সকালে অথবা জুমআর নামাযের পরে অথবা আসরের পরে এলেমের মজলিসে উপস্থিত হবে। কিন্তু কিস্সাকথক ওয়ায়েযদের মজলিসে যাবে না। তাদের কথাবার্তায় কোন কল্যাণ নেই। আখেরাতের পথিক জুমআর সমস্ত দিন দান খয়রাত ও দোয়ায় আত্মনিয়োগ করবে, যাতে উৎকৃষ্ট মুহূর্তটি হাতছাড়া না হয়। নামাযের পূর্বে কোন মজলিস
হলে তাতে যাওয়া উচিত নয়। হযরত ইবনে ওমর (রাঃ)-এর রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) জুমআর নামাযের পূর্বে হাল্কা তথা মজলিস করতে নিষেধ করেছেন। তবে কোন হক্কানী আলেম সকালে জামে মসজিদে আল্লাহ্ তাআলার নেয়ামত ও শাস্তি বর্ণনা করে ওয়ায করলে তাঁর কাছে বসবে। এরূপ ওয়াজ শ্রবণ করা নফল এবাদত অপেক্ষা উত্তম। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : এলেমের মজলিসে হাজির হওয়া হাজার রাকআত নামায পড়া অপেক্ষা উত্তম।
“নামাযান্তে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ অন্বেষণ কর”।
এ আয়াত সম্পর্কে হযরত আনাস ইবনে মালেক (রঃ) বলেন, এতে দুনিয়া অন্বেষণ করা উদ্দেশ্য নয়; বরং রোগীকে দেখা, জানাযায় শরীক হওয়া এবং এলেম শিক্ষা করা উদ্দেশ্য। আল্লাহ তাআলা কোরআন মজীদে কয়েক জায়গায় এলেমকে 'ফযল' তথা অনুগ্রহ বলেছেন। এক জায়গায় বলেছেন- “আপনাকে শিক্ষা দিয়েছেন যা আপনি জানতেন না। আপনার প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ বিরাট”। আরও বলা হয়েছে- “আমি দাউদকে এলেম দান করেছি”।
সুতরাং জুমআর দিনে এলেম শিক্ষা করা ও শিক্ষা দেয়া উত্তম এবাদত। কিসসাকথকদের মজলিসে যাওয়া অপেক্ষা নামায উত্তম। কেননা, পূর্ববর্তীরা কিসসাকথন বেদআত মনে করতেন। তাঁরা কিসসা কথকদেরকে জামে মসজিদ থেকে বের করে দিতেন।
হযরত ইবনে ওমর (রাঃ) জামে মসজিদে নিজের জায়গায় এসে দেখেন, জনৈক কিসসাকথক সেস্থানে কিছু বর্ণনা করছে। তিনি বললেন : আমার জায়গা থেকে উঠে যাও। সে বলল : আমি উঠব না। আমি অগ্রে এখানে বসেছি। হযরত ইবনে ওমর (রাঃ) কোতোয়ালকে ডেকে তাকে সেখান থেকে বহিষ্কার করলেন। নিছক বয়ান করাই সুন্নত হলে তাকে বহিষ্কার করা কিরূপে জায়েয হত? রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন :
“তোমাদের কেউ যেন তার মুসলমান ভাইকে তার স্থান থেকে তুলে দিয়ে নিজে সেখানে না বসে; বরং তোমরা সরে যাও এবং তাকে জায়গা দাও”।
হযরত ইবনে ওমরের জন্যে কেউ নিজের স্থান ছেড়ে দিলে তিনি তাতে বসতেন না, যে পর্যন্ত সেই ব্যক্তি সেখানে না বসত।
বর্ণিত আছে, জনৈক কিসসাকথক হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর কক্ষের আঙ্গিনায় বসত। তিনি হযরত ইবনে ওমর (রাঃ)-কে বললেন : লোকটি তার কিসসা দ্বারা আমাকে জ্বালাতন করছে। আমি যিকির ও তসবীহ করতে পারছি না। হযরত ইবনে ওমর (রাঃ) তাকে এমন পিটুনি দিলেন যে, তার কোমরে একটি ছড়ি ভেঙ্গে ফেললেন।
