রবিবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০২৩

হকদারের হক (৪) আল্লাহর উদ্দেশ্যে শত্রুতার পরিচয়


হকদারের হক পর্ব- ৪
📚সৌভাগ্যের পরশমণি   ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

আল্লাহর উদ্দেশ্যে শত্রুতার পরিচয়
যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশ্যে তাঁহার আজ্ঞানুবর্তী বান্দাগণকে ভালবাসিবে সে স্বতঃ কাফির, জালিম, গুনাহ্গার ও ফাসিকদিগকে শত্রু বলিয়া গণ্য করিবে। কারণ কেহ, কাহাকেও ভালবাসিলে সে বন্ধুর-বন্ধুকেও বন্ধু ও শত্রুকে শত্রুরূপে গ্রহণ করিয়া থাকে। এবং কাফির, জালিম, গুনাহ্গার ও ফাসিকগণ আল্লাহর শত্রু। কোন মুসলমান ফাসিক (পাপী) হইলে মুসলমান হওয়ার কারণে তাহাকে ভালবাসিতে হইবে এবং পাপের কারণে তৎপ্রতি অসন্তুষ্ট থাকিতে হইবে। এইরূপ স্থলে ভালবাসা ও অসন্তুষ্টি একত্রে মিলিত হইবে। যেমন, এক ব্যক্তি এক পুত্রকে পুরস্কার প্রদান করিল কিন্তু অপর পুত্রকে কিছুই দিল না। এইরূপ ক্ষেত্রে বুঝিতে হইবে, এক কারণে সে এক পুত্রকে ভালবাসে এবং অন্য এক কারণে সে অপর পুত্রের প্রতি অসন্তুষ্ট; ইহা অসম্ভব নহে। কারণ, যেমন এক ব্যক্তির তিন পুত্র আছে। তন্মধ্যে একজন বুদ্ধিমান পিতৃভক্ত; দ্বিতীয়জন বোকা ও পিতার অবাধ্য এবং তৃতীয় জন নির্বোধ কিন্তু পিতৃভক্ত। এমতাবস্থায় সে ব্যক্তি প্রথম পুত্রকে ভালবাসিবে, দ্বিতীয় পুত্রের প্রতি অসন্তুষ্ট থাকিবে এবং তৃতীয় পুত্রকে পিতৃ ভক্ত হওয়ার জন্য ভালবাসিবে ও নির্বুদ্ধিতার দরুন তৎপ্রতি অসন্তুষ্ট থাকিবে। আচার-ব্যবহারে ইহার প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হইয়া থাকে। কেননা সে প্রথম পুত্রকে স্নেহের দৃষ্টিতে দেখিবে। দ্বিতীয় পুত্রকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখিবে এবং তৃতীয় পুত্রের কিছুটা স্নেহ ও কিছুটা অবজ্ঞার চোখে দেখিবে।
ফলকথা, যে ব্যক্তি আল্লাহর নাফরমানী করে, তৎপ্রতি তোমার এইরূপভাব পোষণ করা কর্তব্য যে, যেন সে তোমার বিরুদ্ধাচরণ করিয়া থাকে এবং বিরুদ্ধাচরণের পরিমাণ অনুযায়ী তুমিও তাহার প্রতি শত্রুতা পোষণ করিয়া থাক। আবার আল্লাহর প্রতি তাহার বাধ্যতা ও আনুগত্যের পরিমাণ অনুযায়ী তাহাকে ভালবাসিতে হইবে যেন উহার প্রতিক্রিয়া পরস্পর আচার-ব্যবহার, কাজ-কারবার, সঙ্গ-সাহচর্য এবং কথাবার্তায় প্রকাশ পায়। এমনকি পাপীর সংসর্গে তুমি যাইবে না এবং তাহার সঙ্গে কর্কশ ভাষা ব্যবহার করিবে। আর তাহার পাপ অত্যাধিক বৃদ্ধি পাইয়া থাকিলে তাহা হইতে বহুদূরে থাকিবে এবং তাহার পাপ সীমা অতিক্রম করিয়া গেলে তাহার সহিত কথাবার্তা বন্ধ করিয়া তাহা হইতে অন্যদিকে মুখ ফিরাইবে। অত্যাচারীর সাহিত পাপী অপেক্ষা অধিক রূঢ় ও কঠোর ব্যবহার করিতে হইবে।
কিন্তু যে ব্যক্তি কেবল তোমার উপর অত্যাচার করিয়াছে তাহাকে ক্ষমা করা ও অত্যাচার সহ্য করিয়া যাওয়া উত্তম। এ সম্বন্ধে প্রাচীন বুযর্গগণের বিভিন্নরূপ অভ্যাস ছিল। কেহ কেহ ধর্মীয় বন্ধনও শরীয়তের শাসন দৃঢ় রাখার উদ্দেশ্যে পাপী ও অত্যাচারীর প্রতি খুব কড়া ব্যবহার করিতেন এবং হযরত ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল (রহঃ) তাহাদের অন্যতম।
হারিস মজামী দর্শন শাস্ত্রে একখানা গ্রন্থ রচনা করেন। ইহাতে মুতাযিলা সম্প্রদায়ের ভ্রান্ত মতবাদের খণ্ডন করা হইয়াছে। কিন্তু এই সম্প্রদায়ের ভ্রান্ত মতবাদসমূহ প্রথমে বর্ণিত হইয়াছে। ইহাতে হযরত ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল (রহঃ) উক্ত গ্রন্থকারের প্রতি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হইয়া তৎপর যুক্তি-প্রমাণ দ্বারা উহা খণ্ডন করিয়াছেন। হয়ত কেহ এই ভ্রান্ত মতবাদগুলি পাঠ করিবে এবং উহা তাহার অন্তরে বদ্ধমূল হইয়া পড়িবে। হযরত ইয়াহইয়া ইব্‌ন মুঈন বলিলেন : কাহারও নিকট আমি কিছু প্রত্যাশা করি না। কিন্তু বাদশাহ আমাকে কিছু দান করিলে আমি তাহা গ্রহণ করিব। ইহাতে হযরত ইমাম সাহেব (রহঃ) তাঁহার প্রতি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হইলেন; এমনকি তাঁহার সহিত কথাবার্তা বন্ধ করিয়া দিলেন। তিনি তখন হযরত ইমাম সাহেব (রহঃ)-র নিকট ক্ষমা চাহিয়া বলিলেন : আমি ঠাট্টা করিতেছিলাম। হযরত ইমাম সাহেব (রহঃ) বলিলেন : হালাল জীবিকা ভোগ করা ধর্মের বিধান। কিন্তু ধর্ম-বিষয়ে ঠাট্টা করা সঙ্গত নহে।
কেহ কেহ আবার সর্বপ্রকার পাপীকেই দয়ার চোখে দেখিতেন। কিন্তু এইরূপ দয়ার নিয়্যত সর্বদা পরিবর্তনশীল। কারণ, তাওহীদের প্রতি যাঁহার লক্ষ্য, তিনি আল্লাহর প্রবল প্রতাপান্বিত কবলে সকলকেই অস্থির অবস্থায় দেখিতে পান এবং সকলকেই দয়ার চোখে দেখিয়া থাকেন। এইরূপ মনোভাব খুব বড় কথা। কিন্তু নির্বোধ লোকদের ইহাতে ধোকায় পতিত হওয়ার সম্ভাবনা রহিয়াছে। কারণ, এমন লোকও আছে, যে অপরের পাপ ও উৎপীড়নের প্রতি গুরুত্ব প্রদান না করিয়া অম্লান বদনে সহ্য করিয়া যায়। কিন্তু নির্বোধ ব্যক্তি ইহাকে তাওহীদের প্রভাব বলিয়া মনে করিয়া থাকে। অথচ তাওহীদের লক্ষণ এই যে, কেহ প্রহার করিলে, ধন-সম্পদ কাড়িয়া লইলে, অপমান করিলে অথবা গালি দিলে ক্রোধের সঞ্চার হয় না; বরং তিনি মনে করেন যে, সমস্তই আল্লাহর তরফ হইতে ঘটিতেছে এবং উহাতে মানুষের কোন হাত নাই। অতএব কাহারও প্রতি ক্রুদ্ধ না হইয়া তিনি তাহাদিগকে দয়ার চোখে দেখিয়া থাকেন। যেমন কাফিরগণ উহুদের যুদ্ধে যখন রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর দান্দান (দাঁত) মুবারক প্রস্তরাঘাতে ভাঙ্গিয়া ফেলে এবং ফলে তাঁহার নূরাণী চেহারা মুবারক রক্তাপ্লুত হইয়া যায়। তখন তিনি তাহাদের প্রতি ক্রুদ্ধ না হইয়া এই দু'আ করিতে লাগিলেন :
>“ইয়া আল্লাহ্! আমার কওমকে হিদায়ত করুন। কারণ, নিশ্চয়ই তাহারা অজ্ঞান।”
কিন্তু এমন যদি হয় যে, নিজের প্রতি অত্যাচার হইলে ক্রুদ্ধ হইয়া থাকে এবং আল্লাহর নাফরমানী করিলে নীরব থাকে, তবে ইহা ধর্ম-বিষয়ে গুরুত্ব প্রদানের অভাব, কপটতা ও বোকামি বলিয়া গণ্য হইবে। ইহা তাওহীদের লক্ষণ নহে। সুতরাং যাহার উপর তাওহীদ তত প্রবল হইয়া উঠে নাই এবং সে পাপীকে পাপের দরূন অন্তরে শত্রু জ্ঞান করে না, ইহা তাহার ঈমানের দুর্বলতা ও পাপীর সহিত তাহার বন্ধুত্বের প্রমাণ। যেমন, কেহ তোমার বন্ধুকে মন্দ বলিলে তুমি যদি ইহাতে ক্রুদ্ধ না হও তবে বুঝা যাইবে যে, তোমার বন্ধুত্ব খাঁটি নহে।

