শনিবার, ১৫ জুলাই, ২০২৩

ক্ষুধার ফযীলত ও উদরপূর্তির নিন্দা



 উদর ও লজ্জাস্থানের খাহেশের প্রতিকার (পর্ব– ২)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

ক্ষুধার ফযীলত ও উদরপূর্তির নিন্দা

রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন :

“তোমরা নফসের বিরুদ্ধে ক্ষুধা ও পিপাসা দ্বারা জেহাদ কর। এতে এমন সওয়াব, যেমন আল্লাহর পথে জেহাদকারীর সওয়াব। আল্লাহ তাআলার কাছে ক্ষুধা পিপাসার চেয়ে অধিক প্রিয় কোন আমল নেই”।


হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন : আকাশের ফেরেশতা সেই ব্যক্তির কাছে আসে না, যে তার পেট ভরে নেয়। এক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করল : মানুষের মধ্যে উত্তম কে? তিনি বললেন : যে কম খায়, কম হাসে এবং এমন পোশাকে সন্তুষ্ট থাকে, যা দ্বারা তার গুপ্ত অঙ্গ আবৃত করতে পারে। 

আবু সায়ীদ খুদরীর রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন : “পশমী বস্ত্র পরিধান কর এবং আধাপেট খাও। এটা নবুওয়তের একাংশ”। হযরত হাসান (রঃ) এর রেওয়ায়েতে বলা হয়েছে : “কেয়ামতে আল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠ মর্তবাশালী সেই ব্যক্তি হবে, যে অধিক ক্ষুধার্ত থাকবে এবং যিকির বেশী করবে। কেয়ামতে আল্লাহর কাছে অধিক ঘৃণিত সে ব্যক্তি হবে, যে অধিক নিদ্রা যায়, অধিক খায় এবং অধিক পান করে।”


বর্ণিত আছে, রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) প্রয়োজনেও ক্ষুধার্ত থাকতেন, অর্থাৎ এটা তাঁর পছন্দনীয় ছিল। এক হাদীসে কুদসীতে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তির পানাহার দুনিয়াতে কম, আল্লাহ তাকে নিয়ে ফেরেশতাদের সামনে গর্ব করেন এবং বলেন : আমার বান্দাকে দেখ, আমি তাকে দুনিয়াতে পানাহার কম দিয়েছি। সে সবর করেছে। তোমরা সাক্ষী থাক, যে লোকমা সে ছেড়ে দেবে, তার বিনিময়ে জান্নাতে তাকে উচ্চ মর্তবা দান করব। এক হাদীসে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন : 

“তোমরা অন্তরকে অধিক পানাহার দ্বারা মেরে ফেলো না। অন্তর কৃষিক্ষেত্রের মত। তাতে পানি বেশী হলে ফসল বিনষ্ট হয়ে যায়।'


উসামা ইবনে যায়েদ ও আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত এক দীর্ঘ হাদীসে রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন : কেয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলার অধিক নিকটবর্তী সে ব্যক্তিই হবে, যে দুনিয়াতে অধিক ক্ষুধার্ত, পিপাসার্ত ও চিন্তান্বিত থাকবে। এ ধরনের লোকেরা হচ্ছে গোপন মুত্তাকী। এরা আত্মপ্রকাশ করলে কেউ তাদেরকে চেনে না এবং অদৃশ্য হয়ে গেলে কেউ খোঁজে না। ফেরেশতারা তাদেরকে ঘিরে রাখে। তারাই ভাল লোক। আল্লাহ তা'আলার আনুগত্যও উত্তমরূপে তারাই করে। লোকেরা নরম নরম শয্যায় শয়ন করে। আর তারা নিজেদের মস্তক ও হাঁটু বিছিয়ে দেয়। পয়গম্বরগণের চরিত্র ও ক্রিয়াকর্ম তাদের মুখস্থ। যে জায়গা থেকে তারা চলে যায়, সেই জায়গা কাঁদে। যে শহরে তাদের কেউ না থাকে, সেই শহরের উপর গযব নাযিল হয়। তারা দুনিয়ার জন্যে মৃতের উপর কুকুরের মত লড়াই করে না। যে পরিমাণ খেলে নিঃশ্বাস বাকী থাকে, তারা সেই পরিমাণই খায় এবং ছিন্নবস্ত্র পরিধান করে। মলিন অবস্থার কারণে লোকে তাদেরকে রোগগ্রস্ত মনে করে ; অথচ তাদের কোন রোগ নেই। কেউ কেউ মনে করে, তাদের জ্ঞানবুদ্ধি বিলুপ্ত; অথচ এটাও নয়। পরকালের গৌরব তাদের জন্যেই। হে উসামা, যে শহরে এরূপ লোক দৃষ্টিগোচর হয়, জেনে নেবে, সেই শহরের শান্তির কারণ তারাই। যে সম্প্রদায়ের মধ্যে তারা থাকে, আল্লাহ সেই সম্প্রদায়কে আযাব দেন না। ভূপৃষ্ঠও তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং আল্লাহ তা'আলাও তাদের প্রতি রাযী। মানুষের মধ্যে তাদেরকে রাখার কারণ তাদের দ্বারা যথাসম্ভব মানুষকে মুক্তি দেয়া। তুমি যদি আমৃত্যু ক্ষুধা-পিপাসা সহ্য করতে পার, তবে কর। এর কারণে তুমি উচ্চ মর্যাদা পাবে এবং নবীগণের কাতারে দাখিল হবে। তোমার আত্মা যখন ফেরেশতাদের কাছে যাবে, তখন তারা আনন্দিত হবে এবং আল্লাহ তোমার প্রতি রহম করবেন।হযরত আবু হুরায়রার রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন :

“পশম পরিধান কর এবং কর্মতৎপর থাক। আধাপেট আহার কর। তাহলে আকাশের ফেরেশতাদের মধ্যে দাখিল হয়ে যাবে।'


হযরত ঈসা (আঃ) বলেন : হে হাওয়ারীগণ, তোমাদের পাকস্থলীকে ক্ষুধাতুর এবং দেহ উলঙ্গ রাখ, যাতে তোমাদের অন্তর আল্লাহকে দেখে। তওরাতে লিখিত আছে- আল্লাহ তা’আলা কোন স্থূলদেহী আলেমকে পছন্দ করেন না। কেননা, দৈহিক স্থূলতা অনবধানতা ও অধিক আহার জ্ঞাপন করে। এটা আলেমের জন্যে ভাল নয়। তাই হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ) বলেন :

“যে আলেম পেট ভরে খেয়ে মোটা হয়েছে, আল্লাহ তাকে পছন্দ করেন না। এক হাদীসে আছে, শয়তান মানুষের মধ্যে রক্তের মত বিচরণ করে। তোমরা ক্ষুধা ও পিপাসা দ্বারা তার চলাচলের পথ সংকীর্ণ করে দাও। এক হাদীসে বলা হয়েছে- “মুমিন এক নাড়ি-ভুঁড়িতে এবং কাফের সাত নাড়ি-ভুঁড়িতে খায়”।


অর্থাৎ মুমিনের তুলনায় কাফের সাত গুণ বেশী খায় কিংবা তার খাহেশ মুমিনের চেয়ে সাত গুণ বেশী হয়। রূপক অর্থে খাহেশের স্থলে নাড়ি-ভুঁড়ি ব্যবহৃত হয়েছে। হাদীসের অর্থ এরূপ নয় যে, কাফেরের নাড়ি-ভুঁড়ি বাস্তবে মুমিনের তুলনায় বেশী হয়। হযরত হাসান (রঃ)-এর  রেওয়ায়াতে আছে, হযরত আয়েশা (রাঃ) রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-কে একথা বলতে শুনেছেন : “তোমরা সর্বদা জান্নাতের দরজার কড়া নাড়। তোমাদের জন্যে তা খুলে যাবে।”


হযরত আয়েশা (রাঃ) বললেন : জান্নাতের দরজার কড়া কিরূপে নাড়া দেব ? তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বললেন : “ক্ষুধা ও পিপাসা দ্বারা”। 

হযরত আবু হুযায়ফা (রাঃ) একবার রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর মজলিসে ঢেকুর তুললে তিনি বললেন : অধিক ঢেকুর তুলো না। কেননা, কেয়ামতের দিন সে ব্যক্তিই অধিক ক্ষুধার্ত হবে, যে দুনিয়াতে বেশী পেট ভরে খায়। 

হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন : রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) কখনও পেটভরে আহার করেননি। মাঝে মাঝে তাঁর ক্ষুধা দেখে হযরত আয়েশা (রঃ)-এর করুণা হত এবং তিনি কেঁদে দিতেন। তিনি তাঁর পেটে হাত বুলিয়ে বলতেন : আপনার প্রতি আমি উৎসর্গ। দুনিয়া থেকে এতটুকু অংশ তো নিন, যদ্দ্বারা শক্তি বহাল থাকে এবং ক্ষুন্নিবৃত্তি হয়ে যায়। জওয়াবে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বলতেন : আয়েশা, আমার ভাইগণ অর্থাৎ প্রধান প্রধান পয়গম্বরগণ আমার চেয়েও অধিক কষ্ট সহ্য করেছেন। এসব কষ্টে সবর করে তাঁরা যখন পরওয়ারদেগারের কাছে গেছেন, তখন অত্যন্ত সম্মানিত হয়েছেন এবং অপরিসীম সওয়াব লাভ করেছেন। আমি লজ্জাবোধ করি, কোথাও জীবনে কিছু আরাম ভোগ করার কারণে আখেরাতে তাঁদের চেয়ে কম মর্তবা লাভ করি। আখেরাতে কম মর্তবা পাওয়া অপেক্ষা দুনিয়াতে কয়েক দিন সবর করা সহজ। আপন ভাইদের সাথে মিলিত হওয়া ছাড়া আমার কাছে অন্য কিছু ভাল মনে হয় না। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন : আল্লাহর কসম, এই কথাবার্তার পর এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে তিনি দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে যান। 


হযরত আনাস (রাঃ) বর্ণনা করেন- একবার হযরত ফাতেমা (রাঃ) একখন্ড রুটি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে উপস্থিত করেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন : এটা কি ? হযরত ফাতেমা বললেন : আমি একটি রুটি তৈরী করেছিলাম। আমার মনে চাইল, তাই এ খন্ডটি আপনার জন্যে এনেছি। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) রুটির টুকরাটি খেয়ে বললেন : তিন দিন পর তোমার পিতার মুখে এই প্রথম খাদ্য পৌঁছল। 

হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন : রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) সারা জীবনে কখনও পরিবার-পরিজনকে লাগাতার তিন দিন পেট ভরে গমের রুটি দেননি। তিনি বলতেন : “দুনিয়াতে যারা ক্ষুধার্ত, আখেরাতে তারা তৃপ্ত হবে। আল্লাহ তা'আলার কাছে সে ব্যক্তি অধিক ঘৃণিত, যার বদহজম লেগে থাকে এবং পেট ভরে আহার করে। বান্দা খাহেশ সত্ত্বেও যে লোকমাটি ছেড়ে দেয়, তার বিনিময়ে সে জান্নাতে একটি স্তর লাভ করে।


ক্ষুধার ফযীলত সম্পর্কে মহাজন উক্তিও অনেক। 

হযরত ওমর (রাঃ) বলেন : উদরপূর্তি থেকে নিজেকে রক্ষা কর। কেননা, এটা জীবদ্দশায় দুর্মূল্যের এবং মৃত্যুর পর দুর্গন্ধের কারণ। 

হযরত শাকীক বলখী (রঃ) বলেন : এবাদত একটি পেশা, যার দোকান হচ্ছে নির্জনতা এবং হাতিয়ার ক্ষুধা। 

হযরত লোকমান (রঃ) আপন পুত্রকে বলেন : রস, যখন পাকস্থলী পূর্ণ থাকে, তখন চিন্তা ঝিমিয়ে পড়ে এবং এবাদতের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বেকার বসে থাকে। 

হযরত ফযল ইবনে আয়ায নিজেকে সম্বোধন করে বলতেন : তোমার কিসের ভয়? ক্ষুধার? ক্ষুধাকে ভয় করা উচিত নয়। কেননা, এর কারণেই তুমি আল্লাহ তা'আলার সামনে হালকা-পাতলা থাক। আল্লাহর রসূল ও তাঁর সকল সাহাবী ক্ষুধার্ত থাকতেন। 

কাহমস (রঃ) বলেন : ইলাহী, আপনি আমাকে ক্ষুধার্ত রেখেছেন, উলঙ্গ রেখেছেন এবং অন্ধকার রাতে প্রদীপহীন রেখেছেন। কেমন কেমন ওসীলা দ্বারা আমাকে এই মর্তবায় পৌঁছিয়েছেন। 

তওরাতে উল্লিখিত আছে- আল্লাহকে ভয় কর এবং যখন পেট ভরে আহার কর, তখন ক্ষুধার্তকে স্মরণ কর। 

আবু সোলায়মান (রঃ) বলেন : রাতের খাদ্য থেকে এক লোকমা কম খাওয়া আমার কাছে সারারাত জেগে এবাদত করার চেয়ে ভাল মনে হয়। তিনি আরও বলেন : আল্লাহর ভান্ডার থেকে ক্ষুধা তাকেই দান করা হয়, যাকে তিনি পছন্দ করেন। হযরত সহল ইবনে আবদুল্লাহ তস্তরী (রঃ) পঁচিশ দিন পর্যন্ত খেতেন না এবং এক দেরহামের আটা দিয়ে এক বছর চালিয়ে দিতেন। তিনি ক্ষুধার উচ্চ মর্তবা বিশ্বাস করতেন এবং এ সম্পর্কে অতিশয়োক্তি করে বলতেন : কেয়ামতের দিন কোন নেক আমলের এতটুকু সওয়াব হবে না, যতটুকু রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর অনুসরণে বাড়তি খাদ্য ত্যাগ করলে হবে। তিনি আরও বলেন : যারা আখেরাত তলব করে, তাদের জন্যে খাওয়ার চেয়ে অধিক ক্ষতিকর কিছু নেই। প্রজ্ঞা ও জ্ঞান ক্ষুধার মধ্যে এবং গোনাহ ও মূর্খতা তৃপ্তির মধ্যে নিহিত। যে হাদীসে বলা হয়েছে, পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাদ্যের জন্যে, সেই হাদীসের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন : যে ব্যক্তি এই পরিমাণের চেয়ে বেশী খায়, সে তার পুণ্য খায়। এর চেয়ে উচ্চ মর্তবার কথা তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন : খাদ্য খাওয়ার তুলনায় না খাওয়া অধিক প্রিয় না হওয়া পর্যন্ত কারও ফযীলত লাভ হবে না। এক রাত ক্ষুধার্ত থাকলে আল্লাহর কাছে দু'রাত ক্ষুধার্ত থাকার জন্যে দোয়া করবে। এই অবস্থা অর্জিত হলে সে খাদ্য না খাওয়া প্রিয় মনে করবে। তিনি আরও বলেন : যারা আবদাল হয়েছেন, তারা পেটকে ক্ষুধার্ত রাখা, রাত্রি জাগরণ ও একান্তবাস দ্বারা আবদাল হয়েছেন। আবদুল ওয়াহেদ ইবনে যায়দ বলেন : আল্লাহর কসম, আল্লাহর মহব্বত পাওয়া যায় না, কিন্তু ক্ষুধা দ্বারা। ওলীগণ পানির উপর দিয়ে হেঁটে যান না, কিন্তু ক্ষুধার বদৌলত। তারা নিমেষের মধ্যে পথের দূরত্ব অতিক্রম করেন না, কিন্তু ক্ষুধার কারণে।



