উপহাস . কৌতুক ও গোপন কথা ফাঁস করা
পরবর্তী পর্ব-
মিথ্যা ওয়াদা
পরবর্তী পর্ব-
মিথ্যা ওয়াদা
পরবর্তী পর্ব-
উপহাস ও কৌতুক
হযরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেন, একদিন আমি সূতা কাটছিলাম এবং রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) জুতা সেলাই করছিলেন। আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে দেখি, তাঁর কপাল ঘর্মাক্ত এবং ঘর্মবিন্দু আলোর মধ্যে নক্ষত্রপুঞ্জের অপরূপ সৌন্দর্য প্রদর্শন করছে। আমি দেখামাত্রই এই অলৌকিক সৌন্দর্যে অভিভূত হয়ে পড়লাম। তিনি আমার হতবুদ্ধিতা আঁচ করে নিলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন : এমন বিস্ময়াবিষ্ট হচ্ছ কেন? আমি আরজ করলাম : আপনার ললাটের ঘর্মবিন্দু থেকে সৌন্দর্যের যে তরঙ্গ উত্থিত হচ্ছে, তাতেই আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাচ্ছি। যদি আবু বকর হুযলী আপনাকে এই মুহূর্তে দেখতে পেত, তবে অবশ্যই জেনে নিত, তার কবিতার মূর্ত প্রতীক আপনিই। তিনি বললেন : তার কবিতা কি ? আমি আরজ করলাম : এ দু'টি পংক্তি—
“ঋতুস্রাবের মলিনতা থেকে, দুধমাতার ভ্রষ্টতা থেকে এবং
শয়তানের ব্যায়াম থেকে। তুমি যখন তার মুখমণ্ডলের পানে তাকাবে, তখন মনে হবে যেন তা বিদ্যুৎ উজ্জ্বল মেঘমালার ন্যায় ঝলমল করছে”।
হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন : অতঃপর রসূলূল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) আপন কাজ ছেড়ে আমার ললাটে চুম্বন এঁকে দিলেন। তিনি বললেন : - “আয়েশা, আল্লাহ্ তোমাকে উত্তম প্রতিদান দিন। তুমি আমার প্রতি সম্ভবতঃ এতটুকু খুশী হওনি, যতটুকু আমি তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছি”।
হোনায়ন যুদ্ধের পর রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বণ্টন করলেন এবং আব্বাস ইবনে মেরদাসকে চারটি উট দান করলেন। সে উট নিয়ে চলে গেল এবং তার হক আরও বেশী বলে অভিযোগ করে একটি কবিতা রচনা করল। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) সাহাবায়ে কেরামকে আদেশ করলেন : তার অভিযোগ মিটিয়ে দাও। অতঃপর হযরত আবু বকর (রাঃ) তাকে সঙ্গে নিয়ে গেলেন এবং এত বেশী দিলেন যে, সে ওযর পেশ করতে শুরু করল এবং বলল : আমার পিতামাতা আপনার প্রতি উৎসর্গ হোক। কবিতা যখন আমার জিহ্বায় পিঁপড়ার মত দংশন করতে থাকে, তখন কিছু না বলে উপায় থাকে না। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) হাসলেন এবং বললেন : যতদিন উট উচ্চ কণ্ঠে চেঁচাবে, ততদিন আরবরা কবিতা বলা ত্যাগ করবে না।
পরবর্তী পর্ব-
হাসিঠাট্টা
পরবর্তী পর্ব-
গান ও কবিতা আবৃত্তি
বদর যুদ্ধে যেসকল মুশরিক নিহত হয়েছিল, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) তাদেরকেও গালি দিতে নিষেধ করে বলেছিলেন : তাদেরকে গালি দিয়ো না। কেননা তোমরা যা বল তাতে তাদের তো কিছুই হয় না, কেবল জীবিতদেরই কষ্ট হয়ে থাকে। আর সাবধান, মন্দ বলা নীচতা।
