রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন : "আল্লাহ যার কল্যাণ চান তিনি তাকে দীন বিষয়ে গভীর ইলম দান করেন।"
তিনি আরো ইরশাদ করেন - "জ্ঞানী ব্যাক্তিবর্গ পয়গন্বরগণের উত্তরাধিকারী।"
বলাবাহুল্য নবুয়তের ছেয়ে বড় কোন মর্তবা নেই। কাজেই এই মর্তবার উত্তরাধিকারী হওয়ার ছেয়ে বড় আর কোন গৌরব নেই।
তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরো বলেন, – "জ্ঞানী ব্যাক্তির জন্য আকাশ ও পৃথিবীস্থিত সবকিছু মাগফেরাত কামনা করে।"
সুতরাং এর চেয়ে বড় আর কি পদমর্যাদা হবে,যার কারণে আকাশ ও পৃথিবীর ফেরেশতাকুল মাগফেরতের দোয়ায় মশগুল থাকবে? জ্ঞানি ব্যাক্তি নিজের মধ্যে ব্যাপৃত থাকে, আর ফেরেস্তারা তার জন্য মাগফেরাত প্রার্থনায় নিরত থাকেন।
রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন : "প্রজ্ঞা সম্ভ্রান্ত ব্যাক্তির মাহাত্ম্য বৃদ্বি করে। এবং গোলামের মর্যাদাও এত উচু করে যে, তাকে রাজা বাদশাদের আসনে বসিয়ে দেয়।" এ হাদীসে তিনি দুনিয়াতে জ্ঞানের ফলাফল বর্ণনা করেছেন। বলাবাহুল্য আখেরাত দুনিয়ার তুলনায় শ্রে্ষ্ঠ ও স্থায়ী।
এক হাদীসে বলা হয়েছে : "দুটি স্বভাব মুনাফেকের মধ্যে পাওয়া যায়না। - (১) সুন্দর পথ প্রদর্শন (২) ধর্ম সম্পর্কিত জ্ঞান।"
কোন কোন সমসাময়িক ধর্ম জ্ঞানীর নেফাক (কপটতা) দেখে এ হাদীস সম্পর্জে সন্দেহ করা উচিত নয়। কেননা 'ফেকাহ্' শব্দ বলে রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সে জ্ঞান ও প্রজ্ঞাই বুঝাননি, যা তোমরা মনে কর; বরং এ শব্দের অর্থ পরে বর্ণিত হবে। ফেকাহবিদের সর্বনিম্ন স্থর হল আখেরাতকে দুনিয়া অপেক্ষা উলে বিশ্বাস করা। এ বিশ্বাস ফেকাহবিদদের কাছে সু্ষ্টু ও প্রবল হয়ে গেলে সে নেফাক ও নাম যসের মোহ থেকে মুক্ত হয়ে যায়।
রসূল-আল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরো ইরশাদ করেন : "মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ঈমানদার সেই জ্ঞানীব্যাক্তি যার কাছে মানুষ প্রয়োজন নিয়ে আগমন করে এবং মানুষ তার প্রতি বুমুখতা প্রদর্শন করলে সে নিজেকে বিমুখ করে দেয়।"
তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরো বলেন "ঈমান নিরাভরণ। তার পোষাক হচ্ছে তাকওয়া (খোদাভীতি), তার মজ্জা হচ্ছে লজ্জা এবং তার ফল হচ্ছে জ্ঞান।"
এক হাদীসে আছে : "মানুষের মধ্যে নবুয়তোর মর্তবার নিকটবর্তী হচ্ছে জ্ঞানী ও জেহাদকারী সম্প্রদায়। জ্ঞানী সম্প্রদায এ জন্য যে তারা মানুষকে রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) কতৃক আনীত কথাবার্তা বলে। এবং জেহাদকারীগণ এ কারণে যে তারা পয়গম্বরগণের আনীত শরীয়তের জন্য অশ্বের সাহায্যে জেহাদ করে।"
অন্য এক হাদীসে আছে : "একটি গোষ্টির মরে যাওয়া একজন জ্ঞাণী ব্যক্তির মরেযাওয়া অপেক্ষা সহজতর।"
রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন : "মানুষ সর্ণ ও রৌপ্যের খনির মত খনি বিশেষ। অতএব যারা যাহেলিয়াতের যুগে শ্রেষ্ঠ ছিল, তারা ইসলাম যুগেও শ্রেষ্ট, যদি তারা দ্বীনের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়।"
এক হাদীসে আছে : কিয়ামতের দিন জ্ঞানীদের লেখার কালি শহীদের রক্তের সাথে ওজন করা হবে।"
আরো আছে,- "আমার উম্মতের যে ব্যক্তি চল্লিশটি হাদীস মুখস্ত করবে, সে কেয়ামতেরদিন ফেকাবিদ ও জ্ঞানীরূপে আল্লাহ্ তা'আলার সাক্ষাত লাভে ধণ্য হবে।
অন্যত্র আছে : "যে ব্যক্তি আল্লাহ্ তা'আলার দ্বীন সম্পর্কিত জ্ঞান অর্জন করবে, আল্লাহ্ তা'আলা তাকে দুঃখ থেকে বাচাবেন। এবং তাকে ধারণাতীত জায়গা থেকে জীবনোপকরন সরবরাহ করবেন।"
আরো বলা হয়েছে : "আল্লাহ্ তা'আলা হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর প্রতি এই মর্মে ওহী পাঠাইলেন, "হে ইব্রাহীম ! আমি মহা জ্ঞানী এবং প্রত্যেক জ্ঞানীকে পছন্দ করি।"
