বুধবার, ৮ নভেম্বর, ২০২৩

জ্ঞান ও জ্ঞানার্জন (২১) মোনাযারা


জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ২১)
এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

মোনাযারা
জানা উচিত, একশ্রেণীর আলেম কোন কোন সময় মানুষকে এই বলে বিভ্রান্ত করে যে, তাদের মোনাযারা বা বিতর্ক করার উদ্দেশ্য এমন বিষয়ে আলোচনা, যাতে সত্য প্রস্ফুটিত হয়ে উঠে। কেননা সত্য কাম্য। চিন্তায় একে অন্যের সাহায্য করা এবং অনেক লোকের ঐকমত্য হওয়া নিঃসন্দেহে উপকারী। সাহাবায়ে কেরামও এ উদ্দেশ্যেই পরস্পর পরামর্শ করতেন। উদাহরণতঃ তাঁরা দাদা বিদ্যমান থাকলে পৌত্রদের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া, মদ্যপানের শাস্তি, ফরায়েযের মাসআলা ইত্যাদি বিষয়ে পরস্পর পরামর্শ করতেন। ইমাম শাফেয়ী, আহমদ, মুহাম্মদ, মালেক, আবু ইউসুফ (রহঃ) প্রমুখ ইমাম থেকে বর্ণিত মতভেদও এ বিষয়ে সহায়ক। আমি তোমাকে এ বিভ্রান্তির অন্তর্নিহিত রহস্য বলে দিচ্ছি, সত্য বিষয়ে একে অপরের কাছে সাহায্য চাওয়া অবশ্যই ধর্মসিদ্ধ। কিন্তু এর জন্যে কয়েকটি শর্ত ও আলামত রয়েছে।
প্রথম, মোনাযারা যেহেতু ফরযে কেফায়া। কাজেই যেব্যক্তি ফরযে আইন সমাপ্ত করেনি, তার পক্ষে এতে ব্যাপৃত হওয়া উচিত নয়। যা উপর ফরযে আইন রয়েছে, সে যদি ফরযে কেফায়ায় ব্যাপৃত হয় এবং বলে, তার উদ্দেশ্য সত্যান্বেষণ, তবে সে মিথ্যাবাদী। সে সে ব্যক্তিরই মত, যে নিজে নামায পড়ে না এবং বস্ত্র বয়নে ব্যাপৃত থেকে বলে : আমার উদ্দেশ্য যারা উলঙ্গ অবস্থায় নামায পড়ে এবং পোশাক পায় না, তাদের সতর আবৃত করা। কেননা, এরূপ হওয়া সম্ভবপর এবং বাস্তবে কখনও এরূপ হয়েও থাকে। যেমন, ফেকাহবিদগণ বলেন, তাদের বিরোধপূর্ণ বিষয়সমূহ বাস্তবে সংঘটিত হওয়া সম্ভবপর, যদিও কম সংঘটিত হয়। আজ যারা মোনাযারায় ব্যাপৃত থাকে তারা সর্বসম্মতিক্রমে ফরযে আইন বিষয়সমূহ বর্জন করে বসেছে। যদি কারও উপর তাৎক্ষণিকভাবে কোন আমানত আদায় করা ওয়াজেব হয়ে থাকে এবং সে তাতে অবহেলা করার বাহানারূপে নামায পড়তে থাকে, যা বাহ্যতঃ সর্বোত্তম সওয়াবের কাজ, তবে বলাবাহুল্য, এ নামায দ্বারা সে আল্লাহ তাআ'লার নাফরমানই হবে। এ থেকে জানা গেল, আনুগত্যের কোন কাজ করাই মানুষের আনুগত্যশীল হওয়ার জন্যে যথেষ্ট নয়, যে পর্যন্ত না তাতে সময়, শর্ত ও ধারাবাহিকতা লক্ষ্য রাখা হয় ।
দ্বিতীয় শর্ত হচ্ছে, মোনাযারা অপেক্ষা অন্য কোন ফরযে কেফায়া অধিক গুরুত্বপূর্ণ না দেখা। যদি অন্য কোন ফরযে কেফায়া অধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়, এরপরও মোনাযারায় ব্যাপৃত হয়, তবে সে নাফরমান হবে। তার দৃষ্টান্ত এমন, যেমন কোন ব্যক্তি একদল মানুষকে পিপাসায় কাতর হতে দেখে, কেউ যাদের খবর নেয় না। কিন্তু সে তাদেরকে পানি পান করাতে সক্ষম। এমতাবস্থায় সে পানি পান না করিয়ে যদি শিংগা লাগানোর কৌশল শিক্ষা করতে ব্যাপৃত হয় এবং বলে, এটা শিক্ষা করা ফরযে কেফায়া; শহরে এরূপ কুশলী ব্যক্তি না থাকলে শহরবাসীরা রোগে কষ্ট পাবে। যদি তাকে কেউ বলে, শহরে শিংগা লাগানোর লোক পর্যাপ্ত পরিমাণে বিদ্যমান আছে, তবে সে বলে, এতে এ কাজটি যে ফরযে কেফায়া, তা তো বিলুপ্ত হয় না। মোট কথা, যেব্যক্তি এরূপ করে এবং নেহায়েত জরুরী কাজটি করে না, অর্থাৎ পিপাসার্ত মুসলমানদেরকে পানি পান করায় না, তার অবস্থা এ ব্যক্তির মতই, যে মোনাযারাকে ফরযে কেফায়া মনে করে তাতে ব্যাপৃত থাকে এবং অন্য যেসব ফরযে কেফায়া কেউ পালন করে না, তাতে তৎপর হয় না।
উদাহরণতঃ ফতোয়ার কথাই বলা যাক, এর জন্যে অনেক লোক রয়েছে। প্রত্যেক শহরে কিছু না কিছু ফরযে কেফায়া পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। যেমন অধিকাংশ শহরে মুসলমান চিকিৎসক নেই, যার সাক্ষ্য চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয়াদিতে শরীয়তের আইনে গ্রাহ্য হয়। অথচ ফেকাহবিদদের মধ্যে কারও চিকিৎসা শাস্ত্রের প্রতি উৎসাহ নেই।
অনুরূপভাবে সৎকাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করা একটি ফরযে কেফায়া। যারা মোনাযারা করে, তাদের অধিকাংশই মোনাযারার মজলিসে রেশমী পোশাক অথবা রেশমী ফরাশ বিছানো দেখে। অথচ সে এমন বিষয়ে মোনাযারা করে, যার বাস্তব অস্তিত্ব নেই। যদিও থাকে, তবে তার বর্ণনাকারী থাকে অনেক। এরপরও তারা বলে, তারা ফরযে কেফায়ায় মশগুল হয়ে আল্লাহ্ তাআলার নৈকট্য কামনা করে।
হযরত আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, জনৈক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করল : সৎকাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ কখন বর্জিত হবে? তিনি বললেন : “যখন তোমাদের চেয়ে উত্তম লোকদের মধ্যে শৈথিল্য দেখা দেবে, বড়দের মধ্যে নির্লজ্জতা ও ছোটদের মধ্যে রাজত্ব চলে আসবে এবং নীচদের মধ্যে ফেকাহ্ তথা ধর্মীয় জ্ঞান।”
তৃতীয় শর্ত হচ্ছে, যে মোনাযারা করবে তার মুজতাহিদ হতে হবে। অর্থাৎ নিজের অভিমত অনুসারে ফতোয়া দেয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে। ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আযম (রঃ) প্রমুখের মযহাবের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে ফতোয়া দেবে না। এমনকি, সে যদি সত্য বিষয়টি ইমাম আযমের মযহাব থেকে জানতে পারে, তবে ইমাম শাফেয়ীর বক্তব্য বর্জন করবে এবং সত্য যা জানবে তদনুযায়ী ফতোয়া দেবে। সাহাবায়ে কেরাম ও ইমামগণ তাই করতেন। যেব্যক্তি ইজতিহাদের স্তরে উন্নীত হয়, তাকে কোন প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা হলে সে তার ইমামের উক্তি বর্ণনা করে দেয়। তার ইমামের মযহাবে কিছু দুর্বলতা জানতে পারলে সে তা বর্জন করে না। এরূপ ব্যক্তির মোনাযারায় ফায়দা নেই।
চতুর্থ শর্ত হচ্ছে, মোনাযারা এমন বিষয়ে করবে, যা হয়ে গেছে অথবা সত্বরই হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কেননা, সাহাবায়ে কেরাম এমনি ধরনের ঘটনাবলীতে পরামর্শ করেছেন, যা নতুন সংঘটিত হত অথবা প্রায়ই সংঘটিত হত। যেমন, ফরায়েযের বিষয়সমূহ। কিন্তু আজকাল যারা মোনাযারা করে, তাদেরকে এরূপ করতে দেখা যায় না। যেসব ব্যাপারে মানুষ প্রায়ই লিপ্ত হয়, সেগুলোর তথ্যানুসন্ধানে তারা প্রয়াস চালায় না; বরং এমন ব্যাপার তালাশ করে, যাতে কোন না কোন দিক দিয়ে বিবাদের অবকাশ থাকে। যেসকল ঘটনা সচরাচর ঘটে থাকে, সেগুলো প্রায়ই ছেড়ে দেয়া হয় এবং বলা হয়, এ বিষয়টি হাদীসের সাথে সম্পর্কযুক্ত অথবা এটা নিতান্ত ছোটখাট ব্যাপার। আশ্চর্যের বিষয়, উদ্দেশ্য তো সত্যানুসন্ধান, অথচ হাদীসের দোহাই দিয়ে বিষয়টি ছেড়ে দেয়া হয় অথবা ছোটখাট বিষয় বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়! সত্য বিষয়ে তো সংক্ষিপ্ত আলোচনা করে অভীষ্টে পৌছে যাওয়াই কাম্য হয়ে থাকে। দীর্ঘ আলোচনা কাম্য নয়।
পঞ্চম শর্ত, মজলিসে এবং আমীর ও শাসকদের সামনে মোনাযারা করা অপেক্ষা নির্জনতায় ও একান্তে মোনাযারা করা উত্তম মনে হতে হবে। কেননা, নির্জনতায় সাহস, চিন্তা-ভাবনা একত্রিত ও পরিষ্কার থাকে এবং সত্য বিষয় দ্রুত অনুধাবন করা যায়। পক্ষান্তরে লোকজনের সামনে নিজেকে প্রকাশ করার প্রেরণা মাথাচাড়া দিয়ে উঠে এবং প্রত্যেকেই নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপন্ন করতে উৎসাহী হয়ে যায়- সত্যপন্থী হোক বিংবা মিথ্যাপন্থী। সকলেই জানে, এখন মোনাযারাকারীরা মজলিস ও জনগণের সমাবেশেই বিতর্কে প্রবৃত্ত হতে অধিক আগ্রহী। একজন অন্যজনের সাথে বহু দিন থাকে, কিন্তু একান্তে কোন বক্তৃতা দেয় না; কিংবা একজন কিছু জিজ্ঞেস করলে অন্যজন জওয়াব দেয় না। যদি কোন আমীর ব্যক্তি উপস্থিত থাকে অথবা জনসমাগম হয়, তবে বক্তৃতার কোন দিক বাকী রাখে না, যাতে প্রমাণিত হয়, সে একজন জবরদস্ত বক্তা।
ষষ্ঠ শর্ত, সত্য বিষয়ের অন্বেষণে এমন অবস্থা হতে হবে, যেমন কেউ হারানো বস্তু অন্বেষণ করে। হারানো বস্তুটি তার হাত দিয়ে পাওয়া যাক বা অন্যের হাত দিয়ে- তাতে কোন পার্থক্য থাকে না। বিতর্কে নিজেকে প্রতিপক্ষের সাহায্যকারী মনে করতে হবে; বিপরীত ও শত্রুপক্ষ নয়। সে ভ্রান্তি প্রকাশ করে দিলে অথবা সত্য বিষয় বলে দিলে তার কাছে কৃতজ্ঞ হবে।
উদাহরণতঃ হারানো বস্তুর অন্বেষণে যদি কেউ এক পথে চলতে থাকে এবং অন্য এক ব্যক্তি তাকে অন্য সড়কে যেতে বলে, তবে সে সেই ব্যক্তিকে কৃতজ্ঞতাস্বরূপ ধন্যবাদ জানায়। তাকে মন্দ বলে না; বরং তার প্রতি খুশী হয়। সাহাবায়ে কেরামের পরামর্শের অবস্থা তাই ছিল। সেমতে এক মহিলা হযরত ওমর (রাঃ)-এর ভাষণের মধ্যে বাধা দিয়ে তাঁকে সত্য বিষয় অবগত করালে তিনি বললেন : মহিলা ঠিক বলছে এবং পুরুষ (অর্থাৎ, আমি) ভুল করেছি। অন্য এক ব্যক্তি হযরত আলী (রাঃ)-কে কিছু জিজ্ঞেস করলে তিনি তার জওয়াব দিলেন। লোকটি বলল : আমীরুল মুমিনীন, মাসআলাটি এরূপ নয়; বরং এরূপ। হযরত আলী (রাঃ) বললেন : তোমার কথাই ঠিক। আমি ভুল করেছি। প্রত্যেক জ্ঞানী ব্যক্তির উপরও জ্ঞানী রয়েছে। হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ) হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-কে সে কথা বলে দিলেন যা থেকে তিনি বিচ্যুত হয়ে পড়েছিলেন। তখন আবু মূসা বললেন : যতদিন এ আলেম তোমাদের মধ্যে রয়েছেন, ততদিন আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করো না।
ঘটনাটি এই : এক ব্যক্তি হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করল : এক ব্যক্তি আল্লাহর পথে জিহাদ করল এবং মারা গেল। তার কি অবস্থা হবে? তিনি বললেন : ‘সে জান্নাতে থাকবে।' তখন আবু মূসা (রাঃ) কূফার শাসনকর্তা ছিলেন। হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ) প্রশ্নকারীকে বললেন : আমীরকে পুনরায় জিজ্ঞেস কর। সম্ভবতঃ তিনি তোমার প্রশ্ন বুঝেননি। লোকটি পুনরায় জিজ্ঞেস কললেন। আমীর আবারও একই জওয়াব দিলেন। হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ) বললেন : আমি বলি, যদি সে মারা যায় এবং সত্যে পৌঁছে থাকে, তবে জান্নাতী হবে। হযরত আবু মূসা বললেন : আপনার কথাই ঠিক। বাস্তবে সত্যান্বেষী ব্যক্তির পক্ষে এরূপ ন্যায়সঙ্গত কথাই বলা উচিত। আজকাল এ ধরনের কথা কোন সামান্য ফেকাহবিদের কাছে কেউ বর্ণনা করলেও সে মানবে না; বরং বলবে- এ মাসআলায় সত্যে পৌঁছার কথা বলার কোন প্রয়োজন নেই । কারণ এটা সবাই জানে। মোট কথা আজকালকার মোনাযারাকারীদেরকে লক্ষ্য কর, যদি প্রতিপক্ষের মুখ দিয়ে সত্য প্রকাশ পায়, তবে তাদের মুখমণ্ডল কেমন কাল হয়ে যায়। এরপর গোপনে গোপনে যতদূর সম্ভব, এ সত্য অস্বীকার করার চেষ্টা করে। যেব্যক্তি তাদেরকে অভিযুক্ত করে, তার সারা জীবন তার নিন্দা চর্চা করতে থাকে। তার পরও মোনাযারায় নিজেদেরকে সাহাবায়ে কেরামের অনুরূপ বলতে তাদের লজ্জা করে না।
সপ্তম শর্ত, মোনাযারায় শরীক ব্যক্তি যদি এক প্রমাণ থেকে অন্য প্রমাণের দিকে যায় এবং এক আপত্তির বদলে অন্য আপত্তি পেশ করতে চায়, তবে তাকে বাধা দেয়া উচিত নয়। পূর্ববর্তী মনীষীগণের মোনাযারা এরূপই হত। বিতর্কের নবাবিষ্কৃত সূক্ষ্ম বিষয়াদি তাদের মোনাযারায় অনুপস্থিত ছিল। কেননা, সত্য বিষয়ের দিকে প্রত্যাবর্তন করা সর্বদাই মিথ্যার বিপরীত হয়ে থাকে। আর সত্য বিষয় কবুল করা ওয়াজেব।
অথচ মোনাযারার মজলিসে দেখা যায়, সারাক্ষণ একে অপরের কথা খণ্ডনে এবং বিবাদ বিসম্বাদে লিপ্ত থাকে। উদাহরণতঃ এক ব্যক্তি তার ধারণায় কোন মূল বিধানের একটি কারণ বর্ণনা করলে অন্য ব্যক্তি জওয়াব দেয় : মূল বিষয়ে এ বিধান হওয়ার কারণ এটিই, এর প্রমাণ কি? উত্তরে সে বলে : আমার তো তাই মনে হয়। তুমি যদি অন্য কোন সুস্পষ্ট কারণ জান, তবে বর্ণনা কর। আমিও ভেবে দেখব। এরপর আপত্তিকারী পীড়াপীড়ি করে বলে : কারণ অন্যটি; আমি তা জানি কিন্তু বলব না। কেননা, বলা আমার জন্যে জরুরী নয়। এরপর পীড়াপীড়ি সত্ত্বেও সে তা বর্ণনা করে না এবং মোনাযারার মজলিসে হট্টগোল হতে থাকে। আপত্তিকারী ব্যক্তি বুঝে না যে, 'আমি জানি কিন্তু বলব না'- তার একথা 'শরীয়ত বিরোধী' মিথ্যার নামান্তর। কেননা, যদি বাস্তবে কারণটি তার অজানা থাকে এবং কেবল প্রতিপক্ষকে অপারগ করে দেয়ার জন্যে জানার দাবী করে, তবে সে ফাসেক, মিথ্যাবাদী, আল্লাহ্ নাফরমান এবং তাঁর ক্রোধের পাত্র।
পক্ষান্তরে যদি সে আপন দাবীতে সত্যবাদী হয়, তবুও সে ফাসেক। কারণ, সে একটি জানা শরীয়তগত বিষয় গোপন করে। অথচ তার মুসলমান ভাই তা জেনে চিন্তাভাবনা করার জন্যে তাকে জিজ্ঞেস করছে। এটা সর্ববাদিসম্মত কথা যে, মানুষ ধর্মের যা কিছু জানে, কারও জিজ্ঞাসার পর তা বলা ও প্রকাশ করা ওয়াজেব। এখন সাহাবায়ে কেরামের পরামর্শ ও পূর্ববর্তী আলেমগণের বক্তব্য দেখে বিচার করা দরকার, তাদের মধ্যে এ ধরনের বিষয় শুনা গেছে কি? তাদের কেউ কখনও এক প্রমাণ থেকে অন্য প্রমাণে যেতে নিষেধ করেছেন কি? তারা কি কিয়াস ছেড়ে সাহাবীর উক্তি অবলম্বন করতে এবং হাদীস ছেড়ে আয়াত অবলম্বন করতে নিষেধ করেছেন? তাঁদের সকল মোনাযারা এমন হত যে, তাঁরা অন্তরে যা চিন্তা করেছেন, মুখে হুবহু তা বর্ণনা করেছেন, অতঃপর তা নিয়ে সকলে মিলে চিন্তাভাবনা করেছেন।
অষ্টম শর্ত, মোনাযারা এমন ব্যক্তির সাথে করতে হবে, যার কাছ থেকে উপকার আশা করা যায় এবং যে জ্ঞানের বিষয়ে ব্যাপৃত। আজকাল প্রায়শঃ দেখা যায়, যারা মোনাযারা করে তারা বড় বড় আলেমের সাথে মোনাযারা করতে ভয় পায়। আশংকা এই করা হয় যে, সত্য বিষয় তার মুখ দিয়ে বের হয়ে পড়লে মোনাযারাকারীর প্রকৃত অবস্থা ফাঁস হয়ে পড়বে। ফলে যারা অজ্ঞানী তাদের সাথে মোনাযারা করার উৎসাহ বেশী দেখা যায়, যাতে তাদের সামনে বাতিলকেই সপ্রমাণ করা যায়।
মোনাযারার এই আটটি শর্ত ছাড়া আরও অনেক সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম শর্ত রয়েছে, কিন্তু এই আটটি শর্ত দ্বারাই তুমি মোনাযারাকারীর প্রকৃত অবস্থা জানতে পারবে, সে আল্লাহ্ জন্যে মোনাযারা করে না অন্য কোন কারণে। সারকথা, শয়তান মানুষের অন্তরকে ঘিরে রেখেছে। বাস্তবে শয়তান হল মানুষের সর্ববৃহৎ দুশমন ও ধ্বংসকামী। যেব্যক্তি এই শয়তানের সাথে মোনাযারা করে না এবং অন্য লোকের সাথে এমন বিরোধপূর্ণ বিষয়ে মোনাযারায় প্রবৃত্ত হয়, যাতে ইজতিহাদকারী সত্য বিষয়ে পৌছে অথবা সত্য বিষয়ে পৌছার সওয়াবে অংশীদার হয়, সে শয়তানের ক্রীড়নক এবং খাঁটি লোকদের জন্যে একটি শিক্ষা।