পরবর্তী পর্ব

ক্ষুধার উপকারিতা ও তৃপ্তির বিপদাপদ

উদর ও লজ্জাস্থানের খাহেশের প্রতিকার

 

উদর ও লজ্জাস্থানের খাহেশের প্রতিকার (পর্ব– ১)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

জানা উচিত, উদরের খাহেশ আদম সন্তানের জন্যে বড় মারাত্মক, যার কারণে হযরত আদম ও হাওয়া (আঃ) চিরস্থায়ী জান্নাত থেকে (ইবলিশের ধোকায় পড়ে) এই ধ্বংসশীল পৃথিবীতে বহিষ্কৃত হন। তাঁদেরকে এক বিশেষ বৃক্ষের ফল খেতে নিষেধ করা হয়েছিল। কিন্তু তাঁদের খাহেশ প্রবল হওয়ায় তাঁরা তা (ভুলক্রমে) খেয়ে ফেলেন। প্রকৃতপক্ষে উদর খাহেশের ঝরণা এবং আপদের খনি। কারণ, উদরের জন্যে নারী সম্ভোগের খাহেশ অপরিহার্য। পেটপূর্তি হলে একাধিক স্ত্রী ও অত্যাধিক সহবাসের বাসনা জাগ্রত হয়। এর পর ধন-সম্পদ ও জাঁকজমকের দিকে মন ঝুঁকে পড়ে। কেননা, এগুলো দ্বারা এই মতলব সুন্দরভাবে সিদ্ধ হয়। ধন-সম্পদের আধিক্য থেকে নানা রকমের ঔদ্ধত্য ও হিংসার সৃষ্টি হয় এবং এরই বদৌলতে রিয়া, পারস্পরিক গর্ব ও অহংকার জন্মলাভ করে, ফলে বিদ্বেষ ও শত্রুতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। অবশেষে মানুষ অবাধ্যতা, নাফরমানী ও নিষিদ্ধ কাজ করতে শুরু করে। এগুলো সব এ বিষয়েরই ফল যে, উদরকে খালি না রেখে আকণ্ঠ ভরে নেয়া হয়। যদি মানুষ তার নফসকে ক্ষুধার্ত রেখে শয়তানের পথ সংকীর্ণ করে দেয়, তবে অবশ্যই সে আল্লাহর আনুগত্যের পথ থেকে পা উঠাবে না, অবাধ্যতা ও আস্ফালনের কাছেও ঘেঁষবে না, আখেরাত ছেড়ে দুনিয়াদার হয়ে থাকবে না এবং বাদানুবাদ ও কলহ কিনে নেবে না। এসব কারণে উদরের বিপদাপদ ও ধ্বংসকারিতা বর্ণনা করা এবং এ সম্পর্কিত মোজাহাদার পদ্ধতি ও ফযীলত ব্যাখ্যা করা অত্যাবশ্যক, যাতে মানুষ এ থেকে বেঁচে থাকে এবং মোজাহাদার প্রতি আকৃষ্ট হয়। লজ্জাস্থানের খাহেশও এমনি ধরনের, যা এর পরে আসে। তাই এর বর্ণনাও জরুরী। সেমতে আমরা এ বিষয়গুলোকে আটটি শিরোনামে বর্ণনা করব।


(১) ক্ষুধার ফযীলত ও উদরপূর্তির নিন্দা

(২) ক্ষুধার উপকারিতা ও তৃপ্তির বিপদাপদ

(৩) উদরের খাহেশ চূর্ণকারী সাধনা 

(৪) ক্ষুধা ও তার ফযীলতে মিতাচার

(৫) রিয়ার বিপদাপদ

(৬) লজ্জাস্থানের খাহেশ

(৭) মুরীদের বিবাহ করা না করা

(৮) যিনা ও কুদৃষ্টি থেকে আত্মরক্ষা করা 


পরবর্তী পর্ব

ক্ষুধার ফযীলত ও উদরপূর্তির নিন্দা

মঙ্গলবার, ১১ জুলাই, ২০২৩

তাওহীদের স্থর ও প্রকার

তাওহীদের স্থর সমুহ 
বলা বাহুল্য, তাওহীদের চারটি স্তর রয়েছে— 

( এক)সারাংশ, (দুই) সারাংশের সারাংশ, (তিন) বাকল এবং (চার) বাকলের উপরকার বাকল। 

অজ্ঞ লোকদেরকে বুঝাবার জন্যে আমরা একটি দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করছি। 

তাওহীদকে একটি আখরোটের উপরকার বাকল মনে করা উচিত। আখরোটের উপরিভাগে উপর-নিচে দু'টি বাকল থাকে, একটি সারাংশ থাকে এবং সারাংশে থাকে তৈল। সুতরাং তাওহীদের 

প্রথম স্তর হচ্ছে আখরোটের উপরকার বাকল। তা হচ্ছে শুধু মুখে “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” উচ্চারণ করা, কিন্তু তার অন্তর্নিহিত অর্থ সম্পর্কে গাফেল থাকা কিংবা মনে মনে তা অস্বীকার করা- এটা হচ্ছে মুনাফিক তথা কপট বিশ্বাসীদের তাওহীদ। 

দ্বিতীয় স্তর হচ্ছে মুখে কলেমা উচ্চারণ করার সাথে সাথে তার অর্থ হৃদয়ঙ্গম করা। এটা হচ্ছে সাধারণ জনগণের তাওহীদ। 

তৃতীয় স্তর হচ্ছে সত্যের নূরের মাধ্যমে কলেমার অর্থ স্বর্গীয় প্রেরণায় প্রকটিত হওয়া এবং তা প্রত্যক্ষ করা। এটা নৈকট্যশীলদের তাওহীদ। 

চতুর্থ স্তর এই যে, অস্তিত্ব জগতে এক ও অভিন্ন আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছু না দেখা। এটা সিদ্দীকগণের তাওহীদ। সূফী-বুযুর্গগণের পরিভাষায় এর নাম “ফানা ফিত্তাওহীদ” (তাওহীদে বিলুপ্তি)। কারণ, এই স্তরে ব্যক্তি যেখানে আল্লাহ তা'আলার সত্তা ছাড়া কিছুই দেখে না, সেখানে নিজের অস্তিত্বকেও দেখে না। সুতরাং তার সত্তা নিজের চোখেও বিলুপ্ত থাকে।


উপরোক্ত স্তর চতুষ্টয়ের মধ্যে 

প্রথম ব্যক্তি কেবল মৌখিক তাওহীদপন্থী। তার তাওহীদের উপকারিতা কেবল দুনিয়াতেই পাবে। অর্থাৎ সে মুজাহিদদের তরবারি থেকে রক্ষা পাবে। 

দ্বিতীয় ব্যক্তি এই অর্থে তাওহীদপন্থী যে, সে কলেমার অর্থ বুঝে এবং অন্তর দ্বারা তা মিথ্যা বলে বিশ্বাস করে না। এ ধরনের তাওহীদ অন্তরের উপর এক গ্রন্থিবিশেষ, যাতে উন্মোচন ও উদ্দীপনা হয় না। এতদসত্ত্বেও এই তাওহীদ দ্বারা আখেরাতের আযাব থেকে রক্ষা পাওয়া যায়, যদি এর উপরই জীবনাবসান হয় এবং . গোনাহের কারণে তা দুর্বল না হয়। এই গ্রন্থিকে ঢিলে করার ও খুলে দেয়ারও কতকগুলো কৌশল রয়েছে। সেগুলোকে “বেদআত” বলা হয়। আরও কিছু পন্থা রয়েছে, যেগুলোর দ্বারা এই গ্রন্থিকে মযবুত করা ও ঢিলেকারীদের কৌশল প্রতিহত করা উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। এসব পন্থাকে বলা হয় “কালাম শাস্ত্র”। যে কালাম শাস্ত্র জানে, তাকে মুতাকাল্লিম এবং তার বিপরীতকে মুবতাদে' বলা হয়। জনসাধারণের অন্তর থেকে তাওহীদের গ্রন্থি খুলে ফেলার জন্য মুরতাদে' যে অপচেষ্টা চালায়, তা ব্যর্থ করে দেয়াই মুতাকাল্লিমের লক্ষ্য থাকে।

তৃতীয় ব্যক্তি এই অর্থে তাওহীদপন্থী যে, সে বিশ্ব-জাহানের হর্তাকর্তা একজনকেই বিশ্বাস করে। সে যদিও জানে, বস্তু সামগ্রী অনেক; কিন্তু এই প্রারাচুর্য সত্ত্বেও সেগুলোকে সে এক পরাক্রমশালী আল্লাহ থেকেই প্রকাশিত বলে জানে। 

চতুর্থ ব্যক্তি এই অর্থে তাওহীদপন্থী যে , এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহ্ ছাড়া কোন কিছুই তার দৃষ্টিগোচর হয়নি। সে বস্তুসামগ্রীকে বহুত্বে দৃষ্টতে দেখে। এটি তাওহীদের সর্বোচ্ছ স্তর।

অতএব 


প্রথম প্রকার তৌহীদ হচ্ছে আখরোটের উপরের ছাল,দ্বিতীয় স্তর দ্বিতীয় ছাল, তৃতীয় স্তর সারাংশ এচতুর্থ স্তর তৈলের ন্যায়। যা সারাংশ থেকে নির্গত হয়। উপরের ছাল কোন উপকারে আসেনা। খেলে তিক্ত লাগে। আগুনে নিক্ষেপ করলে আগুন নিভিয়ে দেয় এবং ধোয়া বৃদ্ধি করে। ঘরে রাখলে অহেতুক যায়গা আবদ্ধ রাখে। মোটকথা , কয়েকদিন আখরোটের হেফাজত করা ছাড়া এটা কোন কাজে লাগেনা। সারংশ বের করলে এটা ফেলে দেয়া হয়। মৌখিক তাওহীদের অবস্থাও ঠিক তেমনি। এরূপ তাওহীদের উপকার কম এবং ক্ষতি বেশী। স্বল্পকালীন উপকার এই যে, মন ও দেহকে রক্ষা করার জন্য মৃত্যু পর্যন্ত কাজে লাগে এবং মুনাফিকের দেহকে মুজাহিদদের তরবারির গ্রাস হতে দেয়না। কারণ তাদের প্রতি অন্তর চিড়ে দেখার নির্দেশ নেই। তারা কেবল বাহ্যিক ইসলামকে দেখে। কিন্তু মৃত্যুর সময় তাদের এই তাওহীদ তাদের দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে এবং এরপর কোন কাজে আসবেনা।


দ্বিতীয় প্রকার তৌহিদ - আখরোটের দ্বিতীয় ছাল প্রথম ছালের তুলনায় বাহ্যত উপকারী। এর দ্বারা সারাংশের হেফাজত হয়। এবং রেখে দিলে সারাংশকে বিগড়ে যেতে দেয়না। পৃথক করে নিলে জ্বালানি কাজেও আসে। কিন্তু এই উপকার সর্বাবস্থায় সারাংশের তুলনায় কম। এমনিভাবে অন্তরে কেবল কলেমার অর্থের বিশ্বাস রাখা মৌখিক কলেমার তুলনায় অনেক উপকারী। কিন্তু কাশফ্ ও প্রত্যক্ষকরণের তুলনায় এর মান কম। কাশফ্ ও প্রত্যক্ষকরণের ফল স্বরুপ যে উন্মোচন ও প্রশস্থতা অর্জিত হয়, তাই নিম্নোক্ত আয়াতে বুঝানো হয়েছে - "আল্লাহ্ যাকে পথ প্রদর্শন করার ইচ্ছা করেন, তার বক্ষ ইসলামের জন্য উন্মোচিত করে দেন। নিন্মের আয়াতেও তাই উদ্দেশ্যে - "আল্লাহ যার বক্ষ ইসলামের জন্য উন্মোচিত করে দিয়েছেন, সে তার পালনকর্তার পক্ষ থেকে কি নূরের উপর  প্রতিষ্টিত আছে?" 

