রবিবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৪

সিদক (পর্ব- ১) সিদকের ফযীলত



সিদক (পর্ব- ১)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

সিদকের ফযীলত: 
আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেন :
>“তারা এমন মানুষ, যারা আল্লাহর সাথে কৃত চুক্তিকে সত্যে পরিণত করেছে”।
সিদকের শ্রেষ্ঠত্বের জন্যে এতটুকুই যথেষ্ট যে, ‘সিদ্দীক’ শব্দটি এ থেকেই উদগত ! আল্লাহ তা'আলা পয়গম্বরগণের প্রশংসায় তাদেরকে সিদ্দীক বলেছেন। বলা হয়েছে-
> “কিতাবে ইবরাহীমের আলোচনা করুন। সে ছিল সিদ্দীক তথা সাচ্চা নবী। 
> “কিতাবে ইদ্রীসের আলোচনা করুন। সে ছিল সিদ্দীক ও নবী”।
রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন,- 
>“সত্যবাদিতা পূণ্যের পথ দেখায় আর পুণ্য জান্নাতে নিয়ে যায়। মানুষ সত্য বলতে থাকে। অবশেষে সে আল্লাহর কাছে সিদ্দীক হিসাবে লিখিত হয় মিথ্যা পাপাচারের পথ দেখায়। পাপাচার জাহান্নামে নিয়ে যায়। মানুষ মিথ্যা বলতে থাকে। অবশেষে সে আল্লাহর কাছে মিথ্যাবাদী হিসাবে লিখিত হয়”।

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন : চারটি বিষয় এমন রয়েছে, যেগুলোর উপকার সে-ই পায়, যার মাঝে এগুলো থাকে- সত্যবাদিতা, লজ্জা, সচ্চরিত্রতা ও শোকর। 
বিশর ইবনে হারেছ (রহঃ) বলেন : “যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে নিষ্ঠা সহকারে আচরণ করে, সে মানুষকে ঘৃণা করে”। 
এক ব্যক্তি জনৈক দার্শনিককে বলল : আমি কোন সাচ্চা মানুষ দেখিনি। দার্শনিক বলল : যদি তুমি সাচ্চা হতে, তবে সাচ্চাদেরকে চিনতে। 
জনৈক ব্যক্তি হযরত শিবলী (রঃ)-এর মজলিসে চিৎকার দিয়ে উঠল। অতঃপর সে দজলা নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। হযরত শিবলী (রঃ) বললেন : যদি সে সাচ্চা হয়, তবে আল্লাহ তা'আলা তাকে বাঁচিয়ে দেবেন, যেমন হযরত মূসা (আঃ)-কে বাঁচিয়েছিলেন। আর যদি সে মিথ্যুক হয়, তবে তাকে নিমজ্জিত করে দেবেন, যেমন ফেরাউনকে নিমজ্জিত করেছিলেন।
আলেম ও ফেকাহবিদগণ এ বিষয়ে একমত যে, তিনটি বিষয় সঠিক হয়ে গেলে মানুষ মুক্তি পেয়ে যাবে- 
(১) বেদআত ও খেয়ালখুশীমুক্ত ইসলাম, 
(২) আমলসমূহে আল্লাহ তা'আলার নিষ্ঠা এবং 
(৩) হালাল খাদ্য । 
ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বেহ (রহঃ) বলেন : আমি তাওরাতের প্রান্তটীকায় বাইশটি বাক্য দেখেছি যা বনী ইসরাঈলের সাধু বক্তিরা সমবেত হয়ে পাঠ করত। বাক্যগুলো এই : 
(১) কোন ভাণ্ডার জ্ঞানের চেয়ে অধিক উপকারী নয়। 
(২) কোন ধন সহনশীলতা অপেক্ষা অধিক ফলদায়ক নয়। 
(৩) কোন স্বভাব ক্রোধের চেয়ে অধিক নীচ নয়। 
(৪) কোন সঙ্গী আমলের চেয়ে বেশী শোভাদায়ক নয়। 
(৫) কোন সহচর মূর্খতার চেয়ে অধিক দোষী নয়। 
(৬) কোন গৌরব খোদাভীতি অপেক্ষা অধিক প্রিয় নয়। 
(৭) কোন বীরত্ব বাসনা বর্জনের চেয়ে বেশী পূর্ণাঙ্গ নয়। 
(৮) কোন আমল চিন্তা-ভাবনা অপেক্ষা অধিক শ্রেষ্ঠ নয়। 
(৯) কোন পুণ্য কাজ সবর অপেক্ষা উচ্চ নয়। 
(১০) কোন দোষ অহংকার অপেক্ষা অধিক অপমানকর নয়। 
(১১) কোন ঔষধ নম্রতার চেয়ে অধিক নরম নয়। 
(১২) কোন ব্যাধি বোকামি অপেক্ষা অধিক কষ্টদায়ক নয়। 
(১৩) কোন রসূল সত্য বিমুখ নয়। 
(১৪) সত্যবাদিতার চেয়ে অধিক কোন হিতাকাংখী নেই। 
(১৫) কোন ফকীর-লোভের চেয়ে অধিক লাঞ্ছিত নয়। 
(১৬) কোন প্রাচুর্য সম্পদ আগলে রাখার চেয়ে অধিক হতভাগা নয়। 
(১৭) কোন জীবন সুস্থতার চেয়ে উৎকৃষ্টতর নয়। 
(১৮) সাধুতার চেয়ে অধিক সহনীয় কোন পাপ নেই। 
(১৯) খুশুর চেয়ে উত্তম কোন এবাদত নেই। 
(২০) অল্পে তুষ্টির চেয়ে ভাল কোন বৈরাগ্য নেই। 
(২১) চুপ থাকার চেয়ে অধিক কোন হেফাযতকারী নেই। 
(২২) কোন অদৃশ্য বস্তু মৃত্যুর চেয়ে অধিক নিকটবর্তী নয়।
মুহাম্মাদ ইবনে সাঈদ মরুযী (রঃ) বলেন: যখন তুমি আল্লাহ তা'আলাকে নিষ্ঠার সাথে অন্বেষণ করবে, তখন তিনি তোমার হাতে একটি আয়না দিবেন, যার মধ্যে তুমি দুনিয়া ও আখেরাতের অত্যাশ্চর্য বিষয়সমূহ দেখতে পাবে।

পরবর্তী পর্ব-
সিদকের স্বরূপ 

শনিবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৪

বিভ্রান্তি (পর্ব- ১৩) বিভ্রান্তি থেকে আত্মরক্ষার উপায়



বিভ্রান্তি (পর্ব- ১৩)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

বিভ্রান্তি থেকে আত্মরক্ষার উপায়—

বিভ্রান্তি থেকে আত্মরক্ষার জন্যে তিনটি বিষয় মানুষের মধ্যে থাকা বাঞ্ছনীয়– বুদ্ধি, শিক্ষা ও মারেফত। 


বিভ্রান্তি থেকে আত্মরক্ষার প্রথম উপায়– 

বুদ্ধি এমন একটি জন্মগতভাবে প্রাপ্ত মৌলিক নূর বা আলো। যা দ্বারা মানুষ বস্তুনিচয়ের স্বরূপ উদঘাটন করতে সক্ষম। মানুষের মূল সৃষ্টিতে বুদ্ধিমত্তাও থাকে এবং নির্বুদ্ধিতাও থাকে। বুদ্ধিহীন ব্যক্তি বিভ্রান্তির মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না। তাই মূল সৃষ্টিতেই তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা থাকা জরুরী। জন্মগতভাবে এরূপ না হলে তা অর্জন করা সম্ভব নয়। তবে মূল বুদ্ধিমত্তা বিদ্যমান থাকলে অভিজ্ঞতা ইত্যাদি দ্বারা তাকে শানিত করা যায়। এ থেকে জানা গেল যে, বুদ্ধিমত্তা হচ্ছে সৌভাগ্যের চাবিকাঠি। তাই হাদীসে বলা হয়েছে,

"মহিমান্বিত সেই আল্লাহ, যিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্নরূপে বুদ্ধিমত্তা বণ্টন করেছেন। নিশ্চয় দু'ব্যক্তির আমল তথা নামায, রোযা ইত্যাদি সমান সমান হয়। কিন্তু তাদের বুদ্ধিমত্তার একটি কণাতেও উহুদ পাহাড়সম ব্যবধান থাকে। আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টিকে বুদ্ধিমত্তার চেয়ে উত্তম বস্তু দান করেননি।

হযরত আবু দারদা (র.) বর্ণনা করেন। এক ব্যক্তি রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করল- যদি কেউ দিনে রোযা রাখে, রাতে তাহাজ্জুদ পড়ে, হজ্জ ও উমরা পালন করে এবং দান-খয়রাত, জেহাদ ইত্যাদি পুণ্য কাজ যথারীতি সম্পাদন করে, তবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার কাছে তার কি মর্তবা হবে? তিনি জওয়াব দিলেন সে বুদ্ধিমত্তার মাপ অনুযায়ী সওয়াব পাবে।

হযরত আনাস (রা.) বলেনঃ রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর সামনে এক ব্যক্তির প্রশংসা করা হলে তিনি শুধালেন? তার বুদ্ধিমত্তা কেমন? লোকেরা বলল : আমরা এবাদত, চরিত্র ও গুণ-গরিমার কথা বলছি। তিনি বললেন : আগে বল তার বুদ্ধিমত্তা কেমন? কেননা, নির্বোধ ব্যক্তি নির্বুদ্ধিতার কারণে ব্যভিচারের চেয়েও জঘন্য ভুল করে বসে। কিয়ামতের দিন মানুষ বুদ্ধি পরিমাণেই আল্লাহর নৈকট্য লাভ করবে।

