শনিবার, ১৫ জুলাই, ২০২৩

মুরীদের বিবাহ করা না করা


 উদর ও লজ্জাস্থানের খাহেশের প্রতিকার (পর্ব- ৮)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

মুরীদের বিবাহ করা না করা

প্রথম অবস্থায় মুরীদের বিবাহের ঝামেলায় পড়া উচিত নয়। কারণ, এটা আখেরাতের পথে বাধা সৃষ্টি করবে। মুরীদ স্ত্রীর মহব্বতে আটকা পড়ে যাবে। এ বিষয় থেকে ধোকা খাওয়া উচিত নয় যে, রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) অনেক বিবাহ করেছিলেন। কেননা, স্ত্রীর মহব্বত দূরের কথা, দুনিয়ার সকল বস্তু মিলেও তাঁর অন্তরকে আল্লাহ তাআলার দিক থেকে ফেরাতে পারত না। আল্লাহর মহব্বতে তাঁর মগ্নতা এতদূর ছিল যে, মাঝে মাঝে যখন মহব্বতের উত্তাপ অন্তরে উথলে উঠত, তখন অন্তর বিস্ফারিত হওয়ার আশংকা দেখা দিত। তিনি তখন হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর ঊরুতে করাঘাত করে বলতেন, কিছু কথাবার্তা বল। তাঁর কথাবার্তার ফলে উত্তাপ কিছুটা প্রশমিত হত। সুতরাং অন্য কোন ব্যক্তি নিজেকে রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে তুলনা করতে পারে না। করলে সে ধোকা খাবে।


মোট কথা, প্রাথমিক পর্যায়ে অবিবাহিত থাকাই মুরীদের জন্যে উপযুক্ত। 

আবু সোলায়মান বলেন : যে বিবাহ করে, সে দুনিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ে। আমি এমন কোন মুরীদ দেখিনি যে বিবাহ করে পূর্বাবস্থায় বহাল রয়েছে। যে কোন বস্তু আল্লাহ্ থেকে বিরত রাখে- স্ত্রী হোক, অর্থ হোক অথবা সন্তান-সন্ততি হোক, তাকেই অলক্ষুণে মনে করা উচিত। তবে মুরীদের অবিবাহিত থাকা তখন পর্যন্তই শোভনীয়, যে পর্যন্ত খাহেশ জোরালো না হয়। খাহেশ প্রবল হতে দেখলে প্রথমে ক্ষুধা ও সার্বক্ষণিক রোযা দ্বারা তা দমন করবে। এতেও দমিত না হলে খাহেশকে শান্ত করার জন্যে বিবাহ করবে। নতুবা দৃষ্টি ফিরিয়ে রাখা সম্ভব হবে না এবং উদ্দেশ্য বিঘ্নিত হবে। দৃষ্টির গোনাহ সগীরা গোনাহসমূহের মধ্যে অনেক বড়। এ থেকে কবীরা গোনাহ্ও হয়ে থাকে। যে তার দৃষ্টি আয়ত্তে রাখতে পারে না, সে তার দ্বীনদারীরও হেফাযত করতে পারে না। 

হযরত ঈসা (আঃ) বলেন : তাকানো থেকে বেঁচে থাক। এর কারণে অন্তরে খাহেশের বীজ পড়ে এবং এতটুকু অনর্থই যথেষ্ট। হযরত সায়ীদ ইবনে জোবায়র বলেন : কেবল দৃষ্টির কারণে হযরত দাউদ (আঃ) অনর্থে লিপ্ত হন। এ কারণেই হযরত সোলায়মান (আঃ) এরশাদ করেন : সিংহ ও সর্পের পেছনে যেয়ো; কিন্তু নারীর পেছনে যেয়ো না। 

হযরত ইয়াহইয়া (আঃ)-কে কেউ জিজ্ঞেস করল : যিনার সূচনা কিভাবে হয়? তিনি বললেন : দেখা ও বাসনা করার মাধ্যমে। 

হযরত ফোযায়ল এরশাদ করেন, ইবলীস বলে : দৃষ্টি আমার প্রাচীন তীর ধনুক, যা কখনও ভুল করে না। দৃষ্টি সম্পর্কে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর উক্তিসমূহ নিম্নরূপ-

