রবিবার, ১০ মার্চ, ২০২৪

রোযা - ৫) রোষার আভ্যন্তরীণ শর্তসমূহ


রোযা - (পর্ব- ৫)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - 🖌️ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

রোষার আভ্যন্তরীণ শর্তসমূহ
প্রকাশ থাকে যে, রোযার তিনটি স্তর আছে- সাধারণের রোযা, বিশেষ ব্যক্তিগণের রোযা এবং বিশিষ্টতম ব্যক্তিবর্গের রোযা।

সাধারণের রোযা হচ্ছে, উদর ও লজ্জাস্থানকে কামোদ্দীপনা পূর্ণ করা থেকে বিরত রাখা; যেমন পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের রোযা হচ্ছে চক্ষু, কর্ণ, জিহ্বা, হাত-পা এবং সমস্ত অঙ্গকে গোনাহ থেকে বিরত রাখা এবং বিশিষ্টতম ব্যক্তিবর্গের রোযা হচ্ছে, অন্তরকে দুঃসাহস, পার্থিব চিন্তা এবং আল্লাহ ব্যতীত সকল বিষয় থেকে ফিরিয়ে রাখা। এই প্রকার রোযা আল্লাহ তাআলা ও আখেরাত ছাড়া অন্য বস্তুর চিন্তা এবং সাংসারিক চিন্তার কারণে নষ্ট হয়ে যায়। হাঁ, ধর্ম পালনের জন্যে যতটুকু পার্থিব চিন্তা জরুরী, ততটুকুর চিন্তা রোযা নষ্ট করে না। কেননা, এটা আখেরাতের পাথেয়- দুনিয়ার নয়। এমনকি, বুযুর্গগণ বলেন: যেব্যক্তি দিনের বেলায় এ চিন্তায় ব্যাপৃত হয় যে, ইফতারীর ব্যবস্থা করে নেয়া, দরকার, তাকে ভ্রান্ত বলা হবে। কেননা, সে আল্লাহ তাআলার কৃপার উপর ভরসা কম করে এবং তাঁর প্রতিশ্রুত রিযিকে বিশ্বাস কম রাখে। এটা নবী, সিদ্দীক ও নৈকট্যশীলগণের স্তর। আমরা এ স্তরের অধিক বর্ণনা দিতে চাই না। এই রোযা তখন অর্জিত হয়, যখন মানুষ সমস্ত সাহসিকতা সহকারে আল্লাহ তাআলার প্রতি মনোনিবেশ করে, অন্য সবকিছুর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং এই আয়াতের বিষয়বস্তু তার উপর আচ্ছন্ন হয়ে যায়- “বলুন, আল্লাহ, অতঃপর তাদেরকে তাদের ছিদ্রান্বেষা নিয়ে খেলা করতে দেন”।

বিশিষ্ট অর্থাৎ সৎকর্মপরায়ণ ব্যক্তিদের রোযা অঙ্গ প্রত্যঙ্গকে গোনাহের কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখার মাধ্যমে অর্জিত হয়। ছয়টি বিষয় দ্বারা এই রোযা পূর্ণতা লাভ করে।

(১) দৃষ্টি নত রাখা, মন্দ বিষয়সমূহের প্রতি দৃষ্টিপাত না করা এবং

আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল করে দেয় এমন বিষয় থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে রাখা। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: মন্দ বিষয়ের প্রতি দৃষ্টিপাত করা শয়তানের একটি বিষ মিশ্রিত তীর। আল্লাহ তাআলার ভয়ে যে এটা বর্জন করে, আল্লাহ তাকে এমন ঈমান দান করেন, যার মিষ্টতা সে অন্তরে অনুভব করে। 
হযরত জাবের (রাঃ) রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) থেকে রেওয়ায়েত করেন: “পাঁচটি বিষয় রোযাদারের রোযা নষ্ট করে দেয়- মিথ্যা বলা, কুটনামি করা, পশ্চাদনিন্দা করা, মিথ্যা কসম খাওয়া এবং কামভাব সহকারে দৃষ্টিপাত করা।

(২) অনর্থক কথাবার্তা, মিথ্যা, পরনিন্দা, অশ্লীলতা, জুলুম, কলহ বিবাদ ইত্যাদি গর্হিত কর্ম থেকে রসনা সংযত রাখা, সাধ্যমত নিরবতা পালন করা এবং যিকির ও তেলাওয়াতে ব্যাপৃত থাকা এটা জিহ্বার রোযা! সুফিয়ান সওরী (রঃ) বলেন: পরনিন্দা রোযা বিনষ্ট করে। হযরত মুজাহিদ (রঃ) থেকে বর্ণিত আছে- দুটি অভ্যাস রোযা নষ্ট করে- পরনিন্দা ও মিথ্যা। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: রোযা ঢাল। তোমাদের কেউ যখন রোযা রাখে, তখন যেন মূর্খোচিত ও অশ্লীল কথা না বলে। কেউ তার সাথে ঝগড়া করলে অথবা গালি দিলে সে যেন বলে দেয়- আমি রোযাদার। এক হাদীসে আছে- রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর আমলে দু'জন মহিলা রোযা রাখে। রোযার শেষ ভাগে তাদের ক্ষুধা ও পিপাসা তীব্র আকার ধারণ করে এবং তারা মৃত্যুর নিকটবর্তী হয়ে পড়ে। তারা রোযা ভঙ্গের অনুমতি নেয়ার জন্যে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে একজনকে প্রেরণ করল। তিনি প্রেরিত লোকের হাতে একটি পেয়ালা দিয়ে বললেন: মহিলাদ্বয়কে বলো, তারা যা খেয়েছে তা যেন এই পেয়ালায় বমি করে দেয়। একজন মহিলা তাজা রক্ত ও টাটকা মাংস দিয়ে অর্ধেক পেয়ালা ভরে দিল। অপর মহিলাও এসব বস্তু বমি করল। ফলে পেয়ালা কানায় কানায় ভর্তি হয়ে গেল। ব্যাপার দেখে লোকেরা বিস্ময় প্রকাশ করল। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: তারা উভয়েই আল্লাহর হালাল করা বস্তু দ্বারা রোযা রেখেছে এবং হারাম করা বস্তু দ্বারা রোযা নষ্ট করেছে। তারা একে অপরের কাছে বসে পরনিন্দায় মেতে উঠেছে। তাদের এই পরনিন্দাই পেয়ালায় গোশতের আকারে দেখা যাচ্ছে।

(৩) কুকথা শ্রবণ থেকে কর্ণকে বিরত রাখা। কেননা, যেসব কথা বলা হারাম সেগুলো শ্রবণ করাও হারাম। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা মিথ্যা শ্রবণকারী ও হারাম ভক্ষণকারীদের পাশাপাশি উল্লেখ করেছেন। বলা হয়েছে: "তারা মিথ্যা শ্রবণকারী ও হারাম ভক্ষণকারী"। আরও বলা হয়েছে- "তাদের দরবেশ ও আলেমগণ তাদেরকে গোনাহের কথা বলতে এবং হারাম ভক্ষণ করতে নিষেধ করে না কেন"?
সুতরাং পরনিন্দা শুনে চুপ থাকা হারাম। আল্লাহ বলেন "তখন তোমরাও তাদের মত।" 
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ (কথনকারী ও শ্রবণকারী উভয়েই গোনাহে শরীক।

(৪) হাত, পা ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে খারাপ বিষয় থেকে এবং ইফতারের সময় পেটকে সন্দেহযুক্ত খাদ্য থেকে বিরত রাখা। কেননা, যদি কেউ সারাদিন হালাল থেকে বিরত থাকে এবং হারাম দ্বারা ইফতার করে, তবে তার রোযা কিছুই হয় না। সে সেই ব্যক্তির মত, যে একটি প্রাসাদ তৈরী করে এবং একটি নগরী বিধ্বস্ত করে। কেননা, হালাল খাদ্যের আধিক্যই ক্ষতিকর। এ ক্ষতি হ্রাস করার জন্যে রোযার বিধান যেব্যক্তি অনেক ওষুধ সেবনের ক্ষতিকে ভয় করে বিষ পান করে, সে নির্বোধ। হারাম খাদ্য বিষতুল্য, যা ধর্ম বরবাদ করে এবং হালাল খাদ্য ওষুধ স্বরূপ, যা কম খাওয়া উপকারী এবং বেশী খাওয়া ক্ষতিকর।

