মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর, ২০২৪

হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ ( ২১) পারিবারিক ব্যবস্থা



মানব সমাজের বিভিন্ন সংগঠন -৩

📚 হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (পর্ব- ২১)
✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)

পারিবারিক ব্যবস্থা 
এটা এমন বিদ্যা যাতে ব্যক্তি দ্বিতীয় ধাপে পৌঁছে একই ঘরে বাসিন্দা হিসেবে সম্পর্ক সংস্থাপন ও সংরক্ষণের পদ্ধতি পরিজ্ঞাত হয়। এ সম্পর্ক চার ভাগে বিভক্ত। একদাম্পত্য সম্পর্ক। দুইপিতা-মাতা ও সন্তানের সম্পর্ক। তিনগৃহকর্তা ও অধীনস্থদের সম্পর্ক। চারসকলের পারস্পরিক সম্পর্ক ও সাহচর্য। 

পরিবারের মূল ভিত্তি রচিত হয় যৌন প্রয়োজনে নারী ও পুরুষের সম্পর্ক ও সাহচর্যের মাধ্যমে। উভয়ের সম্পর্ক নিবিড়তর হয় এবং পারস্পরিক সহায়তার দ্বার উন্মুক্ত হয়। নারী সন্তানাদি প্রতিপালনের ক্ষেত্রে প্রকৃতিগত ভাবেই অধিকতর দক্ষ এ ব্যাপারে বিভিন্ন কলা-কৌশলের অধিকারিণী। এ কারণে অন্যান্য ক্ষেত্রে তার জ্ঞান-বুদ্ধি নগণ্য থাকে। দৈহিক কোমলতার জন্য কঠিন কাজ এড়িয়ে চলে। সে অধিকতর লজ্জাশীল হয়। ফলে স্বভাবতঃই ঘরকুনো হয়। ঘরের ছোট-খান ও খুঁটিনাটি কাজেই সে গলদঘর্ম হয়। সাধারণতঃ পুরুষের অনুগত হয়। 
পক্ষান্তরে পুরুষের বৃহত্তর ক্ষেত্রে ব্যাপক কাজের প্রয়োজনে প্রকৃতিগত ভাবে তারা নারীর তুলনায় জ্ঞানীআত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্নসাহসীসৌজন্য বোধের অধিকারীশক্তিশালী ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী হয়ে থাকে। পুরুষের জীবনে নারীর প্রয়োজন রয়েছে। পুরুষের আত্মমর্যাদাবোধ ও কষ্ট স্বীকারের দাবী এটাই যেকোন এক নারী নির্দিষ্টভাবে তারই সহচরী হিসেবে সাক্ষীদের সামনে নির্ধারিত হয়ে থাকবে। 
তেমনি নারীর প্রতি পুরুষের আকর্ষণ ও নির্ভরতা দাবী করে যেপুরুষ নারীর জন্য মহরানা দেবেপ্রস্তাব পাঠাবে ও অভিভাবকদের মাধ্যমে নারীর সম্মতি নেবে। অভিভাবকরা নারীর জন্য মাহরাম হওয়ায় এটা সম্ভব হবে। পক্ষান্তরে নারীর অভিভাবক যদি নারীর গায়ের-মাহরম হত তাহলে নারীর জন্য তা ক্ষতিকর হত। সে ক্ষেত্রে অভিভাবক নারীর অভিপ্রেত পুরুষ থেকে তাকে জোর করে ফিরিয়ে রাখত। তাছাড়া তখন নারীর অধিকার আদায় করে দেয়ার কেউ থাকত না। ফলে অধিকার বঞ্চিতা নারীর জীবন দুর্বিষহ হয়ে যেত। পরন্তু পারস্পরিক দাবী-দাওয়ার কলহে রক্তের সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যেত। তেমনি মার্জিত রুচির দাবী এটাই যেপুরুষ তার গর্ভধারিণীর কিংবা ঔরসজাত নারীর অথবা এই ঔরসে জন্মগ্রহণ কারিণীর সাথে যৌন সম্পর্কের অভিলাষী হতে পারে না। 
তারপর বিয়ের আলোচনায় যদিও মানবিক লজ্জা-শরম পারস্পরিক যৌন সম্পর্কের কথা উল্লেখ করতে দেয় নাতথাপি সেটাই যে এর আসল উদ্দেশ্য তা সকলের কাছে সুস্পষ্ট থাকে। ঘর সাজিয়েমাইক বাজিয়ে যেভাবে তার জোর প্রচার করা হয়তাতে লোকদের ওলিমা না খাইয়ে উপায় থাকে না। মোটকথা এ ক্ষেত্রে অনেক পদ্ধতি অনুসৃত হয়। তার কিছু অংশ এখানে উল্লেখ করলাম। আর অবশিষ্টগুলো বুঝে নেয়ার জন্য রেখে দিলাম। 
