাহুল্য, যেসব বিষয় আল্লাহর স্মরণে বাধা সৃষ্টি করে তা পরিবার পরিজন হোক। অথবা অর্থ-সম্পদ হোক, সমস্তই অমঙ্গলজনক হয়ে থাকে। 

আমাদের উদ্দেশ্য এই নয় যে, এসব বিষয় তাকে কোন নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত করে দেবে। কেননা, এটা তো প্রথম ও দ্বিতীয় বিপদে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে; বরং উদ্দেশ্য, স্ত্রী পুত্র পরিজনের কারণে মানুষ বৈধ বস্তু দ্বারা বিলাসব্যসন, হাসি-তামাশা ও উপভোগে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। বিবাহের কারণে এ ধরনের ব্যস্ততা বহুলাংশে বেড়ে যায়। মন এগুলোতে ডুবে যায় সকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা এবং সন্ধ্য গড়িয়ে রাত হয়ে গেলেও মানুষ আখেরাতের চিন্তা ও প্রস্তুতি গ্রহণের ফুরসত পায় না। এরূপ ক্ষেত্রেই হযরত ইব্রাহীম আদহাম বলেন: যে ব্যক্তি নারীর হাঁটুর সাথে হাঁটু মিলিয়ে বসে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তার দ্বারা কিছুই হতে পারে না। আবু সোলায়মান দারানী বলেন: যে ব্যক্তি বিবাহ করে, সে দুনিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ে। অর্থাৎ, বিবাহ দুনিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ার কারণ হয়।

এ পর্যন্ত বিবাহের উপকারিতা ও অপকারিতা পূর্ণরূপে বর্ণিত হল! এখন কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্যে বিবাহ করা উত্তম, না অবিবাহিত থাকা উত্তম, তা সর্বাবস্থায় বলা যায় না। কেননা, এসব বিষয় থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়া যায় না। বরং নির্দিষ্ট ব্যক্তির কর্তব্য হবে এসব উপকারিতা অপকারিতাকে কষ্টিপাথর মনে করে তাতে নিজের অবস্থা পরখ করা। যদি নিজের মধ্যে অপকারিতা না পায় এবং উপকারিতা বিদ্যমান থাকে, তবে জেনে নেবে, বিবাহ করাই তার জন্যে উত্তম। উদাহরণতঃ যদি তার কাছে হালাল অর্থসম্পদ বিদ্যমান থাকে, সে সচ্চরিত্রবান হয়, এমন পাকা দ্বীনদার হয় যে, বিবাহের কারণে আল্লাহর স্মরণে পার্থক্য হবে না এবং সর্বোপরি যৌবনের কারণে কামস্পৃহা দমিত করার প্রয়োজন থাকে, তবে তার জন্যে বিবাহ করা নিশ্চিতরূপেই উত্তম। আর যদি এসব উপকারিতা অনুপস্থিত থাকে এবং অপকারিতা বিদ্যমান থাকে, তবে নিঃসন্দেহে অবিবাহিত থাকা, তার জন্যে শ্রেয়। পক্ষান্তরে যদি উপকারিতা ও অপকারিতা উভয়টি বিদ্যমান থাকে, যেমন- আমাদের যুগে এটাই প্রবল, তবে ন্যায়ের মানদণ্ডে পরিমাপ করতে হবে যে, উপকারিতা দ্বারা তার দ্বীনদারী কি পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে এবং অপকারিতা দ্বারা ক্ষতি কতটুকু হবে, যদি প্রবল ধারণা একদিকে হয়ে যায়, তবে সেই অনুযায়ী মীমাংসায় উপনীত হবে। উদাহরণতঃ দুটি উপকারিতা অধিক প্রকাশমান- সন্তান হওয়া এবং কামস্পৃহা দমিত হওয়া। তদনুরূপ বিপদও দুটি অধিক দেখা যায়, একটি হারাম উপার্জনের প্রয়োজন পড়ে  পড়েগএবং অপরটি আল্লাহর স্মরণ থেকে বিরত হওয়া। এখন আমরা চারটিকেই একটি অপরটির বিপরীতে ধরে নিয়ে বলি, যদি কোন ব্যক্তি কামস্পৃহার কষ্টে না থাকে এবং বিবাহের উপকারিতা কেবল সন্তান হওয়াই হয়, তবে উল্লিখিত দুটি অপকারিতা বিদ্যমান থাকলে তার জন্যে অবিবাহিত থাকাই উত্তম। কেননা, যে বিষয়ে আল্লাহর স্মরণে বাধা হয়, তার মধ্যে কোন কল্যাণ নেই এবং হারাম উপার্জনেও কল্যাণ নেই। এ দুটি অপকারিতার কারণে যে ক্ষতি হবে, তা কেবল সন্তানের জন্যে চেষ্টা করার উপকারিতা দ্বারা পূরণ হবে না কেননা, সন্তানের জন্যে বিবাহ করলে সন্তানের জীবন যাপনের ব্যাপারেও চেষ্টা করা হয়, কিন্তু এই জীবন একটি অনিশ্চিত বিষয়। অথচ দ্বীনদারীতে অপকারিতার ক্ষতি নিশ্চিত। দ্বীনদারীকে নির্বিঘ্ন রাখার মধ্যেই কল্যাণ। কেননা, দ্বীনদারী হচ্ছে পুঁজি। এটা নষ্ট হয়ে গেলে আখেরাতের জীবন বরবাদ হয়ে যায়। 

