বুধবার, ১৪ জুন, ২০২৩

জুমআর দিনের অন্যান্য আদব

 

জুমআ (পর্ব– ৪)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ
জুমআর দিনের অন্যান্য আদব 
সকালে অথবা জুমআর নামাযের পরে অথবা আসরের পরে এলেমের মজলিসে উপস্থিত হবে। কিন্তু কিস্সাকথক ওয়ায়েযদের মজলিসে যাবে না। তাদের কথাবার্তায় কোন কল্যাণ নেই। আখেরাতের পথিক জুমআর সমস্ত দিন দান খয়রাত ও দোয়ায় আত্মনিয়োগ করবে, যাতে উৎকৃষ্ট মুহূর্তটি হাতছাড়া না হয়। নামাযের পূর্বে কোন মজলিস

হলে তাতে যাওয়া উচিত নয়। হযরত ইবনে ওমর (রাঃ)-এর রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) জুমআর নামাযের পূর্বে হাল্কা তথা মজলিস করতে নিষেধ করেছেন। তবে কোন হক্কানী আলেম সকালে জামে মসজিদে আল্লাহ্ তাআলার নেয়ামত ও শাস্তি বর্ণনা করে ওয়ায করলে তাঁর কাছে বসবে। এরূপ ওয়াজ শ্রবণ করা নফল এবাদত অপেক্ষা উত্তম। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : এলেমের মজলিসে হাজির হওয়া হাজার রাকআত নামায পড়া অপেক্ষা উত্তম।
“নামাযান্তে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ অন্বেষণ কর”।
এ আয়াত সম্পর্কে হযরত আনাস ইবনে মালেক (রঃ) বলেন, এতে দুনিয়া অন্বেষণ করা উদ্দেশ্য নয়; বরং রোগীকে দেখা, জানাযায় শরীক হওয়া এবং এলেম শিক্ষা করা উদ্দেশ্য। আল্লাহ তাআলা কোরআন মজীদে কয়েক জায়গায় এলেমকে 'ফযল' তথা অনুগ্রহ বলেছেন। এক জায়গায় বলেছেন- “আপনাকে শিক্ষা দিয়েছেন যা আপনি জানতেন না। আপনার প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ বিরাট”। আরও বলা হয়েছে- “আমি দাউদকে এলেম দান করেছি”।
সুতরাং জুমআর দিনে এলেম শিক্ষা করা ও শিক্ষা দেয়া উত্তম এবাদত। কিসসাকথকদের মজলিসে যাওয়া অপেক্ষা নামায উত্তম। কেননা, পূর্ববর্তীরা কিসসাকথন বেদআত মনে করতেন। তাঁরা কিসসা কথকদেরকে জামে মসজিদ থেকে বের করে দিতেন।
হযরত ইবনে ওমর (রাঃ) জামে মসজিদে নিজের জায়গায় এসে দেখেন, জনৈক কিসসাকথক সেস্থানে কিছু বর্ণনা করছে। তিনি বললেন : আমার জায়গা থেকে উঠে যাও। সে বলল : আমি উঠব না। আমি অগ্রে এখানে বসেছি। হযরত ইবনে ওমর (রাঃ) কোতোয়ালকে ডেকে তাকে সেখান থেকে বহিষ্কার করলেন। নিছক বয়ান করাই সুন্নত হলে তাকে বহিষ্কার করা কিরূপে জায়েয হত? রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন :
“তোমাদের কেউ যেন তার মুসলমান ভাইকে তার স্থান থেকে তুলে দিয়ে নিজে সেখানে না বসে; বরং তোমরা সরে যাও এবং তাকে জায়গা দাও”।


হযরত ইবনে ওমরের জন্যে কেউ নিজের স্থান ছেড়ে দিলে তিনি তাতে বসতেন না, যে পর্যন্ত সেই ব্যক্তি সেখানে না বসত।
বর্ণিত আছে, জনৈক কিসসাকথক হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর কক্ষের আঙ্গিনায় বসত। তিনি হযরত ইবনে ওমর (রাঃ)-কে বললেন : লোকটি তার কিসসা দ্বারা আমাকে জ্বালাতন করছে। আমি যিকির ও তসবীহ করতে পারছি না। হযরত ইবনে ওমর (রাঃ) তাকে এমন পিটুনি দিলেন যে, তার কোমরে একটি ছড়ি ভেঙ্গে ফেললেন।
জুমআর মধ্যে যে মুহূর্তটি উৎকৃষ্ট ও বরকতময়, তার প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখবে। হাদীসে আছে, জুমআয় একটি মুহূর্ত আছে, যাতে কোন মুসলমান আল্লাহ তাআলার কাছে যা প্রার্থনা করে, আল্লাহ তাকে তা দান করেন। এ মুহূর্ত কোনটি, তাতে মতভেদ আছে। যেমন, সূর্যোদয়ের সময়, নামাযে দাঁড়ানোর সময়, আসরের শেষ সময় এবং সূর্যাস্তের কিছু পূর্বেকার সময় ইত্যাদি। হযরত ফাতেমা (রাঃ) এ সময়ের প্রতি দৃষ্টি রাখতেন এবং খাদেমাকে বলতেন : সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাক। যখন দেখ সূর্য অস্ত যাওয়ার উপক্রম হয়েছে, তখন আমাকে খবর দাও। খাদেমা তাই করত। হযরত ফাতেমা এ সময় দোয়া ও এস্তেগফারে মশগুল হতেন। তিনি বলতেন : এ মূহূর্তের অপেক্ষায় থাকা উচিত তিনি এটি তাঁর পিতার কাছ থেকে অবলম্বন করেছিলেন। কোন কোন আলেম বলেন : এ মুহূর্তটি সারা দিনের মধ্যে অনির্ধারিত। যেমন শবে কদর অনির্ধারিত, যাতে বেশী পরিমাণে এর অপেক্ষা করা হয়। কেউ কেউ বলেন : এ মুহূর্তটি জুমআর দিনের মধ্যে পরিবর্তিত হতে থাকে, যেমন শবে কদর পরিবর্তিত হতে থাকে। এ উক্তি অধিক সঙ্গত। হযরত কা'ব আহবার (রঃ) বলেন : এটি জুমআর দিনের শেষ মুহূর্ত; অর্থাৎ, সূর্যাস্তের সময়। একথা শুনে হযরত আবু হোরায়রা (রঃ) বললেন : শেষ মুহূর্ত কিরূপে হতে পারে? আমি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি, বান্দা এ মুহূর্তটি নামায় পড়া অবস্থায় পায়। দিনের শেষ মুহূর্ত তো নামাযের সময় নয়।

কা'ব (রঃ) বললেন : রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)- কি একথা বলেননি, যেব্যক্তি বসে নামাযের অপেক্ষা করে সে নামাযেই থাকে? আবু হোরায়রা (রাঃ) বললেন : হাঁ, বলেছেন। কা'ব বললেন : কাজেই এটাও নামাযের সময়। হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) চুপ হয়ে গেলেন। হযরত কা'ব আরও বলতেন, এ মুহূর্তটি আল্লাহ তাআলার রহমত তাদের জন্যে, যারা এদিনের হকসমূহ আদায় করে। সুতরাং এ রহমত তখন হওয়া উচিত, যখন হক আদায় সমাপ্ত হয়। মোট কথা, এ সময় এবং ইমামের মিম্বরে আরোহণের সময় উভয়টি উৎকৃষ্ট। উভয় সময়ে দোয়া করা উচিত ।

জুমআর দিনে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-উনার প্রতি অধিক পরিমাণে দরূদ পাঠ করবে। তিনি বলেন : যে কেউ জুমআর দিনে আমার প্রতি আশি বার দরূদ পাঠ করবে, আল্লাহ তাআলা তার আশি বছরের গোনাহ মাফ করে দেবেন। এক ব্যক্তি আরয করল : ইয়া রসূলাল্লাহ, আমরা কিরূপে দরূদ প্রেরণ করব? তিনি বললেন : এভাবে বল-

‎اللهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ عَبدِكَ وَنَبِيِّكَ وَرَسُولِكَ النَّبِي

“আল্লাহুম্মা সল্লিআলা মুহাম্মাদিন্ আব্দিকা ওয়া নাবিয়্যিকা ওয়া রাসূলিকা আন্নাবী”।
এটা একবার হল। এমনিভাবে আশি বার পূর্ণ কর। এ ছাড়া অন্য যেকোন দরূদ পাঠ করলে এমনকি তাশাহ্হুদের দরূদ পাঠ করলেও তাকে দরূদ পাঠকারী বলা হবে। দরূদের সাথে এস্তেগফারও করা উচিত। জুমআর দিন এস্তেগফার করাও মোস্তাহাব।

জুমআর দিন অধিক পরিমাণে কোরআন তেলাওয়াত করবে। বিশেষ করে সূরা কাহফ পাঠ করবে। হযরত ইবনে আব্বাস ও আবু হোরায়রা (রঃ) থেকে বর্ণিত আছে, যেব্যক্তি জুমআর দিন অথবা তার রাতে সূরা কাহফ পাঠ করে, তাকে তার পড়ার স্থান থেকে মক্কা শরীফ পর্যন্ত নূর দান করা হয় এবং দ্বিতীয় জুমআ ও আরও তিন দিনের মাগফেরাত করা হয়। সত্তর হাজার ফেরেশতা সকাল পর্যন্ত তার প্রতি রহমত প্রেরণ করে। সে ব্যথা, পেটের ফোড়া, বাত, কুষ্ঠ এবং দাজ্জালের ফেতনা থেকে নিরাপদ থাকে। সম্ভব হলে জুমআর দিনে অথবা রাত্রে কোরআন খতম করা মোস্তাহাব। এতে অনেক সওয়াব রয়েছে।

জামে মসজিদে প্রবেশ করে চার রাকআত না পড়া পর্যন্ত বসবে না। এর প্রত্যেক রাকআতে পঞ্চাশ বার করে সূরা এখলাস পাঠ করবে। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : যেব্যক্তি এ আমল করবে, সে মৃত্যুর পূর্বে জান্নাতে তার ঠিকানা দেখে নেবে। তাহিয়্যাতের দু'রাকআতও পড়তে ভুল করবে না, যদিও ইমাম খোতবা দিতে থাকে। এমতাবস্থায় দ্রুত পড়ে নেবে। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এক ব্যক্তিকে তাই করতে আদেশ করেছেন।
(হানিফী মাজহাবের মতে খুতবা শুরু হলে কোন নফল নামাজ পড়া যাবেনা। কারণ খোতবা শুনা ওয়াযিব)
মোট কথা, জুমআর দিন সময় এভাবে বন্টন করা উচিত- সকাল থেকে সূর্য ঢলে পড়া পর্যন্ত নামাযের জন্যে, জুমআর পর থেকে আসর পর্যন্ত এলেম শোনার জন্যে এবং আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত তসবীহ ও এস্তেগফারের জন্যে।

জুমআর দিনে দান-খয়রাত করলে দ্বিগুণ সওয়াব পাওয়া যায়। তবে শর্ত, এমন ব্যক্তিকে দেবে না যে ইমামের খোতবার সময় দানের আবেদন করে এবং ইমামের কথা বলার সঙ্গে কথা বলে। এরূপ ব্যক্তিকে দান করা মাকরূহ। ইমাম আহমদের পুত্র সালেহ বলেন : জুমআর দিন জনৈক মিসকীন ইমামের খোতবা পাঠের সময় দানের আবেদন করল। সে আমার পিতার বরাবর ছিল। জনৈক ব্যক্তি আমার পিতাকে এক খন্ড রৌপ্য দিল মিসকীনকে দেয়ার জন্যে। আমার পিতা তা গ্রহণ করলেন না। হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ) বলেন : যেব্যক্তি মসজিদে মানুষের ঘাড়ের উপর দিয়ে লাফিয়ে যায়, তাকে ভিক্ষা দেয়া কতক আলেমের মতে মাকরূহ; কিন্তু এক জায়গায় দাঁড়িয়ে অথবা বসে চাইলে দেয়ায় দোষ নেই।

কা'ব আহবার (রঃ) বলেন : যেব্যক্তি জুমআর জন্যে আসে, এর পর ফিরে গিয়ে দু'প্রকার বস্তু খয়রাত করে, পুনরায় মসজিদে এসে পূর্ণ রুকু সেজদা সহকারে দু'রাকআত নফল নামায পড়ে এই দোয়া করে-

‎الرحمن اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْئَلُ لَكَ بِاسْمِكَ بِسْمِ الـ الرحيم وَبِاسْمِكَ الَّذِى إِلا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ لا تَأخُذُهُ

এরপর সে যেকোন দোয়া করবে, আল্লাহ তাআলা তা কবুল করবেন।

জুমআর দিনকে আখেরাতের জন্যে নির্দিষ্ট করবে। এতে দুনিয়ার কোন কাজ করবে না। বেশী পরিমাণে ওযিফা পাঠ করবে এবং এদিন সফর শুরু করবে না। বর্ণিত আছে, যেব্যক্তি জুমআর রাত্রে সফর করে, তার উভয় ফেরেশতা তার জন্যে বদ দোয়া করে। জুমআর ফজরের পরে তো সফর নিষিদ্ধই, যদি কাফেলা চলে না যায়।
সারকথা, জুমআর দিনে ওযিফা পাঠ ও দান-খয়রাত বেশী করে করবে। আল্লাহ তাআলা যখন কোন বান্দাকে পছন্দ করেন, তখন তার কাছ থেকে ভাল সময়ে ভাল কাজ নেন। আর যখন কোন বান্দাকে অপছন্দ করেন, তখন তার কাছ থেকে ভাল সময়ে খারাপ কাজ নেন, যাতে এ খারাপ কাজ তাঁর আযাব আরও বাড়িয়ে দেয়।
+++++++++++++++++
এহইয়াউ উলুমিদ্দিন

