রবিবার, ২৫ জুন, ২০২৩

জিহ্বার বিপদাপদ - (পর্ব - ১১) উপহাস . কৌতুক ও গোপন কথা ফাঁস করা

 


জিহ্বার বিপদাপদ - (পর্ব - ১১)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

উপহাস . কৌতুক ও গোপন কথা ফাঁস করা
যদি এর দ্বারা অপরের কষ্ট হয়, তবে হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন : “মুমিনগণ! তোমাদের একদল অপর দলের সাথে যেন উপহাস না করে। সম্ভবতঃ তারা তাদের চেয়ে উত্তম হবে। মহিলারাও যেন অন্য মহিলাদের সাথে উপহাস না করে। সম্ভবতঃ তারা তাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হবে”।
উপহাসের অর্থ হচ্ছে অপরের হেয়তা প্রকাশ করা এবং তার দোষত্রুটি হাস্যকর পন্থায় বর্ণনা করা। এটা তার কথা ও কাজের অনুকরণ অথবা ইশারা ইঙ্গিত দ্বারা হতে পারে। অনুপস্থিতিতে হলে এটা গীবত এবং উপস্থিতিতে হলে উপহাস, কিন্তু উভয়ের সারমর্ম এক।
হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন : আমি এক ব্যক্তির অনুকরণ করলে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) বললেন : আল্লাহর কসম. অনেক কিছু পাওয়ার বিনিময়েও আমি পছন্দ করি না যে, কোন মানুষের অনুকরণ করি।
যদি কোন ব্যক্তি উপহাসে খুশী হয়, তবে একে উপহাস না বলে ঠাট্টা বলা হবে, যার বিধান পূর্বে বর্ণিত হয়েছে ।

গোপন কথা ফাঁস করা
এটাও নিষিদ্ধ। কারণ এতেও কষ্ট হয় এবং বন্ধুত্বের হক বিনষ্ট হয়।
রসূলে করীম (সাঃ) এরশাদ করেন, “যখন কোন ব্যক্তি কথা বলার পর আড় চোখে তাকায় তখন এটা আমানত হয়ে যায়”। . হযরত হাসান (রাঃ) বলেন : কোন ভাইয়ের গোপন তথ্য প্রকাশ করে দেয়াও খেয়ানতের মধ্যে দাখিল।
বর্ণিত আছে, আমীর মোয়াবিয়া ওলীদ ইবনে ওতবাকে কোন গোপন তথ্য বললেন। তিনি আপন পিতা ওতবাকে গিয়ে বললেন : আজ আমীর মোয়াবিয়া একটি গোপন কথা বলেছেন। আমাকে যখন বলেছেন, তখন আপনার কাছে আর গোপন থাকবে কেন? ওতবা বললেন, ব্যাপারটি আমাকে বলো না। কারণ, যতক্ষণ মানুষ গোপন তথ্য গোপন রাখে, ততক্ষণ তার থাকে, কিন্তু বলে দিলে অপরের এখতিয়ারে চলে যায়। ওলীদ বললেন : পিতা পুত্রের মধ্যেও এরূপ হয় নাকি? তিনি বললেন : পিতা পুত্রের মধ্যে হয় না ঠিক, কিন্তু আমি চাই, গোপন তথ্য ফাঁস করার অভ্যাস যেন তোমার না হয়। এরপর ওলীদ আমীর মোয়াবিয়া কাছে গিয়ে সকল বৃত্তান্ত বর্ণনা করলে তিনি বললেন : তোমার পিতা তোমাকে ভুলের গোলামী থেকে মুক্ত করে দিয়েছেন। সারকথা, গোপন তথ্য ফাঁস করা খেয়ানত। এতে কারও ক্ষতি হলে হারাম। ক্ষতি না হলেও নীচতা।

পরবর্তী পর্ব-
মিথ্যা ওয়াদা

জিহ্বার বিপদাপদ - (পর্ব - ১০) হাসিঠাট্টা

  


জিহ্বার বিপদাপদ - পর্ব - ১০
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

