রবিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৩

জ্ঞান ও জ্ঞানার্জন (৪) জ্ঞান অন্বেষনের মাহাত্ম্য



জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ৪)
এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

জ্ঞান অন্বেষনের মাহাত্ম্য
এ সম্পর্কিত আয়াত সমুহ নিম্নরূপ :
এ সম্পর্কিত আয়াত সমুহ নিম্নরূপ :
"তাদের প্রতিটি দল থেকে কিছু লোক কেন বের হয়না, যাতে তারা দ্বীন সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে?"
"অতএব যারা স্মরণ রাখে, তাদের কাছে জিজ্ঞেস কর যদি তোমরা না জান।"
হাদীস নিম্নরূপ :
>"যে ব্যক্তি জ্ঞান অম্বেষন করে চলে, আল্লাহ্ তাকে জান্নাতের পথে চালাবেন।"
> "ফেরেশতারা জ্ঞান অন্বেষনকারীর কাজে সন্তুষ্ট হয়ে তার জন্যে পাখা বিছিয়ে দেন"।
> "এক'শ রাকাত নামাজ পড়া অপেক্ষা জ্ঞানের কোন অধ্যায় শিক্ষা করা উত্তম"।
> "জ্ঞানের কোন অধ্যায় শিক্ষা করা মানুষের জন্য পৃথিবী ও পৃথিবীস্থিত সব কিছু থেকে উত্তম"।
> "জ্ঞান অন্বেষন কর; যদিও তা চীনে থাকে; অর্থাৎ অনেক দুরে থাকে"।
> "জ্ঞান অন্বেষন করা প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরয"।
> "জ্ঞান একটি ভান্ডার যার চাবি হচ্ছে প্রশ্ন করা। সুতরাং জ্ঞান সম্পর্কিত বিষয়ে প্রশ্ন কর। কেননা এতে চার ব্যাক্তি সওয়াব পায়। (১) প্রশ্নকারী (২) জ্ঞানী ব্যাক্তি (৩) শ্রোতা এবং (৪) যে তাদের প্রতি মহব্বত রাখে।"
> "মূর্খ ব্যাক্তি যেন তার মূর্খতা নিয়ে বসে না থাকে। জ্ঞানী ব্যাক্তিরও তার জ্ঞান নিয়ে চুপ থাকা উচিৎ নয়।" অর্থাত মূর্খতা দূর করার জন্যে প্রশ্ন করবে আর জ্ঞানী ব্যাক্তি তার জওয়াব দিবে।
হযরত আবু যর (রঃ)-এর হাদীসে বলা হয়েছে :
>"জ্ঞান সংক্রান্ত মজলিশে হাজির হওয়া- হাজার রাকাত নামাজ পড়া, হাজার রোগীর খবর নিতে যাওয়া এবং হাজার জানাযায় যোগদান অপেক্ষা উত্তম। কেউ আরজ করল : কুরআন তেলাওয়াত অপেক্ষাও কি উত্তম? রসুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: জ্ঞান ব্যাতিত কুরআন কি উপকার করে?"
> "ইসলামকে জীবিত করার উদ্দেশ্যে জ্ঞান অন্বেষনকালে যে ব্যক্তি মৃত্যুবরন করে, জান্নাতে তার এবং পয়গম্বরগণের স্থর হবে এক।"

জ্ঞান জ্ঞানার্জন (৩) জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে সাহাবী ও তাবেয়ীগণের উক্তি


জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে সাহাবী ও তাবেয়ীগণের উক্তি

জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ৩ )
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে সাহাবী ও তাবেয়ীগণেরও অনেক উক্তি বর্নিত আছে। হযরত আলী (র.) কোমায়লকে বলেন, "হে কোমায়ল ! জ্ঞান ধন-সম্পদ অপেক্ষা উত্তম । জ্ঞান তোমার হেফাজত করে, আর তুমি ধন-সম্পদের হেফাজত কর। জ্ঞান শাসক আর ধন-সম্পদ শাসিত । ধন ব্যয় করলে হ্রাস পায় আর জ্ঞান ব্যয় করলে বেড়ে যায় ।"

