মঙ্গলবার, ৮ এপ্রিল, ২০২৫

আত্মদর্শন (৩১) নবুওয়াতের হাকিকত



আত্মদর্শন পর্ব - ৩১
📚কিমিয়ায়ে সাদাত ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

নবুওয়াতের হাকিকত 
উপরে যাহা বর্ণিত হইল তাহা যে ব্যক্তি ভালরূপে বুঝতে না পারিবে সে নবূওতের হাকীকত বুঝিতে পারিবে না; তবে অপরের মুখে শুনিয়া এতটুকু বুঝিতে পারিবে যে  নবুয়ত ও বেলায়েত মানবাত্মার অতি গৌরবান্বিত সোপানসমূহের অন্যতম। এরূপ উন্নত অবস্থাপ্রাপ্ত লোক তিন প্রকার গুণসম্পন্ন হইয়া থাকেন, যথা 
(১) স্বপ্নে সর্বসাধারণ লোকে যাহা দেখিতে পায়, তাহারা জাগ্রতাবস্থায় তাহা সুস্পষ্ট জানিতে পারেন। 
(২) সর্বসাধারণের আত্মা কেবল নিজ শরীরের উপরই আধিপত্য চালাইতে পারে, কিন্তু তাঁহাদের আত্মা জগতের মঙ্গল সাধনে স্বীয় শরীর ব্যতীত সমস্ত বস্তুর উপর আধিপত্য চালাইতে পারে। 
(৩) সাধারণ লোক যে ইল্‌ম উস্তাদের নিকট শিক্ষা করিয়া লাভ করে, তাঁহারা ইহা বিনা উস্তাদে স্বীয় হৃদয়ে লাভ করিয়া থাকেন। যাহাদের বুদ্ধি একটু প্রখর ও আত্মা কতকটা পবিত্র তাহারা বিনা শিক্ষায় কোন কোন বিদ্যা লাভ করিতে পারেন। এমত অবস্থায় যাঁহারা অসাধারণ তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন এবং যাহাদের আত্মা খুব পবিত্র, তাঁহারা বিনা উস্তাদে নিজে নিজে প্রচুর ইল্ল্ম বা সমস্ত ইল্ম লাভ করিতে পারিবে, ইহাতে কোন সন্দেহ নাই। এই প্রকারে প্রাপ্ত জ্ঞানকে ‘ইল্‌মে লাদুনী’ বলে যেমন আল্লাহ্ বলেন  : “আর আমি তাহাকে আমার নিকট হইতে ইল্‌ম শিখাইয়াছিলাম ।” (সূরা কাহাফ, রুকূ ৮) । যে ব্যক্তি উক্ত ত্রিবিধ গুণে গুণান্বিত, তিনি শ্রেষ্ঠ পয়গম্বরগণের বা শ্রেষ্ঠ ওলীগণের অন্তর্ভুক্ত। যাহার মধ্যে এই তিনটি গুণের একটি থাকে। তিনিও এই শ্রেণীর অন্তর্গত । তবে তাঁহারা এক শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হইলেও তাঁহাদের মধ্যে বিরাট পার্থক্য আছে। কারণ কাহারও মধ্যে ঐ ত্রিবিধ গুণই রাসূলে মাকবুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর মধ্যে অতি পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান ছিল। তাঁহার নবূওতের উন্নত অবস্থার কথা অবগত হইয়া যাহাতে বিশ্ববাসী তাঁহার অনুসরণ করে এবং সৌভাগ্যের পথ পায় তজ্জন্য আল্লাহ্ উক্ত তিনটি গুণের প্রত্যেকটিরই আভাসমাত্র সকলকেই দান করিয়াছেন। এই কারণেই কেহ স্বপ্নে দেখেন; কেহ বা স্বীয় প্রভাবে অপরের বুদ্ধি সুপথে পরিচালিত করেন, আবার কেহ বা স্বীয় হৃদয়কে বিনা উস্তাদে জ্ঞানলাভের উপযোগী পাইয়া থাকেন। যে বস্তুর জ্ঞান নাই তত্পতি লোকে বিশ্বাস স্থাপন করতে পারে না। কারণ, যাহার ছায়ামাত্রও হৃদয়ে নাই তাহার আকৃতি কখনও বুঝা যায় না। এই জন্যই আল্লাহ্’র হাকীকত আল্লাহ্ ব্যতীত যথাযথভাবে অপর কেহই বুঝিতে পারে না। এই বাক্যের বিশদ ব্যাখ্যা বহু বিস্তৃত। ‘মাআনী আসমা ইল্লাহ্' কিতাবে স্পষ্ট দলিলের সহিত আমি ইহা বর্ণনা করিয়াছি। 

