মঙ্গলবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২৩

হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (৩) মালা-ই-আলা (সর্বোচ্চ পরিষদ)



📚 হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (পর্ব-৩)
✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)

মালা-ই-আলা  (সর্বোচ্চ পরিষদ) 
আল্লাহর সর্বোচ্চ পরিষদের মহামান্য ফেরেশতাদের বর্ণনাই এ পরিচ্ছেদের উদ্দেশ্য। আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং বলছেনঃ 
 আরশ মুআল্লার বাহক ও তা বেষ্টনকারী পরিষদ আল্লাহর প্রশংসা ও পবিত্রতা বর্ণনায় নিরত থাকেন এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ প্রত্যয় নিয়ে ঈমানদার বান্দাদের জন্য ক্ষমা চাইতে থাকেন। তাঁরা বলতে থাকেনহে আমাদের প্রভু ! সব কিছুই ঘিরে আছে তোমার জ্ঞান ও করুণা ! (আপনি সবই জানেন ও সবার প্রতি আপনার সহৃদয় সৃষ্টি)। তাই যে বান্দারা আপনার দিকে মুখ ফিরিয়েছে ও আপনার দেখানো সরল পথ অনুসরণ করেছেতাদের আপনি ক্ষমা করুন। তাদের দোযখের আগুন থেকে রেহাই দেন। হে আল্লাহ ! তাদের ও তাদের বাপ-মাস্ত্রী-পুত্রদের যারা ঈমানদার তাদের সবাইকে চিরন্তর জান্নাতের বাসিন্দা করুন। তাদের জান্নাত দানের আপনি ওয়াদা করেছেন। আপনিই সর্বশক্তিমান ও শ্রেষ্ঠতম কুশলী। হে মাবুদ ! তাদের অকল্যাণ থেকে বাঁচায়ে রাখুন। আপনি সেদিন যাদের অকল্যাণ থেকে বাঁচাবেনতার ওপর বড়ই দয়া দেখানো হবে। এটাই চরম সাফল্যপরম অভীষ্ট লাভ।(সূরা মুমিনঃ আয়াতঃ ৭-৯)

রাসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেনআল্লাহ তায়ালা যখন আরশ থেকে কোন ফরমান জারী করেনতখণ ভয়ে ফেরেশতাদের পাখা ও পালক ঝড়পেটা হতে থাকে। তাতে পাথরে জিঞ্জীর আছড়ানোর মত ঝনৎকার শ্রুত হয়। তারপর যখন তাদের অন্তর থেকে ভয় ও অস্থিরতা দূর হয়তখন একে অপরকে জিজ্ঞেস করেনআল্লাহ পাক কি নির্দেশ দিলেনতখন কেউ বলে দেনতিনি অমুক সত্যটি প্রকাশ করেছেন এবং তিনিই সর্বোন্নত ও শ্রেষ্ঠতম। 

অন্য এক বর্ণনায় এরূপ বলা হয়েছেআল্লাহ পাক যখন কোন নির্দেশ দেনতখন আরশবাহী ফেরেশতারা তাঁর তাসবীহ পাঠ করতে থাকেন। তারপর তা অনুসরণ করেন আরশের পার্শ্বস্ত মজলিস সদস্যরা। এ ভাবে পর্যায়ক্রমে পার্শ্বষ্থ নিম্নতর আকাশেরএমনকি দুনিয়ার ফেরেশতা পর্যন্ত তাসবীহ পাঠের অনুসরণ করে চলে। অবশেষে আরশের নিম্ন দিকের ফেরেশতারা আরশবাহী ফেরেশতাদের প্রশ্ন করেনপ্রভু তোমাদের কি নির্দেশ দিলেনতখন তাঁরা প্রভুর নির্দেশ বলে দেন এবং তা আবার পর্যায়ক্রমে শ্রুত হয়ে সপ্ত আকাশ পেরিয়ে দুনিয়ার ফেরেশতাদের কাছে পৌঁছে যায়। 

অন্যত্র তিনি বলেনআমি তাহাজ্জুদের জন্যে জেগে উঠে ওজু সেরে আল্লাহ যতখানি তাওফিক দিলেন নামায পড়লাম। নামাযের ভেতরেই তন্দ্রা এল এবং ঘুমিয়ে পড়লাম। যখন গভীর নিদ্রায় নিমগ্ন হলামদেখতে পেলামআল্লাহ তা'আলা অত্যন্ত পবিত্র রূপে জ্যোতির্ময় হয়েছেন। তিনি বলছেনহে হাবীব (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ! আমি জবাব দিলামহে আমার প্রতিপালক ! আমি উপস্থিত রয়েছি। তিনি প্রশ্ন করলেনসর্বোচ্চ পরিষদের ফেরেশতারা কোন সম্পর্কে আলোচনা করছেআরজ করলামআমার তো জানা নেই। তিনি একে একে তিনবার একই প্রশ্ন করলেন এবং আমিও একই উত্তর দিলাম। 

**** [এখানে একটি কথা উল্লেখ করাটা জরুরী যে, যদি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সর্বোচ্ছ পরিষদের ফেরেশতাদের খবর না জানতেন আল্লাহ্ তা'আলা প্রশ্নইবা কেন করলেন? হয়ত মনে প্রশ্ন জাগতে পারে তাহলে তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) জানা নেই কেন বললেন? তার জবাবে বলতে পারি সেটা হল আদব রক্ষা করা। উদাহরণ স্বরুপ বলতে পারি, বিদায় হজ্জের খুতবা দেয়াকালে রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সাহাবীয়েকেরামের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, আজকের এই দিন কোন দিন? সকলে সমস্বরে আরজ করলেন আপনিই ভাল জানেন ইয়া রসূলুল্লাহ্ ! তাহলে জিজ্ঞাসই বা কেন করা হল? তাছারা সাহাবীদের কি জানা ছিলনা সেই দিন আরাফার দিন? জানা না থাকলে আরাফার ময়দানে কেন সমবেত হলেন সবাই? এখানে এটাই হল শিক্ষনীয় আদব। বেয়াদবেরা তার উল্টাটা বুঝবে। তারা বুঝবে জানা থাকলেতো বলে দিতেন।]**** 

***উপরের তারকার ফাকে লাইন কয়টি বইয়ের লিখা নয়, আমার নিজের মতামত প্রকাশ করলাম মাত্র। যারা একমত নহেন তারা এড়িয়ে যান।***

তারপর মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেনআমি দেখলামতিনি আমার কাঁধের ওপর হাত রাখলেন এবং আমি তাঁর আঙ্গুলের অগ্রভাগের শীতলতা অন্তর দিয়ে অনুভভ করলাম। তারপর সে কথাগুলো আমার কাছে সুস্পষ্ট হল। তাঁর প্রশ্নের জবাবও আমার জানা হয়ে গেল। অতঃপর আল্লাহ পাক সম্বোধন করলেনহে হাবীব ! আমি জবাব দিলামহে আমার প্রভু ! আমি হাজির আছি। তখন তিনি প্রশ্ন করলেনহে হাবীবউচ্চতম পরিষদ কোন ব্যাপারে আলোচনা করছেআরজ করলামজামাতের (নামাযের) জন্য পথ চলানামজের পর (ইবাদতের জন্য) মসজিদে বসে থাকা এবং কষ্টের ভেতরেও পুরোপুরি ওজু করা।

তিনি আবার প্রশ্ন করলেনএ ছাড়া আর কি আলোচনা করছে তারাআরজ করলামমর্যাদার বিভিন্ন স্তর সম্পর্কে। প্রশ্ন করলেনসেগুলো কিআরজ করলামমিসকীন খাওয়ানোসবিনয়ে কথা বলা এবং সবার ঘুমের সময়ে ইবাদত করা (তাহাজুজদ পড়া)।

অন্য এক জায়গায় তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, "আল্লাহ যখন কোন বান্দাকে ভালবাসেন এবং বন্ধুরূপে গ্রহণ করেনতখন জিব্রাঈলকে ডেকে বলেনআমি অমুককে ভালবাসিতুমিও তাকে ভালবাস"। সেমতে জিব্রাঈল তাকে ভালবাসেন। তারপর আকাশমণ্ডলীতে ঘোষণা করে দেয়া হবেঅমুক ব্যক্তি আল্লাহর বন্ধুতাকে সবাই ভালবাস। তাই আকাশের সবাই তাকে ভালবাসবেন। এভাবে তাকে পৃথিবীতেও জনপ্রিয় করা হয়। অর্থাৎ সবার অন্তরে তার ভালবাসা জন্ম নেয়। তেমনি আল্লাহ যখন কাউকে খারাপ ঘৃণা করতে থাকেন। সেমতে জিব্রাঈল তাকে ঘৃণা করবেন। তারপর আকাশ-মণ্ডলীর সবাইকে জানিয়ে দেয়া হবেঅমুক ব্যক্তিকে আল্লাহ পাক ঘৃণা করেনতোমরাও তাকে ঘৃণা কর। তা শুনে সেখানে সবাই তাকে ঘৃণা করবে। অবশেষে সেই ঘৃণা পৃথিবীতেও দেখা দেবে। 

মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) অন্যত্র বলেনকেউ যদি নামাযের পর মসজিদে বসে থাকেতাকে ফেরেশতারা ততক্ষণ দোয়া করেন যতক্ষণ না সে তাদের র্কষ্ট দেয় এবং অপবিত্র হয়। তাঁরা এ দোয়া করেনহে আমার প্রভু! তাকে ক্ষমা কর। হে আমার প্রভু! তাকে দয়ার দৃষ্টিতে দেখ। 

তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলেনপ্রতি ফজরে দুজন ফেরেশতা নেমে আসেন। একজন বলেনহে আমার প্রভু! দাতা ও (উদার হস্তে) খরচকারীকে তুমি প্রতিদানে আরও বাড়িয়ে দাও। দ্বিতীয় ফেরেশতা বলেনহে আমার প্রভুবখিলকে বাড়িয়ে দিও না এবং তার সম্পদ ধ্বংস কর"। 

উল্লেখ্য যেশরীয়ত থেকে এ কথা প্রমাণিত হয়েছেআল্লাহ পাকের কিছু উত্তম বান্দা রয়েছেন। তাঁরা হলেন উচ্চ মর্যাদার আল্লাহ নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতা। যে ব্যক্তি নিজকে পুণ্যবান রূপে গড়ে তোলেন এবং নিজকে সম্পূর্ণ নির্দোষ রেখে পূত চরিত্রের অধিকারী হনএবং মানব সমাজের সংস্কার ও কল্যাণ সাধনে ব্রতী হনসেই ফেরেশতারা তার জন্য সর্বদা দোয়া করতে থাকেন। ফলে তার ওপর রহমত ও বরকত নাযিল হয়। এ ফেরেশতারা আল্লাহর নাফরমান ও ফেতনা সৃষ্টিকারী বান্দাদের ওপর বদ-দোয়া ও অভিসম্পাত দিতে থাকেন। তাদের এ বদ-দোয়া ও অভিসম্পাতের কারণে পরিণামে নাফরমানদের অনুতপ্ত হতে হয়। আর সে কারণেই নিম্নতর আকাশের ও পৃথিবীর বাসিন্দাদের অন্তরে তাদের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়। খারাপ ব্যবহার করার জন্য ইলহামেও জানানো হয়। তার ফলে পৃথিবীতেও তারা দুর্ব্যবহার পায়নশ্বর দেহ থেকে আত্মা ও বিচ্ছিন্ন হবার পরেও পায়। 

এ ফেরেশতারা আল্লাহ ও তাঁর বান্দাদের ভেতর দূত হিসেবে কাজ করেন। তাঁরা বনি আদমের অন্তরে ভাল কথা জাগিয়ে দেন। তাঁরা যে কোন ভাবে অন্তরের ভাল ভাবগুলো জাগ্রত রাখার ব্যবস্থা করেন। আল্লাহ পাক যেভাবে তাঁদের যেখানে চান সমবেত করে মজলিস বসান। তাঁদের এ মর্যাদা ও অবস্থার জন্য পৃথক পৃথক নামে তাঁদের ডাকেন। কখনও রফীকুল আলা’ (উঁচুস্তরের বন্ধু)কখনও নুদীউল আলা’ (ঊর্ধ্বতম মজলিস) ও কখনও মালা-ই-আলা (উচ্চতম পরিষদ) বলে আখ্যায়িত করেন। পুণ্যবান ও নৈকট্য লাভকারী লোকদের আত্মাও তাদের ভেতর শামিল হয়। আল্লাহ পাক বলেন, 'হে নিশ্চিন্ত আত্মাসমূহ! সানন্দে তোমাদের প্রভুর কাছে চলে এস ও আমার বান্দাদের সাথে গিয়ে মিলিত হও এবং আমার জান্নাতে এসে বাস কর। (সূরা ফাজরঃ আয়াত ২৮-৩০) 

রাসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনআমি জাফর ইবনে আবু তালিবকে ফেরেশতা রূপে জান্নাতে অন্যান্য ফেরেশতারা সাথে পাখায় ভর করে উড়তে দেখেছি। 

আল্লাহর সব বিধি-বিধান ও সিদ্ধান্ত প্রথমে মালা-ই-আলায় অবতীর্ণ হয়। দুনিয়ার যে সব কাজ তাৎপর্যময় ও কল্যাণধর্মী তা এই মুবারক রাতে নির্ধারিত হয়” আল্লাহর এ বাণী সংশ্লিষ্ট ব্যাপারগুলো উচ্চতম পরিষদে নির্ধারিত হয়ে থাকে। কোন না কোন ভাবে শরা-শরীয়ত এখানেই স্থিরিকৃত হয়। 

স্মরণ রাখা প্রয়োজনউচ্চতম পরিষদে তিন শ্রেণীর সদস্য রয়েছেন। প্রথম শ্রেণীর দায়িত্বে রয়েছে আল্লাহর মংগলময় ব্যবস্থাবলী। মুসা (আঃ)-কে পথ প্রদর্শনের জন্য যে নূর দ্বারা আল্লাহ আগুন সৃষ্টি করেছিলেনতা থেকেই এ শ্রেণীর ফেরেশতাদের তৈরী করে তাতে পবিত্র আত্মাগুলোর সংযোগ ঘটানো হয়েছে। 

দ্বিতীয় শ্রেণীর জন্ম হয়েছে মৌল উপাদানগুলোর সংঘাতসৃষ্ট সূক্ষ্মতম ও পরম হাল্কা এক বিশেষ তাপ ও দ্যুতি থেকে। তারপর তাকে এমন উঁচু পর্যায়ের আত্মার সংযোগ ঘটানো হয়েছে যা জীব জগতের পংকিল প্রাণ প্রবাহ থেকে স্পষ্টত স্বতন্ত্র হয়ে ধরা দেয়। 

তৃতীয় শ্রেণীর সদস্য হলেন আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী মানবাত্মারা। তাঁরা জীবিতাবস্থায় পুণ্যব্রতের দ্বারা মালা-ই-আলার মর্যাদা পান। অবশেষে তাঁদের আত্মা থেকে দেহরূপ আবরণটুকু খসে পড়লে তাঁরা সেখানে গিয়ে শামিল হন। তখন থেকে তাঁরা মালা-ই-আলার সদস্যরূপে গণ্য হন। 

মালা-ই-আলার আসল কাজ হল প্রতিনিয়ত নিজ প্রভুর দিকে নিবিষ্ট থাকা এবং অন্য কোন ব্যস্ততাকে সেই পথে অন্তরায় হতে না দেয়া। আল্লাহ তা;আলা যে বলেছে ন, “মালা-ই-আলা” সতত আল্লাহর স্তুতি গেয়ে ফিরে ও তাঁর পবিত্রতা বর্ণনায় মুখর থাকে এবং তাঁর ওপর সুদৃঢ় ঈমান রাখে” তার তাৎপর্য এটাই। তা ছাড়া তাঁদের অন্তরকে আল্লাহ খোদায়ী জীবন ব্যবস্থা পছন্দের ও গ্রহণের জন্য প্রস্তুত রাখেন। তেমনি তাঁরা আল্লাহ বিরোধী অন্যায় জীবন ব্যবস্থাকে খারাপ জানেন ও ঘৃণা করেন। তারা ঈমানদারের পাপের জন্য ক্ষমা চাইতে থাকেন?” আল্লাহর এ বাণীর তাৎপর্য এটাই, যা নিচে বর্ণিত হল।

উচ্চতম পরিষদের সর্বোচ্চ মর্যাদার ফেরেশতারা সেই পূণ্যত্মার চার পাশে নূরের সমাবেশ ঘটান ও তাদের সাথে মেলামেশা করেন। তারপর এরা সবাই মিলে একাত্ম হয়ে যান এবং নাম পান হাজিরাতুর কুদুস’ বা পবিত্র পার্লামেন্ট। 

এ পবিত্র পার্লামেন্টে এরুপ পরামর্শ করা হয় যেবনি আদমের পার্থিব ও অপার্থিব কার্যাবলীর ব্যবস্থাপনার জন্য এবং তাদের সমস্যাবলী দূর করার জন্য কোন এক ব্যক্তিকে পূর্ণত্ব দেয়া ও তার নির্দেশ অন্য সবার ভেতরে প্রতিপাল্য করা প্রয়োজন। সে ব্যক্তিটি হবেন সেই যুগের উত্তম ব্যক্তি। এ পরামর্শ অনুসারেই যোগ্য লোকদের অন্তরে এ ইলহাম (কথা) ঢেলে দেয়া হয় যেসেই ব্যক্তির অনুগত হয়ে তারা এমন এক জাতিতে পরিণত হবে যারা গোটা বনি আদমের সেবায় আত্মনিয়োগের যোগ্যতা অর্জন করবে। এ পরামর্শের প্রেক্ষিতেই এমন বিদ্যার চর্চা বেড়ে যায় ও দীক্ষা চলতে থাকে যা থেকে জাতি সংশোধিত হয় এবং পথের দিশা পায়। 

উক্ত ইলহাম কখনও ওহী হয়ে আসেকখনও স্বপ্নে দেখতে পায়কখনও গায়ব আওয়াজ শোনেকখনও বা হাজিরাতুল কুদুসের প্রতিনিধি সেই ব্যক্তিটির (নবীর) সাথে দেখা করে সরাসরি বলে দেয়। এ কারণেই সেই ব্যক্তিত্বের সহচর ও অনুচররা তাঁকে সাহায্য করতে প্রস্তুত থাকে। ফলে তাঁর সাফল্য ও মংগলের উপকরণ ও সম্ভাবনা বেড়ে যায়। তাঁর দুশমন ও আল্লাহর পথে প্রতিবন্ধক সৃষ্টিকারীর ওপর অভিসম্পাত বর্ষিত হয় এবং সেটা তাদের ব্যর্থতা ও দুঃখ-দুর্দশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মোট কথানবুয়তের অন্যায় মূলনীতির এটা অন্যতম। এ ফেরেশতাদের এরূপ স্বতন্ত্র ও স্থায়ী সিদ্ধান্তকে বলা হয় তাঈদে রূহুল কুদুস’ বা পব্রি পার্লামেন্টের সহায়তাএটা যাঁরা লাভ করেন তাঁরা নানারূপ অলৌকিক কাজ করেন ও মানুষের অসাধ্য কার্যাবলী সাধন করে থাকেন। এটাকেই বরে 'মুজিযা'। 

এ দ্বিবিধ মালা-ই-আলার এক স্তর নীচে কিছু সংখ্যক ব্যক্তি রয়েছেন। তারা উচ্চতম মর্যাদার অধিকারী না হলেও তাদের প্রের্রণার সূক্ষ্ম ও হাল্কা তাপে সবার ভেতর এক সরল প্রকৃতি জন্ম নেয়। এ সরল প্রকৃতির সৃষ্টিরা শুধু প্রেরণা ও নির্দেশনা লাভের অপেক্ষায় থাকে। তারই প্রভাব স্রষ্টার যোগ্যতা ও প্রভাব গ্রহণের ক্ষমতার ভেতরে যখন সমতা স্থাপিত হয়তখন তারা নিজ অস্তিত্ব ভুলে জান-মাল বাজী রেখে প্রভাবিত কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে। পশু-পাখী নিজের প্রাকৃতিক প্রয়োজনে যেভাবে ছুটে যায়তেমনি ছুটে যায় তারা ওপর ওয়ালার ইংগিতে। 

সুতরাং তাঁদের কাজই হচ্ছে মানুষ ও জীবজন্তুর ভেতর প্রভাব সৃষ্টি করা। সে সবের ধ্যান-ধারনা ও ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষাকে তাঁরা নিজেদের অভিপ্রায় অনুসারে পরিচালিত করেন। যদি কোন পাথর নড়ে কিংবা চঞ্চল হয়কোন বুজুর্গ ফেরেশতা সেটাকে চঞ্চল ও গতিশীল করেন। তেমনি কোন শিকারী যখন নদীতে জাল ফেলেনতখন একদল ফেরেশতা কোন কোন মাছের ভেতর জালে ফেঁসে যাবার ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং কোন মাছকে ভেগে যাবার ভাবনা দান করেন। সেমতে কোন ফেরেশতা রশি টেনে ধরে এবং কোন ফেরেশতা রশি ঢিল দেয়। মাছগুলোও জানে না তাদেরকে কি করছে ও কেন করছে। তাদের মনে যা ইলহাম হয় তা-ই তারা করে যায়। তেমনি দুদল সৈন্য যখন লড়াইয়ে লিপ্ত হয়তখন ফেরেশতারা এসে এক দলের প্রাণে সাহস ও অস্ত্র চালনার শক্তি যোগান এবং অন্য দলের প্রাণে দুর্বলতা ও হাতে শিথিলতা এনে দেন। তাদের উদ্দেশ্য থাকে যার কর্মে যে পরিণতি রয়েছে সেটাকে বাস্তবায়িত করে দেয়া। কখনও তাঁদের ওপর নির্দেশ আসে মানুষকে সুখ-শান্তি কিংবা দুঃখ-দুর্দশা পৌঁছে দেয়ার। তখন তারা সে কাজে আত্মনিয়োগ করে। 

এ ফেরেশতাদের বিপরীত দিকে এমন একটি দল রয়েছে যাদের ভেতর রয়েছে খেলো প্রকৃতির রাগ ও পাপ প্রবণতা। তারা উত্তপ্ত আঁধার থেকে জন্ম নেয়। তাদের বলা হয় শয়তান। এ শয়তানরাই ফেরেশতাদের প্রয়াস ব্যর্থ করার জন্য পাল্টা প্রচেষ্টা চালিয়ে থাকে।

পরবর্তী পর্ব- (চতুর্থ পরিচ্ছেদ)

হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (২) আলম-ই-মিছাল বা (স্বরূপ জগত)



হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (পর্ব-২)
শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)

আলম-ই-মিছাল বা (স্বরূপ জগত) 
জানা প্রয়োজনঅনেক হাদীসই প্রমাণ করেছেএ রূপ জগতের পশ্চাতে এক স্বরূপ জগত রয়েছে। সেখানে মানুষের দোষ-গুণ ইত্যাদি নিজরূপে অস্তিত্ব ধারণ করে। বস্তু জগতে যতকিছু দেখা দেয় আগে তা সেই কর্ম জগতে রূপ পায়। এখানে যা পাই তা ঠিক ওখানের মতই। সাধারণের চোখে অনেক বস্তুর অস্তিত্ব ধরা দেয়না। সেগুলো সেখানে শরীরী হয়ে বিচরণ করে। মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন, "আল্লাহ যখন মায়া-মমতা সৃষ্টি করলেনতখন সে দাঁড়িয়ে বলতে লাগলযে ব্যক্তি আত্মীয়তা বিচ্ছেদের ব্যাপারে তোমাকে ভয় করবে এবং তোমার আশ্রয় চাইবেসে আমার কাছে ঠাঁই পাবে"। তিনি আরও ইরশাদ করেন, "সূরা বাকারা ও সূরা আলে ইমরান কেয়ামতের দিন দুখণ্ড মেঘ বা দুটো ছাতা কিংবা দুঝাঁক পাখীর মত ছায়া হয়ে আসবে এবং তারা তাদের পাঠকদের পক্ষ হয়ে কথা বলবে"। তিনি এও বলেন, "কেয়ামতের দিন সব কৃতকর্ম হাজির হবে। প্রথমে আসবে নামাযতারপর সদকাতারপর রোজা ইত্যাদি"। অন্যত্র তিনি ইরশাদ করেন, "হাশরের মাঠে পাপ ও পুণ্য দেহ ধারণ করে দাঁড়িয়ে যাবে। পুণ্যবানকে সুসংবাদ শুনাবে পুণ্য এবং পাপ পাপীকে বলবেপালাওপালাও। কিন্তু পাপী তখন পালাবার পথ পাবেনা"। আর এক স্থানে তিনি ইরশাদ করেন, "কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার অন্যান্য দিনগুলো যথাযথভাবে উপস্থিত করবেন। কিন্তু জুমআর দিনটিকে অত্যন্ত শান-শওকতের সাথে হাজির করবেন"। অন্যত্র তিনি বরেন, "কেয়ামতের দিন পৃথিবীকে আল্লাহ নীল রংয়ের দাঁত একং কুৎসিত ও প্রশস্ত মুখবিশিষ্ট এক অতি বৃদ্ধারূপে দাঁড় করাবেন"। 

