শনিবার, ১৫ জুলাই, ২০২৩

উদরের খাহেশ চূর্ণকারী সাধনা


 উদর ও লজ্জাস্থানের খাহেশের প্রতিকার (পর্ব– ৪)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

উদরের খাহেশ চূর্ণকারী সাধনা 

উদর ও খাদ্যের ব্যাপারে মুরীদের উচিত চারটি বিষয় নির্দিষ্ট করে নেয়া  (১) খাদ্যের পরিমাণ, (২) খাদ্যের সময়, (৩) খাদ্যের শ্রেণী এবং (৪) পরহেযের স্তর। শেষোক্ত বিষয়টি আমরা হালাল ও হারাম অধ্যায়ে বর্ণনা করেছি। এখানে প্রথমোক্ত তিনটি বিষয় উল্লেখ করা হচ্ছে। প্রথম কথা, খাদ্যের পরিমাণ হ্রাস করতে হবে এবং এতে ধাপে ধাপে সাধনা করতে হবে, যাতে একটি অনুমানে পৌঁছা যায়। কারণ, অতিভোজনে অভ্যস্ত কোন ব্যক্তি যদি হঠাৎ খাদ্য হ্রাস করে দেয়, তবে কষ্টও বেশী হবে এবং দুর্বলতা হেতু সাধনা সহ্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে। সুতরাং অল্প অল্প করে খাদ্য হ্রাস করতে হবে। উদাহরণতঃ যদি কেউ দু'রুটি খায় এবং তা হ্রাস করে এক রুটিতে আনতে চায়, তবে পূর্ণ এক মাস সময়ের মধ্যে তা হ্রাস করা যায়। প্রথমে দু'রুটির পরিমাণ ওযন করবে। এর পর প্রত্যহ এক রুটির ওযনের ত্রিশ ভাগের এক ভাগ হ্রাস করবে। অথবা লোকমার গণনার মাধ্যমেও এটা করা যায়। এভাবে কোন ক্ষতি অথবা বিরূপ প্রভাবের আশংকা নেই। খাদ্যের পরিমাণের চারটি স্তর আছে। 


প্রথম স্থর, এতটুকু কম, যাতে জীবনটা কোন রকমে বেঁচে যায়। এটা সিদ্দীকগণের স্তর। সহল তস্তরী (রহঃ)ও একেই পছন্দ করেন । তিনি বলেন : আল্লাহ্ তাআলা জীবন, বুদ্ধি-বিবেচনা ও শক্তি- এই তিনটি বিষয় দ্বারা এবাদত করান। যদি বান্দা জীবন ও বুদ্ধি-বিবেচনা বিলুপ্ত হওয়ার আশংকা করে, তবে আহার করবে- রোযা রাখবে, মাঝে মাঝে রোযা ছাড়াও থাকবে। খাদ্য নিজের কাছে না থাকলে তালাশ করবে। আর যদি এ দু'টি বিলুপ্ত হওয়ার আশংকা না হয়- কেবল শক্তি বিনষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা হয়, তবে খাদ্যের কোন পরওয়া করবে না, যদিও দুর্বলতার কারণে বসে বসে নামায পড়তে হয়। এক্ষেত্রে বিশ্বাস করতে হবে যে, উপবাসের দুর্বলতার কারণে বসে নামায পড়া খাদ্যের শক্তি দ্বারা দাঁড়িয়ে নামায পড়ার তুলনায় উত্তম। কেউ তার খাদ্যের অবস্থা জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন : আমি সারা বছরে তিন দেরহামের খাদ্য খাই। এক দেরহামের বিনিময়ে আঙ্গুরের ঘন রস ক্রয় করি, এক দেরহাম দিয়ে চাউলের আটা এবং এক দেরহাম দিয়ে ঘি কিনে নেই। এর পর সবগুলো মিলিয়ে তিনশ' ষাটটি বড়ি তৈরি করে নেই। প্রতি রাতে এক বড়ি দিয়ে ইফতার করি। তবে আজকাল সময়ের কোন পরিমাণ নির্দিষ্ট নেই। জনৈক সংসারত্যাগী সম্পর্কে বর্ণিত আছে, তিনি আপন খাদ্য সাড়ে তিন মাশা পর্যন্ত পৌঁছিয়ে ছিলেন।


দ্বিতীয় স্তর হচ্ছে, দিনে-রাতে পাঁচ ছটাক পরিমাণে খাদ্য খাবে । সম্ভবত এটা অধিকাংশ লোকের এক-তৃতীয়াংশ পেটের সমান হবে, যা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। হযরত ওমর (রাঃ)-এর অভ্যাস তাই ছিল। তিনি সাত লোকমা অথবা নয় লোকমা খেতেন।


তৃতীয় স্তর হচ্ছে, সারা দিনে আড়াই পোয়া পরিমাণে আহার করবে। এটা পেটের এক-তৃতীয়াংশের বেশী এবং খুব সম্ভব দু-তৃতীয়াংশের সমান । এমতাবস্থায় এক-তৃতীয়াংশ পেট পানীয়ের জন্য থেকে যাবে।


চতুর্থ স্তর হচ্ছে, আরও বাড়িয়ে এক সের পর্যন্ত আহার করবে। এর বেশী খাওয়া অপব্যয়ের মধ্যে দাখিল এবং খোদায়ী আদেশের বিপরীত। এখানে বুঝা দরকার, অধিকাংশের দিকে লক্ষ্য করে উপরোক্ত স্তরসমূহ বর্ণিত হয়েছে। নতুবা খাদ্যের পরিমাণ ব্যক্তি, বয়স ও সংশ্লিষ্ট কাজকর্মের দিকে লক্ষ্য করে প্রত্যেকের জন্যে আলাদা ।


পঞ্চম স্তর হচ্ছে, সত্যিকার খাহেশ হলে আহার করবে এবং সত্যিকার খাহেশ বাকী থাকা অবস্থায় হাত গুটিয়ে নেবে; কিন্তু এক রুটি অথবা দু’রুটির পরিমাণ নির্দিষ্ট না করলে সত্যিকার খাহেশের শেষ সীমা প্রকাশ পাবে না। তবে সত্যিকার খাহেশের আলামত এই লিখিত আছে যে, যে কোন রুটি পেলে তা খেয়ে নেয়া। যদি নির্দিষ্ট রুটি মনে চায় কিংবা তরকারিও কামনা করে, তবে খাহেশ সত্যিকার হবে না ।

আরেকটি আলামত হচ্ছে, থুথু ফেললে তাতে মাছি বসবে না। অর্থাৎ থুথুর মধ্যে তৈলাক্ততা না থাকায় বুঝা যায়, পাকস্থলী শূন্য। সুতরাং সত্যিকার খাহেশের পরিচয় কঠিন। সুতরাং মুরীদের জন্যে এটাই উত্তম যে, খাদ্যের একটি পরিমাণ নির্দিষ্ট করে নেবে, যাতে যে এবাদত সে করে, তা সুন্দররূপে আনজাম দিতে পারে- তাতে দুর্বল না হয়ে পড়ে। এ সীমায় পৌঁছে যাওয়ার পর খাহেশ বাকী থাকলেও থেমে যাবে এবং পরিমাণ বাড়াবে না।


সারকথা, খাদ্যের বিশেষ পরিমাণ নির্ধারণ সম্ভবপর নয়। কেননা, অবস্থা ও ব্যক্তিভেদে প্রত্যেকের জন্যে আলাদা আলাদা সীমা রয়েছে। তবে সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে এক দলের অভ্যাস ছিল, তাঁরা সপ্তাহে এক ছা' গম আহার করতেন এবং খেজুর খেলে সপ্তাহে দেড় ছা' খেতেন। চার মুদে এক ছা' হয়। প্রতি মুদ আড়াই পোয়ার সমান। এভাবে এক দিনের খাদ্য হয় গম আধা মুদের কিছু বেশী। খেজুর বেশী হওয়ার কারণ এ থেকে বীচি বের হয়ে যায়। এ পরিমাণটি পেটের এক-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি। হযরত আবু যর গেফারী (রাঃ) রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর প্রকাশ্য-জীবদ্দশায় প্রতি সপ্তাহে তিন সের যব খেতেন । রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর ওফাতের পরও তাই আহার করতেন। তিনি বলতেন : আল্লাহর কসম, আমি সারা জীবন এই পরিমাণ বৃদ্ধি করব না । আমি প্রিয় হাবীব (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি  : “কেয়ামতের দিন সেই ব্যক্তি আমার অধিক নিকটে থাকবে, যে আমৃত্যু বর্তমান অবস্থার উপর কায়েম থাকবে”। তিনি কতক সাহাবীর উদ্দেশ্যে বলতেন : তোমরা রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর রীতিনীতি বদলে ফেলেছ। এখন যব শোধন করে খাও, চাপাতি রুটি তৈরী কর এবং দুধ, তরকারি ও নানা রকম খাদ্য খাও। পোশাক সকালে এক প্রকার ও বিকালে এক প্রকার পরিধান কর। এগুলো রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর আমলে কোথায় ছিল? সুফফাবাসীদের খাদ্য ছিল প্রত্যহ দু'জনের জন্যে তিন পোয়া খোরমা। এতে বীচিও রয়েছে, যা বাদ দেয়ার পর পরিমাণ খুব কম থেকে যেত।


দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, খাদ্যের সময় নির্দিষ্ট করা; অর্থাৎ একবার খাওয়ার পর কতক্ষণ পর পুনরায় খাবে। এতে তিনটি স্তর রয়েছে। প্রথম স্তর, তিন দিন অথবা আরও বেশী সময় খাবে না। কোন কোন সাধক এ ক্ষেত্রে এত সাধনা করেছেন যে, এই মেয়াদ ত্রিশ দিন, চল্লিশ দিন পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছেন। আলেমগণের মধ্যে অনেকের অবস্থা এরূপ। উদাহরণতঃ মুহাম্মদ ইবনে ওমর ওরফী, আবদুর রহমান ইবনে ইবরাহীম তায়মী, সোলায়মান খাওয়াস, সহল তস্তরী, ইবরাহীম ইবনে আহমদ খাওয়াস প্রমুখ। হযরত আবু বকর (রাঃ) ছয় দিন নির্দিষ্ট করতেন। সুফিয়ান সওরী ও ইবরাহীম ইবনে আদহাম তিন দিন নির্দিষ্ট করতেন । তাঁরা সকলেই উপদেশ দ্বারা আখেরাতে সাহায্য চাইতেন। জনৈক আলেম বলেন : যে ব্যক্তি আল্লাহর ওয়াস্তে চল্লিশ দিন কিছু না খায়, তার কাছে কতক খোদায়ী রহস্য উন্মোচিত হয়ে যায়। দ্বিতীয় স্তর হচ্ছে, দু' থেকে তিন দিন পর্যন্ত নির্দিষ্ট করা। এটা অভ্যাস বহির্ভূত নয়; বরং সম্ভবপর । সামান্য চেষ্টা সাধনা করলেই এই স্তর অর্জন করা যায় । তৃতীয় স্তর হচ্ছে, দিন ও রাতের মধ্যে একবার খাবে। এর বেশী হলে তা অপব্যয় হবে। সর্বদা তৃপ্ত অবস্থায় থাকা এবং ক্ষুধা অনুভব না করা বিলাসীদের কাজ, সুন্নত বিরোধী। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন : “রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) সকালে খেলে সন্ধ্যায় খেতেন না এবং সন্ধ্যায় খেলে সকালে খেতেন না”। বড় বড় বুযুর্গগণও এ নিয়ম পালন করতেন। তারা দিনে একবার খাদ্য গ্রহণ করতেন। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে সম্বোধন করে বলেন : “তুমি অপব্যয় থেকে বেঁচে থাক। প্রত্যহ দু'বার খাওয়া অপব্যয়ের মধ্যে দাখিল। প্রত্যেক দু'দিনে একবার খাওয়া মারাত্মক; কিন্তু প্রত্যহ একবার খাওয়া উভয়ের ঠিক মধ্যবর্তী স্তর। আল্লাহর কিতাবে এটা প্রশংসিত।”


অতএব, যে ব্যক্তি দিবারাত্রির মধ্যে একবার খেতে চায়, তার জন্যে তাহাজ্জুদের পর সোবহে সাদেকের পূর্বে অর্থাৎ সেহরীর সময়ে খাওয়া মোস্তাহাব। এতে দিনের বেলায় উপবাস করার কারণে রোযা হয়ে যাবে। এছাড়া রাতেও তাহাজ্জুদের জন্যে উঠা সহজ হবে।


তৃতীয় যে বিষয়টি নির্দিষ্ট করা দরকার, তা হচ্ছে খাদ্যের প্রসার। জানা দরকার, সর্বোত্তম খাদ্য হচ্ছে গমের আটা। এটা শোধিত অবস্থায় পাওয়া গেলে তা স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে দাখিল হয়ে যায়। মধ্যম খাদ্য হচ্ছে যবের শোধিত আটা এবং নিম্নস্তরের খাদ্য যবের অশোধিত আটা। উৎকৃষ্ট ব্যঞ্জন হচ্ছে গোশ্ত ও মিষ্টি, মধ্যম গোশতবিহীন শুরবা এবং নিম্নস্তরের হচ্ছে লবণ ও সিরকা। অধ্যাত্ম পথের পথিকদের অভ্যাস, তারা কখনও ব্যঞ্জন খান না; মনোলোভা সুস্বাদু খাদ্য থেকেও তারা বিরত থাকেন । কেননা, এতে নফসের আস্ফালন ও কঠোরতা বাড়ে এবং মনে দুনিয়ার আনন্দ ও বিলাস আসন পেতে নেয়। ইয়াহইয়া ইবনে মুয়ায বলেন : হে সাধকবৃন্দ! যদি জান্নাতের ওলীমা খেতে চাও, তবে দুনিয়াতে নফসকে যত বেশী সম্ভব অনাহারে রাখ। এখানে ক্ষুধা যত বেশী হবে, ততই সেখানকার খাদ্য খাওয়ার খাহেশ বৃদ্ধি পাবে। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন : “আমার উম্মতের মধ্যে অসৎ তারা, যারা ধনৈশ্বর্যের মধ্যে লালিত-পালিত এবং এর উপরই বড় হয়। তাদের সাহসিকতা কেবল নানা রকম খাদ্য এবং বিভিন্ন পোশাক-পরিচ্ছদ। তারা গলা ফাটিয়ে কথাবার্তা বলে”।


আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ)-কে এরশাদ করেন : স্মরণ রাখ, তোমাকে কবরে থাকতে হবে। সেখানে অনেক খাহেশ থেকে বঞ্চিত থাকবে। পূর্ববর্তী বুযুর্গগণ সুস্বাদু খাদ্যকে খুব ভয় করতেন এবং একে দুর্ভাগ্যের আলামত মনে করতেন। তাই হযরত ওমর (রাঃ) ঠাণ্ডা পানির শরবত পান করেননি এবং বলতেন : আমাকে এর হিসাবের সাথে জড়িত করো না। 

