রবিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৩

অপ্রিয় বাক্য শ্রবণকারীর কর্তব্য

 

ক্রোধ, বিদ্বেষ ও ঈর্ষা (পর্ব- ৬)
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
অপ্রিয় বাক্য শ্রবণকারীর কর্তব্য

কাহারও অত্যাচার বা অপ্রিয় বাক্যের উত্তর না দিয়া নীরব থাকাই উত্তম। কিন্তু এইরূপ স্থলে নীরব থাকা ওয়াজিব নহে। কিন্তু প্রত্যেক কথার জওয়াব দিবারও অনুমতি নাই। গালির পরিবর্তে গালি দেওয়া এবং গীবতের পরিবর্তে গীবত করা জায়েয নহে। কেননা, এই সমস্ত কারণে শরীয়তের শাস্তি বিধান অপরাধীর উপর ওয়াজিব হইয়া পড়ে। কিন্তু কটু বাক্যের উত্তরে এমন কটুবাক্য বলার অনুমতি আছে যাহাতে মিথ্যার লেশমাত্রও নাই। ইহা কেছাছ সদৃশ্য। (অপরাধ প্রবণতা নিবারণের উদ্দেশ্যে তুল্য পরিমাণ প্রতিশোধ গ্রহণ ও যথাবিহিত শাস্তির বিধানকে কেছাছ বলে)।


রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন- 

>“যে দোষ তোমার মধ্যে আছে ইহার উল্লেখ করিয়া তোমাকে কেহ গালি দিলে তাহার দোষ উল্লেখ করত উত্তর দিও না।” 

কিন্তু এই হাদীসের নির্দেশ অনুসারে গালি বা ব্যভিচার সম্বন্ধে কোন বিষয়ের উল্লেখ না হইলে ঐ ব্যক্তির উত্তর না দিয়া বিরত থাকা ওয়াজিব নহে। ইহার প্রমাণ এই যে, রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন-

>“পরস্পর ঝগড়ার সময় যাহা বলা হইয়া থাকে ইহার পাপ অত্যাচারিত ব্যক্তি সীমা অতিক্রম না করা পর্যন্ত আরম্ভকারীর উপর থাকে।”


হযরত আয়েশা রদিয়াল্লাহু আন্হা বলেন- “রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) আমাকে অধিক ভালবাসেন এবং আমার প্রতি তাঁহার আসক্তি অত্যধিক বলিয়া আমার সপত্নীগণ হযরত ফাতিমা রাযিয়াল্লাহু আন্হাকে হযরত (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট নিবেদন করিয়া বলিয়া পাঠান যেন তিনি সকলকে তুল্যরূপে ভালবাসেন। হযরত ফাতিমা রদিয়াল্লাহু আন্হা আসিয়া হযরত (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-কে নিদ্রিত দেখিতে পাইলেন। তিনি জাগ্রত হইলে হযরত ফাতিমা রদিয়াল্লাহু আন্হা তাঁহাকে নিবেদন জানাইলেন। হযরত (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) আবার বলিলেন- 'আমি আয়েশাকে অত্যন্ত ভালবাসি, তোমরাও তাহাকে তদ্রূপ ভালবাস।' হযরত ফাতিমা রদিয়াল্লাহু আন্হা প্রত্যাবর্তন করিয়া আমার সপত্নীদিগকে সমস্ত কথা জানাইলেন, কিন্তু তাঁহারা ইহাতে সন্তুষ্ট হইলেন না। আমার অপর সপত্নী হযরত যয়নব রদিয়াল্লাহু আন্হাকে সকলে মিলিয়া হযরত (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট পাঠাইলেন। তাঁহাকে হযরত আমার সমান ভালবাসিতেন বলিয়া তিনি দাবি করিতেন। তিনি (হযরত যয়নব) আসিয়াই অপ্রিয় বাক্যে বলিতে আরম্ভ করিলেন- 'আবূ বকরের কন্যা এইরূপ, আবূ বকরের কন্যা ঐরূপ।' আমি চুপ ছিলাম। তৎপর রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) জওয়াব দিবার জন্য আমাকে অনুমতি দিলেন। অনুমতি লাভ করিয়া আমিও ঐ প্রকার অপ্রিয় বাক্যে জওয়াব দিতে লাগিলাম। জওয়াব দিতে আমার মুখ শুষ্ক হইয়া গেল। অনন্তর তিনি (হযরত যয়নব) পরাজিত হইলেন। রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) তখন বলিলেন- “হে যয়নব, তিনিই আবূ বকরের কন্যা।” অর্থাৎ তর্ক-বিতর্কে তুমি তাঁহাকে পরাস্ত করিতে পারিবে না। উল্লিখিত ঘটনা হইতে প্রমাণিত হয় যে, মিথ্যা না হইয়া সত্য হইলে অপ্রিয় কথায় উত্তর দিবার অনুমতি আছে; যেমন- হে নির্বোধ, হে জাহিল, লজ্জা কর, নীরব থাক, প্রভৃতি। এইরূপ বাক্য কটু হইলেও অসত্য নহে। কারণ, কেহই একেবারে নির্বুদ্ধিতা ও অজ্ঞতাশূন্য হইতে পারে না। কিন্তু অশ্লীল কথা যেন রসনা হইতে বাহির না হয় তজ্জন্য ক্রোধের সময় বিশেষ প্রয়োজন হইলে এমন কথা বলিবার অভ্যাস করিবে যাহা নিতান্ত জঘন্য নহে; যেমন হতভাগ্য, অপদার্থ, অসভ্য, গাধা ইত্যাদি।

তবে ঝগড়া-বিবাদকালে উত্তর দিলে ন্যায়ের গণ্ডির ভিতর থাকা নিতান্ত দুষ্কর। এইজন্য উত্তর না দিয়া নীরবতা অবলম্বন করাই উত্তম।


রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) উনার সম্মুখে এক ব্যক্তি হযরত আবূ বকর রদিয়াল্লাহু আনহুকে অপ্রিয় বাক্য বলিতে লাগিল। কিন্তু তিনি নীরব ছিলেন। তিনি অবশেষে উত্তর দিতে আরম্ভ করিলে রাসূলে মাকবুল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) উঠিয়া দাঁড়াইলেন। হযরত আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) নিবেদন করিলেন- “ওগো আল্লাহর রাসূল, এতক্ষণ ত আপনি বসিয়া ছিলেন, কিন্তু আমি উত্তর দিতে আরম্ভ করিতেই আপনি গাত্রোখান করিলেন?” তিনি বলিলেন-

>“তুমি নীরব থাকা পর্যন্ত ফেরেশতাগণ তোমার পক্ষ হইতে জওয়াব দিতেছিল। (তুমি জওয়াব দিতে আরম্ভ করিলে) শয়তান আগমন করিল। শয়তানের সহিত উপবেশন করাকে আমি ঘৃণা করি।"

রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন- 

>“আল্লাহ্ বিভিন্ন ধাতে মানব সৃষ্টি করিয়াছেন। কতক লোক এরূপ যে, তাহারা বিলম্বে ক্রুদ্ধ হয় ও বিলম্বে শান্ত হয়, কতক লোক ইহার বিপরীত, তাড়াতাড়ি ক্ষুদ্ধ হয় এবং তাড়াতাড়ি শান্ত হয়। তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম যে বিলম্বে ক্ষুদ্ধ হয় এবং তাড়াতাড়ি শান্ত হয়। আর তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি নিকৃষ্ট যে তাড়াতাড়ি ক্রুদ্ধ হয়, কিন্তু বিলম্বে শান্ত হইয়া থাকে।”



পরবর্তী পর্ব

গুপ্ত ক্রোধের আপদ এবং বিদ্বেষজাত মনোভাব

ক্রোধ-উপশমমূলক উপায়



ক্রোধ, বিদ্বেষ ও ঈর্ষা (পর্ব- ৫)
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

ক্রোধ-উপশমমূলক উপায়

ক্রোধের মূল কারণসমূহ উৎপাটনের জন্য উল্লিখিত ব্যবস্থা জোলাপ সদৃশ। উহা অবলম্বনেও ক্রোধের মূলোৎপাটন করিতে না পারিলে ক্রোধ উত্তেজিত হইয়া উঠিলেই তৎক্ষণাত শান্ত করা আবশ্যক। এইজন্য এক প্রকার মবরাম্ল শরবত তাহাকে পান করিতে হইবে। ইহা নম্রতার মাধুর্য ও সহিষ্ণুতার অম্লত্বের মিশ্রণে প্রস্তুত হইয়া থাকে। আর ইলম ও আমলের সহযোগে একই মাজন প্রস্তুত করিলে, ইহা সকল কুস্বভাবের মহৌষধ হইয়া থাকে।


ক্রোধ-প্রতিষেধকরূপে ইলম

ক্রোধের অনিষ্টকারিতা ও ইহা নিবারণের সওয়াব সম্পর্কে কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফের উক্তিসমূহ বুঝিয়া হৃদয়ঙ্গম করিয়া লইবে। ইহাই ক্রোধ প্রতিষেধক জ্ঞানমূলক উপায়। এইরূপ কতিপয় উক্তি উপরে বর্ণিত হইয়াছে। তৎপর ভাবিবে, অন্যের উপর তোমার যতটুকু ক্ষমতা রহিয়াছে, এই তুলনায় তোমার উপর আল্লাহর ক্ষমতা অনন্ত ও অসীম। তুমি ক্রোধে উত্তেজিত হইয়া অপরের কতটুকু ক্ষতি করিতে পারিবে? আল্লাহ্ তোমার ক্ষতি অনায়াসে অতি সহজে করিতে পারেন। অদ্য তুমি কাহারও উপর ক্রুদ্ধ হইলে কিয়ামতের দিন আল্লাহর ক্রোধ হইতে তুমি কিরূপে রক্ষা পাইবে?


একদা রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) এক ভৃত্যকে কোন কাজ উপলক্ষে পাঠাইলেন। ভৃত্য অত্যন্ত বিলম্বে ফিরিয়া আসিলে তিনি তাহাকে বলিলেন 

>“শেষ বিচার দিবস না থাকিলে আমি তোমাকে প্রহার করিতাম।” 

ইহা বলিবার পরই তিনি নিজকে সম্বোধন করিয়া মনে মনে বলিতে লাগিলেন- “তোমার কাজটি যেরূপে সম্পন্ন করা আল্লাহর ইচ্ছা ছিল, ঠিক সেইরূপে সম্পন্ন হইয়াছে; তোমার অভিপ্রায় অনুযায়ী হয় নাই, ইহাই কি তোমার ক্রোধের কারণ? তাহা হইলে ত আল্লাহর প্রভুত্বের বিরুদ্ধে ঝগড়া করা হইল!”


