মঙ্গলবার, ১১ জুলাই, ২০২৩

অন্তর বা হৃদয় (১৭) শয়তানকে দূরে রাখার উপায়



অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ১৭) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

শয়তানকে দূরে রাখার উপায় 
এর পূর্বে পর্যন্ত অন্তরের দিকে শয়তানের প্রবেশপথ সম্পর্কে কিঞ্চিৎ বর্ণনা দেয়া হল। তার সবগুলো পথ লিপিবদ্ধ করা আমাদের সাধ্যের বাইরে। তবে জানা উচিত, মানুষের যত মন্দ স্বভাব রয়েছে, সবগুলো শয়তানের হাতিয়ার এবং প্রবেশপথ। এখন প্রশ্ন হয়, শয়তানকে দূরে রাখার উপায় কি এবং তাকে দূরে রাখার জন্যে মুখে “লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ” বলে দেয়া যথেষ্ট কি না? জওয়াব, শয়তানের সকল পথ বন্ধ করে দেয়াই অন্তরকে তার কুপ্রভাব থেকে বাঁচিয়ে রাখার উপায়। অর্থাৎ, অন্তরকে যাবতীয় মন্দ স্বভাব থেকে মুক্ত করতে হবে। এর বর্ণনা অত্যন্ত দীর্ঘ। এখণ্ডে কেবল মারাত্মক স্বভাবগুলো বর্ণনা করাই আমাদের লক্ষ্য। প্রত্যেকটি স্বভাবের জন্যে একটি আলাদা অধ্যায় জরুরী ভবিষ্যতে এর বিশদ বর্ণনা হবে।যেমন এখানে এতটুকু বলা জরুরী যে, যখন অন্তর এসব স্বভাব থেকে মুক্ত হয়ে যায়, তখন শয়তান তাতে কেবল আনাগোনাই করতে থাকে- স্থায়ীভাবে আসন গাড়ে না। আল্লাহর যিকির এই আনাগোনার পথে বাধা হয়ে যায়। কেননা, অন্তর কুস্বভাব থেকে মুক্ত হলেই যিকির তাতে স্থায়িত্ব লাভ করে, নতুবা যিকিরও কেবল আনাগোনার পর্যায়ে থেকে যায়। অন্তরের উপর তার কোন ক্ষমতা থাকে না এবং শয়তানকেও দূর করতে পারে না। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা নিম্নোক্ত আয়াতে শয়তান দূর করার বিষয়টিকে মুত্তাকীদের সাথে সম্পৃক্ত করে উল্লেখ করেছেন :

“নিশ্চয় যারা মুত্তাকী, তাদেরকে শয়তান স্পর্শ করলে তারা হুঁশিয়ার হয়ে যায়, অতঃপর তৎক্ষণাৎ চক্ষুষ্মান হয়ে যায়।”

মোট কথা, শয়তানকে ক্ষুধার্ত কুকুরের অনুরূপ মনে করতে হবে। কারও কাছে ভাত, মাংস ইত্যাদি না থাকলে কেবল 'ধ্যাৎ' বললেই সরে যাবে; কিন্তু সামনে খাদ্যসামগ্রী থাকলে ক্ষুধার্ত কুকুর অবশ্যই খাদ্যের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইবে। তখন কেবল 'ধ্যাৎ' বলে কুকুরকে সরানো যাবে না। এমনিভাবে যে অন্তরে শয়তানের খাদ্য নেই, তার কাছ থেকে শয়তান শুধু যিকির দ্বারা সরে যাবে; কিন্তু কামপ্রবৃত্তি প্রবল হলে অন্তর শয়তানের করায়ত্ত হয়ে যাবে এবং আল্লাহর যিকিরকে দূরে সরিয়ে রাখবে । মুত্তাকীদের অন্তর কুপ্রবৃত্তি ও মন্দ স্বভাব থেকে মুক্ত থাকে বিধায় তাতে শয়তানের আগমন কুপ্রবৃত্তির কারণে নয়; বরং গাফলতির কারণে হয়ে থাকে। যখন তাদের অন্তর যিকির থেকে গাফেল থাকে, তখন নিজের পথ বের করে নেয়। পুনরায় আবার যিকির শুরু করলে শয়তান হটে যায়। এর প্রমাণ, আল্লাহ তাআলা শয়তান দূর করার জন্যে বলেছেনঃ

“অতঃপর আশ্রয় প্রার্থনা কর আল্লাহর কাছে বিতাড়িত শয়তান থেকে।” এমনিভাবে যিকির সম্পর্কিত আরও অনেক আয়াত এবং হাদীস থেকে একথা প্রতীয়মান হয়। 

হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে- একবার মুমিনের শয়তান ও কাফেরের শয়তান এক জায়গায় মিলিত হল। কাফেরের শয়তান অত্যন্ত স্বাস্থ্যবান মসৃণ ও সুন্দর পোশাক পরিহিত ছিল। অপরপক্ষে মুমিনের শয়তান বিবস্ত্র, শীর্ণ ও ধূলি ধূসরিত ছিল। কাফেরের শয়তান তাকে শুধাল : তুমি এমন শীর্ণ কেন? সে বলল : আমি যার সাথে থাকি, সে পানাহার, বস্ত্র পরিধান এবং মাথায় তেল মালিশ করার সময় 'বিসমিল্লাহ' বলে। ফলে আমি খানাপানি, বস্ত্র ও তেল পাই না। তাই ক্ষুধার্ত, উলঙ্গ ও এলোকেশী হয়ে থাকি। একথা শুনে কাফেরের শয়তান বলল : ভাই, আমি যার সাথে থাকি, সে এসব কাজে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে না। তাই আমি তার সকল কাজে শরীক থাকি। 

মুহাম্মদ ইবনে ওয়াসে প্রত্যহ ফজরের নামাযের পর এই দোয়া করতেন- “হে আল্লাহ! আপনি আমাদের উপর এক শত্রুকে ক্ষমতা দান করেছেন, যে আমাদের দোষত্রুটি সম্পর্কে ওয়াকিফহাল। সে এবং তার দলবল আমাদেরকে এমন জায়গা থেকে দেখে, যেখান থেকে আমরা তাদেরকে দেখি না। হে আল্লাহ! অতএব আপনি তাকে আশা থেকে নিরাশ করুন, যেমন তাকে আপনার রহমত থেকে নিরাশ করেছেন। তাকে আমাদের থেকে হতাশ করুন, যেমন আপনার ক্ষমা থেকে হতাশ করেছেন। তার মধ্যে ও আমাদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করুন, যেমন তার মধ্যে ও আপনার রহমতের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করেছেন।” তিনি বলেন: একদিন মসজিদের পথে শয়তানের সাথে আমার সাক্ষাৎ হল। সে জিজ্ঞেস করল: আমাকে চেনেন? আমি বললামঃ তুমি কে? সে বলল, আমি ইবলীস। আমি শুধালাম : কি উদ্দেশে এসেছ? সে বলল : আমি চাই আপনি এই দোয়া কাউকে না শেখান। আমি আপনার পথে কণ্টক হব না। আমি বললাম : আমি কাউকে নিষেধ করব না। যে কেউ পড়তে পারে। তোমার মনে যা চায় তাই কর। 

হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবী লায়লা বলেন : এক শয়তান রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে এয়া আলিহী  ওয়া সাল্লাম)-এর সামনে নামাযের অবস্থায় আগুনের মশাল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। কেরাআত ও এস্তেগফারের পরও সে সরে যেত না। এরপর হযরত জিবরাঈল (আঃ) রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে এয়া আলিহী  ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে এসে আরজ করলেন : আপনি এই দোয়া পাঠ করুন “আমি আল্লাহ তাআলার পরিপূর্ণ কালেমাসমূহ দ্বারা আশ্রয় প্রার্থনা করি, যেগুলোর খেলাফ করে না সাধু ও অসাধুরা - সেই বস্তুর অনিষ্ট থেকে, যা পৃথিবীতে প্রবেশ করে এবং পৃথিবী থেকে নির্গত হয়, যা আকাশ থেকে অবতীর্ণ হয় এবং আকাশে উত্থিত হয়, আর দিবারাত্রির ফেতনার অনিষ্ট থেকে এবং দিবারাতে আগত দুর্ঘটনার অনিষ্ট থেকে।”রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে এয়া আলিহী  ওয়া সাল্লাম) এই দোয়া পাঠ করলে শয়তানের মশাল নিভে যায় এবং সে উপুড় হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। 

হযরত হাসান বসরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে- হযরত জিব্রাঈল (আঃ) রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে এয়া আলিহী  ওয়া সাল্লাম)-এর খেদমতে এসে আরজ করলেন, “এক শয়তান আপনার সাথে প্রতারণা করতে চায়। আপনি যখন শয্যা গ্রহণ করেন, তখন আয়াতুল কুরসী পড়ে নেবেন।”

হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে - “আমার কাছে শয়তান এসে বাদানুবাদ শুরু করলে আমি তার গলা টিপে ধরলাম। আল্লাহর কসম! আমি তাকে ততক্ষণ ছাড়িনি, যতক্ষণ না তার থুথুর শীতলতা আমার হাতে অনুভব করলাম। যদি আমার ভাই সোলায়মান (আঃ) দোয়া না করতেন, তবে সে মসজিদে ভূতলশায়ী হয়ে থাকত।”

আরও বর্ণিত আছে - “হযরত ওমর (রঃ) যে পথে চলেছেন, সেই পথে শয়তান চলেনা” এর কারণ, তাঁর অন্তর শয়তানের প্রবেশপথ ও খাদ্য থেকে পবিত্র ছিল অর্থাৎ খাহেশের কোন দখল ছিল না। সুতরাং যদি অন্য কোন ব্যক্তি যিকির দ্বারা হযরত ওমর (রাঃ)-এর ন্যায় শয়তানকে দূরে রাখতে চায়, তবে এটা অসম্ভব। উদাহরণতঃ কোন ব্যক্তি ওষুধ সেবন করে কিন্তু পরহেয করে না; অথচ পাকস্থলী দূষিত পদার্থে পরিপূর্ণ। এমতাবস্থায় ওষুধের উপকার আশা করা যায় না। এখানে যিকরকে ওষুধ এবং তাকওয়াকে পরহেয মনে করতে হবে। যে অন্তর আল্লাহ ছাড়া অন্য সবকিছু থেকে মুক্ত, যিকির দ্বারা সেই অন্তর থেকে শয়তান দূর হবে।

আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেন - “নিশ্চয় এতে চিন্তার বিষয় আছে তার জন্যে, যার অন্তর আছে।” সুতরাং যদি কেউ শয়তান থেকে মুক্তি পেতে চায়, তবে তাকে প্রথমে তাকওয়ার পরহেয অবলম্বন করতে হবে, এরপর যিকিরের ওষুধ সেবন করতে হবে। তাহলেই শয়তান তার কাছ থেকে পলায়ন করবে, যেমন হযরত ওমর (রাঃ)-এর কাছ থেকে পলায়ন করেছিল। 

ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বেহ বলেন : “আল্লাহকে ভয় কর এবং বাহ্যত শয়তানকে মন্দ বলো না, যখন অন্তরে তুমি তার বন্ধু অর্থাৎ আজ্ঞাবহ।”


অন্তর বা হৃদয় (১৬) শয়তানের প্রবেশপথ সমুহ



অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ১৬) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

শয়তানী পথসমূহের কিঞ্চিৎ বিবরণ 
জানা দরকার, মানুষের অন্তর একটি দুর্গ সদৃশ। দুশমন শয়তান এর অভ্যন্তরে প্রবেশ করে একে করতলগত করতে চায়। এখন যদি দুর্গের দ্বারসমূহের হেফাযত করা হয় এবং শয়তানের প্রবেশপথে পাহারা বসানো হয়, তবে অন্তর বিপদ মুক্ত থাকবে, কিন্তু যে ব্যক্তি এর দ্বার সম্পর্কেই অজ্ঞ, সে হেফাযত করতেও অক্ষম। অন্তরকে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে রক্ষা করা ওয়াজিব। বরং প্রত্যেক বুদ্ধিমান বালেগ বান্দার উপর ফরযে আইন। যে কাজ ফরযে আইন আদায় করার উপায় হয়, তাও ওয়াজিব। এ থেকে জানা গেল, শয়তানী পথ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা ওয়াজিব। বলাবাহুল্য, এসব পথ হচ্ছে বান্দার অন্তহীন স্বভাব ও অভ্যাস, কিন্তু আমরা এখানে কয়েকটি বড় বড় পথের পরিচয় তুলে ধরব। যেগুলোতে শয়তানী লশকরসমূহের অধিক ভিড় থাকে।

