তওবা - (পর্ব - ১৬)
ওয়াযের উপকারী পদ্ধতি
এখন আমরা ওয়াযের উপকারী পদ্ধতি বর্ণনা করব। যদিও এটা নাতিদীর্ঘ, কিন্তু আমরা কয়েক প্রকার বিষয়বস্তু উল্লেখ করব, যাতে মানুষ অব্যাহত গোনাহ বর্জন করতে সক্ষম হবে। ওয়াযে চার প্রকার বিষয়বস্তু বর্ণনা করা জরুরী।
প্রথমত, কোরআন মজীদে গোনাহগারদের ভীতি প্রদর্শনের জন্যে যে সকল আয়াত বর্ণিত হয়েছে, সেগুলো বর্ণনা করবে। এমনিভাবে এই বিষয়বস্তু সম্বলিত হাদীস ও রেওয়ায়েতসমূহ উল্লেখ করবে। উদাহরণতঃ রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন - প্রত্যহ সকালে ও সন্ধ্যায় দু'জন ফেরেশতা একে অপরের কথার জওয়াব দেয়। এক ফেরেশতা বলে : মানবকুল সৃজিত না হলেই ভাল হত ! অন্য ফেরেশতা বলে : চমৎকার হত যদি মানবকুল তাদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য জানতে পারত ! প্রথম ফেরেশতা বলে : তারা যখন সৃষ্টির উদ্দেশ্য জানল না, তখন যদি নিজেদের জ্ঞান দ্বারাই আমল করে নিত !
এক রেওয়ায়েতে আছে, ভাল হত যদি তারা পরস্পর বসে জানা বিষয়গুলোর চর্চা করত ! অন্য ফেরেশতা বলে : তারা যদি আপন কুকর্ম থেকে তওবা করে নিত !
জনৈক বুযুর্গ বলেন : বান্দা যখন গোনাহ করে, তখন ডানদিকের ফেরেশতা বামদিকের ফেরেশতাকে বলে : ছয় ঘন্টা পর্যন্ত এই গোনাহটি লিপিবদ্ধ করো না।
যদি এ সময়ের মধ্যে সে তওবা ও এস্তেগফার করে নেয়, তবে লিপিবদ্ধ করা হয় না। নতুবা আমলনামায় লিখে নেয়া হয়। কেউ কেউ বলেন : গোনাহ করার সময় বান্দা যে জায়গায় থাকে, সেই জায়গার মাটি আল্লাহর দরবারে আরয করে- আদেশ হলে আমি তাকে গিলে ফেলি। তার মাথার উপরের আকাশ আল্লাহর কাছে বলে- আদেশ হলে আমি তার উপর ভেঙ্গে পড়ি! কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তাদের উভয়কে বলেন, আমার বান্দা থেকে বিরত থাক। তোমরা তাকে সৃষ্টি করনি। তোমরা সৃষ্টি করলে তার প্রতি তোমাদের দয়া হত। হয়তো সে তওবা করবে এবং আমি ক্ষমা করে দেব, অথবা এই গোনাহের বিনিময়ে কোন সৎকর্ম করবে এবং আমি এ গোনাহকেও পুণ্যে পরিবর্তিত করে দেব।
নিম্নোক্ত আয়াতে এটাই বুঝানো হয়েছে – “নিশ্চয় আল্লাহ ধারণ করে রাখেন আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীকে যাতে টলে না যায়। যদি এগুলো টলে যায়, তবে তিনি ব্যতীত কেউ এগুলোকে ধারণ করতে সক্ষম নয়”।
হযরত উমর (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে— মোহরকারী ফেরেশতা আরশের সন্নিকটে অপেক্ষমাণ রয়েছে। যখন কোন বড় ধরনের দুষ্কর্ম সংঘটিত হয় এবং হারাম বস্তুসমূহকে হালাল মনে করা হয়, তখন আল্লাহ তা'আলা সেই ফেরেশতাকে পাঠিয়ে দেন। সে মানুষের অন্তরে মোহর লাগিয়ে যায়। ফলে, অন্তরের অভ্যন্তরস্থ বিষয়সমূহ সেখানেই থেকে যায়— প্রকাশের পথ পায় না। হযরত মুজাহিদ বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে— অন্তর হাতের খোলা তালুর মত। যখন মানুষ গোনাহ করে, তখন একটি আঙ্গুল বন্ধ হয়ে যায়। অবশেষে একে একে সবগুলো আঙ্গুল বন্ধ হয়ে যায়। এটা অন্তরের তালা। গোনাহের নিন্দা ও তওবাকারীদের প্রশংসায় এমনি ধরনের রেওয়ায়েত বহুল পরিমাণে বর্ণনা করা উচিত।
দ্বিতীয় বর্ণনাযোগ্য বিষয় হচ্ছে পয়গম্বর ও পূর্ববর্তী বুযুর্গগণের কাহিনী যে, ভুলভ্রান্তির কারণেই তাদের উপর কেমন বিপদাপদ এসেছে ! এ ধরনের কাহিনী অন্তরে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে এবং উপকার অনুভূত হয়।
উদাহরণতঃ হযরত আদম (আঃ) ভুলের কারণে কতই না কষ্ট ভোগ করেছেন! জান্নাত থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। বর্ণিত আছে, তিনি যখন নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণ করলেন, তখন দেহ থেকে জান্নাতী পোশাক উড়ে গেল এবং তিনি উলঙ্গ হয়ে পড়লেন। অতঃপর আরশের উপর থেকে আওয়াজ এল : তোমরা উভয়ে আমার কাছ থেকে নেমে যাও। যে আমার অবাধ্য, তার ঠিকানা আমার কাছে হতে পারে না। হযরত আদম (আঃ) কেঁদে বিবি হাওয়াকে বললেন : একটি মাত্র ভ্রান্তির প্রথম পরিণতিতে আমরা প্রেমাস্পদের কাছ থেকে বিতাড়িত হলাম।
বর্ণিত আছে, সোলায়মান ইবনে দাউদ (আঃ)-ও আল্লাহর ক্রোধের শিকার হয়েছিলেন। এর কারণ ছিল সেই চিত্র, যার পূজা তাঁর গৃহে চল্লিশ দিন পর্যন্ত করা হয়েছিল। কেউ কেউ বলেন : তার একটি ছিল এই যে, জনৈকা মহিলা তার পিতার অনুকূলে মোকদ্দমায় রায় দেয়ার জন্যে তাঁকে বলেছিল এবং তিনি তাই করবেন বলে ওয়াদা করেছিলেন। কিন্তু পরে সেরূপ করেননি। কারও মতে অপরাধ ছিল এই যে, সেই মহিলার খাতিরে তার পিতাকে মামলায় জিতিয়ে দেয়ার ইচ্ছা জাগ্রত হয়েছিল।