>“দৃষ্টি ইবলীসের তীরসমূহের মধ্যে একটি বিষাক্ত তীর। যে আল্লাহ তা'আলার ভয়ে এটি পরিত্যাগ করে, আল্লাহ্ তা'আলা তাকে এমন ঈমান দেবেন, যার মিষ্টতা সে অন্তরে অনুভব করবে”।


>“আমি আমার পরে পুরুষদের জন্যে নারীদের চেয়ে অধিক ক্ষতিকর কোন ফেতনা ছেড়ে যাইনি”।

>”তোমরা দুনিয়ার ফেতনা ও নারীদের ফেতনা থেকে বেঁচে থাক। বনী ইসরাঈলের প্রথম ফেতনা নারীদের পক্ষ থেকেই ছিল”। 

>”প্রত্যেক মানুষের জন্যে যিনার কিছু অংশ আছে। কেননা, চক্ষুদ্বয় যিনা করে। তাদের যিনা হচ্ছে দৃষ্টিপাত করা। হস্তদ্বয় যিনা করে। তাদের যিনা হচ্ছে স্পর্শ করা। পদদ্বয় যিনা করে, তাদের যিনা হচ্ছে হাঁটা। মুখ যিনা করে, তার যিনা হচ্ছে বলা। অন্তর ইচ্ছা ও বাসনা করে। লজ্জাস্থান তাকে সত্যে পরিণত অথবা মিথ্যা প্রতিপন্ন করে।” 

আল্লাহ্ তা'আলা বলেন :

“মুমিনদেরকে বলে দিন, তারা যেন দৃষ্টি নত রাখে এবং লজ্জাস্থান হেফাযত করে”।


হযরত উম্মে সালামা (রাঃ) বলেন : একবার অন্ধ ইবনে মকতুম (রঃ) রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে আসতে চাইলেন। তখন আমি ও মায়মুনা রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে বসা ছিলাম। তিনি আমাদেরকে পর্দা করতে বললেন। আমরা বললাম, সে তো অন্ধ। পর্দা করার প্রয়োজন কি? তিনি বললেন : তোমরা তো তাকে দেখ।


এ থেকে জানা গেল, নারীদের অন্ধের কাছে বসা এবং বিনা প্রয়োজনে তার সাথে কথা বলা জায়েয নয়। আজকাল এটা প্রচলিত আছে। হাঁ, প্রয়োজনের সময় নারী পুরুষের সাথে কথা বলতে অথবা দেখতে পারে।


যদি মুরীদের অবস্থা এমন হয় যে, সে নারীদের থেকে তো দৃষ্টি ফিরিয়ে রাখতে পারে; কিন্তু বালকদের থেকে দৃষ্টি ফেরাতে পারে না; তবুও বিবাহ করা উত্তম। কেননা, বালকদের সৌন্দর্যপ্রীতির মধ্যে অনিষ্ট বেশী। কোন নারীর প্রতি মন আকৃষ্ট হয়ে গেলে তাকে বিবাহ করে মনের আশা পূরণ করা সম্ভব। কিন্তু বালকদের দ্বারা এটা সম্ভবপর নয়। এ কারণেই বালককে কুদৃষ্টিতে দেখা হারাম। এক্ষেত্রে মানুষ খুব শৈথিল্য প্রদর্শন করে এবং পরিণামে ধ্বংসের মুখে পড়ে। জনৈক তাবেয়ী বলেন : যুবক সাধকের সাথে শ্মশ্রুবিহীন বালকের উঠাবসা আমি হিংস্র জন্তুর চেয়েও অধিক ভয় করি। হযরত সুফিয়ান সওরী বলেন : যদি কোন ব্যক্তি খাহেশবশতঃ কোন বালকের পায়ের অঙ্গুলিতেও সুড়সুড়ি দেয়, তবুও সে সমকামী হবে। 