জুমআর মধ্যে যে মুহূর্তটি উৎকৃষ্ট ও বরকতময়, তার প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখবে। হাদীসে আছে, জুমআয় একটি মুহূর্ত আছে, যাতে কোন মুসলমান আল্লাহ তাআলার কাছে যা প্রার্থনা করে, আল্লাহ তাকে তা দান করেন। এ মুহূর্ত কোনটি, তাতে মতভেদ আছে। যেমন, সূর্যোদয়ের সময়, নামাযে দাঁড়ানোর সময়, আসরের শেষ সময় এবং সূর্যাস্তের কিছু পূর্বেকার সময় ইত্যাদি। হযরত ফাতেমা (রাঃ) এ সময়ের প্রতি দৃষ্টি রাখতেন এবং খাদেমাকে বলতেন : সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাক। যখন দেখ সূর্য অস্ত যাওয়ার উপক্রম হয়েছে, তখন আমাকে খবর দাও। খাদেমা তাই করত। হযরত ফাতেমা এ সময় দোয়া ও এস্তেগফারে মশগুল হতেন। তিনি বলতেন : এ মূহূর্তের অপেক্ষায় থাকা উচিত তিনি এটি তাঁর পিতার কাছ থেকে অবলম্বন করেছিলেন। কোন কোন আলেম বলেন : এ মুহূর্তটি সারা দিনের মধ্যে অনির্ধারিত। যেমন শবে কদর অনির্ধারিত, যাতে বেশী পরিমাণে এর অপেক্ষা করা হয়। কেউ কেউ বলেন : এ মুহূর্তটি জুমআর দিনের মধ্যে পরিবর্তিত হতে থাকে, যেমন শবে কদর পরিবর্তিত হতে থাকে। এ উক্তি অধিক সঙ্গত। হযরত কা'ব আহবার (রঃ) বলেন : এটি জুমআর দিনের শেষ মুহূর্ত; অর্থাৎ, সূর্যাস্তের সময়। একথা শুনে হযরত আবু হোরায়রা (রঃ) বললেন : শেষ মুহূর্ত কিরূপে হতে পারে? আমি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি, বান্দা এ মুহূর্তটি নামায় পড়া অবস্থায় পায়। দিনের শেষ মুহূর্ত তো নামাযের সময় নয়।
কা'ব (রঃ) বললেন : রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)- কি একথা বলেননি, যেব্যক্তি বসে নামাযের অপেক্ষা করে সে নামাযেই থাকে? আবু হোরায়রা (রাঃ) বললেন : হাঁ, বলেছেন। কা'ব বললেন : কাজেই এটাও নামাযের সময়। হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) চুপ হয়ে গেলেন। হযরত কা'ব আরও বলতেন, এ মুহূর্তটি আল্লাহ তাআলার রহমত তাদের জন্যে, যারা এদিনের হকসমূহ আদায় করে। সুতরাং এ রহমত তখন হওয়া উচিত, যখন হক আদায় সমাপ্ত হয়। মোট কথা, এ সময় এবং ইমামের মিম্বরে আরোহণের সময় উভয়টি উৎকৃষ্ট। উভয় সময়ে দোয়া করা উচিত ।
اللهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ عَبدِكَ وَنَبِيِّكَ وَرَسُولِكَ النَّبِي
“আল্লাহুম্মা সল্লিআলা মুহাম্মাদিন্ আব্দিকা ওয়া নাবিয়্যিকা ওয়া রাসূলিকা আন্নাবী”।
এটা একবার হল। এমনিভাবে আশি বার পূর্ণ কর। এ ছাড়া অন্য যেকোন দরূদ পাঠ করলে এমনকি তাশাহ্হুদের দরূদ পাঠ করলেও তাকে দরূদ পাঠকারী বলা হবে। দরূদের সাথে এস্তেগফারও করা উচিত। জুমআর দিন এস্তেগফার করাও মোস্তাহাব।
জুমআর দিন অধিক পরিমাণে কোরআন তেলাওয়াত করবে। বিশেষ করে সূরা কাহফ পাঠ করবে। হযরত ইবনে আব্বাস ও আবু হোরায়রা (রঃ) থেকে বর্ণিত আছে, যেব্যক্তি জুমআর দিন অথবা তার রাতে সূরা কাহফ পাঠ করে, তাকে তার পড়ার স্থান থেকে মক্কা শরীফ পর্যন্ত নূর দান করা হয় এবং দ্বিতীয় জুমআ ও আরও তিন দিনের মাগফেরাত করা হয়। সত্তর হাজার ফেরেশতা সকাল পর্যন্ত তার প্রতি রহমত প্রেরণ করে। সে ব্যথা, পেটের ফোড়া, বাত, কুষ্ঠ এবং দাজ্জালের ফেতনা থেকে নিরাপদ থাকে। সম্ভব হলে জুমআর দিনে অথবা রাত্রে কোরআন খতম করা মোস্তাহাব। এতে অনেক সওয়াব রয়েছে।
