কেহ তোমার অনিষ্ট করিলে তুমি তাহার উপকার কর। ইহাই আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রকৃষ্টতম উপায়। ইহা সম্ভবপর না হইলে অন্ততঃপক্ষে তাহাকে ক্ষমা কর, কেননা, ক্ষমার ফযীলত অত্যন্ত বেশী। রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন-
>“তিনটি বিষয়ে আমি শপথ করিতে পারি; (উহা এই যে)
(১) সদকা দিলে ধন কমে না, তোমরা সদকা দাও।
(২) যে ব্যক্তি অপরের অপরাধ মাফ করে কিয়ামত দিবসে আল্লাহ্ তাহাকে অধিক মর্যাদা দান করিবেন।
(৩) যে ব্যক্তি নিজের জন্য ভিক্ষার পথ উন্মুক্ত করে, আল্লাহ্ তাহার জন্য দরিদ্রতার পথ উন্মুক্ত করিয়া দেন।”
হযরত আয়েশা রদিয়াল্লাহু আন্হা বলেন- “যাহারা রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি অন্যায় করিয়াছে, তাহাদের নিকট হইতে প্রতিশোধ গ্রহণ করিতে আমি কখনও তাঁহাকে দেখি নাই; কিন্তু আল্লাহর সম্বন্ধে কেহ অন্যায় করিলে তাঁহার ক্রোধের পরিসীমা থাকিত না। তাঁহার ইচ্ছাধীন কার্যের মধ্যে যাহা মানবজাতির জন্য অধিক সহজ দেখিতেন, তাহাই তিনি গ্রহণ করিতেন। কিন্তু কখনও তিনি পাপকার্য অবলম্বন করিতেন না।”
হযরত আকাবা ইব্ন আমের রদিয়াল্লাহু আন্হু বলেন- “রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) আমার হস্ত ধারণপূর্বক বলিলেন-
>"সংসারী লোক ও আখিরাতের পথিক, উভয়ের জন্য যে-ভাব উত্তম, তাহা তোমাকে জানাইয়া দিতেছি। তোমার সহিত কেহ সম্বন্ধ কর্তন করিতে চাহিলে তুমি তাহার সঙ্গে মিলিত হও; তোমাকে কেহ বঞ্চিত করিলে তুমি তাহাকে দান কর।”
রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন- “হযরত মূসা আলায়হিস্ সালাম আল্লাহর নিকট নিবেদন করিলেন— হে আল্লাহ্, আপনার বান্দাগণের মধ্যে কোন্ ব্যক্তি আপনার অধিক প্রিয়?' উত্তর হইল-
>‘শাস্তি দানের শক্তি থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি শত্রুকে মা'ফ করে।”
রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন-
>“যে ব্যক্তি অত্যাচারীর উপর অভিশাপ দিল সে তাহার প্রাপ্য অংশ গ্রহণ করিল।”
রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) কুরায়শ জাতিকে পরাজিত করিয়া পবিত্র মক্কা শরীফ দখল করিলে কুরায়শগণ তাঁহার প্রতি নিজেদের অবিচার, অত্যাচার স্মরণ করিয়া নিতান্ত ভীত ও জীবনে নিরাশ হইয়া পড়িল। কিন্তু রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) কা'বা শরীফের দ্বারদেশে স্বীয় পবিত্র হস্ত স্থাপনপূর্বক তাহাদিগকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন-
>“আল্লাহ্ এক, অদ্বিতীয়; তাঁহার শরীক নাই। তিনি অঙ্গীকার সত্যে পরিণত করিলেন ও স্বীয় বান্দাগণকে জয়ী করিলেন এবং স্বীয় দুশমনদিগকে পরাস্ত ও বিধ্বস্ত করিলেন। (হে কুরায়শগণ) অদ্য তোমরা কী দেখিতেছ এবং কী বলিতেছ?”
কুরায়শগণ একবাক্যে নিবেদন করিল “ইয়া রাসূলাল্লাহ্, আজ সকল ক্ষমতাই আপনার করতলগত, ক্ষমা প্রার্থনা ব্যতীত আমাদের আর কী বলিবার আছে? আমরা আপনার দয়াপ্রার্থী।” তাহাদের কথা শুনিয়া রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলিলেন-
>“আমার ভাই ইউসুফ আলায়হিস্ সালাম স্বীয় ভ্রাতাগণের উপর ক্ষমতা লাভ করিয়া যাহা বলিয়াছিলেন আমিও তাহাই বলিতেছি: আজ তোমাদের উপর ভৎসনা করিবার কিছুই নাই।”
ইহা বলিয়া তিনি কুরায়শদিগকে জানমালের নিরাপত্তা প্রদান করিলেন।
রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন-
>“কিয়ামতের দিন সমস্ত লোক উত্থিত হইলে এক ঘোষণাকারী ঘোষণা করিবে- 'যাহাদের পুরস্কার আল্লাহর নিকট রহিয়াছে, তাহারা উঠ।' কয়েক সহস্র লোক উঠিবে এবং বিনা হিসাবে বেহেশতে চলিয়া যাইবে। কারণ, তাহারা (দুনিয়াতে) আল্লাহর বান্দাদের অপরাধ মাফ করিয়া দিত।”