হযরত নাফে' (রঃ) বর্ণনা করেন, ইবনে ওমর (রাঃ) একবার অসুস্থ হয়ে টাটকা মাছ খাওয়ার বাসনা প্রকাশ করেন। মদীনায় অনেক খোঁজাখুঁজির পরও তা পাওয়া গেল না । কয়েকদিন পর যখন পাওয়া গেল, তখন দেড় দেরহাম দিয়ে কিনে এনে রান্না করা হয়। অতঃপর একটি রুটির উপর মাছটি রেখে হযরত ইবনে ওমরের সামনে পেশ করা হয়। ইতিমধ্যে জনৈক ভিক্ষুক দরজায় এসে হাঁক দিল। হযরত ইবনে ওমর খাদেমকে বললেন : মাছটি রুটিতে জড়িয়ে ভিক্ষুককে দিয়ে দাও। খাদেম আরজ করল : জনাব, অনেক দিন থেকে যখন মাছ খেতে আপনার মন চাইছিল, তখন পাওয়া যায়নি। এখন পাওয়ার পর দেড় দেরহাম দিয়ে কিনে আপনার জন্যে রান্না করেছি। আপনি বললে ভিক্ষুককে এর মূল্য দিয়ে দেই। তিনি বললেন : না, এ মাছটি রুটিতে জড়িয়ে তাকে দিয়ে দাও। অতঃপর খাদেম গিয়ে ভিক্ষুককে বলল : তুমি এটি এক দেরহামের বিনিময়ে বিক্রয় করবে? ভিক্ষুক সম্মতি দিলে খাদেম এক দেরহাম তাকে দিয়ে মাছটি আবার তাঁর সামনে হাযির করল এবং বলল : এ মাছটি এক দেরহাম দিয়ে কিনে এনেছি। তিনি বললেন : ভিক্ষুকের কাছ থেকে দেরহাম ফেরত না নিয়ে মাছটি রুটিসহ তাকে দিয়ে এস। আমি রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি : যে ব্যক্তির কোন খাহেশ হয়, অতঃপর তাকে বাধা দেয় এবং ত্যাগ স্বীকার করে অন্যকে সমর্পণ করে, আল্লাহ্ তা'আলা তাকে ক্ষমা করবেন।


হযরত ওমর (রাঃ) একবার সংবাদ পান যে, ইয়াযীদ ইবনে আবু সুফিয়ান নানা রকম খাদ্য আহার করেন। সেমতে তিনি ইয়াযীদের খাদেমকে বললেন : তার রাতের খাদ্য প্রস্তুত হয়ে গেলে আমাকে সংবাদ দিও। খাদেম তাই করল। হযরত ওমর (রাঃ) ইয়াযীদের গৃহে চলে গেলেন। যখন খাদ্য এল, তখন প্রথমে “ছরীদ” (গোশতের শুরুয়া) আনা হল। হযতর ওমরও তার সাথে আহার করলেন। এরপর ভাজা করা গোশত আনা হলে ইয়াযীদ হাত বাড়ালেন; কিন্তু হযরত ওমর (রাঃ) হাত গুটিয়ে নিলেন এবং বললেন : হে ইয়াযীদ ইবনে আবু সুফিয়ান! তোমার এখানে এক খাদ্যের পর আরেক খাদ্য হয় নাকি? আল্লাহর কসম, যদি তুমি পূর্ববর্তীদের সুন্নত ছেড়ে দাও, তবে তাদের গোটা তরীকা থেকে তুমি আলাদা হয়ে যাবে। ইয়াসার ইবনে ওমায়র (রঃ) বলেন : আমি কোন দিন হযরত ওমরের জন্যে আটা শোধন করিনি। কখনও করে থাকলে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে করেছি। ওতবা (রাঃ) আটাগুলো রৌদ্রে রেখে দিতেন। শুকিয়ে গেলে খেয়ে নিতেন এবং বলতেন : একখন্ড রুটি ও নিমক খেয়ে থাকা উচিত, যাতে আখেরাতে ভাজা করা গোশত ও উৎকৃষ্ট খাদ্য পাওয়া যায়। তিনি একটি মাটির কলসী থেকে পানি পান করতেন, যা সারাদিন রৌদ্রে পড়ে থাকত। তাঁর বাঁদী বলত : আটা দিয়ে দিলে আমি রুটি তৈরী করে এবং পানি ঠাণ্ডা করে দেব। ওতবা জওয়াবে বলতেন : ক্ষুধার কুকুরকে দমন করা উদ্দেশ্য। সে এভাবেও দমিত হয়ে যায়।


শাকীক ইবনে ইবরাহীম বলেন : একদিন আমি যখন মক্কায় রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর জন্মস্থানের নিকটে অবস্থিত আলইয়াল বাজার দিয়ে গমন করছিলাম, তখন ইবরাহীম ইবনে আদহামকে রাস্তার ধারে বসে ক্রন্দন করতে দেখলাম। আমিও পথ ছেড়ে তাঁর কাছে গিয়ে বসলাম, এবং ক্রন্দনের কারণ জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন : ভাল আছি, যাও। অবশেষে আমি দ্বিতীয় ও তৃতীয় বার জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন : কারও কাছে না বললে বলতে পারি। আমি বললাম : ঠিক আছে, বলব না, আপনি বলুন। তিনি বললেন : তিরিশ বছর ধরে আমার মনে “হারীরা” খাওয়ার সাধ ছিল। কিন্তু আমি সর্বপ্রযত্নে মনকে তা থেকে বিরত রেখেছি। গতকাল রাতে যখন আমি বসে বসে ঝিমুচ্ছিলাম, তখন সবুজ পেয়ালা হাতে এক ব্যক্তি আগমন করল। পেয়ালা থেকে হারীরার সুগন্ধি বের হয়ে এল। আমি সাহস করে নফসকে বাধা দিলাম। লোকটি পেয়ালা আমার নিকটে রেখে বলল : ইবরাহীম, খাও। আমি বললাম : আমি আল্লাহর ওয়াস্তে এটা ছেড়ে দিয়েছি। খাব না। সে বলল : যদি আল্লাহ তাআলাই খাওয়ান, তবে খাওয়া উচিত। আমি এর কোন জওয়াব দিতে পারলাম না এবং কাঁদতে লাগলাম। লোকটি আবার বলল : নাও, খাও। আমি বললাম : খানা কোত্থেকে এল, এ কথা না জানা পর্যন্ত খেতে আমাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে। সে বলল : খাও, এটা তোমার জন্যে প্রদত্ত হয়েছে। আমাকে আদেশ করা হয়েছে, হে ইসফের, এ পেয়ালাটি নিয়ে যাও এবং ইবরাহীমের নফসকে খাইয়ে দাও। সে অনেক দিন ধরে নফসকে বাধা দিয়ে যাচ্ছে। এখন আল্লাহ্ তার প্রতি রহম করেছেন। হে ইবরাহীম, স্মরণ রাখ, আমি ফেরেশতাদের মুখে শুনেছি, যে ব্যক্তি দান গ্রহণ করে না, সে পরে তা তালাশ করেও পায় না। আমি বললাম : যদি তাই হয়, তবে আমি তোমার সম্মুখে আছি। এর সমাধান আল্লাহ তাআলাই দেবেন। এরপর আর এক ব্যক্তি দৃষ্টিগোচর হল । সে প্রথম ব্যক্তিকে কিছু দিয়ে বলল : তুমিই আপন হাতে খাইয়ে দাও। সেমতে সে আমার মুখে লোকমা দিতে শুরু করল। শেষ পর্যন্ত আমি ঘুমিয়ে পড়লাম । জাগ্রত হয়ে আমি মুখে হারীরার স্বাদ অনুভব করলাম।


শাকীক বলেন : ইবরাহীম এ কথা শেষ করতেই আমি বললাম : আপনার হাতটি দেখান তো। আমি তাঁর হাত ধরে চুম্বন করলাম এবং বললাম : হে আল্লাহ্! যাঁরা আপন খাহেশকে পূর্ণরূপে দাবিয়ে রাখে, তুমি তাদের সাধ পূর্ণ করে দাও। তুমিই অন্তরে বিশ্বাস দান কর এবং অন্তরকে প্রশান্ত রাখ । অধম বান্দা শাকীকের প্রতিও কৃপাদৃষ্টি দাও। এরপর শাকীক হযরত ইবরাহীম ইবনে আদহামের হাত আকাশের দিকে উত্তোলন করে বললেন : ইলাহী, এই হাত ও এই হাতের মালিকের বরকতে এবং ইবরাহীমকে প্রদত্ত অনুগ্রহের বরকতে এই মিসকীন বান্দার প্রতি অনুগ্রহ কর। সে তোমারই কৃপা, অনুগ্রহ ও রহমতের মুখাপেক্ষী, যদিও এর যোগ্য নয়। এরপর তিনি সেখান থেকে রওয়ানা হয়ে হরম শরীফে প্রবেশ করলেন।


কথিত আছে, মালেক ইবনে দীনার (রঃ) চল্লিশ বছর পর্যন্ত অন্তরে দুধের স্পৃহা নিয়েও দুধ পান করেননি। একদিন তাঁর কাছে খোরমা হাদিয়াস্বরূপ এলে লোকেরা তা খাওয়ার জন্যে তাঁকে পীড়াপীড়ি করল । তিনি বললেন : তোমরাই খেয়ে নাও। আমি চল্লিশ বছর এর স্বাদ গ্রহণ করিনি। তিনি বলেন : আমি পঞ্চাশ বছর ধরে দুনিয়া ত্যাগ করেছি। আমার অন্তর চল্লিশ বছর ধরে দুধ পান করার সাধ পোষণ করে আসছে। কিন্তু আল্লাহর কসম, আমি সারা জীবন তা পান করব না। ক্রীতদাস ওতবা বলেন : সাত বছর পর্যন্ত আমার মন গোশত খাওয়ার খাহেশ করতে থাকে। অবশেষে আমি এই ভেবে লজ্জাবোধ করলাম যে, মনের খাহেশ আর কত মুলতবী রাখব। সাত বছর তো হয়ে গেছে। অতঃপর একদিন একখন্ড গোত নিয়ে ভাজা করলাম এবং তা রুটিতে জড়িয়ে নিলাম। মুখে দেয়ার আগে একটি বালককে দেখে জিজ্ঞেস করলাম : তুমি কি অমুকের পুত্র নও, যে মারা গেছে? সে বলল : হাঁ। অতঃপর আমি গোশ্ত জড়ানো রুটিটি তাকে দিয়ে দিলাম । বর্ণিত আছে, বালকের হাতে রুটি সঁপে দিয়ে তিনি কেঁদে কেঁদে এই আয়াত পাঠ করতে থাকেন- “তারা খাদ্যের মহব্বত সত্ত্বেও মিসকীন, পিতৃহীন এতীম ও বন্দীকে খাদ্য খাওয়ায়”। এরপর তিনি কখনও গোশ্ত খাননি ।

জাফর ইবনে নসর বলেন : হযরত জুনায়েদ আমাকে কিছু আঞ্জীর ফল কিনে আনতে বললেন। আমি কিনে আনলে তিনি ইফতারের সময় তা মুখে দিলেন এবং সাথে সাথে ফেলে দিলেন। আমি এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন : অন্তরের কানে গায়েব থেকে আওয়াজ এসেছে, তুমি আমার খাতিরে এটি ছেড়ে দিয়েছিলে । আবার খাবে?


সালেহ্ বলেন : আমি আতা সলমীর খেদমতে আরজ করলাম : আমি আপনার জন্যে একটি বস্তু প্রেরণ করতে চাই। কিন্তু শর্ত হচ্ছে, আপনি ফেরত দিতে পারবেন না। তিনি বললেন : ভাল কথা। আমি আমার পুত্রের হাতে ঘি ও মধুর সাথে ছাতু মিশ্রিত করে পাঠিয়ে দিলাম এবং বলে দিলাম. যতক্ষণ তিনি না খান, সেখানেই থাকবে। তিনি খেলেন। এর পরের দিন আমি আবার প্রেরণ করলাম। কিন্তু তিনি না খেয়ে ফেরত পাঠিয়ে দিলেন। সেমতে আমি রাগতস্বরে তাঁকে বললাম : সোবহানাল্লাহ! আপনি আমার হাদিয়া ফেরত দিয়েছেন। তিনি আমাকে রাগ করতে দেখে বললেন : রাগের কোন কথা নেই। একবার তো আমি তোমার আবদার রেখেছি। দ্বিতীয় বার যখন তুমি প্রেরণ করলে তখন আমি অনেক খেতে চেয়েছি, কিন্তু সম্ভব হয়নি। যখনই আমি খাওয়ার ইচ্ছা করতাম তখনই এ আয়াত মনে পড়ে যেত-“চুমুক দেয় এবং গলাধঃকরণ করতে পারে না। সালেহ্ বলেন : আমি কেঁদে কেঁদে বললাম : হায়! আমি এক জায়গায় এবং আপনি অন্য জায়গায় আছেন । .


জনৈক আবেদ তাঁর এক আপনজনকে দাওয়াত করে এনে কয়েকটি রুটি সামনে রেখে দিলেন। লোকটি রুটিগুলো ওলট-পালট করে খাওয়ার জন্যে ভাল রুটি বেছে নিতে লাগল। আবেদ বললেন : এ কি করছ? তুমি জান না, যে রুটিটি তুমি বাদ দিয়েছ, সেটি কতজন কারিগরের হাত হয়ে তোমার কাছে এসেছে। প্রথমে মেঘমালা থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে। বৃষ্টি দ্বারা মৃত্তিকা ও চতুষ্পদ জন্তু সতেজ হয়েছে। অনেক মানুষে কাজ করেছে। এরপর এ রুটি তোমার কাছে এসেছে। এখন তুমি ওলট-পালট করছ এবং খাওয়ায় আগ্রহ দেখাচ্ছ না। হাদীসে বলা হয়েছে :

“রুটি গোলাকার হয়ে তোমার সামনে আসে না যে পর্যন্ত তাতে তিন'শ ষাট জন কারিগর কাজ না করে। প্রথম কারিগর হচ্ছে মীকাঈল (আঃ), যে পানিকে রহমতের ভাণ্ডার থেকে মেপে দেয়। এরপর সেই সকল ফেরেশতা, যারা মেঘমালা হাঁকিয়ে নিয়ে যায়। এরপর রয়েছে সূর্য, চন্দ্র এবং আকাশের ফেরেশতাকুল। সর্বশেষ কারিগর হচ্ছে রুটি প্রস্তুতকারী। যদি তুমি আল্লাহ্’র নেয়ামতসমূহ গণনা কর, তবে শেষ করতে পারবে না।


জনৈক বুযুর্গ বলেন : আমি কাসেম জাওরীর কাছে যেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, বৈরাগ্য কি? তিনি বললেন : তুমি এ সম্পর্কে কি শুনেছ? আমি কয়েকটি উক্তি উদ্ধৃত করলে তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। আমি বললাম : এ সম্পর্কে আপনার উক্তি কি? তিনি বললেন : উদর হচ্ছে মানুষের দুনিয়া। একে যতটুকু নিয়ন্ত্রণ করবে ততটুকু বৈরাগ্য অর্জিত হবে এবং যে পরিমাণ একে বাধা না দেবে, সেই পরিমাণ তুমি দুনিয়ার করায়ত্ত হয়ে যাবে।