তিনি (আলী র.) আরো বলেন : "জ্ঞানী ব্যক্তি রোজাদার, এবাদতকারী ও জেহাদকারী অপেক্ষা উত্তম। আলেম ব্যক্তির মৃত্যু হলে ইসলামে এমন শুন্য দেখা দেয় যা তার উত্তরশুরি ছাড়া কেউ পূরণ করতে পারে না ।" 

তার কথিত একটি আরবী অনুবাদ এরূপ : "সকল মানুষ আকার আকৃতিতে এক রূপ সকলের পিতা আদম এবং সকলের মা হাওয়া । তারা যদি মূল উপাদান দিযে গর্ব করতে চায়, তবে পানি ও মৃত্তিকা ব্যতিত তাদের মূল উপাদান আর কি? হা যার দেহে আলেমদের গর্বের আলখেল্লা আলা রয়েছে। কেননা সে নিজে যেমন পথপ্রাপ্ত, তেমনি অপরেরও পথ-প্রদর্শক। সৌন্দর্যের বস্তু তার অর্জিত রয়েছে। এটাই মানুষের মর্যাদা। 

মূর্খরা সদাই জ্ঞানীদের সাথে শত্রুতা পোষন করে। তথাপি তুমি এমন জ্ঞান অর্জন কর, যদ্বারা চিরঞ্জীব হতে পার। সকল মানুষ মৃত; কিন্তু জ্ঞানী চিরজীবী।

আবুল আসওয়াদ (রহ.) বলেন : জ্ঞানের ছেয়ে বেশী ইজ্জতের কোন কোন বিষয় নেই। বাদশাহ জনগণের শাসক হয়ে থাকে এবং জ্ঞানীরা বাদশাহদের শাসক হয়।

হযরত ইবনে আব্বাস (র.) বলেন,- হযরত সোলায়মান ইবনে দাউদ (আ.)-কে এলেম, ধন-সম্পদ ও রাজত্বের মধ্য থেকে যে কোন একটি বেছে নেয়ার ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল। তিনি এলেম পছন্দ করেছিলেন। ফলে তাকে এলেমের সাথে ধন ও রাজত্বও দেয়া হয়েছিল।

হযরত ইবনে মোবারক (রহ.)-কে কেউ জিজ্ঞাসা করল : মানুষ কে? তিনি বললেন : "সংসারবিমুখ দরবেশ।" প্রশ্ন হল : নীচ কে? উত্তর হল : "যারা নিজেদের দ্বীন বিক্রি করে খায়।" 

মোট কথা জ্ঞানী ব্যক্তি ছারা অন্য কাউকে তিনি মানুষ বলেননি। কেননা যে বৈশিষ্ট মানুষ ও চতুষ্পদ বস্তুর মধ্যে পার্থক্য সূচিত করে তা হচ্ছে জ্ঞান। মানুষ তখনই মানুষ বলে কথিত হবে যখন তার মধ্যে গৌরব ও শ্রেষ্ঠত্বের কারণ বিদ্যমান থাকবে। 

মানুষের মর্যাদা দৈহিক শক্তির কারণে নয়। কেননা, উট তার ছেয়ে বেশী শক্তির অধিকারী। মানুষের মর্যাদা বিশাল বপু হওয়ার কারণেও নয়। কেননা, হিংস্র জন্তুর বীরত্ব মানুষের ছেয়ে বড়। বরং একমাত্র জ্ঞানের দিক দিয়ে মানুষ সম্ভ্রান্ত। জ্ঞানের জন্যই মানুষ সৃ্ষ্টি। 

জনৈক দার্শনিক বলেন : কেউ আমাকে বলুক, যে ব্যক্তি এলেম পায়নি, সে কি পেয়েছে এবং যে ব্যক্তি এলেম পেয়েছে, তার পাওয়ার আর কি বাকী আছে?