জুমআ (পর্ব– ৩) জুম'আর আদব



জুমআ (পর্ব– ৩)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
জুম'আর আদব 
জুমআর ফযীলত লাভের উদ্দেশ্যে বৃহস্পতিবার থেকে তৎপর হওয়া উচিত। সেমতে আসরের পর দোয়া, এস্তেগফার ও তসবীহ পাঠে মশগুল হবে। কেননা, এ সময়টি জুমআর মধ্যে অজ্ঞাত মুহূর্তের সমান ফযীলত রাখে।

জনৈক বুযুর্গ বলেন : আল্লাহ তাআলার কাছে মানুষের জীবিকা ছাড়া আরও একটি অনুগ্রহ আছে, যা থেকে তিনি তাকে দেন, যে তাঁর কাছে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এবং জুমআর দিন তা তলব করে।
বৃহস্পতিবার দিন কাপড়-চোপড় ধুয়ে পরিষ্কার করবে। সুগন্ধিও যোগাড় করবে। এ রাত্রে জুমআর দিনে রোযা রাখার নিয়ত করবে। এর অনেক সওয়াব। কিন্তু এর সাথে বৃহস্পতিবার অথবা শনিবারের রোযা মিলিয়ে নেবে। কেননা, শুধু জুমআর দিন রোযা রাখা মাকরূহ। এ রাত্রিটি নামায ও খতমে কোরআনে অতিবাহিত করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। কেউ কেউ এ রাতে স্ত্রীসহবাস মোস্তাহাব বলেছেন। তাঁরা এ হাদীসের উদ্দেশ্য তাই বলেছেন:–
“আল্লাহ রহম করুন সেই ব্যক্তির প্রতি, যে প্রথম ওয়াক্তে জুমআ আসে, শুরু থেকে খোতবা শুনে এবং গোসল করায় ও গোসল করে”। এখানে গোসল করায় অর্থ স্ত্রীকে গোসল করায়।
এসব কাজ করলে পূর্ণরূপে জুমআকে স্বাগত জানানো হবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি গাফেলদের শ্রেণী থেকে বের হয়ে যাবে, যারা সকাল বেলায় জিজ্ঞেস করে, আজ কোন্ দিন?


জনৈক বুযুর্গ বলেন : জুমআর পূর্ণ অংশ সেই ব্যক্তি পায়, যে একদিন পূর্ব থেকে এর অপেক্ষা করে। আর ক্ষুদ্র অংশ সেই ব্যক্তি পায়, যে সকালে জিজ্ঞেস করে, আজ কোন্ দিন? কোন কোন বুযুর্গ জুমআর পূর্ব রাতে জামে মসজিদেই থাকতেন।

জুমআর দিন ফজর হতেই গোসল করা উচিত, যদিও তখন জামে মসজিদে না যায়। কিন্তু এর কাছাকাছি সময়েই মসজিদে যাওয়া উচিত, যাতে গোসল ও মসজিদে যাওয়া কাছাকাছি সময়ে হয়। জুমআর দিন গোসল করা তাকিদসহ মোস্তাহাব। কোন কোন আলেম একে ওয়াজিব বলেছেন। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন-
“জুমআর গোসল প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের উপর ওয়াজিব”।
এক মশহুর হাদীসেআছে,
“যে জুমআয় উপস্থিত হয়, তার গোসল করা উচিত। মদীনার মুসলমানরা কাউকে মন্দ বলার ক্ষেত্রে এরূপ বলত : “তুমি তার চেয়েও খারাপ, যে জুমআর দিন গোসল করে না”।

একবার হযরত ওমর (রঃ) জুমআর খোতবা দিচ্ছিলেন। এমন সময় হযরত ওসমান (রঃ) মসজিদে আগমন করলেন। এ সময়ে আগমন খারাপ মনে করে হযরত ওমর (রঃ) বললেন : এটা কোন্ সময়? অর্থাৎ, আগে এলেন না কেন? হযরত ওসমান (রঃ) জওয়াব দিলেন : আমি আযান শুনার পর দেরী করিনি। ওযু করেই চলে এসেছি। হযরত ওমর (রঃ) বললেন : একটি নয়, দুটি হল। আপনি তো জানেন, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাকিদ সহকারে জুমআর দিন গোসল করার জন্যে বলতেন। আপনি কেবল ওযু করলেন।
এক রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : যেব্যক্তি জুমআর দিন ওযু করে, সে ভাল করে। আর যে গোসল করে সে সর্বোত্তম কাজ করে। এ থেকে জানা গেল, গোসল তরক করাও জায়েয।
জুমআর দিন সাজসজ্জা করা মোস্তাহাব। তিনটি বিষয় সাজসজ্জার অন্তর্ভুক্ত- পোশাক, পরিচ্ছন্নতা ও সুগন্ধি ব্যবহার করা। পরিচ্ছন্নতার মধ্যে রয়েছে মেসওয়াক করা, চুল কাটা, নখ কাটা ও গোঁফ কাটা। এছাড়া পবিত্রতা অধ্যায়ে যেসব বিষয় বর্ণিত হয়েছে, সেগুলোও করা উচিত।
হযরত ইবনে মসউদ (রঃ) বলেন : যেব্যক্তি জুমআর দিন নখ কাটে, আল্লাহ তাআলা তার নখ থেকে রোগ দূর করে দেন। নিজের কাছে যে উৎকৃষ্ট সুগন্ধি থাকে, তা জুমআর দিন ব্যবহার করবে, যাতে দুর্গন্ধ দূর হয় এবং উপস্থিত মুসল্লীরা আরাম বোধ করে। পুরুষদের জন্যে উত্তম সুগন্ধি হচ্ছে যার গন্ধ প্রকট এবং রং অস্পষ্ট। পক্ষান্তরে নারীদের জন্যে সেই সুগন্ধি উত্তম, যার রং উজ্জ্বল এবং গন্ধ গোপন। ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) বলেন : যেব্যক্তি তার কাপড় চোপড় পরিষ্কার রাখে, তার মনোকষ্ট কম হয় এবং যার সুগন্ধি উৎকৃষ্ট, তার বুদ্ধি বাড়ে। সাদা পোশাক সর্বোত্তম। আল্লাহ তা'আলার কাছে সাদা পোশাক অধিক পছন্দনীয়। কাল পোশাকে কোন সওয়াব নেই। কেউ কেউ কাল পোশাকের দিকে তাকানো মাকরূহ বলেছেন। জুমআর দিনে পাগড়ী পরিধান করা মোস্তাহাব। ওয়াসেলা ইবনে আসকা (রঃ)-এর রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : আল্লাহ তাআলা ও তাঁর ফেরেশতাগণ জুমআর দিন পাগড়ী পরিধানকারীদের প্রতি রহমত প্রেরণ করেন। সুতরাং গরমে কষ্ট হলে নামাযের পূর্বে ও পরে পাগড়ী খুলে ফেলায় দোষ নেই।

জামে মসজিদে সকালেই রওয়ানা হওয়া উচিত। এর সওয়াব অনেক। যাওয়ার সময় খুশু সহকারে থাকবে। নামায শেষ হওয়া পর্যন্ত মসজিদে এতেকাফের নিয়ত করবে। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন : "যেব্যক্তি মসজিদে আউয়াল ওয়াক্তে যায় সে যেন একটি উট কোরবানী করে; যে দ্বিতীয় প্রহরে যায়, সে যেন একটি গরু কোরবানী করে; যে তৃতীয় প্রহরে যায়, সে যেন শিংবিশিষ্ট ভেড়া কোরবানী করে; যে চতুর্থ প্রহরে যায়, সে যেন খোদার পথে মুরগী যবেহ করে এবং যে পঞ্চম প্রহরে যায়, সে যেন একটি ডিম আল্লাহর জন্যে উৎসর্গ করে। ইমাম যখন খোতবার জন্যে বের হয়ে আসেন, তখন আমলনামা বন্ধ করে দেয়া হয়, কলম তুলে নেয়া হয় এবং ফেরেশতারা মিম্বরের কাছে সমবেত হয়ে যিকির (খুতবা) শ্রবণ করে। এ সময় যারা আসে তারা কোন সওয়াব পায় না"।
সূর্যোদয় পর্যন্ত প্রথম ওয়াক্ত, এক বর্শা পরিমাণ সূর্য উপরে উঠা পর্যন্ত দ্বিতীয় প্রহর, রৌদ্র প্রখর থাকা পর্যন্ত তৃতীয় প্রহর এবং এ সময় থেকে সূর্য ঢলে পড়া পর্যন্ত চতুর্থ ও পঞ্চম প্রহর। এ দু'প্রহরে সওয়াব কম। সূর্য ঢলে পড়ার পর নামাযের সময়। এতে কোন সওয়াব নেই।
রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন : "তিনটি কাজের সওয়াব যদি মানুষ জানত, তবে সেগুলোর জন্যে মানুষ সওয়ারীতে বসে রওয়ানা হয়ে যেত- (১) আযান, (২) জামাআতের প্রথম সারি এবং (৩) ভোরে জুমআর নামাযের জন্যে মসজিদে যাওয়া"।

এক হাদীসে আছে, "জুমআর দিন ফেরেশতারা হাতে রূপার কাগজ ও স্বর্ণের কলম নিয়ে জামে মসজিদের দরজাসমূহে বসে যায় এবং প্রথম ও দ্বিতীয় প্রহরে আগমনকারীদের নাম লিপিবদ্ধ করে"।
এক হাদীসে আছে, "যখন কোন বান্দা জুমআর দিনে দেরী করে, তখন ফেরেশতারা তাকে তালাশ করে এবং তার অবস্থা একে অপরের কাছে জিজ্ঞেস করে। তারা বলে : ইলাহী, যদি দারিদ্র্যের কারণে তার দেরী হয়ে থাকে, তবে তাকে ধনাঢ্য কর। রোগের কারণে দেরী হয়ে থাকলে তাকে সুস্থতা দান কর। কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে দেরী হলে তাকে অবসর দান কার। কোন খেলার কারণে দেরী হয়ে থাকলে তার অন্তর এবাদতের দিকে ফিরিয়ে দাও"।
প্রথম শতাব্দীতে সেহরীর সময় এবং সোবহে সাদেকের পরে রাস্তা জনাকীর্ণ থাকত। লোকজন প্রদীপ হাতে জামে মসজিদে ঈদের দিনের মত দলে দলে গমন করত। আস্তে আস্তে এটা বিলুপ্ত হয়ে যায়। ইসলামে এটাই প্রথম বেদআত ছিল, লোকজন জুমআর দিন ভোরে মসজিদে যাওয়া ত্যাগ করল। ইহুদী খৃস্টানদের দেখেও মুসলমানের লজ্জা হয় না। তারা তাদের এবাদত গৃহে শনিবার ও রবিবার প্রত্যূষে যায়। দুনিয়াপ্রার্থীরাও ক্রয়-বিক্রয় মুনাফা উপার্জনের জন্যে খুব ভোরে বাজারে যায়। আখেরাতের প্রার্থীদের কি হল, তারা এ ব্যাপারে অগ্রগামী হয় না?
কথিত আছে, মানুষ যখন আল্লাহ্ তাআলার দীদার লাভ করবে, তখন তারা ততটুকু নৈকট্য পাবে, যতটুকু প্রত্যূষে জুমআয় গমন করবে। হযরত ইবনে মসউদ (রঃ) জামে মসজিদে খুব ভোরে গিয়ে দেখেন, তিন ব্যক্তি তাঁরও আগে মসজিদে বিদ্যমান রয়েছে। এতে তিনি দুঃখিত হলেন এবং নিজেকে ধিক্কার দিয়ে বললেন : চার জনের মধ্যে আমি চতুর্থ হলাম।