প্রিয় পাঠক, উল্লিখিত পারলৌকিক কারণেও ক্রোধ দমন না হইলে স্বয়ং সাংসারিক যুক্তি অবলম্বনে মনে মনে চিন্তা করিবে; তুমি উত্তেজিত হইলে প্রতিপক্ষও উত্তেজিত হইয়া তোমা হইতে প্রতিশোধ গ্রহণ করিতে পারে। শত্রুকে অবহেলা করা সমীচীন নহে। আরও মনে কর, কোন দাস বা দাসী ঠিকভাবে কর্তব্য পালন করে না, আবার কখন কখনও পলায়ন করে। ক্রোধের বশবর্তী হইয়া তাহাকে তিরস্কার করিলে সে ছলনা ও প্রতারণা করিতে পারে। আর ক্রোধের সময় মানুষ কিরূপ জঘণ্য মূর্তি ধারণ করে, ইহাও একবার স্মরণ কর। তখন তাহার বাহ্য আকার পরিবর্তিত হইয়া কুশ্রী ও কদর্য হইয়া পড়ে। সেই মূর্তি দর্শনে মনে হয় যেন, উত্তেজিত ব্যাঘ্র কোন জন্তুকে আক্রমণের উপক্রম করিয়াছে। ক্রোধের সময় মানুষের বাহ্য আকারে যেরূপ পরিবর্তন দেখা যায়, তাহার আন্তরিক অবস্থারও তদ্রূপ পরিবর্তন ঘটিয়া থাকে। তখন মনে হয় যেন তাহার ভিতরে আগুন জ্বলিতেছে। ক্রোধের সময় সে ক্ষুধিত কুকুরের ন্যায় হইয়া থাকে।

কেহ ক্রোধ দমন করিতে চাহিলে অধিকাংশ সময় শয়তান তাহাকে প্ররোচণা দিয়া বলে- “ক্রোধ দমন করিলে তোমার দুর্বলতা প্রকাশ পাইবে, অপমান হইবে, প্রভাব-প্রতিপত্তি হ্রাস পাইবে এবং লোকচক্ষে তুমি হেয় বলিয়া প্রতিপন্ন হইবে।” তখন শয়তানকে এইরূপ উত্তর দিয়া নিরস্ত করিবে- “নবীগণের (আঃ) সৎস্বভাব অর্জন এবং আল্লাহর সন্তোষ লাভে সমর্থ হইলে যে সম্মানের অধিকারী হওয়া যায়, সংসারে তদপেক্ষা অধিক সম্মানের আর কিছুই হইতে পারে না। কাহারও উপর ক্রুদ্ধ হওয়ার ফলে কল্য কিয়ামতের দিন হেয় ও তুচ্ছ হওয়া অপেক্ষা অদ্য ক্ষণস্থায়ী সংসারে হেয় ও তুচ্ছ হওয়া আমার পক্ষে উত্তম।”


ক্রোধ প্রতিষেধক জ্ঞানমূলক উপায় বর্ণনা করিতে যাইয়া উপরে কতিপয় উপমার অবতারণা করা হইল। তদ্রূপ আরও দৃষ্টান্ত তোমরা নিজে নিজেই বুঝিয়া লইবে। 


ক্রোধ প্রতিষেধক আমল 


ক্রোধের সময় বলিবে

>(আউযুবিল্লাহ্ মিনাশ-শায়তানির রাযিম)

“বিতাড়িত শয়তান হইতে আমি আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করিতেছি।” তুমি দণ্ডায়মান থাকিলে বসিয়া পড়িবে, আর বসিয়া থাকিলে শয়ন করিবে। ইহা সুন্নত। ইহাতেও ক্রোধ দমন না হইলে ঠাণ্ডা পানি দ্বারা ওযু করিবে। কেননা, রাসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন- 

>“ক্রোধ আগুন হইতে জন্মে, পানিতে ইহা দমন হয়।” 

হাদীস শরীফে উক্ত আছে- 

>“(ক্রোধের সময়) কপাল মাটিতে রাখিয়া সিজদা করিবে এবং মনে করিবে যে, তুমি মাটি হইতে সৃষ্ট, আল্লাহর নগণ্য দাস। (মাটি হইতে সৃষ্ট দাসকে মাটির ন্যায় সহিষ্ণু হওয়া আবশ্যক)। এইরূপ দাসের পক্ষে ক্রোধ শোভা পায় না।”


একদা হযরত ওমর রদিয়াল্লাহু আন্হু ক্রুদ্ধ হইলে নাকে দিবার জন্য পানি চাহিয়া বলিলেন- 

>“ক্রোধ শয়তান হইতে আসে, নাকে পানি দিলে চলিয়া যায়।” 


হযরত আবূ যর রদিয়াল্লাহু আন্হু একদা এক ব্যক্তিকে বলিলেন- 

“ইয়া ইব্‌নাল হামরা”। অর্থাৎ হে লোহিত জননীর পুত্র। এইরূপ আহ্বানে ইহাই প্রকাশ পাইল যে, ঐ ব্যক্তি দাসীর পুত্র। তৎপর রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলিলেন- “হে আবূ যর, আমি শুনিলাম, তুমি অদ্য এক ব্যক্তিকে তাহার মাতার সম্বন্ধে উল্লেখ করিয়া দোষারোপ করিয়াছ। হে আবূ যর, জানিয়া রাখ, 

>"পরহেযগারীতে অধিক না হইলে তুমি কোন কৃষ্ণ বা লোহিত মানুষ অপেক্ষা উৎকৃষ্ট নও।” 

হযরত আবূ যর রদিয়াল্লাহু আন্হু ইহা শুনিয়া ক্ষমা প্রার্থনার উদ্দেশ্যে ঐ ব্যক্তির নিকট গমন করিলেন। সেই ব্যক্তি সহাস্য বদনে তাঁহার সম্মুখে আসিয়া সালাম দিলেন।


হযরত আয়েশা রদিয়াল্লাহু আন্হা ক্রুব্ধ হইলে রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) তাঁহার নাসিকা মুবারক ধারণপূর্বক বলিতেন- হে আয়েশা, বল-


اللَّهُم رَبِ النَّبِيِّ مُحَمَّدٍ - اغْفِرْ لِي ذَنْبِي وَأَذْهِبْ غَيْظَ قَلْبِي وَأَجِرْنِي مِنْ مُضَلاتِ الْفِتْنِ

>“হে আল্লাহ, আমার নবী মুহাম্মদের  (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) প্রভু, আমার গোনাহ্ মা'ফ করুন, অন্তরের ক্রোধ দূর করিয়া দিন এবং আমাকে পথ-ভ্রান্তির বিপদাপদ হইতে রক্ষা করুন।” ক্রোধের সময় এই দোয়া পাঠ করাও সুন্নত। 

[এখানে শিক্ষনীয় যে আল্লাহ্ তা'আলাকে মুহম্মদের রব সম্বোধন করা নবী (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)  উনার শিক্ষা ।দোয়ার পূর্বে  যেমন বলা "ইয়া রব্বি মুস্তফা" বিশেষ মর্যাদার উপমা]



অপ্রিয় বাক্য শ্রবণকারীর কর্তব্য

ক্রোধ বিনাশক ব্যবস্থা

 

ক্রোধ, বিদ্বেষ ও ঈর্ষা (পর্ব- ৪)
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
ক্রোধ বিনাশক ব্যবস্থা

ক্রোধ দমনের জন্য ব্যবস্থা অবলম্বন ও সাধনা অবশ্য কর্তব্য। কারণ, ক্রোধেই অধিকাংশ মানুষকে দোযখে লইয়া যায় এবং ইহা হইতেই জগতে অশান্তি, কলহ-বিবাদ ও যুদ্ধ বিগ্রহের সৃষ্টি হয়। ক্রোধ দমনের দুইটি উপায় আছে। 

প্রথম- ক্রোধ বহিষ্কারক উপায়। ইহা জোলাপের মত ক্রোধরূপ ব্যাধির জড় ও মূল অন্তর হইতে বাহির করিয়া দেয়। 

দ্বিতীয়- ক্রোধ উপশমমূলক উপায়। ইহা ‘শিকাবীন' নামক অম্লরস ও মধু বা চিনি মিশ্রিত পানীয় সদৃশ। ইহা ব্যাধির তীব্র দোষসমূহ উপশম করে ও উগ্র স্বভাবকে সাম্যভাবাপন্ন করিয়া তোলে।


ক্রোধ বহিষ্কারক উপায়--

সর্বাগ্রে ক্রোধ সঞ্চারের কারণ নির্ণয় করিবে এবং তৎপর ইহার মূলোচ্ছেদ করিবে। ইহাই ক্রোধ বহিষ্কারক উপায়। পাঁচটি কারণে ক্রোধের সঞ্চার হয়;  যথা : (১) অহঙ্কার, (২) ওজ্ব অর্থাৎ নিজে নিজকে উত্তম ও গুণবান বলিয়া মনে করা, (৩) কৌতুক, (৪) তিরস্কার এবং (৫) ধনলিপ্সা ও প্রভুত্বপ্রিয়তা।


ক্রোধ-বহিষ্কারক উপায়ের প্রথম ধাপ-

অহঙ্কার ক্রোধ সঞ্চারের অন্যতম প্রধান কারণ। অহঙ্কারী ব্যক্তি কথাবার্তা ও কাজকর্মের অপরের নিকট হইতে প্রত্যাশিত সম্মান না পাইলেই ক্রোধে উত্তেজিত হইয়া উঠে। অতএব বিনয়ী ব্যবহারে অহঙ্কার চূর্ণ করিতে হইবে। তোমার হৃদয়ে অহঙ্কার দেখা দিলে চিন্তা করিবে, তুমি আল্লাহর একটি নগণ্য দাসমাত্র; দাসের পক্ষে অহঙ্কার শোভা পায় না। আরও বুঝিবে যে, সৎস্বভাবেই দাসত্ব হইয়া থাকে; অহঙ্কার অসৎস্বভাবের অন্তর্গত। সুতরাং অহঙ্কার দাসত্বের দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন ঘটায়। বিনয় ব্যতীত অন্য কিছুতেই অহঙ্কার বিনাশ করা যায় না।