>> শয়তানের প্রথম প্রবেশপথ হচ্ছে কাম ও ক্রোধ। 
কেননা, ক্রোধের কারণে জ্ঞানবুদ্ধি রহিত হয়। জ্ঞানবুদ্ধি স্তিমিত হওয়ার সাথে সাথে শয়তানের হামলা শুরু হয়ে যায়। মানুষ যখন ক্রুদ্ধ হয়, তখন শয়তান তাকে নিয়ে এমন খেলা করে, যেমন শিশুরা বল নিয়ে খেলা করে। বর্ণিত আছে, ইবলীস হযরত মূসা (আঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করে আরজ করল : আপনাকে তো আল্লাহ তাআলা রসূল করেছেন এবং বাক্যালাপের গৌরব দান করেছেন। আমিও তাঁরই সৃজিত। আমা দ্বারা একটি পাপ হয়ে গেছে। এখন আমি তওবা করতে চাই। তওবা কবুল হওয়ার জন্যে আপনি আল্লাহর কাছে আমার পক্ষ থেকে সুপারিশ করুন। হযরত মূসা (আঃ) তার প্রার্থনা কবুল করলেন। তিনি যখন তূর পর্বতে গমন করে আল্লাহর সাথে কথা বলার পর প্রস্থানোদ্যত হলেন, তখন রাব্বুল ইযযত এরশাদ করলেন : হে মূসা! অঙ্গীকার পূর্ণ কর। মূসা (আঃ) আরজ করলেন : হে আল্লাহ! তোমার বান্দা ইবলীস চায়, তার তওবা কবুল হোক। এরশাদ হল : ইবলীস আদমের কবর সেজদা করলে তার তওবা কবুল হবে। হযরত মূসা (আঃ) ফিরে এসে ইবলীসকে বললেনঃ তোমার সাথে কৃত অঙ্গীকার আমি পূর্ণ করেছি। আদেশ হয়েছে, আদমের কবর সেজদা করলে তোমার তওবা কবুল হবে। অভিশপ্ত শয়তান একথা শুনে ক্রুদ্ধ হল এবং অহংকার সহকারে বলতে লাগল : আমি জীবদ্দশায় যাকে সেজদা করিনি, মৃত্যুর পর কেন তার কবর সেজদা করতে যাব? কিন্তু আপনি আল্লাহর কাছে আমার জন্যে সুপারিশ করেছেন, তাই আমার কাছে আপনার হক আছে। আমি একটি বিষয় বলে দিচ্ছি। তিনটি ক্ষেত্রে আপনি আমাকে স্মরণ করবেন। এতে আমি আপনার কোন ক্ষতি করতে পারব না। 
এক : ক্রোধের অবস্থায়; কেননা, আমার আত্মা আপনার অন্তরে এবং আমার চোখ আপনার চোখে রয়েছে। দেহের যে যে অংশে রক্ত চলাচল করে, আমি সেখানে চলাচল করি। কাজেই ক্রোধের অবস্থায় আমাকে অবশ্যই স্মরণ করবেন। মানুষ যখন ক্রুদ্ধ হয়, তখন আমি তার নাকে ফুঁ দিয়ে দেই। এর পর আমি কি করি, না করি, সে কিছুই টের পায় না। 
দুই : যুদ্ধের সারিতে আমাকে স্মরণ করবেন। কেননা, যুদ্ধের সারিতে আমি যোদ্ধাকে তার বাড়ী-ঘর, স্ত্রী ও সন্তানদের কথা স্মরণ করিয়ে দেই; যাতে সে পলায়ন করে। 
তিন : আরও স্মরণ রাখবেন, বেগানা নারীর কাছে তার মাহরামের অনুপস্থিতিতে কখনও বসবেন না। কারণ, তখন আমি আপনার ও তার মধ্যে পয়গামবাহক হয়ে যাই. যাতে উভয়ে অপকর্মে লিপ্ত হয়। 
মোট কথা, ইবলীস এতে কামপ্রবৃত্তি, ক্রোধ ও লোভের প্রতি ইঙ্গিত করেছে। কেননা, আদম (আঃ)-কে মৃত্যুর পর সেজদা না করার কারণ ছিল প্রতিহিংসা এবং যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করার কারণ হয় দুনিয়ার লোভ। এগুলো হচ্ছে শয়তানের বড় বড় প্রবেশপথ।
অনুরূপভাবে জনৈক ওলী থেকে বর্ণিত আছে, তিনি ইবলীসকে জিজ্ঞেস করলেন : মানুষের মনের উপর তুমি কখন প্রবল হও? ইবলীস জওয়াব দিল : ক্রোধ ও খাহেশের সময় আমি তাকে চেপে ধরি। 
কথিত আছে, শয়তান বলে- মানুষ আমার উপর কোনরূপেই প্রবল হতে পারে না। কেননা, সে যখন হাস্যরত ও আনন্দিত থাকে, তখন আমি তার অন্তরে থাকি আর যখন ক্রুদ্ধ হয়, তখন উড়ে তার মাথায় পৌঁছে যাই।

>> শয়তানের দ্বিতীয় বড় প্রবেশপথ হচ্ছে হিংসা ও মোহ। 
এই মোহ মানুষকে অন্ধ ও বধির করে দেয়। হাদীসে আছে : “বস্তুর মহব্বত ও মোহ তোমাকে অন্ধ এবং বধির করে দেয়।” 
হিংসা ও মোহের কারণে যখন জ্ঞানের আলো বিদূরিত হয়ে যায়, তখন মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ে। তখনই শয়তান সুযোগ পায় এবং মোহের বস্তুকে তার দৃষ্টিতে সুন্দর ও সুশ্রী করে দেখায়, যদিও তা বাস্তবে কুশ্রী হয়। হযরত নূহ (আঃ) যখন নৌকায় সওয়ার হন, তখন আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী প্রত্যেক বস্তুর একটি করে জোড়া তাতে তুলে নেন। নৌকার মধ্যে তিনি জনৈক অপরিচিত বৃদ্ধকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন : তুমি নৌকায় সওয়ার হলে কেন? সে আরজ করল : আপনার সঙ্গীদের অন্তর নিতে এসেছি। তাদের দেহ আপনার সাথে থাকবে আর অন্তর আমার সাথে। হযরত নূহ (আঃ) বললেন : তুমি তো আল্লাহর দুশমন বিতাড়িত শয়তান। বের হয়ে যাও এখান থেকে। সে আরজ করল: পাঁচটি বিষয় দ্বারা আমি মানুষের সর্বনাশ করব। তন্মধ্যে তিনটি আপনাকে বলে দেব দু'টি বলব না । ইতিমধ্যে ওহী এল, যে তিনটি বিষয় সে আপনাকে বলতে চায়, সেগুলোর কোন প্রয়োজন নেই। সে দুটি বিষয় জিজ্ঞেস করুন, যেগুলো সে গোপন করতে চায়। তিনি দুটি বিষয় জিজ্ঞেস করলে শয়তান বলল : দু'টি বিষয় হচ্ছে হিংসা ও লোভ। এ দুটি বিষয় কখনও আমারে ধোকা দেয় না এবং মানুষকে ধ্বংস করার কাজে ভুল করে না। হিংসা তো এমন বিষয়, যদ্দ্বারা আমি অভিশপ্ত ও বিতাড়িত শয়তান হয়েছি। আর লোভ এমন জিনিস যে, আদমের জন্যে একটি বৃক্ষ ছাড়া গোটা জান্নাত বৈধ হয়েছিল; কিন্তু আমি লোভের সাহায্যেই কার্য সিদ্ধ করেছি এবং আদমকে জান্নাত থেকে বহিষ্কার করেছি।

>> উদরপূর্তি শয়তান প্রবেশের তৃতীয় পথ—
শয়তানের প্রধান প্রধান প্রবেশপথসমূহের মধ্যে একটি হচ্ছে উদরপূর্তি করে আহার করা- যদিও তা হালাল এবং পবিত্র আহার্য বস্তু দ্বারা হয়। কেননা, উদরপূর্তির কারণে কামভাব সতেজ হয়। কামভাব শয়তানের হাতিয়ার। 
বর্ণিত আছে, ইবলীস অনেকগুলো ফাঁদ হাতে নিয়ে ইয়াহইয়া (আঃ)-এর সামনে উপস্থিত হল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন : এই ফাঁদ কেন? সে আরজ করল : এগুলো হচ্ছে কামপ্রবৃত্তি, যদ্দ্বারা আমি মানুষকে কাবু করি। 
হযরত ইয়াহইয়া শুধালেন : এতে আমার জন্যেও কোন ফাঁদ আছে কি? ইবলীস জওয়াব দিল : হাঁ, আপনি যখন উদরপূর্তি করে আহার করেন, তখন আমি আপনার জন্যে নামায ও যিকির ভারী করে দেই। তিনি আবার শুধালেন : এ ছাড়া আরও কিছু আছে কি? ইবলীস বলল : না। তিনি বললেন : আমিও শপথ করে বলছি, কখনও উদরপূর্তি করে আহার করব না। শয়তান বলল, : আমিও শপথ করছি, মুসলমানের সাথে কখনও শুভেচ্ছার কথা বলব না।
 কথিত আছে, পেট ভরে আহার করার কুফল ছয়টি। 

>প্রথম, এতে অন্তর থেকে আল্লাহর ভয় দূর হয়ে যায়। 
>দ্বিতীয়, এতে মানুষের প্রতি দয়া ও অনুকম্পা থাকে না। কেননা, সে সকলকে ভরা পেট মনে করে। 
>তৃতীয়, আল্লাহ তাআলার এবাদত কঠিন হয়ে যায়। 
>চতুর্থ, জ্ঞানের কথাবার্তা শুনে অন্তর নরম হয় না। 
>পঞ্চম, অপরকে উপদেশ দিলে তাতে কারও অন্তর প্রভাবিত হয় না। 

>ষষ্ঠ, উদর রোগব্যাধির আবাসস্থল হয়ে যায়।
>>শয়তানের আর একটি বড় পথ হচ্ছে সুন্দর জাঁকজমকপূর্ণ আসবাবপত্র, পোশাক-পরিচ্ছদ, গৃহ ইত্যাদি পছন্দ করা। 

শয়তান যখন এ বিষয়টি মানুষের মধ্যে প্রবল দেখে, তখন সে সর্বদাই প্ররোচিত করে যে, গৃহ খুব উঁচু ও প্রশস্ত তৈরী করে তার ছাদ ও প্রাচীরসমূহ সজ্জিত করা উচিত। এমনিভাবে পোশাক ও সওয়ারীও খুব জাঁকজমকপূর্ণ হওয়া দরকার। এর পর সারাজীবন এতেই নিয়োজিত রাখে। শয়তান একবার মানুষকে এতে নিয়োজিত দেখলে পুনরায় তার কাছে আসার প্রয়োজনও অনুভব করে না। কেননা, মানুষের শখ আপনা-আপনি এক জিনিস থেকে অন্য জিনিসে ছড়িয়ে পড়ে। অবশেষে এই কামনা-বাসনা নিয়েই দুনিয়া থেকে বিদায় হয়ে যায়। এতে পরকালের সর্বনাশ এবং কুফরেরও আশংকা আছে।
শয়তানের অন্যতম প্রবেশপথ হচ্ছে অপরের কাছে লোভ করা। 
কেননা, অন্তরে লোভ প্রবল হলে শয়তান শিক্ষা দেয় যে, যার কাছে লোভ করা হয়, তার সামনে খুব সাজসজ্জা ও লৌকিকতা প্রকাশ করতে হয়। ফলে তার সামনে এত রিয়া করা হয়, যেন সেই তার মাবুদ ও উপাস্য। তার দৃষ্টিতে প্রিয়পাত্র হওয়ার কৌশল উদ্ভাবনে সে সর্বদা সচেষ্ট থাকে। তার প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করে এবং সৎকাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধের স্থলে জেনেশুনে চুপ করে থাকে। 

হযরত সফওয়ান ইবনে সলীম (রহঃ) রেওয়ায়েত করেন, একবার ইবলীস আবদুল্লাহ্ ইবনে হানযালার সামনে এসে বলল : আমি তোমাকে একটি বিষয় শিখিয়ে দিচ্ছি- মনে রাখবে। তিনি বললেন : তোমার কাছে কিছু শেখার প্রয়োজন আমার নেই। সে বলল : ভাল কথা হলে মনে রাখবে, নতুবা আমার মুখের উপর ছুঁড়ে মারবে। কথা হচ্ছে, আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারও কাছে লোভের কোন বস্তু চাইবে না।
কাজেকর্মে তড়িঘড়ি করা এবং দৃঢ়তা বর্জন করাও শয়তানের একটি প্রবেশপথ। 
হাদীসে বলা হয়েছে -“তাড়াহুড়া করা শয়তানের কাজ এবং ধীরে-সুস্থে কাজ করা আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়।” 
এর কারণ হচ্ছে, কাজকর্ম ভেবেচিন্তে করা উচিত। এর জন্যে বিচার-বিবেচনা ও সময়ের প্রয়োজন। তাড়াহুড়ার মধ্যে এটা সম্ভবপর নয়। তড়িঘড়ির মধ্যে শয়তান মানুষের উপর অনিষ্ট চাপিয়ে দেয়; অথচ মানুষ টেরও পায় না। বর্ণিত আছে, যখন হযরত ঈসা (আঃ) ভূমিষ্ঠ হন, তখন শয়তান ইবলীসের কাছে এসে বলল : আজ সকল মূর্তি উপুড় হয়ে গেছে, ব্যাপার কি? ইবলীস বলল : মনে হয় নতুন কোন ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। তুমি এখানেই থাক। আমি দেখছি ব্যাপার কি? ইবলীস তখনি ভূপৃষ্ঠে উড়ে গেল; কিন্তু অনেক হন্যে হয়েও কিছু জানতে পারল না। এর পর দেখল, হযরত ঈসা (আঃ) জন্মগ্রহণ করেছেন এবং ফেরেশতারা তাঁকে ঘিরে রেখেছে। ইবলীস তার দলের মধ্যে ফিরে এসে বলল : গতরাত্রে একজন পয়গম্বর জন্মগ্রহণ করেছেন। অথচ যে কোন মহিলা গর্ভবতী হয় অথবা সন্তান প্রসব করে, আমি সেখানে উপস্থিত থাকি, কিন্তু এই শিশুর জন্ম সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। মনে হয় আজ থেকে মূর্তিপূজার আসর তেমন জমবে না। কাজেই তোমরা তড়িঘড়ির সময় মানুষকে বিভ্রান্ত কর।