জামে মসজিদে প্রবেশ করার পর মানুষের ঘাড় ডিঙ্গিয়ে এবং সামনে দিয়ে যাবে না। অনেক আগে গেলে এরূপ করার প্রয়োজনই হবে না। মানুষের ঘাড় ডিঙ্গিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে কঠোর শাস্তিবাণী বর্ণিত হয়েছে। হাদীসে আছে, কেয়ামতের দিন এরূপ ব্যক্তিকে পুল করে মানুষকে তার উপর দিয়ে যেতে বলা হবে।
ইবনে জুরায়েজ থেকে বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) জুমআর খোতবা দেয়ার সময় দেখলেন, এক ব্যক্তি মানুষের ঘাড় ডিঙ্গিয়ে সামনে এসে বসে গেছে। নামাযের পর তিনি সেই লোকটির সাথে সাক্ষাৎ করে বললেন : ব্যাপার কি, তুমি আজ আমাদের সাথে জুমআয় শরীক হলে না? লোকটি বলল : হুযুর, আমি তো জুমআ উপস্থিত হয়েছি। তিনি বললেন : আমি তোমাকে মানূষের ঘাড় ডিঙ্গিয়ে যেতে দেখেছিলাম। এতে ইঙ্গিত আছে, লোকটির আমল বেকার হয়েছে এক রেওয়ায়েতে আছে, লোকটি আরজ করল : হুযুর আমাকে দেখেননি? তিনি বললেন : আমি দেখেছি, তুমি দেরীতে এসেছ এবং মানুষকে কষ্ট দিয়েছ।
হাঁ, প্রথম কাতার খালি পড়ে থাকলে মানুষের উপর দিয়ে যাওয়া দূষণীয় নয়। কারণ, তখন মানুষ নিজেরাই নিজেদের হক নষ্ট করে এবং ফযীলতের স্থান ছেড়ে দেয়।
হযরত হাসান (রঃ) বলেন : যারা জুমআর দিনে জামে মসজিদের দরজায়ই বসে যায়, তাদের ঘাড় ডিঙ্গিয়ে যাও। তাদের কোন ইযযত নেই।
নামায পড়ার সময় নামাযীর সামনে দিয়ে যাবে না। নামাযী নিজে স্তম্ভ অথবা প্রাচীরের কাছে বসবে, যাতে কেউ সামনে দিয়ে না যায়। নামাযীর সামনে দিয়ে গেলে নামায ফাসেদ হয় না ঠিক; কিন্তু এটা নিষিদ্ধ। রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : মুসলমানের জন্যে চল্লিশ বছর দাঁড়িয়ে থাকা নামাযীর সামনে দিয়ে যাওয়া অপেক্ষা উত্তম। তিনি আরও বলেন : মানুষের জন্যে ছাই ও ধুলা হয়ে বাতাসে উড়ে যাওয়া নামাযীর সামনে দিয়ে যাওয়া অপেক্ষা ভাল।
অন্য এক হাদীসে বলা হয়েছে, যদি কেউ জানত নামাযের সামনে দিয়ে যাওয়া কত বড় গোনাহ্, তবে চল্লিশ বছর দাঁড়িয়ে থাকা তার জন্যে উত্তম হত। যদি স্তম্ভ, প্রাচীর অথবা বিছানো জায়নামাযের ভিতরের ভাগ দিয়ে কেউ গমন করে, তবে নামাযীর উচিত তাকে হটিয়ে দেয়া। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : নামাযীর উচিত তাকে হটিয়ে দেয়া। যদি না মানে তবে আবার হটিয়ে দেবে। যদি এর পরও না মানে, তবে তার সাথে লড়াই করবে। কেননা, সে শয়তান।
হযরত আবু সায়ীদ খুদরী (রাঃ) -এর সামনে দিয়ে কেউ গেলে তিনি সজোরে ধাক্কা দিতেন। ফলে সে মাটিতে পড়ে যেত। প্রায়ই তিনি তাঁকে জড়িয়ে ধরতেন। মারওয়ানের কাছে এ অভিযোগ গেলে মারওয়ান বলতেন : রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাঁকে এরূপ করার আদেশ দিয়েছেন। নামাযীর উচিত সামনে এক হাত দীর্ঘ কোন খুঁটি পুঁতে নেয়া, যাতে সীমা চিহ্নিত হয়ে যায়।

জুমআর নামাযে প্রথম কাতারে বসার চেষ্টা করবে। এর সওয়াব অনেক। রেওয়ায়েত আছে- যেব্যক্তি পরিবারের লোকজনকে গোসল করায়, নিজে গোসল করে, সকালে মসজিদে যায়, প্রথম খোতবা পায় এবং ইমামের কাছে থেকে খোতবা ও কেরাআত শ্রবণ করে, এটা তার জন্যে দু'জুমআর মধ্যবর্তী দিন এবং আরও তিন দিনের গোনাহের কাফফারা হয়ে যায়। অন্য এক রেওয়ায়েতে প্রথম কাতার অন্বেষণ করার কথা বলা হয়েছে।

কিন্তু যদি ইমামের কাছে এমন কোন বিষয় থাকে, যা পরিবর্তন করতে তুমি অক্ষম; যেমন ইমাম রেশমী বস্ত্র পরিহিত হলে অথবা ভারী অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে নামাযে এলে প্রথম কাতার থেকে পেছনে থাকা তোমার জন্যে উত্তম। কেননা, এমতাবস্থায় প্রথম কাতারে থাকলে তোমার ধ্যান বিক্ষিপ্ত হবে। কোন কোন আলেম এহেন অবস্থায় নিরাপত্তার খাতিরে প্রথম কাতার বর্জন করেছেন।
বিশর ইবনে হারেসকে কেউ জিজ্ঞেস করল : আমরা আপনাকে ভোর বেলায় মসজিদে আসতে দেখি। কিন্তু আপনি শেষ কাতারসমুহে নামায পড়েন। এটা কেন?
তিনি বললেন : অন্তরের নৈকট্য উদ্দেশ্য- দেহের নয়। এতে তিনি ইঙ্গিত করেছেন, পেছনের কাতারে থাকা অন্তরের জন্যে ভাল।
সুফিয়ান সত্ত্বরী শোয়ায়েব ইবনে হরবকে মিম্বরের কাছে আবু জাফর মনসুরের খোতবা শুনতে দেখলেন। নামাযান্তে সুফিয়ান শোয়ায়েবকে বললেন : মনসুরের কাছে আপনাকে বসা দেখে আমি বিচলিত হয়েছি। যদি আপনি তার মুখে এমন কোন কথা শুনেন, যার প্রতিবাদ করা জরুরী হয়, তবে আপনি প্রতিবাদ করতে পারবেন কি? এরা কাল পোশাকের বেদআত আবিষ্কার করেছে। শোয়ায়েব বললেন : হাদীসে কি ইমামের কাছে থাকতে এবং খোতবা শুনতে বলা হয়নি? সুফিয়ান বললেন : এটা খোলাফায়ে রাশেদীনের বেলায় প্রযোজ্য। এদের কাছ থেকে তো যত দূরে থাকা যায়, ততই আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জিত হবে।
হযরত সাঈদ ইবনে আমের বলেন : আমি হযরত আবু দারদার সাথে নামায পড়ি। তিনি নামাযে পেছনের কাতারে যেতে লাগলেন। অবশেষে আমরা সর্বশেষ কাতারে চলে গেলাম। নামাযান্তে আমি তাঁকে বললাম : প্রথম কাতার কি সব কাতার অপেক্ষা উত্তম নয়? তিনি বললেন : হাঁ, কিন্তু এটা রহমতপ্রাপ্ত উম্মত। এ উম্মতের প্রতি রহমতের দৃষ্টি রয়েছে। আল্লাহ তাআলা যখন কোন বান্দাকে নামাযে রহমতের দৃষ্টিতে দেখেন, তখন তার পেছনে যত মানুষ থাকে, সকলকে ক্ষমা করে দেন। অতএব আমি এই আশা নিয়ে সকলের পেছনে দাঁড়িয়েছি, সম্মুখের কাতারের যার প্রতি আল্লাহ তাআলা রহমতের দৃষ্টি দেবেন, তাঁর ওসিলায় আমার মাগফেরাত হয়ে যাবে।
কোন কোন রেওয়ায়েতে আছে, হযরত আবু দারদা এ বিষয়বস্তু রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-উনার কাছ থেকে শুনেছেন । সুতরাং যেব্যক্তি এরূপ নিয়ত সহকারে পেছনের কাতারে থাকে, অন্যকে অগ্রগণ্য মনে করে এবং সচ্চরিত্রতা প্রদর্শন করে, তার জন্যে এতে কোন দোষ নেই। প্রকাশ থাকে যে, মিম্বরের সাথে সংলগ্ন পূর্ণ কাতারকে প্রথম কাতার ধরা হবে। সুতরাং মিম্বর যদি কোন কাতারকে কেটে দেয়, তবে মিম্বরের দু'পাশে যে কাতার, তা পূর্ণ কাতার নর। তাই একে প্রথম কাতার ধরা হয় না।
হযরত সুফিয়ান সওরী বলতেন : মিম্বরের সম্মুখস্থ কাতার প্রথম কাতার। কেননা, এটাই মিম্বর সংলগ্ন কাতার। এতে উপবিষ্ট ব্যক্তি ইমামের সম্মুখে থাকে এবং তাঁর খোতবা শুনে। কিন্তু মিম্বরের প্রতি লক্ষ্য না করে যে কাতার কেবলার অধিক নিকটবর্তী, তাকে প্রথম কাতার বলা সম্ভবপর।

ইমাম যখন মিম্বর যান, তখন নামায বন্ধ করতে হবে এবং কথাবার্তাও মওকুফ করতে হবে। এ সময় খোতবা শ্রবণ করতে হবে। কোন কোন সাধারণ লোকের অভ্যাস এই, মুয়াযযিন আযান দিতে উঠলে তারা সেজদা করে। হাদীসে ও গুণীজন বাক্যে এর কোন ভিত্তি নেই। হযরত আলী ও হযরত ওসমান (রঃ) থেকে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি চুপচাপ খোতবা শুনে তার জন্যে দুটি সওয়াব, যে খোতবা শুনে না এবং চুপ থাকে, তার জন্যে এক সওয়াব এবং যে শুনে বাজে কথা বলে, তার জন্যে দু'গোনাহ্ লেখা হয়। আর যেব্যক্তি শুনে না এবং বাজে কথা বলে, তার জন্যে এক গোনাহ্ লেখা হয়।
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : “যেব্যক্তি ইমাম খোতবা পাঠ করার সময় সঙ্গীকে বলে : চুপ থাক, সে বাজে কথা বলে। আর যে বাজে কথা বলে তার জুমআ হয় না”।
এ রেওয়ায়েত থেকে জানা গেল, ইশারা করে অথবা কংকর নিক্ষেপ করে চুপ করাতে হবে- কথা বলে নয়।
হযরত আবু যর (রঃ) বলেন : রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) যখন খোতবা পাঠ করছিলেন, তখন আমি উবাই ইবনে কাবকে প্রশ্ন করলাম, এ সূরা কবে নাযিল হয়েছিল। হযরত উবাই আমাকে চুপ থাকতে ইশারা করলেন। এর পর রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) মিম্বর থেকে নামার পর উবাই আমাকে বললেন : যাও, তোমার জুমআ নেই। আমি রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)- এর কাছে অভিযোগ পেশ করলাম। তিনি বললেনঃ উবাই ঠিক বলেছে।
যেব্যক্তি দূরে বসার কারণে খোতবা শুনতে অক্ষম, তার চুপ থাকা উচিত। হযরত আলী (রাঃ) বলেন : চার সময়ে নফল নামায মাকরূহ - ফজরের পরে, আসরের পরে, ঠিক দ্বিপ্রহরে এবং ইমাম যখন খোতবা দেন।

জুমআর নামায শেষ হলে কথা বলার পূর্বে
>সাত বার আলহামদু লিল্লাহ,
>সাত বার কুল হুয়াল্লাহু এবং
সাত বার কুল আউযু সূরাদ্বয় (ফালাক ও নাস) পাঠ করবে। বর্ণিত আছে, যে এরূপ করবে সে এক জুমআ থেকে অন্য জুমআ পর্যন্ত নিরাপদ থাকবে এবং শয়তান থেকে আশ্রয় পাবে। জুমআর পরে নিম্নোক্ত দোয়া পাঠ করা মোস্তাহাব :

‎اللَّهُمَّ يَا غَنِيُّ يَا حَمِيدُ يَا مُبْدِي يَا مُعِبُدُ يَا رَحِيمُ يَا وَدُودُ أَغْنِنِى بِحَلَالِكَ عَنْ حَرَامِكَ وَبِفَضْلِكَ عَنْ مَنْ سِوَاكَ .


“আল্লাহুম্মা ইয়া গানিয়্যু-ইয়া হামিদ, ইয়া মুবদি-ইয়া মুয়িদ, ইয়া রাহিমু-ইয়া ওয়াদুদ, আগনি বি-হালালিকা আন্ হারামিকা ওয়া বি ফাদলিকা আম্মান সিওয়াক”

অর্থাৎ, হে আল্লাহ, হে অমুখাপেক্ষী, হে প্রশংসিত, হে প্ৰথমে সৃষ্টিকারী, হে পুনর্বার সৃষ্টিকারী, হে দয়ালু, হে প্রিয়, আমাকে আপনার হালাল রিযিক দ্বারা হারাম থেকে রক্ষা করুন এবং আপনার অনুগ্রহ দ্বারা আপনি ব্যতীত সব কিছুর প্রতি অমুখাপেক্ষী করুন।

বর্ণিত আছে, কেউ যথারীতি এ দোয়া পাঠ করলে আল্লাহ তাআলা তাকে সৃষ্ট জীব থেকে বেপরওয়া করে দেন এবং তাকে ধারণাতীত স্থান থেকে রিযিক পৌছান। এর পর জুমআর পরবর্তী ছয় রাকআত নামায পড়বে। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) থেকে দু'রাকআত, চার রাকআত এবং ছয় রাকআত পড়ার বিভিন্ন রূপ রেওয়ায়েত বর্ণিত আছে। এগুলো বিভিন্ন অবস্থায় দুরস্ত। অতএব ছয় রাকআত পড়লে সবগুলো রেওয়ায়েত পালিত হয়ে যাবে।
জুমআ শেষে আসরের নামায পর্যন্ত মসজিদে থাকা উচিত। মাগরিব পর্যন্ত থাকলে আরও ভাল। বর্ণিত আছে, যেব্যক্তি জামে সমজিদে আসরের নামায পড়ে, সে হজ্জের সওয়াব পায় এবং যে মাগরিবের নামাযও পড়ে, সে হজ্জ ও ওমরার সওয়াব পায়। যদি রিয়ার আশংকা থাকে অথবা মসজিদে অনর্থক কথাবার্তায় মশগুল হওয়ার ভয় হয়, তবে আল্লাহর যিকির করতে করতে এবং তাঁর নেয়ামতের কথা ভাবতে ভাবতে গৃহে ফিরে আসাই উত্তম। এর পর সূর্যাস্ত পর্যন্ত অন্তর ও মুখের হেফাযত করবে, যাতে জুমআর দিনের উৎকৃষ্ট মুহূর্তটি বিনষ্ট না হয়।
জামে মসজিদে ও অন্যান্য মসজিদে দুনিয়ার কথাবার্তা বলা উচিত নয়। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : এমন সময় আসবে, যখন মানুষ মসজিদসমূহে দুনিয়ার কথাবার্তা বলবে। তাদের সাথে আল্লাহ তাআলার কোন সম্পর্কই নেই। তুমি তাদের কাছে বসো না।