বস্তুতঃ বিয়ের জন্য জরুরী হল গায়ের-মাহরমের সাথে বিয়ে হবেমজলিস অনুষ্ঠিত হবেপ্রস্তাব অনুমোদন হবেঅভিভাবকগণ নিঃস্বার্থ অভিভাকত্বের দায়িত্ব পালন করবেকুফু রক্ষিত হবেওলিমা করা হবেস্বামী সর্বদা স্ত্রীর জিম্মাদার হবে ও তার খাওয়া-পরার ব্যবস্থা করবেস্ত্রী সর্বদা স্বামীর ঘর সংসারের কাজে নিয়োজিত থাকবেসন্তানাদি লালন-পালন করবে ও স্বামীর অনুগত হয়ে থাকবে। গোটা মানব সমাজে এগুলোই বিয়ের অপরিহার্য শর্ত ও স্বতঃসিদ্ধ রীতি-নীতি। আল্লাহ তাআলা মানুষকে যে স্বভাব দিয়ে তৈরী করেছেন এগুলো তারই স্বাভাবিক দাবী। তাই আরব-আজমের কোথাও এর ব্যতিক্রম দেখা যায় না। 
এভাবে যখন দুজন এক হয়ে যায় এবং একে অপরের ভাল-মন্দের সাথে জড়িয়ে যায় ও পরস্পর অবিচ্ছেদ্য সহযোগী হয়ে দাঁড়ায়তখন বুঝা যায় যেউভয়ই মনে-প্রাণে এ বিয়ে মেনে নিয়েছে। পক্ষান্তরে যদি এর বিপরীত দেখা দেয়তখন তা থেকে মুক্তি লাভের পন্থাও অপরিহার্য হয়ে দেখা দেয়। অবশ্য তালাক ব্যবস্থা সকল বৈধ কাজের ভেতর সবচেয়ে অপ্রিয় কাজ। তাই তালাকের শর্ত রাখা হয়েছে এবং পরে ইদ্দত পালনের ব্যবস্থা অপরিহার্য করা হয়েছে। একই কারণে স্বামীর মৃত্যুর পরে ইদ্দত পালন শর্ত করা হয়েছে যেন বিয়ের গুরুত্ব ও মর্যাদা অন্তরে অবশিষ্ট থাকেতাছাড়া বংশ ধারার সংমিশ্রণের আশংকাও যেন তিরোহিত হয়। 
পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের মুখাপেক্ষিতা ও সন্তানের প্রতি মাতা-পিতার বাৎসল্যের দাবী এটাই যেতারা তাদের এমন তালীম-তরবিয়ত দেবেযা হবে সর্বতোভাবে প্রকৃতি সম্মত। সন্তান বয়স্ক ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত মাতা-পিতার অভিভাবকত্বের দায়িত্ব অব্যাহত থাকবে। তাঁদের পুণ্য চরিত্রের সাহচর্য সন্তানদেরও পুণ্য চরিত্রের অধিকারী করবে। সন্তানের শিক্ষা-দীক্ষায় মাতা-পিতার শ্রম ও ত্যাগস্বীকার ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। এসব কারণেই মা-বাপের সঙ্গে সুসম্পর্ক ও সদাচরণ সন্তানদের জন্য অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়। 
আদম সন্তানদের মেধা ও যোগ্যতার যেহেতু প্রকৃতিগত তারতম্য থেকে যায়তাই তাদের কেউবা নেতা হয়মনীষী হয়বিত্তশালী হয়এমনকি তার ভেতরে প্রকৃতিগতভাবেই সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক যোগ্যতা এবং জনকল্যাণের প্রবণতা দেখা দেয়। পক্ষান্তরে কেউ আবার প্রকৃতিগতভাবেই ভৃত্যনির্বোধঅনুগত ও অন্ধ অনুসারী হয়ে থাকে। এ দুব্যক্তির জীবন স্বভাবতঃই পরস্পর নির্ভরশীল ও একে অপরের সম্পূরক। এ দুজন তখনই একে অপরের সুখ-দুঃখের অংশীদার হবেযখন দুজনের পারস্পরিক সম্পর্ককে অন্তরে স্থায়ীভাবে ঠাঁই দেবে। 
মানুষের ভেতর আরেকটি সম্পর্ক শাসক ও শাসিতের। তখন শাসক শাসিতের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব বহন করে। মালিক ও গোলামপ্রভু ও ভৃত্য কিংবা রাজা ও প্রজার সম্পর্কটা এই স্তরের। মানব সমাজে এ ব্যবস্থাটাও চালু রাখা হয়েছে। এই শাসক ও শাসিতের সম্পর্কের একটা বিধি-বিধান থাকা অপরিহার্য। সে বিধানের অনুসরণ উভয়ের জন্য জরুরী হবে ও ব্যত্যয় ঘটা নিন্দনীয় অপরাধ বলে গণ্য হবে। তেমনি মালিক ও গোলামের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গোলামের মুক্তির কোন শর্ত বা বিধান থাকা চাইহোক সে টাকা দিয়ে কিংবা অন্য কোন উপায়ে যেন মুক্তি পেতে পারে। 