রোযার উদ্দেশ্য হালালের ক্ষতি হ্রাস করা। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন- "অনেক রোযাদারের রোযায় ক্ষুধা ও তৃষ্ণা ছাড়া কিছুই লাভ হয় না"। কেউ কেউ বলেন, যে হারাম দ্বারা ইফতার করে, হাদীসে তাকেই বুঝানো হয়েছে। কারও কারও মতে সে ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে, যে হালাল খাদ্য থেকে বিরত থাকে এবং মানুষের গোশত অর্থাৎ গীবত দ্বারা ইফতার করে, যা হারাম। আবার কেউ কেউ বলেন, যেব্যক্তি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে গোনাহ থেকে বাঁচিয়ে রাখে না, হাদীসে তাকে বুঝানো হয়েছে।

(৫) ইফতারে হালাল খাদ্য এত বেশী খেতে নেই যাতে পেট স্ফীত হয়ে যায়। কেননা, আল্লাহ তাআলার কাছে হালাল খাদ্য দ্বারা পরিপূর্ণ পেটের চেয়ে অধিক মন্দ পাত্র আর একটিও নেই। এছাড়া সারা দিনের। ক্ষুধা ও পিপাসার ক্ষতি ইফতারের সময় পূরণ করে নেয়া হলে মানুষ রোযা দ্বারা শয়তানকে কিরূপে দাবিয়ে রাখবে এবং কামভাবকে কিরূপে চূর্ণ করবে? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, রোযার মধ্যে নানা প্রকারের খাদ্যের আয়োজন হয়ে থাকে। সেমতে মানুষের অভ্যাস এই দাঁড়িয়েছে যে, তারা রমযান মাসের জন্যে সব খাদ্য গুছিয়ে রাখে এবং রমযানে এত বেশী খায়, যা অন্য সময় কয়েক মাসেও খায় না। বলাবাহুল্য, রোযার উদ্দেশ্য পেট খালি রাখা এবং কামনা-বাসনাকে চূর্ণ করা, যাতে তাকওয়া শক্তিশালী হয়। কিন্তু সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত উদরকে অভুক্ত রাখার পর যখন খাদ্যস্পৃহা অনেক বেড়ে যায়, তখন পেট পুরে ও তৃপ্তি সহকারে সুস্বাদু খাদ্য খেলে নফসের আনন্দ শক্তি আরও দ্বিগুণ হয়ে যায় এবং এমন সব কুবাসনা জাগ্রত হয়, যা রমযান মাস না হলে হয় তো জাগ্রত হত না। মোট কথা, যেসব শক্তি মানুষকে মন্দ কাজের দিকে টেনে নেয়ার ওসিলা এবং শয়তানের হাতিয়ার, সেগুলোকে দুর্বল করা রোযার উদ্দেশ্য। এটা অল্প ভক্ষণ ছাড়া অর্জিত হয় না। অর্থাৎ, রোযার রাতে এতটুকু খাবে, যতটুকু রোযা ছাড়া প্রত্যেক রাতে খাওয়ার অভ্যাস ছিল। রোযা রেখে দ্বিপ্রহর ও রাত্রির খাদ্য এক সাথে খেয়ে ফেললে সেই রোযা দ্বারা কোন উপকার হবে না। ক্ষুধা, পিপাসা ও দৈহিক দুর্বলতা উপলব্ধি করার কারণে দিনের বেলায় বেশী নিদ্রা না যাওয়া মোস্তাহাব। রাতেও কিছু দুর্বলতা থাকা ভাল, যাতে তাহাজ্জুদ ও ওজিফা সহজসাধ্য হয়। এতে শয়তান মনের আশেপাশে ভিড়তে পারবে না। ফলে মানুষের দৃষ্টিতে ঊর্ধ্বজগত উদ্ভাসিত হয়ে গেলে তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই।
শবে কদর সেই রাত্রকেই বলে, যাতে ঊর্ধ্বজগতের কিছু মানুষের কাছে উন্মোচিত হয়ে যায়। যেব্যক্তি অন্তর ও বুকের মধ্যে খাদ্যের আড়াল সৃষ্টি করে, সে ঊর্ধ্ব জগতের অন্তরালে থেকে যায়।