ওলী ও পয়গম্বগণের গুণ সাধারণের ধারণাতীত 

আত্মদর্শন (৩০) মু'জিযা, কেরামত ও যাদু



আত্মদর্শন পর্ব - ৩০
📚কিমিয়ায়ে সাদাত ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

মু'জিযা, কেরামত ও যাদু 
পয়গম্বরগণের মাধ্যমে তদ্রূপ অলৌকিক ক্ষমতা প্রকাশ পাইলে উহাকে মু'জিযা ও ওলীগণের মাধ্যমে প্রকাশ পাইলে উহাকে কারামত বলে এই প্রকার গুণসম্পন্ন ব্যক্তি সৎকার্যে প্রবৃত্ত থাকিলে তাঁহাকে ওলী বলে এবং অন্যায়কার্যে লিপ্ত থাকিলে তাহাকে যাদুকর বলে। যাদু, মু'জিযা, কারামত, সমস্তই মানবাত্মার অলৌকিক ক্ষমতার কার্য। কিন্তু উহাদের আকাশ-পাতাল প্রভেদ রহিয়াছে। এই প্রভেদের বিস্তারিত বর্ণনা এ ক্ষুদ্র গ্রন্থে সমাবেশ হইবে না।

নবুওয়াতের হাকিকত 

আত্মদর্শন (২৯) অন‍্যেন‍্য পদার্থের উপর আত্মার প্রভাব



আত্মদর্শন পর্ব - ২৯
📚কিমিয়ায়ে সাদাত ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

অন‍্যেন‍্য পদার্থের উপর আত্মার প্রভাব 
ইহাও জানিয়া রাখা আবশ্যক যে, যে সকল আত্মা অতি শ্রেষ্ঠ ও বলবান এবং যে সকল আত্মায় ফেরেশতাগণের মাত্রা বেশি, স্বীয় শরীর ব্যতীত অন্যান্য পদার্থও তাহাদের অধীন হইয়া থাকে। এইরূপ আত্মার প্রতাপ সিংহ-ব্যাঘ্রের উপর পড়িলে তাহারাও নম্র ও অধীন হইয়া পড়ে। আবার কোন সুস্থ ব্যক্তির বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হইলে সে পীড়িত হইয়া পড়ে। কোন ব্যক্তিকে নিকট পাইতে ইচ্ছা করিলে সেও তাঁহার নিকট আগমনের ইচ্ছা করে। তদ্রূপ ব্যক্তি বৃষ্টি পাইতে চাহিলে বৃষ্টিপাত হইয়া থাকে। আত্মার যে এই প্রকার ক্ষমতা আছে তাহা যুক্ত দ্বারা প্রমাণ করার যায় এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা দ্বারাও ইহা প্রমাণিত সত্য। বদনযর ও যাদু এই শ্রেণীর কার্যের অন্তর্ভুক্ত। সকল বস্তুর উপরই মানবাত্মার প্রভাব আছে। হিংসাপরায়ণ ব্যক্তি যদি কোন পশুর দিকে বদনজর করত ইহাকে বিনাশ করিতে চায় তবে তাহা তৎক্ষণাৎ বিনাশপ্রাপ্ত হয়; তেমনি হাদীস শরীফে উক্তি আছে- “বদনজর মানুষকে কবরে ও উটকে ডেগে লইয়া যায়।” আত্মার ক্ষমতাসমূহের মধ্যে ইহা একটি বিস্ময়কর ক্ষমতা। 

মু'জিযা, কেরামত ও যাদু 

আত্মদর্শন (২৮) স্বীয় দেহে আত্মার অপ্রতিহত ক্ষমতা



আত্মদর্শন পর্ব - ২৮
📚কিমিয়ায়ে সাদাত ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