>>শয়তানের আরেকটি বড় পথ হচ্ছে টাকা-পয়সা, আসবাবপত্র, বিষয় সম্পত্তি ইত্যাদি। 
এসব বস্তু যখন প্রয়োজনের অতিরিক্ত হয়, তখন এগুলোর উপর শয়তানের পাহারা বসে। কোন সচ্ছল ব্যক্তির হাতে যদি অতিরিক্ত একশ' করে টাকা এসে যায়, তবে তার মনে দশটি এমন খাহেশ মাথাচাড়া দিয়ে উঠে, যার প্রত্যেকটি পূর্ণ করার জন্যে একশ' টাকার প্রয়োজন হয়। ফলে তার কাছে যে পরিমাণ টাকা থাকে, তা দ্বারা কার্যোদ্ধার হয় না; বরং আরও নয়শ' টাকার প্রয়োজন হয়। অথচ যখন একশ' টাকাও ছিল না, তখন সে সচ্ছল ও পরাঙ্মুখ ছিল। সে কেবল মনে করে, একশ' টাকা পেয়ে ধনী হয়ে গেছে; কিন্তু এটা বুঝে না যে, একশ' টাকা পাওয়ার কারণে আরও নয়শ টাকার অভাবে পড়ে গেছে। এমনিভাবে অধিকতর বস্তুর চিন্তা করতে করতে পরিণামে সে জাহান্নামের যোগ্য হয়ে যায়।

হযরত সাবেত বানানী (রহঃ) বর্ণনা করেন, যখন রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী  ওয়া সাল্লাম) রেসালতপ্রাপ্ত হন, তখন ইবলীস তার সাঙ্গপাঙ্গকে বলল : নতুন কিছু ঘটেছে খোঁজ কর। অমনি শয়তানের দল এদিক-ওদিক ছুটে গেল। অবশেষে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসে বলল : আমরা কিছুই জানতে পারলাম না। ইবলীস বলল : তোমরা এখানে থাক, আমি খবর আনছি। এর পর সে খবর আনল, আল্লাহ তাআলা মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী  ওয়া সাল্লাম)-উনাকে পয়গম্বর করে পাটিয়েছেন। এখন তোমরা তাঁর অনুচরদের খবর নাও। শয়তানের দল নিরাশ হয়ে ফিরে এসে বলল : এমন লোক আমরা কখনও দেখিনি। যদি আমরা তাদের দ্বারা কোন গোনাহ করিয়ে নেই, তারা অমনি নামাযে দাঁড়িয়ে যায়। ফলে তাদের সকল গোনাহ্ মিটে যায়। ইবলীস বলল : অধীর হয়ো না; কিছু দিন অপেক্ষা কর। যখন তারা দেশ-বিদেশ জয় করবে এবং দুনিয়া তাদের হাতে আসবে, তখন আমাদের কার্য সিদ্ধ হবে।
বর্ণিত আছে, একদিন হযরত ঈসা (আঃ) একটি প্রস্তরখণ্ড মাথার নীচে রেখে দেন। ইবলীস তাঁর কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় বলতে লাগল : হযরত, আপনিও দেখা যায় দুনিয়ার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন। তিনি তৎক্ষণাৎ প্রস্তরখণ্ডটি দূরে নিক্ষেপ করে বললেন : এটা দুনিয়াসহ তোর জন্যই। চিন্তা করলে দেখা যায়, যার কাছে বালিশের জায়গায় পাথর থাকে, তার এতটুকু দুনিয়া তো অর্জিত হয়ে যায়, যদ্দ্বারা শয়তান আঘাত হানতে সক্ষম হয়। উদাহরণতঃ যদি কেউ তাহাজ্জুদ পড়ার জন্যে উঠে এবং তার নিকটে একটি পাথরও থাকে, তবে শয়তান অবশ্যই তার মনে একথা জাগ্রত করবে যে, এই পাথরে একটু হেলান দিয়ে নেই।

এমতাবস্থায় ঘুমের প্রতি আকর্ষণ হয়ে যাবে। কেননা, কথায় বলে, গাড়ী দেখলে পা ফুলে। যদি কাছে পাথর না থাকত, তবে মনে এই কল্পনা জাগত না এবং ঘুমের প্রতিও আকর্ষণ হত না। এ হচ্ছে পাথরের অবস্থা, কিন্তু যার কাছে বড় বড় বালিশ, তুলতুলে ফরাশ এবং আরাম-আয়েশের সর্বোত্তম উপকরণ রয়েছে, সে আল্লাহর এবাদত করে কি স্বাদ পেতে পারে?
>>শয়তানের আরেকটি বড় প্রবেশপথ হচ্ছে কৃপণতা ও দরিদ্র হয়ে যাওয়ার ভয়। 
এ বিষয়টি মানুষকে সদকা, খয়রাত ইত্যাদি কিছুই করতে দেয় না। বরং ধন-সম্পদ স্তূপীকৃত করতে ও পুঁতে রাখতে উৎসাহিত করে। এরূপ লোকদের জন্যে কোরআন মজীদে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির হুমকি উচ্চারিত হয়েছে। খায়সামা ইবনে আবদুর রহমান বলেন : শয়তান বলে, মানুষ আমার উপর যতই প্রবল হোক না কেন, তিনটি বিষয়ে আমার অবাধ্য হতে পারে না। এ ক্ষেত্রে আমি যা বলি, সে তাই করে। এক, অন্যায়ভাবে কারও ধন-সম্পদ গ্রহণ করা। দুই, ধনসম্পদ অযথা ব্যয় করা এবং তিন, যেখানে ব্যয় করা প্রয়োজন, সেখানে ব্যয় না করা। 

আবু সুফিয়ান (রহঃ) বলেন : দারিদ্র্যের ভয় দেখানোর চেয়ে বড় কোন হাতিয়ার শয়তানের কাছে নেই। মানুষ এটা মেনে নিলে অন্যায়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যায় এবং সত্য বিষয় থেকে বিরত থাকে। সে কেবল মতলবের কথাই বলে এবং আল্লাহ তাআলার প্রতি কুধারণা পোষণ করতে থাকে। ধনসম্পদ পুঞ্জীভূত করার জন্যে শয়তানের আড্ডা বাজারে উপস্থিত থাকাও কৃপণতা ও লালসার অন্যতম আপদ। হযরত আবু উমামা (রাঃ)-এর রেওয়ায়েতে রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী  ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন : ইবলীস পৃথিবীতে অবতরণ করে পরওয়ারদেগারের কাছে আবেদন করল : ইলাহী, তুমি আমাকে পৃথিবীতে নামিয়ে দিয়ে আপন রহমত থেকে বিতাড়িত করেছ। এখন আমার থাকার জায়গা কোথায়? আল্লাহ বললেন :  হাম্মাম (স্নানাগার) তোর থাকার জায়গা। ইবলীস বলল : আমার জন্য একটি বৈঠকখানাও নির্দেশ করা হোক। এরশাদ হল : বাজার ও চৌরাস্তা তোর বৈঠকখানা। ইবলীস আরজ করল : আমার খোরাক কি হবে? উত্তর হল : যে খাদ্যের উপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয় না, সেটাই তোর খোরাক। ইবলীস আরজ করল: আমাকে পানীয় দান করুন। জওয়াব হল: নেশার বস্তু তোর পানীয়। ইবলীস আরজ করল : আমাকে একটি সংবাদ মাধ্যমও প্রদান করা হোক। এরশাদ হল : বাদ্যযন্ত্র তোর সংবাদ মাধ্যম। ইবলীস আরজ করল : আমার শিকার ক্ষেত্র কোনটি হবে?আল্লাহ বললেন: মহিলারা তোর শিকার ক্ষেত্র।

>>মত ও পথ সম্পর্কিত বিদ্বেষও শয়তানের একটি বড় প্রবেশপথ।

এর সারকথা হচ্ছে, নিজের বিরুদ্ধে মতামত পোষণকারীদের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন হওয়া ও তাদেরকে ঘৃণার চোখে দেখা। এই দোষ দ্বারা শয়তান আব্দে ফাসেক উভয়েরই সর্বনাশ করে থাকে। কেননা, অন্যের প্রতি দোষারোপ করা এবং তার কুকীর্তি বর্ণনা করা মানুষের একটি সহজাত প্রবৃত্তি। যখন শয়তান এ প্রবৃত্তিকে মানুষের দৃষ্টিতে হক সাব্যস্ত করে, তখন অন্তরে এর প্রতি মোহ জন্মে যায় এবং মানুষ সর্বপ্রযত্নে এতে আত্মনিয়োগ করে। সে মনে করে, সে ধর্মের খেদমত করছে। অথচ বাস্তবে সে শয়তানের অনুসরণ করে। 

উদাহরণতঃ এক ব্যক্তি হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর মহব্বতের ব্যাপারে অপরের প্রতি বিদ্বেষভাবাপন্ন; কিন্তু নিজে হারামখোর, মিথ্যাবাদী ও কলহপ্রিয়। তাকে হযরত আবুবকর রাঃ) দেখলে নিজের বড় শত্রু জ্ঞান করতেন। কেননা, তাঁর বন্ধু সেই ব্যক্তি হবে, যে তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করে, তাঁর ভাবাদর্শ মেনে চলে এবং বাজে কথাবার্তা থেকে রসনা সংযত রাখে। যেমন- হযরত আবু বকর (রাঃ) নিজে অনর্থক কথাবার্তা থেকে আত্মরক্ষার জন্যে মুখে কংকর পুরে রাখতেন। সুতরাং উপরোক্ত ব্যক্তি তাঁর আদর্শ অনুসরণ না করে কিরূপে তাঁর মহব্বত দাবী করতে পারে? অনুরূপভাবে কোন কোন লোক হযরত আলী (রাঃ)-এর মহব্বতের ব্যাপারে অপরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, অথচ নিজে রেশমী বস্ত্র পরিধান করে এবং হারাম ধসসম্পদ দ্বারা খুব জাঁকজমক প্রকাশ করে। অথচ হযরত আলী (রাঃ) খেলাফত আমলেও এমন বস্তু গরিধান করেছেন, যার মূল্য এক টাকার চেয়েও কম ছিল। সুতরাং এমন ব্যক্তির প্রতি তিনি কিরূপে প্রসন্ন হবেন? বরং কেয়ামতের দিন এ ব্যক্তি তাঁর দুশমন হবে।
সারকথা, শয়তানী কল্পনাবিলাসের ফলে এসব লোকের মনে এ ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গেছে যে, যে কেউ হযরত আবু বকর ও হযরত আলী (রাঃ)-এর মহব্বত নিয়ে মৃত্যুবরণ করবে, সে দোযখের অগ্নি থেকে বেঁচে থাকবে। তারা এ হাদীসটি দেখে না যে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) তাঁর কলিজার টুকরা হযরত ফাতেমা (রাঃ)-কে এরশাদ করেনঃ “নিজে আমল কর। কেননা, আমি আল্লাহর সামনে তোমার কোন উপকার করতে পারব না।” তাদের অবস্থাও তদ্রূপ, যারা ইমাম আবু হানীফা, ইমাম শাফেঈ, ইমাম মালেক ও ইমাম আহমদ (রদিয়াল্লাহু আনহুম)-এর ব্যাপারে বিদ্বেষ প্রকাশ করে। অতএব যারা কোন এক ইমামের মাযহাব দাবী করে এবং তাঁর জীবনাদর্শ অবলম্বন করে না, কেয়ামতের দিন সেই ইমামই তাদের বিরুদ্ধে গিয়ে জিজ্ঞেস করবেন : আমার মাযহাব তো আমল ছিল- বাগাড়ম্বর ছিল না। তুমি আমার আমলের বিরুদ্ধাচরণ করলে কেন? 

