রবিবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৫

হজ্জ (৪) হজ্জের অবশ্য করণীয় কার্যাবলী



হজ্জ (পর্ব – ৪)
📚সৌভাগ্যের পরশমনি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী(রহ.)

হজ্জের অবশ্য করণীয় কার্যাবলী —

হজ্জের অবশ্য করণীয় কার্য পাঁচটি; যথা-(ইহরাম বাঁধা, (কা'বা শরীফ তাওয়াফ করা, (সাঈ অর্থাৎ সাফা হইতে মারওয়া পাহাড় পর্যন্ত নির্ধারিত নিয়মে দৌড়ান, (আরাফার ময়দানে দণ্ডায়মান হওয়া এবং (অপর এক রেওয়ায়েত মতে মস্তক মুণ্ডন করা। (হানাফী মতে মস্তক মুণ্ডন অবশ্য কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত নহে) 

হজ্জের ওয়াজিব কার্য ছয়টি। তন্মধ্যে যে কোন একটি ত্যাগ করিলে হজ্জ বিনষ্ট হইবে না বটেকিন্তু ইহার কাফ্ফারাস্বরূপ একটি ছাগ কুরবানী করা ওয়াজিব হইবে। ওয়াজিবগুলি এই- (মীকাতঅর্থাৎ নির্ধারিত স্থানে ইহরাম বাঁধাইহরাম না বাঁধিয়া মীকাত অতিক্রম করিলে ইহার কাফফারাস্বরূপ একটি ছাগল কুরবানী করিতে হইবে (মিনায় প্রস্তর নিক্ষেপ করা (সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফার ময়দানে অবস্থান করা। (মুযদালফা নামক স্থানে রাত্রি যাপন করা। (এইরূপে মিনায় অবস্থান করা, (বিদায়কালে কা'বা শরীফ তাওয়াফ করা। কাহারও মতে শেষোক্ত চারিটিকার্য পরিত্যাগ করিলে ছাগল কুরবানী ওয়াজিব না হইয়া সুন্নাত হইবে।


পরবর্তী পর্ব —
হজ্জ করিবার প্রণালী 

হজ্জ (৩) হজ্জ ফরয হওয়ার শর্ত



হজ্জ (পর্ব – ৩)
📚সৌভাগ্যের পরশমনি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী(রহ.) 

হজ্জ ফরয হওয়ার শর্ত —

(মুসলমান হওয়া, (বালেগ হওয়া, (আযাদ হওয়া  (সামর্থ্য থাকা। এই সামর্থ্য দুইপ্রকার-(সুস্থ দেহে শরীর খাটাইয়া স্বয়ং হজ্জ করিবার শক্তি থাকা। এই শক্তি আবার তিন জিনিসে লাভ হয়- (সুস্থ শরীর, (নিরাপদ রাস্তা অর্থাৎ পথিমধ্যে ভয়সঙ্কুল সমুদ্র এবং শত্রু কর্তৃক জান মাল নাশের আশংকা না থাকা এবং (এই পরিমাণ ধন থাকা যদ্দ্বারা সমস্ত ঋণ পরিশোধ করত যাতায়াতের যানবাহন  থাকা খাওয়ার ব্যয় স্বাচ্ছন্দ্যে চলে এবং তদুপরি সফর হইতে দেশে ফিরিয়া আসা পর্যন্ত পরিবারস্থ সকলের ভরণ-পোষণ স্বাচ্ছন্দ্যে নির্বাহ হয় (যে ব্যক্তি নিজের শরীর খাটাইয়া হজ্জ করিতে পারে নাযেমন শরীর অবশ হইয়া পড়িল বা পীড়াগ্রস্ত হইয়া এমনভাবে শয্যাশায়ী হইল যেপুনরায় আরোগ্য লাভের আশা নাই তাহার সামর্থ্য এইতাহার এই পরিমাণ ধন থাকা আবশ্যক যাহাতে সে অন্য একজনকে যাবতীয় খরচ  মজুরি দিয়া তাহার প্রতিনিধিস্বরূপ পাঠাইয়া তাহার পক্ষ হইতে হজ্জ করাইতে পারে। অচল ব্যক্তির পুত্র পিতা হইতে কোন খরচ গ্রহণ নাকরিয়া নিজ ব্যয়ে পিতার হজ্জ করিয়া দিতে চাহিলে ইহাতে সম্মতি হওয়া পিতার কর্তব্য। কারণপিতার খেদমত করা মর্যাদা  সম্মানের বিষয়। কিন্তু পুত্র নিজে হজ্জে না যাইয়া যদি বলেআমি যাবতীয় খরচ  মজুরি দিতেছিআপনি অপর কাহাকেও প্রতিনিধিস্বরূপ প্রেরণ করত আপনার হজ্জ-করাইয়া লউন তবে এরূপ প্রস্তাবে সম্মতি দেওয়া পিতার অবশ্য কর্তব্য নহে। কারণ ইহাতে ইবাদত-কার্যে পুত্রের অনুকম্পা গ্রহণ করা হয়। এইরূপ কোন অনাত্মীয় যদি অচল ব্যক্তি হইতে খরচাদি গ্রহণ না করিয়া প্রতিনিধিরূপে তাহার হজ্জ করিয়া দিতে ইচ্ছা করে তবে এইরূপ অনুকম্পা গ্রহণ করাও আবশ্যক নহে।