হাসিঠাট্টা
আসলে এটাও খারাপ ও নিষিদ্ধ, কিন্তু অল্প হলে দোষ নেই। হাদীসে আছে “আপন ভাইয়ের কথার মধ্যে কথা বলো না এবং তার সাথে ঠাট্টা করো না”। কথার মধ্যে কথা বললে অপরের মনে কষ্ট হয়; তাকে মিথ্যুক ও মূর্খ সাব্যস্ত করা হয়। হাসিঠাট্টার মধ্যে এটা নেই। তবুও হাসিঠাট্টা নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ হচ্ছে বাড়াবাড়ির করা। এতে মন সর্বক্ষণ খেলাধুলা ও কৌতুকে ব্যাপৃত হয়ে পড়ে। খেলাধুলা যদিও মোবাহ, কিন্তু সর্বক্ষণ এতে লিপ্ত থাকা নিষিদ্ধ। অধিক হাসির কারণে অট্টহাসির পথ খুলে যায়, যদ্দরুন অন্তর মরে যায় এবং অন্তরে শত্রুতা সৃষ্টি হয়। ভাবমুর্তি বিনষ্ট হয়ে যায়। হাসি এসব দোষ থেকে মুক্ত হলে নিন্দনীয় নয়। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন- “আমি হাসিঠাট্টা করি, কিন্তু সত্য ছাড়া - মিথ্যা বলি না”। এটা তাঁরই বৈশিষ্ট্য। অন্যদের উদ্দেশ্য তো হয়ে থাকে যেভাবেই হোক কেবল অপরকে হাসানো। হযরত ওমর (রাঃ) বলেন : যে বেশী হাসে, তার ব্যক্তিত্বের প্রভাব হ্রাস পায়। যে আনন্দ গীত গায়, সে মানুষের দৃষ্টিতে পাতলা হয়ে যায়। যে এ কাজ বেশী করে, সে এ নামেই খ্যাত হয়ে যায়। যে বেশী কথা বলে, সে বেশী ভুল করে। যে বেশী ভুল করে তার লজ্জা কমে যায়। যার লজ্জা কম, তার পরহেযগারীও কম। যার পরহেযগারী কম, তার অন্তর মরে যায়। আর একটি কারণ হচ্ছে, হাসির কারণে মানুষ আখেরাত থেকে গাফেল হয়ে যায়।
রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন : “যদি তোমরা জানতে যা আমি জানি, তবে ক্রন্দন করতে বেশী এবং হাসতে কম”। ওহায়ব ইবনে ওয়ারদ কিছু লোককে ঈদুল ফিতরের দিন হাসাহাসি করতে দেখে বললেন : যদি এদের মাগফেরাত হয়ে থাকে, তবে এটা শোকরকারীদের কাজ নয়। আর মাগফেরাত না হয়ে থাকলে এটা ভীতদেরও কাজ নয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন : যে ব্যক্তি গোনাহ করে হাসে, সে কাঁদতে কাঁদতে দোযখে যাবে।
যে হাসি সরবে হয় তাই খারাপ। অর্থাৎ যা মুচকি হাসির চেয়ে বেশী তা নিষিদ্ধ। নীরব হাসি, যাকে আরবীতে ‘তাবাস্সুম' বলা হয়, তা ভাল। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) তিনিও মুচকি হাসতেন।
এক্ষণে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর হাসি ঠাট্টা কিরূপ ছিল, তার কয়েকটি নমুনা পেশ করা হচ্ছে। হযরত হাসান (রাঃ) রেওয়ায়াত করেন, এক বৃদ্ধা রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে হাযির হলে তিনি তাকে বললেন : কোন বৃদ্ধ জান্নাতে যাবে না। এ কথা শুনে বৃদ্ধা কান্না জুড়ে দিল। তিনি বললেন, আরে, কাঁদ কেন? তুমি যখন জান্নাতে যাবে, তখন বৃদ্ধ থাকবে না, ষোড়শী হয়ে যাবে। আল্লাহ্ তাআলা বলেছেন : চলো আমি তাদেরকে আবার সৃষ্টি করব এবং কুমারী যুবতীতে পরিণত করব। যায়দ ইবনে আসলাম রেওয়ায়াত করেন, উম্মে আয়মন নাম্নী জনৈকা মহিলা রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে এসে আরজ করল : আমার স্বামী আপনাকে দাওয়াত দিচ্ছে। তিনি বললেন : তোমার স্বামী কি সেই ব্যক্তি নয়, যার চোখে শুভ্রতা আছে? মহিলা বলল, তার চোখ তো ভাল । তাতে শুভ্রতা নেই। তিনি বললেন : অবশ্যই আছে। মহিলা কসম খেয়ে বলল : নেই। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) বললেন : এমন কোন ব্যক্তি নেই, যার চোখে শুভ্রতা নেই। অর্থাৎ প্রত্যেক মানুষের চক্ষু কোটর সাদা ও কাল হয়ে থাকে।
অন্য একজন মহিলা তাঁর খেদমতে এসে সওয়ারীর জন্যে একটি উট প্রার্থনা করলে তিনি বললেন : আমি তোমাকে সওয়ারীর জন্যে একটি উটের বাচ্চা দেব। মহিলা বলল : বাচ্চা নিয়ে আমি কি করব? তিনি বললেন : উট তো উটের বাচ্চাই হয়ে থাকে।
যাহ্হাক ইবনে সুফিয়ান কেলাবী যারপরনাই কুশ্রী ব্যক্তি ছিলেন। তিনি যখন বয়াত করার জন্যে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে উপস্থিত হলেন, তখন হযরত আয়েশা (রাঃ)-ও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তখন পর্যন্ত পর্দার বিধান ছিল না। বয়াতের পর যাহ্হাক আরজ করলেন : আমার দু'জন স্ত্রী আছে, যারা এই গোরা মহিলা অর্থাৎ হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর চেয়েও ভাল। আপনি বিবাহ করলে তাদের একজনকে আপনার কাছে পাঠিয়ে দেই। হযরত আয়েশা (রাঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেন : তারা সুশ্রী, না তুমি সুশ্রী? সে বলল : আমি তাদের চেয়ে অনেক ভাল। এই সওয়াল জওয়াব শুনে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) এই ভেবে হাসি সংবরণ করতে পারলেন না যে, এমন সুরত নিয়েও সে নিজেকে সুশ্রী মনে করে।
নায়ীমান আনসারী একজন হাস্যকারী ব্যক্তি ছিল, কিন্তু খুব মদ্যপান করত। মদ্যপানের পর তাকে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে উপস্থিত করা হলে তিনি আপন জুতা দিয়ে তাকে খুব প্রহার করতেন এবং সাহাবায়ে কেরামকেও আদেশ করতেন, তাঁরাও জুতা মারতেন। অনেকবার এরূপ প্রহৃত হওয়ার পর একদিন জনৈক সাহাবী বললেন : তোমার প্রতি আল্লাহর লানত। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) সাহাবীকে বললেন : এরূপ বলো না। এ ব্যক্তি আল্লাহ ও রসূলের প্রতি মহব্বত রাখে। এই নায়ীমানের অবস্থা ছিল, মদীনায় কখনও দুধ অথবা অন্য কোন খাদ্যবস্তু এলে সে তা ক্রয় করে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে উপস্থিত করত এবং বলত, হুযুর, এ বস্তুটি আমি আপনার জন্যেই ক্রয় করেছি এবং হাদিয়া এনেছি। যখন সেই বস্তুর মালিক দাম চাইতে আসত, তখন তাকেও রসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর কাছে উপস্থিত করে বলত, হুযুর অমুক বস্তুর দামটি দিয়ে দিন। তিনি বলতেন : তুমি তো আমাকে হাদিয়া দিয়েছিলে। সে আরজ করত, আমার কাছে দাম ছিল না, কিন্তু মন চাচ্ছিল, আপনি এ বস্তুটি খান। এরপর রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) হেসে দাম দিয়ে দিতেন। অতএব এ ধরনের হাসিঠাট্টা কখনও কখনও করা জায়েয।

পরবর্তী পর্ব-
উপহাস ও কৌতুক

গান ও কবিতা আবৃত্তি - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)



জিহ্বার বিপদাপদ - (পর্ব - ৯০
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

গান ও কবিতা আবৃত্তি
গানের মধ্যে কোনটি হারাম ও কোনটি হালাল সেমা অধ্যায়ে আমরা তা লিপিবদ্ধ করেছি। এখানে পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন নেই। কবিতা ভালও আছে মন্দও আছে, অবশ্য একেবারে কবিতার মধ্যেই ডুবে যাওয়া নিন্দনীয়। অযথা কথাবার্তা না হলে কবিতা আবৃত্তি করা ও রচনা করা হারাম নয়, কিন্তু কথা হচ্ছে, কবিতার মধ্যে প্রায়ই প্রশংসা, দুর্নাম রটনা ও নারীদের উল্লেখ থাকে। এতে মিথ্যারও অবকাশ আছে। স্বয়ং রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) হযরত হাসসান ইবনে সাবেত আনসারী (রাঃ)-কে কবিতায় কাফেরদের দুর্নাম বর্ণনা করার আদেশ করেছিলেন। কারও প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করলে যদিও কিছুটা মিথ্যা হয়, কিন্তু হারাম হয় না। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর সামনেও এমন কবিতা পাঠ করা হয়েছে, যাতে তালাশ করলে বাড়াবাড়ির বিষয়বস্তু পাওয়া যাবে, কিন্তু তিনি কখনও নিষেধ করেননি।

হযরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেন, একদিন আমি সূতা কাটছিলাম এবং রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) জুতা সেলাই করছিলেন। আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে দেখি, তাঁর কপাল ঘর্মাক্ত এবং ঘর্মবিন্দু আলোর মধ্যে নক্ষত্রপুঞ্জের অপরূপ সৌন্দর্য প্রদর্শন করছে। আমি দেখামাত্রই এই অলৌকিক সৌন্দর্যে অভিভূত হয়ে পড়লাম। তিনি আমার হতবুদ্ধিতা আঁচ করে নিলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন : এমন বিস্ময়াবিষ্ট হচ্ছ কেন? আমি আরজ করলাম : আপনার ললাটের ঘর্মবিন্দু থেকে সৌন্দর্যের যে তরঙ্গ উত্থিত হচ্ছে, তাতেই আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাচ্ছি। যদি আবু বকর হুযলী আপনাকে এই মুহূর্তে দেখতে পেত, তবে অবশ্যই জেনে নিত, তার কবিতার মূর্ত প্রতীক আপনিই। তিনি বললেন : তার কবিতা কি ? আমি আরজ করলাম : এ দু'টি পংক্তি—
“ঋতুস্রাবের মলিনতা থেকে, দুধমাতার ভ্রষ্টতা থেকে এবং
শয়তানের ব্যায়াম থেকে। তুমি যখন তার মুখমণ্ডলের পানে তাকাবে, তখন মনে হবে যেন তা বিদ্যুৎ উজ্জ্বল মেঘমালার ন্যায় ঝলমল করছে”।
হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন : অতঃপর রসূলূল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) আপন কাজ ছেড়ে আমার ললাটে চুম্বন এঁকে দিলেন। তিনি বললেন : - “আয়েশা, আল্লাহ্ তোমাকে উত্তম প্রতিদান দিন। তুমি আমার প্রতি সম্ভবতঃ এতটুকু খুশী হওনি, যতটুকু আমি তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছি”।
হোনায়ন যুদ্ধের পর রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বণ্টন করলেন এবং আব্বাস ইবনে মেরদাসকে চারটি উট দান করলেন। সে উট নিয়ে চলে গেল এবং তার হক আরও বেশী বলে অভিযোগ করে একটি কবিতা রচনা করল। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) সাহাবায়ে কেরামকে আদেশ করলেন : তার অভিযোগ মিটিয়ে দাও। অতঃপর হযরত আবু বকর (রাঃ) তাকে সঙ্গে নিয়ে গেলেন এবং এত বেশী দিলেন যে, সে ওযর পেশ করতে শুরু করল এবং বলল : আমার পিতামাতা আপনার প্রতি উৎসর্গ হোক। কবিতা যখন আমার জিহ্বায় পিঁপড়ার মত দংশন করতে থাকে, তখন কিছু না বলে উপায় থাকে না। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) হাসলেন এবং বললেন : যতদিন উট উচ্চ কণ্ঠে চেঁচাবে, ততদিন আরবরা কবিতা বলা ত্যাগ করবে না।


পরবর্তী পর্ব-
হাসিঠাট্টা

জিহ্বার বিপদাপদ - (পর্ব - ৮) অভিসম্পাত ও ভর্ৎসনা - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)