স্বীয় দেহে আত্মার অপ্রতিহত ক্ষমতা
যে সকল বস্তু আত্মার অধীনে আছে তন্মধ্যে স্বীয় দেহই প্রধান কারণ দেহের কোন অঙ্গেই আত্মা আবদ্ধ নহে; অথচ সমস্ত দেহই আত্মার আদেশে চলে। যেমন, আত্মা অঙ্গুলীর মধ্যে নহে, ইহাতে জ্ঞান বা ইচ্ছাশক্তিও নাই; অথচ আত্মার আদেশে অঙ্গুলী পরিচালিত হয়। হৃদয়ের ক্রোধের সঞ্চার হইলে সমস্ত শরীর হইতে ঘর্ম নির্গত হয়। ইহা বারিবর্ষণ তুল্য। কামভাব হৃদয়ে প্রবল হইলে শরীরে একপ্রকার আন্দোলনের সৃষ্টি হয় এবং ইহার গতি অঙ্গ বিশেষের দিকে পরিচালিত হয়। অন্তরে আহারের ইচ্ছা হইলে রসনার নিম্নস্থ এক প্রকার শক্তি খেদমতের জন্য প্রস্তুত হয় এবং খাদ্যদ্রব্য ভিজাইবার জন্য লালা রস বাহির করে যাহাতে আহার্যবস্তু সহজেই উদরস্থ হইতে পারে। এই সকল বিষয় হইতে পরিষ্কারভাবে বুঝা যায় যে, শরীরের উপর আত্মার প্রভুত্ব চলিতেছে এবং শরীর আত্মার অধীন I 

অন‍্যেন‍্য পদার্থের উপর আত্মার প্রভাব 

আত্মদর্শন (২৭) আত্মার ক্ষমতাজনিত শ্রেষ্ঠত্ব



আত্মদর্শন পর্ব - ২৭
📚কিমিয়ায়ে সাদাত ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

আত্মার ক্ষমতাজনিত শ্রেষ্ঠত্ব
মানবাত্মার জ্ঞানজনিত শ্রেষ্ঠত্ব সম্বন্ধে কিঞ্চিত বর্ণিত হইল। এখন ইহার ক্ষমতাজনিত শ্রেষ্ঠত্ব সম্বন্ধে বলা হইতেছে। এই প্রকার শ্রেষ্ঠত্বও ফেরেশতাদের এক গুণ, এ গুণ পশুপক্ষীর নাই। জড়জগতের কার্য পরিচালনার জন্য ফেরেশতাগণ নিযুক্ত আছেন। জগতের পক্ষে যখন বৃষ্টি হিতকর ও আবশ্যক হয় তখন ফেরেশতাগণ আল্লাহর আদেশে বৃষ্টি বর্ষণ করেন। তাঁহারা বসন্তকালে মৃদুমন্দ বায়ু প্রবাহিত করেন, বাচ্চাদানিতে জীবের মূর্তি এবং জমিতে উদ্ভিদের আকার গঠন করত বর্ধিত করেন। এক এক রকম কার্যে এক এক শ্রেণীর ফেরেশতা নিযুক্ত আছেন। মানবাত্মাও ফেরেশতা জাতির অন্তর্ভুক্ত। আত্মাকেও আল্লাহ্ ক্ষমতা দিয়াছেন এবং জড়জগতের কিয়দংশ ইহার অধীন করিয়া রাখিয়াছেন। 

স্বীয় দেহে আত্মার অপ্রতিহত ক্ষমতা

আত্মদর্শন (২৬) ওলীর উন্নত অবস্থা সাধনাসাপেক্ষ



আত্মদর্শন পর্ব - ২৬
📚কিমিয়ায়ে সাদাত ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

ওলীর উন্নত অবস্থা সাধনাসাপেক্ষ 
ওলীগণের আল্লাহর নৈকট্য প্রাপ্তি ও কারামতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর। আর জানিয়া রাখ যে, ওলীগণের এই উন্নত অবস্থা প্রথমত কঠোর সাধনার উপর নির্ভর করে- বিনা সাধনায় ওলী হওয়া যায় না। কিন্তু যে ব্যক্তি কৃষিকার্য করে সে শস্যও পাইবে, যে ব্যক্তি পথ চলে সে গন্তব্যস্থানেও পৌছিবে এবং যে অনুসন্ধান করে সে বাঞ্ছিত বস্তুও লাভ করিবে, এরূপ কোন নিশ্চয়তা নাই। যে কার্য যত গৌরবের ইহার শর্তাবলীও তত অধিক এবং ইহা অর্জন করাও ততই দুষ্কর। জ্ঞানলাভের কার্যই মানুষের শ্রেষ্ঠ কার্য, তন্মধ্যে আল্লাহর পরিচয়-জ্ঞান সর্বাপেক্ষা গৌরবান্বিত । বিনা সাধনা ও মুর্শিদে কামিল ব্যতীত এই পথে চলা যায় না । আবার উপযুক্ত সাধনা ও মুর্শিদে কামিল থাকিলেও আল্লাহর সাহায্য না হইলে এবং সৃষ্টির প্রারম্ভে সেইরূপ সৌভাগ্য অদৃষ্টে লিপিবদ্ধ না থাকিলে গৌরবের সেই উন্নত সীমায় উপনীত হওয়া যায় না । জাহেরী ইলমে নেতৃত্ব লাভ ও যাবতীয় কার্যের বেলায়ই এ কথা খাটে ।