হযরত হাসান বসরী (রহঃ) এরশাদ করেন যে, শয়তান বলে, আমি উম্মতে মুহাম্মদীর জন্যে যেসকল পাপকর্ম সজ্জিত করেছি, সেগুলোতে তারা আল্লাহর কাছে এস্তেগফার অর্থাৎ ক্ষমা প্রার্থনা করে আমার কোমর ভেঙ্গে দিয়েছে। এর পর আমি এমন গোনাহ্ গড়ে দিয়েছি, যাতে তারা এস্তেগফার করবে না। তা হচ্ছে মনের খাহেশ, যা ধর্মের কাজ মনে করে করা হয়। অভিশপ্ত শয়তানের এ উক্তি সম্পূর্ণ সত্য। কেননা, এ ধরনের কাজে মানুষ জানেই না যে, পরিণামে নাফরমানী হচ্ছে। জানলে তারা অবশ্যই এস্তেগফার করত।
>>শয়তানের আরেকটি বড় কৌশল, মানুষ আপনা আপনি অপরের পারস্পরিক বিরোধ ও কলহের মধ্যে লেগে যায়। 
সেমতে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মসউদ (রাঃ) বলেন : একদল লোক আল্লাহর যিকিরে মশগুল ছিল। শয়তান চাইল, তারা এখান থেকে প্রস্থান করুক এবং বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ুক, কিন্তু কিছু করতে না পেরে সে অপর একটি দলের মধ্যে ভিড়ে গেল, যারা সাংসারিক কথাবার্তায় ব্যাপৃত ছিল। সে তাদের মধ্যে গোলমাল সৃষ্টি করে দিল। ফলে খুনখারাবী শুরু হয়ে গেল। এতে প্রথম দল যিকির ভঙ্গ করে চলে গেল এবং তাদের মধ্যে আপস-মীমাংসা করে দিল। এখানে শেষোক্ত দলে খুনখারাবী হোক- এটা শয়তানের উদ্দেশ্য ছিল না; বরং প্রথম দলকে স্থানত্যাগে বাধ্য করাই তার লক্ষ্য ছিল।

>>শয়তানের এক তরীকা হচ্ছে, সে অনভিজ্ঞ জনসাধারণকে আল্লাহ তাআলার সত্তা, গুণাবলী এবং এমন বিষয়সমূহের আলোচনায় জড়িয়ে ফেলে, যা তাদের বোধগম্য নয়। 

ফলে তারা মূল ধর্ম সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে পড়ে। তারা আল্লাহ সম্পর্কে এমন ধারণা করতে থাকে, যা কুফর ছাড়া কিছু নয়। হযরত আয়েশার (রাঃ) রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন : “শয়তান তোমাদের কারো কাছে এসে বলেঃ তোমাকে কে সৃষ্টি করেছে? সে উত্তরে বলে : আল্লাহ তাআলা। এর পর শয়তান জিজ্ঞেস করে : আল্লাহ তাআলাকে কে সৃষ্টি করেছে? তোমাদের কেউ যখন নিজের মধ্যে এই অবস্থা অনুভব করে, তখন সে বলুক- আমি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছি। এটা বললে তার এই অবস্থা দূর হয়ে যাবে।”

এখানে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) এ ধরনের কুমন্ত্রণার প্রতিকারের আলোচনা করার অনুমতি দেননি। কেননা, এই কৃমন্ত্রণা অজ্ঞ জনসাধারণের মধ্যে দেখা দেয়- আলেমদের মনে দেখা দেয় না। সুতরাং জনসাধারণের উচিত ঈমান ও ইসলাম প্রকাশ করে এবাদত ও জীবিকা উপার্জনের কাজে মশগুল হয়ে যাওয়া। সাধারণ মানুষ যদি যিনা ও চুরি করে, তবে এটা এ ধরনের কুমন্ত্রণার পেছনে পড়ার চেয়ে উত্তম। কেননা, যে ব্যক্তি না জেনে না শুনে আল্লাহ ও তাঁর ধর্ম সম্পর্কে কিছু বলবে, সে অজ্ঞাতেই কাফের হয়ে যাবে। এটা এমন হবে, যেমন কেউ সাঁতার না শিখে উত্তাল নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
>>মূসলমানের প্রতি কুধারণা পোষণ করা শয়তান প্রবেশের একটি পথ।
শয়তানের দ্বারসমূহের মধ্যে একটি হচ্ছে অপর মূসলমানের প্রতি কুধারণা পোষণ করা। আল্লাহ তাআলা বলেন : “যারা ঈমান এনেছ শুন, তোমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধারণা করা থেকে বেঁচে থাক। কারণ, কোন কোন ক্ষেত্রে ধারণা করা পাপ।”

সুতরাং যে কেউ অপরের প্রতি কুধারণা করবে, শয়তান তাকে তার গীবত করতেও প্ররোচিত করবে। অথবা সে অপরের হক আদায় করবে সম্মান প্রদর্শনে শৈথিল্য করবে এবং তাকে হেয় দৃষ্টিতে দেখবে। এগুলো সব সর্বনাশা কাজ। এ কারণেই শরীয়তে অপবাদ থেকে আত্মরক্ষার নির্দেশ আছে। হাদীসে আছে - “তোমরা অপবাদের স্থান থেকে বেঁচে থাক।” 
স্বয়ং রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) অপবাদের স্থান থেকে আত্মরক্ষা করেছেন। 
হযরত আলী ইবনে হোসাইন (রাঃ) সফিয়্যা বিনতে হুয়াই থেকে বর্ণনা করেন- তিনি বলেন : একবার রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) মসজিদে এতেকাফরত ছিলেন। আমি যখন তাঁর কাছে গেলাম, তখন ঋতুবতী হয়ে গেলাম। সন্ধ্যায় সেখান থেকে ফিরে আসার জন্যে রওয়ানা হলে তিনিও আমার সাথে রওয়ানা হলেন। পথিমধ্যে দু'জন আনসারীর সাথে দেখা হল। তারা রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-কে সালাম করে যেতে লাগল। তিনি তাদেরকে ডাক দিলেন এবং বললেনঃ এ হচ্ছে আমার স্ত্রী সফিয়্যা উন্মুল মুমিনীন। তারা আরজ করল : ইয়া রসূলাল্লাহ! আমরা আপনার প্রতি সুধারণা রাখি। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ এটা ঠিক। কিন্তু শয়তান মানুষের সাথে দেহের রক্তের মত মিশে আছে। তাই আমি আশংকা করলাম, কোথাও তোমাদেরকে বিভ্রান্ত না করে দেয়। এখানে দেখা উচিত, নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) উম্মতের প্রতি কতটুকু স্নেহপরায়ণ ছিলেন! তিনি আনসারীদ্বয়কেও বিভ্রান্তি থেকে বাঁচিয়ে দিলেন এবং উম্মতকে অপবাদ থেকে বেঁচে থাকার পন্থাও শিখিয়ে দিলেন, যাতে কোন বিশিষ্ট আলেম ও পরহেযগার ব্যক্তি অপবাদের ব্যাপারটিকে হালকা মনে না করে এবং আত্মম্ভরিতার কারণে এরূপ ধারণা না করে যে, মানুষ তার প্রতি সুধারণাই পোষণ করবে। কারণ, যত বড় পরহেযগারই হোক না কেন, সকল মানুষ তার সমান ভক্ত হবে না; বরং কেউ তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকে এবং কেউ অসন্তুষ্ট। যারা সন্তুষ্ট, তারা তার দোষ দেখবে না; কিন্তু অসন্তুষ্টরা দোষ গেয়েই ফিরবে। অতএব কুধারণা ও দুষ্ট লোকদের অপবাদ থেকে বেঁচে থাকা জরুরী। কেননা, দুষ্টরা সকল মানুষের প্রতি কুধারণা রাখে। সুতরাং যখন এমন কোন লোক দেখা যায়, যে মানুষের প্রতি কুধারণা করে এবং তাদের দোষ অন্বেষণ করে, তখন বুঝতে হবে যে, সে নিজের অন্তরে ভ্রষ্টামি পোষণ করে এবং এই দোষ অন্বেষণ তারই বহিঃপ্রকাশ। কারণ, সে সকলকে নিজের মতই মনে করে। জানা দরকার, দোষ অন্বেষণ মোনাফেকের কাজ। মুমিনের বক্ষ সকল মানুষের তরফ থেকে পরিষ্কার থাকে।


পরবর্তী পর্ব-
 শয়তানকে দূরে রাখার উপায় 

অন্তর বা হৃদয় (১৫) শয়তানের সত্তাকে চেনার উপায়



অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ১৫) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

শয়তানের সত্তাকে চেনার উপায়
এখানে জানা দরকার, অন্তরে যে সকল খেয়াল জাগে, সেগুলো তিন প্রকার। 

(১) যে খেয়াল নিশ্চিতরূপেই কল্যাণের দিকে আহ্বান করে। এগুলো যে এলহাম, তাতে কোন সন্দেহ নেই।

(২) যে খেয়াল নিশ্চিতরূপেই অনিষ্টের দিকে আহ্বান করে। এগুলো যে কুমন্ত্রণা, তাতে কারও দ্বিমত নেই। 

(৩) যে খেয়াল মাঝামাঝি। এগুলো ফেরেশতার পক্ষ থেকে, না শয়তানের পক্ষ থেকে, তা জানা যায় না। এতে খুব ধোকা হয় এবং পার্থক্য করা খুব কঠিন। কেননা, কিছু সৎকর্মপরায়ণ লোককে শয়তান প্রকাশ্যভাবে অনিষ্টের দিকে আহ্বান করতে পারে না; বরং অনিষ্টকে কল্যাণের আকৃতি দিয়ে তাদের সামনে পেশ করে। এতে অধিকাংশ লোকের সর্বনাশ হয়ে যায়। 

উদাহরণতঃ শয়তান আলেমকে উপদেশের ভঙ্গিতে বলে : 

সাধারণ মানুষের অবস্থা দেখ। সকলেই মূর্খতায় গ্রেফতার, গাফলতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত এবং দোযখের কিনারায় দণ্ডায়মান। তাদের প্রতি রহম করে তাদেরকে সর্বনাশ থেকে বাঁচানো উচিত এবং ওয়ায নসীহত করা দরকার। আল্লাহ তাআলা তোমাকে এলেমের নেয়ামত, উজ্জ্বল মন-মস্তিষ্ক, চিত্তাকর্ষক বাগ্মিতা এবং সুললিত কণ্ঠস্বর দ্বারা মণ্ডিত করেছেন। এমতাবস্থায় তুমি আল্লাহর নাশোকরী কিরূপে করতে পার এবং জ্ঞান প্রচারে বিরত হয়ে আল্লাহর অসন্তুষ্টির পাত্র হবে কিরূপে? ওয়ায নসীহত করে মানুষকে সৎপথে আনা দরকার। শয়তান এমনিভাবে বুঝিয়ে শুনিয়ে কৌশলে আলেম ব্যক্তিকে ওয়ায করতে সম্মত করে। 

এর পর তার মনে এই ধারণ সৃষ্টি করে দেয় যে,  উৎকৃষ্ট পোশাক পরিধান করে মিষ্ট ভাষায় ওয়ায না করলে তোমার কথাবার্তা মনে প্রভাব বিস্তার করবে না এবং কেউ সৎপথ পাবে না। সে আলেম ব্যক্তির সামনে হরহামেশা এমনি ধরনের বক্তব্য পেশ করতে থাকে। অথচ এতে তার মূল উদ্দেশ্য থাকে এই আলেমকে রিয়াতে লিপ্ত করে দেয়া, যাতে তার মধ্যে সম্মানপ্রাপ্তি, খাদেমের আধিক্য, জ্ঞান ও যশের অহংকার এবং অপরকে হেয় দৃষ্টিতে দেখার অভ্যাস গড়ে উঠে। সে প্রকাশ্যে শুভেচ্ছার কথা বলে; কিন্তু বাস্তবে আলেম বেচারার সর্বনাশের ফিকির করে। এরূপ আলেমের প্রতি ইশারা করে হাদীসে বলা হয়েছে : 

“নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা এই ধর্মকে এমন লোকদের দ্বারা শক্তিশালী করবেন, যারা বেশী দ্বীনদার হবে না।” 