বলাবাহুল্য সন্তানের কল্যাণ উপরোক্ত দুটি বিপদের একটিরও বিপরীত হতে পারে না। তবে যদি সন্তানের সাথে কামস্পৃহা দমিত করার প্রয়োজনও অধিকতর প্রবল হয় তবে দেখতে হবে, বিবাহ না করলে যদি যিনায় লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে তার জন্যে বিবাহ করা উত্তম। কেননা, যে দুতরফা বিপদে ফেঁসে গেছে- বিবাহ না করলে যিনায় লিপ্ত হবে এবং করলে হারাম উপার্জন করবে। উভয়েরর মধ্যে হারাম উপার্জন যিনার তুলনায় কম মারাত্মক। যদি বিশ্বাস রাখে যে, সে বিবাহ না করলে যিনায় লিপ্ত হবে না, কিন্তু দৃষ্টি নত রাখতে সক্ষম হবে না, তবে বিবাহ না করা ভাল। কেননা পর নারীর প্রতি দৃষ্টিপাত করা এবং হারাম উপার্জন করা উভয়টি হারাম হলেও উভয়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তা এই যে, হারাম উপার্জন সব সময় হয় এবং এর কারণে সে নিজে এবং পরিবারের সকলেই গোনাহগার হয়, কিন্তু কৃদৃষ্টি কদাচিত হয় এবং এ কারণে বিশেষভাবে সে নিজেই গোনাহগার হয়, অন্য কেউ তাতে শরীক হয় না। এছাড়া এটা দ্রুত শেষও হয়ে যায়। কুদৃষ্টি যদিও চোখের যিনা, কিন্তু হারাম খাওয়ার তুলানায় এটা দ্রুত মাফ হতে পারে। তবে যদি কুদৃষ্টির কারণে যিনায় লিপ্ত হবার ভয় থাকে, তবে তার অবস্থাও যিনায় লিপ্ত হবার ভয়ের মতই। মোট কথা, উপরোক্ত বিপদসমূহকে উপকারিতার সাথে তুলনা করে তদনুযায়ী সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া উচিত। যেব্যক্তি এসব রহস্য সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হবে, তার জন্যে পূর্ববর্তী বুযুর্গগণের বর্ণিত বিভিন্নমুখী অবস্থা হৃদয়ঙ্গম করা কঠিন হবে না। কেননা, বিবাহের প্রতি উৎসাহ এবং অনীহা অবস্থাভেদে উভয়টিই সঠিক। এখন যদি প্রশ্ন করা হয় যে, বিপদাপদ মুক্ত ব্যক্তির জন্যে এবাদতের উদ্দেশে অবিবাহিত থাকা উত্তম, না বিবাহ করা উত্তম, তবে এর জওয়াবে আমরা বলি, তার জন্যে উভয়টিই উত্তম। কেননা বিবাহ স্বতন্ত্র দৃষ্টিতে এবাদতের পরিপন্থী নয়, বরং এ দৃষ্টিতে পরিপন্থী যে, এতে অর্থ উপার্জনের প্রয়োজন দেখা দেয়। সুতরাং হালাল পথে অর্থ উপার্জনে সক্ষম হলে বিবাহও উত্তম। কারণ, দিবারাত্র চব্বিশ ঘণ্টা এবাদত করা এবং এক মুহূর্তও আরাম না করা সম্ভবপর নয়। যদি ধরে নেয়া যায় যে, এক ব্যক্তি সর্বক্ষণ অর্থোপার্জনে ব্যয়িত হয় এবং পাঞ্জেগানা ফরয নামায, পানাহার ও প্রস্রাব পায়খানার সময় ছাড়া নফল এবাদতের জন্যে কোন সময় থাকে না, তবে তার জন্যেও বিবাহ করা ভাল। কেননা, হালাল অর্থোপার্জন, স্ত্রী পুত্র পরিজনের খেদমত, সন্তান লাভের প্রয়াস এবং নারী স্বভাবে সবর করার মধ্যেও নানা প্রকার এবাদত নিহিত রয়েছে, যার সওয়াব নফল এবাদতের চেয়ে কম নয়। পক্ষান্তরে যদি সে এমন লোকদের অন্তর্ভুক্ত হয়, যারা জ্ঞান, চিন্তাভাবনা ও অন্তরের ভ্রমের মাধ্যমে এবাদত করে এবং বিবাহ করলে এবাদতে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ার আশংকা থাকে, তাহলে তার জন্যে বিবাহ না করা উত্তম।

