মঙ্গলবার, ২ এপ্রিল, ২০২৪

নফল নামায (পর্ব - ৩) চাশতের নামায


নফল নামায - (পর্ব - ৩)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

চাশতের নামায-
চাশতের নামায নিয়মিত পড়া একটি উত্তম আমল। এর সংখ্যা সর্বোচ্চ আট রাকআত বর্ণিত আছে। হযরত উম্মে হানী (রাঃ) বর্ণনা করেন, রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) চাশতের নামায আট রাকআত পড়েছেন এবং খুব দীর্ঘ করে ও উত্তমরূপে পড়েছেন। এ সংখ্যা অন্য কোন রাবী বর্ণনা করেননি। হযরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেন, নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) চাশতের নামায নিয়মিতভাবে চার রাকআত পড়েছেন এবং মাঝে মাঝে বেশীও পড়েছেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) বেশীর সীমা উল্লেখ করেননি। এ থেকে জানা যায়, তিনি চার রাকআত নিয়মিত পড়তেন- এর কম পড়তেন না এবং মাঝে মাঝে বেশীও পড়তেন। হযরত আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) চাশতের নামায ছয় রাকআত দু’ওয়াক্তে পড়তেন।

"উদয়ের পর সূর্য যখন সামান্য উপরে উঠতো, তখন তিনি দাঁড়িয়ে : দু'রাকআত পড়তেন। এরপর যখন সূর্যের কিরণ ছড়িয়ে পড়তো এবং সূর্য আকাশের পূর্ব প্রান্তে থাকত, তখন চার রাকআত পড়তেন। মোট কথা, সূর্য যখন অর্ধ বর্শা পরিমাণ উপরে উঠত, তখন দু'রাকআত পড়তেন এবং সূর্য যথেষ্ট উপরে উঠার পর চার রাকআত পড়তেন। সুতরাং চাশতের সময় এভাবে নির্ণীত হবে, সূর্যোদয় থেকে সূর্য ঢলে পড়া পর্যন্ত মোট সময়ের অর্ধেক হলে চাশত পড়া উচিত; যেমন সূর্য ঢলে পড়া থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত মোট সময়ের অর্ধাংশের সময় আসরের নামায পড়া হয়। অতএব আসরের সময়ের বিপরীত সময় হচ্ছে চাশতের সময়। এ সময়টি -চাশতের উত্তম সময়। নতুবা সূর্য উপরে উঠার পর থেকে দ্বিপ্রহরের পূর্ব পর্যন্ত যেকোন সময় চাশত পড়া যায়।

মন্তব্য:- [সূর্য উদয়ের ২০ মিনিটf পর (২+২) চার রাকাত ইশরাক এবং দশটার পর যাওয়ালের (পশ্চিমে হেলা) পূর্বে চার রাকাত চাশত নামাজের উপযুক্ত সময় ।]


পরবর্তী পর্ব

নফল নামায (পর্ব - ২) পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সুন্নত সমুহ 📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন



নফল নামায - (পর্ব - ২)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সুন্নত সমুহ
(১) ফজরের সুন্নত
পাঞ্জেগানা নামাযের মধ্যে ফজরের সুন্নত দু'রাকআত। এ সম্পর্কে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : “ফজরের দু'রাকআত দুনিয়া ও দুনিয়াস্থিত সবকিছু অপেক্ষা উত্তম।” এর সময় সোবহে সাদেক থেকে শুরু হয়ে যায়। আকাশের কিনারায় ফজরের পূর্বে বিস্তৃত শুভ্র রেখাকে সোবহে সাদেক বলা হয়। শুরুতে এটা চেনা খুবই কঠিন। এর জন্যে চন্দ্রের উদয় অস্তের সময় জানতে হবে। প্রতি মাসে দু'বার চন্দ্র দ্বারা সোবহে সাদেক চেনা যায়। ছাব্বিশতম রাতে চাঁদ সোবহে সাদেকের সাথে উদিত হয় এবং দ্বাদশতম রাতে চাদের অস্ত যাওয়ার সাথে সাথে প্রায় সোবহে সাদেক হয়ে যায়। যে আখেরাত তলব করে, তার জন্যে চাঁদের এসব মনযিল চেনা জরুরী। এতে রাত্রিকালীন সময়ের পরিমাণ ও সোবহে সাদেক চেনা যায়। যখন ফজরের ফরয সময় শেষ হয়, তখন সুন্নতের সময়ও শেষ হয়ে যায়। অর্থাৎ, সূর্যোদয়ের সময় এরপর নামায পড়া যায় না। ফরযের পূর্বে এ দু'রাকআত পড়া সুন্নত। মসজিদে আসার পর যদি ফরযের তকবীর হয়ে যায়, তবে ফরয নামাযেই শামিল হয়ে যাবে। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ “নামাযের তকবীর হয়ে গেলে ফরয ছাড়া কোন নামায পড়া যাবে না।” ফরয নামায শেষ হলে সুন্নত পড়ে নেবে। সূর্যোদয়ের পূর্বে পড়লে তাও আদায় হবে। কেননা, সময়ের মধ্যে সুন্নত ফরযের অনুগামী। তবে জামাআত ফওত না হলে এ সুন্নত ফরযের পূর্বে পড়া সুন্নত। 

মোস্তাহাব এই, এ সুন্নত গৃহে সংক্ষেপে পড়ে মসজিদে যাবে এবং দু'রাকআত তাহিয়্যাতুল মসজিদ পড়ে বসে যাবে। ফরয পড়া পর্যন্ত কোন নামায পড়বে না । এর পর সূর্যোদয় পর্যন্ত যিকিরে মশগুল থাকবে।

(২) যোহরের সুন্নত
যোহরের সুন্নত ছয় রাকআত। ফরযের পূর্বে চার রাকআত এবং পরে দু'রাকআত। এ দু'রাকআত সুন্নতে মোআক্কাদা। হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) থেকে রেওয়ায়েত করেন, যেব্যক্তি সূর্য ঢলে পড়ার (যাওয়াল) পর চার রাকআত নামায পড়ে এবং তার কেরাআত, রুকু ও সেজদা ভালরূপে করে, তার সাথে সত্তর হাজার ফেরেশতা নামায পড়ে এবং রাত্রি পর্যন্ত তার জন্যে মাগফেরাতের দোয়া করে। 

(৩) আসরের সুন্নত
আসরের পূর্বে চার রাকআত নফল নামায। হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ)-এর রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন  : “আল্লাহ সেই বান্দার প্রতি রহম করুন যে আসরের পূর্বে চার রাকআত পড়ে।” সুতরাং রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর দোয়ায় দাখিল হওয়ার আশা নিয়ে এই চার রাকআত পড়া মোস্তাহাব। তিনি যোহরের দু'রাকআতের অনুরূপ নিয়মিতভাবে আসরের এই চার রাকআত পড়েন নি।

(৪) মাগরিবের সুন্নত-
মাগরিবের ফরযের পর দু'রাকআত সুন্নত। এক্ষেত্রে একটি ভিন্ন রেওয়ায়েত উবাই ইবনে কাব, ওবাদা ইবনে সামেত, আবু যর, যায়দ ইবনে সাবেত প্রমুখ সাহাবী থেকে বর্ণিত আছে যে, মাগরিবের ফরযের পূর্বে আযান ও একামতের মাঝখানে দু'রাকআত দ্রুত পড়ে নেয়া উচিত। কোন কোন সাহাবী বলেনঃ আমরা মাগরিবের পূর্বে দু'রাকআত পড়তাম। ফলে নতুন আগন্তুক মনে করত, আমরা মাগরিব পড়ে নিয়েছি। এটা আসলে এই হাদীসের ব্যাপকতার মধ্যে দাখিল- “প্রত্যেক দু'আযান অর্থাৎ, আযান ও একামতের মধ্যে নামায রয়েছে। যে চায় সে পড়ুক।” হযরত ইমাম আহমদ (রহঃ) এই দু'রাকআত পড়তেন। কিন্তু লোকেরা এজন্যে তাঁর সমালোচনা শুরু করলে তিনি তা পরিত্যাগ করেন। 
>নিজস্ব মত--
[(এ থেকে বুঝা যায় মাগরিবের ফরযের পূর্বে কোন নামাজ নেই) পরে দুরাকাত সুন্নত। সুন্নতের পরে দু’রাকাত নফল। হানিফি মাজহাবে ইহাই নিয়ম]

(৫) মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী নফল নামায ও সুন্নতে মোআক্কাদা। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর কর্ম দ্বারা এর রাকআত সংখ্যাদ্বয় বর্ণিত আছে। এ নামাযের সওয়াব অনেক। কোন কোন তফসীরবিদ বলেনঃ এ (তাদের পার্শ্ব নিদ্রার স্থান থেকে আলাদা থাকে।) আয়াতে ঐ নামাযই বুঝানো হয়েছে। নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ “যে মাগরিব ও এশার মাঝখানে নামায পড়ে, তার এ নামায আল্লাহর দিকে রুজুকারীদের নামায।”  তিনি আরও বলেন : “যেব্যক্তি মাগরিব ও এশার মাঝখানে নিজেকে মসজিদে আবদ্ধ রাখে এবং নামায ও কোরআন পাঠ ছাড়া অন্য কোন আলাপ-আলোচনা না করে, আল্লাহ তাআলা তার জন্যে জান্নাতে দুটি প্রাসাদ তৈরী করেন, যা পরস্পরের একশ' বছরের দূরত্বে অবস্থিত। তার জন্যে উভয় প্রাসাদের মধ্যস্থলে এত বৃক্ষ রোপণ করেন, দুনিয়ার সকল বাসিন্দা তাতে ঘুরাফেরা করতে চাইলে তাদের জন্যে স্থান সংকুলান হবে।” 

[যতটুকু ধারনা লেখক এখানে আওয়াবিনের নামাজ বুঝাতে চেয়েছন, কারণ মাগরিবের  ও এশার   সুন্নত (‘সংখ্যাদ্বয়’ শব্দ দ্বারা)  তিনি পূর্বেই উল্লেখ করেছেন।

(৬) এশার সুন্নত ও নফল-
এশার ফরযের পর চার রাকআত সুন্নত। হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এশার পর চার রাকআত পড়ে শুয়ে পড়তেন। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ নামায একটি সুরক্ষিত কল্যাণ। যার ইচ্ছা কম নিক এবং যার ইচ্ছা বেশী নিক। এ থেকে জানা গেল, প্রত্যেকেই নফল নামায ততটুকু অবলম্বন করবে, যতটুকু তার কল্যাণের প্রতি আগ্রহ থাকে। উপরোক্ত বর্ণনা থেকে একথা প্রকাশ পেয়েছে, নফলসমূহের মধ্যে কতক অধিক মোআক্কাদ (জোরদার) এবং কতক কম মোআক্কাদ। সুতরাং অধিক মোআক্কাদ নফল ছেড়ে দেয়া মোটেই সমীচীন নয়। কেননা, নফল নামায ফরযের জন্যে পরিপূরক হয়ে থাকে। কাজেই নফল বেশী না পড়লে ফরয ত্রুটিযুক্ত ও অসম্পূর্ণ থেকে যাওয়া বিচিত্র নয়।