তারপর অনেক সময় আবার মানুষ বিভিন্ন প্রয়োজনের শিকার হয়রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পড়েঅচলাবস্থার মুখোমুখি হয়। এক কথায় এমন সব অবস্থার সৃষ্টি হয়যাতে করে অন্য মানুষের সহায়তা ছাড়া তার চলাই অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এ সব সমস্যা সৃষ্টির ব্যাপারে সব মানুষই সমান। মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ও সম্প্রীতি বজায় রাখা অপরিহার্য হয়। এ কারণেই অভাবী মানুষের সমস্যার সমাধান ও উৎপীড়িতদের উৎপীড়ন রোধের জন্য বিশেষ রীতি-নীতি ও বিধি-বিধান অত্যাবশ্যক। সে বিধান অবশ্য পাল্য হতে হবে এবং তা বর্জনকারী নিন্দনীয় ও তিরস্কৃত হবে। মানবিক প্রয়োজনের এই সমস্যার সমাধানের জন্য দুটো দিক প্রয়োজন। এক দিকে প্রত্যেকে অপরের লাভ-লোকসান ও ভাল-মন্দকে নিজের লাভ-লোকসান ও ভাল-মন্দবলে বিবেচনা করবে। অপর দিকে প্রত্যেকে অপরের জন্য নিজের যথাসাধ্য শক্তি-সামর্থ্য ব্যয় করবেএমনকি নিজের আয় ও সম্পদের অধিকার দান করবে। 
সারকথাপারস্পরিক সহযোগিতার এ সম্পর্কের ক্ষেত্রে সাহায্যদাতা ও সাহায্য গ্রহীতা উভয়ের সহায়তা প্রয়োজন। দাতা যেন তার ক্ষতি স্বীকারের যথাযথ বিনিময় পেয়ে যেতে পারে। দান ও সহায়তার ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য দাবী হল নিকটাত্মীয়ের। কারণ তাদের সাথে নৈকট্য ও সম্প্রীতি সম্পর্কটা সহজাত ও প্রকৃতিগত। দ্বিতীয় ধাপটি সাধারণ মানুষের। স্বভাবতঃই প্রথম ধাপের চেয়ে এর গুরুত্ব অপেক্ষাকৃত কম। তবে বিপদগ্রস্তদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া মানুষের একটি স্বীকৃত রীতি হয়ে গেছে। অবশ্য আত্মীয়ের খবরদারী করার ব্যাপারটা সব চাইতে মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। 
মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল পারিবারিক তথা দাম্পত্য সম্পর্কের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে অবহিত হওয়া। যেমনবিয়ে ও বিচ্ছেদের শর্ত ও কারণসমূহ জ্ঞাত হওয়াপুরুষ ও স্ত্রীর প্রয়োজনীয় গুণাবলী জানাপারস্পরিক সু-সম্পর্ক ও হৃদ্যতা সৃষ্টির পদ্ধতি বিদিত হওয়াস্ত্রীর ইজ্জত-আবরু রক্ষার ক্ষেত্রে পুরুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কিত জ্ঞান অর্জন করানিজের পবিত্রতা রক্ষা ও স্বামীর আনুগত্যের মাধ্যমে স্ত্রী সংসারের কতখানি দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করবে তা জ্ঞাত হওয়াস্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার সৃষ্ট অসন্তোষ ও বিরাগের অবসান ঘটানোর উপায় অবহিত হওয়াতালাকের পন্থা এবং স্বামী বিয়োগের শোক পালনের উপায় সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখা ইত্যাদি। 
তাছাড়া মা-বাপের সাথে কিভাবে সুসম্পর্ক রাখা যায়ভৃত্য ও কর্মচারীর সাথে কিরূপে সদ্ভাব রাখতে হয়ভৃত্যরা কিভাবে মালিকের যথার্থ সেবা করতে পারেগোলাম কি করে প্রভুর কাছে থেকে মুক্তি পাবেআত্মীয়পাড়া-পড়শীর সাথে কি ধরনের আচার-আচরণ করতে হবেঅসহায় নাগরিকদের কিরূপ সহানুভূতি দেখাতে হবেআর তাদের বিপদ মুক্তির জন্য কি কি চেষ্টা করতে হবেজাতীয় নায়কদের আচার-আচরণ কেমন হবেআর তারা কিভাবে জাতিকে পরিচালনা করবেকি ভাবে মীরাছ বণ্টন হবেকি ভাবেই বা বংশধারা সংরক্ষিত হবেতা সবই অবগত হওয়া অপরিহার্য। 
এ কারণেই মানব জাতির ভেতর এমন কোন সম্প্রদায় বা গোষ্ঠী মিলবে নাযারা উপরোক্ত ব্যাপারসমূহের নির্ধারিত রীতিনীতি অনুসরণ করে চলে না। অথচ তারা বিভিন্ন জাতি আর বিভিন্ন দেশের লোক।