একবার তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, "হে মানবমণ্ডলী! আমি যা দেখছি তা কি তোমরা দেখতে পাচ্ছআমি তো তোমাদের ঘরে ঘরে বৃষ্টির মত ফেতনা-ফাসাদ বর্ষিত হতে দেখছি"। মিরাজ সম্পর্কিত হাদীসে তিনি বলেন, "হঠাৎ আমার সামনে চারটি প্রস্রবণ দেখা দিল। দুটি আত্মিক ও দুটি বাহ্যিক। আমি প্রশ্ন করলামহে জিব্রাঈল ! এ সব কিতিনি জবাব দিলেনআত্মিক দুটো জান্নাতের ও বাহ্যিক দুটো হল নীল ও ফোরাতের স্রোত"। সূর্য গ্রহণের হাদীস প্রসংগে তিনি বললেন, "আমাকে জান্নাত ও জাহান্নামের রূপ দেখানো হয়েছে"। অন্য বর্ণনা মতে তিনি বললেন, "কেবলাস্থিত দেয়াল ও আমার মাঝখানে বেহেশত ও দোযখ স্বরূপে দেখানো হলো"। এ হাদীসে এ কথাও বলা হয়েছেতিনি বেহেশতের ফলের একটি গুচ্ছ নেবার জন্য হাত বাড়ালেন। তাতে এও আছে, "তিনি দোযখের আগুনের তেজে উহ উহ করে পিছিয়ে এলেন এবং সে আগুনে হাজীদের জিনিসপত্রের চোরকে ও বিড়াল উপোসে মারার ঘঠনার সেই মহিলাকে দেখতে পেলেন। তেমনি জান্নাতে তিনি পিপাসার্ত কুকুরকে পানি পান করিয়ে বাঁচাবার গণিকাটিকে দেখতে পেলেন।" এটা সুস্পষ্ট যেমহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ও মসজিদের মেহরাবের মধ্যবর্তী সংকীর্ণ জায়গায় বেহেশত-দোযখের যে পরিধি সবার জানা রয়েছে তা বাহ্যত কিছুতেই ঠাঁই পেতে পারে না। অথচ অন্যত্র তিনি বলেছেনদেখলাম, ‘জান্নাত এত কণ্ঠকাকীর্ণ যে প্রবৃত্তির তা অসহ মনে হয়এবং জাহান্নাম এত কুসুমাস্তীর্ণ যেপ্রবৃত্তির তা খুবই পছন্দনীয়। তারপর জিব্রাঈল বললেননিনএখন দেখে নিন তাদের 

অন্যত্র তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনযখন বিপদের অবতীর্ণ হয়তখন দোয়া তার সাথে লড়াই করে এবং ঠেকিয়ে রাখে। তিনি আরও বলেন, "আল্লাহ জ্ঞান সৃষ্টি করে বললেনকাছে এস। সে কাছে এল। তারপর বললেনচলে যাও। তখন সে চলে গেল।" 

একস্থানে তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, "এ পুস্তক দুটো আল্লাহর তরফ থেকে পাঠানো হল"। তিনি আরও বলেন, "মৃত্যুকে দুম্বারূপ দিয়ে বেহেশত ও দোযখের মাঝখানে জবাই করা হবে"। 

আল্লাহ তাআলা বলেন, "আমি মরিয়মের কাছে এক ফেরেশতা পাঠালামসে এক যুবকরূপে তার সামনে দেখা দিল"। হাদীসে প্রমাণ মিলেজিব্রাঈল যখন মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর কাছে আসতেনতিনি তাঁকে দেখতে পেতেন এবং তাঁর সাথে বলতেন। অথচ উপস্থিত অন্য সবাই দেখতে পেতেন না। এও প্রমাণিত হয়েছেমুমিনের কবর দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে সত্তর গজ প্রশস্ত হয়ে যায়। পক্ষান্তরে কাফেরের কবর সংকীর্ণ হতে হতে তার পাঁজরের হাড় এদিক থেকে ওদিকে নিয়ে যায়। হাদীসে এও রয়েছেকবরে ফেরেশতা এসে মৃতের কাছে জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং তার কৃতকর্ম বিশেষ এক রূপ নিয়ে দেখা দেয়। এও আছেমরণ কালে যে ফেরেশতা প্রাণ বয়ে নিয়ে আসে তার হাতে হয় রেশমী বস্ত্রনয় তো চট থাকে। আরও আছেকবরে মৃত ব্যক্তিকে (যারা কাফের) ফেরেশতারা গুর্জ ও হাতুড়ি পেটা করবে। তখন তার চীৎকার জীন ও মানুষ ছাড়া চতুর্দিকে সবাই শুনতে পাবে । অন্যত্র আছেপ্রতিটি কাফেরের ওপর কবরে নিরানব্বইটি আজদাহা লেলিয়ে দেয়া হয়। কেয়ামত পর্যন্ত সেগুরো তাকে দংশন ও ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করতে থাকে। 

তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলেন, ‘মৃতকে (মুমিনকে) যখন কবরে রাখা হয়তখন তার মনে হয়সূর্য ডুবছে। তাই সে বসে চোখ ডলতে ডলতে ফেরেশতাদের বলেআমাকে ছেড়ে দাওতো নামাযটা পড়ে নিই। হাদীসে প্রমাণ মিলেকেয়ামতের দিন হাশরে উপনীতদের আল্লাহতায়ালা বিভিন্ন রূপে নিজ জ্যোতি প্রদর্শন করাবেন। এও আছে, ‘মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) যখন আল্লাহর সমীপে যাবেনতখন তিনি কুরসির ওপর উপবিষ্ট থাকবেন। আরও আছে, ‘আল্লাহ তা'আলা বনী-আদমের সাথে সামনা সামনি বলবেন। মোট কথা এ ধরনের অসংখ্য হাদীস রয়েছে। 

এ সব হাদীস যারা দেখবেতাদের তিনটি অবস্থার যে কোন একটি দেখা দেবেই। হয় কেউ এর প্রকাশ্য অর্থই গ্রহণ করবে। তাকে আমার বর্ণিত স্বরূপ জগতটি মেনে নিতে হবে। আহলে  হাদীসের রীতি এটাই। আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ুতী (রহঃ) বলেনআমি তো হাদীসের প্রকাশ্য অর্থ গ্রহণ করি এবং এটাই আমার মজহাব। 

কেউ হয়ত বলবেআসলে এসবের কোন কিছুই অস্তিত্ব নেবেনাশুধু খেয়ালী দৃষ্টিতেই তা পরিদৃষ্ট হবে। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রঃ) তিনি আল্লাহর "সেদিনের অপেক্ষা কর যেদিন আকাশ ধোঁয়াটে মনে হবে" এ বাণী ব্যাখ্যা প্রসংগে বলেনতাঁর সময়ে একবার দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল এবং তখন অনশনক্লিষ্ট দেহ নিয়ে ওপরে তাকালে গোটা আকাশ ধোঁয়াটে মনে হত। ইবনে মাজেফুন থেকে বর্ণিত আছেযে হাদীসেই কেয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা বান্দার দৃষ্টি এভাবে বদলে দেবেন যাতে করে তারা সেরূপ দেখতে পাবে। তারা দেখবে যেন তিনি এসে তাদের সাথে কথা বলছেন। অথচ না তিনি মূলত নিজ অবস্থান থেকে বিন্দুমাত্র নড়ছেননা কারো সাথে কথা বলছেন। বান্দার এ অবস্থা এজন্য ঘটানো হবে যেন তারা বুঝতে পায় আল্লাহ সব কিছুই করতে পারেন। 

কেউ হয়তবা বলবেএ সব হাদীসের অন্যরূপ তাৎপর্য রয়েছে। সে সব তাৎপর্যের জন্য এ সব রূপকের আশ্রয় নেয়া হয়েছে। আমার বক্তব্য হলএ তৃতীয় মতটি কোন সত্যানুসারীর নয়। 

ইমাম গাজ্জালী (রঃ) কবর আজাব সম্পর্কে বলতে দিয়ে এ তিনটি অবস্থা সম্পর্কেই ভালভাবে পর্যালোচনা করেছেন। তিনি বলেনঃ এ ধরনের হাদীসের বাহ্যিক অর্থ তো ঠিকতবে তার অন্তর্নিহিত রহস্য রয়েছে। অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্নদের কাছে তা সুস্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়। যে ব্যক্তি এগুলোর রহস্য জানেনা এবং কোন কিছুর অন্তর্নিহিত তত্ত্ব যার কাছে ধরা দেয়নাতার অন্তত প্রকাশ্য অর্থগুলো অস্বীকার করা উচিত নয়। বরং সত্য বরে সেগুলো মেনে নেয়া উচিত। কারণএটা ঈমানের নূন্যতম দাবী 

কেউ যদি বলেআমি কাফেরের কবর উন্মুক্ত করে দেখেছি এবং বহুদিন ধরে তার লাশ পড়ে থাকতে দেখেছি। কিন্তু বর্ণিত অবস্থাগুলো কখনও পরিদৃষ্ট হয়নি। তাই চোখে দেখা ব্যাপারের বিপরীত কথাকে কি করে সত্য বলে মেনে নেব

তার জবাব হল এইএ ধরনের কথা মানতে গেলে মানুষের তিনটি অবস্থা দেখা দেয়।

(১) প্রথম অবস্থাটি সব চাইতে বিশুদ্ধসুস্পষ্ট ও সমর্থনযোগ্য। তা হল এইএসব কথা মূলত সত্য। নিঃসন্দেহে অজগর সাপ মৃত কাফেরকে দংশন করে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করছে। তবে এ পার্থিব চোখে আপনি সেই অপার্থিব ব্যাপারটি দেখতে পাবেন কেনপারলৌকিক সব ঘটনাই তো আত্মিক ও অপার্থিব। দেখুনজিব্রাঈলের (আঃ) অবতরণ সম্পর্কে সাহাবারা (রাঃ) কিরূপ আস্থা রাখতেন। অথচ তাঁরা তাঁকে দেখতে পেতেন না। তথাপি তাঁরা বিশ্বাস করতেন যেমহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) যথার্থই জীব্রাঈলকে (আঃ) দেখতে পেতেন। এক্ষণে আপনারা যদি মহানবীর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উনার হাদীসগুলো অবাস্তব বলে মনে করেন তো তাঁর কাছে ফেরেশতার আগমন ও ওহী অবতীর্ণ হবার কথা কি করে বিশ্বাস করবেন

সুতরাং প্রথমে আপনাদের ঈমানের নবায়ন ও সংস্কার প্রয়োজন। যদি আপনি এ ঈমান রাখেন যেকিছু ব্যাপার মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) দেখতেনকিন্তু উম্মতরা দেখার ক্ষমতা রাখেনাতাহলে মৃতের ব্যাপারে যা যা বলা হল তা মানতে দ্বিধা আসবে কেনফেরেশতা যেরূপ মানুষ ও জীব-জন্তুর মত ননতেমনি মৃতকে দংশন করার অজগর ও বিচ্ছু পার্থিব অজগর ও বিচ্ছুর মত নয়। বরং সেই অপার্থিব অজগর অন্য কিছুর তৈরী সাপ। তাইতা দেখতে অন্য ধরনের দৃষ্টি ও অনুভব শক্তি থাকা চাই। 