সারাংশ সয়ং ছালের তুলনায় উৎকৃষ্ট এবং এটাই প্রকৃতপক্ষে উদ্দেশ্য। তবুও তৈল বের করার পর তাতে কিছু গাদের মিশ্রণ থাকে। এমনিভাবে জগতের হত্তাকর্তাকে বিশ্বাস করাও সাধকের একটি সুউচ্চ লক্ষ্য কিন্তু এতে কিছু না কিছু ভ্রূক্ষেপ গায়রুল্লার প্রতিও থেকে যায়। যে ব্যাক্তি আল্লাহ্ ছারা কিছুই দেখেনা, তার তুলনায় এরূপ ব্যক্তির দৃষ্টি বহুত্বের দিকে থাকে।

এখানে প্রশ্ন হয়, মানুষ পৃথিবীতে এক সত্তা ছাড়া কিছুই প্রত্যক্ষ করবে না, তা কেমন করে সম্ভব ? কেননা, সে নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল, চন্দ্র, সূর্য, বৃক্ষ, তরুলতা ও অন্যান্য শরীরী বস্তুসমূহ প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ করে। এসব বস্তু এক নয় অনেক। অতএব, অনেক বস্তু এক কেমন করে হবে? এর জওয়াব এই, কোন কোন বস্তু কোন বিশেষ দৃষ্টিতে দেখলে অনেক হয়; কিন্তু অন্য দৃষ্টিতে দেখলে একই হয় । উদাহরণতঃ মানুষকে যদি আমরা আত্মা, দেহ, হাত-পা, শিরা-উপশিরা, অস্থি ও অন্ত্রের দিক দিয়ে দেখি, তবে তাতে বহুত্ব থাকে; কিন্তু যদি অন্যদিক দিয়ে অর্থাৎ মানবতার দিক দিয়ে দেখি, তবে সে এক। অনেকেই মানুষকে দেখে এবং তাদের অন্তরে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বহুত্ব ও পৃথক হওয়া ধারণাও থাকে না। আসলে মানুষ যখন একত্বের ধ্যানে নিমজ্জিত থাকে, তখন সে একের মধ্যে বিভেদ ও পার্থক্য দেখে না। আর যখন বহুত্বের দিকে লক্ষ্য করে, তখন এসব বস্তু যে আলাদা আলাদা, সেদিকে কল্পনা ধাবিত হয়। এমনিভাবে স্রষ্টা হোক কিংবা সৃষ্টি সকলকে দেখার আলাদা আলাদা ও বহু দৃষ্টিকোণ রয়েছে। কোন দৃষ্টিকোণে তারা এক এবং কোন দৃষ্টিকোণে অনেক। এখানে দৃষ্টান্তটি যদিও উদ্দেশ্যের সাথে পুরাপুরি খাপ খায় না, তবু এর মাধ্যমে মোটামুটিভাবে প্রত্যক্ষকরণে অনেক যে এক হতে পারে, তা বুঝা যায়।

সর্বশক্তিমান এক আল্লাহর সত্তা ছাড়া অন্য কিছুই দৃষ্টিগোচর না হওয়ার অবস্থাটি কখনও সার্বক্ষণিক হয়ে থাকে, আবার কখনও বিদ্যুতের ন্যায় ক্ষণস্থায়ী হয়ে থাকে। সত্য বলতে কি, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্ষণস্থায়ীই হয়ে থাকে। এটা সর্বক্ষণ অব্যাহত থাকা খুবই বিরল। বর্ণিত আছে , হুসাইন ইবনে মনসূর হাল্লাজ ইবরাহীম খাওয়াসকে সফর করতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন : তুমি বর্তমানে কি কাজে মশগুল আছ ? তিনি জওয়াব দিলেন : তাওয়াক্কুল পাকাপোক্ত করার উদ্দেশ্যে আজকাল আমি সফর করছি। হুমায়ুন ইবনে মনসূর বললেন : তুমি অন্তর আবাদ করার কাজে সারা জীবন বিনষ্ট করেছ। ফানা ফিত্তাওহীদ ( তাওহীদে বিলুপ্তি ) কোথায় গেল ? সেটা অবলম্বন কর না কেন ? উদ্দেশ্য এই, হযরত খাওয়াস তৃতীয় স্তরের তাওহীদ পাকাপোক্ত করার কাজে মশগুল ছিলেন, আর হুমায়ুন তাকে চতুর্থ স্তর অবলম্বন করতে বলেছিলেন। 

এ পর্যন্ত তাওহীদপন্থীদের মকামসমূহ সংক্ষেপে বর্ণিত হল। এখন সেই তাওহীদের ব্যাখ্যা শোনা দরকার, যার উপর তাওয়াক্কুল নির্ভরশীল। সে মতে চতুর্থ স্তরের তাওহীদ সম্পর্কে চিন্তাভাবনাই করা উচিত নয়। তাওয়াক্কুলও এর উপর ভিত্তিশীল নয়; বরং তৃতীয় প্রকার তাওহীদ থেকেই তাওয়াক্কুলের হাল অর্জিত হয়। প্রথম প্রকার তাওহীদ হল নিফাক, যার অবস্থা বর্ণিত হয়েছে। দ্বিতীয় প্রকার তাওহীদ সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। এর পাকাপোক্ত করার নিয়মপদ্ধতি কালাম শাস্ত্রে উল্লিখিত হয়েছে। বেদআতীদের আপত্তিসমূহের জওয়াবও তাতে বর্ণিত হয়েছে। বাকী রইল তৃতীয় প্রকার তাওহীদ। বলা বাহুল্য , এর উপরই তাওয়াক্কুল নির্ভরশীল। কেননা , কেবল বিশ্বাসগত তাওহীদই তাওয়াক্কুল সৃষ্টি করে না- এতে কিছু কাশফ ও প্রত্যক্ষণেরও দরকার। সুতরাং তৃতীয় প্রকার তাওহীদের ক্ষেত্রে যতটুকুর উপর তাওয়াক্কুল নির্ভরশীল, নিম্নে আমরা ততটুকুই বর্ণনা করার প্রয়াস পাব।


তৃতীয় প্রকার তৌহিদ - সংক্ষেপে কথা হল, মানুষের কাছে এটা দিবালোকের ন্যায় প্রতিপন্ন হতে হবে যে, আল্লাহ তা'আলা ছাড়া জগতের সর্বময় কর্তা আর কেউ নেই। সৃষ্টি, রিযিক, বখশিশ, জীবন, মরণ, প্রাচুর্য, দরিদ্রতা ইত্যাদি যত বিষয়াদি রয়েছে, সবগুলোর স্রষ্টা, আবিষ্কারক ও উদ্ভাবক একমাত্র আল্লাহ তা’আলাই। এতে কেউ তার অংশীদার নেই। এ বিষয়টি যখন মানুষের কাছে প্রকটিত হয়ে যাবে, তখন সে অন্য কারও দিকে লক্ষ্য করবে না, অন্য কাউকে ভয় করবে না। তারই কাছে আশা করবে এবং তারই উপর ভরসা করবে। কেননা, সর্বাধিপতি তো কেবল তিনিই। তিনি ব্যতীত যা কিছু আছে, সবই তার অধীন ও পদানত। মানুষের সামনে যখন কাশফের দ্বার উন্মুক্ত হয়ে যায়, তখন এটা সে চর্মচক্ষেও প্রত্যক্ষ করতে সক্ষম হয়।

শয়তান মানুষকে এই তাওহীদ থেকে দু'উপায়ে বিরত রাখে এবং তার সাথে শিরক মিশ্রিত করে দেয়। প্রথমত, প্রাণিকুলের ক্ষমতার প্রতি দৃষ্টিপাতের মাধ্যমে এবং দ্বিতীয়ত, জড় পদার্থের ক্ষমতার প্রতি মনোযোগর মাধ্যমে। জড়জগতের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত হল এই, মানুষ শস্য উৎপাদনের জন্যে বৃষ্টির উপর ভরসা করে এবং বৃষ্টিপাতের ব্যাপারে মেঘমালার উপর ভরসা করে। নৌকা পানির উপর সঠিকভাবে ভেসে থাকা এবং চলার ব্যাপারে অনুকূল বায়ুর উপর ভরসা। এ সমস্ত বিষয় তাওহীদের ক্ষেত্রে শিরক এবং আসল সত্য সম্পর্কে অজ্ঞতা বৈ কিছু নয়। এ কারণেই আল্লাহ পাক এরশাদ করেন : "তারা যখন নৌকায় আরোহণ করে, তখন একান্তভাবে আল্লাহকে ডাকে। অতঃপর আল্লাহ যখন তাদেরকে উদ্ধার করে ডাঙ্গায় পৌছে দেন, তখনই তারা শিরক করতে শুরু করে।" কতক তাফসীরকারের মতে এখানে শিরক করার অর্থ এই, তারা বলতে শুরু করে যদি বায়ু অনুকূল না হতো, তবে আমরা তীরে পৌছুতে পারতাম না। কিন্তু যে ব্যক্তি বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে সম্যক অবগত সে জানে, অনুকূল বাতাসও স্বেচ্ছায় চলে না যে পর্যন্ত না আল্লাহ পাক তাকে চালান।

অতএব, নাজাতের ক্ষেত্রে বায়ুর প্রতি মানুষের মনোযোগ এমন, যেমন কোন প্রাণদণ্ডযোগ্য ব্যক্তি গ্রেফতার হয়, অতঃপর বাদশাহ তার মুক্তি ও ক্ষমার আদেশ লিখে দেন। এখন এই ব্যক্তি বাদশাহের দোয়াত, কলম ও কাগজকে স্মরণ করে বলে- যদি দোয়াত, কলম ও কাগজ না হত, তবে আমি রক্ষা পেতাম না। অর্থাৎ, সে কলম ইত্যাদিকেই নাজাতের কারণ মনে করে। যিনি কলম চালিয়েছেন, তাকে স্মরণ করে না। বলা বাহুল্য, এটা চূড়ান্ত মূর্খতা। যে ব্যক্তি জানে, কলম কোন আদেশ দিতে পারে না, বরং সে লেখকের অনুগত, সে কলমের দিকে মনোযোগ দিবে না এবং লেখক ছাড়া অন্য কোন কিছুর কাছে কৃতজ্ঞ হবে না। এমনকি, মুক্তির আনন্দ এবং বাদশাহের কৃতজ্ঞতায় কলম ও কালির কল্পনাও তার অন্তরে জাগ্রত হবে না। সুতরাং চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, তারা, বৃষ্টি, মেঘমালা, পৃথিবীর সমস্ত প্রাণী, উদ্ভিদ প্রভৃতি সমস্তই আল্লাহ তা'আলার কুদরতের এমনিভাবে অনুগত, যেমন লেখকের হাতে কলম-কাগজ ইত্যাদি। এ দৃষ্টান্তটিও কেবল বুঝানোর জন্যে, নতুবা দস্তখত বাদশাহ করলেও বাস্তবে লেখক আল্লাহ তা’আলাই। এক আয়াতে এরশাদ হয়েছে "আপনি যখন ধূলি নিক্ষেপ করলেন, তখন প্রকৃতপক্ষে তা আপনি নিক্ষেপ করেননি; বরং আল্লাহ নিক্ষেপ করেছেন।"

মানুষের কাছে যখন প্রতীয়মান হয়ে যায় যে, নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের সবকিছুই আল্লাহ তা'আলার আদেশের অনুগত, তখন শয়তান তার কাছ থেকে নিরাশ হয়ে ফিরে যায় এবং তার তাওহীদে জড়পদার্থের অংশীদারিত্ব মিশ্রিত করতে পারে না। শয়তান তখন অন্য উপায় অবলম্বন করে। অর্থাৎ, প্রাণিকুলের ক্ষমতার প্রতি মানুষের মনোযোগ আকৃষ্ট করে এবং বলে— সবকিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়— এ কথা তুমি কেমন করে বিশ্বাস করতে পারলে? দেখ, অমুক ব্যক্তি তার ক্ষমতা বলে তোমাকে রূযী-রোযগার দেয়। সে ইচ্ছা করলে তা বন্ধও করে দিতে পারে। বাদশাহ ইচ্ছা করলে তোমার গর্দান উড়িয়ে দিতে পারে এবং ইচ্ছা করলে ক্ষমাও করতে পারে। অতএব, বাদশাহকে ভয় করা উচিত এবং তাঁর কাছেই আশা করা উচিত। কেননা, তুমি তাঁর অধীন। শয়তানের এই প্ররোচনায় অনেক মানুষের পা পিছলে যায়। তবে আল্লাহ তা'আলার খাঁটি বান্দার উপর শয়তানের কোন প্রভাব নেই। তারা অন্তর্দৃষ্টিতে দেখে, লেখক অনুগত ও বাধ্য। কিন্তু যে ব্যক্তির অন্তর ইসলামের জন্য আল্লাহর নূর দ্বারা উন্মোচিত হয়নি, তার অন্তর্দৃষ্টি আকাশ ও পৃথিবীর মহাপ্রভুকে দেখতে অক্ষম। সে দেখে না যে, এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহ সবকিছুর উপর প্রবল। পক্ষান্তরে যারা “মোশাহাদা” তথা প্রত্যক্ষকরণের স্তরে উন্নীত, আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্য নিজের কুদরত দ্বারা আকাশ ও পৃথিবীর প্রতিটি অণু-পরমাণুকে বাকশক্তি সম্পন্ন করে দেন। এ সাধকগণ এসব অণু-পরমাণু আল্লাহর উদ্দেশে যে তাসবীহ ও পবিত্রতা বর্ণনা করে, তা নিজের কানে শুনে। অবশ্য তাদের কান এরূপ কান নয়, যা ধ্বনি ব্যতীত অন্য কিছু শুনতে পারে না। এরূপ কান তো গাধারও থাকে। অতএব, যে বস্তুতে চতুষ্পদ জন্তুও শরীক, তার তেমন মূল্য নেই।




পরবর্তী পর্ব

তাওয়াক্কুলের ক্রিয়াকর্ম


তাওয়াক্কুল ও এর ফযীলত



তাওহীদ ও তাওয়াক্কুল পর্ব- ১
এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
তাওয়াক্কুল 
তাওয়াক্কুল ধর্মের মনযিল সমূহের মধ্যে একটি মনযিল এবং বিশ্বাসের মকাম সমুহের মধ্যে একটি অন্যতম মকাম। এটি জানার দিক দিয়ে যেমন অত্যন্ত সূক্ষ, আমলের দিক দিয়েও অত্যন্ত কঠিন। জানার দিক দিয়ে সূক্ষ হওয়ার কারণ, উপায়-উপকরণ ও কারণাদির উপর ভরসা করা পকৃতপক্ষে তাওহীদের পরিপন্থী এবং শিরকের নামান্তর। আবার এগুলো থেকে সম্পূর্ণ দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলেও শরীয়তের উপর আপত্তি উঠে। সুতরাং কারণাদির প্রতি দৃ্ষ্টি না দেয়া এবং এগুলোর উপর ভরসাও করা - এ বিষয়টি দুর্বোধ্য। তাই তাওয়াক্কুলের অর্থ এমন ভাবে হৃদয়ঙ্গম করা, যা তওহীদের অনুকূল। এবং বিবেক ও শরীয়তের সাথেও সামঞ্জ্যশীল হয়, নেহায়েত কঠিন ও সূক্ষ ব্যাপার। আল্লাহ্ তা'আলার অনুগ্রহে যে সকল আলেমের দৃষ্টিতে বস্তুনিচয়ের স্বরূপ প্রস্ফুটিত হয়েছে, তাদের ছারা এ সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হওয়ার সাধ্য কারো নেই। দিব্যজ্ঞানসম্পন্ন আলেমগণ দেখে জেনে নিয়েছেন এবং আল্লাহ্ তা'আলা তাদের দ্বারা য়েভাবে বর্ণনা করিয়েছেন, তারা সেভাবেই বর্ণনা করেছেন।

আমরা এই বিষয়বস্তু সম্পর্কে এখানে একটি ভূমিকা ও দুটি পরিচ্ছেদ লিপিবদ্ধ করব। ভূমিকায় তাওয়াক্কুলের ফযীলত এবং প্রথম পরিচ্ছেদে তাওহীদ এবং দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে তাওয়াক্কুল সম্পর্কে আলোচনা করা হবে।


তাওয়াক্কুলের ফযীলত-

আল্লাহ্ তা'আলা এরশাদ করেন, 

> "যদি তোমরা ঈমানদার হও তবে আল্লাহর উপর ভরসা কর"। 

> "ভরসাকারীদের আল্লাহর উপরই ভরসা করা উচিত"। 

> "যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, আল্লাহ্ তার জন্য যতেষ্ট"। 

> "আল্লাহ্ ভরসাকারীদের ভাল বাসেন"।


সুতরাং সেই মকামের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনাসাপেক্ষ নয়, সেখানে পৌছলে আল্লাহর ভালবাসা লাভ করা যায়। যার জন্যে আল্লাহ্ তা'আলা যতেষ্ট হন এবং যাকে তিনি ভালবাসেন, সে অত্যন্ত সফলকাম। কেননা যাকে ভালবাসা হয় তার আযাব হবেনা এবং সে দুরে ও অন্তরালে থাকবেনা। এক আয়াতে এরশাদ হয়েছে - 

>“আল্লাহ্ কি তার বান্দার জন্য যতেষ্ট নন”?