[এখানে উল্লেখ করা জরুরী যে হানিফি মাযহাব অনুযায়ী এশার পর দু’রাকাত সুন্নতে মোয়াক্কাদা এবং দু রাকাত নফল পূর্বের সুন্নতের কথা মাগরিবের নামাজের সাথে উল্লেখ হয়েছে]

বেতের ওয়াজিব-
(৭) বেতেরের নামায। হযরত আনাস (রাঃ) বলেন  : রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এশার পরে তিন রাকআত বেতের পড়তেন। প্রথম রাকআতে ‘সুরা আলা’ দ্বিতীয় রাকআতে ‘কাফিরূন’ এবং তৃতীয় রাকআতে ‘সূরা এখলাস’ পাঠ করতেন। এক হাদীসে আছে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বেতেরের পর দু'রাকআত বসে বসে পড়তেন এবং নিদ্রার পূর্বে দু'রাকআত পড়তেন। প্রথম রাকআতে সূরা যিলযাল এবং দ্বিতীয় রাকআতে তাকাসুর পাঠ করতেন। রাত্রিকালীন নফল নামাযের শেষে বেতের পড়া উত্তম। সুতরাং তাহাজ্জুদের পরে বেতের পড়া ভাল। 
[এখানে উল্লখ্য যে, যারা উক্ত সুরা সমুহ না জানেন নিজের যে কোন জানা সুরা পড়তে সমস্যা নেই]

পরবর্তী পর্ব

নফল নামায (পর্ব - ১) নফল নামাজ বিবরণ



নফল নামায - (পর্ব - ১)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

নফল নামাজের বিবরণ
প্রকাশ থাকে যে, ফরয ছাড়া আরও তিন প্রকার নামায রয়েছে সুন্নত, মোস্তাহাব ও তাতাব্বু । সুন্নত নামায বলতে আমাদের উদ্দেশ্য সেসব নামায, যেগুলো রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) নিয়মিতভাবে আদায় করেছেন; যেমন ফরয নামাযসমূহের পরবর্তী সুন্নত নামাযসমূহ, চাশতের নামায ও তাহাজ্জুদ ইত্যাদি । যে পথে চলা হয়েছে, তাকে বলা হয় সুন্নত । অতএব রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) যে পথে নিয়মিত চলেছেন, তাই হবে সুন্নত । মোস্তাহাব বলে আমাদের উদ্দেশ্য সেই নামায, যার মাহাত্ম্য হাদীসে বর্ণিত রয়েছে । কিন্তু রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) থেকে তা নিয়মিত পড়া বর্ণিত নেই । যেমন, গৃহ থেকে বের হওয়া ও গৃহে আগমনের সময়কার নামায । তাতাব্বু বলে আমরা সেই নামায বুঝিয়েছি, যা সুন্নত ও মোস্তাহাবের আওতায় পড়ে না; অর্থাৎ এ নামাযের পক্ষে বিশেষ কোন হাদীস নেই । কিন্তু বান্দা আল্লাহর সাথে মোনাজাতে উৎসাহী হয়ে এ নামায পড়ে । এই তিন প্রকার নামাযকেই নফল নামায বলা হয় । কেননা, নফল শব্দের অর্থ অতিরিক্ত । বলাবাহুল্য, এই তিন প্রকার নামায ফরযের অতিরিক্ত । এসব উদ্দেশ্য প্রকাশ করার জন্য আমরা উপরোক্ত তিনটি পরিভাষা নির্দিষ্ট করেছি । কেউ এই পরিভাষা বদলে দিতে চাইলে তাতে আমাদের কোন আপত্তি নেই । কেননা, উদ্দেশ্য বুঝে নেয়ার পরে শব্দের কোন গুরুত্ব থাকে না । উপরোক্ত প্রকারত্রয়ের মধ্যে প্রত্যেক প্রকারের বিভিন্ন স্তর রয়েছে । এসব স্তরের মর্যাদায়ও পার্থক্য রয়েছে । যেমন, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-এর নিয়মিত পড়ার মধ্যে এবং এগুলোর হাদীসের মধ্যেও সহীহ্ ও মশহুরের পার্থক্য রয়েছে । এর ভিত্তিতেই আমরা বলি, জামাআতের সুন্নতসমূহ একান্তের সুন্নত অপেক্ষা উত্তম । জামাআতের সুন্নতসমুহের মধ্যে সর্বোত্তম হচ্ছে ঈদের নামায, এর পর সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণের নামায, এর পর বৃষ্টির জন্য নামায । একান্তের সুন্নতসমূহের মধ্যে সর্বোত্তম হচ্ছে বেতেরের নামায, এর পর ফজরের সুন্নত, এর পর অন্যান্য নামাযের সুন্নত ।

প্রকাশ থাকে যে, নফল নামাযসমূহ দু'প্রকার- (১) কারণের সাথে সম্পর্কযুক্ত; যেমন, সূর্যগ্রহণ ও বৃষ্টির নামায এবং (২) সময়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত । সময়ের পুনরাবৃত্তির সাথে সাথে এসব নফল নামাযেরও পুনরাবৃত্তি হয় । এই প্রকার নফল আটটি- পাঞ্জেগানা নামাযসমূহের নফল নামায পাঁচটি এবং তিনটি হচ্ছে চাশতের নামায, মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী নফল নামায এবং তাহাজ্জুদের নামায ৷ 

পরবর্তী পর্ব

যাকাত (পর্ব– ১১) সদকা গ্রহণ করা উত্তম না যাকাত

যাকাত পর্ব– ১১
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

সদকা গ্রহণ করা উত্তম না যাকাত
ইবরাহীম খাওয়াস, জুনায়দ বাগদাদী প্রমুখ বুযুর্গের অভিমত হচ্ছে, যাকাতের তুলনায় সদকার অর্থ গ্রহণ করা উত্তম। কেননা, যাকাতের অর্থ গ্রহণ করলে মিসকীনদের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করা হয়। এছাড়া যাকাতের হকদার হওয়ার জন্যে যেসকল বিশেষণ ও শর্ত উল্লিখিত আছে, সেগুলো নিজের মধ্যে থাকে না। সদকার মধ্যে এ ব্যাপারে অবকাশ বেশী। কেউ কেউ বলেন: যাকাত গ্রহণ করা উচিত- সদকা নয়। কেননা, যাকাত গ্রহণ করলে মানুষকে ফরয আদায়ে সাহায্য করা হয়। সকল মিসকীন যাকাত নেয়া ত্যাগ করলে সকল মানুষ গোনাহগার হবে। এছাড়া যাকাত কারও অনুগ্রহ নয়। এটা মালদারের যিম্মায় আল্লাহর ওয়াজেব হক। এর মাধ্যমে অভাবী বান্দাদের রুজি অর্জিত হয়। আরও কারণ, যাকাত অভাবের কারণে গ্রহণ করা হয়। অভাব প্রত্যেক ব্যক্তির নিশ্চিতরূপে জানা থাকে। কিন্তু সদকা গ্রহণ করা দ্বীনদারীর কারণে হয়। কেননা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দাতা তাকেই সদকা দেয়, যার দ্বীনদারী সম্পর্কে তার বিশ্বাস থাকে। 
এক্ষেত্রে সত্য হচ্ছে, এ বিষয়টি প্রত্যেক ব্যক্তির অবস্থা অনুযায়ী বিভিন্ন রূপ হয়। যে ধরনের অবস্থা প্রবল এবং যেরূপ নিয়ত হয়, সেই ধরনের বিধান হয়ে থাকে। সুতরাং যদি কোন ব্যক্তি সন্দেহ করে, তার মধ্যে যাকাতের হকদার হওয়ার শর্ত আছে কিনা, তবে তার যাকাত গ্রহণ না করা উচিত। আর যদি নিজেকে হকদার বলে নিশ্চিতরূপে জানে, তবে যাকাত গ্রহণ করতে পারে। উদাহরণতঃ এক ব্যক্তির যিম্মায় ঋণ আছে, যা সে উত্তম পথে ব্যয় করেছে। এখন ঋণ শোধ করার কোন উপায় নেই। এরূপ ব্যক্তি নিশ্চিতরূপেই যাকাতের হকদার। তাকে সদকা ও যাকাতের মধ্যে এখতিয়ার দেয়া হলে সে চিন্তা করবে- যদি আমি এই সদকা গ্রহণ না করি, তবে মালিক সদকা করবে না। এমতাবস্থায় সে সদকাই গ্রহণ করবে। আর যদি যাকাত নিলে মিসকীনদের কোন অসুবিধা না হয়, তবে সদকা ও যাকাত প্রত্যেকটি গ্রহণ করবে। এতদসত্ত্বেও নফসকে হেয় করার ব্যাপারে যাকাত গ্রহণের প্রভাব সম্ভবতঃ অনেক বেশী।

(সমাপ্ত)
প্রথম পর্ব

রবিবার, ৩১ মার্চ, ২০২৪

যাকাত (পর্ব– ১০) সদকা গোপনে ও প্রকাশ্যে গ্রহণ করা


যাকাত পর্ব– ১০

📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
সদকা গোপনে ও প্রকাশ্যে গ্রহণ করা

সদকা গোপনে ও প্রকাশ্যে গ্রহণ করা-
আধ্যাত্ম পথের পথিকগণ মতভেদ করেছেন, সদকা গোপনে বা প্রকাশ্যে গ্রহণ করার মধ্যে কোনটি উত্তম। কারও মতে গোপনে গ্রহণ করা উত্তম এবং কেউ বলেন, প্রকাশ্যে গ্রহণ করা ভাল। আমরা প্রথমে উভয় বিষয়ের উপকারিতা ও অপকারিতা বর্ণনা করব, এর পর যা সত্য তার ব্যাখ্যা করব। প্রকাশ থাকে যে, গোপনে সদকা গ্রহণ করার উপকারিতা পাঁচটি।

(১) গ্রহীতার গোপনীয়তা বজায় থাকে। প্রকাশ্যে গ্রহণ করলে ভদ্রতার পর্দা ছিন্ন হয়ে যায়, অভাব প্রকাশ হয়ে পড়ে এবং সওয়াল করার ভীতি দূর হয়ে যায়।
(২) গোপনে সদকা গ্রহণ করলে মানুষের অন্তর ও মুখ নিরাপদ থাকে। কেননা, প্রকাশ্যে গ্রহণ করলে মানুষ তার প্রতি হিংসা করে অথবা তার গ্রহণ অপছন্দ করে একথা ভেবে যে, সে ধনী হওয়া সত্ত্বেও সদকা গ্রহণ করেছে অথবা বেশী পরিমাণে গ্রহণ করেছে। হিংসা ও কুধারণা বড় গোনাহ। মানুষকে এসব গোনাহ থেকে নিরাপদ রাখা উত্তম।
আবু আইউব সুখতিয়ানী (রহঃ) বলেন: আমি নতুন বস্ত্র পরিধান করি না এই আশংকায়, কোথাও প্রতিবেশীদের মনে হিংসা সৃষ্টি না হয়ে যায়। অন্য এক দরবেশ বলেন: আমি আমার ভাইদের খাতিরে অধিকাংশ বস্তুর ব্যবহার বর্জন করি, যাতে তারা একথা না বলে যে, তার কাছে এটা কোথেকে এল? ইবরাহীম তায়মীর গায়ে নতুন জামা দেখে কেউ জিজ্ঞেস করল : এটা আপনি কোথায় পেলেন? তিনি বললেন: আমার ভাই' খায়সামা আমাকে পরিধান করিয়েছে। যদি জানতাম, তার পরিবারের লোকেরা এটা জানে, তবে কখনও কবুল করতাম না।