(২) দ্বিতীয় অবস্থার মানুষেরা বলেনআপনারা নিদ্রিত ব্যক্তির স্বপ্নে সাপে কাটার কথা মনে করুন। স্বপ্নে সে দংশন জ্বালায় তীব্রতাও অনুভব করে। সে জাগ্রতের মতই দংশন জ্বালায় চীৎকার করে উঠে ও ঘর্মাক্ত হয়। কখনও সে শয়নস্থল থেকে লাফিয়ে ওঠে। এ সবই সে ব্যক্তি দেখে ও অনুভব করে। কিন্তু বাহ্যত আপনি নিদ্রিতকে চুপচাপ পড়ে থাকতে দেখছেন। না তার কাছে সাপ দেখছেননা ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন দেহ। অথচ স্বপ্নদ্রষ্টা তো সাপ-বিচ্ছু যেমন দেখছেতেমনি তার দংশন জ্বালাও অনুভব করছে।
আপনাদের দৃষ্টিকোণ থেকে এসব হল দৃষ্টি অগোচর ব্যাপার। তথাপি স্বপ্নের সাপের দংশন জ্বালা স্বপ্নমগ্নের জন্য যখন জাগ্রত সাপের দংশন জ্বালার মতই কষ্টদায়কতখন এ দুসাপের ভেতর তারতম্য কোথায়
(৩) তৃতীয় অবস্থাটা এইআপনারা ভালভাবেই জানেনসাপ স্বয়ং দুঃখ-কষ্ট নয়দুঃখ-কষ্ট রয়েছে তার বিষে। এমনকি বিষও দুঃখ-কষ্ট নয়দুঃখ-কষ্ট তার প্রভাবজাত জ্বালায়। এখন যদি বাস্তব বিষ ছাড়া অন্য কিছু থেকেও সেই জ্বালা অনুভূত হয়তাও তার থেকে আদৌ কম দুঃখদায়ক শাস্তি নয়। তবে সেই শাস্তির দুঃখকে সাধারণের উপলব্ধির উপযোগী করতে হলে বাস্তব কারণের উল্লেখ সম্ভব নয়। যেমন যৌন সুখ যদি কাউকে নারীর স্পর্শ ছাড়া উপলব্ধি করাতে হয় তা হরে নর-নারীর যৌন মিলনের উল্লেখ ছাড়া বুঝানো সম্ভব হয় না। এটা কার্যকারণ বুঝবার জন্য প্রয়োজন। যেন কারণ থেকে অনিবার্য কার্যের উপলব্ধি ঘটে। কার্যত যদিও কারণ অনুপস্থিততথাপি তার বর্ণনার মাদ্যমে তাহা জ্ঞাত করানোই উদ্দেশ্য। লক্ষ্যবস্তু কারণ নয়কার্য। 
বলা বাহুল্যমানুষের এ জীবনের কু-অভ্যাসগুলোই মৃত্যুকালে তাকে দুঃখ-কষ্ট দেবার জন্য মওজুদ থাকে। সেগুলোর অনুশোচনা তাকে সাপের মতই দংশন করতে থাকে। যদিও তার অন্তরে সাপ উপস্থিত থাকে না।

পরবর্তী পর্ব- (তৃতীয় পরিচ্ছেদ)
মালা-ই-আলা  (সর্বোচ্চ পরিষদ) 

হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (১) কার্যকারণ রীতি



📚হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (পর্ব-১)
✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)

কার্যকারণ রীতি
এ খণ্ডে শরীয়তের বিধি-নিষেধের রহস্যাবলী তথা কল্যাণকর তত্ত্বগুলো উদঘাটিত হবে । সেগুলো সাতটি পর্যায়ে ও সত্তরটি পরিচ্ছেদে বর্ণিত হবে। প্রথম অধ্যায়ে শরীয়ত অনুসরণ ও তার প্রতিদান সম্পর্কে আলোচিত হবে । তার প্রথম পরিচ্ছেদে থাকবে আদি সৃষ্টিসৃষ্টি থেকে সৃষ্টি ও কার্যকারণ রীতির সৃষ্টি সম্পর্কিত পর্যালোচনা। 

জানা প্রয়োজনআল্লাহ তাআলা গোটা সৃষ্ট জগত সৃষ্টির ব্যাপারে পর্যায়ক্রমে তিনটি পন্থা অবলম্বন করেছেন। প্রথমে তিনি অনস্তিত্ব থেকে বস্তুর অস্তিত্ব দান করেছেন। মানেকোন উপাদান ছাড়াই শূন্যতা থেকে বস্তুতে পূর্ণতা দান করেছেন। সৃষ্টির আদি সম্পর্কে মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে এক ব্যক্তি প্রশ্ন করায় তিনি জবাব দিলেনআদিতে স্রষ্টাই ছিলেনঅন্য কিছু ছিল না । 

দ্বিতীয় পর্যায়ে এসে তিনি এক সৃষ্টি থেকে অন্য সৃষ্টির পত্তন করলেন। যেমন আদমকে মাটি ও জীনকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন।

***[এখানে একটি কথা উল্লেখ করতে চাই যেযা লেখক লিখেননি ! নবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর নুরকে সর্ব-প্রথম আল্লাহর নুর থেকে সৃষ্টি করেন ! সেই নুরে মুহম্মদী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) থেকেই সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেন। এখানে 'এক সৃষ্টিবলতে লেখক ইহাই বুঝিয়েছেন।]***

দলীল-প্রমাণ ও যুক্তি-বুদ্ধির মিলিত সিদ্ধান্ত হল এইগোটা সৃষ্টি জগতকে আল্লাহ পাক কয়েকটি শ্রেণী ও জাতিতে সবিন্যস্ত করে রূপ দিয়েছেন। তারপর সেই জাতি ও শ্রেণীর বৈশিষ্ট্য সুনির্দিষ্ট করেছেন। যেমনমানুষের বৈশিষ্ট্য হল বাকবিন্যাসমসৃণ চর্মসরল আকৃতি ও যুক্তি-বুদ্ধি। পক্ষান্তরে অশ্বের বৈশিষ্ট্য হল হ্রেষারবলোমশ চর্মবংকিম আকৃতি ও যুক্তি-বুদ্ধিহীনতা। তেমনি বিষের বৈশিষ্ট্য হল নিধন শক্তিআদার বৈশিষ্ট্য ঝাঁঝ ও শুষ্কতা এবং কর্পূরের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে কোমলতা ও শীতলতা। এ ধরনের বৈশিষ্ট্য দেখা যায় খনিজ দ্রব্যগাছ-পালাজীবজন্তু এবং অন্যান্য শ্রেণী ও জাতির সৃষ্টিতেও। 

আল্লাহর বিধানের বিশেষত্ব এটাইকোন বস্তু তার নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য বা গুণ থেকে পৃথক হতে পারে না। একই মানুষের প্রত্যেকেই যেভাবে নিজ বৈশিষ্ট্য স্বতন্ত্র হয়ে আছে। ঠিক এ অবস্থাই প্রতিটি বস্তুর গুণাগুণ ও প্রভাবের । বিশেষ-অবিশেষ সব কিছুর ভেতরেই সাধারণতঃ তার পরিচয় মিলে। কোথাও বিশেষ ভাবে তা প্রতিভাত হয়ে থাকে। বস্তুউদ্ভিদজীবজন্তু ও মানুষ সবার ভেতরেই সাধারণ কিছু গুণাগুণ ও প্রভাবাদি রয়েছে। তেমনি বিশেষ গুণাগুণ ও প্রভাবাদিও বিশেষ ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয়। সাধারণের দৃষ্টিতে এ বিশেষ বৈশিষ্ট্য ধরা দেয়না। সব কিছুকে তারা সাধারণ বৈশিষ্ট্য একাকার দেখতে পায়। গভীর জ্ঞানই শুধু সেই সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্য উপলব্ধি করে সঠিক প্রভাবাদির সাথে তার সম্পর্ক স্থাপনে সমর্থ। মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) অনেক বস্তুর বিশেষ বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করে তার সঠিক প্রভাব নির্ধারণ করে গেছেন। যেমন তিনি বলেছেন, ‘তালবীবা (খাদ্য বিশেষ) রোগীর জন্য আনন্দ ও শক্তিবর্ধক। কালিজিরা মৃত্যুব্যাধি ছাড়া সব রোগেরই প্রতিষেধক। উটের দুধ ও প্রস্রাব দুটোই হজমের দাওয়াই। শিরাম (বিশেষ বীজ) ঝাঁঝ বিশিষ্ট 

তৃতীয় পর্যায়ে পাই কার্যকারণ রীতির সৃষ্টি। এ রীতিতে প্রতিটি তাঁর প্রবর্তিত প্রাকৃতিক নিয়মে দেখা দেয় এবং যে সৃষ্টি থেকে তিনি যে উদ্দেশ্য সাধন করতে চান তা সে গুণ নিয়েই দেখা দেয়। যেমন মেঘ থেকে তিনি বারিপাত ঘটান। তা থেকে মাটি সজীব করে ফসল ফলান। সে ফসল দ্বারা জীবজন্তু ও মানুষ প্রতিপালন করেন। আবার দেখিইবরাহীম (আঃ) আগুনে নিক্ষিপ্ত হলে তাঁকে বাঁচাবার জন্য তিনি আগুনকে প্রয়োজনীয় শীতলতা দান করলেন। তেমনি আইউব (আঃ)-এর দেহে রোগ জীবাণু পূর্ণ করে অবশেষে তা নির্মূল করার জন্য একটি প্রস্রবণ সৃষ্টি করলেন। 

এভাবে দেখিআল্লাহ তা'আলা দুনিয়াবাসীর দিকে একবার দৃষ্টি দিলেন। তাদের পাপাচার দেখে ক্ষুব্ধ হলেন। তারপর ওহীর মারফৎ এক নবী মনোনীত করে তাঁকে দায়িত্ব দিলেন আল্লাহর শাস্তি ও পুরস্কারের ব্যাপারে তাদের সচেতন করার। অবশেষে তাঁকে নির্দেশ দিলেন শক্তি প্রয়োগের (জেহাদের) মাধ্যমে তাদের পাপের আধাঁরপুরী থেকে উদ্ধার করে পূণ্যলোকে উদ্ভাসিত করতে। 

কার্য-কারণ রীতিতে সৃষ্টির ভেতরেই যে সৃজনী শক্তি দিয়ে দেয়া হয় তা যখন পরস্পর সন্নিহিত হয়ে সংঘাতে লিপ্ত হয়তখন আল্লাহর ইচ্ছায় তা থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়াজাত জিনিস আত্ম প্রকাশ করে। তার ভেতরে কিছু হয় মৌলিক ও কিছু থাকে কৃত্রিম। কৃত্রিমগুলোর ভেতর থাকে কোন প্রাণীর প্রক্রিয়া কিংবা ইচ্ছা অথবা এ দুয়ের ব্যতিক্রমে অন্য কিছু। তাই এ সব প্রতিক্রিয়াজাত জিনিস ও তার ধরনের ভেতরে কার্যকারণ রীতির ব্যতিক্রম বা বিপরীত কিছু দেখা দেয়াটা অন্যায় নয়। 

এটা তো সাধারণ রীতি যেকোন কিছুর অস্তিত্ব লাভের কারণ ও উদ্দেশ্য নিয়ে যে গবেষণা করা হয় তা হলে নিঃসন্দেহে তা ভার ও কল্যাণকর প্রতীয়মান হবে। দেখুনলোহা কাটবে এটাই তার উদ্দেশ্যতাই তা ভাল। তবে যে মানুষটিকে কাটবে সে মানুষটির জীবন খতম হয়ে যাবেএ দৃষ্টিতে লোহার কাটবার শক্তিটা নিন্দনীয় হতে পারে। হ্যাঁপ্রতিক্রিয়া ও প্রকৃতিতে আরও দুধরনের মন্দ কথা দিতে পারে। (১) যে কল্যাণের উদ্দেশ্যে তার সৃষ্টি তাতে শূন্যতা দেখা দেয়া। (২) কোন কল্যাণকর প্রভাবের আদৌ অনুপস্থিতি। যখন এ ধরনের মন্দ দেখা দেবার কারণ তৈরী হয়তখন আল্লাহর অপার করুণাপরিপূর্ণ ক্ষমতাসর্বব্যাপী জ্ঞানের দাবী সেই সৃজনী শক্তিগুরোর ও বস্তুনীচয়ের ওপর কবজবাসাতইহালা ও ইলহামের মাধ্যমে হস্তক্ষেপ করেন এবং সেগুলোকে উদ্দেশ্য অনুসারে পরিচালিত করান। 

কবজ’ অর্থ হরণ। তার উদাহরণ এইহাদীসে আছেদাজ্জাল ঈমানদার ব্যক্তিটিকে দ্বিতীয়বার হত্যার প্রয়াস পাবে। কিন্তু আল্লাহ তার হত্যা করার শক্তি হরণ করবেন। যদিও হত্যার সব হাতিয়ার ও উপকরণ তার বহাল থাকবে। 