পরবর্তী পর্ব 
মানব সমাজের বিভিন্ন সংগঠন - ৪
অর্থনৈতিক ব্যবস্থা 

হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (২০) জীবিকা-পদ্ধতি



মানব সমাজের বিভিন্ন সংগঠন -৩

📚 হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (পর্ব- ২০)
✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)

জীবিকা-পদ্ধতি 
জীবিকা-পদ্ধতির বিষয়টি এমন বিদ্যা যা জীবন ধারার দ্বিতীয় রূপ রেখায় বর্ণিত হয়েছে। তার সারকথা এইপ্রথম পর্যায়ের জীবন ধারার প্রয়াসগুলোকে সঠিক অভিজ্ঞতার কষ্টি পাথরে যাচাই করে বিশেষ রূপ দান। সেগুলো একদিকে যেমন ক্ষতিমুক্ত হবেঅন্যদিকে হবে কল্যাণকর। যা কিছু ক্ষতিকর বা কল্যাণমুক্ত প্রমাণিত হয়েছে তা বর্জন করা হবে। তা ছাড়া প্রথম পর্যায়ের পদ্ধতিগুলো সে সব চারিত্রিক মানদণ্ডে যাচাই করা প্রয়োজনযা পূর্ণাঙ্গ ও সুস্থ স্বভাবের মানুষের প্রকৃতিতে জন্মগত ভাবেই সুরক্ষিত রয়েছে। সে সব পূর্ণাঙ্গ চরিত্রের অনুকূল ও আকাঙ্ক্ষিত রূপ রেখাই হবে সঠিক জীবিকা-পদ্ধতি। সেটাই গ্রহণ করে অন্যগুলো বর্জন করা উচিত। তারপর সে রীতিগুলোকে সর্বসাধারণের ভেতর উত্তম সংসর্গ ও সুন্দর আদান-প্রদানের মানদণ্ডে উতরে নিতে হবে। এভাবে সেগুলোর নির্ভুলতা সম্পর্কে অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে হবে। সাধারণ সংস্কারের জন্য সর্বসম্মত অভিমতের আলোকে তা করতে হবে। 
জীবিকা ও জীবন পদ্ধতির গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো হল খানা-পিনাচলা-ফিরাউঠা-বসামেহমানদারীপ্রস্রাব-পায়খানাস্ত্রী-সহবাসপোশাক-পরিচ্ছদঘর-বাড়ীপাক-পবিত্রতাসাজ-সজ্জাআলাপ-আলোচনাসেবা-শুশ্রূষাওষুধ-তাবিজমহামারী ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধ প্রয়াসসন্তান-সন্ততি হওয়াবিয়ে-শাদী করাঈদ উদযাপনঅতিথি-মুসাফির খাওয়ানোবিয়ের ওলিমা কিংবা মেহমানদারীর ভোজোৎসববিপদাপদে হা-হুতাশ ও কান্নাকাটিমৃতের দাফন-কাফন ব্যবস্থা ইত্যাদি। 
প্রধান প্রধান শহর ও জনপদের সুস্থ প্রকৃতির বিবেক সম্পন্ন লোক এ ব্যাপারে একমত যেঅপবিত্র ও অপরিচ্ছন্ন জিনিস খাওয়া উচিত নয়। যেমনমৃত পশুদুর্গন্ধময় বস্তু এবং অপ্রকৃতিস্থ ও জঘন্য স্বভাবের জীব-জন্তু। তাই এগুলো থেকে বাঁচা প্রয়োজন। সকল রুচি সম্পন্ন বিবেকবান ব্যক্তিই চান যেখানা বরতনে রাখা হোক এবং বরতন রাখার জন্য দস্তরখানা বিছানো হোক ইত্যাদি। এটাও সবাই পসন্দ করে যে খাবার আগে হাত-মুখ ধোয়া হোক। এটাও সর্বসম্মত রীতি যেউগ্রতাক্রোধ কিংবা এ ধরনের যে সব কাজে সংগী-সাথীদের অন্তরে বিষাদ আসে তা বর্জন করা চাই। এটাও সার্বজনীন অভিমত যেদুর্গন্ধময় পানি পান করা ঠিক নয়। তেমনি গোগ্রাসে পানি পান করাও উচিত নয়। 
বিবেক সম্পন্ন ও রুচি মার্জিত ব্যক্তিরা এ ব্যাপারেও একমত যেদুধরনের পংকিলতা থেকে দেহবসন ও আসন পবিত্র থাকা প্রয়োজন। একদুর্গন্ধময় বস্তু থেকে। দুইপ্রকৃতিগত পংকিলতা থেকে। যেমন বাসিমুখ দাঁতন দিয়ে ধোয়াকিংবা অনভিপ্রেত লোম থেকে দেহকে মুক্ত রাখা। এভাবে কাপড়ের ময়লা ও বাড়ী-ঘরের আবর্জনা দূর করা। 
সুস্থ প্রকৃতির লোক এ ব্যাপারেও দ্বিমত রাখেন না যেমানুষ মানুষের মাঝে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন ও রুচি মার্জিত ভাবে থাকবে। সুন্দর পোশাক পরবে। মাথার চুল ও দাড়ি সুন্দর করে রাখবে। বিবাহিতা নারী হাত-পা রাংগিয়ে অলংকার ভূষিতা হয়ে থাকবে। 
এ ব্যাপারেও তারা মতৈক্য রাখেন যেনগ্নতা লজ্জাকর। পোশাক সৌন্দর্য বাড়ায় লজ্জাস্থান আবৃত থাকা অপরিহার্য গোটা দেহকে ঢেকে রাখে যে পোশাক সেটাই পূর্ণাঙ্গ পোশাক। লজ্জাস্থান ঢেকে রাখার জন্য অপরিহার্য পোশাক ও গোটা অংগ ঢাকার পোশাকের আলাদা পরিমাপও তারা নির্ধারণ করে থাকেন। 
এটাও তাঁদের সর্বসম্মত মত যেস্বপ্নজ্যোতির্বিদ্যাফালনামা ইত্যাদি দ্বারা ভবিষ্যতের ঘটনাবলী সম্পর্কে আগাম কিছু জানা যায়। 
তা ছাড়া রুচি মার্জিত বিবেকবান ব্যক্তি মার্জিত ভাষায় কথা পছন্দ করেন। শ্রুতিমধুর বাক-বিন্যাস ও সংযত ভাষাপ্রয়োগ তাঁর বৈশিষ্ট্য হবে ও বাকভংগী আকর্ষনীয় হবে। তার কথাবার্তা ও বিবৃতি ভাষণ মানুষকে মুগ্ধ ও আকৃষ্ট করবে। এ ধরনের লোকই ভাষা ও সাহিত্যের মানদণ্ড হয়ে থাকে।
মোট কথাপ্রত্যেক ক্ষেত্রেই এমন কতগুলো সর্বসম্মত রীতি থাকে যা শহর ও জনপদ সমানে প্রতিপাল্য ও সর্বজন মান্য হয়। যে কোন দূর দূরান্তরের শহর ও জনপদে এ রীতি অনুসৃত হয়ে থাকে। যেমনচিকিৎসা বিজ্ঞানীরা চিকিৎসা শাস্ত্রের বিধি-বিধান অনুসরণ করা পছন্দ করেনতেমনি জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা নক্ষত্রের গতিবিধির আলোকে নিজেদের জীবন ধারা নিয়ন্ত্রিত করেন। আর আল্লাহ বিশ্বাসীরা ইসলাম ও ইহসানের ভিত্তিতে তাদের জীবনধারা গড়ে তোলেন এবং ঐশী গ্রন্থে সে জীবন পদ্ধতির পরিপূর্ণ রূপরেখা সবিস্তারে বিবৃত রয়েছে। ফলে প্রত্যেক সম্প্রদায়ের মন-মেজাজচাল-চলন ও রীতি-নীতিতে সুস্পষ্ট পার্থক্য পরিদৃষ্ট হয়।
পরবর্তী পর্ব 