বিষয় মারেফতের অর্থ হচ্ছে চারটি বিষয়ে জ্ঞান লাভ করা।

প্রথমত, নিজের সম্পর্কে জানতে হবে যে, সে এই পৃথিবীতে একজন অচেনা মুসাফির এবং আল্লাহর মারেফত ও দীদারই তার জন্যে উপযুক্ত।

দ্বিতীয়ত, আল্লাহ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান অর্জন করতে হবে।

তৃতীয়ত, দুনিয়া সম্পর্কে জানতে হবে।

চতুর্থত, আখেরাত সম্পর্কে পুরোপুরি জ্ঞানলাভ করতে হবে।

আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞানলাভের কারণে বান্দার অন্তরে তাঁর প্রতি মহব্বত সৃষ্টি হবে। আখেরাতের জ্ঞান অর্জিত হলে তৎপ্রতি আগ্রহ ও ঔৎসুক্য বৃদ্ধি পাবে। দুনিয়া সম্পর্কে জ্ঞাত হলে দুনিয়ার প্রতি ঘৃণা ও বিমুখতা হাসিল হবে এবং তার কাছে সর্বাধিক জরুরী কাজ তাই হবে, যা আখেরাতে উপকারী। যখন আখেরাতের কাজ করার ইচ্ছা প্রবল হবে, তখন সকল বিষয়ে তার নিয়ত সঠিক হবে। ফলে, বিভ্রান্তি দূর হয়ে যাবে। আল্লাহর মারেফত ও নিজের সম্পর্কে জ্ঞান লাভের ফলস্বরূপ যখন খোদায়ী মহব্বত প্রবল হবে, তখন তৃতীয় বিষয়ের জ্ঞান লাভ করার প্রয়োজন হবে ; অর্থাৎ আল্লাহর পথ কিভাবে অতিক্রম করা উচিত, কোন্ কোন্ কাজ আল্লাহর নিকটবর্তী করে, কোন্ কোন্ কাজ আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এছাড়া পথের বিপদাপদ ও বিনাশকারী বাধাসমূহ জানা। আলোচ্য গ্রন্থে আমরা এসব বিষয় নিয়েই বিস্তারিত আলোচনা করছি। যেমন প্রথম খণ্ডে এবাদতের শর্ত ও বাধাবিপত্তি লিপিবদ্ধ করেছি। এসব শর্তের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে এবং বাধাবিপত্তিগুলো অতিক্রম করতে হবে। দ্বিতীয় খণ্ডে পারস্পরিক আদান-প্রদানের রহস্য এবং যেসব আদান-প্রদান অপরিহার্য, সেগুলো বর্ণিত হয়েছে। এক্ষেত্রে শরীয়তের নিয়ম-কানুন অনুযায়ী আমল করতে হবে। আলোচ্য খণ্ডে আল্লাহর পথের প্রতিবন্ধক বিষয়সমূহ বিধৃত হয়েছে অর্থাৎ, নিন্দনীয় স্বভাব-চরিত্র বর্ণনা করা হয়েছে। সুতরাং নিন্দনীয় স্বভাবগুলো জানতে হবে এবং প্রতিকারের পন্থাও আয়ত্ত করতে হবে। এসব বিষয় জেনে নিলে বর্ণিত সকল প্রকার বিভ্রান্তি থেকে আত্মরক্ষা করা সম্ভবপর হবে।


প্রথম পর্ব

বিভ্রান্তি সকল দুর্ভাগ্যের মূল

বিভ্রান্তি (পর্ব- ১২) বিভ্রান্তি থেকে কেউ মুক্ত নয়



বিভ্রান্তি (পর্ব- ১২)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

বিভ্রান্তি থেকে কেউ মুক্ত নয়

এখন প্রশ্ন হয় যে, উপরে যে সকল বিভ্রান্তি বর্ণিত হয়েছে, সেগুলো থেকে কেউই মুক্ত নয় এবং এ সকল বিভ্রান্তি থেকে আত্মরক্ষা করাও অসম্ভব। সুতরাং বিভ্রান্তির এ বর্ণনা থেকে মানুষের মধ্যে এক প্রকার নৈরাশ্য সৃষ্টি হয়, যার ফলস্বরূপ সে আমল করতে উৎসাহ পায় না এবং হাত গুটিয়ে বসে থাকে। এর জওয়াব এই যে, মানুষ যখন সাহস হারিয়ে ফেলে, তখন সে নিরাশও হয় এবং সম্ভবপর কাজকেও অসম্ভব মনে করতে থাকে। কিন্তু যখন সে সত্যিকার সাহস ও ঐকান্তিক ইচ্ছা নিয়ে কাজে অগ্রসর হয়, তখন অভীষ্ট পর্যন্ত পৌঁছার জন্য স্বীয় সূক্ষ্ম চিন্তার মাধ্যমে গোপন পথ আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়। উদাহরণতঃ উড়ন্ত পাখীকে ইচ্ছা করলে দূরত্ব সত্ত্বেও নিচে নামিয়ে আনা যায় অথবা সমুদ্রের অতল গভীরে অবস্থানকারী মৎস্যকে উপরে তুলে আনতে চাইলে আনা যায় অথবা পাহাড় ও পর্বতের ভিতর থেকে সোনা ও রূপা আহরণ করতে চাইলে খনন করে আহরণ করা যায় অথবা বনের স্বাধীন ও মুক্ত হাতীকে ধরে পোষ মানাতে চাইলে মানানো যায়, বিষধর সাপ ও অজগরকে ধরে খেলা দেখাতে চাইলে দেখানো যায়, যদি কেউ গ্রহ-উপগ্রহের সংখ্যা ও দৈর্ঘ্য-প্রস্থ জানতে চায়, তবে জ্যামিতি শাস্ত্রের মাধ্যমে পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে দাড়িয়ে তা জানতে পারে। মোটকথা, মানুষ দুঃসাধ্য কর্মসমূহের উপায় বের করার ব্যাপারে ওস্তাদ। সে প্রত্যেক কাজের পদ্ধতি ও তার সাজসরঞ্জাম সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে পারে। এসব উপায় ও পদ্ধতি মানুষ কেবল পার্থিব জীবনের উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্যে আবিষ্কার করে। সুতরাং সে যদি পারলৌকিক জীবনের উদ্দেশ্য সিদ্ধ করতে চায় এবং তার সামনে একটি মাত্র কাজ থাকে অর্থাৎ অন্তরকে সোজা করা, তবে এ কাজে সে অক্ষম হবে কেন এবং এটা অসম্ভব হবে কেন? না, মানুষের সাহস ও হিম্মতের সামনে কোন কিছুই অসম্ভব নয়। পূর্ববর্তী মনীষীগণ তো এ কাজে অক্ষম হননি। যারা তাদের উত্তমরূপে অনুসরণ করেছে, তারাও এ কাজে হার মানেনি। এখনও যে ব্যক্তি সত্যিকার ইচ্ছা ও অটল সাহসের অধিকারী হবে, সে কখনও অপারগ হবে না; বরং পার্থিব উপায়সমূহ আবিষ্কার করার কাজে যে পরিমাণ অধ্যবসায় ও শ্রম স্বীকার করতে হয়, তার এক-দশমাংশও এতে স্বীকার করার প্রয়োজন হয় না।


পরবর্তী পর্ব

বিভ্রান্তি থেকে আত্মরক্ষার উপায়

বিভ্রান্তি (পর্ব- ১১) বিত্তশালীদের বিভ্রান্তি



বিভ্রান্তি (পর্ব- ১১)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

বিত্তশালীদের বিভ্রান্তি-

একদল বিত্তশালী লোক মসজিদ, মাদ্রাসা, সরাইখানা, পুল ইত্যাদি দর্শনীয় কীর্তি নির্মাণে তৎপর থাকে। তারা এগুলোর মধ্যে নিজেদের নাম খোদাই করে লিখে দেয়, যাতে মৃত্যুর পরও তাদের স্মৃতি অম্লান থাকে। এ কাজ করার পর তারা মনে করে এর মাধ্যমে তারা মাগফেরাতের উপযুক্ত হয়ে গেছে। অথচ দু’কারণে তারা বিভ্রান্ত।

এক, তারা যুলুম, ঘুষ, সূদ ইত্যাদি অবৈধ উপায়ে অর্জিত টাকা-পয়সা দ্বারা এসব তৈরি করে। সুতরাং হারাম ভক্ষণের কারণে তারা শাস্তির যোগ্য।

দুই, তারা রিয়া ও সুখ্যাতির জন্যে অর্থ ব্যয় করে। তাদের উচিত ছিল এই অর্থ উপার্জন না করা। উপার্জন করে যখন তারা গোনাহগার হল, তখন তওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া এবং যে অর্থ প্রকৃত মালিককে ফিরিয়ে দেয়া দরকার ছিল, মালিক পাওয়া না গেলে তার ওয়ারিসকে, ওয়ারিস না থাকলে মুসলমানদের জরুরী প্রয়োজনে ব্যয় করা দরকার ছিল। এ ব্যাপারে মিসকীনদের মধ্যে বন্টন করাই অধিক জরুরী মনে হয়। কিন্তু তারা মিসকীনদের মধ্যে বণ্টন করে না; বরং সুখ্যাতি কুড়ানোর জন্যে দালান-কোঠা নির্মাণে তৎপর হয়ে যায়। সুতরাং জনকল্যাণ তাদের উদ্দেশ্য নয়; বরং রিয়া, সুখ্যাতি এবং প্রশংসা কুড়ানোই তাদের লক্ষ্য হয়ে থাকে। তাদেরকে যদি বলা হয় যে, দালান-কোঠা তৈরি কর, কিন্তু তাতে নিজের নাম খোদাই করো না, তবে কখনও তা মেনে নেবে না এবং দালান-কোঠা নির্মাণে সম্মত হবে না। যদি মানুষকে দেখানো উদ্দেশ্য না হত এবং আল্লাহর ওয়াস্তেই হত, তবে নাম খোদাই করার কি প্রয়োজন ছিল?


আরেক দল ধনী লোক হালাল উপায়ে অর্থ উপার্জন করে মসজিদে ব্যয় করে দেয়। অথচ তার আশেপাশে কিংবা শহরে এমন দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত লোক বাস করে, যাদেরকে দেয়া মসজিদে দেয়ার চেয়ে শরীয়তের দৃষ্টিতে অনেক ভাল। কিন্তু তারা মসজিদেই দেয়। কারণ, এতে মানুষের মধ্যে সুখ্যাতি হয়। এধরনের বিত্তশালী দাতা নিঃসন্দেহে বিভ্রান্ত। এছাড়া মসজিদে চিত্রাংকন ও কারুকার্য করা নিষিদ্ধ। নামাযীদের ধ্যান সেদিকে বিভক্ত হয়। দৃষ্টি সেদিকেই পড়ে। অথচ নামাযের উদ্দেশ্য অনুনয়-বিনয় ও অন্তরের উপস্থিতি। অন্তর কারুকার্যে মশগুল থাকলে সওয়াব বাতিল হয়ে যাবে এবং এর শাস্তি যে কারুকার্য করে, তার উপর বর্তাবে। অথচ সে ধারণা করে থাকে যে, সৎকাজ করেছে, যা ওসীলা হবে আল্লাহর সন্তুষ্টির। কিন্তু বাস্তবে সে আল্লাহর ক্রোধের যোগ্য হবে।

একবার হযরত ঈসা (আঃ)-এর শিষ্যগণ তাঁর খেদমতে আরয করল : দেখুন, এই মসজিদটি কি চমৎকার ! তিনি বললেন : হে আমার উম্মত, আমি সত্য বলছি, আল্লাহ তা'আলা এই মসজিদের ইটের উপর ইট কায়েম রাখবেন না। এই মসজিদ নির্মাণকারীদের গোনাহের কারণে সকলকে বরবাদ করে দেবেন। আল্লাহর কাছে না সোনা-রূপার মূল্য আছে, না এসব ইটের, যেগুলোকে তোমরা চমৎকার বলছ। বরং তার কাছে সর্বাধিক প্রিয় হচ্ছে সৎ অন্তর, যা দিয়ে তিনি পৃথিবীকে আবাদ রাখেন। যখন সৎ অন্তর থাকবে না, তখন পৃথিবীকে শ্মশানে পরিণত করে দেবেন।

হযরত আবু দারদার (রাঃ) রেওয়ায়েতে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ যখন তোমরা মসজিদকে চাকচিক্যময় করবে এবং কোরআনকে সোনা-রূপা পরিধান করাবে, তখন তোমাদের উপর বিপর্যয় নেমে আসবে। হযরত হাসান (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) যখন মদীনায় মসজিদে নববী নির্মাণ করার ইচ্ছা করেন, তখন হযরত জিবরাঈল (আ্ঃ) এসে বললেন : সাত হাত উঁচু করবেন এবং কারুকার্য ও চিত্রাংকন করবেন না। মোটকথা , এই ধনীরা একটি মন্দ কাজকে ভাল মনে করে এবং তারই উপর ভরসা করে। এটা তাদের বিভ্রান্তি।


আরেক দল ধনী টাকা-পয়সা ব্যয় করে এবং ফকীর-মিসকীনকে দান করে। কিন্তু এই দানের জন্যে এমন জায়গা তালাশ করে, যেখানে অধিক পরিমাণে লোক উপস্থিত থাকে। এছাড়া এমন ফকীর খোজে, যে কৃতজ্ঞ হয় এবং জনসমক্ষে দাতার স্তুতি কীর্তন করে। তারা গোপনে দান করাকে ভাল মনে করে না। কোন ফকীর তাদের কাছ থেকে কিছু নিয়ে গোপন করলে তাকে তারা অপরাধী ও অকৃতজ্ঞ মনে করে। তারা কখনও হজ্জের পর হজ্জ করে; কিন্তু দরিদ্র প্রতিবেশীকে ক্ষুধার্ত রাখে। একারণেই হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন : শেষ যুগে এমন লোক হবে, যারা বিনা কারণেও হজ্জ করবে। ধনী হওয়ার কারণে তারা সফরকে কষ্টকর মনে করবে না। তারা বঞ্চিত অবস্থায় গৃহে ফিরবে। অর্থাৎ, সওয়াব কিছুই পাবে না। নিজেরা তো আরামদায়ক যানবাহনে বসে সফর করবে, প্রতিবেশীর খবরও নেবে না।

আবূ নছর (রহঃ) বলেন : জনৈক ব্যক্তি হযরত বিশর ইবনে হারেছের কাছে বসে বললঃ আমি হজ্জ করার ইচ্ছা করে আপনার কাছ থেকে বিদায় নিতে এসেছি। তিনি জিজ্ঞেস করলেন : হজ্জের জন্যে তোমার কাছে কি পরিমাণ অর্থ আছে? সে জওয়াব দিল : দু'হাজার দেরহাম। বিশর জিজ্ঞেস করলেন। হজ্জের দ্বারা তোমার উদ্দেশ্য কি দেশভ্রমণ, কাবাগৃহের আগ্রহ, না আল্লাহর সন্তুষ্টি? লোকটি আরয করল ; আল্লাহর সন্তুষ্টি। তিনি বললেন : যদি গৃহে বসে এ দু’হাজার দেরহাম ব্যয় করে তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেয়ে যাও এবং সন্তুষ্টিপ্রাপ্তির ব্যাপারে তোমার দৃঢ় বিশ্বাসও অর্জিত হয়ে যায়, তবে তুমি কি করবে? লোকটি বলল : তবে এভাবেই সন্তুষ্টি অর্জন করব। তিনি বললেন ; তাহলে যাও, এই দেরহামগুলো দশ প্রকার ব্যক্তিকে দিয়ে দাও- ঋণগ্রস্তকে দাও, যে তার ঋণ পরিশোধ করবে, অভাবগ্রস্তকে দাও, যে তার অভাব মোচন করবে, বাল-বাচ্চাদারকে দাও, তার বাল-বাচ্চাদেরকে পালন করবে, অনাথ শিশুদের দেখাশোনাকারীকে দাও, যে তাদেরকে খুশী করবে। যদি মনে চায়, তবে এসব প্রকারের এক এক ব্যক্তিকে দাও। আমার এরূপ বলার কারণ এই যে, কোন মুসলমানের মন খুশী করা, মযলুমের ডাকে সাড়া দেয়া এবং দুর্বলের সাহায্য করা ফরয হজ্জের পর এক'শ হজ্জের চেয়েও উত্তম। কাজেই এখন যাও এবং আমি যা বললাম- তাই কর। নতুবা মনের কথা বলে দাও। লোকটি বলল : আমার মন তো ভ্রমণ করতেই ইচ্ছুক। অগত্যা হযরত বিশর মুচকি হেসে বললেনঃ যখন টাকা-পয়সা ব্যবসা-বাণিজ্য ও সন্দেহযুক্ত পথে সঞ্চিত হয়ে যায়, তখন মন চায় কোন সৎকর্ম সম্পাদন করতে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা কসম করেছেন যে, তিনি মুত্তাকীদের আমল ছাড়া কারও আমল কবুল করবেন না।


আরেক দল লোক কৃপণতাবশত অর্থকড়ি সঞ্চয় করে এবং সৎকর্ম ও এবাদত এমন করে, যাতে মোটেই অর্থ ব্যয় করতে হয় না। যেমন দিনের বেলায় রোযা রাখে এবং রাত্রিতে জাগরণ করে কিংবা কোরআন খতম করে, এরাও বিভ্রান্ত। কেননা, মারাত্মক কৃপণতা তাদের অন্তরকে ঘিরে রেখেছে। অর্থ ব্যয় করে প্রথমে এরই মূলোৎপাটন করা উচিত ছিল। এর পরিবর্তে যা তারা করে, তার কোন প্রয়োজন ছিল না। তাদের দৃষ্টান্ত এমন, যেমন কারও পরনের কাপড়ে সাপ ঢুকে গেছে। ফলে, সে মুত্যুর মুখোমুখি হয়ে পড়েছে। কিন্তু এ দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে সে সর্দির ঔষধ। প্রস্তুত করার কাজে ব্যস্ত। বল, যাকে সাপে দংশন করবে, সর্দির ঔষধ দ্বারা তার কি উপকার হবে? এ কারণেই হযরত বিশরের কাছে কেউ বলেন : অমুক ধনী ব্যক্তি নামায, রোযা খুব করে। তিনি বললেন : তার অবস্থার সাথে যে কাজের মিল ছিল, তা তো সে ছেড়ে দিয়েছে এবং যে কাজ অন্যের জন্যে উপযুক্ত ছিল, তা অবলম্বন করেছে। তার কর্তব্য ছিল নিরন্নকে অন্ন দেয়া এবং ফকীর-মিসকীনকে খয়রাত দেয়া । নিজে ক্ষুধার্ত থাকার চেয়ে দান-খয়রাত তার জন্যে উত্তম ছিল।