হকদারের হক (৩) আল্লাহর প্রতি মহব্বতের দ্বিবিধ কারণ


হকদারের হক পর্ব- ৩
📚সৌভাগ্যের পরশমণি   ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
আল্লাহর প্রতি মহব্বতের দ্বিবিধ কারণ
প্রথম, মানবের প্রতি পরম করুণাময় আল্লাহর ইহলৌকিক ও পারলৌকিক দানের কারণে মহব্বত; দ্বিতীয়, কেবল আল্লাহর জন্যই আল্লাহ্‌কে ভালবাসা। কোন বস্তু বা উদ্দেশ্যের সহিত উহার আদৌ কোন সংশ্রব নাই। ইহা অতি উচ্চ স্তরের মহব্বত। এই গ্রন্থের পরিত্রাণ খণ্ডে ‘মহব্বত' অধ্যায়ে ইহার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হইবে। মোট কথা, ঈমানের বল অনুপাতে আল্লাহর মহব্বত প্রবল হইয়া থাকে। ঈমান যত বলবান হইবে মহব্বতও ততই প্রবল ও প্রগাঢ় হইয়া উঠিবে। তৎপর ইহা আল্লাহর প্রিয়জনের মধ্যে সঞ্চারিত হইবে। স্বার্থ ও উপকারের কারণে ভালবাসার উদ্রেক হইলে পূর্বকালীন নবী ও ওলীগণের প্রতি কাহারও ভালবাসা জন্মিত না। অথচ তাঁহাদের প্রতি ভালবাসা সকল মুসলমানের অন্তরেই রহিয়াছে। সুতরাং ধর্মপথের দিশারী আলিম, সূফী, সংসারবিরাগী এবং তাঁহাদের খাদিম ও বন্ধুগণের প্রতি যে ভালবাসা জন্মে, তাহা আল্লাহর উদ্দেশ্যেই হইয়া থাকে বলিতে হইবে। কিন্তু আল্লাহর রাস্তায় মান-সম্ভ্রম ও ধন-দৌলত উৎসর্গ করার পরিমাণ দ্বারাই তাঁহার প্রতি মহব্বতের পরিমাণ নির্ণয় করা চলে। কাহারও ঈমান ও মহব্বত এত প্রবল যে, তিনি নিজের যথাসর্বস্ব একবারেই আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ করিয়া দিয়া থাকেন। যেমন হযরত আবূবকর সিদ্দীক (রাঃ) তাঁহার যথাসর্বস্ব একবারেই আল্লাহর রাস্তায় দান করিয়াছিলেন। আবার কেহ এইরূপও হইয়া থাকেন যে, তাঁহার অর্ধেক ধন-সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ করেন। যেমন, হযরত উমর (রাঃ) এইরূপ করিয়াছিলেন। আবার কেহ কেহ অল্প ধন-সম্পদই আল্লাহর রাস্তায় দান করিয়া থাকে। অল্পই হউক আর অধিকই হউক, কোন মুসলমানের হৃদয়ই এরূপ নিঃস্বার্থ ভালবাসা হইতে একবারে মুক্ত থাকিবে না।

হকদারের হক (২) আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালবাসার নিদর্শন


