শনিবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৪

খওফ ও খাশিয়াত বা খোদাভীতি (পর্ব 2)



খওফ ও খাশিয়াত বা খোদাভীতি (পর্ব 2) 
📚মুকাশাফাতুল-কুলুব ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

হযরত আবুল-লাইস (রহঃ) বলেছেনঃ সপ্তম আসমানে আল্লাহ তা'আলা অসংখ্য ফেরেস্তা সৃষ্টি করে রেখেছেন। সৃষ্টিলগ্ন থেকেই তারা আল্লাহ তাআলার আরাধনায় সিজদারত অবস্থায় মগ্ন রয়েছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত এভাবেই থাকবে। আল্লাহ তা'আলার ভয়ে তাদের পাজর সর্বদা প্রকম্পিত থাকে। কিয়ামতের দিবসে তারা মস্তক উত্তোলনপূর্বক বলবে,- "আয়আল্লাহ ! আপনি পাক পবিত্র, আপনার হক আদায় করে যেভাবে ইবাদত করা আমাদের কর্তব্য ছিল তা আমরা করতে পারি নাই"। যেমন পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,- "তারা তাদের উপর পরাক্রমশালী তাদের রব্বকে ভয় করে এবং তারা যা আদেশ পায় তা করে।” ( সূরা নাহল, আয়াত : ৫০) 
অর্থাৎ, তারা এক মুহূর্তের জন্যেও আল্লাহ তা'আলার ভয়-ভীতি হতে চিন্তামুক্ত হয় না।
হুযুর আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন-"আল্লাহর ভয়ে যখন বান্দার শরীর কম্পমান হয়, তখন তার পাপরাশি এইরূপে ঝরে পড়ে যেমন বৃক্ষ হতে শুষ্কপত্র ঝরে পড়ে।"
একদা এক ব্যক্তি জনৈকা নারীর প্রতি প্রেমাসক্ত হয়। কোন প্রয়োজনে সেই মহিলা গৃহ হতে বের হলে প্রেমিক তার পশ্চাদানুসরণ করতে থাকে। এভাবে এক বনভূমিতে দুজন একত্রিত হয়। আশেপাশের লোকজন নিদ্রাভিভূত হওয়ার পর একান্ত মুহূর্তে পুরুষ উক্ত মহিলার নিকটতার মনোকামনা ব্যক্ত করে। তখন মহিলা তাকে জিজ্ঞাসা করলো, - “সকলেই কি ঘুমিয়ে গেছে"? শুনে মহিলার সম্মতি অনুমান করে লোকটি কাফেলার চতুর্পাশ প্রদক্ষিণ করে জানালো, - সকলেই ঘুমিয়ে গেছে; কেউ সজাগ নাই। অতঃপর মহিলা তাকে জিজ্ঞাসা করলো, — “ মহান আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে তোমার কি ধারণা; তিনিও কি এ সময় ঘুমিয়ে আছেন? লোকটি বললো, - “আল্লাহ্ তা'আলা ঘুমান না; নিদ্রা বা তন্দ্রা তাকে স্পর্শ করেনা। মহিলা বললো, - “যে সত্তা ঘুমান নাই এবং যিনি কখনও ঘুমাবেন, সর্বদা সজাগ ও চিরঞ্জীব সেই সত্তা আমাদেরকে দেখছেন; যদিও অন্যান্য লোকজনের কেউ আমাদেরকে দেখছে না। সুতরাং এমতাবস্থায় আমাদের অধিকতর ভীত-শঙ্কিত হওয়া উচিত। মহিলার এবক্তব্য শুনে লোকটির অন্তরে আল্লাহর ভয় সঞ্চারিত হলো এবং তৎক্ষণাৎ সত্যিকার তওবা করে সে উক্ত গর্হিত কাজ পরিত্যাগ করলো। 

কিছুকাল পর সে মারা গেলে এক ব্যক্তি স্বপ্নযোগে তাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, আল্লাহ তা'আলা আপনার সঙ্গে কেমন ব্যবহার করেছেন? 
উত্তরে সে বলেছে : “আল্লাহর ভয়ে আমি পাপকার্য হতে বিরত হওয়ার কারণে তিনি আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।"