(৩) গোপনে দান গ্রহণ করলে দাতাকে গোপনে আমল করতে সাহায্য করা হয়। বলাবাহুল্য, দান গোপনে করাই উত্তম। অতএব এ ব্যাপারে গ্রহীতা দাতাকে সাহায্য করলে উত্তম কাজে সাহায্য করা হবে, যা নিঃসন্দেহে ভাল। দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের প্রচেষ্টা ছাড়া গোপনে দান হতে পারে না। ফকীর নিজের অবস্থা প্রকাশ করে দিলে দাতার অবস্থাও প্রকাশ হয়ে পড়বে।
এক ব্যক্তি জনৈক আলেমকে প্রকাশ্যে কিছু দান করলে তিনি গ্রহণ করলেন না। অন্য এক ব্যক্তি তাকে গোপনে কিছু দান করলে তিনি গ্রহণ করলেন। অতঃপর এ কারণ জিজ্ঞাসিত হলে তিনি বললেন: দ্বিতীয় ব্যক্তি তার খয়রাতে আদব ও নিয়মের প্রতি লক্ষ্য রেখেছে- গোপনে দিয়েছে। তাই আমি কবুল করেছি।
এক ব্যক্তি জনৈক দরবেশ সুফীকে জনসমাবেশে কিছু দান করলে দরবেশ তা ফিরিয়ে দিলেন। লোকটি বলল: যে বস্তু আপনাকে আল্লাহ তাআলা দিলেন, তা গ্রহণ করলেন না কেন? দরবেশ বললেন: যে বস্তু একান্তভাবে আল্লাহর ছিল, তাতে অপরকে শরীক করে নিয়েছ। কেবল আল্লাহর দেখা তুমি যথেষ্ট মনে করনি। কাজেই তোমার শেরক আমি তোমার কাছেই ফিরিয়ে দিলাম।
জনৈক সাধক এক বস্তু গোপনে কবুল করে নিলেন, যা তিনি প্রকাশ্যে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। দাতা এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন: প্রকাশ্যে দেয়ার কারণে তুমি আল্লাহর নাফরমানী করেছিলে। তাই আমি তোমাকে সাহায্য করিনি। এখন গোপনে দেয়ার কারণে তুমি আল্লাহর আনুগত্য করেছ। তাই আনুগত্যের কাজে আমি তোমাকে সাহায্য করেছি।
সুফিয়ান সওরী (রহঃ) বলেন: যদি আমি জানতাম, কোন ব্যক্তি দান করে তার আলোচনা করবে না এবং অন্যের কাছে বলবে না, তবে আমি তার দান গ্রহণ করতাম।
(৪) গোপনে গ্রহণ করলে গ্রহীতা অপমান ও লাঞ্ছনা থেকে বেঁচে থাকে। প্রকাশ্যে গ্রহণ করলে লাঞ্ছনা হয়। নিজেকে লাঞ্ছিত করা ঈমানদার ব্যক্তির জন্যে শোভন নয়। কোন আলেমকে গোপনে কেউ কিছু দিলে তিনি তা গ্রহণ করতেন এবং প্রকাশ্যে দিলে গ্রহণ করতেন না। তিনি বলতেন: প্রকাশ্যে নেয়ার মধ্যে এলেমের লাঞ্ছনা এবং আলেমগণের বেইযযতী হয়। তাই আমি দুনিয়ার ধন-সম্পদকে উঁচু করে বিনিময়ে এলেম ও আলেমগণকে নীচু করি না।
(৫) গোপনে গ্রহণ করলে শরীকানার সন্দেহ থেকে মুক্ত থাকা যায়। কারণ, রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: যেব্যক্তির কাছে কোন উপঢৌকন আসে, তার কাছে যত লোক থাকে, তারা সকলেই উপঢৌকনে শরীক থাকে। স্বর্ণ-রৌপ্য হলেও তা উপঢৌকন। কেননা, রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : মানুষের দেয়া উত্তম উপঢৌকন হচ্ছে রূপা অথবা খাদ্য, যা খাওয়ানো হয়। এতে রূপাকেও উপঢৌকন বলা হয়েছে। এ থেকে জানা গেল, জনসমাবেশে সকলের সম্মতি ছাড়া বিশেষ কোন ব্যক্তিকে কিছু দেয়া মাকরূহ। সকলের সম্মতি সন্দিগ্ধ বিধায় একান্তে দিলে এই সন্দেহ থেকে মুক্ত থাকা যায়।

এখন সদকা প্রকাশ্যে গ্রহণ করা এবং অন্যের কাছে তার আলোচনা করার মধ্যে যেসকল উপকারিতা রয়েছে, সেগুলো বর্ণিত হচ্ছে। এতে চারটি উপকারিতা আছে।

(১) সদকা প্রকাশ্যে গ্রহণ করলে আন্তরিকতা ও সততা প্রকাশ পায়, নিজের অবস্থা সম্পর্কে অপরকে ধোঁকা দেয়া হয় না এবং রিয়া থেকে মুক্ত থাকা যায়। কারণ, এতে বাস্তব অবস্থাই প্রকাশ পায়। এরূপ হয় না যে, বাস্তব অবস্থা অন্যরূপ এবং লোক দেখানোর উদ্দেশে তা প্রকাশ করা হয় না।

(২) প্রকাশ্যে গ্রহণ করলে জাঁকজমকপ্রীতি দূর হয়ে যায়, দাসত্ব ও দীনতা প্রকাশ পায়, অহংকার ও অভাবমুক্ততার দাবী থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যায় এবং মানুষের দৃষ্টিতে হেয় হওয়া যায়। এ কারণেই জনৈক সাধক তাঁর শিষ্যকে বলেন: সদকা সর্বাবস্থায় প্রকাশ্যে নেবে। এরূপ করলে তোমার ব্যাপারে মানুষ দু'দলে বিভক্ত হয়ে যাবে। এক দল হবে, যাদের মনে তোমার কোন মর্যাদা থাকবে না। এট তো অভীষ্ট লক্ষ্যই। কেননা, এটা তোমার ধর্মের নিরাপত্তার জন্য অধিক উপকারী। আরেক দল হবে, যাদের মনে তোমার প্রতি সহানুভূতি বেশী হবে। কারণ, তুমি আপন অবস্থা ঠিক ঠিক প্রকাশ করে দিয়েছ। এটা তোমার ভাইয়ের কাম্য। কারণ, তার উদ্দেশ্য বেশী বেশী সওয়াব পাওয়া। সে যখন তোমাকে মহব্বত বেশী করবে তখন সে সওয়াবও অবশ্যই পাবে। এ সওয়াব তুমিও পাবে। কেননা, তার সওয়াব বেশী হওয়ার কারণ তুমিই।

(৩) প্রকাশ্যে সদকা গ্রহণ করলে তওহীদকে শেরক থেকে বাঁচানো যায়। কেননা, সাধকের দৃষ্টি মহান আল্লাহ ব্যতীত অন্য দিকে নিবদ্ধ হয় না। গোপনও প্রকাশ্য তার জন্যে সমান। এ অবস্থার পরিবর্তন তওহীদে শেরকের নামান্তর।
জনৈক বুযুর্গ বলেন: যেব্যক্তি গোপনে গ্রহণ এবং প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করত, আমরা তার দোয়ার কোনই মূল্য দিতাম না। উপস্থিত অথবা অনুপস্থিত মানুষের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করা হালের ক্ষতি বৈ নয়। দৃষ্টি সর্বদা এক আল্লাহর দিকে নিবিষ্ট থাকা উচিত। কথিত আছে, জনৈক বুযুর্গ তাঁর মুরীদগণের মধ্যে একজনের প্রতি অধিক আকৃষ্ট ছিলেন। এটা অন্য মুরীদদের কাছে দুঃসহ মনে হলে বুযুর্গ ব্যক্তি তাদের কাছে সেই মুরীদের শেষ্ঠত্ব প্রকাশ করতে চাইলেন। সেমতে প্রত্যেক মুরীদকে একটি করে মুরগী দিয়ে তিনি বললেন: প্রত্যেকেই আপন আপন মুরগী এমন জায়গা থেকে জবাই করে আনবে, যেখানে অন্য কেউ না দেখে। সকল মুরীদ গিয়ে আপন আপন মুরগী জবাই করে আনল। কিন্তু সেই মুরীদ জীবিত মুরগী নিয়ে এল। বুযুর্গ তাকে কারণ জিজ্ঞেস করলে সে বলল: আমি এমন কোন জায়গা খুঁজে পেলাম না, যেখানে কেউ দেখে না। কেননা, আল্লাহ্ তাআলা সর্বত্রই দেখেন। বুযুর্গ ব্যক্তি মুরীদগণকে বললেন: এ কারণেই আমি তার প্রতি অধিক আকৃষ্ট। সে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন কিছুর প্রতি ধ্যান দেয় না।