এসব গল্প থেকে জানা গেল, আমাদের বর্ণিত উপকারিতাসমূহ অর্জনের উদ্দেশেই বুযুর্গগণ খাহেশ থেকে বিরত রয়েছেন এবং উদরপূর্তি করে আহার বর্জন করেছেন। মাঝে মাঝে এর কারণ এটাও ছিল যে, তাঁরা খাদ্যদাতার রুযী হালাল ও স্বচ্ছ মনে করতেন না। জানা উচিত, মন যা চায় তাই প্রয়োজনের অন্তর্ভুক্ত নয়। আবু সোলায়মান দারানী বলেন : লবণও খাহেশ বা কামনার বস্তু। কারণ, এটা রুটির অতিরিক্ত। রুটির অতিরিক্ত সবকিছুই বাড়তি এবং খাহেশের মধ্যে দাখিল। এটা চূড়ান্ত নীতি। কেউ এতে সক্ষম না হলে তার উচিত কমপক্ষে আপন নফস সম্পর্কে গাফেল এবং খাহেশের মধ্যে নিমজ্জিত না হওয়া। যা মনে চায়, তাই খাওয়া এবং যা খুশী তাই করা অপব্যয়ের জন্যে যথেষ্ট। তাই বিরতিহীনভাবে গোশত ভক্ষণ ত্যাগ করা উচিত। হযরত আলী (রাঃ) বলেন : যে ব্যক্তি চল্লিশ দিন পর্যন্ত গোশত বর্জন করে, সে বদস্বভাব হয় এবং যে চল্লিশ দিন অবিরত গোশত খায়, সে কঠোর প্রাণ হয়ে যায়। সার কথা, নফসকে বৈধ খাদ্যসামগ্রীর খাহেশের মধ্যেও ফেলা উচিত নয়। যদি কেউ দুনিয়াতে সকল খাহেশ পূর্ণ করে নেয়, তবে কেয়ামতে তাকে বলা হবে,  এজীবনেই তোমরা তোমাদের মজা নিঃশেষ করে দিয়েছে এবং ভোগ করে নিয়েছ। (এখন কি চাও? ) পার্থিব দুনিয়াতে নফসের বিরুদ্ধে জেহাদ করে যে পরিমাণ খাহেশ বর্জন করা হবে, আখেরাতে সেই পরিমাণ লোভনীয় সামগ্রী পাওয়া যাবে। বসরার জনৈক বুযুর্গ বিশ বছর পর্যন্ত চাউলের রুটি ও মাছ খাওয়ার সাধ পোষণ করতে থাকেন; কিন্তু নফসের উপর মোজাহাদা করে নিজেকে তা থেকে বিরত রাখেন । ওফাতের পর কেউ তাঁকে স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞেস করল : আল্লাহ তাআলা আপনার সাথে কিরূপ ব্যবহার করেছেন? তিনি বললেন : যেসকল নেয়ামত প্রাপ্ত হয়েছি, সেগুলো বর্ণনা করার ক্ষমতা আমার নেই। সর্বপ্রথম আমাকে যা দেয়া হয়েছে, তা ছিল চাউলের রুটি ও মাছ। আমাকে বলা হয়েছে- আজ যে পরিমাণ ইচ্ছা বেহিসাব খেয়ে নাও। আল্লাহ স্বয়ং বলেন : “স্বচ্ছন্দে খাও ও পান কর, বিগত দিনে যা পাঠিয়েছিলে তার কারণে”।


এ কারণেই আবু সালমান (রহঃ) বলেন : একটি খাহেশ ত্যাগ করা এক বছর রোযা রাখা ও রাত্রি জাগরণ অপেক্ষা অধিক উপকারী। আল্লাহ আমাদেরকেও মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর ওসিলায় স্বীয় সন্তুষ্টির তওফীক দান করুন।


পরবর্চী পর্ব

(৫) ক্ষুধা ও তার ফযীলতে মিতাচার-

ক্ষুধার উপকারিতা ও তৃপ্তির বিপদাপদ


 উদর ও লজ্জাস্থানের খাহেশের প্রতিকার (পর্ব– ৩)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন  ✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

ক্ষুধার উপকারিতা ও তৃপ্তির বিপদাপদ
এক্ষণে প্রশ্ন হয়, ক্ষুধার এত ফযীলত কোত্থেকে এল এবং এর কারণ কি ? ক্ষুধা দ্বারা কেবল পাকস্থলী দুঃখ ও কষ্টই ভোগ করে। যদি কষ্টের মধ্যেই ফযীলত নিহিত থাকে, তবে যারা আত্মহত্যা করে অথবা আপন দেহের মাংস কাটে অথবা এমনি ধরনের কোন কান্ড করে, তাদের অধিক সওয়াব হওয়া উচিত। এর জওয়াব হচ্ছে, এটা এমন, যেমন কেউ ওষুধ সেবন করে সুস্থ হওয়ার পর মনে করতে থাকে যে, ওষুধের মধ্যে যে তিক্ততা ছিল, তাতেই আমি সুস্থ হয়েছি। এর পর আরও অধিক তিক্ত ওষুধ খেতে শুরু করে। অথচ এটা ভ্রান্তি ছাড়া কিছু নয়। ওষুধের উপকারিতা তিক্ততার কারণে নয়। বরং ওষুধের মধ্যে একটি বৈশিষ্ট্য আছে, যা চিকিৎসকরা জানে। এমনিভাবে ক্ষুধার মধ্যে যেসব উপকারিতা রয়েছে, সেগুলো আলেমগণ জানেন। যে কেউ এর উপকারিতা বিশ্বাস করে নিজের জন্যে অবলম্বন করবে, সে নিঃসন্দেহে উপকৃত হবে, যদিও উপকারের কারণ তার মজানা থাকে। যেমন ঔষধ সেবনকারী কারণ না জানলেও ওষুধের উপকার পায়। কিন্তু যারা আপন জ্ঞানভান্ডার সমৃদ্ধ করতে চায়, তাদের জন্য নিম্নে আমরা ক্ষুধার দশটি উপকারিতা লিখে দিচ্ছি।


প্রথম উপকারিতা, ক্ষুধা দ্বারা অন্তরের পরিচ্ছন্নতা, স্বভাবের তীক্ষ্ণতা এবং অন্তর্দৃষ্টির পূর্ণতা অর্জিত হয়। এর বিপরীতে তৃপ্তি স্থূলবুদ্ধিতা জন্ম দেয়, মেধা বিনষ্ট করে এবং মস্তিষ্কে নেশার মত পৌঁছে চিন্তা-ভাবনার জায়গাকে ঘিরে ফেলে। ফলে অন্তর ভারী হয়ে চিন্তার দিকে ধাবিত হয় না এবং দ্রুত অনুভব করতে পারে না। শিশুরা বেশী খেলে তাদের স্মরণশক্তিতে ত্রুটি দেখা দেয়। হযরত আবু সোলায়মান (রহঃ) বলেন : ক্ষুধা অবলম্বন করা উচিত। এতে নফস লাঞ্ছিত এবং অন্তর সূক্ষ্ম হয়ে আসমানী জ্ঞান লাভের যোগ্য হয়। রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন : তোমাদের অন্তরকে কম হাসি ও কম তৃপ্তি দ্বারা পুনরুজ্জীবিত কর এবং পবিত্র কর ক্ষুধা দ্বারা। এতে তোমাদের অন্তর সাফ ও নরম হবে।”


হযরত ইবনে আব্বাসের রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন : যে পেট ভরে আহার করে ও নিদ্রা যায়, তার অন্তর কঠোর হয়ে যায়। অন্য এক রেওয়ায়েতে তিনি বলেন, প্রত্যেক বস্তুর যাকাত আছে। দেহের যাকাত ক্ষুধা।


হযরত শিবলী (রহঃ) বলেন : যখনই আমি আল্লাহর ওয়াস্তে ক্ষুধার্ত থেকেছি, তখনই অন্তরে প্রজ্ঞা ও শিক্ষার একটি দরজা খোলা পেয়েছি, যা পূর্বে পাইনি।


হযরত আবু ইয়াযীদ বোস্তামী (রহঃ) বলেন : ক্ষুধা একটি মেঘ । এর কারণে বান্দার অন্তরে হেকমতের বৃষ্টি বর্ষিত হয়। রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন : প্রজ্ঞার নূর হচ্ছে ক্ষুধা, আল্লাহ থেকে দূরত্ব হচ্ছে পেট ভরে খাওয়া এবং আল্লাহর নৈকট্য হচ্ছে মিসকীনদের ভালবাসা ও তাদের কাছে থাকা। তোমরা পেট ভরে খেয়ো না। খেলে অন্তর থেকে প্রজ্ঞার নূর নিভে যাবে। যে ব্যক্তি রাত্রি বেলায় সামান্য আহার করে নামায পড়ে, তার আশেপাশে সকাল পর্যন্ত বেহেশতের হুর থাকে।


দ্বিতীয় উপকারিতা হচ্ছে, অন্তরের নম্রতা, যা দ্বারা অন্তরের যিকিরের ত্রুটি অনুভব করা যায়। প্রায়ই এমন হয় যে, অন্তরের উপস্থিতিসহ মুখে যিকির চালু থাকে; কিন্তু অন্তর তাতে প্রভাবিত হয় না। অন্তর ও প্রভাবের মধ্যে যেন আন্তরিক কঠোরতা আড়াল হয়ে যায়। আবার কোন সময় অন্তরে যিকিরের খুব প্রভাব পড়ে এবং মোনাজাতে আনন্দ পাওয়া যায়। এর বাহ্যিক কারণ পাকস্থলী খালি হওয়া। আবু সোলায়মান দারানী (রহঃ) বলেন : আমি এবাদতে তখনই অধিক মিষ্টতা পাই, যখন আমার পিঠ পেটের সাথে লেগে থাকে। তিনি আরও বলেন : অন্তর যখন ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্ত থাকে, তখন পরিষ্কার ও পাতলা থাকে। পক্ষান্তরে যখন পেট ভর্তি থাকে, অন্ধ ও স্থূল হয়ে যায়।


তৃতীয় উপকারিতা হচ্ছে, বিনয় ও বশ্যতা অর্জিত হওয়া এবং দর্প ও অহংকার দূর হওয়া। ক্ষুধা দ্বারা নফস যতটুকু নম্র ও লাঞ্ছিত হয়, অন্য কোন কিছু দ্বারা ততটুকু হয় না। ক্ষুধার অবস্থায় নফস দুর্বল হয়ে যখন এক খন্ড রুটি ও এক চুমুক পানি পায় না, তখন মালিকের আনুগত্য করে ও অক্ষম হয়ে থাকে। নিজেকে অক্ষম অপারগ মনে করা এবং আল্লাহ ত’আলাকে পরাক্রমশালী মনে করার মধ্যেই মানুষের সৌভাগ্য নিহিত। তাই সর্বক্ষণ ক্ষুধার্ত হয়ে আল্লাহ তা'আলার দিকে প্রত্যাশী থাকা নেহায়েত জরুরী। এ কারণেই যখন দুনিয়া ও তার সমস্ত ভান্ডার রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর সামনে পেশ করা হয়েছিল, তখন তিনি মুখ ফিরিয়ে নেন এবং বলেন-

“না, বরং আমি একদিন ক্ষুধার্ত থাকব ও একদিন তৃপ্তি সহকারে খাব। যখন ভুখা থাকব, তখন সবর করব ও আনুগত্য করব। আর যখন পেট ভরে খাব, তখন শোকর করব”।


চতুর্থ উপকারিতা হচ্ছে, খোদায়ী আযাব ও বিপদগ্রস্তদের কষ্ট বিস্মৃত না হওয়া। কেননা, যারা পেট ভরে খায়, তারা ক্ষুধার্ত ও ক্ষুধা উভয়টি ভুলে যায়। হুশিয়ার ব্যক্তি কোন বিপদ দেখেই আখেরাতের বিপদ স্মরণ করে। সে পিপাসা দেখে কেয়ামতের মাঠে পরকালে পিপাসা স্মরণ করে এবং ক্ষুধা দেখে দোযখীদের ক্ষুধা স্মরণ করে। দোযখীরা ভুখা অবস্থায় কন্টকযুক্ত বৃক্ষ খাদ্য হিসেবে পাবে এবং পিপাসার সময় পুঁজ পাবে। যে ব্যক্তি কখনও ক্ষুধা ও পিপাসার কষ্ট না করে, সে আখেরাতের আযাব ভুলে যায়। 

হযরত ইউসুফ (আঃ)-কে লোকেরা জিজ্ঞেস করল : আপনি ভুখা থাকেন কেন, আসমান ও যমীনের ধন-ভান্ডার তো আপনার করায়ত্ত? তিনি বললেন : আমি আশংকা করি, পেট ভরে আহার করলে ভুখাদেরকে ভুলে যাব। এ থেকে বুঝা গেল, ভুখা ও অভাবগ্রস্তদেরকে স্মরণ করাও ক্ষুধার অন্যতম উপকারিতা। কারণ, ক্ষুধা থেকে দয়া, অন্নদান ও মানুষের প্রতি অনুকম্পা জন্ম লাভ করে।


পঞ্চম উপকারিতা হচ্ছে, খাহেশ চূর্ণ করা এবং “নফসে আম্মারা” তথা কুকর্মের আদেশদাতা নফসের বিরুদ্ধে জয়লাভ করা। এ উপকারিতাটি সর্ববৃহৎ। বলা বাহুল্য, সকল গোনাহের মূল কারণ হচ্ছে খাহেশ ও শক্তি, যার উপাদান খাদ্য ও আহার্য। খাদ্য হ্রাস করলে যাবতীয় খাহেশ ও শক্তি দুর্বল এবং নিস্তেজ হয়ে পড়ে। মানুষের সৌভাগ্য সবটুকুই নফসকে কাবু করে রাখার মধ্যে এবং দুর্ভাগ্য সবটুকুই নফসের কাবুতে চলে যাওয়ার মধ্যে নিহিত। সেমতে অবাধ্য ঘোড়া যেমন দানাপানি না দিলে কাবুতে থাকে, তেমনি নফসকে ভুখা রাখলে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। 

জনৈক বুযুর্গকে লোকেরা বলল : আপনি তো দুর্বল হয়ে পড়েছেন। এখন নফসের খেদমত করেন না কেন? তিনি বললেন : নফস দ্রুত আস্ফালন করতে থাকে এবং খুব দুষ্টামি করে। সে অবাধ্য হয়ে কোথাও আমাকে বিপদে না ফেলে দেয়, তাই তার খেদমত করি না। কোন গোনাহ করার চেয়ে নফসের সাথে কঠোরতা করাকেই আমি উত্তম মনে করি। 

হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন : রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর পরে সর্বপ্রথম যে বেদআতটি মাথাচাড়া দিয়ে উঠে, তা ছিল, মানুষ তৃপ্ত হয়ে আহার করতে শুরু করল। পেট ভরে খেলে অবশ্যই তাদের নফস দুনিয়ার দিকে জোর দেখাবে। জনৈক বুযুর্গ বলেন : ক্ষুধা আল্লাহ্ তা'আলার একটি ভাণ্ডার। এর সামান্যতম কাজ হচ্ছে লজ্জাস্থানের খাহেশ ও কথা বলার খাহেশ বিলোপ করা। কারণ, ভুখার মন বেশী কথা বলতে চায় না। ফলে সে মুখের আপদ তথা গীবত, অশ্লীলতা, মিথ্যাকথন ইত্যাদি থেকে নিরাপদ থাকে। 

যিনার ক্ষতি কারও কাছে গোপন নয়; কিন্তু ক্ষুধা দ্বারা মানুষ এর অনিষ্ট থেকেও নিরাপদ থাকে। পেট ভরে আহার করলে এই খাহেশ জোরদার হয়। আল্লাহর ভয়ে এ থেকে বিরত থাকলেও দৃষ্টিকে ফেরানো যায় না। এটাও যিনার মধ্যে দাখিল। 