আত্মার ক্ষমতাজনিত শ্রেষ্ঠত্ব

আত্মদর্শন (২৫) নবী ও ওলী



আত্মদর্শন পর্ব - ২৫
📚কিমিয়ায়ে সাদাত ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

নবী ও ওলী
যে ব্যক্তির প্রতি আধ্যাত্মিক জ্ঞানের পথ উদ্‌ঘাটিত হইয়াছে তাহাতে যদি আল্লাহ্ জগতের মঙ্গল কিসে হয় তাহা শিক্ষা দেন এবং তিনিও বিশ্ববাসীকে আহ্বান করত তদনুযায়ী হিদায়েত করেন তবে তিনি আল্লাহর নিকট হইতে যে শিক্ষাপ্রাপ্ত হন তাকে শরীয়ত বলে ও তাঁহাকে নবী বলা হয়। নবীর অলৌকিক কার্যকলাপকে মু'জিযা বলে। আর তদ্রূপ ব্যক্তি যদি সমস্ত বিশ্ববাসীকে আহ্বানপূর্বক হিদায়েত করিবার জন্য আল্লাহ্ কর্তৃক নিযুক্ত না হন তবে তাঁহাকে ওলী বলে এবং তাহার অলৌকিক কার্যকলাপকে কারামত বলে । আল্লাহ্ প্রদত্ত জ্ঞানে বিভূষিত ও অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য আপনা-আপনিই বিশ্বমানবের হিদায়েত কার্যে লিপ্ত হওয়া জরুরী নহে। বরং আল্লাহ্ নিজ ক্ষমতায় এক এক ব্যক্তিকে যোগ্যতানুসারে এক এক কার্যে নিযুক্ত করিয়া রাখেন। কোন ওলীকে বিশ্বের হিদায়েতের ভার অর্পণ না করার বিভিন্ন কারণ থাকিতে পারে। হয়ত তখন শরীয়ত জীবিত আছে এবং তজ্জন্য বিশ্ববাসীকে নূতনভাবে আর শিক্ষা দিবার প্রয়োজন নাই অথবা জগতের শিক্ষাগুরু হওয়ার জন্য নবীগণের যে যে গুণ থাকা আবশ্যক উহা তাঁহার মধ্যে পূর্ণভাবে নাই।

ওলীর উন্নত অবস্থা সাধনাসাপেক্ষ 

আত্মদর্শন (২৪) আত্মার আদি অবস্থা

আত্মদর্শন পর্ব - ২৪
📚কিমিয়ায়ে সাদাত ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)