জনৈক বুযুর্গ বলেন : এই উম্মতে তিন প্রকার সমকামী হবে। কেউ তো কেবল দেখবে, কেউ করমর্দন করবে এবং কেউ কুকর্মই করবে। এ থেকে বুঝা গেল, দৃষ্টির কারণে বড় বড় বিপদের উদ্ভব ঘটে। সুতরাং যখন আপন দৃষ্টি ফেরাতে এবং চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবে না, তখন বিবাহ করাই তার জন্যে শ্রেয়ঃ। অধিকাংশ মানুষের যৌন উত্তেজনা ক্ষুধার কারণে হ্রাস পায় না। সেমতে জনৈক বুযুর্গ বর্ণনা করেন, সাধনার প্রথম পর্যায়ে একবার আমার উপর খাহেশ প্রবল হয়ে গেলে আমি আল্লাহর দরবারে খুব কান্নাকাটি করলাম। স্বপ্নে এক ব্যক্তিকে দেখলাম, তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করছেন, তোমার কি অবস্থা? আমি ঘটনা বর্ণনা করলে তিনি বললেন : এগিয়ে এস। আমি এগিয়ে গেলাম । তিনি আপন হাত আমার বুকের উপর রাখলেন। আমি এর শীতলতা অন্তরে ও দেহে অনুভব করলাম। সকালে ঘুম থেকে জেগে নিজের মধ্যে সেই যৌন উত্তেজনা পেলাম না। এক বছর কাল এ অবস্থা বহাল রইল। এরপর আবার প্রাবল্য দেখা দিল । আমি আবার হাহুতাশ করলে স্বপ্নে এক ব্যক্তিকে দেখলাম। সে বলল : যদি তুমি তোমার ঘাড় কাটাতে সম্মত হও, তবে আমি তোমার চিকিৎসা করি। আমি বললাম : উত্তম। সে বলল : ঘাড় নত কর। আমি ঘাড় নত করলে সে একটি নূরের তরবারি দিয়ে আমার ঘাড়ে আঘাত করল। আমার নিদ্রা ভঙ্গ হল। এক বছর কাল আবার সুস্থ থাকার পর পুনরায় সেই রোগ দ্বিগুণ বেগে দেখা দিল। এ অবস্থায় এক ব্যক্তিকে স্বপ্নে দেখলাম, সে আমার বক্ষ ও পাঁজরের মাঝখানে বসে আমাকে বলছে : যে বিষয়টি দূর করা আল্লাহর অভিপ্রেত নয়, তা দূর করার জন্য আর কতদিন কাকুতি মিনতি করবে? এরপর আমি জাগ্রত হয়ে বিবাহ করলাম এবং সন্তানাদি হল। এখন সেই খাহেশের জোর আর নেই।


সুতরাং মুরীদের বিবাহ করার প্রয়োজন দেখা দিলে বিবাহের শুরুতে নিয়ত ভাল রাখবে এবং পরিণামে জরুরী হক আদায় করবে। নিয়ত ভাল রাখার আলামত হচ্ছে, কোন সম্বলহীন ধর্মপরায়ণা মহিলাকে বিবাহ করবে, বিত্তশালিনী তালাশ করবে না। জনৈক বুযুর্গ বলেন : বিত্তশালিনী মহিলাকে বিবাহ করার অনিষ্ট পাঁচটি, (১) মোহরানা বেশী হওয়া, (২) স্বামী গৃহে গমনে ইতস্ততঃ করা, (৩) সেবা না করা, (৪) অধিক ব্যয়ভার বহন করা এবং (৫) ত্যাগ করতে মনে চাইলে বিত্তের লোভে তা না পারা। পক্ষান্তরে সম্বলহীনাকে বিবাহ করার মধ্যে এরূপ কোন অনিষ্ট নেই। 

জনৈক বুযুর্গ বলেন : চারটি বিষয়ে নারীর পুরুষের চেয়ে কম হওয়া চাই। নতুবা সে পুরুষকে হেয় মনে করবে। চারটি বিষয় এই : বয়সে, দৈহিক গড়নে, অর্থকড়িতে এবং বংশ মর্যাদায়। পক্ষান্তরে চারটি বিষয়ে নারীর পুরুষের চেয়ে বেশী হওয়া দরকার- সৌন্দর্যে, শিষ্টাচারে সংযমে এবং চরিত্রে। 