(৪) প্রকাশ্যে সদকা গ্রহণ করলে শোকরের সুন্নত আদায় হয়। আল্লাহ্ তাআলা বলেন : "তুমি তোমার পালনকর্তার নেয়ামত বর্ণনা কর"। নেয়ামত গোপন করা অকৃতজ্ঞতার শামিল। যারা আল্লাহর নেয়ামত গোপন করে, আল্লাহ তাদের নিন্দা করেন এবং কৃপণ আখ্যা দেন। বলা হয়েছেঃ "যারা কৃপণতা করে, মানুষকে কৃপণতা করতে আদেশ করে এবং আল্লাহ প্রদত্ত অনুগ্রহ গোপন করে।
রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: আল্লাহ তাআলা যখন কোন বান্দাকে নেয়ামত দেন, তখন বান্দাকে সেই নেয়ামতের উপযোগী দেখাও পছন্দ করেন।
এক ব্যক্তি জনৈক সাধককে গোপনে কিছু দিলে সাধক আপন হাত উঁচু করে বললেন: এটা দুনিয়ার বস্তু। এটা প্রকাশ্যে দেয়া উত্তম। আখেরাতের কাজ গোপন করা উত্তম। এ কারণেই জনৈক বুযুর্গ বলেন: তোমাকে জনসমাবেশে কিছু দেয়া হলে তুমি তা গ্রহণ কর। এর পর একান্তে তা ফেরত দিয়ে দাও। সদকার ক্ষেত্রে শোকরের প্রতি উৎসাহ বর্ণিত আছে। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: "যে মানুষের শোকর করে না, সে আল্লাহরও শোকর করে না। শোকর প্রতিদানের স্থলবর্তী হয়ে থাকে। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: "কেউ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করলে তুমি তার প্রতিদান দাও। প্রতিদান সম্ভব না হলে উত্তমরূপে তার প্রশংসা কর এবং সেই পর্যন্ত দোয়া কর, যে পর্যন্ত প্রতিদান হয়ে গেছে বলে তোমার বিশ্বাস না জন্মে। মুহাজিরগণ মদীনায় রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে শোেকর সম্পর্কে প্রশ্ন করলেন: ইয়া রসূলাল্লাহ্, আমরা আনসারদের চেয়ে উত্তম লোক দেখিনি। আমরা তাঁদের কাছে এলে তাঁরা আপন বিষয়-সম্পত্তি আমাদের মধ্যে বন্টন করে দিয়েছেন। আমাদের আশংকা হচ্ছে, সব সওয়াব তাঁরাই নিয়ে যাবেন। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: না, তা নয়। তোমরা যে তাঁদের শোকর করেছ এবং প্রশংসা করেছ, এতে প্রতিদান হয়ে গেছে।
এসব উপকারিতা জানার পর এখন জানা দরকার, এ সম্পর্কে বর্ণিত মতভেদ মূল বিষয়বস্তুর মধ্যে নয়; বরং এটা হাল তথা অবস্থার মতভেদ।
এ ক্ষেত্রে সত্য এই যে, গোপনে গ্রহণ করা সর্বাবস্থায় উত্তম অথবা প্রকাশ্যে গ্রহণ করা ভাল, একথা নিশ্চিতরূপে বলা যায় না। বরং এটা নিয়তের বিভিন্নতার কারণে বিভিন্ন হয়ে থাকে। হাল ও ব্যক্তির পার্থক্যের কারণে নিয়ত আলাদা আলাদা হয়ে যায়। এমতাবস্থায় এখলাসবিশিষ্ট ব্যক্তির উচিত নিজের দেখাশুনা করা এবং বিভ্রান্তিতে না পড়া। এ ব্যাপারে মনের প্রতারণা ও শয়তানের ধোঁকা থেকে বেঁচে থাকতে হবে। প্রকাশ্যে গ্রহণ করার তুলনায় গোপনে গ্রহণ করার কারণসমূহের মধ্যে ধোঁকা প্রতারণা বেশী রয়েছে- যদিও উভয়ের মধ্যেই প্রতারণা আছে। গোপনে গ্রহণ করার মধ্যে প্রতারণার কারণ, মন গোপনে গ্রহণ করার প্রতি আগ্রহী থাকে। কারণ, এতে জাঁকজমক ও মর্যাদা বহাল থাকে। মানুষের দৃষ্টিতে সম্মান ঠিক থাকে। কেউ মিসকীনকে ঘৃণার দৃষ্টিতে এবং দাতাকে তার প্রতি অনুগ্রহকারী ও নেয়ামতদানকারীরূপে দেখে না। এই রোগ মনের মধ্যে গোপন থাকে এবং শয়তান এর মাধ্যমে উপকারিতা প্রকাশ করে। এমনকি, পূর্ববর্ণিত পাঁচটি উপকারিতাকেই গোপনে গ্রহণ করার কারণরূপে উল্লেখ করে।

প্রকাশ্যে গ্রহণ করার প্রতিও মন আগ্রহী থাকে। কারণ, এতে দাতার মন প্রফুল্ল হয় এবং সে দানে উৎসাহিত হয়। এখানে শয়তান বলে, শোকর আদায় করা সুন্নত এবং গোপন রাখা রিয়া। এমনকি, শয়তান পূর্বোল্লিখিত চারটি উপকারিতাকেও প্রমাণস্বরূপ পেশ করে, যাতে প্রকাশ্যে গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করা যায়।

অতএব ফয়সালা এই যে, দাতাকে দেখতে হবে। যদি সে শোকর ও প্রকাশ্যে দেয়া পছন্দ করে, তবে তার দান গোপন রাখবে এবং শোকর করবে না। কেননা, শোকর তলব করা একটি জুলুম। এই জুলুমের কাজে তাকে সাহায্য না করা চাই। পক্ষান্তরে যদি দাতা শোকর পছন্দ না করে, তবে গ্রহীতা তার শোকর করবে এবং দান প্রকাশ করবে। এ কারণেই রসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর সামনে লোকেরা এক ব্যক্তির প্রশংসা করলে তিনি বললেন: তোমরা তাকে মেরে ফেলেছ। সে শুনলে কল্যাণ প্রাপ্ত হবে না। অথচ রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) মানুষের প্রশংসা তাদের উপস্থিতিতে করতেন। কারণ, তিনি তাদের ব্যাপারে আস্থাশীল ছিলেন, এ প্রশংসা তাদের জন্যে ক্ষতিকর হবে না। বরং তাদের সৎ কাজের প্রতি উৎসাহ আরও বৃদ্ধি করবে। উদাহরণতঃ তিনি এক ব্যক্তিকে বললেন: সে গেঁয়ো লোকদের সর্দার। অন্য এক ব্যক্তি সম্পর্কে বললেন: তোমাদের কাছে কোন সম্প্রদায়ের সর্দার আগমন করলে তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন কর। এক ব্যক্তির কথাবার্তা রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর খুব ভাল লাগলে তিনি বললেনঃ নিঃসন্দেহে কিছু বর্ণনা জাদু হয়ে থাকে। মুমিনের প্রশংসা করা হলে তার অন্তরে ঈমান বৃদ্ধি পায়।

সুফিয়ান সওরী বলেন: যেব্যক্তি নিজেকে সম্যক চেনে, মানুষের প্রশংসা তার জন্যে ক্ষতিকর হয় না। সারকথা, জনসমাবেশে গ্রহণ করা এবং একান্তে না করা উত্তম ও নিরাপদ পন্থা। হাঁ, যদি মারেফত কামেল হয় এবং প্রকাশ্যে গ্রহণ ও গোপনে গ্রহণ উভয়টি সমান হয়ে যায়, তবে গোপনে গ্রহণ করার মধ্যেও দোষ নেই। কিন্তু এরূপ ব্যক্তি অত্যন্ত বিরল। আলোচনায় আছে- বাস্তবে পাওয়া ভার। আল্লাহ আমাদেরকে সাহায্য করুন এবং তওফীক দান করুন।

পরবর্তী পর্ব
সদকা গ্রহণ করা উত্তম না যাকাত

যাকাত (পর্ব– ৯) নফল সদকা সম্পর্কে সাহাবায়ে কেরাম ও বুযুর্গগণের উক্তি



যাকাত পর্ব– ৯
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

নফল সদকা সম্পর্কে সাহাবায়ে কেরাম ও বুযুর্গগণের উক্তি-
ওরওয়া ইবনে যুবায়র (রাঃ) বলেন: হযরত আয়েশা (রাঃ) পঞ্চাশ হাজার দেরহাম খয়রাত করেন অথচ তাঁর কোর্তায় তালিই থাকত।
হযরত ওমর (রাঃ) বলতেন: ইলাহী, ধনসম্পদ ও ধনাঢ্যতা আমাদের মধ্যে উত্তম ব্যক্তিকে দান করুন। সম্ভবতঃ সে তা আমাদের অভাবগ্রস্তদেরকে পৌঁছাবে।
আবদুল আজীজ ইবনে ওমায়র (রহঃ) বলেন : নামায মানুষকে অর্ধেক পথে পৌঁছায়, রোযা বাদশাহের দ্বারে নিয়ে যায় এবং সদকা বাদশাহের সামনে উপস্থিত করে।
ইবনে আবিল জা'দ (রহঃ) বলেন: সদকা মানুষ থেকে সত্তর প্রকার অনিষ্ট দূর করে। প্রকাশ্যে সদকা দেয়ার তুলনায় গোপনে দেয়ায় সত্তর গুণ বেশী সওয়াব। সদকা সত্তর শয়তানের চোয়াল বিদীর্ণ করে।
হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ) বলেন: এক ব্যক্তি সত্তর বছর আল্লাহ তাআলার এবাদত করার পর কোন একটি কবীরা গোনাহ করায় তার এবাদত বাতিল করে দেয়া হল। অতঃপর সে এক মিসকীনের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় তাকে এক খন্ড রুটি সদকা করল। ফলে আল্লাহ তার অপরাধ মার্জনা করে সত্তর বছরের এবাদত বহাল করে দিলেন।
লোকমান (আঃ) তাঁর পুত্রকে বললেন: তুমি যখন কোন গোনাহ কর, তখন সদকা করবে।
ইয়াহইয়া ইবনে মুআয (রহঃ) বলেনঃ সদকার দানা ব্যতীত কোন দানা দুনিয়ার পাহাড়ের সমান হয়ে যায় বলে আমার জানা নেই। সদকার দানা অবশ্যই এতটুকু হয়ে যায়।
আবদুল আজীজ ইবনে আবী রুয়াদ বলেন: প্রথম যমানায় বলা হত, তিনটি বিষয় জান্নাতের ভান্ডারসমূহের মধ্যে দাখিল- রোগ গোপন করা, সদকা গোপন করা এবং বিপদাপদ গোপন করা।
হযরত ওমর (রাঃ) বলেনঃ আমলসমূহ একে অপরের উপর গর্ব করল। সদকা বলল: আমি তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।
আবদুল্লাহ (রহঃ) চিনি খয়রাত করতেন এবং বলতেন: আমি দেখলাম, আল্লাহ তাআলা বলেন: "তোমরা প্রিয় বস্তু ব্যয় না করা পর্যন্ত পূর্ণ নেকী পাবে না"। আমি চিনি ভালবাসি, একথা আল্লাহ তাআলা জানেন।
নখয়ী (রহঃ) বলেন: আল্লাহর জন্যে যে বস্তু দেব তাতে কোন দোষ থাকা আমার পছন্দনীয় নয়।
ওবায়েদ ইবনে ওমায়ের (রহঃ) বলেন: কেয়ামতের দিন মানুষ সকল দিন অপেক্ষা অধিক ক্ষুধার্ত, পিপাসার্ত ও উলঙ্গ অবস্থায় উত্থিত হবে। অতঃপর যেব্যক্তি দুনিয়াতে আল্লাহর জন্যে ক্ষুধার্তকে আহার দিয়ে থাকবে, আল্লাহ তাকে পেট ভরে আহার করাবেন। যেব্যক্তি আল্লাহর জন্যে বস্ত্রহীনকে বস্ত্র পরিধান করিয়ে থাকবে, আল্লাহ তাকে বস্ত্র পরিধান করাবেন।
হযরত হাসান বসরী (রহঃ) বলেন: আল্লাহ তাআলা ইচ্ছা করলে তোমাদের সকলকে ধনাঢ্য করে দিতেন- তোমাদের মধ্যে ফকীর থাকত না। কিন্তু তিনি একজনকে অপরজন দ্বারা পরীক্ষা করেছেন।
শা'বী (রহঃ) বলেন: ফকীর ধনীর সদকার যতটুকু মুখাপেক্ষী, যদি ধনী তার তুলনায় আপন সদকার সওয়াবের অধিক মুখাপেক্ষী না হয়, তবে তার সদকা অনর্থক। এ সদকা তার মুখে নিক্ষেপ করা হবে।
ইমাম মালেক (রহঃ) বলেন: যে পানি সদকা করা হয় এবং মসজিদে পান করানো হয়, তা থেকে ধনী ব্যক্তি পান করলে আমরা দোষ মনে করি না। কেননা, যে পানি সদকা করে, সে পিপাসার্তদের জন্যে সদকা করে। বিশেষভাবে ফকীর-মিসকীনকে সদকা করার নিয়ত তার থাকে না।
কথিত আছে, জনৈক দাস বিক্রেতা এক বাঁদী সঙ্গে নিয়ে হযরত হাসান বসরীর কাছ দিয়ে গমন করলে তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন: তুমি এই বাঁদী এক দুই দেরহামের বিনিময়ে বিক্রয় করতে সম্মত আছ কি? সে বলল: না। হাসান বসরী (রঃ) বললেন: যাও, আল্লাহ তাআলা তো এক পয়সা ও এক লোকমা সদকা করার বিনিময়ে বেহেশতের হুর দিতে সম্মত আছেন।