আত্মার আদি অবস্থা 
উক্ত প্রকার জ্ঞান শুধু পয়গম্বরগণের একচেটিয়া, তাঁহারা ব্যতীত আর কেহই উহা লাভ করিতে পারে না, এরূপ মনে করিও না। বরং সকল মানবাত্মাই আদিম অবস্থায় তদ্রূপ উপযুক্ত থাকে। সৃষ্টিগতভাবে এমন কোন লোকই নাই যাহা স্বচ্ছ আয়না তৈরির উপযোগী নহে, যাহাতে বিশ্বজগতের সকল পদার্থের প্রতিবিম্ব প্রতিফলিত হইতে পারে। কিন্তু লৌহে মরিচা ধরিয়া ইহাকে আসলেই নষ্ট করিয়া দিলে ইহার প্রতিবিম্ব গ্রহণের ক্ষমতা আর থাকে না। আত্মার অবস্থাও ঠিক এইরূপ। সংসারের লোভ, কুপ্রবৃত্তি ও পাপ দ্বারা আত্মা আচ্ছাদিত ও কলুষিত হইলে উহা আধ্যাত্মিক জ্ঞান লাভের ক্ষমতা হারাইয়া ফেলে। এই সম্বন্ধেই হাদীসে উল্লেখ আছে “প্রত্যেক মানব সন্তানই মুসলমানরূপে জন্মগ্রহণ করে। তৎপর তাহাদের মাতাপিতা যে যেইরূপ তাহাদিগকে ইয়াহুদী খ্রিস্টান বা অগ্নি উপাসকরূপে পরিণত করে।” সকল মানবই জ্ঞান লাভে উপযুক্ত। তৎসম্বন্ধে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন : “আমি কি তোমাদের প্রভু নই? তাহারা বলিল- হাঁ।” কোন ব্যক্তি যদি অপর কাহাকেও জিজ্ঞাসা করে দুই কি এক অপেক্ষা অধিক নহে? উত্তরে সকলেই বলিবে - হ্যাঁ, নিশ্চয়ই অধিক। যদিও ইহার যথার্থ সকলে শুনে নাই, মুখেও বলে তথাপি সকলের হৃদয়েই ইহার সত্যতা বদ্ধমূল হইয়া রহিয়াছে। তদ্রূপ আল্লাহর সম্বন্ধে জ্ঞানও সৃষ্টিগতভাবে সকলের প্রকৃতির মধ্যেই নিহিত আছে। যেমন আল্লাহ্ বলেন : “আর যদি আপনি তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করেন কে তোমাদিগকে সৃষ্টি করিয়াছে? তাহারা নিশ্চয়ই বলিবে আল্লাহ্।” তিনি আরও বলেন “যে প্রকৃতির উপর মানুষ সৃষ্ট হইয়াছে, ইহাই আল্লাহর সৃষ্ট প্রকৃতি।”

যুক্তি-প্রমাণ ও অভিজ্ঞতা দ্বারাও জানা গিয়াছে যে, বিনা উস্তাদে জ্ঞান লাভ ও অদৃশ্য বস্তু দর্শন কেবল পয়গম্বরদের একচেটিয়া নহে। কারণ পয়গম্বরগণও মানুষ। আল্লাহ্ তা'আলা রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে লক্ষ্য করিয়া বলেন : “বলুন, আমি তোমাদের ন্যায় একজন মানুষ ব্যতীত আর কিছুই নহি।”

নবী ও ওলী

আত্মদর্শন (২৩) জ্ঞানের শ্রেনীবিভাগ



আত্মদর্শন পর্ব - ২৩
📚কিমিয়ায়ে সাদাত ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

জ্ঞানের শ্রেনীবিভাগ
উল্লিখিত আয়াতসমূহ হইতে কিরূপ সাধনা ও পরিশ্রম করিতে হয় তাহা শিক্ষা পাওয়া যায়। তদনুযায়ী আমল করিতে লোকের সহিত শত্রুতা, দুনিয়ার লোভ-লালসা, ইন্দ্রিয় চরিতার্থে লিপ্ততা প্রভৃতি দোষ হইতে হৃদয় নির্মল হইয়া উঠে। ধর্মগ্রন্থাদি অধ্যয়ন করত এরূপ জ্ঞান লাভ করা আলিমগণের তরীকা। ইহা উৎকৃষ্ট বটে, কিন্তু নবীগণের তরীকার তুলনায় ইহা অতি তুচ্ছ। আম্বিয়া আওলিয়াগণ বিনা উস্তাদে আল্লাহর দরবার হইতে যে জ্ঞান লাভ করেন তাহা মানবের নিকট হইতে অর্জিত জ্ঞান হইতে বহুগুণে শ্রেষ্ঠ। বিনা উস্তাদে যে জ্ঞান লাভ হয় তাহা বহু অভিজ্ঞতা যুক্তি প্রমাণে সাব্যস্ত হইয়াছে। তুমি যদি স্বীয় স্বাভাবিক অনুরাগ প্রভাবে তদ্রূপ অবস্থা লাভ করিতে না পার, উস্তাদের উপদেশও লাভ করিতে অক্ষম হও এবং যুক্তি-প্রমাণেও বুঝিতে না পার তথাপি অন্ধভাবে বিশ্বাস করা উচিত যে, সেইরূপ অবস্থায় উন্নীত হওয়ার যোগ্যতা মানুষের আছে তাহা হইলেও তুমি অবিশ্বাসী হইয়া এই তিন শ্রেণী হইতে বহির্গত হইবে না। এই সকল অন্তরজগতের বিস্ময়কর ব্যাপার এবং উহা হইতেই আত্মার শ্রেষ্ঠত্ব উপলব্ধি করা যায়।


