মানব সমাজের বিভিন্ন সংগঠন - ১১
মানবিক বৈশিষ্ট্য, বৈশিষ্ট্যের তাৎপর্য
জেনে রেখো, মানুষের কিছু বৈশিষ্ট্য এমন যে, তা মানুষ হিসেবে সে প্রকৃতিগত ভাবেই পেয়ে থাকে। তেমনি কিছু বৈশিষ্ট্য তার বৈষয়িক। যা তার পারিপার্শ্বিকতা ও দূরবর্তী কোন প্রভাব থেকে অর্জিত হয়। মানবিক সচ্চরিত্রতা ও বিবেক যে ব্যাপারটিকে অত্যধিক গুরুত্ব দেয় ও লক্ষ্যবস্তু হিসেবে নেয় তা হলো মানবিক পরিপূর্ণতা বা পূর্ণাঙ্গ মানবতা।
কারণ, কখনও কারও এমন কিছু নিয়ে প্রশংসা করা হয়, যা তার প্রকৃতিগত অবয়বের সাথে সংশ্লিষ্ট। যেমন, তার দৈহিক উচ্চতা কিংবা দেহের বিশালত্বের প্রশংসা। সেটাকেয দি কৃতিত্ব বলা হয়, তাহলে সে কৃতিত্বের পূর্ণতা দেখতে পাবে সুউচ্চ ও সুবিশাল পাহাড়-পর্বতে। কখনও কাউকে প্রশংসা করা হয় এমন কিছুর জন্যে যা গাছ-পালায়ও দেখতে পাওয়া যায়। যেমন, কারো দ্রুত বর্ধন ডগমগে চেহারা, সুন্দর গড়ন ইত্যাদির জন্যে। সেটাই যদি কৃতিত্ব হয়, তাহলে লালা কিংবা গোলাপফুল সে কৃতিত্বের সর্বাধিক দাবীদার। কখনও কাউকে এমন কিছুর জন্যে প্রশংসা করা হয়, যা জীব-জন্তুর ভেতরেও পাওয়া যায়। যেমন, দৈহিক শক্তি, সুউচ্চ কণ্ঠ, খাওয়া, শক্ত হাতে পাঞ্জা লড়া, জেদী ও প্রতিদ্বন্দ্বীতাপরায়ণ হওয়া ইত্যাদি। যদি সেটাকে কৃতিত্ব বলা হয় তা হলে গাধাকে সেক্ষেত্রে সর্বাধিক কৃতিত্বের দাবীদার বলতে হয়। হ্যাঁ, কখনও কাউকে এমন কিছুর জন্যে প্রশংসা করা হয়, যা শুধু মানুষের মধ্যেই পাওয়া যায়। যেমন, মার্জিত চরিত্র, উত্তম কর্মধারা, উন্নতমানের গুণাবলী, উচ্চাংগের শিল্প-নৈপুণ্য ও সুউচ্চ মর্যাদা ইত্যাদি।
মূলত এগুলোকেই বলা হয় মানবিক যোগ্যতা ও কৃতিত্ব। প্রত্যেক জাতির জ্ঞানী মনীষীগণ এগুলোকেই লক্ষ্য বানিয়ে নেন এবং এসব ছাড়া অন্য যেসব গুণের কথা বলা হয়েছে, তারা সেগুলোকে আদৌ কোন প্রশংসনীয় গুণ বলে মনে করেন না। অবশ্য এখনও বিষয়টি সুস্পষ্ট ও পরিশীলিত হয়নি। কারণ, সে গুণাবলীর মূল বস্তু প্রতিটি জীবের ভেতরই পাওয়া যায়। যেমন, বীরত্বের মূলে রয়েছে ক্রোধ সহকারে প্রতিশোধ নেয়া, প্রচণ্ড ভাবে অগ্রসর হওয়া ও বিপজ্জনক কাজে পা রাখা। অথচ এগুলো পুরুষ জীবজন্তুর ভেতরে যথেষ্ট দেখা যায়। কিন্তু সেটাকে তখনই বীরত্ব বলা হয়, যখন কোন মানুষ অত্যন্ত বিজ্ঞতার সাথে কল্যাণকর পথে সেগুলোর উপস্থাপনা, বাস্তবায়ন ঘটায়। তেমনি কলাকৌশল ও কারিগরী কাজের মূল বস্তু জীব জন্তুর ভেতরেও দেখা যায়।
বাউউ পাখী তার নিজের বাসা তৈরী করে। কোন কোন জীবতো স্বভাবগত ভাবে এমন শিল্পকর্ম দেখায় যা মানুষকে অনেক কষ্ট করেও সেরূপ করতে ব্যর্থ হতে হয়।
