একদল বিত্তশালী লোক মসজিদ, মাদ্রাসা, সরাইখানা, পুল ইত্যাদি দর্শনীয় কীর্তি নির্মাণে তৎপর থাকে। তারা এগুলোর মধ্যে নিজেদের নাম খোদাই করে লিখে দেয়, যাতে মৃত্যুর পরও তাদের স্মৃতি অম্লান থাকে। এ কাজ করার পর তারা মনে করে এর মাধ্যমে তারা মাগফেরাতের উপযুক্ত হয়ে গেছে। অথচ দু’কারণে তারা বিভ্রান্ত।
এক, তারা যুলুম, ঘুষ, সূদ ইত্যাদি অবৈধ উপায়ে অর্জিত টাকা-পয়সা দ্বারা এসব তৈরি করে। সুতরাং হারাম ভক্ষণের কারণে তারা শাস্তির যোগ্য।
দুই, তারা রিয়া ও সুখ্যাতির জন্যে অর্থ ব্যয় করে। তাদের উচিত ছিল এই অর্থ উপার্জন না করা। উপার্জন করে যখন তারা গোনাহগার হল, তখন তওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া এবং যে অর্থ প্রকৃত মালিককে ফিরিয়ে দেয়া দরকার ছিল, মালিক পাওয়া না গেলে তার ওয়ারিসকে, ওয়ারিস না থাকলে মুসলমানদের জরুরী প্রয়োজনে ব্যয় করা দরকার ছিল। এ ব্যাপারে মিসকীনদের মধ্যে বন্টন করাই অধিক জরুরী মনে হয়। কিন্তু তারা মিসকীনদের মধ্যে বণ্টন করে না; বরং সুখ্যাতি কুড়ানোর জন্যে দালান-কোঠা নির্মাণে তৎপর হয়ে যায়। সুতরাং জনকল্যাণ তাদের উদ্দেশ্য নয়; বরং রিয়া, সুখ্যাতি এবং প্রশংসা কুড়ানোই তাদের লক্ষ্য হয়ে থাকে। তাদেরকে যদি বলা হয় যে, দালান-কোঠা তৈরি কর, কিন্তু তাতে নিজের নাম খোদাই করো না, তবে কখনও তা মেনে নেবে না এবং দালান-কোঠা নির্মাণে সম্মত হবে না। যদি মানুষকে দেখানো উদ্দেশ্য না হত এবং আল্লাহর ওয়াস্তেই হত, তবে নাম খোদাই করার কি প্রয়োজন ছিল?
আরেক দল ধনী লোক হালাল উপায়ে অর্থ উপার্জন করে মসজিদে ব্যয় করে দেয়। অথচ তার আশেপাশে কিংবা শহরে এমন দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত লোক বাস করে, যাদেরকে দেয়া মসজিদে দেয়ার চেয়ে শরীয়তের দৃষ্টিতে অনেক ভাল। কিন্তু তারা মসজিদেই দেয়। কারণ, এতে মানুষের মধ্যে সুখ্যাতি হয়। এধরনের বিত্তশালী দাতা নিঃসন্দেহে বিভ্রান্ত। এছাড়া মসজিদে চিত্রাংকন ও কারুকার্য করা নিষিদ্ধ। নামাযীদের ধ্যান সেদিকে বিভক্ত হয়। দৃষ্টি সেদিকেই পড়ে। অথচ নামাযের উদ্দেশ্য অনুনয়-বিনয় ও অন্তরের উপস্থিতি। অন্তর কারুকার্যে মশগুল থাকলে সওয়াব বাতিল হয়ে যাবে এবং এর শাস্তি যে কারুকার্য করে, তার উপর বর্তাবে। অথচ সে ধারণা করে থাকে যে, সৎকাজ করেছে, যা ওসীলা হবে আল্লাহর সন্তুষ্টির। কিন্তু বাস্তবে সে আল্লাহর ক্রোধের যোগ্য হবে।