(৬) ইফতারের পর মনে একাধারে আশা ও ভয় এবং সন্দেহ থাকা। কেননা, একথা কারও জানা নেই যে, রোযাদারের রোযা কবুল হয়েছে কিনা এবং সে নৈকট্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কিনা। প্রত্যেক এবাদত শেষে এমনি ধরনের অবস্থা থাকা ভাল। বর্ণিত আছে, হযরত হাসান বসরী ঈদের দিন একদল লোকের কাছ দিয়ে গমন করলেন, যারা তখন হাস্যরত ছিল। তিনি বললেন: আল্লাহ তাআলা রমযান মাসকে দৌড়ের মাঠ করেছেন, যাতে সকল মানুষ তার আনুগত্যের জন্যে মাঠে দৌড় দেয়। কিছু লোক তো অগ্রসর হয়ে মনযিলে মকছুদে পৌঁছে গেছে। আর কিছু লোক পেছনে থেকে নিরাশ হয়েছে। যেদিন অগ্রগামীরা তাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছেছে এবং বাতিলপন্থীরা বঞ্চিত রয়েছে, সেদিন যারা হাসি-তামাশা করে, তাদের প্রতি বিস্ময় লাগে। আল্লাহর কসম, প্রকৃত পরিস্থিতি ফুটিয়ে তোলা হলে মকবুল ব্যক্তিরা আনন্দের আতিশয্যে ক্রীড়া-কৌতুক বর্জন করবে এবং প্রত্যাখ্যাত ব্যক্তিরা দুঃখের আতিশয্যে হাস্য, রসিকতা থেকে বিরত থাকবে। আহনাফ ইবনে কায়স (রাঃ)-কে কেউ বলল: আপনি বুড়ো মানুষ। রোযা আপনাকে দুর্বল করে দেয়। এ জন্যে কোন উপায় করা আপনার জন্যে মঙ্গলজনক। তিনি বললেন: আমি একটি দীর্ঘ সফরের জন্যে রোযাকে প্রস্তুত করছি। আল্লাহ তাআলার আনুগত্যে সবর করা তাঁর আযাবে সবর করার তুলনায় অনেক সহজ। এ পর্যন্ত রোযার ছয়টি আভ্যন্তরীণ বিষয় বর্ণিত হল।
যেব্যক্তি কেবল উদর ও লজ্জাস্থানের কামনা-বাসনা থেকে বিরত থাকে এবং এগুলো পালন করে না, ফেকাহবিদগণ তাদের রোযা জায়েয বলে থাকেন। এখন যদি প্রশ্ন হয়, ফেকাহবিদগণ যে রোযাকে জায়েয বলেন, আপনি তা অশুদ্ধ বলেন কেন, তবে আমার পক্ষ থেকে এর জওয়াব হচ্ছে, ফেকাহবিদগণ বাহ্যদর্শী। তাঁরা এমন দলীল দ্বারা বাহ্যিক শর্তাবলী প্রমাণ করেন, যা বাতেনী শর্তাবলীর মধ্যে আমাদের বর্ণিত দলীলের তুলনায় নেহায়েত দুর্বল। বিশেষতঃ পরনিন্দা, কলহ-বিবাদ ইত্যাদি ক্ষেত্রে। বাহ্যদর্শী ফেকাহবিদগণকে এমন বিধান দিতে হয়, যাতে গাফেল ও সংসারাসক্ত ব্যক্তিরাও দাখিল থাকতে পারে। তাই বহ্যিক শর্তাবলী দৃষ্টে অনেক বিষয়কে তাদের শুদ্ধ বলতে হয়। 
কিন্তু আখেরাতবিদগণের মতে শুদ্ধ হওয়ার অর্থ কবুল হওয়া। আর কবুল হওয়ার মানে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছা। তাঁরা বলেন: রোযার উদ্দেশ্য আল্লাহ তাআলার একটি গুণ ক্ষুধা পিপাসা থেকে মুক্ত হওয়াকে নিজের অভ্যাসে পরিণত করা এবং কামনা-বাসনা চূর্ণ করার ব্যাপারে যথাসাধ্য ফেরেশতাগণের অনুসরণ করা। মানুষের মর্তবা চতুষ্পদ জন্তুর মর্তবা থেকে ঊর্ধ্বে; কেননা, মানুষ বিবেকের সাহায্যে তার কামনা-বাসনা চূর্ণ করতে সক্ষম। কিন্তু চেষ্টার মাধ্যমে কামনা বাসনা নিয়ন্ত্রণ করতে হয় বলে মানুষের মর্তবা ফেরেশতাগণের নীচে। এ কারণেই মানুষ যখন কামনা-বাসনায় নিমজ্জিত হয়ে পড়ে, তখন সে নিম্নতমদের স্তরে নেমে যায় এবং চতুষ্পদ জন্তুর কাতারে শামিল হয়ে যায়। পক্ষান্তরে যখন মানুষ কামনা-বাসনার মূলোৎপাটন করতে সক্ষম হয়, তখন মর্যাদার উচ্চতম শিখরে আরোহণ করে ফেরেশতাগণের স্তরে পৌঁছে যায়। ফেরেশতাগণ আল্লাহ তাআলার নিকটবর্তী। যে লোক তাদের অনুসরণ করে এবং তাদের মত অভ্যাস গড়ে তোলে, সে-ও তাদের মত আল্লাহ তাআলার নিকটবর্তী হয়ে যায়।এই নৈকট্য স্থান ও দূরত্বের দিক দিয়ে নয়; বরং গুণাবলীর দিক দিয়ে।
মনস্তত্ত্ববিদদের মতে রোযার মূল উদ্দেশ্য যখন এই, তখন দ্বিপ্রহরের খাদ্য দেরী করে সন্ধ্যার খাদ্যের সাথে একেবারে খেয়ে নিলে এবং সারাদিন কামনা বাসনায় নিমজ্জিত থাকলে কি উপকার হবে? এরূপ রোযা দ্বারা উপকার হলে এই হাদীসের অর্থ কি যে, অনেক রোযাদারের রোযা ক্ষুধায় তৃষ্ণা ছাড়া কিছুই অর্জিত হয় না? এ কারণেই জনৈক আলেম বলেন:
অনেক রোযাদার রোযাখোর এবং অনেক রোযাখোর রোযাদার হয়ে থাকে। অর্থাৎ, রোযাখোর হয়েও রোযাদার তারা, যারা আপন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে গোনাহ থেকে মুক্ত রেখে পানাহার করে এবং রোযাদার হয়েও রোযাখোর তারা, যারা ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্ত তো থাকে; কিন্তু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে গোনাহ থেকে বিরত রাখে না। রোযার অর্থ ও মূল লক্ষ্য অবগত হওয়ার' পর জানা গেল, যেব্যক্তি পানাহার ও স্ত্রী সহবাস থেকে বেঁচে থাকে; কিন্তু গোনাহের কাজ করে রোযা নষ্ট করে দেয়, সে সেই ব্যক্তির মত, যে ওযুর মধ্যে ওযুর অঙ্গ তিন বার মাসেহ করে নেয়। এখানে সে বাহ্যতঃ তিন বার মাসেহ করল; কিন্তু আসল উদ্দেশ্য যে ধৌত করা ছিল, তা ছেড়ে দিল। এরূপ ব্যক্তির নামায অজ্ঞতার কারণে তার মুখের উপর প্রত্যাখ্যাত হবে। যেব্যক্তি খেয়ে রোযা নষ্ট করে এবং আপন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে গোনাহের কাজ থেকে বিরত রাখে, সে সেই ব্যক্তির মত, যে ওযুর মধ্যে এক একবার অঙ্গ ধৌত করে। তার নামায ইনশাআল্লাহ মকবুল। কেননা, সে আসল ফরয আদায় করেছে, যদিও ফযীলত বর্জন করেছে। আর যেব্যক্তি পানাহার বর্জন করে এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারাও রোযা রাখে অর্থাৎ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে গোনাহের কাজ থেকে বিরত রাখে, সে সেই ব্যক্তির মত, যে ওযুর মধ্যে প্রত্যেক অঙ্গ তিন বার ধৌত করে। সে আসল ও ফযীলত উভয়টি অর্জন করেছে, যা পূর্ণতার স্তর।
রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: নিশ্চয় রোযা একটি আমানত। তোমাদের প্রত্যেকের উচিত এই আমানতের হেফাযত করা। অতঃপর তিনি এই আয়াত পাঠ করলেন:
"আল্লাহ আদেশ করেন, তোমরা আমানত আমানতের মালিকদের কাছে পৌঁছে দাও"। আয়াত পাঠ শেষে তিনি আপন কান ও চোখের উপর হাত রেখে বললেন: কানে শুনা এবং চোখে দেখা আমানত। যদি শুনা ও দেখা রোযার অন্যতম আমানত না হত, তবে তিনি কখনও বলতেন না যে, কেউ বিবাদ করতে চাইলে বলে দেবে- আমি রোযাদার। অর্থাৎ, আমি আমার জিহ্বা আমানত রেখেছি। আমি তার হেফাযত করব। তোমাকে জওয়াব দিয়ে এই হেফাযত কিরূপে নষ্ট করব? 

পরবর্তী পর্ব
নফল রোযা

রোযা - (৪) রোযার সুন্নতসমূহ



রোযা - (পর্ব- ৪)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - 🖌️ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
রোযার সুন্নতসমূহ

রোযার সুন্নত ছয়টি 
(১) বিলম্বে সেহরী খাওয়া, 
(২) খোরমা অথবা পানি দ্বারা মাগরিবের নামাযের পূর্বে ইফতার করা, 
(৩) দ্বিপ্রহরের পরে মেসওয়াক না করা, 
(৪) রমযান মাসে দান খয়রাত করা, 
(৫) কোরআন পড়া ও পড়ানো এবং 
(৬) মসজিদে এতেকাফ করা; বিশেষতঃ শেষ দশ দিনে। 

রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) রমযানের শেষ দশ দিন খুব এবাদত করতেন- নিজেও মেহনত করতেন এবং পরিবারের লোকজনকেও মেহনত করাতেন। কারণ, এই দশ দিনের মধ্যে শবে কদর রয়েছে। এই দশ দিন নিরন্তর এতেকাফ করা উত্তম। এতেকাফের নিয়ত করার পর শরীয়তসম্মত প্রয়োজন ব্যতিরেকে মসজিদ থেকে বের হলে নিরন্তর এতেকাফ হবে না। যেমন, কোন রোগীকে দেখার জন্যে, সাক্ষ্য দেয়ার জন্যে, জানাযায় শরীক হওয়ার জন্যে এবং যিয়ারত করার জন্যে বের হওয়া। প্রস্রাব পায়খানার জন্যে বের হলে কোন ক্ষতি হবে না। কিন্তু ওযু ব্যতীত অন্য কোন কাজে মশগুল হওয়া যাবে না। দেহের কিছু অংশ: মসজিদ থেকে বের করলে এতেকাফের নিরন্তরতা ভঙ্গ হবে না। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) নিজের মস্তক আয়েশা (রাঃ)-এর কক্ষে বের করে দিতেন এবং তিনি চিরুনি করে দিতেন।

পরবর্তী পর্ব
রোষার আভ্যন্তরীণ শর্তসমূহ

বোযা (পর্ব-৩) রোযার কাযা ও কাফফারা



রোযা - পর্ব- ৩
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন
🖌️ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

