রবিবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০২৩
হকদারের হক (৪) আল্লাহর উদ্দেশ্যে শত্রুতার পরিচয়
হকদারের হক (৩) আল্লাহর প্রতি মহব্বতের দ্বিবিধ কারণ
হকদারের হক (২) আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালবাসার নিদর্শন
হকদারের হক (১) বন্ধুত্বের ফযীলত
পরবর্তী পর্ব
আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালবাসার নিদর্শন
শনিবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০২৩
হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (১৪) পার্থিব শাস্তি-পুরস্কার
আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “অনন্তর যা কিছু বিপর্যয় তোমাদের ওপর নেমে আসে, তা তোমাদেরই স্বহস্তে উপার্জিত বৈ নয়। এবং অনেককে রেহাইও দেয়া হয়ে থাকে”। (সূরা শূরাঃ আয়াতঃ ৩০)
অন্যত্র তিনি বলেনঃ-
“যদি তারা তাওরাত, ইঞ্জীল কিংবা যা কিছু তাদের কাছে অবতীর্ণ হয়েছে তা বাস্তবায়িত করত তা হলে আকাশ ও পৃথিবীর সব দিক থেকে তারা অফুরন্ত নেয়ামত ভোগ করতে পেত”। (সূরা মায়েদাঃ ৬৬)
কৃপণ বাগানের মালিক প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’আলা (সূরা নূহে) যে ঘটনার উল্লেখ করেছেন তা প্রণিধানযোগ্য। (বাগানের মালিক তিন ভাই প্রতি মৌসুমে ফসল কাটার সময়ে উপস্থিত ভিক্ষুকদের ভেতর কিছু অংশ বিতরণ করত। একবার রাতারাতি ফসল কেটে ভিক্ষুকদের পৌঁছার আগেই তা ঘরে তোলার অভিলাষ নিয়ে গিয়ে দেখল বাগান জ্বলে গেছে।) মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) কুরআনের
["এবং তোমরা যা খুলে বল বা গোপন রাখ, সব কিছুর হিসাব আল্লাহ নেবেন" (সূরা বাক্বারাঃ ২৮৪)]
[ "এবং খারাপ কাজ করবে তাকে শাস্তি পেতে হবে"] আয়াত দুটির ব্যাখ্যা প্রসংগে বলেন, ‘এ হিসাব নেয়া ও শাস্তি দেয়া আল্লাহর অসুখ-বিসুখ ও অন্যান্য বিপদাপদের দ্বারা কার্যকরী করেন। পকেটের কিছু হারিয়ে যে দুর্ভাবনা ও মনোকষ্ট দেখা দেয় তাও তার ভেতরে শামিল। এ ভাবের বিপদাপদের ভেতর দিয়ে মানুষ তার ছোট-খাট পাপগুলো কাফফারা দিয়ে দিয়ে এরূপ নিষ্পাপ হবে যেন আগুনে জ্বালিয়ে সোনা খাঁটি করা হল।
জেনে রাখুন, বিবেক রিপুর হাতে মার খেয়েও আবার মাথা তুলে দাঁড়ায়। একটি উপায় হল তার স্বাভাবিক মৃত্যু। দ্বিতীয় উপায় হল তার ইচ্ছা করে মরার মত হওয়া। স্বাভাবিক মৃত্যুতে রিপুগুলোর রুজী রুটি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে তার বেঁচে থাকার শক্তি এভাবে বিলুপ্ত হয় যা আর ফিরে পাবার নয়। এ অবস্থায় ক্ষুৎ-পিপাসা, লোভ-লালসা ও রাগ-দ্বেষ কিছুই তার থাকে না বলে তার ওপর আত্মিক জগতের প্রভাব জমতে থাকে (তাই বিবেক চাংগা হয়)। ইচ্ছা করে মৃত সাজা মানে হল, আত্মিক সাধনা দিয়ে রিপুকে মেরে মেরে নিস্তেজ করা এবং আত্মিক জগতের দিকে মনোনিবেশ করে সেখানকার চিত্রগুলো অন্তরে চিত্রিত করতে থাকা। এর ফলে তার অন্তরে ফেরেশতা স্বভাব বা বিবেকের আলো দেখা দেবে।