জামে মসজিদে প্রবেশ করে চার রাকআত না পড়া পর্যন্ত বসবে না। এর প্রত্যেক রাকআতে পঞ্চাশ বার করে সূরা এখলাস পাঠ করবে। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : যেব্যক্তি এ আমল করবে, সে মৃত্যুর পূর্বে জান্নাতে তার ঠিকানা দেখে নেবে। তাহিয়্যাতের দু'রাকআতও পড়তে ভুল করবে না, যদিও ইমাম খোতবা দিতে থাকে। এমতাবস্থায় দ্রুত পড়ে নেবে। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এক ব্যক্তিকে তাই করতে আদেশ করেছেন।
(হানিফী মাজহাবের মতে খুতবা শুরু হলে কোন নফল নামাজ পড়া যাবেনা। কারণ খোতবা শুনা ওয়াযিব)
মোট কথা, জুমআর দিন সময় এভাবে বন্টন করা উচিত- সকাল থেকে সূর্য ঢলে পড়া পর্যন্ত নামাযের জন্যে, জুমআর পর থেকে আসর পর্যন্ত এলেম শোনার জন্যে এবং আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত তসবীহ ও এস্তেগফারের জন্যে।
জুমআর দিনে দান-খয়রাত করলে দ্বিগুণ সওয়াব পাওয়া যায়। তবে শর্ত, এমন ব্যক্তিকে দেবে না যে ইমামের খোতবার সময় দানের আবেদন করে এবং ইমামের কথা বলার সঙ্গে কথা বলে। এরূপ ব্যক্তিকে দান করা মাকরূহ। ইমাম আহমদের পুত্র সালেহ বলেন : জুমআর দিন জনৈক মিসকীন ইমামের খোতবা পাঠের সময় দানের আবেদন করল। সে আমার পিতার বরাবর ছিল। জনৈক ব্যক্তি আমার পিতাকে এক খন্ড রৌপ্য দিল মিসকীনকে দেয়ার জন্যে। আমার পিতা তা গ্রহণ করলেন না। হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ) বলেন : যেব্যক্তি মসজিদে মানুষের ঘাড়ের উপর দিয়ে লাফিয়ে যায়, তাকে ভিক্ষা দেয়া কতক আলেমের মতে মাকরূহ; কিন্তু এক জায়গায় দাঁড়িয়ে অথবা বসে চাইলে দেয়ায় দোষ নেই।
কা'ব আহবার (রঃ) বলেন : যেব্যক্তি জুমআর জন্যে আসে, এর পর ফিরে গিয়ে দু'প্রকার বস্তু খয়রাত করে, পুনরায় মসজিদে এসে পূর্ণ রুকু সেজদা সহকারে দু'রাকআত নফল নামায পড়ে এই দোয়া করে-
الرحمن اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْئَلُ لَكَ بِاسْمِكَ بِسْمِ الـ الرحيم وَبِاسْمِكَ الَّذِى إِلا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ لا تَأخُذُهُ
এরপর সে যেকোন দোয়া করবে, আল্লাহ তাআলা তা কবুল করবেন।
জুমআর দিনকে আখেরাতের জন্যে নির্দিষ্ট করবে। এতে দুনিয়ার কোন কাজ করবে না। বেশী পরিমাণে ওযিফা পাঠ করবে এবং এদিন সফর শুরু করবে না। বর্ণিত আছে, যেব্যক্তি জুমআর রাত্রে সফর করে, তার উভয় ফেরেশতা তার জন্যে বদ দোয়া করে। জুমআর ফজরের পরে তো সফর নিষিদ্ধই, যদি কাফেলা চলে না যায়।
সারকথা, জুমআর দিনে ওযিফা পাঠ ও দান-খয়রাত বেশী করে করবে। আল্লাহ তাআলা যখন কোন বান্দাকে পছন্দ করেন, তখন তার কাছ থেকে ভাল সময়ে ভাল কাজ নেন। আর যখন কোন বান্দাকে অপছন্দ করেন, তখন তার কাছ থেকে ভাল সময়ে খারাপ কাজ নেন, যাতে এ খারাপ কাজ তাঁর আযাব আরও বাড়িয়ে দেয়।








