নির্জনবাস (পর্ব- ৬)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
নির্জনবাসের অনিষ্ট—
এখন আমরা নির্জনবাসের অনিষ্ট বর্ণনায় প্রবৃত্ত হচ্ছি। প্রকাশ থাকে যে, যে সকল ইহলৌকিক ও পারলৌকিক উদ্দেশ্য অপরের সাহায্যে অর্জিত হয়, সেগুলো মেলামেশা ছাড়া অর্জিত হতে পারে না।
বলাবাহুল্য, নির্জনবাস অবলম্বন করলে এ সকল উদ্দেশ্য ফওত হয়ে যাবে। এগুলোর ফওত হওয়াই নির্জবাসের ক্ষতি। এখন মেলামেশার উপকারিতা সমূহের প্রতি লক্ষ্য করলে বুঝা যাবে, নির্জনবাসের কারণে এতগুলোর উপকারিতা হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। সুতরাং এগুলোই হচ্ছে নির্জনবাসের অনিষ্ট তথা বিপদ। নিম্নে বিপদগুলো এক একটি করে বিস্তারিত বর্ণনা করা হচ্ছে।
[১] নির্জনবাসের প্রথম বিপদ হচ্ছে, এতে শিক্ষাদান ও শিক্ষা গ্রহণ ফওত হয়ে যায়, যার ফযীলত আমরা এলেম অধ্যায়ে বর্ণনা করে এসেছি। এই উভয় কাজ দুনিয়াতে বড় এবাদতসমূহের অন্যতম। মেলামেশা ছাড়া এগুলো সম্ভবপর নয়। হাঁ, এটা ঠিক যে, শিক্ষার অনেক প্রকার রয়েছে। তন্মধ্যে কতক জরুরী নয়। যে শিক্ষা অর্জন করা মানুষের উপর ফরয, তা যদি না শেখে এবং নির্জনবাস অবলম্বন করে, তবে গোনাহগার হবে। যদি ফরয পরিমাণে শিখে নেয়, এরপর এবাদত করতে মনে চায়, তবে নির্জনবাস করতে দোষ নেই। আর যদি কেউ বর্ণনাগত ও যুক্তিগত সকল শিক্ষায় পূর্ণতা অর্জন করার ক্ষমতা রাখে, তার জন্যে সেগুলো শিক্ষা করার পূর্বে নির্জনবাস অবলম্বন করা নেহায়েত ক্ষতির কথা। এ কারণেই ইবরাহীম নখয়ী ও অন্যান্য বুযুর্গ বলেন প্রথমে আলেম হও, এরপর নির্জনবাসী হও। যে ব্যক্তি শিক্ষা লাভের পূর্বে নির্জনবাসী হয়, সে প্রায়ই নিদ্রায় অথবা অন্য কোন প্রবৃত্তি চরিতার্থ করার চিন্তায় আপন মূল্যবান সময় বিনষ্ট করে। বেশীর বেশী সে সম্পূর্ণ সময় ওযিফার মধ্যে ডুবে থাকে এবং দৈহিক আমল করতে থাকে; কিন্তু অন্তর নানারকম প্রবঞ্চনার মাধ্যমে তার প্রচেষ্টা নিষ্ফল এবং আমল বাতিল করতে থাকে; অথচ সে টেরও পায় না। সে সর্বদা আল্লাহ্ তা'আলার যাত ও সিফাতের বিশ্বাসে নানা কুসংস্কারের আশ্রয় নিয়ে মন ভুলিয়ে রাখে এবং প্রায়ই নানা দুষ্ট কুমন্ত্রণার সম্মুখীন হয়। ফলে সে শয়তানের ক্রীড়নকে পরিণত হয় এবং মনে মনে নিজেকে 'আবেদ' মনে করতে থাকে। মোট কথা, শিক্ষা ধর্মকর্মের মূল শিকড় এবং অজ্ঞ জনসাধারণ ও মূর্খদের নির্জনবাসে কোন কল্যাণ নেই। অর্থাৎ, যে ব্যক্তি নির্জনে এবাদত করার নিয়ম পদ্ধতি সম্পর্কে সম্যক অবগত নয় এবং নির্জনে কি কি বিষয় জরুরী, তা জানে না, তার নির্জনবাসে কোন উপকার নেই। কেননা, মানুষের নফস রোগীর মতই বিচক্ষণ ডাক্তারের চিকিৎসার মুখাপেক্ষী। যদি কোন মূর্খ রোগী চিকিৎসা শাস্ত্র না শেখে এবং ডাক্তারের কাছ থেকে দূরে থাকে, সে নিঃসন্দেহে কেবল রোগযন্ত্রণাই ভোগ করে যাবে। সুতরাং আলেম ব্যতীত অন্য কারও জন্যে নির্জনবাস সমীচীন নয়। শিক্ষাদান কার্যেও বিরাট সওয়াব আছে, যদি শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের নিয়ত সঠিক হয়। এ যুগে আলেমরা যদি ধর্মের নিরাপত্তা কামনা করে, তবে নির্জনবাস অবলম্বন করুক। কেননা, আজকাল এমন কোন শিক্ষার্থী দৃষ্টিগোচর হয় না, যে ধর্মের উপকারের জন্যে শিক্ষা গ্রহণ করে। আজকাল শিক্ষার্থীরা কেবল মসৃণ কথাবার্তা অন্বেষণ করে, যদ্দ্দ্বারা ওয়াযে জনসাধারণকে নিজেদের দিকে আকৃষ্ট করতে পারে অথবা সমসাময়িকদেরকে পেছনে ফেলে দেয়ার জন্যে, শাসকবর্গের নৈকট্য লাভের জন্যে এবং গর্ব ও আত্মম্ভরিতার স্থলে ব্যবহার করার জন্যে তারা মুনাযারা তথা বিতর্কের বিষয়বস্তু অধ্যয়ন করে। ফেকাহ্ সম্বন্ধীয় রেওয়ায়েত-সমূহের উপর ভিত্তি করে ফতোয়াদান শিক্ষা আজকাল সর্বাধিক জনপ্রিয়। কিন্তু প্রায়শঃ সমসাময়িকদের অগ্রে থাকা এবং সরকারী পদ লাভ করে অর্থ সঞ্চয় করাই এ শিক্ষা অর্জনের কারণ হয়ে থাকে। অতএব এ ধরনের শিক্ষার্থীদের থেকে বেঁচে থাকাই ধর্ম ও সাবধানতার দাবী। যদি এমন শিক্ষার্থী পাওয়া যায়, যে আল্লাহ্ তা'আলার নৈকট্য লাভের উদ্দেশে শিক্ষা গ্রহণ করে, তার কাছে শিক্ষা গোপন করা কবীরা গোনাহ। এরূপ শিক্ষার্থী পাওয়া গেলেও বড় বড় শহরে দু'একজনের বেশী পাওয়া যায় না। সুফিয়ান সওরী (রহঃ) বলেন : আমরা অন্য উদ্দেশে শিক্ষা গ্রহণ করেছি; কিন্তু আমাদের শিক্ষা আল্লাহ্ ছাড়া অন্য উদ্দেশের জন্য নিবেদিত হতে অস্বীকার করেছে। এ উক্তি দ্বারা ধোঁকা খেয়ে এরূপ মনে করা উচিত নয় যে, আলেম ব্যক্তি অন্য উদ্দেশে এলেম শিক্ষা করলেও পরবর্তীতে তারা আল্লাহ্'র দিকে রুজু করে। কেননা, অধিকাংশ আলেমের অবস্থা আমাদের সামনেই রয়েছে। তারা দুনিয়ার অন্বেষণেই মৃত্যুবরণ করে এবং এ লালসায়ই জীবনপাত করে। সংসারবিমুখ আলেম খুব কমই দেখা যায়। এখন আমরা শুনা কথার উপর ভরসা করব, না দেখা ঘটনা বিশ্বাস করব। কথায় বলে, শুনা কথা দেখা ঘটনার মত বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে না। এছাড়া সুফিয়ান সওরী যে শিক্ষার দিকে ইঙ্গিত করেছেন, সেটা হচ্ছে হাদীস, তফসীর এবং পয়গম্বর ও সাহাবায়ে কেরামের জীবনচরিত শিক্ষা। এসব শিক্ষা খোদাভীতির কারণ হয়ে থাকে। এগুলো আপাততঃ প্রভাবশালী না হলেও পরবর্তীতে প্রভাবশালী হয়ে থাকে। কিন্তু কালাম ও ফেকাহ্ শিক্ষা এরূপ নয়। এগুলো যারা দুনিয়া লাভের নিয়তে শিক্ষা করে, তারা আজীবন দুনিয়ালোভীই থেকে যায়। সম্ভবতঃ এই কিতাবে আমরা যেসব বিষয় লিপিবদ্ধ করেছি, যদি শিক্ষার্থী দুনিয়ালাভের নিয়তেই এগুলো শিক্ষা করে, তবে তাকে অনুমতি দেয়া যায়। কেননা, আশা করা যায়, শেষ বয়সে সে সঠিক পথে ফিরে আসবে। কারণ, এই কিতাব আল্লাহ্ তাআলার ভয় সৃষ্টি করা, আখেরাতের প্রতি উৎসাহিত করা এবং দুনিয়ার নিন্দা সম্পর্কিত বিষয়বস্তুতে পরিপূর্ণ। এসব বিষয়বস্তু হাদীস ও কোরআনে ভূরি ভূরি পাওয়া যায়। কালাম ও ফেকাহ্ শিক্ষার মধ্যে পাওয়া যায় না।
সুতরাং শিষ্য সংখ্যা কম করা এবং নির্জনবাস অবলম্বন করার মধ্যেই সাবধানতা নিহিত। যে ব্যক্তি দুনিয়া লাভের নিয়তে শিক্ষাদান কার্যে নিয়োজিত, তার জন্যে এ যুগে আপন কাজ পরিত্যাগ করাই উত্তম। কেননা, আবু সোলায়মান খাত্তাবী এ যুগের সঠিক চিত্র এভাবে তুলে ধরেছেন- যারা তোমার কাছে বসতে এবং পড়াশুনা করতে আগ্রহী, তাদেরকে বর্জন কর। তুমি তাদের কাছ থেকে অর্থ ও সুনাম কিছুই পাবে না। তারা বাহ্যতঃ বন্ধু হলেও অন্তরে দুশমন। যখন তোমাকে দেখে, তখন খোশামোদ করে এবং পশ্চাতে মন্দ বলে। কাছে এসে তোমার ক্রিয়াকর্ম লক্ষ্য করে এবং বাইরে গিয়ে তোমার কুৎসা রটনা করে। শিক্ষা অর্জন করা এদের উদ্দেশ্য নয়; বরং জাঁকজমক ও অর্থোপার্জনই এদের লিপ্সা। তারা তোমাকে নিজেদের মতলব হাসিলের সিঁড়ি বানাতে চায়। তাদের উদ্দেশ্য সাধনে তোমার পক্ষ থেকে কোন ত্রুটি হয়ে গেলে তারা তোমার ঘোর শত্রু হয়ে যায় । তারা চায়, তুমি তোমার ইযযত, ধর্ম সব তাদের জন্যে ব্যয় কর। অর্থাৎ, তাদের শত্রুকে শত্রু মনে কর এবং তাদের প্রবঞ্চনায় সাহায্য কর। তাদের মর্জি, তুমি আলেম হয়ে তাদের জন্যে বোকা হও এবং অনুসৃত ও সরদার হয়ে তাদের হীন অনুসারী হও। এ কারণেই বলা হয়, অজ্ঞদের থেকে সরে থাকা পূর্ণ মনুষ্যত্ব।
[২] নির্জনবাসের দ্বিতীয় বিপদ হল, এতে নিজে উপকার লাভ করা ও পরোপকার করা ফওত হয়ে যায়। নিজে উপকার লাভ করা লেনদেনের মাধ্যমে হয়ে থাকে। এটা মেলামেশা ছাড়া সম্ভব নয়। অতএব যে ব্যক্তি লেনদেন ও উপার্জনের মুখাপেক্ষী, সে ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় নির্জনবাস বর্জনকারী হবে। লেনদেনে যদি শরীয়তের নিয়ম কানুন মেনে চলতে চায়, তবে মেলামেশা সুকঠিন হবে। যদি কারও কাছে এই পরিমাণ সম্পদ থাকে যে, মিতব্যয়ী হলে যথেষ্ট হয়ে যাবে, তবে তার জন্যে নির্জনবাস উত্তম। কেননা, এখন গোনাহ ছাড়া জীবিকা উপার্জনের কোন পথ নেই। হাঁ, যদি কেউ হালাল উপায়ে উপার্জন করে দান-খয়রাত করতে চায়, তবে তা সেই নির্জনবাস থেকে উত্তম, যা কেবল নফল এবাদতের জন্যে অবলম্বন করা হয়। কিন্তু সেই নির্জনবাস থেকে উত্তম নয়, যা আল্লাহর মারেফত ও শরীয়ত শাস্ত্রের গবেষণার জন্যে অবলম্বন করা হয়। পরোপকার অর্থ ব্যয় করে অথবা দৈহিক খেদমতের মাধ্যমে হয়ে থাকে। বলাবাহুল্য, খাঁটি নিয়তে পারিশ্রমিক ছাড়া মুসলমানদের প্রয়োজন মেটানোর অশেষ সওয়াব আছে। কিন্তু মেলামেশা ছাড়া এটা হতে পারে না। অতএব যে মানুষের কাজ করে দিতে সক্ষম, এর সাথে শরীয়তের সীমাও লঙ্ঘন না করে, তার জন্যে মেলামেশা নির্জনবাসের তুলনায় উত্তম।