এটাও স্মরণ রাখতে হবে যে, সব কিছুই অনুকূল অবস্থায় খুশীতে ফুলে ফেঁপে যায়। তেমনি প্রতিকূল পরিবেশে তা দুঃখে ও হতাশায় ভেংগে পড়ে। (বিবেকের দশাও তাই।)
এও জানা প্রয়োজন, প্রতিটি দুঃখ-কষ্ট এবং আনন্দ-খুশীর নিজ নিজ বিশেষ আকৃতি-প্রকৃতি রয়েছে। তারাসেই বিশেষ রূপ ধরেই প্রকাশ পায়। যেমন, রক্ত দূষিত হওয়ার প্রকাশ ঘটে দেহে খুজলী পাচড়া রূপে। তেমনি পিত্ত গরমের কষ্ট প্রকাশিত হয় দেহের অস্থিরতা ও স্বপ্নে আগুন দেখার মাধ্যমে। কফের কষ্ট সর্দীর প্রচণ্ডতায় স্বপ্নে বরফ দেখায় প্রকাশ পায়।
তেমিন বিবেক প্রাধান্য পায় এবং মানুষ তার অনুকূল অবস্থা সৃষ্টি করে অর্থাৎ নিজের ভেতর পবিত্রতা ও বিনয় সৃষ্টি করে, তখন স্বপ্ন কি জাগরণে আনন্দ ও প্রীতির বিশেষ বিশেষ দৃশ্য ও চিত্র দেখতে পায়। যদি তার বিপরীত কাজ করে তা হলে সে সব অসামঞ্জস্য কাজগুলো এরূপ দৃশ্য ও চিত্রের সৃষ্টি করবে যাতে লাঞ্ছনা ও ভীতির ব্যাপার থাকে। যেমন হিংস্র বাঘকে দেখবে শিকার ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে ক্রোধ প্রকাশ করতে কিংবা সাপকে দেখবে দংশন উদ্যত কিংবা দংশন করতে ইত্যাদি।
বাহ্যিক তথা পার্থিব পুরস্কার-শাস্তির মূলনীতি হল এই, কারণ সৃষ্টি হলেই কেবল সে কাজগুলো দেখা দেবে। যে ব্যক্তি কার্যকারণ রীতি বুঝে নিবে এবং কোন কারণে কোন কাজ দেখা দেয় তা খেয়ালে রাখবে, তা হলে সে সুস্পষ্ট জানতে পাবে, আল্লাহ পাক পার্থিব জীবনেও পাপীকে শাস্তি থেকে রেহাই দেননা। তবে সংগে সংগে দুনিয়া পরিচালনার (কার্যকারণ) রীতি বাহ্যত করে তিনি তা করেন না (বরং পরকালের জন্য মুলতবী রাখেন)।
ব্যাপারটা এই হয়, পৃথিবীতে পুণ্যবানের শান্তি ও পাপীর শাস্তি লাভের বাহ্যিক কারণ-উপকরণ যদি সৃষ্টি ও সরবরাহ না হয়, তখন পুণ্য কাজ করাতে (আত্মিক) শান্তি ও পাপ কাজ করাতেই (আত্মিক) শাস্তি পেয়ে থাকে। যদি কোন পুণ্যবানের শাস্তির জন্য পার্থিব কারণ সৃষ্টি হয় এবং তা বন্ধ করলে তার পুণ্য কাজের কোন ক্ষতি না হয় তাহলে তার পুণ্য সেটাকে পুরোপুরি বন্ধ করতে কিংবা শাস্তির পরিমাণ ও প্রচণ্ডতা কমাতে সহায়ক হয়। তেমনি কোন পাপীর জন্য যদি শাস্তির পার্থিব কারণ সৃষ্টি হয়, তখন তার পাপ সে শাস্তির পথে অন্তরায় হয় এবং তা কার্যকর হতে দেয় না। তবে যদি তার কর্মফলের অনুকূল কারণ-উপকরণ সৃষ্টি হয়, তা হলে শাস্তি ও শান্তি দুটোই যথেষ্ট পরিমাণে মিলে। তা বলে পাপ-পুণ্যের ফলাফল দ্বারা পৃথিবীর রীতিনীতি কখনও বদলানো হয় না। বাহ্যিক ফলাফল দেবার ক্ষেত্রে যেখানে পার্থিব রীতি-নীতি