জু'মআ (পর্ব- ২) জুমআর শর্ত

জু'মআ (পর্ব- ২)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

জুমআর শর্ত-
প্রকাশ থাকে যে, অন্যান্য নামাযে যেসব শর্ত রয়েছে, সেগুলো জুমআর মধ্যেও শর্ত। কিন্তু কয়েকটি অতিরিক্ত শর্ত জুমআর মধ্যে রয়েছে, যা অন্যান্য নামাযে নেই।
(১) প্রথমতঃ যোহরের সময় হওয়া। সুতরাং যদি জুমআর নামাযে ইমামের সালাম আসরের সময়ে পড়ে যায়, তবে জুমআ বাতিল হবে। তখন ইমামের জন্যে জরুরী হবে, দু'রাকআত আরও বাড়িয়ে যোহর পূর্ণ করা।
(২) দ্বিতীয়ত জামাআত হওয়া শর্ত। শাফেয়ী মাযহাবে কমপক্ষে চল্লিশ জন এবং হানাফী মাযহাবে ইমামসহ তিন জন হওয়া জরুরী। প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতে শহরের কয়েক জায়গায় জুমআ হলে যে ইমাম শ্রেষ্ঠ, তাঁর পেছনে জুমআ পড়া উত্তম। এক্ষেত্রে মুসল্লীদের সংখ্যাধিক্যও লক্ষণীয় ব্যাপার।
(৩) তৃতীয়তঃ জুমআর জন্যে উপযুক্ত স্থান শর্ত। সুতরাং জঙ্গলে, বিজন স্থানে ও তাঁবুতে জুমআর নামায হয় না। এর জন্যে অস্থাবর দালান বিশিষ্ট স্থান জরুরী।
(৪) চতুর্থতঃ দু'খোতবা দেয়া এবং উভয় খোতবার মাঝখানে বসা। প্রথম খোতবায় চারটি বিষয় থাকা ওয়াজিব-
(১) আল্লাহর প্রশংসা করা এবং কমপক্ষে আলহামদু লিল্লাহ বলা,
(২) রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-এর প্রতি দরূদ পাঠ করা,
(৩) তাকওয়ার উপদেশ দেয়া এবং
(৪) কোরআন পাক থেকে একটি আয়াত পাঠ করা।
অনুরূপভাবে দ্বিতীয় খোতবায়ও এ চারটি বিষয় ওয়াজিব। কিন্তু আয়াত পাঠের জায়গায় দোয়া পাঠ করা ওয়াজিব। উভয় খোতবা শ্রবণ করাও ওয়াজিব।
প্রাপ্তবয়স্ক, বুদ্ধিমান মুসলমান ব্যক্তির উপর জুমআ ফরয। যাদের উপর জু'মআ ফরয তাদের জন্যে বৃষ্টি, কর্দমাক্ততা, ভয়, অসুস্থতা ও অসুস্থ ব্যক্তির দেখাশুনা করার ওযরে জুমআ তরক করার অনুমতি আছে। তাদের জন্যে জুমআর নামায শেষ হওয়ার পর যোহর পড়া মোস্তাহাব। যদি জুমআর নামাযে গোলাম, মুসাফির ও মগ্ন ব্যক্তি হাযির হয় তবে তাদের জুমআ দুরস্ত হবে। যোহরের নামায পড়তে হবে না।
পরবর্তী পর্ব - 
জুমার আদব 

জু'মআ (পর্ব- ১) জুমআর ফযীলত



জু'মআ (পর্ব- ১)
এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

জুমআর ফযীলত
জানা উচিত, জুমআর দিন একটি মহান দিন। আল্লাহ তা'আলা এর মাধ্যমে ইসলামকে মাহাত্ম্য দান করেছেন এবং একে মুসলমানের বৈশিষ্ট্য সাব্যস্ত করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, 
>"মুমিনগণ, যখন জুমআর দিন নামাযের জন্যে আযান দেয়া হয়, তখন তোমরা আল্লাহর যিকিরের দিকে ত্বরা করবে এবং ক্রয়-বিক্রয় বন্ধ রাখবে"।
এ আয়াতে দুনিয়ার কাজকর্মে মশগুল হওয়া এবং জুমআয় যাওয়ার পরিপন্থী সকল কাজ-কারবার হারাম করা হয়েছে।
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন, 
>"আল্লাহ তা'আলা তোমাদের উপর জুমআ ফরয করেছেন আমার এদিনে ও এ স্থানে"।" 
এক রেওয়ায়েতে এরশাদ হয়েছে 
>"যেব্যক্তি বিনা ওযরে তিন বার জুমআ তরক করে, আল্লাহ্ তা'আলা তার অন্তরে মোহর মেরে দেন"।
এক ব্যক্তি হযরত ইবনে আব্বাস (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে বলল : অমুক ব্যক্তি মারা গেছে। সে জুমআ ও জামাআতে উপস্থিত হত না। এখন তার অবস্থা কি হবে? তিনি বললেন : সে দোযখী। লোকটি একমাস পর্যন্ত তাঁর কাছে এসে এ প্রশ্নই করল এবং তিনি উত্তর দিলেন, সে দোযখী। হাদীসে আছে, ইহুদী ও খ্রীস্টানদেরকে জুমআর দিন দেয়া হলে তারা এতে বিরোধ করল। তাই তাদেরকে এ থেকে বঞ্চিত করে আমাদেরকে দেয়া হয়েছে। এ উম্মতের জন্যে একে ঈদ করা হয়েছে। 
হযরত আনাস (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়া-সাল্লাম) বলেন : 
>"আমার কাছে হযরত জিবরাঈল (আলাইহিস্সালাম) আগমন করলেন। তাঁর হাতে একটি উজ্জ্বল আয়না ছিল। তিনি বললেনঃ এটা 'জুমআ'। যা আল্লাহ তাআলা আপনাকে দান করেছেন, যাতে আপনার এবং আপনার উম্মতের জন্যে এটা ঈদ হয়। আমি জিজ্ঞাসা করলাম : 'জুমআ' দিয়ে আমাদের কি উপকার হবে? তিনি বললেন : এতে একটি সর্বোৎকৃষ্ট মুহূর্ত আছে। যেব্যক্তি এ মুহূর্তে নিজের কল্যাণের জন্যে দোয়া করবে, যদি সেই কল্যাণ তার নসীবে না থাকে, তবে তার তুলনায় অনেক বেশী তার জন্য সঞ্চিত রাখবেন। অথবা কেউ এ মুহূর্তে কোন বালা মসিবত থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করলে যদি সেই বালা মসিবত তার নসীবে লেখা থাকে, তবে আল্লাহ তাআলা বালা-মুসিবত অপেক্ষা বড় বালা-মসিবত থেকেও তাকে রক্ষা করবেন। আমাদের কাছে এদিন সকল দিনের সর্দার। আমরা একে আখেরাতে – বৃদ্ধির দিন বলব। আমি এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন : আপনার পরওয়ারদেগার জান্নাতে একটি শুভ্র ও মেশকের চেয়ে অধিক সুগন্ধিযুক্ত উপত্যকা নির্দিষ্ট করেছেন। জুমআর দিন হলে তিনি ইল্লিয়্যীন থেকে তথায় তাঁর সিংহাসনে অবতরণ করবেন এবং মানুষের জন্যে দ্যুতি বিকিরণ করবেন, যাতে তারা তাঁকে দেখতে পায়।" 
এক হাদীসে আছে, 
>"যে সর্বোত্তম দিনের উপর সূর্য উদিত হয়েছে, তা হচ্ছে জুমআর দিন। এদিনে হযরত আদম (আলাইহিস্সালাম) সৃজিত হয়েছেন। এদিনেই তাঁকে জান্নাতে দাখিল করা হয়েছে। এদিনেই তাকে পৃথিবীতে নামানো হয়েছে। এদিনেই তাঁর তওবা কবুল হয়েছে। এদিনেই তাঁর ওফাত হয়েছে। এদিনেই কেয়ামত সংঘটিত হবে। এদিন আল্লাহর কাছে বৃদ্ধির দিন। আকাশে ফেরেশতারা একে তা-ই বলে। এদিনেই জান্নাতে খোদায়ী দীদার হবে।"
হাদীসে আছে, 
>"আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক জুমআর দিনে ছয় লক্ষ বান্দাকে দোযখ থেকে মুক্তি দেন।" 
হযরত আনাস (রদিয়াল্লাহু আনহু)-এর রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে  ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন : 
>"যখন জুমআর দিন সহি-সালামত থাকে, তখন অন্য দিনও সহি-সালামত থাকে।" 
তিনি আরও বলেছেন : 
>"প্রত্যহ সূর্য যখন আকাশের মাঝখানে থাকে, তখন দোযখ উত্তপ্ত করা হয়। তখন নামায় পড়ো না; কিন্তু জুমআর দিন সবটুকুই নামাযের সময়। এদিনে দোযখ উত্তপ্ত করা হয় না।" 
হযরত কা'ব বলেন : আল্লাহ তাআলা শহরসমূহের মধ্যে মক্কা মোয়াযযমাকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন, মাসসমূহের মধ্যে রমযানকে, দিনসমূহের মধ্যে জুমআকে এবং রাত্রিসমূহের মধ্যে শবে কদরকে ফযীলত দিয়েছেন। কথিত আছে, পক্ষীসমূহ এবং ইতর কীট-পতঙ্গ জুমআর দিনে পরস্পরে সাক্ষাৎ করে এবং বলে : সালাম, সালাম, এটা ভাল দিন। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন,- 
>"যেব্যক্তি জুমআর দিন (ঈমান সহকারে) মৃত্যুবরণ করে, আল্লাহ তা'আলা তার জন্যে শহীদের সওয়াব লেখেন এবং কবরের আযাব থেকে তাকে মুক্তি দেন।"

অন্তর বা হৃদয়- ১ অন্তরের পরিচয় - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)



অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ১) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

অন্তরের পরিচয় 
সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর নিমিত্ত, যার মাহিমা অনুধাবনে হৃদয় ও মন হতবুদ্ধি এবং নূরের কিঞ্চিৎ দ্যুতির কারণে চক্ষু ও দৃষ্টি কিংকর্তব্যবিমূঢ়। তিনি গোপন রহস্যাবলী এবং অন্তরে লুক্কায়িত ভেদ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত। তাঁর রাজত্ব পরিচালনায় উপদেষ্টা ও মন্ত্রীর প্রয়োজন নেই। দোষ গোপন করা এবং হৃদয় পরিবর্তন করা তাঁর কাজ এবং 'গাফফারু যুনুব’ (গোনাহ মার্জনাকারী) ও 'সাত্তারুল উয়ুব’ (দোষ গোপনকারী) তাঁর নাম। 

দুরূদ ও সালাম হযরত শাফীউল মুজনিবীন সাইয়েদুল মুরসালীন মুহাম্মদ মুস্তফা (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়া-সাল্লাম)-উনার প্রতি, যিনি ধর্মের শৃঙ্খলা বিধান করেছেন এবং ধর্মদ্রোহীদেরকে সমূলে উৎপাটিত করেছেন। তাঁর পবিত্র বংশধর ও পুণ্যাত্মা সাহাবায়ে কেরামের প্রতি অসংখ্য সালাম। 


প্রকাশ থাকে যে, যে মর্যাদা ও উৎকর্ষের কারণে মানুষ “আশরাফুল মাখলুকাত” তথা সৃষ্টির সেরা বলে পরিচিত, তা হচ্ছে আল্লাহ পাকের মারেফতের যোগ্যতা। এ মারেফতই ইহকালে মানুষের সৌন্দর্য ও পরাকাষ্ঠা এবং পরকালে তার সম্পদ ও সরঞ্জাম।

মারেফতের যে যোগ্যতা অন্তরকে দান করা হয়েছে, তা অন্য কোন অঙ্গকে দান করা হয়নি। কেননা, আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ করা, তাঁকে চেনা, তার জন্যে কাজ করা এবং তাঁর দিকে ধাবিত হওয়া- এগুলো অন্তরেরই কাজ। হাযিরযোগ্য বস্তুসমূহের কাশফও অন্তরের সাথেই সম্পৃক্ত। অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তাঁর হাতিয়ার, অনুগামী ও খেদমতগার মাত্র। অন্তর এগুলোকে এমনভাবে কাজে লাগায়, যেমন মালিক গোলামকে এবং শাসক শাসিতকে কাজে লাগায়। মোট কথা, আল্লাহ ব্যতীত অন্য সব কিছু থেকে মুক্ত থাকলে অন্তরই আল্লাহ তাআলার কাছে গ্রহণীয়। পক্ষান্তরে অন্যের প্রতি অধিক নিবিষ্ট হলে এ অন্তর আল্লাহ তাআলা থেকে আড়াল হয়ে যায়। অন্তরের সাথেই হিসাব-নিকাশের সম্পর্ক এবং অন্তরকে সম্বোধন করেই আদেশ ও নিষেধ করা হয়েছে। সুতরাং স্বচ্ছতা ও আত্মশুদ্ধি নসীব হয়ে গেলে অন্তর সাফল্য লাভ করে এবং অপবিত্রতা ময়লার মধ্যে পড়ে থাকলে অন্তর দুর্ভাগ্য ও নৈরাশ্যের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়। সারকথা,  প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তাআলার আনুগত্য অন্তরই করে এবং বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে কেবল এবাদতের কারণে নূর ছড়িয়ে পড়ে।পক্ষান্তরে গোনাহ এবং অবাধ্যতাও অন্তরেরই কাজ। তখন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে পাপ কর্মের চিহ্ন ফুটে উঠে। অন্তরের আলো ও তমসা থেকেই বাহ্যিক সৌন্দর্য এবং অপকৃষ্টত প্রকাশ পায়। কেননা, পাত্র থেকে তাই টপকে পড়ে, যা তার মধ্যে থাকে। মানুষ যখন তার অন্তরকে জেনে নেয়, তখন সে নিজের সম্পর্কে জ্ঞানী হয়ে যায়। নিজের সম্পর্কে জ্ঞান লাভের উপরই আল্লাহ তা'আলার মারেফত ভিত্তিশীল। অন্তর সম্পর্কে অজ্ঞান হলে মানুষ নিজের সম্পর্কে অজ্ঞান থেকে যায়। ফলে, সে আল্লাহ তা'আলাকেও চিনতে পারে না। অধিকাংশ মানুষ তাদের অন্তর সম্পর্কে অজ্ঞ এবং আল্লাহ তাদের ও তাদের অন্তরের মাঝে আড়াল হয়ে যায় । 