হকদারের হক পর্ব- ২
📚সৌভাগ্যের পরশমণি   ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালবাসার নিদর্শন
একই মক্তব, মাদ্রাসা বা গ্রামে অবস্থান অথবা ভ্রমণে একত্রে থাকার কারণে যে ভালবাসার উৎপত্তি হয় তাহা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালবাসার অন্তর্ভুক্ত নহে। আবার দেখিতে মনোহর, বচনে মিষ্টভাষী এবং অন্তরে সরল ও অকপট হওয়ার দরুন অপরের প্রতি যে ভালবাসার উদ্রেক হয়, তাহাও আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালবাসার অন্তর্ভুক্ত নহে। কাহারও সাহায্যে পদমর্যাদা কিংবা ধন-সম্পদ লাভ হইলে অথবা কাহারও সহিত সাংসারিক কোন কার্যে নিবদ্ধ থাকিলে যে ভালবাসা জন্মে তাহাও আল্লাহ্ উদ্দেশ্যে ভালবাসার অন্তর্গত নহে।
আল্লাহ্ ও আখিরাতের উপর যাহার ঈমান নাই তাহার সহিতও এইরূপ ভালবাসা জন্মিতে পারে। ঈমান ব্যতীত আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালবাসা হইতে পারে না।
আল্লাহ্ উদ্দেশ্যে ভালবাসার দুইটি সোপান আছে।
প্রথম সোপান : আল্লাহর উদ্দেশ্যে স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ভালবাসা। কিন্তু এই স্বার্থ ধর্ম আল্লাহর জন্য হইতে হইবে। যেমন ধর্মবিদ্যা শিক্ষা দেন বলিয়া উস্তাদকে ভালবাসা। এই বিদ্যার উদ্দেশ্য পরকাল হইলে এবং সাংসারিক পদমর্যাদা ও ধনলাভের জন্য না হইলেও উস্তাদের প্রতি ভালবাসাকে আল্লাহর ওয়াস্তে ভালবাসা বলা যাইবে। কিন্তু পর্থিব মান-মর্যাদা ও ধন-দৌলত লাভ করা, বিদ্যা অর্জনের উদ্দেশ্যে হইলে উহাকে আল্লাহর ওয়াস্তে বলা যাইবে না। সদকা প্রদানকারী যদি এমন লোককে ভালবাসে যে তাহার নিকট হইতে সদকা গ্রহণপূর্বক শর্তানুসারে গরীব-দুঃখীদিগকে উহা পৌছাইয়া দেয় কিংবা তাহাদের আতিথ্য করিয়া থাকে অথবা এমন লোককে যদি ভালবাসে যে গরীব-দুঃখীদের জন্য উত্তমরূপে খাদ্য পাকাইয়া থাকে তবে এই ভালবাসা আল্লাহর ওয়াস্তে বলিয়া গণ্য হইবে। যে ব্যক্তি খাদ্য-বস্ত্র প্রদান করতঃ নিরুদ্বেগে ও একাগ্রচিত্তে ইবাদত করিবার সুযোগ দান করে তাহার প্রতি ভালবাসাও আল্লাহর ওয়াস্তে ভালবাসার মধ্যে গণ্য হইবে। কিন্তু শর্ত এই যে, খাদ্য-বস্ত্ৰ পাইয়া নিশ্চিত মনে ইবাদত করিবার উদ্দেশ্য থাকিতে হইবে। বহু আলিম ও আবিদ এই উদ্দেশ্যে ধনীদের সহিত বন্ধুত্ব স্থাপন করিয়া থাকেন এবং ফলে উভয় দলই আল্লাহর ভালবাসা লাভ করিয়া থাকেন।
মন্দ কার্য হইতে স্বামীকে বাঁচাইবে এবং এমন সন্তান জন্মিবার উপলক্ষ হইবে যে পিতার মঙ্গলের জন্য যুদ্ধ করিবে, এই কারণে স্বীয় স্ত্রীকে ভালবাসিলে এই ভালবাসাও আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালবাসা বলিয়া গণ্য হইবে এবং এইরূপ স্ত্রীকে ভরণ-পোষণের ব্যয়ও সদকার মধ্যে গণ্য। ভৃত্য প্রভুর খেদমত করে এবং সে তাহার কার্যভার গ্রহণপূর্বক প্রভূকে নিশ্চিন্ত মনে ইবাদতের অবসর প্রদান করে বলিয়া ভৃত্যকে ভালবাসিলে ইবাদতে অবসর করার দরুন ভৃত্যের প্রতি যে ভালবাসাটুকু হয়, তাহা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালবাসা বলিয়া গণ্য হইবে এবং উহার সওয়াবও পাওয়া যাইবে।
দ্বিতীয় সোপান : যে ভালবাসা নিঃস্বার্থভাবে একমাত্র আল্লাহর ওয়াস্তেই হইয়া থাকে এবং যাহাতে উভয় পক্ষের অন্য কোন প্রকার স্বার্থের লেশমাত্রও থাকে না, উহাই এই উচ্চ সোপানের ভালবাসা। ইহা পূর্বোক্ত স্বার্থসংশ্লিষ্ট ভালবাসা অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর। শিক্ষা প্রদান, শিক্ষা গ্রহণ, ইবাদতে অবসরলাভ এবং বিধ কোন প্রকার স্বার্থই ইহাতে থাকে না। আল্লাহর আজ্ঞানুবর্তী ও তাঁহার প্রিয়পাত্র বলিয়া কাহাকেও ভালবাসিলে ইহাকে এই শ্রেণীর ভালবাসা বলে। কিংবা অন্ততঃপক্ষে ইহা মনে করিয়াও যদি কেহ কাহাকেও ভালবাসে যে, এই ব্যক্তি আল্লাহর বান্দা, তাঁহারই সৃষ্টি, তবে ইহাও আল্লাহর ওয়াস্তে বন্ধুত্বের অন্তর্ভুক্ত এবং ইহার বড় সওয়াব পাওয়া যাইবে। কারণ, এইরূপ ভালবাসা আল্লাহর প্রতি এমন মহব্বত হইতে জন্মিয়া থাকে যাহা ইশকের পর্যায়ে উন্নীত হইয়াছে। যেমন, কেহ কাহারও প্রতি আশিক হইলে সে মাশুকের অলি-গলি এবং তাহার মহল্লাকেও ভালবাসে। আর প্রিয়জনের গৃহ প্রাচীরও তাহার নিকট প্রিয় হইয়া পড়ে। এমন কি যে কুকুর প্রিয়জনের গলিতে যাতায়াত করে, ইহাও অন্যান্য কুকুর অপেক্ষা উক্ত আশিকের নিকট অধিক প্রিয় হইয়া উঠে। অতএব যাহারা তাহার প্রেমাষ্পদকে ভালবাসে অথবা যাহাদিগকে তাহার প্রেমাষ্পদ ভালবাসে তাহাদিগকে, এমন কি যাহারা প্রেমাষ্পদের আজ্ঞানুবর্তী চাকর-বাকর, দাস-দাসী তাহাদিগকে এবং তাহার আত্মীয়-স্বজনকেও প্রেমিক স্বতঃই ভালবাসিয়া থাকে। কারণ, প্রেমাম্পদের সহিত সংশ্লিষ্ট সম্বন্ধযুক্ত বস্তু ও ব্যক্তির প্রতি ভালবাসা স্বতঃই প্রেমিকের অন্তরে অনুপ্রবেশ করে। প্রিয়জনের প্রতি প্রেম যত অধিক, তাহার সহিত সংশ্লিষ্ট ও তাহার অনুগত ব্যক্তিগণের প্রতিও সেই প্রেমের প্রতিক্রিয়ারূপ ভালবাসা তত অধিক হইয়া থাকে ।
সুতরাং যাহার অন্তরে আল্লাহর মহব্বত বৃদ্ধি পাইয়া ইশকের পর্যায়ে উন্নীত হইয়াছে তিনি সাধারণভাবে তাঁহার সমস্ত বান্দাকে এবং বিশেষভাবে তাঁহার প্রিয়পাত্রগণকে ভালবাসিয়া থাকেন। সমস্ত মাখলুকাত স্বীয় প্রেমাস্পদের অপরিসীম শক্তির পরিচায়ক ও তাঁহার শিল্পনৈপুণ্যের জ্বলন্ত নিদর্শন, এইজন্য তিনি এই সমস্তকেই ভালবাসিয়া থাকেন। অপর কারণ এই যে, আশিক মাশুকের হস্তলিপি ও শিল্পকলাকেও ভালবাসিয়া থাকে।
রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর সমীপে কেহ নূতন ফল আনয়ণ করিলে তিনি উহার সম্মান করিতেন এবং স্বীয় চক্ষু মুবারকে লাগাইয়া বলিতেন যে, উহার সৃষ্টিকাল আল্লাহর নিকটবর্তী অর্থাৎ উহা প্রকৃত শিল্পী আল্লাহর নূতন শিল্প নৈপূণ্য।

হকদারের হক (১) বন্ধুত্বের ফযীলত



হকদারের হক পর্ব- ১
📚সৌভাগ্যের পরশমণি   ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