হজ্জ সম্পাদনের সামর্থ্য হওয়ামাত্র অবিলম্বে হজ্জ সম্পাদন করা উচিত। বিলম্ব করাও দুরস্ত আছে।পরবর্তী কোন বৎসরে হজ্জ করিয়া থাকিলে তো মঙ্গলকিন্তু বিলম্ব করিতে করিতে হজ্জ করিবার পূর্বেই মৃত্যু হইলে গুনাহগার হইয়া মরিতে হইবে। কেহ ফরয হজ্জ আদায় না করিয়া মরিলে মৃত ওসিয়ত করুক বা না করুক তাহার পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে প্রতিনিধি প্রেরণ করত হজ্জ করাইয়া লওয়া তাহার উত্তরাধিকারিগণের কর্তব্য। কারণ ইহা মৃত ব্যক্তির ঋণস্বরূপ। হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন- "যে শহরের অধিবাসী হজ্জের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও হজ্জ না করেআমার ইচ্ছা হয় যে তাহাদের নিকট হইতে জিযিয়া আদায় করিবার জন্য আমার অধীনস্ত শাসনকর্তাদিগকে আদেশ দেই।" (নিজেদের জানমাল রক্ষার্থে অমুসলমান প্রজাবৃন্দ মুসলিম রাষ্ট্রকে যে কর প্রদান করে তাহাকে জিযিয়া বলে)


পরবর্তী পর্ব –
হজ্জের অবশ্য করণীয় কার্যাবলী 

হজ্জ (২) হজ্জের শর্তসমূহ (সৌভাগ্যের পরশমনি)



হজ্জ (পর্ব – ২)
📚সৌভাগ্যের পরশমনি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