আত্মার আদি অবস্থা 

আত্মদর্শন (২২) জাগ্রতাবস্থায় আধ্যাত্মিক জগতের জ্ঞান লাভের উপায়



আত্মদর্শন পর্ব - ২২
📚কিমিয়ায়ে সাদাত ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

জাগ্রতাবস্থায় আধ্যাত্মিক জগতের জ্ঞান লাভের উপায় —
প্রিয় পাঠক, মনে করিও না যে, স্বপ্ন ও মৃত্যু ব্যতীত আধ্যাত্মিক জগতের দিকে আত্মার দ্বার খোলে না। কোন ব্যক্তি যদি প্রকৃত রিয়াযত মুজাহাদা ও সাধনা করে ক্রোধ-লোভাদি রিপুসমূহ হইতে নিজেকে বাঁচাইয়া রাখে, মন্দ স্বভাব হইতে আপনাকে পবিত্র রাখে, নির্জনে চক্ষু বন্ধ করত উপবেশনপূর্বক জড়জগত হইতে ইন্দ্রিয়সমূহের সকল সম্বন্ধ ছিন্ন করে এবং অপর দিকে আধ্যাত্মিক জগতের সহিত আত্মার সংযোগ স্থাপন করত রসনা দ্বারা নহে বরং হৃদয় হইতে ‘আল্লাহ্' 'আল্লাহ্' যিকির করিতে থাকে, এমনকি নিজকে ও সমস্ত বিশ্বজগত ভুলিয়া যায়- এক আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কোন কিছুরই তাহার খবর থাকে না, তবে জাগ্রত অবস্থায়ও তাহার অন্তর্দ্বার খোলা থাকিবে। লোকে স্বপ্নে যাহা দেখিতে পায় এরূপ অবস্থাপ্রাপ্ত ব্যক্তি জাগ্রত অবস্থাতেই তাহা দেখিতে পাইবে, ফেরেশতাগণ মনোহর মূর্তিতে তাহার নিকট প্রকাশিত হইবে আর সে ব্যক্তি পয়গম্বরগণকে দেখিতে পাইবে এবং তাঁহাদের নিকট হইতে সাহায্য পাইবে, আসমান-যমীনের সমস্ত রাজ্য তাহার নয়নগোচর হইবে যাহার প্রতি এই পথ খোলা হইয়াছে, তিনি বিশ্বজগতের আশ্চর্য আশ্চর্য তামাশা দেখিতে পান এবং এমন এমন ব্যাপার তাঁহার সম্মুখে উদ্ঘাটিত হয় যাহা বর্ণনাতীত। এই অবস্থা সম্বন্ধেই রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : “আমাকে সমস্ত জগত দেখানো হইয়াছে। অনন্তর আমি বিশ্বের পূর্ব হইতে পশ্চিম পর্যন্ত সমস্ত দেখিয়াছি।” আল্লাহ্ও এই অবস্তা সম্বন্ধেই বলেনঃ “আর তদ্রূপ আমি ইব্রাহীম (আ.)-কে আসমান ও যমীনের সমস্ত রাজ্য দেখাইয়াছি।” সমস্ত পয়গম্বরের জ্ঞান এইরূপেই হাসিল হইয়াছিল; ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে বা শিক্ষার পথে অর্জিত হয় নাই। তাঁহাদের রিয়াযত মুজাহাদাই এই জ্ঞানের মূল উৎস। যেমন আল্লাহ্ বলেন : “সব সম্বন্ধ ছিন্ন করত কেবল তাঁহার (আল্লাহর) দিকে আস, সব ছাড়িয়া তাঁহাকেই স্মরণ কর। নিজকে আল্লাহর এখতিয়ারে ছাড়িয়া দাও। দুনিয়া অর্জনে লিপ্ত হইও না, তিনি সকল কার্যের বন্দোবস্ত করিয়া দিয়া থাকেন।” তিনি আরও বলেন : “তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের প্রভু, তিনি ব্যতীত আর কেহই উপাস্য নাই। অনন্তর তাঁহাকেই কার্যনির্বাহ ধর।” তুমি যখন আল্লাহকে কার্যনির্বাহক ধরিলে তখন বেপরোয়া থাক এবং দুনিয়ার সহিত আর মিলিত হইও না। আল্লাহ্ তৎপর বলেন “আর তাহারা যাহা বলিয়া থাকে তাহাতে তুমি সবর কর এবং তাহাদিগকে সদ্ভাবে ছাড়িয়া দাও।”

জ্ঞানের শ্রেনীবিভাগ

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...