বনী ইসরাঈল গোত্রে একজন আবেদ লোক ছিলেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে দারিদ্র অবস্থায় জীবন-যাপন করতেন। একদা জঠর জ্বালায় অস্থির হয়ে সন্তানদের জন্য কিছু খাবারের ব্যবস্থা করার উদ্দেশে তিনি স্ত্রীকে বাহিরে পাঠালেন। স্ত্রী জনৈক ধনাঢ্য ব্যক্তির দারস্থ হয়ে সন্তানদের জন্য কিছু প্রার্থনা করলে লোকটি বললো, - “অবশ্যই আমি তোমাকে কিছু দান করবো; কিন্তু শর্ত হচ্ছে আমি কিছুক্ষণের জন্য তোমাকে ভোগ করতে চাই। একথা শুনে স্ত্রীলোকটি নিশ্চুপ গৃহে ফিরে আসলো। গৃহে এসে দেখে সন্তানরা ক্ষুধার যন্ত্রণায় কান্নাকাটি করছে এবং মরণাপন্ন অবস্থায় উপনীত হয়েছে। মাকে দেখে ওরা তার কাছে খাবারের জন্য আর্তি করতে লাগলো। স্ত্রীলোকটি সন্তানদের এহেন কষ্ট সহ্য করতে না পেরে পুনরায় সেই লোকটির দারস্থ হয়ে প্রার্থনার পুনরাবৃত্তি করলো। স্ত্রীলোকটি প্রথমবারের বিপরীত এবার দেহ দানের জন্য রাজী হয়ে গেল। 
অতঃপর ধনাঢ্য লোকটি স্বীয় মনোকামনা পূরণের জন্য যখন উদ্যত হলো, তখন স্ত্রীলোকটির সর্বশরীর হঠাৎ এমনভাবে কাপতে আরম্ভ করলো যে, তার শরীরের জোড় গ্রন্থিসমূহ যেন উপড়ে যাবে। 
লোকটি জিজ্ঞাসা করলো, – তোমার এ অবস্থা হচ্ছে কেন'? 
স্ত্রীলোকটি বললো, — “আমি মহান সৃষ্টিকর্তাকে ভয় করি, ফলে আমার এ অবস্থা হয়েছে। 
লোকটি বললো,- তোমার এহেন ভূখা-ফাকা ও দারিদ্রাবস্থায়ও আল্লাহর প্রতি তুমি এত প্রবল ভীতি ও শঙ্কা বোধ করছো ! তাহলে তো আমার পক্ষে আল্লাহকে আরও অধিক ভয় করা উচিত। 
এ কথা বলে সে উক্ত গর্হিত কাজ হতে বিরত হয়ে গেল এবং স্বচ্ছ অন্তরে মহিলাকে তার প্রয়োজনের চাইতেও অধিক মাল-সম্পদ দিয়ে বিদায় করলো। 
মহিলা ঘরে ফিরে পরিবার-পরিজনকে নিয়ে আনন্দচিত্তে সকলের জঠর-জ্বালা নিবারণ করলো।
অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ) -এর নিকট এই মর্মে ওহী প্রেরণ করলেন যে, “হে মুসা ! তুমি আমার সেই ধনাঢ্য বান্দাকে সুসংবাদ শুনিয়ে দাও যে, আমি তার সমস্ত গুনাহ মাফ করে দিয়েছি। 
অতঃপর হযরত মূসা (আ.) সেই বান্দার নিকট গমন করে বললেন, "তুমি এমন কি সৎকাজ করেছো? যার ফলে আল্লাহ তাআলা তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে তোমার সমস্ত গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন"। লোকটি হযরত মূসা আলাইহিস সালামকে পূর্বাপর সম্পূর্ণ ঘটনা শুনালো।অতঃপর হযরত মুসা (আ.) তাকে ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত সুসংবাদটি শুনিয়ে বিদায় নিলেন।
হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন, মহামহিমান্বিত আল্লাহ তা'আলা বলেন "আমি কখনও স্বীয় বান্দার মধ্যে দুইটি ভয় এবং দুইটি অভয় একত্রিত করি না। যে বান্দা ইহজগতে আমার ভয়ে থাকবে, পরকালে আমি তাকে নির্ভয় রাখবো ! আর যে-ব্যক্তি ইহলোকে আমা হতে নির্ভয় থাকবে, পরলোকে আমিতাকে ভীত-সন্ত্রস্ত রাখবো।" আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেন, "তোমরা লোকদেরকে ভয় করোনা; ভয় আমাকেই কর।” (মায়িদাহঃ ৪৪) 
তিনি আরও ইরশাদ করেন, "তোমরা তাদেরকে ভয় করো না; ভয় আমাকেই কর, যদি তোমরা প্রকৃত ঈমানদার হয়ে থাক।" (আলে - ইমরান : ১৭৫) 
আমীরুল মুমেনীন হযরত উমর ফারুক (রা.) আল্লাহর ভয়ে মাটিতে ঢলে পড়তেন। তিনি কুরআনের কোন আয়াত শ্রবণ করলে মুর্ছিত হয়ে যেতেন। একদা একটি খড়কুটা হাতে নিয়ে তিনি বললেন, — “হায় ! আমি যদি এই খড়কুটাটিই হতাম; আমাকে যদি কেউই উল্লেখ না করতো।” তিনি প্রায়ই আক্ষেপ করে বলতেন : ‘ হায় ! কতই না ভাল হতো, যদি উমর মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠই না হতো। আল্লাহ্ তা'আলার ভয়ে তিনি এত অধিক পরিমাণে ক্রন্দন করতেন যে, অবিরাম ধারায় অশ্রু প্রবাহিত হওয়ার কারণে তাঁর গন্ডদ্বয়ের উপর দুটি কৃষ্ণবর্ণ রেখাপড়ে গিয়েছিল।
হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন- "আল্লাহর ভয়ে যে-ব্যক্তি রোদন করে,  সে দোযখে প্রবেশ করবে না, যেমন স্তন হতে নির্গত দুগ্ধ পুনরায় স্তনে প্রবেশ করে না।"