ফাতাহ্ মুসেলী বলেন : রোগীকে রোজ রোজ খাদ্য, পানীয় ও ওষুধপত্র না দিলে সে কি মরে যাবেনা? লোকেরা বলল : নিসন্দেহে মরে যাবে। তিনি বললেন : আত্মার অবস্থাও তদ্রূপ। আত্মাকে তিন দিন এলেম ও জ্ঞান থেকে উপোস রাখলে সে মরে যায়। তার এ উক্তি যথার্থ। কেননা জ্ঞান ও প্রজ্ঞা হচ্ছে আত্মার খোরাক; এগুলোর মধ্যেই তার জীবন; যেমন দেহের খোরাক খাদ্য। যার জ্ঞান নেই তার অন্তর রুগ্ন। মৃত্যু তার জন্য অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তার আত্মার রোগ ও মৃত্যুর খবর রাখেনা।দুনিয়ার মহব্বত ও কাজ-কারবারে লেগে থাকার কারণে তার চেতনা লোপ পায়। যেমন ভয় ও নেশার আতিসয্যে জখমের ব্যাথা অনুভূত হয় না; যদিও বাস্তবে ব্যাথা থাকে। কিন্তু মৃত্যু যখন দুনিয়ার বোঝা ও সম্পর্ক ছিন্ন করে দেয়, তখন সে আত্মার মৃত্যুর কথা জানতে পারে এবং পরিতাপ করে। অবশ্য দহন পরিতাপে কোন উপকার হয়না। ভীত ব্যক্তির ভয় অথবা মাতালের নেশা দূর হয়ে গেলে ভয় ও নেশার অবস্থায় তার যে সব যখম লাগে, সেগুলো সে হাড়ে হাড়ে টের পেতে থাকে। সত্য উদঘাটিত হওয়ার সেই দিনের (হাসরের দিন) ভয়াবহতা থেকে আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি। কেননা এখন মানুষ ঘুমিয়ে আছে। মৃত্যু হলে জাগ্রত হবে।

হযরত হাসান বসরী (রহ.) বলেন : জ্ঞানী লোকদের লেখার কালি এবং শহীদের রক্ত ওজন করা হলে কালির ওজন বেশী হবে । 

হযরত ইবনে মাসুদ (র.) )বলেন : "হে লোকসকল ! জ্ঞান অর্জন কর জ্ঞানকে তুলে নেয়ার পূর্বে । জ্ঞান তুলে নেয়ার অর্থ জ্ঞানী লোকদের মৃত্যুবরণ করা । আল্লাহর কসম, যার হাতে আমার প্রাণ - যারা আল্লাহর পথে শহীদ হয়েছে, তারা জ্ঞানীলোকদের মাহাত্ম্য দেখে আকাঙ্ক্ষা করবে যে, আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে জ্ঞানী অবস্থায় পুনরুখ্বিত করলে ভাল হত । কেউ জ্ঞানী হয়ে জন্মগ্রহন করে না, বরং অনুশীলনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জিত হয়।"

হযরত ইবনে আব্বাস (র.) বলেন : রাতের কিছু অংশে জ্ঞান চর্চা করা আমার মতে সারারাত জাগ্রত থেকে নফল এবাদত করা অপেক্ষা উত্তম । এ বিষয়টি হযরত আবু হুরায়রা (র.) ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) থেকেও বর্ণিত আছে।

"আয় পরোয়ারদেগর আমাদেরকে ইহকালের পুণ্য এবং পরকালের পুণ্য দান করুন" এ আয়াতের তফসীর প্রসঙ্গে হযরত হাসান (রহ.) বলেন : দুনিযার পুণ্য জ্ঞান ও আরাধনা। পরকালের পুন্য অর্থ জান্নাত ।

জনৈক দার্শনিককে কেউ প্রশ্ন করল : কোন্ বস্তু সঞ্চয় করা দরকার? উত্তর হল : এমন বস্তু সঞ্চয় করা উচিৎ, যা তোমার নৌকা ডুবে গেলে তোমার সাথে সাতার কাটতে থাকে। অর্থাৎ, জ্ঞানই হচ্ছে সঞ্চয়যোগ্য বস্তু। কারণ দেহরূপী নৌকা মৃত্যুরূপী সলিলে সমাধিলাভ করলে পর এটাই সাথী থাকে।

অন্য এক দার্শনিক বলেন : "যে ব্যক্তি প্রজ্ঞাকে নিজের লাগাম বানায়ে নেয়, মানুষ তাকে ইমাম করে নেয়। যে ব্যক্তি জ্ঞানে খ্যাতি অর্জন করে মানুষ তাকে ইজ্জত সন্মানের দৃষ্টিতে দেখে।"

ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলেন : জ্ঞানের এক গৌরভ এইযে, "একে কোন ব্যক্তির সাথে সামান্যতম সম্পর্কযুক্ত করা হলে সে আনন্দিত হয়। উদাহরণত: যদি বলা হয়, অমুক ব্যক্তি এব্যাপারে জ্ঞান রাখে, তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আনন্দ অনুভব করে। পক্ষান্তরে সে এবিষয়ে জ্ঞান রাখেনা -একতা কাউকে বললে সে দুঃখিত হয়।"

হযরত ওমর বিন খাত্তাব (র.) বলেন : "হে লোকসকল! জ্ঞানব্রতী হও। আল্লাহ্ তা'আলার কাছে একটি মহব্বতের চাদর আছে। যে ব্যক্তি কোন বিষয়ে জ্ঞান অন্বেষন করে, আল্লাহ্ তা'আলা সে চাদর তাকে পরিয়ে দেন। এরপর সে ব্যক্তি কোন গুনাহ করলেও তাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি (তওবার) লাভের তওফিক দান করা হয়। পুনরায় গুনাহ্ করলেও তাকে আল্লাহ্'র সন্তুষ্টি লাভের তওফিক দান করা হয়। পুনরায় গুনাহ করলেও আল্লাহ্ তাকে ওই তওফিক দান করেন । তৃতীয়বার গুনাহ করার পরও এরূপ করা হয় । এভাবে বারবার তওফিক দানের উদ্দেশ্য হচ্ছে, তার কাছ থেকে সেই চাদরটি ছিনিয়ে না নেয়া, যদিও তার গুনাহ বৃদ্ধি পেতে পেতে মৃত্যু পর্যন্ত পৌছে ।"

আহনাফ (রহ.) বলেন, "মনে হয় জ্ঞানীগন সমগ্র ইজ্জতের মালিক হয়ে যাবে । যে ইজ্জত জ্ঞানের দ্বারা সুদৃঢ না হয় তার পরিনতি হয় লাঞ্ছনা।"

সালেম ইবনে আবী জা'দ বলেন : "আমি ক্রীতদাস ছিলাম । প্রভু আমাকে তিনশ দিরহামের বিনিময়ে মুক্ত করে দিলে আমি কি কাজ শিখে জীবিকা নির্বাহ করব সে সম্পর্কে ভাবতে লাগলাম । অবশেষে জ্ঞানকে পেশা করে নিলাম । এর পর এক বছর অতীত না হতেই শহরের শাসক আমার সাথে সাক্ষাত করতে এলেন । আমি তাকে ফিরিযে দিলাম; কাছে আসতে দিলাম না ।"

যু্হরা ইবনে আবুবকর বলেন : আমার পিতা আমাকে জ্ঞানব্রতী হতে চিটি লিখলেন । তিনি লিখলেন- যদি তুমি নিঃস্ব হয়ে যাও তবে জ্ঞান হবে তোমার ধন । আর যদি ধনাঢ্য হয়ে যাও তবে জ্ঞান হবে অঙ্গসজ্জা ।
হযরত লোকমান তাঁর ছেলেকে উপদেশ দিলেন : হে বৎস জ্ঞানীদের কাছে বস । কেননা আল্লা্হ্ তা'আলা জ্ঞানের নুর দ্বারা অন্তরকে জীবিত করেন । যমিন বৃষ্টির পানি দ্বারা মাটিকে শস্যশ্যামল করেন ।

জনৈক দার্শনিক বলেন : জ্ঞানী ব্যক্তি মারা গেলে তার জন্য পানিতে মাছ এবং শুন্যে পাখীরা পর্যন্ত ক্রন্দন করে। বাহ্যত: তাকে দেখা না গেলেও তার স্মৃতি অন্তরে জাগ্রত থাকে।

জ্ঞান জ্ঞানার্জন (২) জ্ঞানের শ্রেষ্টত্ব সম্পর্কে বর্ণিত হাদিসসমূহ



জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ২)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

জ্ঞানের শ্রেষ্টত্ব সম্পর্কে বর্ণিত হাদিসসমূহ নিম্নরূপ –
রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন : "আল্লাহ যার কল্যাণ চান তিনি তাকে দীন বিষয়ে গভীর ইলম দান করেন।" 