হজ্জের শর্তসমূহ 

নির্ধারিত সময়ে হজ্জ করিলে হজ্জ দুরস্ত হইবে। পহেলা শাওয়াল হইতে ৯ই যিলহজ্ব সময়। (এই সময়ে হজ্জের আনুষঙ্গিক কার্য করা যায় বলিয়া হজ্জের সময় বলা হইয়াছে) ঈদুল ফিতরের দিন প্রাতঃকাল হইতেই হজ্জের জন্য ইহরাম বাঁধা জায়েয। ইহার পূর্বে ইহরাম বাঁধিলে হজ্জ হইবে নাবরং ওমরাহ হইবে। ভালমন্দ বুঝিতে পারে এমন বালকের হজ্জ দুরস্ত হইবে। দুগ্ধপোষ্য শিশু হইলে অভিভাবক যদি তাহার পক্ষে ইহরাম বাঁধিয়া শিশুকে আরাফার "ময়দানে উপস্থিত রাখিয়া সাঈ  তওয়াফ” করে তবে এই হজ্জ শিশুর পক্ষেই গণ্য হইবে। অতএব নির্ধারিত সময়ে অনুষ্ঠিত হওয়াই হজ্জের শর্ত। কিন্তু ইসলামের হজ্জের দায়িত্ব হইতে অব্যাহতি লাভ এবং ফরয আদায় হওয়ার জন্য পাঁচটি শর্ত রহিয়াছেযথা- (মুসলমান হওয়া, (আযাদ হওয়া, (বালেগ হওয়া, (বোধসম্পন্ন হওয়া, (নির্দিষ্টসময়ে ইহরাম বাঁধা। নাবালেগ অথবা দাস-দাসী যদি ইহরাম বাঁধে এবং আরাফাতের ময়দানে দণ্ডায়মান হওয়ার পূর্বে বালেগ হয় বা স্বাধীনতা লাভ করে তবে তাহারা হজ্জের দায়িত্ব হইতে অব্যাহতি পাইবে। ফরয ওমরাহ আদায়ের জন্যও উল্লিখিত পাঁচটি শর্ত রহিয়াছে। কিন্তু ওমরাহ সারা বৎসরই করা যায়।


অন্যের পক্ষ হইতে প্রতিনিধিস্বরূপ হজ্জ করিবার শর্ত এই যেপ্রথমে নিজের ফরয হজ্জ আদায় করিয়া লইতে হইবে। নিজের ফরয হজ্জ আদায়ের পূর্বে অপরের বদলী হজ্জ করিবার নিয়ত করিলে হজ্জকারীর হজ্জই আদায় হইবেযাহার বদলী হজ্জ করিবার নিয়ত করিয়াছে তাহার হজ্জ আদায় হইবে না। প্রথমে ফরয হজ্জ তৎপর কাযা হজ্জতৎপর মান্নতের হজ্জ এবং তৎপর অপরের পক্ষ হইতে বদলী হজ্জ করিতে হইবে। এই নিয়মের বিপরীত নিয়ম করিলেও এই তরতীব অনুযায়ী হজ্জ আদায় হইবে।

পরবর্তী পর্ব –
হজ্জ ফরয হওয়ার শর্ত 

হজ্জ (১) সৌভাগ্যের পরশমনি

 

হজ্জ (পর্ব – ১)
📚সৌভাগ্যের পরশমনি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

হজ্জের ফযীলত —

হজ্জ ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ এবং ইহা সারা জীবনে একবার করণীয় ইবাদত। রাসূলে মাকবুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন- “যে ব্যক্তি হজ্জ (ফরয হওয়া সত্ত্বেও ইহাসম্পন্ন না করিয়া মারা যায়তাহাকে বলিয়া দাওসে ইয়াহুদী হইয়া মরুক বা খ্রিস্টান হইয়া মরুক।” 

তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন- "যে ব্যক্তি হজ্জ করিবার সময় পাপ করেনা এবং বেহুদা  অশ্লীল কথা বলে না সে পূর্বকৃত পাপ হইতে এরূপ নিষ্পাপ হইয়া যায় যেরূপ মাতৃগর্ভ হইতে ভূমিষ্ঠ হওয়ার দিন সে নিষ্পাপ ছিল। 

তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন- “বহু পাপ এমন আছে যাহা আরাফাতের ময়দানে দণ্ডায়মান না হইলে খণ্ডন হয় না।” 

তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন- "আরাফার দিনে শয়তান যেমন অপদস্থ বিষণ্ণ হয় তদ্রূপ আর কোনদিন হয় না। কারণসেই দিন আল্লাহ্ তা'আলা স্বীয় বান্দার উপরবিশেষ রহমত নাযিল করেন এবং অসংখ্য কবীরা গুনাহ্ মাফ করিয়া থাকেন।” 

তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন- "যে ব্যক্তি হজ্জের উদ্দেশ্যে গৃহ হইতে বহির্গত হইয়া পথিমধ্যে প্রাণ ত্যাগ করেকিয়ামত পর্যন্ত তাহার আমলনামায় প্রতি বৎসর এক হজ্জ ও এক ওমরার সওয়াব লিখিত হয়। আর যে ব্যক্তি মক্কা শরীফ বা মদীনা শরীফ পৌঁছিয়া প্রাণ ত্যাগ করিবে সে কিয়ামত দিবসের হিসাব-নিকাশ হইতে অব্যাহতি পাইবে।” 

তিনি বলেন-“বিশুদ্ধরূপে সম্পন্ন মকবুল এক হজ্জ সমস্ত দুনিয়া  দুনিয়ার যাবতীয় বস্তু অপেক্ষা উত্তমবেহেশত ব্যতীত অন্য কিছুই ইহার বিনিময় হইতে পারে না।” 

তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলেন-"হজ্জের সময় আরাফাতের ময়দানে দণ্ডায়মান হইয়া যদি কেহ মনে করে যেআমার গুনাহ মাফ হইল নাতবে তদপেক্ষা অধিকগুনাহ্ আর কিছুই নাই।” 

হযরত আলী বিন মওয়াফির নামে এক বুযর্গ ছিলেন। তিনি বলেন-“এক বৎসর আমি হজ্জ করত আরাফার রাত্রে স্বপ্নে দেখিলামসবুজ পোশাকধারী দুই ফেরেশতা আকাশ হইতে অবতরণ করেন।তাঁহাদের একজন অপরজনকে বলিলেন, 'আপনি কি জানেন  বৎসর কতজন লোক হজ্জকরিয়াছে?' তিনি উত্তর করিলেন, 'না' সেই ফেরেশতা বলিলেন, 'ছয় লক্ষ।তিনি আবার জিজ্ঞাসাকরিলেন- 'আপনি কি জানেন কত লোকের হজ্জ কবুল হইয়াছে?' তিনি উত্তর দিলেন, 'না' সেইফেরেশতা পুনরায় বলিলেন, "মোট ছয়জনের হজ্জ কবুল হইয়াছে।

সেই বুযর্গ বলিলেন-'ফেরেশতা দুইজনের কথা শুনিয়া ভয়ে আমার নিদ্রা ভঙ্গ হইল এবং আমিঅত্যন্ত দুঃখিত  চিন্তিত হইলাম। আর আমি মনে মনে বলিলামআমি কখনই সেই ছয়জনের মধ্যে হইব না। এইরূপ চিন্তা  মনস্তাপে মশআরুল হারামে পৌঁছিয়া আবার নিদ্রামগ্ন হইলাম। 

স্বপ্নে আবার দুই ফেরেশতাকে পরস্পর  প্রকার আলাপ করিতে দেখিলাম। তখন একজন অপরজনকেজিজ্ঞাসা করিলেন-'আপনি কি জানেনআজ রাত্রে আল্লাহ্ স্বীয় বান্দাগণের সম্বন্ধে কি আদেশ দান করিয়াছেন?' দ্বিতীয়জন বলিলেন- 'না' সেই ফেরেশতা বলিলেন-'সেই ছয়জনের তুফায়েলে আল্লাহ্ তা'আলা ছয় লক্ষ হাজীকে মাফ করিয়া দিয়াছেন।তৎপর প্রফুল্লচিত্তে আমি নিদ্রা হইতে জাগ্রত হইলাম এবং করুণাময় আল্লাহ্ শোকরগুজারী করিলাম।"


রাসূলে মাকবুল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন যেআল্লাহ্ ওয়াদা করিয়াছেনপ্রতি বৎসর হজ্জ উপলক্ষে ছয় লক্ষ লোক কা'বা শরীফ যিয়ারত করিবে। তদপেক্ষা কম লোকের সমাগম হইলে ফেরেশতা পাঠাইয়া তিনি এই সংখ্যা পূর্ণ করিয়া দিবেন। আর হাশরের দিন কাবাশরীফকে নববধুর ন্যায় সুসজ্জিত করিয়া উপস্থিত করা হইবে এবং হাজিগণ ইহার চারিদিকে তওয়াফকরিতে থাকিবে  আহারা ইহার আচ্ছাদন বস্ত্রে স্পর্শ করিতে থাকিবে। পরিশেষে কা'বা শরীফ বেহেশতে প্রবেশ করিবে এবং হাজিগণও উহার সহিত বেহেশতে ঢুকিয়া পড়িবে।