রোযার কাযা ও কাফফারা
কোন ওযরের কারণে অথবা ওযর ছাড়াই রোযা না রাখলে তার কাযা করা ওয়াজেব। রমযানের রোযার কাযা একাদিক্রমে (ফাঁক না দিয়ে) করা ওয়াজেব নয়। সহবাস ব্যতীত অন্য কোন কারণে রোযার কাফফারা ওয়াজেব হয় না। (হানাফী মাযহাবে ওযর ব্যতীত ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার অথবা সহবাস করে রোযা ভঙ্গ করলে কাযা ও কাফফারা উভয়টি ওয়াজেব হয়।) উদাহরণতঃ পানাহার এবং সহবাস ব্যতীত বীর্যপাত ঘটালে কেবল কাযা ওয়াজেব হবে- কাফফারা নয়। কাফফারা হল একটি গোলাম মুক্ত করা। এটি সম্ভব না হলে একাদিক্রমে দু'মাস রোযা রাখা। এটাও সম্ভব না হলে ষাট জন মিসকীনকে পেট ভরে খাওয়ানো। যাদের রোযা নিজেদের দোষে নষ্ট হয়ে যায়, তাদের উপর ইমসাক অর্থাৎ দিনের অবশিষ্ট অংশ পানাহার থেকে বিরত থাকা ওয়াজেব। কষ্টের আশংকা না থাকলে সফরে রোযা রাখা এবং কষ্টের আশংকা থাকলে রোযা না রাখা উত্তম। শায়খে ফানী অর্থাৎ যে বৃদ্ধ রোযা রাখার ক্ষমতা রাখে না, সে প্রত্যেক রোযার বিনিময়ে অর্থ সা' গম দান করবে।

পরবর্তী পর্ব
রোযার সুন্নতসমূহ

রোযা (পর্ব - ২) রোযার বাহ্যিক ওয়াজেবসমূহ



রোযা - পর্ব- ২ 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন
🖌️ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

রোযার বাহ্যিক ওয়াজেবসমূহ–
(১) রমযান মাসের সূচনা জ্ঞাত হওয়া। এটা চাঁদ দেখা অথবা আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলে শাবানের ত্রিশ দিন পূর্ণ হওয়ার মাধ্যমে জ্ঞাত হওয়া যায়। চাঁদ দেখার উদ্দেশ্য চাঁদ দেখা যাওয়ার কথা জানা, যা একজন আদেল ব্যক্তির কথায় হতে পারে। ঈদুল ফেতরের চাঁদ দুজন আদেল ব্যক্তির কথা ছাড়া প্রমাণিত হয় না। যেব্যক্তি একজন আদেল ব্যক্তির কাছে চাঁদ দেখার কথা শুনে এবং বিশ্বাস করে, তার উপর রোযা ওয়াজেব হবে, যদিও সরকারীভাবে রোযা রাখার আদেশ না হয়। যদি এক শহরে চাঁদ দেখা যায় ও অন্য শহরে দেখা না যায় এবং উভয় শহরের মধ্যবর্তী দূরত্ব বেশী হলে প্রত্যেক শহরের বিধান আলাদা হবে। (প্রকাশ থাকে যে, হানাফী মাযহাবে দেশের এক শহরে চাঁদ দেখা প্রমাণিত হলে সকল শহরের মানুষের উপর রোযা রাখা ওয়াজেব হবে, দূরত্ব বেশী হোক কিংবা কম।)

(২) প্রত্যেক রোযার জন্যে রাত থেকে নির্দিষ্ট করে ও বিশ্বাস সহকারে নিয়ত করা। সুতরাং সমগ্র রমযান মাসের নিয়ত এক দফায় করে নিলে যথেষ্ট হবে না। দিনের বেলায় নিয়ত করলে রমযানের রোযা হবে না; বরং নফল রোযা হবে। (হানাফী মাযহাব অনুযায়ী দ্বিপ্রহরের পূর্ব পর্যন্ত নিয়ত করা চলে।) শুধু রোযার নিয়ত করলে জায়েয হবে না, বরং নির্দিষ্ট করে রমযানের ফরয রোযার নিয়ত করতে হবে। (হানাফী মাযহাব অনুযায়ী শুধু রোযা কিংবা নফল রোযার নিয়ত করলেও রমযানের ফরয রোযাই হবে।) আগামীকাল রমযান হলে রোযা রাখব- এরূপ সন্দেহজনক নিয়ত করা যথেষ্ট নয়। বরং পূর্ণ বিশ্বাস সহকারে নিয়ত করতে হবে। (হানাফী মাযহাবে এটা জরুরী নয়।)

(৩) রোযা স্মরণ থাকা অবস্থায় পেটে কোন কিছু যেতে না দেয়া। সুতরাং রোযা রেখে জেনে-শুনে কিছু খেলে অথবা পান করলে অথবা নাকের ছিদ্র পথে কোন বস্তু পেটে চলে গেলে অথবা পেটে ওষুধ প্রবেশ করালে রোযা ভেঙ্গে যাবে। যে বস্তু ইচ্ছা ব্যতিরেকে পেটে চলে যায়; যেমন পথের ধুলাবালি অথবা মাছি অথবা কুলি করার সময় পানি, তাতে রোযা ভঙ্গ হয় না। কিন্তু কুলিতে গরগরা করার সময় পেটে পানি চলে গেলে রোযা ভেঙ্গে যাবে। কেননা, এটা রোযাদারের ত্রুটি। রোযার কথা ভুলে গিয়ে পানাহার করলে রোযা ভঙ্গ হবে না।

(৪) স্ত্রীসহবাস থেকে বিরত থাকা। যদি রাত্রে সহবাস করে অথবা স্বপ্নদোষ হয় এবং নাপাক অবস্থায় সকাল হয়ে যায়, তবে তাতে রোযা নষ্ট হয় না।

(৫) বীর্যপাত করা থেকে বিরত থাকা। অর্থাৎ, ইচ্ছাকৃতভাবে সহবাসের মাধ্যমে অথবা সহবাস ছাড়াই বীর্যস্খলন ঘটাবে না। এরূপ করলে রোযা নষ্ট হয়ে যাবে। স্ত্রীকে চুম্বন করলে অথবা কাছে শোয়ালে রোযা নষ্ট হয় না, যে পর্যন্ত বীর্যপাত না হয়, কিন্তু এসব কাজ মাকরূহ।

(৬) বমি করা থেকে বিরত থাকা। ইচ্ছা করে বমি করলে রোযা নষ্ট হয়ে যাবে। আপনা আপনি হলে রোযা নষ্ট হবে না। গলা থেকে অথবা বুক থেকে শ্লেষ্মা নির্গত হলে রোযা নষ্ট হবে না। যদি শ্লেষ্মা মুখে পৌঁছার পর তা গিলে ফেলে তবে রোযা নষ্ট হয়ে যাবে।

পরবর্তী পর্ব
রোযার কাযা ও কাফফারা


রোযা - (পর্ব- ১) রোযার তাৎপর্য


রোযা - পর্ব- ১
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন
🖌️ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

রোযার তাৎপর্য
প্রকাশ থাকে যে, রোযা ঈমানের এক-চতুর্থাংশ। কারণ, এক হাদীসে রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : “রোযা সবরের অর্ধেক” এবং অন্য এক হাদীসে বলেন :”সবর ঈমানের অর্ধেক”। এ থেকে জানা গেল, রোযা ঈমানের অর্ধেকের অর্ধেক অর্থাৎ এক-চতুর্থাংশ।
রোযা আল্লাহ্ তাআলার সাথে সম্পর্কযুক্ত বিধায় ইসলামের সকল রোকনের মধ্যে এটা সেরা রোকন। সেমতে আল্লাহ তাআলার উক্তি রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এক হাদীসে কুদসীতে বর্ণনা করেছেন। উক্তিটি এই: “সকল সৎ কাজের সওয়াব দশ গুণ থেকে সাতশ' গুণ পর্যন্ত হবে; কিন্তু রোযা একান্তভাবে আমার জন্যে বিধায় আমিই এর প্রতিদান দেব”। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন: “সবরকারীদেরকে বেহিসাব সওয়াব দান করা হবে”। 