এ থেকে বুঝা গেল যে, সেগুলোও মানুষের মূল কৃতিত্ব বা মৌলিক গুণ নয়; বরং সেগুলোও প্রকৃতিগত কৃতিত্বের অন্তর্ভুক্ত! মানুষের মূল কৃতিত্ব বা গুণ হল তার ভেতরকার পশু প্রকৃতিতে মানব প্রকৃতির নিয়ন্ত্রণে রাখা, প্রবৃত্তির তাড়নাকে বিবেক-বুদ্ধির বশীভূত রাখা। তারই ফলে মানুষ জীব জগতে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও কৃতিত্বের অধিকারী হয়ে থাকে।
জেনে রেখো, মানবিক মূল গুণের সাথে যেসব ব্যাপার সম্পৃক্ত তা দু’শ্রেণীতে বিভক্ত। একটি হচ্ছে মানবের জৈবিক প্রয়োজনের কাজগুলো দ্বারা আপন উদ্দেশ্য হাসিল সম্ভব হয় না; বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসবের চাকচিক্যের মোহে ডুবে আসল উদ্দেশ্য বিস্মৃত হয়। এটা যেমন আংশিক লাভেল আশায় সামগ্রিক লাভ থেকে বঞ্চিত হওয়া। এসব ক্ষুদ্র কৃতিত্ব মূল কৃতিত্বের পরিপন্থী হয়ে থাকে। যেমন, কোন লোক নিজের উত্তেজনা সৃষ্টি করে ও কুস্তী লড়ে লড়ে বীরত্ব অর্জন করতে চায়, কিংবা আরবী কবিতা ও ভাষণ মুখস্ত করে বিশুদ্ধ আরবী ভাষী হতে চায়।
মানব চরিত্রের প্রকাশ ঘটে তার স্বজাতির সাথে ঘাত-প্রতিঘাতের ভেতর দিয়ে। তেমনি মানুষের কর্ম কৌশল উদ্ভাবিত হয় তার প্রয়োজনাদি মেটাবার গরজে। তেমনি শিল্প কার্যের প্রয়োজনে যন্ত্রপাতি আবিস্কৃত হয়। তবে এসব কিছুই জীবন সাংগ হবার সাথে সাথেই শেষ হয়ে যায়। তাই কোন ব্যক্তি যদি এ অসম্পূর্ণ গুণ নিয়ে এমনকি তার সাথে সম্পৃক্ত অস্থায়ী ব্যাপারগুলোর প্রতি অসন্তোষ নিয়েও মারা যায়, তথাপি সে মানবিক মূল গুণ থেকে বঞ্চিত থেকেই চলে যায়।
তারপর যদি তার অসম্পূর্ণ গুণ ও কার্যাবলীর পেছনে প্রবৃত্তির তাড়না সৃষ্ট সংকীর্ণ স্বার্থান্ধতা সক্রিয় থেকে থাকে, তাহলে তো লাভের বদলে শুধুই ক্ষতি হল।
দ্বিতীয় শ্রেণী হল, সে ব্যাপারগুলো যার প্রভাবে তার ভেতরকার পশু স্বভাব ফেরেশতা স্বভাবের অনুগত হয়ে যায়, সেটার নির্দেশেই চলে আর তারই রঙে রঞ্চিত হয়। তার ফেরেশতা স্বভাবটি এরূপ শক্তিশালী হতে হবে যা বিন্দুমাত্র পশু স্বভাবের প্রভাব মেনে নেবেনা। কোনমতে সেটার হিংসার ছাপ তার ওপর পড়বে না। মোমের ওপর আংটির ছাপ যেভাবে পড়ে সে ভাবে কোন মতেই পশু স্বভাবের ছাপ ফেরেশতা স্বভাবের ওপর যেন না পড়ে, তার উপায় হল এই, যখনই আত্মিক শক্তিটির কোন কিছুর প্রয়োজন দেখা দেয় আর তা সে তার দৈহিক শক্তির নিকট কামনা করে, তখন জৈবিক শক্তির কাজ হবে সে নির্দেশ পালন করা এবং কোন মনে তা অমান্য না করা। এভাবে আত্মিক