পরববর্তী পর্ব

জ্ঞান ও জ্ঞানার্জন (২০) তর্কশাস্ত্রে মানুষের মনোযোগী হওয়ার কারণ



 জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ২০)
এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

তর্কশাস্ত্রে মানুষের মনোযোগী হওয়ার কারণ-
প্রকাশ থাকে যে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর পরে খোলাফায়ে রাশেদীন খেলাফতের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। তাঁরা ছিলেন একাধারে আলেম বিল্লাহ (আল্লাহ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞানী), তাঁর বিধি-বিধান সম্পর্কে পরিজ্ঞাত এবং বিরোধপূর্ণ বিষয়ে ফতোয়া দানের ব্যাপারে পারদর্শী। এ কারণেই ফেকাহবিদদের কাছ থেকে সাহায্য নেয়ার প্রয়োজন তাঁদের কমই হত। কেবল যেসব ব্যাপারে পরামর্শ ছাড়া উপায় ছিল না, সেগুলোতেই ফেকাহবিদদের প্রয়োজন দেখা দিত। এজন্যই আলেমগণ একনিষ্ঠভাবে আখেরাত বিষয়ক শাস্ত্রেই নিয়োজিত ছিলেন এবং তাঁদের অন্য কোন বৃত্তি ছিল না। তাঁরা আইনের খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে আলোচনা এবং এ নিয়ে বিতর্ক এড়িয়ে চলতেন এবং এ দায়িত্ব একে অপরের উপর ন্যস্ত করতেন। তাঁরা সর্বপ্রযত্নে আল্লাহ তা'আলার দিকে মনোযোগী ছিলেন। তাদের জীবনালেখ্য থেকে এ কথাই জানা যায়।

পরবর্তী পর্যায়ে এক শ্রেণীর আলেম যোগ্যতা এবং বিধি-বিধান ও ফতোয়া সম্পর্কে প্রগাঢ় জ্ঞান ছাড়াই শাসন কর্তৃত্বের বিভিন্ন দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ফলে তাদেরকে বাধ্য হয়ে ফেকাহবিদদের সাহায্য গ্রহণ করতে হয় এবং সর্বাস্থায় তাদেরকে সঙ্গে রাখার প্রয়োজন দেখা দেয়। তখন তাবেয়ী আলেমগণের মধ্যে যাঁরা অবশিষ্ট ছিলেন, তাঁরা প্রথম যুগের রীতি-নীতিতে অভ্যস্ত, খাঁটি দ্বীনের অনুসারী এবং পূর্বসূরিদের পদাংক অনুসরণকারী ছিলেন।
ফলে শাসকবর্গ তাঁদেরকে ডাকলে তাঁরা পালিয়ে ফিরতেন এবং পৃষ্ঠ প্রদর্শন করতেন। তাই বিচার বিভাগ ও শাসন বিভাগের বিভিন্ন পদ দান করার জন্যে শাসকবর্গ আলেমগণকে পীড়াপীড়ি করত। খলীফা, ইমাম ও প্রশাসন সবাই আলেমগণের তোয়াজ করতেন, কিন্তু আলেমগণ তাদের হাতে ধরা দিতেন না। সমসাময়িক লোকেরা যখন আলেমগণের এই সম্মান প্রত্যক্ষ করল, তখন তারা এলেম হাসিল করার প্রতি মনোনিবেশ করল, যাতে শাসকবর্গের কাছে সম্মান ও প্রতিপত্তি লাভ করা যায়। তারা ফতোয়া শাস্ত্রের প্রতি ঝুঁকে পড়ল এবং নিজেদেরকে শাসকবর্গের সামনে উপস্থাপন করল। তাদের সাথে পরিচিত হয়ে বিভিন্ন পদ ও পুরস্কার লাভ করল।
কিছু সংখ্যক তো এর পরেও বঞ্চিত রইল এবং কিছু সংখ্যকের উদ্দেশ্য সফল হল। যারা সফল হল, তারাও চাওয়ার লাঞ্ছনা এবং অনাহূত অবস্থায় দন্ডায়মান হওয়ার অবমাননা থেকে বাঁচতে পারল না। মোট কথা, যে ফেকাহবিদগণ পূর্বে প্রার্থিত ছিল, তারা এখন প্রার্থী হয়ে গেল। পূর্বে যারা শাসকবর্গের হাতে ধরা দিত না এবং সম্মানিত ছিল, এখন তাদের কাছে এসে তারা লাঞ্ছিত হন। কিন্তু এর পরেও যেসব আলেম তওফীকপ্রাপ্ত হলেন, তাঁরা সর্বদাই এই লাঞ্ছনা থেকে মুক্ত রইলেন। সে যুগে মানুষের অধিকাংশ মনোযোগ ফতোয়া ও বিচার বিভাগের সাথে সংশ্লিষ্ট শাস্ত্রের প্রতি নিবদ্ধ ছিল। কেননা, পদ ও শাসনক্ষমতা লাভে এরই প্রয়োজন ছিল বেশী। তাদের পরে আকায়েদের রীতিনীতি সম্পর্কে মানুষের আলোচনা শুনে কিছু সংখ্যক শাসকের মনে কারণসমূহের প্রমাণাদি শুনার আগ্রহ সৃষ্টি হল। জনসাধারণ যখন জানতে পারল, এই শাসকগণ কালাম শাস্ত্রের মোনাযারা ও বিতর্কের প্রতি আগ্রহী, তখন তারা এরই চর্চা শুরু করে দিল। এতে অনেক গ্রন্থ রচিত হল এবং বিতর্কের পদ্ধতি, প্রতিপক্ষের বক্তব্যে আপত্তি উত্থাপনের পন্থা আবিষ্কৃত হল। তারা মনে করল, আল্লাহর দ্বীনের পক্ষ থেকে মন্দ বিষয়সমূহ প্রতিহত করা, সুন্নতের পক্ষ থেকে লড়াই করা এবং বেদআতের মূলোৎপাটন করাই আমাদের লক্ষ্য। যেমন- তাদের পূর্বসূরি ফেকাহবিদগণ বলতেন, তাদের উদ্দেশ্য ফতোয়া উত্তমরূপে জানা এবং মুসলমানদের প্রয়োজনীয় বিধি-বিধানের দায়িত্ব নেয়া।
এর কিছুকাল পরে এমন শাসকশ্রেণী আগমন করল, যারা কালাম শাস্ত্রের গবেষণা পছন্দের দৃষ্টিতে দেখল না। কারণ, এতে বিতর্কের দ্বার খুলে যাওয়ায় পারস্পরিক বিদ্বেষ ও কলহ সৃষ্টি হয়। এমনকি, খুনাখুনি এবং জনপদ পর্যন্ত ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু তারা ফেকাহ সম্পর্কিত মোনাযারা, বিশেষতঃ ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আযম (রহঃ)-এর মাযহাবের উত্তম বিধান জানার প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করে। সেমতে জনসাধারণ কালাম শাস্ত্র ও অন্যান্য শাস্ত্র বাদ দিয়ে এই ইমামদ্বয়ের মধ্যে বিরোধীয় মাসআলাসমূহের প্রতি ঝুঁকে পড়ে।
ইমাম মালেক, আহমদ ও সুফিয়ান সওরী (রহঃ)-এর মধ্যেকার মতভেদসমূহের প্রতি তারা তেমন কঠোর মনোভাব প্রদর্শন করেনি। তারা নিজেদের খামখেয়ালীতে একথা বুঝে নেয় যে, তাদের উদ্দেশ্য শরীয়তের সূক্ষ্ম বিষয়াদি বের করা, দ্বীনের কারণসমূহ সপ্রমাণ করা এবং ফতোয়ার মূলনীতির ভিত্তি স্থাপন করা। এ সম্পর্কে তারা অনেক গ্রন্থ রচনা করে, যাতে নানারকম বিতর্ক লিপিবদ্ধ করা হয়। জনসাধারণ এখন পর্যন্ত এ নীতিই অনুসরণ করে আসছে। জানি না, আমাদের পরবর্তী যমানায় আল্লাহ তা'আলা কি অবধারিত করে রেখেছেন। মোট কথা, মতভেদ ও মোনাযারার প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার এটাই ছিল কারণ। যদি শাসকশ্রেণী এগুলো ছাড়া অন্য কোন শাস্ত্রের প্রতি আগ্রহী হয়ে যায়, তবে আলেমরাও তাদের অনুগামী হবে এবং এ বাহানা পেশ করা থেকে বিরত হবে না যে, যে শাস্ত্রে তারা মশগুল রয়েছে সেটা ধর্মীয় শাস্ত্র এবং আল্লাহ তাআ'লার নৈকট্য ছাড়া তাদের অন্য কিছু কাম্য নয়।