পরিণামে জরুরী হক আদায়ের আলামত হচ্ছে সদা সদাচার প্রদর্শন করা। 

জনৈক মুরীদ বিবাহ করে সদা সর্বদা স্ত্রীর সেবাযত্ন করতে থাকে। অবশেষে স্ত্রী লজ্জিত হয়ে তার পিতা-মাতাকে বলল : আমি আমার স্বামীর সদাচারে বিস্মিত হয়েছি। এত বছর ধরে তার গৃহে যখনই পায়খানা করতে যাই তখনই সে বদনা আমার পূর্বে সেখানে রেখে দেয়। অন্য একজন বুযুর্গ জনৈকা রূপসী মহিলাকে বিবাহ করেন। স্বামী গৃহে যাওয়ার সময় নিকটবর্তী হলে স্ত্রী বসন্ত রোগে আক্রান্ত হল। তার পরিবারের লোকজন মহাচিন্তায় পড়ল, এখন স্বামী তাকে পছন্দ করবে না। বুযুর্গ ব্যক্তি সংবাদ পেয়ে প্রথমে চক্ষু রোগের বাহানা করলেন, এরপর অন্ধ সেজে গেলেন। স্ত্রী স্বামী গৃহে এসে বিশ বছর সদ্ভাবে সংসার করার পর মারা গেল। এরপর বুযুর্গ ব্যক্তি চক্ষু খুললেন। লোকেরা এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন : আমি ইচ্ছা করেই অন্ধ সেজেছিলাম যাতে শ্বশুরালয়ের লোকেরা দুঃখ না করেন। এতে সকলেই পরম বিস্ময় প্রকাশ করে বলল : এমন সদাচারী লোক দুনিয়াতে দ্বিতীয়জন আর নেই। 


জনৈক সুফী এক বদমেযাজ মহিলাকে বিবাহ করে সর্বদাই তার কটূক্তি সহ্য করতে থাকেন। লোকেরা বলল : আপনি এই মহিলাকে তালাক দেন না কেন? তিনি বললেন : আশংকা হয়, অন্য কোন ব্যক্তি তার হাতে নিপীড়িত হবে। অতএব মুরীদ বিবাহ করলে এরূপই হওয়া উচিত। আর যদি বিবাহ ছাড়া থাকতে পারে এবং বিবাহের কারণে আখেরাতের পথে বিঘ্ন সৃষ্টি হবে মনে করে, তবে বিবাহ না করাই উত্তম।


বর্ণিত আছে, মুহাম্মদ ইবনে সোলায়মান হাশেমীর দৈনিক আমদানী ছিল আশি হাজার দেরহাম। তিনি বসরার আলেমগণের কাছে এ মর্মে পত্র লেখলেন : আমি কোন মহিলাকে বিবাহ করতে চাই । আপনারা পছন্দ করে দিন। সকলেই একমত হয়ে তাঁকে জওয়াব দিলেন, রাবেয়া বসরীয়াকে বিবাহ করাই আপনার জন্যে উপযুক্ত। সেমতে তিনি রাবেয়া বসরীয়াকে এভাবে পত্র লেখলেন :

বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। হামদ ও সালাতের পর আবেদন হল, আল্লাহ তাআলা আমাকে আজ দৈনিক আশি হাজার দেরহাম আমদানী দিয়েছেন। আশা করা যায়, কিছু দিন পরেই আমদানী বৃদ্ধি পেয়ে দৈনিক এক লাখ দেরহাম হয়ে যাবে। যদি তুমি আমাকে মঞ্জুর কর, তবে এই ধন-সম্পদ সমস্তই তোমার হবে। —ইতি


হযরত রাবেয়া বসরীয়া এই পত্রের জওয়াবে লেখলেন : বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম, হামদ ও না'তের পর জানাচ্ছি, সংসার নির্লিপ্ততার মধ্যেই অন্তরের শান্তি ও দেহের সুখ নিহিত এবং দুনিয়ার প্রতি আগ্রহ দুঃখ ও অশান্তির কারণ। পত্র পাওয়ার সাথে সাথে আপনার উচিত পরকালের পাথেয় সংগ্রহ করা এবং পরকালের চিন্তায় মগ্ন হওয়া। আপনি নিজেই নিজের ওছি হয়ে যান, যাতে ত্যাজ্য সম্পত্তি বণ্টনের জন্যে অন্যকে ওছি নিযুক্ত করার প্রয়োজন না থাকে। সারা জীবন রোযা রাখুন এবং মৃত্যুর সময় ইফতার করুন। আমার অবস্থা হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা যদি আমাকে আপনার সমপরিমাণ অথবা আরও কয়েকগুণ বেশী ধন-সম্পদ দিয়ে দেন, তবুও এক মুহূর্ত আল্লাহকে স্মরণ না করে থাকতে পারব না। - ইতি