শক্তির প্রতিটি নির্দেশ যদি জৈবিক শক্তি পালন করতে থাকে, তাহলে সে স্বভাবতই সেগুলোয় অভ্যস্ত হয়ে যাবে। ফলে সে নিজেই সেগুলোর আকাঙ্ক্ষা হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে যে কাজগুলো ফেরেশতা স্বভাব কামনা করে তার পশু স্বভাব তা বাধ্য হয়ে মেনে নেয়, তখন স্বভাতই প্রথমটি সন্তুষ্ট এবং দ্বিতীয়টি অসন্তুষ্ট হয়। এ ব্যাপারটি যে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব মেনে চলে বহিঃশক্তির গতিবিধির প্রতি লক্ষ্য করা। এটাও ফেরেশতা স্বভাত বা বিবেকেরই বৈশিষ্ট্য, পশু স্বভাব বা প্রবৃত্তি এ বৈশিষ্ট্য থেকে অনেক দূরে অবস্থিত।
যখন এ অবস্থা দাঁড়াবে যে, পশু প্রবৃত্তি তার বাসনা-কামনা, স্বাদ-আহলাদ ও আসক্তি-আকর্ষণ বর্জন করবে, তখন তার নাম দেয়া হবে ইবাদাত ও বিয়াযাত বা উপাসনা ও সাধনা। এটাই মানুষের সেই মূল চরিত্র অর্জনের মাধ্যমে হয় যা তার ভেতরে অনুপস্থিত। এ মাকাম বা পর্যায়ের তাৎপর্য এই দাঁড়াল, মানবের সত্যিকারের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ইবাদত ছাড়া অর্জিত হয় না।
এ কারণেই ব্যক্তি মানবের সামগ্রিক কল্যাণের ব্যাপারে মানবিক সত্তার মৌল আলোক বর্তিকা ডাক দিয়ে বলে ও কঠোরভাবে নির্দেশ দেয় যে, ব্যক্তি মানুষের দ্বিতীয় পর্যায়ের পূর্ণতার জন্যে প্রয়োজন মোতাবেক নির্ধারিত গুণের পরিমার্জন ও উন্নয়ন চাই। সে জন্যে স্বীয় প্রকৃতিকে পরিশোধিত ও সুসজ্জিত করে নিজেকে উচ্চ পরিষদের সদস্যদের পর্যায়ে উন্নীত করাকে জীবনের মূল লক্ষ্য ও সাধনা বলে স্থির করতে হবে। এমন কি নিজের ভেতরে এরূপ যোগ্যতা সৃষ্টি করতে হবে যার ফলে জৈবিক ও আত্মিক উভয় শক্তির ভারসাম্যের প্রভাব সে বিমণ্ডিত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে জৈবিক শক্তি আত্মিক শক্তির নির্দেশে পরিচালিত হবে এবং সে ফেরেশতা স্বভাতের মূর্তরূপ ধরে প্রতিভাত হবে। কোন মানুষ যখন সুস্থ মানসিকতার অধিকারী হয়, আরতার অস্তিত্ব যখন মানবিক বিধি-বিধান পুরোপুরি ধারণের যোগ্য হয়ে যায়, তখন সে উক্ত দুর্লভ গুণ বা বৈশিষ্ট্যের জন্য উদগ্রীব হয়। লোহকে যেভাবে চুম্বক টেনে নিয়ে যায়, ঠিক তেমনি তখন সেই ব্যক্তি সত্তাকে উক্ত গুণটি টেনে নেয়। এটা একটা প্রকৃতিগত অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যাপার। আল্লাহ পাক এ স্বভাব দিয়েই মানুষ সৃষ্টি করেছেন।