‘রাকায়েকুল- আখবার'  কিতাবে আছে :  কিয়ামতের দিন এক ব্যক্তিকে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত করা হবে। প্রচুর পাপের কারণে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করার হুকুম দেওয়া হবে।এমন সময় তার চোখের একটি পশম কথা বলবে এবং আরজ করবে : হে পরওয়ারদিগার !  আপনার প্রিয় হাবীব (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, -"যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার ভয়ে ভীত হয়ে ক্রন্দন করবে, সেই ব্যক্তির চক্ষুর জন্য আল্লাহ্ তা'আলা দোযখের আগুন হারাম করে দিয়েছেন।"  
আর আমি আপনার ভয়ে ভীত হয়ে ক্রন্দন করেছি। অতএব আমি আপনার নিকট দোযখের অগ্নি হতে মুক্তি প্রার্থনা করি। 
অতঃপর আল্লাহ তা'আলা এই পশমকে মুক্তি দিবেন এবং এই একটি পশমের ওসীলায় সেই বান্দাকেও দোযখের অগ্নি থেকে মুক্তি দান করবেন। 
তারপর হযরত জিবরাঈল (আ.) উচ্চস্বরে ঘোষণা করে দিবেন যে, — “অমুক বান্দাকে শুধুমাত্র একটি পশমের ওসীলায় দোযখের আগুন থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।” 
‘বিদায়াতুল- হিদায়াহ' কিতাবে আছে : কিয়ামতের দিন জাহান্নামকে সকলের সম্মুখে উপস্থিত করা হবে। তখন ভয় ও আতঙ্কের আতিশয্যে হাশরের ময়দানে উপস্থিত সকলেই হাঁটুগেড়ে ভূতলে আছড়িয়ে পড়বে। যেমন পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে - "আপনি প্রত্যেক উম্মতকে দেখবেন নতজানু অবস্থায়। প্রত্যেক উম্মতকে তাদের আমলনামা দেখতে বলাহবে। তোমরা যা করতে অদ্য তোমাদেরকে তার প্রতিফল দেওয়া হবে।" (জাসিয়াহ : ২৮) 
জাহান্নামকে উপস্থিত করা হলে সমবেত সকলেই জাহান্নামের কুদ্ধ গর্জন ও হুংকার শুনবে। 
এ হুংকার ও গর্জন পাঁচশত বৎসরের পথ পরিমাণ দূরত্ব হতেও শ্রুত হবে। এহেন ভয়াবহঅবস্থায় প্রত্যেকেই এমনকি আম্বিয়ায়ে কেরাম পর্যন্ত কেবল নিজের চিন্তায় ব্যস্ত থাকবেন এবং 'নাফসী' 'নাফসী' উদ্বেগ করবেন। একমাত্র প্রিয়নবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উম্মতের জন্য চিন্তা করবেন এবং 'উম্মতী' 'উম্মতী' বলে বেকারার থাকবেন। 
এ সময় জাহান্নাম থেকে পর্বতসম উচু হয়ে অগ্নিশিখা বের হতে থাকবে। উম্মতে মুহাম্মদী এই ভয়াবহ অবস্থা দূর করার জন্য প্রয়াস চালাবে এবং এই বলে দো'আ করবে, — “হে অগ্নি : নামাযী ব্যক্তিদের ওসীলায়, দান-খয়রাতকারী গণের তোফায়লে, নিষ্ঠাবান ও রোযাদার লোকদের দোহাই — তুমি তোমার এই ভয়াবহতা নিয়ে আমাদের থেকে দুরে সরে যাও। 
এদিকে হযরত জিবরাঈল (আঃ) সজোরে চিৎকার করে বলে উঠবেন? ওই যে সেই ভয়াবহ অগ্নি হযরত মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর উম্মতের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। একথা বলে হযরত জিব্রাঈল (আঃ) পানিভর্তি একটি পাত্ৰ এনে হুযুর আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর হস্ত মুবারকে দিয়ে বলবেন, "এই নিন পানির পেয়ালা; এই পানি আপনি দোযখের অগ্নির উপর ছিটিয়ে দিন।"  
হুযুর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তৎক্ষণাৎ সেই পানি দোযখের অগ্নির উপর ছিটিয়ে দিবেন । ফলে, সেই ভয়াবহ অগ্নি মুহুর্তের মধ্যে নির্বাপিত হয়ে যাবে। 
অতঃপর আল্লাহর রাসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হযরত জিবরাঈল(আঃ)-কে জিজ্ঞাসা করবেন, - “হে জিবরাঈল ! বলুন, এটা কিসের পানি?” 
হযরত জিব্রাঈল (আঃ) জওয়াবে বলবেন : ‘এটা আপনার উম্মতের মধ্যে গুনাহ্গার লোকদের অশ্রুজল, যা খোদার ভয়ে রোদন করার কারণে তাদের চোখ হতে নির্গত হয়েছে; 
অদ্যকার এ ভয়াবহ পরিস্থিতিতে দোযখের অগ্নি নিবারণের জন্য এ পানি আপনাকে দিতে আমাকে হুকুম করা হয়েছে এবং গোনাহগার লোকদের এই আঁখিজলের ওসীলায়ই আল্লাহ্ তা'আলা দোযখের ভয়াবহ অগ্নিকে নির্বাপিত করে দিয়েছেন।"
হুযুর আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সর্বদা আল্লাহর দরবারে এইবলে দো'আ করতেন। "হে আল্লাহ ! আপনি আমাকে দুটি ক্রন্দসী চক্ষু দান করুন, যে দু'টির দ্বারা আমি আপনার ভয়ে রোদন করতে পারি — সেই (হাশরের) দিন উপস্থিত হওয়ার পূর্বেই, যেদিন রক্তের অশ্রু কাঁদতে হবে।"