পরবর্তী পর্ব

রবিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৩

জ্ঞান ও জ্ঞানার্জন (১৯) কল্যাণকর জ্ঞানের মধ্যে প্রশংসনীয় জ্ঞান



জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ১৯)
এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

কল্যাণকর জ্ঞানের মধ্যে প্রশংসনীয় জ্ঞান—
প্রকাশ থাকে যে, এদিক দিয়ে জ্ঞান তিন প্রকার-
(১)– যে জ্ঞানের অল্পও মন্দ, অধিকও মন্দ।
(২)– যে জ্ঞানের অল্পও ভাল, অধিকও ভাল এবং
(৩)– যে জ্ঞান যতটুকুতে কাজ চলে, ততটুকু হলে তো ভাল, কিন্তু চাহিদার অতিরিক্ত হলে প্রশংসনীয় নয়।
এ প্রকার তিনটি দেহের অবস্থার মতই। দেহের কোন কোন অবস্থা কম হোক কিংবা বেশী, ভাল বলে গণ্য হয়; যেমন সুস্থতা ও সৌন্দর্য। কতক অবস্থা কম হোক কিংবা বেশী, মন্দ বিবেচিত হয়; যেমন কুশ্রী হওয়া ও কুচরিত্র হওয়া। কতক অবস্থা এমন যে, তা মাঝামাঝি পরিমাণে হলে ভাল বলে গণ্য হয়; যেমন অর্থ ব্যয়। এ ব্যাপারে অপব্যয় প্রশংসনীয় নয়, যদিও তা ব্যয়।
প্রথম প্রকার জ্ঞান যার অল্প ও অধিক সবটাই মন্দ তা হল এমন জ্ঞান যাতে ইহকাল ও পরকালের কোন উপকারিতা নেই, অথবা যার ক্ষতি উপকারিতার তুলনায় বেশী। যেমন জাদু, তেলেসমাত ও জ্যোতির্বিদ্যা। এগুলোর কোনটির মধ্যেই ফায়দা নেই। মানুষের উৎকৃষ্ট সম্পদ জীবন এতে ব্যয় করা অনর্থক বরবাদ করার নামান্তর। আবার কোন জ্ঞানের দ্বারা পার্থিব কোন প্রয়োজন কখনো মিটে গেলেও এর উপকারিতার তুলনায় অপকারিতা বেশী হয়ে থাকে; বরং অপকারের তুলনায় এ উপকার তুচ্ছ মনে হয়।
আর দ্বিতীয় জ্ঞান হল- যে জ্ঞান আদ্যোপান্ত ভাল, তা হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার মারেফত, তাঁর গুণাবলী ও কর্ম সম্পর্কে অবগত হয়ে সৃষ্টির মধ্যে তাঁর অভ্যাস ও নীতি জানা এবং দুনিয়ার উপর আখেরাতকে অগ্রাধিকার দেয়ার রহস্য অবগত হওয়া। এ জ্ঞানই মূল উদ্দেশ্য এবং পরকালীন সৌভাগ্য লাভের উপায়। এ জ্ঞানার্জনের যত বেশী চেষ্টাই করা হোক তা প্রয়োজনের তুলনায় কমই হবে। কেননা, এটা অতল দরিয়া। সকল পর্যটক তার তীরেই ঘুরাফেরা করে। এর অভ্যন্তরে নবী, ওলী ও দৃঢ় চিত্ত আলেম ব্যতীত কেউ প্রবেশ করতে পারে না। এ সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়ার ব্যাপারে এলেম শিক্ষা করা ও আখেরাত শাস্ত্রজ্ঞগণের জীবনী অধ্যয়ন করা কল্যাণকর হয়ে থাকে, এটা শুরুতে দরকার। পরিণামে এ শিক্ষায় যে বিষয় দ্বারা সাহায্য পাওয়া যায়, তা হচ্ছে সাধনা, অধ্যবসায়, অন্তরের পরিশুদ্ধি, দুনিয়ার সাথে সম্পর্কচ্ছেদকরণ এবং দুনিয়াতে নবী ওলীদের মিল সৃষ্টিকরণ। যে কেউ এ জ্ঞান লাভের জন্যে এভাবে চেষ্টা করবে, সে তার ভাগ্যে যতটুকু আছে তা পেয়ে যাবে। চেষ্টা পরিমাণে পাবে না । হাঁ, এতে সাধনার প্রয়োজন অবশ্য আছে। সাধনা ব্যতীত কোন কিছু অর্জিত হয় না। এ ছাড়া হেদায়েতের কোন চাবি নেই।
তৃতীয় জ্ঞান হল- (যা এক বিশেষ পরিমাণ পর্যন্ত ভাল)- সে শিক্ষা, যা আমরা ফরযে কেফায়ার বর্ণনায় লিখে এসেছি। মানুষের উচিত দু'টি বিষয় থেকে যে কোন একটি অবলম্বন করা। হয় সে নিজের চিন্তা করবে এবং নিজের চিন্তা শেষ হলে অপরের চিন্তা করবে। কিন্তু নিজের সংশোধন করার পূর্বে অপরের সংশোধনে মশগুল হওয়া কিছুতেই উচিত নয়। এখন যদি তুমি নিজের চিন্তা কর, তবে সর্বপ্রথম সে জ্ঞান আহরণে মশগুল হও, যা পরিস্থিতির চাহিদা অনুযায়ী তোমার উপর ফরযে আইন। আর বাহ্যিক আমল যেমন নামায, রোযা, পবিত্রতা ইত্যাদিতে মশগুল হও। কিন্তু অত্যন্ত জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ যে জ্ঞান মানুষ বাদ দিয়ে রেখেছে, সেটি হচ্ছে অন্তরের গুণাগুণ সম্পর্কিত জ্ঞান। এতে জানতে হবে, কোন্ গুণটি ভাল ও কোনটি মন্দ। কেননা, কোন মানুষ এমন নেই যার মধ্যে লোভ, লালসা, হিংসা, রিয়া ও আত্মম্ভরিতা ইত্যাদি মন্দ গুণাবলী নেই। এগুলো সবই মারাত্মক গুণ। এগুলোকে এমনিই রেখে কেবল বাহ্যিক আমলে মশগুল থাকা এমন, যেমন কেউ খোস-পাঁচড়া, ফোড়া ইত্যাদি রোগে কেবল ত্বকের উপর প্রলেপ দেয় এবং শিঙ্গা লাগিয়ে ভিতরের বদরক্ত বের করার ব্যাপারে অলসতা করে। যারা নামেই আলেম এবং কাঠমোল্লা, তারা কেবল বাহ্যিক আমল সম্পর্কেই বর্ণনা করে। আর আখেরাতের আলেমগণ বাতেনের সংস্কার ও অনিষ্টের উপকরণ দূর করা ছাড়া আর কিছুই বলেন না। অধিকাংশ মানুষ কেবল বাহ্যিক আমল করে এবং অন্তর পরিষ্কার করে না। এর কারণ, বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমল সহজ এবং অন্তরের আমল কঠিন। এটা এমন, যেমন কেউ তিক্ত ও বিস্বাদ ওষুধ পান করা কঠিন মনে করে কেবল ত্বকের উপর ওষুধের প্রলেপ লাগায়। সে এতেই লিপ্ত থাকে এবং ভিতরে বদ উপকরণ বৃদ্ধি পেয়ে রোগ দ্বিগুণ বেড়ে যায়। সুতরাং তুমি যদি আখেরাত কামনা কর এবং চির ধ্বংসের কবল থেকে মুক্তি প্রত্যাশা কর, তবে বাতেনের রোগ ও তার চিকিৎসায় আত্মনিয়োগ কর। তৃতীয় খন্ডে আমরা এর বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছি। সেটা জানার পর তুমি সে উৎকৃষ্ট মকামে অবশ্যই পৌছাতে পারবে যা আমরা চতুর্থ খন্ডে বর্ণনা করেছি। কেননা, অন্তর মন্দ বিষয় থেকে মুক্ত হলে তাতে ভাল বিষয়ের জন্য স্থান সংকুলান হয়। ফরযে আইন সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত তুমি ফরযে কেফায়াতে ব্যাপৃত হয়ো না। বিশেষতঃ যখন অন্যেরা তা জানে ও পালন করে। কেননা, যেব্যক্তি অন্যের সম্ভাব্য সংশোধনের আশায় নিজের জীবন বিপন্ন করে, সে নির্বোধ। উদাহরণতঃ কারও কাপড়ের মধ্যে সাপ বিচ্ছু ঢুকে পড়ে তাকে হত্যা করতে উদ্যত, কিন্তু সে অপরের শরীর থেকে মাছি তাড়ানোর জন্যে পাখা খুঁজে ফিরে। এ ব্যক্তির চেয়ে বোকা আর কে হবে? যদি তুমি তোমার জাহের ও বাতেনের গোনাহ পরিত্যাগ করতে সক্ষম হও এবং এটা তোমার সার্বক্ষণিক অভ্যাসে পরিণত হয়, যা মোটেই অসম্ভব নয়, তবে তখন অবশ্য ফরযে কেফায়ায় মশগুল হতে পার। এতে ধারাবাহিকতা ও স্তরের প্রতি লক্ষ্য রাখা উচিত। অর্থাৎ, প্রথমে কালামে মজীদ, এর পর হাদীস শরীফ, অতঃপর তফসীর এবং কোরআন শিক্ষা অর্জন করতে হবে। অনুরূপভাবে হাদীসের শিক্ষা ও তার শাখা-প্রশাখায় মশগুল হওয়া উচিত। অর্থাৎ, ফেকাহ শাস্ত্রের বিশ্বাসযোগ্য মাযহাবসমূহ জানতে হবে-মতভেদ নয়।
এর পর ফেকাহর নীতিশাস্ত্র এবং অন্যান্য শিক্ষা জীবনে যতদূর সম্ভব অর্জন করা কর্তব্য। কিন্তু সমগ্র জীবন কোন এক বিশেষ শাস্ত্রে পূর্ণতা লাভের উদ্দেশে ডুবিয়ে রাখা অনুচিত। কেননা, জ্ঞান সীমাহীন এবং বয়স সীমিত। এসব শাস্ত্র অন্য উদ্দেশ্যের জন্যে হাতিয়ার ও উপায়, স্বয়ং কাম্য নয়। কাজেই এগুলোতে এমনভাবে নিমগ্ন হওয়া ঠিক নয় যে, আসল উদ্দেশ্যই বিস্মৃত হয়ে যায়। কাজেই অভিধান শাস্ত্র ততটুকুই শিক্ষা করা উচিত, যদ্দ্বারা আরবী ভাষা বুঝা ও বলা যায়।
এমনিভাবে ব্যাকরণ ততটুকু শিক্ষা করা দরকার, যতটুকুর সম্পর্ক কোরআন ও হাদীসের সাথে রয়েছে।
শিক্ষার তিনটি স্তর রয়েছে- (১) যতটুকুতে কাজ চলে, (২) মাঝারি স্তর এবং (৩) পূর্ণতার স্তর।
এখন হাদীস, তফসীর, ফেকাহ ও কালাম শাস্ত্রের এ তিনটি স্তর বলে দেয়া হচ্ছে, যাতে অন্যান্য শাস্ত্ৰ ও অনুমান করে নেয়া যায়।
তফসীর শাস্ত্রে প্রথম স্তর হচ্ছে কোরআনের দ্বিগুণ পুরু একটি কিতাব যেমন, আলী ওয়াহেদী নিশাপুরীর তফসীর ওজীয। মাঝারি স্তর হচ্ছে কোরআনের তিন গুণ পুরু একটি কিতাব। যেমন, নিশাপুরীর অন্য তফসীর ওসীত। পূর্ণতার স্তর আরও বেশী, যার কোন প্রয়োজন নেই।
হাদীসের প্রথম স্তর হচ্ছে বোখারী ও মুসলিমের বিষয়বস্তু কোন পন্ডিত ব্যক্তির কাছে বুঝে নেয়া। বর্ণনাকারীদের নাম মুখস্থ করা জরুরী নয়। এ কাজ পূর্ববর্তী লোকেরা সম্পন্ন করেছেন। তাঁদের কিতাবসমূহ বিশ্বাসযোগ্য মনে করাই তোমার জন্যে যথেষ্ট। মাঝারি স্তর হচ্ছে বোখারী ও মুসলিমের সাথে সকল সহীহ হাদীস গ্রন্থ পাঠ করা। পূর্ণতার স্তর হচ্ছে দুর্বল, শক্তিশালী, সহীহ, মুয়াল্লাল ইত্যাদি যত প্রকার হাদীস বর্ণিত আছে সবগুলো পাঠ করা এবং সনদের অনেক তরীকা, বর্ণনাকারীদের জীবনচরিত, নাম ও গুণাবলী জানা ।
ফেকাহ শাস্ত্রে প্রথম স্তর হচ্ছে মুযানীর মুখতাসারের ন্যায় কিতাব পড়ে নেয়া। মাঝারি স্তর হচ্ছে আমার কিতাব ওসীতের সাথে আরও বড় বড় কিতাব পাঠ করা। কালাম শাস্ত্রের উদ্দেশ্য কেবল পূর্ববর্তী মনীষীদের কাছ থেকে বর্ণিত আহলে সুন্নতের আকীদাসমূহ জেনে নেয়া। এর মাঝারি স্তর হচ্ছে আমার ‘কিতাবুল ইকতিসাদ ফিল এতেকাদের' মত একশ' পৃষ্ঠার একটি পুস্তিকা। বেদআতীদের সাথে বিতর্ক করার জন্যেই কালামশাস্ত্রের প্রয়োজন। এটা কেবল সর্বসাধারণের স্বার্থেই উপকারী। বেদআতী ব্যক্তি সামান্য বিতর্ক জানলেও তার সাথে কালাম শাস্ত্র কমই উপকারী হয়। কারণ, বিতর্কে নিরুত্তর হয়ে গেলেও সে বেদআত ত্যাগ করবে না । সে নিজেকে অপক্ক মনে করে ধরে নেবে, এর জওয়াব অবশ্যই আছে, তবে আমি দিতে পারিনি।
মন্দ আলেমদের দোষ এই যে, তারা সত্যের নামে বিদ্বেষে বাড়াবাড়ি করে এবং প্রতিপক্ষকে ঘৃণার চোখে দেখে। এর ফল এই দাঁড়ায় প্রতিপক্ষও মোকাবিলা করতে উদ্যত হয় এবং বাতিলের পক্ষপাতিত্ব অধিক করে। যে বিষয়ে তাকে অভিযুক্ত করা হয় তা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। যদি আলেমগণ শুভেচ্ছা ও হিতাকাঙ্ক্ষার পথ ধরে একান্তে প্রতিপক্ষকে উপদেশ দিত এবং বিদ্বেষ ও ঘৃণা পরিহার করত, তবে সম্ভবতঃ সফলতা অর্জিত হত।
পরবর্তী যমানায় যেসব বিরোধ আবিষ্কৃত হয়েছে এবং এ সম্পর্কে যে ধরনের রচনা, গ্রন্থ ও বিতর্ক আত্মপ্রকাশ করেছে, তেমন পূর্ববর্তী যমানা ছিল না। এগুলো থেকে মারাত্মক বিষের ন্যায় বেঁচে থাকা উচিত ! কারণ, এটা দুরারোগ্য ব্যাধি। এ ব্যাধিই ফেকাহবিদদেরকে পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষে লিপ্ত করেছে।
আমার বক্তব্য তেমনি কোন ফেকাহবিদ শুনলে বলবে : যে যা না পারে, সে তার দুশমন হয়ে যায়। এতে তোমার বুঝা উচিত নয় যে, আমি এ শাস্ত্র সম্পর্কে অনভিজ্ঞ; বরং আমি এ শাস্ত্রে জীবনের একটি বড় অংশ নিয়োজিত করেছি। রচনা, তথ্যানুসন্ধান, বিতর্ক ও বর্ণনায় প্রথম শ্রেণীর লোকদেরকেও পেছনে ফেলে দিয়েছি। কিন্তু এর পর আল্লাহ তা'আলা আমাকে সরল পথ এলহাম করে এ শাস্ত্রের দোষ-ত্রুটি সম্পর্কে অবহিত করেছেন। তখন আমি এ শাস্ত্র বর্জন করে আত্মচিন্তায় মশগুল হয়েছি। কাজেই আমার উপদেশ তোমার কবুল করা উচিত। কেননা, অভিজ্ঞ ব্যক্তির কথা ঠিক হয়ে থাকে। যদি কেউ বলে, ফতোয়া শরীয়তের স্তম্ভ এবং শরীয়তের কারণসমূহ বিরোধ না জেনে জ্ঞাত হওয়া যায় না, তাই কালাম শাস্ত্র শিক্ষা করা জরুরী। এ যুক্তি শুনে তোমার পক্ষে বিভ্রান্ত হওয়া উচিত নয়। কেননা, মাযহাবের কারণসমূহ স্বয়ং মযহাবে উল্লিখিত হয়েছে। এর অতিরিক্ত সবই অহেতুক ঝগড়া। প্রথম যুগের লোকগণ এবং সাহাবায়ে কেরাম এগুলো জানতেন না। অথচ অন্যদের তুলনায় তাঁরা ফতোয়া শাস্ত্র অনেক বেশীই জানতেন।
অতএব তোমার উচিত জ্বিন শয়তানদের কাছ থেকে আত্মরক্ষা করা এবং মানব শয়তানদের ধোঁকা থেকেও বেঁচে থাকা। মানব শয়তানরা বিভ্রান্ত ও পথভ্রান্ত করার কাজে জ্বিন শয়তানদেরকে বিশ্রামের সুযোগ দিয়েছে।
সারকথা, তুমি পৃথিবীতে নিজেকে আল্লাহ তা'আলার সাথে একাকী ধরে নাও এবং জান যে, মৃত্যু, আল্লাহর সামনে উপস্থিতি, হিসাব নিকাশ, বেহেশত-দোযখ সম্মুখে রয়েছে। এর পর চিন্তা কর, এই সামনের বস্তুগুলোর মধ্যে কোনটি তোমার জন্যে উপকারী। যেটি উপকারী সেটি অবলম্বন কর এবং অবশিষ্ট সবগুলো বর্জন কর।
জনৈক সূফী কোন একজন পরলোকগত আলেমকে স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞেস করলেন : আপনি যেসব শাস্ত্র দ্বারা বিতর্ক করতেন, সেগুলোর অবস্থা কি? আলেম ব্যক্তি তার প্রসারিত হাতের তালুতে ফুঁ মেরে বললেন : সব ধুলোর ন্যায় উড়ে গেছে। কেবল দু'রাকআত নামায আমার কাজে এসেছে, যা রাতের বেলায় আমি আদায় করতাম।
হাদীসে বলা হয়েছে-
>“হেদায়াত লাভ করার পর কোন সম্প্রদায় পথভ্রষ্ট হয়নি, কিন্তু তখন হয়েছে, যখন তারা কলহ ও বিতর্কে প্রবৃত্ত হয়েছে।”
এর পর রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এই আয়াত তেলাওয়াত করলেন :
>“তারা কেবল কলহের জন্যেই আপনার এ নাম বর্ণনা করে। তারা তো কলহপ্রিয় সম্প্রদায়।”(যাদের অন্তর বক্র)
এ আয়াতের তফসীর প্রসঙ্গে বর্ণিত হাদীসে আছে—
>“এরা হচ্ছে ঝগড়াটে লোক।এদের থেকে বেঁচে থাকুন, যাতে ওরা আপনাকে বিভ্রান্তিতে না ফেলে” এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকেই বুঝিয়েছেন।
জনৈক বুযুর্গ বলেন : শেষ যমানায় কিছু লোক হবে, যাদের উপর আমলের দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে এবং ঝগড়া ও বিতর্কের দরজা খুলে যাবে।
এক হাদীসে আছে- তোমরা এমন যমানায় আছ, যাতে আমলের দরজা খোলা আছে। অচিরেই এমন সম্প্রদায় সৃষ্টি হবে, যাদের অন্তরে বিবাদ ঢেলে দেয়া হবে।
মশহুর এক হাদীসে আছে “আল্লাহ তা'আলার কাছে মানুষের মধ্যে অধিক নিন্দনীয় হচ্ছে ঝগড়াটে ব্যক্তি।”
এক রেওয়ায়েতে আছে : যে সম্প্রদায় বাকপটুতা প্রাপ্ত হয়, তারা আমল থেকে বঞ্চিত হয়।
আলী ইবনে বসীর হিম্মামী তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তাঁর পিতা খলীল ইবনে আহমদের মৃত্যুর পর তাঁকে স্বপ্নে দেখে বললেন : আপনার চেয়ে অধিক বুদ্ধিমান আমি কাউকে পাইনি। এখন আপনার অবস্থা কি?
খলীল বললেন : আমি যে কাজে ব্যাপৃত ছিলাম তার অবস্থা তো তুমি জেনেছ? এ কলেমাগুলো ছাড়া কোন কিছু আমার জন্যে উপকারী হয়নি- কলেমা হল-
>‘ছোবহানাল্লাহি ওয়ালহামদুলিল্লাহি ওয়ালা~ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াআল্লাহু আকবার’ (আল্লাহ মহা পবিত্র, আল্লাহই সমস্ত প্রশংসার অধিকারী, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই, আল্লাহ সুমহান)।

