কন্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ —
পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরকে অপরের সাথে সদ্ব্যবহার করা এবং স্বামীর সাথে সম্ভাবে বসবাস করার শিক্ষা দেবে।
বর্ণিত আছে, আসমা বিনতে খারেজা করারী তাঁর কন্যার বিয়ের সময় তাকে এরূপ উপদেশ দান করেন: যে গৃহে তুমি এসেছিলে, এখন সেখান থেকে বের হয়ে এমন শয্যায় যাচ্ছ, যে সম্পর্কে তুমি ওয়াকিফহাল ছিলে না। তুমি এমন ব্যক্তির কাছে থাকবে, যার সাথে পূর্ব থেকে পরিচয় ছিল না। অতএব তুমি তার পৃথিবী হবে। ফলে সে তোমার আকাশ হবে। তুমি তার জন্যে শান্তির কারণ হলে সে তোমার সুখের কারণ হবে। তুমি তার বাঁদী হলে সে তোমার গোলাম হয়ে থাকবে! স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তার কাছে যাবে না যে, তোমাকে ঘৃণা করে এবং দূরেও থাকবে না যে, দ্রুত ভুলে যায়; বরং সে তোমার কাছে থাকলে তুমি তার নিকটে থাকবে। সে আলাদা থাকলে তুমি দূরে থাকবে। তার নাক, কান ও চোখের দিকে লক্ষ্য রাখবে। সে যেন তোমার কাছ থেকে সুগন্ধি ছাড়া অন্য কিছুর ঘ্রাণ না পায়। সে যখন শুনে তখন যেন তোমার কাছ থেকে ভাল কথা শুনে এবং যখন দেখে তখন যেন ভাল কিছু দেখে।
স্ত্রীর আদবসমূহের মধ্যে একশ' কথার এক কথা, স্ত্রী আপন গৃহে বসে চরকায় সূতা কাটা ইত্যাদি কাজে ব্যস্ত থাকবে। ছাদে আরোহণ করে এদিক ওদিক তাকাবে না। প্রতিবেশীদের সাথে কথা কম বলবে এবং নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া তাদের গৃহে যাবে না। স্বামীর উপস্থিতিতে ও অনুপস্থিতিতে তার সম্মান করবে। প্রত্যেক কাজে তার সন্তুষ্টি কামনা করবে। নিজের ব্যাপারে ও স্বামীর ধন-সম্পদের ব্যাপারে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না। স্বামীর অনুমতিক্রমে গৃহ থেকে বের হলেও পুরাতন কাপড়-চোপড়ে আবৃতা হয়ে বের হবে। সড়কের মধ্যস্থলে ও বাজার থেকে বেঁচে চলবে। সর্বপ্রযত্নে নিজের অবস্থার উন্নতি ও ঘর-কন্নায় নিয়োজিত থাকবে এবং নামায-রোযার সাথে সম্বন্ধ রাখবে। স্বামীর কোন বন্ধু দরজায় আওয়াজ দিলে যদি স্বামী গৃহে না থাকে, তবে তার সাথে কোন কথা না বলাই নিজের স্বামীর আত্মমর্যাদার দাবী। স্বামীকে আল্লাহ তা'আলা যা কিছু দিয়েছেন তাতেই সন্তুষ্ট থাকবে। খুব সেজেগুজে থাকবে এবং স্বামী সম্ভোগ করতে চাইলে তজ্জন্যে সর্বাবস্থায় প্রস্তুত থাকবে। সন্তানদের প্রতি স্নেহমমতা করবে। স্বামীর কথার প্রত্যুত্তর দেবে না।
এক হাদীসে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: আল্লাহ তা'আলা আমার পূর্বে জান্নাতে যাওয়া প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে হারাম করেছেন, কিন্তু আমি এক মহিলাকে দেখব সে জান্নাতের দরজার দিকে আমার আগে আগে যেতে থাকবে। আমি জিজ্ঞেস করব, ব্যাপার কি, এই মহিলা আমার আগে যাচ্ছে। আমাকে বলা হবে; হে মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)! এ মহিলা সুন্দরী রূপবতী ছিল। তার দুটি এতীম শিশু ছিল। সে তাদের ব্যাপারে সবর করেছে। ফলে তার যে দুর্দশা হওয়ার ছিল, তাই হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা তার এই আত্মত্যাগ পছন্দ করে তাকে এই মর্যাদা দান করেছেন।
স্ত্রীর অন্যতম আদব হচ্ছে, স্বামীর সাথে আপন রূপ-লাবণ্য নিয়ে গর্ব না করা এবং স্বামী কুশ্রী হওয়ার কারণে তাকে হেয় মনে না করা। আসমায়ী বলেন: আমি জঙ্গলে গিয়ে একজন নেহায়েত রূপসী মহিলাকে দেখলাম। সাথে তার স্বামীকে দেখলাম চরম কুশ্রী কদাকার। আমি মহিলাকে বললাম: আশ্চর্যের বিষয়, তুমি এমন ব্যক্তির স্ত্রী হয়ে সুখী আছ! সে বলল: চুপ কর। তুমি ভুল করছ। আসল ব্যাপার হচ্ছে সম্ভবতঃ সে তার স্রষ্টার সন্তুষ্টির কোন কাজ করেছে, যার বিনিময়ে আমাকে লাভ করেছে। আর খুব সম্ভব আমার দ্বারা স্রষ্টার মর্জির খেলাফ কোন কাজ হয়েছে, যার
শাস্তিস্বরূপ আমি এই স্বামী পেয়েছি। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা আমার
জন্যে যা পছন্দ করেছেন তাতে আমি সন্তুষ্ট থাকব না কেন?