এ থেকে জানা যায়, যে বিষয় আল্লাহর স্মরণে অন্তরায় হয়, তা ত্রুটিযুক্ত। সুতরাং মুরীদ তার অন্তরের অবস্থা সম্পর্কে গভীর চিন্তা করবে। অবিবাহিত থাকা সম্ভব না হলে বিবাহ করা উত্তম। এ রোগের তিনটি প্রতিকার রয়েছে— প্রথম অনাহারে থাকা দ্বিতীয়, দৃষ্টি সংযত রাখা এবং তৃতীয়, অন্তরকে এমন কাজে ব্যস্ত রাখা, যাতে আচ্ছন্ন রাখে। এ তিনটি তদবীরে কোন উপকার না হলে সর্বশেষে বিবাহ করতে হবে। এতে এ রোগের মূল উৎপাটিত হয়ে যায়। এ কারণেই পূর্ববর্তী বুযুর্গগণ তাড়াহুড়া করে কন্যাদের বিবাহ দিতেন। সায়ীদ ইবনে মুসাইয়িব বলেন :

“শয়তান কারও তরফ থেকে নিরাশ হয় না। সে নারীদের দ্বারা অবশ্যই ফাঁদ পাতে”।


হযরত সায়ীদ ইবনে মুসাইয়িবের বয়স যখন চৌরাশি বছরে পৌঁছে, তখন তাঁর একটি চক্ষু নষ্ট হয়ে যায় এবং অপর চক্ষু থেকেও পানি ঝরতে থাকে । তখনও তিনি বলতেন : আমি নারীদের চেয়ে অধিক অন্য কিছুকে ভয় করি না। 