পরবর্তী পর্ব

জ্ঞান ও জ্ঞানার্জন (১৮) শব্দ পরিবর্তিত এলেম



জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ১৮)
এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

শব্দ পরিবর্তিত এলেম
প্রকাশ থাকে যে, মন্দ এলেম শরীয়তগত এলেমের সাথে মিশে যাওয়ার কারণ হচ্ছে, মানুষ উৎকৃষ্ট নামসমূহ তাদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্যে ভিন্ন অর্থে পরিবর্তিত করে দিয়েছে। পূর্ববর্তী মনীষীগণ এসব নাম যে উদ্দেশে ব্যবহার করতেন, মানুষ সেসব নাম বিকৃত করে অন্য উদ্দেশে ব্যবহার করতে শুরু করেছে। এরূপ শব্দ পাঁচটি— ফেকাহ্, এলেম, তওহীদ, তাকীর ও হেকমত। এগুলো উৎকৃষ্ট শব্দ। এগুলো দ্বারা বিশেষিত ব্যক্তিবর্গ দ্বীনের স্তম্ভ হতেন। কিন্তু এখন এগুলো মন্দ অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে। এজন্যই এখন এগুলো দ্বারা বিশেষিত ব্যক্তিবর্গের নিন্দা করা হলে তা আশ্চর্য ঠেকে। কেননা, প্রথমে এগুলো দ্বারা উত্তম ব্যক্তিবর্গ বিশেষিত হতেন।

প্রথম শব্দ ফেকাহকে আজকাল বিশেষ অর্থে ব্যবহার করা হচ্ছে- পরিবর্তন করা হয়নি। অর্থাৎ, ফেকাহ্ হচ্ছে আশ্চর্য ধরনের শাখাগত বিষয় ও তার সূক্ষ্ম কারণাদি জানা, এ সম্পর্কে আলোচনা করা এবং এ সম্পর্কিত উক্তিসমূহ মুখস্থ করা। যেব্যক্তি এ সম্পর্কে খুব চিন্তা-ভাবনা করে এবং অধিক মশগুল থাকে, তাকে বড় ফেকাহবিদ বলা হয় । অথচ পূর্ববর্তী যুগে ফেকাহ্ শব্দের এ অর্থ ছিল না; বরং তখন অর্থ ছিল আখেরাতের পথ এবং নফসের সূক্ষ্ম বিপদাপদ ও অনিষ্টকর আমলসমূহ জানা, ঘৃণিত দুনিয়া সম্পর্কে উত্তমরূপে অবহিত হওয়া, আখেরাতের আনন্দ সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হওয়া এবং অন্তরে ভয়-ভীতি আচ্ছন্ন থাকা। এর প্রমাণ হচ্ছে–
আল্লাহ্ তা’আলার এই উক্তি-
>“যাতে দ্বীন সম্পর্কে বোধশক্তি অর্জন করে এবং নিজ সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে এসে তাদেরকে সতর্ক করে।”
অতএব, যে ফেকাহ্ দ্বারা মানুষকে সতর্ক করা হয়, সেটিই আমাদের বর্ণিত ফেকাহ্। তালাক, গোলাম মুক্ত করার মাসআলা এবং লেয়ান, সলম ও ইজারার শাখাগত বিষয়াদি নয়। কারণ, এগুলো দ্বারা মোটেই সতর্ক করা হয় না। বরং কেউ সদা সর্বদা এসব বিষয়ে মশগুল থাকলে তার অন্তর কঠোর হয়ে যায় এবং মন থেকে ভয় দূর হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন :
>“তারা তাদের অন্তর দ্বারা হৃদয়ঙ্গম করে না।”
অর্থাৎ তারা ঈমানের কথাবার্তা হৃদয়ঙ্গম করে না। ফতোয়া হৃদয়ঙ্গম না করা উদ্দেশ্য নয়। মনে হয় ফেকাহ্ ও ফাহম সমার্থবোধক দু'টি শব্দ। পূর্বে ও বর্তমানে এগুলো সে অর্থে ব্যবহৃত হত, যা আমরা লিখেছি। আল্লাহ তাআলা বলেন :
>“নিশ্চয় তাদের অন্তরে আল্লাহর চেয়ে তোমাদের ভয় বেশী। এটা এজন্যে যে, তারা বুঝে না।”
এ আয়াতে কাফেররা যে আল্লাহকে কম ভয় করে এবং মানুষকে বেশী ভয় করে সে বিষয়কেই ফেকার অভাব বলে অভিহিত করা হয়েছে। এখন চিন্তা কর, এটা শাখাগত ফতোয়া মনে না রাখার ফল, না আমরা যে বিষয়গুলো উল্লেখ করেছি, সেগুলো না থাকার ফল? রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার কাছে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গকে বলেছিলেন : তোমরা বিজ্ঞ, দার্শনিক ও ফকীহ্। অথচ তারা শাখাগত ফতোয়া অবগত ছিল না।
মা'দ ইবনে ইবরাহীম যুহরী (রহঃ)-কে কেউ প্রশ্ন করল : মদীনা মুনাওয়ারার বাসিন্দাদের মধ্যে অধিক ফকীহ্ কে? তিনি বললেন : যে আল্লাহ তাআলাকে অধিক ভয় করে। তিনি যেন ফেকাহর ফলাফল বলে দিয়েছেন। খোদাভীতি বাতেনী এলেমের ফল- ফতোয়া ও মামলা-মোকদ্দমার ফল নয়।

রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : পূর্ণ ফকীহ কে, আমি কি তোমাদেরকে তা বলব না?
লোকেরা আরজ করল : জি হাঁ বলুন। তিনি বললেন :
>"পূর্ণ ফকীহ সে ব্যক্তি, যে মানুষকে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ করে না, তাঁর আযাব থেকে নির্ভীক করে না এবং অন্য কিছুর আশায় কোরআন বর্জন করে না।"

একবার আনাস ইবনে মালেক (রাঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করলেন :
>“যারা ভোর থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত আল্লাহর যিকির করে, তাদের সাথে বসা আমার কাছে চারটি গোলাম আযাদ করার চেয়ে অধিক পছন্দনীয়।”
অতঃপর হযরত আনাস (রাঃ) ইয়াযীদ রাকাশী ও যিয়াদ নিমেরীকে সম্বোধন করে বললেন : “পূর্বে যিকিরের মজলিস তোমাদের এসব মজলিসের মত ছিল না। তোমাদের একজন কিসসা বলে, ওয়াজ করে, মানুষের সামনে খোতবা পাঠ করে এবং একের পর এক হাদীস বর্ণনা করে। আর আমরা বসে ঈমানের আলোচনা করতাম, কোরআন বুঝতাম, দ্বীনের ব্যাপারে জ্ঞান অর্জন করতাম এবং আমাদের প্রতি আল্লাহর নেয়ামত বর্ণনা করতাম।” এ রেওয়ায়েতে হযরত আনাস (রাঃ) কোরআন বুঝা ও নেয়ামত বর্ণনাকে 'তাফাক্কুহ্' তথা দ্বীনের জ্ঞান বলেছেন !
এক হাদীসে এরশাদ হয়েছে— মানুষ পূর্ণ ফকীহ হয় না যে পর্যন্ত আল্লাহর ব্যাপারে অপরকে নিজের প্রতি নাখোশ না করে এবং কোরআনের বহু অর্থে বিশ্বাস না করে। এ রেওয়ায়েতটি আবু দারদার উপর মওকুফও বর্ণিত আছে। তাতে আরও আছে, এরপর সে নিজের নফসের প্রতি মনোনিবেশ করবে এবং তার প্রতি সর্বাধিক নাখোশ থাকবে।