মোটকথা, এরূপ একটি ভ্রান্তির বিনিময়ে চল্লিশ দিনের জন্যে তাঁর রাজত্ব ছিনিয়ে নেয়া হয় এবং তিনি দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। খাওয়ার জন্যে হাত প্রসারিত করলে খাদ্যবস্তু উধাও হয়ে যেত। তিনি মানুষকে বলতেন : আমাকে খাবার দাও। আমি সোলায়মান ইবনে দাউদ। জওয়াবে মানুষ তাকে প্রহার করে তাড়িয়ে দিত। রেওয়ায়েতে আছে, এক বৃদ্ধার কাছে খাদ্য চাইলে সে তাকে শাসিয়ে দিল এবং মুখে থুথু নিক্ষেপ করল। অন্য এক রেওয়ায়েতে আছে,এক বৃদ্ধা নোংরা পানির একটি পাত্র তাঁর মাথায় ঢেলে দিল। অতঃপর আল্লাহর নির্দেশে তাঁর আংটি মাছের পেট থেকে বেরিয়ে এল এবং চল্লিশ দিন পর তিনি আংটি পরিধান করলেন। তখন পক্ষীকুল পুনরায় তাঁর মাথার উপর ছায়া করে দাঁড়িয়ে গেল এবং জিন, শয়তান বন্য জন্তুরা কাছে এসে গেল। তাদের কেউ কেউ পূর্ববর্তী ধৃষ্টতার জন্যে ক্ষমাপ্রার্থী হলে তিনি বললেন : অতীত কৃতকর্মের জন্যে তোমাদের বিরুদ্ধে আমার কোন অভিযোগ নেই। এটা ছিল একটি অবশ্যম্ভাবী ঐশী বিষয়।
বর্ণিত আছে, আল্লাহ তা'আলা ওহীর মাধ্যমে হযরত ইয়াকুব (আঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেন : বলতে পার, আমি তোমার কলিজার টুকরা ইউসুফকে তোমার কাছ থেকে কেন বিচ্ছিন্ন করেছি? তিনি আরয করলেন : জানি না। এরশাদ হল : কারণ, তুমি তার ভাইদেরকে বলেছিলে-
“আমার ভয় হয় বাঘ তাকে খেয়ে ফেলবে অথচ তোমরা থাকবে অসতর্ক”
তুমি বাঘের ভয় করেছ, আমার আশা করনি। তুমি ভাইদের গাফলতির কথা চিন্তা করেছ, আমার হেফাযতের প্রতি লক্ষ্য করনি। আল্লাহ পাক আবার প্রশ্ন করলেন : তুমি জান, আমি ইউসুফকে কেন ফেরত দিয়েছি? তিনি আরয করলেন : না, জানি না। এরশাদ হল : তুমি বলেছিলে- “হয়তো আল্লাহ তাদের সকলকে আমার কাছে নিয়ে আসবেন। তুমি আরও বলেছিলে-
“যাও এবং ইউসুফ ও তার ভাইকে খোঁজ কর। তোমরা আল্লাহর কৃপা থেকে নিরাশ হয়ো না”।
এতে করে তুমি আমার আশা করেছিলে। তাই আমি তোমাদের মিলন ঘটিয়েছি।
অনুরূপভাবে হযরত ইউসুফ (আঃ) জেলখানায় শাহী মুসাহিবকে বলেছিলেন : তোমার প্রভুকে আমার আটকে থাকার কথাটি স্মরণ করিয়ে দিয়ো। তিনি হয়তো আমাকে মুক্তি দেবেন। আল্লাহ তা'আলা এ ঘটনাটি এভাবে উল্লেখ করেছেন- “অতঃপর শয়তান তাকে প্রভুর কাছে উল্লেখ করার বিষয়টি বিস্মৃত করে দিল। ফলে, ইউসুফকে আরও কয়েক বছর জেলে থাকতে হল”।
কোরআন ও হাদীসে বর্ণিত এ ধরনের অসংখ্য গল্প কেবল কিসসা-কাহিনীর জন্যে নয়; বরং এগুলোতে সচেতন ও চক্ষুষ্মান ব্যক্তিদের জন্যে মূল্যবান শিক্ষা রয়েছে। তারা এগুলো দেখে অনুধাবন করতে পারবে যে, পয়গম্বরগণের ছোট ছোট পদস্খলন যখন মার্জিত হয়নি, তখন অন্যদের কবীরা গোনাহ কিরূপে মাফ হবে?