এ থেকে জানা গেল, যে ব্যাক্তি আল্লাহ্ ছাড়া অন্যকে যতেষ্ট মনে করবে, সে তাওয়াক্কুল বর্জনকারী হবে। আরও এরশাদ হয়েছে - 

>"যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, আল্লাহ্ পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়"। অর্থাত তিনি এমন শক্তিধর যে, কেউ তার আশ্রয়ে এলে তিনি তাকে লাঞ্ছিত করেন না। আর তিনি এমন কৌশলী যে, কেউ তার কৌশলের উপর ভরসা করলে তিনি তাকে নিরাশ করেন না।

আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন - 

>“তোমরা আল্লাহ্ ছাড়া অন্য যাদের এবাদত কর তারা তোমাদের মতই বান্দা”।

এতে বলা হয়েছে আল্লাহ ছাড়া সবাই তোমাদের মত অভাবগ্রস্ত। অতএব তাদের উপর কেমন করে ভরসা করা যায়? আরো এরশাদ হয়েছে - 

>“তোমরা আল্লাহ্ ছাড়া যাকে পূজা কর, তারা তোমাদের রুযীর মালিক নয়। অতএব তোমরা আল্লাহর কাছে রুযী অন্বেষন কর এবং তার এবাদত কর”। 

অন্যত্র বলা হয়েছে - 

>“নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের ধণভান্ডার আল্লাহরই; কিন্তু কপট বিশ্বাসীরা তা বুঝেনা”।

এসব আয়াত ছাড়াও কোরআন মজীদে তাওহীদ সম্পর্কে উল্লেখিত আয়াত সমুহে এ কথাই বলা হয়েছে যে, অন্যের প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করে প্রবল প্রতাপশালী এক আল্লাহর উপরই ভরসা কর।


তাওয়াক্কুল সম্পর্কে হাদিস—

হাদীস গ্রন্থসমূহেও তাওয়াক্কুল সম্পর্কে অনেক রেওয়ায়েত বর্ণিত রয়েছে। হযরত ইবনে মাসুদের এক রেওয়ায়েতে রসুলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী  ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন : “আমাকে হজ্জের মৌসুমে উম্মতসমুহ দেখানো হয়েছে। আমি আমার উম্মতকে দেখেছি, তাদের দ্বারা সকল পাহাড়-পর্বত, উচ্চভূমি ও নিম্নভূমি ভর্তি হয়ে গেছে। তাদের সংখ্যাধিক্য দেখে আমার বিস্ময়ের অবধি থাকেনি। অতপর আমাকে প্রশ্ন করা হল : আপনি সন্তুষ্ট হয়েছেন? আমি বললাম হ্যা অবশ্যই। অতঃপর বলা হল : এদের সাথে আরো সত্তর হাজার বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। 

সাহাবায়ে কেরাম আরয করলেন : ইয়া রাসুলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী  ওয়া সাল্লাম) তারা কারা? তিনি বললেন, যারা অঙ্গে দাগ দেয়না, ভাবী শুভাশুভ বিশ্বাস করেনা এবং নিজের পালনকর্তার উপর ভরসা করে। একথা শুনে ওকাশা ইবনে মুহসিন দাড়িয়ে আরয করলেন। ইয়া রসুলআল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী  ওয়া সাল্লাম) আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যাতে তিনি আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করে দেন। 

রসুলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী  ওয়া সাল্লাম) দোয়া করলেন হে আল্লাহ্ তাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। এর পর অপর এক ব্যক্তি দাড়িয়ে বলল : আমার জন্যও দোয়া করুন। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী  ওয়া সাল্লাম) বললেন এ দোয়ায় ওকাশা অগ্রগামী হযে গেছে।


এক হাদিসে বর্ণিত আছে  - “যদি তোমরা আল্লাহ তা'আলার উপর যথার্থ ভরসা কর তবে আল্লাহ পাখীদের মত তোমাদেরকেও রিযিক দেবেন। পাখীরা ভোরে ক্ষুধার্থ অবস্থায় নীড় ত্যাগ করে এবং সন্ধ্যায় উদরপূর্তি করে ফিরে আসে”।

এক হাদীসে বলা হয়েছে- “যে ব্যক্তি নিরবচ্ছিন্নভাবে আল্লাহ্ তা'আলার হয়ে যায়, আল্লাহ্ তাকে যাবতীয় পরিশ্রম থেকে রক্ষা করেন এবং ধারণাতীত যায়গা থেকে রিযিক দান করেন। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি দুনিয়ার হয়ে যায় আল্লাহ্ তাকে দুনিযার হাতেই ছেড়ে দেন”। 

রসুলে আকরাম (সল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন- যে ব্যক্তি সবার চাইতে অধিক বিত্তবান হওয়া পছন্দ করে, তার উচিত নিজের সামনের বস্তুর তুলনায় আল্লাহ্ তা'আলার নিকটবর্তী বস্তুর উপর অধিক ভরষা করা। বর্ণিত আছে রসুল (সল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর পরিবারের লোকজন যখন উপবাসের সন্মুখীন হতেন, তখন তিনি বলতেন : তোমরা নামাজের জন্য দাড়িযে যাও। তিনি আরও বলতেন : আমার পালনকর্তা আমাকে এ নির্দেশই করেছেন। সেই মতে কুরআন পাকে এরশাদ হয়েছে : আপনি আপনার পরিবারবর্গকে নামাজের নির্দেশ দিন এবং আপনি তাতে অটল থাকুন।


এক হাদিসে বলা হয়েছে- যে তাবীজগন্ডা করায় সে তাওয়ক্কুল করেনা। অর্থাত কুরআন মজিদ ও শরীয়তের সাধারণ নীতি অনুযায়ী তাবীজগন্ডা করানো যদিও জায়েয; কিন্তু এদিকে মোটেই ভ্রূক্ষেপ না করা তাওয়ক্কুলের দাবি।

কথিত আছে হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস্সালাম-কে যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হচ্ছিল, তখন জিবরাঈল (আঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেন : আপনার কোন প্রয়োজন আছে কি ? তিনি বললেন আছে, কিন্তু তোমার কাছে নয়। একথা বলার কারণ এই যে, তাকে যখন আগুনে নিক্ষেপ করার জন্য ধরা হয়েছিল, তখন তিনি বলেছিলেন : আল্লাহই আমার জন্য যতেষ্ট। তিনি চমৎকার কার্যনির্বাহী। এই উক্তি বাস্তবায়িত করার জন্যই তিনি জিবরাঈল (আঃ)-কে একথা বলেছিলেন। তার এই কথা রক্ষা করার প্রতি ইঙ্গিত করেই কোরআন পাকে এরশাদ হয়েছে : "সেই ইব্রাহীম, যে তার কথা রক্ষা করেছিল"।


আল্লাহ্ তা'আলা হযরত দাউদ আলাইহিস্সালাম-এর প্রতি ওহী প্রেরণ করেন যে, হে দাউদ ! যে ব্যক্তি কেবল আমার মযবুত রশি ধারণ করবে, মানুষের সাথে কোন সম্পর্ক রাখবে না, তার সাথে নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের সবাই প্রবঞ্চনা করলেও আমি তার নিষ্কৃতির পথ বের করে দিব।


তাওয়াক্কুল সম্পর্কে মনীষীগণের উক্তি

তাওয়াক্কুল সম্পর্কে মনীষীগণের উক্তি এই যে, একবার হযরত ইবরাহীম খাওয়াস এই আয়াত পাঠ করেন : আল্লা্র উপর ভরষা কর, যিনি চিরজীবী- কখনো মৃত্যুবরণ করেন না। অতঃপর তিনি বললেন : এ আয়াতের পর আল্লাহ ছারা আর কারো কাছে ভিক্ষা চাওয়া বান্দার উচিত নয়। 

জনৈক আলেম বলেন : মানবের পক্ষে নিন্দনীয় রিযিকের অন্বেষনে নিজের ফরয কর্ম থেকে গাফেল হয়ে পড়া এবং পরকালের অধঃপতন ডেকে আনা উচিত নয়। সে দুনিয়াতে রিযিক ততটুকুই পাবে যতটুকু লিখা হয়েছে। 

ইয়াহিয়া ইবনে মুয়ায বলেন : যখন মানুসের কাছে অন্বেষন ছাড়াই রিযিক আসে, তখন বুঝা যায়, রিযিকের প্রতিও মানুষ খুঝে নেয়ার নির্দেশ রয়েছে। 

ইবরাহীম ইবনে আদহাম বলেন : আমি জনৈক দুনিয়াত্যাগী দরবেশকে প্রশ্ন করলাম : তোমার রিযিকের উৎস কি? সে উত্তরে বলল : এটা আমার জানার বিষয় নয়। পরওয়ারদেগারের কাছে জিজ্ঞাসা কর, তিনি কোথা থেকে আমার রিযিক দেন (খাওয়ান)? 

হরম ইবনে হাব্বান হযরত ওয়ায়েস করণীকে জিজ্ঞেস করেন : আপনি কোথায় থাকেন ? তিনি সিরিয়ার দিকে ইশারা করলেন। হরম আবার প্রশ্ন করলেন : জীবিকা কিভাবে চলে? তিনি উত্তরে বললেন : সে সব অন্তরের জন্য পরিতাপ, যাতে সন্দেহ মিস্রিত রয়েছে। উপদেশ তাদের কি উপকার হবে ? 



পরবর্তী পর্ব

তাওহীদের মাহাত্ন্য ও স্থর


অন্তর বা হৃদয় (২০) শয়তানের বিভিন্ন রূপ



অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ২০) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

শয়তানের বিভিন্ন রূপ
আল্লাহ্ তা’আলা মানব ও জিনকে তিন শ্রেণীতে সৃষ্টি করেছেন—
হযরত আবু দারদার রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন :
“আল্লাহ তাআলা জিনকে তিন শ্রেণীতে সৃষ্টি করেছেন। 
এক শ্রেণী হচ্ছে সর্প, বিচ্ছু ও কীটপতঙ্গ। 
আরেক শ্রেণী হচ্ছে শূন্যস্থিত বায়ুর ন্যায় । 
আরেক শ্রেণীর কারণে সওয়াব ও আযাব দেয়া হয়। 
মানুষকেও আল্লাহ তাআলা তিন শ্রেণীতে সৃষ্টি করেছেন। 
এক শ্রেণী চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায়। যেমন আল্লাহ্ নিজে বলেন : তাদের অন্তর আছে, যদ্দ্বারা তারা হৃদয়ঙ্গম করে না; তাদের চক্ষু আছে, যদ্দ্বারা দেখে না এবং তাদের কর্ণ আছে, যদ্দ্বারা শ্রবণ করে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায়; বরং আরও নিকৃষ্ট। 
আরেক শ্রেণী এমন, যাদের দেহ মানুষের দেহের মত; কিন্তু আত্মা শয়তানদের মত। 
আরেক শ্রেণী তারা, যারা কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার ছায়ায় থাকবে। সেদিন আল্লাহ তাআলার ছায়া ছাড়া কোন ছায়া হবে না।
ওহায়ব ইবনুল ওরদ বলেন : শয়তান একবার হযরত ইয়াহইয়া (আঃ)-এর খেদমতে এসে বলল : 
আমি আপনাকে উপদেশ দিতে চাই। তিনি বললেন : তোর উপদেশের কোন প্রয়োজন আমার নেই। তবে আদম সন্তানদের অবস্থা বর্ণনা কর। শয়তান বলল : আমাদের কাছে আদম সন্তানরা তিন ভাগে বিভক্ত। 
এক প্রকার তারা, যাদের কাছে আমরা যাই এবং প্ররোচনা দিয়ে বশীভূত করি; কিন্তু তারা এস্তেগফার ও তওবা করতে শুরু করে। ফলে আমাদের জমানো খেলা পণ্ড হয়ে যায়। পুনরায় যদি আমরা কিছু প্রচেষ্টা চালাই, তবে তারা পরেও তাই করে। এ প্রকার মানুষ আমাদের জন্যে খুবই কঠিন। 
দ্বিতীয় প্রকার মানুষ আমাদের হাতে এমন থাকে, যেমন খেলোয়াড়ের হাতে বল থাকে। তাদেরকে আমরা যেদিকে ইচ্ছা পরিচালনা করি। এদের ব্যাপারে আমাদের কোন ভাবনা নেই। 
তৃতীয় প্রকার তারা, যারা আপনার মত নিষ্পাপ। তাদের উপর আমাদের কোন কারসাজি চলে না।
প্রকাশ থাকে যে, শয়তান আসল আকৃতিতেও দৃষ্টিগোচর হয় এবং বিভিন্ন আকৃতিতেও। তবে শয়তান সকলের দৃষ্টিগোচর হয় না। ফেরেশতাগণের অবস্থাও তদ্রূপ। তাদের আসল আকৃতিও আছে। নবুওয়তের নূর দ্বারা তাদের আসল আকৃতি দেখা যায়। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) হযরত জিব্রাঈলকে আসল আকৃতিতে মাত্র দু'বার [বা একবার] দেখেছিলেন। একবার তিনি স্বয়ং হযরত জিব্রাঈলকে তার আসল আকৃতি দেখানোর জন্যে অনুরোধ করেছিলেন। সেমতে জিব্রাঈল হেরা পর্বতে আসল আকৃতিতে আত্মপ্রকাশ করেন। দ্বিতীয়বার মেরাজের রাতে সিদরাতুল মুন্তাহায় তাকে আসল আকৃতিতে দেখেন। 
[দ্বিতীয় প্রকারের মধ্যে মতভেদ আছে। মূলত মেরাজের রাতে আল্লাহ্ তা’আলাকেই দেখেছিলেন]