আরেক দল ধনী এত বেশী কৃপণ যে, ধন-সম্পদের মধ্য থেকে যাকাত ছাড়া অন্য কিছু দান করে না। যাকাতেও এমন নিকৃষ্ট মাল দেয়, যা নিজের কাছে রাখতে ঘৃণা করে। তারা যাকাত দিতে গিয়ে এমন ফকীর বেছে নেয়, যে তাদের খেদমত করে অথবা ভবিষ্যতে যার কাছ থেকে খেদমত আশা করে কিংবা যে কোন বড় লোকের সুপারিশ নিয়ে আসে। তাকে দান করার উদ্দেশ্য থাকে সেই বড় লোকের প্রিয়ভাজন হওয়া। এসব বিষয় নিঃসন্দেহে খারাপ নিয়তের পরিচায়ক। যারা এরূপ করে, তারা বিভ্রান্ত। কারণ, এরূপ করেও তারা নিজেদেরকে আল্লাহর ফরমাবরদার বলে ধারণা করে; অথচ তারা বদকার, গোনাহগার। আল্লাহর এবাদত করে অপরের কাছে বিনিময় চায়।

এগুলো ছাড়া বিত্তশালীদের মধ্যে আরও অসংখ্য বিভ্রান্তি দেখা যায়। নমুনা স্বরূপ এখানে মাত্র কয়েকটি উল্লেখ করা হল।

আরও একদল লোক আছে, যারা কেবল বিত্তশালীদের মধ্যেই নয়; বরং জনসাধারণের এমনকি ফকীরদের মধ্যেও বিস্তৃত । তারা ওয়াযের মজলিসে উপস্থিত থাকাকেই মুক্তির জন্যে যথেষ্ট মনে করে। ওয়াযের মজলিসে যাওয়াকে তারা একটি প্রথা ও অভ্যাসে পরিণত করে নিয়েছে। তাদের বিশ্বাস, ওয়ায শুনলেই সওয়াব পাওয়া যাবে এবং তদনুযায়ী আমল করা জরুরী নয়। এটা তাদের খামখেয়ালী। কেননা, ওয়ায মাহফিলের মাহাত্ম এ কারণেই যে, এর মাধ্যমে সৎকর্মের আগ্রহ সৃষ্টি হয়। এই আগ্রহ এ কারণেই ভাল যে, এতে মানুষ আমল করতে উদ্বুদ্ধ হয়। যদি ওয়ায দ্বারা দুর্বল আগ্রহ সৃষ্টি হয়, যা আমলে উদ্বুদ্ধ করে না, তবে এরূপ ওয়াযের কোন উপকারিতা নেই। এ ধরনের শ্রোতা যখন ওয়ায়েযের মুখে ওয়ায মাহফিলের ফযীলত এবং কান্নাকাটি করার সওয়াব শুনে, তখন নারীদের ন্যায় কান্না শুরু করে দেয়। আবার কোন সময় কোন ভয়ংকর কথা শুনে হাতের উপর হাত মেরে হায় আল্লাহ ! মায়াযাল্লাহ ! সোবহানাল্লাহ ! ইত্যাদি বলা ছাড়া আর কিছুই করে না। তাদের ধারণা, তারা যা কিছু করে সবই ভাল। অথচ এটা প্রকাশ্য বিভ্রান্তি। তাদের দৃষ্টান্ত এমন, যেমন কোন রোগী ব্যক্তি ঔষধালয়ে যাতায়াত করে এবং সেখানে ঔষধের গুণাগুণ সম্পর্কে আলোচনা শোনে অথবা কোন ক্ষুধাতুর ব্যক্তি এমন মজলিসে যায় যেখানে সুস্বাদু খাদ্যের আলোচনা হয়। বলা বাহুল্য, এতে না রোগীর রোগ দূর হবে, না ক্ষুধাতুরের ক্ষুধা নিবৃত্ত হবে। এমনিভাবে ওয়ায মাহফিলে এবাদত ও সঙ্কর্মের বর্ণনা শুনলে এবং আমল না করলে আল্লাহর কাছে কোন উপকার পাওয়া যাবে না।


পরবর্তী পর্ব

বিভ্রান্তি থেকে কেউ মুক্ত নয়

বিভ্রান্তি (পর্ব- ১০) সূফীগণের বিভ্রান্তি



বিভ্রান্তি (পর্ব- ১০)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

প্রথম প্রকার সূফীদের বিভ্রান্তি 

সুফীগণের মধ্যে অনেক শ্রেনীর রয়েছে তাদের মধ্যে বিভ্রান্তি প্রবল থাকে। এক শ্রেনীর সুফীর নীতি এই যে, তারা সাচ্চা সুফীগণের ন্যায় পোষাক, আঁকার-আকৃতি, ভাষা, আদব-কায়দা, রীতিনীতি পরিভাষা তৈরী করে এবং বাহ্যিক দিক দিয়ে তাদের অনুরূপ হয়ে থাকে। উদাহরনতঃ তারা রাগ-রাগীনি শ্রবন করে, ভাবতিশয্যে নর্তন কুর্দন করে, জায়নামাজে মাথা নত করে চিন্তাশীলদের ন্যায় বসে,দীর্ঘ শ্বাস নেয়, ক্ষীনস্বরে কথা বলে। এতেই তারা বিভ্রান্তিবশত মনে করে যে,সুফী হয়ে গেছে। অথচ তারা নিজেদেরকে কঠোর পরিশ্রম ও সাধনায় অভ্যস্ত করেনা। এবং নিজেদেরকে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ গুনাহ থেকে পবিত্র করেনা। যা সাচ্ছা সুফীগণের মধ্যে মামুলী বিষয় বলে পরিগণিত হয়। কেউ এই সব বিষয় আরম্ভ করে দিলেও নিজেকে সুফী বলে গন্য করতে পারেনা এবং বড়বড় কথা বলতে পারেনা। এমতাবস্থায় যারা হারাম ও সন্দেহযুক্ত ধন সম্পদের বাছ বিছার করেনা। টাকা পয়সা দেখলে লাফিয়ে পড়ে। সামান্য বিষয়ে হিংসাবিদ্বেষ পোষন করে। কেউ সামান্য বিপরীত কথা বললে তার মান হানি করতে উদ্যত হয়, তারা কিভাবে সুফী হতে পারে? কিয়ামতের দিন যখন এই মেকী সুফীর দল আল্লাহর সামনে উপস্থিত হবে, যিনি বাহ্যিক ছেড়াবাস নয় বরং অন্তরের অবস্থা দেখেন। তখন তাদের দুর্দশার অন্ত থাকবেনা।


দ্বিতীয় প্রকার সূফীদের বিভ্রান্তি-

আরেক শ্রেনীর সুফীর আবার যেনতেন পোষাক পড়তে রুচীতে বাধে, আবার সুফী হওয়ার বাসনাও প্রবল। সুফীগণের পোষাক ছারা যেহেতু সুফী হওয়া যায়না, তাই তারা উৎকৃষ্ট খন্ড খন্ড কাপরের জোরা দিয়ে বিচিত্র ধরনের পোষাক তৈরী করে, যা রেশমী কাপড়ের ছেয়েও মুল্যবান। তারা মনে করে যে, পোষাকে তালি লাগিয়েই তারা সুফী হয়ে গেছে। পূর্ববর্তী সুফীগণ তালিযুক্ত পোষাক পরিধান করিতেন। তাই তারাও উৎকৃষ্ট খন্ড খন্ড পোষাককে তালিযুক্ত করে নেয়। অথচ বুঝা কঠিন যে, মুল্যবান বস্ত্রগুলি খন্ড খন্ড করে তালিযুক্ত করে তারা পূর্ববর্তী সুফীগণের অনুসরন হয়ে গেল কিরূপে? 

বলাবাহুল্য তাদের এই খামখেয়ালী সকল বিভ্রান্তিকে ছারিয়ে গেছে। কেননা তারা মুল্যবান পোষাক পরে, সুস্বাদু খাবার খায়, যালেম ও পাপাসক্তদের অর্থ দুহাতে গ্রহন করে। এবং বাহ্যিক গুনাহ থেকে বেঁচে থাকেনা, আন্তরিক গুনাহের কথা নাইবা বলা হল। এর পরও তারা সুফী বলে থাকে এবং নিজেদেরকে উত্তম মনে করতে থাকে। তাদের অনিষ্ট সাধারণ মানুষদের মধ্যেও বিস্তার লাভ করে। কেননা যারা তাদের অনুসরণ করে, তারা তাদের মত বরবাদ হয়ে যায়। আর যারা অনুসরণ করেনা তাদের বিশ্বাস সুফী সম্প্রদায়ের প্রতি শিথিল হয়ে যায়। সকলকেই তারা এরূপ মনে করে। ফলে সত্যিকার সুফীগণ সম্পর্কে বিরূপ সমালোচনা করতে তারা দ্বিধা করেনা। বলাবাহুল্য এটা এই তথাকথিত সুফীদের কুকর্মেরই ফল।