তাই দেখা যায়, যখন কোন জাতি উক্তরূপ ভারসাম্যপূর্ণ স্বভাব আয়ত্ত করে ফেলে, তখন তাদের ভেতর এরূপ মনীষী অবশ্যই দেখা দেয় যিনি তাদের সেই প্রশংসনীয় চরিত্রকে পূর্ণথায় পৌঁছে দিতে যত্নবান হন। মূলত সেটাকেই তখন তারা সর্বোচ্চ সৌভাগ্য বলে ভেবে থাকে। রাষ্ট্রনায়ক ও প্রশাসনের দৃষ্টি সে দিকেই থাকে। জনগণও তাদের প্রভাবে অনুরূপ গড়ে উঠে। সমগ্র দুনিয়ায় তারা মানবতার অত্যুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে বিরাজ করে। সে দেশে সরকার ও জনতা তখন ফেরেশতাদের দলে শামিল হয়ে যায়। সে দেশের মানুষ ও পুণ্যময় অনুশাসনের বরকতে ধন্য হয়ে চলে। দেশে দেশে তাদের স্বাগত সম্ভাষণ শুরু হয়ে যায়। একমাত্র মানবতার সহজাত মানসিক বিধি-বিধান ছাড়া আরব-আজম, সাদা-কালো, ধার্মিক-অধার্মিক, কাছের-দূরের, উঁচু-নীচু সর্বস্তরের সকল দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার আর কোন বিধি-বিধান রয়েছে কী? নেই, তা থাকতেও পারে না। এক মাত্র মানবিক মৌলিক গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্যের ওপরেই দুনিয়ার সকল মানুষকে একমত করা যেতো, কারণ, তুমি দেখতে পেলে যে প্রতিটি মানুষের ভেতর ফেরেশতা স্বভাবের বিবেক বিদ্যমান। তাদের মর্যাদা যে কত বড় আর তাদের ভেতরকার উত্তম চরিত্রের লোকদের আসন যে কত ঊর্ধ্বে তাও তুমি দেখতে পেয়েছ। আল্লাহই সর্বশক্তিমান।
জেনে রেখো, মানুষের কিছু বৈশিষ্ট্য এমন যে, তা মানুষ হিসেবে সে প্রকৃতিগত ভাবেই পেয়ে থাকে। তেমনি কিছু বৈশিষ্ট্য তার বৈষয়িক। যা তার পারিপার্শ্বিকতা ও দূরবর্তী কোন প্রভাব থেকে অর্জিত হয়। মানবিক সচ্চরিত্রতা ও বিবেক যে ব্যাপারটিকে অত্যধিক গুরুত্ব দেয় ও লক্ষ্যবস্তু হিসেবে নেয় তা হলো মানবিক পরিপূর্ণতা বা পূর্ণাঙ্গ মানবতা।
কারণ, কখনও কারও এমন কিছু নিয়ে প্রশংসা করা হয়, যা তার প্রকৃতিগত অবয়বের সাথে সংশ্লিষ্ট। যেমন, তার দৈহিক উচ্চতা কিংবা দেহের বিশালত্বের প্রশংসা। সেটাকেয দি কৃতিত্ব বলা হয়, তাহলে সে কৃতিত্বের পূর্ণতা দেখতে পাবে সুউচ্চ ও সুবিশাল পাহাড়-পর্বতে। কখনও কাউকে প্রশংসা করা হয় এমন কিছুর জন্যে যা গাছ-পালায়ও দেখতে পাওয়া যায়। যেমন, কারো দ্রুত বর্ধন ডগমগে চেহারা, সুন্দর গড়ন ইত্যাদির জন্যে। সেটাই যদি কৃতিত্ব হয়, তাহলে লালা কিংবা গোলাপফুল সে কৃতিত্বের সর্বাধিক দাবীদার। কখনও কাউকে এমন কিছুর জন্যে প্রশংসা করা হয়, যা জীব-জন্তুর ভেতরেও পাওয়া যায়। যেমন, দৈহিক শক্তি, সুউচ্চ কণ্ঠ, খাওয়া, শক্ত হাতে পাঞ্জা লড়া, জেদী ও প্রতিদ্বন্দ্বীতাপরায়ণ হওয়া ইত্যাদি। যদি সেটাকে কৃতিত্ব বলা হয় তা হলে গাধাকে সেক্ষেত্রে সর্বাধিক কৃতিত্বের দাবীদার বলতে হয়। হ্যাঁ, কখনও কাউকে এমন কিছুর জন্যে প্রশংসা করা হয়, যা শুধু মানুষের মধ্যেই পাওয়া যায়। যেমন, মার্জিত চরিত্র, উত্তম কর্মধারা, উন্নতমানের গুণাবলী, উচ্চাংগের শিল্প-নৈপুণ্য ও সুউচ্চ মর্যাদা ইত্যাদি।