ক্রোধ-বহিষ্কারক উপায়ের দ্বিতীয় ধাপ--

ক্রোধ সঞ্চারের দ্বিতীয় কারণ খোদপছন্দী বা নিজে নিজকে উত্তম ও গুণবান বলিয়া মনে করা। ইহা বিদূরিত করিতে হইলে স্বীয় পরিচয় লাভ করিবে। অহঙ্কার ও খোদপছন্দী দূর করিবার উপায় যথাস্থানে বণিত হইবে।


ক্রোধ-বহিষ্কারক উপায়ের তৃতীয় ধাপ – 

ক্রোধ সঞ্চারের তৃতীয় কারণ কৌতুক। কাহাকেও কৌতুক করিলে অধিকাংশ সময় সেই ব্যক্তি উত্তেজিত হইয়া উঠে। সুতরাং এইরূপ অপকর্মে সময়ের অপচয় না করিয়া বরং আখিরাতের সম্বল সংগ্রহ কার্যে ও সৎস্বভাব অর্জনে নিজকে ব্যাপৃত রাখিবে এবং কৌতুক হইতে বিরত থাকিবে। কৌতুকের ন্যায় উপহাস, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপেও ক্রোধ জন্মে। তুমি কাহাকেও উপহাস ও ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করিলে সে-ও তোমাকে তদ্রূপ করিবে। এইরূপে তোমার নিজের সম্মান নিজেই নষ্ট করিবে। অতএব এইরূপ কৌতুক, উপহাস ও ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ হইতে নিরস্ত থাকা নিতান্ত আবশ্যক।


ক্রোধ-বহিষ্কারক উপায়ের চতুর্থ ধাপ – 

কাহাকেও তিরস্কার করিলে তিরস্কারকারী ও তিরস্কৃত ব্যক্তি এই উভয়ের হৃদয়েই ক্রোধের উদ্রেক হয়। ইহা হইতে অব্যাহতি লাভের উপায় এই মনে করিবে, নিজে দোষমুক্ত না হইয়া অপরের দোষ ধরিয়া তিরস্কার করা শোভা পায় না। অপরপক্ষে, দোষমুক্ত ব্যক্তিই বা অপরকে তিরস্কার করিয়া নিজেকে কলঙ্কিত করিবে কেন? অতএব তিরস্কার করা কাহারও পক্ষে সঙ্গত নহে।


ক্রোধ বহিষ্কারক উপায়ের পঞ্চম ধাপ — 

যদিও সংসারযাত্রা নির্বাহ করিতে অধিকাংশ স্থলেই মানবের ধন, প্রভুত্ব ও মান-সম্ভ্রমের দরকার হইয়া পড়ে, তথাপি ধন-লিপ্সা ও প্রভুত্বপ্রিয়তাই ক্রোধ উৎপত্তির অন্যতম কারণ। কৃপণের নিকট হইতে এক কপর্দক গ্রহণ করিলেও সে ক্রুদ্ধ হয়, আর অতি লোভীর নিকট হইতে এক গ্রাস অন্ন লইলেও সে ক্রোধে উত্তেজিত হইয়া উঠে। ধনাসক্তি ও প্রভুত্ব কামনা মন্দ স্বভাবের অন্তর্গত এবং ক্রোধের মূল কারণ। ধনাসক্তি ও প্রভুত্ব কামনা দমনের জ্ঞানমূলক ও অনুষ্ঠানমূলক উপায় রহিয়াছে।


জ্ঞানমূলক উপায়— 

ধনাসক্তি ও প্রভুত্ব কামনার আপদ, কদর্যতা এবং ইহ-পরকালে ইহাদের অনিষ্ট সাধন সম্পর্কে সম্যক উপলব্ধি করত ইহাদের প্রতি আন্তরিক ঘৃণার উদ্রেক করিবে।


অনুষ্ঠানমূলক উপায়— 

উক্ত প্রবৃত্তিদ্বয়ের বিরুদ্ধাচরণে প্রবৃত্ত হইবে; ইহারা যে বিষয়ে তোমাকে উত্তেজিত করিতে চেষ্টা করে, ইহা হইতে তুমি বিরত থাকিবে। প্রবৃত্তির বিরুদ্ধাচরণে যে শুধু ধনাসক্তি ও প্রভুত্বপ্রিয়তা নিবৃত্ত হয় তাহাই নহে, বরং ইহা সকল প্রকার কুস্বভাব নিবারণের উপায়। ‘রিয়াযত’ বিষয় বর্ণনাকালে প্রথম অধ্যায়ে ইহার বিস্তৃত আলোচনা হইয়াছে।


ক্রোধান্ধ ব্যক্তির সংসর্গে ক্রোধ সঞ্চার—

মানব অন্তরে ক্রোধ বদ্ধমূল হওয়ার অপর একটি প্রধান কারণ রহিয়াছে। যাহারা ক্রোধকে মহিমা ও বীরত্বের কারণ বলিয়া মনে করে এবং ইহাতে গর্ব অনুভব করে, এইরূপ ক্রোধান্ধ লোকের সংসর্গে যাহারা প্রতিপালিত হয় তাহাদের অন্তরে ক্রোধরূপ ব্যাধি সংক্রামিত হয় এবং পরিশেষে ইহা তাহাদিগকে চির রুগ্ন করিয়া ফেলে। ক্রোধান্ধ ব্যক্তিগণ ক্রোধের মাহাত্ম্য বর্ণনা করিতে যাইয়া বলে- “অমুক সাধু পুরুষ এক কথায় এক ব্যক্তিকে মারিয়া ফেলিয়াছেন, অমুকের জানমাল ধ্বংস করিয়াছেন, কাহার সাধ্য যে, তাঁহার কথার প্রতিবাদ করে। সিংহপুরুষ বটে, যে কেহ তাঁহার রোষে পতিত হইয়াছে সেই ধ্বংস হইয়াছে। সিংহপুরুষ এইরূপই হইয়া থাকেন; কাহাকেও ক্ষমা করিয়া ছাড়িয়া দেওয়াকে তাঁহারা অপমান, অক্ষমতা ও অনুপযুক্ততার কারণ বলিয়া মনে করেন।” ক্রোধান্ধ ব্যক্তিগণের মুখে ক্রোধের এইরূপ প্রশংসাবাদ শ্রবণ করিয়া তাহাদের নব সঙ্গিগণের অন্তরেও পরিশেষে ক্রোধ বদ্ধমূল হইয়া পড়ে।


ক্রোধ কুকুরের স্বভাব। কিন্তু ক্রোধান্ধগণ ইহাকে বীরত্ব ও বাহাদুরির কারণ বলিয়া মনে করে। মানবের প্রশংসনীয় গুণাবলী, যাহা পয়গম্বরগণের স্বভাব, যেমন সহিষ্ণুতা, ধৈর্য, ক্ষমা প্রভৃতিকে তাহার অনুপযুক্ততা ও কাপুরুষতার লক্ষণ বলিয়া থাকে। ইহাই শয়তানের কাজ। সে প্রতারণা দ্বারা প্রশংসনীয় গুণের কুৎস রটনা করত মানুষকে সৎস্বভাব অর্জনে বিরত রাখে এবং জঘণ্য দোষের গুণকীর্তন করত অসৎস্বভাবের দিকে তাহাকে আহ্বান করে। জ্ঞানীগণ জানেন, ক্রোধের সহিত বীরত্বের কোন সম্বন্ধ নাই। তাহা হইলে অবলা নারী, অসহায় শিশু, দুর্বল বৃদ্ধ এবং রুগ্ন ব্যক্তির কখনও ক্রোধের সঞ্চার হইত না। কিন্তু ইহা অবিদিত নহে যে, তাহারা তাড়াতাড়ি উত্তেজিত হইয়া থাকে। ক্রোধ বিজয়ীগণের ন্যায় বীরপুরুষ আর নাই। নবী ও কামিল দরবেশগণই সেই বীরত্বের অধিকারী। পাহলোয়ান, তুর্কী সিপাহীগণ সিংহ-ব্যাঘ্রাদি প্রাণীর হিংস্র বলে বলীয়ান হইলেও ক্রোধ দমন ক্ষেত্রে তাহাদের কোনই বীরত্ব নাই।

প্রিয় পাঠক, এখন ভাবিয়া দেখ, নবী ও দরবেশগণের গুণে ভূষিত হওয়া তোমার পক্ষে গৌরবের বিষয়, না নির্বোধ অজ্ঞদের ন্যায় হওয়া সঙ্গত।



পরবর্তী পর্ব

ক্রোধ-উপশমমূলক উপায়

ক্রোধ উত্তেজিত হওয়ার কারণ

 

ক্রোধ, বিদ্বেষ ও ঈর্ষা (পর্ব- ৩)
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