তবে পয়গম্বরগণের সাজা দুনিয়াতে হয়ে গেছে— আখেরাতে কোন পাকড়াও হবে না। এটা তাঁদের বৈশিষ্ট্য। যারা হতভাগ্য, দুনিয়াতে তাদেরকে অবকাশ দেয়া হয়, যাতে পুরামাত্রায় গোনাহ করে নেয়। দুনিয়ার শাস্তি হাল্কা এবং আখেরাতের শাস্তি কঠোরতর। হতভাগাদের কুকর্ম এমনি কঠোর আযাবের যোগ্য। এ কারণেও তাদেরকে দুনিয়াতে অবকাশ দেয়া হয়।
এ ধরনের কথাবার্তা অব্যাহত গোনাহকারীদের সামনে অধিক পরিমাণে বলা উচিত। তওবায় উদ্বুদ্ধ করার জন্যে এটা প্রায়শ উপকারী হয়ে থাকে।
তৃতীয় প্রকার বিষয়বস্তু একথা বর্ণনা করা যে, দুনিয়াতে বান্দা যে সকল বিপদাপদে পতিত হয়, সেগুলো গোনাহের কারণে হয়ে থাকে। মানুষ প্রায়ই আখেরাতের ব্যাপারে অলসতা করে; কিন্তু মূর্খতাবশত পার্থিব শাস্তিকে অধিক ভয় করে। অতএব, এ ধরনের মানুষকে এ ধরনের বিষয়বস্তুর দ্বারা হেদায়াতের পথে আনা জরুরী। কেননা, অধিকাংশ সময় গোনাহের অমঙ্গল দুনিয়াতেই মানুষের উপর আপতিত হয়; যেমন হযরত · সোলায়মান (আঃ)-এর কাহিনীতে ব্যক্ত হয়েছে। এমনকি, মাঝে মাঝে গোনাহের দরুন মানুষের রূযী-রোযগার সংকীর্ণ হয়ে যায়। কখনও মানুষের মনে সম্মান ও প্রতিপত্তি হ্রাস পায়। ফলে শত্রু প্রবল হয়ে যায়। হাদীসে আছে, গোনাহ করার কারণে বান্দা রিযিক থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়।
হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ) বলেন : আমার জানা মতে গোনাহের কারণে মানুষ বিদ্যাশিক্ষা ভুলে যায়। এক হাদীসে এ বিষয়টি এভাবে ব্যক্ত হয়েছে— "যে ব্যক্তি গোনাহ করে, তার জ্ঞানবুদ্ধি তার কাছ থেকে বিছিন্ন হয়ে যায় এবং কখনও ফিরে আসে না"।
জনৈক বুযুর্গ বলেন : মুখমণ্ডল বিশ্রী হওয়া এবং ধনসম্পদ হ্রাস পাওয়ার নাম লা'নত তথা অভিসম্পাত নয়; বরং অভিসম্পাত হল এক গোনাহ থেকে বের হয়ে তারই অনুরূপ অথবা তদপেক্ষা বড় গোনাহে লিপ্ত হয়ে পড়া। বাস্তবে তিনি ঠিকই বলেছেন। কারণ, লা'নতের শাব্দিক অর্থ হচ্ছে বঞ্চিত করা এবং রহমত থেকে দূরে ঠেলে দেয়া। মানুষ যখন সৎকাজের তাওফীক পায় না, তখন রহমত থেকে দূরেই সরে পড়ে। এছাড়া প্রত্যেক গোনাহ অন্য গোনাহের দিকে আহ্বান করে এবং বৃদ্ধি পেতে থাকে। অবশেষে মানুষ তার আত্মিক খাদ্যরূপী রিযিক থেকে বঞ্চিত হয়। অর্থাৎ, আলেমদের কাছে বসা এবং সৎকর্মীদের সাথে চলাফেরা করা। আল্লাহ তা'আলা এরূপ ব্যক্তির প্রতি অসন্তুষ্ট থাকেন, যাতে সৎকর্মীগণও তার প্রতি নারাজ থাকে।