আরো আছে, "আমার উম্মতের মধ্যে দুই শ্রেণীর লোক রয়েছে, যারা ঠিক হয়ে গেলে তার অনুসারী সকল মানুষ ঠিক হয়ে যায় এবং তারা বিগড়ে গেলে সকল মানুষ বিগড়ে যায়। তাদের এক শ্রেণী হচ্ছে শাসক এবং অপর শ্রেণী হচ্ছে ফেকাহবিদ। অর্থাৎ দ্বীনি এলমে সমৃদ্ধ ব্যক্তিবর্গ।"
অন্য হাদীসে আছে : "আল্লাহ'র নৈকট্যশালী করে এমন জ্ঞান বেশী পরিমানে না থাকার দিন যদি আমার উপর আসে, তবে সেদিনের সূর্যোদয় যেন আমার ভাগ্যে না জোটে।"
এবাদত ও শাহাদতের উপর জ্ঞাণীকে শ্রেষ্ঠত্বদান প্রসঙ্গে রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : "জ্ঞাণী ব্যক্তির শ্রেষ্ঠত্ব এবাদতকারীর উপর এমনি, যেমন আমার শ্রেষ্ঠত্ব সাহাবীদের উপর।"
লক্ষ্যণীয়, এ হাদীসে রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এলেমকে কেমন করে নবুয়তের স্থরে রেখেছেন এবং জ্ঞানহীন কর্মের মর্তবা কেমন করে হ্রাস করেছেন। অথচ এবাদতকারী সদাসর্বদা যে এবাদত করে, তার জ্ঞান সে অবশ্যই রাখে। এ জ্ঞান না হলে এবাদত হবেনা।
রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন : "আলেম ব্যক্তির শ্রে্ঠত্ব এবাদত কারীর উপর তেমনি, যেমন চতুর্দশীর চাদের শ্রেষ্ঠত্ব তারকারাজির উপর হয়ে থাকে।"
তিনি আরো বলেছেন : "কেয়ামতেরদিন তিন শ্রেণীর লোক সুপারিশ করবে - পয়গম্বরগণ, অতঃপর জ্ঞানীলোকগণ, অতঃপর শহীদগণ।" এ হাদীস দ্বারা জ্ঞানের এমন মাহাত্ম্য প্রমানিত হয় যে, এটা নবুয়তের পরে এবং শাহাদতের অগ্রে। অথচ শাহাদতের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে বহু রেওয়ায়েত বর্ণিত আছে।
রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরো ইরশাদ করেন ; "আল্লাহ্ তা'আলার এবাদত কোন কিছুর মাধ্যমে ততটুকু সমৃদ্ধ হয়না, যতটুকু দ্বীনের জ্ঞানের মাধ্যমে হয়। একজন দ্বীনের জ্ঞানী ব্যক্তি শয়তানের জন্য হাজার এবাদতকারী অপেক্ষা কঠোর হয়ে থাকে।
প্রত্যেক বস্তুর একটি স্তম্ভ আছে। এ দ্বীনের স্তম্ভ হচ্ছে ফেকাহ্ (দ্বীনি জ্ঞান)।" আরো বলা হয়েছে : ঈমানদার আলেম ঈমানদার আবেদ অপেক্ষা সত্তরগুণ শ্রেষ্ঠ।"
অন্য এক হাদীসে আছে : "তোমরা এমন যুগে রয়েছ, যখন জ্ঞানী ব্যক্তির স়ংখ্যা অনেক এবং বক্তার সংখ্যা কম। ভিক্ষুকের সংখ্য অল্প এবং দাতার সংখ্যা অধিক। এমন যুগে জ্ঞান লাভ করা অপেক্ষা আমল করা উত্তম।
অতি সত্বর এমন যুগ আসবে, যখন জ্ঞানীর সংখ্যা হ্রাস পাবে এবং বক্তা হবে অধিক। দাতা কম হবে এবং ভিক্ষুক বেশী হবে। তখন জ্ঞান অর্জন হবে আমল অপেক্ষা উত্তম।"
রসূল।(সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরো ইরশাদ করেন : জ্ঞানী ব্যক্তি ও এবাদতকারীর মধ্যে একশ স্তরের ব্যাবধান রয়েছে। প্রত্যেক দু'স্থরের মাঝখানে এতটুকু দূরত্ব রয়েছে যতটুকু একটি দ্রুতগামী ঘোড়া সত্তর বছরে অতিক্রম করতে পারবে।"
এক হাদীসে বর্ণিত আছে, সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন : 'ইয়া রসুলআল্লাহ্,(সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম): কোন আমলটি উত্তম?" তিনি বললেন : "আল্লাহ্ তা'আলার ব্যপারে জ্ঞান।"
সাহাবীগণ আরজ করলেন : আমরা উত্তম আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করছি। তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আবার বললেন "আল্লাহ্ তা'আলার ব্যপারে জ্ঞান"
আবার বলা হল, আমরা আমল সম্পর্কে প্রশ্ন করছি, আপনি এলেম সম্পর্কে বলছেন! তিনি বললেন "এলেমের সমন্বয়ে অল্প আমল উপকারী হয় এবং মূর্খতার সমন্বয়ে অধিক আমলও নিষ্ফল হয়ে যায়।"
এক হাদিসে আছে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা বান্দাকে উঠাবেন। অতপর আলেমদেরকে উঠাবেন এবং তাদেরকে বলবেন, "হে জ্ঞানীগণ ! আমি তোমাদের মধ্যে যে জ্ঞান রেখেছিলাম, তা তোমাদেরকে কিছু জেনেই রেখেছিলাম।আমি তোমাদের মধ্যে আমার জ্ঞান এইজন্য রাখিনি যে, তোমাদেরকে শাস্তি দেব। যাও আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করলাম" আল্লাহ তা'আলার কাছে আমরাও এমনি আনজাম কামনা করি।