আবদুল্লাহ ইবনে আবী ওদায়া বলেন : আমি তাঁর কাছে গিয়ে বসতাম। কয়েক দিন যাইনি। এরপর একদিন গেলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এ কয়দিন কোথায় ছিলে? আমি বললাম : আমার স্ত্রী মারা গিয়েছিল। তাই হাযির হতে পারিনি। তিনি বললেন : তুমি আমাকে খবর দিলে না কেন? এরপর আমি প্রস্থানোদ্যত হলে তিনি বললেন : খুব তো চলে যাচ্ছ; কিন্তু জিজ্ঞেস করি, পরে বিয়ে শাদী করলে কি না? আমি আরজ করলাম : হুযুর, আমি গরীব মানুষ। আমাকে কে কন্যা দান করবে। তিনি বললেন : আমি দিচ্ছি। আমি সবিস্ময়ে বললাম : আপনি ! তিনি বললেন : হাঁ। অতঃপর খোতবা পাঠ করে সামান্য মোহরানার বিনিময়ে আপন কন্যার বিবাহ আমার সাথে সম্পন্ন করে দিলেন। আমি আহ্লাদে আটখানা হয়ে সেখান থেকে চলে এলাম এবং কারও কাছ থেকে কিছু কর্জ নেয়ার কথা ভাবছিলাম। ইতিমধ্যে মাগরিবের সময় হয়ে গেল। আমি নামায পড়ে গৃহে ফিরে এলাম। বাতি জ্বালিয়ে রুটি ও তেল নিয়ে ইফতার করতে বসলাম। এমন সময় দরজা থেকে করাঘাতের শব্দ কানে ভেসে এল। আমি জিজ্ঞেস করলাম : কে? জওয়াব এল : সায়ীদ। আমি ভাবনায় পড়ে গেলাম, কোন্ সায়ীদ হতে পারে! সায়ীদ ইবনে মুসাইয়িব হবেন, তা কল্পনায়ও ছিল না। কারণ, তিনি চল্লিশ বছর ধরে মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও যাওয়া সম্পূর্ণ মওকুফ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু দরজা খুলেই দেখি, সায়ীদ ইবনে মুসাইয়িব দণ্ডায়মান। আমি ধারণা করলাম, বোধ হয় কোন সাংঘাতিক প্রয়োজনে আমার কাছে এসেছেন । আমি আরজ করলাম : আমাকে ডেকে নিলেন না কেন? তিনি বললেন : তোমার কাছে আসাই সমীচীন মনে হল। আমি বললাম : আদেশ করুন। তিনি বললেন : তুমি বিবাহ করেছ। এখন একাকী শয়ন করবে- এটা আমার কাছে ভাল মনে হয়নি। তাই তোমার স্ত্রীকে তোমার কাছে পৌঁছে দিতে এসেছি। আমি ভাল করে দেখতেই দেখি, বাস্তবে সেই ভাগ্যবতী কন্যা সলজ্জ ভঙ্গিতে তাঁর পেছনেই দণ্ডায়মান রয়েছে। তিনি তার হাত ধরে ভিতরে ঠেলে দিয়ে দরজা বন্ধ করে চলে গেলেন । এদিকে কন্যাটি লজ্জা শরমের আতিশয্যে মাটিতে পড়ে গেল। আমি দরজা খুব ভাল করে বন্ধ করে দিলাম। অতঃপর যে পেয়ালায় রুটি ও তেল রাখা ছিল, তা বাতির কাছ থেকে সরিয়ে দিলাম, যাতে স্ত্রীর দৃষ্টিগোচর না হয়। এরপর গৃহের ছাদে উঠে প্রতিবেশীদেরকে ডাক দিলাম। সকলেই একত্রিত হয়ে জিজ্ঞেস করল : ব্যাপার কি? আমি বললাম : সায়ীদ ইবনে মুসাইয়িব আজ দিনের বেলায় তাঁর কন্যার বিবাহ আমার সাথে সম্পন্ন করেছেন। এখন রাতের বেলায় অপ্রত্যাশিতভাবে তিনি তাঁর কন্যাকে এখানে রেখে গেছেন। লোকেরা সবিস্ময়ে জিজ্ঞেস করল : সায়ীদ তোমাকে বিবাহ করিয়েছেন? আমি বললাম : হাঁ। তারা বলল : তাঁর কন্যা এখন তোমার গৃহে? আমি বললাম : হাঁ। অতঃপর তারা সকলেই তার কাছে গেল। আমার মা সংবাদ পেয়ে এলেন এবং বললেন : তিন দিন পর্যন্ত তুই বউ মাকে স্পর্শ করতে পারবি না। যদি করিস কখনও তোর মুখ দেখব না। এই তিন দিনে আমরা তাকে ঠিক করে নেব। মায়ের আদেশমত আমি তিন দিন আলাদা রইলাম। এরপর যখন তাকে দেখলাম, তখন পরমাসুন্দরী, কালামুল্লাহর হাফেয, সুন্নতের আলেম এবং স্বামীর হক সম্পর্কে বেশ ওয়াকিফহাল পেলাম। একমাস পর্যন্ত সায়ীদ ইবনে মুসাইয়িব আমার গৃহে এলেন না এবং আমিও তাঁর কাছে গেলাম না। একমাস পর যখন গেলাম, তখন তিনি ভক্তদের বৃত্তের মধ্যে উপবিষ্ট ছিলেন। আমি সালাম করলে তিনি শুধু জওয়াব দিলেন এবং কিছু বললেন না। ভক্তদের প্রস্থানের পর আমাকে জিজ্ঞেস করলেন : তোমার স্ত্রীর অবস্থা কি? আমি বললাম : খুব ভাল। তিনি বললেন : মর্জির খেলাফ কোন কিছু পেলে লাঠি দিয়ে খবর নেবে। আমি গৃহে চলে এলাম। এরপর তিনি বিশ হাজার দেরহাম আমার কাছে পাঠিয়ে দিলেন। এ ছিল সেই কন্যা, যাকে খলীফা আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ান তার খেলাফত কালে আপন পুত্রবধূরূপে গ্রহণ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সায়ীদ ইবনে মুসাইয়িব অস্বীকৃত হন। এরপর খলীফা মিথ্যা অভিযোগে তাঁকে একশ' বেত্রদণ্ডে দণ্ডিত করেন এবং কনকনে শীতের মধ্যে এক কলসী ঠাণ্ডা পানি তাঁর গায়ে ঢেলে দেন। এছাড়া কম্বলের কোর্তাও পরিধান করান। এসব কারণে কন্যাকে রাতেই স্বামী গৃহে বিদায় দেয়া পূর্ণ ধার্মিকতা ও সাবধানতার পরিচায়ক ছিল। (আল্লাহ তাঁকে উত্তম প্রতিদান দিন।)


পরবর্তী পর্ব

(৯) যিনা ও কুদৃষ্টি থেকে আত্মরক্ষা করা 

লজ্জাস্থানের খাহেশ

 


 উদর ও লজ্জাস্থানের খাহেশের প্রতিকার (পর্ব- ৭)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