জনৈক কবি বলেছেন : 'ওহে চক্ষুযুগল ! আমার কৃত পাপকার্যের উপর তোমরা রোদন করকেন? আফসুস ! জীবনের মুহূর্তগুলো গাফলত ও শৈথিল্যের মধ্য দিয়েই শেষ হয়ে গেল; অথচ আমি তা টেরও করতে পারলাম না।
হুযুর আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন " কোন বান্দার চক্ষু হ'তে আল্লাহর ভয়ে যদি অন্ততঃপক্ষে মক্ষিকার মস্তক পরিমাণ অশ্রু নির্গত হয়েতার মুখমণ্ডলকে উষ্ণ করে, তাহলে তার জন্য দোযখের অগ্নি হারাম হয়ে যাবে। 
হযরত মুহাম্মদ ইবনে মুযির (র.) যখন আল্লাহর ভয়ে রোদন করতেন, তখন নির্গত অশ্রু স্বীয় মুখমণ্ডল ও দাড়িতে মর্দন করে বলতেন, —এই অশ্রুজল যে-যে স্থানে পৌঁছবে,  সেসব স্থানকে দোযখের অগ্নি স্পর্শ করবে না। 
অতএব প্রত্যেক ঈমানদার ব্যক্তির কর্তব্য, —আল্লাহর ভয়াবহ আযাব ও শাস্তির কথা স্মরণকরে ভীত-সন্ত্রস্ত হওয়া এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে নিজেকে সর্বদা নিবৃত্ত রাখা । 
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন - “যে ব্যক্তি সীমা লংঘন করে এবং পার্থিব জীবনকে অগ্রাধিকার দেয়, তার ঠিকানা জাহান্নাম। 
আর যে ব্যক্তি তার পরওয়ারদিগারের সামনে দণ্ডায়মান হওয়াকে ভয় করে এবং স্বেচ্ছাচারিতা হতে নিজেকে নিবৃত্ত রাখে, তার ঠিকানা জান্নাত। [নাযি'আত (৩৭ , ৩৮ , ৩৯, ৪০)]
আল্লাহ্ তা'আলার আযাব হ'তে আত্মরক্ষা করতে হলে এবং তাঁর দয়া ও অনুগ্রহ লাভ করতে হলে, দুনিয়ার জীবনে দুঃখ-কষ্ট ও মুসীবতের উপর ধৈর্যধারণ করতে হবে। সেইসঙ্গে সর্ববিধ পাপাচার পরিহার করে এক আল্লাহু তা'আলার ইবাদত ও আনুগত্যে আত্মনিয়োগ করতে হবে।
‘যাহরু-রিয়াদ কিতাবে আছে, হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)  ইরশাদ করেছেনঃ “যখন বেহেশতী লোকদেরকে বেহেশতে স্থান দেওয়া হবে, তখন ফেরেশতাগণ সর্বপ্রকার বেহেশতী নেয়ামত ও সাজ-সরঞ্জাম নিয়ে তাঁদের সাদর সম্ভাষণ ও আপ্যায়ন করবে, তাঁদের জন্য মঞ্চ স্থাপন করবে এবং রকমারী খাদ্যসামগ্রী ও ফলমুল পেশ করবে। এসব আয়োজন ও ব্যবস্থাপনা প্রত্যক্ষ করে বেহেশতীগণ হতবাক ও আশ্চর্যান্বিত হবে। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন হে আমার বান্দাগণ ! তোমরা আশ্চর্যান্বিত হচ্ছো কেন? আমারএই বেহেশত কোনরূপ দুঃখ-ক্লেশ ও বিড়ম্বনার স্থান নয়। বেহেশতবাসীরা আরজ করবে, — “হে পরওয়ারদিগার ! আমাদের সাথে আপনার একটি ওয়াদা ছিল, সেটা পূরণ হওয়ার সময়এসে গেছে। তখন আল্লাহ তা'আলা ফেরেশতাদেরকে হুকুম করবেন যে, তোমরা বেহেশতবাসীদের সম্মুখ হতে পর্দা সরিয়ে নাও, কেননা এরা দুনিয়াতে আমাকে স্মরণ করেছে, আমার যিকর করেছে, আমাকে সিজদা করেছে এবং আমার সঙ্গে সাক্ষাত ও দীদারের আকাংখা পোষণ করেছে। 
আল্লাহ পাকের নির্দেশে ফেরেশতাগণ যখন পর্দা সরিয়ে নিবে, তখন বেহেশতবাসীরা স্বচক্ষেআল্লাহ তা'আলাকে প্রত্যক্ষ করবে এবং তার সম্মুখে সিজদায় পড়ে যাবে। এ সময় আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে সিজদা হতে মাথা উঠাতে হুকুম করে বলবেন যে, এটা আমল ও ইবাদতের স্থান নয় এটা ভোগ-বিলাস ও পুরস্কার প্রতিদানের স্থান। এরপর থেকে তারা আল্লাহ্ তাআলার দীদার স্বাভাবিক ভাবেই লাভ করতে সমর্থ হবে। অধিকন্তু আল্লাহ্ তা'আলা তাদের আনন্দবৃদ্ধির জন্য বলবেন, — “হে আমার প্রিয় বান্দাগণ ! তোমাদের উপর সালাম ও শান্তি বর্ষিত হোক, আমি তোমাদের প্রতি সন্তুষ্ট, তোমরাও আমার প্রতি সন্তুষ্ট থাক। বেহেশতবাসীগণ বলবে, — “ আমরা আপনার প্রতি অবশ্যই সন্তুষ্ট; কারণ আপনি আমাদেরকে এমন নেয়ামত দান করেছেন, যা কেউ কোনদিন দেখে নাই, শুনে নাই এবং কল্পনাও করতে পারে নাই"। যেমন আল্লাহ তা'আলা এ মর্মে ঘোষণা করেছেন, "আল্লাহ্ তা'আলা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট।" ( বাইয়িনাহ : ৮)  
"করুণাময় পালনকর্তার পক্ষ হতে তাদেরকে বলা হবে ‘ সালাম ' । (ইয়াসীন :  ৫৮)