পরবর্তী পর্ব–

হজ্জের শর্তসমূহ

মঙ্গলবার, ৮ এপ্রিল, ২০২৫

আত্মদর্শন (৪৫) মানবের উন্নতির উপায়



আত্মদর্শন পর্ব - ৪৫
📚কিমিয়ায়ে সাদাত ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

মানবের উন্নতির উপায়
প্রকৃত কথা এই যে, মানুষ এ দুনিয়াতে নিতান্ত ত্রুটিপূর্ণ, অত্যন্ত অক্ষম ও বড়ই অসহায়। কিয়ামতের দিন ইহা উত্তমরূপে বুঝা যাইবে। কিন্তু সৌভাগ্যের পরশমণিকে স্বীয় আত্মার উপর বারবার ঘর্ষণ করিতে থাকিলে মানুষ ইতর প্রাণীর শ্রেণী অতিক্রম করিয়া ফেরেশতার মরতবায় উন্নীত হইতে পারিবে। অপর পক্ষে দুনিয়া ও দুনিয়ার লোভ-লালসায় নিবিষ্ট থাকিলে কিয়ামতের দিন মানুষ কুকুর ও শূকর হইতে নিকৃষ্ট হইবে ; কারণ কুকুর ও শূকর সেই দিন মাটিতে মিশিয়া গিয়া দোযখের আযাব হইতে অব্যাহতি পাইবে ; কিন্তু মানুষ নিজ কর্মদোষে আযাবে নিপতীত থাকিবে। মানুষ যখন নিজের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব সম্বন্ধে অবগত হইল তখন নিজের দোষ--ত্রুটি, অক্ষমতা ও অসহায়তা সম্বন্ধেও তাহার অবগত থাকা আবশ্যক। কারণ  এইরূপ আত্মপরিচয় আল্লাহ্র মারিফাত লাভের অন্যতম উপায়। আত্ম-পরিচয়ের জন্য যাহা বলা হইল তাহাই এগ্রন্থে যথেষ্ট। এ স্থলে ইহার অধিক বর্ণনা সম্ভব নহে ।

প্রথম পর্বের লিংক

আত্মদর্শন (৪৪) একটি শিক্ষনীয় কাহিনী



আত্মদর্শন পর্ব - ৪৪
📚কিমিয়ায়ে সাদাত ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

একটি কাহিনী 
একদা হযরত শাইখ আবূ সাঈদ (র.) সূফীগণের সহিত কোন স্থানে যাইতেছিলেন। পথিমধ্যে একস্থানে দেখিতে পাইলেন, মেথরগণ পায়খানা পরিষ্কার করিতেছে। রাস্তায় কিছু মল পড়িয়াছিল। ইহা দেখিয়া তাঁহার সঙ্গিগণ হঠাৎ থামিয়া গেলেন এবং নাক বন্ধ করত অন্যদিকে সরিয়া পড়িলেন। কিন্তু তিনি সে স্থানে দাঁড়াইয়া তাঁহাদিগকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন “বন্ধুগণ, বুঝিয়া বলত, এই ময়লা আমাকে কি বলিতেছে? ” তাঁহার উত্তর করিলেনঃ “ হযরত, কি বলিতেছেন আপনি বলিয়া দিন। ” তিনি বলিতে লাগিলেনঃ “ ময়লা বলিতেছে - গতকল্য আমরা বাজারে নানাবিধ উপাদেয় ফলমূল, মিষ্টান্ন ইত্যাদি আকারে দোকানে বিরাজ করিতেছিলাম। লোকে আমাদিগকে ক্রয় করিবার জন্য রাশি রাশি টাকা-পয়সা লুটাইতেছিল। এক রাত্র মাত্র আমরা তোমাদের উদরে ছিলাম। ইহাতেই আমরা দুর্গন্ধময় ও অপবিত্র হইয়া পড়িয়াছি। এখন ভাবিয়া দেখ, তোমাদের নিকট হইতে আমাদের পলায়ন করা উচিত, না আমাদের নিকট হইতে তোমাদের পলায়ন করা উচিত?” । 