তিনি আরো ইরশাদ করেন - "জ্ঞানী ব্যাক্তিবর্গ পয়গন্বরগণের উত্তরাধিকারী।"
বলাবাহুল্য নবুয়তের ছেয়ে বড় কোন মর্তবা নেই। কাজেই এই মর্তবার উত্তরাধিকারী হওয়ার ছেয়ে বড় আর কোন গৌরব নেই। 

তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরো বলেন, – "জ্ঞানী ব্যাক্তির জন্য আকাশ ও পৃথিবীস্থিত সবকিছু মাগফেরাত কামনা করে।" 
সুতরাং এর চেয়ে বড় আর কি পদমর্যাদা হবে,যার কারণে আকাশ ও পৃথিবীর ফেরেশতাকুল মাগফেরতের দোয়ায় মশগুল থাকবে? জ্ঞানি ব্যাক্তি নিজের মধ্যে ব্যাপৃত থাকে, আর ফেরেস্তারা তার জন্য মাগফেরাত প্রার্থনায় নিরত থাকেন। 

রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন : "প্রজ্ঞা সম্ভ্রান্ত ব্যাক্তির মাহাত্ম্য বৃদ্বি করে। এবং গোলামের মর্যাদাও এত উচু করে যে, তাকে রাজা বাদশাদের আসনে বসিয়ে দেয়।" এ হাদীসে তিনি দুনিয়াতে জ্ঞানের ফলাফল বর্ণনা করেছেন। বলাবাহুল্য আখেরাত দুনিয়ার তুলনায় শ্রে্ষ্ঠ ও স্থায়ী।

এক হাদীসে বলা হয়েছে : "দুটি স্বভাব মুনাফেকের মধ্যে পাওয়া যায়না। - (১) সুন্দর পথ প্রদর্শন (২) ধর্ম সম্পর্কিত জ্ঞান।" 

কোন কোন সমসাময়িক ধর্ম জ্ঞানীর নেফাক (কপটতা) দেখে এ হাদীস সম্পর্জে সন্দেহ করা উচিত নয়। কেননা 'ফেকাহ্' শব্দ বলে রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সে জ্ঞান ও প্রজ্ঞাই বুঝাননি, যা তোমরা মনে কর; বরং এ শব্দের অর্থ পরে বর্ণিত হবে। ফেকাহবিদের সর্বনিম্ন স্থর হল আখেরাতকে দুনিয়া অপেক্ষা উলে বিশ্বাস করা। এ বিশ্বাস ফেকাহবিদদের কাছে সু্ষ্টু ও প্রবল হয়ে গেলে সে নেফাক ও নাম যসের মোহ থেকে মুক্ত হয়ে যায়। 

রসূল-আল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরো ইরশাদ করেন : "মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ঈমানদার সেই জ্ঞানীব্যাক্তি যার কাছে মানুষ প্রয়োজন নিয়ে আগমন করে এবং মানুষ তার প্রতি বুমুখতা প্রদর্শন করলে সে নিজেকে বিমুখ করে দেয়।"
তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরো বলেন "ঈমান নিরাভরণ। তার পোষাক হচ্ছে তাকওয়া (খোদাভীতি), তার মজ্জা হচ্ছে লজ্জা এবং তার ফল হচ্ছে জ্ঞান।" 

এক হাদীসে আছে : "মানুষের মধ্যে নবুয়তোর মর্তবার নিকটবর্তী হচ্ছে জ্ঞানী ও জেহাদকারী সম্প্রদায়। জ্ঞানী সম্প্রদায এ জন্য যে তারা মানুষকে রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) কতৃক আনীত কথাবার্তা বলে। এবং জেহাদকারীগণ এ কারণে যে তারা পয়গম্বরগণের আনীত শরীয়তের জন্য অশ্বের সাহায্যে জেহাদ করে।" 

অন্য এক হাদীসে আছে : "একটি গোষ্টির মরে যাওয়া একজন জ্ঞাণী ব্যক্তির মরেযাওয়া অপেক্ষা সহজতর।"

রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন : "মানুষ সর্ণ ও রৌপ্যের খনির মত খনি বিশেষ। অতএব যারা যাহেলিয়াতের যুগে শ্রেষ্ঠ ছিল, তারা ইসলাম যুগেও শ্রেষ্ট, যদি তারা দ্বীনের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়।"

এক হাদীসে আছে : কিয়ামতের দিন জ্ঞানীদের লেখার কালি শহীদের রক্তের সাথে ওজন করা হবে।"

আরো আছে,- "আমার উম্মতের যে ব্যক্তি চল্লিশটি হাদীস মুখস্ত করবে, সে কেয়ামতেরদিন ফেকাবিদ ও জ্ঞানীরূপে আল্লাহ্ তা'আলার সাক্ষাত লাভে ধণ্য হবে।

অন্যত্র আছে : "যে ব্যক্তি আল্লাহ্ তা'আলার দ্বীন সম্পর্কিত জ্ঞান অর্জন করবে, আল্লাহ্ তা'আলা তাকে দুঃখ থেকে বাচাবেন। এবং তাকে ধারণাতীত জায়গা থেকে জীবনোপকরন সরবরাহ করবেন।"

আরো বলা হয়েছে : "আল্লাহ্ তা'আলা হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর প্রতি এই মর্মে ওহী পাঠাইলেন, "হে ইব্রাহীম ! আমি মহা জ্ঞানী এবং প্রত্যেক জ্ঞানীকে পছন্দ করি।"

আরো আছে, "আমার উম্মতের মধ্যে দুই শ্রেণীর লোক রয়েছে, যারা ঠিক হয়ে গেলে তার অনুসারী সকল মানুষ ঠিক হয়ে যায় এবং তারা বিগড়ে গেলে সকল মানুষ বিগড়ে যায়। তাদের এক শ্রেণী হচ্ছে শাসক এবং অপর শ্রেণী হচ্ছে ফেকাহবিদ। অর্থাৎ দ্বীনি এলমে সমৃদ্ধ ব্যক্তিবর্গ।"

অন্য হাদীসে আছে : "আল্লাহ'র নৈকট্যশালী করে এমন জ্ঞান বেশী পরিমানে না থাকার দিন যদি আমার উপর আসে, তবে সেদিনের সূর্যোদয় যেন আমার ভাগ্যে না জোটে।"

এবাদত ও শাহাদতের উপর জ্ঞাণীকে শ্রেষ্ঠত্বদান প্রসঙ্গে রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : "জ্ঞাণী ব্যক্তির শ্রেষ্ঠত্ব এবাদতকারীর উপর এমনি, যেমন আমার শ্রেষ্ঠত্ব সাহাবীদের উপর।"

লক্ষ্যণীয়, এ হাদীসে রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এলেমকে কেমন করে নবুয়তের স্থরে রেখেছেন এবং জ্ঞানহীন কর্মের মর্তবা কেমন করে হ্রাস করেছেন। অথচ এবাদতকারী সদাসর্বদা যে এবাদত করে, তার জ্ঞান সে অবশ্যই রাখে। এ জ্ঞান না হলে এবাদত হবেনা।

রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন : "আলেম ব্যক্তির শ্রে্ঠত্ব এবাদত কারীর উপর তেমনি, যেমন চতুর্দশীর চাদের শ্রেষ্ঠত্ব তারকারাজির উপর হয়ে থাকে।"

তিনি আরো বলেছেন : "কেয়ামতেরদিন তিন শ্রেণীর লোক সুপারিশ করবে - পয়গম্বরগণ, অতঃপর জ্ঞানীলোকগণ, অতঃপর শহীদগণ।" এ হাদীস দ্বারা জ্ঞানের এমন মাহাত্ম্য প্রমানিত হয় যে, এটা নবুয়তের পরে এবং শাহাদতের অগ্রে। অথচ শাহাদতের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে বহু রেওয়ায়েত বর্ণিত আছে।

রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরো ইরশাদ করেন ; "আল্লাহ্ তা'আলার এবাদত কোন কিছুর মাধ্যমে ততটুকু সমৃদ্ধ হয়না, যতটুকু দ্বীনের জ্ঞানের মাধ্যমে হয়। একজন দ্বীনের জ্ঞানী ব্যক্তি শয়তানের জন্য হাজার এবাদতকারী অপেক্ষা কঠোর হয়ে থাকে। 