[৩] নির্জনবাসের তৃতীয় বিপদ হল, - এতে সংশোধিত হওয়া ও সংশোধন করা ফওত হয়ে যায়। সংশোধিত হওয়া দ্বারা আমাদের উদ্দেশ্য নফসের সাধনা করা এবং মানুষের জ্বালাতন সহ্য করা, যাতে নফস শিথিল হয়ে যায় এবং কামভাব দমিত হয়। নফসের এরূপ হওয়াও মেলামেশা ছাড়া হতে পারে না। যার চরিত্র মার্জিত নয় এবং কামভাব শরীয়তের সীমার অনুগত নয়, তার জন্যে নির্জনবাসের চেয়ে মেলামেশা উত্তম। এ কারণেই খানকায় যারা সূফীদের খেদমত করে, তারা এ কাজটি ভাল বুঝে। মানুষের কাছে সওয়াল করার কারণে তাদের নফসের অহমিকা চূর্ণ হয়ে যায় এবং সূফীগণের দোয়া দ্বারা বরকত লাভ হয়। অতীত যুগের শুরুতে এ খেদমতের এটাই ছিল কারণ। এখন এতে কুউদ্দেশ্য শামিল হয়ে গেছে। এখন খেদমতের জন্যে বলার কারণ হচ্ছে অনুসারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি করে অনেক ধনসম্পদ লাভ করা। যদি খেদমতের নিয়ত তাই হয়, তবে এর চেয়ে নির্জনবাসই উত্তম, যদিও কোন কবরের কাছে হয়। আর যদি বাস্তবেই নফসের অহমিকা দূর করার নিয়ত থাকে, তবে সে সাধনার মুখাপেক্ষী, তার জন্যে এই খেদমত নির্জনবাসের তুলনায় উত্তম। আধ্যাত্ম পথের শুরুতে সাধনার প্রয়োজন হয়। সাধনা অর্জিত হওয়ার পর এটা বুঝতে হবে যে, ঘোড়াকে শিক্ষা দেয়ার উদ্দেশেই শিক্ষা দেয়া হয় না; বরং পথ অতিক্রমের জন্যে সওয়ারী করা এবং যেখানে ইচ্ছা সেখানে যাওয়ার জন্যে শিক্ষা দেয়া হয়। অনুরূপভাবে মানুষের দেহ তার অন্তরের সওয়ারী। এতে সওয়ার হয়ে অন্তর আখেরাতের পথ অতিক্রম করে। এতে অনেক কামনা-বাসনা আছে বিধায় সওয়ারী পথিমধ্যে অবাধ্য হয়ে যেতে পারে। তাই সাধনার প্রয়োজন আছে। কিন্তু উদ্দেশ্য সওয়ারীই। সুতরাং কেউ যদি সারা জীবন সাধনার মধ্যে অতিবাহিত করে দেয়, তবে সে হবে সেই ব্যক্তির মত, যে সারা জীবন ঘোড়াকে শিক্ষা দেয় এবং তার পিঠে সওয়ার হয়ে পথ অতিক্রম করে না। এমতাবস্থায় ঘোড়ার শিক্ষিত হওয়ার উপকার এটাই হবে যে, সে ঘোড়ার কামড় ও লাথি মারা থেকে নিরাপদ থাকবে। যদিও এ উপকারটিও উদ্দেশ্য; কিন্তু এরূপ উপকার তো মৃত জন্তু থেকেও অর্জিত হয়। ঘোড়া তো রাখা হয় সেটির দ্বারা জীবনে কিছু কাজ নেয়ার জন্যে। এমনিভাবে দেহের কামনা বাসনা থেকে মুক্তি তো নিদ্রা ও মৃত্যু দ্বারাও অর্জিত হয়। কিন্তু কেবল কামনা বাসনা বর্জনই উদ্দেশ্য