খাসায়েসুল কুবরা (পর্ব– ১)
📚খাসায়েসুল কুবরা ✍🏻জালালুদ্দীন সিয়ুতী (রহঃ)
রসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সৃষ্টি ও নবুওয়ত সকল পয়গাম্বরের অগ্রে—
আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেছেন– "স্মরণ করুন যখন আমি নবীগণের কাছ থেকে তাদেরঅঙ্গীকার গ্রহণ করলাম"।
ইবনে আবী হাতেম স্বীয় তফসীর গ্রন্থে এবং আবূ নায়ীম তাঁর "আদ্দালায়েল” গ্রন্থে উপরোক্তআয়াতের তফসীর প্রসঙ্গে কাতাদাহ, হাসান ও আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর এই উক্তি উদ্ধৃত করেছেন- “আল্লাহ তায়ালাআমাকে সকল পয়গাম্বরের অগ্রে সৃষ্টি করেছেন এবং সকলের শেষে প্রেরণ করেছেন। একারণেই তিনি আমার কাছ থেকে অঙ্গীকারও সকলের অগ্রে নিয়েছেন।
আবূ সহল কাত্তান স্বীয় 'ইমামী' গ্রন্থে সহল ইবনে সালেহ হামদানী থেকে রেওয়ায়েত করেছেনযে, তিনি আবু জাফর মোহাম্মদ ইবনে আলীকে জিজ্ঞাসা করলেন: নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সকলের শেষে প্রেরিত হয়েও সকল পয়গাম্বরের অগ্রেকিরূপে হলেন? জবাবে আবু জাফর মোহাম্মদ ইবনে আলী বললেন : আল্লাহ তায়ালা যখনআদম (আঃ)-এর ঔরস থেকে তাঁর সমস্ত বংশধরকে সৃষ্টি করেন, তখন তাদের কাছ থেকেসাক্ষ্য নেন যে, আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই? জবাবে সকলের অগ্রে হযরত মোহাম্মদ(সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: (بلی) হ্যাঁ। এ কারণেই তিনি সকলপয়গাম্বরের অগ্রে, যদিও তিনি প্রেরিত হয়েছেন সকলের শেষে।
আহমদ, বোখারী (স্ব-স্ব ইতিহাস গ্রন্থে), তিবরানী, হাকেম ও আবূ নায়ীম সাহাবী মায়সারাতুলফজর (রাঃ) থেকে রেওয়ায়েত করেন, তিনি জিজ্ঞাসা করলেন : ইয়া রসূলাল্লাহ! আপনিকখন নবী মনোনীত হয়েছেন? তিনি বললেন: যখন আদম (আঃ) আত্মা ও দেহের মধ্যবর্তীঅবস্থায় ছিলেন।
আহমদ, হাকেম ও বায়হাকী ইরবায ইবনে সারিয়া (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনিরসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনাকে এ কথা বলতে শুনেছেন: আমি আল্লাহ তায়ালার কাছে “উম্মুল কিতাবে" (লওহে মাহফুযে) তখন নবী ছিলাম, যখনআদম (আঃ) মৃত্তিকায় লুটোপুটি খাচ্ছিলেন। হাকেম, বায়হাকী ও আবূ নায়ীম হযরত আবুহুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন- নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনাকে জিজ্ঞাসা করা হল, আপনাকে কখন নবী নিযুক্ত করা হল? তিনি বললেনঃ তখন, যখন আদম (আঃ) সৃষ্টি ও আত্মা ফুঁকার মধ্যবর্তী পর্যায়ে ছিলেন।
আবূ নায়ীম সালেজী থেকে রেওয়ায়েত করেন, হযরত ওমর (রাঃ) রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনাকে প্রশ্ন করেন: আপনি কখন নবী নিযুক্ত হয়েছেন? উত্তর হল: তখন, যখন আদম (আঃ) মৃত্তিকায় লুটোপুটি খাচ্ছিলেন।
ইবনে সা'দ ইবনে আবুল জাদআ (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে জিজ্ঞাসা করলেন: আপনি কবে নবী মনোনীতহয়েছেন? তিনি বললেন : তখন, যখন আদম (আঃ) রুহ ও দেহের মাঝখানে ছিলেন।'
ইবনে সা'দ মুতরিফ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে শাখীর (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, এক ব্যক্তিরসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনাকে প্রশ্ন করলঃ আপনি কবেনবী হিসাবে মনোনীত হয়েছেন? তিনি বললেন: আদম (আঃ) যখন রুহ ও দেহের মাঝখানেছিলেন, তখন আমার কাছ থেকে অঙ্গীকার নেওয়া হয়।
