মানব সমাজের বিভিন্ন সংগঠন -৩
পারিবারিক ব্যবস্থা
এটা এমন বিদ্যা যাতে ব্যক্তি দ্বিতীয় ধাপে পৌঁছে একই ঘরে বাসিন্দা হিসেবে সম্পর্ক সংস্থাপন ও সংরক্ষণের পদ্ধতি পরিজ্ঞাত হয়। এ সম্পর্ক চার ভাগে বিভক্ত। এক, দাম্পত্য সম্পর্ক। দুই, পিতা-মাতা ও সন্তানের সম্পর্ক। তিন, গৃহকর্তা ও অধীনস্থদের সম্পর্ক। চার, সকলের পারস্পরিক সম্পর্ক ও সাহচর্য।
এটা এমন বিদ্যা যাতে ব্যক্তি দ্বিতীয় ধাপে পৌঁছে একই ঘরে বাসিন্দা হিসেবে সম্পর্ক সংস্থাপন ও সংরক্ষণের পদ্ধতি পরিজ্ঞাত হয়। এ সম্পর্ক চার ভাগে বিভক্ত। এক, দাম্পত্য সম্পর্ক। দুই, পিতা-মাতা ও সন্তানের সম্পর্ক। তিন, গৃহকর্তা ও অধীনস্থদের সম্পর্ক। চার, সকলের পারস্পরিক সম্পর্ক ও সাহচর্য।
পরিবারের মূল ভিত্তি রচিত হয় যৌন প্রয়োজনে নারী ও পুরুষের সম্পর্ক ও সাহচর্যের মাধ্যমে। উভয়ের সম্পর্ক নিবিড়তর হয় এবং পারস্পরিক সহায়তার দ্বার উন্মুক্ত হয়। নারী সন্তানাদি প্রতিপালনের ক্ষেত্রে প্রকৃতিগত ভাবেই অধিকতর দক্ষ এ ব্যাপারে বিভিন্ন কলা-কৌশলের অধিকারিণী। এ কারণে অন্যান্য ক্ষেত্রে তার জ্ঞান-বুদ্ধি নগণ্য থাকে। দৈহিক কোমলতার জন্য কঠিন কাজ এড়িয়ে চলে। সে অধিকতর লজ্জাশীল হয়। ফলে স্বভাবতঃই ঘরকুনো হয়। ঘরের ছোট-খান ও খুঁটিনাটি কাজেই সে গলদঘর্ম হয়। সাধারণতঃ পুরুষের অনুগত হয়।
পক্ষান্তরে পুরুষের বৃহত্তর ক্ষেত্রে ব্যাপক কাজের প্রয়োজনে প্রকৃতিগত ভাবে তারা নারীর তুলনায় জ্ঞানী, আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন, সাহসী, সৌজন্য বোধের অধিকারী, শক্তিশালী ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী হয়ে থাকে। পুরুষের জীবনে নারীর প্রয়োজন রয়েছে। পুরুষের আত্মমর্যাদাবোধ ও কষ্ট স্বীকারের দাবী এটাই যে, কোন এক নারী নির্দিষ্টভাবে তারই সহচরী হিসেবে সাক্ষীদের সামনে নির্ধারিত হয়ে থাকবে।
তেমনি নারীর প্রতি পুরুষের আকর্ষণ ও নির্ভরতা দাবী করে যে, পুরুষ নারীর জন্য মহরানা দেবে, প্রস্তাব পাঠাবে ও অভিভাবকদের মাধ্যমে নারীর সম্মতি নেবে। অভিভাবকরা নারীর জন্য মাহরাম হওয়ায় এটা সম্ভব হবে। পক্ষান্তরে নারীর অভিভাবক যদি নারীর গায়ের-মাহরম হত তাহলে নারীর জন্য তা ক্ষতিকর হত। সে ক্ষেত্রে অভিভাবক নারীর অভিপ্রেত পুরুষ থেকে তাকে জোর করে ফিরিয়ে রাখত। তাছাড়া তখন নারীর অধিকার আদায় করে দেয়ার কেউ থাকত না। ফলে অধিকার বঞ্চিতা নারীর জীবন দুর্বিষহ হয়ে যেত। পরন্তু পারস্পরিক দাবী-দাওয়ার কলহে রক্তের সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যেত। তেমনি মার্জিত রুচির দাবী এটাই যে, পুরুষ তার গর্ভধারিণীর কিংবা ঔরসজাত নারীর অথবা এই ঔরসে জন্মগ্রহণ কারিণীর সাথে যৌন সম্পর্কের অভিলাষী হতে পারে না।