এছাড়া অন্যান্য সময় জিব্রাঈল হযরত দেহইয়া কালবী (রাঃ)-এর আকৃতিতে রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর সামনে আগমন করেছেন ৷ দেহইয়া কালবী (রাঃ) নেহায়েত সুশ্রী ছিলেন।

অধিকাংশ সময় কাশফবিশিষ্ট বুযুর্গগণের সামনে আসল আকৃতির মিছাল তথা নমুনা ভেসে উঠে। উদাহরণতঃ শয়তান জাগ্রত অবস্থায় আকৃতি ধারণ করে তাদের দৃষ্টির সামনে আসে। তখন তারা শয়তানকে দেখেন এবং কথাও শুনেন। বলাবাহুল্য, কাশ্ফবিশিষ্ট বুযুর্গগণ জাগ্রত অবস্থায় এমন বিষয় জানতে পারেন, যা অন্যরা কেবল স্বপ্নেই জানতে পারে। 

হযরত ওমর ইবনে আবদুল আযীয বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার কাছে এই মর্মে দোয়া করে- ইলাহী, আমাকে মানুষের অন্তরের সেই স্থান দেখান যেখানে শয়তান থাকে। এরপর সে স্বপ্নে দেখল, এক ব্যক্তির দেহ স্বচ্ছ স্ফটিকের মত; অর্থাৎ তার ভিতরের সবকিছু বাইরে থেকে দেখা যায়। শয়তান ব্যাঙের আকৃতিতে তার বাম ঝুটিতে কাঁধ ও কানের মধ্যস্থলে বসে আছে। সে তার চিকন ও লম্বা শুঁড় লোকটির অন্তরে প্রবেশ করিয়ে সেখান থেকেই কুমন্ত্রণা দিচ্ছে। লোকটি যখন যিকর করে, তখন শয়তান সরে যায়। এমনি ধরনের ব্যাপার কখনও জাগ্রত অবস্থায় হুবহু দেখা যায়। সেমতে জনৈক কাশফবিশিষ্ট বুযুর্গ দেখেন, শয়তান কুকুরের আকৃতি ধারণ করে মৃতের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে এবং মানুষকে সেদিকে আহ্বান করছে। অর্থাৎ, তিনি দুনিয়াকে মৃতের আকারে দেখতে পান।


পরবর্তী পর্ব-
যিকিরের সময় কুমন্ত্রণা ছিন্ন হয় কি না

অন্তর বা হৃদয় (১৯) বিভিন্ন অপকর্মে বিভিন্ন শয়তান রয়েছে



অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ১৯) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

বিভিন্ন অপকর্মে বিভিন্ন শয়তান রয়েছে  
একই শয়তান মানুষকে বিভিন্ন পাপাচারের প্রতি আহ্বান করে, না আলাদা আলাদা পাপাচারের জন্যে আলাদা আলাদা শয়তান রয়েছে- এ বিষয়টি জানা এলমে মোয়ামালায় মোটেই জরুরী নয়। এখানে জরুরী হচ্ছে শয়তান থেকে আত্মরক্ষা করা এবং আপন কাজে ব্যস্ত থাকা। কথায় বলে, আম খাও- বৃক্ষ গণনা করো না। এতদসত্ত্বেও বিভিন্ন রেওয়ায়েত ও অন্তর্দৃষ্টি দ্বারা এ সম্পর্কে যা জানা গেছে, তা লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে।প্রত্যেক প্রকার গোনাহের জন্যে একটি করে নির্দিষ্ট শয়তান রয়েছে। সেই বিশেষ গোনাহের প্রতি আহ্বান করাই তার কাজ। এই হিসাব অনুযায়ী শয়তানের অসংখ্য দল রয়েছে। কেননা, ঘটনার বিভিন্নতা থেকে কারণের বিভিন্নতা জানা যায়। এ সম্পর্কিত রেওয়ায়েতগুলো নিম্নে উদ্ধৃত করা হল।
হযরত মুজাহিদ বলেন : শয়তানের সন্তান পাঁচটি। তাদের প্রত্যেককে এক এক কাজ সোপর্দ করা হয়েছে। 
এক সন্তানের নাম ছিবর। তাকে বিপদাপদের কাজ দেয়া হয়েছে। সুতরাং হা-হুতাশ করা, পরিধানের বস্ত্র ছিন্ন করা, বিলাপ করা ইত্যাদি সব তারই প্ররোচনায় হয়ে থাকে। 
দ্বিতীয় সন্তানের নাম আওয়ার। তার কাজ হচ্ছে যিনার প্রতি উস্কানি দেয়া। 
তৃতীয় মবসূত, যাকে মিথ্যাচারের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। 
চতুর্থ ওয়াসেম, সে গৃহে যেয়ে মানুষের সামনে আত্মীয়-স্বজনের দোষত্রুটি পেশ করে এবং তাকে তাদের প্রতি ক্ষুব্ধ করে তোলে। 
পঞ্চম জলম্বুর, সে বাজারে থাকে এবং সকল প্রকার গোলযোগ সংঘটিত করে। 

শয়তানের ন্যায় ফেরেশতাদের মধ্যেও প্রাচুর্য রয়েছে। হযরত আবু উমামা বাহেলীর রেওয়ায়েতে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন : 

“মুমিনের উপর একশ' ষাট জন ফেরেশতা নিয়োজিত আছে। তারা তার উপর থেকে এমন বিষয় প্রতিহত করে, যার সাধ্য তার নেই। তন্মধ্যে চোখের জন্যে সাত জন ফেরেশতা রয়েছে, যারা এমনভাবে প্রতিহত করে, যেমন গ্রীষ্মকালে মধুর পেয়ালা থেকে মাছি প্রতিহত করা হয়। যাকে প্রতিহত করা হয়, তা যদি তোমাদের দৃষ্টিগোচর হয়, তবে দেখবে, সে প্রত্যেক নিম্নভূমি ও পাহাড়ের উপর বাহু প্রসারিত এবং মুখ বিস্তৃত করে রয়েছে। যদি মুমিন বান্দাকে এক মুহূর্তের জন্যেও তার নিজের দায়িত্বে ছেড়ে দেয়া হয়, তবে শয়তানরা তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে যাবে।”

আইউব ইবনে ইউনুস বর্ণনা করেন- আমি জেনেছি, আদম সন্তানের সাথে জিন সন্তানও জন্মগ্রহণ করে। 
জাবের ইবনে আবদুল্লাহ থেকে বর্ণিত আছে- হযরত আদম (আঃ) পৃথিবীতে অবতরণ করে আল্লাহর কাছে আরজ করলেন, হে আল্লাহ, তুমি শয়তানকে আমার শত্রু করে দিয়েছ। এখন তোমার সাহায্য না হলে আমি তার বিরুদ্ধে জয়ী হতে পারব না। এরশাদ হল : তোমার যে সন্তান হবে, তার উপর একজন ফেরেশতা নিযুক্ত করা হবে। তিনি আরজ করলেন : আরও বেশী দান করা হোক। আদেশ হল : যদি কেউ একটি পাপ করে, তবে এক পাপেরই শাস্তি ভোগ করবে; কিন্তু পুণ্যের প্রতিদান দশ গুণ থেকে যত বেশী ইচ্ছা আমি দেব। এরপর আরও বেশী সাহায্যের আবেদন করলে আল্লাহ বললেন : যতক্ষণ দেহে আত্মা থাকবে, তওবার দরজা বন্ধ হবে না। অপর দিকে শয়তান আল্লাহ তা'আলার দরবারে আরজ করল : ইলাহী, তুমি মানুষকে আমা থেকে শ্রেষ্ঠ করেছ। এখন আমাকে সাহায্য করা না হলে আমি কিরূপে বিজয়ী হব? এরশাদ হল : আদমের ঘরে যে সন্তান হবে, তার সাথে সাথে তোরও সন্তান হবে। সে আরজ করল, আরও বেশী সাহায্য দান করা হোক। আদেশ হল : দেহে যেমন রক্ত চলাচল করে, তেমনি তুইও তাদের শিরা-উপশিরায় চলাচল করবি এবং তাদের বক্ষে আসন করে নিবি। শয়তান আরও সাহায্যের আবেদন করলে আল্লাহ তা'আলা বললে, “তাদের বিরুদ্ধে তোর অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী ডেকে আন। ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে তাদের শরীক হয়ে যা এবং তাদেরকে ওয়াদা দে। শয়তান তাদেরকে প্রবঞ্চনা ছাড়া কোন ওয়াদা দেয় না।



অন্তর বা হৃদয় (১৮) দোয়া কবুল না হবার কারণ


অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ১৮) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

দোয়া কবুল না হবার কারণ–
এক আয়াতে বলা হয়েছে- “তোমরা আমাকে ডাক, আমি সাড়া দেব।”- 

এই আয়াত অনুযায়ী দোয়া করা হয়, কিন্তু কবুল হয় না। এমনিভাবে আল্লাহর যিকির করার পরও শয়তান দূর হয় না। কেননা, যিকির ও দোয়ার শর্তসমূহ অনুপস্থিত থাকে। 

হযরত ইবরাহীম ইবনে আদহামকে কেউ জিজ্ঞেস করলঃ বলুন, আমাদের দোয়া কবুল হয় না কেন, অথচ আল্লাহ বলেছেন- তোমরা দোয়া কর, আমি কবুল করব? তিনি জওয়াব দিলেন, তোমাদের অন্তর মৃত। 

প্রশ্ন করা হল : অন্তর মৃত হওয়ার কারণ কি? 
তিনি বললেন : আটটি অভ্যাস এর কারণ। 
১। তোমরা আল্লাহর হক জেনেও তা পালন কর না। 
২। তোমরা কোরআন পাঠ কর, কিন্তু তদনুযায়ী আমল কর না। 
৩। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে এয়া আলিহী  ওয়া সাল্লাম)-এর মহব্বত দাবী কর; কিন্তু তাঁর সুন্নত পালন কর না। 
৪। মৃত্যুকে ভয় কর, কিন্তু তার জন্যে প্রস্তুতি গ্রহণ কর না। 
৫। আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ হচ্ছে তোমরা শয়তানকে শত্রু মনে কর; কিন্তু তোমরা গোনাহের কাজে তার সাথে মিত্রতা কর। 
৬। তোমরা দোযখকে ভয় কর বলে দাবী কর; কিন্তু নিজেকে তাতে নিক্ষেপ করেছ। 
৭। জান্নাতকে মনে প্রাণে কামনা কর; কিন্তু তার জন্যে কোন কাজ কর না। 
৮। সকালে ঘুম থেকে উঠেই নিজের দোষসমূহ পশ্চাতে ফেলে দাও, আর অন্যের দোষ খুঁজতে শুরু কর। এসব কারণে আল্লাহ তা'আলা নারাজ হয়ে গেছেন। কাজেই দোয়া কবুল করবেন কিরূপে?


অন্তর বা হৃদয় (১৭) শয়তানকে দূরে রাখার উপায়



অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ১৭) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

শয়তানকে দূরে রাখার উপায় 
এর পূর্বে পর্যন্ত অন্তরের দিকে শয়তানের প্রবেশপথ সম্পর্কে কিঞ্চিৎ বর্ণনা দেয়া হল। তার সবগুলো পথ লিপিবদ্ধ করা আমাদের সাধ্যের বাইরে। তবে জানা উচিত, মানুষের যত মন্দ স্বভাব রয়েছে, সবগুলো শয়তানের হাতিয়ার এবং প্রবেশপথ। এখন প্রশ্ন হয়, শয়তানকে দূরে রাখার উপায় কি এবং তাকে দূরে রাখার জন্যে মুখে “লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ” বলে দেয়া যথেষ্ট কি না? জওয়াব, শয়তানের সকল পথ বন্ধ করে দেয়াই অন্তরকে তার কুপ্রভাব থেকে বাঁচিয়ে রাখার উপায়। অর্থাৎ, অন্তরকে যাবতীয় মন্দ স্বভাব থেকে মুক্ত করতে হবে। এর বর্ণনা অত্যন্ত দীর্ঘ। এখণ্ডে কেবল মারাত্মক স্বভাবগুলো বর্ণনা করাই আমাদের লক্ষ্য। প্রত্যেকটি স্বভাবের জন্যে একটি আলাদা অধ্যায় জরুরী ভবিষ্যতে এর বিশদ বর্ণনা হবে।যেমন এখানে এতটুকু বলা জরুরী যে, যখন অন্তর এসব স্বভাব থেকে মুক্ত হয়ে যায়, তখন শয়তান তাতে কেবল আনাগোনাই করতে থাকে- স্থায়ীভাবে আসন গাড়ে না। আল্লাহর যিকির এই আনাগোনার পথে বাধা হয়ে যায়। কেননা, অন্তর কুস্বভাব থেকে মুক্ত হলেই যিকির তাতে স্থায়িত্ব লাভ করে, নতুবা যিকিরও কেবল আনাগোনার পর্যায়ে থেকে যায়। অন্তরের উপর তার কোন ক্ষমতা থাকে না এবং শয়তানকেও দূর করতে পারে না। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা নিম্নোক্ত আয়াতে শয়তান দূর করার বিষয়টিকে মুত্তাকীদের সাথে সম্পৃক্ত করে উল্লেখ করেছেন :

“নিশ্চয় যারা মুত্তাকী, তাদেরকে শয়তান স্পর্শ করলে তারা হুঁশিয়ার হয়ে যায়, অতঃপর তৎক্ষণাৎ চক্ষুষ্মান হয়ে যায়।”

মোট কথা, শয়তানকে ক্ষুধার্ত কুকুরের অনুরূপ মনে করতে হবে। কারও কাছে ভাত, মাংস ইত্যাদি না থাকলে কেবল 'ধ্যাৎ' বললেই সরে যাবে; কিন্তু সামনে খাদ্যসামগ্রী থাকলে ক্ষুধার্ত কুকুর অবশ্যই খাদ্যের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইবে। তখন কেবল 'ধ্যাৎ' বলে কুকুরকে সরানো যাবে না। এমনিভাবে যে অন্তরে শয়তানের খাদ্য নেই, তার কাছ থেকে শয়তান শুধু যিকির দ্বারা সরে যাবে; কিন্তু কামপ্রবৃত্তি প্রবল হলে অন্তর শয়তানের করায়ত্ত হয়ে যাবে এবং আল্লাহর যিকিরকে দূরে সরিয়ে রাখবে । মুত্তাকীদের অন্তর কুপ্রবৃত্তি ও মন্দ স্বভাব থেকে মুক্ত থাকে বিধায় তাতে শয়তানের আগমন কুপ্রবৃত্তির কারণে নয়; বরং গাফলতির কারণে হয়ে থাকে। যখন তাদের অন্তর যিকির থেকে গাফেল থাকে, তখন নিজের পথ বের করে নেয়। পুনরায় আবার যিকির শুরু করলে শয়তান হটে যায়। এর প্রমাণ, আল্লাহ তাআলা শয়তান দূর করার জন্যে বলেছেনঃ