জনৈক দার্শনিক বলেন : যে মুরীদ পানাহারের শাসনে সবর করে, এক বছরকাল আধা পেট রুটি খায় এবং তাতে কোন দিলপছন্দ বস্তু মিশ্রিত না করে,আল্লাহ তা'আলা তার মন থেকে নারীর চিন্তা দূর করে দেন।


ষষ্ঠ উপকারিতা হচ্ছে, নিদ্রা দূর হওয়া এবং অধিক সময় জাগ্রত থাকা। কেননা, যে পেট ভরে খায়, সে অনেক পানি পান করে। অধিক পানি পান করার কারণে নিদ্রা বেশী আসে। কোন কোন বুযুর্গ এ কারণেই আহারের সময় মুরীদকে বলতেন : বেশী আহার করো না। বেশী আহার করলে পানি বেশী পান করবে এবং নিদ্রা বেশী হবে।


সপ্তম উপকারিতা হচ্ছে, ক্ষুধা দ্বারা এবাদত অব্যাহত রাখা সহজ হয়। কেননা, স্বয়ং আহার করা অধিক এবাদতের পথে এ কারণে বাধা যে, এর জন্যে সময় ব্যয় করা প্রয়োজন। আটা ইত্যাদি ক্রয় করা ও রুটি তৈরী করার মধ্যেও বেশ সময় লেগে যায়। এ সময়কে যিকির, মোনাজাত ইত্যাদিতে ব্যয় করলে উপকার বেশী হত। হযরত সিররী (রহঃ) বলেন : আমি জুরজানীর কাছে ছাতু দেখে জিজ্ঞেস করলাম : আপনার ছাতু খাওয়া ও রুটি না খাওয়ার কারণ কি? তিনি বললেন, হিসাব করে দেখেছি, রুটি তৈরী করতে যে অতিরিক্ত সময় লাগবে তাতে সত্তর বার সোবহানাল্লাহ বলা যায়। তাই চল্লিশ বছর ধরে আমি রুটি খাওয়া ত্যাগ করেছি। চিন্তার বিষয়, তিনি সময় নষ্ট হওয়ার কথা কোথায় চিন্তা করেছেন এবং সময় নষ্ট হতে দেননি। এমনিভাবে মানুষের প্রত্যেকটি শ্বাস একটি অমূল্য সম্পদ। এর দ্বারা আখেরাতের অক্ষয় ভাণ্ডার অর্জন করা উচিত। এটা সময়কে আল্লাহর যিকর ও আনুগত্যে ব্যয় করার মাধ্যমে হয়। এছাড়া অধিক খাদ্য গ্রহণ করলে সব সময় পাকসাফ থাকা যায় না এবং মসজিদে অবস্থান করা যায় না। কেননা, বার বার পেশাব করার জন্যে যেতে হয়।


অষ্টম উপকারিতা হচ্ছে, দৈহিক সুস্থতা ও রোগব্যাধি প্রতিরোধ করা। কেননা, রোগব্যাধির কারণ হচ্ছে, অধিক ভোজন, যে কারণে অকর্মণ্য পিত্তাদি পাকস্থলী ও শিরায় একত্রিত থাকে। এর পর রোগী এবাদত করতে সক্ষম হয়না। মন সর্বদা উদ্বিগ্ন থাকে এবং জীবন তিক্ত হয়ে যায়। 


বর্ণিত আছে, খলীফা হারুনুর রশীদ একবার ভারত, রোম, ইরাক ও আবিসিনিয়া— এই চার দেশ থেকে চার জন খ্যাতনামা চিকিৎসককে একত্রিত করে জিজ্ঞেস করলেন : আপনারা এমন ওষুধের কথা বলুন যদ্দ্বারা কোন রোগ হয় না। 

ভারতীয় চিকিৎসক বলল : আমার মতে এরূপ ওষুধ হচ্ছে কাল হরীতকী। 

ইরাকী চিকিৎসক বলল : আমার মতে এটা হচ্ছে তেরাতীয়ক। 

রোমীয় চিকিৎসক গরম পানির কথা বলল। 

তাদের মধ্যে সর্বাধিক বিজ্ঞ ছিল আবিসিনীয় চিকিৎসক। সে বলল : হরীতকী খেলে পাকস্থলী সংকীর্ণ হয়ে যায়। এটাও একটা রোগ। তেরাতীযকের ফলে পাকস্থলী নরম হয়। এটা আলাদা ব্যাধি। গরম পানিতে পাকস্থলী দুর্বল হয়ে পড়ে, যা রোগ ছাড়া কিছু নয়। 

খলীফা জিজ্ঞেস করলেন : তা হলে আপনার মতে এরূপ ওষুধ কোনটি? সে জওয়াবে বলল : আমার মতে যে ব্যবস্থার ফলে রোগ হয় না, তা হচ্ছে, আহার তখন করবে, যখন খাহেশ হয় এবং খতম তখন করবে, যখন খাহেশ বাকী থাকে। সকলেই তার কথা মেনে নিল।


জনৈক আহলে কিতাব আলেমের সামনে এ হাদীসটি বর্ণনা করা হয়  -“পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাদ্যের জন্যে, এক-তৃতীয়াংশ পানীয়ের জন্যে এবং এক-তৃতীয়াংশ শ্বাসের জন্যে।


আলেম আশ্চর্যান্বিত হয়ে বললেন : স্বল্পভোজন সম্পর্কে এর চেয়ে অধিক মযবুত উক্তি আমি আর শুনিনি। এ উক্তি নিশ্চয়ই কোন দার্শনিকের মনে হয়। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন : “উদরপূর্তি মূল রোগ, পরহেয করা মূল ওষুধ। দেহ যে যে বিষয়ে অভ্যস্ত হয়, তারই অভ্যাস গড়ে তোল।”

আমাদের মতে এ হাদীসটি চিকিৎসকের নিকট অধিক আশ্চর্য মনে হওয়ার যোগ্য।


নবম উপকারিতা হচ্ছে, ব্যয় কম হওয়া। কেননা, যে অল্প ভোজন করবে, তার জন্যে অল্প সামগ্রী যথেষ্ট হবে। মুমিন ব্যক্তির কর্তব্য খরচ কম করা। জনৈক আলেম বলেন : আমি আমার অধিকাংশ প্রয়োজন এভাবে পূর্ণ করি যে, সেগুলো বাদ দিয়ে দেই। এতে অন্তর খুবই স্বস্তি পায়। 

হযরত ইবরাহীম ইবনে আদহাম (রহঃ) আপন সহচরদের কাছে খাদ্যদ্রব্যের দর জিজ্ঞেস করতেন। তারা দুর্মূল্যের কথা বললে তিনি বলতেন : খাওয়া বর্জন করে সস্তা করে নাও।


দশম উপকারিতা হচ্ছে, কম আহারের কারণে যে খাদ্য বেঁচে যাবে, তা সদকা-খয়রাতে ব্যয় করা যাবে। মানুষ যে পরিমাণ খাদ্য খেয়ে নেয়, তা মাটি ও পায়খানা হয়ে যায়। আর যে পরিমাণ সদকা করে, তা আল্লাহর রহমত লাভের জন্যে ভাণ্ডার হয়ে থাকে। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) এক ব্যক্তির ভুঁড়ির দিকে আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করে বললেন : যদি এই পরিমাণ অন্যের পেটে যেত, তবে তোমার জন্যে মঙ্গলজনক হত। অর্থাৎ, তুমি যদি আপন খাদ্য হ্রাস করে অন্যকে খাওয়াতে, তবে তা আখেরাতের জন্য ভাণ্ডার হত। 


হযরত হাসান বসরী (রহঃ) বলেন : আল্লাহর কসম, আমরা এমন লোক দেখেছি, যাদের কাছে সামান্যই খাদ্য ছিল। ইচ্ছা করলে তারা সবটুকু খেতে পারতেন; কিন্তু তারা বলতেন : আমরা সবটুকু নিজেদের পেটে দেব না। কিছু আল্লাহর জন্যেও রেখে দেব।


পরবর্তী পর্ব

উদরের খাহেশ চূর্ণকারী সাধনা

ক্ষুধার ফযীলত ও উদরপূর্তির নিন্দা



 উদর ও লজ্জাস্থানের খাহেশের প্রতিকার (পর্ব– ২)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

ক্ষুধার ফযীলত ও উদরপূর্তির নিন্দা

রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন :

“তোমরা নফসের বিরুদ্ধে ক্ষুধা ও পিপাসা দ্বারা জেহাদ কর। এতে এমন সওয়াব, যেমন আল্লাহর পথে জেহাদকারীর সওয়াব। আল্লাহ তাআলার কাছে ক্ষুধা পিপাসার চেয়ে অধিক প্রিয় কোন আমল নেই”।


হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন : আকাশের ফেরেশতা সেই ব্যক্তির কাছে আসে না, যে তার পেট ভরে নেয়। এক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করল : মানুষের মধ্যে উত্তম কে? তিনি বললেন : যে কম খায়, কম হাসে এবং এমন পোশাকে সন্তুষ্ট থাকে, যা দ্বারা তার গুপ্ত অঙ্গ আবৃত করতে পারে। 

আবু সায়ীদ খুদরীর রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন : “পশমী বস্ত্র পরিধান কর এবং আধাপেট খাও। এটা নবুওয়তের একাংশ”। হযরত হাসান (রঃ) এর রেওয়ায়েতে বলা হয়েছে : “কেয়ামতে আল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠ মর্তবাশালী সেই ব্যক্তি হবে, যে অধিক ক্ষুধার্ত থাকবে এবং যিকির বেশী করবে। কেয়ামতে আল্লাহর কাছে অধিক ঘৃণিত সে ব্যক্তি হবে, যে অধিক নিদ্রা যায়, অধিক খায় এবং অধিক পান করে।”


বর্ণিত আছে, রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) প্রয়োজনেও ক্ষুধার্ত থাকতেন, অর্থাৎ এটা তাঁর পছন্দনীয় ছিল। এক হাদীসে কুদসীতে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তির পানাহার দুনিয়াতে কম, আল্লাহ তাকে নিয়ে ফেরেশতাদের সামনে গর্ব করেন এবং বলেন : আমার বান্দাকে দেখ, আমি তাকে দুনিয়াতে পানাহার কম দিয়েছি। সে সবর করেছে। তোমরা সাক্ষী থাক, যে লোকমা সে ছেড়ে দেবে, তার বিনিময়ে জান্নাতে তাকে উচ্চ মর্তবা দান করব। এক হাদীসে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন : 

“তোমরা অন্তরকে অধিক পানাহার দ্বারা মেরে ফেলো না। অন্তর কৃষিক্ষেত্রের মত। তাতে পানি বেশী হলে ফসল বিনষ্ট হয়ে যায়।'


উসামা ইবনে যায়েদ ও আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত এক দীর্ঘ হাদীসে রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন : কেয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলার অধিক নিকটবর্তী সে ব্যক্তিই হবে, যে দুনিয়াতে অধিক ক্ষুধার্ত, পিপাসার্ত ও চিন্তান্বিত থাকবে। এ ধরনের লোকেরা হচ্ছে গোপন মুত্তাকী। এরা আত্মপ্রকাশ করলে কেউ তাদেরকে চেনে না এবং অদৃশ্য হয়ে গেলে কেউ খোঁজে না। ফেরেশতারা তাদেরকে ঘিরে রাখে। তারাই ভাল লোক। আল্লাহ তা'আলার আনুগত্যও উত্তমরূপে তারাই করে। লোকেরা নরম নরম শয্যায় শয়ন করে। আর তারা নিজেদের মস্তক ও হাঁটু বিছিয়ে দেয়। পয়গম্বরগণের চরিত্র ও ক্রিয়াকর্ম তাদের মুখস্থ। যে জায়গা থেকে তারা চলে যায়, সেই জায়গা কাঁদে। যে শহরে তাদের কেউ না থাকে, সেই শহরের উপর গযব নাযিল হয়। তারা দুনিয়ার জন্যে মৃতের উপর কুকুরের মত লড়াই করে না। যে পরিমাণ খেলে নিঃশ্বাস বাকী থাকে, তারা সেই পরিমাণই খায় এবং ছিন্নবস্ত্র পরিধান করে। মলিন অবস্থার কারণে লোকে তাদেরকে রোগগ্রস্ত মনে করে ; অথচ তাদের কোন রোগ নেই। কেউ কেউ মনে করে, তাদের জ্ঞানবুদ্ধি বিলুপ্ত; অথচ এটাও নয়। পরকালের গৌরব তাদের জন্যেই। হে উসামা, যে শহরে এরূপ লোক দৃষ্টিগোচর হয়, জেনে নেবে, সেই শহরের শান্তির কারণ তারাই। যে সম্প্রদায়ের মধ্যে তারা থাকে, আল্লাহ সেই সম্প্রদায়কে আযাব দেন না। ভূপৃষ্ঠও তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং আল্লাহ তা'আলাও তাদের প্রতি রাযী। মানুষের মধ্যে তাদেরকে রাখার কারণ তাদের দ্বারা যথাসম্ভব মানুষকে মুক্তি দেয়া। তুমি যদি আমৃত্যু ক্ষুধা-পিপাসা সহ্য করতে পার, তবে কর। এর কারণে তুমি উচ্চ মর্যাদা পাবে এবং নবীগণের কাতারে দাখিল হবে। তোমার আত্মা যখন ফেরেশতাদের কাছে যাবে, তখন তারা আনন্দিত হবে এবং আল্লাহ তোমার প্রতি রহম করবেন।হযরত আবু হুরায়রার রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন :

“পশম পরিধান কর এবং কর্মতৎপর থাক। আধাপেট আহার কর। তাহলে আকাশের ফেরেশতাদের মধ্যে দাখিল হয়ে যাবে।'


হযরত ঈসা (আঃ) বলেন : হে হাওয়ারীগণ, তোমাদের পাকস্থলীকে ক্ষুধাতুর এবং দেহ উলঙ্গ রাখ, যাতে তোমাদের অন্তর আল্লাহকে দেখে। তওরাতে লিখিত আছে- আল্লাহ তা’আলা কোন স্থূলদেহী আলেমকে পছন্দ করেন না। কেননা, দৈহিক স্থূলতা অনবধানতা ও অধিক আহার জ্ঞাপন করে। এটা আলেমের জন্যে ভাল নয়। তাই হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ) বলেন :

“যে আলেম পেট ভরে খেয়ে মোটা হয়েছে, আল্লাহ তাকে পছন্দ করেন না। এক হাদীসে আছে, শয়তান মানুষের মধ্যে রক্তের মত বিচরণ করে। তোমরা ক্ষুধা ও পিপাসা দ্বারা তার চলাচলের পথ সংকীর্ণ করে দাও। এক হাদীসে বলা হয়েছে- “মুমিন এক নাড়ি-ভুঁড়িতে এবং কাফের সাত নাড়ি-ভুঁড়িতে খায়”।


অর্থাৎ মুমিনের তুলনায় কাফের সাত গুণ বেশী খায় কিংবা তার খাহেশ মুমিনের চেয়ে সাত গুণ বেশী হয়। রূপক অর্থে খাহেশের স্থলে নাড়ি-ভুঁড়ি ব্যবহৃত হয়েছে। হাদীসের অর্থ এরূপ নয় যে, কাফেরের নাড়ি-ভুঁড়ি বাস্তবে মুমিনের তুলনায় বেশী হয়। হযরত হাসান (রঃ)-এর  রেওয়ায়াতে আছে, হযরত আয়েশা (রাঃ) রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-কে একথা বলতে শুনেছেন : “তোমরা সর্বদা জান্নাতের দরজার কড়া নাড়। তোমাদের জন্যে তা খুলে যাবে।”