জনৈক অধ্যাত্মবিদের ঘটনায় বর্ণিত আছে যে, তিনি পরনের কাপড় উপরে তুলে কর্দমাক্ত পথে চলে যাচ্ছিলেন এবং পদযুগল শক্ত করে মাটিতে রাখছিলেন, যাতে পিছলে না যান। কিন্তু তার পা পিছলে গেল এবং তিনি কাদায় পড়ে গেলেন। এরপর তিনি উঠে কাদার মধ্যেই কেঁদে কেঁদে অগ্রসর হচ্ছিলেন এবং বলছিলেন : বান্দার অবস্থা হুবহু তাই। সে সর্বদা গোনাহ থেকে বেঁচে চলে। অবশেষে একাধিক গোনাহে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এরপর গোনাহের মধ্যে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। এ উক্তি থেকে বুঝা যায়, এক গোনাহ থেকে অন্য গোনাহে লিপ্ত হওয়াও গোনাহের অন্যতম শাস্তি ।
মোটকথা, আল্লাহওয়ালাদের মতে দুনিয়ার বিপদাপদ গোনাহের শাস্তির অন্তর্ভুক্ত। সেমতে হযরত ফুযায়ল (রহঃ) বলেন : মানুষ যখন দুনিয়ার দুর্বিপাকে পড়ে, তখন তার জানা উচিত যে, এটা তার গোনাহেরই কারণে।
জনৈক বুযুর্গ বলেন : যদি আমার গাধার অভ্যাসও বিগড়ে যায়, তবে আমি এটাই মনে করব যে, এটা আমারই ত্রুটি-বিচ্যুতির ফল।
জনৈক আল্লাহ-ওয়ালা বলেন : আমি আমার গোনাহের শাস্তি গৃহের ইঁদুরের মধ্যেও আছে বলে জানি।
জনৈক সূফী বর্ণনা করেন— আমি সিরিয়ায় একজন অপরূপ সৌন্দর্যের অধিকারী খৃস্টান বালককে দেখে দাঁড়িয়ে গেলাম এবং অপলক দৃষ্টিতে তার সৌন্দর্য সুধা পান করতে লাগলাম। ইতিমধ্যে আমার কাছে ইবনে জালা দামেশকী আগমন করলেন এবং আমার হাত ধরলেন। আমি এভাবে ধরা পড়ে যাওয়ায় ভীষণ লজ্জিত হলাম। অতঃপর কথা বানিয়ে বললাম : এই বালকের মুখাবয়ব দেখে আমি বিস্মিত হয়ে ভাবছিলাম, এমন অনিন্দ্য সুন্দর মুখও জাহান্নামের অগ্নিতে প্রজ্বলিত হবে? জানি না, এর পেছনে আল্লাহর কি হেকমত। একথা শুনে ইবনে জালা আমার হাতে চিমটি কেটে বললেন : কয়েক দিন পর তুমি এর শাস্তি পেয়ে যাবে। সূফী বলেন : ত্রিশ বছর পর আমি এর শাস্তি পেয়েছি।
আবূ সোলায়মান দারানী (রহঃ) বলেন : স্বপ্নদোষ হওয়াও গোনাহের একটি শাস্তি। তিনি আরও বলেন : নামাযে জামাত না পাওয়ার বিষয়টিও কোন গোনাহ করার কারণে প্রকাশ পায়।
এক হাদীসে আছে, “যামানার যে বিষয় তোমাদের খারাপ লাগে, তাকে তোমাদের আমল বিকৃত করারই ফল মনে কর”।
আবু আমর ইবনে হুলওয়ান তার কাহিনীতে লিখেনঃ একদিন আমি নামায পড়ছিলাম, এমন সময় আমার অন্তরে কামভাব মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। আমি এ সম্পর্কে অনেকক্ষণ চিন্তা করলাম এবং শেষ পর্যন্ত তা সমকামিতার খাহেশে রূপান্তরিত হয়ে যায়। আমি তৎক্ষণাৎ মাটিতে পড়ে গেলাম এবং আমার সমস্ত শরীর কাল হয়ে গেল। লোকলজ্জার ভয়ে আমি তিনদিন পর্যন্ত ভেতরে গা-ঢাকা দিয়ে রইলাম এবং হাম্মামে গিয়ে সাবান দিয়ে শরীর ধৌত করলাম। কিন্তু কালো রঙ বাড়তেই থাকল।