তারপর বিয়ের আলোচনায় যদিও মানবিক লজ্জা-শরম পারস্পরিক যৌন সম্পর্কের কথা উল্লেখ করতে দেয় না, তথাপি সেটাই যে এর আসল উদ্দেশ্য তা সকলের কাছে সুস্পষ্ট থাকে। ঘর সাজিয়ে, মাইক বাজিয়ে যেভাবে তার জোর প্রচার করা হয়, তাতে লোকদের ওলিমা না খাইয়ে উপায় থাকে না। মোটকথা এ ক্ষেত্রে অনেক পদ্ধতি অনুসৃত হয়। তার কিছু অংশ এখানে উল্লেখ করলাম। আর অবশিষ্টগুলো বুঝে নেয়ার জন্য রেখে দিলাম।
বস্তুতঃ বিয়ের জন্য জরুরী হল গায়ের-মাহরমের সাথে বিয়ে হবে, মজলিস অনুষ্ঠিত হবে, প্রস্তাব অনুমোদন হবে, অভিভাবকগণ নিঃস্বার্থ অভিভাকত্বের দায়িত্ব পালন করবে, কুফু রক্ষিত হবে, ওলিমা করা হবে, স্বামী সর্বদা স্ত্রীর জিম্মাদার হবে ও তার খাওয়া-পরার ব্যবস্থা করবে, স্ত্রী সর্বদা স্বামীর ঘর সংসারের কাজে নিয়োজিত থাকবে, সন্তানাদি লালন-পালন করবে ও স্বামীর অনুগত হয়ে থাকবে। গোটা মানব সমাজে এগুলোই বিয়ের অপরিহার্য শর্ত ও স্বতঃসিদ্ধ রীতি-নীতি। আল্লাহ তাআলা মানুষকে যে স্বভাব দিয়ে তৈরী করেছেন এগুলো তারই স্বাভাবিক দাবী। তাই আরব-আজমের কোথাও এর ব্যতিক্রম দেখা যায় না।
এভাবে যখন দুজন এক হয়ে যায় এবং একে অপরের ভাল-মন্দের সাথে জড়িয়ে যায় ও পরস্পর অবিচ্ছেদ্য সহযোগী হয়ে দাঁড়ায়, তখন বুঝা যায় যে, উভয়ই মনে-প্রাণে এ বিয়ে মেনে নিয়েছে। পক্ষান্তরে যদি এর বিপরীত দেখা দেয়, তখন তা থেকে মুক্তি লাভের পন্থাও অপরিহার্য হয়ে দেখা দেয়। অবশ্য তালাক ব্যবস্থা সকল বৈধ কাজের ভেতর সবচেয়ে অপ্রিয় কাজ। তাই তালাকের শর্ত রাখা হয়েছে এবং পরে ইদ্দত পালনের ব্যবস্থা অপরিহার্য করা হয়েছে। একই কারণে স্বামীর মৃত্যুর পরে ইদ্দত পালন শর্ত করা হয়েছে যেন বিয়ের গুরুত্ব ও মর্যাদা অন্তরে অবশিষ্ট থাকে, তাছাড়া বংশ ধারার সংমিশ্রণের আশংকাও যেন তিরোহিত হয়।
পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের মুখাপেক্ষিতা ও সন্তানের প্রতি মাতা-পিতার বাৎসল্যের দাবী এটাই যে, তারা তাদের এমন তালীম-তরবিয়ত দেবে, যা হবে সর্বতোভাবে প্রকৃতি সম্মত। সন্তান বয়স্ক ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত মাতা-পিতার অভিভাবকত্বের দায়িত্ব অব্যাহত থাকবে। তাঁদের পুণ্য চরিত্রের সাহচর্য সন্তানদেরও পুণ্য চরিত্রের অধিকারী করবে। সন্তানের শিক্ষা-দীক্ষায় মাতা-পিতার শ্রম ও ত্যাগস্বীকার ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। এসব কারণেই মা-বাপের সঙ্গে সুসম্পর্ক ও সদাচরণ সন্তানদের জন্য অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়।