বাসাত অর্থ অস্বাভাবিক। তার উদাহরণ এইহযরত আইউব (আঃ)-এর আরোগ্য লাভের জন্য ফেরেশতারা চঞ্চুর ঘায়ে প্রস্রবণ তৈরী করলেন। অথচ কার্যকারণের স্বাভাবিক রীতিতে তা হয় না। তেমনি কোন কোন প্রেমিক বান্দা দ্বারা আল্লাহ জেহাদের ময়দানে এমন কাজ করান যা তার মত লোকের কিংবা তার মত কয়েকজনের পক্ষে আদৌ স্বাভাবিক নয় ।

 [এখানে মউলা আলী (রঃ) এর কথা স্বরণযোগ্য। খায়বারের যুদ্ধে তা অনুমাযোগ্য। আমার নিজস্ব মতামত ]

ইহালা অর্থ অসম্ভব বা অলৌকিক। যেমনহযরত ইবরাহীম (আঃ) আগুনে নিক্ষিপ্ত হলে আগুন ঠাণ্ডা হয়ে তাঁকে শান্তিতে বাঁচিয়ে রাখলেন। 

ইলহাম অর্থ দিব্যজ্ঞান বা অবতীর্ণ জ্ঞান। হযরত খিজির (আঃ) ও মূসার (আঃ) ভ্রমণ বৃত্তান্তটি তার উদাহরণ। নৌকাগুলো ভেংগে দেয়াছেলেটি হত্যা করা ও দেয়াল সংস্কার করে দেয়ার কাজ খিজির (আঃ) দিব্যজ্ঞানের নির্দেশে করেছেন। নবীদের ওপর গ্রন্থ ও বিধি-বিধান অবতীর্ণ হওয়াও ইলহামের অন্তর্ভুক্ত। ব্যক্তি বিশেষেরও প্রয়োজনীয় মুহুর্ত তা হাসিল হতে পারে। কখনও প্রয়োজনীয় ব্যক্তি সম্পর্কে অন্যের ইলহাম অর্জিত হতে পারে। কুরআন পাকে কার্যকারণ রীতির এত সব শ্রেণী ও ধরনের বর্ণনা রয়েছে যা অতিক্রম করা কখনও কারও পক্ষে সম্ভব হবে না।


দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ (পরবর্তী পর্ব)

সোমবার, ২৭ নভেম্বর, ২০২৩

নির্জনবাস - (৭) নির্জনবাসের উপসংহার



 নির্জনবাস (পর্ব- ৭)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

নির্জনবাসের উপসংহার—
নির্জনবাসের উপকারিতা ও বিপদাপদ জানার পর একথা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, নির্জনবাস উত্তম কিংবা উত্তম নয়- সর্বাবস্থায় একথা বলা নিতান্তই ভুল; বরং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, তার অবস্থা, তার সঙ্গী ও সঙ্গীর অবস্থা দেখা উচিত। আরও দেখা উচিত, মেলামেশার কারণ কি এবং মেলামেশার কারণে কোন্ কোন্ উপকারিতা হাতছাড়া হয়ে যাবে এবং কি উপকার পাওয়া যাবে? এরপর উপকার ও ক্ষতি তুলনা করতে হবে । তখন গিয়ে সত্য বিষয়টি প্রস্ফুটিত হয়ে যাবে এবং কোন্‌টি উত্তম তা জানা যাবে। এ সম্পর্কে ইমাম শাফেয়ীর বক্তব্য চূড়ান্ত মীমাংসা। তিনি বলেন : হে ইউনুস, মানুষের কাছে সংকুচিত হয়ে থাকা শত্রুতার কারণ এবং তাদের সাথে অধিক খোলামেলা থাকা অসৎ সঙ্গী সৃষ্টি করে। অতএব এমনভাবে থাকা উচিত, না সংকুচিত, না খোলামেলা। শেখ সা'দী (রহঃ) বলেন "মানুষের সাথে এতটুকু কঠোরতা করো না যে, তোমার কাছ থেকে পালিয়ে যায় এবং এতটুকু নম্রতাও করো না যে, তোমার মাথায় চড়ে বসে" মোট কথা, মেলামেশা ও নির্জনবাসের মধ্যে সমতা আবশ্যক। এটা অবস্থাভেদে বিভিন্ন রূপ হয়ে থাকে এবং উপকারিতা ও বিপদাপদ দেখে নিলে উত্তম পথ পরিষ্কার হয়ে যায়। এ সম্পর্কে সত্য ঠিক এটাই৷ এছাড়া কেউ কেউ যা বলেছে, তা অসম্পূর্ণ; বরং প্রত্যেকেই এমন বিশেষ অবস্থা উল্লেখ করেছে, যার মধ্যে সে নিজে রয়েছে। অন্য ব্যক্তি, যে এ অবস্থার মধ্যে নয়, তার সম্পর্কে একথা বলা ঠিক হবে? বাহ্যিক শিক্ষায় সুফী ও আলেমের মধ্যে এটাই পার্থক্য। সুফী সেই বক্তব্যই পেশ করে, যে অবস্থার মধ্যে সে নিজে থাকে। এ কারণে মাসআলা-মাসায়েলের ক্ষেত্রে সুফীদের জওয়াব বিভিন্ন হয়। পক্ষান্তরে আলেম বাস্তব ক্ষেত্রে যা সত্য, তাই উদঘাটন করে এবং নিজের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য করে না। এ কারণে আলেম যা বলে, তাই সত্য হয়। এতে বিরোধের অবকাশ থাকতে পারে না। কেননা, সত্য সর্বদা একই হবে আর অসত্য অনেক হয়ে থাকে। এসব কারণেই সুফী বুযুর্গগণকে যখন দরবেশী কি, জিজ্ঞেস করা হল, তখন প্রত্যেকেই ভিন্ন ভিন্ন জওয়াব দিলেন। সেই জওয়াব যদিও জওয়াবদাতার অবস্থানুসারে সত্য; কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে সত্য নয়। কেননা, সত্য তো এক ও অভিন্ন হয়ে থাকে। উদাহরণতঃ আবু আবদুল্লাহ্‌কে দরবেশী কি, জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন : নিজের উভয় আস্তিন প্রাচীরে মেরে বলা- আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ্ তা'আলা, এটাই দরবেশী। হযরত জুনায়দ বাগদাদী (রহঃ) এর জওয়াবে বলেনঃ দরবেশ সে ব্যক্তি, যে সওয়াল করে না এবং কারও অসুবিধা সৃষ্টি করে না। তার সাথে কেউ ঝগড়া করলে সে চুপ হয়ে যায়। সহল ইবনে আবদুল্লাহ্ বলেন : দরবেশ সেই ব্যক্তি, যে সওয়াল করে না এবং সঞ্চয় করে না। অন্য এক বুযুর্গ বলেন : দরবেশী হচ্ছে তোমার কাছে কিছু না থাকা। কোন সময় থাকলেও তাকে নিজের মনে না করা। ইবরাহীম খাওয়াস (রহঃ) বলেন দরবেশী হচ্ছে অভিযোগ না করা এবং নেয়ামত প্রকাশ করা। উদ্দেশ্য, যদি একশ' জনকে জিজ্ঞেস করা হয়, তবে একশ'টি ভিন্ন ভিন্ন জওয়াব পাওয়া যাবে। সম্ভবতঃ দু'টি জওয়াবও একরকম হবে না। কিন্তু কোন না কোন দিক দিয়ে সবগুলো জওয়াবই সঠিক হবে। কেননা, প্রত্যেকের জওয়াব তার অবস্থার বর্ণনা হবে। এ কারণেই এ সম্প্রদায়ের দু’ব্যক্তি এমন দেখা যাবে না, যাদের একজন অপরজনকে সুফীবাদে সুদৃঢ় বলে এবং তার প্রশংসা করে; বরং প্রত্যেকেই দাবী করে, সেই প্রকৃত সত্যের সাধক। কিন্তু শিক্ষার নূর যখন চমকে উঠে, তখন সবকিছু বেষ্টন করে নেয় এবং গোপনীয়তার পর্দা ফাঁস করে দেয়। কোন মতবিরোধ থাকতে পারে না। সুফীগণের মতবিরোধের দৃষ্টান্ত হচ্ছে, আমরা সূর্য ঢলে পড়ার সময় আসল ছায়া সম্পর্কে নানাজনের নানা উক্তি প্রত্যক্ষ করেছি। কেউ বলে গ্রীষ্মকালে ছায়া দুকদম হয়। কেউ বলে অর্ধেক কদম হয়। কেউ এতে আপত্তি করে বলে শীতকালে সাত কদম হয়। আবার কেউ পাঁচ কদম বলে। সূফীগণের জওয়াবের অবস্থাও তেমনি। অর্থাৎ প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ নিজ শহরের আসল ছায়া দেখে জওয়াব দেয়। এটা সঠিক; কিন্তু অপরের জওয়াবকে ভুল আখ্যা দেয়া অন্যায়। কেননা, সে সারা বিশ্বকে নিজের শহর অথবা তার মত মনে করে নেয়। আলেম ব্যক্তি জানে, ছায়া কি কারণে ছোট বড় হয় এবং বিভিন্ন শহরে বিভিন্ন হয়? নির্জনবাস ও মেলামেশার ফযীলত সম্পর্কে এতটুকু বর্ণনা করাই আমাদের উদ্দেশ্য ছিল। এখন যদি কেউ নির্জনবাসকে নিজের জন্যে শ্রেষ্ঠ ও অধিকতর নিরাপদ মনে করে, তবে তার জন্যে নির্জনবাসের আদব কি, তা সংক্ষেপে বর্ণনা করে দিচ্ছি। প্রথমে নিয়ত করতে হবে, তার দ্বারা যেন অন্যের কোন অনিষ্ট না হয়। দ্বিতীয়, মানুষের যোগদান থেকে নিরাপদ থাকার নিয়ত করবে। তৃতীয়, মুসলমানদের হক আদায়ে ত্রুটি থেকে মুক্তির নিয়ত করবে। চতুর্থ, কায়মনোবাক্যে আল্লাহর এবাদতের জন্যে মুক্ত হওয়ার নিয়ত করবে। এভাবে নিয়ত করার পর নির্জনে এলেম, আমল ও যিকির ফিকিরে আত্মনিয়োগ করবে। মানুষকে অধিক আসা যাওয়া করতে বারণ করবে। নতুবা অধিকাংশ সময় একাগ্রতা হবে না। শহরের খবরাখবর শুনবে না। কেননা, খবরাখবর কানে পড়া এমন, যেমন মাটিতে বীজ পড়া, যা অবশ্যই অংকুরিত হয় এবং শিকড় ও ডালাপালা সৃষ্টি করে। এমনিভাবে খবরও মনের মধ্যে শাখ -প্রশাখা বিস্তার করে এবং নানা কুমন্ত্রণা মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। কুমন্ত্রণা থেকে অস্তর মুক্ত হওয়া নির্জনবাসের জন্যে অত্যন্ত জরুরী। অল্প জীবিকায় সন্তুষ্ট থাকা উচিত। অধিক জীবিকা পেতে চাইলে বাধ্য হয়ে মেলামেশা করতে হবে। প্রতিবেশীদের জ্বালাতনে সবর করতে হবে। তারা যদি নির্জনবাসের কারণে প্রশংসা করে অথবা মেলামেশা বর্জন করার কারণে তিরস্কার করে, তবে কিছুই শুনবে না এবং আপন ধ্যানে মগ্ন থাকবে। কেননা, এসব বিষয় অল্প শুনলেও অনেক ক্ষতি করে। কোন ওযিফা পাঠ কিংবা যিকির করার সময় মনকে উপস্থিত রাখবে অথবা আল্লাহ্ তা'আলার প্রতাপ, গুণাবলী, ক্রিয়াকর্ম এবং আকাশ ও পৃথিবীর রহস্য সম্পর্কে ফিকির করবে অথবা আমলের সূক্ষ্মতা ও মনের রিপুগুলোর কথা চিন্তা-ভাবনা করবে এবং এগুলোকে দমন করতে সচেষ্ট হবে। গৃহের কোন লোক অথবা একজন সৎসঙ্গীও থাকা বাঞ্ছনীয়, যাতে নির্জনবাসী দিনে এক ঘন্টা তার সাথে মনোরঞ্জন করে এবং উপর্যুপরি মেহনত থেকে স্বস্তি লাভ করে। নির্জনবাসে মৃত্যুকে অধিক স্মরণ করতে হবে। একাকিত্বে মনে বিরক্তি দেখা দিলে মনে করবে, কবরে কে সাথে থাকবে? সেখানেও তো একা থাকতে হবে। যে আল্লাহ্'র যিকির ও মারেফতের সঙ্গ লাভ করে, মৃত্যুর পরও তার এই সঙ্গ বিনষ্ট হয় না; বরং এই সঙ্গের কারণে সে জীবিত ও প্রফুল্ল থাকে যেমন- শহীদদের সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন : "যারা আল্লাহ্'র পথে জেহাদ করে শহীদ হয়, তাদেরকে মৃত মনে করো না; বরং তারা জীবিত- পালনকর্তার রিযিকপ্রাপ্ত।" আল্লাহ্ যে অনুগ্রহ তাদেরকে দান করেছেন, তজ্জন্যে তারা প্রফুল্ল। আল্লাহ্'র জন্যে মেহনতকারী ব্যক্তিও মৃত্যুর পর শহীদ হয়। কেননা, সে-ই মুজাহিদ, যে আপন নফস ও খাহেশের বিরুদ্ধে জেহাদ করে। রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : নফসের জেহাদই বড় জেহাদ। সাহাবায়ে কেরাম বলেন আমরা ছোট জেহাদ থেকে বড় জেহাদের দিকে প্রত্যাবর্তন করছি; অর্থাৎ, নফসের জেহাদের দিকে।
প্রথম পর্ব
নির্জনবাসের আদব

রবিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২৩

নির্জনবাস - (৬) নির্জনবাসের অনিষ্ট



নির্জনবাস (পর্ব- ৬)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

নির্জনবাসের অনিষ্ট—
এখন আমরা নির্জনবাসের অনিষ্ট বর্ণনায় প্রবৃত্ত হচ্ছি। প্রকাশ থাকে যে, যে সকল ইহলৌকিক ও পারলৌকিক উদ্দেশ্য অপরের সাহায্যে অর্জিত হয়, সেগুলো মেলামেশা ছাড়া অর্জিত হতে পারে না।
বলাবাহুল্য, নির্জনবাস অবলম্বন করলে এ সকল উদ্দেশ্য ফওত হয়ে যাবে। এগুলোর ফওত হওয়াই নির্জবাসের ক্ষতি। এখন মেলামেশার উপকারিতা সমূহের প্রতি লক্ষ্য করলে বুঝা যাবে, নির্জনবাসের কারণে এতগুলোর উপকারিতা হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। সুতরাং এগুলোই হচ্ছে নির্জনবাসের অনিষ্ট তথা বিপদ। নিম্নে বিপদগুলো এক একটি করে বিস্তারিত বর্ণনা করা হচ্ছে।
[১] নির্জনবাসের প্রথম বিপদ হচ্ছে, এতে শিক্ষাদান ও শিক্ষা গ্রহণ ফওত হয়ে যায়, যার ফযীলত আমরা এলেম অধ্যায়ে বর্ণনা করে এসেছি। এই উভয় কাজ দুনিয়াতে বড় এবাদতসমূহের অন্যতম। মেলামেশা ছাড়া এগুলো সম্ভবপর নয়। হাঁ, এটা ঠিক যে, শিক্ষার অনেক প্রকার রয়েছে। তন্মধ্যে কতক জরুরী নয়। যে শিক্ষা অর্জন করা মানুষের উপর ফরয, তা যদি না শেখে এবং নির্জনবাস অবলম্বন করে, তবে গোনাহগার হবে। যদি ফরয পরিমাণে শিখে নেয়, এরপর এবাদত করতে মনে চায়, তবে নির্জনবাস করতে দোষ নেই। আর যদি কেউ বর্ণনাগত ও যুক্তিগত সকল শিক্ষায় পূর্ণতা অর্জন করার ক্ষমতা রাখে, তার জন্যে সেগুলো শিক্ষা করার পূর্বে নির্জনবাস অবলম্বন করা নেহায়েত ক্ষতির কথা। এ কারণেই ইবরাহীম নখয়ী ও অন্যান্য বুযুর্গ বলেন প্রথমে আলেম হও, এরপর নির্জনবাসী হও। যে ব্যক্তি শিক্ষা লাভের পূর্বে নির্জনবাসী হয়, সে প্রায়ই নিদ্রায় অথবা অন্য কোন প্রবৃত্তি চরিতার্থ করার চিন্তায় আপন মূল্যবান সময় বিনষ্ট করে। বেশীর বেশী সে সম্পূর্ণ সময় ওযিফার মধ্যে ডুবে থাকে এবং দৈহিক আমল করতে থাকে; কিন্তু অন্তর নানারকম প্রবঞ্চনার মাধ্যমে তার প্রচেষ্টা নিষ্ফল এবং আমল বাতিল করতে থাকে; অথচ সে টেরও পায় না। সে সর্বদা আল্লাহ্ তা'আলার যাত ও সিফাতের বিশ্বাসে নানা কুসংস্কারের আশ্রয় নিয়ে মন ভুলিয়ে রাখে এবং প্রায়ই নানা দুষ্ট কুমন্ত্রণার সম্মুখীন হয়। ফলে সে শয়তানের ক্রীড়নকে পরিণত হয় এবং মনে মনে নিজেকে 'আবেদ' মনে করতে থাকে। মোট কথা, শিক্ষা ধর্মকর্মের মূল শিকড় এবং অজ্ঞ জনসাধারণ ও মূর্খদের নির্জনবাসে কোন কল্যাণ নেই। অর্থাৎ, যে ব্যক্তি নির্জনে এবাদত করার নিয়ম পদ্ধতি সম্পর্কে সম্যক অবগত নয় এবং নির্জনে কি কি বিষয় জরুরী, তা জানে না, তার নির্জনবাসে কোন উপকার নেই। কেননা, মানুষের নফস রোগীর মতই বিচক্ষণ ডাক্তারের চিকিৎসার মুখাপেক্ষী। যদি কোন মূর্খ রোগী চিকিৎসা শাস্ত্র না শেখে এবং ডাক্তারের কাছ থেকে দূরে থাকে, সে নিঃসন্দেহে কেবল রোগযন্ত্রণাই ভোগ করে যাবে। সুতরাং আলেম ব্যতীত অন্য কারও জন্যে নির্জনবাস সমীচীন নয়। শিক্ষাদান কার্যেও বিরাট সওয়াব আছে, যদি শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের নিয়ত সঠিক হয়। এ যুগে আলেমরা যদি ধর্মের নিরাপত্তা কামনা করে, তবে নির্জনবাস অবলম্বন করুক। কেননা, আজকাল এমন কোন শিক্ষার্থী দৃষ্টিগোচর হয় না, যে ধর্মের উপকারের জন্যে শিক্ষা গ্রহণ করে। আজকাল শিক্ষার্থীরা কেবল মসৃণ কথাবার্তা অন্বেষণ করে, যদ্দ্দ্বারা ওয়াযে জনসাধারণকে নিজেদের দিকে আকৃষ্ট করতে পারে অথবা সমসাময়িকদেরকে পেছনে ফেলে দেয়ার জন্যে, শাসকবর্গের নৈকট্য লাভের জন্যে এবং গর্ব ও আত্মম্ভরিতার স্থলে ব্যবহার করার জন্যে তারা মুনাযারা তথা বিতর্কের বিষয়বস্তু অধ্যয়ন করে। ফেকাহ্ সম্বন্ধীয় রেওয়ায়েত-সমূহের উপর ভিত্তি করে ফতোয়াদান শিক্ষা আজকাল সর্বাধিক জনপ্রিয়। কিন্তু প্রায়শঃ সমসাময়িকদের অগ্রে থাকা এবং সরকারী পদ লাভ করে অর্থ সঞ্চয় করাই এ শিক্ষা অর্জনের কারণ হয়ে থাকে। অতএব এ ধরনের শিক্ষার্থীদের থেকে বেঁচে থাকাই ধর্ম ও সাবধানতার দাবী। যদি এমন শিক্ষার্থী পাওয়া যায়, যে আল্লাহ্ তা'আলার নৈকট্য লাভের উদ্দেশে শিক্ষা গ্রহণ করে, তার কাছে শিক্ষা গোপন করা কবীরা গোনাহ। এরূপ শিক্ষার্থী পাওয়া গেলেও বড় বড় শহরে দু'একজনের বেশী পাওয়া যায় না। সুফিয়ান সওরী (রহঃ) বলেন : আমরা অন্য উদ্দেশে শিক্ষা গ্রহণ করেছি; কিন্তু আমাদের শিক্ষা আল্লাহ্ ছাড়া অন্য উদ্দেশের জন্য নিবেদিত হতে অস্বীকার করেছে। এ উক্তি দ্বারা ধোঁকা খেয়ে এরূপ মনে করা উচিত নয় যে, আলেম ব্যক্তি অন্য উদ্দেশে এলেম শিক্ষা করলেও পরবর্তীতে তারা আল্লাহ্'র দিকে রুজু করে। কেননা, অধিকাংশ আলেমের অবস্থা আমাদের সামনেই রয়েছে। তারা দুনিয়ার অন্বেষণেই মৃত্যুবরণ করে এবং এ লালসায়ই জীবনপাত করে। সংসারবিমুখ আলেম খুব কমই দেখা যায়। এখন আমরা শুনা কথার উপর ভরসা করব, না দেখা ঘটনা বিশ্বাস করব। কথায় বলে, শুনা কথা দেখা ঘটনার মত বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে না। এছাড়া সুফিয়ান সওরী যে শিক্ষার দিকে ইঙ্গিত করেছেন, সেটা হচ্ছে হাদীস, তফসীর এবং পয়গম্বর ও সাহাবায়ে কেরামের জীবনচরিত শিক্ষা। এসব শিক্ষা খোদাভীতির কারণ হয়ে থাকে। এগুলো আপাততঃ প্রভাবশালী না হলেও পরবর্তীতে প্রভাবশালী হয়ে থাকে। কিন্তু কালাম ও ফেকাহ্ শিক্ষা এরূপ নয়। এগুলো যারা দুনিয়া লাভের নিয়তে শিক্ষা করে, তারা আজীবন দুনিয়ালোভীই থেকে যায়। সম্ভবতঃ এই কিতাবে আমরা যেসব বিষয় লিপিবদ্ধ করেছি, যদি শিক্ষার্থী দুনিয়ালাভের নিয়তেই এগুলো শিক্ষা করে, তবে তাকে অনুমতি দেয়া যায়। কেননা, আশা করা যায়, শেষ বয়সে সে সঠিক পথে ফিরে আসবে। কারণ, এই কিতাব আল্লাহ্ তাআলার ভয় সৃষ্টি করা, আখেরাতের প্রতি উৎসাহিত করা এবং দুনিয়ার নিন্দা সম্পর্কিত বিষয়বস্তুতে পরিপূর্ণ। এসব বিষয়বস্তু হাদীস ও কোরআনে ভূরি ভূরি পাওয়া যায়। কালাম ও ফেকাহ্ শিক্ষার মধ্যে পাওয়া যায় না। সুতরাং শিষ্য সংখ্যা কম করা এবং নির্জনবাস অবলম্বন করার মধ্যেই সাবধানতা নিহিত। যে ব্যক্তি দুনিয়া লাভের নিয়তে শিক্ষাদান কার্যে নিয়োজিত, তার জন্যে এ যুগে আপন কাজ পরিত্যাগ করাই উত্তম। কেননা, আবু সোলায়মান খাত্তাবী এ যুগের সঠিক চিত্র এভাবে তুলে ধরেছেন- যারা তোমার কাছে বসতে এবং পড়াশুনা করতে আগ্রহী, তাদেরকে বর্জন কর। তুমি তাদের কাছ থেকে অর্থ ও সুনাম কিছুই পাবে না। তারা বাহ্যতঃ বন্ধু হলেও অন্তরে দুশমন। যখন তোমাকে দেখে, তখন খোশামোদ করে এবং পশ্চাতে মন্দ বলে। কাছে এসে তোমার ক্রিয়াকর্ম লক্ষ্য করে এবং বাইরে গিয়ে তোমার কুৎসা রটনা করে। শিক্ষা অর্জন করা এদের উদ্দেশ্য নয়; বরং জাঁকজমক ও অর্থোপার্জনই এদের লিপ্সা। তারা তোমাকে নিজেদের মতলব হাসিলের সিঁড়ি বানাতে চায়। তাদের উদ্দেশ্য সাধনে তোমার পক্ষ থেকে কোন ত্রুটি হয়ে গেলে তারা তোমার ঘোর শত্রু হয়ে যায় । তারা চায়, তুমি তোমার ইযযত, ধর্ম সব তাদের জন্যে ব্যয় কর। অর্থাৎ, তাদের শত্রুকে শত্রু মনে কর এবং তাদের প্রবঞ্চনায় সাহায্য কর। তাদের মর্জি, তুমি আলেম হয়ে তাদের জন্যে বোকা হও এবং অনুসৃত ও সরদার হয়ে তাদের হীন অনুসারী হও। এ কারণেই বলা হয়, অজ্ঞদের থেকে সরে থাকা পূর্ণ মনুষ্যত্ব। [২] নির্জনবাসের দ্বিতীয় বিপদ হল, এতে নিজে উপকার লাভ করা ও পরোপকার করা ফওত হয়ে যায়। নিজে উপকার লাভ করা লেনদেনের মাধ্যমে হয়ে থাকে। এটা মেলামেশা ছাড়া সম্ভব নয়। অতএব যে ব্যক্তি লেনদেন ও উপার্জনের মুখাপেক্ষী, সে ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় নির্জনবাস