বন্ধুত্বের ফযীলত
আল্লাহ যাহার হিত কামনা করেন তাহাকে উৎকৃষ্ট বন্ধু দান করেন, যেন সে আল্লাহ্‌কে ভুলিয়া গেলে বন্ধু তাহাকে স্মরণ করাইয়া দেয়; আর সে আল্লাহর স্মরণে লিপ্ত থাকিলে বন্ধু তাহার সঙ্গী ও সহায়ক থাকে। তিনি আরও বলেনঃ দুইজন মু'মিন পরস্পর মিলিত হইলে একের দ্বারা অন্যের কোন ধর্মীয় উপকার না হইয়া পারে না। তিনি অন্যত্র বলেন : কোন ব্যক্তি অপরকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে স্বীয় ভ্রাতারূপে গ্রহণ করিলে তাহাকে বেহেশতে এমন উন্নত মর্যাদা প্রদান করা হইবে যাহা অন্য কোন নেককার্য দ্বারা লাভ করা যায় না। হযরত আবূ ইদরীস খাওলানী (রঃ) হযরত মুআয (রাঃ)-কে বলিলেন : আমি আল্লাহর ওয়াস্তে তোমাকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করিলাম। তিনি বলিলেন : আমি তোমাকে শুভ সংবাদ প্রদান করি যে, আমি রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-উনাকে বলিতে শুনিয়াছি-
>“কিয়ামত দিবস আরশের আশে পাশে কুরসীসমূহ স্থাপিত হইবে। কতিপয় লোক উহাতে উপবেশন করিবে। তাহাদের চেহারা পূর্ণচন্দ্রের ন্যায় দীপ্তিমান হইবে। সমস্ত লোক তো ভীত থাকিবে, অথচ এই সকল কুরসীতে সমাসীন লোক নির্ভয়ে থাকিবে; সব লোক ভীত-সন্ত্রস্ত থাকিবে; (কিন্তু) এই সকল লোক প্রশান্ত থাকিবে। কুরসীতে সমাসীন এই সমস্ত লোক আল্লাহ্ তা'আলার বন্ধু। তাহাদের কোন ভয় বা চিন্তা থাকিবে না।”
সাহাবাগণ নিবেদন করিলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ্ ! (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাঁহারা কারা? রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেনঃ
"তাহারা এইরূপ লোক যাহারা আল্লাহর উদ্দেশ্যে একে অন্যের সহিত বন্ধুত্ব স্থাপন করিয়াছিল"।
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ
>“যে দুই ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশ্যে বন্ধুত্ব স্থাপন করে তন্মধ্যে আল্লাহ্ সেই ব্যক্তিকে অধিক ভালবাসেন যে স্বীয় বন্ধুকে অধিক ভালবাসে।” তিনি আরও বলেন : আল্লাহ্ বলেন :
>“যাহাদের একজন অপরজনের সহিত আমার উদ্দেশ্যে সাক্ষাত করে, একজন অপরজনের সহিত আমার উদ্দেশ্যে বন্ধুত্ব স্থাপন করে, আমার উদ্দেশ্যে একজন অপরজনকে ক্ষমা করে এবং আমার জন্য একে অন্যকে সহায়তা করে, তাহারা আমার বন্ধু হওয়ার যোগ্য।”
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন :
>“কিয়ামত দিবস আল্লাহ্ বলিবেন, যে সকল লোক আমার জন্য পরস্পর বন্ধুত্ব করিয়াছিল তাহারা কোথায়? আজ মানবের আশ্রয়ের জন্য কোথাও ছায়া নাই; আমি তাহাদিগকে স্বীয় (আরশের) ছায়ায় আশ্রয় প্রদান করিব।”
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ
>“কিয়ামত দিবস সাত প্রকার লোক আল্লাহর আরশের ছায়া লাভ করিবে, তাহারা ব্যতীত অপর কেহই কোন ছায়া পাইবে না। তাহারা হলো-
(১) সুবিচারক ও ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ্।
(২) যে যুবক যৌবনের প্রারম্ভ হইতে আল্লাহ্ ইবাদতে লিপ্ত রহিয়াছে।
(৩) যে ব্যক্তি মসজিদ হইতে বহির্গত হইয়া পুনরায় মসজিদে প্রবেশ করা পর্যন্ত সময়ে তাহার হৃদয় মসজিদের প্রতি আকৃষ্ট থাকে।
(৪) যে দুই ব্যক্তি কেবল আল্লাহর উদ্দেশ্যে পরস্পর বন্ধুত্ব স্থাপন করে, আল্লাহর উদ্দেশ্যেই মিলিত হয় এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে সংসর্গ বর্জন করে।
(৫) যে ব্যক্তি নির্জনে আল্লাহ তা’আলাকে স্মরণ করিয়া রোদন করে।
(৬) যে ব্যক্তিকে কোন ধনবতী ও সুন্দরী যুবতী নিজের দিকে আহ্বান করে এবং সে বলে 'আমি আল্লাহকে ভয় করি।'
(৭) সেই ব্যক্তি যেন ডান হাতে এমনভাবে দান করে যে তাহার বাম হাতও জানিতে না পারে।"
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন :
>"যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশ্যে তাহার মুসলমান ভ্রাতার সহিত সাক্ষাত করে, এক ফেরেশতা তাহার পশ্চাতে ঘোষণা করিয়া বলে-আল্লাহর বেহেশত তোমার জন্য মুবারক হউক।" তিনি আরও বলেনঃ
>"এক ব্যক্তি তাহার কোন বন্ধুর সহিত সাক্ষাত করিতে যাইতেছিল। আল্লাহর আদেশে পথিমধ্যে এক ফেরেশতা তাহার সহিত সাক্ষাত করিল।
ফেরেশতা তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল- তুমি কোথায় যাইতেছ?
সে বলিল-অমুক ভ্রাতার সহিত সাক্ষাত করিতে যাইতেছি।
ফেরেশতা জিজ্ঞাসা করিল-তাহার নিকট তোমার কোন কাজ আছে কি?