রোযা সবরের অর্ধেক। তাই এর সওয়াব হিসাব-কিতাবের আওতা বহির্ভূত হবে। শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্যে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর এ উক্তিই যথেষ্ট, তিনি এরশাদ করেন : “আল্লাহর কসম, যার হাতে আমার প্রাণ- নিশ্চয় রোযাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহ তাআলার কাছে মেশকের চেয়েও উত্তম”। 
আল্লাহ্ তা’আলা বলেন, “রোযাদার তার কামনা-বাসনা ও পানাহার একমাত্র আমার জন্যে পরিত্যাগ করে। অতএব রোযা আমার জন্যে এবং আমিই এর প্রতিদান দেব”। 
রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলেন: “জান্নাতের একটি দ্বারকে বলা হয় 'বাবুর রাইয়ান'। এতে রোযাদারগণ ছাড়া অন্য কেউ প্রবেশ করবে না। রোযাদারকে তার রোযার বিনিময়ে আল্লাহর দীদারের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে”। 
আরও বলা হয়েছে: “রোযাদারের দুটি আনন্দ। এক আনন্দ ইফতারের সময় এবং এক আনন্দ তার পালনকর্তার দীদার লাভ করার সময়”।

এক হাদীসে আছে- “প্রত্যেক বস্তুর একটি দরজা আছে। এবাদতের দরজা হল রোযা”। 
আরও বলা হয়েছে: “রোযাদারের নিদ্রা এবাদত”। 
হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ)-এর রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: যখন রমযান মাস শুরু হয়, তখন জান্নাতের দরজা উন্মুক্ত হয় এবং জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। শয়তানকে শিকল পরানো হয়। জনৈক ঘোষণাকারী ঘোষণা করে- যারা কল্যাণ কামনা কর, তারা এগিয়ে আস এবং যারা অনিষ্ট কামনা কর তারা সরে যাও। 
কোরআনের এক আয়াতে বলা হয়েছে- তোমরা অতীত দিনগুলোতে যা পাঠিয়েছ, তার বিনিময়ে আজ জান্নাতে স্বচ্ছন্দে পানাহার কর। এর তফসীর প্রসঙ্গে ওকী বলেন, এখানে অতীত দিন বলে রোযার দিন বুঝানো হয়েছে। কেননা, রোযার দিনে তারা পানাহার ত্যাগ করেছিল। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সংসার ত্যাগ ও রোযাকে গর্বের বিষয়সমূহের মধ্যে এক কাতারে রেখেছেন। সংসার ত্যাগ সম্পর্কে তিনি বলেন: আল্লাহ তাআলা যুবক এবাদতকারীকে নিয়ে ফেরেশতাদের কাছে গর্ব করেন এবং বলেন, হে আমার জন্যে আপন বাসনা বর্জনকারী যুবক, হে আমার সন্তুষ্টিতে যৌবন অতিবাহিতকারী যুবক! তুমি আমার কাছে ফেরেশতার মতই। পক্ষান্তরে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) রোযাদার সম্পর্কে বলেন: আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের উদ্দেশে বলেন,. “ফেরেশতাগণ! আমার বান্দাকে দেখ, সে আমার কারণে তার কামনা-বাসনা ও পানাহার ত্যাগ করেছে। কেউ জানে না তাদের আমলের প্রতিদানস্বরূপ তাদের জন্যে কি লুক্কায়িত রয়েছে, যা তাদের চক্ষুকে শীতল করবে”।
কোরআনের এ আয়াতের তফসীর প্রসঙ্গে কোন কোন তফসীরকার বলেন, এখানে আমল বলে রোযা বুঝানো হয়েছে। কেননা, সবরকরীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, “সবরকারীকে বেহিসাব পুরস্কার দেয়া হবে”।

এ থেকে জানা যায়, সবরকারীর জন্যে অগণিত সওয়াবের স্তূপ সাজানো হবে, যা অনুমানও করা যায় না। এরূপ হওয়াই সমীচীন। কেননা, রোযা আল্লাহ তাআলার জন্যে এবং তাঁর সাথে সম্পর্কযুক্ত হওয়ার কারণে গৌরবোজ্জ্বল। সকল এবাদতই আল্লাহর জন্যে। তবুও রোযা কাবা গৃহের ন্যায় প্রাধান্য রাখে, যদিও সমস্ত ভূপৃষ্ঠই আল্লাহর। রোযার এই প্রাধান্য দুটি কারণে- 
(১) রোযা রাখার অর্থ কয়েকটি বিষয় থেকে বিরত থাকা এবং কয়েকটি বিষয় বর্জন করা। এটি আভ্যন্তরীণ কাজ। এতে এমন কোন আমল নেই, যা চোখে দেখা যায়। অন্যান্য এবাদত মানুষের দৃষ্টিতে থাকে। কিন্তু রোযা আল্লাহ ব্যতীত কেউ দেখে না। 
(২) রোযা আল্লাহ তাআলার শত্রুর উপর চাপ সৃষ্টি করে এবং প্রবল হয়। কেননা, কামনা-বাসনা হচ্ছে শয়তানের ওসিলা বা হাতিয়ার, যা পানাহারের মাধ্যমে শক্তিশালী হয়। এ কারণেই রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: শয়তান মানুষের ধমনী (রক্ত চলার পথে) বিচরণ করে। সুতরাং ক্ষুধা তৃষ্ণা দ্বারা তার পথসমূহ সংকীর্ণ করে দাও। এদিকে লক্ষ্য করে রসূলে পাক (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে বলেছিলেন: সর্বদা জান্নাতের দরজা খঠখটাও। আরজ করা হল: কিসের মাধ্যমে? তিনি বললেন: ক্ষুধার মাধ্যমে। যেহেতু রোযা বিশেষভাবে শয়তানের মূলোৎপাটন করে, তার চলার পথ রুদ্ধ এবং সংকীর্ণ করে, তাই রোযা বিশেষভাবে আল্লাহর সাথে সম্পর্কযুক্ত হওয়ার যোগ্য হয়েছে। কেননা, শয়তানের মূলোৎপাটনে আল্লাহ সাহায্য করেন। বান্দাকে সাহায্য করা নির্ভর করে বান্দার পক্ষ থেকে আল্লাহকে সাহায্য করার উপর। 
সে মতে আল্লাহ্ তা’আলা বলেন : যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য কর, তবে আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পদযুগল সুদৃঢ় রাখবেন।
মোট কথা, চেষ্টা শুরু করা বান্দার পক্ষ থেকে এবং বিনিময়ে হেদায়েত তথা সৎপথ প্রদর্শন আল্লাহর পক্ষ থেকে হবে। 
যেমন- আল্লাহ্ তা’আলা বলেন,
“যারা আমার পথে অধ্যবসায় করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথ প্রদর্শন করি। আরও বলেন: 
“আল্লাহ কোন জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন না করে”। 
পরিবর্তনের জন্যে কামনা-বাসনাকে চূর্ণ বিচূর্ণ করার আদেশ দেয়া হয়েছে। কেননা, কামনা বাসনা শয়তানের বিচরণ ক্ষেত্র। যে পর্যন্ত এই বিচরণ ক্ষেত্র সবুজ শ্যামল থাকবে, শয়তানের বিচরণ বন্ধ হবে না। বিচরণ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আল্লাহ্ তা’আলার প্রতাপ বান্দার কাছে প্রকাশ পাবে না এবং দীদারের পথে পর্দা পড়ে থাকবে। 
রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: “যদি মানুষের অন্তরে শয়তানের যাতায়াত না থাকত, তবে মানুষ ঊর্ধ্বজগত নিরীক্ষণ করতে সক্ষম হত”। 
এদিক দিয়ে রোযা এবাদতসমূহর দরজা ও ঢাল।

পরবর্তী পর্ব

বৃহস্পতিবার, ২১ ডিসেম্বর, ২০২৩

হকদারের হক (১৩) দাস-দাসীর প্রতি কর্তব্য



হকদারের হক পর্ব- (১৩)
📚সৌভাগ্যের পরশমণি   ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