মানবের উন্নতির উপায়

আত্মদর্শন (৪৩) আত্মপরিচয় ও আত্ম-উন্নতিতে পরিশ্রম আবশ্যক



আত্মদর্শন পর্ব - ৪৩
📚কিমিয়ায়ে সাদাত ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

আত্মপরিচয় ও আত্ম-উন্নতিতে পরিশ্রম আবশ্যক 
এতক্ষণ যাহা বলা হইল তাহাতে আত্মার শ্রেষ্ঠত্ব বুঝিতে পারিয়াছ। এখন বুঝিয়া লও যে, আল্লাহ্ তোমাকে এই অতি উত্তম পদার্থ দান করিয়াছেন এবং ইহাকে তোমা হইতে গোপনে রাখিয়াছেন। তুমি যদি ইহার পর্যবেক্ষণে অনুসন্ধান না কর, ইহাকে ধ্বংস করিয়া দাও এবং ইহা হইতে গাফিল থাক তবে বড়ই ক্ষতিগ্রস্ত হইবে। সুতরাং পরিশ্রমের সহিত আত্মার অনুসন্ধান কর এবং দুনিয়া হইতে একেবারে নির্লিপ্ত করিয়া ইহাকে গৌরবের উচ্চতম সিংহাসনে আরোহণ করাও। তাহা হইলে পরকালে তোমার অনন্ত সৌভাগ্য ও অসীম সন্ধান প্রকাশিত হইবে, অর্থাৎ তখন তুমি অবিমিশ্র সুখ, অবিনশ্বর জীবন, অপ্রতিহত ক্ষমতা, সন্দেহশূন্য মারিফাত লাভ ও নির্মল সৌন্দর্য দর্শনের সৌভাগ্য অর্জন করিবে। আত্মা যদি পরকালে প্রকৃত সম্মান ও গৌরব লাভের উপযোগী হয় তবে ইহকালেও ইহার শ্রেষ্ঠত্ব থাকে। অন্যথায় মানবের ন্যায় অসহায় ও অসম্পূর্ণ আর কেহই নেই। কারণ, মানুষ এ সংসারে শীত-গ্রীষ্ম, ক্ষুধা-তৃষ্ণা, রোগ-শোক, দুঃখ-বেদনা ও যাতনায় বিজড়িত হইয়া রহিয়াছে। আবার যাহাতে তাহার তৃপ্তি ও আনন্দ তাহাই তাহার ক্ষতি ও অনিষ্টের কারণ এবং যাহা তাহার জন্য উপকারী তাহা দুঃখ ও তিক্ততাশূন্য নহে। জ্ঞান, ক্ষমতা, সংকল্প, ধৈর্য অথবা সৌন্দর্যের কারণেই মানুষ শ্রেষ্ঠ ও সম্মানী হইয়া থাকে। কিন্তু জ্ঞানের দিকে বিবেচনা করিয়া দেখিলে বুঝা যাইবে  মানুষ অপেক্ষা মূর্খ জগতে আর নাই। কেননা, তাহার মস্তিষ্কের একটি মাত্র রগ বক্র হইয়া পড়িলে সে উন্মাদ বা একেবারে ধ্বংস হইতে পারে। অথচ সে ইহার কারণও বুঝিতে পারে না এবং উপশমের উপায়ও সে জানে না। এমনও হয় যে, ঔষধ তাহার সম্মুখে বিরাজমান থাকে, অথচ সে তাহা চিনিতে পারে না। আবার ক্ষমতা সম্বন্ধে বিরাজমান থাকে , অথচ সে তাহা চিনিতে পারে না। আবার ক্ষমতা সম্বন্ধে বিবেচনা করিয়া দেখিলে বুঝা যায় যে, মানুষের ন্যায় দুর্বল আর কোন প্রাণীই নহ । একটি মাছিকেও সে পরাস্ত করিতে পারে না। আল্লাহ্ একটি মশাকে মানুষের বিপক্ষে নিযুক্ত করিলে ইহার নিকট সে পরাজিত হয়। একটি মৌমাছির ডাক শুনিয়া মানুষ ভীত ও অস্থির হয়। তৎপর ধৈর্যের দিক দিয়া বিচার করিলে দেখা যাইবে যে, মানুষ কণামাত্র কমতি সহ্য করিতে পারে না ; সামান্যতম ক্ষতি হইলেও দুঃখ-ভারাক্রান্ত ও পেরেশান হইয়া উঠে। ক্ষুধার সময় এক গ্রাস খাদ্য না পাইলে নিতান্ত অধৈর্য হইয়া পড়ে। মানুষ অপেক্ষা সংকীর্ণমনা আর কে আছে? পরিশেষে মানুষের সৌন্দর্য ও আকৃতির দিকে মনোনিবেশ করিলে বুঝা যায় যে, স্তূপীকৃত অপবিত্রতাকে চর্ম দ্বারা আবৃত করিয়া রাখা হইয়াছে। মানুষ যদি দুই দিন নিজ শরীর ধৌত না করে তবে তাহার শরীর হইতে নিঃসৃত ময়লার দুর্গন্ধে সে নিজেই অতিষ্ট হইয়া পড়িবে ; তখন তাহার সমস্ত শরীর হইতে দুর্গন্ধ বাহির হয় এবং সকলেই তাহাকে ঘৃণা করে।
মানব দেহ অপেক্ষা অধিক ময়লাযুক্ত আর কিছুই নাই। কারণ , ইহার ভিতরে সর্বদাই অপবিত্র মল-মূত্রাদি থাকে, আর এইগুলি বহন করিয়াই মানুষ চলে এবং প্রত্যহ নিজ হস্তে এই মলমূত্র ধৌত করে " 