পরবর্তী পর্ব—

খওফ ও খাশিয়াত বা খোদাভীতি (পর্ব 1)



খওফ ও খাশিয়াত বা খোদাভীতি (পর্ব 1) 
📚মুকাশাফাতুল-কুলুব ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন :  আল্লাহ তা'আলা একজন ফেরেশতা সৃষ্টি করেছেনযার বিরাটকায় দেহের এক বাহু দুনিয়ার পূর্বপ্রান্তে এবং অপর বাহু দুনিয়ার পশ্চিম প্রান্তে মাথা আরশের সন্নিকটে এবং পদদ্বয় যমীনের সপ্তম তবককেও অতিক্রম করেছে। তাকে সমগ্র জগতে বিস্তৃত সৃষ্টির সমপরিমাণ পর-পাখা দেওয়া হয়েছে। আমার উম্মতের মধ্যে কোন পুরুষ বা নারী যখন আমার প্রতি দরূদ পাঠ করেতখন আল্লাহ তাআলা সেই ফেরেশতাকে এই মর্মে নির্দেশ প্রদান করেন যেসে যেন আরশের নীচে অবস্থিত নূরের সাগরে ডুব দেয়।

আল্লাহ তাআলার নির্দেশ অনুযায়ী সে দরিয়াতে নিমজ্জিত হয়ে বাহির হয় এবং সর্ব শরীর ঝাড়া দেয় ফলে তার অসংখ্য পাখনাহতে অগণিত পানি বিন্দু ঝরে পড়ে। তখন আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর কুদরতের দ্বারা ফেরেশতার গা থেকে ঝরে পড়া প্রতিটি বিন্দু হতে এক একজন ফেরেশতা সৃষ্টি করেন। এই অসংখ্য  অগণিত ফোবশতা দরুদ পাঠকারী ব্যক্তির জন্য কিয়ামত পর্যন্ত গুনাহ মাফীর দো' করতে থাকে। 