যদি কেউ প্রশ্ন করে যে, বিবাহ করা উত্তম হলে হযরত ঈসা (আ.) বিবাহ করলেন না কেন এবং আল্লাহর এবাদত উত্তম হলে হযরত রসূলে মকবুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এত অধিক বিবাহ করলেন কেন, তবে এর জওয়াব এই যে, যেব্যক্তি সক্ষম, উচ্চ সাহসী এবং অধিক শক্তির অধিকারী, তার জন্যে উভয় বিষয়ই উত্তম। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) চূড়ান্ত পর্যায়ের শক্তি ও সাহসের অধিকারী ছিলেন তাই তিনি উভয় মাহাত্ম অর্জন করেছেন, অর্থাৎ, নয় পত্নীর স্বামী হওয়া সত্ত্বেও তিনি আল্লাহর এবাদতে মশগুল ছিলেন এবং  বিবাহ তাঁর জন্যে এবাদতে প্রতিবন্ধক হয়নি। যেমন জগতের বড় বড় দার্শনিকদের জন্যে প্রস্রাব-পায়খানার কাজ পার্থিব চিন্তাভাবনায় বাধা সৃষ্টি করে না, তারা বাহ্যতঃ প্রস্রাব পায়খানার কাজে মশগুল থাকেন এবং তাঁদের অন্তর আপন অভীষ্ট কর্মে নিমজ্জিত থাকে তেমনি রসূলে পাক (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তিনিও আপন উচ্চ মর্যাদার কারণে দুনিয়ার কাজকর্ম করার সাথে সাথে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত থাকতেন এবং এতে কোন বাধা অনুভব করতেন না। এ কারণেই এমন সময়েও তাঁর প্রতি ওহী নাযিল হত, যখন তিনি নিজের পত্নীর সাথে শয্যায় থাকতেন। অন্য কোন ব্যক্তির জন্যে এই মর্যাদা ধরে নেয়া সম্ভব, কিন্তু সাথে সাথে একথাও বুঝতে হবে যে, নর্দমা সামান্য খড়কুটা দ্বারা বন্ধ হয়ে যেতে পারে, কিন্তু সমুদ্রে এ কারণে কোন পরিবর্তন আসতে পারে না। তাই রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর অনুরূপ অন্যকে মনে করা অনুচিত। হযরত ঈসা (আ.)-এর বিবাহ না করার কারণ, তিনি নিজের ক্ষমতার প্রতি লক্ষ্য করে সাবধানতা অবলম্বন করেছেন। অথবা সম্ভবতঃ তাঁর অবস্থা এমন ছিল যে, তাতে পারিবারিক ব্যস্ততা ক্ষতিকর হত অথবা তাতে বিবাহ ও এবাদত উভয়টি একত্রে সম্পাদন করা সম্ভবপর ছিল না। তাই তিনি এবাদতের পথই বেছে নিয়েছেন।


পরবর্তী পর্ব 

বিবাহ বন্ধনের শর্ত 



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...