সে বলিল-কোন কাজ নাই।
ফেরেশতা আবার জিজ্ঞাসা করিল--তাহার সহিত তোমার কোন আত্মীয়তা আছে কি?
সে বলিল-কিছুই নহে।
ফেরেশতা পুনরায় জিজ্ঞাসা করিল-সে তোমার কোন উপকার করিয়ছে কি?
সে বলিল-কিছুই নহে।
ফেরেশতা জিজ্ঞাসা করিল- তবে কেন যাইতেছ?
সে বলিল-আল্লাহর উদ্দেশ্যে তাহার নিকট যাইতেছি এবং তাহাকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করিয়াছি।
ফেরেশতা বলিল-তোমাকে এই শুভ সংবাদ প্রদানের জন্য আল্লাহ্ আমাকে তোমার নিকট প্রেরণ করিয়াছেন যে, সেই ব্যক্তিকে তুমি ভালবাস বলিয়া আল্লাহ্ তোমাকে ভালবাসেন এবং তোমার জন্য তাঁহার উপর বেহেশত ওয়াজিব করিয়া লইয়াছেন।"
রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ
>"সেই বন্ধুত্ব এবং শত্রুতা ঈমানের দৃঢ়তম দলীল যাহা আল্লাহর ওয়াস্তে হইয়া থাকে।"
আল্লাহ্ কোন নবী (আঃ)-এর উপর ওহী প্রেরণ করিলেন,
>"তুমি যে যুহদ (অর্থাৎ সংসার বিরাগ ও পরকাল আসক্তি) অবলম্বন করিয়াছ, ইহাতে স্বীয় শান্তি লাভের জন্য তাড়াতাড়ি করিয়াছ। কারণ ইহাতে সংসার ও সাংসারিক দুঃখ-কষ্ট হইতে মুক্তি পাইয়াছ। আর তুমি যে আমার ইবাদতে মশগুল হইয়াছ ইহাতে স্বীয় মর্যাদা লাভ করিয়াছ। কিন্তু ভাবিয়া দেখ, তুমি কি কখনও আমার বন্ধুগণের সহিত বন্ধুত্ব এবং আমার শত্রুদের সহিত শত্রুতা করিয়াছ?"
আল্লাহ্ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর ওহী প্রেরণ করিলেন :
>"হে ঈসা ! আপনি যদি পৃথিবী ও আকাশের অধিবাসীবৃন্দের সমস্ত ইবাদত একা সম্পন্ন করেন এবং এই সকল ইবাদতের মধ্যে আমার উদ্দেশ্যে অন্যের সহিত বন্ধুত্ব বা শত্রুতা না থাকে তবে এই সমস্ত ইবাদত নিষ্ফল।"
হযরত ঈসা (আঃ) বলেন:
>"পাপীদের সহিত শত্রুতা করিয়া তোমরা আল্লাহর প্রিয়পাত্র হও, তাহাদিগ হইতে দূরে থাকিয়া আল্লাহর নিকটবর্তী হও এবং তাহাদের প্রতি ক্রোধ করিয়া আল্লাহর সন্তোষ অন্বেষণ কর"।
লোকে জিজ্ঞাসা করিলঃ হে রূহুল্লাহ ! আমরা কাহার সহিত উঠাবসা করিব? তিনি বলিলেনঃ
>"এমন লোকের নিকট বস যাহাকে দর্শন করিলে আল্লাহর স্মরণ তোমাদের অন্তরে জাগ্রত হয়, যাহার কথা তোমাদের জ্ঞান বৃদ্ধি করে এবং যাহার কার্যাবলী তোমাদিগকে পরকালের প্রতি আকৃষ্ট করে"।
আল্লাহ্ হযরত দাউদ (আঃ)-এর উপর ওহী প্রেরণ করিলেনঃ হে দাউদ ! মানব-সমাজ পরিত্যগ করতঃ আপনি নির্জনে বসিয়াছেন কেন? তিনি নিবেদন করিলেন : ইয়া আল্লাহ্ ! আপনার মহব্বত আমার অন্তর হইতে সৃষ্টের স্মরণ বিস্মৃত করিয়া দিয়াছে এবং আমি সকলের প্রতি বিরক্ত হইয়া পড়িয়াছি। নির্দেশ হইলঃ হে দাউদ ! সাবধান হোন এবং নিজের জন্য ভাই বন্ধু বানাইয়া নেন। আর যে ব্যক্তি ধর্ম-পথে আপনার সহায়ক না হয়, তাহা হইতে দূরে থাকুন; কারণ সে ব্যক্তি আপনার হৃদয় অন্ধকার করিয়া ফেলিবে এবং আপনাকে আমা হইতে দূরে সরাইয়া রাখিবে।
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন :
>"আল্লাহর এক ফেরেশতা আছে, তাহার দেহের অর্ধাংশ বরফ দ্বারা ও অপর অর্ধাংশ অগ্নি দ্বারা সৃষ্ট। এই ফেরেশতা বলে : "ইয়া আল্লাহ্! যেমন আপনি বরফ ও অগ্নির মধ্যে সখ্যতা স্থাপন করিয়াছেন তদ্রূপ আপনার নেক বান্দাগণের অন্তরে সখ্যতা স্থাপন করিয়া দেন।"
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ
>"যাহারা আল্লাহর উদ্দেশ্যে পরস্পর বন্ধুত্ব স্থাপন করে তাহাদের জন্য বেহেশতে লোহিত বর্ণ ইয়াকৃত নির্মিত একটি স্তম্ভ তৈয়ার করা হইবে। ইহার উপর সত্তর হাজার বালাখানা থাকিবে। তথা হইতে তাহারা বেহেশতবাসিগণকে ঝুঁকিয়া দেখিবে। তাহাদের মুখমণ্ডলের জ্যোতি বেহেশতবাসিগণের উপর এমনভাবে প্রতিফলিত হইবে যেমন পৃথিবীর উপর সূর্যকিরণ প্রতিফরিত হইয়া থাকে। বেহেশতবাসিগণ বলিবে-চল, আমরা তাহাদিগকে দেখিয়া আসি। তাহাদের পরিধানে সবুজ রেশমী পোশাক থাকিবে এবং তাহাদের ললাটে লিখিত থাকিবে (আল মুতাহাব্বুনা ফি আল্লাহ্) এই সকল লোক আল্লাহর উদ্দেশ্যে পরস্পর বন্ধুত্ব স্থাপনকারী।"
হযরত ইব্‌ন সামাক (রঃ) মৃত্যুকালে আল্লাহর নিকট নিবেদন করিলেনঃ ইয়া আল্লাহ্ ! আপনি জানেন, আমি পাপ করিবার সময় আপনার অনুগত বান্দাগণকে ভালবাসিতাম। এই কার্যের ফলস্বরূপ আমার পাপসমূহ মাফ করিয়া দেন।
হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন : আল্লাহর উদ্দেশ্যে বন্ধুত্ব স্থাপনকারিগণ যখন একে অন্যকে দেখিয়া আনন্দিত হয় তখন তাহাদের নিকট হইতে গুনাহ্ এইরূপভাবে ঝরিয়া পড়ে যেমন বৃক্ষ হইতে পত্র ঝরিয়া পড়িতে থাকে।