জনৈক বুযুর্গ বলেছেন :– “দেহের স্বাস্থ্য নির্ভর করে অল্পাহারের উপর। আত্মার শান্তি নির্ভর করে পাপকার্য পরিত্যাগ করার উপরআর দ্বীন  ঈমানের সংরক্ষণ নির্ভর করে হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর প্রতি দরূদ পাঠের উপর। 
আল্লাহ্তা'আলা ইরশাদ করেছেন :– ‘ হে ঈমানদার ব্যক্তিগণ ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। অর্থাৎতোমাদের অন্তরে আল্লাহ তা'আলার ভয়-ভীতি জাগরুক করে তোল এবং পরিপূর্ণভাবে তার দাসত্ব  আনুগত্য অবলম্বন করে নাও। এবং প্রত্যেকের উচিতআগামী (কিয়ামতদিবসের জন্য সে কি (আমলপ্রেরণ করছেবা এর জন্য কি প্রস্তুতি নিচ্ছেসে বিষয়ে চিন্তাকরা। বস্তুতঃ  আয়াতে আল্লাহ্ তা'আলা এই মর্মে নির্দেশ প্রদান করছেন যেতোমরা দান-খয়রাত  ইবাদত-বন্দেগীতে আত্মনিয়োগ কর। যাতে এর প্রতিদানে কিয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে পুরস্কৃত হতে পার। - তোমরা সর্বদা আল্লাহকে ভয় করতে থাক। কারণ তিনি তোমাদের (প্রতিটি নেক আমল  অন্যায়কার্যকলাপ সম্পর্কে সম্যক পরিজ্ঞাত।(হাশর   ১৮
আদম সন্তান দুনিয়াতে কি কি সৎকাজ করেছে অথবা কি কি অপরাধ অসৎ কাজে লিপ্ত হয়েছে  আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করেছেকি নাফরমানী করেছেসেসম্পর্কে কিয়ামতের দিন ফেরেশতাকুলআসমান-যমীনদিবস-রজনী—  সবকিছু আল্লাহর সম্মুখে সাক্ষ্য প্রদান করবে। বরং সেদিন মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও মানুষের স্বার্থের বিপরীত সাক্ষ্য দিবে। মানুষ যদি সৎ  পুণ্যবান হয়তাহলে তার স্বপক্ষেই সাক্ষ্য প্রদান করবে। ঈমানদার  পরহেযগার ব্যক্তির স্বপক্ষে যমীন এই মর্মে সাক্ষ্য দান করবে যেইয়া আল্লাহ !  ব্যক্তি তোমাকে খুশী করার জন্য আমার পৃষ্ঠে নামায পড়েছেরোযা রেখেছেহজ্জ করেছেজিহাদ করেছে। উক্তরূপ সাক্ষ্য শ্রবণ করে ঈমানদার ব্যক্তি অত্যন্ত আনন্দিত ও পুলকিত হবে। পক্ষান্তরেযমীন কাফের  অবাধ্য ব্যক্তির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে যে, “হে আল্লাহ ব্যক্তি আমার পৃষ্ঠে বিচরণ করে শিরক করেছেব্যভিচার করেছেশরাব পান করেছে এবং অন্যান্য হারাম কার্যে লিপ্ত হয়েছে। ফলেবোজ হাশরের কঠিন হিসাবের সময় ধ্বংস  শাস্তি তাকে গ্রাস করে নিবে। বস্তুত প্রকৃত ঈমানদার সে-যে নিজের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দ্বারা আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করে এবং সদা শঙ্কিত থাকে। 
ফকীহ আবুল-লাইস (রহঃবলেছেন : ‘ কারও অন্তঃকরণে আল্লাহর ভয়-ভীতি আছে কি-না বিষয়ে তুমি যদি জানতে চাওতাহলে সাতটি আলামত  লক্ষণের প্রতি লক্ষ্য কর।
এগুলো যদি কারও আচার-ব্যবহারভাবভঙ্গি  জীবনধারায় পরিলক্ষিত হয়তা হলে বুঝেনাও যেতার মনের ভিতরে খোদা-ভীতি  পরহেযগারী বদ্ধমূল হয়েছে। তার অন্তর খোদা তা'আলার খওফ  খাশিয়াতে আবাদ হয়েছে। সেই লক্ষণগুলো হচ্ছে 
(১)  আলামতটি জিহবার সাথে সম্পর্কিত। অর্থাৎতার জিহ্বা মিথ্যাবানোয়াটগীবতচুগলিঅপবাদঅপ্রীতিকর কথাবার্তা  অহেতুক বাক্যালাপ হতে বিরত থাকবে এবং সর্বদা আল্লাহর যিকরকুরআন তিলাওয়াত  দ্বীনি ইলমের চর্চায় নিমগ্ন থাকবে। 