একবার হযরত ঈসা (আঃ)-এর শিষ্যগণ তাঁর খেদমতে আরয করল : দেখুন, এই মসজিদটি কি চমৎকার ! তিনি বললেন : হে আমার উম্মত, আমি সত্য বলছি, আল্লাহ তা'আলা এই মসজিদের ইটের উপর ইট কায়েম রাখবেন না। এই মসজিদ নির্মাণকারীদের গোনাহের কারণে সকলকে বরবাদ করে দেবেন। আল্লাহর কাছে না সোনা-রূপার মূল্য আছে, না এসব ইটের, যেগুলোকে তোমরা চমৎকার বলছ। বরং তার কাছে সর্বাধিক প্রিয় হচ্ছে সৎ অন্তর, যা দিয়ে তিনি পৃথিবীকে আবাদ রাখেন। যখন সৎ অন্তর থাকবে না, তখন পৃথিবীকে শ্মশানে পরিণত করে দেবেন।
হযরত আবু দারদার (রাঃ) রেওয়ায়েতে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ যখন তোমরা মসজিদকে চাকচিক্যময় করবে এবং কোরআনকে সোনা-রূপা পরিধান করাবে, তখন তোমাদের উপর বিপর্যয় নেমে আসবে। হযরত হাসান (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) যখন মদীনায় মসজিদে নববী নির্মাণ করার ইচ্ছা করেন, তখন হযরত জিবরাঈল (আ্ঃ) এসে বললেন : সাত হাত উঁচু করবেন এবং কারুকার্য ও চিত্রাংকন করবেন না। মোটকথা , এই ধনীরা একটি মন্দ কাজকে ভাল মনে করে এবং তারই উপর ভরসা করে। এটা তাদের বিভ্রান্তি।
আরেক দল ধনী টাকা-পয়সা ব্যয় করে এবং ফকীর-মিসকীনকে দান করে। কিন্তু এই দানের জন্যে এমন জায়গা তালাশ করে, যেখানে অধিক পরিমাণে লোক উপস্থিত থাকে। এছাড়া এমন ফকীর খোজে, যে কৃতজ্ঞ হয় এবং জনসমক্ষে দাতার স্তুতি কীর্তন করে। তারা গোপনে দান করাকে ভাল মনে করে না। কোন ফকীর তাদের কাছ থেকে কিছু নিয়ে গোপন করলে তাকে তারা অপরাধী ও অকৃতজ্ঞ মনে করে। তারা কখনও হজ্জের পর হজ্জ করে; কিন্তু দরিদ্র প্রতিবেশীকে ক্ষুধার্ত রাখে। একারণেই হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন : শেষ যুগে এমন লোক হবে, যারা বিনা কারণেও হজ্জ করবে। ধনী হওয়ার কারণে তারা সফরকে কষ্টকর মনে করবে না। তারা বঞ্চিত অবস্থায় গৃহে ফিরবে। অর্থাৎ, সওয়াব কিছুই পাবে না। নিজেরা তো আরামদায়ক যানবাহনে বসে সফর করবে, প্রতিবেশীর খবরও নেবে না।
আবূ নছর (রহঃ) বলেন : জনৈক ব্যক্তি হযরত বিশর ইবনে হারেছের কাছে বসে বললঃ আমি হজ্জ করার ইচ্ছা করে আপনার কাছ থেকে বিদায় নিতে এসেছি। তিনি জিজ্ঞেস করলেন : হজ্জের জন্যে তোমার কাছে কি পরিমাণ অর্থ আছে? সে জওয়াব দিল : দু'হাজার দেরহাম। বিশর জিজ্ঞেস করলেন। হজ্জের দ্বারা তোমার উদ্দেশ্য কি দেশভ্রমণ, কাবাগৃহের আগ্রহ, না আল্লাহর সন্তুষ্টি? লোকটি আরয করল ; আল্লাহর সন্তুষ্টি। তিনি