“অতঃপর আশ্রয় প্রার্থনা কর আল্লাহর কাছে বিতাড়িত শয়তান থেকে।” এমনিভাবে যিকির সম্পর্কিত আরও অনেক আয়াত এবং হাদীস থেকে একথা প্রতীয়মান হয়। 

হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে- একবার মুমিনের শয়তান ও কাফেরের শয়তান এক জায়গায় মিলিত হল। কাফেরের শয়তান অত্যন্ত স্বাস্থ্যবান মসৃণ ও সুন্দর পোশাক পরিহিত ছিল। অপরপক্ষে মুমিনের শয়তান বিবস্ত্র, শীর্ণ ও ধূলি ধূসরিত ছিল। কাফেরের শয়তান তাকে শুধাল : তুমি এমন শীর্ণ কেন? সে বলল : আমি যার সাথে থাকি, সে পানাহার, বস্ত্র পরিধান এবং মাথায় তেল মালিশ করার সময় 'বিসমিল্লাহ' বলে। ফলে আমি খানাপানি, বস্ত্র ও তেল পাই না। তাই ক্ষুধার্ত, উলঙ্গ ও এলোকেশী হয়ে থাকি। একথা শুনে কাফেরের শয়তান বলল : ভাই, আমি যার সাথে থাকি, সে এসব কাজে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে না। তাই আমি তার সকল কাজে শরীক থাকি। 

মুহাম্মদ ইবনে ওয়াসে প্রত্যহ ফজরের নামাযের পর এই দোয়া করতেন- “হে আল্লাহ! আপনি আমাদের উপর এক শত্রুকে ক্ষমতা দান করেছেন, যে আমাদের দোষত্রুটি সম্পর্কে ওয়াকিফহাল। সে এবং তার দলবল আমাদেরকে এমন জায়গা থেকে দেখে, যেখান থেকে আমরা তাদেরকে দেখি না। হে আল্লাহ! অতএব আপনি তাকে আশা থেকে নিরাশ করুন, যেমন তাকে আপনার রহমত থেকে নিরাশ করেছেন। তাকে আমাদের থেকে হতাশ করুন, যেমন আপনার ক্ষমা থেকে হতাশ করেছেন। তার মধ্যে ও আমাদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করুন, যেমন তার মধ্যে ও আপনার রহমতের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করেছেন।” তিনি বলেন: একদিন মসজিদের পথে শয়তানের সাথে আমার সাক্ষাৎ হল। সে জিজ্ঞেস করল: আমাকে চেনেন? আমি বললামঃ তুমি কে? সে বলল, আমি ইবলীস। আমি শুধালাম : কি উদ্দেশে এসেছ? সে বলল : আমি চাই আপনি এই দোয়া কাউকে না শেখান। আমি আপনার পথে কণ্টক হব না। আমি বললাম : আমি কাউকে নিষেধ করব না। যে কেউ পড়তে পারে। তোমার মনে যা চায় তাই কর। 

হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবী লায়লা বলেন : এক শয়তান রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে এয়া আলিহী  ওয়া সাল্লাম)-এর সামনে নামাযের অবস্থায় আগুনের মশাল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। কেরাআত ও এস্তেগফারের পরও সে সরে যেত না। এরপর হযরত জিবরাঈল (আঃ) রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে এয়া আলিহী  ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে এসে আরজ করলেন : আপনি এই দোয়া পাঠ করুন “আমি আল্লাহ তাআলার পরিপূর্ণ কালেমাসমূহ দ্বারা আশ্রয় প্রার্থনা করি, যেগুলোর খেলাফ করে না সাধু ও অসাধুরা - সেই বস্তুর অনিষ্ট থেকে, যা পৃথিবীতে প্রবেশ করে এবং পৃথিবী থেকে নির্গত হয়, যা আকাশ থেকে অবতীর্ণ হয় এবং আকাশে উত্থিত হয়, আর দিবারাত্রির ফেতনার অনিষ্ট থেকে এবং দিবারাতে আগত দুর্ঘটনার অনিষ্ট থেকে।”রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে এয়া আলিহী  ওয়া সাল্লাম) এই দোয়া পাঠ করলে শয়তানের মশাল নিভে যায় এবং সে উপুড় হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। 

হযরত হাসান বসরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে- হযরত জিব্রাঈল (আঃ) রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে এয়া আলিহী  ওয়া সাল্লাম)-এর খেদমতে এসে আরজ করলেন, “এক শয়তান আপনার সাথে প্রতারণা করতে চায়। আপনি যখন শয্যা গ্রহণ করেন, তখন আয়াতুল কুরসী পড়ে নেবেন।”

হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে - “আমার কাছে শয়তান এসে বাদানুবাদ শুরু করলে আমি তার গলা টিপে ধরলাম। আল্লাহর কসম! আমি তাকে ততক্ষণ ছাড়িনি, যতক্ষণ না তার থুথুর শীতলতা আমার হাতে অনুভব করলাম। যদি আমার ভাই সোলায়মান (আঃ) দোয়া না করতেন, তবে সে মসজিদে ভূতলশায়ী হয়ে থাকত।”

আরও বর্ণিত আছে - “হযরত ওমর (রঃ) যে পথে চলেছেন, সেই পথে শয়তান চলেনা” এর কারণ, তাঁর অন্তর শয়তানের প্রবেশপথ ও খাদ্য থেকে পবিত্র ছিল অর্থাৎ খাহেশের কোন দখল ছিল না। সুতরাং যদি অন্য কোন ব্যক্তি যিকির দ্বারা হযরত ওমর (রাঃ)-এর ন্যায় শয়তানকে দূরে রাখতে চায়, তবে এটা অসম্ভব। উদাহরণতঃ কোন ব্যক্তি ওষুধ সেবন করে কিন্তু পরহেয করে না; অথচ পাকস্থলী দূষিত পদার্থে পরিপূর্ণ। এমতাবস্থায় ওষুধের উপকার আশা করা যায় না। এখানে যিকরকে ওষুধ এবং তাকওয়াকে পরহেয মনে করতে হবে। যে অন্তর আল্লাহ ছাড়া অন্য সবকিছু থেকে মুক্ত, যিকির দ্বারা সেই অন্তর থেকে শয়তান দূর হবে।

আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেন - “নিশ্চয় এতে চিন্তার বিষয় আছে তার জন্যে, যার অন্তর আছে।” সুতরাং যদি কেউ শয়তান থেকে মুক্তি পেতে চায়, তবে তাকে প্রথমে তাকওয়ার পরহেয অবলম্বন করতে হবে, এরপর যিকিরের ওষুধ সেবন করতে হবে। তাহলেই শয়তান তার কাছ থেকে পলায়ন করবে, যেমন হযরত ওমর (রাঃ)-এর কাছ থেকে পলায়ন করেছিল। 

ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বেহ বলেন : “আল্লাহকে ভয় কর এবং বাহ্যত শয়তানকে মন্দ বলো না, যখন অন্তরে তুমি তার বন্ধু অর্থাৎ আজ্ঞাবহ।”


অন্তর বা হৃদয় (১৬) শয়তানের প্রবেশপথ সমুহ



অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ১৬) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

শয়তানী পথসমূহের কিঞ্চিৎ বিবরণ 
জানা দরকার, মানুষের অন্তর একটি দুর্গ সদৃশ। দুশমন শয়তান এর অভ্যন্তরে প্রবেশ করে একে করতলগত করতে চায়। এখন যদি দুর্গের দ্বারসমূহের হেফাযত করা হয় এবং শয়তানের প্রবেশপথে পাহারা বসানো হয়, তবে অন্তর বিপদ মুক্ত থাকবে, কিন্তু যে ব্যক্তি এর দ্বার সম্পর্কেই অজ্ঞ, সে হেফাযত করতেও অক্ষম। অন্তরকে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে রক্ষা করা ওয়াজিব। বরং প্রত্যেক বুদ্ধিমান বালেগ বান্দার উপর ফরযে আইন। যে কাজ ফরযে আইন আদায় করার উপায় হয়, তাও ওয়াজিব। এ থেকে জানা গেল, শয়তানী পথ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা ওয়াজিব। বলাবাহুল্য, এসব পথ হচ্ছে বান্দার অন্তহীন স্বভাব ও অভ্যাস, কিন্তু আমরা এখানে কয়েকটি বড় বড় পথের পরিচয় তুলে ধরব। যেগুলোতে শয়তানী লশকরসমূহের অধিক ভিড় থাকে।

>> শয়তানের প্রথম প্রবেশপথ হচ্ছে কাম ও ক্রোধ। 
কেননা, ক্রোধের কারণে জ্ঞানবুদ্ধি রহিত হয়। জ্ঞানবুদ্ধি স্তিমিত হওয়ার সাথে সাথে শয়তানের হামলা শুরু হয়ে যায়। মানুষ যখন ক্রুদ্ধ হয়, তখন শয়তান তাকে নিয়ে এমন খেলা করে, যেমন শিশুরা বল নিয়ে খেলা করে। বর্ণিত আছে, ইবলীস হযরত মূসা (আঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করে আরজ করল : আপনাকে তো আল্লাহ তাআলা রসূল করেছেন এবং বাক্যালাপের গৌরব দান করেছেন। আমিও তাঁরই সৃজিত। আমা দ্বারা একটি পাপ হয়ে গেছে। এখন আমি তওবা করতে চাই। তওবা কবুল হওয়ার জন্যে আপনি আল্লাহর কাছে আমার পক্ষ থেকে সুপারিশ করুন। হযরত মূসা (আঃ) তার প্রার্থনা কবুল করলেন। তিনি যখন তূর পর্বতে গমন করে আল্লাহর সাথে কথা বলার পর প্রস্থানোদ্যত হলেন, তখন রাব্বুল ইযযত এরশাদ করলেন : হে মূসা! অঙ্গীকার পূর্ণ কর। মূসা (আঃ) আরজ করলেন : হে আল্লাহ! তোমার বান্দা ইবলীস চায়, তার তওবা কবুল হোক। এরশাদ হল : ইবলীস আদমের কবর সেজদা করলে তার তওবা কবুল হবে। হযরত মূসা (আঃ) ফিরে এসে ইবলীসকে বললেনঃ তোমার সাথে কৃত অঙ্গীকার আমি পূর্ণ করেছি। আদেশ হয়েছে, আদমের কবর সেজদা করলে তোমার তওবা কবুল হবে। অভিশপ্ত শয়তান একথা শুনে ক্রুদ্ধ হল এবং অহংকার সহকারে বলতে লাগল : আমি জীবদ্দশায় যাকে সেজদা করিনি, মৃত্যুর পর কেন তার কবর সেজদা করতে যাব? কিন্তু আপনি আল্লাহর কাছে আমার জন্যে সুপারিশ করেছেন, তাই আমার কাছে আপনার হক আছে। আমি একটি বিষয় বলে দিচ্ছি। তিনটি ক্ষেত্রে আপনি আমাকে স্মরণ করবেন। এতে আমি আপনার কোন ক্ষতি করতে পারব না। 
এক : ক্রোধের অবস্থায়; কেননা, আমার আত্মা আপনার অন্তরে এবং আমার চোখ আপনার চোখে রয়েছে। দেহের যে যে অংশে রক্ত চলাচল করে, আমি সেখানে চলাচল করি। কাজেই ক্রোধের অবস্থায় আমাকে অবশ্যই স্মরণ করবেন। মানুষ যখন ক্রুদ্ধ হয়, তখন আমি তার নাকে ফুঁ দিয়ে দেই। এর পর আমি কি করি, না করি, সে কিছুই টের পায় না। 
দুই : যুদ্ধের সারিতে আমাকে স্মরণ করবেন। কেননা, যুদ্ধের সারিতে আমি যোদ্ধাকে তার বাড়ী-ঘর, স্ত্রী ও সন্তানদের কথা স্মরণ করিয়ে দেই; যাতে সে পলায়ন করে। 
তিন : আরও স্মরণ রাখবেন, বেগানা নারীর কাছে তার মাহরামের অনুপস্থিতিতে কখনও বসবেন না। কারণ, তখন আমি আপনার ও তার মধ্যে পয়গামবাহক হয়ে যাই. যাতে উভয়ে অপকর্মে লিপ্ত হয়। 
মোট কথা, ইবলীস এতে কামপ্রবৃত্তি, ক্রোধ ও লোভের প্রতি ইঙ্গিত করেছে। কেননা, আদম (আঃ)-কে মৃত্যুর পর সেজদা না করার কারণ ছিল প্রতিহিংসা এবং যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করার কারণ হয় দুনিয়ার লোভ। এগুলো হচ্ছে শয়তানের বড় বড় প্রবেশপথ।
অনুরূপভাবে জনৈক ওলী থেকে বর্ণিত আছে, তিনি ইবলীসকে জিজ্ঞেস করলেন : মানুষের মনের উপর তুমি কখন প্রবল হও? ইবলীস জওয়াব দিল : ক্রোধ ও খাহেশের সময় আমি তাকে চেপে ধরি। 
কথিত আছে, শয়তান বলে- মানুষ আমার উপর কোনরূপেই প্রবল হতে পারে না। কেননা, সে যখন হাস্যরত ও আনন্দিত থাকে, তখন আমি তার অন্তরে থাকি আর যখন ক্রুদ্ধ হয়, তখন উড়ে তার মাথায় পৌঁছে যাই।