তৃতীয় প্রকার সূফীদের বিভ্রান্তি

আরেক শ্রেনীর সুফী মারেফত জ্ঞানের দাবী করে, তারা বলে আমরা সকল মকাম ও হাল অতিক্রম করেছি, সর্বদা হকের মোশাহাদা করি এবং আল্লাহ্'র সান্নিধ্যে পৌছে গেছি।অথচ তারা এইসব বিষয়ের নাম ও শব্দই শুনেছে - এগুলোর স্বরূপ, শর্ত, আলামত ও বাধা-বিপত্তি সম্পর্কে কিছুই জানেনা। তারা মারেফত-ওয়ালাদের কিছু বিপরিত ধর্মী কথাবার্তা শিখে নেয় এবং সেগুলিই গেয়ে ফিরে। তাদের মতে এগুলি অত্যাধিক উচ্চস্থরের কথা। ফলে তারা আবেদ ও আলেমদেরকে মোটেই যোগ্য মনে করেনা। আবেদদের সম্পর্কে বলে এরা পরিশ্রমী শ্রমিক। আর আলেমদের সম্পর্কে বলে, এরা আল্লাহ্ থেকে আড়ালে। অথচ আল্লাহ্ তা'আলার কাছে এই ধরনের সুফীরাই মুনাফিক, বদকার,  নির্বোধ ও মুর্খ। এরা না শিক্ষা গ্রহন করে, না চরিত্র সংশোধন করে এবং না অন্তরের হেফাজত করে। কেউ কেউ বলে, বাহ্যিক আমল ধর্তব্য নয়। আল্লাহ্ তায়ালা অন্তরকে দেখেন। আমাদের অন্তর আল্লাহর মহব্বতে পাগল পারা। দুনিয়াতে আমরা দেহের পিন্জরে আবদ্ধ। আর অন্তর অসীম-এর আস্তানা প্রদক্ষিনরত। আমরা সর্বসাধারণের স্থর থেকে অনেক উর্ধে চলে গেছি। সুতরাং দৈহিক আমল দ্বারা আত্মসংশোধনের প্রয়োজন নেই। যেহেতু আমরা মারেফতে শক্তিশালী, তাই কামনা ও খায়েশ আমাদেরকে আধ্যাত্মপথে বাঁধা দিতে পারেনা। তাদের এই সব কথাবার্তা থেকে বুঝাযায় যে, তারা পয়গম্বরগণের স্থরও অতিক্রম করে গেছে।


চতুর্থ প্রকের সূফীদের বিভ্রান্তি-

কতক সুফী দাবি করেযে তারা আল্লাহর আশেক ও তার মহব্বতের জালে আটকা পড়েছে। সম্ভবত তারা আল্লাহ্ সম্পর্কে এমন ধারনা পোষন করে, যেগুলো বিদআত অথবা কুফর হওয়া বিচিত্র নয়। তারা মারেফতের পূর্বেই মহব্বতের দাবি করে। অথচ কতক কাজ এমন করে যা আল্লাহর পছন্দনীয় নয়। যেমন আল্লাহর কাজের উপর নিজের খাহেশকে অগ্রাধিকার দেওয়া, লোক লজ্জার কারণে কোন কোন কাজ না করা ইত্যাদি। এগুলো যে মহব্বতের পরিপন্থী সে কথা তারা জানেইনা। কতক লোক আহার, পোষাক ও বাসস্থানের হালাল তালাশ করেনা, অন্যেন্য ক্ষেত্রে হালালের জন্য আপ্রান চেষ্টা করে। তারা জানেনা যে আল্লাহ্ তা'আলা বান্দার প্রতি না কেবল হালাল অন্নের জন্য সন্তুষ্ট হবেন; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হালাল অন্ন খাওয়া সহ সকল এবাদত করা জরুরী এবং সকল গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক। যে মনে করে সামান্য বিষয় দ্বারাই সিদ্ধিলাভ হবে, সে বিভ্রান্ত। আধ্যত্ন পথ অতিক্রম করার জন্য যত প্রকার বিভ্রান্তি হতে পারে, সেগুলি পুরোপুরি বর্ণনা করার জন্য বিরাট পুস্তক দরকার। এলমে মোকাশাফার বিশদ বর্ণনা ছারা সবগুলো বিভ্রান্তি ফুটিয়ে তোলা সম্ভব নয়। অথচ এলেমে মোকাশাফা বর্ণনা করার অনুমতি নেই।


পরবর্তী পর্ব

বিত্তশালীদের বিভ্রান্তি

বিভ্রান্তি (পর্ব- ৯) সংসারত্যাগী ও এবাদতকারীদের বিভ্রান্তি



বিভ্রান্তি (পর্ব- ৯)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

সংসারত্যাগী ও এবাদতকারীদের বিভ্রান্তি

এরাও কয়েকটি দলে বিভক্ত। কারও নামাযে, কারও তেলাওয়াতে, কারও হজ্জে, কারও জেহাদে এবং কারও সংসার অনাসক্তিতে বিভ্রান্তি হয়। তবে বিজ্ঞ ব্যক্তি কখনও বিভ্রান্ত হয় না। এরূপ লোকের সংখ্যা নিতান্তই কম। এদের মধ্যে এক শ্রেণীর লোক ফরয ছেড়ে নফল ও মোস্তাহাব নিয়ে ব্যস্ত থাকে। উদাহরণতঃ কেউ উযু করতে গেলে নানা ধরনের সন্দেহ-সংশয়বশত সীমাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করে। এমনকি, যে পানি শরীয়তের দৃষ্টিতে পাক, তাতেও তাদের খটকা থাকে এবং নাপাকীর দূরবর্তী সম্ভাবনাকেও তারা নিকটবর্তী মনে করতে থাকে। অথচ হালাল ভক্ষণের ক্ষেত্রে তারাই নিকটবর্তী সম্ভাবনাকে দূরবর্তী জ্ঞান করে। বরং মাঝে মাঝে অকৃত্রিম হারামও খেয়ে ফেলে। যদি তারা পানির সাবধানতাকে খাওয়ার মধ্যে ব্যবহার করত, তবে এটা সাহাবায়ে কেরামের জীবনধারার অনুরূপ হত। হযরত উমর (রাঃ) একবার জনৈক খৃস্টান মহিলার ঘটি থেকে পানি নিয়ে উযু করে নেন; অথচ নাপাকীর সম্ভাবনা প্রকট ছিল। কিন্তু খাওয়ার ব্যাপারে তাঁর এতদূর সাবধানতা ছিল যে, অনেক হালাল বস্তুও হারামে লিপ্ত হওয়ার ভয়ে বর্জন করতেন। এই বিভ্রান্তদের কেউ কেউ উযু-গোসলে পানির অপচয় করে; অথচ এব্যাপারে অকাট্য নিষেধাজ্ঞা বর্ণিত রয়েছে। কেউ কেউ এতই সন্দেহপ্রবণ যে, উযু করতে করতে জামাআত খতম হয়ে যায় অথবা নামাযের সময়ই চলে যায়। সময় থাকলেও তারা ভ্রান্ত, এতে কোন সন্দেহ নেই। আসলে শয়তান মানুষকে খুব উত্তম পন্থায় এবাদত থেকে বিরত রাখে। এধরনের ধারণা সৃষ্টি করে যে, মানুষকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। কোন কোন এবাদতকারীর উপর নামাযের নিয়ত করার সময় সন্দেহ প্রবল হয়ে যায়। শয়তান তাদেরকে নিয়ত ঠিক করে নেয়ার সময় দেয় না; বরং এত পেরেশান করে যে, হয় জামাআত খতম হয়ে যায়, না হয়। নামাযের সময় চলে যায়। যদি তারা তাকবীর বলে তাহরীমা বেঁধে নেয়, তবে নামাযের বিশুদ্ধতায় সন্দেহ পোষণ করতে থাকে। কখনও “আল্লাহু আকবার” বলার মধ্যে এত সন্দেহ করে যে, সাবধানতার আতিশয্যে তাকবীরের শব্দ বদলে যায়। নামাযের শুরুতে এ অবস্থা হয়, এরপর সমগ্র নামাযে গাফেল থাকে এবং মনকে উপস্থিত করে না। তারা বিভ্রান্তির কারণে মনে করে যে, এসব কাণ্ড আল্লাহর কাছে খুব প্রিয়।

কতক লোকের উপর, “আলহামদু” ও অন্যান্য সকল ওযীফার মাখরাজসহ বিশুদ্ধ উচ্চারণের সন্দেহ প্রবল থাকে। তারা সর্বদাই এ ব্যাপারে খুব সাবধানতা অবলম্বন করে এবং একেই অত্যাবশ্যক মনে করে অন্যান্য বিষয়ে চিন্তাই করে না। তারা আয়াতের অর্থ, তার উপদেশ ও রহস্য হৃদয়ঙ্গম করার সাথে কোন সম্পর্কই রাখে না। এটা বড় বিভ্রান্তি। কেননা, আল্লাহ তা'আলা মানুষকে এমনভাবে কোরআন তেলাওয়াত করার আদেশ দিয়েছেন, যেমন তারা দৈনন্দিন কথাবার্তা বলে। অতএব, এতে এহেন বানোয়াট কোত্থেকে এল? তাদের দৃষ্টান্ত এমন, যেমন কোন ব্যক্তিকে একটি বার্তা বাদশাহের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য প্রেরণ করা হল। সে বাদশাহের দরবারে পৌঁছে বার্তার শব্দসমূহের সঠিক উচ্চারণে সমগ্র মনোযোগ নিবিষ্ট করল এবং এক এক শব্দকে ঠিক করতে গিয়ে কয়েকবার উচ্চারণ করল। কিন্তু বার্তার বিষয়বস্তু কি ছিল এবং বাদশাহের দরবারের শিষ্টাচার কি কি ইত্যাদি বিষয়ের প্রতি ক্ৰক্ষেপও করল না। এরূপ ব্যক্তির শাস্তি পাগলা গারদে পাঠিয়ে দেয়া ছাড়া আর কি হতে পারে?