ক্রোধ উত্তেজিত হওয়ার কারণ-
কি কারণে ক্রোধ উত্তেজিত হয় এবং কোন্ অবস্থায় গুপ্ত থাকে, উহা বুঝিয়া লওয়া দরকার। মনে কর, এক ব্যক্তির কোন বিশেষ একটি জিনিসের নিতান্ত প্রয়োজন; কিন্তু অপরে ইহা ছিনাইয়া লইতে চাহিলে প্রথমোক্ত ব্যক্তি ক্রুদ্ধ হইয়া থাকে। আর যে দ্রব্যের তাহার কোন দরকার নাই, যেমন কাহারও একটি কুকুর আছে এবং ইহা তাহার কোন উপকারেও আসে না, এরূপ স্থলে ইহা যদি কেহ অপহরণ করে বা মারিয়া ফেলে, তবে হয়ত কুকুরের মালিক ক্রুদ্ধ হইবে না। অপরপক্ষে আহার্য সামগ্রী, পরিধেয় বস্ত্র, ঘরবাড়ী, স্বাস্থ্য ইত্যাদি জীবন ধারণের অত্যাবশ্যক দ্রব্যাদি ব্যতীত মানুষ কখনও চলিতে পারে না। এমতাবস্থায়, এবং অন্ন-বস্ত্র ছিনাইয়া লইলে ক্রোধ অবশ্যই মাথা তুলিয়া দাঁড়াইবে। যাহার যত অধিক অভাব তাহার ক্রোধ তত অধিক এবং সে সেই পরিমাণে অসহায় ও দুঃখিত। মানুষ যে পরিমাণে স্বীয় অভাব ও আবশ্যকতা বর্জন করিবে সেই পরিমাণে সে আজাদী লাভ করিবে। আর যে পরিমাণে অভাব ও আবশ্যকতা বৃদ্ধি পাইবে, সেই পরিমাণে সে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকিবে। মানব সাধনার ফলে এত পরিমাণে স্বাধীনতা লাভ করিতে পারে যে, সে তখন জীবন ধারণের জন্য নিতান্ত আবশ্যক দ্রব্যাদির অভাব অনুভব করে। এই সময় মান-মর্যাদা ও ধনের অভাব তাহার মোটেই অনুভব হয় না। জগতের নানাবিধ অতিরিক্ত পদার্থের অভাব হইতেও সে তখন নিষ্কৃতি লাভ করে। সুতরাং মান-মর্যাদার হানি এবং ধন-দৌলত ও অতিরিক্ত দ্রব্যাদি হস্তগত না হওয়া বা অপহৃত হওয়ার নিমিত্ত তাহার অন্তরে তখন আর ক্রোধ উত্তেজিত হইয়া ওঠে না; ইহা তখন স্বতই লয়প্রাপ্ত হয়।
সম্মান লাভের প্রত্যাশী নহে, এমন ব্যক্তির অগ্রে অগ্রে কেহ পথ চলিলে বা সভাস্থলে তাহার অপেক্ষা উচ্চ আসনে বসিলে ইহাতে তাহার অন্তরে ক্রোধের সঞ্চার হয় না। ক্রোধোৎপত্তির কারণ অনুসন্ধান করিলে মানুষে মানুষে বিরাট প্রভেদ পরিলক্ষিত হয়। যাহাতে একের ক্রোধের সঞ্চার হয় অপরে ইহাতে লজ্জায় মাথা হেট করে। অধিকাংশ স্থানে মান-মর্যাদা ও ধন-দৌলত লইয়াই ক্রোধ উত্তেজিত হইয়া উঠে। নিতান্ত ঘৃণ্য ও তুচ্ছ ব্যাপার অবলম্বনেও কেহ কেহ ক্রুদ্ধ হয়। দাবা ও চৌসরক্রীড়া, কবুতর খেলা বা মদ্যপান প্রভৃতি নিকৃষ্ট ও জঘন্য কর্মে অভ্যস্ত লোকের এই সকল অপকর্মে কোন ত্রুটি ধরিলে তাহার ক্রুদ্ধ হইয়া উঠে। কেহ যদি এই প্রকৃতির লোককে বলে- “তুমি দাবা খেলায় তত দক্ষতা লাভ কর নাই, তুমি বেশী মদ পান করিতে অক্ষম, তবে সে ক্রুদ্ধ হয়। মান-সম্ভ্রম, ধন-দৌলত বা অন্যান্য ঘৃণ্য ও তুচ্ছ ব্যাপার অবলম্বনে যে সমস্ত ক্রোধের উৎপত্তি হয়, রিয়াযত দ্বারা মানুষ তৎসমুদয় হইতে নিষ্কৃতি লাভ করিতে পারে। কিন্তু জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি অবলম্বনে যে ক্রোধের উৎপত্তি হয় মানুষ ইহা হইতে নিস্তার লাভ করিতে পারে না এবং এই প্রকার ক্রোধের মূলোচ্ছেদ সঙ্গতও নহে।

স্থলবিশেষে ক্রোধ বাঞ্ছনীয়
মানব জীবনে নিতান্ত আবশ্যক দ্রব্যাদির অপচয় ও অপহরণজনিত ক্রোধ বাঞ্ছনীয়। কিন্তু যে স্থানে ক্রোধ মঙ্গলজনক সে স্থানে যেন মানুষ ক্রোধের উত্তেজনায় উন্মত্ত দিশাহারা না হয় এবং ধর্ম-বুদ্ধির বশীভূত থাকে, এইজন্য তাহার সাবধান হওয়া কর্তব্য। সাধনা দ্বারা মানুষ এই প্রকার ক্রোধের আজ্ঞাধীন করিতে সমর্থ হয়। ইহার মূলোৎপাটন অসম্ভব ও অসঙ্গত। রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) যে ক্রোধশূন্য ছিলেন না, ইহাই তাহার প্রকৃষ্ট প্রমাণ।

রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন- 
>“আমি (স্বভাব চরিত্রে) তোমাদের মত মানুষ; তোমরা যেরূপ ক্রোধ কর আমিও তদ্রূপ ক্রোধ করি। যদি আমি কাহাকেও অভিশাপ দেই, কটুবাক্য বলি বা আঘাত করি, তবে হে খোদা, আমার সেই কাজকে তাহার উপর তোমার রহমতের হেতু করিয়া লও।" 

হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আমর ইব্‌নে আছ রদিয়াল্লাহু আন্হু তখন নিবেদন করিলেন- “ইয়া রাসূলাল্লাহ্, আপনি ক্রুদ্ধ অবস্থায় যাহা বলিলেন উহাও আমি লিপিবদ্ধ করিতেছি।” তিনি বলেন- >“ইহাও লিখিয়া লও, যে আল্লাহ্ আমাকে সত্য রাসূল করিয়া পাঠাইয়াছেন, তাঁহার শপথ, আমি ক্রুদ্ধ হইলেও সত্য ব্যতীত কোন কথা আমার মুখ হইতে বাহির হয় না।” 

সুতরাং দেখা যাইতেছে, রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) এই কথা বলেন নাই যে, তাঁহার ক্রোধ ছিল না; বরং তাঁহারও ক্রোধ ছিল, কিন্তু ইহা সত্য ও ন্যায়-বিচারের সীমা অতিক্রম করিয়া যাইতে পারে নাই, তিনি ইহাই প্রকাশ করিয়াছেন।

একদা হযরত আয়েশা রদিয়াল্লাহু আন্হা ক্রুদ্ধ হইলেন দেখিয়া রাসূলে মাকবুল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন- “হে আয়েশা, তোমার শয়তান আসিয়াছে।” তিনি নিবেদন করিলেন- “ইয় রাসূলাল্লাহ্, আপনার কি শয়তান নাই?” উত্তরে হযরত (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বলিলেন- “হাঁ, আছে; তবে আল্লাহ্ তাহার উপর আমাকে বিজয়ী করিয়াছেন, সে আমার বশীভূত হইয়া রহিয়াছে; সৎকাজ ব্যতীত অন্য কোন কাজে সে আদেশ করে না।” এস্থলেও তিনি ইহা বলেন নাই যে, তাঁহার ক্রোধ প্রবৃত্তি ছিল না।

তাওহীদ প্রভাবে গুপ্ত ক্রোধ 
মানব হৃদয় হইতে ক্রোধের মূলোচ্ছেদ সম্ভবপর না হইলেও অবস্থাবিশেষে ইহা গুপ্ত থাকে। অল্প বা অধিক সময়ের জন্যই হউক, কাহারও হৃদয়ে তাওহীদ ভাব (আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস) প্রবল হইয়া তাহাকে তন্ময় করিয়া ফেলিলে সেই ব্যক্তি তখন যাহা কিছু সংঘটিত হইতে দেখে, উহা একমাত্র আল্লাহর দিক হইতেই সংঘটিত হইতেছে দেখিতে পায়। তেমন ব্যক্তির হৃদয়ে ক্রোধ অদৃশ্যভাবে থাকে এবং মোটেও উত্তেজিত হইয়া উঠে না। যেমন মনে কর, একে অপরের উপর পাথর নিক্ষেপ করিল। আহত ব্যক্তির অন্তরে ক্রোধ অদৃশ্যভাবে থাকিলেও সে কিছুতেই পাথরের উপর ক্রুদ্ধ হয় না। কারণ, সে জানে, জড় পাথরের কোন দোষ নাই; বরং পাথর নিক্ষেপকারীই অপরাধী। তদ্রূপ বিচার অপরাধীকে হত্যার আদেশ কলম দ্বারা লিখিলেও দণ্ডিত ব্যক্তি কলমের উপর ক্রুদ্ধ হয় না। কারণ, কলমের সাহায্যে দণ্ডাদেশ লিখিত হইলেও সে জানে যে, ইহা লেখকের আজ্ঞাধীন এবং তাহার স্বাধীন প্রবর্তনশক্তিতেই কলম পরিচালিত হইয়াছে ও ইহার নিজস্ব কোন ক্ষমতা নাই । তদ্রূপ, যাহার হৃদয়ে তাওহীদ ভাব প্রবল হইয়া তাহাকে তন্ময় করিয়া ফেলিয়াছে, সেই ব্যক্তি অবশ্যই জানে যে, সৃষ্টির মাধ্যমে যে কাজ সম্পন্ন হয়, ইহাতে সেই প্রাণীর কোন স্বাধীন ক্ষমতা নাই।
মানবের কয়েকটি বৃত্তির সমন্বয় ও সম্মিলিত চেষ্টায় কার্য সম্পন্ন হয়। ইহারা পরস্পর অধীনতার পাশে আবদ্ধ। বাহ্যদৃষ্টিতে দেখা যায় যে, হস্তপদাদি সঞ্চালনেই কার্য সম্পন্ন হয়। কিন্তু হস্তপদাদি সঞ্চালন শক্তির অধীন। শক্তি হস্তপদাদি ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে যে দিকে চালায় ইহারা সেইদিকে চলিলেও এই ব্যাপারে শক্তি স্বাধীন নহে। শক্তি ইচ্ছার অধীন। ইচ্ছা আবার মানবের আজ্ঞাধীন নহে। তাহার মনঃপুত হউক বা না হউক, ইচ্ছাকে তাহার উপর চাপাইয়া দেওয়া হইয়াছে। ইচ্ছার সহিত শক্তির সংযোগ ঘটিলে হস্তপদাদি সঞ্চালনে কার্য আবশ্য সম্পন্ন হইয়া থাকে। উল্লিখিত পাথর নিক্ষেপ কার্যের প্রতি লক্ষ্য করিলে বুঝা যাইবে যে, নিক্ষেপকারীর ইচ্ছানুসারে শক্তির সংযোগ হওয়াতেই হস্তপদাদি সঞ্চালনে পাথরটি ঐ ব্যক্তির উপর নিক্ষিপ্ত হইয়াছিল এবং উহার আঘাত হইত ব্যক্তি বেদনা অনুভব করিয়াছিল। পাথরটি স্বেচ্ছায় নিজ স্বাধীন ক্ষমতায় তাহাকে আঘাত করে নাই এবং এইজন্যই ইহার উপর কেহই ক্রুদ্ধ হয় না ।
আবার মনে কর, একমাত্র একটি ছাগলের দুগ্ধ দ্বারাই এক ব্যক্তি জীবিকা নির্বাহ করে। এমতাবস্থায়, ছাগলটি মরিয়া গেলে তাহার দুঃখ হয়, কিন্তু কাহারও উপর সে ক্ষুদ্ধ হয় না। আবার ছাগলটিকে কেহ বধ করিয়া ফেলিলেও তাওহীদভাবে তন্ময় ব্যক্তির পক্ষে তাহার উপর ক্রুদ্ধ না হওয়াই সঙ্গত। কারণ, তাওহীদের তন্ময়ভাব যাহাকে বিভোর করিয়া রাখিয়াছে, নিখিল বিশ্বের সকল কার্য কেবল আল্লাহর দিক হইতে সম্পন্ন হইতেছে সে দেখিতে পায়, সেই ব্যক্তি উক্ত পাথর নিক্ষেপকারী ও ছাগলবধকারী উভয়কেই বিশ্বনিয়ন্তা সর্বশক্তিমান আল্লাহ্ কর্তৃক পরিচালিত দেখিতে পাইয়া তাহাদের উপর কুপিত হইতে পারে না। কিন্তু তাওহীদের তন্ময়ভাব সর্বক্ষণ প্রবল থাকে না; বরং বিদ্যুৎ চমকের ন্যায় ইহা নিমিষেই বিলীন হইয়া যায়। তখন দৈহিক প্রকৃতির দাবি-দাওয়া এবং আন্তরিক প্রবৃত্তির প্রভাবে জাগতিক পূর্বসংস্কার আবার তাহার হৃদয়ে জাগিয়া উঠে। অধিকাংশ কামিল ব্যক্তির অন্তরে কোন কোন সময় এরূপ তাওহীদভাব আসে। তাহাদের অন্তর হইতে যে ক্রোধের মূলোচ্ছেদ হইয়াছে, তাহা নহে; বরং সৃষ্ট জীবের মাধ্যমে যে কাজ সম্পন্ন হইতেছে, ইহাতে সেই জীবের কোন স্বাধীন প্রবর্তনশক্তি নাই, এই বিশ্বাসে তাহাদের হৃদয়ে ক্রোধের সঞ্চার হয় না। তেমন ব্যক্তির প্রতি কেহ প্রস্তর নিক্ষেপ করিলেও তাহার অন্তরে ক্রোধ জাগিয়া উঠে না।