জিহ্বার বিপদাপদ - পর্ব - ৮
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

অভিসম্পাত ও ভর্ৎসনা
এটা জন্তু-জানোয়ার, মানুষ ও জড় পদার্থ সকলের জন্যে সমান। রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন-
“তোমরা একে অপরকে আল্লাহর লানত, আল্লাহর গযব বা জাহান্নাম দ্বারা অভিসম্পাত করো না।"
হযরত আয়েশা (রাঃ) রেওয়ায়াত করেন- একবার রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) হযরত আবু বকরকে তার এক গোলামের প্রতি অভিসম্পাত করতে শুনলেন। তিনি তাঁর কাছে গিয়ে বললেন : হে আবু বকর, সিদ্দীকও অভিসম্পাত করে? কাবার পালনকর্তার কসম! এ বাক্যটি তিনি কয়েকবার উচ্চারণ করলেন।
হযরত আবু বকর (রাঃ) সেদিনই গোলামটিকে মুক্ত করে দিলেন এবং রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে এসে আরজ করলেন : এখন থেকে আমি কখনও এরূপ ভুল করব না।
এক হাদীসে বলা হয়েছে-
“অভিসম্পাতকারীরা কেয়ামতের দিন সুপারিশকারীও হবে না, সাক্ষ্যদাতাও হবে না।”
লানত তথা অভিসম্পাতের অর্থ আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়া। সুতরাং এ শব্দটি তার ক্ষেত্রেই বলা দুরস্ত হবে, যার মধ্যে রহমত থেকে দূরে সরে যাওয়ার বিশেষণ পাওয়া যায়। এরূপ বিশেষণ হচ্ছে কুফর ও জুলুম। অতএব কাফেরের উপর অথবা জালেমের উপর অভিসম্পাত হোক, একথা বলা জায়েয। মোট কথা, শরীয়তে যেমন বর্ণিত আছে, সেসব শব্দ দ্বারা অভিসম্পাত করা উচিত। কেননা, এতে বিপদও আছে। কারণ এটা অদৃশ্য জ্ঞানের দাবী যে, তার অভিশপ্তকে আল্লাহ তাআলা রহমত থেকে দূর করে দিয়েছেন। এটা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানতে পারে না অথবা আল্লাহ আপন রসূলকে বলে দিলে তিনি জানতে পারেন।
জানা উচিত, তিনটি বিশেষণ লানতের দাবী রাখে- কুফর, বেদআত ও পাপাচার। এসব বিশেষণে লানত করার পন্থা তিনটি। প্রথম, ব্যাপক বিশেষণ সহকারে লানত করা; যেমন ‘কাফের, বেদআতী ও ফাসেকদের উপর আল্লাহর লানত হোক' বলা; অথবা ‘ইহুদী, খৃষ্টান, যিনাকার, জালেম ও সুদখোরের উপর লানত হোক বলা। এই উভয়বিধ পন্থায় লানত করা জায়েয। তবে বেদআতীদের উপর লানত করতে সর্বসাধারণকে নিষেধ করা উচিত। কেননা, কোটি বেদআত, তা চেনা, কঠিন। হাদীসে এর জন্যে কোন শব্দ বর্ণিত নেই। তৃতীয় কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লানত করা। উদাহরণতঃ যায়দ কাফের, ফাসেক অথবা বেদআতী হলেও যায়দের উপর অভিসম্পাত হোক বলা যাবে না, কিন্তু শরীয়তে যার উপর লানত প্রমাণিত আছে, তার উপর লানত হোক বলায় দোষ নেই; যেমন ‘ফেরাউন ও আবু জাহলের উপর লানত হোক' বলা, কিন্তু কোন নির্দিষ্ট জীবিত ব্যক্তি কট্টর কাফের হলেও তার উপর লানত করা ঠিক নয়; সম্ভবতঃ সে মৃত্যুর পূর্বে তওবা করতঃ মুমিন হয়ে যাবে।
ইয়াযীদ হযরত ইমাম হোসাইন (রাঃ)-কে হত্যা করেছিল অথবা হত্যার অনুমতি দিয়েছিল। তাকে লানত বলা জায়েয কিনা? এ প্রশ্নের জওয়াব হচ্ছে, হত্যা ও হত্যার অনুমতি উভয়টি যথার্থ প্রমাণ দ্বারা প্রমাণিত হয় না। হত্যা ও হত্যার অনুমতি প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাকে ঘাতক বলা যায় না। কেননা, হত্যা কবীরা গোনাহ্। কোন মুসলমানকে বিনা প্রমাণে হত্যাকারী বলা যায় না। রসূলে
আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন : যদি কেউ কাউকে কাফের অথবা ফাসেক বলে, বাস্তবে সে এরূপ না হলে যে বলে তার প্রতিই ফিরে আসে। যদি কেউ বলে, “ইমাম হোসাইনের হত্যাকারীর উপর লানত হোক”- তবে এটা জায়েয কিনা? জওয়াব হল- এর সাথে একথাও বলা উত্তম, যদি সে তওবা না করে মরে থাকে, তবে তার উপর লানত হোক। কেননা, তওবার পর মৃত্যুবরণ করারও সম্ভাবনা আছে। দেখ, ওয়াহশী (রাঃ) রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) পিতৃব্য হযরত হামযা (রাঃ)-কে কাফের অবস্থায় শহীদ করেছিলেন। এরপর মুসলমান হয়ে কুফর ও হত্যা সবকিছু থেকে তওবা করেছিলেন। এখন কেউ তার উপর লানত করতে পারবে না। এখানে ইয়াযীদকে লানত করার প্রসঙ্গটি উত্থাপন করার কারণ, আজকাল মানুষ লানত করার ব্যাপারে তড়িঘড়ি মুখ খোলে। অথচ হাদীসে বলা হয়েছে- মুমিন লানতকারী হয় না। সুতরাং যে কাফের অবস্থায় মারা যায়, তাকে ছাড়া কাউকে লানত করা ঠিক নয়। যদি একান্তই মনে চায়, তবে নির্দিষ্ট ব্যক্তির উল্লেখ না করে ব্যাপক বিশেষণ সহকারে লানত করবে। লানত করার চেয়ে আল্লাহ্র যিকির করা উত্তম। এটা না হলে চুপ থাকার মধ্যেই নিরাপত্তা।

পরবর্তী পর্ব-
গান ও কবিতা আবৃত্তি

জিহ্বার বিপদাপদ - (পর্ব - ৭) অশ্লীল কথন ও গালিগালাজ

  

জিহ্বার বিপদাপদ - পর্ব - ৭
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

অশ্লীল কথন ও গালিগালাজ—
এটাও নিন্দনীয় ও নিষিদ্ধ । আভ্যন্তরীণ নষ্টামি ও বিদ্বেষ থেকেই এর উৎপত্তি। রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন : “তোমরা অশ্লীলতা থেকে বেঁচে থাক। আল্লাহ তাআলা অশ্লীলতা ও সীমাতিরিক্ত অনর্থক বকাবকি পছন্দ করেন না।

বদর যুদ্ধে যেসকল মুশরিক নিহত হয়েছিল, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) তাদেরকেও গালি দিতে নিষেধ করে বলেছিলেন : তাদেরকে গালি দিয়ো না। কেননা তোমরা যা বল তাতে তাদের তো কিছুই হয় না, কেবল জীবিতদেরই কষ্ট হয়ে থাকে। আর সাবধান, মন্দ বলা নীচতা।