আল্লাহ পাপাচারী ব্যক্তি দ্বারা এই ধর্মকে জোরদার করবেন।


একবার বিতাড়িত শয়তান হযরত ঈসা (আঃ)-এর সামনে এসে আরজ করল : বল, 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্। তিনি বললেন : এই কালেমা সঠিক, কিন্তু তোর কথায় আমি এটা উচ্চারণ করব না। এতে তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, শয়তান শুভেচ্ছার ভিতর দিয়েও প্রতারণা করে। শয়তানের এ ধরনের শঠতা গণনাতীত। এসব প্রতারণার কারণে তাদের সর্বনাশ হয়ে যায়, যারা কেবল বাহ্যিক অনিষ্টকেই অনিষ্ট মনে করে এবং শুধু প্রকাশ্য গোনাহ থেকে বেঁচে থাকে। এ খণ্ডের শেষভাগে আমরা শয়তানের কিছু প্রতারণা লিপিবদ্ধ করব। সময় পেলে সম্ভবত এই বিশেষ অধ্যায় সম্পর্কে একটি কিতাবই লেখে তার নাম রাখব 'তালবীসে ইবলীস' (ইবলীসের বিভ্রান্তি)। কেননা, আজকাল শয়তানের প্রতারণা মানুষের মধ্যে বিশেষত মাযহাব ও আকীদাসমূহের মধ্যে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। এর কারণ, মানুষ শয়তানের ধোকাকে সত্য বলে বিশ্বাস করে নেয়।

অতএব মানুষের কর্তব্য হচ্ছে, অন্তরে যে ইচ্ছা আসে তাতে বিরতি ও চিন্তাভাবনার মাধ্যমে জেনে নেবে যে, এটা ফেরেশতার পক্ষ থেকে, না শয়তানের পক্ষ থেকে? এটা তাকওয়ার নূর, পর্যাপ্ত এলেম ও অন্তর্দৃষ্টি ছাড়া জানা যায় না। যেমন আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেনঃ “উদ্দেশ্য হচ্ছে, তাকওয়ার অধিকারীরা শয়তানের স্পর্শ পাওয়ার সময় এলেমের নূর কাজে লাগায়। ফলে তাদের খটকা দূর হয়ে যায়। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তাকওয়ার অধিকারী নয়, কামপ্রবৃত্তির অনুসরণের কারণে সে শয়তানের ধোকায় বিশ্বাস করে নেয় এবং ধ্বংস হয়ে যায়।” 

এ ধরনের লোক সম্পর্কেই আল্লাহ তাআলা বলেন : 

“আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের জন্যে এমন বিষয় প্রকাশ পেল, যা তারা ধারণাও করত না”। অর্থাৎ, তারা তাদের যে সকল আমলকে পুণ্য কাজ মনে করত, সবগুলো পাপকর্মের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল। 

এলমে মুয়ামালায় সর্বাধিক সূক্ষ্ম বিষয় হচ্ছে নফ্‌স ও শয়তানের প্রতারণাকে জানা। এটা প্রত্যেক বান্দার উপর ফরযে আইন, কিন্তু মানুষ এ থেকে গাফেল হয়ে এমন এলেমের মধ্যে মশগুল হয়েছে, যদ্দ্বারা কুমন্ত্রণা বৃদ্ধি পায় এবং শয়তান প্রবল হয়।

অধিক কুমন্ত্রণা থেকে আত্মরক্ষার উপায় হচ্ছে অন্তরে প্রবণতা আসার দরজা বন্ধ করে দেয়া। এই দরজা হচ্ছে বাহ্যিক পঞ্চ ইন্দ্রিয় এবং অভ্যন্তরীণ কামপ্রবৃত্তি ও সাংসারিক সম্পর্ক। অন্ধকার গৃহে বসে থাকলে পঞ্চ ইন্দ্রিয় বন্ধ হয়ে যায়। আর পরিবার-পরিজন ও ধনসম্পদ থেকে আলাদা হয়ে অভ্যন্তরীণ কুমন্ত্রণা বন্ধ হয় গেলে। এ পর্যায়ে কেবল তখল্লী তথা নির্জনতার পথ খোলা থাকবে, যা সর্বদা অন্তরে অব্যাহত থাকে। এ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আল্লাহর যিকির ছাড়া উপায় নেই, কিন্তু শয়তান অন্তরকে সেখানেও ছাড়ে না এবং আল্লাহর যিকির বিস্মৃত করতে থাকে। এমতাবস্থায় মোজাহাদা তথা সাধনা করা উচিত। মৃত্যু দ্বারা এই সাধনা চূড়ান্ত হয়। কেননা, মানুষ যে পর্যন্ত জীবন্ত থাকে, শয়তান থেকে নিষ্কৃতি পায় না। তবে সাধনার বলে শয়তানের আনুগত্য থেকে মুক্ত এবং তার অনিষ্ট থেকে বেঁচে থাকতে পারে, কিন্তু দেহে রক্ত থাকা পর্যন্ত এই সাধনা জরুরী। কেননা, শয়তানের দ্বার সারা জীবন মানুষের সামনে খোলা থাকে, কখনও বন্ধ হয় না। এই দ্বার হচ্ছে কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ ইত্যাদি। দ্বার যখন উন্মুক্ত এবং শত্রুও সজাগ, তখন সাধনা ছাড়া কাজ হবে না।

হযরত হাসান বসরীকে কেউ প্রশ্ন করল : হে আবু সাঈদ! শয়তান নিদ্রামগ্ন হয় কি? তিনি বললেন : যদি সে নিদ্রামগ্ন হত, তবে আমরা শান্তি পেতাম। সারকথা, মুমিন বান্দা শয়তান থেকে মুক্তি পায় না। 

তবে তার জোর হ্রাস করতে পারে। হাদীসে আছে : 

“তোমরা যেমন উটকে সফরে শীর্ণ করে দাও, তেমনি ঈমানদার ব্যক্তি শয়তানকে শীর্ণ করতে পারে।”


হযরত ইবনে মসঊদ (রাঃ) বলেন : মুমিনের শয়তান ক্ষীণ হয়ে থাকে। 

কায়েস ইবনে হাজ্জাজ বলেন, আমার শয়তান একদিন আমাকে বলতে লাগল : আমি তোমার কাছে উটের মত সবল ও শক্তিশালী এসেছিলাম। এখন তালপাতার সেপাই হয়ে গেছি। আমি জিজ্ঞেস করলাম : এটা কিরূপে? সে বলল : তুমি আল্লাহর যিকির দ্বারা আমাকে শীর্ণ করে দিচ্ছ।


এসব রেওয়ায়েত থেকে জানা যায় যে, যারা তাকওয়ার অধিকারী, তাদের সামনে বাহ্যিক শয়তানী দরজা বন্ধ হওয়া কঠিন নয়, কিন্তু শয়তানী চক্রান্ত থেকে বেঁচে থাকার ব্যাপারে তাদেরও পদস্খলন ঘটে যায়। কেননা, এসব, চক্রান্ত দ্রুত জানা যায় না। যেমন আমরা আলেমদের সাথে চক্রান্তের একটি দৃষ্টান্ত পূর্বে উল্লেখ করেছি। ব্যাপারটি আরও কঠিন এজন্যে যে, অন্তরের সামনে শয়তানের যেসব দরজা খোলা রয়েছে, সেগুলো অনেক। আর ফেরেশতাদের দরজা মাত্র একটি। এই একটি মাত্র দরজা সবগুলো দরজার মধ্যে সন্দিগ্ধ হয়ে গেছে। এসব দরজার মধ্যে বান্দার অবস্থা এমন, যেমন কোন মুসাফির অন্ধকার রাতে কোন জঙ্গলে দণ্ডায়মান। সেই জঙ্গলে অনেকগুলো দুর্গম পথ রয়েছে। এমতাবস্থায় মুসাফির ব্যক্তি দুই উপায়ে সঠিক পথ জানতে পারে অন্তর্দৃষ্টি ও জ্ঞান দ্বারা অথবা সূর্যের আলো দ্বারা। অতএব এসব দরজা জানার ব্যাপারে মুত্তাকীর অন্তর দিব্যদৃষ্টি ও জ্ঞানের স্থলে রয়েছে এবং কোরআন ও সুন্নাহর পর্যাপ্ত জ্ঞান হচ্ছে সূর্যালোকের মত। এ দু'উপায়ে অবশ্যই সঠিক পথ জানা যাবে।


হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে- একদিন রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) আমাদের সামনে মাটির একটি রেখা টানলেন, এর পর বললেন : এটা আল্লাহর পথ। অতঃপর এই রেখার ডানে ও বামে অনেকগুলো রেখা টেনে বললেন : এগুলো শয়তানের পথ। প্রত্যেক পথে একটি শয়তান দাঁড়িয়ে মানুষকে তার দিকে ডাকছে। এর পর তিনি এই আয়াত পাঠ করলেন :

“এটা হচ্ছে আমার সরল পথ। অতএব তোমরা এ পথে চল এবং অনেক পথে চলো না।”


তিনি ডান ও বাম দিকের রেখাগুলোকেই 'অনেক পথ' বললেন। এই হাদীসে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) শয়তানের পথ যে অনেক একথাই ফুটিয়ে তুলেছেন। আমরা তার একটি সূক্ষ্ম পথের দৃষ্টান্তও লিপিবদ্ধ করেছি, যে পথে সে আলেম ও আবেদদেরকে পরিচালনা করে। অথচ এরা তাদের কামপ্রবৃত্তিকে বশে রাখতে সক্ষম এবং প্রকাশ্য গোনাহেও লিপ্ত হয় না। এখন আমরা একটি সুস্পষ্ট পথের উল্লেখ করতে চাই। মানুষ কারণে অকারণে এ পথে চলতে শুরু করে।ঘটনাটি হাদীস শরীফেও বর্ণিত হয়েছে। 


বনী ইসরাঈলের মধ্যে জনৈক সংসারত্যাগী দরবেশ ছিল। তাকে বিভ্রান্ত করার জন্যে শয়তান এক কৌশল অবলম্বন করে। সে এক বালিকার গলা টিপে দেয় এবং তার পরিবারের লোকজনের মনে একথা জাগ্রত করে দেয় যে, এর চিকিৎসা অমুক দরবেশের কাছে আছে। সেমতে তারা বালিকাকে দরবেশের কাছে নিয় গেল। দরবেশ প্রথমে চিকিৎসা করতে অস্বীকার করল, কিন্তু তাদের পীড়াপীড়িতে অবশেষে সম্মত হল। তারা বালিকাকে দরবেশের কাছে রেখে গেল। এর পর শয়তান এসে দরবেশকে বালিকার সাথে অপকর্ম করতে প্রলুব্ধ করল। দরবেশ আত্মরক্ষার অনেক চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত শয়তানের প্রতারণার সামনে টিকে থাকতে পারল না। সে অপকর্ম করে বসল। ফলে বালিকাটি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে গেল। তখন শয়তান এসে তার মনে একথা সৃষ্টি করল যে, এখন তো তোর লাঞ্ছনার শেষ থাকবে না। পরিবারের লোকজন আসবে। সে তাদেরকে মুখ দেখাবে কি করে? সুতরাং তাকে হত্যা করে দাফন করে দেয়াই উত্তম। কেউ জিজ্ঞেস করতে এলে বলে দেবে, অসুখে মারা গেছে। দরবেশ তাই করল। এর পর শয়তান বালিকার আত্মীয়দের কাছে যেয়ে তাদের মনে কুমন্ত্রণা দিল যে, দরবেশ বালিকার সাথে এমন এমন করেছে এবং হত্যা করে দাফন করে। দিয়েছে। আত্মীয়রা দরবেশের কাছে এসে জিজ্ঞেস করল। দরবেশ সন্তোষজনক জওয়াব দিতে না পারায় তারা তাকে হত্যার বিনিময়ে হত্যা করার জন্যে গ্রেফতার করে নিয়ে গেল। তখন শয়তান দরবেশের সামনে আত্মপ্রকাশ করে বলল : এগুলো সব আমার কাজ। এখন যদি আমার কথা মেনে নাও, তবে খুন থেকে রক্ষা পেতে পার। দরবেশ শুধাল : কি করব, বল। প্রাণ তো বাঁচাতে হবে। 

শয়তান বলল : আমাকে দুটি সেজদা করলেই তুমি বেঁচে যাবে। দরবেশ অগত্যা দু'টি সেজদা করে নিল। সেজদা করার পর শয়তান বলল : আমি কিছুই করতে পারব না। তুমি কে, তাও আমি জানি না। এ ব্যক্তির অবস্থাই আল্লাহ তাআলা কোরআনের নিম্নোদ্ধৃত আয়াতে উল্লেখ করেছেন :

“শয়তানের উক্তির মত, যখন সে মানুষকে বলল : কুফর কর। যখন মানুষ কুফর করল, তখন শয়তান বলল : আমি তোমা থেকে মুক্ত।”


চিন্তা করা উচিত, শয়তান কত বড় প্রতারক! সে দরবেশকে কিভাবে কবীরা গোনাহে লিপ্ত করে দিল! দরবেশ তো শুধু চিকিৎসার ব্যাপারে তার কুমন্ত্রণা মেনে নিয়েছিল। এটা খুব সহজ ব্যাপার ছিল। শুরুতে দরবেশ এটাই ভেবেছিল যে, চিকিৎসা করা খুবই ভাল কাজ। এ থেকে জানা গেল, শয়তান প্রথমে মনে এমন বিষয় জাগ্রত করে দেয় যে, মানুষ ভাল কাজে উৎসাহী হওয়ার কারণে তাকে ভাল মনে করে, কিন্তু শেষ পরিণতি তার করায়ত্ত থাকে না। এক বিষয় থেকে আরেক বিষয় এমন সৃষ্টি হয়ে যায়, যা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া সম্ভবপর হয় না। হাদীসে আছে :