পরবর্তী পর্ব-
একটি কাহিনী 

আত্মদর্শন (৪২) শরীর-বিদ্যা অপেক্ষা আত্মবিদ্যা শ্রেষ্ঠ



আত্মদর্শন পর্ব - ৪২
📚কিমিয়ায়ে সাদাত ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

শরীর-বিদ্যা অপেক্ষা আত্মবিদ্যা শ্রেষ্ঠ 
কিন্তু আত্মবিদ্যার তুলনায় শরীরবিদ্যা অতি সংক্ষিপ্ত তুচ্ছ। কারণ, শরীর বিদ্যায় কেবল দেহের বিবরণ জানা যায় এবং দেহ বাহনস্বরূপ ও আত্মা আরোহী সদৃশ। সৃষ্টির উদ্দেশ্য বাহন নহে, বরং আরোহী। আরোহীর জন্যই বাহনের সৃষ্টি, বাহনের জন্য আরোহীর প্রয়োজন হয় না। 
জগতের সমস্ত পদার্থ অপেক্ষা তিনি নিজের তোমার অধিক নিকটবর্তী, তথাপি তুমি নিজকে উত্তমরূপে চিনিতে পার না - এই কথা তোমাকে বুঝাইবার জন্যই এতটুকু বলা হইল। যে ব্যক্তি নিজকে চিনে না, অথচ অপরকে চিনে বলিয়া দাবি করে সে এমন নিঃস্ব ব্যক্তিতুল্য যাহার নিজের আহার্যের সংস্থান নাই অথচ নগরবাসী সমস্ত দীন-দুঃখীদের আহার প্রদান করে বলিয়া দাবি করে তাহার এরূপ দাবি নিতান্ত বাজে ও আশ্চর্যের বিষয়।

আত্মপরিচয় ও আত্ম-উন্নতিতে পরিশ্রম আবশ্যক 

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...