দাস-দাসীর প্রতি কর্তব্য
রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : দাস-দাসীদের হক সম্বন্ধে তোমারা আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা যাহা আহার কর তাহাদিগকেও উহা খাইতে দাও। তোমরা যাহা পরিধান কর তাহাদিগকে তাহা পরিতে দাও। এমন কঠিন কাজের আদেশ তাহাদিগকে দিবে না যাহা তাহারা করিতে অক্ষম। কাজের উপযোগী হইলে তাহাদিগকে রাখ, অন্যথায় বিদায় করিয়া দাও এবং আল্লাহর বান্দাগণকে দুঃখে-কষ্টে রাখিও না। কারণ, আল্লাহ্ তাহাদিগকে তোমাদের দাস-দাসী ও অধীনস্থ করিয়া দিয়াছেন। তিনি ইচ্ছা করিলে তোমাদিগকে তাহাদের অধীনস্থ করিতে পারিতেন।
এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে জিজ্ঞাসা করিল : ইয়া রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)! একদিনের মধ্যে কয়বার দাস-দাসীদের অপরাধ ক্ষমা করিব? হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেনঃ সত্তরবার। হযরত আত্নাফ ইব্‌ন কায়স (র)-কে লোকে জিজ্ঞাসা করিল : আপনি ধৈর্য কাহার নিকট শিখিলেন? তিনি উত্তর দিলেন : কায়স ইব্‌ন আসেম হইতে শিখিয়াছি। কারণ, একদা তাঁহার দাসী একটি ছাগলের বাচ্চা ভাজিয়া একটি লৌহ শলাকায় গাঁথিয়া লইয়া আসিতেছিল । অকস্মাৎ তাহার হাত হইতে স্খলিত হইয়া উহা কায়স ইব্ন আসেমের পুত্রের উপর পতিত হইল। ইহাতে শিশুটির মৃত্যু ঘটিল। দাসী ভয়ে বেহুঁশ হইয়া পড়িল। তিনি দাসীকে বলিলেন : শান্ত হও। তোমার কোন দোষ নাই। আল্লাহর উদ্দেশ্যে আমি তোমাকে আযাদ করিয়া দিলাম।
হযরত আওন ইব্‌ন আবদুল্লাহ (রা) স্বীয় ভৃত্যকে তাঁহার প্রতি অবাধ্যচরণ করিতে দেখিলে তাঁহাকে বলিতেন : তোমার প্রভু যেমন স্বীয় প্রভু আল্লাহর নাফরমানী করিয়া থাকে, তুমিও তাহার সেই অভ্যাস অবলম্বন করতঃ তাহার নাফরমানী করিয়া থাক? হযরত আবূ মাসউদ আনসারী (রা) এক ভৃত্যকে প্রহার করিতেছিলেন, এমন সময় শব্দ আসিল, “হে আবূ মাসউদ!” তৎক্ষণাৎ তিনি সেই দিকে ফিরিয়া রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে দেখিতে পাইলেন। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিতে লাগিলেনঃ এই গোলামের উপর তোমার যত ক্ষমতা আছে তোমার উপর আল্লাহ্ তা'আলার তদপেক্ষা অধিক ক্ষমতা রহিয়াছে।
দাস-দাসীর হকের মধ্যে ইহাই একটি যে, তাহাদিগকে অন্ন, ব্যঞ্জন ও বস্তু হইতে বঞ্ছিত করিবে না এবং ঘৃণার চক্ষে দেখিবে না। মনে করিবে, সেও তোমার মতই মানুষ। সে তোমার নিকট কোন অপরাধ করিলে তুমি নিজে আল্লাহর নিকট যে সকল অপরাধ করিতেছ তাহা স্মরণ ও চিন্তা করিবে। দাস-দাসীর প্রতি তোমার ক্রোধের সঞ্চার হইলে তোমার উপর আল্লাহ্ তা'আলার যে অপ্রতিহত ক্ষমতা রহিয়াছে তাহা স্মরণ করিবে।
রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : অধীনস্থ ব্যক্তি যখন কষ্ট ও পরিশ্রম করিয়া খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুত করিয়াছে এবং তাহাকে পরিশ্রম হইতে অব্যাহতি দিয়াছে তখন অধীনস্থ ব্যক্তিকে তাহার সহিত বসাইয়া তাহার আহার করা উচিত। এতটুকু করিতে না পারিলে এক লোকমা অন্ন উৎকৃষ্ট ব্যঞ্জনসহ নিজ হস্তে তাহার মুখে তুলিয়া বলিবে : এই লোকমা খাইয়া ফেল।


হকদারের হক (১২) সন্তান-সন্তুতির প্রতি কর্তব্য



হকদারের হক পর্ব- (১২)
📚সৌভাগ্যের পরশমণি   ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

সন্তান-সন্তুতির প্রতি কর্তব্য
এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট নিবেদন করিল : আমি কাহার সহিত ইহসান (ইহসান অর্থ সদ্ব্যবহার, উপকার ও হিত সাধন) করিব? হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন: মাতাপিতার সহিত। সে ব্যক্তি নিবেদন করিল : তাঁহারা তো মরিয়া গিয়াছেন। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন: সন্তানের সহিত ইহসান কর। কারণ সন্তানেরও পিতার তুল্য হক রহিয়াছে। সন্তানের হকসমূহের মধ্যে ইহাও একটি যে, মন্দ স্বভাবের কারণে তাহাকে অবাধ্য করিয়া তুলিবে না। রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ যে ব্যক্তি স্বীয় পুত্রকে অবাধ্যতার দিকে পরিচালিত না করে আল্লাহ্ তাহার উপর রহমত বর্ষণ করেন।
হযরত আনাস (রা) হইতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: ছেলে সাতদিনের হইলে তাহার আকীকা কর ও নাম রাখ এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কর। ছয় বৎসরের হইলে আদব শিক্ষা দাও। নয় বৎসরের হইলে তাহার বিছানা পৃথক করিয়া দাও এবং তের বৎসর বয়সের হইলে নামাযের জন্য তাহাকে প্রহার কর। ষোল বৎসর হইলে তাহাকে বিবাহ করাও এবং তাহার হস্তধারণপূর্বক বলিয়া দাও-আমি তোমাকে শিক্ষা দিয়াছি, তোমাকে লালন-পালন করিয়াছি, তোমাকে বিবাহ করাইয়া দিয়াছি। এখন দুনিয়াতে তোমার ফিতনা হইতে এবং আখিরাতে তোমার আযাব হইতে আমি আল্লাহ তা'আলার আশ্রয় প্রার্থনা করিতেছি।
সন্তান-সন্ততির অন্যতম হক এই যে, দান, উপহার এবং স্নেহ-অনুগ্রহ প্রদানে সকলের প্রতি সমতা রক্ষা করিবে। ছোট শিশুকে স্নেহ ও চুম্বন করা সুন্নত। রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হযরত হাসান (রা)-কে চুম্বন করিতেন। আকরা ইবনে হাবিস বলেন: আমার দশ পুত্র আছে। আমি কখনও কাহাকেও চুম্বন করি নাই। রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: যে ব্যক্তি দয়া করে না তাহার উপর আল্লাহ্ তা'আলার দয়া অবতীর্ণ হইবে না। একবার রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) মিম্বরের উপর ছিলেন এমন সময় হযরত হাসান (রা) পড়িয়া গেলেন। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তৎক্ষণাৎ মিম্বর হইতে অবতরণপূর্বক তাঁহাকে উঠাইয়া লইলেন এবং এই আয়াত পাঠ করিলেন-"নিশ্চয়ই তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি ফিতনা ব্যতীত কিছুই নহে"। একবার রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) নামায পড়িতেছিলেন। যখন তিনি সিজদায় গেলেন তখন ইমাম হাসান হুসাইন (রা) হুযূরের পবিত্র স্কন্ধের উপরে পা রাখিলেন। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সিজদায় এত বিলম্ব করিলেন যে, সাহাবায়ে কিরাম (রা) মনে করিতে লাগিলেন, হয়ত ওহী অবতীর্ণ হইতেছে; এইজন্যই তিনি এত দীর্ঘ সিজদা করিতেছেন। সালাম ফিরাইলে সাহাবায়ে কিরাম (রা) নিবেদন করিলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)! সিজদায় কি ওহী অবতীর্ণ হইয়াছিল? হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন : না! হুসাইন (রা) আমাকে উট বানাইয়া ছিল। আমি তাহাকে সরাইয়া দিতে চাহিলাম না।মোটকথা, সন্তান-সন্ততির হক অপেক্ষা মাতাপিতার হকের প্রতি অত্যধিক তাকীদ দেওয়া হইয়াছে। কারণ, তাহাদিগকে সম্মান করা সন্তান-সন্ততির উপর ওয়াজিব। আল্লাহ্ তা'আলা মাতাপিতার প্রতি সম্মান প্রদর্শনকে তাঁহার নিজের ইবাদতের সঙ্গে বর্ণনা করিয়া বলেন : "আপনার প্রভু চরম নির্দেশ প্রদান করিয়াছেন যে, তাঁহাকে ছাড়া তোমরা আর কাহারও ইবাদত করিও না এবং মাতাপিতার সহিত ইহসান করিও"।
মাতাপিতার হক এত গুরুত্বপূর্ণ যে, তজ্জন্য দুইটি বিষয় ওয়াজিব হইয়া পড়িয়াছে। (১) যে খাদ্য সন্দেহযুক্ত, কিন্তু হারাম নহে, মাতাপিতা সন্তানকে তাহা আহার করিতে বলিলে তাঁহাদের আদেশে উহা গ্রহণ করা অধিকাংশ আলিমের মতে সন্তানের প্রতি ওয়াজিব। কারণ, সন্দেহযুক্ত দ্রব্য হইতে পরহিয করা অপেক্ষা মাতাপিতার আদেশ পালন করিয়া তাঁহাদিগকে সন্তুষ্ট করা অধিক কর্তব্য। (২) মাতাপিতার অনুমতি ব্যতিত কোন সফর করা উচিত নহে। কিন্তু সফর সন্তানের উপর ফরয হইয়া থাকিলে, যেমন নিজ দেশে উপযুক্ত আলিম বিদ্যমান না থাকিলে নামায, রোযা প্রভৃতি ফরয বিষয়ক শিক্ষালাভের উদ্দেশ্যে সফর করা আবশ্যক হইয়া পড়িলে, তাঁহাদের বিনা অনুমতিতে সফরে যাওয়া দুরস্ত আছে। হজ্জ ফরয হইলেও মাতাপিতার অনুমতি লইয়া যাওয়াই সঙ্গত। কারণ, উহাতে কিছু বিলম্ব করা জায়েয আছে।
এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট জিহাদে যাওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করিলে হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞাসা করিলেনঃ তোমার মাতা আছেন কি? সে ব্যক্তি নিবেদন করিল : হ্যাঁ। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ তাহার নিকট যাইয়া বস; কেননা তাহার পায়ের নিচে তোমার বেহেশত। এক ব্যক্তি ইয়েমেন হইতে রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর খিদমতে উপস্থিত হইয়া জিহাদে গমনের অনুমতি প্রার্থনা করিলে হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেনঃ তোমার মাতাপিতা আছেন কি? সে ব্যক্তি বলিল : জি হ্যাঁ, আছেন। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন : তবে যাও, প্রথমে তাঁহাদের অনুমতি গ্রহণ কর। তাঁহারা অনুমতি না দিলে তাঁহাদের নির্দেশ মানিয়া চল। কারণ, তাওহীদের পর কোন নৈকট্য ও ইবাদত আল্লাহ্ তা'আলার নিকট তদপেক্ষা উৎকৃষ্ট নহে।
জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার হক প্রায় পিতার হকের সমান। কারণ, হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, পুত্রের উপর পিতার হক যেরূপ ভ্রাতার উপর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার হকও তদ্রূপ।