মানব সমাজের বিভিন্ন সংগঠন -৪
পারিবারিক ব্যবস্থা 

হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (১৯) প্রথম সংগঠন



মানব সমাজের বিভিন্ন সংগঠন -২

📚 হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (পর্ব- ১৯)
✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)

প্রথম সংগঠন ভাষা
এ সংগঠনের প্রথম ভিত্তি হল ভাষা। ভাষার মাধ্যমেই মানুষ তার ভাবের আদান-প্রদান ঘটায়। ভাষার মূলে রয়েছে কাঠামোপ্রকৃতি ও প্রক্রিয়া। এ সব মিলেই কোন না কোন ধ্বনি সৃষ্টি হয়। এ ধ্বনি অবশ্যই কোন না কোন সম্পর্ক বা কারণ থেকে হয়ে থাকে। ঐ ধ্বনিই হুবহু ভাষা হয়ে প্রকাশ পায়। তারপর তার অর্থের দিক থেকে শব্দ উদ্ভাবন করে তা বিন্যস্ত করা হয়। তার ফলে যে ব্যাপারটি সামনে ভেসে উঠে কিংবা ব্যক্তির মনের যে ভাবের উদ্রেক করেসেটাকেই প্রথম সংগঠনের ভিত্তি মূল ভাষা নাম দেয়া হয়। তখন সেই ভাষার অনুরূপ ভাষা তৈরী করা হয় এবং কোন সম্পর্ক বা সামঞ্জস্যের কারণে তাকে ব্যঞ্জনার দিক থেকে বেশ প্রসারতা দেয়া হয়। ভাষা সম্পর্কিত আরও কিছু মূলনীতি আপনারা আমার অন্যান্য বক্তব্যে কোথাও কোথাও পাবেন। 
এ প্রথম সংগঠনের ভেতর ভাষা ছাড়া ক্ষেত-খামার করাগাছপালা লাগানোকূপ খননখানা পাকান এবং রুটি ও বিভিন্নরূপ খাদ্য তৈরী রয়েছে। বিভিন্ন পাত্র তৈরী এবং প্রয়োজনীয় নানা যন্ত্রপাতি উদ্ভাবনও এর অন্তর্ভুক্ত। চতুষ্পদ জীবকে অনুগত করে কাজ লাগানোতা বাহনরূপে ব্যবহারতার দুধ-গোশত ভক্ষণহাড় ও লোমের ব্যবহার এবং বংশাবলী রক্ষা ও ব্যবহার এরই অন্তর্ভুক্ত। এ পর্যায়ে মানুষ শীত-গ্রীষ্ম থেকে বাঁচার জন্য গুহা কিংবা ঘরের ব্যবহার জানতে পায়। চতুষ্পদ জীবের চামড়াগাছের বল্কল কিংবা পাতা দিয়ে কাপড় তৈরীও এ কালের কাজ। মানুষের জন্য তা পাখীর পালকের মতই কল্যাণ দেয়। নির্দিষ্ট বিয়ে-শাদীও এ অধ্যায়ে আসে। অপরের কুৎসা বা হস্তক্ষেপ থেকে বাঁচার জন্য তা করা হয়। এ থেকে মানুষ তারকামনা চরিতার্থের সাথে বংশধারাও অব্যাহত রাখে। তার ঘরকন্না ও সন্তান পালনের কাজ দেয়। মানুষ ছাড়া অন্যান্য জীব এভাবে স্ত্রী নির্দিষ্ট করতে পারে না। সেগুলোর জোড় বাঁধার ব্যাপারটি নেহাৎ আকস্মিক। হয় সে দুটো একই সাথে জন্ম নেয় বলে পূর্ণত্ব লাভ করা পর্যন্ত এক সঙ্গে থাকে কিংবা অন্য কোন কারণে তারা জোড় বেঁধে থাকতে বাধ্য হয়। 
এ সমাজ ব্যবস্থায় কারিগরীর দিকেও নজর পড়ে। যেমনকৃষি খামারবাগান তৈরীকূপ খননপশু পালন এবং পানি সিঞ্চনের জন্য ফোয়াড়ামশক ইত্যাদির উদ্ভাবন। তাছাড়া পরস্পরের সামগ্রিক প্রয়োজন মিটানোর জন্য পারস্পরিক দ্রব্য বিনিময় পদ্ধতির সূত্রপাত হয় এবং বিভিন্ন কাজে পারস্পরিক সহযোগিতার প্রচলন হয়। 
এ ব্যবস্থায় এমন লোকও দেখা যায় যিনি সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে পারতেন। তিনি নিজ শক্তিতে অন্যান্যকে আয়ত্ত করতে পারেন এবং কোন না কোন উপায়ে নিজ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। এমন কি অনুবর্তীদের সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারেন। 
এ ধরনের লোকদের কতগুলো সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত থাকে। তার সাহায্যে তাঁরা বিরোধ-বিসম্বাদ মিটিয়ে থাকেন। তা দিয়ে অত্যাচারী ও উচ্ছৃঙ্খলদের দমিয়ে রাখেন। তাঁদের বিরোধী শক্তির সাথে লড়তে পারেন। প্রত্যেক গোত্র ও সম্প্রদায়ের ভেতর এরূপ লোক থাকা এক অপরিহার্য ব্যাপার। যে কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে তাঁরা ভেবে-চিন্তে এরূপ রীতি-নীতি উদ্ভাবন করে থাকেন যা সবাই অনুসরণ করে থাকে। তাঁদের একদল বেশ মার্জিত রুচির হন। তাঁরা কোন না কোন উপায়ে শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন পসন্দ করেন। কিছু লোক তাঁদের চারিত্রিক মহত্ত্ববীরত্বদানশীলতাপাণ্ডিত্য ও শিল্প-সাহিত্যে গৌরবময় ভূমিকা নেন। এমন লোকও থাকেন যাঁর দুনিয়া জোড়া খ্যাতির চমক জাগে। তিনি নিজ শান শওকত বাড়িয়ে সবার শীর্ষে ঠাঁই নেন। 
এটা অবশ্য বান্দার ওপর আল্লাহর বিরাট অনুগ্রহ যেতিনি কুরআন পাকে মানবীয় জীবন ধারার সর্ব ইলহামী (স্বভাবগত) শাখাগুলো সুস্পষ্ট করে দিয়েছেন। কারণ আল্লাহ জানতেনকুরআনের পাঠক সব ধরনের লোকই হবে। তাই সব মানুষের জীবন ধারাই তাতে রয়েছে এবং সেগুলোই এখানে বলা হল।