গুরুতর কাজের চাপে লুক্কায়িত ক্রোধ

যাহাকে তাওহীদ ভাবাবেশ তন্ময় করে নাই, এমন ব্যক্তিও কোন গুরুতর কাজে নিবিষ্ট থাকিলে তাহার হৃদয়েও ক্রোধ জাগিয়া উঠে না; বরং লুক্কায়িত থাকে। হযরত সালমান রদিয়াল্লাহু আন্হুকে এক ব্যক্তি গালি দিল। তিনি তাহাকে বলিলেন- কিয়ামতের দিন আমার পাপের পাল্লা ভারী হইলে তুমি যাহা বলিতেছ আমি তদপেক্ষা মন্দ, কিন্তু পাপের পাল্লা হাল্কা হইলে তোমার কথায় আমার কি ভয়?” হযরত রাবী' ইব্‌নে খায়সাম (রহঃ)-কে কেহ গালি দিলে তিনি বলিলেন- “বেহেশ্ত ও আমার মধ্যে এক দুর্গম গিরিপথ রহিয়াছে। আমি ইহা অতিক্রমে ব্যাপৃত আছি। অতিক্রম করিতে পারিলে আমি তোমার গালিকে ভয় করি না; কিন্তু অতিক্রম করিতে না পারিলে আমার দুর্দশার তুলনায় তোমার গালি অত্যন্ত কম।” এই দুই মহামনীষী পরকালের চিন্তায় এমন বিভোর ছিলেন যে, অপরের গালিতেও তাঁহাদের ক্রোধ জাগে নাই।

হযরত আবূ বকর রদিয়াল্লাহু আন্হুকে এক ব্যক্তি গালি দিলে তিনি তাহাকে বলিলেন- “আমার অবস্থার যেটুকু তোমার অজ্ঞাত তাহা তুমি যাহা বলিতেছ তদপেক্ষা অধিক।” স্বীয় দোষ-ত্রুটি পর্যবেক্ষণে তিনি এত অধিক ব্যাপৃত ছিলেন যে, অপরের গালি শুনিয়াও তাঁহার ক্রোধ জন্মে নাই। 

হযরত মালিক ইব্‌নে দীনার (রঃ)-কে এক রমণী কপট ধার্মিক বলিয়া সম্বোধন করিল। তিনি সেই রমণীকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন- “হে পুণ্যবতী, তুমি ভিন্ন আর কেহই আমাকে চিনিতে পারে নাই।” 

হযরত শা'বী (রঃ)-কে এক ব্যক্তি নিন্দা করিতেছিল। তিনি ইহা শুনিয়া বলিলেন “তুমি সত্য বলিয়া থাকিলে আল্লাহ্ যেন আমাকে মাফ করেন; আর তুমি মিথ্যা বলিয়া থাকিলে আল্লাহ্ যেন তোমাকে মাফ করেন।” এই সকল দৃষ্টান্তে প্রমাণিত হয় যে, মানুষ কোন গুরুতর কাজ বা চিন্তায় মগ্ন থাকিলে ক্রোধ বশীভূত ও লুক্কায়িত থাকে।

আবার কেহ যদি বিশ্বাস করে, যে ব্যক্তি ক্রোধ করে না, আল্লাহ্ তাহাকে ভালবাসেন, তবে তাঁহার ভালবাসা লাভের লালসায় উত্তেজনা প্রবল কারণ দেখা দিলেও সেই ব্যক্তি ক্রুদ্ধ হয় না। যেমন মনে কর, কেহ কোন রমণীর প্রতি প্রেমাসক্ত; কিন্তু সেই রমণীর সন্তান তাহাকে গালি দেয়। এমতাবস্থায়, যদি সে জানে যে, উক্ত সন্তানের গালি সহ্য করিলে প্রেমাস্পদ তাহাকে ভালবাসিবে, তবে সেই রমণীর প্রতি আসক্তি তাহাকে এইরূপ তন্ময় করিয়া তোলে যে সে তাহার সন্তান প্রদত্ত দুঃখ-কষ্ট অম্লান বদনে সহ্য করে এবং উক্ত সন্তানের কোনরূপ দুর্ব্যবহার তাহার হৃদয়ে ক্রোধের সঞ্চার করে না।
ক্রোধ দমনের উপায় বর্ণিত হইল। তন্মধ্যে যে কোনটি অবলম্বনে ক্রোধকে মারিয়া ফেলা আবশ্যক। অসম্ভব হইলে ইহাকে এত দুর্বল করিয়া ফেলিবে যেন উহা অবাধ্য না হয় এবং ধর্ম-বুদ্ধির বিরুদ্ধাচরণ না করে।


পরবর্তী পর্ব
ক্রোধ বিনাশক ব্যবস্থা

ক্রোধ ও লোভ সৃষ্টির কারণ ও ক্ষতি



 ক্রোধ, বিদ্বেষ ও ঈর্ষা (পর্ব- ২)
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

ক্রোধ ও লোভ সৃষ্টির কারণ ও ক্ষতি
প্রয়োজনের সময় অস্ত্ররূপে ব্যবহৃত হওয়ার উদ্দেশ্যে আল্লাহ্ মানব হৃদয়ে ক্রোধ সৃজন করিয়াছেন, যেন কোন অনিষ্টের কারণ তাহার সম্মুখীন হইলে ক্রোধ তৎক্ষণাত ইহা বিদূরিত করিতে পারে। লোভ সৃজনেও এই একই উদ্দেশ্য রহিয়াছে। ইহাও অস্ত্রের ন্যায় মানুষের কাজে আসিবে এবং মঙ্গলজনক বস্তু তাহার দিকে আকর্ষণ করিবে, উহাই আল্লাহর উদ্দেশ্য। এই দুই প্রবৃত্তি মানবজীবনে অপরিহার্য। কিন্তু উহা সীমা অতিক্রম করিয়া বৃদ্ধি পাইলে তাহার সকল অনিষ্টের কারণ হইয়া উঠে।

অতি ক্রোধ বুদ্ধি-বিনাশক-

ক্রোধ সীমা অতিক্রম করিয়া বাড়িয়া গেলে মানব হৃদয়ে আগুনের মত জ্বলিয়া উঠে। ইহার ধোঁয়া মস্তিষ্ক পূর্ণ করিয়া দিলে বুদ্ধি ও নিপুণতার কার্যালয় অন্ধকারাবৃত্ত হইয়া যায়। বুদ্ধি তখন অকর্মণ্য হইয়া পড়ে। ফলে, মানুষের হিতাহিত জ্ঞান লোপ পায়। গুহা ধুমে পরিপূর্ণ হইয়া অন্ধকারাচ্ছন্ন হইলে যেমন কিছুই নয়ন- গোচর হয় না, তেমনি ক্রোধের সময় মস্তিষ্ক কুঠরীর অবস্থাও তদ্রূপ হইয়া থাকে। ক্রোধের এইরূপ আধিক্য নিতান্ত জঘণ্য। ক্রোধের সময় মানব হিতাহিত নির্ণয়ে অক্ষম হয় বলিয়াই বুযুর্গগণ ইহাকে 'গোলে আকল' অর্থাৎ বুদ্ধি-বিনাশক বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন।


অত্যল্প ক্রোধ ক্ষতিকর-

ক্রোধ সীমা ছাড়াইয়া অত্যন্ত কমিয়া গেলেও - ক্ষতিকর। কারণ, ক্রোধই মানুষকে অন্যায় ও গর্হিত কর্মের বিরুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করে এবং জগতে ধর্ম প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে কপটতা ও নাস্তিকতার বিরুদ্ধে মুসলমানের অন্তরে প্রেরণা যোগায়। আল্লাহ্ তা'আলা তিনি রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-উনাকে লক্ষ্য করিয়া বলেন :

>“কাফির ও মুনাফিকদের সহিত জিহাদ করুন এবং তাহাদের উপর কর্কশ ব্যবহার করুন।” [তখনকার পরিস্থিতিতে এই ব্যাবহার জরুরী ছিল]

সাহাবা রদিয়াল্লাহু আন্হুমের প্রশংসা করিয়া আল্লাহ্ বলেন : 