পরবর্তী পর্ব

যাকাত (পর্ব– ৮) নফল দান-খয়রাত ও তার ফযীলত 📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)



যাকাত পর্ব– ৮
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

নফল দান-খয়রাত ও তার ফযীলত-
নফল দান খয়রাতের ফযীলত সম্পর্কিত হাদীস নিম্নরূপ:
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: সদকা কর যদিও তা একটি খেজুর হয়। কেননা, এটা ক্ষুধার্তের কিছু না কিছু কষ্ট দূর করে এবং গোনাহকে এমনভাবে নির্বাপিত করে, যেমনভাবে পানি অগ্নি নির্বাপিত করে। তিনি আরও বলেনঃ "এক খন্ড খেজুর দান করে হলেও দোযখ থেকে আত্মরক্ষা কর। যদি তা না পাও, তবে ভাল কথা বলে আত্মরক্ষা কর।
রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলেন: "যে মুসলমান বান্দা তার পবিত্র উপার্জন থেকে সদকা করে- আল্লাহ তাআলা পবিত্রকেই গ্রহণ করেন- আল্লাহ তাআলা এই সদকা ডান হাতে গ্রহণ করেন, অতঃপর তা লালন-পালন করেন, যেমন তোমাদের কেউ উটের বাচ্চা লালন-পালন করে অবশেষে খেজুর বেড়ে ওহুদ পাহাড়ের সমান হয়ে যায়"।

রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হযরত আবু দারদা (রঃ)-কে বললেন: "যখন তুমি শুরবা রান্না কর তখন তাতে বেশী পরিমাণে পানি দাও। অতঃপর তা থেকে প্রতিবেশীদেরকে দান কর"। তিনি আরও বলেন: "যে বান্দা ভাল সদকা দেয়, আল্লাহ তার সম্পদে অনেক বরকত দেন"।

এক হাদীসে আছে- "হাশরের মাঠে মানুষের মধ্যে ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক ব্যক্তি তার সদকার ছায়াতলে অবস্থান করবে"।
আরও আছে-"সদকা অনিষ্টের সত্তরটি দরজা বন্ধ করে"।
আরও আছে- "গোপন সদকা পালনকর্তার ক্রোধ নির্বাপিত করে"।
এক হাদীসে বলা হয়েছে- "যেব্যক্তি সচ্ছলতাবশতঃ দান করে, সে সওয়াবে সেই ব্যক্তির চেয়ে উত্তম নয়, যে অভাবের কারণে তা কবুল করে"। এর উদ্দেশ্য সম্ভবতঃ এই, যেব্যক্তি সদকা কবুল করে নিজের অভাব দূর করে, যাতে ধর্মের কাজে আত্মনিয়োগ করতে পারে, সে সেই দাতার সমান, যে তার দান দ্বারা ধর্মের অগ্রগতির নিয়ত করে। কেউ রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে প্রশ্ন করল: কোনটি সদকা উত্তম? তিনি বললেনঃ "এমন সময়ে সদকা করা উত্তম, যখন মানুষ সুস্থ থাকে, মাল আটকে রাখতে চায়, অনেক দিন বাঁচার আশা রাখে এবং উপবাসকে খুব ভয় করে। সদকা দিতে এতদূর বিলম্ব করবে না যে, মরণোন্মুখ অবস্থায় বলতে থাকবে, এই পরিমাণ অমুককে এবং এই পরিমাণ অমুককে দেবে, অথচ তখন তোমার মাল অন্যের অর্থাৎ ওয়ারিসদের হয়ে গেছে"। একদিন রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সাহাবীগণকে বললেন: তোমরা সদকা কর। এক ব্যক্তি আরজ করল : আমার কাছে একটি দীনার আছে। তিনি বললেন: এটি নিজের জন্যে ব্যয় কর। লোকটি বলল: আমার কাছে আরও একটি দীনার আছে। তিনি বললেন: এটি স্ত্রীর জন্যে ব্যয় কর। লোকটি বলল: আমার কাছে আরও একটি দীনার আছে, তিনি বললেন: এটি সন্তানদের জন্য ব্যয় কর। লোকটি আরজ করল, আমার কাছে আরেকটি দীনার আছে, তিনি বললেন এটি খাদেমের জন্যে ব্যয় কর। লোকটি বলল: আমার কাছে আর একটি দীনার আছে। তিনি বললেন: এটা যেখানে ভাল মনে কর, ব্যয় কর।
রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলেন: মুহাম্মদ পরিবারের জন্যে সদকা হালাল নয়। কারণ, সদকা মানুষের সম্পদের ময়লা। তিনি আরও বলেন: যেব্যক্তি ভিক্ষুককে খালি হাতে ফিরিয়ে দেয়, ফেরেশতারা তার গৃহের উপর সাত দিন পর্যন্ত ছায়া দান করেন না।
দুটি কাজ রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) অন্যের হাতে সোপর্দ করতেন না- নিজে করতেন। এক, ওযুর পানি নিজে রাখতেন ও তা ঢেকে দিতেন এবং দুই, মিসকীনকে নিজের হাতে দান করতেন। তিনি বলেন: সে ব্যক্তি মিসকীন নয়, যাকে এক খেজুর অথবা দুই খেজুর এবং এক লোকমা অথবা দুই লোকমা দিয়ে বিদায় করা হয়; বরং সেই মিসকীন যে সওয়াল থেকে বিরত থাকে। তুমি এ আয়াত পড়ে দেখ- "তারা মানুষের কাছে গায়ে পড়ে সওয়াল করে না"।
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলেন : যে মুসলমান অন্য কোন মুসলমানকে বস্ত্র পরিধান করায়, সে মিসকীনের গায়ে ঐ বস্ত্রের তালি থাকা পর্যন্ত আল্লাহ্ তাআলার হেফাযতে থাকে। 

পরবর্তী পর্ব

যাকাত (পর্ব– ৭) যাকাত গ্রহীতার আদব 📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)