পরবর্তী পর্ব
আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালবাসার নিদর্শন

শনিবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০২৩

হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (১৪) পার্থিব শাস্তি-পুরস্কার



📚 হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (পর্ব- ১৪)
✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)

প্রথম পরিচ্ছেদ (১৪) 
পার্থিব শাস্তি-পুরস্কার -
আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “অনন্তর যা কিছু বিপর্যয় তোমাদের ওপর নেমে আসেতা তোমাদেরই স্বহস্তে উপার্জিত বৈ নয়। এবং অনেককে রেহাইও দেয়া হয়ে থাকে (সূরা শূরাঃ আয়াতঃ ৩০) 

অন্যত্র তিনি বলেনঃ-  
যদি তারা তাওরাতইঞ্জীল কিংবা যা কিছু তাদের কাছে অবতীর্ণ হয়েছে তা বাস্তবায়িত করত তা হলে আকাশ ও পৃথিবীর সব দিক থেকে তারা অফুরন্ত নেয়ামত ভোগ করতে পেত (সূরা মায়েদাঃ ৬৬)

কৃপণ বাগানের মালিক প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা (সূরা নূহে) যে ঘটনার উল্লেখ করেছেন তা প্রণিধানযোগ্য। (বাগানের মালিক তিন ভাই প্রতি মৌসুমে ফসল কাটার সময়ে উপস্থিত ভিক্ষুকদের ভেতর কিছু অংশ বিতরণ করত। একবার রাতারাতি ফসল কেটে ভিক্ষুকদের পৌঁছার আগেই তা ঘরে তোলার অভিলাষ নিয়ে গিয়ে দেখল বাগান জ্বলে গেছে।) মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) কুরআনের  
["এবং তোমরা যা খুলে বল বা গোপন রাখসব কিছুর হিসাব আল্লাহ নেবেন" (সূরা বাক্বারাঃ ২৮৪)]
[ "এবং খারাপ কাজ করবে তাকে শাস্তি পেতে হবে"] আয়াত দুটির ব্যাখ্যা প্রসংগে বলেন, ‘এ হিসাব নেয়া ও শাস্তি দেয়া আল্লাহর অসুখ-বিসুখ ও অন্যান্য বিপদাপদের দ্বারা কার্যকরী করেন। পকেটের কিছু হারিয়ে যে দুর্ভাবনা ও মনোকষ্ট দেখা দেয় তাও তার ভেতরে শামিল। এ ভাবের বিপদাপদের ভেতর দিয়ে মানুষ তার ছোট-খাট পাপগুলো কাফফারা দিয়ে দিয়ে এরূপ নিষ্পাপ হবে যেন আগুনে জ্বালিয়ে সোনা খাঁটি করা হল। 
জেনে রাখুনবিবেক রিপুর হাতে মার খেয়েও আবার মাথা তুলে দাঁড়ায়। একটি উপায় হল তার স্বাভাবিক মৃত্যু। দ্বিতীয় উপায় হল তার ইচ্ছা করে মরার মত হওয়া। স্বাভাবিক মৃত্যুতে রিপুগুলোর রুজী রুটি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে তার বেঁচে থাকার শক্তি এভাবে বিলুপ্ত হয় যা আর ফিরে পাবার নয়। এ অবস্থায় ক্ষুৎ-পিপাসালোভ-লালসা ও রাগ-দ্বেষ কিছুই তার থাকে না বলে তার ওপর আত্মিক জগতের প্রভাব জমতে থাকে (তাই বিবেক চাংগা হয়)। ইচ্ছা করে মৃত সাজা মানে হলআত্মিক সাধনা দিয়ে রিপুকে মেরে মেরে নিস্তেজ করা এবং আত্মিক জগতের দিকে মনোনিবেশ করে সেখানকার চিত্রগুলো অন্তরে চিত্রিত করতে থাকা। এর ফলে তার অন্তরে ফেরেশতা স্বভাব বা বিবেকের আলো দেখা দেবে। 
এটাও স্মরণ রাখতে হবে যেসব কিছুই অনুকূল অবস্থায় খুশীতে ফুলে ফেঁপে যায়। তেমনি প্রতিকূল পরিবেশে তা দুঃখে ও হতাশায় ভেংগে পড়ে। (বিবেকের দশাও তাই।) 
এও জানা প্রয়োজনপ্রতিটি দুঃখ-কষ্ট এবং আনন্দ-খুশীর নিজ নিজ বিশেষ আকৃতি-প্রকৃতি রয়েছে। তারাসেই বিশেষ রূপ ধরেই প্রকাশ পায়। যেমনরক্ত দূষিত হওয়ার প্রকাশ ঘটে দেহে খুজলী পাচড়া রূপে। তেমনি পিত্ত গরমের কষ্ট প্রকাশিত হয় দেহের অস্থিরতা ও স্বপ্নে আগুন দেখার মাধ্যমে। কফের কষ্ট সর্দীর প্রচণ্ডতায় স্বপ্নে বরফ দেখায় প্রকাশ পায়। 
তেমিন বিবেক প্রাধান্য পায় এবং মানুষ তার অনুকূল অবস্থা সৃষ্টি করে অর্থাৎ নিজের ভেতর পবিত্রতা ও বিনয় সৃষ্টি করেতখন স্বপ্ন কি জাগরণে আনন্দ ও প্রীতির বিশেষ বিশেষ দৃশ্য ও চিত্র দেখতে পায়। যদি তার বিপরীত কাজ করে তা হলে সে সব অসামঞ্জস্য কাজগুলো এরূপ দৃশ্য ও চিত্রের সৃষ্টি করবে যাতে লাঞ্ছনা ও ভীতির ব্যাপার থাকে। যেমন হিংস্র বাঘকে দেখবে শিকার ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে ক্রোধ প্রকাশ করতে কিংবা সাপকে দেখবে দংশন উদ্যত কিংবা দংশন করতে ইত্যাদি। 
বাহ্যিক তথা পার্থিব পুরস্কার-শাস্তির মূলনীতি হল এইকারণ সৃষ্টি হলেই কেবল সে কাজগুলো দেখা দেবে। যে ব্যক্তি কার্যকারণ রীতি বুঝে নিবে এবং কোন কারণে কোন কাজ দেখা দেয় তা খেয়ালে রাখবেতা হলে সে সুস্পষ্ট জানতে পাবেআল্লাহ পাক পার্থিব জীবনেও পাপীকে শাস্তি থেকে রেহাই দেননা। তবে সংগে সংগে দুনিয়া পরিচালনার (কার্যকারণ) রীতি বাহ্যত করে তিনি তা করেন না (বরং পরকালের জন্য মুলতবী রাখেন)।