আল্লাহ বলেন "আল্লাহ মানুষ ও তার অন্তরের মধ্যে আড়াল হয়ে যান"। আল্লাহ তা'আলার আড়াল হওয়ার অর্থ, তিনি অন্তরকে 'মুশাহাদা' (প্রত্যক্ষকরণ) 'মুরাকাবা' (ধ্যানমগ্নতা) ও অন্তর্গত গুণাবলী অনুধাবন করতে দেন না। তিনি এটা জানতে দেন না যে, অন্তর আল্লাহ তাআলার দু’অঙ্গুলির মধ্যে কিভাবে ঘুরাফেরা করে, কিভাবে সে মাঝে মাঝে সর্বনিম্ন স্তরের দিকে ঝুঁকে পড়ে শয়তান হয়ে যায় এবং মাঝে মাঝে সর্বোচ্চ স্তরের দিকে ধাবমান হয়ে নৈকট্যশীল ফেরেশতাগণের স্তরে উন্নীত হয়ে যায়। যে ব্যক্তি ফেরেশতাসুলভ গুণাবলী অর্জনের আশায় আপন অন্তরের অবস্থা জানার চেষ্টা করে না, সে তাদেরই একজন, যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন -

>"তারা আল্লাহকে বিস্মৃত হয়েছে। ফলে আল্লাহ তাদেরকে আত্মবিস্মৃত করে দিয়েছেন। এরাই পাপাচারী"।

অতত্রব বুঝা গেল, অন্তরকে চেনা এবং তার গুণাবলীর স্বরূপ উদঘাটন করা আসল ধর্ম এবং আধ্যাত্ম পথের বুনিয়াদ। আমরা এ গ্রন্থের প্রথমার্ধে বাহ্যিক অঙ্গ সম্পর্কিত এবাদত ও লেনদেনের অবস্থা লিপিবদ্ধ করেছি, যাকে “এলমে যাহের” বলা হয়। দ্বিতীয়ার্ধে অন্তর ধ্বংসকারী ও উদ্ধারকারী অবস্থাসমূহ বর্ণনা করার ওয়াদা করেছিলাম। অন্তরের এ সকল অবস্থা জানার নাম "এলমে বাতেন"। উপরোক্ত বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে এক্ষণে এলমে বাতেন শুরু করার পূর্বে দুটি পরিচ্ছেদ লেখা জরুরী হয়ে পড়েছে। প্রথম পরিচ্ছেদে অন্তরের আশ্চর্যজনক গুণাবলী ও চরিত্র বর্ণিত হবে এবং দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে অন্তরের আধ্যাত্মিক সাধনা ও তার চরিত্র শুদ্ধির উপায় বিবৃত হবে। এখন আমরা অন্তরের রহস্যাবলী চলতি বর্ণনাভঙ্গিতে উল্লেখ করছি, যাতে দ্রুত হৃদয়ঙ্গম হয়। নতুবা অন্তরের উধ্বজগত সম্পর্কিত আশ্চর্য অবস্থাসমূহ প্রায়শ হৃদয়ঙ্গম হয় না।

পরবর্তী পর্ব — অন্তরের রহস্যাবলী


সোমবার, ১২ জুন, ২০২৩

সবরের স্বরূপ - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

 


সবর ও শোকর (পর্ব- ২)

সবরের স্বরূপ

উপরে কোরআন-হাদিসের আলোকে সবরের ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। এখন যুক্তির নিরিখে সবরের শ্রেষ্ঠত্ব জানতে হলে তার স্বরূপ ও মর্ম জানা একান্ত আবশ্যক। তাই এক্ষণে সবরের স্বরূপ বর্ণনা করা হচ্ছে।

প্রকাশ থাকে যে, ধর্মের একটি মকাম (অবস্থান) এবং আধ্যাত্ম পথের একটি মনযিলের নাম সবর। ধর্মের সমস্ত মকাম তিনটি বিষয়ের সমন্বয়ে গঠিত হয়-

(১) মারেফত তথা তত্ত্বজ্ঞান, (২) হাল এবং (৩) আমল।

মারেফত সবকিছুর মূল এবং এ থেকেই হালের উদ্ভব হয়। হাল থেকে আমলের বিকাশ ঘটে। সুতরাং মারেফত যেন বৃক্ষসদৃশ, হাল শাখা-প্রশাখা এবং আমল যেন ফলের অনুরূপ। এ বিষয়টি সাধকদের সকল মনযিলেই বিদ্যমান। ঈমান শব্দটি কখনও মারেফতের অর্থে এবং কখনও এই বিষয়ত্রয়ের সমষ্টির অর্থে প্রয়োগ করা হয়। পূর্ণাঙ্গ সবর তখনই হয়, যখন প্রথমে মারেফত অর্জিত হয়, এরপর একটি হাল কায়েম হয়। বাস্তবে এ দুটির নামই সবর। আমল হল ফলসদৃশ, যা এ দুটি বিষয় থেকে প্রকাশ পায়। 


ফেরেশতা, মানুষ ও পশুর পারস্পরিক ক্রম জানা ছাড়া এটা জানা যায় না। কেননা, সবর মানুষের বৈশিষ্ট্য, যা ফেরেশতা ও পশুর হতে পারে না- ফেরেশতাদের মধ্যে তাদের পূর্ণতার কারণে এবং পশুর মধ্যে অপূর্ণতার কারণে। পশুদের উপর কামনা-বাসনা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। ফলে, তারা কামনা-বাসনারই অধীন। তাদের চলা-ফেরা ও গতিবিধির কারণ কামনা-বাসনা ছাড়া কিছুই নয়। তাদের মধ্যে এমন কোন শক্তি নেই, যা কামনা-বাসনার প্রতিবন্ধক হয় এবং তাদেরকে এ থেকে বিরত রাখে। কামনা-বাসনার মোকাবিলায় এরূপ শক্তিকে বলা হবে সবর। পক্ষান্তরে ফেরেশতা সৃজিত হয়েছে আল্লাহ তা'আলার এবাদতে নিয়োজিত থাকার জন্য এবং তাঁর নৈকট্যলাভে সন্তুষ্ট থাকার জন্য। তাদের মধ্যে কামনা-বাসনা রাখা হয়নি, যা তাদেরকে এবাদতের আগ্রহ ও নৈকট্য অর্জনে বাধা দেবে। অপরদিকে মানুষের অবস্থা এই যে, সে শৈশবের শুরুতে পশুর ন্যায় অপূর্ণ সৃজিত হয়েছে। তখন খাদ্যস্পৃহা ছাড়া অন্য কোন কামনা-বাসনা তার মধ্যে থাকে না। কিছুদিন পর তার মধ্যে খেলাধুলা ও সাজসজ্জার কামনা-বাসনা জেগে উঠে। এরপর বিবাহের কামনা-বাসনা প্রকাশ পায়। এসব কামনা তার মধ্যে পর্যায়ক্রমে প্রকাশ পায় এবং শুরুতে সবর থাকে না। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা স্বীয় কৃপায় মানুষকে সৃষ্টির সেরারূপে সৃষ্টি করেছেন এবং তার মর্যাদা পশুর ঊর্ধ্বে রেখেছেন। তাই যখন তার অস্তিত্ব পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করে এবং সে বালেগ হওয়ার কাছাকাছি পৌছে যায়, তখন তার মধ্যে দু'জন ফেরেশতা নিযুক্ত করা হয়। তাদের একজন তাকে সৎপথ প্রদর্শন করে এবং অপরজন এ কাজে তাকে সাহায্য করতে থাকে। এ ফেরেশতাদ্বয়ের সাহায্যে মানুষ পণ্ড থেকে স্বতন্ত্র হয়। এ ছাড়া এই ফেরেশতাদ্বয়ের কারণেই মানুষের মধ্যে দুটি বিশেষ গুণের বিকাশ ঘটে– (১) আল্লাহ ও রসূলের মারেফত এবং (২) শুভ-অশুভ পরিণামের জ্ঞান। পশুরা না আল্লাহ্ ও রসূলকে চিনে, না শুভ পরিণামের চিন্তা করতে পারে। বরং তারা শুধু তাই দেখে, যা কার্যত তাদের কামনা-বাসনার অনুকূলে। এ কারণে সুস্বাদু খাদ্য ছাড়া অন্য কোন বস্তু তারা অন্বেষণ করে না। পক্ষান্তরে মানুষ হেদায়াতের নূরের মাধ্যমে জানে যে, কামনা-বাসনার অনুসরণ করার পরিণতি তার জন্যে অশুভ। কিন্তু কেবল এ হেদায়াতই যথেষ্ট নয়, বরং ক্ষতিকর বস্তু পরিত্যাগ করার ক্ষমতাও তার থাকতে হবে। কারণ, অনেক ক্ষতিকর বস্তু মানুষের জানা আছে, কিন্তু সে সেগুলোকে প্রতিহত করতে পারে না। এমতাবস্থায় কামনা-বাসনাকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দেয়ার জন্যে আল্লাহ তা'আলা আরও একজন ফেরেশতা নিযুক্ত করেছেন। সে মানুষকে কল্যাণের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখে এবং অদৃশ্য বাহিনীর মাধ্যমে তাকে শক্তি ও সমর্থন যোগায়৷ এ বাহিনীকে কামনা-বাসনার বাহিনীর সাথে সদা লড়াই করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ যুদ্ধে কখনও সে দুর্বল এবং কখনও প্রবল হয়। এ দুর্বলতা ও প্রবলতা ততটুকুই হয়ে থাকে, যতুটুকু সে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে অদৃশ্য সমর্থনপ্রাপ্ত হয়।


এখন যে বাহিনীর দ্বারা মানুষ কামনা-বাসনাকে পরাভূত করে পশুর স্তর থেকে স্বাতন্ত্র্য অর্জন করে, আমরা তার নাম রাখব ধর্মীয় প্রেরণা। আর কামনার বাহিনীকে বলব শয়তানী প্রেরণা। কল্পনা করা উচিত যে, উভয় প্রেরণার মধ্যে তুমুল যুদ্ধ চলছে। কখনও ধর্মীয় প্রেরণা প্রবল হয় এবং কখনও শয়তানী প্রেরণা শক্তিশালী হয়। এ যুদ্ধের ক্ষেত্র হচ্ছে মানুষের অন্তর। ধর্মীয় প্রেরণা ফেরেশতাদের কাছ থেকে এবং শয়তানী প্রেরণা শয়তানদের কাছ থেকে সাহায্য পায়। এ যুদ্ধে শয়তানী প্রেরণার মোকাবিলায় ধর্মীয় প্রেরণায় অটল ও অনড় থাকাই হচ্ছে সবরের স্বরূপ অটল থাকার পর যদি সে প্রতিপক্ষকে পরাভূত করে এবং কামনার বিরোধিতায় সদা প্রস্তুত থাকে, তবে সে সবরকারীদের তালিকায় স্থান পাবে। পক্ষান্তরে যদি দুর্বল হয় এবং কামনার কাছে পরাভূত হয়ে যায়, তবে সে শয়তানের অনুসারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। এ বর্ণনা থেকে জানা গেল যে, কামনাজনিত ক্রিয়াকর্ম ত্যাগ করা এমন একটি আমল, যা সবর থেকে উৎপন্ন হয়।


পরবর্তী পর্ব— কামনা-বাসনা দুনিয়া ও আখেরাতে সৌভাগ্যের দুশমন 

শুক্রবার, ৯ জুন, ২০২৩

সবরের ফজিলত

 


সবর ও শোকর পর্ব- ১


‘সবর’ ও ‘শোকর’ ঈমানের দুটি অংশ—

হাদীস ও মনীষীদের বাণীর দ্বারা প্রমাণিত রয়েছে যে, ঈমানের দুটি অংশ - একটি 'সবর', অপরটি 'শোকর'। 