মূলত এগুলোকেই বলা হয় মানবিক যোগ্যতা ও কৃতিত্ব। প্রত্যেক জাতির জ্ঞানী মনীষীগণ এগুলোকেই লক্ষ্য বানিয়ে নেন এবং এসব ছাড়া অন্য যেসব গুণের কথা বলা হয়েছে, তারা সেগুলোকে আদৌ কোন প্রশংসনীয় গুণ বলে মনে করেন না। অবশ্য এখনও বিষয়টি সুস্পষ্ট ও পরিশীলিত হয়নি। কারণ, সে গুণাবলীর মূল বস্তু প্রতিটি জীবের ভেতরই পাওয়া যায়। যেমন, বীরত্বের মূলে রয়েছে ক্রোধ সহকারে প্রতিশোধ নেয়া, প্রচণ্ড ভাবে অগ্রসর হওয়া ও বিপজ্জনক কাজে পা রাখা। অথচ এগুলো পুরুষ জীবজন্তুর ভেতরে যথেষ্ট দেখা যায়। কিন্তু সেটাকে তখনই বীরত্ব বলা হয়, যখন কোন মানুষ অত্যন্ত বিজ্ঞতার সাথে কল্যাণকর পথে সেগুলোর উপস্থাপনা, বাস্তবায়ন ঘটায়। তেমনি কলাকৌশল ও কারিগরী কাজের মূল বস্তু জীব জন্তুর ভেতরেও দেখা যায়।
বাউউ পাখী তার নিজের বাসা তৈরী করে। কোন কোন জীবতো স্বভাবগত ভাবে এমন শিল্পকর্ম দেখায় যা মানুষকে অনেক কষ্ট করেও সেরূপ করতে ব্যর্থ হতে হয়।
এ থেকে বুঝা গেল যে, সেগুলোও মানুষের মূল কৃতিত্ব বা মৌলিক গুণ নয়; বরং সেগুলোও প্রকৃতিগত কৃতিত্বের অন্তর্ভুক্ত! মানুষের মূল কৃতিত্ব বা গুণ হল তার ভেতরকার পশু প্রকৃতিতে মানব প্রকৃতির নিয়ন্ত্রণে রাখা, প্রবৃত্তির তাড়নাকে বিবেক-বুদ্ধির বশীভূত রাখা। তারই ফলে মানুষ জীব জগতে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও কৃতিত্বের অধিকারী হয়ে থাকে।
জেনে রেখো, মানবিক মূল গুণের সাথে যেসব ব্যাপার সম্পৃক্ত তা দু’শ্রেণীতে বিভক্ত। একটি হচ্ছে মানবের জৈবিক প্রয়োজনের কাজগুলো দ্বারা আপন উদ্দেশ্য হাসিল সম্ভব হয় না; বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসবের চাকচিক্যের মোহে ডুবে আসল উদ্দেশ্য বিস্মৃত হয়। এটা যেমন আংশিক লাভেল আশায় সামগ্রিক লাভ থেকে বঞ্চিত হওয়া। এসব ক্ষুদ্র কৃতিত্ব মূল কৃতিত্বের পরিপন্থী হয়ে থাকে। যেমন, কোন লোক নিজের উত্তেজনা সৃষ্টি করে ও কুস্তী লড়ে লড়ে বীরত্ব অর্জন করতে চায়, কিংবা আরবী কবিতা ও ভাষণ মুখস্ত করে বিশুদ্ধ আরবী ভাষী হতে চায়।