ব্যাপারটা এই হয়পৃথিবীতে পুণ্যবানের শান্তি ও পাপীর শাস্তি লাভের বাহ্যিক কারণ-উপকরণ যদি সৃষ্টি ও সরবরাহ না হয়তখন পুণ্য কাজ করাতে (আত্মিক) শান্তি ও পাপ কাজ করাতেই (আত্মিক) শাস্তি পেয়ে থাকে। যদি কোন পুণ্যবানের শাস্তির জন্য পার্থিব কারণ সৃষ্টি হয় এবং তা বন্ধ করলে তার পুণ্য কাজের কোন ক্ষতি না হয় তাহলে তার পুণ্য সেটাকে পুরোপুরি বন্ধ করতে কিংবা শাস্তির পরিমাণ ও প্রচণ্ডতা কমাতে সহায়ক হয়। তেমনি কোন পাপীর জন্য যদি শাস্তির পার্থিব কারণ সৃষ্টি হয়তখন তার পাপ সে শাস্তির পথে অন্তরায় হয় এবং তা কার্যকর হতে দেয় না। তবে যদি তার কর্মফলের অনুকূল কারণ-উপকরণ সৃষ্টি হয়তা হলে শাস্তি ও শান্তি দুটোই যথেষ্ট পরিমাণে মিলে। তা বলে পাপ-পুণ্যের ফলাফল দ্বারা পৃথিবীর রীতিনীতি কখনও বদলানো হয় না। বাহ্যিক ফলাফল দেবার ক্ষেত্রে যেখানে পার্থিব রীতি-নীতি অন্তরায় হয়সেখানে ফলাফল মুলতবী থাকে। এ কারণেই দেখা যায়পাপ করেও মানুষ পার্থিব জীবনের স্বল্প পরিসরে বেশ সুখে-শান্তিতে কাটাচ্ছে। পক্ষান্তরে পুণ্য করেও মানুষ যথেষ্ট দুঃখ-কষ্ট ভোগ করছে। পুণ্যবানের এ বাহ্যিক দুঃখ-কষ্ট তার পশু শক্তিকে দুর্বল ও পরাভূত করে থাকে। এভাবে তাকে তার দুঃখ-কষ্ট তার পশু শক্তিকে দুর্বল ও পরাভূত করে থাকে। এভাবে তাকে তার দুঃখ-কষ্টের কল্যাণ বুঝানো হয়। তখন রোগী যে ভাবে রোগমুক্তির আশায় তিক্ত ওষুধ খেতে রাজী হয়তেমনি পুণ্যবান পার্থিব দুঃখ-কষ্ট অম্লান বদনে সহ্য করে। মহানবীর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) নিম্ন হাদীসটির মর্মও তাই।
মুমিন হল নরম ডালের মত। বাতাস কখনও এদিক হেলায়ওদিক হেলায়মাটিতে লুটায়আকাশে উঠায়এমনকি তার অন্তিম দশা ঘটায় (তবু সে টিকে যায়)। পক্ষান্তরে মুনাফিক মাথা উঁচু করা শক্ত বিটপীর মত। হাওয়া তাকে এদিক-ওদিক হেলাতে পারে না বটেকিন্তু শেষ পর্যন্ত ভেংগে বা উপড়ে ফেলে 
এ মর্মেই অপর একটি হাদীস এসেছে। তাতে পাই, "যে মুসলমানেরই অসুখ-বিসুখ কিংবা অনুরূপ কোন বিপদাপদ দেখা দেয় তার ছোট-খাট পাপগুলো ঠিক গাছের পাতার মতই ঝরে যায়" 
অনেক দেশেই শয়তানের আনুগত্য ও অর্চনা জোরে-শোরে করা হয়। সে সব এলাকার লোক আয়েশ-আরাম ও অত্যাচার-উৎপীড়নে পশু ও হিংস্র জীবের মত হয়। এ ধরনের লোকের শাস্তিও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মুলতবী থাকে। নিম্ন আয়াতে তারই ইংগিত পাই-  
আমি যখন কোন শহর বা গ্রামে নবী পাঠিয়েছিতখন সেখানকার লোকদের দারিদ্য ও বালা-মসিবত দিয়ে (আল্লাহর দিকে) ফিরে আসার ব্যবস্থা করেছি। যখন তাতেও ফল হয়নিতখন তাদের দুঃখ-দুর্দশার স্থলে সুখ-সচ্ছলতা দিয়ে ধন্য করেছি তা দেখে তারা বলাবলি করতে লাগলআমাদের বাপ-দাদার জীবনেও এভাবে সুদিন-দুর্দিনের পালাবদল হয়েছে (পাপ-পুণ্যের এতে কোন দখল নেই)। তারপর হঠাৎ আমি এমনভাবে পাকড়াও করলাম যেতারা ভাববারও অবকাশ পেল না। যদি এলাকার লোকরা ঈমান আনত এবং আমার কথা মতে ভাল হয়ে চলততা হলে আকাশ ও পৃথিবীর বরকতের ভাণ্ডার তাদের জন্য খুলে দিতাম। কিন্তু তারা আমার কথাকে মিথ্যা বলে উড়াল তাই আমিও তাদের এ পাপের বিনিময়ে আপদ-বিপদের ফাঁদে ফাঁসিয়ে নিলাম (সূরা আরাফঃ আয়াতঃ ৯৪,৯৫,৯৬)
মোট কথাএ দুনিয়ার পুরস্কার ও শাস্তির ব্যাপারটা হল এইপ্রভু যেন ভৃত্যকে যখন তখন পূর্ণ বিনিময় দিতে প্রস্তুত নন। পূর্ণ অবসর নিয়ে তিনি তা করার জন্য সময় নির্ধারিত করে রেখেছেন। সেটা হল শেষ বিচারের দিন। আল্লাহ পাকের নিম্ন বানীতে তারই ইশারা রয়েছেঃ 
হে মানুষ ও জিন! আমি শীঘ্রই তোমাদের প্রতি (হিসাব-নিকাশের জন্য) মনোনিবেশ করব। (সূরা আর-রাহমানঃ আয়াতঃ ৩১)
পার্থিব শাস্তি ও পুরস্কারের কয়েকটি অবস্থা দেখা যায়। কখনও এভাবে হয় যেমানুষের আনন্দ ও স্বস্তি কিংবা দুঃখ ও অস্বস্তি দেখা দেয়। কখনও এমন হয় যেদুর্ভাবনায় শারীরিক অসুস্থতা বা রোগ-ব্যাধি দেখা দেয়। নবুয়তের আগে মহানবীর (সঃ) একবার দেহাবরণ খসে পড়ায় তিনি লাজে-ভয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন। এও ঠিক সেরূপ রোগ-ব্যাধি। তেমনি কখনও পার্থিব পুরস্কার ধন-সম্পদের মাধ্যমে দেয়া হয়। কখনও মানুষপশু ও ফেরেশতাদের কাছে ইলহাম আসেঅমুকের সাথে সদ্ব্যবহার বজায় রাখ। কখনও বা মানুষ নিজেই ইলহাম পেয়ে ভাল ও মন্দ অবস্থার সম্মুখীন হয়। 
যে ব্যক্তি আমার উপরোক্ত আলোচনা ভাল ভাবে বুঝে নিবে এবং প্রতিটি কথা যথাস্থানে রেখে বিচার বিবেচনা করবে,সে অনেক জটিলতা থেকে বেঁচে যাবে। অন্যথায় সে মহানবীর (সঃ) হাদীসে পরস্পর বিরোধ দেখে মতভেদ ও দ্বিধা-দ্বন্দ্বের শিকার হবে। সে দেখতে পাবেএক হাদীসে তিনি বলছেনপুণ্য কাজে রুজী বাড়ে এবং পাপে তা কমে। পক্ষান্তরে অন্য হাদীসে বলছেনপাপীদের পার্থিব জীবনের স্বল্প পরিসরে সুখ-স্বচ্ছন্দ্য দেয়া হয় এবং পুণ্যবানদের আপদ-বিপদ ও দুঃখ-দুর্দশা দেয়া হয়। এমন কি যে যত বড় পুণ্যবান তাকে তত বেশী পার্থিব দুঃখ-কষ্ট দেয়া হয়। এ ভাবের বিভিন্ন স্তরের আরও বহু হাদীসে আপাত বিরোধ ও তা থেকে উম্মতের ভেতর মতভেদ দেখা যায়। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