আল্লাহ তা'আলার 'আসমায়ে হুসনা' তথা সুন্দর নামসমূহের মধ্যে 'সাবূর' ও 'শাকূর' উভয়টি রয়েছে। তাই সবর ও শোকর যে খোদায়ী গুণাবলী ও আসমায়ে হুসনার অন্তর্ভুক্ত, তা প্রমাণিত। অতএব, এ দুটি বিষয় সম্পর্কে অজ্ঞ থাকা যেন ঈমানের দুটি অংশ সম্পর্কে অজ্ঞ থাকা অথবা আল্লাহ তা'আলার দুটি গুণ সম্পর্কে গাফেল থাকার নামান্তর। ঈমান ব্যতীত আল্লাহর নৈকট্য অর্জিত হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। কোন্ বিষয়ের প্রতি এবং কোন্ ব্যক্তির প্রতি ঈমান আনতে হবে, তা জানা ছাড়া ঈমানের পথে চলা অসম্ভব। যে ব্যক্তি এটা জানার ব্যাপারে শৈথিল্য করবে, সে সবর ও শোকরের সম্যক পরিচয় লাভেও ব্যর্থ হবে। এ থেকে বুঝা গেল, ঈমানের উভয় অংশের যথাযথ বর্ণনা একান্ত জরুরী। তাই আমরা এ অধ্যায়টিকে দুটি পরিচ্ছেদে বিভক্ত করে সবর ও শোকর একত্রে বর্ণনা করেছি। কারণ, উভয়ের মধ্যে মিল ও যোগসূত্র অত্যন্ত গভীর


সবরের ফজিলত

আল্লাহ তা'আলা সবরকারীদেরকে অনেক বিশেষণে বিশেষিত করেছেন এবং কোরআন পাকে সত্তরেরও বেশী জায়গায় সবরের উল্লেখ করেছেন। তিনি অনেক মর্যাদা ও পুণ্যকর্মকে সবরের ফলশ্রুতি সাব্যস্ত করেছেন। নিম্নে কয়েকটি আয়াত উল্লেখ করা হল—   

> "তারা যখন সবর করল, তখন আমি তাদের মধ্য থেকে পথ প্রদর্শক করলাম, যারা আমার আদেশে পথপ্রদর্শন করত"।

> "তোমার পালনকর্তার কল্যাণের ওয়াদা বনী ইসরাঈলের প্রতি পূর্ণতা লাভ করল এ কারণে যে, তারা সবর করেছিল"।

> "আমি সবরকারীদেরকে তাদের প্রাপ্য প্রদান করব তাদের সর্বোত্তম কর্মের বিনিময়ে |"

> "তারা তাদের পুরস্কার দু’বার পাবে। কারণ, তারা সবর করেছে।"

> "সবরকারীদেরকে তাদের পুরস্কার বে-হিসাব প্রদান করা হবে"।

শেষোক্ত এ আয়াত দ্বারা জানা যায় যে, সবর ব্যতীত অন্যান্য পুণ্যকর্মের সওয়াব বিশেষ পরিমাণ ও হিসাব অনুযায়ী প্রদান করা হবে এবং সবরের সওয়াব বেহিসাব দেয়া হবে। রোযা অর্ধেক সবর হওয়ার কারণে এটি সবরেরই অন্তর্ভুক্ত। তাই এক হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ পাক এরশাদ করেন "রোযা হল আমার জন্যে এবং আমি এর প্রতিদান দেব।"

সবরের সওয়াব সম্পর্কে বলা হয়েছে "তোমরা সবর কর। নিশ্চয় আল্লাহ সবরকারীদের সঙ্গে রয়েছেন"।

অন্যত্র তিনি স্বীয় সাহায্যকে সবরের সাথে শর্তযুক্ত করে বলেছেনঃ "হাঁ, যদি তোমরা সবর কর, সংযমী হও এবং শত্রু এ মুহূর্তে অতর্কিতে তোমাদের উপর ঝাপিয়ে পড়ে, তবে তোমাদের পালনকর্তা পাঁচ হাজার ফেরেশতা দিয়ে তোমাদের মদদ করবেন"।

আরও এক জায়গায় সবরকারীদের জন্যে এমন সব নেয়ামতের সমাবেশ ঘটিয়েছে, যেগুলো অন্যদের জন্যে নয় : এরশাদ হয়েছে 

>"এই লোকদের প্রতিই তাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে ধন্যবাদ ও অনুকম্পা ! এবং তারাই সৎপথ প্রাপ্ত"।

এ আয়াতে সৎপথ, অনুকম্পা ও ধন্যবাদ সবরকারীদের জন্য একত্রিত আছে। মোটকথা, সবরের ফযীলত সম্পর্কে আরও অনেক আয়াত বর্ণিত হয়েছে। 


হাদীসে সবরের ফজিলত:—

এ (সবর) সম্পর্কে হাদীসের সংখ্যাও অনেক। সেমতে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন

> "সবর ঈমানের অর্ধেক"

এক হাদীসে বলা হয়েছে : 

> যেসব বিষয় তোমাদেরকে কম দেয়া হয়েছে, একীন ও সবর সেগুলোর অন্যতম। যে ব্যক্তি এ দুটি বিষয় থেকে যথেষ্ট পরিমাণ প্রাপ্ত হয়, সে তাহাজ্জুদ ও নফল রোযা না করলেও পরওয়া করবে না। 

> “তোমরা যদি বর্তমান অবস্থার উপর সবর কর, তবে এটা আমার কাছে এক এক ব্যক্তির সকলের সমপরিমাণ আমল নিয়ে আসার তুলনায় অধিক প্রিয়। কিন্তু আমি আশংকা করি আমার পর তোমাদের সামনে দুনিয়ার দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়া হবে”। 

> তোমরা একে অপরকে খারাপ মনে করবে। তখন আকাশের অধিবাসীরা তোমাদেরকে খারাপ মনে করবে। যে ব্যক্তি এ অবস্থায় সওয়াবের নিয়তে সবর করবে, সে তার সওয়াব পুরাপুরি পাবে। এরপর রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) নিম্নোক্ত আয়াত তেলাওয়াত করলেন ?  "যা তোমাদের কাছে আছে, তা নিঃশেষ হয়ে যাবে এবং যা আল্লাহর কাছে আছে, তা অবশিষ্ট থাকবে। আমি সবরকারীদেরকে তাদের প্রাপ প্রদান করব তাদের সর্বোত্তম আমলের বিনিময়ে"।

> হযরত জাবের (রাঃ) বর্ণনা করেন, জনৈক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-কে ঈমান কি জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন : "সবর করা ও দান করা"।


এক হাদীসে আছে –

>"সবর জান্নাতের অন্যতম ভাণ্ডার”। 

একবার এক প্রশ্নের জওয়াবে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বললেন :  

> ঈমান হচ্ছে সবর করা। এর অর্থ, ঈমানের বড় রোকন হচ্ছে সবর করা। 

> বর্ণিত আছে, আল্লাহ তাআলা হযরত দাউদ (আঃ)-কে ওহী প্রেরণ করেন যে, আমার চরিত্রের মত তুমিও তোমার চরিত্র গঠন কর। আমার চরিত্র এই যে, আমি সাবূর (অধিক সবরকারী)। আতা ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন - রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) আনসারদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করেন– তোমরা কি ঈমানদার ?  সকলেই চুপ করে রইল। হযরত উমর (রাঃ) আরয করলেন :  আমরা ঈমানদার। তিনি বললেনঃ তোমাদের ঈমানের পরিচয় কি ? আনসারগণ আরয করলেন :  আমরা সুখে শোকর করি, কষ্টে সবর করি এবং আল্লাহর আদেশের উপর সন্তুষ্ট থাকি। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বললেন : কা’বার পালনকর্তার কসম, তোমরা ঈমানদার। 

এক হাদীসে আছে–

> "অপ্রিয় বিষয়ে সবর করার মধ্যে অনেক কল্যাণ নিহিত রয়েছে।"

হযরত ঈসা (আঃ) এরশাদ করেন—

> অপ্রিয় বস্তুর ব্যাপারে সবর করলেই তুমি তোমার প্রিয় বস্তু লাভ করতে পারবে ।


সবরের ফজিলতে মনীষীগণের উক্তি—

বহু মনীষীগণের উক্তি দ্বারাও সবরের ফযীলত প্রমাণিত হয়। খলীফা হযরত উমর (রাঃ) আবু মূসা আশআরীকে যে পত্র লিখেন, তাতে একথাও লিখিত ছিল- সবরকে নিজের জন্যে অপরিহার্য করে নাও। মনে রেখ, সবর দু'প্রকার এবং একটি অপরটির চেয়ে উত্তম। 

বিপদে সবর করা ভাল কিন্তু তার চেয়ে উত্তম আল্লাহ তা'আলার বণ্টনে সবর করা। মনে রেখ, সবর ঈমানের মূল। কেননা, সর্বোত্তম নেকী হচ্ছে তাকওয়া, যা সবর দ্বারা অর্জিত হয়। হযরত আলী (রাঃ) বলেন :  চারটি স্তম্ভের উপর ঈমানের স্থায়িত্ব নির্ভরশীল —  একীন, সবর, জেহাদ ও ইনসাফ। 


তিনি আরও বলেন ? ঈমানের সাথে সবরের সম্পর্ক দেহের সাথে মস্তিষ্কের সম্পর্কের অনুরূপ। সুতরাং মস্তিষ্ক ছাড়া যেমন দেহ কল্পনা করা যায় না, তেমনি যার সবর নেই, তার ঈমান আছে বলা যায় না।

(পরবর্তী পর্ব– সবরের স্বরূপ)

বুধবার, ৭ জুন, ২০২৩

খুশু-খুজু বা নামাজে একাগ্রতা

 খুশু-খুজু  বা নামাজে একাগ্রতা



📚মুকাশাফাতুল কুলুব

✍🏻 হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

———————

নামাযের পূর্ণাঙ্গতা বিনম্ন আত্মসমর্পণ ও একাগ্রতার মাধ্যমে নামাযকে পূর্ণাঙ্গ সুন্দর ও প্রাণবন্ত করার নাম খুশু-খুজু। আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেছেন   : 

>“মু'মিনগণ সফলকাম হয়ে গেছে, যারা নিজেদের নামাযে বিনয়ী-নম্র”। (মুমিনূন  : ১,২ ) 

আয়াতে উল্লেখিত ‘খুশু’র ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে কেউ কেউ বলেছেন, — ‘এটা আত্মার সাথে সম্পর্কিত আমল। যেমন ভয় ও শঙ্কা’র সম্পর্ক আত্মার সাথে, তেমনি খুশুও একটি আত্মিক আমল। 

আবার কেউ কেউ খুশুকে বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সাথে যুক্ত করে এটাকে বাহ্যিক আমল বলে আখ্যায়িত করেছেন। যেমন, -শারীরিক স্থিরতা-ধীরতা, এদিক-সেদিক দৃষ্টি না করা, অহেতুক অঙ্গ সঞ্চালন থেকে বিরত থাকা; নামাযের ভিতর এগুলো বাহ্যিক আমলের সাথে সম্পর্কিত বিষয়। অনুরূপ, আরও কেউ কেউ বলেছেন, নামাযের জন্য খুশু’র প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য, অর্থাৎ এটা একান্ত ফরয পর্যায়ের বিষয়। অপরদিকে কেউ কেউ খুশুকে নামাযের জন্য ফযীলত ও মুস্তাহাব বলে অভিহিত করেছেন। ফরয আখ্যাদানকারীগণ দলীল হিসাবে যে হাদীসখানি পেশ করে থাকেন, তা’ হচ্ছে, - 

>“নামাযের যতটুকু অংশ বান্দা উপলব্ধি করে আদায় করে, ততটুকু অংশই তার কবুল করা হয়”। 

অনুরূপ এ আয়াতটিও উল্লেখ করেছেন  : 

>“এবং আমার স্মরণার্থে নামায কায়েম কর”। (তোয়াহা ১৪) আল্লাহর যিকর করতে হলে যেহেতু গাফলতি ও অবহেলা পরিহার করতে হবে, তাই ইরশাদ হয়েছে : 

>“এবং গাফেলদের দলভুক্ত হয়ো না” (আ'রাফ  : ২০৫ ) 

ইমাম বায়হাক্কী (রহঃ) মুহাম্মদ ইব্‌নে সীরীন (রহঃ) থেকে রেওয়ায়াত করেছেন যে, উক্ত আয়াতের শানে নুযূল হচ্ছে, - নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) নামাযে আকাশের দিকে দৃষ্টি উঁচু করে দেখতেন, তাই এ আয়াতে তা’ নিষেধ করা হয়েছে। মুসনাদে আবদুর রাজ্জাকের সূত্রে অতিরিক্ত এ অংশটুকুও রয়েছে - ‘অতঃপর তাঁকে নামাযে ‘খুশু’ অবলম্বন করার হুকুম করা হয়েছে। সেজন্যে তিনি নামাযে দৃষ্টিকে সিজদা'র স্থানে নিবন্ধ করে রাখতেন’। হাকেম ও বায়হাক্বী হযরত আবূ হুরাইরাহ্ (রঃ) থেকে রেওয়ায়াত করেন,  

“নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর নামাযে দৃষ্টিকে আকাশ পানে উঁচু করার প্রেক্ষিতে আয়াতখানি নাযিল হয়; তারপর থেকে তিনি দৃষ্টি নীচু করে নিয়েছেন। 

হযরত হাসান (রাঃ) থেকে বর্ণিত, হুযুর আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন : “পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের উদাহরণ হচ্ছে এরূপ যে, “তোমাদের কারো বাড়ীর সম্মুখে যদি একটি নহর থাকে এবং তাতে প্রচুর পানি থাকে, সেখানে দৈনিক পাঁচবার যদি সে গোসল করে, তা’ হলে তার শরীরে কি সামান্যতম ময়লাও বাকী থাকবে?” অর্থাৎ, –নামায আদায়ের দ্বারা মানুষ পাপের পঙ্কিলতা হতে মুক্ত ও পবিত্র হয়ে যায়; কবীরা গুনাহ্ ব্যতীত সর্বপ্রকার গুনাহ্ মাফ হয়ে যায়। নামাযের এ মর্যাদা হাসিল করতে হলে বিনম্র আত্মসমর্পণ ও নিষ্ঠার সাথে নামায আদায় করতে হবে। নামাযে অস্তরকে হাজির রাখতে হবে। অন্যথায় এই নামায - নামায পাঠকারীর মুখে নিক্ষেপ করা হবে ।