আদম সন্তানদের মেধা ও যোগ্যতার যেহেতু প্রকৃতিগত তারতম্য থেকে যায়, তাই তাদের কেউবা নেতা হয়, মনীষী হয়, বিত্তশালী হয়, এমনকি তার ভেতরে প্রকৃতিগতভাবেই সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক যোগ্যতা এবং জনকল্যাণের প্রবণতা দেখা দেয়। পক্ষান্তরে কেউ আবার প্রকৃতিগতভাবেই ভৃত্য, নির্বোধ, অনুগত ও অন্ধ অনুসারী হয়ে থাকে। এ দু’ব্যক্তির জীবন স্বভাবতঃই পরস্পর নির্ভরশীল ও একে অপরের সম্পূরক। এ দু’জন তখনই একে অপরের সুখ-দুঃখের অংশীদার হবে, যখন দু’জনের পারস্পরিক সম্পর্ককে অন্তরে স্থায়ীভাবে ঠাঁই দেবে।
মানুষের ভেতর আরেকটি সম্পর্ক শাসক ও শাসিতের। তখন শাসক শাসিতের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব বহন করে। মালিক ও গোলাম, প্রভু ও ভৃত্য কিংবা রাজা ও প্রজার সম্পর্কটা এই স্তরের। মানব সমাজে এ ব্যবস্থাটাও চালু রাখা হয়েছে। এই শাসক ও শাসিতের সম্পর্কের একটা বিধি-বিধান থাকা অপরিহার্য। সে বিধানের অনুসরণ উভয়ের জন্য জরুরী হবে ও ব্যত্যয় ঘটা নিন্দনীয় অপরাধ বলে গণ্য হবে। তেমনি মালিক ও গোলামের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গোলামের মুক্তির কোন শর্ত বা বিধান থাকা চাই, হোক সে টাকা দিয়ে কিংবা অন্য কোন উপায়ে যেন মুক্তি পেতে পারে।
তারপর অনেক সময় আবার মানুষ বিভিন্ন প্রয়োজনের শিকার হয়, রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পড়ে, অচলাবস্থার মুখোমুখি হয়। এক কথায় এমন সব অবস্থার সৃষ্টি হয়, যাতে করে অন্য মানুষের সহায়তা ছাড়া তার চলাই অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এ সব সমস্যা সৃষ্টির ব্যাপারে সব মানুষই সমান। মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ও সম্প্রীতি বজায় রাখা অপরিহার্য হয়। এ কারণেই অভাবী মানুষের সমস্যার সমাধান ও উৎপীড়িতদের উৎপীড়ন রোধের জন্য বিশেষ রীতি-নীতি ও বিধি-বিধান অত্যাবশ্যক। সে বিধান অবশ্য পাল্য হতে হবে এবং তা বর্জনকারী নিন্দনীয় ও তিরস্কৃত হবে। মানবিক প্রয়োজনের এই সমস্যার সমাধানের জন্য দুটো দিক প্রয়োজন। এক দিকে প্রত্যেকে অপরের লাভ-লোকসান ও ভাল-মন্দকে নিজের লাভ-লোকসান ও ভাল-মন্দবলে বিবেচনা করবে। অপর দিকে প্রত্যেকে অপরের জন্য নিজের যথাসাধ্য শক্তি-সামর্থ্য ব্যয় করবে, এমনকি নিজের আয় ও সম্পদের অধিকার দান করবে।