ফারকাদ সনজী (রহঃ) কোন বিশেষ বিষয় হাসান বসরীকে জিজ্ঞেস করলেন। জওয়াব শুনে ফারকাদ বললেন, ফেকাহবিদরা আপনার বিপরীত মত প্রকাশ করেন। হাসান বসরী বললেন : হে ফারকাদ! তুমি কি ফেকাহবিদ স্বচক্ষে কোথাও দেখেছ? ফকীহ সে ব্যক্তি, যে সংসারের প্রতি বিমুখ, পরকালের প্রতি উৎসাহী, দ্বীনের ব্যাপারে বুদ্ধিমান, বিরতিহীনভাবে পরওয়ারদেগারের এবাদতকারী, পরহেযগার, মুসলমানদের বিমুখতা থেকে আত্মরক্ষাকারী, তাদের ধন-সম্পদের প্রতি বিমুখ এবং মুসলমানদের হিতাকাঙ্ক্ষী। এখানে হযরত হাসান বসরী এতগুলো বিষয় উল্লেখ করলেন, কিন্তু একথা বললেন না যে, ফকীহ ফেকাহ শাস্ত্রের শাখাগত ফতোয়ারও হাফেয হবে। আমরা একথা বলি না যে, ফেকাহ শব্দটি বাহ্যিক বিধানাবলীর ফতোয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে না। বরং আমরা বলি, ব্যাপক অর্থে ফতোয়ার ক্ষেত্রেও শব্দটি ব্যবহৃত হত। তবে অধিকাংশ মনীষী ফেকাহ শব্দটি আখেরাত বিষয়ক শাস্ত্রের অর্থেই ব্যবহার করতেন। এখন শব্দটি বিশেষ অর্থে ব্যবহৃত হওয়ায় মানুষ ধোঁকায় পড়েছে। তারা কেবল ফতোয়ার বিধানাবলীতেই মশগুল হয়ে পড়েছে এবং আখেরাত বিষয়ক শাস্ত্র থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তারা এ পছন্দের উপর মনের দিক থেকে একটি ভরসা পেয়েছে। কেননা, আখেরাত বিষয়ক শাস্ত্র সূক্ষ্ম বিধায় তা পালন করা কঠিন। তার মাধ্যমে সরকারী পদ, জাঁকজমক ও অর্থকড়ি লাভ করা দুরূহ। তাই শয়তান এই বাহ্যিক ফেকাহ অন্তরে প্রতিষ্ঠিত করার খুব সুযোগ পেয়েছে। যে ফেকাহ্ শরীয়তের একটি উৎকৃষ্ট শাস্ত্র ছিল, শয়তান তা বিশেষ ফতোয়া শাস্ত্রের জন্যে নির্দিষ্ট করে দিয়েছে।
দ্বিতীয়, এলেম শব্দটি পূর্বে আল্লাহর মারেফত, তাঁর আয়াতসমূহের অবগতি এবং সৃষ্টির মধ্যে তাঁর ক্রিয়াকর্ম চেনার অর্থে ব্যবহৃত হত। হযরত ওমর (রাঃ)-এর ওফাতের পর হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ) বলেছিলেন : এলেমের দশ ভাগের নয় ভাগ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তিনি এলেমকে মারেফত বলেছেন এবং নিজেই তফসীর করেছেন যে, এখানে আল্লাহর এলেম উদ্দেশ্য।
মানুষ এ শব্দটিও বিশেষ অর্থে ধরে নিয়েছে। তারা প্রচার করে দিয়েছে, যেব্যক্তি প্রতিপক্ষের সাথে ফেকাহ্ মাসআলা মাসায়েল নিয়ে খুব বিতর্ক করে এবং এতে ব্যাপৃত থাকে, প্রকৃতপক্ষে সে-ই আলেম। শ্রেষ্টত্বের শিরোপা তার মাথায়ই শোভা পায়।
পক্ষান্তরে যে বিতর্কে পারদর্শী নয়, অথবা তাতে পিছিয়ে থাকে, মানুষ তাকে দুর্বল মনে করে এবং আলেমদের মধ্যে গণ্য করে না। বস্তুতঃ এলেমের এ অর্থ পূর্বে ছিল না। এটা তাদেরই কারসাজি। এলেম ও আলেমের ফযীলত সম্পর্কে হাদীসে যা কিছু বর্ণিত হয়েছে, তা সেসব আলেমের বিশেষণ, যাঁরা আল্লাহ্ তাআলা, তাঁর বিধিবিধান, ক্রিয়াকর্ম ও গুণাবলী সম্পর্কে পরিজ্ঞাত। পক্ষান্তরে এখন আলেম তাদেরকে বলা হয়, যারা শরীয়তের এলেম তো রাখেই না, কেবল বিরোধপূর্ণ মাসআলাসমূহে ঝগড়া-কলহ করার পদ্ধতি আয়ত্ত করেছে। এতেই তারা অদ্বিতীয় আলেমগণের মধ্যে পরিগণিত হয়, যদিও তফসীর, হাদীস ইত্যাদি কিছুই জানে না। এ বিষয়ই অনেক শিক্ষার্থীর জন্যে মারাত্মক অবনতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তৃতীয় শব্দ তওহীদের অর্থ এবং কালাম শাস্ত্র ও বিতর্ক পদ্ধতি সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হওয়া, প্রতিপক্ষের বিরোধপূর্ণ কথাবার্তা আয়ত্ত করা, সে সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন তৈরী করা, অধিক আপত্তি বের করা এবং প্রতিপক্ষকে অভিযুক্ত করা। ফলে এ ধরনের অনেক নতুন দল নিজেদের উপাধি সাব্যস্ত করছে 'আহলে আদল ও তওহীদ' এবং কালামশাস্ত্রীদের নাম রেখেছে তওহীদের আলেম। অথচ এ শাস্ত্রের যেসব বিষয়বস্তু উদ্ভব হয়েছে, সেগুলোর কোনটিই প্রথম যুগে ছিল না; বরং তখন যারা বিতর্ক ও কলহের সূত্রপাত করত, তাদের প্রতি ভীষণ অসন্তুষ্টি প্রকাশ করা হত। সে যুগের লোকেরা কোরআন পাকে বর্ণিত হৃদয়গ্রাহী যুক্তি প্রমাণই হৃদয়ঙ্গম করত এবং তখন কোরআনের শিক্ষাই ছিল পূর্ণ শিক্ষা। তাদের মতে পরকালীন বিষয়কে তওহীদ বলা হত। এটা কালামশাস্ত্রীরা বুঝে না, বুঝলেও আমলে আনেন না। পরকাল বিষয়ের ব্যাখ্যা এই যে, উপায় ও কারণাদির প্রতি লক্ষ্য না করে ভাল মন্দ সকল কর্ম আল্লাহর পক্ষ থেকে হয় বলে বিশ্বাস করতে হবে এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর পক্ষ থেকে হয় বলে বিশ্বাস করা যাবে না। এটা তওহীদের একটি প্রধান মূলনীতি। এরই ফল হচ্ছে তওয়াক্কুল, যা যথাস্থানে বর্ণিত হবে। এ তওহীদেরই এক ফল ছিল, হযরত আবু বকর (রাঃ) অসুস্থ হলে তাঁর সহচরগণ বললেন : আমরা আপনার জন্যে চিকিৎসক ডেকে আনি। তিনি বললেন : চিকিৎসকই আমাকে অসুস্থ করেছেন। অন্য এক রেওয়ায়েতে আছে- হযরত আবু বকর (রাঃ) অসুস্থ হলে তাঁর সহচরগণ জিজ্ঞেস করলেন : চিকিৎসক আপনার রোগ সম্পর্কে কি বলেছে? তিনি বললেন : চিকিৎসক বলেছেন- এটি আমি যা চাই, তাই করি।

তওহীদ এমন একটি উৎকৃষ্ট রত্ন, যার দু'টি আবরণ রয়েছে এবং আর দুটির একটি অপরটি অপেক্ষা রত্ন থেকে দূরবর্তী। লোকেরা তওহীদ শব্দটিকে বিশেষ আবরণের অর্থে এবং সেই বিশেষ শাস্ত্রের অর্থে নির্দিষ্ট করে দিয়েছে, যদ্দ্বারা আবরণের হেফাযত হয়। তারা আসল রত্ন বাদ দিয়েছে। তওহীদের প্রথম আবরণ হচ্ছে মুখে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলা । এ তওহীদ খৃস্টানদের প্রবর্তিত ত্রিত্ববাদের বিপরীত। কিন্তু এ তওহীদ কখনও মোনাফেকের মুখ থেকেও উচ্চারিত হয়; যার অন্তর বাইরের বিপরীত।
তওহীদের দ্বিতীয় আবরণ হচ্ছে মুখে যে কলেমা উচ্চারণ করে, অন্তরে তার বিষয়বস্তুর বিপরীত বিশ্বাস না থাকা; বরং অন্তরে তা সত্য বলে প্রত্যয় থাকা। এটা সর্বসাধারণের তওহীদ। কালামশাস্ত্রীরা এ তওতীদকেই বেদআত থেকে রক্ষা করে। আর আসল রত্ন তওহীদ হচ্ছে উপায় ও কারণাদির প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করে সবকিছুকে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বিশ্বাস করা এবং বিশেষভাবে তাঁরই এবাদত করা, অন্য কাউকে উপাস্য সাব্যস্ত না করা। যারা নিজের খেয়াল খুশীর অনুসরণ করে, তারা এ তওহীদের বাইরে অবস্থান করে। কেননা, যেব্যক্তি নিজের খেয়ালখুশীর অনুসরণ করে, সে তার খেয়াল খুশীকেই উপাস্য সাব্যস্ত করে নেয়। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন :
>“আপনি সেই ব্যক্তির প্রতি লক্ষ্য করেছেন কি, যে তার খেয়াল খুশীকে উপাস্য করে নিয়েছে?”

রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : মনের খেয়াল খুশী হচ্ছে আল্লাহ তাআলার কাছে সর্বাধিক ঘৃণ্য উপাস্য, যার উপাসনা পৃথিবীতে করা হয়। আসলেও চিন্তা করলে বুঝা যায়, মূর্তিপূজারীরা প্রকৃতপক্ষে মূর্তির পূজা করে না; বরং মনের খেয়াল খুশীর পূজা করে। কারণ, তাদের মন বাপদাদার ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট। তারা সেই আকর্ষণের অনুসরণ করে।

মানুষের প্রতি রাগ করাও এ তওহীদের পরিপন্থী। কেননা, যেব্যক্তি ভালমন্দ সবকিছু আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে হয় বলে বিশ্বাস করবে, সে অন্যের প্রতি কিরূপে রাগ করতে পারে? মোট কথা, পূর্বে এ স্তরকে তওহীদ' বলা হত। এটা সিদ্দীকৃগণের স্তর। মানুষ একে কিভাবে পাল্টে দিয়েছে এবং ব্যক্তিক আবরণটি নিয়েই সন্তুষ্ট হয়ে গেছে! তারা এ আবরণকেই প্রশংসা ও গর্বের বস্তু সাব্যস্ত করেছে। অথচ এটা প্রশংসার মূল বিষয় থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। মানুষের অবস্থা সে ব্যক্তির মত, যে প্রত্যূষে ঘুম থেকে উঠে কেবলামুখী হয়ে বলে-“আমি একাগ্রতা সহকারে আমার মুখ সেই সত্তার দিকে করলাম, যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন।”
এখন যদি তার অন্তর বিশেষভাবে আল্লাহ তা'আলার দিকে না থাকে, তবে এর অর্থ এই হবে যে, সে প্রত্যহ দিনের শুরুতেই আল্লাহ তা'আলার সাথে মিথ্যা বলে। কেননা, মুখের অর্থ যদি বাহ্যিক মুখ হয় তবে সেটা তো সব দিক থেকে ফিরিয়ে কাবার দিকে রাখা হয়েছে। কা'বা আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তা'আলার দিক নয় যে, কেউ কা'বার দিকে মুখ করলে আল্লাহ তা'আলার দিকে মুখ করা হবে। আর যদি মুখের অর্থ হয় অন্তরের ধ্যান, যা এবাদতের উদ্দেশ্য, তবে যেখানে অন্তর পার্থিব প্রয়োজন ও স্বার্থসিদ্ধিতে লিপ্ত, অর্থসম্পদ ও জাঁকজমক সঞ্চয়ের কৌশল আবিষ্কারে মগ্ন এবং সম্পূর্ণরূপে সেদিকেই নিবিষ্ট, সেখানে একথা কেমন করে সত্য হবে যে, আমি আমার মুখ সেই আল্লাহর দিকে করলাম, যিনি আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন? এ বাক্যটি আসল তওহীদের স্বরূপ জ্ঞাপন করে। বাস্তবে সে-ই তওহীদপন্থী, যে সত্যিকার এক ছাড়া অন্য কাউকে দেখে না এবং অন্তর অন্য দিকে ফেরায় না। এ তওহীদ হচ্ছে এ আদেশ পালন করা :
>“বলুন, আল্লাহ! এরপর তাদেরকে তাদের বৃথা কথনে খেলাধুলা করতে দিন।”
এখানে মুখে বলা অর্থ নয়। কেননা, মুখ অন্তরের অবস্থা বর্ণনা করে, যা কখনও সত্য কখনও মিথ্যা হয়। আল্লাহ তা'আলাকে দেখার স্থান হচ্ছে অন্তর, যা তওহীদের উৎস।

চতুর্থ শব্দ যিকির ও তাযকীর –
এসম্পর্কে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন : “আর আপনি উপদেশ দিতে থাকুন, কারণ নিশ্চয় উপদেশ মুমিনদের উপকারে আসে”
যিকিরের মজলিসের প্রশংসায় অনেক হাদীস বর্ণিত আছে। উদাহরণতঃ রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন-
>“যখন তোমরা জান্নাতের বাগান অতিক্রম কর, তখন বিচরণ কর” (অর্থাৎ, সংগ্রহ করে বেড়াও)। জিজ্ঞেস করা হল : জান্নাতের বাগান কি? তিনি বললেন : যিকিরের মজলিস।
>“মখলুকের ফেরেশতা ছাড়াও আল্লাহ তাআলার কতক ভ্রমণকারী ফেরেশতা আছে, তারা শূন্যে বিচরণ করে। তারা যখন যিকিরের মজলিস দেখে তখন একে অপরকে ডেকে বলে : চল, তোমাদের অভীষ্ট বিষয় এখানে রয়েছে ! অতঃপর তারা যিকিরওয়ালাদের কাছে এসে তাদেরকে ঘিরে নেয় এবং যিকির শুনে। সাবধান, আল্লাহর যিকির কর এবং নসকে উপদেশ দাও।”