পরবর্তী পর্ব
মানব সমাজের বিভিন্ন সংগঠন -৩
জীবিকা-পদ্ধতি 

হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (১৮) সংগঠন উদ্ভাবন পদ্ধতি



মানব সমাজের বিভিন্ন সংগঠন - ১

📚 হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (পর্ব- ১৮)
✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)

সংগঠন উদ্ভাবন পদ্ধতি 
জেনে রাখুনমানুষ খানা-পিনা,বিয়ে-শাদীগ্রীষ্মে-বর্ষায় ছত্রছায়া গ্রহণশৈত্যে গরম কাপড় ব্যবহার ইত্যাকার চাহিদায় সবাই সমান। আল্লাহ তাআলা বিশেষ অনুগ্রহ করে সব শ্রেণীকেই যার যার এ ধরনের প্রয়োজন পূরণের জন্য প্রকৃতিগত ইলহাম’ করে রেখেছেন। তাই তারা জানতে পায়কি করে কোন উপায়ে সে সব প্রয়োজন মিটাতে হবে। এ গুণগত দিক থেকে সবাই একাকার। কিন্তু যদি কেউ প্রকৃতিগত ভাবেই পংগু ও দুর্বল হয় এবং কোন চাহিদা না-ই থাকেসেটা স্বতন্ত্র কথা। 
লক্ষ্য করুনমৌমাছি জানে কোন গাছে কি ফুল বা ফল খেতে হবেকিভাবে মধু আহরণ করতে হবেকোথায় কিরূপ ঘর বানাতে হবে। অন্য পাখী জানেকোথা থেকে তাকে খাদ্য ও পানি সংগ্রহ করতে হবে। বিড়াল বা বাজ দেখলে পালাতে জানে। জানে তার প্রয়োজনের পথে অন্তরায় দেখলে তা দূর করার সংগ্রাম চালাতে। যৌন মিলন পদ্ধতিও তাদের অজানা নেই। নিরাপদে বসবাসের জন্য পাহাড়ের টিলায় কিংবা উঁচু গাছে বাসা বাঁধতে হবে তাও জানে। বাসায় ডিম দিয়ে কিভাবে তা হেফাজত করতে হবে তাও বুঝে। মোট কথাএ সব ব্যাপারে প্রত্যেক শ্রেণীর স্বতন্ত্র পদ্ধতি জানা রয়েছে। শ্রেণীগত স্বাতন্ত্র্যের ভিত্তিতে প্রত্যেক শ্রেণীকেই প্রকৃতিগতভাবেই প্রয়োজনীয় জ্ঞান দান করা হয়। 

এভাবেই আল্লাহ তাআলা মানুষকে তাদের প্রয়োজন মিটাবার ও কল্যাণ সাধনের ক্ষেত্রে সহজতর পথ উদ্ভাবনের জন্য বিশেষ জ্ঞান দান করেছেন। যেহেতু মানব জাতি অন্যান্য জাতি থেকে বড়তাই তার শ্রেষ্ঠত্ব অনুসারে তাকে তিনটি অতিরিক্ত জিনিস দেয়া হল। 
প্রথমতমানুষ কিছু করতে চাইলে সব দিক বিচার-বিবেচনা করেই তা চায়। পক্ষান্তরে চতুষ্পদ জীব শুধু প্রাকৃতিক তাগাদা দ্বারা পরিচালিত হয়। যেমন ক্ষুধাতৃষ্ণাযৌনস্পৃহা ইত্যাকার ব্যাপার। অথচ মানুষ জৈবিক প্রয়োজন ছাড়াই বুদ্ধি বৃত্তির প্রেরণার কাজ করে। কখনও তারা নগর ও রাষ্ট্র সুশাসন পদ্ধতি প্রবর্তনে উদ্যোগী হয়। কখনও তারা চরিত্র উন্নয়ন কিংবা আত্ম সংশোধনের প্রয়াস চালায়। কখনও পরকালের শাস্তির ভয়ে সংযত জীবনে অভ্যস্ত হয়। কখনও মানুষের কাছে মর্যাদা প্রতিষ্ঠা লাভের আকাঙ্ক্ষী হয়। 

দ্বিতীয়তমানুষ তার প্রয়োজন মিটানোর পদ্ধতিটি শালীন ও সুন্দর করতে চায়। অথচ চতুষ্পদ জীব যে কোন ভাবে তার প্রয়োজন মিটায়। মানুষ প্রয়োজন পূরণের ক্ষেত্রে রুচি ও আনন্দের তাগাদাদা অনুভব করে। যেমনসে সুন্দরী স্ত্রীসুস্বাদু খাদ্যউত্তম পোশাক ও সুরম্য ভবন পছন্দ করে। 