নয়; বরং এরপর আখেরাতের পথ অতিক্রম করাও উদ্দেশ্য। সুতরাং কামনা বাসনা বর্জন ও কেবল সাধনা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা মানুষের উচিত নয়। কাজেই সাধনার পর কি করতে হবে, সেটা দৃষ্টির সামনে রাখতে হবে। এ পর্যায়ে এসে নির্জনবাস তার জন্যে মেলামেশার তুলনায় অধিক সহায়ক হবে। অর্থাৎ এরূপ ব্যক্তির জন্যে শুরুতে মেলামেশা উত্তম এবং পরিণামে নির্জনবাস উত্তম।
সংশোধন দ্বারা আমাদের উদ্দেশ্য অপরকে সাধনায় লিপ্ত করা; যেমন মুরশিদগণ সূফীগণের সাথে করে থাকেন। এটাও মেলামেশা ছাড়া হতে পারে না। অর্থাৎ মুরশিদ যে পর্যন্ত মুরীদদের সাথে মেলামেশা না করে, তাদের সংশোধন করতে সক্ষম হবে না ।
[৪] নির্জনবাসের চতুর্থ বিপদ হল এতে অপরের কাছ থেকে সুলভ সঙ্গ হাসিল করা ও অপরকে বন্ধুসুলভ সঙ্গ দেয়া ফওত হয়ে যায়। এটা সেই ব্যক্তির কাম্য হয়, যে ওলীমা, ভোজসভা ও মনোরঞ্জনের জায়গায় যায় না। এর পরিণাম বিলাসগত আনন্দ এবং কখনও ধর্মপরায়ণতাও হয়ে থাকে। যেমন কোন ব্যক্তি মাশায়েখের কাছ থেকে সঙ্গ হাসিল করে এ কারণে যে, তারা সর্বদা খোদাভীতি ও পরহেযগারীর মধ্যে মগ্ন থাকে। কাজেই তাদের কথাবার্তা ও অবস্থা দেখে বন্ধুসুলভ সঙ্গ লাভ করা মোস্তাহাব।
[৫] নির্জনবাসের পঞ্চম বিপদ হল, - মানুষ নিজে সওয়াব পাওয়া ও অপরকে সওয়াব পৌঁছানো থেকে বঞ্চিত থাকে। নিজে সওয়াব পাওয়ার উপায় হচ্ছে জানাযায় যাওয়া, রোগীর অবস্থা জিজ্ঞেস করা, ঈদের নামাযে শরীক হওয়া, জুমুআয় উপস্থিত হওয়া ইত্যাদি। যে নির্জনবাস করে, তার জন্যে সকল নামাযের জামাতে যোগদান করা জরুরী। জামাত বর্জন করার অনুমতি কোন অবস্থাতেই নেই। হাঁ, জামাতের সওয়াব না পাওয়ার সমতুল্য কোন বাহ্যিক ক্ষতির আশংকা থাকলে জামাত বর্জন করা যায়। কিন্তু এরূপ কমই হয়ে থাকে। অপরকে সওয়াব পৌঁছানোর উপায়, নিজের দরজা খোলা রাখবে, যাতে রুগ্ন অবস্থায় মানুষ এসে তার হাল জিজ্ঞেস করে এবং বিপদে সান্ত্বনা ও আনন্দে মোবারকবাদ দেয়। কেননা, এতে মানুষ সওয়াব পায়।
[৬] নির্জনবাসের ষষ্ঠ বিপদ হল,- এতে বিনয় ফওত হয়ে যায়। নির্জনতা অবলম্বনের কারণ কখনও অহংকারও হয়ে থাকে। বনী ইসরাঈলের জনৈক দার্শনিক দর্শন শাস্ত্রে তেষট্টিটি পুস্তক রচনা করেছিল। এরপর তার ধারণা হল, আল্লাহ তা'আলার কাছে তার মর্যাদা অনেক বৃদ্ধি পেয়ে থাকবে। আল্লাহ তা'আলা তখন তার নবীর প্রতি ওহী পাঠালেন, অমুক ব্যক্তিকে বলে দাও সে তার বকবক দ্বারা সারা পৃথিবী ভরে দিয়েছে। আমি এর মধ্য থেকে কিছুই কবুল করি না। দার্শনিক নির্জনবাস অবলম্বন করল এবং মাটির নিচে কুঠরীতে চলে গেল। অতঃপর মনে মনে বলল : আমি এবার পরওয়ারদেগারের মহব্বতে পৌছে গেছি। আল্লাহ তাআলা নবীর প্রতি আবার ওহী পাঠালেন, তাকে বলে দাও, সে আমার সন্তুষ্টি পাবে না যে পর্যন্ত মানুষের সাথে মেলামেশা এবং তাদের জ্বালাতন সহ্য না করে। অতঃপর সে মানুষের সাথে মেলামেশা করল, তাদের কাছে বসল, সঙ্গে আহার করল এবং বাজারে ঘুরাফেরা করল। তখন আল্লাহ তা'আলা নবীর প্রতি ওহী পাঠালেন, তাকে বলে দাও, সে আমার সন্তুষ্টি লাভে সক্ষম হয়েছে। সুতরাং বুঝা গেল, কিছু লোকের নির্জনবাসের কারণ অহংকারই হয়ে থাকে। তারা এজন্যে মজলিসে যায় না যে, কেউ তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে না এবং অগ্রে বসাবে না। কিংবা তারা মনে করে, মানুষের সাথে মেলামেশা না করলে আমাদের মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে এবং সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়বে। কিছু লোক এ জন্যে নির্জনবাস অবলম্বন করে যে, মেলামেশার কারণে তাদের গোপন রহস্য প্রকাশ হয়ে পড়বে এবং দরবেশী ও এবাদতের যে বিশ্বাস তাদের প্রতি রয়েছে, তা খতম হয়ে যাবে। ফলে তারা তাদের গৃহকে আপন কুকর্মের জন্যে আড়াল করে নেয়। তারা গৃহে সময়ই যিকির ফিকিরে ব্যয় করে না। তাদের পরিচয় হচ্ছে, স্বয়ং কারও কাছে যাওয়া পছন্দ করে না; কিন্তু অন্যরা তাদের কাছে আসুক, এটা খুব কামনা করে। বরং জনসাধারণ ও আমীর ওমরারা তাদের দরজায় সমবেত হলে এবং তাদের হস্ত চুম্বন করলে তারা অত্যন্ত খুশী হয়। এসব লোক যদি এবাদতে মশগুল থাকার কারণে মেলামেশা ঘৃণা করত, তবে নিজের যাওয়া যেমন তাদের কাছে ভাল মনে হত না, তেমনি অপরের আগমনও তারা অপছন্দ করত; যেমন ফোযায়ল (রহঃ)-এর অবস্থা এই মাত্র বর্ণিত হয়েছে, তিনি বন্ধুকে দেখে বললেন : তুমি শুধু এ জন্যে এসেছ যে, আমি তোমার সামনে সেজে বসে থাকি : এবং তুমি আমার সামনে। অথবা যেমন হাতেম আসাম্ম তাঁর সাথে সাক্ষাৎকামী আমীরকে বলেছিলেন : আমার প্রয়োজন, না আমি তোমাকে দেখব, না তুমি আমাকে। সুতরাং যে ব্যক্তি একাকিত্বে আল্লাহর যিকিরে মশগুল নয়, তার নির্জনবাসের কারণ এটাই যে, সে অতি মাত্রায় মানুষের সাথে মশগুল আছে; অর্থাৎ তার মন চায়, মানুষ তাকে সম্মানের দৃষ্টিতে দেখুক । এরূপ নির্জনবাস কয়েক কারণে মূর্খতা ।
প্রথমতঃ যে ব্যক্তি শিক্ষা ও ধর্মকর্মে বড় হয়, মেলামেশা ও বিনয়ের কারণে তার মর্যাদা হ্রাস পায় না। সেমতে হযরত আলী (রাঃ) খোরমা ও লবণ বাজার থেকে আপন কাপড়ে ও হাতে বহন করে আনেন।
হযরত আবূ হোরায়রা, হোযায়ফা, উবাই ইবনে ক্বাব ও ইবনে মসউদ (রাঃ) খড়ির বোঝা ও আটার পুটলি কাঁধে বহন করে আনতেন। হযরত আবূ হোরায়রা (রাঃ) যখন শাসনকর্তা ছিলেন, তখন খড়ির বোঝা মাথায় বহন করে নিয়ে যেতেন এবং বলতেন- তোমাদের আমীরকে পথ দাও।
রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সওদা ক্রয় করতেন এবং নিজেই গৃহে নিয়ে যেতেন। কোন কোন সাহাবী আরজ করতেন, আমার হাতে দিন। আমি নিয়ে যাই, তিনি বলতেন : বস্তুর মালিক তা নিয়ে যাওয়ার অধিক হকদার।
হযরত ইমাম হাসান (আঃ) ভিক্ষুকদের কাছ দিয়ে গমন করতেন। তারা রুটির টুকরা ভক্ষণ করত এবং বলত সাহেবজাদা ! থামুন, আমাদের সাথে আহার করুন। তিনি সওয়ারী থেকে নেমে যেতেন এবং পথে বসে তাদের সাথে আহার করতেন। এরপর ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে বলতেন : আল্লাহ তাআলা অহংকারীদেরকে পছন্দ করেন না।
দ্বিতীয়তঃ যারা মানুষের সন্তুষ্টি ও ভক্তিশ্রদ্ধা কামনা করে, তারা বিভ্রান্ত। কেননা, তারা আল্লাহ তা'আলাকে যথার্থ চিনতে পারলে বুঝতে পারবে, মানুষ দ্বারা কোন কিছু হয় না। লাভ-লোকসান, উপকার ক্ষতি সমস্তই আল্লাহ তা'আলার করায়ত্ত। যে ব্যক্তি আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে মানুষকে সন্তুষ্ট করতে চায়, আল্লাহ্ তার প্রতি অসন্তুষ্ট হন এবং মানুষকেও তার প্রতি অসন্তুষ্ট করে দেন৷
সহল তস্তরী তাঁর জনৈক মুরীদকে বললেন তুমি অমুক আমল কর। মুরীদ বলল : লোকলজ্জার কারণে আমি এটা করতে পারি না। তিনি সকল মুরীদকে লক্ষ্য করে বললেন দু'টি গুণের মধ্য থেকে একটি গুণে গুণান্বিত না হওয়া পর্যন্ত মানুষ মারেফতের স্বরূপ জানতে পারে না- হয় মানুষ তার দৃষ্টি থেকে পড়ে যাবে এবং দুনিয়াতে পরওয়ারদেগারকে ছাড়া কাউকে দেখবে না, অন্য কাউকে লাভ ও ক্ষতির মালিক মনে করবে না; না হয় তার নফস তার অন্তরের সামনে তুচ্ছ হয়ে যাবে। মানুষ কি অবস্থায় তাকে দেখবে, এ ব্যাপারে সে নফসের পরওয়া করবে না।
হযরত ইমাম শাফেয়ী (রহ) বলেন : এমন কেউ নেই, যার বন্ধু ও শত্রু নেই । অতএব যে আল্লাহ্'র অনুগত তার সাথে থাকা ভাল।
হযরত হাসান বসরীকে কেউ বলল : আপনার মজলিসে কিছু লোক আসে। উদ্দেশ্য, আপনি ওয়াযে কোথায় কোথায় ভুল করেন তা লক্ষ্য করতে এবং আপনাকে প্রশ্ন করে করে বিরক্ত করতে। তিনি মুচকি হেসে বললেন : এটা খারাপ মনে করো না। আমি আমার নফসকে জান্নাতে থাকা এবং আল্লাহ তা'আলার প্রতিবেশী হওয়ার জন্যে রেখেছি। আমি এ বিষয়েরই আকাঙ্ক্ষী। আমি কখনও বলিনি যে, মানুষের মুখ থেকে অক্ষত থাকব। কারণ, আমি জানি, আল্লাহ তাআলা যিনি মানুষের স্রষ্টা, রিযিকদাতা, জীবনদাতা এবং মৃত্যুদাতা, তিনিও মানুষ থেকে অক্ষত নন। অতএব আমি অক্ষত থাকব কিরূপে?
হযরত মূসা (আঃ) আল্লার দরবারে আরজ করলেন ইয়া রব, মানুষের রসনাকে আমা থেকে ফিরিয়ে রাখুন । আদেশ হলঃ হে মূসা, এটা তো এমন বিষয়ের প্রার্থনা, যা আমি নিজের জন্যে পছন্দ করিনি- তোমার জন্যে কিরূপে করব?