লোকেরা এ যিকির পরিবর্তন করে এমন সব বিষয়ের নাম যিকির রেখে দিয়েছে যা আজকালকার ওয়ায়েযরা সব সময় বর্ণনা করে। অর্থাৎ, কিসসা, কবিতা ইত্যাদির বর্ণনা। অথচ কিসসা বেদআত। পূর্ববর্তী মনীষীগণ কিসসা কথকের কাছে বসতে নিষেধ করেছেন। ইবনে মাজা রেওয়ায়েত করেন, রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর আমলে কিসসা ছিল না- হযরত আবু বকর ও হযরত ওমর (রাঃ)-এর আমলে ছিল। ফলে ফেতনা দেখা দেয় এবং কিসসা কথকরা বহিষ্কৃত হয়। ইবনে ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, একদিন তিনি মসজিদ থেকে বের হয়ে বললেন : কিসসা কথকই আমাকে মসজিদ থেকে বের করেছে। সে না আসলে আমি বের হতাম না।
যমরা বলেন : আমি সুফিয়ান সওরীকে বললাম : আমরা কিসসা কথকের কাছে যাব? তিনি বললেন : বেদআতের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও।
ইবনে আওন বলেন : আমি ইবনে সিরীনের কাছে গিয়ে আরজ করলাম : আজ তেমন ভাল কাজ হয়নি। আমীর কিসসা কথকদের কিসসা বলতে নিষেধ করে দিয়েছেন। তিনি বললেন : আমীর উত্তম তওফীক প্রাপ্ত হয়েছেন।
আ'মাশ (রহঃ) বসরার জামে মসজিদে প্রবেশ করে দেখলেন, এক ব্যক্তি ওয়ায করছে এবং বলছে : আ'মাশ আমার কাছে রেওয়ায়েত করেছেন। একথা শুনে আ'মাশ বৃত্তের মধ্যে ঢুকে পড়লেন এবং বগলের লোম উপড়াতে লাগলেন। ওয়ায়েয বলল : মিয়া, তোমার লজ্জা করে না। আ'মাশ বললেন : আমি তো সুন্নত কাজ করছি। এতে শরমের কি আছে? বরং তুমি মিথ্য বলছ যে, আ'মাশ তোমার কাছে রেওয়ায়েত করেছে। শুন, আমিই আ'মাশ। আমি তোমার কাছে কিছুই রেওয়ায়েত করিনি।

আহমদ বলেন : কিসসা কথক ও ভিক্ষুক সর্বাধিক মিথ্যুক।
হযরত আলী (রাঃ) বসরার জামে মসজিদ থেকে কিসসা কথককে বের করে দেন এবং হযরত হাসান বসরী (রহঃ)-এর কথাবার্তা শুনলেন- তাঁকে বের করেননি। কারণ, তিনি আখেরাত ও মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন, নফসের দোষ ও বিপজ্জনক আমল সম্পর্কে হুশিয়ার করতেন, শয়তানের কুমন্ত্রণা এবং তা থেকে আত্মরক্ষার উপায় সম্পর্কে আলোচনা করতেন। তিনি আল্লাহ্ নেয়ামত ও তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশে বান্দার অক্ষমতার কথা বলতেন এবং দুনিয়ার নিকৃষ্টতা, দোষ, ক্ষণস্থায়িত্ব, বিশ্বাসঘাতকতা এবং পরকালের পথে বিপদাপদের অবস্থা বর্ণনা করতেন। এটাই শরীয়তসম্মত উৎকৃষ্ট যিকির। এর প্রতিই আবু যর (রাঃ) বর্ণিত নিম্নোক্ত হাদীসে উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে।
“যিকিরের মজলিসে উপস্থিতি হাজার রাকআত (নফল নামায) পড়ার চেয়ে উত্তম। এলেমের মজলিসে যাওয়া হাজার রোগীর কুশল জিজ্ঞাসা করার চেয়ে এবং হাজার জানাযার পশ্চাতে যাওয়ার চেয়ে উত্তম।” কেউ জিজ্ঞেস করল : হুযুর, কোরআন তেলাওয়াতের চেয়েও কি? তিনি বললেন : “কোরআন তেলাওয়াতের উপকারিতা এটি এলেম বলেই।”
আতা (রঃ) বলেন : “যিকিরের একটি মজলিস ক্রীড়া-কৌতুকের সত্তরটি মজলিসের জন্যে কাফ্ফারা হয়ে যায়”।
এখন মিষ্ট ও মসলাযুক্ত কথার উদগাতারা তাদের বাজে কথাবার্তার নাম দিয়েছে তাযকীর। অথচ তারা উৎকৃষ্ট যিকিরের পথ ভুলে কোরআন বহির্ভূত ও অতিরঞ্জিত কিসসা কাহিনীতে ব্যাপৃত। একান্ত সত্য হলেও কতক কিস্সা শোনা উপকারী এবং কতক শোনা অপকারী হয়ে থাকে। যেব্যক্তি এটা অবলম্বন করে, তার মধ্যে সত্য-মিথ্যা এবং উপকারী অপকারী বিষয়বস্তুর সংমিশ্রণ হয়ে যায়। এ কারণেই এ থেকে নিষেধ করা হয়েছে এবং এ কারণেই ইমাম আহমদ বলেন : সত্য অবস্থা বর্ণনাকারীর বড় প্রয়োজন রয়েছে। সুতরাং যদি সে কিসসা কোন নবীর হয়, ধর্ম সম্পর্কিত হয় এবং কথকও সত্যবাদী হয়, তবে এরূপ কিস্সা শুনতে কোন দোষ আছে বলে মনে হয় না। কিন্তু বর্ণনাকারীর মিথ্যা থেকে বেঁচে থাকা উচিত। যেসব কিসসায় এমন ত্রুটি ও অসতর্কতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যার তাৎপর্য সর্বসাধারণের বোধগম্য নয়, সেগুলো বর্ণনা করবে না এবং এমন বিরল ত্রুটি-বিচ্যুতিও বর্ণনা করবে না, যার পেছনে ত্রুটিকারী অনেক সৎকর্ম সম্পাদন করেছে, যার ফলে সে ত্রুটি ক্ষমাযোগ্য হয়ে গেছে। কিসসা কথক এ দু'টি বিষয় থেকে বেঁচে থাকলে তার কিসসা কথনে দোষ নেই। এসব শর্তসহ উৎকৃষ্ট কিসসা তাই হবে, যা কোরআন মজীদ ও সহীহ হাদীসে বর্ণিত রয়েছে। কোন কোন লোক আনুগত্য ও এবাদতে উৎসাহ যোগায় এমন গল্প রচনা করে নেয়া দুরস্ত মনে করে। তারা বলে : আমাদের উদ্দেশ্য মানুষকে সত্যের দিকে আহ্বান করা। কিন্তু এটা শয়তানী কুমন্ত্রণা। কেননা, সত্য ঘটনার অভাব নেই যে মিথ্যার আশ্রয় নিতে হবে। যেসব বিষয় আল্লাহ্ তা'আলা ও তাঁর রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বর্ণনা করেছেন, সেগুলো সত্ত্বেও ওয়াযে নতুন বিষয় আবিষ্কার করার প্রয়োজন নেই। ছন্দ মিলিয়ে কথা বলার চেষ্টা মকরূহ ও বানোয়াট 'গণ্য হয়েছে। সেমতে সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাসের ছেলে ওমর প্রয়োজনবশতঃ তাঁর কাছে আসেন। তিনি ওমরকে ছন্দপূর্ণ কাব্যে নিজের প্রয়োজনের কথা বর্ণনা করতে শুনে বললেন : এ কারণেই আমি তোমাকে মন্দ মনে করি। তওবা না করা পর্যন্ত আমি তোমার প্রয়োজনের কথা শুনব না। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আবদুল্লাহ্ ইবনে রাওয়াহার মুখে তিনটি ছন্দপূর্ণ বাক্য শুনে বললেন : হে ইবনে রাওয়াহা! নিজেকে ছন্দের বাঁধন থেকে দূরে রাখ। এ থেকে জানা যায়, যে ছন্দ দু'বাক্যের অধিক হয়, তা নিষিদ্ধ ছিল।
জনৈক ব্যক্তি ভ্রূণহত্যায় হত্যার বিনিময় সম্পর্কে বলেছিল :
“যে খায়নি, পান করেনি, চিৎকার করেনি, তার রক্তপণ আমরা কিরূপে দেব? এরূপ বিষয় তো মাফ হয়ে যায়।”
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) একথা শুনে বললেন : বেদুঈন ব্যক্তির ছন্দের অনুরূপ ছন্দ রচনা কর।
ওয়াযের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে কবিতা বলা খারাপ। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন :
>“পথভ্রান্তরাই কবিদের অনুসরণ করে। দেখ না, তারা প্রতি উপত্যকায় মাথা কুটে ফেরে?
>“আমি পয়গম্বরকে কবিতা শিক্ষা দেইনি এবং তা তাঁর জন্যে শোভনীয়ও নয়।”
যেসব কবিতা বলা ওয়ায়েযদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, সেগুলোর অধিকাংশের মধ্যে এশকের জ্বালা, মাশুকের সৌন্দর্য, মিলনের আনন্দ ও বিরহের যন্ত্রণা বর্ণিত হয়। অথচ ওয়াযের মজলিস সর্বসাধারণ দ্বারাই পূর্ণ থাকে, যাদের অভ্যন্তর কামভাবে পরিপূর্ণ এবং অন্তর সুন্দর বস্তুর প্রতি আকৃষ্ট। এমতাবস্থায় এসব কবিতা তাদের মনের সুপ্ত বিষয়কে উস্কানি দেয়। ফলে কামাগ্নি প্রজ্বলিত হয়ে উঠে এবং তারা চিৎকার ও হাহুতাশ করে। মোট কথা, অধিকাংশ অথবা সব কবিতার পরিণতিই এক ধরনের অনিষ্টকর বিষয় হয়ে থাকে। তবে যেসব কবিতায় উপদেশ ও প্রজ্ঞা রয়েছে, কেবল সেগুলোই দলীল হিসাবে উল্লেখ করা এবং অন্য কোন প্রকার কবিতা ব্যবহার না করা উচিত।
রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন:
>“নিশ্চয় কোন কোন কবিতা প্রজ্ঞাপূর্ণ”।
যদি মজলিসে বিশিষ্ট দ্বীনী ব্যক্তিবর্গ সমবেত থাকে এবং জানা থাকে যে, তাদের অন্তর আল্লাহ তা'আলার মহব্বতে নিমজ্জিত, তবে তাদের জন্যে সে কবিতা ক্ষতিকর নয়, যা বাহ্যতঃ মানুষের উদ্দেশে রচনা করা হয়েছে। কেননা, শ্রোতা যা শুনে তা সে ছাঁচেই গড়ে নেয়, যা তার অন্তরে প্রবল থাকে। ‘সেমা' অধ্যায়ে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
এ কারণেই হযরত জুনায়েদ বাগদাদী (রহঃ) ছয় থেকে দশ জন লোকের মধ্যে ওয়ায করতেন। এর বেশী হলে কিছুই বলতেন না। তাঁর মজলিসে কখনও পূর্ণ বিশ জন লোক হয়নি।
একবার ইবনে সালেমের ঘরের দরজায় কিছু লোক সমবেত হলে এক ব্যক্তি হযরত জুনায়েদ বাগদাদী (রঃ)-কে বলল : আপনি বয়ান করুন। এখানে আপনার বন্ধুবর্গ উপস্থিত রয়েছেন । তিনি বললেন : এরা আমার বন্ধু নয়। এরা মজলিসের লোক। আমার বন্ধু বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
কতক সূফী দু'প্রকার কালাম গড়েছেন- একে তো তারা খোদায়ী এক ও মিলনের ব্যাপারে লম্বা চওড়া দাবী, যার পর বাহ্যিক আমলের কোন প্রয়োজন থাকেনি। এমনকি কেউ কেউ আল্লাহর সাথে এক হয়ে যাওয়ার দাবীও করতে থাকে এবং বলে : পর্দা সরে গেছে, দীদার হচ্ছে এবং সামনাসামনি সম্বোধন অর্জিত হচ্ছে। তারা আরও বলে : আমাদের প্রতি এই আদেশ হয়েছে এবং আমরা এই বলেছি। এ ব্যাপারে তারা হুসাইন ইবনে মনসূর হাল্লাজের অনুরূপ হওয়ার দাবী করে, যাকে এমনি ধরনের কয়েকটি কথা বলার কারণে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল। তারা ‘আনাল হক' উক্তি এবং হযরত বায়েযীদ বোস্তামীর উক্তিকে সনদ হিসাবে পেশ করে। অর্থাৎ, বায়েযীদ বোস্তামী থেকেও 'সোবহানী, সোবহানী বলার কথা বর্ণিত আছে।
এ ধরনের বাক্যের দ্বারা সর্বসাধারণের অনেক ক্ষতি হয়েছে। এমন কি, কোন কোন কৃষক তার কাজকর্ম ছেড়ে দিয়ে এমনি ধরনের দাবী করতে শুরু করে। কেননা, এ বাক্য অন্তরের কাছে খুব ভাল মনে হয়। এতে বাহ্যিক আমল করতে হয় না। মকাম ও হাল অর্জনের জন্যে আত্মশুদ্ধিও করতে হয় না। কাজেই নির্বোধেরা এরূপ দাবী করবে না কেন এবং পাগলামি ও বাজে কথা বকবে না কেন? কেউ তাদের এ সব বিষয় মানতে অস্বীকার করলে তারা বলে : এ অস্বীকারের কারণ হচ্ছে এলেম ও বিতর্ক। এলেম একটি পর্দা এবং বিতর্ক নফসের আমল। আমরা যা অর্জন করেছি তা নূরের কাশফের মাধ্যমে কেবল বাতেন দ্বারা জানা যায়। মোট কথা, এমনি ধরনের বিষয় পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে সর্বসাধারণের ক্ষতি এত বেড়ে গেছে যে, যদি তাদের মধ্যে কেউ এ ধরনের কিছু কথা বলে, তবে তাকে মেরে ফেলা দশ ব্যক্তিকে জীবিত রাখার তুলনায় ভাল হয়।