বর্জনকারী হবে। লেনদেনে যদি শরীয়তের নিয়ম কানুন মেনে চলতে চায়, তবে মেলামেশা সুকঠিন হবে। যদি কারও কাছে এই পরিমাণ সম্পদ থাকে যে, মিতব্যয়ী হলে যথেষ্ট হয়ে যাবে, তবে তার জন্যে নির্জনবাস উত্তম। কেননা, এখন গোনাহ ছাড়া জীবিকা উপার্জনের কোন পথ নেই। হাঁ, যদি কেউ হালাল উপায়ে উপার্জন করে দান-খয়রাত করতে চায়, তবে তা সেই নির্জনবাস থেকে উত্তম, যা কেবল নফল এবাদতের জন্যে অবলম্বন করা হয়। কিন্তু সেই নির্জনবাস থেকে উত্তম নয়, যা আল্লাহর মারেফত ও শরীয়ত শাস্ত্রের গবেষণার জন্যে অবলম্বন করা হয়। পরোপকার অর্থ ব্যয় করে অথবা দৈহিক খেদমতের মাধ্যমে হয়ে থাকে। বলাবাহুল্য, খাঁটি নিয়তে পারিশ্রমিক ছাড়া মুসলমানদের প্রয়োজন মেটানোর অশেষ সওয়াব আছে। কিন্তু মেলামেশা ছাড়া এটা হতে পারে না। অতএব যে মানুষের কাজ করে দিতে সক্ষম, এর সাথে শরীয়তের সীমাও লঙ্ঘন না করে, তার জন্যে মেলামেশা নির্জনবাসের তুলনায় উত্তম। [৩] নির্জনবাসের তৃতীয় বিপদ হল, - এতে সংশোধিত হওয়া ও সংশোধন করা ফওত হয়ে যায়। সংশোধিত হওয়া দ্বারা আমাদের উদ্দেশ্য নফসের সাধনা করা এবং মানুষের জ্বালাতন সহ্য করা, যাতে নফস শিথিল হয়ে যায় এবং কামভাব দমিত হয়। নফসের এরূপ হওয়াও মেলামেশা ছাড়া হতে পারে না। যার চরিত্র মার্জিত নয় এবং কামভাব শরীয়তের সীমার অনুগত নয়, তার জন্যে নির্জনবাসের চেয়ে মেলামেশা উত্তম। এ কারণেই খানকায় যারা সূফীদের খেদমত করে, তারা এ কাজটি ভাল বুঝে। মানুষের কাছে সওয়াল করার কারণে তাদের নফসের অহমিকা চূর্ণ হয়ে যায় এবং সূফীগণের দোয়া দ্বারা বরকত লাভ হয়। অতীত যুগের শুরুতে এ খেদমতের এটাই ছিল কারণ। এখন এতে কুউদ্দেশ্য শামিল হয়ে গেছে। এখন খেদমতের জন্যে বলার কারণ হচ্ছে অনুসারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি করে অনেক ধনসম্পদ লাভ করা। যদি খেদমতের নিয়ত তাই হয়, তবে এর চেয়ে নির্জনবাসই উত্তম, যদিও কোন কবরের কাছে হয়। আর যদি বাস্তবেই নফসের অহমিকা দূর করার নিয়ত থাকে, তবে সে সাধনার মুখাপেক্ষী, তার জন্যে এই খেদমত নির্জনবাসের তুলনায় উত্তম। আধ্যাত্ম পথের শুরুতে সাধনার প্রয়োজন হয়। সাধনা অর্জিত হওয়ার পর এটা বুঝতে হবে যে, ঘোড়াকে শিক্ষা দেয়ার উদ্দেশেই শিক্ষা দেয়া হয় না; বরং পথ অতিক্রমের জন্যে সওয়ারী করা এবং যেখানে ইচ্ছা সেখানে যাওয়ার জন্যে শিক্ষা দেয়া হয়। অনুরূপভাবে মানুষের দেহ তার অন্তরের সওয়ারী। এতে সওয়ার হয়ে অন্তর আখেরাতের পথ অতিক্রম করে। এতে অনেক কামনা-বাসনা আছে বিধায় সওয়ারী পথিমধ্যে অবাধ্য হয়ে যেতে পারে। তাই সাধনার প্রয়োজন আছে। কিন্তু উদ্দেশ্য সওয়ারীই। সুতরাং কেউ যদি সারা জীবন সাধনার মধ্যে অতিবাহিত করে দেয়, তবে সে হবে সেই ব্যক্তির মত, যে সারা জীবন ঘোড়াকে শিক্ষা দেয় এবং তার পিঠে সওয়ার হয়ে পথ অতিক্রম করে না। এমতাবস্থায় ঘোড়ার শিক্ষিত হওয়ার উপকার এটাই হবে যে, সে ঘোড়ার কামড় ও লাথি মারা থেকে নিরাপদ থাকবে। যদিও এ উপকারটিও উদ্দেশ্য; কিন্তু এরূপ উপকার তো মৃত জন্তু থেকেও অর্জিত হয়। ঘোড়া তো রাখা হয় সেটির দ্বারা জীবনে কিছু কাজ নেয়ার জন্যে। এমনিভাবে দেহের কামনা বাসনা থেকে মুক্তি তো নিদ্রা ও মৃত্যু দ্বারাও অর্জিত হয়। কিন্তু কেবল কামনা বাসনা বর্জনই উদ্দেশ্য নয়; বরং এরপর আখেরাতের পথ অতিক্রম করাও উদ্দেশ্য। সুতরাং কামনা বাসনা বর্জন ও কেবল সাধনা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা মানুষের উচিত নয়। কাজেই সাধনার পর কি করতে হবে, সেটা দৃষ্টির সামনে রাখতে হবে। এ পর্যায়ে এসে নির্জনবাস তার জন্যে মেলামেশার তুলনায় অধিক সহায়ক হবে। অর্থাৎ এরূপ ব্যক্তির জন্যে শুরুতে মেলামেশা উত্তম এবং পরিণামে নির্জনবাস উত্তম। সংশোধন দ্বারা আমাদের উদ্দেশ্য অপরকে সাধনায় লিপ্ত করা; যেমন মুরশিদগণ সূফীগণের সাথে করে থাকেন। এটাও মেলামেশা ছাড়া হতে পারে না। অর্থাৎ মুরশিদ যে পর্যন্ত মুরীদদের সাথে মেলামেশা না করে, তাদের সংশোধন করতে সক্ষম হবে না । [৪] নির্জনবাসের চতুর্থ বিপদ হল এতে অপরের কাছ থেকে সুলভ সঙ্গ হাসিল করা ও অপরকে বন্ধুসুলভ সঙ্গ দেয়া ফওত হয়ে যায়। এটা সেই ব্যক্তির কাম্য হয়, যে ওলীমা, ভোজসভা ও মনোরঞ্জনের জায়গায় যায় না। এর পরিণাম বিলাসগত আনন্দ এবং কখনও ধর্মপরায়ণতাও হয়ে থাকে। যেমন কোন ব্যক্তি মাশায়েখের কাছ থেকে সঙ্গ হাসিল করে এ কারণে যে, তারা সর্বদা খোদাভীতি ও পরহেযগারীর মধ্যে মগ্ন থাকে। কাজেই তাদের কথাবার্তা ও অবস্থা দেখে বন্ধুসুলভ সঙ্গ লাভ করা মোস্তাহাব।
[৫] নির্জনবাসের পঞ্চম বিপদ হল, - মানুষ নিজে সওয়াব পাওয়া ও অপরকে সওয়াব পৌঁছানো থেকে বঞ্চিত থাকে। নিজে সওয়াব পাওয়ার উপায় হচ্ছে জানাযায় যাওয়া, রোগীর অবস্থা জিজ্ঞেস করা, ঈদের নামাযে শরীক হওয়া, জুমুআয় উপস্থিত হওয়া ইত্যাদি। যে নির্জনবাস করে, তার জন্যে সকল নামাযের জামাতে যোগদান করা জরুরী। জামাত বর্জন করার অনুমতি কোন অবস্থাতেই নেই। হাঁ, জামাতের সওয়াব না পাওয়ার সমতুল্য কোন বাহ্যিক ক্ষতির আশংকা থাকলে জামাত বর্জন করা যায়। কিন্তু এরূপ কমই হয়ে থাকে। অপরকে সওয়াব পৌঁছানোর উপায়, নিজের দরজা খোলা রাখবে, যাতে রুগ্ন অবস্থায় মানুষ এসে তার হাল জিজ্ঞেস করে এবং বিপদে সান্ত্বনা ও আনন্দে মোবারকবাদ দেয়। কেননা, এতে মানুষ সওয়াব পায়। [৬] নির্জনবাসের ষষ্ঠ বিপদ হল,- এতে বিনয় ফওত হয়ে যায়। নির্জনতা অবলম্বনের কারণ কখনও অহংকারও হয়ে থাকে। বনী ইসরাঈলের জনৈক দার্শনিক দর্শন শাস্ত্রে তেষট্টিটি পুস্তক রচনা করেছিল। এরপর তার ধারণা হল, আল্লাহ তা'আলার কাছে তার মর্যাদা অনেক বৃদ্ধি পেয়ে থাকবে। আল্লাহ তা'আলা তখন তার নবীর প্রতি ওহী পাঠালেন, অমুক ব্যক্তিকে বলে দাও সে তার বকবক দ্বারা সারা পৃথিবী ভরে দিয়েছে। আমি এর মধ্য থেকে কিছুই কবুল করি না। দার্শনিক নির্জনবাস অবলম্বন করল এবং মাটির নিচে কুঠরীতে চলে গেল। অতঃপর মনে মনে বলল : আমি এবার পরওয়ারদেগারের মহব্বতে পৌছে গেছি। আল্লাহ তাআলা নবীর প্রতি আবার ওহী পাঠালেন, তাকে বলে দাও, সে আমার সন্তুষ্টি পাবে না যে পর্যন্ত মানুষের সাথে মেলামেশা এবং তাদের জ্বালাতন সহ্য না করে। অতঃপর সে মানুষের সাথে মেলামেশা করল, তাদের কাছে বসল, সঙ্গে আহার করল এবং বাজারে ঘুরাফেরা করল। তখন আল্লাহ তা'আলা নবীর প্রতি ওহী পাঠালেন, তাকে বলে দাও, সে আমার সন্তুষ্টি লাভে সক্ষম হয়েছে। সুতরাং বুঝা গেল, কিছু লোকের নির্জনবাসের কারণ অহংকারই হয়ে থাকে। তারা এজন্যে মজলিসে যায় না যে, কেউ তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে না এবং অগ্রে বসাবে না। কিংবা তারা মনে করে, মানুষের সাথে মেলামেশা না করলে আমাদের মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে এবং সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়বে। কিছু লোক এ জন্যে নির্জনবাস অবলম্বন করে যে, মেলামেশার কারণে তাদের গোপন রহস্য প্রকাশ হয়ে পড়বে এবং দরবেশী ও এবাদতের যে বিশ্বাস তাদের প্রতি রয়েছে, তা খতম হয়ে যাবে। ফলে তারা তাদের গৃহকে আপন কুকর্মের জন্যে আড়াল করে নেয়। তারা গৃহে সময়ই যিকির ফিকিরে ব্যয় করে না। তাদের পরিচয় হচ্ছে, স্বয়ং কারও কাছে যাওয়া পছন্দ করে না; কিন্তু অন্যরা তাদের কাছে আসুক, এটা খুব কামনা করে। বরং জনসাধারণ ও আমীর ওমরারা তাদের দরজায় সমবেত হলে এবং তাদের হস্ত চুম্বন করলে তারা অত্যন্ত খুশী হয়। এসব লোক যদি এবাদতে মশগুল থাকার কারণে মেলামেশা ঘৃণা করত, তবে নিজের যাওয়া যেমন তাদের কাছে ভাল মনে হত না, তেমনি অপরের আগমনও তারা অপছন্দ করত; যেমন ফোযায়ল (রহঃ)-এর অবস্থা এই মাত্র বর্ণিত হয়েছে, তিনি বন্ধুকে দেখে বললেন : তুমি শুধু এ জন্যে এসেছ যে, আমি তোমার সামনে সেজে বসে থাকি : এবং তুমি আমার সামনে। অথবা যেমন হাতেম আসাম্ম তাঁর সাথে সাক্ষাৎকামী আমীরকে বলেছিলেন : আমার প্রয়োজন, না আমি তোমাকে দেখব, না তুমি আমাকে। সুতরাং যে ব্যক্তি একাকিত্বে আল্লাহর যিকিরে মশগুল নয়, তার নির্জনবাসের কারণ এটাই যে, সে অতি মাত্রায় মানুষের সাথে মশগুল আছে; অর্থাৎ তার মন চায়, মানুষ তাকে সম্মানের দৃষ্টিতে দেখুক । এরূপ নির্জনবাস কয়েক কারণে মূর্খতা । প্রথমতঃ যে ব্যক্তি শিক্ষা ও ধর্মকর্মে বড় হয়, মেলামেশা ও বিনয়ের কারণে তার মর্যাদা হ্রাস পায় না। সেমতে হযরত আলী (রাঃ) খোরমা ও লবণ বাজার থেকে আপন কাপড়ে ও হাতে বহন করে আনেন।