অন্তরায় হয়, সেখানে ফলাফল মুলতবী থাকে। এ কারণেই দেখা যায়, পাপ করেও মানুষ পার্থিব জীবনের স্বল্প পরিসরে বেশ সুখে-শান্তিতে কাটাচ্ছে। পক্ষান্তরে পুণ্য করেও মানুষ যথেষ্ট দুঃখ-কষ্ট ভোগ করছে। পুণ্যবানের এ বাহ্যিক দুঃখ-কষ্ট তার পশু শক্তিকে দুর্বল ও পরাভূত করে থাকে। এভাবে তাকে তার দুঃখ-কষ্ট তার পশু শক্তিকে দুর্বল ও পরাভূত করে থাকে। এভাবে তাকে তার দুঃখ-কষ্টের কল্যাণ বুঝানো হয়। তখন রোগী যে ভাবে রোগমুক্তির আশায় তিক্ত ওষুধ খেতে রাজী হয়, তেমনি পুণ্যবান পার্থিব দুঃখ-কষ্ট অম্লান বদনে সহ্য করে। মহানবীর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) নিম্ন হাদীসটির মর্মও তাই।
এ মর্মেই অপর একটি হাদীস এসেছে। তাতে পাই, "যে মুসলমানেরই অসুখ-বিসুখ কিংবা অনুরূপ কোন বিপদাপদ দেখা দেয় তার ছোট-খাট পাপগুলো ঠিক গাছের পাতার মতই ঝরে যায়"।
অনেক দেশেই শয়তানের আনুগত্য ও অর্চনা জোরে-শোরে করা হয়। সে সব এলাকার লোক আয়েশ-আরাম ও অত্যাচার-উৎপীড়নে পশু ও হিংস্র জীবের মত হয়। এ ধরনের লোকের শাস্তিও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মুলতবী থাকে। নিম্ন আয়াতে তারই ইংগিত পাই-
“আমি যখন কোন শহর বা গ্রামে নবী পাঠিয়েছি, তখন সেখানকার লোকদের দারিদ্য ও বালা-মসিবত দিয়ে (আল্লাহর দিকে) ফিরে আসার ব্যবস্থা করেছি। যখন তাতেও ফল হয়নি, তখন তাদের দুঃখ-দুর্দশার স্থলে সুখ-সচ্ছলতা দিয়ে ধন্য করেছি তা দেখে তারা বলাবলি করতে লাগল, আমাদের বাপ-দাদার জীবনেও এভাবে সুদিন-দুর্দিনের পালাবদল হয়েছে (পাপ-পুণ্যের এতে কোন দখল নেই)। তারপর হঠাৎ আমি এমনভাবে পাকড়াও করলাম যে, তারা ভাববারও অবকাশ পেল না। যদি এলাকার লোকরা ঈমান আনত এবং আমার কথা মতে ভাল হয়ে চলত, তা হলে আকাশ ও পৃথিবীর বরকতের ভাণ্ডার তাদের জন্য খুলে দিতাম। কিন্তু তারা আমার কথাকে মিথ্যা বলে উড়াল তাই আমিও তাদের এ পাপের বিনিময়ে আপদ-বিপদের ফাঁদে ফাঁসিয়ে নিলাম”। (সূরা আ’রাফঃ আয়াতঃ ৯৪,৯৫,৯৬)
মোট কথা, এ দুনিয়ার পুরস্কার ও শাস্তির ব্যাপারটা হল এই, প্রভু যেন ভৃত্যকে যখন তখন পূর্ণ বিনিময় দিতে প্রস্তুত নন। পূর্ণ অবসর নিয়ে তিনি তা করার জন্য সময় নির্ধারিত করে রেখেছেন। সেটা হল শেষ বিচারের দিন। আল্লাহ পাকের নিম্ন বানীতে তারই ইশারা রয়েছেঃ
“হে মানুষ ও জিন! আমি শীঘ্রই তোমাদের প্রতি (হিসাব-নিকাশের জন্য) মনোনিবেশ করব।”। (সূরা আর-রাহমানঃ আয়াতঃ ৩১)