হযরত বায়েযীদ বোস্তামী থেকে বর্ণিত উক্তি সম্পর্কে কথা এই যে প্রথমতঃ এর বিশুদ্ধতা স্বীকৃত নয়। দ্বিতীয়তঃ যদি কেউ এরূপ কথা তাঁর মুখে শুনে থাকে, তবে সম্ভবতঃ আল্লাহর উক্তিকেই বর্ণনার আকারে তিনি মনের মধ্যে পুনরাবৃত্তি করছিলেন। যেমন বলতেন :
“নিশ্চয় আমিই আল্লাহ। আমি ছাড়া কোন মাবুদ নেই। অতএব আমার এবাদত কর।” (সূরা তোয়াহা)
এ থেকে এরূপ মনে করা উচিত নয় যে, যিনি এ আয়াত পাঠ করছেন তিনি নিজের অবস্থা বর্ণনা করছেন।
দ্বিতীয় প্রকার কালাম যা হৃদয়ঙ্গম করা যায় না। এটি বাহ্যতঃ ভাল কিন্তু অর্থ ভয়াবহ। এতে কোন প্রকার উপকার হয় না। এসব কালাম স্বয়ং বক্তারই হৃদয়ঙ্গম হয় না; বরং পাগলামি ও বিক্ষিপ্ত চিন্তাধারার কারণে বলে দেয়। এ পাগলামির কারণ, যে কথা তার কানে পড়ে, তার অর্থ কমই স্মরণ রাখে। অধিকাংশ এরূপই।
অথবা বক্তা নিজে বুঝে কিন্তু অপরকে সে কালাম বুঝাতে পারে না। কিংবা মনের ভাব প্রকাশ করার মত বাক্য গঠন করতে সক্ষম হয় না। কারণ, বিদ্যাবুদ্ধি কম। এ ধরনের কালাম দ্বারা অন্তর পেরেশান এবং বুদ্ধি চিন্তাকে হয়রান করা ছাড়া কোন উপকার হয় না। হাঁ, এমন অর্থ বুঝে নেয়া যেতে পারে, যা উদ্দেশ্য নয়। এমতাবস্থায় প্রত্যেক ব্যক্তি এসব কালামের অর্থ নিজের বাসনা অনুযায়ী বুঝবে। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন :
>“যেব্যক্তি কোন সম্প্রদায়ের কাছে এমন হাদীস বর্ণনা করে, যার অর্থ তারা বুঝে না, সে হাদীস সেই সম্প্রদায়ের জন্যে একটি আপদ হবে।”
তিনি আরও বলেন : “এমন কথা বল, যা তারা বুঝে। যা বুঝে না তা বলো না।”
>“তোমরা কি চাও, আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে মিথ্যাবাদী বলা হোক?” এ উক্তিটি এমন কালাম সম্পর্কে, যার বক্তা নিজে তা বুঝে বটে কিন্তু শ্রোতারা তা হৃদয়ঙ্গম করতে পারে না। এরূপ কালাম বলা জায়েয হবে না। এ থেকে জানা যায়, যে কালাম স্বয়ং বক্তাই বুঝে না, তা বলা কেমন করে দুরস্ত হবে?
হযরত ঈসা (আঃ) বলেন : যারা যোগ্য নয়, তাদেরকে জ্ঞানের কথা শুনিয়ো না। শুনালে জ্ঞানের কথার প্রতি তোমার বাড়াবাড়ি হবে। পক্ষান্তরে যারা যোগ্য, তাদের থেকে জ্ঞানের কথা আটকে রেখো না। রাখলে তাদের প্রতি অন্যায় করা হবে। কোমলপ্রাণ চিকিৎসকের মত হয়ে যাও। সে যেখানে রোগ দেখে সেখানেই ওষুধ লাগিয়ে দেয়।
অন্য এক রেওয়ায়েতে আছে, যেব্যক্তি অযোগ্যদের মধ্যে জ্ঞানের কথা বর্ণনা করে, সে মূর্খ। আর যে যোগ্য থেকে জ্ঞানের কথা আটকে রাখে সে জালেম। জ্ঞানের কথা একটি প্রাপ্য হক। কিছু লোক এর অধিকারী। সুতরাং প্রত্যেক হকদারকে তার হক দিয়ে দেয়া উচিত।
কেউ কেউ শরীয়তের বাহ্যিক শব্দ থেকে যে অর্থ বুঝা যায় তা গ্রহণ করে না এবং তা থেকে এমন বাতেনী বিষয় উদ্ভাবন করে, যার কোন উপকারিতা নেই। যেমন, বাতেনী ফের্কার লোকেরা কোরআন মজীদের ভিন্ন অর্থ বের করে । এটাও হারাম এবং এর ক্ষতি অনেক বেশী। কেননা, শরীয়তের পক্ষ থেকে কোন দলীল ও প্রয়োজন ছাড়াই যখন শব্দের বাহ্যিক অর্থ বাদ দেয়া হবে, তখন শব্দের উপর কোন আস্থা থাকবে না। ফলে আল্লাহ ও রসূলের কালামের উপকারিতা বিনষ্ট হয়ে যাবে। কারণ সকলের বাতেন এক রকম হয় না। তাতে পরস্পর বিরোধিতার আশংকা থাকে । ফলে শব্দকে বিভিন্ন অর্থে ঢেলে নেয়া যেতে পারে। বাতেনী ফেকা এভাবে গোটা শরীয়তকে বরবাদ করেছে। এ ফের্কার লোকেরা কোরআনের যে ব্যাখ্যা করে, তার কয়েকটি দৃষ্টান্ত এই :
আল্লাহ্ তাআলা বলেন: (হে মূসা!) ফেরআউনের কাছে যাও, সে সীমালঙ্ঘন করেছে। বাতেনী ফের্কা বলে : এতে অন্তরের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। ফেরআউনের অর্থও অন্তর। অন্তরই প্রত্যেক মানুষের অবাধ্য।
“তুমি তোমার লাঠি নিক্ষেপ কর।” -বাতেনী ফের্কা বলে : আল্লাহ ব্যতীত যেসব বস্তুর উপর ভরসা করা হয়, সেগুলো নিক্ষেপ করা উচিত।
হাদীসে আছে “তোমরা সেহরী খাও। সেহরীর মধ্যে বরকত আছে।”
বাতেনী ফের্কা বলে : এর অর্থ সেহরীর সময় এস্তেগফার করা। তারা এমনিভাবে ব্যাখ্যা করে। তারা আদ্যোপান্ত কোরআনকে বাহ্যিক অর্থ এবং হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও অন্যান্য আলেমগণ কর্তৃক বর্ণিত তফসীর থেকে ভিন্ন খাতে নিয়ে যায়। এগুলোর মধ্যে কিছু সংখ্যক যে বাতিল তা নিশ্চিত। যেমন ফেরআউনের অর্থ অন্তর নেয়া। কেননা, ফেরআউন একজন ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ব্যক্তি ছিল। সে কাফের ছিল এবং হযরত মূসা (আঃ) তাকে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিলেন- একথা আমাদের জানা। এমনিভাবে সে শব্দ দ্বারা এস্তেগফার অর্থ নেয়াও বাতিল। কেননা, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তখন আহার করতেন এবং বলতেন :
“তোমরা বরকতের খাদ্যের দিকে এসো।”
মোট কথা, এসব ব্যাখ্যা হারাম ও পথভ্রষ্টতা। এগুলোর মধ্যে কোনটিই সাহাবী ও তাবেয়ীগণ থেকে বর্ণিত নেই। হযরত হাসান বসরী (রহঃ)- যিনি মানুষকে ইসলামের প্রতি আহ্বান ও উপদেশদানে পাগলপারা ছিলেন, তাঁর পক্ষ থেকেও এরূপ ব্যাখ্যা বর্ণিত নেই। হাদীসে আছে-
“যেব্যক্তি নিজের মতানুযায়ী কোরআনের তফসীর করে, তার ঠিকানা জাহান্নাম।”
এ হাদীসে উপরোক্তরূপ বাক্যই বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, প্রথমে একটি উদ্দেশ্য ও মত ঠিক করে নিয়ে সেই মত প্রমাণ করার জন্যে কোরআনকে সাক্ষী করা এবং কোরআনের শব্দ থেকে আপন মতলব উদ্ধার করা। অথচ এর পেছনে কোন আভিধানিক সমর্থন নেই।
এ হাদীস থেকে একথা বুঝা ঠিক হবে না যে, চিন্তা গবেষণার মাধ্যমে কোরআনের তফসীর করা যাবে না। কেননা, অনেক আয়াত সম্পর্কে সাহাবী ও তফসীরকারগণের পক্ষ থেকে পাঁচ ছয় ও সাত ধরনের উক্তি বর্ণিত আছে। এটা জানা কথা, সবগুলো উক্তিই রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) থেকে শ্রুত নয়। কেননা, এসব উক্তি মাঝে মাঝে পরস্পর বিরোধীও হয়ে থাকে। সুতরাং এগুলো দীর্ঘ গবেষণাপ্রসূতই হয়ে থাকবে। এ কারণেই রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) সম্পর্কে বলেছিলেন : “হে আল্লাহ! তাকে দ্বীনের গভীর জ্ঞান দান করুন।”
যারা উপরোক্তরূপ অপব্যাখ্যা বৈধ মনে করে এবং বলে, এর উদ্দেশ্য মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করা, তারা সে ব্যক্তিরই অনুরূপ, যে শরীয়তে উল্লেখ নেই এমন একটি বাস্তব সত্য বিষয়ে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর পক্ষ থেকে একটি হাদীস গড়ে নেয় অথবা যে কোন বিষয় সে সত্য মনে করে, সে সম্পর্কেই রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) থেকে একটি হাদীস তৈরী করে নেয়। এটা জুলুম ও গোমরাহী এবং নিম্নবর্ণিত হাদীসের বিষয়বস্তুর অন্তর্ভুক্ত-
>“যে ইচ্ছাকৃতভাবে আমার উপর মিথ্যা বলে, তার ঠিকানা জাহান্নাম।”
বরং শব্দের অপব্যাখ্যা করা আরও খারাপ। কেননা, এর কারণে শব্দের উপর থেকেই আস্থা নষ্ট হয়ে যায় এবং কোরআন বুঝার পথ রুদ্ধ হয়। এখন তুমি জেনে থাকবে যে, শয়তান মানুষের ইচ্ছাকে কিরূপ সৎ জ্ঞান থেকে সরিয়ে মন্দ জ্ঞানের দিকে নিয়ে গেছে। এগুলো মন্দ আলেমদের দ্বারা মর্মার্থ পরিবর্তনের বদৌলত প্রসার লাভ করেছে। যদি তুমি কেবল প্রসিদ্ধির ভিত্তিতে তাদের অনুসরণ কর এবং প্রথম যুগে যেসকল ব্যাখ্যা সুবিদিত ছিল, সেগুলোর প্রতি লক্ষ্য না কর, তবে তোমার অবস্থাও শোচনীয় হবে।

পঞ্চম শব্দ হেকমত।
আজকাল হাকীম শব্দটি চিকিৎসক, কবি ও জ্যোতির্বিদ অর্থে ব্যবহৃত হয়। বরং যেব্যক্তি ফুটপাতে বসে নানা রূপ ভেল্কী দেখায়,, তাকেও হাকীম বলা হয়। অথচ হেকমতের প্রশংসা স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা করেছেন। তিনি বলেন :
>“আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হেকমত (প্রজ্ঞা) দান করেন। যে হেকমত প্ৰাপ্ত হয় সে প্রভূত কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।”
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এ সম্পর্কে বলেন : মানুষ যদি হেকমতের একটি বাক্য শেখে, তবে এটা তার জন্যে পৃথিবী ও পৃথিবীস্থিত সবকিছুর চেয়ে উত্তম। এখন চিন্তা কর, পূর্বে হেকমত কি ছিল আর এখন কার্যতঃ কোন্ অর্থে চলে গেছে। অন্যান্য শব্দ এর উপরই অনুমান করে নাও এবং মন্দ আলেমদের দ্বারা প্রতারিত হয়ো না। কেননা, দ্বীনের উপর তাদের অনিষ্ট শয়তানদের তুলনায় অনেক বেশী। শয়তান তাদের মাধ্যমেই মানুষের মন থেকে দ্বীনকে বহিষ্কার করে।
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়; ঘৃণ্যতম মানুষ কে? তিনি জওয়াব দিতে অস্বীকার করেন এবং বলেন : ইলাহী! ক্ষমা করুন। অতঃপর বার বার জিজ্ঞাসার জওয়াবে তিনি বললেন : ঘৃণ্যতম মানুষ হচ্ছে মন্দ আলেম। সুতরাং ভাল ও মন্দ এলেম জানা হয়ে গেছে এবং আরও জানা হয়েছে যে, কি কারণে ভাল এলেম মন্দ এলেমের সাথে মিশে একাকার হয়ে যায়। এখন তুমি ইচ্ছা করলে নিজের মঙ্গলাকাঙ্ক্ষায় পূর্ববর্তী মনীষীদের অনুসরণ করবে। আর যদি প্রতারণার কূপে নিক্ষিপ্ত হতে চাও, তবে পরবর্তীদের সাথে সামঞ্জস্য সৃষ্টি করবে। যেসব জ্ঞান পূর্ববর্তীদের পছন্দনীয় ছিল সেগুলো সব বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আর যে এলেমের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ছে, তার অধিকাংশই বেদআত বা নতুন আবিষ্কার । রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) যথার্থই বলেছেন :
>“ইসলামের সূচনা হয়েছে নিঃসঙ্গ অবস্থায় এবং শেষ পর্যন্ত সে নিঃসঙ্গ অবস্থায়ই ফিরে যাবে যেমন সূচনা হয়েছিল।”
অতএব সুসংবাদ একাকীদের জন্যে। প্রশ্ন করা হল : একাকী কারা? তিনি বললেন : যারা আমার সেই সুন্নতের সংস্কার করে, যা মানুষের হাতে নষ্ট হয়ে যায় এবং যারা সেই সুন্নতকে পুনরুজ্জীবিত করে, যাকে মানুষ মেরে ফেলে।”
অন্য রেওয়ায়েতে আছে, “তোমরা আজ যে বিষয় আঁকড়ে রয়েছ, তারা সে বিষয় আঁকড়ে থাকবে।”
অন্য হাদীসে আছে-
>“তারা অনেক লোকের মধ্যে কম সংখ্যক সৎলোক। তাদের বন্ধুর তুলনায় শত্রুর সংখ্যা অনেক বেশী। কেউ এ জ্ঞানের বিষয় বর্ণনা করলে মানুষ তার শত্রু হয়ে যায়।”
এ জন্যেই হযরত সুফিয়ান সওরী (রহঃ) বলেন : যখন তুমি কোন আলেমের অনেক বন্ধু দেখ, তখন বুঝে নাও সে সত্যকে মিথ্যার সাথে মিলিয়ে দিয়েছে। কারণ, সে কেবল সত্য কথা বললে অধিকাংশ মানুষ তার শত্রু হত।

পরবর্তী পর্ব

সোমবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৩

জ্ঞান ও জ্ঞানার্জন (১৭) যে জ্ঞান উত্তম গণ্য হয় কিন্তু বাস্তবে উত্তম নয়

  


জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ১৭)
এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
যে জ্ঞান উত্তম গণ্য হয় কিন্তু বাস্তবে উত্তম নয়
কোন কোন জ্ঞান মন্দ কেন —
প্রশ্ন হতে পারে, যে বস্তু যেমন আছে ঠিক তেমনি জানাকে বলা হয় এলেম। এটা আল্লাহ তাআলার অন্যতম সিফাত বা গুণ। এমতাবস্থায় এলেম মন্দ ও নিন্দনীয় কেমন করে হতে পারে? জওয়াব এই যে, এলেম স্বয়ং মন্দ হয় না; বরং তিনটি কারণের মধ্য থেকে কোন একটি কারণ মানুষের মধ্যে উপস্থিতির কারণে এলেমকে মন্দ বলা হয়। তিনটি কারণ এই -
(১) এমন এলেম, যা আলেমের জন্যে অথবা অন্যের জন্যে ক্ষতিকর পরিণতি বয়ে আনে। যেমন, জাদুবিদ্যা ও তেলেসমাতি বিদ্যাকে মন্দ বলা হয়। অথচ জাদুবিদ্যা সত্য। কোরআন এর সাক্ষী। মানুষ জাদুকে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানোর কাজে ব্যবহার করে। বোখারী ও মুসলিমে বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) উনাকে কেউ জাদু করেছিল। ফলে তিনি অসুস্থ হয় পড়েছিলেন। অবশেষে জিবরাঈল (আঃ) এসে সংবাদ দেন এবং একটি কূপের ভেতরে পাথরের নীচ থেকে সে জাদু সামগ্রী উদ্ধার করা হয়।
[নোট-এখানে উল্লেখ করা জরুরী যে তিনি জানতেননা এমন নয় বরং মানুষের শিক্ষাই এর মধ্যে নিহিত]
জাদু এক প্রকার জ্ঞান, যা পদার্থের বৈশিষ্ট্য ও তারকা উদয়ের মধ্যে গণনামত বিষয়সমূহ জানার মাধ্যমে অর্জিত হয়।
প্রথমে পদার্থ দ্বারা সে ব্যক্তির একটি পুত্তলিকা তৈরী করা হয়, যার উপর জাদু করতে হবে। এরপর তারকা উদয়ের একটি বিশেষ সময়ের জন্যে অপেক্ষো করা হয়। যখন সেই সময় আসে তখন পুত্তলিকার উপর কতিপয় কুফরী কলেমা ও শরীয়ত বিরোধী অশ্লীল বাক্য উচ্চারণ করে এগুলোর মাধ্যমে শয়তানের সাহায্য প্রার্থনা করা হয়। এসব তদবীরের ফলে আল্লাহর নিয়মানুযায়ী জাদুকৃত ব্যক্তির মধ্যে অদ্ভুত অবস্থা সৃষ্টি হয়। জ্ঞান হিসাবে এসব বিষয় জানা মন্দ নয়। কিন্তু মানুষের ক্ষতি করা ছাড়া এবং অনিষ্টের ওসিলা হওয়া ছাড়া অন্য কিছুর যোগ্যতা এসবের মধ্যে নেই বিধায় এ বিদ্যাকে নিন্দনীয় বলা হয়। যদি কোন অত্যাচারী ব্যক্তি কোন ওলীকে হত্যা করতে মনস্থ করে এবং ওলী তার ভয়ে কোন সুরক্ষিত স্থানে আত্মগোপন করেন, তবে জানা সত্ত্বেও ওলীর ঠিকানা অত্যাচারীকে বলা উচিত নয়। এস্থলে মিথ্যা বলা ওয়াজেব। অথচ জিজ্ঞাসার জওয়াবে তার ঠিকানা বলা সত্য অবস্থা প্রকাশ করা ছাড়া কিছু নয়, কিন্তু পরিণতি ক্ষতিকর বিধায় এটা মন্দ।
(২) যে এলেম প্রায়শঃ আলেমের জন্যে ক্ষতিকর হয়ে থাকে- যেমন জ্যোতির্বিদ্যা। এটা সত্তার দিক দিয়ে মন্দ নয়। কেননা, এটা হিসাব সংক্রান্ত বিষয়। কোরআন পাকে বলা হয়েছে; তুমি অর্থাৎ, সূর্য ও চন্দ্রের গতি হিসাব দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
আরওবলা হয়েছে-
“আমি চন্দ্রকে কক্ষপথ নির্ধারিত করে দিয়েছি। অবশেষে সে খেজুরের পুরাতন শাখার ন্যায় সরু হয়ে যায়।”
অথবা জ্যোতির্বিদ্যার সারমর্ম হচ্ছে কারণ দ্বারা ঘটনা বর্ণনা করা। এটা চিকিৎসকের নাড়ি দেখে ভাবী রোগের কথা বলে দেয়ার মতই।
মোট কথা, জ্যোতির্বিদ্যা জানার মানে সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহ্ তাআলা নির্ধারিত নিয়মকে জানা।
কিন্তু শরীয়ত একে মন্দ বলে আখ্যা দিয়েছে। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : যখন তকদীরের আলোচনা হয় তখন নীরব হয়ে যাও। যখন জ্যোতির্বিদ্যার কথা বলা হয় তখন নীরব থাক এবং যখন আমার সাহাবীগণের প্রসঙ্গ উঠে তখন নীরব থাক। তিনি আরও বলেন : আমি আমার উম্মতের জন্যে তিনটি বিষয়ে ভয় করি- (ক) শাসকদের জুলুম করা, (খ) জ্যোতির্বিদ্যায় বিশ্বাসী হওয়া এবং (গ) তকদীর অস্বীকার করা।
হযরত ওমর (রাঃ) বলেন : জ্যোতির্বিদ্যা এ পরিমাণে অর্জন কর যাতে স্থলে ও পানিতে পথ প্রাপ্ত হতে পার। এতটুকু অর্জন করেই ক্ষান্ত হও।
তিন কারণে জ্যোতির্বিদ্যা অর্জন করতে নিষেধ করা হয়েছে। প্রথমতঃ অধিকাংশ মানুষের জন্যে এটা ক্ষতিকর। অর্থাৎ, যখন মনে একথা উদয় হয় যে, তারকার গতিবিধির দরুনই এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়, তখন মনে এ বিশ্বাসও বদ্ধমূল হতে থাকে যে, তারকারাজিই প্রভাব বিস্তারকারী এবং সেগুলোই উপাস্য। সেগুলো ঊর্ধ্বাকাশে বিরাজমান থাকে বিধায় মনে সেগুলোর সম্মান বৃদ্ধি পায় এবং আন্তরিক মনোযোগ সেগুলোর দিকে নিবদ্ধ থাকে। কল্যাণের আশা এবং অনিষ্ট থেকে রক্ষাপ্রাপ্তি তারকারাজির সাথেই সম্পৃক্ত বলে ধারণা হতে থাকে। এতে করে আল্লাহ্ তা'আলার স্মরণ মন থেকে মুছে যায়। কেননা, দুর্বল বিশ্বাসীদের দৃষ্টি উপায় পর্যন্তই সীমিত থাকে। পাকা আলেম ব্যক্তি অবশ্যই জানেন, চন্দ্র, সূর্য ও তারকারাজি সকলেই আল্লাহ্ তাআলার আদেশ পালন করে মাত্র। দুর্বল বিশ্বাসী ব্যক্তি সূর্যের কিরণ সূর্যোদয়ের কারণে দেখে। উদাহরণতঃ যদি পিপীলিকাকে বুদ্ধিমান ধরে নেয়া হয় এবং সে কাগজের উপর থেকে লক্ষ্য করে যে, কলমের কালি দ্বারা কাগজ কাল হয়ে যাচ্ছে, তবে সে এটাই বিশ্বাস করবে যে, লেখা কলমেরই কাজ। তার দৃষ্টি কলম থেকে আঙ্গুলের দিকে, আঙ্গুল থেকে হাতের দিকে, হাত থেকে ইচ্ছার দিকে, ইচ্ছা থেকে ইচ্ছাকারী লেখকের দিকে এবং লেখক থেকে তার শক্তি ও হাত সৃষ্টিকারীর দিকে উন্নতি করবে না। মোট কথা, মানুষের দৃষ্টি প্রায়ই নিকটের ও নিম্নের কারণসমূহের মধ্যে নিবদ্ধ থেকে সকল কারণের মূল কারণের দিকে উন্নতি করা থেকে বিরত থাকে। তাই জ্যোতির্বিদ্যা শিক্ষা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
নিষেধ করার দ্বিতীয় কারণ, জ্যোতির্বিদ্যার বিষয়াবলী নিছক অনুমানভিত্তিক। তাই এর মাধ্যমে কোন কিছু বলা মূর্খতার উপর ভিত্তি করে বলারই নামান্তর। এমতাবস্থায় এটা মূর্খতা হিসাবে মন্দ-বিদ্যা হিসাবে নয়। কেননা, এটা ছিল হযরত ইদরীস (আঃ)-এর মোজেযা, যা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। জ্যোতির্বিদের কোন কথা ঘটনাচক্রেই সত্য হয়ে থাকে। কেননা, জ্যোতির্বিদ মাঝে মাঝে কোন কারণ সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হয়ে থাকে। সেই কারণের পর অনেকগুলো শর্তের অনুপস্থিতির দরুন ঘটনা সংঘটিত হয় না। এ সব শর্ত সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হওয়ার ক্ষমতা মানুষের নেই। সুতরাং যদি ঘটনাচক্রে আল্লাহ্ তাআলা অবশিষ্ট শর্তগুলোও উপস্থিত করে দেন, তখন জ্যোতির্বিদের কথা সত্য হয়ে যায়। অন্যথায় তার কথা ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়। এটা এমন যেন কেউ দেখল, পাহাড়ের উপর থেকে মেঘমালা উঠে উঠে একত্রিত হচ্ছে এবং চলাফেরা করছে। এতে সে অনুমান করে বলে দিল, আজ বৃষ্টি হবে। অথচ প্রায়ই এমন মেঘমালার পরেও রৌদ্র উঠে পড়ে এবং মেঘ কেটে যায়। কখনও বৃষ্টি হলেও কেবল মেঘমালাই বৃষ্টিপাতের জন্যে যথেষ্ট নয়, যে পর্যন্ত অন্যান্য কারণগুলোর সমাবেশ না ঘটে।
অনুরূপভাবে মাঝির অনুমান করা যে, নৌকা সহীহ্ সালামত থাকবে। মাঝি বাতাসের গতিবিধি সম্পর্কে ওয়াকিফহাল থাকে এবং এর উপর ভরসা করেই একথা বলে। অথচ বাতাসের দিক পরিবর্তনের আরও গোপন কারণ রয়েছে। সেগুলো মাঝি জানে না। ফলে কখনও তার অনুমান সত্য এবং কখনও ভ্রান্ত হয়ে থাকে। এ জন্যেই দৃঢ় চিত্ত ব্যক্তিকেও জ্যোতির্বিদ্যা শিক্ষা করতে নিষেধ করা হয়েছে।
তৃতীয় কারণ, এই বিদ্যার দ্বারা কোন উপকারই হয় না। কেননা, এতে অনর্থক ও অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে মাথা ঘামানো হয়। মানুষের মূল্যবান জীবন অনুপকারী কাজে বিনষ্ট করা যে খুবই ক্ষতিকর, তা বলাই বাহুল্য। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) একবার এক ব্যক্তির চার পাশে অনেক লোককে জমায়েত দেখে জিজ্ঞেস করলেন : লোকটি কে? লোকেরা বলল : সে একজন বড় পণ্ডিত। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন : কি বিষয়ে পণ্ডিত? উত্তর হল, কাব্যে ও আরবদের বংশ জ্ঞানে। তিনি বললেন : এ বিদ্যা উপকারী নয়; বরং এটা এমন মূর্খতা যা ক্ষতিকরও বটে। তিনি আরও বললেন :
“বিদ্যা তিনটি – কোরআনের অকাট্য আয়াত, প্রতিষ্ঠিত সুন্নত এবং কোরআন ও সুন্নতে বর্ণিত ত্যাজ্য সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার বিষয়ক জ্ঞান।”
এতে প্রমাণিত হয়, জ্যোতির্বিদ্যার মত শাস্ত্রে মাথা ঘামানো বিপদাশংকায় পতিত হওয়া এবং মূর্খতায় লিপ্ত হওয়ার নামান্তর। কারণ, তকদীরে যা আছে তা হবেই। তা থেকে আত্মরক্ষা অসম্ভব। চিকিৎসা শাস্ত্র এরূপ নয়। এর প্রয়োজন আছে। সাধারণতঃ এর প্রমাণ দেখা যায়। বিদ্যা যে কিছু লোকের জন্যে নিশ্চিত ক্ষতিকর, তা অস্বীকার করা যায় না। যেমন, পাখীর গোশত দুগ্ধপোষ্য শিশুর জন্যে ক্ষতিকর। বরং কোন কোন লোকের কিছু কিছু বিষয় সম্পর্কে অনবহিত থাকাই উপকারী হয়ে থাকে। বর্ণিত আছে, এক ব্যক্তি চিকিৎসকের কাছে তার স্ত্রীর বন্ধ্যাত্বের অভিযোগ করলে চিকিৎসক স্ত্রীর নাড়ি পরীক্ষা করে বলল : এখন সন্তান লাভের জন্যে চিকিৎসা করার কোন প্রয়োজন নেই। কেননা নাড়ি দেখে মনে হচ্ছে, সে চল্লিশ দিনের মধ্যে মারা যাবে। একথা শুনে স্ত্রী অত্যন্ত ভয় পেয়ে গেল এবং তার জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠল। সে তার ধন-সম্পদ বন্টন ও ওসিয়ত করে পানাহার পরিহার করল এবং মৃত্যুর জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল। অবশেষে নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত হয়ে গেল, কিন্তু স্ত্রীর মৃত্যু হল না। তার স্বামী চিকিৎসককে এ কথা জানালে চিকিৎসক বলল : আমি জানতাম, সে মরবে না। এখন তার সাথে সহবাস কর। তার গর্ভে তোমার সন্তান হবে। স্বামী জিজ্ঞেস করল : এটা কিরূপে বললেন? চিকিৎসক বললেন, অধিক মোটা হওয়ার কারণে মহিলার গর্ভাশয়ের মুখে চর্বির পরত পড়ে যাচ্ছিল। এটাই ছিল গর্ভ ধারণের অন্তরায়। আমি মনে করলাম, মৃত্যু ভয় ছাড়া সে ক্ষীণাঙ্গিনী হবে না। তাই তার মনে মৃত্যুর ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম। এখন তার গর্ভধারণের অন্তরায় দূর হয়ে গেছে। এ গল্প থেকে জানা যায়, কতক বিদ্যা সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হওয়ার মধ্যে বিপদাশংকা থাকে। এ থেকেই এ হাদীসের অর্থ হৃদয়ঙ্গম করা যায়-
>“অনুপকারী বিদ্যা থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করি।”
অতএব শরীয়ত যেসব জ্ঞানের নিন্দা করেছে, সেগুলো সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো না এবং সাহাবায়ে কেরাম ও সুন্নতের অনুসরণ করো। এ অনুসরণেই নিরাপত্তা নিহিত এবং ঘাঁটাঘাঁটিতে বিপদ লুক্কায়িত। এ কারণেই রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন :
-“নিশ্চয় কোন কোন এলেম মূর্খতা এবং কোন কোন কথা হয়রানির কারণ।”
বলাবাহুল্য, এলেম মূর্খতা হয় না; কিন্তু ক্ষতিসাধনে তার প্রভাব মূর্খতার অনুরূপ হয়ে থাকে। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলেন : সামান্য তওফীক অনেক এলেম অপেক্ষা উত্তম।
হযরত ঈসা (আঃ) বলেন : বৃক্ষ অনেক, কিন্তু সবগুলো উপকারী নয়।

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...