হকদারের হক পর্ব- ৪
আল্লাহর উদ্দেশ্যে শত্রুতার পরিচয়
যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশ্যে তাঁহার আজ্ঞানুবর্তী বান্দাগণকে ভালবাসিবে সে স্বতঃ কাফির, জালিম, গুনাহ্গার ও ফাসিকদিগকে শত্রু বলিয়া গণ্য করিবে। কারণ কেহ, কাহাকেও ভালবাসিলে সে বন্ধুর-বন্ধুকেও বন্ধু ও শত্রুকে শত্রুরূপে গ্রহণ করিয়া থাকে। এবং কাফির, জালিম, গুনাহ্গার ও ফাসিকগণ আল্লাহর শত্রু। কোন মুসলমান ফাসিক (পাপী) হইলে মুসলমান হওয়ার কারণে তাহাকে ভালবাসিতে হইবে এবং পাপের কারণে তৎপ্রতি অসন্তুষ্ট থাকিতে হইবে। এইরূপ স্থলে ভালবাসা ও অসন্তুষ্টি একত্রে মিলিত হইবে। যেমন, এক ব্যক্তি এক পুত্রকে পুরস্কার প্রদান করিল কিন্তু অপর পুত্রকে কিছুই দিল না। এইরূপ ক্ষেত্রে বুঝিতে হইবে, এক কারণে সে এক পুত্রকে ভালবাসে এবং অন্য এক কারণে সে অপর পুত্রের প্রতি অসন্তুষ্ট; ইহা অসম্ভব নহে। কারণ, যেমন এক ব্যক্তির তিন পুত্র আছে। তন্মধ্যে একজন বুদ্ধিমান পিতৃভক্ত; দ্বিতীয়জন বোকা ও পিতার অবাধ্য এবং তৃতীয় জন নির্বোধ কিন্তু পিতৃভক্ত। এমতাবস্থায় সে ব্যক্তি প্রথম পুত্রকে ভালবাসিবে, দ্বিতীয় পুত্রের প্রতি অসন্তুষ্ট থাকিবে এবং তৃতীয় পুত্রকে পিতৃ ভক্ত হওয়ার জন্য ভালবাসিবে ও নির্বুদ্ধিতার দরুন তৎপ্রতি অসন্তুষ্ট থাকিবে। আচার-ব্যবহারে ইহার প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হইয়া থাকে। কেননা সে প্রথম পুত্রকে স্নেহের দৃষ্টিতে দেখিবে। দ্বিতীয় পুত্রকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখিবে এবং তৃতীয় পুত্রের কিছুটা স্নেহ ও কিছুটা অবজ্ঞার চোখে দেখিবে।
ফলকথা, যে ব্যক্তি আল্লাহর নাফরমানী করে, তৎপ্রতি তোমার এইরূপভাব পোষণ করা কর্তব্য যে, যেন সে তোমার বিরুদ্ধাচরণ করিয়া থাকে এবং বিরুদ্ধাচরণের পরিমাণ অনুযায়ী তুমিও তাহার প্রতি শত্রুতা পোষণ করিয়া থাক। আবার আল্লাহর প্রতি তাহার বাধ্যতা ও আনুগত্যের পরিমাণ অনুযায়ী তাহাকে ভালবাসিতে হইবে যেন উহার প্রতিক্রিয়া পরস্পর আচার-ব্যবহার, কাজ-কারবার, সঙ্গ-সাহচর্য এবং কথাবার্তায় প্রকাশ পায়। এমনকি পাপীর সংসর্গে তুমি যাইবে না এবং তাহার সঙ্গে কর্কশ ভাষা ব্যবহার করিবে। আর তাহার পাপ অত্যাধিক বৃদ্ধি পাইয়া থাকিলে তাহা হইতে বহুদূরে থাকিবে এবং তাহার পাপ সীমা অতিক্রম করিয়া গেলে তাহার সহিত কথাবার্তা বন্ধ করিয়া তাহা হইতে অন্যদিকে মুখ ফিরাইবে। অত্যাচারীর সাহিত পাপী অপেক্ষা অধিক রূঢ় ও কঠোর ব্যবহার করিতে হইবে।
কিন্তু যে ব্যক্তি কেবল তোমার উপর অত্যাচার করিয়াছে তাহাকে ক্ষমা করা ও অত্যাচার সহ্য করিয়া যাওয়া উত্তম। এ সম্বন্ধে প্রাচীন বুযর্গগণের বিভিন্নরূপ অভ্যাস ছিল। কেহ কেহ ধর্মীয় বন্ধনও শরীয়তের শাসন দৃঢ় রাখার উদ্দেশ্যে পাপী ও অত্যাচারীর প্রতি খুব কড়া ব্যবহার করিতেন এবং হযরত ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল (রহঃ) তাহাদের অন্যতম।