হযরত আয়েশা (রাঃ) বললেন : জান্নাতের দরজার কড়া কিরূপে নাড়া দেব ? তিনি (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বললেন : “ক্ষুধা ও পিপাসা দ্বারা”। 

হযরত আবু হুযায়ফা (রাঃ) একবার রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর মজলিসে ঢেকুর তুললে তিনি বললেন : অধিক ঢেকুর তুলো না। কেননা, কেয়ামতের দিন সে ব্যক্তিই অধিক ক্ষুধার্ত হবে, যে দুনিয়াতে বেশী পেট ভরে খায়। 

হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন : রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) কখনও পেটভরে আহার করেননি। মাঝে মাঝে তাঁর ক্ষুধা দেখে হযরত আয়েশা (রঃ)-এর করুণা হত এবং তিনি কেঁদে দিতেন। তিনি তাঁর পেটে হাত বুলিয়ে বলতেন : আপনার প্রতি আমি উৎসর্গ। দুনিয়া থেকে এতটুকু অংশ তো নিন, যদ্দ্বারা শক্তি বহাল থাকে এবং ক্ষুন্নিবৃত্তি হয়ে যায়। জওয়াবে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বলতেন : আয়েশা, আমার ভাইগণ অর্থাৎ প্রধান প্রধান পয়গম্বরগণ আমার চেয়েও অধিক কষ্ট সহ্য করেছেন। এসব কষ্টে সবর করে তাঁরা যখন পরওয়ারদেগারের কাছে গেছেন, তখন অত্যন্ত সম্মানিত হয়েছেন এবং অপরিসীম সওয়াব লাভ করেছেন। আমি লজ্জাবোধ করি, কোথাও জীবনে কিছু আরাম ভোগ করার কারণে আখেরাতে তাঁদের চেয়ে কম মর্তবা লাভ করি। আখেরাতে কম মর্তবা পাওয়া অপেক্ষা দুনিয়াতে কয়েক দিন সবর করা সহজ। আপন ভাইদের সাথে মিলিত হওয়া ছাড়া আমার কাছে অন্য কিছু ভাল মনে হয় না। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন : আল্লাহর কসম, এই কথাবার্তার পর এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে তিনি দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে যান। 


হযরত আনাস (রাঃ) বর্ণনা করেন- একবার হযরত ফাতেমা (রাঃ) একখন্ড রুটি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে উপস্থিত করেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন : এটা কি ? হযরত ফাতেমা বললেন : আমি একটি রুটি তৈরী করেছিলাম। আমার মনে চাইল, তাই এ খন্ডটি আপনার জন্যে এনেছি। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) রুটির টুকরাটি খেয়ে বললেন : তিন দিন পর তোমার পিতার মুখে এই প্রথম খাদ্য পৌঁছল। 

হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন : রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) সারা জীবনে কখনও পরিবার-পরিজনকে লাগাতার তিন দিন পেট ভরে গমের রুটি দেননি। তিনি বলতেন : “দুনিয়াতে যারা ক্ষুধার্ত, আখেরাতে তারা তৃপ্ত হবে। আল্লাহ তা'আলার কাছে সে ব্যক্তি অধিক ঘৃণিত, যার বদহজম লেগে থাকে এবং পেট ভরে আহার করে। বান্দা খাহেশ সত্ত্বেও যে লোকমাটি ছেড়ে দেয়, তার বিনিময়ে সে জান্নাতে একটি স্তর লাভ করে।


ক্ষুধার ফযীলত সম্পর্কে মহাজন উক্তিও অনেক। 

হযরত ওমর (রাঃ) বলেন : উদরপূর্তি থেকে নিজেকে রক্ষা কর। কেননা, এটা জীবদ্দশায় দুর্মূল্যের এবং মৃত্যুর পর দুর্গন্ধের কারণ। 

হযরত শাকীক বলখী (রঃ) বলেন : এবাদত একটি পেশা, যার দোকান হচ্ছে নির্জনতা এবং হাতিয়ার ক্ষুধা। 

হযরত লোকমান (রঃ) আপন পুত্রকে বলেন : রস, যখন পাকস্থলী পূর্ণ থাকে, তখন চিন্তা ঝিমিয়ে পড়ে এবং এবাদতের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বেকার বসে থাকে। 

হযরত ফযল ইবনে আয়ায নিজেকে সম্বোধন করে বলতেন : তোমার কিসের ভয়? ক্ষুধার? ক্ষুধাকে ভয় করা উচিত নয়। কেননা, এর কারণেই তুমি আল্লাহ তা'আলার সামনে হালকা-পাতলা থাক। আল্লাহর রসূল ও তাঁর সকল সাহাবী ক্ষুধার্ত থাকতেন। 

কাহমস (রঃ) বলেন : ইলাহী, আপনি আমাকে ক্ষুধার্ত রেখেছেন, উলঙ্গ রেখেছেন এবং অন্ধকার রাতে প্রদীপহীন রেখেছেন। কেমন কেমন ওসীলা দ্বারা আমাকে এই মর্তবায় পৌঁছিয়েছেন। 

তওরাতে উল্লিখিত আছে- আল্লাহকে ভয় কর এবং যখন পেট ভরে আহার কর, তখন ক্ষুধার্তকে স্মরণ কর। 

আবু সোলায়মান (রঃ) বলেন : রাতের খাদ্য থেকে এক লোকমা কম খাওয়া আমার কাছে সারারাত জেগে এবাদত করার চেয়ে ভাল মনে হয়। তিনি আরও বলেন : আল্লাহর ভান্ডার থেকে ক্ষুধা তাকেই দান করা হয়, যাকে তিনি পছন্দ করেন। হযরত সহল ইবনে আবদুল্লাহ তস্তরী (রঃ) পঁচিশ দিন পর্যন্ত খেতেন না এবং এক দেরহামের আটা দিয়ে এক বছর চালিয়ে দিতেন। তিনি ক্ষুধার উচ্চ মর্তবা বিশ্বাস করতেন এবং এ সম্পর্কে অতিশয়োক্তি করে বলতেন : কেয়ামতের দিন কোন নেক আমলের এতটুকু সওয়াব হবে না, যতটুকু রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর অনুসরণে বাড়তি খাদ্য ত্যাগ করলে হবে। তিনি আরও বলেন : যারা আখেরাত তলব করে, তাদের জন্যে খাওয়ার চেয়ে অধিক ক্ষতিকর কিছু নেই। প্রজ্ঞা ও জ্ঞান ক্ষুধার মধ্যে এবং গোনাহ ও মূর্খতা তৃপ্তির মধ্যে নিহিত। যে হাদীসে বলা হয়েছে, পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাদ্যের জন্যে, সেই হাদীসের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন : যে ব্যক্তি এই পরিমাণের চেয়ে বেশী খায়, সে তার পুণ্য খায়। এর চেয়ে উচ্চ মর্তবার কথা তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন : খাদ্য খাওয়ার তুলনায় না খাওয়া অধিক প্রিয় না হওয়া পর্যন্ত কারও ফযীলত লাভ হবে না। এক রাত ক্ষুধার্ত থাকলে আল্লাহর কাছে দু'রাত ক্ষুধার্ত থাকার জন্যে দোয়া করবে। এই অবস্থা অর্জিত হলে সে খাদ্য না খাওয়া প্রিয় মনে করবে। তিনি আরও বলেন : যারা আবদাল হয়েছেন, তারা পেটকে ক্ষুধার্ত রাখা, রাত্রি জাগরণ ও একান্তবাস দ্বারা আবদাল হয়েছেন। আবদুল ওয়াহেদ ইবনে যায়দ বলেন : আল্লাহর কসম, আল্লাহর মহব্বত পাওয়া যায় না, কিন্তু ক্ষুধা দ্বারা। ওলীগণ পানির উপর দিয়ে হেঁটে যান না, কিন্তু ক্ষুধার বদৌলত। তারা নিমেষের মধ্যে পথের দূরত্ব অতিক্রম করেন না, কিন্তু ক্ষুধার কারণে।



পরবর্তী পর্ব

ক্ষুধার উপকারিতা ও তৃপ্তির বিপদাপদ

উদর ও লজ্জাস্থানের খাহেশের প্রতিকার

 

উদর ও লজ্জাস্থানের খাহেশের প্রতিকার (পর্ব– ১)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

জানা উচিত, উদরের খাহেশ আদম সন্তানের জন্যে বড় মারাত্মক, যার কারণে হযরত আদম ও হাওয়া (আঃ) চিরস্থায়ী জান্নাত থেকে (ইবলিশের ধোকায় পড়ে) এই ধ্বংসশীল পৃথিবীতে বহিষ্কৃত হন। তাঁদেরকে এক বিশেষ বৃক্ষের ফল খেতে নিষেধ করা হয়েছিল। কিন্তু তাঁদের খাহেশ প্রবল হওয়ায় তাঁরা তা (ভুলক্রমে) খেয়ে ফেলেন। প্রকৃতপক্ষে উদর খাহেশের ঝরণা এবং আপদের খনি। কারণ, উদরের জন্যে নারী সম্ভোগের খাহেশ অপরিহার্য। পেটপূর্তি হলে একাধিক স্ত্রী ও অত্যাধিক সহবাসের বাসনা জাগ্রত হয়। এর পর ধন-সম্পদ ও জাঁকজমকের দিকে মন ঝুঁকে পড়ে। কেননা, এগুলো দ্বারা এই মতলব সুন্দরভাবে সিদ্ধ হয়। ধন-সম্পদের আধিক্য থেকে নানা রকমের ঔদ্ধত্য ও হিংসার সৃষ্টি হয় এবং এরই বদৌলতে রিয়া, পারস্পরিক গর্ব ও অহংকার জন্মলাভ করে, ফলে বিদ্বেষ ও শত্রুতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। অবশেষে মানুষ অবাধ্যতা, নাফরমানী ও নিষিদ্ধ কাজ করতে শুরু করে। এগুলো সব এ বিষয়েরই ফল যে, উদরকে খালি না রেখে আকণ্ঠ ভরে নেয়া হয়। যদি মানুষ তার নফসকে ক্ষুধার্ত রেখে শয়তানের পথ সংকীর্ণ করে দেয়, তবে অবশ্যই সে আল্লাহর আনুগত্যের পথ থেকে পা উঠাবে না, অবাধ্যতা ও আস্ফালনের কাছেও ঘেঁষবে না, আখেরাত ছেড়ে দুনিয়াদার হয়ে থাকবে না এবং বাদানুবাদ ও কলহ কিনে নেবে না। এসব কারণে উদরের বিপদাপদ ও ধ্বংসকারিতা বর্ণনা করা এবং এ সম্পর্কিত মোজাহাদার পদ্ধতি ও ফযীলত ব্যাখ্যা করা অত্যাবশ্যক, যাতে মানুষ এ থেকে বেঁচে থাকে এবং মোজাহাদার প্রতি আকৃষ্ট হয়। লজ্জাস্থানের খাহেশও এমনি ধরনের, যা এর পরে আসে। তাই এর বর্ণনাও জরুরী। সেমতে আমরা এ বিষয়গুলোকে আটটি শিরোনামে বর্ণনা করব।


(১) ক্ষুধার ফযীলত ও উদরপূর্তির নিন্দা

(২) ক্ষুধার উপকারিতা ও তৃপ্তির বিপদাপদ

(৩) উদরের খাহেশ চূর্ণকারী সাধনা 

(৪) ক্ষুধা ও তার ফযীলতে মিতাচার

(৫) রিয়ার বিপদাপদ

(৬) লজ্জাস্থানের খাহেশ

(৭) মুরীদের বিবাহ করা না করা

(৮) যিনা ও কুদৃষ্টি থেকে আত্মরক্ষা করা 


পরবর্তী পর্ব

ক্ষুধার ফযীলত ও উদরপূর্তির নিন্দা

মঙ্গলবার, ১১ জুলাই, ২০২৩

তাওহীদের স্থর ও প্রকার

তাওহীদের স্থর সমুহ 
বলা বাহুল্য, তাওহীদের চারটি স্তর রয়েছে— 

( এক)সারাংশ, (দুই) সারাংশের সারাংশ, (তিন) বাকল এবং (চার) বাকলের উপরকার বাকল। 

অজ্ঞ লোকদেরকে বুঝাবার জন্যে আমরা একটি দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করছি। 

তাওহীদকে একটি আখরোটের উপরকার বাকল মনে করা উচিত। আখরোটের উপরিভাগে উপর-নিচে দু'টি বাকল থাকে, একটি সারাংশ থাকে এবং সারাংশে থাকে তৈল। সুতরাং তাওহীদের 

প্রথম স্তর হচ্ছে আখরোটের উপরকার বাকল। তা হচ্ছে শুধু মুখে “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” উচ্চারণ করা, কিন্তু তার অন্তর্নিহিত অর্থ সম্পর্কে গাফেল থাকা কিংবা মনে মনে তা অস্বীকার করা- এটা হচ্ছে মুনাফিক তথা কপট বিশ্বাসীদের তাওহীদ। 

দ্বিতীয় স্তর হচ্ছে মুখে কলেমা উচ্চারণ করার সাথে সাথে তার অর্থ হৃদয়ঙ্গম করা। এটা হচ্ছে সাধারণ জনগণের তাওহীদ। 

তৃতীয় স্তর হচ্ছে সত্যের নূরের মাধ্যমে কলেমার অর্থ স্বর্গীয় প্রেরণায় প্রকটিত হওয়া এবং তা প্রত্যক্ষ করা। এটা নৈকট্যশীলদের তাওহীদ। 

চতুর্থ স্তর এই যে, অস্তিত্ব জগতে এক ও অভিন্ন আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছু না দেখা। এটা সিদ্দীকগণের তাওহীদ। সূফী-বুযুর্গগণের পরিভাষায় এর নাম “ফানা ফিত্তাওহীদ” (তাওহীদে বিলুপ্তি)। কারণ, এই স্তরে ব্যক্তি যেখানে আল্লাহ তা'আলার সত্তা ছাড়া কিছুই দেখে না, সেখানে নিজের অস্তিত্বকেও দেখে না। সুতরাং তার সত্তা নিজের চোখেও বিলুপ্ত থাকে।


উপরোক্ত স্তর চতুষ্টয়ের মধ্যে 

প্রথম ব্যক্তি কেবল মৌখিক তাওহীদপন্থী। তার তাওহীদের উপকারিতা কেবল দুনিয়াতেই পাবে। অর্থাৎ সে মুজাহিদদের তরবারি থেকে রক্ষা পাবে। 

দ্বিতীয় ব্যক্তি এই অর্থে তাওহীদপন্থী যে, সে কলেমার অর্থ বুঝে এবং অন্তর দ্বারা তা মিথ্যা বলে বিশ্বাস করে না। এ ধরনের তাওহীদ অন্তরের উপর এক গ্রন্থিবিশেষ, যাতে উন্মোচন ও উদ্দীপনা হয় না। এতদসত্ত্বেও এই তাওহীদ দ্বারা আখেরাতের আযাব থেকে রক্ষা পাওয়া যায়, যদি এর উপরই জীবনাবসান হয় এবং . গোনাহের কারণে তা দুর্বল না হয়। এই গ্রন্থিকে ঢিলে করার ও খুলে দেয়ারও কতকগুলো কৌশল রয়েছে। সেগুলোকে “বেদআত” বলা হয়। আরও কিছু পন্থা রয়েছে, যেগুলোর দ্বারা এই গ্রন্থিকে মযবুত করা ও ঢিলেকারীদের কৌশল প্রতিহত করা উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। এসব পন্থাকে বলা হয় “কালাম শাস্ত্র”। যে কালাম শাস্ত্র জানে, তাকে মুতাকাল্লিম এবং তার বিপরীতকে মুবতাদে' বলা হয়। জনসাধারণের অন্তর থেকে তাওহীদের গ্রন্থি খুলে ফেলার জন্য মুরতাদে' যে অপচেষ্টা চালায়, তা ব্যর্থ করে দেয়াই মুতাকাল্লিমের লক্ষ্য থাকে।