(২) দ্বিতীয় আলামত অন্তরের সাথে সম্পর্কিত। অর্থাৎ, —অন্যের প্রতি শত্রুতা পোষণ করাঅহেতুক কাউকে দোষারোপ করা এবং হিংসাবিদ্বেষ প্রভৃতি ব্যাধি হতে সে সম্পূর্ণ মুক্ত-পবিত্র থাকবে। হাদীস শরীফে আছে : "হিংসা নেক আমলকে এমনভাবে গ্রাস করে ফেলেযেমনঅগ্নি কাষ্ঠকে জ্বালিয়ে শেষ করে দেয়।”  কথা স্মরণ রাখতে হবে এবং সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে যেহিংসা বিদ্বেষ মানব হৃদয়ের একটি দুরারোগ্য ব্যাধি।  ধরণের আরও অসংখ্য ব্যাধি রয়েছে। এগুলো হতে নিষ্কৃতি পেতে হলে পরিপক্ক ইলম  সনিষ্ঠ আমলের একান্ত প্রয়োজন।বস্তুতঃ উক্তরূপ ইলম  আমলের সমন্বিত সাধনা  পরিশ্রমের মাধ্যমেই আধ্যাত্মিক ব্যাধিসমূহ থেকে আত্মরক্ষা করা অথবা এসব রোগের সুচিকিৎসা করা সম্ভব হতে পারে। 
(৩) তৃতীয় আলামত চক্ষু বা দৃষ্টির সাথে সম্পর্কিত। অর্থাৎখোদাভীরু  পরহেযগার ব্যক্তি স্বীয় দৃষ্টিকে হারাম খাদ্যদ্রব্যনিষিদ্ধ পানীয় বস্তুহারাম লেবাস -পোষাক থেকে হিফাযত করবে এবং পার্থিব বস্তুনিচয়ের প্রতি কখনও লোলুপ দৃষ্টি করবে না। বরং আল্লাহর অনুপম সৃষ্টি ও কুদরতের প্রতি দৃষ্টি করে শিক্ষা  সবক হাসিল করবে। হারাম  নিষিদ্ধ পদার্থের প্রতি মোটেও ভ্রুক্ষেপ করবে না। 
হুযুর আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন : “যে ব্যক্তি নিজের চক্ষুকে হারাম বস্তুর প্রতি দৃষ্টিপাতের দ্বারা পরিতৃপ্ত করবেকিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা সেই চক্ষুর ভিতরে দোযখের অগ্নি ভরে দিবেন। 
(৪) চতুর্থ আলামত উদরের সাথে সম্পর্কিত। অর্থাৎ, —পরহেযগার ব্যক্তি স্বীয় উদরকে হারাম পন্থায় উপার্জিত রিযিক হতে হিফাযত করবে। কেননা এহেন রিযিক ভক্ষণ করা স্বতঃসিদ্ধ মহাপাপ। হযরত নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন ‘ আদম সন্তানের উদরে যখন হারাম খাদ্যের কোন লুকমা পতিত হয়তখন যমিন আসমানের সকল ফেরেশতা  তার উপর লানত  আভিশাপ দিতে থাকে, যতক্ষণ পর্যন্ত এই লুকমা তারপেটে মওজুদ থাকে। আর যদি উক্ত লুকমা পেটে থাকা অবস্থায় সে মারা যায়তাহলে তার ঠিকানা হয় জাহান্নাম। 
(৫) পঞ্চম লক্ষণ হস্তের সাথে সম্পর্কিত। অর্থাৎ, —পরহেযগার ব্যক্তিরহাত কখনও হারাম  নিষিদ্ধ বস্তুর প্রতি প্রসারিত হবে না। বরং সাধ্যানুযায়ী সর্বদা সে স্বীয় হাতকে আল্লাহর দাসত্ব  আনুগত্যের কাজে ব্যবহার করবে। হযরত কা' আহবার (.) থেকে বর্ণিত আছে যেআল্লাহ্ তা'আলা বেহেশতে সবুজ ইয়াকুত রত্নের মহল তৈরী করেছেনপ্রত্যেক মহলে সত্তর হাজার কামরা আছে। আবার প্রত্যেক কামরায় সত্তর হাজার দরজা আছে। এই বেহেশতে  ব্যক্তিই প্রবেশ করতে পারবেযার সম্মুখে দুনিয়াতে হারাম বস্তু পেশকরা হয়েছে ; কিন্তু সে একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলার ভয়ে তা পরিত্যাগ করেছে। 
(৬) ষষ্ঠ আলামত পদদ্বয়ের সাথে সম্পর্কিত। অর্থাৎপরহেযগার ব্যক্তির পদদ্বয় আল্লাহ্ তা'আলার নাফরমানী  অবাধ্যতার কাজে ব্যবহার হবে না। বরং সর্বদা আল্লাহর আনুগত্য সন্তুষ্টির কাজে ব্যবহৃত হবে এবং উলামামাশায়েখ  আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের প্রতি বেগবান হবে। 
(৭) সপ্তম আলামত ইবাদত  রিয়াযত। অর্থাৎখালেস  নেক নিয়তে একমাত্র আল্লাহর জন্য ইবাদত-বন্দেগী  সাধনা-পরিশ্রমে নিমগ্ন থাকবে। বস্তুতঃ মানবের উচিত এটাই যেসর্ববিধ সাধনা  ইবাদতের মূলে একমাত্র সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্ রাব্বুল-আলামীনের রেযা  সন্তুষ্টিকেই সামনে রাখবে। এতে কোনরূপ রিয়াকারীলোকদেখানো মনোবৃত্তি  কপটতাকে প্রশ্রয় দিবে না। বিষয়ে সাফল্য অর্জন করতে পারলে সে ঐসব মহান  ভাগ্যবান লোকের অন্তর্ভুক্ত হবেযাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন :  "মুত্তাকীদের জন্য রয়েছে তোমার প্রতিপালকের নিকট আখেরাতের কল্যাণ।" (যুখরুফ ! ৩৫