হুযুর আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন  

>“যে ব্যক্তি দুনিয়ার চিন্তা ধান্দা হতে মুক্ত ও পবিত্র অস্তর নিয়ে দু'রাকাত নামায পড়বে, আল্লাহ্ তা'আলা তার অতীতের সমস্ত গুনাহ্ মাফ করে দিবেন"।  অন্য এক হাদীসে ইরশাদ হয়েছে, - 

>“নামায, হজ্জ, তওয়াফ এবং হজ্জের অন্যান্য বিধানাবলী ইত্যাদি ইবাদত এজন্যে দেওয়া হয়েছে যে, এগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ্ তা'আলাকে স্মরণ করা হবে; কিন্তু এগুলো পালন করতে সময় যে মহান সত্তাকে স্মরণ করা উদ্দেশ্য, যদি তাঁকে স্মরণ না করা হয়, তা’ হলে এই যিকর ও ইবাদত অর্থহীন বস্তুতে পর্যবসিত হয়”।

হুযূর আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও ইরশাদ করেন  : 

>“যে ব্যক্তির নামায তাকে অশ্লীলতা ও অপছন্দনীয় কার্য হতে বিরত রাখতে পারলো না, সে ব্যক্তি আল্লাহর নৈকট্য হতে ক্রমেই সরে যাচ্ছে”। 

হযরত আবূ বকর ইবনে আবদুল্লাহ্ (রহঃ) বলেছেনঃ “তুমি যদি বিনা অনুমতিতে এবং কোন দুভাষী ছাড়াই তোমার মাওলার কাছে যেতে ইচ্ছা কর, তা’ হলে যেতে পারো'। জিজ্ঞাসা করা হলো, এটা কি করে সম্ভব? তিনি বললেন, - ‘সুন্দরভাবে পরিপূর্ণরূপে উযু করে জায়নামাযে দাঁড়িয়ে যাও; এভাবে তুমি অনুমতি ছাড়াই মাওলার দরবারে প্রবেশ করলে, অতঃপর (নামাযের ক্বিরাআত ও যিকর-তসবীহের মাধ্যমে) দু'ভাষী ছাড়া কথা বল”।

হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, -“অনেক সময় এমন হতো যে, হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) আমাদের সাথে কথাবার্তায় মগ্ন রয়েছেন : এবং আমরাও তার সাথে কথাবার্তায় মগ্ন রয়েছি; ইতিমধ্যে নামাযের সময় উপস্থিত হয়েছে, তখন হুযূরের অবস্থা এমন হতো, যেন তিনি আমাদেরকে চিনেন না এবং আমরাও তাকে চিনি না; আল্লাহ্ তা'আলার আজমত ও প্রতাপ তাঁকে আচ্ছন্ন করে ফেলতো”।

রসুল আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেনঃ 

>“নামাযে দণ্ডায়মান হওয়ার পর বান্দার শরীর যেমন উপস্থিত থাকে, তার অস্তরও যদি অনুরূপ উপস্থিত না থাকে, তা’ হলে আল্লাহ্ তা'আলা এরূপ নামাযের প্রতি মোটেও দৃষ্টিপাত করেন না”।

হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালাম নামাযে দণ্ডায়মান হওয়ার পর ভয়ে এতই কম্পমান হতেন যে, দূর থেকে তাঁর হৃদপিণ্ডের কম্পন শোনা যেতো। হযরত সাঈদ তানূখী (রহঃ) যখন নামাযে দাঁড়াতেন, তখন অবারিত অশ্রু তার গণ্ডদেশ প্রবাহিত হয়ে শ্মশ্রুতে পৌছতো।


একদা এক ব্যক্তিকে হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম নামায রত অবস্থায় দাড়ি সঞ্চালন করতে দেখে বলেছেন, - 

>“যদি এ ব্যক্তির অস্তরে খুশু ও একাগ্রতা থাকতো, তা হলে তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও স্থির - থাকতো”। বর্ণিত আছে, - হযরত আলী (রঃ) যখন নামাযে দাড়াতেন, তখন তিনি ভয়ে কম্পমান হতেন এবং মুখমণ্ডল বিবর্ণ হয়ে যেতো। একদা তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো, - “হে আমীরুল মুমেনীন ! নামাযে আপনার এ অবস্থা হয় কেন?”  তিনি বলেছেন : “তখন আল্লাহ্ তা'আলার সেই আমানত আদায়ের সময় এসে যায়, যে আমানত বহন করতে আসমান, যমীন ও পর্বতসমূহ অস্বীকার করেছে; অথচ আমি তা বহন করেছি”। হযরত আলী ইবনে হুসাইন সম্পর্কে বর্ণিত আছে, —তিনি যখন উযূ করতেন, তখন তার চেহারা বিবর্ণ হয়ে যেতো। লোকজন এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলতেন, - 

>“তোমরা কি জাননা যে, এরপর আমি কার দরবারে দণ্ডায়মান হবো?” 

হযরত হাতেম আসাম্ম (রহঃ)-কে তার নামায সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে বলেছেন  : “যখন নামাযের সময় উপস্থিত হয়, তখন আমি পরিপূর্ণরূপে উযু সম্পন্ন করি। অতঃপর জায়নামাযে এসে কিছুক্ষণ স্থির-ধীরভাবে অপেক্ষা করি। এভাবে সম্পূর্ণ শাস্ত হওয়ার পর নামাযের জন্য দণ্ডায়মান হই। তখন আমার অবস্থা এই হয় যে, অস্তরে আমি দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে ধ্যান করি যে, আল্লাহ্র পবিত্র ঘর কা'বা শরীফ আমার সম্মুখ, পুলসিরাত আমার নীচে, বেহেশ্ত আমার ডান পার্শ্বে, দোযখ আমার বামে এবং মৃত্যুর ফেরেশ্তা আযরাঈল আমার পিছনে। সেইসঙ্গে আমি এ কথাও অস্তরে দৃঢ়বদ্ধ করে নেই যে, এ নামাযই আমার জীবনের শেষ নামায, এর পরেই আমার মৃত্যু। অতঃপর আর নামাযের সুযোগ হবে না। এই ধ্যানমগ্নতা সহকারে আমি আল্লাহর প্রতি ভয় ও আশার মধ্যবর্তী স্তরে থেকে নেহায়েত একাগ্রতার সাথে  ‘আল্লাহু আকবার’ বলে নামায আরম্ভ করি। অতঃপর অত্যন্ত স্পষ্ট ও ধীর-স্থিরভাবে ক্বিরাআত পড়ি। রুকু  অত্যন্ত বিনয়ের সাথে করি। সিজদায় পরিপূর্ণ একাগ্রতা ও নিষ্ঠা অবলম্বন করি। বাম নিতম্বে উপবেশন করি, বাম পা বিছিয়ে ডান পা খাড়া রেখে অঙ্গুলি কেবলার দিকে ফিরিয়ে রাখি এবং অস্তরে পরিপূর্ণ এখলাস ও আল্লাহর ভয় জাগরুক রাখি। এরপরেও আমি বলতে পারি না যে, আমার নামায আল্লাহর দরবারে কবুল হয়েছে কিনা?” 


হযরত ইবনে আব্বাস (রঃ) বলেন, – “আন্তরিক নিষ্ঠা ও ধ্যান সহকারে উপলব্ধি করে দুই রাকাত নামায পড়া গাফেল ও অন্যমনস্ক অবস্থায় সারা রাত্র নামায পড়ার চাইতে উত্তম”।

হুযুর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ 

>“আখেরী যমানায় আমার উম্মতের মধ্যে কিছু লোক এমন হবে, যারা মসজিদে উপস্থিত হবে; কিন্তু সেখানে মজলিস অনুষ্ঠান করে তারা দুনিয়াবী আলোচনায় লিপ্ত হবে; অস্তরে তাদের থাকবে দুনিয়ার মহব্বত। খবরদার ! এসব লোকের সংস্পর্শে যেয়ো না। কেননা আল্লাহ্ তা'আলা তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট”।


হযরত হাসান (রঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, - হুযূর পাক (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন : 'আমি কি তোমাদেরকে বলবো যে, দুনিয়াতে নিকৃষ্টতম চোর কে ? সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, হে আল্লাহ্’র রাসুল ! অবশ্যই আপনি আমাদেরকে এ কথা বলে দিন। হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বললেন  : 

>“সবচেয়ে নিকৃষ্ট চোর হচ্ছে ঐ ব্যক্তি, যে নামাযে চুরি করে”।  সাহাবীগণ আরজ করলেন, “নামাযে চুরি করা হয় কিভাবে ?” - আল্লাহর রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বললেন “রুকু ও সিজদা পরিপূর্ণভাবে আদায় না করাই নামাযে চুরি করা”। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ “ক্বিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম নামায পরিত্যাগকারীদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে। যদি কেউ পরিপূর্ণভাবে নামায আদায় করে থাকে তা’ হলে তার অন্যান্য বিষয়ের হিসাব সহজ করা হবে। আর যদি ফরয নামাযে কোন ত্রুটি থাকে, তা’ হলে আল্লাহ্ তা'আলা ফেরেশতাদেরকে বলবেন, দেখ, - আমার বান্দার কোন নফল নামায আছে কিনা; সেগুলো দিয়ে তার ফরয নামাযের ত্রুটি মুছে দাও।


হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও ইরশাদ করেছেন  : 

>”বান্দার জন্য সর্বোৎকৃষ্ট নেয়ামত হচ্ছে, দুই রাকাত নামাযের তওফীক হওয়া”।  হযরত উমর (রঃ) যখন নামাযে দাঁড়াতেন , তখন তাঁর পাজর কাঁপতে থাকতো এবং উপর ও নীচের দাতগুলো পরষ্পর শব্দিত হতে থাকতো। তাঁকে কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে বলতেন, “আল্লাহ্র আমানত আদায় করার সময় এসে গেছে, জানিনা এই আমানত আমি কিভাবে আদায় করবো”।

 খলফ ইব্‌নে আইয়ূব (রহঃ) সম্পর্কে বর্ণিত আছে, –একদা তিনি নামায আরম্ভ করার পর তাঁকে ভীমরুল দংশন করেছিল। ফলে, দংশিত স্থান থেকে রক্ত নির্গত হয়; কিন্তু তিনি তা’ মোটেও অনুভব করতে পারেন নাই। অবশেষে ইব্‌নে সাঈদ এসে তাঁকে জানালে তিনি কাপড় ধৌত করে নেন। তাঁকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, ' আপনাকে ভীমরুল দংশন করছিল এবং রক্তও প্রবাহিত হচ্ছিল; অথচ আপনি তা মোটেও অনুভব করতে পারেন নাই, এর কারণ কি ? তিনি বলেছেন, — “যে ব্যক্তি মহা পরাক্রমশালী সত্তার সম্মুখে দণ্ডায়মান হয়, পিছনে যার মৃত্যুর ফেরেশ্তা বিরাজমান থাকে, বামে থাকে যার দোযখ আর ডানে থাকে বেহেশত এবং পা থাকে পুলসিরাতের উপর, সে-কি এসব বিষয় কখনও অনুভব করতে পারে ?" 