>> শয়তানের দ্বিতীয় বড় প্রবেশপথ হচ্ছে হিংসা ও মোহ। 
এই মোহ মানুষকে অন্ধ ও বধির করে দেয়। হাদীসে আছে : “বস্তুর মহব্বত ও মোহ তোমাকে অন্ধ এবং বধির করে দেয়।” 
হিংসা ও মোহের কারণে যখন জ্ঞানের আলো বিদূরিত হয়ে যায়, তখন মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ে। তখনই শয়তান সুযোগ পায় এবং মোহের বস্তুকে তার দৃষ্টিতে সুন্দর ও সুশ্রী করে দেখায়, যদিও তা বাস্তবে কুশ্রী হয়। হযরত নূহ (আঃ) যখন নৌকায় সওয়ার হন, তখন আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী প্রত্যেক বস্তুর একটি করে জোড়া তাতে তুলে নেন। নৌকার মধ্যে তিনি জনৈক অপরিচিত বৃদ্ধকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন : তুমি নৌকায় সওয়ার হলে কেন? সে আরজ করল : আপনার সঙ্গীদের অন্তর নিতে এসেছি। তাদের দেহ আপনার সাথে থাকবে আর অন্তর আমার সাথে। হযরত নূহ (আঃ) বললেন : তুমি তো আল্লাহর দুশমন বিতাড়িত শয়তান। বের হয়ে যাও এখান থেকে। সে আরজ করল: পাঁচটি বিষয় দ্বারা আমি মানুষের সর্বনাশ করব। তন্মধ্যে তিনটি আপনাকে বলে দেব দু'টি বলব না । ইতিমধ্যে ওহী এল, যে তিনটি বিষয় সে আপনাকে বলতে চায়, সেগুলোর কোন প্রয়োজন নেই। সে দুটি বিষয় জিজ্ঞেস করুন, যেগুলো সে গোপন করতে চায়। তিনি দুটি বিষয় জিজ্ঞেস করলে শয়তান বলল : দু'টি বিষয় হচ্ছে হিংসা ও লোভ। এ দুটি বিষয় কখনও আমারে ধোকা দেয় না এবং মানুষকে ধ্বংস করার কাজে ভুল করে না। হিংসা তো এমন বিষয়, যদ্দ্বারা আমি অভিশপ্ত ও বিতাড়িত শয়তান হয়েছি। আর লোভ এমন জিনিস যে, আদমের জন্যে একটি বৃক্ষ ছাড়া গোটা জান্নাত বৈধ হয়েছিল; কিন্তু আমি লোভের সাহায্যেই কার্য সিদ্ধ করেছি এবং আদমকে জান্নাত থেকে বহিষ্কার করেছি।

>> উদরপূর্তি শয়তান প্রবেশের তৃতীয় পথ—
শয়তানের প্রধান প্রধান প্রবেশপথসমূহের মধ্যে একটি হচ্ছে উদরপূর্তি করে আহার করা- যদিও তা হালাল এবং পবিত্র আহার্য বস্তু দ্বারা হয়। কেননা, উদরপূর্তির কারণে কামভাব সতেজ হয়। কামভাব শয়তানের হাতিয়ার। 
বর্ণিত আছে, ইবলীস অনেকগুলো ফাঁদ হাতে নিয়ে ইয়াহইয়া (আঃ)-এর সামনে উপস্থিত হল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন : এই ফাঁদ কেন? সে আরজ করল : এগুলো হচ্ছে কামপ্রবৃত্তি, যদ্দ্বারা আমি মানুষকে কাবু করি। 
হযরত ইয়াহইয়া শুধালেন : এতে আমার জন্যেও কোন ফাঁদ আছে কি? ইবলীস জওয়াব দিল : হাঁ, আপনি যখন উদরপূর্তি করে আহার করেন, তখন আমি আপনার জন্যে নামায ও যিকির ভারী করে দেই। তিনি আবার শুধালেন : এ ছাড়া আরও কিছু আছে কি? ইবলীস বলল : না। তিনি বললেন : আমিও শপথ করে বলছি, কখনও উদরপূর্তি করে আহার করব না। শয়তান বলল, : আমিও শপথ করছি, মুসলমানের সাথে কখনও শুভেচ্ছার কথা বলব না।
 কথিত আছে, পেট ভরে আহার করার কুফল ছয়টি। 

>প্রথম, এতে অন্তর থেকে আল্লাহর ভয় দূর হয়ে যায়। 
>দ্বিতীয়, এতে মানুষের প্রতি দয়া ও অনুকম্পা থাকে না। কেননা, সে সকলকে ভরা পেট মনে করে। 
>তৃতীয়, আল্লাহ তাআলার এবাদত কঠিন হয়ে যায়। 
>চতুর্থ, জ্ঞানের কথাবার্তা শুনে অন্তর নরম হয় না। 
>পঞ্চম, অপরকে উপদেশ দিলে তাতে কারও অন্তর প্রভাবিত হয় না। 

>ষষ্ঠ, উদর রোগব্যাধির আবাসস্থল হয়ে যায়।
>>শয়তানের আর একটি বড় পথ হচ্ছে সুন্দর জাঁকজমকপূর্ণ আসবাবপত্র, পোশাক-পরিচ্ছদ, গৃহ ইত্যাদি পছন্দ করা। 

শয়তান যখন এ বিষয়টি মানুষের মধ্যে প্রবল দেখে, তখন সে সর্বদাই প্ররোচিত করে যে, গৃহ খুব উঁচু ও প্রশস্ত তৈরী করে তার ছাদ ও প্রাচীরসমূহ সজ্জিত করা উচিত। এমনিভাবে পোশাক ও সওয়ারীও খুব জাঁকজমকপূর্ণ হওয়া দরকার। এর পর সারাজীবন এতেই নিয়োজিত রাখে। শয়তান একবার মানুষকে এতে নিয়োজিত দেখলে পুনরায় তার কাছে আসার প্রয়োজনও অনুভব করে না। কেননা, মানুষের শখ আপনা-আপনি এক জিনিস থেকে অন্য জিনিসে ছড়িয়ে পড়ে। অবশেষে এই কামনা-বাসনা নিয়েই দুনিয়া থেকে বিদায় হয়ে যায়। এতে পরকালের সর্বনাশ এবং কুফরেরও আশংকা আছে।
শয়তানের অন্যতম প্রবেশপথ হচ্ছে অপরের কাছে লোভ করা। 
কেননা, অন্তরে লোভ প্রবল হলে শয়তান শিক্ষা দেয় যে, যার কাছে লোভ করা হয়, তার সামনে খুব সাজসজ্জা ও লৌকিকতা প্রকাশ করতে হয়। ফলে তার সামনে এত রিয়া করা হয়, যেন সেই তার মাবুদ ও উপাস্য। তার দৃষ্টিতে প্রিয়পাত্র হওয়ার কৌশল উদ্ভাবনে সে সর্বদা সচেষ্ট থাকে। তার প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করে এবং সৎকাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধের স্থলে জেনেশুনে চুপ করে থাকে। 

হযরত সফওয়ান ইবনে সলীম (রহঃ) রেওয়ায়েত করেন, একবার ইবলীস আবদুল্লাহ্ ইবনে হানযালার সামনে এসে বলল : আমি তোমাকে একটি বিষয় শিখিয়ে দিচ্ছি- মনে রাখবে। তিনি বললেন : তোমার কাছে কিছু শেখার প্রয়োজন আমার নেই। সে বলল : ভাল কথা হলে মনে রাখবে, নতুবা আমার মুখের উপর ছুঁড়ে মারবে। কথা হচ্ছে, আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারও কাছে লোভের কোন বস্তু চাইবে না।
কাজেকর্মে তড়িঘড়ি করা এবং দৃঢ়তা বর্জন করাও শয়তানের একটি প্রবেশপথ। 
হাদীসে বলা হয়েছে -“তাড়াহুড়া করা শয়তানের কাজ এবং ধীরে-সুস্থে কাজ করা আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়।” 
এর কারণ হচ্ছে, কাজকর্ম ভেবেচিন্তে করা উচিত। এর জন্যে বিচার-বিবেচনা ও সময়ের প্রয়োজন। তাড়াহুড়ার মধ্যে এটা সম্ভবপর নয়। তড়িঘড়ির মধ্যে শয়তান মানুষের উপর অনিষ্ট চাপিয়ে দেয়; অথচ মানুষ টেরও পায় না। বর্ণিত আছে, যখন হযরত ঈসা (আঃ) ভূমিষ্ঠ হন, তখন শয়তান ইবলীসের কাছে এসে বলল : আজ সকল মূর্তি উপুড় হয়ে গেছে, ব্যাপার কি? ইবলীস বলল : মনে হয় নতুন কোন ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। তুমি এখানেই থাক। আমি দেখছি ব্যাপার কি? ইবলীস তখনি ভূপৃষ্ঠে উড়ে গেল; কিন্তু অনেক হন্যে হয়েও কিছু জানতে পারল না। এর পর দেখল, হযরত ঈসা (আঃ) জন্মগ্রহণ করেছেন এবং ফেরেশতারা তাঁকে ঘিরে রেখেছে। ইবলীস তার দলের মধ্যে ফিরে এসে বলল : গতরাত্রে একজন পয়গম্বর জন্মগ্রহণ করেছেন। অথচ যে কোন মহিলা গর্ভবতী হয় অথবা সন্তান প্রসব করে, আমি সেখানে উপস্থিত থাকি, কিন্তু এই শিশুর জন্ম সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। মনে হয় আজ থেকে মূর্তিপূজার আসর তেমন জমবে না। কাজেই তোমরা তড়িঘড়ির সময় মানুষকে বিভ্রান্ত কর।

>>শয়তানের আরেকটি বড় পথ হচ্ছে টাকা-পয়সা, আসবাবপত্র, বিষয় সম্পত্তি ইত্যাদি। 
এসব বস্তু যখন প্রয়োজনের অতিরিক্ত হয়, তখন এগুলোর উপর শয়তানের পাহারা বসে। কোন সচ্ছল ব্যক্তির হাতে যদি অতিরিক্ত একশ' করে টাকা এসে যায়, তবে তার মনে দশটি এমন খাহেশ মাথাচাড়া দিয়ে উঠে, যার প্রত্যেকটি পূর্ণ করার জন্যে একশ' টাকার প্রয়োজন হয়। ফলে তার কাছে যে পরিমাণ টাকা থাকে, তা দ্বারা কার্যোদ্ধার হয় না; বরং আরও নয়শ' টাকার প্রয়োজন হয়। অথচ যখন একশ' টাকাও ছিল না, তখন সে সচ্ছল ও পরাঙ্মুখ ছিল। সে কেবল মনে করে, একশ' টাকা পেয়ে ধনী হয়ে গেছে; কিন্তু এটা বুঝে না যে, একশ' টাকা পাওয়ার কারণে আরও নয়শ টাকার অভাবে পড়ে গেছে। এমনিভাবে অধিকতর বস্তুর চিন্তা করতে করতে পরিণামে সে জাহান্নামের যোগ্য হয়ে যায়।

হযরত সাবেত বানানী (রহঃ) বর্ণনা করেন, যখন রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী  ওয়া সাল্লাম) রেসালতপ্রাপ্ত হন, তখন ইবলীস তার সাঙ্গপাঙ্গকে বলল : নতুন কিছু ঘটেছে খোঁজ কর। অমনি শয়তানের দল এদিক-ওদিক ছুটে গেল। অবশেষে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসে বলল : আমরা কিছুই জানতে পারলাম না। ইবলীস বলল : তোমরা এখানে থাক, আমি খবর আনছি। এর পর সে খবর আনল, আল্লাহ তাআলা মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী  ওয়া সাল্লাম)-উনাকে পয়গম্বর করে পাটিয়েছেন। এখন তোমরা তাঁর অনুচরদের খবর নাও। শয়তানের দল নিরাশ হয়ে ফিরে এসে বলল : এমন লোক আমরা কখনও দেখিনি। যদি আমরা তাদের দ্বারা কোন গোনাহ করিয়ে নেই, তারা অমনি নামাযে দাঁড়িয়ে যায়। ফলে তাদের সকল গোনাহ্ মিটে যায়। ইবলীস বলল : অধীর হয়ো না; কিছু দিন অপেক্ষা কর। যখন তারা দেশ-বিদেশ জয় করবে এবং দুনিয়া তাদের হাতে আসবে, তখন আমাদের কার্য সিদ্ধ হবে।
বর্ণিত আছে, একদিন হযরত ঈসা (আঃ) একটি প্রস্তরখণ্ড মাথার নীচে রেখে দেন। ইবলীস তাঁর কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় বলতে লাগল : হযরত, আপনিও দেখা যায় দুনিয়ার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন। তিনি তৎক্ষণাৎ প্রস্তরখণ্ডটি দূরে নিক্ষেপ করে বললেন : এটা দুনিয়াসহ তোর জন্যই। চিন্তা করলে দেখা যায়, যার কাছে বালিশের জায়গায় পাথর থাকে, তার এতটুকু দুনিয়া তো অর্জিত হয়ে যায়, যদ্দ্বারা শয়তান আঘাত হানতে সক্ষম হয়। উদাহরণতঃ যদি কেউ তাহাজ্জুদ পড়ার জন্যে উঠে এবং তার নিকটে একটি পাথরও থাকে, তবে শয়তান অবশ্যই তার মনে একথা জাগ্রত করবে যে, এই পাথরে একটু হেলান দিয়ে নেই।

এমতাবস্থায় ঘুমের প্রতি আকর্ষণ হয়ে যাবে। কেননা, কথায় বলে, গাড়ী দেখলে পা ফুলে। যদি কাছে পাথর না থাকত, তবে মনে এই কল্পনা জাগত না এবং ঘুমের প্রতিও আকর্ষণ হত না। এ হচ্ছে পাথরের অবস্থা, কিন্তু যার কাছে বড় বড় বালিশ, তুলতুলে ফরাশ এবং আরাম-আয়েশের সর্বোত্তম উপকরণ রয়েছে, সে আল্লাহর এবাদত করে কি স্বাদ পেতে পারে?
>>শয়তানের আরেকটি বড় প্রবেশপথ হচ্ছে কৃপণতা ও দরিদ্র হয়ে যাওয়ার ভয়। 
এ বিষয়টি মানুষকে সদকা, খয়রাত ইত্যাদি কিছুই করতে দেয় না। বরং ধন-সম্পদ স্তূপীকৃত করতে ও পুঁতে রাখতে উৎসাহিত করে। এরূপ লোকদের জন্যে কোরআন মজীদে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির হুমকি উচ্চারিত হয়েছে। খায়সামা ইবনে আবদুর রহমান বলেন : শয়তান বলে, মানুষ আমার উপর যতই প্রবল হোক না কেন, তিনটি বিষয়ে আমার অবাধ্য হতে পারে না। এ ক্ষেত্রে আমি যা বলি, সে তাই করে। এক, অন্যায়ভাবে কারও ধন-সম্পদ গ্রহণ করা। দুই, ধনসম্পদ অযথা ব্যয় করা এবং তিন, যেখানে ব্যয় করা প্রয়োজন, সেখানে ব্যয় না করা। 