পার্থিব শাস্তি ও পুরস্কারের কয়েকটি অবস্থা দেখা যায়। কখনও এভাবে হয় যে, মানুষের আনন্দ ও স্বস্তি কিংবা দুঃখ ও অস্বস্তি দেখা দেয়। কখনও এমন হয় যে, দুর্ভাবনায় শারীরিক অসুস্থতা বা রোগ-ব্যাধি দেখা দেয়। নবুয়তের আগে মহানবীর (সঃ) একবার দেহাবরণ খসে পড়ায় তিনি লাজে-ভয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন। এও ঠিক সেরূপ রোগ-ব্যাধি। তেমনি কখনও পার্থিব পুরস্কার ধন-সম্পদের মাধ্যমে দেয়া হয়। কখনও মানুষ, পশু ও ফেরেশতাদের কাছে ইলহাম আসে, অমুকের সাথে সদ্ব্যবহার বজায় রাখ। কখনও বা মানুষ নিজেই ইলহাম পেয়ে ভাল ও মন্দ অবস্থার সম্মুখীন হয়।
যে ব্যক্তি আমার উপরোক্ত আলোচনা ভাল ভাবে বুঝে নিবে এবং প্রতিটি কথা যথাস্থানে রেখে বিচার বিবেচনা করবে,সে অনেক জটিলতা থেকে বেঁচে যাবে। অন্যথায় সে মহানবীর (সঃ) হাদীসে পরস্পর বিরোধ দেখে মতভেদ ও দ্বিধা-দ্বন্দ্বের শিকার হবে। সে দেখতে পাবে, এক হাদীসে তিনি বলছেন, পুণ্য কাজে রুজী বাড়ে এবং পাপে তা কমে। পক্ষান্তরে অন্য হাদীসে বলছেন, পাপীদের পার্থিব জীবনের স্বল্প পরিসরে সুখ-স্বচ্ছন্দ্য দেয়া হয় এবং পুণ্যবানদের আপদ-বিপদ ও দুঃখ-দুর্দশা দেয়া হয়। এমন কি যে যত বড় পুণ্যবান তাকে তত বেশী পার্থিব দুঃখ-কষ্ট দেয়া হয়। এ ভাবের বিভিন্ন স্তরের আরও বহু হাদীসে আপাত বিরোধ ও তা থেকে উম্মতের ভেতর মতভেদ দেখা যায়। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ
মৃত্যুরহস্য
হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (১৩) শাস্তি ও পুরস্কারের কারণ
মনে রাখবেন, শাস্তি ও পুরস্কারের কারণ অনেক। তবে তার ভেতর দুটোই মূল কারণ।
(১) মানুষের সুপ্রবৃত্তি (বিবেক) তার কোন খারাপ কাজ বা স্বভাবের প্রতি রুষ্ট থাকে তার এ বিরূপ অনুভূতিই তাকে লজ্জিত, অনুতপ্ত ও আত্মগ্লানিতে বিদগ্ধ করে। অনেক সময় এ কারণে স্বপ্নে কি জাগরণে ভয়াবহ চিত্র তার সামনে ভেসে ওঠে এবং তাকে ভীষণ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করে তোলে। কোন কোন লোক যেভাবে ইলহামে অন্যান্য জ্ঞান অর্জন করেন, তেমনি তার কাজে ভাল-মন্দ সম্পর্কেও ইলহামে জ্ঞাত হবার যোগ্যতা রাখেন। সে অবস্থায় ফেরেশতাদের মাধ্যমে ঘোষিত হয়, কাজের চিত্রটি তাকে দেখিয়ে ও বুঝিয়ে দাও। এ সম্পর্কেই আল্লাহ পাক বলেনঃ
“হ্যাঁ, যারা পাপ অর্জন করল এবং স্খলন-পতন যাদের ঘিরে ফেলল, তারাই জাহান্নামের সহচর এবং সেখানকার তারা স্থায়ী বাসিন্দা”। (সূরা বাক্বারাঃ আয়াতঃ ৮১)
(২) সর্বোচ্চ পরিষদের ফেরেশতারা বনি আদমের দিকে নিবিষ্ট থাকেন। সর্বোচ্চ পরিষদের সামনে মানবীয় প্রবৃত্তি, চরিত্র ও ভাল-মন্দ কাজের চিত্র মওজুদ থাকে। তাঁরা আল্লাহর কাছে এ প্রার্থনা জানান, ‘প্রভু! নেক বান্দাদের শান্তি ও বদ চরিত্রদের শাস্তি দাও’। তাদের এ প্রার্থনা মঞ্জুর হয়। তখন আদম সন্তানদের ওপর ইলহাম অবতীর্ণ হওয়ার মতই শান্তি ও শাস্তি অবতীর্ণ হয়। এ থেকেই মানুষ সুখকর ও দুঃখদায়ক ঘটনার সম্মুখীন হয়। এ পথেই তাঁরা তাঁদের সন্তোষ ও অসন্তোষ প্রকাশ করে থাকেন।