আল্লাহ তা'আলা হযরত ওযায়র (আঃ)-এর কাছে ওহী পাঠান- আমি তোমাকে মানুষের মুখে মেসওয়াকের মত করব, তারা তোমাকে চর্বণ করবে- এটা যদি তুমি পছন্দ না কর, তবে তোমাকে আমার কাছে বিনয়ীদের মধ্যে লেখব না।
সারকথা, মানুষ ভাল বিশ্বাস রাখুক, সাধু বলুক, এ উদ্দেশে যে ব্যক্তি নিজেকে গৃহে আবদ্ধ রাখে, সে দুনিয়াতেও ক্লেশ ভোগ করে এবং আখেরাতেও আযাব থেকে নিস্তার পাবে না। নির্জনবাস এমন ব্যক্তির জন্যেই মোস্তাহাব, যে সদা-সর্বদা পরওয়ারদেগারের যিকির, ফিকির, এবাদত ও মারেফতে ডুবে থাকে।
[৭] নির্জনবাসের সপ্তম বিপদ হল, - এতে অভিজ্ঞতা ফওত হয়ে যায়, যা মানুষের সাথে মেলামেশা ও তাদের প্রাত্যহিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করার উপর নির্ভরশীল। বুদ্ধি-বিবেক, ইহকাল ও পরকালের উপযোগিতা সম্যক উপলব্ধি করার জন্যে যথেষ্ট নয়; বরং উপযোগিতা অভিজ্ঞতা ও পারদর্শিতা দ্বারা জানা যায়। যে ব্যক্তি অভিজ্ঞতায় পটু নয়; তার নির্জনবাসে কোন কল্যাণ নেই। তাই প্রথমে লেখাপড়া শিখতে হবে। এ সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়ে যাবে এবং এতটুকু যথেষ্ট হবে। অবশিষ্ট অভিজ্ঞতা পরিস্থিতি সম্পর্কে শুনার মাধ্যমেও অর্জিত হতে পারে- মেলামেশার প্রয়োজন নেই। যেসকল অভিজ্ঞতা অধিক জরুরী, তন্মধ্যে একটি হচ্ছে নিজের নফস, চরিত্র ও আভ্যন্তরীণ গুণাগুণ পরীক্ষা করা। এটা নির্জনতায় হতে পারে না। উদাহরণতঃ যার মধ্যে হিংসা বিদ্বেষ আছে, সে নির্জনে বাস করলে তার হিংসা-বিদ্বেষ প্রকাশ পাবে না । মানুষের এসব গুণাগুণ অত্যন্ত মারাত্মক, যা পরীক্ষার মাধ্যমে দূর করা ওয়াজিব। যেসব কারণে হিংসা-বিদ্বেষ মাথাচাড়া দিয়ে উঠে, সেগুলো থেকে দূরে থেকে হিংসা-বিদ্বেষের প্রতিকার সম্ভব নয়। কেননা, হিংসা বিদ্বেষের গুণাগুণসম্পন্ন অন্তর ফোঁড়া সদৃশ, যার মধ্যে পুঁজ ও রক্ত ভর্তি থাকে। ফোঁড়া নাড়া না দিলে কিংবা হাত না লাগালে ফোঁড়ার ব্যথা অনুভব হবে না। এখন যদি নাড়া দেয়ার কোন লোক ফোঁড়ার কাছে না থাকে, তবে যার ফোঁড়া, সে নিজেকে সুস্থই মনে করবে, কিন্তু কেউ নাড়া দিলে ফোড়া থেকে পুঁজ ও দূষিত পদার্থ বের হতে থাকবে; যেমন আবদ্ধ পানি ফোয়ারা দিয়ে বের হতে থাকে। এমনিভাবে যে অস্তরে হিংসা, দ্বেষ, কৃপণতা, ক্রোধ ও অন্যান্য কুচরিত্র ভর্তি থাকে, সেই অন্তরকে নাড়া দিলেই এসব কুচরিত্র ফুটে উঠতে থাকে। এ কারণেই যারা আধ্যাত্ম পথের পথিক, তারা আপন নফসের পরীক্ষা নিতেন। পরীক্ষার পর যদি নফসের মধ্যে অহংকার দেখতেন, তবে পানির মশক কোমরে বেঁধে অথবা খড়ির বোঝা মাথায় নিয়ে বাজারে ফিরতেন, যাতে নফস থেকে অহংকার দূর হয়ে যায়। মোট কথা, নফসের বিপদ ও শয়তানের চক্রান্ত গোপন থাকে। খুব কম লোকই এগুলো জানে। এ কারণেই জনৈক বুযুর্গ থেকে বর্ণিত আছে, তিনি ত্রিশ বছরের নামায পুনরায় আদায় করেছিলেন; অথচ এগুলো তিনি জামাতের প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে আদায় করেছিলেন। এই পুনরায় পড়ার কারণ বর্ণনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন একদিন আমি ওযরবশতঃ পেছনে পড়ে গেলাম এবং প্রথম সারিতে স্থান পেলাম না। আমি দ্বিতীয় সারিতে দাঁড়ালাম। পেছনে পড়ার কারণে কিছু লোক আমার দিকে তাকাচ্ছিল। এতে আমার নফস লজ্জা অনুভব করছিল। তখন আমি জানলাম, আমার অতীত নামাযগুলো রিয়া মিশ্রিত ছিল।
সারকথা, মেলামেশার একটি বড় ও সুস্পষ্ট উপকারিতা হচ্ছে, এতে নিন্দনীয় গুণসমূহ জানা হয়ে যায়। এ জন্যেই বলা হয়, সফর চরিত্র প্রকাশ করে দেয়। কেননা, সফরও এক প্রকার মেলামেশা- যা দীর্ঘক্ষণ স্থায়ী হয়।
পরবর্তী পর্ব-