তৃতীয়তএমন কিছু মানুষও রয়েছেনযারা জ্ঞানগত উৎকর্ষের ফলে অনেক ভাল ভাল কল্যাণপ্রদ ব্যাপার নিয়ে ভাবেন ও তা অনুসরণে প্রয়াসী হন। এরূপ একদল মানুষও রয়েছে যারা জ্ঞানী লোকদের উদ্ভাবিত ব্যবস্থা ও অনুসৃত পদ্ধতি পছন্দ করে। কিন্তু নিজে তার উদ্ভাবন ক্ষমতা রাখে না। তারা কোন জ্ঞানীর বিশেষ উদ্ভাবন নিজের মোটামুটি জ্ঞানের অনুকূল পেয়ে তা অনুসরণ করতে আগ্রহী হয়। ক্ষুৎ-পিপাসা কাতর অনেক ব্যক্তিকে দেখতে পাবেন তারা নিজেরা তা জুটিয়ে নিতে না পেরে বেশ কষ্ট পেতে থাকেকিন্তু যখন তা সরবরাহ করা হয়অমনি অত্যন্ত আগ্রহ সহকারে তা যথারীতি নেবার জন্য প্রয়াসী হয়। ঘটনাক্রমে কোন উপযুক্ত জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তি যদি এ অবস্থায় পড়েনতা হলে তিনি খাবার যোগ্য তরি-তরকারী নির্বাচন করে তার চাষ করবেনপানি সেচে যত্ন নেবেনকেটে-কুটে পরিস্কার করে খেয়ে নিবেন এবং পরবর্তী সময়ে খাবার জন্য কিছু জমিয়ে রাখবেন। এমন কি ফসলের ক্ষেত থেকে পানি দূরে থাকলে পয়ঃপ্রণালী কেটে পানি আনয়নের ব্যবস্থা করবেন কিংবা পুকুর কেটে নেবেন অথবা মশক বানিয়ে ডোংগা তৈরী করে কাজ চালাবেন। এ ভাবে খাদ্য উৎপাদন প্রয়াসের তিনি সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর প্রণালী উদ্ভাবন করবেন। এ ব্যক্তির উদ্ভাবিত এ পদ্ধতি স্বভাবতই উক্ত ক্ষুৎ-পিপাসা কাতর ব্যক্তিরা আগ্রহভরে অনুসরণ করবে। 
তেমনি কোন অজ্ঞ ব্যক্তি কাঁচা ফসল বা তরকারী খেয়ে পেট নষ্ট করবে। তাই সে তা এমন উপায়ে খেতে আগ্রহী হবে যাতে পেট খারাপ না হয়। কিন্তু সে পথ তো তার জানা নেই। অবশেষে সে এ ক্ষেত্রে কোন অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে পেল। তিনি পাকাতে জানেনপিষতে জানেনভুনতে জানেন ও ভাজতে জানেন। তাই অজ্ঞ ব্যক্তিটি আগ্রহ ভরেই এ সব উদ্ভাবন অনুসরণ করবে এবং এ ক্ষেত্রে তার জ্ঞানের প্রসারতাও বেড়ে যাবে। 
এ দুটো উদাহরণের আলোকেই আপনি মানুষের অন্যান্য প্রয়োজন পূরণের ব্যাপারটি অনুমান করুন। মানুষ সমস্যায় ভুগেছে। তাদের এক জ্ঞানী ব্যক্তি ভেবে-চিন্তে সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করেছেন। অন্যান্য মানুষ সেটা অনুসরণ করেছে। এ ভাবেই চলে এসেছে মানুষের প্রয়োজন পূরানোর ব্যবস্থাটি। তাই তার প্রয়োজন পূরণের প্রকৃতিগত জ্ঞানের সাথে এ সব অর্জিত বাড়তি জ্ঞান মিলে কল্যাণ অর্জনের বিপুল জ্ঞান ভাণ্ডার সৃষ্টি হয়েছে। সে সব নিয়মিত অনুসরণ করে তারা পূর্ণ মাত্রায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এমন কি সে সব পদ্ধতিতে তারা জীবন ধারণের স্বাভাবিক রীতিতে পরিণত করেছে এবং সেগুলো তাদের বাঁচা-মরার প্রশ্নের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। 
মোট কথামানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসের মতই প্রকৃতিগত জ্ঞান উক্ত তিন ব্যাপারের সাথে সম্পূর্ণ অবিচ্ছেদ্য। মানুষের জন্য মৌলিক শ্বাস-প্রশ্বাস অপরিহার্য। শিরা থাকলে তা নড়া যেমন অপরিহার্যএও তেমনি। তবে শক্তি ও দুর্বলতা ভেদে শিরা সঞ্চালনে ক্ষিপ্রতা ও মন্থরতা আসে। সেরূপ শ্বাস-প্রশ্বাসও। তবে শ্বাস-প্রশ্বাস দীর্ঘ বা হ্রস্ব করা মানুষের ইচ্ছাধীন। 
উক্ত তিনটি ব্যাপার সব মানুষের ভেতর সমানে পাওয়া যায় না। স্বভাববুদ্ধি ও অনুভূতির পার্থক্যের কারণে সিদ্ধান্ত গ্রহণপছন্দ-অপছন্দ এবং ভাল-মন্দ বিচার ও অনুসরণের ক্ষেত্রে পার্থক্য দেখা দেয়। তা ছাড়া চিন্তা-ভাবনার সুযোগ-সুবিধার তারতম্যের কারণেও মানুষের অবস্থায় তারতম্য আসে। এ কারণেই জীবন ধারা অনুসরণের দুটো সীমারেখা নির্দিষ্ট করা হয়েছে। 
প্রথমটি থেকে সাধারণ ও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মানবগোষ্ঠীও বাদ থাকতে পারে না। মরুর বেদুঈনপার্বত্য জাতি ও সভ্যজগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন মনুষ্য সমাজ এ প্রাথমিক স্তরের জীবন ধারার অন্তর্ভুক্ত। 