এর বিপরীতে কিছুসংখ্যক লোক ঘাস কাটার ন্যায় কোরআন পাঠ করে। তারা মাঝে মাঝে একদিনে এক খতম করে। তারা মুখে কোরআন পাঠ করে; কিন্তু অন্তরে নানা প্রকার আশা-আকাঙ্ক্ষা বিচরণ করতে থাকে। অর্থের দিকে তো কোন মনোযোগই থাকে না যে শাস্তিবাণী ও উপদেশবাণী দ্বারা অন্তর কিছুটা প্রভাবিত হবে।

একদল লোক রোযা রাখার জন্যে পাগল থাকে। তারা সর্বদা অথবা পবিত্র দিনগুলোতে রোযা রাখে। কিন্তু নিজের জিহ্বাকে গীবত থেকে, অন্তরকে রিয়া থেকে, পেটকে হারাম থেকে এবং কথাবার্তাকে বাজে বিষয়াদি থেকে বাঁচিয়ে রাখে না। সারাদিন অনর্থক বকবক করতে থাকে। এতদসত্ত্বেও নিজেকে উত্তম মনে করে। যা ফরয তা করে না এবং নফল নিয়ে ব্যস্ত থাকে। তাও আবার যেমন করা উচিত, তেমন করে না। এটা প্রকাশ্য ধোকা। কিছু লোক হজ্জকর্মে বিভ্রান্ত। তারা অপরের হক ও ঋণ আদায় না করে, পিতামাতার অনুমত্ ছাড়াই এবং হালাল পাথেয় সঙ্গে না নিয়েই হজ্জ করতে বের হয়ে পড়ে। পথিমধ্যে নামায ও অন্যান্য ফরয কর্ম বিনষ্ট করে এবং অশ্লীলতা ও কলহ-বিবাদ থেকে বিরত থাকে না। এরপর যখন বাড়ী ফিরে আসে, তখন অন্তরে কুচরিত্রতা ও বদস্বভাবের ভাণ্ডার থাকে। এতদসত্ত্বেও তারা হজ্জ করাকে উত্তম মনে করে।


পরবর্তী পর্ব

সূফীগণের বিভ্রান্তি 

বিভ্রান্তি (পর্ব- ৮) চতুর্থ প্রকার শিক্ষিতদের বিভ্রান্তি



বিভ্রান্তি (পর্ব- ৮)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

চতুর্থ প্রকার শিক্ষিতদের বিভ্রান্তি-

আরেক দল শিক্ষিত লোক ওয়ায-নসীহতে ব্যস্ত থাকে। তাদের মধ্যে উচ্চমর্যাদাশীল তারা, যারা অন্তরের গুণাবলী অর্থাৎ, খোদাভীতি, আশা, সবর, শোকর, তাওয়াক্কুল, সংসারের প্রতি অনাসক্তি, বিশ্বাস, আন্তরিকতা, সততা ইত্যাদি বিষয়বস্তু মানুষকে শুনায়। তারা এই বিভ্রান্তিতে লিপ্ত যে, তারা যেহেতু এসব গুণ বর্ণনা করে, তাই তারা নিজেরা প্রথমে এসব গুণে গুণান্বিত। অথচ আল্লাহর কাছে তারা এসব গুণে গুণান্বিত নয়। যদি অল্প বিস্তর কিছু গুণ তাদের মধ্যে থাকেও, তবে প্রতিটি সাধারণ মুসলমানের মধ্যেও কিছু না কিছু থাকে। সুতরাং তার ফযীলত কোথায়? তারা যখন এখলাসের গুণ বর্ণনা করে, তখন বর্ণনার মধ্যেও এখলাস করে না। যখন রিয়ার উল্লেখ করে, তখন তারাও রিয়ামুক্ত হয় না। সংসার অনাসক্তির বর্ণনাও এজন্যে করে যে, তারা নিজেরা সংসারের প্রতি গভীর আসক্ত। মোটকথা, তারা বাহ্যত মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকে। কিন্তু নিজেরা আল্লাহ থেকে পলায়ন করে। অপরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে; কিন্তু নিজেরা দূরে সরে যায়। এ অবস্থা হচ্ছে সেসব ওয়াযকারীর, যাদের ওয়ায নিষ্কলঙ্ক এবং বর্ণনা নির্ভুল অর্থাৎ, যারা কোরআন-হাদীস ও হযরত হাসান বসরী (রহঃ) প্রমুখের তরীকা অনুযায়ী ওয়ায করে।

কিন্তু আরেক শ্রেণীর ওয়াযকারী ওয়াযের অপরিহার্য নিয়ম-পদ্ধতি থেকে বিচ্যুত। আজকালকার সকল ওয়াযকারীই এমনি ধরনের। আল্লাহ রক্ষা করেছেন, এমন বিরল কেউ থাকতে পারে। কিন্তু আমি এমন কাউকে জানি না। এ ধরনের ওয়ায়েয মানুষকে নতুন কথা শুনানোর জন্যে অনেক মিথ্যা, ভিত্তিহীন, বিবেক ও আইন বহির্ভূত কথাবার্তা বর্ণনা করে। কেউ কেউ সাজানো-গুছানো ও ছন্দময় বাক্য ব্যবহার করে এবং প্রমাণস্বরূপ বিরহ ও মিলনের কবিতা আবৃত্তি করে, যাতে মানুষ ভাবাতিশয্যে চীৎকার করে উঠে। এরা মানুষরূপী শয়তান। নিজেরাও গোমরাহ এবং অপরকেও গোমরাহ করে।

আরেক দল ওয়ায়েয। দুনিয়াত্যাগী বুযুর্গদের উক্তি হুবহু মুখস্থ করে নেয় এবং এসব উক্তির সঠিক অর্থ না বুঝে মজলিসে বর্ণনা করে। আর মনে করে যে, আল্লাহ থেকে আত্মরক্ষা না করলেও আল্লাহর মাগফেরাত তাদের সাথে রয়েছে। মোটকথা, এই শেষ যুগে শিক্ষিত ব্যক্তিদের বিভ্রান্তি গণনার বাইরে। নমুনাস্বরূপ এখানে কয়েকটি বিভ্রান্তি উল্লেখ করা হল। 


পরবর্তী পর্ব

সংসারত্যাগী ও এবাদতকারীদের বিভ্রান্তি

বিভ্রান্তি (পর্ব- ৭) তৃতীয় প্রকার শিক্ষিতদের বিভ্রান্তি



বিভ্রান্তি (পর্ব- ৭)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

তৃতীয় প্রকার শিক্ষিতদের বিভ্রান্তি-

আরেক দল শিক্ষিত লোক বেদআতীদের সাথে ঝগড়া-কলহে লিপ্ত থাকার জন্য কালাম শাস্ত্র ও তর্কশাস্ত্র অধ্যয়ন করে। তারা বিরোধী দলের আপত্তিসমূহ অন্বেষণ করার কাজে এবং তাদেরকে নিরুত্তর করার পদ্ধতি উদ্ভাবনের কাজে সর্বপ্রযত্নে নিয়োজিত থাকে। এ উদ্দেশ্যে তারা বিভিন্ন উক্তি মুখস্থ করে নেয়। তাদের বিশ্বাস, মানুষের কোন আমল ঈমান ব্যতীত শুদ্ধ হয় না। যে পর্যন্ত মানুষ আমাদের বিতর্ক না শিখে এবং কালাম শাস্ত্রের দলীলসমূহ না জানে, সে পর্যন্ত ঈমান শুদ্ধ হয় না। তারা আরও মনে করে, আল্লাহকে কেউ আমাদের চেয়ে বেশী চিনে না। যে আমাদের মাযহাবে বিশ্বাসী নয় এবং আমাদের শাস্ত্র সম্পর্কে জ্ঞাত নয়, সে বেঈমান। এই প্রকার তর্কবিদ দু’শ্রেণীতে বিভক্ত- এক শ্রেণী পথভ্রষ্ট এবং অপর শ্ৰেণী সত্যপন্থী। পথভ্রষ্ট তারা, যারা হাদীসের বিপরীত দিকে আহ্বান করে। আর সত্যপন্থী তারা, যারা হাদীস ও সুন্নাহর দিকে দাওয়াত দেয়। কিন্তু বিভ্রান্তি উভয় শ্রেণীর মধ্যেই বিদ্যমান।

পথভ্রষ্ট দলের বিভ্রান্তি এই যে, তারা তাদের পথভ্রষ্টতা সম্পর্কে গাফেল এবং এতেই নিজেদের মুক্তি মনে করে। এদের মধ্যেও অনেক দল আছে, যারা একে অপরকে কাফের বলে। সত্যপন্থী শ্রেণীর বিভ্রান্তি এই যে, তারা বিতর্ক ও মোনাযারাকে নেহায়েত জরুরী ও অত্যন্ত সওয়াবের কাজ মনে করে। তারা এ বিষয়ের প্রবক্তা যে, তাদের মত বিতর্ক ও তালাশ না করা পর্যন্ত কারও ধর্মপূর্ণতা লাভ করবে না। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও রসূলকে বাহাস ও প্রমাণ ব্যতিরেকে সত্য বলে বিশ্বাস করবে, সে পূর্ণ ঈমানদার নয়। এই ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়েই তারা সমগ্র জীবন বিতর্কানুষ্ঠান, চিত্তাকর্ষক বাক্যাবলী আয়ত্তকরণ এবং বেদআতীদের আপত্তি খণ্ডনে অতিবাহিত করে দেয় এবং নিজের অন্তরের কোন খোঁজ-খবর নেয় না। ফলে বাহ্যিক গোনাহ ও অভ্যন্তরীণ ক্রটি-বিচ্যুতি দেখতে পায় না। তাদের যদি অন্তদৃষ্টি থাকত, তবে অবশ্যই ইসলামের প্রাথমিক যুগের অবস্থা দেখতে পেত, যে যুগ সম্পর্কে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়ালিহি ওয়াসাল্লাম) সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তারা সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে শ্রেষ্ঠ। তারা অনেক বেদআতী ও প্রবৃত্তির পূজারী দেখেছেন; কিন্তু আপন জীবন ও ধর্মকে বিতর্কবাণের লক্ষ্যস্থল করেননি; বরং কখনও এ সম্পর্কে আলোচনা পর্যন্ত করেননি। নেহায়েত প্রয়োজন দেখা দিলে সেখানে প্রয়োজন অনুযায়ীই কথা বলেছেন, যাতে পথভ্রষ্ট ব্যক্তি তার পথভ্রষ্টতা জেনে যায়। তারা যখন কোন গোমরাহকে তার গোমরাহীতে পীড়াপীড়ি করতে দেখেছেন, তখন তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন এবং আল্লাহর ওয়াস্তে তার সাথে শত্রুতা রেখেছেন জীবনভর কথা কাটাকাটি করেননি।