>“তাহারা কাফিরদের উপর বড় কঠিন।”  এই সমস্তই ক্রোধের অবশ্যম্ভাবী ফল।


ক্রোধের মধ্যম অবস্থা কাম্য-

উল্লিখিত বর্ণনা হইতে প্রমাণিত হয়, ক্রোধের আধিক্য ও অত্যল্পতা কাম্য নহে; বরং এতদুভয়ের মধ্যবর্তী ধর্মবুদ্ধির অধীন ইহার সাম্যভাবাপন্ন অবস্থাই কাম্য। কেহ কেহ মনে করেন, ক্রোধের মূলোৎপাটন রিয়াযতের উদ্দেশ্য। ইহা ভুল ধারণা। কারণ, ক্রোধ মানবের অপরিহার্য অস্ত্রস্বরূপ এবং তাহার জীবদ্দশায় লোভের ন্যায় ক্রোধের মূলোচ্ছেদও অসম্ভব। তবে কোন বিশেষ ধর্ম বা ভাবে মানব তন্ময় হইলে ক্রোধের আত্মগোপন সম্ভবপর এবং তখনই সে মনে করে ক্রোধের মূলোৎপাটন হইয়াছে।



পরবর্তী পর্ব

ক্রোধ উত্তেজিত হওয়ার কারণ

ক্রোধ- বিদ্বেষ ও ক্রোধ দমনের ফজিলত

 

ক্রোধ, বিদ্বেষ ও ঈর্ষা (পর্ব- ১)
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

ক্রোধ, বিদ্বেষ, ঈর্ষা এবং উহা হইতে পরিত্রাণের উপায়--

ক্রোধ সীমা ছাড়াইয়া প্রবল হইয়া উঠিলে জঘণ্য হইয়া থাকে। অগ্নি ক্রোধের মূল এবং অন্তরের উপর ইহার প্রভাব। 

শয়তানের সহিত ক্রোধের সম্বন্ধ রহিয়াছে, সে স্বয়ং বলিয়াছে-

>“তুমি আমাকে অগ্নি হইতে সৃজন করিয়াছ এবং তাহাকে (আদমকে) মৃত্তিকা হইতে সৃজন করিয়াছ।”

আগুন সর্বক্ষণ গতিশীল ও চঞ্চল; আর মাটি ধীর ও শান্ত। ক্রোধান্ধ ব্যক্তির সহিত হযরত আদম আলায়হিস্ সালামের সমস্ত সম্বন্ধ ছিন্ন হইয়া শয়তানের সঙ্গে তাহার সম্বন্ধ স্থাপিত হয়।


হযরত ইবনে ওমর রদিয়াল্লাহু আনহু রাসূলে মাকবুল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-উনাকে জিজ্ঞাসা করিলেন- “ইয়া রাসূলাল্লাহ্, আল্লাহর ক্রোধ হইতে আমাকে দূরে রাখিতে পারে, এরূপ কোন কাজ আছে?” তিনি বলিলেন- 

>“তাহা এই যে, তুমি ক্রুদ্ধ হইবে না।” 

তিনি আবার নিবেদন করিলেন- “ইয়া রসূলাল্লাহ্, আমাকে এরূপ একটি সংক্ষিপ্ত কাজের কথা বলিয়া দিন যাহাতে আমি উত্তম পরিণামের আশা করিতে পারি।

রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বলিলেন- 

>“স্বেচ্ছায় ক্রুদ্ধ হইও না”।

তিনি বারবার একই প্রশ্ন করিতেছিলেন এবং রসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) প্রত্যেক বারই ঐ উত্তর দিতেছিলেন। 

রসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন- 

>“সির্কা যেরূপ মধু ধ্বংস করে, ক্রোধ তদ্রূপ ঈমান ধ্বংস করে।” 


হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম হযরত ইয়াহ্ইয়া আলায়হিস্ সালামকে বলিলেন- “ক্রুদ্ধ হইও না।” তিনি বলিলেন- “ইহা সম্ভবপর নহে; কেননা, আমি মানুষ।” হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম বলিলেন-'ধন জমা করিও না।” তিনি বলিলে- "হাঁ, ইহা সম্ভবপর।”


ক্রোধ দমনের ফজিলত--

ক্রোধের মূলোচ্ছেদ মানবের পক্ষে সম্ভবপর নহে। কিন্তু ক্রোধ দমন করা নিতান্ত আবশ্যক। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন :

>“এবং ক্রোধ সংবরণকারী ও মানবের মার্জনাকারীকে (আল্লাহ্ ভালবাসেন)”।

যাহারা ক্রোধ দমন করিতে পারে এই আয়াতে আল্লাহ্ তাহাদের প্রশংসা করিয়াছেন।

রসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন- 

>“যে ব্যক্তি ক্রোধ দমন করে আল্লাহ্ তা’আলা তাহার উপর হইতে স্বীয় আযাব বিদূরিত করেন। যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি কর্তব্য পালনে স্বীয় ত্রুটি স্বীকার করে, তিনি তাহার ত্রুটি মাফ করেন এবং যে ব্যক্তি রসনা (জিহ্বা) সংযত রাখে আল্লাহ্ তাহার গোপনীয় দোষ লুক্কায়িত রাখেন।" 

তিনি আরো বলেন- 

>“যে ব্যক্তি ক্রোধ সংবরণ করিতে পারে কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তাহার অন্তর সন্তোষ দ্বারা ভরপুর করিয়া দিবেন।” তিনি আরও বলেন- 

>“দোযখের একটি দ্বার আছে; এই দ্বার দিয়া শরীয়ত বিরুদ্ধ ক্রোধ প্রকাশকারী ব্যতীত আর কেহই প্রবেশ করিবে না।" তিনি আরো বলেন- 

>“লোক চুমুকে যাহা পান করে, উহার মধ্যে ক্রোধ পান (সংরবণ) অপেক্ষা আর কোন বস্তু পানই আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় নহে। যে ব্যক্তি ক্রোধ দমন করে, আল্লাহ্ তাহার অন্তর ঈমান দ্বারা পরিপূর্ণ করিয়া দেন।”


হযরত ফুযায়ল ইব্‌নে আইয়ায (রঃ), হযরত সুফিয়ান সাওরী (রঃ) এবং আরও কতিপয় বুযুর্গ একবাক্যে বলেন- “ক্রোধের সময় সহিষ্ণুতা এবং লোভের সময় ধৈর্য অপেক্ষা উৎকৃষ্ট কাজ আর কিছুই নাই।” 

এক ব্যক্তি হযরত ওমর ইবনে আবদুল আযীয (রঃ)-কে কটু কথা বলিল। তিনি মস্তক অবনত করিয়া বলিলেন- “আমাকে তুমি ক্রুদ্ধ করত শয়তান কর্তৃক আমাকে স্বীয় মর্যাদা হইতে নামাইয়া লইতে চাহিতেছ? ক্ষমতা ও প্রভুত্বের গর্বে আজ আমি তোমার উপর ক্রুদ্ধ হইলে কল্য কিয়ামত দিবস তুমি আমা হইতে প্রতিশোধ গ্রহণ করিবে, ইহা কখনও হইতে পারে না।” এই বলিয়া তিনি নীরব রহিলেন। 


একজন নবী আলায়হিস্ সালাম লোকদিগকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন- “এমন কেহ আছে কি, যে আমার উপদেশসমূহ পালন করিবে ও প্রতিজ্ঞা করিবে যে, কখনও ক্রুদ্ধ হইবে না এবং আমার তিরোধানের পর আমার প্রতিনিধি হইয়া থাকিতে ও বেহেশতে আমার সমান মর্যাদা পাইতে আশা করে?” 

এক ব্যক্তি স্বীকার করিলেন এবং ঐরূপ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইলেন। তিনি এই ব্যক্তি দ্বারা আরও দুইবার প্রতিজ্ঞা করিয়া লইলেন। অনন্তর সেই ব্যক্তি দৃঢ়তার সহিত স্বীয় প্রতিজ্ঞা পালন করত উক্ত নবী আলায়হিস্ সালামের প্রতিনিধি হইলেন এবং জগতে ‘যুলকুল্‌' অর্থাৎ দায়িত্ব পালক নামে প্রসিদ্ধি লাভ করিলেন



পরবর্তী পর্ব

ক্রোধ ও লোভ সৃষ্টির কারণ ও ক্ষতি

শনিবার, ১৫ জুলাই, ২০২৩

যিনা ও কুদৃষ্টি থেকে আত্মরক্ষা করা

 উদর ও লজ্জাস্থানের খাহেশের প্রতিকার (পর্ব - ৯)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

যিনা ও কুদৃষ্টি থেকে আত্মরক্ষা করা 
জানা উচিত, লজ্জাস্থানের খাহেশ সর্বাধিক প্রবল এবং উত্তেজনার মুহূর্তে জ্ঞান-বুদ্ধির সর্বাধিক অবাধ্য। এর ফলাফল খুবই লজ্জাজনক। মানুষ যে এ খাহেশ থেকে বেঁচে থাকে, তার কারণ হয় অক্ষমতা, না হয় লোকনিন্দার ভয়, না হয় লজ্জা শরম, না হয় মান-ইযযত রক্ষা করা। এগুলোর মধ্যে কোনটিতেই সওয়াব নেই। কারণ, এতে মনের এক আনন্দকে অন্য আনন্দের উপর অগ্রাধিকার দেয়া হয় মাত্র। হাঁ, এসব বাধার মধ্যেও একটি ফায়দা আছে। তা হচ্ছে, মানুষ গোনাহ্ থেকে বেঁচে থাকে, তা যে কোন কারণেই বেঁচে থাকুক। কিন্তু উচ্চ মর্তব্য ও সওয়াব তখন অর্জিত হবে, যখন সকল প্রকার সামর্থ্য সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কেউ শুধু আল্লাহর ভয়ে যিনা থেকে বিরত থাকে, বিশেষতঃ যখন সত্যিকার খাহেশ বিদ্যমান। এটা সিদ্দীকগণের স্তর। তাই রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন : যে আশেক হয়ে সাধু থাকে এবং এশক গোপন রাখে, অতঃপর মারা যায়, সে শহীদ। তিনি আরও বলেন : সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তা'আলা কেয়ামতের দিন আরশের ছায়াতলে স্থান দেবেন। সেদিন অন্য কোন ছায়া থাকবে না। তাদের মধ্যে একজন সে ব্যক্তি, যাকে কোন সম্ভ্রান্ত রূপবতী নারী নিজের দিকে আহ্বান করে, সে জওয়াবে বলে : আমি বিশ্বপালক আল্লাহকে ভয় করি। সামর্থ্য এবং আগ্রহ সত্ত্বেও যুলায়খার সাথে হযরত ইউসুফ (আঃ)-এর কিস্সা প্রসিদ্ধ ও সুবিদিত। আল্লাহ তা'আলা পাক কালামে এ জন্যে তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এ ব্যাপারে হযরত ইউসুফ (আঃ) সকল সৎ ও সাধু পুরুষের ইমাম। 