যাকাত পর্ব– ৭
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

যাকাত গ্রহীতার আদব-
যাকাত গ্রহীতার আদব পাঁচটি:
(১) সে মনে করবে, আল্লাহ, তাআলা তাকে এক চিন্তা ছাড়া সকল চিন্তা থেকে মুক্ত রাখার জন্যে অন্যের উপর যাকাত ওয়াজেব করেছেন। মানুষের নিষ্ঠাকে আল্লাহ তা'আলা এবাদত সাব্যস্ত করেছেন। অর্থাৎ, মানুষ কেবল আল্লাহ ও কেয়ামত দিবসের কথা চিন্তা করবে- অন্য কোন চিন্তায় মগ্ন হবে না।আল্লাহ্ তা'আলা বলেন- "আমি মানুষ ও জ্বিনকে একমাত্র আমার এবাদতের জন্যে সৃষ্টি করেছি"।
কিন্তু আল্লাহ তাআলার আদি রহস্যের তাগিদ অনুযায়ী বান্দার উপর কামনা-বাসনা ও অভাব-অনটন চাপিয়ে তার চিন্তাকে বিক্ষিপ্ত করা হয়েছে। তাই অনুগ্রহস্বরূপ তাকে বিভিন্ন নেয়ামতও পৌঁছানো হয়েছে, যাতে তার অভাব অনটন মোচনের জন্যে যথেষ্ট হয়। এ দৃষ্টিতে প্রভূত ধন-সম্পদ সৃষ্টি করে বান্দার হাতে দেয়া হয়েছে। এসব ধন-সম্পদ বান্দার প্রয়োজনাদি মেটানোর ওসিলা এবং এবাদতের জন্যে অবকাশ লাভের উপায়। আল্লাহ তাআলা কতক বান্দাকে অগাধ ধন-দৌলত দান করেছেন, যাতে তা তাদের জন্যে পরীক্ষা হয়। কতক লোককে তিনি তাঁর মহব্বত দ্বারা গৌরবান্বিত করে দুনিয়ার ঝামেলা থেকে এমনভাবে বাঁচিয়ে রেখেছেন, যেমন দরদী ও স্নেহশীল চিকিৎসক রোগীকে কুপথ্য থেকে বাঁচিয়ে রাখে। অর্থাৎ, তিনি তাদেরকে দুনিয়ার অতিরিক্ত সাজসরঞ্জাম থেকে আলাদা রেখেছেন এবং প্রয়োজনীয় অর্থ ধনীদের হাত দিয়ে তাদের কাছে পৌঁছিয়েছেন, যাতে উপার্জনের চিন্তা, সঞ্চয়ের পরিশ্রম, হেফাযতের পেরেশানী ধনীদের দায়িত্বে থাকে এবং তার লাভ ফকীররা ভোগ করে; ফলে তারা আল্লাহ তাআলার এবাদতেই সর্বক্ষণ মগ্ন থাকে এবং পরকালের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। ফকীরদের প্রতি এটি আল্লাহ তায়ালার পরম নেয়ামত। ফকীরদের উচিত এ নেয়ামতের কদর করা এবং মনে প্রাণে বিশ্বাস করা, দুনিয়ার সাজসরঞ্জাম থেকে তাদেরকে বিচ্ছিন্ন রেখে আল্লাহ তাদের প্রতি একান্তই কৃপা করেছেন।
সারকথা, ফকীর যা নেবে, তদ্দ্বারা স্বীয় রিযিক ও এবাদতে সাহায্য লাভের উদ্দেশে নেবে। যদি তা সম্ভবপর না হয়, তবে এ দানের অর্থ আল্লাহ তাআলার অনুমোদিত খাতে ব্যয় করবে। যদি এই অর্থ দ্বারা পাপ কাজে সাহায্য লাভ করে, তবে সে আল্লাহর নেয়ামতের অকৃতজ্ঞ হবে এবং তাঁর ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির পাত্র হবে।
(২) ফকীর দাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হবে এবং তার জন্যে নেক দোয়া করবে। দোয়া এভাবে করবে যেন দাতাকে মধ্যবর্তী ছাড়া অন্য কিছু মনে না করা হয়। বরং এটাই বুঝবে, আল্লাহর নেয়ামত পৌঁছার পথ ও উপায় এ ব্যক্তি হয়ে গেছে। এ ধারণা নেয়ামত আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে বলে বিশ্বাস করার পরিপন্থী নয়। সেমতে হাদীসে বলা হয়েছে- "যেব্যক্তি মানুষের শোকর করে না, সে আল্লাহ তাআলার শোকর করে না"।
আল্লাহ তাআলা বান্দার আমলের জন্যে তার প্রশংসা অনেক জায়গায় করেছেন। উদাহরণতঃ এক জায়গায় বলেন, "আইউব চমৎকার বান্দা। সে বলেেেছন- আমার দিকে প্রত্যাবর্তনকারী"। আরও অনেক আয়াতে এই বিষয়বস্তু বর্ণিত হয়েছে। গ্রহীতা এভাবে দোয়া করবে- "আল্লাহ্ পবিত্র লোকদের অন্তরের সাথে আপনার অন্তরকে পবিত্র করুন এবং সৎকর্মীদের কর্মের সাথে আপনার কর্মকে পরিষ্কার করুন। শহীদদের আত্মা সাথে আপনার আত্মার প্রতি রহমত নাযিল করুন"।
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: কেউ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করলে তুমি তাকে কিছু বিনিময় দাও। আর কিছু সম্ভব না হলে তার জন্যে দোয়া কর। এত দোয়া কর যেন প্রতিদান হয়ে গেছে বলে তোমার মনে বিশ্বাস জন্মে। শোকরের পরিশিষ্ট হচ্ছে, দানের মধ্যে কিছু দোষ থাকলে তা গোপন করবে এবং তার নিন্দা করবে না। দাতা যদি না দেয়, তবে তাকে লজ্জা দেবে না। দিলে তার কাজকে মানুষের সামনে বড় বলে প্রকাশ করবে। কেননা, দাতার আদব হল নিজের দানকে ছোট মনে করা এবং কৃতজ্ঞ হওয়া।
(৩) গ্রহীতা যে অর্থ নিতে চায়, তা হারাম কিনা প্রথমে দেখে নেয়া উচিত। নাজায়েয ও হারাম হলে তা গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকবে। এর বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা অন্য কোথাও থেকে তাকে দেয়াবেন। আল্লাহ বলেন:
"যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্যে নিষ্কৃতির পথ করে দেন এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রিযিক দেন, যার কল্পনাও সে করে না"। এরূপ নয় যে, কেউ হারাম থেকে বিরত থাকলে সে হালাল মাল পাবে না। মোট কথা, সরকারী কর্মচারীদের মাল এবং যাদের উপার্জন অধিকাংশই হারাম, তাদের মাল গ্রহণ করবে না। কিন্তু অবস্থা সংকটজনক হলে এবং প্রদত্ত মালের কোন মালিক জানা না থাকলে প্রয়োজনমাফিক তা গ্রহণ করা জায়েয। কেননা, এরূপ মাল খয়রাত করে দেয়াই বিধান।
(৪) গ্রহীতা সন্দেহের জায়গা থেকে বেঁচে থাকবে এবং যা নেবে তার পরিমাণে সন্দেহ হলে যতটুকু জায়েয, ততটুকুই নেবে। নিজের মধ্যে হকদার হওয়ার কারণ বিদ্যমান আছে- একথা না জানা পর্যন্ত নেবে না। উদাহরণতঃ যদি ঋণী হওয়ার কারণে যাকাত নেয়, তবে ঋণের পরিমাণের বেশী নেবে না। যদি মুসাফির হওয়ার কারণে যাকাত নেয়, তবে পাথেয় এবং গন্তব্যস্থানে পৌঁছা পর্যন্ত যানবাহনের যা ভাড়া লাগে, তার বেশী নেবে না। এসব বিষযের আন্দাজ গ্রহীতা নিজের ইজতেহাদ দ্বারা করবে। এর কোন সীমা নির্দিষ্ট নেই। মোট কথা, প্রয়োজন পরিমাণ হয়ে গেলে যাকাতের মাল বেশী গ্রহণ করবে না; বরং এই বছরের জন্যে যথেষ্ট হয়, এই পরিমাণ গ্রহণ করবে। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আপন পোষ্যদের জন্যে এক বছরের খাদ্য একত্রিত করেছেন। অতএব ফকীর ও মিসকীনের জন্যে এ সীমাই নির্দিষ্ট হওয়া উচিত। যদি একমাস অথবা একদিনের প্রয়োজন পরিমাণ গ্রহণ করে ক্ষান্ত হয়, তবে এটা তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।
যাকাত ও খয়রাত থেকে ফকীরের কি পরিমাণ গ্রহণ করা উচিত, এ সম্পর্কে আলেমগণ ভিন্ন ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ এত বেশী কম বলেন যে, একদিন এক রাতের খাদ্যের বেশী না নেয়া তাদের মতে ওয়াজেব। তাদের এ দাবীর সমর্থনে সহল ইবনে হানয়ালিয়া বর্ণিত একটি হাদীস পেশ করা হয়ে থাকে। তা এই, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) মালদারী থাকা অবস্থায় সওয়াল করতে নিষেধ করেছেন। এর পর মালদারী কি, এ প্রশ্নের জওয়াবে তিনি বলেছেন- সকাল ও সন্ধ্যার খাদ্য থাকা। কেউ কেউ বলেন, ধনাঢ্যতার সীমা হচ্ছে যাকাতের নেসাব। কারণ, আল্লাহ্ তাআলা যাকাত কেবল ধনাঢ্যদের উপর ফরয করেছেন। তারা এর অর্থ এই বের করেছেন, নিজের জন্যে এবং পরিবারের প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে যাকাতের নেসাব পর্যন্ত গ্রহণ করা জায়েয। কেউ কেউ ধনাঢ্যতার সীমা পঞ্চাশ দেরহাম বলেছেন। কেননা, হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ)-এর রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেনঃ "যেব্যক্তি মালদার হওয়া সত্ত্বেও সওয়াল করবে, সে কেয়ামতের দিন মুখমণ্ডলে ঘা নিয়ে উপস্থিত হবে"। প্রশ্ন করা হল: মালদারী কি? তিনি বললেন: "পঞ্চাশ দেরহাম অথবা তার সমতুল্যের স্বর্ণ"। কথিত আছে, এ হাদীসের একজন রাবী দুর্বল। কেউ কেউ ধনাঢ্যতার সীমা চল্লিশ দেরহাম বর্ণনা করেছেন। কেননা, আতা ইবনে ইয়াসারের রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ওকিয়া অর্থাৎ, চল্লিশ দেরহাম থাকা সত্ত্বেও যেব্যক্তি সওয়াল (ভিক্ষা) করে, সে অযথা সওয়াল করে। অন্য আলেমগণ বিষয়টি অধিক প্রশস্ত করে বলেছেন : ফকীর এই পরিমাণে গ্রহণ করতে পারে, তদ্দ্বারা এক খণ্ড জমিন ক্রয় করে জীবনের জন্য নিশ্চিন্ত হয়ে যায় অথবা কোন পণ্য সামগ্রী ক্রয় করে অভাবমুক্ত হয়ে যায়। কেননা, জীবিকার জন্যে নিশ্চিন্ত হওয়াকেই নিশ্চিন্ততা বলে। হযরত ওমর (রাঃ) বলেন: যখন এই দান কর, তখন ধনী করে দাও। কারও কারও মতে, কোন ব্যক্তি ফকীর হয়ে গেলে সে এই পরিমাণ গ্রহণ করতে পারে, যদ্দ্বারা তার পূর্বাবস্থা বহাল হয়ে যায়, যদিও তা দশ হাজার দেরহাম দ্বারা হয়। একবার হযরত আবু তালহা (রাঃ) তাঁর বাগানে নামায পড়ছিলেন। এমতাবস্থায় বাগানের দিকে তাঁর ধ্যান চলে যাওয়ায় তিনি বললেন: আমি এ বাগান খয়রাত করলাম। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাঁকে বললেন: তুমি এ বাগান তোমার আত্মীয়দের মধ্যে খয়রাত কর। এটা তোমার জন্যে ভাল। সেমতে তিনি বাগানটি হযরত হাসান ও আবু কাতাদাহ্ (রাঃ)-কে দান করে দিলেন। একটি খোরমার বাগান পেয়ে তারা উভয়েই ধনী হয়ে গেলেন। হযরত ওমর (রাঃ) জনৈক গেঁয়ো ব্যক্তিকে একটি বাচ্চা উট সেটির পিতা-মাতা সহ দিয়ে দেন।
এসব রেওয়ায়েত থেকে বুঝা যায়, ফকীররা বেশী গ্রহণ করতে পারে। আমাদের মতে, নিম্নে এক দিবা-রাত্রির খাদ্য অথবা চল্লিশ দেরহাম থাকলে সওয়াল করবে না এবং দ্বারে দ্বারে ঘুরাফেরা করবে না। ভিক্ষাবৃত্তি নিন্দনীয়। এ ব্যাপারে পরহেযগার ব্যক্তিকে বলে দেয়া উচিত, তুমি তোমার মনের কাছ থেকে ফতোয়া নাও, অন্যেরা তোমাকে যত ফতোয়াই দিক না কেন। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-ও তাই বলেছিলেন। গ্রহীতা যদি সেই মালের ব্যাপারে মনে কোন খটকা পায়, তবে আল্লাহকে ভয় করে মাল গ্রহণ করা উচিত। ফতোয়াকে বাহানা বানিয়ে তা গ্রহণ করা উচিত নয়। কেননা, যাহেরী আলেমগণের ফতোয়া প্রয়োজনের শর্ত থেকে মুক্ত এবং এতে অনেক সন্দেহ থাকে। ধার্মিক ও আখেরাতের পথিকদের অভ্যাস সন্দেহ থেকে বেঁচে থাকা।
(৫) ফকীর মালদার ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করে জেনে নেবে, তার উপর কি পরিমাণ যাকাত ওয়াজেব। জানার পর দেখবে, যতটুকু সে পেয়েছে তা মোট যাকাতের এক-অষ্টমাংশের বেশী কিনা। বেশী হলে তা নেবে না। কেননা, সে এবং তার আরও দু'জন শরীক মিলে কেবল এক-অষ্টমাংশের হকদার। সুতরাং সে এক অষ্টমাংশের এক-তৃতীয়াংশ নেবে, বেশী নেবে না। এটা জিজ্ঞেস করা অধিকাংশ লোকের উপর ওয়াজেব। কারণ, মানুষ এই ভাগাভাগির প্রতি লক্ষ্য করে না মূর্খতার কারণে অথবা সহজ করার কারণে। তবে হারাম হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল না হলে এসব বিষয় জিজ্ঞেস না করা জায়েয।

যাকাত (পর্ব– ৬) যাকাতের হকদার হওয়ার কারণ




যাকাত পর্ব– ৬
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

যাকাতের হকদার হওয়ার কারণ-
প্রকাশ থাকে যে, এমন ব্যক্তি যাকাতের হকদার, যে মুসলমান, স্বাধীন (হাশেমী ও মুত্তালেবী বংশীয় নয়) এবং যার মধ্যে কোরআন বর্ণিত আটটি গুণের মধ্য থেকে কোন একটি গুণ বিদ্যমান আছে। এই আটটি গুণ আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। কাফের, গোলাম ও হাশেমী বংশীয়কে যাকাত দেয়া জায়েয নয়। নিম্নে আট প্রকার লোক আলাদা আলাদা বর্ণিত হচ্ছে।