পরবর্তী পর্ব
পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ 
মৃত্যুরহস্য 

হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (১৩) শাস্তি ও পুরস্কারের কারণ



📚 হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (পর্ব- ১৩)
✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসে দেহলভী (রহঃ)

শাস্তি ও পুরস্কারের কারণ —
মনে রাখবেনশাস্তি ও পুরস্কারের কারণ অনেক। তবে তার ভেতর দুটোই মূল কারণ। 
(১) মানুষের সুপ্রবৃত্তি (বিবেক) তার কোন খারাপ কাজ বা স্বভাবের প্রতি রুষ্ট থাকে তার এ বিরূপ অনুভূতিই তাকে লজ্জিতঅনুতপ্ত ও আত্মগ্লানিতে বিদগ্ধ করে। অনেক সময় এ কারণে স্বপ্নে কি জাগরণে ভয়াবহ চিত্র তার সামনে ভেসে ওঠে এবং তাকে ভীষণ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করে তোলে। কোন কোন লোক যেভাবে ইলহামে অন্যান্য জ্ঞান অর্জন করেনতেমনি তার কাজে ভাল-মন্দ সম্পর্কেও ইলহামে জ্ঞাত হবার যোগ্যতা রাখেন। সে অবস্থায় ফেরেশতাদের মাধ্যমে ঘোষিত হয়কাজের চিত্রটি তাকে দেখিয়ে ও বুঝিয়ে দাও। এ সম্পর্কেই আল্লাহ পাক বলেনঃ 
হ্যাঁযারা পাপ অর্জন করল এবং স্খলন-পতন যাদের ঘিরে ফেললতারাই জাহান্নামের সহচর এবং সেখানকার তারা স্থায়ী বাসিন্দা (সূরা বাক্বারাঃ আয়াতঃ ৮১) 
(২) সর্বোচ্চ পরিষদের ফেরেশতারা বনি আদমের দিকে নিবিষ্ট থাকেন। সর্বোচ্চ পরিষদের সামনে মানবীয় প্রবৃত্তিচরিত্র ও ভাল-মন্দ কাজের চিত্র মওজুদ থাকে। তাঁরা আল্লাহর কাছে এ প্রার্থনা জানান, ‘প্রভু! নেক বান্দাদের শান্তি ও বদ চরিত্রদের শাস্তি দাও। তাদের এ প্রার্থনা মঞ্জুর হয়। তখন আদম সন্তানদের ওপর ইলহাম অবতীর্ণ হওয়ার মতই শান্তি ও শাস্তি অবতীর্ণ হয়। এ থেকেই মানুষ সুখকর ও দুঃখদায়ক ঘটনার সম্মুখীন হয়। এ পথেই তাঁরা তাঁদের সন্তোষ ও অসন্তোষ প্রকাশ করে থাকেন। 
কখনও সর্বোচ্চ পরিষদের অসন্তোষের প্রভাবে মানুষ অসুস্থ ও অবসন্ন হয়ে পড়ে। কখনও তাঁদের সন্তোষের প্রভাব এসে মানুষের স্বভাবের দুর্বলতা দূর করে তাতে দৃঢ়তা এনে দেয়। এভাবে তাঁদের প্রভাবে ফেরেশতাও মানুষ ভাল লোককে শান্তি দেয় ও মন্দ লোককে শাস্তি দেয়। কখনও মানুষের কৃতকর্মই অঘটন কিংবা শান্তিপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করে তার শান্তি ও শাস্তির কারণ হয়। 
আসল সত্য হল এইযে মানুষকে আল্লাহ ভালবেসে সৃষ্টি করেছেনতাদের তিনি লাগাম ছাড়া হতে দিতে চান না। তাদের কাজের তিনি ভাল-মন্দ দেখবেন নাতা হতে পারে না। যেহেতু আল্লাহ কিভাবে এ ভাল বা মন্দ কাজের প্রতিদান দিবেন তা বুঝা কিছুটা দুষ্করতাই ফেরেশতার নেক দোয়া ও বদ দোয়ার ফলাফল রূপে তা দেখানো হল। বাদ বাকী আল্লাহই জানেন ভাল। 
আমার দ্বিতীয় যুক্তিটির দিকেই আল্লাহ পাকের ইংগিত পাই- 
নিশ্চয় যারা কাফের ও কাফের থেকেই মারা যায়তাদের ওপর আল্লাহফেরেশতা ও মানুষ সবার অভিসম্পাত বর্ষিত হয়। এ অভিসম্পাতে তারা চির কাল কাটায় এবং এ শাস্তি তাদের কমে না আদৌ ও কেউ তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে না (সূরা বাকারাঃ আয়াতঃ ১৬১)
এ দুধরনের কারণের সান্নিধ্য ও সংমিশ্রণে মানব প্রকৃতির যোগ্যতার বিভিন্নতা অনুসারে নানা ধরনের অদ্ভুত কারণ সৃষ্টি হয়েছে। তবে প্রথম কারণটিই মানুষের ব্যক্তিগত স্বভাব ও কাজের ক্ষেত্রে অধিক প্রভাবশালী। সেটি মানুষের স্বভাব ও কাজকে কল্যাণময় ও ধ্বংসকর দুইই করতে পারে। তাই অধিকাংশ (বিবেকবান) জ্ঞান-গুণীগণ এটাই সমর্থন করেন। এর প্রয়োজনীয়তা কেউই অস্বীকার করতে পারে না। 
দ্বিতীয় কারণটি দ্বারা এমন সব কাজ ও স্বভাব নিয়ন্ত্রিত হয় যেগুলো সামগ্রিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে থাকে। অর্থাৎ যে সব স্বভাব ও কাজ সর্বসাধারণের কল্যাণ ও শান্তির পরিপন্থী এবং মানবীয় জীবন ব্যবস্থা পরিশুদ্ধির অন্তরায় হয়। ফেরেশতা স্বভাব বা বিবেক যাদের দুর্বলযারা পাপী তাদের স্বভাব ও কাজগুলোই এ ব্যবস্থা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। 
শান্তি ও পুরস্কারের এ দুটো কারণের প্রভাব সৃষ্টির পথে কিছু অন্তরায়ও রয়েছে। সেগুলো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রভাব ঠেকিয়ে রাখে। প্রথম কারণটির অন্তরায় হল মানুষের দুর্বল বিবেক ও কুপ্রবৃত্তি। এ অবস্থা বেড়ে গিয়ে এমন পর্যায়ে পৌঁছেযখন মানুষের ভেতর পশুত্ব ছাড়া আর কিছুই থাকে না। তখন তার বিবেক অনুভূতিহীন হয়। কোন কিছুই সেটাকে ব্যথিত করে না। তাই তার দংশনও থাকেনা। তারপর যখন তার স্বভাব থেকে পশুত্বের প্রভাব দূর হয় ও সেখানে বিবেক মাথা চাড়া দিতে থাকেতখন তার দুঃখ দেখা দিয়ে থাকে। 
দ্বিতীয় কারণের প্রভাব ততক্ষন মুলতবী থাকে যতক্ষণ তাদের ওপর আল্লাহর আজাবের পথে অন্তরায় মওজুদ থাকে। যখন তা দূর হয়ে নির্ধারিত সময় আসে (পুণ্যাত্মার বিলুপ্তি বা পাপাত্মার পূর্ণত্ব প্রাপ্তি ঘটে)তখন আজাবের রাস্তা উন্মুক্ত হয়। চারদিক থেকৈ তখন বন্যার প্রবাহে আজাব এসে তাদের ভাসিয়ে নেয়। আল্লাহর এ আয়াত তারই সাক্ষ্য বয়ে চলছেঃ- 
প্রত্যেক দল বা জাতির (পতনের) জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় রয়েছে। তাদের সময় যখন এসে যাবেতখন তার এক মুহুর্ত ও আগ-পিছ হবে না। (সুরা আল্-আরাফ আয়াত ৩৪)


পরবর্তী পর্ব

বুধবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২৩

হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (১২) কাজের সাথে স্বভাবের সংযোগ



📚হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ
✍🏻শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দেসী দেহলভী (রহঃ)

কাজের সাথে স্বভাবের সংযোগ 
জেনে রাখুনকাজ হল মনোগত ভাবের বহিঃপ্রকাশতাদের সাধারণ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ এবং তাদের শিকারের বস্তু। সাধারণের ধারণা মতে কাজ ও মনোগত ভাবে কোন প্রভেদ নেই। তাই অধিকাংশ মানুষই কাজ বলতে মানুষের স্বভাব-চরিত্রকে বুঝে থাকে। তার কারণ এইযখন কোন আন্তরিক অভিলাষ কাউকে কোন কাজে উদ্ধুদ্ধ করে এবং প্রবৃত্তি সেটাকে পছন্দ করেতখন সে খুশীতে বাগ বাগ হয়। যদি স্বভাবের সেটা অপছন্দনীয় হয়তখন সে বিমর্ষ ও হতাশ হয়। তারপর যখন সে কাজটি করে ফেলেতখন সে অভিলাষের উৎস ফেরেশতা স্বভাব হোক কিংবা পশু স্ববাবস্বতন্ত্র ও শক্তিশালী হয়ে যায়। তখন তার বিপরীত পশু কিংবা ফেরেশতা প্রবৃত্তি অধীন ও দুর্বল হয়ে যায়। এ দিকেই ইংগিত দিয়ে মহানবী (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, ‘মানুষের প্রবৃত্তি যখন কিছুর অভিলাষ করেতার অংগ-প্রত্যংগ সেটাকে বাস্তবায়িত করে কিংবা ব্যর্থ করে দেয় 

কথা থেকে যায় যেকোন কোন কাজ এমন রয়েছে যার পছন্দ যা অপছন্দের ব্যাপারটি কারো নিজস্ব মনোভাব থেকে হয় নাহয় উচ্চ পরিষদের সরাসরি প্রভাব থেকে। এ ভাবে কোন ভাল কাজ করা যেন সর্বোচ্চ পরিষদের এ ইলহাম গ্রহণ করা আমারে নৈকট্য লাভ করআমাদের মত হও এবং আমাদের আলোকে উজ্জ্বল হও। তেমনি কোন খারাপ কাজ করার ক্ষেত্রে এর বিপরীত প্রভাব আসে। 
সর্বোচ্চ পরিষদে কয়েকটি কারণে এভাবে কাজ নিয়ন্ত্রিত ও নির্ধারিত হয়। 
(১) আল্লাহ তা'আলার তরফ থেকে তাঁরা জানতে পানঅমুক অমুক কাজগুলো না করা হলে কিংবা অমুক অমুক কাজ বর্জিত না হলে মানবীয় জীবন ধারায় পরিবর্তন ও সংস্কার আসবে না। তখন সর্বোচ্চ পরিষদে সে কাজগুলোর রূপরখা অংকিত হয়। তারপর বিশেষ বিশেষ লোকের কাছে তা আল্লাহর নির্ধারিত বিধান রূপে অবতীর্ণ হয়।


পরবর্তী পর্ব
শাস্তি ও পুরস্কারের কারণ

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...