হারিস মজামী দর্শন শাস্ত্রে একখানা গ্রন্থ রচনা করেন। ইহাতে মুতাযিলা সম্প্রদায়ের ভ্রান্ত মতবাদের খণ্ডন করা হইয়াছে। কিন্তু এই সম্প্রদায়ের ভ্রান্ত মতবাদসমূহ প্রথমে বর্ণিত হইয়াছে। ইহাতে হযরত ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল (রহঃ) উক্ত গ্রন্থকারের প্রতি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হইয়া তৎপর যুক্তি-প্রমাণ দ্বারা উহা খণ্ডন করিয়াছেন। হয়ত কেহ এই ভ্রান্ত মতবাদগুলি পাঠ করিবে এবং উহা তাহার অন্তরে বদ্ধমূল হইয়া পড়িবে। হযরত ইয়াহইয়া ইব্ন মুঈন বলিলেন : কাহারও নিকট আমি কিছু প্রত্যাশা করি না। কিন্তু বাদশাহ আমাকে কিছু দান করিলে আমি তাহা গ্রহণ করিব। ইহাতে হযরত ইমাম সাহেব (রহঃ) তাঁহার প্রতি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হইলেন; এমনকি তাঁহার সহিত কথাবার্তা বন্ধ করিয়া দিলেন। তিনি তখন হযরত ইমাম সাহেব (রহঃ)-র নিকট ক্ষমা চাহিয়া বলিলেন : আমি ঠাট্টা করিতেছিলাম। হযরত ইমাম সাহেব (রহঃ) বলিলেন : হালাল জীবিকা ভোগ করা ধর্মের বিধান। কিন্তু ধর্ম-বিষয়ে ঠাট্টা করা সঙ্গত নহে।
কেহ কেহ আবার সর্বপ্রকার পাপীকেই দয়ার চোখে দেখিতেন। কিন্তু এইরূপ দয়ার নিয়্যত সর্বদা পরিবর্তনশীল। কারণ, তাওহীদের প্রতি যাঁহার লক্ষ্য, তিনি আল্লাহর প্রবল প্রতাপান্বিত কবলে সকলকেই অস্থির অবস্থায় দেখিতে পান এবং সকলকেই দয়ার চোখে দেখিয়া থাকেন। এইরূপ মনোভাব খুব বড় কথা। কিন্তু নির্বোধ লোকদের ইহাতে ধোকায় পতিত হওয়ার সম্ভাবনা রহিয়াছে। কারণ, এমন লোকও আছে, যে অপরের পাপ ও উৎপীড়নের প্রতি গুরুত্ব প্রদান না করিয়া অম্লান বদনে সহ্য করিয়া যায়। কিন্তু নির্বোধ ব্যক্তি ইহাকে তাওহীদের প্রভাব বলিয়া মনে করিয়া থাকে। অথচ তাওহীদের লক্ষণ এই যে, কেহ প্রহার করিলে, ধন-সম্পদ কাড়িয়া লইলে, অপমান করিলে অথবা গালি দিলে ক্রোধের সঞ্চার হয় না; বরং তিনি মনে করেন যে, সমস্তই আল্লাহর তরফ হইতে ঘটিতেছে এবং উহাতে মানুষের কোন হাত নাই। অতএব কাহারও প্রতি ক্রুদ্ধ না হইয়া তিনি তাহাদিগকে দয়ার চোখে দেখিয়া থাকেন। যেমন কাফিরগণ উহুদের যুদ্ধে যখন রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর দান্দান (দাঁত) মুবারক প্রস্তরাঘাতে ভাঙ্গিয়া ফেলে এবং ফলে তাঁহার নূরাণী চেহারা মুবারক রক্তাপ্লুত হইয়া যায়। তখন তিনি তাহাদের প্রতি ক্রুদ্ধ না হইয়া এই দু'আ করিতে লাগিলেন :
>“ইয়া আল্লাহ্! আমার কওমকে হিদায়ত করুন। কারণ, নিশ্চয়ই তাহারা অজ্ঞান।”
কিন্তু এমন যদি হয় যে, নিজের প্রতি অত্যাচার হইলে ক্রুদ্ধ হইয়া থাকে এবং আল্লাহর নাফরমানী করিলে নীরব থাকে, তবে ইহা ধর্ম-বিষয়ে গুরুত্ব প্রদানের অভাব, কপটতা ও বোকামি বলিয়া গণ্য হইবে। ইহা তাওহীদের লক্ষণ নহে। সুতরাং যাহার উপর তাওহীদ তত প্রবল হইয়া উঠে নাই এবং সে পাপীকে পাপের দরূন অন্তরে শত্রু জ্ঞান করে না, ইহা তাহার ঈমানের দুর্বলতা ও পাপীর সহিত তাহার বন্ধুত্বের প্রমাণ। যেমন, কেহ তোমার বন্ধুকে মন্দ বলিলে তুমি যদি ইহাতে ক্রুদ্ধ না হও তবে বুঝা যাইবে যে, তোমার বন্ধুত্ব খাঁটি নহে।
পরবর্তী পর্ব