“যে ব্যক্তি নিষিদ্ধ স্থানের আশেপাশে ঘুরাফেরা করে, সে যে কোন সময় নিষিদ্ধ স্থানের অভ্যন্তরে চলে যেতে পারে।


পরবর্তী পর্ব

শয়তানী পথসমূহের কিঞ্চিৎ বিবরণ

অন্তর বা হৃদয় (১৪) শয়তান থেকে আত্মরক্ষার উপায়



অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ১৪)  
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

শয়তান থেকে আত্মরক্ষার উপায় 

শয়তান থেকে আত্মরক্ষার উপায় স্বরূপ হাদীসে আল্লাহর যিকিরই উল্লিখিত হয়েছে।

বর্ণিত আছে, হযরত আমর ইবনুল আস রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর খেদমতে আরজ করলেন : ইয়া রসূলাল্লাহ্ ! শয়তান আমার মধ্যে ও আমার নামাযের মধ্যে আড়াল হয়ে যায়। অর্থাৎ নামায ও কেরাআতের মধ্যে কুমন্ত্রণা দেয়। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বললেন : “এই শয়তানকে খানযাব বলা হয়। তুমি যখন একে অনুভব কর, তখন 'আউযু বিল্লাহি মিনাশ শায়তানির রাজীম' পাঠ কর এবং বাম দিকে তিনবার থুথু নিক্ষেপ কর।” 

আমর ইবনে আস বলেন : আমি এই এরশাদ অনুযায়ী আমল করে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে রক্ষা পেলাম। 

অনুরূপভাবে এক হাদীসে বলা হয়েছে, ওযুর মধ্যে কুমন্ত্রণা দেয়ার জন্যে ওলহান নামক এক শয়তান আছে, এর থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা কর।


আল্লাহর যিকির দ্বারা শয়তান বিদূরিত হওয়ার একটি চমৎকার কারণ আছে, তা হচ্ছে, শয়তানী কুমন্ত্রণা অন্তর থেকে তখনই দূর হবে, যখন এই কুমন্ত্রণা ছাড়া অন্য কোন বিষয় অন্তরে উপস্থিত থাকে। কেননা, যিকির যখন অন্তরে স্থান লাভ করবে, তখন এর পূর্বে অন্তরে যা ছিল, তা তাতে থাকবে না। সুতরাং মনকে অন্য কোন বিষয়ে ব্যাপৃত করলে শয়তানী কুমন্ত্রণা দূর হতে পারে। তবে অন্য বিষয়েও কুমন্ত্রণা দেয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়, কিন্তু আল্লাহর যিকির ও তৎসম্পর্কিত বিষয়াদির উপস্থিতিতে শয়তানের সাধ্য নেই যে, অন্তরের ধারে-কাছে আসে, কিন্তু শয়তানকে দূর করার ক্ষমতা তাদেরই আছে, যারা মুত্তাকী এবং প্রায়ই যিকিরে মশগুল থাকে। এরূপ লোকদের কাছে অসতর্ক মুহূর্তে শয়তান এলেও গোপনে চলে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন :

“নিশ্চয় যারা আল্লাহকে ভয় করে, তারা শয়তানের স্পর্শ পেয়েই সতর্ক হয়ে যায় এবং তখনই দিব্যদৃষ্টি লাভ করে।” 

এ আয়াতের তফসীরে হযরত মুজাহিদ (রহঃ) বলেন : শয়তান অন্তরে ছড়িয়ে থাকে। যখন অন্তর আল্লাহর যিকির করে, তখন সে কষ্টে সংকুচিত হয়ে পড়ে। এর পর অন্তর গাফেল হয়ে গেলে শয়তান আবার ছড়িয়ে পড়ে। যিকির ও কুমন্ত্রণা আলো ও অন্ধকারের মত একটি অপরটির বিপরীত। এই বৈপরীত্যের কারণেই আল্লাহ বলেন : 

“শয়তান তাদের কাবু করে নিয়েছে, অতঃপর আল্লাহর যিকির ভুলিয়ে দিয়েছে।”

 হযরত আনাস (রাঃ)-এর রেওয়ায়েতে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী  ওয়া সাল্লাম) বলেন : “শয়তান তার শুঁড় মানুষের অন্তরের উপর স্থাপন করে। যদি মানুষ আল্লাহর যিকির করে, তবে সে সরে যায়। আর যদি আল্লাহকে ভুলে যায়, তবে শয়তান তার অন্তর গ্রাস করে নেয়।”


ইবনে আওযা রেওয়ায়েত করেন, মানুষ যখন চল্লিশ বছর বয়সে পৌঁছেও তওবা করে না, তখন শয়তান খুশী হয়ে তার মুখে হাত বুলিয়ে বলে : এ চেহারাটি সাফল্য লাভ করবে না।

মোট কথা, কামপ্রবৃত্তির মানুষের রক্ত-মাংসে অনুপ্রবিষ্ট হয়ে গেছে। ফলে শয়তানের রাজত্বও তার রক্ত-মাংসের মধ্যে বিদ্যমান আছে এবং অন্তরকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে রেখেছে। তাই হাদীসে বলা হয়েছে :  

“নিশ্চয় শয়তান মানুষের রক্ত চলার পথে চলাচল করে। অতএব তোমরা ক্ষুধার সাহায্যে তার চলাচলের পথ সংকীর্ণ করে দাও।” 

এরূপ বলার কারণ হচ্ছে, ক্ষুধার কারণে কামপ্রবৃত্তি নিস্তেজ হয়ে পড়ে। ফলে শয়তানের চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। অন্তর যে চতুর্দিক থেকে কামপ্রবৃত্তি দ্বারা পরিবেষ্টিত, তা এই আয়াত দ্বারা প্রমাণিত

“আমি মানুষকে ফাঁদে ফেলার জন্যে তোমার সরল পথে বসে থাকব, এর পর তাদের কাছে আসব সামনে থেকে, পশ্চাৎ থেকে এবং ডান ও বাম দিক থেকে।”


নিম্নোক্ত হাদীসেও এ বিষয়টি উল্লিখিত হয়েছে--

“শয়তান মানুষের কয়েকটি পথে বসে। সে ইসলামের পথে বসে এবং বলে : তুমি কি ইসলাম গ্রহণ করে পৈতৃক ধর্ম বিসর্জন দেবে? মানুষ তার কথা না মেনে মুসলমান হয়ে যায়। এর পর শয়তান হিজরতের পথে বসে এবং বলে : তুমি কি হিজরত করে মাতৃভূমি ত্যাগ করবে? মানুষ একথা মানে না এবং হিজরত করে। এর পর শয়তান জেহাদের পথে বসে এবং বলে : যুদ্ধ করার মানে তো জান ও মাল বিনষ্ট করা। তুমি যুদ্ধ করলে নিহত হবে। মানুষ তাও মানে না এবং জেহাদ করে।”


এর পর রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী  ওয়া সাল্লাম) বলেন : যে ব্যক্তি এভাবে শয়তানের কথা অমান্য করবে, আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তাকে জান্নাতে দাখিল করবেন। এর পর রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী  ওয়া সাল্লাম) কুমন্ত্রণার কথা উল্লেখ করে বললেন : কুমন্ত্রণা মনের এমন কিছু কল্পনা, যেমন জেহাদকারী ভাবতে থাকে, আমি মারা গেলে আমার স্ত্রী অপরের বিবাহিত হয়ে যাবে। এ ধরনের কল্পনার আসল কারণ শয়তান। এই শয়তান থেকে মানুষের পৃথক হওয়া উদ্দেশ্য নয়; বরং তার আদেশ অমান্য করাই উদ্দেশ্য। এ ব্যাপারে মানুষের অবস্থা বিভিন্ন রূপ।


এখন কেউ প্রশ্ন করতে পারে, শয়তান কি বস্তু, সূক্ষ্ম শরীরী কিনা? শরীরী হয়ে মানবদেহে কিরূপে প্রবেশ করে? এ ধরনের প্রশ্ন ঠিক এমন, যেমন কারও কাপড়-চোপড়ে সাপ ঢুকে গেলে সে সাপের অনিষ্ট থেকে মুক্তি লাভের উপায় চিন্তা করে না; বরং প্রশ্ন করতে থাকে, সাপের রং ও আকৃতি কিরূপ এবং দৈর্ঘ্য প্রস্থ কি? এরূপ প্রশ্ন নিছক মূৰ্খতা ছাড়া কিছু নয়। উপরোক্ত বর্ণনা থেকে দুশমন তথা শয়তানের অস্তিত্ব তো নিশ্চিতরূপেই জানা গেল। এখন চেষ্টা করা উচিত যাতে এই দুশমন ক্ষতি সাধন করতে না পারে। এ উদ্দেশেই আল্লাহ্ তাআলা কেরআন পাকে অধিকাংশ স্থানে এরশাদ করেছেন, মানুষ শয়তানকে বিশ্বাস করে তার অনিষ্ট থেকে আত্মরক্ষা করুক। এক জায়গায় বলা হয়েছে : “নিশ্চয় শয়তান তোমাদের দুশমন। অতএব তাকে দুশমনরূপেই গ্রহণ কর। সে তার দলবলকে আহ্বান করে যাতে তারা জাহান্নামী হয়ে যায়।”


অন্যত্র বলা হয়েছে :

“হে আদম সন্তানরা ! আমি কি তোমাদেরকে বলে রাখিনি যে, তোমরা শয়তানের আরাধনা করো না, সে তো তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন।”

অতএব, এ দুশমন থেকে বেঁচে থাকাই মানুষের কর্তব্য। এটা জিজ্ঞেস করা নয় যে, তার বংশ কি এবং বাসস্থান কোথায়? হাঁ, জিজ্ঞেস করার উপযুক্ত বিষয় হচ্ছে, এই দুশমনের হাতিয়ার কি কি? উপরে বর্ণিত হয়েছে, শয়তানের হাতিয়ার হচ্ছে কামপ্রবৃত্তি। আলেমদের জন্য এতটুকু জানাই যথেষ্ট, কিন্তু তার সত্তাকে চেনা এবং ফেরেশতাদের স্বরূপ জানা এটা আরেফ তথা বিভুজ্ঞানীদের বিষয়, যারা কাশফে ডুবে থাকে।


পরবর্তী পর্ব-

শয়তানের সত্তাকে চেনার উপায়

অন্তর বা হৃদয় (১৩) কুমন্ত্রণার মাধ্যমে অন্তরের উপর শয়তানের প্রভাব বিস্তার



অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ১৩) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

কুমন্ত্রণার মাধ্যমে অন্তরের উপর শয়তানের প্রভাব বিস্তার
মানুষের অন্তরে একের পর এক যে সকল প্রভাব আসে, তার ফলে অন্তর পরিবর্তিত হতে থাকে, সেগুলোকে 'খাওয়াতির' বলা হয়। খাওয়াতির থেকে প্রবণতা এবং প্রবণতা থেকে সংকল্প, ইচ্ছা ও নিয়ত গতিশীল হয়। খাওয়াতির দু'প্রকার- শুভ ও অশুভ। অশুভ খাওয়াতিরের পরিণতি ক্ষতিকর হয় এবং শুভ খাওয়াতির দ্বারা আখেরাতে উপকার পাওয়া যায়। শুভ খাওয়াতিরকে এলহাম এবং অশুভ খাওয়াতিরকে ওয়াসত্তয়াসা তথা সন্দেহ, শংকা ও কুমন্ত্রণা বলা হয়। শুভ খাওয়াতিরের মূল কারণ ফেরেশতা এবং অশুভ খাওয়াতিরের মূল উদগাতা শয়তান। ফেরেশতা এমন এক মখলুককে বলা হয়, যাকে আল্লাহ তাআলা কল্যাণ ও জ্ঞান পৌছানো, সত্য কাশফ, মঙ্গলের ওয়াদা এবং সৎকাজের আদেশ করার জন্যে সৃষ্টি করেছেন। পক্ষান্তরে শয়তান এমন এক মখলুক, যার কাজ এর বিপরীত; অর্থাৎ অনিষ্টের ওয়াদা, অশ্লীল কাজের আদেশ এবং দান খয়রাতের সময় দারিদ্র্যের ভয় দেখানো ইত্যাদি। এ থেকে জানা গেল, কুমন্ত্রণার বিপরীত হচ্ছে এলহাম এবং শয়তানের বিপরীত ফেরেশতা। মানুষের অন্তর সদা-সর্বদা এই শয়তান ও ফেরেশতার টানাহেঁচড়ার মধ্যে অবস্থান করে। হাদীস শরীফে বলা হয়েছে :