(১) প্রথম প্রকার- ফকীর।
যার কাছে অর্থ-সম্পদ নেই এবং যে উপার্জনক্ষম নয়, তাকে ফকীর বলা হয়। যার কাছে একদিনের খাদ্য ও পোশাক আছে, সে ফকীর নয়; বরং মিসকীন। অর্ধেক দিনের খাদ্য থাকলে সে ফকীর। সওয়াল করা যেব্যক্তির অভ্যাস সে ফকীর দলের বাইরে নয়। কেননা, সওয়াল করা কোন উপার্জনের পেশা নয়। হাঁ, উপার্জন করতে সক্ষম হলে সে ফকীরদের দল থেকে খারিজ হয়ে যাবে। যন্ত্রপাতি দিয়ে উপার্জন করতে সক্ষম ব্যক্তিও ফকীর, তাকে যাকাতের টাকা দিয়ে যন্ত্রপাতি কিনে দেয়া জায়েয। যদি কেউ এমন পেশা অবলম্বনে করতে সক্ষম না হয়, যা তার ভদ্রতা ও মর্যাদার অনুপযোগী, তবে সে ফকীর বলেই গণ্য হবে। এমনিভাবে আলেম ব্যক্তির যদি কোন পেশা গ্রহণ করে এলেম চর্চায় বাধা সৃষ্টি করে, তবে সে-ও ফকীর। পেশা গ্রহণ করে এবাদতে বাধা সৃষ্টি করলেও তা করা উচিত। কেননা, খয়রাতের তুলনায় কাজ করা উত্তম।
রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন- "হালাল জীবিকা অন্বেষণ ঈমানী ফরযের পরের ফরয"। উদ্দেশ্য, উপার্জনের চেষ্টা করা দরকার। হযরত ওমর (রাঃ) বলেনঃ হালাল-হারামের সন্দিগ্ধ উপার্জন সওয়াল (চাওয়া) অপেক্ষা উত্তম।
(২) দ্বিতীয় প্রকার- মিসকীন।
যার আয় ব্যয়ের জন্যে যথেষ্ট নয়, তাকে মিসকীন বলা হয়। অতএব কেউ হাজার দেরহামের মালিক হয়েও মিসকীন হতে পারে। পক্ষান্তরে একটি কুড়াল ও রশির মালিক হয়েও মিসকীন না হতে পারে। মাথা গোঁজার মত গৃহ ও অবস্থানুযায়ী পোশাক পরিচ্ছদ থাকলেই মানুষ মিসকীনদের দল থেকে খারিজ হয়ে যাবে না। এমনিভাবে ঘরকন্নার প্রয়োজনীয় আসবাবপত্রও মানুষকে মিসকীনদের দল থেকে খারিজ করে দেয় না। ফেকাহ্ শাস্ত্রের কিতাবসমূহের মালিকানাও মিসকিনীর পরিপন্থী নয়। কিতাব ব্যতীত অন্য কোন কিছুর মালিক না হলে তার উপর সদকায়ে ফেতর ওয়াজেব নয়। কিতাবপত্র এবং পোশাক পরিচ্ছদও গৃহের জরুরী আসবাবপত্রের অনুরূপ। তবে কিতাবের প্রয়োজন বুঝার ব্যাপারে সাবধান হওয়া উচিত। তিনটি উদ্দেশ্যে কিতাবের প্রয়োজন হয়, পড়া, পড়ানো ও অধ্যয়ন করা। চিত্তবিনোদন কোন প্রয়োজন নয়। উদাহরণতঃ কবিতা, ইতিহাস, সংবাদপত্র এবং দুনিয়া ও আখেরাতে উপকারী নয় এমন কিতাব সংগ্রহ এক্ষেত্রে ধর্তব্য নয়। এ ধরনের কিতাব মিসকিনীর পরিপন্থী। বেতনভুক্ত শিক্ষক যেসকল কিতাবের সাহায্যে পাঠদান করে, সেগুলো তার জন্যে দর্জি প্রমুখ পেশাদার ব্যক্তিদের যন্ত্রপাতির অনুরূপ। এগুলো থাকলেও কেউ মিসকীন হতে পারে।
(৩) তৃতীয় প্রকার- আমেল (কর্মচারী)।
বিচারক ও শাসনকর্তা ছাড়া যারা যাকাত আদায় করে, তারা এই প্রকারের অন্তর্ভুক্ত। দলপতি, হিসাব রক্ষক, ক্যাশিয়ার, নকল নবীশ প্রমুখ কর্মচারীও এর মধ্যে দাখিল। তাদের কাউকে এ কাজের সাধারণ মজুরির চেয়ে বেশী দেয়া যাবে না।
(৪) চতুর্থ প্রকার- তারা, যাদেরকে মন জয় করার উদ্দেশে যাকাতের অর্থ দেয়া হয়।
তারা আপন আপন গোত্রের সর্দার হয়ে থাকে। তাদেরকে দেয়ার উদ্দেশ্য তাদেরকে ইসলামের উপর কায়েম রাখা এবং তাদের অধীনস্থদেরকে উৎসাহ প্রদান করা।
(৫) পঞ্চম প্রকার- মুকাতাব।
যে গোলামকে তার প্রভু কিছু অর্থের বিনিময়ে মুক্ত করতে বলে, তাকে মুকাতাব বলা হয়। মুকাতাবের অংশ তার প্রভুকে দেয়া উচিত। স্বয়ং মুকাতাবকে দেয়াও জায়েয। প্রভু তার মালের যাকাত মুকাতাবকে দেবে না। কেননা, সে এখনও তার গোলাম।
(৬) ষষ্ঠ প্রকার- ঋণী ব্যক্তি।
যারা বৈধ কাজে ঋণ গ্রহণ করে, অতঃপর দারিদ্র্যের কারণে শোধ করতে পারে না; তারা এই প্রকারের অন্তর্ভুক্ত। গোনাহের কাজে ঋণ গ্রহণ করে থাকলে যে পর্যন্ত তওবা না করে তাকে যাকাতের অর্থ দেয়া যাবে না। ধনী ব্যক্তির যিম্মায় ঋণ থাকলে যাকাতের অর্থ দ্বারা তা শোধ করা যাবে না। তবে সে কোন জনকল্যাণমূলক কাজের জন্যে ঋণ গ্রহণ করে থাকলে তা শোধ করতে অসুবিধা নেই।
(৭) সপ্তম প্রকার- গাজী।
সরকারী ভাতাভুকদের রেজিস্টারে যার কোন ভাতা নেই; তাকে যাকাতের একটি অংশ দেয়া উচিত- যদিও সে ধনী হয়। এতে জেহাদে সাহায্য করা হবে।
(৮) অষ্টম প্রকার- মুসাফির।
যেব্যক্তি সফরের উদ্দেশে আপন শহর থেকে রওয়ানা হয়, সে মুসাফির। সফর গোনাহের উদ্দেশে না হলে এবং মুসাফির ব্যক্তি নিঃস্ব হলে তাকে যাকাত দিতে হবে। তার স্বগৃহে ধন সম্পদ থাকলে তাকে এতটুকু দিতে হবে, যদ্দ্বারা সে গৃহে পৌঁছতে পারে।
এখন প্রশ্ন, উপরোক্ত আট প্রকার হকদার ব্যক্তিকে কিরূপে চেনা যাবে?
জওয়াব, ফকীর ও মিসকীনের বেলায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উক্তিই যথেষ্ট হবে। এ জন্যে সাক্ষ্য ও কসম নিতে হবে না। আমি ফকীর- কেউ একথা বললেই তাকে যাকাত দেয়া যাবে, যদি সে মিথ্যাবাদী বলে দৃঢ় বিশ্বাস না হয়। জেহাদ ও সফর ভবিষ্যতের ব্যাপার। যদি কেউ বলে, সে সফর অথবা জেহাদের ইচ্ছা রাখে, তবে তাকে দেয়া জায়েয। যদি কেউ পরবর্তীতে এই ইচ্ছা পূর্ণ না করে, তবে যা দেয়া হয়, তা ফেরত নিতে হবে। অবশিষ্ট চার প্রকার হকদারকে চেনার জন্যে সাক্ষী অত্যাবশ্যক। এ পর্যন্ত হকদার হওয়ার শর্ত ও কারণসমূহ বর্ণিত হল।

পরবর্তী পর্ব

শনিবার, ৩০ মার্চ, ২০২৪

যাকাত (পর্ব– ৫) যাকাতের হকদার



যাকাত পর্ব– ৫
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

যাকাতের হকদার
দান খয়রাতের জন্যে এমন লোক তালাশ করা, যাদের দ্বারা দান-খয়রাত মর্যাদাশীল ও পবিত্র হয়। যেনতেন লোকের হাতে তা পৌঁছে দেয়া ঠিক নয়। ছয়টি গুণের মধ্যে থেকে দুটি গুণ যাদের মধ্যে পাওয়া যায় তাদেরকে খয়রাত দেবে। 

(১) প্রথম- এমন লোক তালাশ করবে, যে পরহেযগার, সংসারবিমুখ ও কেবল আখেরাতের ব্যবসায়ে লিপ্ত। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : "পরহেযগার ব্যক্তির খাদ্য ছাড়া খেয়ো না এবং তোমার খাদ্য যেন পরহেযগার ছাড়া কেউ না খায়"৷
এর কারণ, পরহেযগার ব্যক্তি খেয়ে তার পরহেযগারীকে শক্তি যোগাবে। ফলে যে খাওয়াবে সে তার এবাদতে শরীক হয়ে যাবে। হাদীসে আরও আছে- "তোমরা তোমাদের খাদ্য পরহেযগারদেরকে খাওয়াও আর অনুগ্রহ যা কর, ঈমানদারদের প্রতি কর"। জনৈক আলেম তার দানের মাল সুফী ফকীরগণ ছাড়া অন্য কাউকে দিতেন না। তাকে কেউ বলল : এ মাল বিশেষ এক সম্প্রদায়কে না দিয়ে সকল ফকীরকে দিলেই তো ভাল হত। তিনি বললেন : না, এই বিশেষ সম্প্রদায়ের সাহসিকতা আল্লাহর জন্যে ব্যয়িত হয়ে যায়। তারা উপবিষ্ট হলে তাদের সাহসিকতা বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়। সুতরাং এক ব্যক্তিকে দান করে যদি আমি তার সাহসিকতা আল্লাহর দিকে আকৃষ্ট করতে পারি, তবে এটা আমার মতে হাজার ব্যক্তিকে দান করা অপেক্ষা উত্তম, যাদের সাহসিকতা কেবল সংসারের দিকেই নিবিষ্ট। এ উক্তিটি হযরত জুনায়দ বাগদাদী (রহঃ)-এর কাছে কেউ উত্থাপন করলে তিনি একে চমৎকার উক্তি বলে অভিহিত করলেন এবং বললেন : এ লোকটি একজন ওলী আল্লাহ। বহু দিন যাবত আমি এর চেয়ে উত্তম উক্তি শ্রবণ করিনি। কথিত আছে, এক সময় এই বুযুর্গ ব্যক্তি আর্থিক সংকটে পড়ে দোকান বন্ধ করে দিতে মনস্থ করেন। হযরত জুনায়দ (রহঃ) তাঁর কাছে কিছু পুঁজি প্রেরণ করে বললেন : এই অর্থ দ্বারা দোকানের মাল কিনে নাও, দোকান বন্ধ করো না। তোমার মত ব্যক্তির জন্যে ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিকর নয়। লোকটি ছিলেন সবজি বিক্রেতা। কোন দরিদ্র লোক তাঁর কাছ থেকে সবজি ক্রয় করলে তিনি দাম নিতেন না।