দ্বিতীয় ধারায় সভ্য জগতের বড় বড় শহর ও বস্তির বাসিন্দারা অন্তর্ভুক্ত। সেখানে উন্নত চরিত্র ও মনীষা জন্ম নেয়। সে সব শহরে বিভিন্ন মত ও পথের মানুষ বাস করে। জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় উপাদানের প্রাচুর্য থাকেসেখানে বিভিন্ন মুখী অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান অর্জিত হয়। সে সব জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার আলোকে বিভিন্ন মূলনীতি ও আইন প্রণীত হয়। সেখানকার অধিবাসীরা গুরুত্ব সহকারে সেগুলো অনুসরণ করে চলে। এ জীবন ধারার উন্নততম পর্যায় হল রাষ্ট্র ব্যবস্থা। রাষ্ট্রপতিকে কেন্দ্র করে সমবেত হন বিভিন্ন সমাজের জ্ঞানী-গুণীবৃন্দ। তিনি তাঁদের পরামর্শে বিভিন্ন কল্যাণপ্রদ ও সঠিক উপায়-উপকরণের উদ্ভব ঘটান। এ পর্যায়টিকেই আমরা জীবন ধারার দ্বিতীয় স্তর বলে থাকি। 
এ দ্বিতীয় স্তর যখন পূর্ণ হয়ে যায়তখন উন্নয়নের তৃতীয় স্তর প্রয়োজনীয় হয়ে দেখা দেয়। তা এইযখন মানবমণ্ডলী একত্রে তাদের কাজ-কারবার চালায় তখন পরস্পরের ভেতর কার্পণ্যলালসাহিংসাঅবহেলামান্যতা ও অমান্যতা জনিত দ্বন্দ্বের বীজ দেখতে পায়। সেগুলো স্বভাবকেও প্রভাবিত করতে উদ্যোগী হয় এবং পরিণামে তাদের ভেতর দ্বন্দ্ব-বিভেদ দেখা দেয়। তাদের ভেতর কলুষ বাসনার লোকও দেখা দেয়। এমনকি স্বভাবগত খুনী ও দাংগাবাজ লোকের উদ্ভব ঘটে। তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের রীতি-নীতি ও বিধি-বিধান হয় মেনে নিতে চায় নানয় মেনে নেবার ক্ষমতা রাখে না কিংবা কেউ তাদের তা মানাতে সাহসী হয় না। তাই মানুষ কোন ইনসাফগার শাসক বা বিচারক নির্বাচন করতে বাধ্য হয়। তিনি যেন অপরাধীকে শাস্তি দেনবিদ্রোহীকে দমন করেনসবার কাছ থেকে কর আদায় করে সমাজের সার্বজনীন কল্যাণ ও সংস্কারের কাজে ব্যয় করেন। 
এ তৃতীয় স্তরের উন্নয়ন থেকেই চতুর্থ স্তরে উন্নীত হবার তাগাদা সৃষ্টি হয়। তা এভাবে যেদেশে দেশে যখন শাসক নিযুক্ত হয়ে যায়তখন ধন-সম্পদের চাবিকাঠি তাঁর মুঠোয় চলে যায়। ফলে সবল ও বিচক্ষণ লোকেরা তাঁর পাশে ভিড় জমায়! তাদের ভেতর কার্পণ্যসংকীর্ণতালোভ-লালসা ও হিংসা-বিদ্বেষের জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে। তার ফলে তাদের ভেতর শুরু হয় ঝগড়াফাসাদ ও রক্তারক্তি। তখন শাসকরা বাধ্য হয় এ পারস্পরিক দ্বন্দ্ব এড়াবার জন্য একজন আন্তর্জাতিক নেতা বা খলীফা নির্বাচন করতে। কিংবা এমন একটি আন্তর্জাতিক শক্তির আওতায় সংঘবদ্ধ হতে যাকে উপেক্ষা করা বা ঘায়েল করা কারো পক্ষে সহজসাধ্য নয়। তা করতে হলে অনেক দেশ বা জাতি মিলে করতে হয় এবং অসংখ্য লোক ও অজস্র ক্ষয়-ক্ষতি স্বীকার করেই তা করতে হয়। বলা বাহুল্যএরূপ আন্তর্জাতিক মহাযুদ্ধের সম্ভাবনা সর্বাধিক কম এবং দীর্ঘকাল পরে হয়ত তা সম্ভব হতে পারে। 
এ খেলাফত বা আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রয়োজন সব দেশ ও জাতির জন্য সমান নয়। দেশবাসীর অবস্থা ভেদে তা দেখা দেয়। যে জাতি রূঢ় স্বভাবের এবং নৈতিকতা বর্জিততাদের প্রয়োজন সর্বাধিক।পক্ষান্তরে যারা শালীনউদার ও মহানুভব তাদের প্রয়োজন খুবই কম। 
এখন আমি আপনাদের মানবীয় জীবন ধারার বিভিন্ন রীতি-নীতি ও অধ্যায়ের তালিকা সম্পর্কে অবহিত করব। উত্তম চরিত্রের প্রকৃষ্ট জাতির জ্ঞানী-গুণীদের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা থেকে তা পাওয়া গেছে। তাঁরা এগুলোকে সর্ববাদি সম্মত নীতি হিসেবে মেনে নিয়েছেন। তাঁদের সমসাময়িক কিংবা কাছাকাছি কালের কেউই এগুলো সম্পর্কে দ্বিমত পোষন করেন নি। এখন আপনাদের সামনে যা কিছু পেশ করা হচ্ছেঅনুধাবন করুন।
------------

পরবর্তী পর্ব
মানব সমাজের বিভিন্ন সংগঠন -২
প্রথম সংগঠন 


বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...