আসমায়ী বলেন : মহিলা আমাকে সম্পূর্ণ নিরুত্তর করে দিল।
স্ত্রীর আর এক আদব —
সে কোন অবস্থাতেই স্বামীকে পীড়ন করবে না। হযরত মোয়ায ইবনে জাবালের রেওয়ায়েতে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, - "দুনিয়াতে যখন কোন স্ত্রী তার স্বামীকে পীড়ন করে, তখন তার বেহেশতী হুর স্ত্রী দুনিয়ার স্ত্রীকে বলে: তুমি ধ্বংস হও। তুমি তাকে পীড়ন করো না। সে-তো তোমার কাছে মুসাফির। সত্বরই তোমার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আমাদের কাছে চলে আসবে।
স্বামী মারা গেলে স্ত্রীর কর্তব্য হবে তার জন্যে চার মাস দশ দিনের বেশী শোক প্রকাশ না করা। এটা বিবাহের অন্যতম হক। স্ত্রী এই চার মাস দশ দিন সুগন্ধি ও সাজসজ্জা থেকে বেঁচে থাকবে। যয়নব বিনতে আবু সালামা বলেন: আমি আবু সুফিয়ানের মৃত্যুর পর তার কন্যা উন্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে হাবীবা (র.)-এর কাছে গেলাম। তিনি হলুদ রঙের সুগন্ধি এনে আপন গালে মালিশ করলেন এবং বললেন: আল্লাহর কসম, আমার সুগন্ধির কোন প্রয়োজন ছিল না; কিন্তু আমি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি, "আল্লাহর প্রতি ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে- এমন কোন মহিলার জন্যে মৃতের কারণে তিন দিনের বেশী শোক পালন করা বৈধ নয়, কিন্তু স্বামী মারা গেলে চার মাস দশ দিন শোক পালন করবে। শোক পালনকালে স্ত্রী মৃত স্বামীর গৃহেই থাকবে। বাপের বাড়ী চলে যাওয়া জায়েয নয়।
স্ত্রীর আর এক আদব, স্বামীর গৃহে যেসব কাজ সম্পাদন করা তার জন্যে সম্ভব, সেগুলো অম্লান বদনে করবে। হযরত আসমা বিনতে আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) বর্ণনা করেন- "হযরত যোবায়রের সাথে আমার বিবাহ হলে তাঁর কোন ধন-সম্পদ ছিল না। না ছিল কোন গোলাম, না ছিল বাঁদী। কেবল একটি ঘোড়া ও পানি আনার জন্যে একটি উট ছিল। ফলে আমিই তার ঘোড়াকে ঘাস পানি দিতাম এবং উটের জন্যে খোরমার বীচি কুটে খাবার দিতাম। পানি ভরে আনতাম এবং মশক সেলাই করতাম। এ ছাড়া আটা পিষতাম এবং দু'ক্রোশ দূর থেকে মাথায় বহন করে বীচি আনতাম। অবশেষে আমার পিতা হযরত আবু বকর (রাঃ) আমার কাছে একটি বাঁদী পাঠিয়ে দিলেন। এতে আমি অনেক কাজকর্ম থেকে মুক্তি পাই। একদিন আমার মাথায় বীচির বস্তা ছিল, তখন পথিমধ্যে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর সাথে সাক্ষাৎ হল। সাহাবীগণও তাঁর সাথে ছিলেন। তিনি আমাকে নিজের পেছনে সওয়ার করিয়ে নেয়ার জন্যে আপন উস্ত্রীকে বসার জন্যে ইশারা করলেন, কিন্তু পুরুষদের সাথে চলতে আমি লজ্জাবোধ করলাম এবং আমার স্বামীর আত্মমর্যাদাবোধ স্বরণ করলাম। কারণ, তিনি অত্যন্ত আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আমার লজ্জা আঁচ করে চলে গেলেন। বাড়ি ফিরে আমি আমার স্বামী যোবায়রের কাছে এ ঘটনা ব্যক্ত করলে তিনি বললেন: আল্লাহর কসম, তুমি যে মাথার বীচি বহন করেছ, এটা রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর সাথে সওয়ার হওয়ার তুলনায় আমার জন্যে কঠিনতর
-----
বিবাহের ফজিলত
প্রথম পর্বের লিংক