মানব চরিত্রের প্রকাশ ঘটে তার স্বজাতির সাথে ঘাত-প্রতিঘাতের ভেতর দিয়ে। তেমনি মানুষের কর্ম কৌশল উদ্ভাবিত হয় তার প্রয়োজনাদি মেটাবার গরজে। তেমনি শিল্প কার্যের প্রয়োজনে যন্ত্রপাতি আবিস্কৃত হয়। তবে এসব কিছুই জীবন সাংগ হবার সাথে সাথেই শেষ হয়ে যায়। তাই কোন ব্যক্তি যদি এ অসম্পূর্ণ গুণ নিয়ে এমনকি তার সাথে সম্পৃক্ত অস্থায়ী ব্যাপারগুলোর প্রতি অসন্তোষ নিয়েও মারা যায়, তথাপি সে মানবিক মূল গুণ থেকে বঞ্চিত থেকেই চলে যায়।
তারপর যদি তার অসম্পূর্ণ গুণ ও কার্যাবলীর পেছনে প্রবৃত্তির তাড়না সৃষ্ট সংকীর্ণ স্বার্থান্ধতা সক্রিয় থেকে থাকে, তাহলে তো লাভের বদলে শুধুই ক্ষতি হল।
দ্বিতীয় শ্রেণী হল, সে ব্যাপারগুলো যার প্রভাবে তার ভেতরকার পশু স্বভাব ফেরেশতা স্বভাবের অনুগত হয়ে যায়, সেটার নির্দেশেই চলে আর তারই রঙে রঞ্চিত হয়। তার ফেরেশতা স্বভাবটি এরূপ শক্তিশালী হতে হবে যা বিন্দুমাত্র পশু স্বভাবের প্রভাব মেনে নেবেনা। কোনমতে সেটার হিংসার ছাপ তার ওপর পড়বে না। মোমের ওপর আংটির ছাপ যেভাবে পড়ে সে ভাবে কোন মতেই পশু স্বভাবের ছাপ ফেরেশতা স্বভাবের ওপর যেন না পড়ে, তার উপায় হল এই, যখনই আত্মিক শক্তিটির কোন কিছুর প্রয়োজন দেখা দেয় আর তা সে তার দৈহিক শক্তির নিকট কামনা করে, তখন জৈবিক শক্তির কাজ হবে সে নির্দেশ পালন করা এবং কোন মনে তা অমান্য না করা। এভাবে আত্মিক শক্তির প্রতিটি নির্দেশ যদি জৈবিক শক্তি পালন করতে থাকে, তাহলে সে স্বভাবতই সেগুলোয় অভ্যস্ত হয়ে যাবে। ফলে সে নিজেই সেগুলোর আকাঙ্ক্ষা হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে যে কাজগুলো ফেরেশতা স্বভাব কামনা করে তার পশু স্বভাব তা বাধ্য হয়ে মেনে নেয়, তখন স্বভাতই প্রথমটি সন্তুষ্ট এবং দ্বিতীয়টি অসন্তুষ্ট হয়। এ ব্যাপারটি যে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব মেনে চলে বহিঃশক্তির গতিবিধির প্রতি লক্ষ্য করা। এটাও ফেরেশতা স্বভাত বা বিবেকেরই বৈশিষ্ট্য, পশু স্বভাব বা প্রবৃত্তি এ বৈশিষ্ট্য থেকে অনেক দূরে অবস্থিত।
যখন এ অবস্থা দাঁড়াবে যে, পশু প্রবৃত্তি তার বাসনা-কামনা, স্বাদ-আহলাদ ও আসক্তি-আকর্ষণ বর্জন করবে, তখন তার নাম দেয়া হবে ইবাদাত ও বিয়াযাত বা উপাসনা ও সাধনা। এটাই মানুষের সেই মূল চরিত্র অর্জনের মাধ্যমে হয় যা তার ভেতরে অনুপস্থিত। এ মাকাম বা পর্যায়ের তাৎপর্য এই দাঁড়াল, মানবের সত্যিকারের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ইবাদত ছাড়া অর্জিত হয় না।