পূর্ববর্তী মনীষীরা বলেছেন- সুন্নাহর দিকে দাওয়াত দেয়া সুন্নত এবং দাওয়াতের মধ্যে বিতর্কে প্রবৃত্ত না হওয়াও সুন্নত। আবু ওসামা বাহেলী (রাঃ) -এর রেওয়ায়েতে রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়ালিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : যে জাতিকে হেদায়াত দান করা হয়, তারা পথভ্রষ্ট হয় না যে পর্যন্ত তাদের মধ্যে বিতর্ক মাথাচাড়া দিয়ে না উঠে। একদিন রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়ালিহি ওয়াসাল্লাম) সাহাবায়ে কেরামের এক সমাবেশে এসে দেখলেন, তারা পরস্পর তর্ক-বিতর্কে প্রবৃত্ত রয়েছেন। তিনি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেন এবং ক্রোধের আতিশয্যে তাঁর মুখমণ্ডল রক্তবর্ণ ধারণ করল। তিনি বললেন "তামরা কি এ জন্যেই প্রেরিত হয়েছ? তোমরা আদিষ্ট হয়েছ যে, আল্লাহর কিতাবের কতক অংশকে কতক অংশের দ্বারা প্রহার কর? দেখ, তোমরা যে বিষয়ে আদিষ্ট হয়েছ, তা কর আর যা করতে নিষেধ করা হয়েছে, তা থেকে বিরত হও।" রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়ালিহি ওয়াসাল্লাম) সকল ধর্মাবলম্বীর প্রতি প্রেরিত হয়েছিলেন। এতদসত্ত্বেও তিনি ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সাথে বিতর্ক সভায় বসেননি তাদেরকে অভিযুক্ত করার জন্যে অথবা নিশ্চুপ করার জন্যে অথবা কোন আপত্তির জওয়াব দেয়ার জন্যে অথবা নিজের পক্ষ থেকে আপত্তি করার জন্যে। তিনি কেবল কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে তাদের সাথে বিতর্ক করেছেন, যা তাদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছিল। এর বেশী বাহাস করেননি কেননা, বেশী কথাবার্তার কারণে তাদের অন্তর বিক্ষিপ্ত হত এবং নানা রকমের আপত্তি ও সন্দেহ দেখা দিত, যা অন্তর থেকে মুছত না। আল্লাহ না করুন, তিনি তাদের সাথে বিতর্ক করতে অক্ষম ছিলেন না। বরং বিজ্ঞ ও সাবধানী ব্যক্তিমাত্রই বিতর্ককে পছন্দ করে না। সুতরাং আমাদের ততটুকু বিতর্কই করা উচিত, যতটুকু সাহাবায়ে কেরাম ইহুদী, খৃস্টান ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের সাথে করেছেন। তারা সমগ্র জীবন এসব বিতর্কে ব্যয় করে দেননি। এছাড়া যে বিষয়ে আমাদের পক্ষ থেকে ভুল হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে, তাতে আমরা এতটুকু মনোনিবেশ করব কেন? কোন বেদআতীর সাথে বিতর্ক করলে দেখা যায় যে, সে বিতর্কের ফলস্বরূপ বেদআত পরিত্যাগ করে না; বরং বিদ্বেষবশত তার বেদআত আরও বেড়ে যায়। এমতাবস্থায় এসব বিরুদ্ধবাদীর সাথে বিতর্ক করার তুলনায় আত্মসংশোধনে জোর দেয়াই উত্তম। এটা তখন, যখন ধরে নেয়া যায় যে, আমাদেরকে বিতর্ক করতে নিষেধ করা হয়নি। কিন্তু যেখানে নিষেধাজ্ঞা বিদ্যমান আছে, সেখানে কাউকে বিতর্কের মাধ্যমে সুন্নতের দিকে দাওয়াত দেয়া যেন এক সুন্নত বর্জন করে অন্য সুন্নত পালন করার নামান্তর।


পরবর্তী পর্ব

চতুর্থ প্রকার শিক্ষিতদের বিভ্রান্তি

বিভ্রান্তি (পর্ব- ৬) দ্বিতীয় প্রকার শিক্ষিতদের বিভ্রান্তি



বিভ্রান্তি (পর্ব- ৬)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

দ্বিতীয় প্রকার শিক্ষিতদের বিভ্রান্তি-

আরেক দল শিক্ষিত লোক এসব অভ্যন্তরীণ দোষ সম্পর্কে জানে এবং এগুলো যে শরীয়তের দৃষ্টিতে বর্জনীয়, তাও জানে। কিন্তু তারা নিজেদেরকে যেহেতু বড় মনে করে, তাই মনে করে যে, এসব দোষ তাদের মধ্যে নেই। তাদের স্তর আল্লাহর কাছে এমন নয় যে, এসব বিষয় দ্বারা আল্লাহ তাদের পরীক্ষা নেবেন। এগুলো হল সাধারণ মানুষকে পরীক্ষা করার বিষয়- তাদের মত শিক্ষিতদেরকে নয়। এরপর যখন তাদের কাছ থেকে অহংকার, ঝাকজমক, আস্ফালন ও গর্বের চিহ্ন ফুটে উঠে, তখন বলে- এটা অহংকার নয়; বরং ধর্মের ইযযত রক্ষার স্পৃহা এবং বিদ্যার মহিমা প্রকাশ। কারণ, আমরা যদি নিকৃষ্ট পোশাক পরি এবং মজলিসে নিচে বসি, তবে ধর্মের শত্রুরা উপহাস করবে, এতে আমাদের অপমান তথা ধর্মের অপমান হবে। এই বিভ্রান্তরা জানে না যে, তাদের শত্রু তো বাস্তবে শয়তান, যার ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা সতর্ক করেছেন। শয়তান তাদের কার্যকলাপ দেখে খুব হাস্য ও উপহাস করে। তারা একথাও জানে যে, রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ধর্মের মদদ কিভাবে করেছিলেন এবং কাফেরদেরকে কিভাবে পর্যদস্ত করেছিলেন। তাঁর সাহাবীগণ কতটুকু বিনয় ও নম্রতার অধিকারী ছিলেন ! দারিদ্র ও অসহায়তাকে কিভাবে অঙ্গের ভূষণ করে রেখেছিলেন। সিরিয়ায় হযরত উমর (রাঃ) -এর বিরুদ্ধে নিকৃষ্ট পোশাক পরিধানের আপত্তি উত্থাপন করা হলে তিনি বললেন : আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে ইসলাম দ্বারা ইয্যত দান করেছেন। অতএব, আমরা অন্য কোন বস্তুতে ইয্যতের আকাক্ষা করি না।

কখনও শিক্ষিত ব্যক্তি অক্লান্ত পরিশ্রম করে গ্রন্থ রচনা করে। সে মনে করে আমি আল্লাহ তা'আলার শিক্ষা প্রচার করছি যাতে সাধারণ মানুষের উপকার হয়। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে তার লক্ষ্য থাকে উৎকৃষ্ট রচনার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে নাম-যশ ও সুখ্যাতি অর্জন করা। এটা লক্ষ্য না হলে অন্য কোন ব্যক্তি যদি এ গ্রন্থ থেকে আসল গ্রন্থকারের নাম মিটিয়ে তদস্থলে নিজের নাম লিখে দেয়, তবে আসল গ্রন্থকার এটা অপছন্দ করে কেন? সে তো জানে যে, এই গ্রন্থ দ্বারা মানুষের যে উপকার হবে, তার সওয়াব সে-ই পাবে। আল্লাহর কাছেও সে-ই গ্রন্থকার- দাবীদার ব্যক্তি নয়।


পরবর্তী পর্ব

তৃতীয় প্রকার শিক্ষিতদের বিভ্রান্তি

বিভ্রান্তি (পর্ব- ৫) প্রথম প্রকার শিক্ষিতদের বিভ্রান্তি




বিভ্রান্তি (পর্ব- ৫)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

শিক্ষিতদের বিভ্রান্তি – ১

একদল শিক্ষিত লোক প্রচুর ধর্মীয় ও যৌক্তিক বিদ্যা শিক্ষা করে এবং তা নিয়ে এত ব্যস্ত থাকে যে, বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের প্রতি মোটেই ভ্রুক্ষেপ করে না। তারা বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে গোনাহ থেকে বিরত রাখে না এবং এবাদত পালন করে না। তারা আরও ধারণা করে আমরা আল্লাহ তাআলার কাছে মর্যাদাশীল। আল্লাহ আমাদের মত শিক্ষিতদেরকে আযাব দেবেন না; বরং সাধারণ লোকের পক্ষে আমাদের সুপারিশ কবুল করবেন। বাস্তবে এটা তাদের বিভ্রান্তি কেননা, গভীর দৃষ্টিতে দেখলে জানা যাবে, বিদ্যা দু’প্রকার। 

(১) মোকাশাফা; অর্থাৎ, আল্লাহ ও তাঁর গুণাবলীকে জানা, যাকে পরিভাষায় মারেফত' বলা হয়।

(২) মোয়ামালা; অর্থাৎ, হালাল-হারাম, ভাল ও মন্দ চরিত্র, তার প্রতিকার এবং মন্দ চরিত্র থেকে আত্মরক্ষার উপায় ইত্যাদি সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করা। 