হকদারের হক (১১) মাতাপিতার প্রতি কর্তব্য


হকদারের হক পর্ব- (১১)
📚সৌভাগ্যের পরশমণি   ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

মাতাপিতার প্রতি কর্তব্য
মাতাপিতার হক (অধিকার) অতি বিরাট। কারণ, তাঁহাদের ঘনিষ্ঠতা অত্যাধিক। রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ সন্তানকে গোলামরূপে পাইয়া মূল্য গ্রহণে তাহাকে আযাদ করিয়া না দেওয়া পর্যন্ত কেহই পিতার হক আদায় করিতে পারে না। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ
"মাতাপিতার সহিত সদ্ব্যবহার, তাহাদের উপকার ও হিত সাধন, নামায, রোযা, হজ্জ, উমরা, জিহাদ ইত্যাদি অপেক্ষা উৎকৃষ্ট"। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ
"লোকে পাঁচশত বৎসরের ব্যবধান হইতে বেহেশতের সুগন্ধ পাইবে। কিন্তু অবাধ্য সন্তান ও আত্মীয়তা ছেদনকারী সুগন্ধ পাইবে না"। আল্লাহ্ তা'আলা হযরত মূসা (আ) এর প্রতি ওহী অবতীর্ণ করিলেন : যে ব্যক্তি মাতাপিতার আনুগত্য স্বীকার করে না, আমি তাহাকে অবাধ্য বলিয়া লিপিবদ্ধ করি।
রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ যে ব্যক্তি মাতাপিতার নামে দান করে তাহার কোন ক্ষতি হয় না। তাহারা উভয়েই সওয়াব পাইয়া থাকে এবং তাহার সওয়াবও কম হয় না। এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট উপস্থিত হইয়া নিবেদন করিল : ইয়া রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)! আমার মাতাপিতার মৃত্যু হইয়াছে। আমার উপর তাহাদের কি হক আছে যাহা আমার জন্য পালনীয়? হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ তাহাদের জন্য নামায পড় এবং ক্ষমা প্রার্থনা কর। আর তাহাদের প্রতিশ্রুতি ও উপদেশ পালন কর। তাহাদের বন্ধু-বান্ধবের সম্মান কর। তাহাদের প্রিয় ব্যক্তিদের সহিত সদ্ব্যবহার (ইহসান) কর। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: মাতার হক পিতার হকের দ্বিগুণ।

পরবর্তী পর্ব

হকদারের হক (১০) আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি কর্তব্য


 হকদারের হক পর্ব- (১০)
📚সৌভাগ্যের পরশমণি   ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি কর্তব্য
রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ঘোষণা করেন আল্লাহ তা'আলা বলেন : আমি রহমান (দয়ালু) এবং আত্মীয়তা রিহম। আমার নাম হইতে ছাঁটাই করিয়া এই নাম রাখা হইয়াছে। যে ব্যক্তি আত্মীয়তার হক পালন করে আমি তাহার সহিত মিলিত হই। যে ব্যক্তি আত্মীয়তা ছিন্ন করে আমি তাহার সহিত ভালবাসা ছিন্ন করি। রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : যে ব্যক্তি নিজের দীর্ঘায়ু ও সচ্ছল জীবিকা আকাংক্ষা করে নিজের আত্মীয়-স্বজনের সহিত সদ্ব্যবহার করিতে তাহাকে বলিয়া দাও। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ কোন ইবাদতের সওয়াবই আত্মীয়-স্বজনের হক প্রতিপালনের সওয়াব অপেক্ষা অধিক নহে। এমন কি কোন কোন লোক পাপাচারে লিপ্ত থাকে। (কিন্তু) তাহারা যখন আত্মীয়-স্বজনের হক প্রতিপালন করে ইহার বরকতে তাহাদের ধন-সম্পদ ও সন্তানাদি বৃদ্ধি পাইয়া থাকে। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : তোমার সহিত শত্রুতা পোষণ করে এমন আত্মীয়-স্বজনকে যাহা তুমি দান কর তদপেক্ষা উৎকৃষ্ট সদকা আর কোনটাই নহে।
আত্মীয়-স্বজনের হক প্রতিপালনের অর্থ এই যে, কোন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি যদি তোমার সহিত সম্পর্ক ছিন্ন করে তথাপি তুমি তাহার সহিত মেলামেশা করিবে। রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট ইহাই যে, যে ব্যক্তি তোমার সহিত সম্বন্ধ ছিন্ন করে তুমি তাহার সহিত মিলিত হইবে এবং যে ব্যক্তি তোমাকে বঞ্চিত করে তাহাকে তুমি দান করিবে, আর যে ব্যক্তি তোমার প্রতি অত্যাচার করে তুমি তাহাকে ক্ষমা করিবে।