এ কারণেই ব্যক্তি মানবের সামগ্রিক কল্যাণের ব্যাপারে মানবিক সত্তার মৌল আলোক বর্তিকা ডাক দিয়ে বলে ও কঠোরভাবে নির্দেশ দেয় যে, ব্যক্তি মানুষের দ্বিতীয় পর্যায়ের পূর্ণতার জন্যে প্রয়োজন মোতাবেক নির্ধারিত গুণের পরিমার্জন ও উন্নয়ন চাই। সে জন্যে স্বীয় প্রকৃতিকে পরিশোধিত ও সুসজ্জিত করে নিজেকে উচ্চ পরিষদের সদস্যদের পর্যায়ে উন্নীত করাকে জীবনের মূল লক্ষ্য ও সাধনা বলে স্থির করতে হবে। এমন কি নিজের ভেতরে এরূপ যোগ্যতা সৃষ্টি করতে হবে যার ফলে জৈবিক ও আত্মিক উভয় শক্তির ভারসাম্যের প্রভাব সে বিমণ্ডিত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে জৈবিক শক্তি আত্মিক শক্তির নির্দেশে পরিচালিত হবে এবং সে ফেরেশতা স্বভাতের মূর্তরূপ ধরে প্রতিভাত হবে। কোন মানুষ যখন সুস্থ মানসিকতার অধিকারী হয়, আরতার অস্তিত্ব যখন মানবিক বিধি-বিধান পুরোপুরি ধারণের যোগ্য হয়ে যায়, তখন সে উক্ত দুর্লভ গুণ বা বৈশিষ্ট্যের জন্য উদগ্রীব হয়। লোহকে যেভাবে চুম্বক টেনে নিয়ে যায়, ঠিক তেমনি তখন সেই ব্যক্তি সত্তাকে উক্ত গুণটি টেনে নেয়। এটা একটা প্রকৃতিগত অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যাপার। আল্লাহ পাক এ স্বভাব দিয়েই মানুষ সৃষ্টি করেছেন।
তাই দেখা যায়, যখন কোন জাতি উক্তরূপ ভারসাম্যপূর্ণ স্বভাব আয়ত্ত করে ফেলে, তখন তাদের ভেতর এরূপ মনীষী অবশ্যই দেখা দেয় যিনি তাদের সেই প্রশংসনীয় চরিত্রকে পূর্ণথায় পৌঁছে দিতে যত্নবান হন। মূলত সেটাকেই তখন তারা সর্বোচ্চ সৌভাগ্য বলে ভেবে থাকে। রাষ্ট্রনায়ক ও প্রশাসনের দৃষ্টি সে দিকেই থাকে। জনগণও তাদের প্রভাবে অনুরূপ গড়ে উঠে। সমগ্র দুনিয়ায় তারা মানবতার অত্যুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে বিরাজ করে। সে দেশে সরকার ও জনতা তখন ফেরেশতাদের দলে শামিল হয়ে যায়। সে দেশের মানুষ ও পুণ্যময় অনুশাসনের বরকতে ধন্য হয়ে চলে। দেশে দেশে তাদের স্বাগত সম্ভাষণ শুরু হয়ে যায়। একমাত্র মানবতার সহজাত মানসিক বিধি-বিধান ছাড়া আরব-আজম, সাদা-কালো, ধার্মিক-অধার্মিক, কাছের-দূরের, উঁচু-নীচু সর্বস্তরের সকল দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার আর কোন বিধি-বিধান রয়েছে কী? নেই, তা থাকতেও পারে না। এক মাত্র মানবিক মৌলিক গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্যের ওপরেই দুনিয়ার সকল মানুষকে একমত করা যেতো, কারণ, তুমি দেখতে পেলে যে প্রতিটি মানুষের ভেতর ফেরেশতা স্বভাবের বিবেক বিদ্যমান। তাদের মর্যাদা যে কত বড় আর তাদের ভেতরকার উত্তম চরিত্রের লোকদের আসন যে কত ঊর্ধ্বে তাও তুমি দেখতে পেয়েছ। আল্লাহই সর্বশক্তিমান।
পরবর্তী পর্ব
মানব সমাজের বিভিন্ন সংগঠন - ১২
মানবিক বৈশিষ্ট্যের তারতম্য
মানবিক বৈশিষ্ট্যের তারতম্য