সাহাবী হযরত সোলায়মান ইবনে ইয়াসার (রাঃ) অসাধারণ সুশ্রী যুবক ছিলেন। তাঁর গৃহে জনৈকা মহিলা আগমন করে তাঁর সাথে কুকর্ম করার ইচ্ছা প্রকাশ করলে তিনি অস্বীকার করেন এবং গৃহ থেকে পালিয়ে যান। তিনি রাত্রে স্বপ্নে হযরত ইউসুফ (আঃ)-কে দেখে আরজ করলেন : আপনি ইউসুফ? উত্তর হল : হাঁ, আমি সেই ইউসুফ, যে ইচ্ছা করেছিল, আর তুমি সেই সোলায়মান, যে ইচ্ছাও করেনি। এই সাহাবীরই আর একটি আশ্চর্যজনক কাহিনী বর্ণিত আছে। তা হচ্ছে, একবার একজন সঙ্গীসহ তিনি মদীনা থেকে হজ্জের উদ্দেশে রওয়ানা হলেন। আবওয়া নামক স্থানে পৌঁছার পর তাঁর সঙ্গী কিছু কেনাকাটা করার জন্যে বাজারে চলে গেল। তিনি তাঁবুতে একাকী বসে রইলেন। জনৈকা বেদুঈন মহিলার দৃষ্টি তাঁর অনন্য রূপ সৌন্দর্যের উপর পতিত হতেই সে মনে প্রাণে তাঁর প্রতি আসক্ত হয়ে গেল এবং পাহাড় থেকে নেমে একেবারে তাঁর সামনে এসে দণ্ডায়মান হল। মহিলা নিজেও রূপ-সৌন্দর্যে ছিল চন্দ্র-সূর্যবৎ অপরূপা। সে বোরকা উত্তোলন করে চন্দ্র-সূর্যের সংযোগ ঘটাতে বিলম্ব করল না। অতঃপর সে বলল : আমাকে কিছু দিন। সোলায়মান মনে করলেন, খাবার চাইছে, তাই রুটি দেয়ার জন্য হাত বাড়ালেন। সে বলল : আমি এটা চাই না। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যা হয়, আমি তাই কামনা করি। তিনি বললেন : তোমাকে শয়তান আমার কাছে পাঠিয়েছে। অতঃপর তিনি আপন মস্তক দুই হাঁটুর মাঝখানে রেখে সজোরে ক্রন্দন শুরু করে দিলেন। মহিলা তাঁর এই করুণ অবস্থা দেখে ব্যর্থতার গ্লানি বহন করে আপন গৃহে চলে গেল। সঙ্গী বাজার থেকে ফিরে এসে দেখল, কাঁদতে কাঁদতে সোলায়মানের চক্ষুদ্বয় ফুলে গেছে এবং কণ্ঠস্বর ভেঙ্গে গেছে। সে জিজ্ঞেস করল, আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি ব্যাপারটি এড়িয়ে যেতে চাইলেন। বললেন : কিছুই নয়। আমার কন্যার কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। সঙ্গী বলল : না, ব্যাপার অন্যকিছু। তিন মনযিল পথ অতিক্রম করার সময় তো আপনার কন্যার কথা একবারও মনে পড়ল না। আজ হঠাৎ মনে পড়বে কেন? মোট কথা, অনেক পীড়াপীড়ি করে জিজ্ঞেস করার পর সোলায়মান বেদুঈন মহিলার ঘটনা বলে দিলেন। সঙ্গী বাজার সওদার থলে রেখে অঝোরে কান্না শুরু করে দিল । তিনি কারণ জিজ্ঞেস করলে সে বলল : আমার কান্নার কারণ হচ্ছে, যদি আপনার স্থলে আমি থাকতাম তবে সবর করতে পারতাম না, গোনাহে লিপ্ত হয়ে যেতাম। কিছুক্ষণ পর্যন্ত উভয়েই কাঁদলেন । অতঃপর তাঁরা মক্কায় পৌঁছলেন। তওয়াফ ও সায়ীর পর যখন তাঁরা হাজারে আসওয়াদের কাছে এলেন, তখন সোলায়মান ইবনে ইয়াসার উপবিষ্ট অবস্থায় তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লেন। তিনি স্বপ্নে জনৈক দীর্ঘদেহী, সুশ্রী, জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পরিহিত, আতরমাখা ব্যক্তিকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন : আপনি কে? তিনি বললেন : আমি ইউসুফ। সোলায়মান আরজ করলেন : যুলায়খার সাথে আপনার আচরণ খুবই বিস্ময়কর। ইউসুফ (আঃ) বললেন : আবওয়ার মহিলার সাথে তোমার আচরণ আরও বেশী আশ্চর্যজনক।


হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) বর্ণনা করেন, আমি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর পবিত্র মুখ থেকে শুনেছি, প্রাচীনকালে তিন ব্যক্তি সফরে বের হয়েছিল। তারা রাতের বেলায় একটি গুহায় অবস্থান গ্রহণ করে।ঘটনাক্রমে একটি বিরাট প্রস্তরখণ্ড পাহাড়ের উপর থেকে পড়ে গুহার মুখ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিল। তারা একে অপরকে বলল : আপন আপন সৎকর্ম স্মরণ করে আল্লাহ্ তা'আলার কাছে দোয়া কর। সৎকর্মের বরকতে এই পাথর সরে যেতে পারে। সেমতে তাদের একজন হাত তুলে বলল : ইলাহী, তুমি জান, আমার পিতামাতা বৃদ্ধ ছিলেন। আমি সন্ধ্যায় প্রথমে তাদেরকে আহার করিয়ে দিতাম, এরপর সন্তান-সন্ততি ও গৃহপালিত গবাদিপশুকে আহার দিতাম। একদিন গবাদিপশুর খাদ্য যোগাড় করতে বিলম্ব হওয়ায় আমি দেরীতে বাড়ী পৌঁছলাম। অতঃপর গাভীর দুধ দোহন করে তা পিতামাতার কাছে নিয়ে দেখি, তাঁরা ঘুমিয়ে পড়েছেন। ডেকে জাগানো আমি ভাল মনে করলাম না। তাই দুধের পেয়ালা হাতে নিয়ে আমি পর্যন্ত তাঁদের শিয়রে দাঁড়িয়ে রইলাম। সন্তানরা আমার পায়ে লুটিয়ে পড়েছে; কিন্তু আমি পিতামাতার পূর্বে তাদেরকে খাবার দেয়া ভাল মনে করিনি। সকালে যখন তারা পান করলেন, তখন অন্যদেরকে দিলাম। ইলাহী, যদি তুমি জান, এ কাজ আমি কেবল তোমার সন্তুষ্টির জন্যে করেছি, তবে এ বিপদ থেকে মুক্তি দাও। এ দোয়ার বরকতে পাথরটি এই পরিমাণ সরে গেল যে, আকাশ দৃষ্টিগোচর হল। 


দ্বিতীয় জন দোয়ায় বলল : ইলাহী, তুমি জান, আমি আমার পিতৃব্য-কন্যার প্রতি আশেক ছিলাম। আমি তার কাছে মিলনের বাসনা প্রকাশ করলে সে অস্বীকৃতি জানাল। এরপর দুর্ভিক্ষের সময় নিদারুণ কষ্টে পড়ে সে আমার কাছে আগমন করল। সে অস্বীকার করবে না। আমি তাকে এই শর্তে একশ' বিশটি স্বর্ণমুদ্রা দিলাম। সে আমার কথা মেনে নিল; কিন্তু আমি যখন তার সাথে অপকর্মে লিপ্ত হতে চাইলাম, তখন বলল : আল্লাহকে ভয় কর। আমার বেইজ্জতী করো না। এতে আমি ভীত হয়ে পড়লাম এবং তাকে ছেড়ে দিলাম। তাকে যা দিয়েছিলাম, তাও ফেরত নিলাম না । ভালবাসাও যথারীতি কায়েম রাখলাম। ইলাহী, যদি আমি কেবল তোমার ভয়ে এ কাজ করে থাকি, তবে এর বরকতে এ বিপদ দূর করে দাও। এরপর পাথরটি আরও সামান্য সরে গেল। কিন্তু বের হওয়ার পথ হল না।

তৃতীয় জন বলল : ইলাহী, আমি একবার কয়েকজন মজুরকে কাজে নিয়োগ করেছিলাম এবং সকলের মজুরিই শোধ করে দিয়েছিলাম, কিন্তু জনৈক মজুর তার মজুরি রেখেই চলে গেল। তার অনুপস্থিতিতে আমি তার অর্থ কারবারে নিয়োগ করায় তা বেড়ে অনেক হয়ে গেল। অনেক দিন পর যখন সে মজুরি চাইতে এল, তখন আমি অনেকগুলো উট, গরু ও ছাগল দেখিয়ে বললাম : এগুলো সব তোমার। সে বলল : আপনি আমার সাথে ঠাট্টা মস্করা করছেন? আমি বললাম : ঠাট্টা নয়। এগুলো তোমার মজুরির অর্থ দিয়ে ব্যবসা করে অর্জিত হয়েছে। এগুলো নিয়ে যাও। সে জন্তুগুলো হাঁকিয়ে নিয়ে গেল এবং কিছুই রেখে গেল না। ইলাহী, যদি আমি এ কাজ তোমার সন্তুষ্টির জন্যে করে থাকি, তবে আমাদেরকে এ বিপদ থেকে উদ্ধার কর। তার এই দোয়ার পর পাথরটি সম্পূর্ণ সরে গেল এবং তারাও গন্তব্য পথে রওয়ানা হয়ে গেল। যে নিজেকে যিনা থেকে বাঁচিয়ে রাখে তার হচ্ছে এই ফযীলত। তারই নিকটবর্তী সে ব্যক্তি, যে চোখের যিনা থেকে নিরাপদ থাকে। কেননা, যিনার সূচনা চোখ দ্বারাই হয়। তাই চোখ সংযত রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ ও দুরূহ কাজ। কিন্তু একে হালকা মনে করা হয়, তেমন ভয় করা হয় না। অথচ সব বিপদের উৎসমূল হচ্ছে চোখ। যদি ইচ্ছা ব্যতিরেকে একবার দেখা হয়, তবে তার জন্যে শাস্তি নেই; কিন্তু পুনর্বার দেখার মধ্যে শাস্তি আছে। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন :-“প্রথম বার দেখা তোমার জন্যে জায়েয এবং দ্বিতীয় বার দেখা বিপদ”! এখানে চোখের দেখাই উদ্দেশ্য। 