হযরত আবূ হোরায়রা, হোযায়ফা, উবাই ইবনে ক্বাব ও ইবনে মসউদ (রাঃ) খড়ির বোঝা ও আটার পুটলি কাঁধে বহন করে আনতেন। হযরত আবূ হোরায়রা (রাঃ) যখন শাসনকর্তা ছিলেন, তখন খড়ির বোঝা মাথায় বহন করে নিয়ে যেতেন এবং বলতেন- তোমাদের আমীরকে পথ দাও।
রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সওদা ক্রয় করতেন এবং নিজেই গৃহে নিয়ে যেতেন। কোন কোন সাহাবী আরজ করতেন, আমার হাতে দিন। আমি নিয়ে যাই, তিনি বলতেন : বস্তুর মালিক তা নিয়ে যাওয়ার অধিক হকদার।
হযরত ইমাম হাসান (আঃ) ভিক্ষুকদের কাছ দিয়ে গমন করতেন। তারা রুটির টুকরা ভক্ষণ করত এবং বলত সাহেবজাদা ! থামুন, আমাদের সাথে আহার করুন। তিনি সওয়ারী থেকে নেমে যেতেন এবং পথে বসে তাদের সাথে আহার করতেন। এরপর ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে বলতেন : আল্লাহ তাআলা অহংকারীদেরকে পছন্দ করেন না। দ্বিতীয়তঃ যারা মানুষের সন্তুষ্টি ও ভক্তিশ্রদ্ধা কামনা করে, তারা বিভ্রান্ত। কেননা, তারা আল্লাহ তা'আলাকে যথার্থ চিনতে পারলে বুঝতে পারবে, মানুষ দ্বারা কোন কিছু হয় না। লাভ-লোকসান, উপকার ক্ষতি সমস্তই আল্লাহ তা'আলার করায়ত্ত। যে ব্যক্তি আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে মানুষকে সন্তুষ্ট করতে চায়, আল্লাহ্ তার প্রতি অসন্তুষ্ট হন এবং মানুষকেও তার প্রতি অসন্তুষ্ট করে দেন৷
সহল তস্তরী তাঁর জনৈক মুরীদকে বললেন তুমি অমুক আমল কর। মুরীদ বলল : লোকলজ্জার কারণে আমি এটা করতে পারি না। তিনি সকল মুরীদকে লক্ষ্য করে বললেন দু'টি গুণের মধ্য থেকে একটি গুণে গুণান্বিত না হওয়া পর্যন্ত মানুষ মারেফতের স্বরূপ জানতে পারে না- হয় মানুষ তার দৃষ্টি থেকে পড়ে যাবে এবং দুনিয়াতে পরওয়ারদেগারকে ছাড়া কাউকে দেখবে না, অন্য কাউকে লাভ ও ক্ষতির মালিক মনে করবে না; না হয় তার নফস তার অন্তরের সামনে তুচ্ছ হয়ে যাবে। মানুষ কি অবস্থায় তাকে দেখবে, এ ব্যাপারে সে নফসের পরওয়া করবে না।
হযরত ইমাম শাফেয়ী (রহ) বলেন : এমন কেউ নেই, যার বন্ধু ও শত্রু নেই । অতএব যে আল্লাহ্'র অনুগত তার সাথে থাকা ভাল।
হযরত হাসান বসরীকে কেউ বলল : আপনার মজলিসে কিছু লোক আসে। উদ্দেশ্য, আপনি ওয়াযে কোথায় কোথায় ভুল করেন তা লক্ষ্য করতে এবং আপনাকে প্রশ্ন করে করে বিরক্ত করতে। তিনি মুচকি হেসে বললেন : এটা খারাপ মনে করো না। আমি আমার নফসকে জান্নাতে থাকা এবং আল্লাহ তা'আলার প্রতিবেশী হওয়ার জন্যে রেখেছি। আমি এ বিষয়েরই আকাঙ্ক্ষী। আমি কখনও বলিনি যে, মানুষের মুখ থেকে অক্ষত থাকব। কারণ, আমি জানি, আল্লাহ তাআলা যিনি মানুষের স্রষ্টা, রিযিকদাতা, জীবনদাতা এবং মৃত্যুদাতা, তিনিও মানুষ থেকে অক্ষত নন। অতএব আমি অক্ষত থাকব কিরূপে? হযরত মূসা (আঃ) আল্লার দরবারে আরজ করলেন ইয়া রব, মানুষের রসনাকে আমা থেকে ফিরিয়ে রাখুন । আদেশ হলঃ হে মূসা, এটা তো এমন বিষয়ের প্রার্থনা, যা আমি নিজের জন্যে পছন্দ করিনি- তোমার জন্যে কিরূপে করব?
আল্লাহ তা'আলা হযরত ওযায়র (আঃ)-এর কাছে ওহী পাঠান- আমি তোমাকে মানুষের মুখে মেসওয়াকের মত করব, তারা তোমাকে চর্বণ করবে- এটা যদি তুমি পছন্দ না কর, তবে তোমাকে আমার কাছে বিনয়ীদের মধ্যে লেখব না।
সারকথা, মানুষ ভাল বিশ্বাস রাখুক, সাধু বলুক, এ উদ্দেশে যে ব্যক্তি নিজেকে গৃহে আবদ্ধ রাখে, সে দুনিয়াতেও ক্লেশ ভোগ করে এবং আখেরাতেও আযাব থেকে নিস্তার পাবে না। নির্জনবাস এমন ব্যক্তির জন্যেই মোস্তাহাব, যে সদা-সর্বদা পরওয়ারদেগারের যিকির, ফিকির, এবাদত ও মারেফতে ডুবে থাকে। [৭] নির্জনবাসের সপ্তম বিপদ হল, - এতে অভিজ্ঞতা ফওত হয়ে যায়, যা মানুষের সাথে মেলামেশা ও তাদের প্রাত্যহিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করার উপর নির্ভরশীল। বুদ্ধি-বিবেক, ইহকাল ও পরকালের উপযোগিতা সম্যক উপলব্ধি করার জন্যে যথেষ্ট নয়; বরং উপযোগিতা অভিজ্ঞতা ও পারদর্শিতা দ্বারা জানা যায়। যে ব্যক্তি অভিজ্ঞতায় পটু নয়; তার নির্জনবাসে কোন কল্যাণ নেই। তাই প্রথমে লেখাপড়া শিখতে হবে। এ সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়ে যাবে এবং এতটুকু যথেষ্ট হবে। অবশিষ্ট অভিজ্ঞতা পরিস্থিতি সম্পর্কে শুনার মাধ্যমেও অর্জিত হতে পারে- মেলামেশার প্রয়োজন নেই। যেসকল অভিজ্ঞতা অধিক জরুরী, তন্মধ্যে একটি হচ্ছে নিজের নফস, চরিত্র ও আভ্যন্তরীণ গুণাগুণ পরীক্ষা করা। এটা নির্জনতায় হতে পারে না। উদাহরণতঃ যার মধ্যে হিংসা বিদ্বেষ আছে, সে নির্জনে বাস করলে তার হিংসা-বিদ্বেষ প্রকাশ পাবে না । মানুষের এসব গুণাগুণ অত্যন্ত মারাত্মক, যা পরীক্ষার মাধ্যমে দূর করা ওয়াজিব। যেসব কারণে হিংসা-বিদ্বেষ মাথাচাড়া দিয়ে উঠে, সেগুলো থেকে দূরে থেকে হিংসা-বিদ্বেষের প্রতিকার সম্ভব নয়। কেননা, হিংসা বিদ্বেষের গুণাগুণসম্পন্ন অন্তর ফোঁড়া সদৃশ, যার মধ্যে পুঁজ ও রক্ত ভর্তি থাকে। ফোঁড়া নাড়া না দিলে কিংবা হাত না লাগালে ফোঁড়ার ব্যথা অনুভব হবে না। এখন যদি নাড়া দেয়ার কোন লোক ফোঁড়ার কাছে না থাকে, তবে যার ফোঁড়া, সে নিজেকে সুস্থই মনে করবে, কিন্তু কেউ নাড়া দিলে ফোড়া থেকে পুঁজ ও দূষিত পদার্থ বের হতে থাকবে; যেমন আবদ্ধ পানি ফোয়ারা দিয়ে বের হতে থাকে। এমনিভাবে যে অস্তরে হিংসা, দ্বেষ, কৃপণতা, ক্রোধ ও অন্যান্য কুচরিত্র ভর্তি থাকে, সেই অন্তরকে নাড়া দিলেই এসব কুচরিত্র ফুটে উঠতে থাকে। এ কারণেই যারা আধ্যাত্ম পথের পথিক, তারা আপন নফসের পরীক্ষা নিতেন। পরীক্ষার পর যদি নফসের মধ্যে অহংকার দেখতেন, তবে পানির মশক কোমরে বেঁধে অথবা খড়ির বোঝা মাথায় নিয়ে বাজারে ফিরতেন, যাতে নফস থেকে অহংকার দূর হয়ে যায়। মোট কথা, নফসের বিপদ ও শয়তানের চক্রান্ত গোপন থাকে। খুব কম লোকই এগুলো জানে। এ কারণেই জনৈক বুযুর্গ থেকে বর্ণিত আছে, তিনি ত্রিশ বছরের নামায পুনরায় আদায় করেছিলেন; অথচ এগুলো তিনি জামাতের প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে আদায় করেছিলেন। এই পুনরায় পড়ার কারণ বর্ণনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন একদিন আমি ওযরবশতঃ পেছনে পড়ে গেলাম এবং প্রথম সারিতে স্থান পেলাম না। আমি দ্বিতীয় সারিতে দাঁড়ালাম। পেছনে পড়ার কারণে কিছু লোক আমার দিকে তাকাচ্ছিল। এতে আমার নফস লজ্জা অনুভব করছিল। তখন আমি জানলাম, আমার অতীত নামাযগুলো রিয়া মিশ্রিত ছিল।
সারকথা, মেলামেশার একটি বড় ও সুস্পষ্ট উপকারিতা হচ্ছে, এতে নিন্দনীয় গুণসমূহ জানা হয়ে যায়। এ জন্যেই বলা হয়, সফর চরিত্র প্রকাশ করে দেয়। কেননা, সফরও এক প্রকার মেলামেশা- যা দীর্ঘক্ষণ স্থায়ী হয়।

পরবর্তী পর্ব-

নির্জনবাসের উপসংহার



বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...