অন্তরে দু'ধরনের উঠানামা হয়। একটি ফেরেশতার তরফ থেকে। তার কাজ হল মঙ্গলের ওয়াদা প্রদান এবং সত্য বিষয়কে সত্য জানা। যে এটা অনুভব করে, তার জানা উচিত, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং তার কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত। অপর উঠানামা শত্রু অর্থাৎ শয়তানের পক্ষ থেকে। তার কাজ হল অনিষ্টের ওয়াদা দেয়া এবং সত্যকে মিথ্যা মনে করা। যে এটা অনুভব করে, সে যেন বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করে।


এর পর রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) এ আয়াতটি পাঠ করলেন : “শয়তান তোমাদেরকে দারিদ্র্যের ওয়াদা দেয় এবং অশ্লীল কাজের আদেশ করে।”


হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন : ইচ্ছা অন্তরের চারপাশে ঘুরাফেরা করে। এক প্রকার ইচ্ছা আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং এক প্রকার শত্রুর পক্ষ থেকে। অতএব আল্লাহ সেই বান্দার প্রতি রহম করুন, যে ইচ্ছা করার সময় বিরাম দেয়। যদি ইচ্ছাটি আল্লাহর পক্ষ থেকে জানে, তবে তা কার্যকর করে। আর যদি শত্রুর পক্ষ থেকে জানে, তবে তার সাথে যুদ্ধ করে। অন্তরের এই টানাহেঁচড়ার প্রতি নিম্নোক্ত হাদীসে ইশারা করা হয়েছে- “মুমিনের অন্তর আল্লাহ্ তাআলার দু'অঙ্গুলির ফাঁকে অবস্থান করে।”

কেননা, আল্লাহ্ তাআলা এ বিষয় থেকে মুক্ত ও পবিত্র যে, তাঁর অস্থি ও রক্তমাংসে গঠিত অঙ্গুলি হবে। বরং এর অর্থ হচ্ছে, মানুষ যেমন অঙ্গুলি দ্বারা দ্রুত কাজ করে এবং অপরের দ্রুততাকে অঙ্গুলি হেলিয়ে ব্যক্ত করে, তেমনি আল্লাহ তাআলা ফেরেশতা ও শয়তানকে কাজে লাগান। এরা উভয়ই অন্তর পরিবর্তনে মানুষের অঙ্গুলির মতই।

জন্মগতভাবেই অন্তরের মধ্যে ফেরেশতার প্রভাব ও শয়তানের প্রভাব কবুল করার যোগ্যতা সমান সমান। একটির অগ্রাধিকার অপরটির উপর নেই। হাঁ, কামপ্রবৃত্তির অনুসরণ ও বিরোধিতার মাধ্যমে একটি অপরটির উপর প্রবল হয়ে যায়। অর্থাৎ, মানুষ যদি কাম ও ক্রোধের দাবী অনুযায়ী কাজ করে, তবে শয়তান তার উপর প্রবল হয়ে যায়। তখন তার অন্তর শয়তানের    আশ্রয়স্থল ও ঠিকানা  হয়ে যায় কেননা, কামপ্রবৃত্তিই শয়তানের বিচরণ ক্ষেত্র। 

পক্ষান্তরে যদি কেউ কামপ্রবৃত্তিকে পরাভূত করে ফেরেশতাসুলভ চরিত্র অবলম্বন করে, তবে তার অন্তর ফেরেশতাদের মনযিল ও বাসস্থান হয়ে যায়। যেহেতু মানুষের অন্তরে কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ ইত্যাদি সকল প্রবৃত্তি বিদ্যমান আছে, তাই প্রত্যেক অন্তরে শয়তানেরও কুমন্ত্রণা দেয়ার অবকাশ আছে। এ কারণেই হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, “তোমাদের প্রত্যেকেরই একটি শয়তান আছে।” সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, আপনারও হে আল্লাহর রসূল? উত্তর হল : “আমারও, কিন্তু আমার শয়তান মুসলমান হয়ে গেছে। ফলে ভাল ছাড়া মন্দ আদেশ দেয় না।”


বলাবাহুল্য, কামপ্রবৃত্তির মাধ্যমেই শয়তান অন্তরে প্রভাব বিস্তার করে। অতএব আল্লাহ তাআলা যার প্রতি কৃপা করেন কামপ্রবৃত্তিকে তার এমন অনুগত করে দেন যে, উপযুক্ত সীমা ছাড়া তা প্রকাশ পায় না, তার কামপ্রবৃত্তি তাকে অনিষ্টের দিকে আহ্বান করে না, বরং শয়তান তাকে মঙ্গলের কথা ছাড়া কিছু বলে না। অন্তর যখন আল্লাহর যিকিরে মশগুল হয়, তখন শয়তান সুযোগ পায় না এবং চলে যায়। এ সময় ফেরেশতা তার কাজ করে। অন্তরে ফেরেশতা ও শয়তানের লশকরদের দ্বন্দ্ব সব সময় লেগেই থাকে, যে পর্যন্ত অন্তর এক লশকরের অনুগত না হয়ে যায়। যে লশকর বিজয়ী হয়, অন্তর তারই আবাসস্থল হয়ে যায়। অপর লশকরের আগমন হলেও তা সংঘর্ষের আকারে হয়ে থাকে।

কিন্তু অধিকাংশ অন্তরের অবস্থা হচ্ছে, শয়তানের লশকর তাদেরকে বিজিত ও বশীভূত করে নিয়েছে এবং তাদের মালিক হয়ে বসেছে। এরূপ অন্তর কুমন্ত্রণায় পরিপূর্ণ। তারা দুনিয়াকে আখেরাতের উপর অগ্রাধিকার দিয়ে রেখেছে। শয়তানের জোর কম না হওয়া পর্যন্ত এসব অন্তর ফেরেশতার বশীভূত হবে না। 

শয়তানের জোর কম করার উপায় হচ্ছে, কামপ্রবৃত্তি ও খেয়ালখুশী থেকে অন্তরকে খালি করা এবং আল্লাহ্ যিকির দ্বারা তা পূর্ণ করা। এভাবেই ফেরেশতার প্রভাব অন্তরে নেমে আসে। 

জাবের ইবনে ওবায়দা আদভী বলেন : আমি আলা ইবনে যিয়াদকে জিজ্ঞেস করলাম, আমার অন্তরে কুমন্ত্রণা হয় কেন? তিনি বললেন : এটা ঠিক এমন, যেমন এক গৃহে চোর প্রবেশ করল। যদি গৃহে কিছু থাকে, তবে চোর মরিয়া হয়ে তা নিয়ে যাবে। আর যদি কিছু না থাকে, তবে খালি হাতেই চলে যাবে। উদ্দেশ্য হচ্ছে, যে অন্তর কামপ্রবৃত্তি ও খেয়ালখুশী থেকে খালি থাকে, তাতে শয়তান প্রবেশ করে না, করলেও খালি হাতে ফিরে যায়। এ কারণেই আল্লাহ বলেন, “(হে শয়তান!) যারা আমার বান্দা, তাদের উপর তোমার কোন ক্ষমতা চলবে না।”

সুতরাং যে ব্যক্তি খেয়ালখুশীর অনুসরণ করে, সে যেন আল্লাহর বান্দা নয়। তাকে খেয়ালখুশীর বান্দা বলা দরকার। সেমতে অন্য আয়াতে বলা হয়েছে- “যে ব্যক্তি তার খেয়ালখুশীকে উপাস্য করে নিয়েছে”।

এতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, খেয়ালখুশীর অনুসরণকারী খেয়ালখুশীর বান্দা। এরূপ ব্যক্তির উপরই আল্লাহ তাআলা শয়তানকে বিজয়ী করে দেন। 



পরবর্তী পর্ব-

শয়তান থেকে আত্মরক্ষার উপায় 

অন্তর বা হৃদয় (১২) সুফী সম্প্রদায়ের শিক্ষা পদ্ধতি সঠিক হওয়ার প্রমাণ



অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ১২) 
এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

সুফী সম্প্রদায়ের শিক্ষা পদ্ধতি সঠিক হওয়ার প্রমাণ
জানা উচিত, যার অন্তরে সামান্য বিষয়ও এলহামের পথে উন্মোচিত হয়, তাকেই ‘আরেফ' (বিভুজ্ঞানী) বলা হবে। আর যার অন্তর কখনও এরূপ অনুভব করে না, তারও এ বিষয়টি বিশ্বাস করা উচিত। কেননা, মারেফত তথা বিভুজ্ঞান মানুষের একটি মজ্জাগত ব্যাপার। এর পক্ষে শরীয়তসম্মত প্রমাণ অভিজ্ঞতা ও কাহিনী বিদ্যমান আছে। প্রমাণ এই আল্লাহ তা'আলা বলেন,- “যারা আমার পথে সাধনা ও অধ্যবসায় করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে পথ প্রদর্শন করি ।”


অর্থাৎ কাশফ ও এলহামের পদ্ধতিতে তাদের অন্তর থেকে প্রজ্ঞা প্রকাশ পায়। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন, - যে ব্যক্তি তার এলেম অনুযায়ী আমল করে, আল্লাহ তাআলা তাকে সেই বিষয়ের এলেম দান করেন, যা সে জানে না। তাকে আমল করার তওফীক দেন। ফলে সে জান্নাতের হকদার হয়ে যায়। আর যে ব্যক্তি তার এলেম অনুযায়ী আমল করে না, সে জানা বিষয়ে হয়রান হয় এবং আমল করার তওফীক পায় না। ফলে সে জাহান্নামের উপযুক্ত হয়ে যায়।


আল্লাহ তা'আলা বলেন,

“যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্যে নিষ্কৃতির পথ করে দেন এবং তাকে ধারণাতীত স্থান থেকে রিযিক পৌঁছান।”

অর্থাৎ আপত্তি ও সন্দেহ থেকে নিষ্কৃতির পথ করে দেন, জ্ঞান ও মেধা শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতা ছাড়াই দান করেন।


আরও বলা হয়েছে:

“মুমিনগণ, তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় কর, আল্লাহ তোমাদেরকে সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী বিষয় দান করবেন।”

এখানে ‘ফোরকান' মানে নূর, যদ্দ্বারা সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করে সন্দেহ থেকে আত্মরক্ষা করা যায়। এ কারণেই রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) দোয়ার মধ্যে প্রায়ই এই নূর প্রার্থনা করতেন এবং বলতেন : “হে আল্লাহ, আমাকে নূর দান করুন, আমার নূর বৃদ্ধি করুন, আমার অন্তরে নূর দিন এবং আমার কলবে ও আমার নয়নে নূর দিন। এমনকি, তিনি আরও বলতেন : আমার কেশ ও রক্ত-মাংসে এবং অস্থির মধ্যে নূর দান করুন। 


আল্লাহ তায়ালা বলেন,

-“আল্লাহ যার বক্ষ ইসলামের জন্যে উন্মুক্ত করে দেন, সে তার রবের পক্ষ থেকে একটি নূরের উপর থাকে।”

এই আয়াতের তফসীর প্রসঙ্গে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-উনাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি এরশাদ করেন : এর অর্থ বক্ষের প্রশস্ততা। অর্থাৎ অন্তরে যখন নূর ঢেলে দেয়া হয়, তখন তার জন্যে বক্ষ প্রশস্ত হয়ে যায়। তিনি হযরত ইবনে আব্বাস (রঃ)-এর জন্যে এই দোয়া করেন- “হে আল্লাহ, তাকে ধর্মীয় বোধশক্তি দান করুন এবং ব্যাখ্যা শিক্ষা দিন।”


হযরত আলী (রাঃ) বলেন : রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) কোন কথা গোপনে বলেননি, কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তাঁর কোন কোন বান্দাকে কিতাবুল্লাহর জ্ঞান দান করেন। এটা শেখার মাধ্যমে অর্জিত হয় না।-“আল্লাহ যাকে ইচ্ছা 'হেকমত' দান করেন”- এই আয়াতে কেউ কেউ হেকমতের অর্থ করেছেন আল্লাহর কিতাবের জ্ঞান। - আমি সোলায়মানকে তা বুঝিয়ে দিলাম। এখানে কাশফের মাধ্যমে সোলায়মান (আঃ) যা বুঝেছিলেন, তাকেই 'বুঝিয়ে দিলাম' বলে ব্যক্ত করা হয়েছে। হযরত আবু দারদা (রাঃ) বলেন : মুমিন সেই ব্যক্তি, যার দৃষ্টিতে আল্লাহর নূর দ্বারা পর্দার অন্তরালের বস্তু ভেসে উঠে। তিনি কসম খেয়ে বলেন : নির্ঘাত সত্য হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা সত্য বিষয় মুমিনদের অন্তরে ঢেলে দেন এবং মুখে উচ্চারিত করে দেন। হাদীস শরীফে আছে :

“মুমিনের দূরদর্শিতাকে ভয় কর। কেননা, সে আল্লাহ তা'আলার নূর দ্বারা দৃষ্টিপাত করে।”


হযরত ইমাম হাসান (রাঃ)-এর রেওয়ায়েতে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেনঃ

এলেম দু'প্রকার। এক এলেম অন্তরে লুক্কায়িত। এটাই উপকারী এলেম। জনৈক আলেমকে অন্তরে লুক্কায়িত এলেমের অর্থ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন : এটা আল্লাহ তা'আলার রহস্যাবলীর অন্যতম, যা তিনি আপন ওলীদের অন্তরে ঢেলে দেন। কোন ফেরেশতা কিংবা মানুষ তা অবগত নয়। কোরআন শরীফে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, তাকওয়া হেদায়াত ও কাশফের চাবি। এই হেদায়াত ও কাশফকেই শিক্ষা ব্যতীত জ্ঞান বলা হয়। এরশাদ হয়েছে - “এটা মানুষের জন্যে বর্ণনা এবং তাকওয়া বিশিষ্টদের জন্যে হেদায়াত ও উপদেশ।”


এখানে হেদায়াতের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে তাকওয়া বিশিষ্টদের উল্লেখ করা হয়েছে। আবু ইয়াযীদ বলতেন : আলেম সেই ব্যক্তির নাম নয়, যে কোরআনের কিছু অংশ মুখস্থ করে নেয়, এর পর যখন তা বিস্মৃত হয়, তখন মূর্খ কথিত হয়। বরং আলেম তাকে বলা হয়, যে পরওয়ারদেগারের কাছ থেকে যখন ইচ্ছা পাঠ ও মুখস্থ করা ছাড়া বস্তুনিচয়ের জ্ঞান অর্জন করে নেয়। এরূপ জ্ঞানকেই এলমে রব্বানী বলা হয়।(আমি তাকে আমার পক্ষ থেকে এলম দিয়েছি।) আয়াতে এই এলেমের দিকেই ইঙ্গিত রয়েছে। নতুবা সকল এলেমই তাঁর তরফ থেকে। তফাৎ হচ্ছে, কতক জ্ঞান শিক্ষাদানের মাধ্যমে হয়, তাকে ‘এলেমে লাদুন্নী' বলা হয় না। বরং যে এলেম বাইরের কোন অভ্যস্ত কারণ ছাড়াই অন্তরে উপস্থিত হয়, তাকেই এলমে লাদুন্নী বলা হয়। এ সম্পর্কে অসংখ্য আয়াত ও হাদীসের মধ্য থেকে এখানে কিঞ্চিত উল্লেখ করা হল।


এখন এ সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা বর্ণনা করা হচ্ছে, যা অনেক সাহাবী, তাবেঈ ও পরবর্তী বুযুর্গগণের হয়েছে। 


বর্ণিত আছে, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) ইন্তেকালের পূর্ব মুহূর্তে কন্যা আয়েশাকে বললেন : তোমরা দু'ভাই ও দু'বোন। অথচ তাঁর পত্নী তখন গর্ভবতী ছিলেন এবং পরে কন্যা জন্মগ্রহণ করেছিল। এখানে তিনি জন্মের পূর্বেই জেনে নেন যে, কন্যা জন্মগ্রহণ করবে। 


হযরত ওমর (রাঃ) জুমুআর খোতবার মাঝখানে বলে উঠেন (যার অর্থ তোমরা আত্মরক্ষা কর) তিনি কাশফের মাধ্যমে জানলেন যে, যুদ্ধক্ষেত্রে মুসলিম বাহিনীকে শত্রু সৈন্যরা ধাওয়া করছে। তখনই তিনি মুসলিম বাহিনীকে পাহাড়ের দিকে সরে যেতে আহ্বান করলেন। তাঁর এই কণ্ঠস্বর যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যদের কানে পৌঁছে যাওয়া একটি বড় কারামাত। 

আনাস ইবনে মালেক বর্ণনা করেন, আমি একদিন হযরত ওসমান (রাঃ)-এর খেদমতে যাওয়ার জন্যে রওয়ানা হলাম। পথিমধ্যে জনৈকা মহিলাকে পেয়ে আমি তার দিকে তাকালাম এবং তার রূপ গভীরভাবে নিরীক্ষণ করলাম। এর পর হযরত ওসমানের খেদমতে উপস্থিত হলে তিনি আমাকে বললেন : তোমাদের কেউ কেউ আমার কাছে আগমন করে এমতাবস্থায় যে, তার চোখে-মুখে যিনার চিহ্ন থাকে। তোমার কি জানা নেই যে, কুদৃষ্টি করা হচ্ছে চোখের যিনা? তুমি তওবা কর। নতুবা তোমাকে সাজা দেব। আমি জিজ্ঞেস করলাম : রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর পরেও ওহী আগমন করে কি? তিনি বললেন : না, কিন্তু অন্তর্দৃষ্টি ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে জানা যায়। 


আবু সাঈদ খেরাম বর্ণনা করেন, একবার আমি হেরেম শরীফে গেলাম। সেখানে খেরকা পরিহিত এক ফকীরকে দেখে মনে মনে বললাম : এ ধরনের মানুষই সমাজের উপর বোঝা হয়ে থাকে। ফকীর তৎক্ষণাৎ আমাকে কাছে ডাকল এবং বললঃ আল্লাহ তোমাদের মনের কথা জানেন। অতএব সাবধান হয়ে যাও। এতে আমি মনে মনে এস্তেগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করলাম। এর পর ফকীর সজোরে বলল : 

“তিনি (আল্লাহ) বান্দার তওবা কবুল করেন।” একথা বলে ফকীর আমার দৃষ্টি থেকে উধাও হয়ে গেল। 


যাকারিয়া ইবনে দাঊদ রেওয়ায়েত করেন, একবার আবুল আব্বাস ইবনে মসরূক অসুস্থ আবুল ফযল হাশেমীকে দেখতে যান। আবুল ফযল ছিলেন ছাপোষা নিঃস্ব ব্যক্তি। জীবন যাপনের জন্যে বাহ্যিক কোন উপকরণ তার ছিল না। আবুল আব্বাস যখন প্রস্থানোদ্যত হলেন, তখন মনে মনে চিন্তা করলেন, ইয়া আল্লাহ! এ লোকটি কোত্থেকে খাবার সংগ্রহ করে? তৎক্ষণাৎ আবুল ফযল তাকে ডেকে বললেন : খবরদার! কখনও এরূপ অনর্থক কথা চিন্তা করো না। আল্লাহ্ তাআলার অদৃশ্য কৃপা অনেক।


আহমদ নকীব বর্ণনা করেন, একদিন আমি হযরত শিবলীর খেদমতে গেলাম। তিনি আমাকে লক্ষ্য করে বললেন : আহমদ, আল্লাহ তাআলা সকলকে পরিচয়ের জন্যে মস্তিষ্ক দান করেছেন। আমি বললাম : হযরত, ব্যাপার কি, একথা বলছেন কেন? তিনি বললেন : আমি এই মুহূর্তে যখন বসা ছিলাম, তখন আমার মনে ধারণা সৃষ্টি হল যে, তুমি কৃপণ। আহমদ বললেন : হযরত, আমি তো কৃপণ নই। এর পর তিনি চিন্তা করে বললেন : নিঃসন্দেহে তুমি কৃপণ। অতঃপর আমি মনে মনে সংকল্প করলাম- আজ যা কিছু পাব, তা প্রথমে যে ফকীরের সাথে সাক্ষাৎ হবে, তাকে দান করে দেব। এমনি সময় এক ব্যক্তি আমার কাছে এসে পঞ্চাশটি আশরফী দিয়ে গেল। 'আমি এগুলো নিয়ে সংকল্প অনুযায়ী রাস্তায় বের হলাম। এক জায়গায় দেখলাম, জনৈক অন্ধ ফকীর নাপিতের কাছে মাথা মুণ্ডাচ্ছে। আমি তার কাছে যেয়ে আশরফীগুলো দিতে চাইলে সে বলল : নাপিতকে দিয়ে দাও। আমি নাপিতকে দিতে গেলে বলল : এই ফকীর মাথা মুণ্ডাতে বসেছে অবধি আমি প্রতিজ্ঞা করেছি, কোন মজুরি গ্রহণ করব না। অগত্যা আমি আশরফীগুলো নদীতে নিক্ষেপ করে বললাম : যে কেউ তোদের (অর্থকে) ইযযত করে, আল্লাহ্ তাকেই লাঞ্ছিত করেন।


হামযা ইবনে আবদুল্লাহ বর্ণনা করেন, আমি একবার হযরত আবুল খায়রের গৃহে রওয়ানা হলাম এবং মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম, তার গৃহে কিছু খাব না। যখন আমি গৃহ থেকে বের হলাম, তখন দেখলাম, তিনি খাদ্যের একটি খাঞ্চা নিয়ে আমার গৃহে আসছেন। তিনি বললেন : নাও, এখন খাও। এটা তো আমার গৃহ নয়। এই বুযুর্গের অনেক প্রসিদ্ধ কারামত আছে। সেমতে ইবরাহীম রকী রেওয়ায়েত করেন, আমি একবার তার সাথে দেখা করতে গেলাম। তিনি মাগরিবের নামায পড়ালেন, কিন্তু সূরা ফাতেহাও ভালরূপে পড়তে পারলেন না। আমি মনে মনে চিন্তা করলাম, তার কাছে আসা সম্পূর্ণ নিরর্থক হয়েছে। নামাযের পর আমি এস্তেঞ্জার জন্যে বাইরে গেলাম। একটি সিংহ আমার পথ রোধ করে দাঁড়াল । আমি আবুল খায়রের কাছে ফিরে এসে ঘটনা বিবৃত করলে তিনি সেখান থেকেই সিংহকে ভর্ৎসনা করে বললেন : কি হে, আমি কি বলিনি, আমার মেহমানদের কোন অসুবিধা করবে না? একথা শুনেই সিংহ সরে গেল। প্রয়োজন সেরে যখন আমি ফিরে এলাম, তখন তিনি বললেন : তুমি তোমার বাহ্যিক দিকটাকে সোজা করেছ। তাই সিংহকে দেখে ভয় পেয়েছ, কিন্তু আমি আমার বাতেন (অভ্যন্তর) ঠিক করেছি। তাই সিংহ আমাকে ভয় করে। এমনি ধরনের আরও অসংখ্য কাহিনী থেকে মাশায়েখের অন্তর্দৃষ্টি, মানুষের মনের কথা জানা এবং তাদের অন্তরের বিশ্বাস বলে দেয়ার বিষয় অবগত হওয়া যায়। হাঁ, যে অস্বীকার করে, তার জন্যে এসব কাহিনী যথেষ্ট নয়, কিন্তু দু'টি অকাট্য দলীল আছে, যেগুলো কেউ অস্বীকার করতে পারে না। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে অভূতপূর্ব সত্য স্বপ্ন, যদ্বারা অবস্থা উন্মোচিত হয়। কেননা, স্বপ্নে এখন অদৃশ্য জগতের অবস্থা ফুটে উঠা সম্ভবপর হয়, তখন জাগ্রত অবস্থায় এরূপ হওয়া অসম্ভব নয়। কেননা, উভয় অবস্থার মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে, স্বপ্নে ইন্দ্রিয় অচল হয়ে থাকে এবং বাহ্যিক অনুভূত বিষয়সমূহের মধ্যে লিপ্ত হয় না । এটা প্রায়ই জাগ্রত অবস্থায়ও সংঘটিত হয়। যেমন কেউ যখন কোন বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তামগ্ন থাকে, তখন না শুনে কোন আওয়ায এবং না দেখে কোন বস্তু।


দ্বিতীয় দলীল হচ্ছে অদৃশ্য জগত ও ভবিষ্যত বিষয়াদি সম্পর্কে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর সংবাদ প্রদান করা। কোরআন ও হাদীস দ্বারা এটা প্রমাণিত। এটা যখন নবীর জন্যে প্রমাণিত হল, তখন নবী নয় – এমন ব্যক্তির জন্যেও প্রমাণিত হতে পারে। কেননা, নবী এমন ব্যক্তিকে বলা হয়, যিনি কাশফের মাধ্যমে বিষয়সমূহের স্বরূপ জেনে নেন এবং সংস্কার কাজে মশগুল থাকেন। অতএব এরূপ কোন ব্যক্তি থাকাও সম্ভব, যিনি কাশফের মাধ্যমে বিষয়সমূহের স্বরূপ জানবেন; কিন্তু সংস্কার কাজে মশগুল থাকবেন না। এরূপ ব্যক্তিকে নবী না বলে ওলী বলা হবে। এখন যে ব্যক্তি নবীগণকে মানবে এবং সত্য স্বপ্নের সত্যায়ন করবে, তাকে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, অন্তরের দু'টি দরজা রয়েছে- একটি বহির্জগত অর্থাৎ, ইন্দ্রিয়ের দিকে এবং অপরটি ঊর্ধ্বজগতের দিকে, একেই বলা হয় এলহাম ও ওহী। এ দু'টি দরজা স্বীকার করে নিলে কেউ একথা বলতে পারবে না যে, এলেম কেবল শিক্ষা ও অভ্যস্ত কারণসমূহের মধ্যেই সীমিত।



বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...