(২) দ্বিতীয়তঃ বিশেষভাবে এলেমধারী ব্যক্তিকে খয়রাত দেবে। তাকে দিলে তার এলেমকে সাহায্য যোগানো হবে। এলেম এবাদতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ যদি তাতে নিয়ত ঠিক থাকে। হযরত ইবনে মোবারক (রহঃ) দান-খয়রাত বিশেষভাবে এলেমধারীদেরকে দিতেন। কেউ তাঁকে বলল : আপনার খয়রাত ব্যাপকভাবে দিলেই তো ভাল হত। তিনি বললেন : আমি নবুওয়তের মর্তবার পর আলেমদের মর্তবা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ কোন মর্তবা আছে বলে জানি না। আলেমের মন যদি অভাব অনটনে ব্যাপৃত থাকে, তবে সে এলেমের জন্যে সময় সুযোগ পাবে না। কাজেই তাঁকে দেয়ার অর্থ এলেমের জন্যে তাঁকে সুযোগ করে দেয়া।

(৩) তৃতীয়- তাকওয়ায় সাচ্চা ও তওহীদে পাকা ব্যক্তিকে খয়রাত দেবে। তওহীদে সাচ্চা হওয়ার অর্থ, যখন কারও কাছ থেকে খয়রাত গ্রহণ করবে, তখন আল্লাহ তাআলার হামদ ও শোকর করবে এবং মনে করবে, এ নেয়ামত তাঁরই পক্ষ থেকে। মধ্যবর্তী ব্যক্তির প্রতি লক্ষ্য করবে না। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর দরবারে বান্দার শোকর এটাই যে, সে সকল নেয়ামত আল্লাহর পক্ষ থেকে মনে করবে। লোকমান (আঃ) তাঁর পুত্রকে উপদেশ দেন, নিজের ও আল্লাহ তাআলার মাঝখানে অপরকে নেয়ামতদাতা সাব্যস্ত করবে না। যেব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অপরের শোকর করে, সে যেন নেয়ামতদাতাকে চেনেই না এবং বিশ্বাস করে না যে, মধ্যবর্তী ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার নিয়ন্ত্রণাধীন। কেননা, আল্লাহ তাআলাই তাকে দানে বাধ্য করেছেন এবং দানের আসবাবপত্র সরবরাহ করেছেন। সে যদি দান না করতে চাইত, তবে তা পারত না। কেননা, পূর্বাহে আল্লাহ মনে জাগরূক করেছেন যে, দান করার মধ্যেই তার ইহলৌকিক কল্যাণ নিহিত। যেব্যক্তি এটা বিশ্বাস করে, তার দৃষ্টি আল্লাহ ব্যতীত অপরের দিকে যাবে না। দাতার জন্য এরূপ ব্যক্তির বিশ্বাস প্রশংসা ও শোকরের চেয়ে বেশী উপকারী। যেব্যক্তি দান করার কারণে প্রশংসা ও দোয়া করে, সে দান না করার কারণে নিন্দা এবং বদ দোয়াও করতে পারবে। বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) কোন এক ফকীরের কাছে কিছু খয়রাত প্রেরণ করে দূতকে বলে দিলেন : ফকীর যা বলে মনে রাখবে। ফকীর খয়রাত গ্রহণ করে বলল : আল্লাহর শোকর, যিনি রিযিকদানকারীকে ভুলেন না এবং শোকরকারীকে বরবাদ করেন না। ইলাহী! আপনি আমাকে বিস্তৃত না হলে আপনার রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে এমন করুন যে, তিনি আপনাকে না ভুলে যান। দূত এসে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে জানালে তিনি ফকীরের উক্তিতে সন্তোষ প্রকাশ করেন। দেখ, এই ফকীর তার দৃষ্টি কিভাবে আল্লাহ তাআলাতে নিবদ্ধ করেছে! 
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এক ব্যক্তিকে তওবা করতে বললে সে বলল : আমি কেবল আল্লাহ' তা'আলার দিকে তওবা করি- মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর দিকে নয়। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন : তুমি হকদারের হক চিনতে পেরেছ। হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর অপবাদ মোচনের আয়াত অবতীর্ণ হলে হযরত আবু বকর (রাঃ) তাঁকে বললেন : আয়েশা! দাঁড়াও, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর মস্তক চুম্বন কর। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন : আল্লাহর কসম, আমি এরূপ করবো না। আমি আল্লাহ ব্যতীত কারও কাছে কৃতজ্ঞ নই। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন : আবু বকর! তাকে ছাড়, কিছু বলো না। এক রেওয়ায়েতে আছে, হযরত আয়েশা (রাঃ) পিতা আবু বকরকে এই জওয়াব দেন -
"আল্লাহ তাআলার শোকর। এতে আপনার ও আপনার সঙ্গীর অর্থাৎ রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর কোন অনুগ্রহ নেই। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) অস্বীকৃতি জানাননি, অথচ অপবাদ মোচনের তাঁর মাধ্যমেই হযরত আয়েশার কাছে পৌঁছেছিল। নেয়ামত আল্লাহ তাআলা ছাড়া অপরের পক্ষ থেকে মনে করা কাফেরদের বৈশিষ্ট্য। সেমতে আল্লাহ বলেন-
"যখন এককভাবে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়, তখন যারা পরকালে বিশ্বাস করে না, তাদের অন্তর স্তব্ধ হয়ে যায়। আর যখন আল্লাহ ব্যতীত অন্য দেবদেবীদের নাম উচ্চারণ করা হয়, তখন তারা হর্ষোৎফুল্ল হয়ে যায়।"

যেব্যক্তির অন্তর মাধ্যমের প্রতি তাকানো থেকে মুক্ত নয় এবং একে নিছক মাধ্যম মনে করে না, তার মন যেন শেরকে খফী তথা গোপন শেরক থেকে আলাদা হয়নি। তার উচিত আল্লাহকে ভয় করা এবং স্বীয় তওহীদকে শেরকের ময়লা ও সন্দেহ থেকে পরিষ্কার করা।

(৪) চতুর্থ- যারা আপন অবস্থা গোপন রাখে, অভাব-অভিযোগ ও কষ্টের কথা খুব একটা বর্ণনা করে না, অথবা যেব্যক্তি পূর্বে ধনী ছিল, এখন সর্বস্বহারা, কিন্তু পূর্বের অভ্যাস পরিত্যাগ করে না এবং পুরোপুরি ভদ্রতা বজায় রেখে জীবন যাপন করে- এরূপ লোককে খয়রাত দেবে। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন- "সওয়াল থেকে বেঁচে থাকার কারণে মূর্খরা তাদেরকে ধনী মনে করে। তুমি তাদেরকে চেহারা দেখে চিনতে পারবে। তারা মানুষের গায়ে পড়ে সওয়াল করে না"। অর্থাৎ, সওয়াল করার মধ্যে আতিশয্য করে না। কারণ, তারা আপন বিশ্বাসে ধনী এবং সবর দ্বারা সম্মানী। প্রত্যেক মহল্লায় ধার্মিক লোকদের মাধ্যমে এরূপ ব্যক্তিদের তালাশ করা উচিত। এরূপ সম্ভ্রমী লোকদের মনের অবস্থা খয়রাতকারীদের জানা উচিত। কেননা, তাদেরকে খয়রাত দেয়া প্রকাশ্য সওয়ালকারীদেরকে খয়রাত দেয়ার তুলনায় কয়েক গুণ বেশী সওয়াব রাখে।

(৫) পঞ্চম- যারা অধিক সন্তান-সন্ততিসম্পন্ন অথবা রোগাক্রান্ত অথবা কোন কারণে দুর্দশাগ্রস্ত, তাদেরকে খয়রাত দেবে। আয়াতে বলা হয়েছে : সেসব ফকীরের জন্যে, যারা আল্লাহর পথে আটকা পড়েছে, তারা স্বদেশে চলাফেরা করতে পারে না। অর্থাৎ, যারা আখেরাতের পথে পরিবার-পরিজনের কারণে অথবা রুজি-রোজগারের স্বল্পতার কারণে অথাব আত্মসংশোধনের কারণে আটকা পড়েছে। ফলে দেশে সফর করার শক্তি রাখে না। কেননা, এসব কারণে তাদের হাতে পায়ে জিঞ্জির পড়েছে। হযরত ওমর (রাঃ) এক গৃহের লোকদেরকে এক পাল ছাগল অথবা দশটি ছাগল অথবা আরও বেশী দান করতেন। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সন্তান-সন্ততির সংখ্যা অনুযায়ী দান করতেন। হযরত ওমর (রাঃ)-কে কেউ জাহ্দুল বালা'র উদ্দিষ্ট অর্থ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন : সন্তান সন্ততির আধিক্য এবং অর্থ সম্পদের স্বল্পতা।

(৬) ষষ্ঠ- যে ফকীর আত্মীয় এবং রক্তের সাথে সম্পর্কশীল, তাকে খয়রাত দেবে। এতে খয়রাতও হবে এবং আত্মীয়তার সম্পর্কও বজায় থাকবে। আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার মধ্যে অনেক সওয়াব। হযরত আলী (রাঃ) বলেন : যদি আমি এক দেরহাম দিয়ে আমার কোন ভাইয়ের আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখি, তবে তা আমার মতে বিশ দেরহাম খয়রাত করা অপেক্ষা উত্তম। যদি বিশ দেরহাম দিয়ে সম্পর্ক বজায় রাখি, তবে এটা একশ' দেরহাম খয়রাত করার চেয়ে ভাল। পরিচিতদের মধ্যে বন্ধুদেরকে আগে দান করা উচিত; যেমন অপরিচিতদের তুলনায় আত্মীয়কে আগে দেয়া উত্তম।
মোট কথা, এসব প্রার্থিত গুণের প্রতি লক্ষ্য রেখে খয়রাত দেয়া উচিত। এগুলোর প্রত্যেকটিতে অনেক স্তর রয়েছে। সর্বোচ্চ স্তর অন্বেষণ করা উচিত। কোন ব্যক্তির মধ্যে এসব গুণের মধ্য থেকে কয়েকটি পাওয়া গেলে তাকে নেয়ামত মনে করতে হবে। যে উপযুক্ত লোক খোঁজাখুঁজি করবে, সে দ্বিগুণ সওয়াব পাবে। ভুল হয়ে গেলেও এক সওয়াব নষ্ট হবে না।

পরবর্তী পর্ব

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...