বললেন : যদি গৃহে বসে এ দু’হাজার দেরহাম ব্যয় করে তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেয়ে যাও এবং সন্তুষ্টিপ্রাপ্তির ব্যাপারে তোমার দৃঢ় বিশ্বাসও অর্জিত হয়ে যায়, তবে তুমি কি করবে? লোকটি বলল : তবে এভাবেই সন্তুষ্টি অর্জন করব। তিনি বললেন ; তাহলে যাও, এই দেরহামগুলো দশ প্রকার ব্যক্তিকে দিয়ে দাও- ঋণগ্রস্তকে দাও, যে তার ঋণ পরিশোধ করবে, অভাবগ্রস্তকে দাও, যে তার অভাব মোচন করবে, বাল-বাচ্চাদারকে দাও, তার বাল-বাচ্চাদেরকে পালন করবে, অনাথ শিশুদের দেখাশোনাকারীকে দাও, যে তাদেরকে খুশী করবে। যদি মনে চায়, তবে এসব প্রকারের এক এক ব্যক্তিকে দাও। আমার এরূপ বলার কারণ এই যে, কোন মুসলমানের মন খুশী করা, মযলুমের ডাকে সাড়া দেয়া এবং দুর্বলের সাহায্য করা ফরয হজ্জের পর এক'শ হজ্জের চেয়েও উত্তম। কাজেই এখন যাও এবং আমি যা বললাম- তাই কর। নতুবা মনের কথা বলে দাও। লোকটি বলল : আমার মন তো ভ্রমণ করতেই ইচ্ছুক। অগত্যা হযরত বিশর মুচকি হেসে বললেনঃ যখন টাকা-পয়সা ব্যবসা-বাণিজ্য ও সন্দেহযুক্ত পথে সঞ্চিত হয়ে যায়, তখন মন চায় কোন সৎকর্ম সম্পাদন করতে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা কসম করেছেন যে, তিনি মুত্তাকীদের আমল ছাড়া কারও আমল কবুল করবেন না।
আরেক দল লোক কৃপণতাবশত অর্থকড়ি সঞ্চয় করে এবং সৎকর্ম ও এবাদত এমন করে, যাতে মোটেই অর্থ ব্যয় করতে হয় না। যেমন দিনের বেলায় রোযা রাখে এবং রাত্রিতে জাগরণ করে কিংবা কোরআন খতম করে, এরাও বিভ্রান্ত। কেননা, মারাত্মক কৃপণতা তাদের অন্তরকে ঘিরে রেখেছে। অর্থ ব্যয় করে প্রথমে এরই মূলোৎপাটন করা উচিত ছিল। এর পরিবর্তে যা তারা করে, তার কোন প্রয়োজন ছিল না। তাদের দৃষ্টান্ত এমন, যেমন কারও পরনের কাপড়ে সাপ ঢুকে গেছে। ফলে, সে মুত্যুর মুখোমুখি হয়ে পড়েছে। কিন্তু এ দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে সে সর্দির ঔষধ। প্রস্তুত করার কাজে ব্যস্ত। বল, যাকে সাপে দংশন করবে, সর্দির ঔষধ দ্বারা তার কি উপকার হবে? এ কারণেই হযরত বিশরের কাছে কেউ বলেন : অমুক ধনী ব্যক্তি নামায, রোযা খুব করে। তিনি বললেন : তার অবস্থার সাথে যে কাজের মিল ছিল, তা তো সে ছেড়ে দিয়েছে এবং যে কাজ অন্যের জন্যে উপযুক্ত ছিল, তা অবলম্বন করেছে। তার কর্তব্য ছিল নিরন্নকে অন্ন দেয়া এবং ফকীর-মিসকীনকে খয়রাত দেয়া । নিজে ক্ষুধার্ত থাকার চেয়ে দান-খয়রাত তার জন্যে উত্তম ছিল।