হযরত মুআবিয়া বলেন- “ক্রোধের সময় ধৈর্য ধারণ কর, তাহা হইলে প্রচুর অবসর পাইবে। আবার অবসরকালে প্রতিশোধ গ্রহণের যথেষ্ট ক্ষমতা থাকিলেও (শত্রুকে) ক্ষমা কর।"
খলীফা হিশামের নিকট এক অপরাধীকে আনয়ন করা হইলে প্রশ্ন করিবার পূর্বেই সে স্বীয় দোষ প্রক্ষালনের উদ্দেশ্যে যুক্তি-প্রমাণাদি প্রদর্শন করিতে লাগিল। খলীফা বলিলেন— “তুমি আমার সম্মুখে প্রমাণাদি উপস্থাপিত করিতে আরম্ভ করিলে?” অপরাধী কুরআন শরীফের এই আয়াত আবৃত্তি করিল
>“হাশরের মাঠে (আল্লাহ্র সম্মুখে) সমস্ত প্রাণী আনয়ন করা হইবে; তাহারা নিজ নিজ জীবনের জন্য তর্ক-বিতর্ক আরম্ভ করিবে।” সে আরও বলিল-
>“কিয়ামত দিবস মহাবিচারক আল্লাহর সম্মুখে জবাবদিহিকালে তা বান্দা প্রমাণাদি উপস্থাপিত করিতে পারিবে; এমতাবস্থায়, আমি আপনার সম্মুখে প্রমাণাদি উপস্থাপিত করিতে পারিব না কেন?” খলীফা হিশাম বলিলেন- “বেশ এস, কি বলিতে চাও বল।”
হযরত ইব্ন মাউদ রদিয়াল্লাহ্ আন্হুর একটি দ্রব্য চোরে লইয়া গেল। সমবেত লোকগণ চোরকে অভিশাপ দিতে লাগিল। তিনি তাহাদিগকে অভিশাপ করিতে নিষেধ করিয়া বলিলেন- “হে খোদা, চোর কোন অভাবের তাড়নায় দ্রব্যটি চুরি করিয়া থাকিলে তাহার মঙ্গল কর; কিন্তু পাপ কার্যে সাহস বর্ধন নিমিত্ত চুরি করিয়া থাকিলে ইহাই যেন তাহার শেষ পাপ বলিয়া লিখিত হয়।” অর্থাৎ তৎপর যেন সেই ব্যক্তি আর পাপ না করে।
হযরত ফুযায়ল (রঃ) বলেন- “চোরে এক ব্যক্তির ধন চুরি করিয়া লইয়া গেল। কা'বা শরীফ তওয়াফকালে দেখিতে পাইলাম, তিনি কাঁদিতেছেন। আমি তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম- 'হে মহাত্মন! আপনি কি অপহৃত ধনের জন্য কাঁদিতেছেন?' তিনি বলিলেন- ‘না, বরং আমি যেন দেখিতেছি, হাশরের মাঠে ঐ ব্যক্তি আমার সহিত দণ্ডায়মান রহিয়াছে; কিন্তু সে ঐ চুরি কার্যের কোন সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারিতেছে না। এইজন্য দুঃখিত হইয়া আমি কাঁদিতেছি।”
খলীফা আবদুল মালিক ইব্ন মারওয়ানের নিকট কতিপয় যুদ্ধবন্দীকে আনয়ন করা হইল। তখন একজন বুযুর্গ তথায় অবস্থান করিতেছিলেন। তিনি খলীফাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন- “তুমি যাহা চাহিলে, আল্লাহ্ তোমাকে তাহা দান করিয়াছেন, অর্থাৎ তোমাকে বিজয়ী করিয়াছেন। এখন আল্লাহ্ যাহা চাহেন, তাহা তুমি দাও, অর্থাৎ তাহাদিগকে ক্ষমা কর।” ইহা শুনিয়া খলীফা সকল বন্দীকে মাফ করিয়া দিলেন।
ইন্জীল কিতাবে আছে ‘যে-ব্যক্তি নিজ নির্যাতকের অপরাধ ক্ষমার জন্য আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে তাহার নিকট শয়তান পরাজিত হয়।” অর্থাৎ শয়তান তাহাকে পাপকর্মে প্ররোচিত করিতে সমর্থ হয় না।
মোটকথা, ক্রোধভাজন ব্যক্তিকে ক্ষমা করিয়া দেওয়া উচিত এবং প্রত্যেক কাজে নম্রতা অবলম্বন করা কর্তব্য। তাহা হইলে মানব-মনে ক্রোধের সঞ্চার হইতে পারে না।
রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন-
>“যাহাকে আল্লাহ্ নম্রতা প্রদান করিয়াছেন, তাহাকে তিনি দুনিয়া ও আখিরাতে লাভবান করিয়াছেন। আর যাহাকে তিনি নম্রতাগুণে বঞ্চিত করিয়াছেন, সে ইহ-পরকালের মঙ্গল হইতে বঞ্চিত রহিয়াছে।”
তিনি অন্যত্র বলেন-
>“আল্লাহ্ সদয় সহনশীল এবং সদয় সহনশীল ব্যক্তিকে তিনি ভালবাসেন। তিনি সদয় সহনশীলতার জন্য যাহা দান করেন, কঠোরতা প্রদর্শন করিলে তাহা দান করেন না।”
রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) হযরত আয়েশা রদিয়াল্লাহু আন্হাকে বলেন-
>“প্রত্যেক কাজে নম্রতার দিকে দৃষ্টি রাখিবে; কেননা নম্রতাযোগে যে কাজ করা হয় তাহা সম্পন্ন হয়, আর যে কাজে নম্রতা থাকে না তাহা নষ্ট হয়।”
পরবর্তী পর্ব