প্রত্যেক বস্তুর একটি স্তম্ভ আছে। এ দ্বীনের স্তম্ভ হচ্ছে ফেকাহ্ (দ্বীনি জ্ঞান)।" আরো বলা হয়েছে : ঈমানদার আলেম ঈমানদার আবেদ অপেক্ষা সত্তরগুণ শ্রেষ্ঠ।"

অন্য এক হাদীসে আছে : "তোমরা এমন যুগে রয়েছ, যখন জ্ঞানী ব্যক্তির স়ংখ্যা অনেক এবং বক্তার সংখ্যা কম। ভিক্ষুকের সংখ্য অল্প এবং দাতার সংখ্যা অধিক। এমন যুগে জ্ঞান লাভ করা অপেক্ষা আমল করা উত্তম। 

অতি সত্বর এমন যুগ আসবে, যখন জ্ঞানীর সংখ্যা হ্রাস পাবে এবং বক্তা হবে অধিক। দাতা কম হবে এবং ভিক্ষুক বেশী হবে। তখন জ্ঞান অর্জন হবে আমল অপেক্ষা উত্তম।"

রসূল।(সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরো ইরশাদ করেন : জ্ঞানী ব্যক্তি ও এবাদতকারীর মধ্যে একশ স্তরের ব্যাবধান রয়েছে। প্রত্যেক দু'স্থরের মাঝখানে এতটুকু দূরত্ব রয়েছে যতটুকু একটি দ্রুতগামী ঘোড়া সত্তর বছরে অতিক্রম করতে পারবে।"

এক হাদীসে বর্ণিত আছে, সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন : 'ইয়া রসুলআল্লাহ্,(সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম): কোন আমলটি উত্তম?" তিনি বললেন : "আল্লাহ্ তা'আলার ব্যপারে জ্ঞান।" 
সাহাবীগণ আরজ করলেন : আমরা উত্তম আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করছি। তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আবার বললেন "আল্লাহ্ তা'আলার ব্যপারে জ্ঞান" 
আবার বলা হল, আমরা আমল সম্পর্কে প্রশ্ন করছি, আপনি এলেম সম্পর্কে বলছেন! তিনি বললেন "এলেমের সমন্বয়ে অল্প আমল উপকারী হয় এবং মূর্খতার সমন্বয়ে অধিক আমলও নিষ্ফল হয়ে যায়।"

এক হাদিসে আছে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা বান্দাকে উঠাবেন। অতপর আলেমদেরকে উঠাবেন এবং তাদেরকে বলবেন, "হে জ্ঞানীগণ ! আমি তোমাদের মধ্যে যে জ্ঞান রেখেছিলাম, তা তোমাদেরকে কিছু জেনেই রেখেছিলাম।আমি তোমাদের মধ্যে আমার জ্ঞান এইজন্য রাখিনি যে, তোমাদেরকে শাস্তি দেব। যাও আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করলাম" আল্লাহ তা'আলার কাছে আমরাও এমনি আনজাম কামনা করি।

পরবর্তী পর্ব

জ্ঞান জ্ঞানার্জন (১) কোরআন মজীদে জ্ঞানের মাহাত্ম সম্পর্কিত আয়াতসমুহ



জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ১)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

কোরআন মজীদে জ্ঞানের মাহাত্ম সম্পর্কিত আয়াতসমুহ —

আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, –
"ফেরেশতা ও মধ্যপন্থী আলেমগণ সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, আল্লাহ ছারা কোন উপাস্য নেই।" এই আয়াতে আল্লাহ্ তা'আলা প্রথম পর্যায়ে নিজের সত্তা, দ্বিতীয় পর্যায়ে ফেরেস্তাকুল এবং তৃতীয় পর্যায়ে জ্ঞানীদের কথা উল্লেখ করেছেন। জ্ঞানের শ্রেষ্টত্ব, মাহাত্ম্য ও মৌলিকতা বুঝার জন্য এতটুকুই যতেষ্ট।