আমল তথা কর্ম করার উদ্দেশ্যে এই দ্বিতীয় প্রকার বিদ্যা অর্জন করা হয়। আমল উদ্দেশ্য না হলে বিদ্যার কোন সার্থকতা নেই। যে বিদ্যার উদ্দেশ্য হয় আমল, সেই আমলই সেই বিদ্যার মূল্য হয়ে থাকে।

উদাহরণতঃ জনৈক রোগী একজন বিচক্ষণ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে চিকিৎসক তাকে কতগুলো বনজ ঔষধ, সেগুলোর প্রাপ্তিস্থান, চূর্ণকরণ, মিশ্রিতকরণ, প্রস্তুত প্রণালী, সেবনবিধি ইত্যাদি বিস্তারিত বলে দিল। রোগী সেগুলো শুনে সুন্দর হস্তাক্ষরে একটি ব্যবস্থাপত্র লিখে নিল। অতঃপর বাড়ী ফিরে সে প্রত্যেহ সে ব্যবস্থাপত্র পাঠ করতে শুরু করল তা পাঠ করে শুনাল। কিন্তু ব্যবস্থা অনুযায়ী বাজার থেকে সেগুলো কিনে ঔষধ তৈরি করল না এবং সেবনও করল না। অথচ তার কাছ থেকে শুনে অনেকেই। সেই ঔষধ তৈরি করে সেবন করল এবং রোগের হাত থেকে মুক্তি পেল। এমতাবস্থায় এই ব্যক্তির রোগমুক্তি আশা করা যায় কি? তার বিদ্যা তার কোন উপকারে আসবে কি? হাঁ, সে যদি পয়সা খরচ করে উপাদানগুলো বাজার থেকে কিনে ঔষধ তৈরি করে এবং যেভাবে সেবন করা দরকার, সেভাবে সেবন করে, সাথে সাথে নিষিদ্ধ ও ক্ষতিকর বস্তু আহার করা থেকে বিরত থাকে, তবে তার রোগমুক্তি আশা করা যায়। এতেও আরোগ্য লাভ না করার সম্ভাবনা থেকে যায়। কিন্তু মোটেই ঔষধ সেবন না করে আরোগ্য আশা করা খামখেয়ালী বৈ কিছু নয়। এমনিভাবে যে ব্যক্তি ফেকাহ, এবাদতের বিধিবিধান ইত্যাদি বিদ্যা শিক্ষা করে; কিন্তু নিজে আমল করে না, গোনাহসমূহ জেনেও গোনাহ থেকে আত্মরক্ষা করে না, মন্দ চরিত্র অধ্যয়ন করে এবং নিজেকে পরিশোধিত করে না এবং সচ্চরিত্রতার জ্ঞান অর্জন করে কিন্তু নিজে তা দ্বারা ভূষিত হয় না, সে নিশ্চিতই বিভ্রান্ত। আল্লাহ তা'আলা বলেন "যে নিজেকে পরিশোধিত করবে, সেই সফল হবে"।

এখানে একথা বলা হয়নি যে, যে পরিশোধনের জ্ঞান অর্জন করবে, সে সফল হবে। এক্ষেত্রে শয়তান আরও একটি ধোকা উপস্থিত করে। তা এই যে, জ্ঞানার্জনের সাথে ঔষধের কোন সম্পর্ক নেই। কেননা, ঔষধের জ্ঞান রোগ দূর করে না ঠিক; কিন্তু জ্ঞানার্জন খোদায়ী নৈকট্য ও সওয়াব লাভের কারণ হয়ে থাকে। সেমতে বিদ্যার ফযীলত সম্পর্কে অনেক হাদীস বর্ণিত আছে। এসব হাদীসে আমল ছাড়াই বিদ্যা অর্জনের মাহাত্ম বর্ণিত হয়েছে। বলা বাহুল্য, অজ্ঞ ব্যক্তিমাত্রই শয়তানের এই ধোকায় পড়ে যায়। কেননা, এটা মানসিক প্রবণতার অনুকূল। পক্ষান্তরে বিজ্ঞ ব্যক্তি শয়তানকে এই জওয়াব দেয় যে, তুই আমাকে বিদ্যার ফযীলত মনে করিয়ে দিচ্ছিস এবং অসৎ আমলহীন বিদ্বান ব্যক্তিদের সম্পর্কে যেসব শাস্তিবাণী উচ্চারিত হয়েছে, সেগুলো বেমালুম ভুলিয়ে দিচ্ছিস। দেখ, আল্লাহ বলেন : 

>"তার দৃষ্টান্ত কুকুরের মত"।

অন্য আয়াতে আছে— 

>"যাদেরকে তাওরাতের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল, অতঃপর তারা তা পালন করেনি, তাদের দৃষ্টান্ত গাধার মত, যে রাশি রাশি কিতাবের বোঝা বহন করে"।

কুকুর ও গাধার সমতুল্য হওয়ার চেয়ে বড় অপমান আর কি হবে? হাদীসে আছে, 

>"যার বিদ্যা বেশী এবং সুপথপ্রাপ্তি কম, সে আল্লাহ থেকে দূরেই চলে যায়"। 

আরও আছে, "আমলহীন আলেমকে দোযখে নিক্ষেপ করা হবে। তার অন্ত্রসমূহ বের হয়ে পড়বে এবং গাধা যেমন ঘানি ঘুরায়, তেমনি সে অগ্নিতে ঘুরবে"। 

হযরত আবু দারদা (রাঃ) বলেন : 'মূখের দুর্ভোগ একবার। সে লেখাপড়া করেনি। আল্লাহর মরযী হলে সে লেখাপড়া করত। কিন্তু বিদ্বানের দুর্ভোগ সাতবার। অর্থাৎ তার বিদ্যা তার বিরুদ্ধে প্রমাণ হবে এবং তাকে বলা হবে- বিদ্যা অর্জন করে তুমি কি আমল করেছ? আল্লাহর নেয়ামতের শোকর কিভাবে আদায় করেছ?' রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন- "কিয়ামতের দিন সর্বাধিক আযাব সেই শিক্ষিত ব্যক্তির হবে, যার শিক্ষা তার কোন উপকারে আসেনি; অর্থাৎ, সে আমল করেনি।" এ ধরনের আরও অসংখ্য রেওয়ায়েত বর্ণিত আছে। এগুলো অসৎ বিদ্বান ব্যক্তির মরযীর অনুকূল নয়। তাই শয়তান এগুলো স্মরণ করায় না


আরও একদল শিক্ষিত লোক আমল করে; কিন্তু কেবল বাহ্যিক এবাদত পালন করে এবং গোনাহ থেকেও বেঁচে থাকে। তারা অন্তরের নিন্দনীয় দোষসমূহের প্রতি মোটেই নজর দেয় না। উদাহরণতঃ অহংকার, হিংসা, রিয়া, জাকজমকপ্রীতি, সুখ্যাতি অন্বেষণ ইত্যাদি থেকে বেঁচে থাকে না। কেউ কেউ তো এগুলোকে দোষ বলেও মনে করে না। তারা এসব হাদীসের প্রতি লক্ষ্য করে না যে, 

>সামান্যতম রিয়াও শিরক। 

>যার অন্তরে কণা পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে যাবে না।

>হিংসা পুণ্য কাজকে এমনভাবে খেয়ে ফেলে, যেমন আগুন লাকড়ীকে খেয়ে ফেলে। 

এগুলো ছাড়াও মন্দ-চরিত্র এর অধ্যায়ে আরও অনেক হাদীস বর্ণিত রয়েছে। এ শ্রেণীর শিক্ষিত লোক নিজের বাহ্যিক আকৃতি, খুব সুন্দর করে, কিন্তু অন্তরের আকৃতি সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়। অথচ রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : "আল্লাহ তা'আলা তোমাদের বাইরের আকৃতি ও অর্থ-সম্পদ দেখেন না; বরং অন্তর ও আমল দেখেন। অন্তরই মূল এবং মুক্তি এর নিরাপত্তার উপরই নির্ভরশীল। আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ  "কিন্তু যে আল্লাহর কাছে আসে সুস্থ অন্তর নিয়ে" এই প্রকার শিক্ষিতদের দৃষ্টান্ত হচ্ছে মৃতদের কবর, যা বাহ্যত খুব সুসজ্জিত; কিন্তু অভ্যন্তরে গলিত লাশ অথবা অন্ধকার কক্ষ। গোনাহের মূল শিকড় হচ্ছে মন্দ স্বভাব, যা অন্তরের অভ্যন্তরে প্রোথিত। অন্তর থেকে এগুলো সাফ না করলে বাহ্যিক এবাদত দ্বারা কি ফল পাওয়া যাবে? উদাহরণতঃ এক ব্যক্তির গায়ে খোস-পাঁচড়া দেখা দিল। চিকিৎসক তাকে মালিশ করার এবং পান করার ঔষধ বলে দিল, যাতে মালিশের ঔষধ দ্বারা ত্বকের উপকার হয় এবং সেবনের ঔষধ দ্বারা মূল শিকড় বিনষ্ট হয়। কিন্তু রোগী কেবল মালিশের ঔষধ লাগিয়েই ক্ষান্ত রইল এবং সেবনের ঔষধ ব্যবহার করল না; বরং এমন নিষিদ্ধ খাদ্য ভক্ষণ করল, যা দ্বারা খোস-পাঁচড়া আরও বেড়ে যায়। এমতাবস্থায় এই রোগীর খোস-পাচড়া কোনদিন দূর হবে না যদি হাজার বারও গায়ে ঔষধ মালিশ করে। কেননা, শিকড় তো ভিতরে অবস্থিত। সেটা দূর হলে এটাও দূর হবে।


পরবর্তী পর্ব

দ্বিতীয় প্রকার শিক্ষিতদের বিভ্রান্তি

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...