তিনদিন পর রঙ পরিষ্কার হল এবং আমি তলব পেয়ে রিক্কা থেকে হযরত জুনায়দ বাগদাদীর খেদমতে বাগদাদ গেলাম। তিনি আমাকে দেখেই বললেন : ছিঃ ছিঃ তোমার লজ্জা হল না। আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে তুমি কামভাবে মত্ত হলে, যা তোমাকে আল্লাহর সম্মুখে উপস্থিতি থেকে বঞ্চিত করে দিয়েছে। যদি আমি দোয়া না করতাম এবং তোমার পক্ষ থেকে তওবা না করতাম, তবে এই কালো রঙ নিয়েই তুমি আল্লাহর কাছে যেতে। আমি বিস্মিত হলাম যে, হযরত জুনায়দ আমার অবস্থা কিরূপে জানলেন! আমি তো রিক্কায় ছিলাম আর তিনি ছিলেন বাগদাদে।
এখানে জানা দরকার যে, মানুষ যখন গোনাহ করে, তখন তার অন্তরের চেহারা কালো হয়ে যায়। যদি সে ভাগ্যবান হয়, তবে কালো রঙ বাইরের দেহেও ফুটে উঠে, যাতে সে গোনাহ থেকে বিরত হতে পারে। পক্ষান্তরে হতভাগ্য হলে কালো রঙ ভেতরেই থেকে যায় এবং শেষ পর্যন্ত সমগ্র অন্তর্ভাগ কালো হয়ে সে দোযখের উপযুক্ত হয়ে যায়।
গোনাহের ফলস্বরূপ দুনিয়াতে যে দারিদ্র্য ও রোগ-ব্যাধি আসে, এ সম্পর্কে অনেক হাদীস ও রেওয়ায়েত বর্ণিত আছে। কিন্তু আল্লাহর অনুগত বান্দার অবস্থা ভিন্ন। তার উপর কোন বিপদাপদ এলে, তা তার গোনাহের কাফফারা হয় এবং এ জন্যে সবর করলে তার মর্তবা বেড়ে যায়।
চতুর্থ বর্ণনাযোগ্য বিষয়বস্তু হচ্ছে আলাদা আলাদা গোনাহের জন্যে শরীয়তে যে শাস্তি উল্লিখিত হয়েছে, ওয়াযে তা বর্ণনা করা। উদাহরণতঃ মদ্যপানের অনিষ্ট, যিনা, চুরি, হত্যা, গীবত, অহমিকা এবং হিংসার কুফল আলাদা আলাদা বর্ণনা করবে। এদের প্রত্যেকটি সম্পর্কে অসংখ্য রেওয়ায়েত বর্ণিত আছে। কিন্তু লক্ষ্য রাখতে হবে, যে ব্যক্তি যে বিষয়ের উপযুক্ত, তার কাছে সেই বিষয়ই বর্ণনা করতে হবে। বিচক্ষণ ডাক্তার যেমন প্রথমে নাড়ী, বর্ণ, গতিবিধি ইত্যাদি পরীক্ষা করে রোগের অভ্যন্তরীণ কারণ জেনে নেয়, এরপর চিকিৎসা করে, আলেমকেও তেমনি অবস্থার ইঙ্গিত দ্বারা মানুষের গোপন দোষগুণ জেনে তাই বর্ণনা করতে হবে, যাতে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর পূর্ণ অনুসরণ হয়।
বর্ণিত আছে, এক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর খেদমতে হাযির হয়ে আরয করল ইয়া রসূলাল্লাহ! (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) আমাকে কিছু উপদেশ দিন। তিনি বললেন :
“তোমার কর্তব্য অপরের ধনসম্পদ থেকে নিরাশ হওয়া। এটাই ধনাঢ্যতা। তুমি লোভ-লালসা থেকে বেঁচে থাক। কেননা, এটা উপস্থিত দারিদ্র্য। বিদায়ী ব্যক্তির ন্যায় নামায পড়। আর এমন কথাবার্তা থেকে বেঁচে থাক, যার জন্যে ক্ষমা চাইতে হয়।”
অন্য এক ব্যক্তি উপদেশ প্রার্থনা করলে তিনি বললেন : মিথ্যা কথা বলো না। আরও এক ব্যক্তি উপদেশ চাইলে তিনি বললেন : ক্রুদ্ধ হয়ো না।