কখনও সর্বোচ্চ পরিষদের অসন্তোষের প্রভাবে মানুষ অসুস্থ ও অবসন্ন হয়ে পড়ে। কখনও তাঁদের সন্তোষের প্রভাব এসে মানুষের স্বভাবের দুর্বলতা দূর করে তাতে দৃঢ়তা এনে দেয়। এভাবে তাঁদের প্রভাবে ফেরেশতাও মানুষ ভাল লোককে শান্তি দেয় ও মন্দ লোককে শাস্তি দেয়। কখনও মানুষের কৃতকর্মই অঘটন কিংবা শান্তিপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করে তার শান্তি ও শাস্তির কারণ হয়।
আসল সত্য হল এই, যে মানুষকে আল্লাহ ভালবেসে সৃষ্টি করেছেন, তাদের তিনি লাগাম ছাড়া হতে দিতে চান না। তাদের কাজের তিনি ভাল-মন্দ দেখবেন না, তা হতে পারে না। যেহেতু আল্লাহ কিভাবে এ ভাল বা মন্দ কাজের প্রতিদান দিবেন তা বুঝা কিছুটা দুষ্কর, তাই ফেরেশতার নেক দোয়া ও বদ দোয়ার ফলাফল রূপে তা দেখানো হল। বাদ বাকী আল্লাহই জানেন ভাল।
আমার দ্বিতীয় যুক্তিটির দিকেই আল্লাহ পাকের ইংগিত পাই-
“নিশ্চয় যারা কাফের ও কাফের থেকেই মারা যায়, তাদের ওপর আল্লাহ, ফেরেশতা ও মানুষ সবার অভিসম্পাত বর্ষিত হয়। এ অভিসম্পাতে তারা চির কাল কাটায় এবং এ শাস্তি তাদের কমে না আদৌ ও কেউ তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে না”। (সূরা বাকারাঃ আয়াতঃ ১৬১)
এ দু’ধরনের কারণের সান্নিধ্য ও সংমিশ্রণে মানব প্রকৃতির যোগ্যতার বিভিন্নতা অনুসারে নানা ধরনের অদ্ভুত কারণ সৃষ্টি হয়েছে। তবে প্রথম কারণটিই মানুষের ব্যক্তিগত স্বভাব ও কাজের ক্ষেত্রে অধিক প্রভাবশালী। সেটি মানুষের স্বভাব ও কাজকে কল্যাণময় ও ধ্বংসকর দুইই করতে পারে। তাই অধিকাংশ (বিবেকবান) জ্ঞান-গুণীগণ এটাই সমর্থন করেন। এর প্রয়োজনীয়তা কেউই অস্বীকার করতে পারে না।
দ্বিতীয় কারণটি দ্বারা এমন সব কাজ ও স্বভাব নিয়ন্ত্রিত হয় যেগুলো সামগ্রিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে থাকে। অর্থাৎ যে সব স্বভাব ও কাজ সর্বসাধারণের কল্যাণ ও শান্তির পরিপন্থী এবং মানবীয় জীবন ব্যবস্থা পরিশুদ্ধির অন্তরায় হয়। ফেরেশতা স্বভাব বা বিবেক যাদের দুর্বল, যারা পাপী তাদের স্বভাব ও কাজগুলোই এ ব্যবস্থা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।
শান্তি ও পুরস্কারের এ দুটো কারণের প্রভাব সৃষ্টির পথে কিছু অন্তরায়ও রয়েছে। সেগুলো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রভাব ঠেকিয়ে রাখে। প্রথম কারণটির অন্তরায় হল মানুষের দুর্বল বিবেক ও কুপ্রবৃত্তি। এ অবস্থা বেড়ে গিয়ে এমন পর্যায়ে পৌঁছে, যখন মানুষের ভেতর পশুত্ব ছাড়া আর কিছুই থাকে না। তখন তার বিবেক অনুভূতিহীন হয়। কোন কিছুই সেটাকে ব্যথিত করে না। তাই তার দংশনও থাকেনা। তারপর যখন তার স্বভাব থেকে পশুত্বের প্রভাব দূর হয় ও সেখানে বিবেক মাথা চাড়া দিতে থাকে, তখন তার দুঃখ দেখা দিয়ে থাকে।