আবু সুফিয়ান (রহঃ) বলেন : দারিদ্র্যের ভয় দেখানোর চেয়ে বড় কোন হাতিয়ার শয়তানের কাছে নেই। মানুষ এটা মেনে নিলে অন্যায়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যায় এবং সত্য বিষয় থেকে বিরত থাকে। সে কেবল মতলবের কথাই বলে এবং আল্লাহ তাআলার প্রতি কুধারণা পোষণ করতে থাকে। ধনসম্পদ পুঞ্জীভূত করার জন্যে শয়তানের আড্ডা বাজারে উপস্থিত থাকাও কৃপণতা ও লালসার অন্যতম আপদ। হযরত আবু উমামা (রাঃ)-এর রেওয়ায়েতে রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী  ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন : ইবলীস পৃথিবীতে অবতরণ করে পরওয়ারদেগারের কাছে আবেদন করল : ইলাহী, তুমি আমাকে পৃথিবীতে নামিয়ে দিয়ে আপন রহমত থেকে বিতাড়িত করেছ। এখন আমার থাকার জায়গা কোথায়? আল্লাহ বললেন :  হাম্মাম (স্নানাগার) তোর থাকার জায়গা। ইবলীস বলল : আমার জন্য একটি বৈঠকখানাও নির্দেশ করা হোক। এরশাদ হল : বাজার ও চৌরাস্তা তোর বৈঠকখানা। ইবলীস আরজ করল : আমার খোরাক কি হবে? উত্তর হল : যে খাদ্যের উপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয় না, সেটাই তোর খোরাক। ইবলীস আরজ করল: আমাকে পানীয় দান করুন। জওয়াব হল: নেশার বস্তু তোর পানীয়। ইবলীস আরজ করল : আমাকে একটি সংবাদ মাধ্যমও প্রদান করা হোক। এরশাদ হল : বাদ্যযন্ত্র তোর সংবাদ মাধ্যম। ইবলীস আরজ করল : আমার শিকার ক্ষেত্র কোনটি হবে?আল্লাহ বললেন: মহিলারা তোর শিকার ক্ষেত্র।

>>মত ও পথ সম্পর্কিত বিদ্বেষও শয়তানের একটি বড় প্রবেশপথ।

এর সারকথা হচ্ছে, নিজের বিরুদ্ধে মতামত পোষণকারীদের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন হওয়া ও তাদেরকে ঘৃণার চোখে দেখা। এই দোষ দ্বারা শয়তান আব্দে ফাসেক উভয়েরই সর্বনাশ করে থাকে। কেননা, অন্যের প্রতি দোষারোপ করা এবং তার কুকীর্তি বর্ণনা করা মানুষের একটি সহজাত প্রবৃত্তি। যখন শয়তান এ প্রবৃত্তিকে মানুষের দৃষ্টিতে হক সাব্যস্ত করে, তখন অন্তরে এর প্রতি মোহ জন্মে যায় এবং মানুষ সর্বপ্রযত্নে এতে আত্মনিয়োগ করে। সে মনে করে, সে ধর্মের খেদমত করছে। অথচ বাস্তবে সে শয়তানের অনুসরণ করে। 

উদাহরণতঃ এক ব্যক্তি হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর মহব্বতের ব্যাপারে অপরের প্রতি বিদ্বেষভাবাপন্ন; কিন্তু নিজে হারামখোর, মিথ্যাবাদী ও কলহপ্রিয়। তাকে হযরত আবুবকর রাঃ) দেখলে নিজের বড় শত্রু জ্ঞান করতেন। কেননা, তাঁর বন্ধু সেই ব্যক্তি হবে, যে তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করে, তাঁর ভাবাদর্শ মেনে চলে এবং বাজে কথাবার্তা থেকে রসনা সংযত রাখে। যেমন- হযরত আবু বকর (রাঃ) নিজে অনর্থক কথাবার্তা থেকে আত্মরক্ষার জন্যে মুখে কংকর পুরে রাখতেন। সুতরাং উপরোক্ত ব্যক্তি তাঁর আদর্শ অনুসরণ না করে কিরূপে তাঁর মহব্বত দাবী করতে পারে? অনুরূপভাবে কোন কোন লোক হযরত আলী (রাঃ)-এর মহব্বতের ব্যাপারে অপরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, অথচ নিজে রেশমী বস্ত্র পরিধান করে এবং হারাম ধসসম্পদ দ্বারা খুব জাঁকজমক প্রকাশ করে। অথচ হযরত আলী (রাঃ) খেলাফত আমলেও এমন বস্তু গরিধান করেছেন, যার মূল্য এক টাকার চেয়েও কম ছিল। সুতরাং এমন ব্যক্তির প্রতি তিনি কিরূপে প্রসন্ন হবেন? বরং কেয়ামতের দিন এ ব্যক্তি তাঁর দুশমন হবে।
সারকথা, শয়তানী কল্পনাবিলাসের ফলে এসব লোকের মনে এ ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গেছে যে, যে কেউ হযরত আবু বকর ও হযরত আলী (রাঃ)-এর মহব্বত নিয়ে মৃত্যুবরণ করবে, সে দোযখের অগ্নি থেকে বেঁচে থাকবে। তারা এ হাদীসটি দেখে না যে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) তাঁর কলিজার টুকরা হযরত ফাতেমা (রাঃ)-কে এরশাদ করেনঃ “নিজে আমল কর। কেননা, আমি আল্লাহর সামনে তোমার কোন উপকার করতে পারব না।” তাদের অবস্থাও তদ্রূপ, যারা ইমাম আবু হানীফা, ইমাম শাফেঈ, ইমাম মালেক ও ইমাম আহমদ (রদিয়াল্লাহু আনহুম)-এর ব্যাপারে বিদ্বেষ প্রকাশ করে। অতএব যারা কোন এক ইমামের মাযহাব দাবী করে এবং তাঁর জীবনাদর্শ অবলম্বন করে না, কেয়ামতের দিন সেই ইমামই তাদের বিরুদ্ধে গিয়ে জিজ্ঞেস করবেন : আমার মাযহাব তো আমল ছিল- বাগাড়ম্বর ছিল না। তুমি আমার আমলের বিরুদ্ধাচরণ করলে কেন? 

হযরত হাসান বসরী (রহঃ) এরশাদ করেন যে, শয়তান বলে, আমি উম্মতে মুহাম্মদীর জন্যে যেসকল পাপকর্ম সজ্জিত করেছি, সেগুলোতে তারা আল্লাহর কাছে এস্তেগফার অর্থাৎ ক্ষমা প্রার্থনা করে আমার কোমর ভেঙ্গে দিয়েছে। এর পর আমি এমন গোনাহ্ গড়ে দিয়েছি, যাতে তারা এস্তেগফার করবে না। তা হচ্ছে মনের খাহেশ, যা ধর্মের কাজ মনে করে করা হয়। অভিশপ্ত শয়তানের এ উক্তি সম্পূর্ণ সত্য। কেননা, এ ধরনের কাজে মানুষ জানেই না যে, পরিণামে নাফরমানী হচ্ছে। জানলে তারা অবশ্যই এস্তেগফার করত।
>>শয়তানের আরেকটি বড় কৌশল, মানুষ আপনা আপনি অপরের পারস্পরিক বিরোধ ও কলহের মধ্যে লেগে যায়। 
সেমতে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মসউদ (রাঃ) বলেন : একদল লোক আল্লাহর যিকিরে মশগুল ছিল। শয়তান চাইল, তারা এখান থেকে প্রস্থান করুক এবং বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ুক, কিন্তু কিছু করতে না পেরে সে অপর একটি দলের মধ্যে ভিড়ে গেল, যারা সাংসারিক কথাবার্তায় ব্যাপৃত ছিল। সে তাদের মধ্যে গোলমাল সৃষ্টি করে দিল। ফলে খুনখারাবী শুরু হয়ে গেল। এতে প্রথম দল যিকির ভঙ্গ করে চলে গেল এবং তাদের মধ্যে আপস-মীমাংসা করে দিল। এখানে শেষোক্ত দলে খুনখারাবী হোক- এটা শয়তানের উদ্দেশ্য ছিল না; বরং প্রথম দলকে স্থানত্যাগে বাধ্য করাই তার লক্ষ্য ছিল।

>>শয়তানের এক তরীকা হচ্ছে, সে অনভিজ্ঞ জনসাধারণকে আল্লাহ তাআলার সত্তা, গুণাবলী এবং এমন বিষয়সমূহের আলোচনায় জড়িয়ে ফেলে, যা তাদের বোধগম্য নয়। 

ফলে তারা মূল ধর্ম সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে পড়ে। তারা আল্লাহ সম্পর্কে এমন ধারণা করতে থাকে, যা কুফর ছাড়া কিছু নয়। হযরত আয়েশার (রাঃ) রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন : “শয়তান তোমাদের কারো কাছে এসে বলেঃ তোমাকে কে সৃষ্টি করেছে? সে উত্তরে বলে : আল্লাহ তাআলা। এর পর শয়তান জিজ্ঞেস করে : আল্লাহ তাআলাকে কে সৃষ্টি করেছে? তোমাদের কেউ যখন নিজের মধ্যে এই অবস্থা অনুভব করে, তখন সে বলুক- আমি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছি। এটা বললে তার এই অবস্থা দূর হয়ে যাবে।”

এখানে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) এ ধরনের কুমন্ত্রণার প্রতিকারের আলোচনা করার অনুমতি দেননি। কেননা, এই কৃমন্ত্রণা অজ্ঞ জনসাধারণের মধ্যে দেখা দেয়- আলেমদের মনে দেখা দেয় না। সুতরাং জনসাধারণের উচিত ঈমান ও ইসলাম প্রকাশ করে এবাদত ও জীবিকা উপার্জনের কাজে মশগুল হয়ে যাওয়া। সাধারণ মানুষ যদি যিনা ও চুরি করে, তবে এটা এ ধরনের কুমন্ত্রণার পেছনে পড়ার চেয়ে উত্তম। কেননা, যে ব্যক্তি না জেনে না শুনে আল্লাহ ও তাঁর ধর্ম সম্পর্কে কিছু বলবে, সে অজ্ঞাতেই কাফের হয়ে যাবে। এটা এমন হবে, যেমন কেউ সাঁতার না শিখে উত্তাল নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
>>মূসলমানের প্রতি কুধারণা পোষণ করা শয়তান প্রবেশের একটি পথ।
শয়তানের দ্বারসমূহের মধ্যে একটি হচ্ছে অপর মূসলমানের প্রতি কুধারণা পোষণ করা। আল্লাহ তাআলা বলেন : “যারা ঈমান এনেছ শুন, তোমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধারণা করা থেকে বেঁচে থাক। কারণ, কোন কোন ক্ষেত্রে ধারণা করা পাপ।”

সুতরাং যে কেউ অপরের প্রতি কুধারণা করবে, শয়তান তাকে তার গীবত করতেও প্ররোচিত করবে। অথবা সে অপরের হক আদায় করবে সম্মান প্রদর্শনে শৈথিল্য করবে এবং তাকে হেয় দৃষ্টিতে দেখবে। এগুলো সব সর্বনাশা কাজ। এ কারণেই শরীয়তে অপবাদ থেকে আত্মরক্ষার নির্দেশ আছে। হাদীসে আছে - “তোমরা অপবাদের স্থান থেকে বেঁচে থাক।” 
স্বয়ং রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) অপবাদের স্থান থেকে আত্মরক্ষা করেছেন। 
হযরত আলী ইবনে হোসাইন (রাঃ) সফিয়্যা বিনতে হুয়াই থেকে বর্ণনা করেন- তিনি বলেন : একবার রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) মসজিদে এতেকাফরত ছিলেন। আমি যখন তাঁর কাছে গেলাম, তখন ঋতুবতী হয়ে গেলাম। সন্ধ্যায় সেখান থেকে ফিরে আসার জন্যে রওয়ানা হলে তিনিও আমার সাথে রওয়ানা হলেন। পথিমধ্যে দু'জন আনসারীর সাথে দেখা হল। তারা রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-কে সালাম করে যেতে লাগল। তিনি তাদেরকে ডাক দিলেন এবং বললেনঃ এ হচ্ছে আমার স্ত্রী সফিয়্যা উন্মুল মুমিনীন। তারা আরজ করল : ইয়া রসূলাল্লাহ! আমরা আপনার প্রতি সুধারণা রাখি। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ এটা ঠিক। কিন্তু শয়তান মানুষের সাথে দেহের রক্তের মত মিশে আছে। তাই আমি আশংকা করলাম, কোথাও তোমাদেরকে বিভ্রান্ত না করে দেয়। এখানে দেখা উচিত, নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) উম্মতের প্রতি কতটুকু স্নেহপরায়ণ ছিলেন! তিনি আনসারীদ্বয়কেও বিভ্রান্তি থেকে বাঁচিয়ে দিলেন এবং উম্মতকে অপবাদ থেকে বেঁচে থাকার পন্থাও শিখিয়ে দিলেন, যাতে কোন বিশিষ্ট আলেম ও পরহেযগার ব্যক্তি অপবাদের ব্যাপারটিকে হালকা মনে না করে এবং আত্মম্ভরিতার কারণে এরূপ ধারণা না করে যে, মানুষ তার প্রতি সুধারণাই পোষণ করবে। কারণ, যত বড় পরহেযগারই হোক না কেন, সকল মানুষ তার সমান ভক্ত হবে না; বরং কেউ তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকে এবং কেউ অসন্তুষ্ট। যারা সন্তুষ্ট, তারা তার দোষ দেখবে না; কিন্তু অসন্তুষ্টরা দোষ গেয়েই ফিরবে। অতএব কুধারণা ও দুষ্ট লোকদের অপবাদ থেকে বেঁচে থাকা জরুরী। কেননা, দুষ্টরা সকল মানুষের প্রতি কুধারণা রাখে। সুতরাং যখন এমন কোন লোক দেখা যায়, যে মানুষের প্রতি কুধারণা করে এবং তাদের দোষ অন্বেষণ করে, তখন বুঝতে হবে যে, সে নিজের অন্তরে ভ্রষ্টামি পোষণ করে এবং এই দোষ অন্বেষণ তারই বহিঃপ্রকাশ। কারণ, সে সকলকে নিজের মতই মনে করে। জানা দরকার, দোষ অন্বেষণ মোনাফেকের কাজ। মুমিনের বক্ষ সকল মানুষের তরফ থেকে পরিষ্কার থাকে।


পরবর্তী পর্ব-
 শয়তানকে দূরে রাখার উপায় 

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...