তিবরানী ও আবূ নায়ীম আবু মরিয়ম গামমানী থেকে রেওয়ায়েত করেন, তিনি বলেছেন- জনৈক বেদুঈন নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনাকে জিজ্ঞাসাকরল : আপনার নবুওয়তের পূর্বে কি কি ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল? তিনি বললেন : সকলপয়গাম্বরের ন্যায় আল্লাহ তায়ালা আমার কাছ থেকেও অঙ্গীকার নেন। ইবরাহীম (আঃ) আমার আগমনের জন্যে দোয়া করেন। ঈসা (আঃ) আমার আগমনের সুসংবাদ দেন।এছাড়া আমার জননী স্বপ্নে দেখেন, তাঁর পদযুগল থেকে একটি প্রদীপ প্রজ্বলিত হয়েছে, যারআলোকে সিরিয়ার রাজপ্রাসাদ পর্যন্ত আলোকিত হয়ে গেছে।
জ্ঞাতব্য বিষয়—
শায়খ তকীউদ্দীন সুবকী (রহঃ) স্বীয় গ্রন্থে আয়াতের ( لَتُؤْمِنُنَّ بِه وَلَتَنْصُرْنَهُ - তোমরাঅবশ্যই তাঁর প্রতি ঈমান আনবে এবং তাঁর সাহায্য করবে।) অংশের তফসীর প্রসঙ্গে বলেন: এই অংশে নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর বিরাট মাহাত্ম্যবর্ণনা করা হয়েছে এবং ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, তিনি অতীত পয়গাম্বরগণের আমলে প্রেরিতহলে তাঁদেরও নবী হতেন। কেননা, তাঁর নবুওয়ত রেসালত সকল কাল ও সকল সৃষ্টিতেপরিবেষ্টিত এবং শামিল। এ কারণেই তিনি এরশাদ করেছেন: আমি সমগ্র সৃষ্টির জন্যেনবীরূপে প্রেরিত হয়েছি। এই "সমগ্র সৃষ্টি” বলতে কেবল ভবিষ্যৎ সৃষ্টিই নয়; বরং অতীতসৃষ্টিও শামিল আছে। এ জন্যেই তো তিনি বলেছেন- আমি তখনও নবী ছিলাম, যখন আদম(আঃ)-এর মৃত্তিকানির্মিত প্রতিকৃতি রুহ থেকে খালি ছিল।
কোন কোন আলেম এই শেষোক্ত হাদীসের অর্থ এই বর্ণনা করেছেন যে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহ তায়ালার জ্ঞানে তখনও নবী ছিলেন। আমরাবলি, এটা ঠিক নয়। কেননা, আল্লাহ তায়ালার জ্ঞান তো সকল বস্তু ও সকল ঘটনাতেইপরিবেষ্টিত। আদম সৃষ্টির প্রাক্কালে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর নবুওয়তের বিশেষভাবে উল্লেখ করা কেবল খোদায়ী জ্ঞান বর্ণনা করার জন্যে নয়; বরং একথা বলা উদ্দেশ্য যে, তাঁর নবুওয়ত সে সময়েই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। এ কারণেই আদম(আঃ) চক্ষু খুলেই আরশে "মোহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ" লিখিত দেখতে পান। যদি এই অর্থ নেয়াহয় যে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহ তায়ালার জ্ঞানেভবিষ্যৎ নবী ছিলেন, তবে এটা কেবল তাঁর বৈশিষ্ট্য নয়; বরং সকল পয়গাম্বরই আল্লাহরজ্ঞান অনুযায়ী ভবিষ্যৎ নবী ছিলেন। এ থেকে জানা গেল, কেবল রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এরই বৈশিষ্ট্য ছিল যে, সকল পয়গাম্বরের পূর্বে তাঁকেনবুওয়তের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করা হয়। এরপর গুরুত্ব সহকারে এই বৈশিষ্ট্য ঘোষণা করাহয়েছে, যাতে তাঁর উম্মত তাঁর উচ্চ মর্যাদার সাথে পরিচিত হয়ে যায় এবং এটা উম্মতের জন্যেকল্যাণ ও বরকতের কারণ হয়।
এখানে কেউ প্রশ্ন করতে পারে যে, নবুওয়ত একটি গুণ। তাই এই গুণে যিনি গুণান্বিত হবেন, তাঁর বিদ্যমান থাকা জরুরী। এছাড়া নবুওয়তের জন্যে চল্লিশ বছর বয়ঃক্রম নির্ধারিত।এমতাবস্থায় রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) প্রেরিত হওয়ার পূর্বেইকিরূপে নবী মনোনীত হয়ে গেলেন? তখন তো তিনি জন্মগ্রহণও করেননি এবং প্রেরিতও হননি।