সারকথা, পারস্পরিক সহযোগিতার এ সম্পর্কের ক্ষেত্রে সাহায্যদাতা ও সাহায্য গ্রহীতা উভয়ের সহায়তা প্রয়োজন। দাতা যেন তার ক্ষতি স্বীকারের যথাযথ বিনিময় পেয়ে যেতে পারে। দান ও সহায়তার ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য দাবী হল নিকটাত্মীয়ের। কারণ তাদের সাথে নৈকট্য ও সম্প্রীতি সম্পর্কটা সহজাত ও প্রকৃতিগত। দ্বিতীয় ধাপটি সাধারণ মানুষের। স্বভাবতঃই প্রথম ধাপের চেয়ে এর গুরুত্ব অপেক্ষাকৃত কম। তবে বিপদগ্রস্তদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া মানুষের একটি স্বীকৃত রীতি হয়ে গেছে। অবশ্য আত্মীয়ের খবরদারী করার ব্যাপারটা সব চাইতে মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত।
মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল পারিবারিক তথা দাম্পত্য সম্পর্কের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে অবহিত হওয়া। যেমন, বিয়ে ও বিচ্ছেদের শর্ত ও কারণসমূহ জ্ঞাত হওয়া, পুরুষ ও স্ত্রীর প্রয়োজনীয় গুণাবলী জানা, পারস্পরিক সু-সম্পর্ক ও হৃদ্যতা সৃষ্টির পদ্ধতি বিদিত হওয়া, স্ত্রীর ইজ্জত-আবরু রক্ষার ক্ষেত্রে পুরুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কিত জ্ঞান অর্জন করা, নিজের পবিত্রতা রক্ষা ও স্বামীর আনুগত্যের মাধ্যমে স্ত্রী সংসারের কতখানি দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করবে তা জ্ঞাত হওয়া, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার সৃষ্ট অসন্তোষ ও বিরাগের অবসান ঘটানোর উপায় অবহিত হওয়া, তালাকের পন্থা এবং স্বামী বিয়োগের শোক পালনের উপায় সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখা ইত্যাদি।
তাছাড়া মা-বাপের সাথে কিভাবে সুসম্পর্ক রাখা যায়, ভৃত্য ও কর্মচারীর সাথে কিরূপে সদ্ভাব রাখতে হয়, ভৃত্যরা কিভাবে মালিকের যথার্থ সেবা করতে পারে, গোলাম কি করে প্রভুর কাছে থেকে মুক্তি পাবে, আত্মীয়, পাড়া-পড়শীর সাথে কি ধরনের আচার-আচরণ করতে হবে, অসহায় নাগরিকদের কিরূপ সহানুভূতি দেখাতে হবে, আর তাদের বিপদ মুক্তির জন্য কি কি চেষ্টা করতে হবে, জাতীয় নায়কদের আচার-আচরণ কেমন হবে, আর তারা কিভাবে জাতিকে পরিচালনা করবে, কি ভাবে মীরাছ বণ্টন হবে, কি ভাবেই বা বংশধারা সংরক্ষিত হবে, তা সবই অবগত হওয়া অপরিহার্য।
এ কারণেই মানব জাতির ভেতর এমন কোন সম্প্রদায় বা গোষ্ঠী মিলবে না, যারা উপরোক্ত ব্যাপারসমূহের নির্ধারিত রীতিনীতি অনুসরণ করে চলে না। অথচ তারা বিভিন্ন জাতি আর বিভিন্ন দেশের লোক।
পরবর্তী পর্ব
মানব সমাজের বিভিন্ন সংগঠন - ৪
অর্থনৈতিক ব্যবস্থা
অর্থনৈতিক ব্যবস্থা