হযরত ইব্‌নে যর (রহঃ) এর হাতে ফোড়া হয়েছিল । আধ্যাত্ম জগতে তিনি ছিলেন অতি উচ্চ মর্যাদার অধিকারী। চিকিৎসকগণ বলেছিল, - “এই মারাত্মক ফোঁড়া হতে নিষ্কৃতি পেতে হলে আপনার হাত কেটে ফেলে দিতে হবে। তিনি অনুমতি দিয়েছিলেন। চিকিৎসকগণ বলেছে - ' তা’ হলে আপনাকে দড়ি দিয়ে উত্তমরূপে বেঁধে নিতে হবে, নতুবা আপনি অসহনীয় কষ্টে ছুটাছুটি করবেন এবং এতে মারাত্মক ক্ষতি হবে। “তিনি বলেছেন, –না, এসব কিছুর প্রয়োজন নাই; আমি যখন নামায আরম্ভ করি, তখন তোমরা আমার হাত কেটে নিও”।  অতঃপর নামাযরত অবস্থায় তাঁর হাত কাটা হয়েছে এবং তিনি তা’ মোটেও অনুভব করেন নাই। 

(সমাপ্ত)

মুকাশাফাতুল কুলুব

*************

#নামাজ

#ইসলাম_ই_মুক্তির_দিশা

শুক্রবার, ২ জুন, ২০২৩

গোনাহগারদের বিভ্রান্তি

 

বিভ্রান্তির নিন্দা ও স্বরূপ : [২য় পর্ব]

✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

———————

বিভ্রান্তির নিন্দা ও স্বরূপ : [২য় পর্ব]


গোনাহগারদের বিভ্রান্তি বর্ণনা—

এখন গোনাহগারদের বিভ্রান্তি বর্ণনা করা হচ্ছে। তারা বলে - আল্লাহ তা'আলা ক্ষমাশীল। আমরা তার ক্ষমা আশা করি। অতঃপর এই আশার উপর ভিত্তি করে তারা সৎকর্মও বর্জন করে। তারা এর নাম রাখে “রাজা” অর্থাৎ আল্লাহর প্রতি আশাবাদ। কারণ তারা জানে “রাজা” ধর্মের একটি প্রশংসনীয় বিষয়। মাঝে মাঝে তাদের এই আশাবাদের একটি দলীল হয়ে থাকে তাদের পিতৃপুরুষদের সৎকর্মপরায়ণ ও উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন হওয়া; যেমন সৈয়দ হওয়া। খোদাভীতি ও পরহেযগারীতে পূর্বপুরুষদের বিপরীত হওয়া সত্ত্বেও তারা ধারণা করে যে, আল্লাহর কাছে তারা বাপ-দাদার চেয়েও বুযুর্গ। কেননা, বাপ-দাদারা খোদাভীতি ও পরহেযগারী সত্ত্বেও ভয়ে কম্পমান থাকতেন; কিন্তু তারা সকল প্রকার পাপাচার সত্ত্বেও নির্ভীক হয়ে থাকে। এটা চরম বিভ্রান্তি। তাদের মনে শয়তান এই ধারণা সৃষ্টি করেছে। যে, যে কাউকে মহব্বত করে, সে তার বংশধরকেও মহব্বত করে। আল্লাহ তা'আলা যেহেতু তোমাদের বাপ-দাদাকে প্রিয় জানতেন, তাই তোমাদেরকেও প্রিয় জানবেন। অতএব, তোমাদের কর্ম করার প্রয়োজন কি? অথচ তারা একথা স্মরণ করে না যে, হযরত নূহ ( আঃ ) নিজের পুত্রকে নৌকায় নিজের সঙ্গে তুলতে চেয়েছিলেন এবং দোয়া করেছিলেন পরওয়ারদেগার, আমার পুত্র আমার পরিবারভুক্ত। কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে উত্তর হল - "হে নূহ ! নিশ্চয় সে তোমার পরিবারভুক্ত নয়। সে তো অসৎ"। 

হযরত ইবরাহীম ( আঃ ) নিজের পিতার জন্যে দোয়া করেন; কিন্তু তা-নামনযুর হয়। মোটকথা, উপরোক্ত ধারণা ধোকা ও বিভ্রান্তি ছাড়া আর কিছুই নয়। আল্লাহ তা'আলা কেবল অনুগতদেরকেই ভালবাসেন এবং গোনাহগারকে অপছন্দ করেন যেমন, পিতা অনুগত হলে তার সন্তানরা গোনাহগার হলেও আল্লাহ। পিতাকে অপছন্দ করেন না। তেমনি পিতাকে মহব্বত করার কারণে তার গোনাহগার পুত্রকেও মহব্বত করেন না। এ ক্ষেত্রে মূল কথা হচ্ছে-   

>"একজনের পাপের বোঝা অন্যজন বহন করবে না"।


যে ব্যক্তি ধারণা করে যে, পিতার তাকওয়া ও খোদাভীতির কারণে সেও মুক্তি পেয়ে যাবে, সে এমন, যেমন কেউ মনে করে যে, পিতা পেট ভরে খেলে তারও পেট ভরে যাবে এবং সে পানি পান করলে তারও তৃষ্ণা মিটে যাবে। অথচ এরূপ মনে করা সম্পূর্ণ অবান্তর। এ থেকে জানা গেল যে, তাকওয়া ফরযে আইন। এতে পিতার তাকওয়া পুত্রের জন্যে যথেষ্ট হবে না। কিয়ামতের দিন তাকওয়ার ভিত্তিতেই বিচার হবে। তবে যে ব্যক্তির উপর আল্লাহর ক্রোধ অধিক হবে না, তার জন্যে সুপারিশের অনুমতি হবে এবং সুপারিশ তার জন্যে লাভজনক হবে।

এখন প্রশ্ন হয়, গোনাহগার ব্যক্তি বলে থাকে, আল্লাহ ক্ষমাশীল। আমি তার ক্ষমা আশা করি। তার এ দুটি বাক্যই তো নির্ভুল এবং মনে লাগে। এতে বিভ্রান্তি কিসের?  

জওয়াব এই যে, শয়তান মানুষকে এমনি ধরনের বাক্য দ্বারা বিভ্রান্ত করে, যা বাহ্যত গ্রহণযোগ্য এবং ভেতরে প্রত্যাখ্যাত । বলা বাহুল্য, বাহ্যিক কথা সুন্দর না হলে মন বিভ্রান্ত হবে কেন? রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়া-সাল্লাম) এই উক্তির রহস্য ফাঁস করে দিয়েছেন। এক হাদীসে তিনি বলেন -

>"বিজ্ঞ সেই ব্যক্তি, যে নিজের নফসকে অনুগত করে, মৃত্যু পরবর্তী সময়ের জন্যে আমল করে এবং নির্বোধ সেই ব্যক্তি, যে খেয়াল-খুশীর অনুগামী হয় এবং আল্লাহর কাছে আশা-আকাক্ষা করতে থাকে। 

সুতরাং বাস্তবে এই হচ্ছে আমলহীন আশা-আকাঙ্ক্ষা, শয়তান যার নাম পাল্টে 'রাজা' দিয়েছে। মূর্খরা এতেই বিভ্রান্ত হয়ে গেছে। অথচ 'রাজা' শব্দের ব্যাখ্যা আল্লাহ তাআলা এভাবে করেন,- 

>"নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং যারা হিজরত করেছে ও আল্লাহর পথে জেহাদ করেছে, তারাই আল্লাহর রহমত আশা করে। অর্থাৎ তারাই আশা করার যোগ্য।

হযরত হাসান (রহঃ)-কে কেউ জিজ্ঞেস করল: কোন কোন লোক বলে-আমরা আল্লাহর কাছে আশা রাখি এবং আমল করি না। তিনি বললেন : এটা তাদের খামখেয়ালী। যে ব্যক্তি কোন বস্তু আশা করে, সে তার অন্বেষণ করে। আর যে ব্যক্তি কোন বস্তুকে ভয় করে, সে তার কাছ থেকে দূরে পালায়। 

মুসলিম ইবনে ইয়াসার বলেন : আমি একদিন এত জোরেশোরে সেজদায় গেলাম যে, আমার সামনের দুটি দাত ভেঙ্গে গেল। এটা দেখে কেউ বলল : আমরা তো আল্লাহর কাছে মাগফেরাত আশা করি। এজন্যে আমল করি না। মুসলিম জওয়াব দিলেন : এটা কস্মিনকালেও 'রাজা'  তথা আশা নয়। মানুষ যে বিষয় আশা করে, তা তালাশ করে।

এর একটি দৃষ্টান্ত এই যে, এক ব্যক্তি আশা করে যে, সে সন্তানের  পিতা হবে; অথচ সে এখনও বিবাহই করেনি কিংবা বিবাহ করে থাকলেও স্ত্রীর সাথে সহবাস করেনি। এরূপ ব্যক্তির সন্তানের পিতা হওয়ার আশা খামখেয়ালী নয় তো কি? এমনিভাবে যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার ক্ষমা ও রহমত আশা করে এবং তার ঈমানই নেই কিংবা ঈমান থাকলেও সৎকর্ম করেনি কিংবা সৎকর্মের সাথে সাথে অসৎকর্মও ছাড়েনি,  সেও খামখেয়ালীতে লিপ্ত।

জানা উচিত যে, আশা দু’জায়গায় করা ভাল। 

(এক)– আপাদমস্তক গোনাহগার ব্যক্তি। তার মনে যখন তওবা করার কল্পনা জাগে, তখন শয়তান তাকে এই বলে বিভ্রান্ত করে যে,  তোর তওবা কবুল হবে না। এতে শয়তানের উদ্দেশ্য থাকে, তাকে নিরাশ করে দেয়া। এমতাবস্থায় নৈরাশ্য দূর করে আশা করা ওয়াজিব। সে স্মরণ করবে যে, আল্লাহ ক্ষমাশীল, তওবা কবুলকারী এবং তওবা একটি এবাদত, যা দ্বারা গোনাহ দূর হয়ে যায়। কোরআন শরীফে এর সমর্থন রয়েছে। আল্লাহ তা’আলা বলেন : 

>"বলে দিন, হে আমার বান্দা ! যারা নিজেদের উপর যুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গোনাহ ক্ষমা করবেন। কারণ, তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। তোমরা আল্লাহর দিকে ফিরে এস।

অতএব, মানুষ যখন তওবা সহকারে ক্ষমার আশা করবে, তখন তাকে আশাবাদী বলা উচিত হবে। নতুবা গোনাহ অব্যাহত রেখে মাগফেরাতের আশা করা খামখেয়ালী। 

(দুই) – যে ব্যক্তি নফল এবাদতে ক্রটি করে এবং কেবল ফরয এবাদত করেই ক্ষান্ত থাকে, সে যদি নিজের জন্যে আল্লাহর সেই সমস্ত নেয়ামত ও ওয়াদা আশা করে, যা তিনি সৎকর্মপরায়ণদেরকে দিয়েছেন এবং এই আশার আনন্দে নফল এবাদতের প্রতি মনোনিবেশ করে, তবে তার এই আশা উত্তম। আল্লাহ বলেন 

>"অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মুমিনরা, যারা আপন নামাযে বিনয় নম্র, যারা অসার কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকে, যারা যাকাতদানে সক্রিয়, যারা আপন যৌনাঙ্গকে সংযত রাখে। তবে তাদের স্ত্রী ও অধিকারভুক্ত দাসীদের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হলে তারা তিরস্কৃত হবে না। কেউ এদের ছাড়া অন্যকে কামনা করলে সে হবে সীমালঙ্ঘনকারী এবং যারা আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে এবং যারা তাদের নামাযে যত্নবান, তারাই হবে অধিকারী ফেরদাউসের, যাতে তারা চিরকাল থাকবে"।

সুতরাং প্রথমোক্ত আশা দ্বারা তওবার প্রতিবন্ধক নৈরাশ্য খতম হয়ে যায় এবং দ্বিতীয় আশা দ্বারা এবাদতে স্ফূর্তির অন্তরায় অলসতা দূর হয়ে যায়। সারকথা, যে আশা তওবা করতে উদ্বুদ্ধ করে, তাকে বলা হয় 'রাজা'। আর যে আশা এবাদতে অলসতার কারণ হয়, তাকে বলা হয় বিভ্রান্তি ও খামখেয়ালী। 

আজকাল অধিকাংশ লোক আমলে অলসতা করে । তারা আল্লাহর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে আখেরাতের জন্যে চেষ্টা-চরিত্র করে না। এর কারণ এটাই যে, ভারা বিভ্রান্তিতে পড়ে আছে, যাকে 'রাজা' মনে করে নিয়েছে। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়া-সাল্লাম) এরশাদ করেছেন— 

>এই উম্মতের শেষ যুগে বিভ্রান্তি প্রবল হবে। বাস্তবে তাই দেখা যায়। প্রথম যুগের লোকেরা অব্যাহতভাবে এবাদত করতেন। তারা যা-ই আমল করতেন, তাদের অন্তর ভয়ে পরিপূর্ণ থাকত; অথচ তারা সারারাত আল্লাহর এবাদতে কাটিয়ে দিতেন। এতদসত্ত্বেও নির্জনে নিজের জন্য কান্নাকাটি করতেন। কিন্তু বর্তমান যুগের অবস্থা এর বিপরীত। এখন মানুষ গোনাহে ডুবে থাকে, দুনিয়া নিয়ে সদা ব্যস্ত থাকে এবং আল্লাহর প্রতি বিমুখ থাকে। এরপরও তারা শংকাহীন ও প্রশান্ত দৃষ্টিগোচর হয়। তারা বলে আমরা আল্লাহর অনুগ্রহ ও কৃপার উপর আস্থা রাখি এবং তাঁর রহমত ও মাগফেরাত আশা করি। তারা যেন দাবী করে আমরা আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহ এতটুকু জানি, যতটুকু পয়গম্বর ও সাহাবায়ে কেরাম জানতেন না।


হযরত মাকাল ইবনে ইয়াসার (রাঃ) -এর রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়া-সাল্লাম) বলেন : এক সময় আসবে, যখন পরনের বস্ত্রের ন্যায় কোরআন মানুষের অন্তরে পুরাতন হয়ে যাবে। মানুষের কেবল আশা-আকাঙ্ক্ষাই থেকে যাবে এবং এর সাথে ভয় মোটেই থাকবে না। কোন কাজ করলে তারা বলবে, এটা কবুল হবে এবং কোন অসাজ করলে বলবে এটা ক্ষমা পেয়ে যাব। এই হাদীস থেকে জানা গেল যে, মানুষ ভয়ের জায়গায় লালসাকে ব্যবহার করবে এবং কোরআনে উল্লিখিত ভয়ের আয়াত সম্পর্কে মূখ হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা খৃস্টানদের এ অবস্থাই বর্ণনা করে বলেন "তাদের পেছনে আগমন করল কিতাবের উত্তরাধিকারীগণ, যারা তুচ্ছ জীবনের সামগ্রী গ্রহণ করে এবং বলে আমাদেরকে ক্ষমা করা হবে।

এখানে বিভ্রান্তদোরকে প্রধানত চার শ্রেনীতে বিভক্ত কর হয়েছে।

(১) শিক্ষিতদের বিভ্রান্তি

(২) সংসারত্যাগী ও এবাদতকারীদের বিভ্রান্তি

(৩) সুফিগণের বিভ্রান্তি ও 

(৪) বিত্তশালীদের বিভ্রান্তি

বিত্তশালীদের বিভ্রান্তি 

———————

পরবর্তী পর্ব

শিক্ষিতদের বিভ্রান্তি–

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...