তিনি অন‍্যত্র ইরশাদ করেন, –
আল্লাহ আরো বলেন,- "যারা বিশ্বাসী এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ্ তা'আলা তাদের মর্তবা অনেক উচু করে দেন"।

হজরত ইবনে আব্বাস (র.) বলেন - সাধারণ মুমিনদের মর্তবা অপেক্ষা জ্ঞানী মুমিনদের মর্তবা সাতশ স্থর বেশী হবে এবং প্রত্যেক দু'স্থরের দূরত্ব হবে পাচ'শ বছরের সমান।

আল্লাহ্ তা'আলা আরো বলেন, – "জিজ্ঞেস করুন, যারা জ্ঞানী এবং জ্ঞানহীন, তারা কি সমান হতে পারে?"

তিনি অন‍্যত্র ইরশাদ করেন, –
"বলুন,আল্লাহ এবং কিতাবের জ্ঞানে জ্ঞানীরা আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষ্যদাতা রূপে যতেষ্ট।"

তিনি অন‍্যত্র ইরশাদ করেন, –
"যার কাছে কিতাবের জ্ঞান ছিল, সে বলল: আমি তাকে এনে দিচ্ছি।" এতে ব্যক্ত করা হয়েছে সে লোকটি জ্ঞানের বলেই রাণী বিলকিসের সিংহাসন এনে দিতে সক্ষম হয়েছিল।

তিনি অন‍্যত্র ইরশাদ করেন, –
"যারা জ্ঞানী ছিল, তারা বলল : তোমাদের ধ্বংশ হোক, আল্লাহ প্রদত্ত কল্যাণই বিশ্বাসী ও সৎকর্মীর জন্য উত্তম।"
এতে বলা হয়েছে, পরকালের মাহাত্ম্য শিক্ষার মাধ্যমে জানা যায়।

তিনি অন‍্যত্র ইরশাদ করেন, –
"আমি এসব দৃষ্টান্ত মানুষের জন্য বর্ননা করি। এগুলি কেবল তারাই বুঝে, যারা জ্ঞাণী।"

তিনি অন‍্যত্র ইরশাদ করেন, –
"যদি তারা বিষয়টি রাসুলের কাছে এবং গণ্যমান্যদের কাছে উপস্থাপন করত, তবে তাদের মধ্যে যারা জ্ঞানান্বেষী, তারা জেনে নিতে পারত।"
এখানে আল্লাহ্ তা'আলা পারষ্পরিক ব্যপারাদিতে তাঁর নিজের বিধান শিক্ষিতদের ইস্তেহাদের উপর ন্যস্ত করেছেন। আল্লাহর বিধান জানার ব্যাপারে তাদের মর্তবাকে পয়গম্বরগণের মর্তবার সাথে মিলিয়ে দিয়েছেন।

তিনি অন‍্যত্র ইরশাদ করেন, –
"হে বনী আদম ! আমি তোমাদের প্রতি নাযিল করেছি পোষাক, যা তোমাদের লজ্জাস্থান আবৃত করে। আর নাযিল করেছি পশম এবং পরহেযগারীসুলভ পোষাক, এটা সর্বোত্তম।"
এ আয়াতে তফসীরে কেউ কেউ বলেন: এখানে পোষাকের অর্থ শিক্ষা, পশমের অর্থ বিশ্বাস এবং পরহেযগারীসুলভ পোষাক বলে লজ্জা বুঝানো হয়েছে।

তিনি অন‍্যত্র ইরশাদ করেন, –
"আমি তোমাদের কাছে কিতাব পৌছে দিয়েছি,যা জ্ঞান সহকারে পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা করেছি।"

তিনি অন‍্যত্র ইরশাদ করেন, –
"আমি সজ্ঞানে তাদের সকল অবস্থা বর্ননা করব।"

তিনি অন‍্যত্র ইরশাদ করেন, –
"বরং এগুলু কোরআনের সুস্পষ্ট আয়াত, যা জ্ঞানপ্রাপ্তদের বক্ষে গচ্ছিত।

তিনি অন‍্যত্র ইরশাদ করেন, –
"তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে বর্ননা শিক্ষা দিয়েছেন।" এ বিষয়টি অনুগ্রহ প্রকাশের স্থলে বর্ণিত হয়েছে।

পরবর্তী পর্ব —

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...