আলা ইবনে যিয়াদ বলেন : নারীর চাদরের উপরও দৃষ্টি নিক্ষেপ করো না। কেননা, দৃষ্টি অন্তরে খাহেশের বীজ বপন করে। মানুষ যখন কোন নারীর উপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, তখন দ্বিতীয় বার না তাকানোটা খুবই বিরল। রূপের ধারণা দৃষ্টিতে থাকলে দ্বিতীয় বার দেখতে মন চাইবে। তখন নিজের মনে সাব্যস্ত করে নেবে যে, পুনর্বার দেখা নিছক বোকামি। কেননা, দ্বিতীয় বার দেখলে যদি মুখমণ্ডল ভাল মনে হয়, তবে নফসে খাহেশ হবে, অথচ সে পাওয়ার নয়। অতএব পরিতাপ ছাড়া আর কি হাতে আসবে। আর যদি মুখমন্ডল বিশ্রী মনে হয় তবে যে উদ্দেশে দেখা; অর্থাৎ আনন্দ লাভ, তা অর্জিত হবে না। কেবল মজাবিহীন গোনাহে লিপ্ত হবে। পক্ষান্তরে যদি না তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে নেয়া হয় তবে মনের উপর থেকে অনেক বিপদ টলে যায়। চোখের ত্রুটির পর যদি কেউ সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও নিজেকে যিনা থেকে বাঁচিয়ে নেয়, তবে এটা বড় শক্তিমত্তা ও অসাধারণ তওফীকের কাজ হবে। আবু বকর ইবনে আবদুল্লাহ মুযানী রেওয়ায়াত করেন, জনৈক কসাই তার প্রতিবেশীর বাঁদীর প্রতি আশেক হয়ে যায়। বাঁদীর মালিক তাকে কার্যোপলক্ষে অন্য গ্রামে প্রেরণ করলে কসাই তার পিছু নেয় এবং আপন কুমতলব প্রকাশ করে। বাঁদী বলল : যতটুকু তুমি আমাকে চাও আমি তার চেয়ে বেশী তোমাকে চাই। কিন্তু অপকর্ম থেকে আমাকে মাফ কর। কারণ, আমি আল্লাহকে ভয় করি। কসাই বলল : তুমি আল্লাহকে ভয় করলে আমি করব না কেন? অতঃপর সে তওবাকারী হয়ে বাড়ীর পথে রওয়ানা হল। পথিমধ্যে সে দারুণ পিপাসায় মরণোন্মুখ হয়ে পড়ল। এমন সময় বনী ইসরাঈলের একজন পয়গম্বরের দূতের সাথে তার সাক্ষাৎ হল। দূত অবস্থা জিজ্ঞেস করলে সে পিপাসার কথা জানাল। দূত বলল : আমি তুমি মিলে দোয়া করি, যাতে গ্রামে পৌঁছা পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা মেঘমালা দ্বারা আমাদেরকে ছায়া দান করেন। কসাই বলল : দোয়া করার মত কোন নেক কাজ আমি করিনি। তুমিই দোয়া কর। দূত বলল : আচ্ছা, আমিই দোয়া করি। তুমি কেবল 'আমীন' বলবে। অতঃপর দূত দোয়া আরম্ভ করল এবং কসাই আমীন বলে গেল। অবশেষে এক খণ্ড মেঘ তাদের মাথার উপর চলতে লাগল এবং তার গ্রামে পৌঁছে গেল। কসাই যখন আলাদা হয়ে তার গৃহের দিকে চলতে লাগল, তখন মেঘখণ্ডটিও তার সাথে যেতে লাগল। দূত বলল : তুমি তো বলছিলে, তোমার কোন নেক আমল নেই। তাই আমি দোয়া করেছিলাম। এখন মেঘখণ্ড তোমার সাথে চলল কিরূপে? তোমার অবস্থা আমাকে খুলে বল। কসাই তওবার ঘটনা বর্ণনা করলে দূত বলল : আল্লাহর কাছে তওবাকারীর এমন মর্তবা, যা অন্য কারও নেই ।


আহমদ ইবনে সায়ীদ তাঁর পিতার বাচনিক বর্ণনা করেন- কুফায় আমাদের কাছে একজন সুগঠন, সুশ্রী ও সৎস্বভাবের আবেদ বসবাস করত। তিনি বেশীর ভাগ সময় মসজিদেই অতিবাহিত করতেন। জনৈকা রূপসী বুদ্ধিমতী মহিলা তাঁকে দেখে প্রেমাসক্ত হয়ে পড়ল এবং দীর্ঘ দিন পর্যন্ত প্রেম অন্তরে গোপন রাখল। একদিন আবেদ যখন মসজিদে গমন করছিলেন, তখন মহিলা তাঁর পথ আগলে দাঁড়িয়ে বলতে লাগল : আপনাকে আমি কিছু বলতে চাই, প্রথমে তা শুনে নিন, এরপর মনে যা চায় করুন। কিন্তু আবেদ কিছুই না বলে সোজা চলে গেলেন। ঘরে ফেরার পথে মহিলা আবার তাঁর পথ আগলে দাঁড়াল এবং বলল : আমার কথা শুনে যান। আবেদ মথা নত করল এবং অনেকক্ষণ পর বলল : এটা অপবাদের জায়গা। কেউ আমাকে অপবাদ দিক, আমি তা ভাল মনে করি না। মহিলা বলল : আমি আপনার অবস্থা না জেনে এখানে দাঁড়াইনি । খোদা না করুন, কেউ আমার পক্ষ থেকে খারাপ কিছু জানুক। কিন্তু এহেন কাজে আমার নিজেরই আসতে হল। আমি জানি, মানুষ তিলকে তাল বানায়। আপনারা আবেদ সম্প্রদায় আয়নার মত। সামান্য বিষয়েই আপনাদের গায়ে দোষ লেগে যায়। আমার একশ' কথার এক কথা হল, আমি আপনার প্রতি প্রেমাসক্ত। এখন আমার আপনার ব্যাপারটি আল্লাহ তা'আলাই নিষ্পত্তি করুন। যুবক আবেদ এ কথা শুনে গৃহে চলে গেলে। তিনি দিশেহারা অবস্থায় নামায পড়তে চাইলেন; কিন্তু পারলেন না। অবশেষে এক চিরকুট লেখে গৃহ থেকে বের হয়ে পড়লেন। দেখলেন, মহিলা পথিমধ্যে পূর্বের জায়গায়ই দণ্ডায়মান আছেন। তিনি চিরকুটটি মহিলার দিকে নিক্ষেপ করে আপন গৃহে ফিরে এলেন- চিরকুটের বিষয়বস্তু ছিল এই :


“বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।

হে নারী! জেনে রাখ, যখন বান্দা আল্লাহর নাফরমানী করে, তখন আল্লাহ সহ্য করেন। যখন পুনর্বার করে তখনও দোষ গোপন রাখেন। কিন্তু যখন গোনাহে গা ভাসিয়ে দেয় তখন এমন গযব নাযিল করেন, যা পৃথিবী, আকাশ, পাহাড় ও বৃক্ষলতা কোন কিছুই সহ্য করতে পারে না। সুতরাং এমন গযব সহ্য করার ক্ষমতা কার? তুমি যে কথা বলেছিলে, তা যদি মিথ্যা হয়, তবে সেদিনকে স্মরণ কর যখন আকাশমণ্ডলী গলিত তামার আকার ধারণ করবে, পাহাড়-পর্বত ধুনা তুলার মত হবে এবং সর্বশক্তিমান আল্লাহর ক্রোধ ও প্রতাপ এমন প্রচণ্ড হবে যে, সকল মানুষ হাঁটু গেড়ে পড়ে থাকবে। আমার অবস্থা হচ্ছে, আমি নিজেকে সংশোধন করতে অক্ষম। পক্ষান্তরে যদি আমার উক্তি সত্য হয়, তবে এমন চিকিৎসকের সন্ধান দিচ্ছি, যিনি সকল ব্যথা নিরাময় এবং মারাত্মক ব্যাধির চিকিৎসা করবেন। তিনি হচ্ছেন আল্লাহ জাল্লা শানুহু । খাঁটি মনে তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তন করা উচিত। তোমার পক্ষ থেকে আমার জন্যে এ আয়াতটিই যথেষ্ট :

“তাদেরকে সতর্ক করে দিন আসন্ন দিন সম্পর্কে, যখন কষ্টের কারণে তাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত হবে। জালেমদের জন্যে কোন অন্তরঙ্গ বন্ধু নেই এবং সুপারিশ গ্রাহ্য হয় এমন কোন সুপারিশকারীও নেই। চোখের অপব্যবহার এবং অন্তরের গোপন বিষয় আল্লাহ জানেন”।

এ আয়াত থেকে পলায়নের উপায় নেই। ইতি -


কয়েকদিন পরে এই মহিলা আবার এসে পথিমধ্যে দণ্ডায়মান হল। আবেদ তাকে দূর থেকে দেখেই গৃহপানে ফিরে যাবার ইচ্ছা করলেন। 

মহিলা বলল : চলে যান কেন? আজই শেষ সাক্ষাৎ। এরপর আল্লাহ তা'আলার কাছেই দেখা হবে। এরপর সে খুব কান্নাকাটি করল এবং বলল : যে আল্লাহর হাতে আপনার প্রাণ, আমি তাঁর কাছে দোয়া করি, তিনি যেন আপনার সমস্যাটি আমার জন্যে সহজ করে দেন। কিন্তু আমাকে কোন উপদেশ দিন। আবেদ বললেন : নিজেকে নফসের কবল থেকে বাঁচিয়ে রাখ এবং এ আয়াতটি মনে রেখ :

“তিনিই তোমাদেরকে রাতের বেলায় ওফাত দেন এবং দিনে যা কর, তা জানেন”।


মহিলা আঁচলে মুখ লুকিয়ে প্রথম বারের চেয়েও অধিক কান্না শুরু করল। এরপর আপন গৃহে চলে গেল। কয়েকদিন আল্লাহর এবাদতে মশগুল থাকার পর সে দুঃখেই ইন্তেকাল করল। আবেদ তাকে স্মরণ করে কাঁদত। লোকেরা জিজ্ঞেস করত : আপনিই তো তাকে নিরাশ করেছেন। এখন কাঁদেন কেন? আবেদ বলতেন, সূচনাতেই তাকে প্রত্যাখ্যান করে আল্লাহর কাছে নিজের জন্যে ভাণ্ডার করেছি। এখন তা বিনষ্ট হয় কি না, তাই ভেবে কাঁদি।


প্রথম পর্ব

 উদর ও লজ্জাস্থানের খাহেশের প্রতিকার


বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...