অশ্লীলতার সংজ্ঞা হচ্ছে, লজ্জাজনক বিষয়সমূহ পরিষ্কার ভাষায় উল্লেখ করা- যেমন লজ্জাস্থানের নাম মুখে উচ্চারণ করা। অধিকাংশ ভাঁড় দিবারাত্র এরূপ শব্দ উচ্চারণ করে ফিরে, কিন্তু সৎ সাধু ব্যক্তিরা এসব শব্দ মুখে আনতে লজ্জাবোধ করে এবং প্রয়োজনের সময় ইঙ্গিতে উল্লেখ করে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন : আল্লাহ জাল্লা শানুহু লজ্জাশীল। তিনি গোনাহ মাফ করেন এবং ইশারায় বর্ণনা করেন। দেখ, তিনি সহবাসকে “লমস” তথা স্পর্শ শব্দ দ্বারা ইঙ্গিতে ব্যক্ত করেছেন, কিন্তু এর জন্যে কতক এমন শব্দ মানুষের মধ্যে ব্যবহৃত আছে, যা না বলাই ভাল এবং প্রায়ই গালি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এগুলোর কতক শব্দের মধ্যেও অশ্লীলতা বেশী এবং কতক শব্দের মধ্যে কম। দেশ ও জাতির অভ্যাসভেদে এগুলোর মধ্যেও বিভিন্নতা আছে। কেবল স্ত্রী সঙ্গমের মধ্যেই অশ্লীলতা সীমিত নয়; বরং প্রত্যেক অপছন্দনীয় বিষয়কেও এরূপ মনে করা উচিত। উদাহরণতঃ মলত্যাগের জন্য পায়খানা ও প্রস্রাব শব্দ ব্যবহার করলে এটা অন্যান্য শব্দের তুলনায় ভাল । মোট কথা, যেসব শব্দ সাধারণভাবে পছন্দীয় নয় সেগুলো পরিষ্কার উল্লেখ করা অনুচিত। করলে অশ্লীলতার মধ্যে দাখিল হয়ে যাবে। অনুরূপভাবে নারীদের উল্লেখও ইশারায় হওয়া বাঞ্ছনীয়। উদাহরণতঃ ‘আমার স্ত্রী একথা বলেছে না বলে ‘ঘরে একথা বলা হয়েছে', ‘পর্দার আড়াল থেকে বলা হয়েছে' অথবা ‘বাচ্চাদের মা একথা বলেছে' বলা উচিত। এমনিভাবে কারও ধবলকুষ্ট, কুষ্ঠ, অর্শ ইত্যাদি ঘৃণা উদ্রেককারী রোগ থাকলে এগুলো উল্লেখ করা ঠিক নয়, বরং ‘দুরারোগ্য ব্যাধি' ইত্যাদি শব্দ দ্বারা বর্ণনা করবে। আলা ইবনে হারূন বলেন, , খলীফা হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজীজের একবার বগলে ফোঁড়া বের হয়। তিনি জিহ্বার খুব হেফাযত করতেন। তাই আমরা তাঁকে দেখতে গেলাম, দেখি, এ ব্যাপারে তিনি কি বলেন। আমরা জিজ্ঞেস করলাম : ফোঁড়া কোথায় বের হয়েছে? তিনি বললেন : বাহুর ভিতরের দিকে। অশ্লীলতার কারণে অপরকে কষ্ট দেয়া হয়ে থাকে অথবা মন্দ লোকের সংসর্গে এই বদভ্যাস গড়ে উঠে। জনৈক বেদুঈন রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে আরজ করল, আপনি আমাকে উপদেশ দিন। তিনি বললেন : আল্লাহকে ভয় কর। তোমার মধ্যে কোন বিষয় দেখে যদি কেউ তোমাকে লজ্জা দেয়, তবে তুমিও তার বিষয় দেখে তাকে লজ্জা দিয়ো না ৷ অৰ্থাং কেউ মন্দ বললে জওয়াবে তুমি তেমনি মন্দ বলো না। এতে সে শাস্তি ভোগ করবে এবং তুমি সওয়াব পাবে। কোন কিছুকে গালি দেবে না । বেদুঈন বলে, এরপর আমি কখনও গালি দেইনি। আয়ায ইবনে হেমার (রাঃ) রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে আরজ করলেন : এক ব্যক্তি আমাকে গালি দেয়। সে মর্তবায় আমার চেয়ে কম। আমিও তার কাছ থেকে এর প্রতিশোধ নিলে ক্ষতি কি? রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) বললেন : গালিগালাজকারী উভয়ই শয়তান হয়ে থাকে। তারা একে অপরকে মিথ্যাবাদী বলে এবং অপবাদ আরোপ করে।
এক হাদীসে আছে : “মুমিনকে গালি দেয়া পাপাচার এবং লড়াই করা কুফর। এক রেওয়ায়াতে বলা হয়েছে- সর্ববৃহৎ কবীরা গোনাহ হচ্ছে পিতামাতাকে গালি দেয়া। সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন : মানুষ পিতামাতাকে কিরূপে গালি দেবে? তিনি বললেন : অন্যের পিতামাতাকে গালি দেয় এবং জওয়াবে সে তার পিতামাতাকে গালি দেয়। এভাবে আপন পিতামাতাকে গালি দেয়ার কারণ সে নিজেই হয়।


জিহ্বার বিপদাপদ - (পর্ব - ৬) কথার প্রাঞ্জলতার জন্যে লৌকিকতা



জিহ্বার বিপদাপদ - পর্ব - ৬
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন   ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

কথার প্রাঞ্জলতার জন্যে লৌকিকতা—
অধিকাংশ বক্তার অভ্যাস হচ্ছে, তারা মূল বিষয়বস্তু বর্ণনার পূর্বে ভূমিকা সাজায়। এ ধরনের লৌকিকতা ও কৃত্রিমতা নিন্দনীয়।
হাদীসে বলা হয়েছে: “আমি এবং আমার উম্মতের পরহেযগার ব্যক্তিগণ লৌকিকতা থেকে মুক্ত”।
হযরত ফাতেমা (রাঃ)-এর রেওয়ায়াতে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন :
“আমার উম্মতের মন্দ লোক তারা, যারা ধন-দৌলতের মধ্যে লালিত পালিত হয়, নানাবিধ খাদ্য ভক্ষণ করে, বৈচিত্র্যময় পোশাক পরিধান করে এবং কথা বলার মধ্যে লৌকিকতা করে”।
ওমর ইবনে সা'দ একদিন তাঁর পিতার কাছে কিছু অভাব অনটনের কথা বলতে এসে দীর্ঘ ভূমিকা পেশ করলেন। হযরত সা'দ (রাঃ) বললেন, অভাবের কথা বলতে গিয়ে আজ যে দীর্ঘ ভূমিকা তুমি বর্ণনা করলে, তা কখনও করনি। আমি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি, এমন এক যমানা আসবে যখন মানুষ কথা চিবিয়ে চিবিয়ে বলবে, যেমন গাভী ঘাস চিবায়। এ থেকে জানা গেল, হযরত সা'দ (রাঃ) অভাব ব্যক্ত করার পূর্বে পুত্রের ভূমিকা বর্ণনাকে দূষণীয় মনে করেছেন। তিনি একে নিছক লৌকিকতা ও কৃত্রিমতা আখ্যা দিয়েছেন। কথার মধ্যে অভ্যাস বহির্ভূত ছন্দের মিলও এর মধ্যে দাখিল। অতএব কথা এমনভাবে বলতে হবে, যাতে উদ্দেশ্য হাসিল হয়। উদ্দেশ্য কেবল অন্যকে বুঝানো। এছাড়া যা কিছু করা হবে, সবই লৌকিকতা। হাঁ, খোতবা ও ওয়াযে উৎকৃষ্ট শব্দের ব্যবহার যথেষ্ট প্রভাবশালী হয়ে থাকে। তাই এতে উৎকৃষ্ট ভাষা থাকা ভাল।

জিহ্বার বিপদাপদ - (পর্ব - ৫) খুসুমত' তথা বিবাদ



জিহ্বার বিপদাপদ - পর্ব - ৫
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন   - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