জনৈক ব্যক্তি মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসে'কে বলল : আমাকে উপদেশ দিন। তিনি বললেন : আমার উপদেশ হল, তুমি দুনিয়া ও আখেরাতে বাদশাহ হয়ে থেকো। লোকটি বলল : এটা আমার জন্যে কিরূপ সম্ভবপর হবে? তিনি বললেন : দুনিয়াতে সংসার অনাসক্তিকে নিজের জন্যে অপরিহার্য করে নাও।
এখানে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) প্রথম ব্যক্তির মধ্যে অপরের ধন-সম্পদের প্রতি লোভ-লালসার আলামত প্রত্যক্ষ করেছেন। তাই তাকে তেমনি আদেশ করেছেন। দ্বিতীয় ব্যক্তির মধ্যে তিনি কথাবার্তার হেরফের লক্ষ্য করেছেন । তাই তাকে মিথ্যা বলতে নিষেধ করেছেন। তৃতীয় ব্যক্তির মধ্যে তিনি ক্রোধের আলামত জানতে পেরেছেন। তাই তাকে ক্রোধ পরিহার করার উপদেশ দিয়েছেন। মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসে'ও তার উপদেশপ্রার্থীর মধ্যে অন্তর্দৃষ্টির আলোকে লালসার চিহ্ন দেখতে পেয়েছেন এবং তদনুযায়ী উপদেশ দিয়েছেন। মোটকথা, প্রার্থীর অবস্থা অনুযায়ী কথাবার্তা হওয়া উচিত—বক্তার যোগ্যতা অনুযায়ী নয়।
হযরত মোয়াবিয়া একবার হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে লিখলেন : আমার জন্যে সংক্ষিপ্ত উপদেশ সম্বলিত একখানা পত্র লিপিবদ্ধ করুন। হযরত আয়েশা পত্রে লিখলেন : আমি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি “যে ব্যক্তি মানুষের অসন্তুষ্টির পরওয়া না করে আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি কামনা করে, আল্লাহ তা'আলা তাকে মানুষের কোপানল থেকে রক্ষা করেন। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আল্লাহর অসন্তুষ্টির পরওয়া না করে মানুষের সন্তুষ্টি চায়, আল্লাহ তাকে মানুষের কাছেই সঁপে দেন।” এ পত্রে হযরত আয়েশার জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তা লক্ষণীয় যে, তিনি কিভাবে সে বিপদটিই উল্লেখ করেছেন, যাতে শাসকবর্গ ও আমীর-উমারা লিপ্ত থাকে। অর্থাৎ, মানুষের পক্ষপাতিত্ব করা ও তাদের সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দেয়া। একবার তিনি আমীর মোয়াবিয়াকে লিখেছিলেন- “আল্লাহকে ভয় করতে থাক। কেননা, আল্লাহকে ভয় করলে তিনি তোমাকে মানুষের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করবেন। কিন্তু মানুষকে ভয় করলে আল্লাহর সামনে তোমার কোন জারিজুরি চলবে না।”