তৃতীয় ব্যক্তি এই অর্থে তাওহীদপন্থী যে, সে বিশ্ব-জাহানের হর্তাকর্তা একজনকেই বিশ্বাস করে। সে যদিও জানে, বস্তু সামগ্রী অনেক; কিন্তু এই প্রারাচুর্য সত্ত্বেও সেগুলোকে সে এক পরাক্রমশালী আল্লাহ থেকেই প্রকাশিত বলে জানে। 

চতুর্থ ব্যক্তি এই অর্থে তাওহীদপন্থী যে , এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহ্ ছাড়া কোন কিছুই তার দৃষ্টিগোচর হয়নি। সে বস্তুসামগ্রীকে বহুত্বে দৃষ্টতে দেখে। এটি তাওহীদের সর্বোচ্ছ স্তর।

অতএব 


প্রথম প্রকার তৌহীদ হচ্ছে আখরোটের উপরের ছাল,দ্বিতীয় স্তর দ্বিতীয় ছাল, তৃতীয় স্তর সারাংশ এচতুর্থ স্তর তৈলের ন্যায়। যা সারাংশ থেকে নির্গত হয়। উপরের ছাল কোন উপকারে আসেনা। খেলে তিক্ত লাগে। আগুনে নিক্ষেপ করলে আগুন নিভিয়ে দেয় এবং ধোয়া বৃদ্ধি করে। ঘরে রাখলে অহেতুক যায়গা আবদ্ধ রাখে। মোটকথা , কয়েকদিন আখরোটের হেফাজত করা ছাড়া এটা কোন কাজে লাগেনা। সারংশ বের করলে এটা ফেলে দেয়া হয়। মৌখিক তাওহীদের অবস্থাও ঠিক তেমনি। এরূপ তাওহীদের উপকার কম এবং ক্ষতি বেশী। স্বল্পকালীন উপকার এই যে, মন ও দেহকে রক্ষা করার জন্য মৃত্যু পর্যন্ত কাজে লাগে এবং মুনাফিকের দেহকে মুজাহিদদের তরবারির গ্রাস হতে দেয়না। কারণ তাদের প্রতি অন্তর চিড়ে দেখার নির্দেশ নেই। তারা কেবল বাহ্যিক ইসলামকে দেখে। কিন্তু মৃত্যুর সময় তাদের এই তাওহীদ তাদের দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে এবং এরপর কোন কাজে আসবেনা।


দ্বিতীয় প্রকার তৌহিদ - আখরোটের দ্বিতীয় ছাল প্রথম ছালের তুলনায় বাহ্যত উপকারী। এর দ্বারা সারাংশের হেফাজত হয়। এবং রেখে দিলে সারাংশকে বিগড়ে যেতে দেয়না। পৃথক করে নিলে জ্বালানি কাজেও আসে। কিন্তু এই উপকার সর্বাবস্থায় সারাংশের তুলনায় কম। এমনিভাবে অন্তরে কেবল কলেমার অর্থের বিশ্বাস রাখা মৌখিক কলেমার তুলনায় অনেক উপকারী। কিন্তু কাশফ্ ও প্রত্যক্ষকরণের তুলনায় এর মান কম। কাশফ্ ও প্রত্যক্ষকরণের ফল স্বরুপ যে উন্মোচন ও প্রশস্থতা অর্জিত হয়, তাই নিম্নোক্ত আয়াতে বুঝানো হয়েছে - "আল্লাহ্ যাকে পথ প্রদর্শন করার ইচ্ছা করেন, তার বক্ষ ইসলামের জন্য উন্মোচিত করে দেন। নিন্মের আয়াতেও তাই উদ্দেশ্যে - "আল্লাহ যার বক্ষ ইসলামের জন্য উন্মোচিত করে দিয়েছেন, সে তার পালনকর্তার পক্ষ থেকে কি নূরের উপর  প্রতিষ্টিত আছে?" 

সারাংশ সয়ং ছালের তুলনায় উৎকৃষ্ট এবং এটাই প্রকৃতপক্ষে উদ্দেশ্য। তবুও তৈল বের করার পর তাতে কিছু গাদের মিশ্রণ থাকে। এমনিভাবে জগতের হত্তাকর্তাকে বিশ্বাস করাও সাধকের একটি সুউচ্চ লক্ষ্য কিন্তু এতে কিছু না কিছু ভ্রূক্ষেপ গায়রুল্লার প্রতিও থেকে যায়। যে ব্যাক্তি আল্লাহ্ ছারা কিছুই দেখেনা, তার তুলনায় এরূপ ব্যক্তির দৃষ্টি বহুত্বের দিকে থাকে।

এখানে প্রশ্ন হয়, মানুষ পৃথিবীতে এক সত্তা ছাড়া কিছুই প্রত্যক্ষ করবে না, তা কেমন করে সম্ভব ? কেননা, সে নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল, চন্দ্র, সূর্য, বৃক্ষ, তরুলতা ও অন্যান্য শরীরী বস্তুসমূহ প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ করে। এসব বস্তু এক নয় অনেক। অতএব, অনেক বস্তু এক কেমন করে হবে? এর জওয়াব এই, কোন কোন বস্তু কোন বিশেষ দৃষ্টিতে দেখলে অনেক হয়; কিন্তু অন্য দৃষ্টিতে দেখলে একই হয় । উদাহরণতঃ মানুষকে যদি আমরা আত্মা, দেহ, হাত-পা, শিরা-উপশিরা, অস্থি ও অন্ত্রের দিক দিয়ে দেখি, তবে তাতে বহুত্ব থাকে; কিন্তু যদি অন্যদিক দিয়ে অর্থাৎ মানবতার দিক দিয়ে দেখি, তবে সে এক। অনেকেই মানুষকে দেখে এবং তাদের অন্তরে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বহুত্ব ও পৃথক হওয়া ধারণাও থাকে না। আসলে মানুষ যখন একত্বের ধ্যানে নিমজ্জিত থাকে, তখন সে একের মধ্যে বিভেদ ও পার্থক্য দেখে না। আর যখন বহুত্বের দিকে লক্ষ্য করে, তখন এসব বস্তু যে আলাদা আলাদা, সেদিকে কল্পনা ধাবিত হয়। এমনিভাবে স্রষ্টা হোক কিংবা সৃষ্টি সকলকে দেখার আলাদা আলাদা ও বহু দৃষ্টিকোণ রয়েছে। কোন দৃষ্টিকোণে তারা এক এবং কোন দৃষ্টিকোণে অনেক। এখানে দৃষ্টান্তটি যদিও উদ্দেশ্যের সাথে পুরাপুরি খাপ খায় না, তবু এর মাধ্যমে মোটামুটিভাবে প্রত্যক্ষকরণে অনেক যে এক হতে পারে, তা বুঝা যায়।

সর্বশক্তিমান এক আল্লাহর সত্তা ছাড়া অন্য কিছুই দৃষ্টিগোচর না হওয়ার অবস্থাটি কখনও সার্বক্ষণিক হয়ে থাকে, আবার কখনও বিদ্যুতের ন্যায় ক্ষণস্থায়ী হয়ে থাকে। সত্য বলতে কি, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্ষণস্থায়ীই হয়ে থাকে। এটা সর্বক্ষণ অব্যাহত থাকা খুবই বিরল। বর্ণিত আছে , হুসাইন ইবনে মনসূর হাল্লাজ ইবরাহীম খাওয়াসকে সফর করতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন : তুমি বর্তমানে কি কাজে মশগুল আছ ? তিনি জওয়াব দিলেন : তাওয়াক্কুল পাকাপোক্ত করার উদ্দেশ্যে আজকাল আমি সফর করছি। হুমায়ুন ইবনে মনসূর বললেন : তুমি অন্তর আবাদ করার কাজে সারা জীবন বিনষ্ট করেছ। ফানা ফিত্তাওহীদ ( তাওহীদে বিলুপ্তি ) কোথায় গেল ? সেটা অবলম্বন কর না কেন ? উদ্দেশ্য এই, হযরত খাওয়াস তৃতীয় স্তরের তাওহীদ পাকাপোক্ত করার কাজে মশগুল ছিলেন, আর হুমায়ুন তাকে চতুর্থ স্তর অবলম্বন করতে বলেছিলেন। 

এ পর্যন্ত তাওহীদপন্থীদের মকামসমূহ সংক্ষেপে বর্ণিত হল। এখন সেই তাওহীদের ব্যাখ্যা শোনা দরকার, যার উপর তাওয়াক্কুল নির্ভরশীল। সে মতে চতুর্থ স্তরের তাওহীদ সম্পর্কে চিন্তাভাবনাই করা উচিত নয়। তাওয়াক্কুলও এর উপর ভিত্তিশীল নয়; বরং তৃতীয় প্রকার তাওহীদ থেকেই তাওয়াক্কুলের হাল অর্জিত হয়। প্রথম প্রকার তাওহীদ হল নিফাক, যার অবস্থা বর্ণিত হয়েছে। দ্বিতীয় প্রকার তাওহীদ সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। এর পাকাপোক্ত করার নিয়মপদ্ধতি কালাম শাস্ত্রে উল্লিখিত হয়েছে। বেদআতীদের আপত্তিসমূহের জওয়াবও তাতে বর্ণিত হয়েছে। বাকী রইল তৃতীয় প্রকার তাওহীদ। বলা বাহুল্য , এর উপরই তাওয়াক্কুল নির্ভরশীল। কেননা , কেবল বিশ্বাসগত তাওহীদই তাওয়াক্কুল সৃষ্টি করে না- এতে কিছু কাশফ ও প্রত্যক্ষণেরও দরকার। সুতরাং তৃতীয় প্রকার তাওহীদের ক্ষেত্রে যতটুকুর উপর তাওয়াক্কুল নির্ভরশীল, নিম্নে আমরা ততটুকুই বর্ণনা করার প্রয়াস পাব।


তৃতীয় প্রকার তৌহিদ - সংক্ষেপে কথা হল, মানুষের কাছে এটা দিবালোকের ন্যায় প্রতিপন্ন হতে হবে যে, আল্লাহ তা'আলা ছাড়া জগতের সর্বময় কর্তা আর কেউ নেই। সৃষ্টি, রিযিক, বখশিশ, জীবন, মরণ, প্রাচুর্য, দরিদ্রতা ইত্যাদি যত বিষয়াদি রয়েছে, সবগুলোর স্রষ্টা, আবিষ্কারক ও উদ্ভাবক একমাত্র আল্লাহ তা’আলাই। এতে কেউ তার অংশীদার নেই। এ বিষয়টি যখন মানুষের কাছে প্রকটিত হয়ে যাবে, তখন সে অন্য কারও দিকে লক্ষ্য করবে না, অন্য কাউকে ভয় করবে না। তারই কাছে আশা করবে এবং তারই উপর ভরসা করবে। কেননা, সর্বাধিপতি তো কেবল তিনিই। তিনি ব্যতীত যা কিছু আছে, সবই তার অধীন ও পদানত। মানুষের সামনে যখন কাশফের দ্বার উন্মুক্ত হয়ে যায়, তখন এটা সে চর্মচক্ষেও প্রত্যক্ষ করতে সক্ষম হয়।

শয়তান মানুষকে এই তাওহীদ থেকে দু'উপায়ে বিরত রাখে এবং তার সাথে শিরক মিশ্রিত করে দেয়। প্রথমত, প্রাণিকুলের ক্ষমতার প্রতি দৃষ্টিপাতের মাধ্যমে এবং দ্বিতীয়ত, জড় পদার্থের ক্ষমতার প্রতি মনোযোগর মাধ্যমে। জড়জগতের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত হল এই, মানুষ শস্য উৎপাদনের জন্যে বৃষ্টির উপর ভরসা করে এবং বৃষ্টিপাতের ব্যাপারে মেঘমালার উপর ভরসা করে। নৌকা পানির উপর সঠিকভাবে ভেসে থাকা এবং চলার ব্যাপারে অনুকূল বায়ুর উপর ভরসা। এ সমস্ত বিষয় তাওহীদের ক্ষেত্রে শিরক এবং আসল সত্য সম্পর্কে অজ্ঞতা বৈ কিছু নয়। এ কারণেই আল্লাহ পাক এরশাদ করেন : "তারা যখন নৌকায় আরোহণ করে, তখন একান্তভাবে আল্লাহকে ডাকে। অতঃপর আল্লাহ যখন তাদেরকে উদ্ধার করে ডাঙ্গায় পৌছে দেন, তখনই তারা শিরক করতে শুরু করে।" কতক তাফসীরকারের মতে এখানে শিরক করার অর্থ এই, তারা বলতে শুরু করে যদি বায়ু অনুকূল না হতো, তবে আমরা তীরে পৌছুতে পারতাম না। কিন্তু যে ব্যক্তি বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে সম্যক অবগত সে জানে, অনুকূল বাতাসও স্বেচ্ছায় চলে না যে পর্যন্ত না আল্লাহ পাক তাকে চালান।

অতএব, নাজাতের ক্ষেত্রে বায়ুর প্রতি মানুষের মনোযোগ এমন, যেমন কোন প্রাণদণ্ডযোগ্য ব্যক্তি গ্রেফতার হয়, অতঃপর বাদশাহ তার মুক্তি ও ক্ষমার আদেশ লিখে দেন। এখন এই ব্যক্তি বাদশাহের দোয়াত, কলম ও কাগজকে স্মরণ করে বলে- যদি দোয়াত, কলম ও কাগজ না হত, তবে আমি রক্ষা পেতাম না। অর্থাৎ, সে কলম ইত্যাদিকেই নাজাতের কারণ মনে করে। যিনি কলম চালিয়েছেন, তাকে স্মরণ করে না। বলা বাহুল্য, এটা চূড়ান্ত মূর্খতা। যে ব্যক্তি জানে, কলম কোন আদেশ দিতে পারে না, বরং সে লেখকের অনুগত, সে কলমের দিকে মনোযোগ দিবে না এবং লেখক ছাড়া অন্য কোন কিছুর কাছে কৃতজ্ঞ হবে না। এমনকি, মুক্তির আনন্দ এবং বাদশাহের কৃতজ্ঞতায় কলম ও কালির কল্পনাও তার অন্তরে জাগ্রত হবে না। সুতরাং চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, তারা, বৃষ্টি, মেঘমালা, পৃথিবীর সমস্ত প্রাণী, উদ্ভিদ প্রভৃতি সমস্তই আল্লাহ তা'আলার কুদরতের এমনিভাবে অনুগত, যেমন লেখকের হাতে কলম-কাগজ ইত্যাদি। এ দৃষ্টান্তটিও কেবল বুঝানোর জন্যে, নতুবা দস্তখত বাদশাহ করলেও বাস্তবে লেখক আল্লাহ তা’আলাই। এক আয়াতে এরশাদ হয়েছে "আপনি যখন ধূলি নিক্ষেপ করলেন, তখন প্রকৃতপক্ষে তা আপনি নিক্ষেপ করেননি; বরং আল্লাহ নিক্ষেপ করেছেন।"