খুসুমত' তথা বিবাদ—
‘খুসুমত' তথা বিবাদ – এর মধ্যে এবং পূর্ববর্তী (বিবাদ)- এর মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে, অপরকে হেয় ও নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপন্ন করার মতলবে কারও কথার মধ্যে দোষত্রুটি বের করাকে বলা হয়। এবং অর্থসম্পদ পাওয়ার উদ্দেশে যে বিবাদ করা হয়, তাকে বলে 'খুসুমত'। এটা কখনও আপত্তি ছাড়াই এবং কখনও আপত্তি সহকারে হয়, কিন্তু বিবাদ আপত্তি ছাড়া হয় না। এই খুসুমতও নিন্দনীয়।

হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর রেওয়ায়াতে রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন -
“অধিক বিবাদকারী ব্যক্তি আল্লাহ্ তাআলার কাছে অধিক অপছন্দনীয়”।
ইবনে কোতায়বা বলেন : একদিন আমি বসা আছি, এমন সময় বশীর ইবনে আবদুল্লাহ আমার কাছ দিয়ে গমন করলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন : এখানে বসে আছ কেন? আমি বললাম : আমার মধ্যে ও আমার চাচাত ভাইয়ের মধ্যে একটি বিষয় নিয়ে বিবাদ আছে। তিনি বললেন : আমার উপর তোমার পিতার অনুগ্রহ আছে। আমি এর প্রতিদান তোমাকে দিতে চাই। “শুন, বিবাদ করার চেয়ে মন্দ কোন কিছু নেই। এতে ধর্মকর্ম বরবাদ হয়, ভদ্রতা বিনষ্ট হয় এবং জীবনের আনন্দ উধাও হয়ে যায়। অন্তর এতেই জড়িত থাকে”। একথা শুনে আমি গৃহে চলে যাওয়ার জন্যে উঠলাম। আমার প্রতিপক্ষ বলল : কোথায় যাও? আমি বললাম : না- আর বিবাদ নয়। সে বলল : বোধ হয় জেনে নিয়েছ যে, আমিই সত্যপথে আছি। বললাম : না, তা নয়, কিন্তু আমি বিবাদ দূরে ঠেলে দিয়ে নিজে মহৎ হতে চাই। সে বলল : যদি তাই হয় তবে আমিও আর কোন দাবী রাখছি না। সে বস্তুটি এখন তুমিই নিয়ে নাও।
এখানে প্রশ্ন হয়, যখন কারও হক কোন জালেম ব্যক্তি আত্মসাৎ করে, তখন তা উদ্ধার করার জন্যে মামলা মোকদ্দমা করা জরুরী হয়। সুতরাং এটা নিন্দনীয় হবে কেন? জওয়াব হচ্ছে, মামলা-মোকদ্দমা সব সময় এক রকমই হয় না। কখনও মিথ্যা হয় এবং কখনও না জেনে না শুনেও হয়; যেমন উকিল সত্য কোন্ পক্ষে তা না জেনেও যুক্তি প্রমাণ পেশ করে। আবার কখনও হকের পরিমাণের চেয়ে বেশী হকের জন্যেও মামলা-মোকদ্দমা করা হয়। মাঝে মাঝে কেবল প্রতিপক্ষকে হেয় ও নির্যাতিত করার উদ্দেশে মোকদ্দমা করা হয়। এছাড়া শত্রুতার ভিত্তিতে সামান্য বিষয়ের জন্যেও এটা করা হয়। এ ধরনের মামলা-মোকদ্দমা অত্যন্ত নিন্দনীয়। যদি মযলুম ব্যক্তি আপন হক পাওয়ার জন্যে শরীয়ত অনুযায়ী মামলা করে, নীচতা, অপব্যয় ও প্রয়োজনের অধিক হাঙ্গামা না করে এবং শত্রুতা ও নির্যাতনের ইচ্ছা মাঝখানে না থাকে, তবে এরূপ মামলা মোকদ্দমা হারাম নয়, কিন্তু যে পর্যন্ত মোকদ্দমা ছাড়াই উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়ে যায় সেই পর্যন্ত নালিশ না করাই উত্তম। কেননা, মামলা মোকদ্দমা ও ঝগড়ার মধ্যে জিহ্বাকে সীমার মধ্যে রাখা খুবই কঠিন। ঝগড়ার কারণে বুকের মধ্যে ক্রোধের শিখা উত্থিত হয়। এর কারণে হক-নাহকের বিবেচনা শিকায় উঠে। ফলে উভয় পক্ষের মধ্যে কেবল হিংসা বিদ্বেষই বাকী থেকে যায়। এমনকি, এক পক্ষের দুঃখে অপর পক্ষ আনন্দিত হয়। যে ব্যক্তি প্রথমে ঝগড়া ও মামলা মোকদ্দমা করে, সে উপরোক্ত অনিষ্টসমূহে লিপ্ত হয়ে পড়ে, কমপক্ষে তার মনে উদ্বেগ প্ৰবল থাকে। এমনকি, কিভাবে প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করা যায়, নামাযের মধ্যেও এই চিন্তা ঘুরপাক খেতে থাকে।

জিহ্বার বিপদাপদ - ৪ (অবৈধ বিষয়াদি বলা )


জিহ্বার বিপদাপদ - পর্ব - ৪
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন  ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

অপরের কথার মধ্যে কথা বলা এবং বিবাদ করা
হাদীস শরীফে কথার মধ্যে কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে । বলা হয়েছে- আপন ভাইয়ের কথার মধ্যে কথা বলো না এবং তার সাথে ঝগড়া করো না । তাকে এমন ওয়াদা দিয়ো না, যা পালন করবে না । এক হাদীসে বলা হয়েছে "কথার মধ্যে কথা বলা ত্যাগ না করা পর্যন্ত কোন বান্দা ঈমানের স্বরূপ পূর্ণ করে না, যদিও তা সত্য হয় ।"  আরও বলা হয়েছে- যার মধ্যে ছয়টি অভ্যাস থাকে, সে ঈমানের স্বরূপ পর্যন্ত পৌঁছে যায়- (১) গরমের দিনে রোযা রাখা, (২) খোদাদ্রোহীদেরকে তরবারি দিয়ে হত্যা করা, (৩) বৃষ্টি-বাদলের দিনে প্রথম ওয়াক্তে নামায পড়া; (৪) বিপদে সবর করা; (৫) অধিক শীতেও ওযু পূর্ণরূপে করা এবং (৬) সত্যের দিকে থাকা সত্ত্বেও ঝগড়া-বিবাদ না করা । হযরত মালেক ইবনে আনাস বলেন, ঝগড়া বিবাদ ধর্মের সাথে কোন সম্পর্ক রাখে না । তিনি আরও বলেন : ঝগড়া করলে অন্তর, কঠোর হয়ে যায় এবং তাতে হিংসা-বিদ্বেষের বীজ পড়ে ।