হকদারের (৯) প্রতিবেশীদের প্রতি কর্তব্য


 হকদারের হক পর্ব- ৯
📚সৌভাগ্যের পরশমণি   ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
প্রতিবেশীদের প্রতি কর্তব্য 
রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : কোন প্রতিবেশী এমন যাহার মাত্র একটি অধিকার (হক) আছে; এই প্রতিবেশী কাফির। আর কোন প্রতিবেশী এমন যাহার দুইটি অধিকার আছে; এই প্রতিবেশী মুসলমান এবং কোন প্রতিবেশী এইরূপ যে, তাহার তিনটি অধিকার রহিয়াছে। এইরূপও প্রতিবেশী (মুসলমান) আত্মীয়। রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ হযরত জিবরাঈল (আ) সর্বদা আমাকে প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে উপদেশ দিতেন এমনকি পরিশেষে আমি মনে করিতে লাগিলাম যে, প্রতিবেশী আমার পরিত্যক্ত সম্পত্তির অংশীদার হইবে। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : যে ব্যক্তি আল্লাহ্ ও পরকালের উপর ঈমান আনিয়াছে, তাহাকে বলিয়া দাও, সে যেন স্বীয় প্রতিবেশীর সম্মান করে। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ যে দুইজন পরস্পর অভিযোগকারী কিয়ামত দিবস সর্বপ্রথম (আল্লাহর দরবারে) উপস্থিত হইবে, তাহারা দুইজন প্রতিবেশী হইবে। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ যে ব্যক্তি প্রতিবেশীর কুকুরকে ঢিল মারিয়াছে সে প্রতিবেশীকে কষ্ট দিয়াছে।
লোকে রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট আরয করিল : অমুক মহিলা দিবসে (নফল) রোযা রাখে এবং রাত্রিকালে (তাহাজ্জুদ ও নফল) নামায পড়ে। কিন্তু সে প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন : সে দোযখে যাইবে। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : চল্লিশ বাড়ি পর্যন্ত প্রতিবেশীর অধিকার রহিয়াছে। এই হাদীসের ব্যাখ্যায় হযরত ইমাম যুহরী (র) বলেন : নিজ গৃহের সম্মুখের দিকে চল্লিশ ঘর, পশ্চাৎদিকে চল্লিশ ঘর, ডানদিকে চল্লিশ ঘর এবং বামদিকে চল্লিশ ঘর প্রতিবেশী বলিয়া বুঝিতে হইবে।
প্রতিবেশীকে কষ্ট না দিলেই যে তাহার প্রতি কর্তব্য প্রতিপালিত হইল তাহা নহে; বরং তাহাদের সহিত সদ্ব্যবহার, বিপদাপদে সাহায্য এবং উপকার করাও কর্তব্য। কারণ, হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, দরিদ্র প্রতিবেশী কিয়ামত দিবস ধনী ব্যক্তির সঙ্গে ঝগড়া করিবে এবং বলিবে : ইয়া আল্লাহ্! তাহাকে জিজ্ঞাসা করুন, সে আমার মঙ্গল করে নাই কেন এবং আমাকে তাহার গৃহে গমন করিতে দেয় নাই কেন।
এক ব্যক্তি ইঁদুরের উপদ্রবে নিতান্ত বিব্রত হইয়া পড়িয়াছিলেন। লোকে তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলঃ তুমি বিড়াল পুষিতেছ না কেন? তিনি বলিলেনঃ আমার আশংকা হয় যে, বিড়ালের আওয়াজ শুনিয়া ইঁদুর প্রতিবেশীর গৃহে চলিয়া যাইবে। তাহা হইলে এই হইবে যে, যাহা আমি নিজের জন্য পছন্দ করি না তাহা তাহার জন্য পছন্দ করিলাম।
রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞাসা করিলেন ঃ প্রতিবেশীর অধিকার কি, তাহা কি তোমরা জান? (প্রতিবেশীর) অধিকার এই-তোমার নিকট সাহায্য চাহিলে সাহায্য করিবে, ধার চাহিলে ধার দিবে, অভাবগ্রস্ত হইলে অভাব মোচন করিবে, পীড়িত হইলে তত্ত্বাবধান করিবে, প্রাণত্যাগ করিলে তাহার জানাযার সঙ্গে যাইবে। আনন্দে অভিনন্দন এবং দুঃখে সমবেদনা জ্ঞাপন করিবে। তোমার গৃহে দেওয়াল উঁচু করিয়া তাহার বাতাস বন্ধ করিবে না। ফল ক্রয় করিলে তাহাকে পাঠাইয়া দাও। পাঠাইতে না পারিলে গোপন রাখ এবং নিজের সন্তানদিগকে ফল হাতে লইয়া বাহিরে যাইতে দিও না, যেন প্রতিবেশীর ছেলে দুঃখিত না হয়। আর স্বীয় রন্ধনশালায় ধূয়া দ্বারা প্রতিবেশীকে কষ্ট দিও না; কিন্তু তাহাকেও যদি খাদ্য প্রেরণ কর (তবে ক্ষতি নাই)।
হুযূর (সা) বলেন : তোমরা কি জান, প্রতিবেশীর অধিকার কি ? সেই আল্লাহর শপথ যাঁহার হাতে আমার প্রাণ, প্রতিবেশীর অধিকার সেই ব্যক্তিই প্রদান করিতে পারে যাহার উপর আল্লাহ্ তা'আলা রহমত বর্ষণ করেন। এইগুলি প্রতিবেশীরও অধিকারসমূহের অন্তর্ভুক্ত-নিজ গৃহ হইতে তাহার গৃহের অভ্যন্তরে উঁকি দিয়া লুকাইয়া দেখিবে না, সে তোমার দেওয়ালের উপর কড়িকাঠ স্থাপন করিলে তাহাকে নিষেধ করিও না এবং তাহার নর্দমা বন্ধ করিও না। তোমার গৃহদ্বারের সম্মুখে সে আবর্জনা ফেলিলে তাহার সহিত ঝগড়া করিও না এবং তাহার যে দোষ শ্রবণ কর তাহা গোপন রাখ। মনে কষ্ট হয়, এমন কোন কথা তাহার নিকট বলিবে না; প্রতিবেশীর স্ত্রীলোকদের প্রতি দৃষ্টিপাত করিবে না; তাহার দাসীদের প্রতি অধিক দৃষ্টিপাত করিবে না। এইগুলি মুসলমানগণের অধিকারসমূহ হইতে স্বতন্ত্র (অর্থাৎ মুসলমান অমুসলমান নির্বিশেষে সকল প্রতিবেশীর জন্য এই হকসমূহের প্রতি অবশ্যই লক্ষ্য রাখিতে হইবে)। এইগুলি ভালরূপে স্মরণ রাখিও।
হযরত আবূ যর (রা) বলেনঃ আমার প্রিয় বন্ধু রাসূলে মাকবুল রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উপদেশ প্রদান করিয়া বলেন যে, যখন তুমি কিছু পাক কর তখন উহাতে অধিক পরিমাণ সুরুয়া রাখ এবং উহা হইতে প্রতিবেশীর অংশ প্রেরণ কর। এক ব্যক্তি হযরত আবদুল্লাহ ইবন মুবারক (র)-কে জিজ্ঞাসা করিল : প্রতিবেশী আমার চাকরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে। বিনা প্রমাণে তাহাকে প্রহার করিলে পাপী হইব। আর প্রহার না করিলে প্রতিবেশী অসন্তুষ্ট হইবে। স্থির করিতে পারিতেছি না এমতাবস্থায় কি করিব। উত্তরে তিনি বলিলেন : অপেক্ষা কর, চাকর এমন কোন অপরাধ করুক, যাহাতে সে শাসনের উপযুক্ত ও দণ্ডনীয় হয়। তৎপর শাসনে একটু বিলম্ব কর যেন প্রতিবেশী আবার তোমার নিকট অভিযোগ করে। তখন চাকরকে শাস্তি দাও যেন উভয়ের প্রতি তোমার কর্তব্য সামাধা হয়।

পরবর্তী পর্ব

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...