এসব রেওয়ায়েত থেকে বুঝা যায়, অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে গোপন দোষ-গুণ জেনে নেয়া ওয়ায়েযের জন্যে অত্যাবশ্যক, যাতে উপযুক্ত অবস্থা ও সময়ের চাহিদা অনুযায়ী জরুরী বিষয়টি বর্ণনা করা যায়। প্রত্যেক ব্যক্তিকে যাবতীয় উপদেশ বলে দেয়া সম্ভব নয়। এ ছাড়া যে বিষয় বর্ণনা করার প্রয়োজন নেই, তাতে মশগুল হওয়ার অর্থ সময় নষ্ট করা। এখানে প্রশ্ন হল, যে ব্যক্তি জনসমাবেশে ওয়ায করে, তার কি করা উচিত? জওয়াব এই যে, এমতাবস্থায় এমন বিষয়বস্তু বর্ণনা করবে যাতে সকল মানুষ শরীক; অর্থাৎ, এমন প্রয়োজনীয় বিষয়, যা জানা সবারই জন্যে উপকারী। শরীয়তের বিষয়াদিতে এটা সম্ভব। কেননা, শরীয়তের বিষয়সমূহ একদিকে যেমন খাদ্য, অপরদিকে তেমনি ঔষধি। খাদ্য সকলের জন্যে এবং ঔষধি রোগগ্রস্তদের জন্যে। এরূপ ওয়াযের দৃষ্টান্ত এই— ‘এক ব্যক্তি হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ)-এর কাছে উপদেশ প্রার্থনা করলে তিনি বললেন : আল্লাহর ভয়কে নিজের জন্যে অপরিহার্য করে নাও। সকল কল্যাণের মূল এটাই। জেহাদকে নিজের জন্যে অত্যাবশ্যকীয় করে নাও। ইসলামে একেই বৈরাগ্য বলা হয়। সদাসর্বদা কোরআন মজীদ পাঠ কর। এটা তোমার জন্যে পৃথিবীতে আলোকবর্তিকা হবে এবং ঊর্ধ্বজগতের স্মারক হবে। ভাল কথা না হলে চুপ করে থাক। এর মাধ্যমে তুমি শয়তানের উপর বিজয়ী হবে।”
হযরত লোকমান (আঃ) তাঁর পুত্রকে বলেছিলেন : আলেমদের সামনে বিনয়াবনত হয়ে বস, তাদের সাথে তর্ক করো না। করলে তারা তোমাকে খারাপ মনে করবে। দুনিয়াতে জীবন ধারণ করা যায় এই পরিমাণ সম্পদ রেখে অবশিষ্ট উপার্জন আখেরাতের জন্যে ব্যয় কর। সংসার-ধর্ম সম্পূর্ণ বর্জন করো না। তাহলে নিজের বোঝা অন্যের ঘাড়ে চাপাতে হবে এবং অপরের গলগ্রহ হতে হবে। রোযা এমনভাবে রাখ, যা দ্বারা কামশক্তি দমিত হয়— এমন ভাবে রেখো না, যা দ্বারা নামাযে বিঘ্ন দেখা দেয়। কেননা, নামায রোযা অপেক্ষা উত্তম। নির্বোধের কাছে বসো না এবং দ্বিমুখী মানুষের সাথে মেলামেশা করো না। নিজের ধন হারিয়ে অপরের ধনের হেফাযত করো না । বলা বাহুল্য, মৃত্যুর পূর্বে যে ধন দান করা হয়, তা নিজের ধন এবং মৃত্যুর সময় যে ধন রেখে যাওয়া হয়, তা অপরের ধন। প্রিয় বৎস, যে দয়া করে, তার প্রতি দয়া করা হয়। যে চুপ থাকে, সে নিরাপদ থাকে। যে ভাল কথা বলে, সে সওয়াব পায়। যে মন্দ কথা বলে, সে গোনাহগার হয়। যে রসনা সংযত করে না, সে অনুতাপ করে।
অব্যাহত গোনাহের চিকিৎসার দ্বিতীয় স্তম্ভ হচ্ছে সবর। এর প্রয়োজন এ কারণে হয় যে, রোগীর রোগ বৃদ্ধির একমাত্র কারণ হচ্ছে ক্ষতিকর বস্তুর ব্যবহার। এই ব্যবহার দু'কারণে হয়ে থাকে- (১) ক্ষতি সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং (২) খাহেশের আতিশয্যে ক্ষতির প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করা। ক্ষতি সম্পর্কে অজ্ঞতা ও গাফলতির প্রতিকার উপরে বর্ণিত হয়েছে। এখন শুধু খাহেশের প্রতিকার বাকী।
পরবর্তী পর্ব
খাহেশের প্রতিকার