আরেক দল ধনী এত বেশী কৃপণ যে, ধন-সম্পদের মধ্য থেকে যাকাত ছাড়া অন্য কিছু দান করে না। যাকাতেও এমন নিকৃষ্ট মাল দেয়, যা নিজের কাছে রাখতে ঘৃণা করে। তারা যাকাত দিতে গিয়ে এমন ফকীর বেছে নেয়, যে তাদের খেদমত করে অথবা ভবিষ্যতে যার কাছ থেকে খেদমত আশা করে কিংবা যে কোন বড় লোকের সুপারিশ নিয়ে আসে। তাকে দান করার উদ্দেশ্য থাকে সেই বড় লোকের প্রিয়ভাজন হওয়া। এসব বিষয় নিঃসন্দেহে খারাপ নিয়তের পরিচায়ক। যারা এরূপ করে, তারা বিভ্রান্ত। কারণ, এরূপ করেও তারা নিজেদেরকে আল্লাহর ফরমাবরদার বলে ধারণা করে; অথচ তারা বদকার, গোনাহগার। আল্লাহর এবাদত করে অপরের কাছে বিনিময় চায়।
এগুলো ছাড়া বিত্তশালীদের মধ্যে আরও অসংখ্য বিভ্রান্তি দেখা যায়। নমুনা স্বরূপ এখানে মাত্র কয়েকটি উল্লেখ করা হল।
আরও একদল লোক আছে, যারা কেবল বিত্তশালীদের মধ্যেই নয়; বরং জনসাধারণের এমনকি ফকীরদের মধ্যেও বিস্তৃত । তারা ওয়াযের মজলিসে উপস্থিত থাকাকেই মুক্তির জন্যে যথেষ্ট মনে করে। ওয়াযের মজলিসে যাওয়াকে তারা একটি প্রথা ও অভ্যাসে পরিণত করে নিয়েছে। তাদের বিশ্বাস, ওয়ায শুনলেই সওয়াব পাওয়া যাবে এবং তদনুযায়ী আমল করা জরুরী নয়। এটা তাদের খামখেয়ালী। কেননা, ওয়ায মাহফিলের মাহাত্ম এ কারণেই যে, এর মাধ্যমে সৎকর্মের আগ্রহ সৃষ্টি হয়। এই আগ্রহ এ কারণেই ভাল যে, এতে মানুষ আমল করতে উদ্বুদ্ধ হয়। যদি ওয়ায দ্বারা দুর্বল আগ্রহ সৃষ্টি হয়, যা আমলে উদ্বুদ্ধ করে না, তবে এরূপ ওয়াযের কোন উপকারিতা নেই। এ ধরনের শ্রোতা যখন ওয়ায়েযের মুখে ওয়ায মাহফিলের ফযীলত এবং কান্নাকাটি করার সওয়াব শুনে, তখন নারীদের ন্যায় কান্না শুরু করে দেয়। আবার কোন সময় কোন ভয়ংকর কথা শুনে হাতের উপর হাত মেরে হায় আল্লাহ ! মায়াযাল্লাহ ! সোবহানাল্লাহ ! ইত্যাদি বলা ছাড়া আর কিছুই করে না। তাদের ধারণা, তারা যা কিছু করে সবই ভাল। অথচ এটা প্রকাশ্য বিভ্রান্তি। তাদের দৃষ্টান্ত এমন, যেমন কোন রোগী ব্যক্তি ঔষধালয়ে যাতায়াত করে এবং সেখানে ঔষধের গুণাগুণ সম্পর্কে আলোচনা শোনে অথবা কোন ক্ষুধাতুর ব্যক্তি এমন মজলিসে যায় যেখানে সুস্বাদু খাদ্যের আলোচনা হয়। বলা বাহুল্য, এতে না রোগীর রোগ দূর হবে, না ক্ষুধাতুরের ক্ষুধা নিবৃত্ত হবে। এমনিভাবে ওয়ায মাহফিলে এবাদত ও সঙ্কর্মের বর্ণনা শুনলে এবং আমল না করলে আল্লাহর কাছে কোন উপকার পাওয়া যাবে না।
পরবর্তী পর্ব
বিভ্রান্তি থেকে কেউ মুক্ত নয়