মোট কথা, কথার মধ্যে কথা বলার অনিষ্ট অনেক । এর সংজ্ঞা হচ্ছে অপরের কথায় আপত্তির ছলে দোষত্রুটি বের করা । এটাই বর্জনীয় । কেউ কোন কথা বললে তা যদি সত্য হয়, তবে মেনে নেয়া উচিত । আর ধর্ম সম্পর্কিত মিথ্যা না হলে চুপ থাকা বাঞ্ছনীয় । দোষ তালাশ করার কোন প্রয়োজন নেই । হাদীসে এই স্বভাব 'মারআ' বলে ব্যক্ত করা হয়েছে ৷

পরবর্তী পর্ব
খুসুমত’ তথা বিবাদ

জিহ্বার বিপদাপদ - (পর্ব - ৩) অধিক কথা বলা

জিহ্বার বিপদাপদ - পর্ব - ৩
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

অধিক কথা বলা—
এতে অনর্থক এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথাও শামিল। উদাহরণতঃ যেখানে প্রয়োজনীয় কথা সংক্ষেপেও বলা যায়, সেখানে এক বাক্যের স্থলে দু'বাক্য বললে দ্বিতীয় বাক্য অতিরিক্ত হবে। গোনাহ্ অথবা ক্ষতি না হলেও এটা খারাপ।
আতা ইবনে আবী রাবাহ বলেন : পূর্ববর্তী বুযুর্গগণ অতিরিক্ত কথা খারাপ মনে করতেন।
মুতরিফ বলেন : আল্লাহ তাআলার প্রতাপের প্রতি লক্ষ্য রাখ। অস্থানে তাঁর উল্লেখ করো না। উদাহরণতঃ কুকুর অথবা গাধা দেখে বলো না, আল্লাহ, একে সরিয়ে দাও।
জানা উচিত, অতিরিক্ত কথার কোন সীমা-পরিসীমা নেই। তবে কোরআন পাকে জরুরী কথার সীমা বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ বলেন : “তাদেরকে অনেক পরামর্শে কোন কল্যাণ নেই। কিন্তু যে খয়রাত করার আদেশ করে অথবা সৎকাজ করতে বলে অথবা মানুষের মধ্যে শান্তি স্থাপনের কথা বলে, তার কথা ভিন্ন”।
হাদীসে বলা হয়েছে : 
>“সেই ব্যক্তির জন্যে সুসংবাদ, যে জিহ্বাকে বাড়তি কথা থেকে সংযত রাখে এবং বাড়তি অর্থ ব্যয় করে দেয়”, 
কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা যায়, মানুষ এ বিষয়টিকে উল্টে দিয়েছে। তারা অতিরিক্ত অর্থ আগলে রাখে এবং জিহ্বাকে বল্গাহীনভাবে ছেড়ে দেয়। মুতরিফের পিতার বর্ণনা, তিনি আমের গোত্রের লোকদের সাথে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম)-উনার খেদমতে উপস্থিত হন। তারা রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম)-উনার প্রশংসা করে বলতে থাকে- “আপনি আমাদের পিতা, সরদার, শ্রেষ্ঠতম এবং অনুগ্রহদাতা, আপনি এমন, আপনি এমন”। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন :
>“তোমরা তোমাদের কথা বল, শয়তান যেন তোমাদেরকে বিভ্রান্ত না করে”।
এ হাদীস থেকে জানা গেল, যখন কারও সত্য প্রশংসাও করা হয় তখন শয়তান অতিরিক্ত কথা মুখ দিয়ে বের করে দিতে পারে।
নিজস্ব মত—
[এই হাদিস থেকে বুঝা যায় রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) উনার প্রসংশায় যাহাই বলাহয় নিষেধ নেই শুধু মনে রাখতে হবে মাবুদ, সৃষ্টিকর্তা, রব এসব যেন মনে করা না হয়। ‘শয়তান অতিরিক্ত কথা মুখ দিয়ে বের করে দিতে পারে’ এই কথা দ্বারা একথাই বুঝানো হয়েছ ] আল্লাহ তা’আলা-ই ভাল জানেন।
হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ) বলেন : আমি তোমাদেরকে অতিরিক্ত কথার ব্যাপারে সতর্ক করছি। কথা ততটুকুই বলা উচিত, যতটুকুতে প্রয়োজন মিটে যায়।
হযরত মুজাহিদ বলেন : মানুষের সব কথা লেখা হয়। কেউ যদি শিশুকে চুপ করানোর জন্যে কোন কিছু দেয়ার কথা বলে এরপর না দেয়, তবে তাকে মিথ্যাবাদী লেখা হয়। হযরত হাসান বলেন : হে মানুষ আমলনামা খোলা রয়েছে। দু'জন ফেরেশতা তোমার আমল লেখার জন্যে নিয়োজিত আছেন। এখন ইচ্ছা হয় কম কথা বল, ইচ্ছা হয় বেশী কথা বল।
বর্ণিত আছে, হযরত সোলায়মান (আঃ) জনৈক জ্বিনকে এক জায়গায় প্রেরণ করে কয়েকজন জ্বিনকে এই বলে তার পেছনে লাগিয়ে দিলেন, তার যা অবস্থা দেখ এবং সে যা বলে, তা এসে আমাকে বলবে। তারা ফিরে এসে বলল : সে বাজারে গিয়ে আপন মস্তক আকাশের দিকে উত্তোলন করে, এরপর মানুষের দিকে তাকিয়ে মাথা দোলাতে থাকে। হযরত সোলায়মান (আঃ) সেই জ্বিনকে জিজ্ঞেস করলেন : এমন করছিলে কেন? জ্বিন আরজ করল, আকাশের ফেরেশতাদেরকে দেখে আমি বিস্মিত হয়েছিলাম, তারা মানুষের মাথার উপর বসে কত দ্রুত তাদের আমল লিপিবদ্ধ করছে।[ছোবহানাল্লাহ্] আর মানুষকে দেখেও অবাক হচ্ছিলাম, তারা কত তাড়াতাড়ি বিপথগামী হচ্ছে [নাউজুবিল্লাহ্]।
হযরত ইবরাহীম তায়মী (রঃ) বলেন : মুমিনের কথা বলা চিন্তাভাবনা সহকারে হয়। কিছু ফায়দা দেখলে বলে : নতুবা চুপ থাকে। পক্ষান্তরে পাপাচারীর জিহ্বা দর্জির কাঁচির মত চলে। চিন্তাভাবনা ছাড়াই অনর্গল বকতে থাকে।
হযরত হাসান (রঃ) বলেন : যার কথা বেশী, সে বেশী মিথ্যাবাদী। যার কাছে অর্থসম্পদ বেশী, তার গোনাহ বেশী। চরিত্রহীন ব্যক্তি নিজের জন্যে আযাব টেনে আনে।
ওমর ইবনে দীনার বলেন : রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) উনার মজলিসে এক ব্যক্তি দীর্ঘ কথা বললে তিনি জিজ্ঞেস করলেন : তোমার জিহ্বার ওপাশে কয়টি দরজা আছে? লোকটি বলল : দাঁত আছে, আর আছে ঠোঁট। তিনি বললেন : এদের একটিও কি তোমার কথায় বাধা দিল না?
ইয়াযীদ ইবনে আবী হাবীব বলেন : আলেমের জন্যে কথা বলার চেয়ে কথা শুনাও একটি পরীক্ষা। তাই যতক্ষণ অন্য ব্যক্তি কথা বলে, ততক্ষণ চুপ থাকা উচিত। কেননা, কথা শুনার মধ্যে নিরাপত্তা আছে- বলার মধ্যে নেই।