আমি বলি, আল্লাহ তায়ালা দেহ সৃষ্টি করার পূর্বে রুহ সৃষ্টি করেছেন। তাই উল্লিখিত হাদীসে ইশারা নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর পবিত্র রুহ অথবা তাঁর হকীকত তথা স্বরূপের দিকে হতে পারে। আল্লাহ তায়ালা সকল স্বরূপ “আসল" তথা আদিকালে সৃষ্টি করে রেখেছেন। তিনি যখন ইচ্ছা করেন এ সকল স্বরূপের মধ্য থেকে কোনএকটিকে অস্তিত্ব জগতে আনয়ন করেন। এ সব স্বরূপের সামগ্রিক উপলব্ধি করতে আমরা অক্ষম। কেবল আল্লাহ তা'আলা সমস্ত স্বরূপ সম্পর্কে ওয়াকিফহাল অথবা যাদেরকে তিনিআপন নূরের আলোকে স্বরূপ পর্যন্ত পৌঁছার সামর্থ্য দান করেছেন। নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর পবিত্র স্বরূপ আদম সৃষ্টির পূর্বেই আল্লাহ তায়ালাসৃষ্টি করেছেন এবং তাঁকে নবুওয়তের গুণে ভূষিত করেছেন। তাই তিনি তখনই নবী হয়ে যান।আরশে তাঁর পবিত্র নাম লিখিত হয় এবং ফেরেশতাগণসহ সমগ্র সৃষ্টিকে আল্লাহর দরবারেতাঁর সুউচ্চ মর্যাদা সম্পর্কে জ্ঞাত করে দেয়া হয়, যদিও তিনি শারীরিক দিক দিয়ে আল্লাহ প্রদত্তসমস্ত গুণ ও বৈশিষ্ট্যসহ এ দুনিয়ায় পরে আগমন করেন। আবির্ভাব, ধর্ম প্রচার এবং বাহ্যিকজগতে নবুওয়তের যোগ্য হওয়ার দিক দিয়ে তিনি নিঃসন্দেহে সকল পয়গাম্বরের পশ্চাতে; কিন্তু তাঁর পবিত্র স্বরূপ এবং কিতাব ও আদেশ দানের দিক দিয়ে তিনি আদম (আঃ)-এরওঅগ্রে।
এতে কোন সন্দেহ নেই যে, বিশ্ব চরাচরে যা কিছু ঘটে, আল্লাহ তায়ালা সে সম্পর্কে আদিকালথেকে জ্ঞাত। আমরা যৌক্তিক ও শরীয়তের প্রমাণাদি দ্বারা সে সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করি। আর সাধারণ মানুষ তখন জানতে পারে, যখন সেই ঘটনা বাহ্য জগতে সংঘটিত হয়ে যায়।উদাহরণতঃ নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-উনার নবুওয়ত সম্পর্কে সাধারণ মানুষ তখন জ্ঞাত হয়েছে, যখন তাঁর প্রতি কোরআন অবতরণ শুরু হয়েছেএবং জিবরাঈল (আঃ) তাঁর কাছে আসতে শুরু করেছেন।
আল্লাহ তায়ালার যে সকল কর্ম কোন বিশেষ পাত্রে আল্লাহর কুদরত, ইচ্ছা ও ক্ষমতার চিহ্নস্বরূপ হয়ে থাকে, কোরআন অবতরণ সেগুলোর মধ্যে একটি। এর দুটি স্তর রয়েছে। প্রথম স্তর সাধারণ মানুষের জন্যে প্রকাশ পায় এবং দ্বিতীয় স্তরে সেই পাত্রের জন্যে আল্লাহর এই কর্মথেকে পূর্ণতা অর্জিত হয়ে যায়। যদিও মানুষ এই পূর্ণতা সম্পর্কে জানতে পারে না; বরংআমরা "খবরে-ছাদেক” তথা বিশুদ্ধ হাদীসের মাধ্যমে এই পূর্ণতা সম্পর্কে অবগত হই। নবীকরীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সমগ্র সৃষ্টির সেরা সৃষ্টি। তাই তিনি সমগ্রসৃষ্টির মধ্যে সর্বাধিক পূর্ণতাপ্রাপ্ত এবং সর্বাধিক মনোনয়নযোগ্য। সহীহ হাদীসের মাধ্যমেআমরা জানতে পারি যে, নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) কেনবুওয়তের পূর্ণতা ও মানবতার পূর্ণতার মর্যাদা হযরত আদম (আঃ) কে সৃষ্টি করার পূর্বেই দানকরা হয়েছিল। আল্লাহ তায়ালা মানব সৃষ্টির পূর্বেই সকল নবীর পবিত্র আত্মাসমূহের কাছথেকে তাঁর সম্পর্কে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন যে, তাঁরা সকলেই তার প্রতি ঈমান আনবে এবংতাঁকে সাহায্য করবে। উদ্দেশ্য, সকল নবী জেনে নিক যে, তিনি সকলের অগ্রে এবং সর্বশ্রেষ্ঠ।তিনি নবীগণের জন্যেও তেমনি নবী ও রসূল, যেমন সকল মানুষের জন্যে। তাই
(لَتُؤْمِنُنَّ بِهِوَلَتَنْصُرْنَهُ)
বাক্যাংশে কসমের 'লাম' অক্ষরটি দাখিল করা হয়েছে।
পরবর্তী পর্ব
নবীগণের কাছ থেকে ঈমান ও সাহায্যের অঙ্গীকার নেয়া খেলাফতের জন্যে বয়াত নেয়ারঅনুরূপ