মানুষের কাছে যখন প্রতীয়মান হয়ে যায় যে, নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের সবকিছুই আল্লাহ তা'আলার আদেশের অনুগত, তখন শয়তান তার কাছ থেকে নিরাশ হয়ে ফিরে যায় এবং তার তাওহীদে জড়পদার্থের অংশীদারিত্ব মিশ্রিত করতে পারে না। শয়তান তখন অন্য উপায় অবলম্বন করে। অর্থাৎ, প্রাণিকুলের ক্ষমতার প্রতি মানুষের মনোযোগ আকৃষ্ট করে এবং বলে— সবকিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়— এ কথা তুমি কেমন করে বিশ্বাস করতে পারলে? দেখ, অমুক ব্যক্তি তার ক্ষমতা বলে তোমাকে রূযী-রোযগার দেয়। সে ইচ্ছা করলে তা বন্ধও করে দিতে পারে। বাদশাহ ইচ্ছা করলে তোমার গর্দান উড়িয়ে দিতে পারে এবং ইচ্ছা করলে ক্ষমাও করতে পারে। অতএব, বাদশাহকে ভয় করা উচিত এবং তাঁর কাছেই আশা করা উচিত। কেননা, তুমি তাঁর অধীন। শয়তানের এই প্ররোচনায় অনেক মানুষের পা পিছলে যায়। তবে আল্লাহ তা'আলার খাঁটি বান্দার উপর শয়তানের কোন প্রভাব নেই। তারা অন্তর্দৃষ্টিতে দেখে, লেখক অনুগত ও বাধ্য। কিন্তু যে ব্যক্তির অন্তর ইসলামের জন্য আল্লাহর নূর দ্বারা উন্মোচিত হয়নি, তার অন্তর্দৃষ্টি আকাশ ও পৃথিবীর মহাপ্রভুকে দেখতে অক্ষম। সে দেখে না যে, এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহ সবকিছুর উপর প্রবল। পক্ষান্তরে যারা “মোশাহাদা” তথা প্রত্যক্ষকরণের স্তরে উন্নীত, আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্য নিজের কুদরত দ্বারা আকাশ ও পৃথিবীর প্রতিটি অণু-পরমাণুকে বাকশক্তি সম্পন্ন করে দেন। এ সাধকগণ এসব অণু-পরমাণু আল্লাহর উদ্দেশে যে তাসবীহ ও পবিত্রতা বর্ণনা করে, তা নিজের কানে শুনে। অবশ্য তাদের কান এরূপ কান নয়, যা ধ্বনি ব্যতীত অন্য কিছু শুনতে পারে না। এরূপ কান তো গাধারও থাকে। অতএব, যে বস্তুতে চতুষ্পদ জন্তুও শরীক, তার তেমন মূল্য নেই।




পরবর্তী পর্ব

তাওয়াক্কুলের ক্রিয়াকর্ম


তাওয়াক্কুল ও এর ফযীলত



তাওহীদ ও তাওয়াক্কুল পর্ব- ১
এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
তাওয়াক্কুল 
তাওয়াক্কুল ধর্মের মনযিল সমূহের মধ্যে একটি মনযিল এবং বিশ্বাসের মকাম সমুহের মধ্যে একটি অন্যতম মকাম। এটি জানার দিক দিয়ে যেমন অত্যন্ত সূক্ষ, আমলের দিক দিয়েও অত্যন্ত কঠিন। জানার দিক দিয়ে সূক্ষ হওয়ার কারণ, উপায়-উপকরণ ও কারণাদির উপর ভরসা করা পকৃতপক্ষে তাওহীদের পরিপন্থী এবং শিরকের নামান্তর। আবার এগুলো থেকে সম্পূর্ণ দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলেও শরীয়তের উপর আপত্তি উঠে। সুতরাং কারণাদির প্রতি দৃ্ষ্টি না দেয়া এবং এগুলোর উপর ভরসাও করা - এ বিষয়টি দুর্বোধ্য। তাই তাওয়াক্কুলের অর্থ এমন ভাবে হৃদয়ঙ্গম করা, যা তওহীদের অনুকূল। এবং বিবেক ও শরীয়তের সাথেও সামঞ্জ্যশীল হয়, নেহায়েত কঠিন ও সূক্ষ ব্যাপার। আল্লাহ্ তা'আলার অনুগ্রহে যে সকল আলেমের দৃষ্টিতে বস্তুনিচয়ের স্বরূপ প্রস্ফুটিত হয়েছে, তাদের ছারা এ সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হওয়ার সাধ্য কারো নেই। দিব্যজ্ঞানসম্পন্ন আলেমগণ দেখে জেনে নিয়েছেন এবং আল্লাহ্ তা'আলা তাদের দ্বারা য়েভাবে বর্ণনা করিয়েছেন, তারা সেভাবেই বর্ণনা করেছেন।

আমরা এই বিষয়বস্তু সম্পর্কে এখানে একটি ভূমিকা ও দুটি পরিচ্ছেদ লিপিবদ্ধ করব। ভূমিকায় তাওয়াক্কুলের ফযীলত এবং প্রথম পরিচ্ছেদে তাওহীদ এবং দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে তাওয়াক্কুল সম্পর্কে আলোচনা করা হবে।


তাওয়াক্কুলের ফযীলত-

আল্লাহ্ তা'আলা এরশাদ করেন, 

> "যদি তোমরা ঈমানদার হও তবে আল্লাহর উপর ভরসা কর"। 

> "ভরসাকারীদের আল্লাহর উপরই ভরসা করা উচিত"। 

> "যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, আল্লাহ্ তার জন্য যতেষ্ট"। 

> "আল্লাহ্ ভরসাকারীদের ভাল বাসেন"।


সুতরাং সেই মকামের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনাসাপেক্ষ নয়, সেখানে পৌছলে আল্লাহর ভালবাসা লাভ করা যায়। যার জন্যে আল্লাহ্ তা'আলা যতেষ্ট হন এবং যাকে তিনি ভালবাসেন, সে অত্যন্ত সফলকাম। কেননা যাকে ভালবাসা হয় তার আযাব হবেনা এবং সে দুরে ও অন্তরালে থাকবেনা। এক আয়াতে এরশাদ হয়েছে - 

>“আল্লাহ্ কি তার বান্দার জন্য যতেষ্ট নন”?

এ থেকে জানা গেল, যে ব্যাক্তি আল্লাহ্ ছাড়া অন্যকে যতেষ্ট মনে করবে, সে তাওয়াক্কুল বর্জনকারী হবে। আরও এরশাদ হয়েছে - 

>"যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, আল্লাহ্ পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়"। অর্থাত তিনি এমন শক্তিধর যে, কেউ তার আশ্রয়ে এলে তিনি তাকে লাঞ্ছিত করেন না। আর তিনি এমন কৌশলী যে, কেউ তার কৌশলের উপর ভরসা করলে তিনি তাকে নিরাশ করেন না।

আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন - 

>“তোমরা আল্লাহ্ ছাড়া অন্য যাদের এবাদত কর তারা তোমাদের মতই বান্দা”।

এতে বলা হয়েছে আল্লাহ ছাড়া সবাই তোমাদের মত অভাবগ্রস্ত। অতএব তাদের উপর কেমন করে ভরসা করা যায়? আরো এরশাদ হয়েছে - 

>“তোমরা আল্লাহ্ ছাড়া যাকে পূজা কর, তারা তোমাদের রুযীর মালিক নয়। অতএব তোমরা আল্লাহর কাছে রুযী অন্বেষন কর এবং তার এবাদত কর”। 

অন্যত্র বলা হয়েছে - 

>“নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের ধণভান্ডার আল্লাহরই; কিন্তু কপট বিশ্বাসীরা তা বুঝেনা”।

এসব আয়াত ছাড়াও কোরআন মজীদে তাওহীদ সম্পর্কে উল্লেখিত আয়াত সমুহে এ কথাই বলা হয়েছে যে, অন্যের প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করে প্রবল প্রতাপশালী এক আল্লাহর উপরই ভরসা কর।


তাওয়াক্কুল সম্পর্কে হাদিস—

হাদীস গ্রন্থসমূহেও তাওয়াক্কুল সম্পর্কে অনেক রেওয়ায়েত বর্ণিত রয়েছে। হযরত ইবনে মাসুদের এক রেওয়ায়েতে রসুলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী  ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন : “আমাকে হজ্জের মৌসুমে উম্মতসমুহ দেখানো হয়েছে। আমি আমার উম্মতকে দেখেছি, তাদের দ্বারা সকল পাহাড়-পর্বত, উচ্চভূমি ও নিম্নভূমি ভর্তি হয়ে গেছে। তাদের সংখ্যাধিক্য দেখে আমার বিস্ময়ের অবধি থাকেনি। অতপর আমাকে প্রশ্ন করা হল : আপনি সন্তুষ্ট হয়েছেন? আমি বললাম হ্যা অবশ্যই। অতঃপর বলা হল : এদের সাথে আরো সত্তর হাজার বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। 

সাহাবায়ে কেরাম আরয করলেন : ইয়া রাসুলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী  ওয়া সাল্লাম) তারা কারা? তিনি বললেন, যারা অঙ্গে দাগ দেয়না, ভাবী শুভাশুভ বিশ্বাস করেনা এবং নিজের পালনকর্তার উপর ভরসা করে। একথা শুনে ওকাশা ইবনে মুহসিন দাড়িয়ে আরয করলেন। ইয়া রসুলআল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী  ওয়া সাল্লাম) আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যাতে তিনি আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করে দেন। 

রসুলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী  ওয়া সাল্লাম) দোয়া করলেন হে আল্লাহ্ তাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। এর পর অপর এক ব্যক্তি দাড়িয়ে বলল : আমার জন্যও দোয়া করুন। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী  ওয়া সাল্লাম) বললেন এ দোয়ায় ওকাশা অগ্রগামী হযে গেছে।


এক হাদিসে বর্ণিত আছে  - “যদি তোমরা আল্লাহ তা'আলার উপর যথার্থ ভরসা কর তবে আল্লাহ পাখীদের মত তোমাদেরকেও রিযিক দেবেন। পাখীরা ভোরে ক্ষুধার্থ অবস্থায় নীড় ত্যাগ করে এবং সন্ধ্যায় উদরপূর্তি করে ফিরে আসে”।

এক হাদীসে বলা হয়েছে- “যে ব্যক্তি নিরবচ্ছিন্নভাবে আল্লাহ্ তা'আলার হয়ে যায়, আল্লাহ্ তাকে যাবতীয় পরিশ্রম থেকে রক্ষা করেন এবং ধারণাতীত যায়গা থেকে রিযিক দান করেন। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি দুনিয়ার হয়ে যায় আল্লাহ্ তাকে দুনিযার হাতেই ছেড়ে দেন”। 

রসুলে আকরাম (সল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন- যে ব্যক্তি সবার চাইতে অধিক বিত্তবান হওয়া পছন্দ করে, তার উচিত নিজের সামনের বস্তুর তুলনায় আল্লাহ্ তা'আলার নিকটবর্তী বস্তুর উপর অধিক ভরষা করা। বর্ণিত আছে রসুল (সল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর পরিবারের লোকজন যখন উপবাসের সন্মুখীন হতেন, তখন তিনি বলতেন : তোমরা নামাজের জন্য দাড়িযে যাও। তিনি আরও বলতেন : আমার পালনকর্তা আমাকে এ নির্দেশই করেছেন। সেই মতে কুরআন পাকে এরশাদ হয়েছে : আপনি আপনার পরিবারবর্গকে নামাজের নির্দেশ দিন এবং আপনি তাতে অটল থাকুন।


এক হাদিসে বলা হয়েছে- যে তাবীজগন্ডা করায় সে তাওয়ক্কুল করেনা। অর্থাত কুরআন মজিদ ও শরীয়তের সাধারণ নীতি অনুযায়ী তাবীজগন্ডা করানো যদিও জায়েয; কিন্তু এদিকে মোটেই ভ্রূক্ষেপ না করা তাওয়ক্কুলের দাবি।

কথিত আছে হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস্সালাম-কে যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হচ্ছিল, তখন জিবরাঈল (আঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেন : আপনার কোন প্রয়োজন আছে কি ? তিনি বললেন আছে, কিন্তু তোমার কাছে নয়। একথা বলার কারণ এই যে, তাকে যখন আগুনে নিক্ষেপ করার জন্য ধরা হয়েছিল, তখন তিনি বলেছিলেন : আল্লাহই আমার জন্য যতেষ্ট। তিনি চমৎকার কার্যনির্বাহী। এই উক্তি বাস্তবায়িত করার জন্যই তিনি জিবরাঈল (আঃ)-কে একথা বলেছিলেন। তার এই কথা রক্ষা করার প্রতি ইঙ্গিত করেই কোরআন পাকে এরশাদ হয়েছে : "সেই ইব্রাহীম, যে তার কথা রক্ষা করেছিল"।


আল্লাহ্ তা'আলা হযরত দাউদ আলাইহিস্সালাম-এর প্রতি ওহী প্রেরণ করেন যে, হে দাউদ ! যে ব্যক্তি কেবল আমার মযবুত রশি ধারণ করবে, মানুষের সাথে কোন সম্পর্ক রাখবে না, তার সাথে নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের সবাই প্রবঞ্চনা করলেও আমি তার নিষ্কৃতির পথ বের করে দিব।


তাওয়াক্কুল সম্পর্কে মনীষীগণের উক্তি

তাওয়াক্কুল সম্পর্কে মনীষীগণের উক্তি এই যে, একবার হযরত ইবরাহীম খাওয়াস এই আয়াত পাঠ করেন : আল্লা্র উপর ভরষা কর, যিনি চিরজীবী- কখনো মৃত্যুবরণ করেন না। অতঃপর তিনি বললেন : এ আয়াতের পর আল্লাহ ছারা আর কারো কাছে ভিক্ষা চাওয়া বান্দার উচিত নয়। 

জনৈক আলেম বলেন : মানবের পক্ষে নিন্দনীয় রিযিকের অন্বেষনে নিজের ফরয কর্ম থেকে গাফেল হয়ে পড়া এবং পরকালের অধঃপতন ডেকে আনা উচিত নয়। সে দুনিয়াতে রিযিক ততটুকুই পাবে যতটুকু লিখা হয়েছে। 

ইয়াহিয়া ইবনে মুয়ায বলেন : যখন মানুসের কাছে অন্বেষন ছাড়াই রিযিক আসে, তখন বুঝা যায়, রিযিকের প্রতিও মানুষ খুঝে নেয়ার নির্দেশ রয়েছে। 

ইবরাহীম ইবনে আদহাম বলেন : আমি জনৈক দুনিয়াত্যাগী দরবেশকে প্রশ্ন করলাম : তোমার রিযিকের উৎস কি? সে উত্তরে বলল : এটা আমার জানার বিষয় নয়। পরওয়ারদেগারের কাছে জিজ্ঞাসা কর, তিনি কোথা থেকে আমার রিযিক দেন (খাওয়ান)? 