পরবর্তী পর্ব-
অবৈধ বিষয়াদি বলা


জিহ্বার বিপদাপদ - ২ অনর্থক কথাবার্তা

  


জিহ্বার বিপদাপদ - পর্ব - ২

এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

অনর্থক কথাবার্তা
যে কথা না বললে কোন গোনাহ্ হয় না এবং জান-মালেরও কোন ক্ষতি হয় না, তাই অনর্থক কথা। মানুষের সর্বোত্তম অবস্থা হচ্ছে, সে কথা বলার সময় লক্ষ্য রাখবে যেন তার সবগুলো কথা গীবত, চোগলখোরী, মিথ্যা, বিবাদ-বিসম্বাদ ইত্যাদি বিপদ থেকে মুক্ত থাকে। সে কেবল এমন কথাই মুখে উচ্চারণ করবে, যা শরীয়ত অনুমোদিত এবং যাতে তার নিজের ও কোন মুসলমান ভাইয়ের ক্ষতি না হয়, কিন্তু মাঝে মাঝে কিছু অনাবশ্যক কথাও মুখ দিয়ে উচ্চারিত হয়ে যায়। এতে একদিকে সময় নষ্ট হয়, অপর দিকে জিহ্বার হিসাব ঘাড়ে চাপে এবং নিকৃষ্ট বস্তুর বিনিময়ে উৎকৃষ্ট বস্তু হাতছাড়া হয়ে যায়। কেননা, কথা বলার সময় যদি কেউ চিন্তাভাবনায় ব্যাপৃত হয় তবে অদৃশ্য জগত থেকে এমন বিষয়ও প্রাপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যার উপকার বেশী অথবা তসবীহ্ কিংবা অন্য কোন যিকিরেও মশগুল হওয়া যায়। অবশ্যই বহু কথা এমন আছে, যেগুলোর কারণে জান্নাতে গৃহ নির্মিত হয়। সুতরাং ধনভাণ্ডার সঞ্চয় করার ক্ষমতা যার আছে, সে যদি এর বিনিময়ে ঢিলা সঞ্চয় করে, তবে একে ক্ষতি ছাড়া আর কি বলা হবে ? অতএব আল্লাহর যিকির, যা উৎকৃষ্ট ধনভান্ডার, তা ছেড়ে অনাবশ্যক কথাবার্তা মুখে উচ্চারণ করাও তেমনি ক্ষতির কাজ, যদিও তা উচ্চারণ করা মোবাহ্ তথা অনুমোদিত হয়। ঈমানদারের চুপ থাকা চিন্তাভাবনা, কথা বলা যিকির এবং দেখা শিক্ষা গ্রহণ হয়ে থাকে। রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন : “মানুষের পুঁজি হচ্ছে সময়। এ সময় অনাবশ্যক কথায় ব্যয় করলে এবং সওয়াব ও আখেরাতে সম্বল অর্জন না করলে পুঁজি বিনষ্ট হতে বাধ্য”। এ জন্যেই রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন- “ব্যক্তির ইসলামের সৌন্দর্য হচ্ছে এমন বিষয় বর্জন করা, যা উপকারী নয়”।

হযরত আনাস (রাঃ)-এর রেওয়ায়াতে এ বিষয়টি আরও কঠোর ভাষায় ব্যক্ত হয়েছে। তিনি বলেন : ওহুদ যুদ্ধে জনৈক যুবক শহীদ হলে আমরা দেখলাম, ক্ষুধার কারণে তার পেটে পাথর বাঁধা রয়েছে। তাঁর মাতা মুখ থেকে মাটি মুছে দিয়ে বলল : বৎস! জান্নাত মোবারক হোক। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) বললেন : কিরূপে জানা গেল, সে জান্নাতে যাবে ? সম্ভবতঃ সে অনর্থক কথাবার্তা বলত। অন্য এক হাদীসে আছে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) হযরত কা'ব (রঃ)-কে কয়েকদিন না দেখে জিজ্ঞেস করলেন : কা'ব কোথায় ? লোকেরা বলল : অসুস্থ। তিনি তাঁকে দেখতে গেলেন। কাছে গিয়ে বললেন : তোমাকে সুসংবাদ হে কা'ব। কাবের মাতা বললেন : তোমাকে বেহিসাব জান্নাত মোবারক হোক। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) বললেন : আল্লাহর উপর আদেশ জারি করে কে এই মহিলা ? কা'ব আরজ করলেন, আমার জননী। তিনি বললেন : তুমি কিরূপে জানলে? তোমার পুত্র হয় তো কখনও অনর্থক কথাবার্তা বলেছে। এই হাদীসের উদ্দেশ্য হচ্ছে, যার যিম্মায় কোন হিসাব নেই সে-ই বেহিসাব জান্নাতে যেতে পারে। যে অনাবশ্যক কথা বলে, তার যিম্মায় হিসাব থেকে যায়, যদিও সে কথা মোবাহ্ হয়।

পরবর্তী পর্ব
অধিক কথা বলা

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...