অশ্লীলতার সংজ্ঞা হচ্ছে, লজ্জাজনক বিষয়সমূহ পরিষ্কার ভাষায় উল্লেখ করা- যেমন লজ্জাস্থানের নাম মুখে উচ্চারণ করা। অধিকাংশ ভাঁড় দিবারাত্র এরূপ শব্দ উচ্চারণ করে ফিরে, কিন্তু সৎ সাধু ব্যক্তিরা এসব শব্দ মুখে আনতে লজ্জাবোধ করে এবং প্রয়োজনের সময় ইঙ্গিতে উল্লেখ করে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন : আল্লাহ জাল্লা শানুহু লজ্জাশীল। তিনি গোনাহ মাফ করেন এবং ইশারায় বর্ণনা করেন। দেখ, তিনি সহবাসকে “লমস” তথা স্পর্শ শব্দ দ্বারা ইঙ্গিতে ব্যক্ত করেছেন, কিন্তু এর জন্যে কতক এমন শব্দ মানুষের মধ্যে ব্যবহৃত আছে, যা না বলাই ভাল এবং প্রায়ই গালি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এগুলোর কতক শব্দের মধ্যেও অশ্লীলতা বেশী এবং কতক শব্দের মধ্যে কম। দেশ ও জাতির অভ্যাসভেদে এগুলোর মধ্যেও বিভিন্নতা আছে। কেবল স্ত্রী সঙ্গমের মধ্যেই অশ্লীলতা সীমিত নয়; বরং প্রত্যেক অপছন্দনীয় বিষয়কেও এরূপ মনে করা উচিত। উদাহরণতঃ মলত্যাগের জন্য পায়খানা ও প্রস্রাব শব্দ ব্যবহার করলে এটা অন্যান্য শব্দের তুলনায় ভাল । মোট কথা, যেসব শব্দ সাধারণভাবে পছন্দীয় নয় সেগুলো পরিষ্কার উল্লেখ করা অনুচিত। করলে অশ্লীলতার মধ্যে দাখিল হয়ে যাবে। অনুরূপভাবে নারীদের উল্লেখও ইশারায় হওয়া বাঞ্ছনীয়। উদাহরণতঃ ‘আমার স্ত্রী একথা বলেছে না বলে ‘ঘরে একথা বলা হয়েছে', ‘পর্দার আড়াল থেকে বলা হয়েছে' অথবা ‘বাচ্চাদের মা একথা বলেছে' বলা উচিত। এমনিভাবে কারও ধবলকুষ্ট, কুষ্ঠ, অর্শ ইত্যাদি ঘৃণা উদ্রেককারী রোগ থাকলে এগুলো উল্লেখ করা ঠিক নয়, বরং ‘দুরারোগ্য ব্যাধি' ইত্যাদি শব্দ দ্বারা বর্ণনা করবে। আলা ইবনে হারূন বলেন, , খলীফা হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজীজের একবার বগলে ফোঁড়া বের হয়। তিনি জিহ্বার খুব হেফাযত করতেন। তাই আমরা তাঁকে দেখতে গেলাম, দেখি, এ ব্যাপারে তিনি কি বলেন। আমরা জিজ্ঞেস করলাম : ফোঁড়া কোথায় বের হয়েছে? তিনি বললেন : বাহুর ভিতরের দিকে। অশ্লীলতার কারণে অপরকে কষ্ট দেয়া হয়ে থাকে অথবা মন্দ লোকের সংসর্গে এই বদভ্যাস গড়ে উঠে। জনৈক বেদুঈন রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে আরজ করল, আপনি আমাকে উপদেশ দিন। তিনি বললেন : আল্লাহকে ভয় কর। তোমার মধ্যে কোন বিষয় দেখে যদি কেউ তোমাকে লজ্জা দেয়, তবে তুমিও তার বিষয় দেখে তাকে লজ্জা দিয়ো না ৷ অৰ্থাং কেউ মন্দ বললে জওয়াবে তুমি তেমনি মন্দ বলো না। এতে সে শাস্তি ভোগ করবে এবং তুমি সওয়াব পাবে। কোন কিছুকে গালি দেবে না । বেদুঈন বলে, এরপর আমি কখনও গালি দেইনি। আয়ায ইবনে হেমার (রাঃ) রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে আরজ করলেন : এক ব্যক্তি আমাকে গালি দেয়। সে মর্তবায় আমার চেয়ে কম। আমিও তার কাছ থেকে এর প্রতিশোধ নিলে ক্ষতি কি? রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) বললেন : গালিগালাজকারী উভয়ই শয়তান হয়ে থাকে। তারা একে অপরকে মিথ্যাবাদী বলে এবং অপবাদ আরোপ করে।
এক হাদীসে আছে : “মুমিনকে গালি দেয়া পাপাচার এবং লড়াই করা কুফর। এক রেওয়ায়াতে বলা হয়েছে- সর্ববৃহৎ কবীরা গোনাহ হচ্ছে পিতামাতাকে গালি দেয়া। সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন : মানুষ পিতামাতাকে কিরূপে গালি দেবে? তিনি বললেন : অন্যের পিতামাতাকে গালি দেয় এবং জওয়াবে সে তার পিতামাতাকে গালি দেয়। এভাবে আপন পিতামাতাকে গালি দেয়ার কারণ সে নিজেই হয়।
হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর রেওয়ায়াতে রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া-আলিহী ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন -
“অধিক বিবাদকারী ব্যক্তি আল্লাহ্ তাআলার কাছে অধিক অপছন্দনীয়”।
ইবনে কোতায়বা বলেন : একদিন আমি বসা আছি, এমন সময় বশীর ইবনে আবদুল্লাহ আমার কাছ দিয়ে গমন করলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন : এখানে বসে আছ কেন? আমি বললাম : আমার মধ্যে ও আমার চাচাত ভাইয়ের মধ্যে একটি বিষয় নিয়ে বিবাদ আছে। তিনি বললেন : আমার উপর তোমার পিতার অনুগ্রহ আছে। আমি এর প্রতিদান তোমাকে দিতে চাই। “শুন, বিবাদ করার চেয়ে মন্দ কোন কিছু নেই। এতে ধর্মকর্ম বরবাদ হয়, ভদ্রতা বিনষ্ট হয় এবং জীবনের আনন্দ উধাও হয়ে যায়। অন্তর এতেই জড়িত থাকে”। একথা শুনে আমি গৃহে চলে যাওয়ার জন্যে উঠলাম। আমার প্রতিপক্ষ বলল : কোথায় যাও? আমি বললাম : না- আর বিবাদ নয়। সে বলল : বোধ হয় জেনে নিয়েছ যে, আমিই সত্যপথে আছি। বললাম : না, তা নয়, কিন্তু আমি বিবাদ দূরে ঠেলে দিয়ে নিজে মহৎ হতে চাই। সে বলল : যদি তাই হয় তবে আমিও আর কোন দাবী রাখছি না। সে বস্তুটি এখন তুমিই নিয়ে নাও।
এখানে প্রশ্ন হয়, যখন কারও হক কোন জালেম ব্যক্তি আত্মসাৎ করে, তখন তা উদ্ধার করার জন্যে মামলা মোকদ্দমা করা জরুরী হয়। সুতরাং এটা নিন্দনীয় হবে কেন? জওয়াব হচ্ছে, মামলা-মোকদ্দমা সব সময় এক রকমই হয় না। কখনও মিথ্যা হয় এবং কখনও না জেনে না শুনেও হয়; যেমন উকিল সত্য কোন্ পক্ষে তা না জেনেও যুক্তি প্রমাণ পেশ করে। আবার কখনও হকের পরিমাণের চেয়ে বেশী হকের জন্যেও মামলা-মোকদ্দমা করা হয়। মাঝে মাঝে কেবল প্রতিপক্ষকে হেয় ও নির্যাতিত করার উদ্দেশে মোকদ্দমা করা হয়। এছাড়া শত্রুতার ভিত্তিতে সামান্য বিষয়ের জন্যেও এটা করা হয়। এ ধরনের মামলা-মোকদ্দমা অত্যন্ত নিন্দনীয়। যদি মযলুম ব্যক্তি আপন হক পাওয়ার জন্যে শরীয়ত অনুযায়ী মামলা করে, নীচতা, অপব্যয় ও প্রয়োজনের অধিক হাঙ্গামা না করে এবং শত্রুতা ও নির্যাতনের ইচ্ছা মাঝখানে না থাকে, তবে এরূপ মামলা মোকদ্দমা হারাম নয়, কিন্তু যে পর্যন্ত মোকদ্দমা ছাড়াই উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়ে যায় সেই পর্যন্ত নালিশ না করাই উত্তম। কেননা, মামলা মোকদ্দমা ও ঝগড়ার মধ্যে জিহ্বাকে সীমার মধ্যে রাখা খুবই কঠিন। ঝগড়ার কারণে বুকের মধ্যে ক্রোধের শিখা উত্থিত হয়। এর কারণে হক-নাহকের বিবেচনা শিকায় উঠে। ফলে উভয় পক্ষের মধ্যে কেবল হিংসা বিদ্বেষই বাকী থেকে যায়। এমনকি, এক পক্ষের দুঃখে অপর পক্ষ আনন্দিত হয়। যে ব্যক্তি প্রথমে ঝগড়া ও মামলা মোকদ্দমা করে, সে উপরোক্ত অনিষ্টসমূহে লিপ্ত হয়ে পড়ে, কমপক্ষে তার মনে উদ্বেগ প্ৰবল থাকে। এমনকি, কিভাবে প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করা যায়, নামাযের মধ্যেও এই চিন্তা ঘুরপাক খেতে থাকে।
মোট কথা, কথার মধ্যে কথা বলার অনিষ্ট অনেক । এর সংজ্ঞা হচ্ছে অপরের কথায় আপত্তির ছলে দোষত্রুটি বের করা । এটাই বর্জনীয় । কেউ কোন কথা বললে তা যদি সত্য হয়, তবে মেনে নেয়া উচিত । আর ধর্ম সম্পর্কিত মিথ্যা না হলে চুপ থাকা বাঞ্ছনীয় । দোষ তালাশ করার কোন প্রয়োজন নেই । হাদীসে এই স্বভাব 'মারআ' বলে ব্যক্ত করা হয়েছে ৷
বিবাহ (পর্ব – ৩৫) 📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.) কন্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...