হরম ইবনে হাব্বান হযরত ওয়ায়েস করণীকে জিজ্ঞেস করেন : আপনি কোথায় থাকেন ? তিনি সিরিয়ার দিকে ইশারা করলেন। হরম আবার প্রশ্ন করলেন : জীবিকা কিভাবে চলে? তিনি উত্তরে বললেন : সে সব অন্তরের জন্য পরিতাপ, যাতে সন্দেহ মিস্রিত রয়েছে। উপদেশ তাদের কি উপকার হবে ? 



পরবর্তী পর্ব

তাওহীদের মাহাত্ন্য ও স্থর


অন্তর বা হৃদয় (২০) শয়তানের বিভিন্ন রূপ



অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ২০) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

শয়তানের বিভিন্ন রূপ
আল্লাহ্ তা’আলা মানব ও জিনকে তিন শ্রেণীতে সৃষ্টি করেছেন—
হযরত আবু দারদার রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন :
“আল্লাহ তাআলা জিনকে তিন শ্রেণীতে সৃষ্টি করেছেন। 
এক শ্রেণী হচ্ছে সর্প, বিচ্ছু ও কীটপতঙ্গ। 
আরেক শ্রেণী হচ্ছে শূন্যস্থিত বায়ুর ন্যায় । 
আরেক শ্রেণীর কারণে সওয়াব ও আযাব দেয়া হয়। 
মানুষকেও আল্লাহ তাআলা তিন শ্রেণীতে সৃষ্টি করেছেন। 
এক শ্রেণী চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায়। যেমন আল্লাহ্ নিজে বলেন : তাদের অন্তর আছে, যদ্দ্বারা তারা হৃদয়ঙ্গম করে না; তাদের চক্ষু আছে, যদ্দ্বারা দেখে না এবং তাদের কর্ণ আছে, যদ্দ্বারা শ্রবণ করে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায়; বরং আরও নিকৃষ্ট। 
আরেক শ্রেণী এমন, যাদের দেহ মানুষের দেহের মত; কিন্তু আত্মা শয়তানদের মত। 
আরেক শ্রেণী তারা, যারা কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার ছায়ায় থাকবে। সেদিন আল্লাহ তাআলার ছায়া ছাড়া কোন ছায়া হবে না।
ওহায়ব ইবনুল ওরদ বলেন : শয়তান একবার হযরত ইয়াহইয়া (আঃ)-এর খেদমতে এসে বলল : 
আমি আপনাকে উপদেশ দিতে চাই। তিনি বললেন : তোর উপদেশের কোন প্রয়োজন আমার নেই। তবে আদম সন্তানদের অবস্থা বর্ণনা কর। শয়তান বলল : আমাদের কাছে আদম সন্তানরা তিন ভাগে বিভক্ত। 
এক প্রকার তারা, যাদের কাছে আমরা যাই এবং প্ররোচনা দিয়ে বশীভূত করি; কিন্তু তারা এস্তেগফার ও তওবা করতে শুরু করে। ফলে আমাদের জমানো খেলা পণ্ড হয়ে যায়। পুনরায় যদি আমরা কিছু প্রচেষ্টা চালাই, তবে তারা পরেও তাই করে। এ প্রকার মানুষ আমাদের জন্যে খুবই কঠিন। 
দ্বিতীয় প্রকার মানুষ আমাদের হাতে এমন থাকে, যেমন খেলোয়াড়ের হাতে বল থাকে। তাদেরকে আমরা যেদিকে ইচ্ছা পরিচালনা করি। এদের ব্যাপারে আমাদের কোন ভাবনা নেই। 
তৃতীয় প্রকার তারা, যারা আপনার মত নিষ্পাপ। তাদের উপর আমাদের কোন কারসাজি চলে না।
প্রকাশ থাকে যে, শয়তান আসল আকৃতিতেও দৃষ্টিগোচর হয় এবং বিভিন্ন আকৃতিতেও। তবে শয়তান সকলের দৃষ্টিগোচর হয় না। ফেরেশতাগণের অবস্থাও তদ্রূপ। তাদের আসল আকৃতিও আছে। নবুওয়তের নূর দ্বারা তাদের আসল আকৃতি দেখা যায়। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) হযরত জিব্রাঈলকে আসল আকৃতিতে মাত্র দু'বার [বা একবার] দেখেছিলেন। একবার তিনি স্বয়ং হযরত জিব্রাঈলকে তার আসল আকৃতি দেখানোর জন্যে অনুরোধ করেছিলেন। সেমতে জিব্রাঈল হেরা পর্বতে আসল আকৃতিতে আত্মপ্রকাশ করেন। দ্বিতীয়বার মেরাজের রাতে সিদরাতুল মুন্তাহায় তাকে আসল আকৃতিতে দেখেন। 
[দ্বিতীয় প্রকারের মধ্যে মতভেদ আছে। মূলত মেরাজের রাতে আল্লাহ্ তা’আলাকেই দেখেছিলেন]

এছাড়া অন্যান্য সময় জিব্রাঈল হযরত দেহইয়া কালবী (রাঃ)-এর আকৃতিতে রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর সামনে আগমন করেছেন ৷ দেহইয়া কালবী (রাঃ) নেহায়েত সুশ্রী ছিলেন।

অধিকাংশ সময় কাশফবিশিষ্ট বুযুর্গগণের সামনে আসল আকৃতির মিছাল তথা নমুনা ভেসে উঠে। উদাহরণতঃ শয়তান জাগ্রত অবস্থায় আকৃতি ধারণ করে তাদের দৃষ্টির সামনে আসে। তখন তারা শয়তানকে দেখেন এবং কথাও শুনেন। বলাবাহুল্য, কাশ্ফবিশিষ্ট বুযুর্গগণ জাগ্রত অবস্থায় এমন বিষয় জানতে পারেন, যা অন্যরা কেবল স্বপ্নেই জানতে পারে। 

হযরত ওমর ইবনে আবদুল আযীয বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার কাছে এই মর্মে দোয়া করে- ইলাহী, আমাকে মানুষের অন্তরের সেই স্থান দেখান যেখানে শয়তান থাকে। এরপর সে স্বপ্নে দেখল, এক ব্যক্তির দেহ স্বচ্ছ স্ফটিকের মত; অর্থাৎ তার ভিতরের সবকিছু বাইরে থেকে দেখা যায়। শয়তান ব্যাঙের আকৃতিতে তার বাম ঝুটিতে কাঁধ ও কানের মধ্যস্থলে বসে আছে। সে তার চিকন ও লম্বা শুঁড় লোকটির অন্তরে প্রবেশ করিয়ে সেখান থেকেই কুমন্ত্রণা দিচ্ছে। লোকটি যখন যিকর করে, তখন শয়তান সরে যায়। এমনি ধরনের ব্যাপার কখনও জাগ্রত অবস্থায় হুবহু দেখা যায়। সেমতে জনৈক কাশফবিশিষ্ট বুযুর্গ দেখেন, শয়তান কুকুরের আকৃতি ধারণ করে মৃতের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে এবং মানুষকে সেদিকে আহ্বান করছে। অর্থাৎ, তিনি দুনিয়াকে মৃতের আকারে দেখতে পান।


পরবর্তী পর্ব-
যিকিরের সময় কুমন্ত্রণা ছিন্ন হয় কি না

অন্তর বা হৃদয় (১৯) বিভিন্ন অপকর্মে বিভিন্ন শয়তান রয়েছে



অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ১৯) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

বিভিন্ন অপকর্মে বিভিন্ন শয়তান রয়েছে  
একই শয়তান মানুষকে বিভিন্ন পাপাচারের প্রতি আহ্বান করে, না আলাদা আলাদা পাপাচারের জন্যে আলাদা আলাদা শয়তান রয়েছে- এ বিষয়টি জানা এলমে মোয়ামালায় মোটেই জরুরী নয়। এখানে জরুরী হচ্ছে শয়তান থেকে আত্মরক্ষা করা এবং আপন কাজে ব্যস্ত থাকা। কথায় বলে, আম খাও- বৃক্ষ গণনা করো না। এতদসত্ত্বেও বিভিন্ন রেওয়ায়েত ও অন্তর্দৃষ্টি দ্বারা এ সম্পর্কে যা জানা গেছে, তা লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে।প্রত্যেক প্রকার গোনাহের জন্যে একটি করে নির্দিষ্ট শয়তান রয়েছে। সেই বিশেষ গোনাহের প্রতি আহ্বান করাই তার কাজ। এই হিসাব অনুযায়ী শয়তানের অসংখ্য দল রয়েছে। কেননা, ঘটনার বিভিন্নতা থেকে কারণের বিভিন্নতা জানা যায়। এ সম্পর্কিত রেওয়ায়েতগুলো নিম্নে উদ্ধৃত করা হল।
হযরত মুজাহিদ বলেন : শয়তানের সন্তান পাঁচটি। তাদের প্রত্যেককে এক এক কাজ সোপর্দ করা হয়েছে। 
এক সন্তানের নাম ছিবর। তাকে বিপদাপদের কাজ দেয়া হয়েছে। সুতরাং হা-হুতাশ করা, পরিধানের বস্ত্র ছিন্ন করা, বিলাপ করা ইত্যাদি সব তারই প্ররোচনায় হয়ে থাকে। 
দ্বিতীয় সন্তানের নাম আওয়ার। তার কাজ হচ্ছে যিনার প্রতি উস্কানি দেয়া। 
তৃতীয় মবসূত, যাকে মিথ্যাচারের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। 
চতুর্থ ওয়াসেম, সে গৃহে যেয়ে মানুষের সামনে আত্মীয়-স্বজনের দোষত্রুটি পেশ করে এবং তাকে তাদের প্রতি ক্ষুব্ধ করে তোলে। 
পঞ্চম জলম্বুর, সে বাজারে থাকে এবং সকল প্রকার গোলযোগ সংঘটিত করে। 

শয়তানের ন্যায় ফেরেশতাদের মধ্যেও প্রাচুর্য রয়েছে। হযরত আবু উমামা বাহেলীর রেওয়ায়েতে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন : 

“মুমিনের উপর একশ' ষাট জন ফেরেশতা নিয়োজিত আছে। তারা তার উপর থেকে এমন বিষয় প্রতিহত করে, যার সাধ্য তার নেই। তন্মধ্যে চোখের জন্যে সাত জন ফেরেশতা রয়েছে, যারা এমনভাবে প্রতিহত করে, যেমন গ্রীষ্মকালে মধুর পেয়ালা থেকে মাছি প্রতিহত করা হয়। যাকে প্রতিহত করা হয়, তা যদি তোমাদের দৃষ্টিগোচর হয়, তবে দেখবে, সে প্রত্যেক নিম্নভূমি ও পাহাড়ের উপর বাহু প্রসারিত এবং মুখ বিস্তৃত করে রয়েছে। যদি মুমিন বান্দাকে এক মুহূর্তের জন্যেও তার নিজের দায়িত্বে ছেড়ে দেয়া হয়, তবে শয়তানরা তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে যাবে।”

আইউব ইবনে ইউনুস বর্ণনা করেন- আমি জেনেছি, আদম সন্তানের সাথে জিন সন্তানও জন্মগ্রহণ করে। 
জাবের ইবনে আবদুল্লাহ থেকে বর্ণিত আছে- হযরত আদম (আঃ) পৃথিবীতে অবতরণ করে আল্লাহর কাছে আরজ করলেন, হে আল্লাহ, তুমি শয়তানকে আমার শত্রু করে দিয়েছ। এখন তোমার সাহায্য না হলে আমি তার বিরুদ্ধে জয়ী হতে পারব না। এরশাদ হল : তোমার যে সন্তান হবে, তার উপর একজন ফেরেশতা নিযুক্ত করা হবে। তিনি আরজ করলেন : আরও বেশী দান করা হোক। আদেশ হল : যদি কেউ একটি পাপ করে, তবে এক পাপেরই শাস্তি ভোগ করবে; কিন্তু পুণ্যের প্রতিদান দশ গুণ থেকে যত বেশী ইচ্ছা আমি দেব। এরপর আরও বেশী সাহায্যের আবেদন করলে আল্লাহ বললেন : যতক্ষণ দেহে আত্মা থাকবে, তওবার দরজা বন্ধ হবে না। অপর দিকে শয়তান আল্লাহ তা'আলার দরবারে আরজ করল : ইলাহী, তুমি মানুষকে আমা থেকে শ্রেষ্ঠ করেছ। এখন আমাকে সাহায্য করা না হলে আমি কিরূপে বিজয়ী হব? এরশাদ হল : আদমের ঘরে যে সন্তান হবে, তার সাথে সাথে তোরও সন্তান হবে। সে আরজ করল, আরও বেশী সাহায্য দান করা হোক। আদেশ হল : দেহে যেমন রক্ত চলাচল করে, তেমনি তুইও তাদের শিরা-উপশিরায় চলাচল করবি এবং তাদের বক্ষে আসন করে নিবি। শয়তান আরও সাহায্যের আবেদন করলে আল্লাহ তা'আলা বললে, “তাদের বিরুদ্ধে তোর অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী ডেকে আন। ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে তাদের শরীক হয়ে যা এবং তাদেরকে ওয়াদা দে। শয়তান তাদেরকে প্রবঞ্চনা ছাড়া কোন ওয়াদা দেয় না।



অন্তর বা হৃদয় (১৮) দোয়া কবুল না হবার কারণ


অন্তর বা হৃদয় (পর্ব- ১৮) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

দোয়া কবুল না হবার কারণ–
এক আয়াতে বলা হয়েছে- “তোমরা আমাকে ডাক, আমি সাড়া দেব।”- 

এই আয়াত অনুযায়ী দোয়া করা হয়, কিন্তু কবুল হয় না। এমনিভাবে আল্লাহর যিকির করার পরও শয়তান দূর হয় না। কেননা, যিকির ও দোয়ার শর্তসমূহ অনুপস্থিত থাকে। 

হযরত ইবরাহীম ইবনে আদহামকে কেউ জিজ্ঞেস করলঃ বলুন, আমাদের দোয়া কবুল হয় না কেন, অথচ আল্লাহ বলেছেন- তোমরা দোয়া কর, আমি কবুল করব? তিনি জওয়াব দিলেন, তোমাদের অন্তর মৃত। 

প্রশ্ন করা হল : অন্তর মৃত হওয়ার কারণ কি? 
তিনি বললেন : আটটি অভ্যাস এর কারণ। 
১। তোমরা আল্লাহর হক জেনেও তা পালন কর না। 
২। তোমরা কোরআন পাঠ কর, কিন্তু তদনুযায়ী আমল কর না। 
৩। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে এয়া আলিহী  ওয়া সাল্লাম)-এর মহব্বত দাবী কর; কিন্তু তাঁর সুন্নত পালন কর না। 
৪। মৃত্যুকে ভয় কর, কিন্তু তার জন্যে প্রস্তুতি গ্রহণ কর না। 
৫। আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ হচ্ছে তোমরা শয়তানকে শত্রু মনে কর; কিন্তু তোমরা গোনাহের কাজে তার সাথে মিত্রতা কর। 
৬। তোমরা দোযখকে ভয় কর বলে দাবী কর; কিন্তু নিজেকে তাতে নিক্ষেপ করেছ। 
৭। জান্নাতকে মনে প্রাণে কামনা কর; কিন্তু তার জন্যে কোন কাজ কর না। 
৮। সকালে ঘুম থেকে উঠেই নিজের দোষসমূহ পশ্চাতে ফেলে দাও, আর অন্যের দোষ খুঁজতে শুরু কর। এসব কারণে আল্লাহ তা'আলা নারাজ হয়ে গেছেন। কাজেই দোয়া কবুল করবেন কিরূপে?


বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...