দ্বিতীয় কারণের প্রভাব ততক্ষন মুলতবী থাকে যতক্ষণ তাদের ওপর আল্লাহর আজাবের পথে অন্তরায় মওজুদ থাকে। যখন তা দূর হয়ে নির্ধারিত সময় আসে (পুণ্যাত্মার বিলুপ্তি বা পাপাত্মার পূর্ণত্ব প্রাপ্তি ঘটে), তখন আজাবের রাস্তা উন্মুক্ত হয়। চারদিক থেকৈ তখন বন্যার প্রবাহে আজাব এসে তাদের ভাসিয়ে নেয়। আল্লাহর এ আয়াত তারই সাক্ষ্য বয়ে চলছেঃ-
“প্রত্যেক দল বা জাতির (পতনের) জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় রয়েছে। তাদের সময় যখন এসে যাবে, তখন তার এক মুহুর্ত ও আগ-পিছ হবে না”। (সুরা আল্-আরাফ আয়াত ৩৪)
বুধবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২৩
হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (১২) কাজের সাথে স্বভাবের সংযোগ
✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)
কাজের সাথে স্বভাবের সংযোগ
কথা থেকে যায় যে, কোন কোন কাজ এমন রয়েছে যার পছন্দ যা অপছন্দের ব্যাপারটি কারো নিজস্ব মনোভাব থেকে হয় না, হয় উচ্চ পরিষদের সরাসরি প্রভাব থেকে। এ ভাবে কোন ভাল কাজ করা যেন সর্বোচ্চ পরিষদের এ ইলহাম গ্রহণ করা ‘আমারে নৈকট্য লাভ কর, আমাদের মত হও এবং আমাদের আলোকে উজ্জ্বল হও’। তেমনি কোন খারাপ কাজ করার ক্ষেত্রে এর বিপরীত প্রভাব আসে।
সর্বোচ্চ পরিষদে কয়েকটি কারণে এভাবে কাজ নিয়ন্ত্রিত ও নির্ধারিত হয়।
(১) আল্লাহ তা'আলার তরফ থেকে তাঁরা জানতে পান, অমুক অমুক কাজগুলো না করা হলে কিংবা অমুক অমুক কাজ বর্জিত না হলে মানবীয় জীবন ধারায় পরিবর্তন ও সংস্কার আসবে না। তখন সর্বোচ্চ পরিষদে সে কাজগুলোর রূপরখা অংকিত হয়। তারপর বিশেষ বিশেষ লোকের কাছে তা আল্লাহর নির্ধারিত বিধান রূপে অবতীর্ণ হয়।
পরবর্তী পর্ব
শাস্তি ও পুরস্কারের কারণ
বিবাহ (৩৫) কন্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ
বিবাহ (পর্ব – ৩৫) 📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.) কন্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...
-
অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ৮) এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) অহংকারের প্রতিকার ও বিনয় অর্জনের উপায় উপরোক্ত আলোচনা থেকে জানা গেল যে,...
-
অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ৫) এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) অহংকারের স্বরূপ ও তার লাভ-লোকসান— অহংকার দু'প্রকার। একটি বাহ্যিক, অপ...
-
অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ৩) এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) অহংকারের নিন্দা — পবিত্র কোরআনুল কবিমে বহু স্থানে আল্লাহ তা'আলা ...