অন্যত্র ইরশাদ করেছেন।"মুত্তাকীগণ থাকবে ঝর্ণাবহুল জান্নাতে" (হিজর : ৪৫ ) 

আরও ইরশাদ করেছেন: "মুত্তাকীগণ থাকবে জান্নাতে  ভোগ-বিলাসে" ( তুর :১৭ ) 

আরও ইরশাদ হয়েছে – "মুত্তাকীগণ থাকবে নিরাপদ স্থানে"(দুখান ! ৫২)

উপরোক্ত আয়াতসমূহে আল্লাহ্ তাআলা প্রকারান্তরে  ঘোষণাই করেছেন যেকিয়ামতের দিবসে দোযখের অগ্নি হতে তারা অবশ্যই মুক্তি পাবে। ঈমানদার ব্যক্তি উচিতযেন সে ভয় ও আশার মধ্যবর্তী স্থানে স্থিত থাকে। কেননাএরূপ ব্যক্তিই কেবল আল্লাহ তাআলার রহমত অনুগ্রহের আশা করতে পারে এবং তার নিকট ক্ষমাপ্রাপ্তির বিষয়ে নিরাশ  হয় না। 
আল্লাহ তা'আলা বলেন– “তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ হতে নিরাশ হয়ো না" (যুমার : ৫৩
অতএবতোমার কর্তব্য হচ্ছে - তুমি একান্তভাবে আল্লাহর দাসত্ব  ইবাদত-বন্দেগীতে মগ্নহয়ে যাওসকল অসৎ  গর্হিত কার্য পরিহার করে এক আল্লাহর প্রতি ধাবিত হও এবং সর্বান্তকরণে  পরিপূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ কর।

একদা হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম নিজ গৃহে বসে পবিত্র যবুর কিতাব তিলাওয়াত করছিলেন। এমন সময় একটি গর্ত হতে লাল বর্ণের একটি কীট বের হয়। হযরত দাউদ(.)-এর দৃষ্টি সেই কীটের উপর পতিত হলে তার মনে প্রশ্নের উদ্রেক হয় যেআল্লাহ তা'আলা এই কীটটিকে কি উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন ; এর রহস্য  তাৎপর্য কি
তখন আল্লাহ্ তাআলা সেই কীটটিকে বাকশক্তি দান করে নবীর প্রশ্নের জওয়াব দিতে আদেশ করলেন।
কীটটি বললো হে আল্লাহর নবী ! আল্লাহ তাআলা আমার অন্তরকে এভাবে সৃষ্টি করেছেন যেআমি প্রত্যহ দিবসে এক হাজার বার এই কালেমা পাঠ করি "ছোবহানাল্লাহ্ ওয়ালহামদুলিল্লাহ্ ওয়ালা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার এবং প্রত্যহ রাত্রিকালে আমি এই দরূদ পড়ে থাকি : “আল্লাহুম্মা সল্লিআলা মুহাম্মাদীন্ নাবিয়্যিল উম্মীয়ি ওয়াআলা আলিহী ওয়া সহাবিহী ওয়াসাল্লিম

হে আল্লাহর নবী। এখন বলুনআপনি আমার সম্পর্কে কি মন্তব্য করছেন ; আমি আপনার দ্বারা উপকৃত হতে চাই। কীটের মুখে একথা শুনে হযরত দাউদ (.) অনুশোচনায় ভেঙ্গে পড়লেন এবং ভীত-শঙ্কিত হয়ে তওবা করে নিজেকে আল্লাহর সোপর্দ করলেন। 

হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম যখন স্বীয় পদম্খলনের কথা স্মরণ করতেনতখন সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়তেন এবং দূর হতে তাঁর বুকের ধড়ফড় আওয়ায শুনা যেতো 
এমনি এক অবস্থার সময় একদা আল্লাহ্ তাআলা হযরত জিবরাঈল (.)-কে প্রেরণ করলেন। তিনি হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে বললেন, –মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ্ তা'আলা আপনাকে সালাম জানিয়েছেন এবং জিজ্ঞাসা করেছেন যেআপনি কি এমন কোন লোক দেখেছেনযে তার বন্ধুকে ভয় করে
হযরত ইবরাহীম (আ.বললেন, — “হে জিবরাঈল। আমার পদম্খলনের কথা যখন স্মরণ হয়তখন শেষ পরিণামের কথা চিন্তাকরে আমি বিহ্বল হয়ে পড়ি ; আল্লাহর সাথে গভীর বন্ধুত্বের কথা তখন আমার স্মরণ থাকেনা। 
প্রিয় সাধক আল্লাহর একান্ত প্রিয় বান্দা আম্বিয়ায়ে কেরামআওলিয়ায়ে সালেহীন ও দুনিয়াত্যাগী যাহেদীনের অবস্থা যদি এই হয়তাহলে অন্যান্যদের দশা কি হবেচিন্তা করাউচিত এবং  থেকে প্রচুর শিক্ষা  সবক হাসিল করা উচিত।

পরবর্তী পর্ব 

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...