লজ্জাস্থানের খাহেশ
প্রকাশ থাকে যে, দুটি উপকারিতা অর্জনের জন্যে মানুষকে স্ত্রী সহবাসের খাহেশে লিপ্ত করা হয়েছে। 
প্রথম হচ্ছে এর দ্বারা আনন্দ ও সুখ লাভ করে মানুষ পরকালের আনন্দ এবং সুখ স্মরণ করবে। কেননা, এই আনন্দ ও সুখ দীর্ঘস্থায়ী হলে দেহের আনন্দসমূহের মধ্যে সর্বাধিক শক্তিশালী হত; যেমন অগ্নি সর্বাধিক কষ্ট দায়ক। ফলে এই আনন্দ মানুষকে জান্নাতের জন্যে আগ্রহান্বিত করত। জান্নাতের আগ্রহ দোযখের ভয় ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সুখ ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য কষ্ট ছাড়া সম্ভবপর নয়। অতএব দুনিয়াতে যখন কেউ স্ত্রী সহবাসের আনন্দ ও সুখ উপভোগ করবে, তখন জেনে নেবে যে, জান্নাতের সুখও এমনি ধরনের অথবা এর চেয়েও উৎকৃষ্ট। দ্বিতীয় উপকারিতা হচ্ছে, পৃথিবীতে মানুষের বংশ পরম্পরা অব্যাহত রাখা। এ দু'টি উপকারিতা ছাড়া এই খাহেশের মধ্যে বিপদাপদ ও অপকারিতা এত বেশী যে, মানুষ একে নিয়ন্ত্রণ করে সমতার পর্যায়ে না রাখলে তার দ্বীন দুনিয়া উভয় বরবাদ হয়ে যায়।

“পরওয়ারদেগার, আমাদেরকে এমন বোঝা দিয়ো না, যার শক্তি আমাদের নেই”।

এই আয়াতের তফসীরে কেউ কেউ লেখেন, এখানে “শক্তির অধিক বস্তু” বলে সহবাসের তীব্র খাহেশ বুঝানো হয়েছে। এতে সন্দেহ নেই যে, মানুষের এই খাহেশ যখন উত্তেজিত হয়ে উঠে, তখন তার দুই তৃতীয়াংশ জ্ঞান বুদ্ধি লোপ পায়। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) দোয়ায় বলতেন :

“আল্লাহ, আপনার কাছে আশ্রয় চাই আমার কান, চক্ষু অন্তর ও বীর্যের অনিষ্ট থেকে”।


তিনি আরও বলেন : “নারী শয়তানের জাল। এই খাহেশ না থাকলে নারীরা পুরুষদের উপর রাজত্ব করতে পারত না।


বর্ণিত আছে, হযরত মূসা (আঃ) এক মজলিসে উপবিষ্ট ছিলেন, এমন সময় ইবলীস আগমন করল। তার মস্তকে বহুরঙ্গের চাকচিক্যময় টুপি। মূসা (আঃ)-এর নিকটবর্তী হয়ে সে টুপি খুলে রেখে দিল। অতঃপর সালাম করল। মূসা (আঃ) জিজ্ঞেস করলেন : তুমি কে? সে আরজ করল : আমি ইবলীস। তিনি বললেন : তোমার মৃত্যু হোক, এখানে আসার কারণ কি? ইবলীস বলল : আল্লাহর কাছে আপনার বিশেষ সম্মান ও মর্যাদা রয়েছে। তাই আপনাকে সালাম করতে এসেছি। মূসা (আঃ) বললেন : আচ্ছা, বল তো, মানুষ কি কাজ করলে তুমি তার উপর প্রবল হয়ে যাও? ইবলীস আরজ করল : যখন মানুষ নিজেকে বড় এবং গোনাহ ভুলে গিয়ে নিজের আমলকে বেশী মনে করতে থাকে, তখন সে আমার করায়ত্ত হয়ে যায়। আমি আপনাকে দুইটি বিষয়ে সতর্ক করছি। প্রথম, বেগানা নারীর সাথে নির্জনে যাবেন না। কেননা, যে পুরুষ বেগানা নারীর সাথে একান্তে থাকে, আমি স্বয়ং সেখানে যাই. চেলাদেরকে পাঠাই না। এরপর এই পুরুষকে কুকর্মে লিপ্ত করে দেই। 

দ্বিতীয়, আল্লাহর সাথে যে অঙ্গীকার করেন তা পূর্ণ করুন এবং যাকাত ও সদকার জন্যে নির্দিষ্ট মাল বণ্টন করে দিন। কারণ, মানুষ খয়রাতের জন্যে যে অর্থ আলাদা করে, আমি তাতেও নানা জটিলতা সৃষ্টি করি, যাতে সে তার নিয়ত পূর্ণ করতে না পারে। এরপর ইবলীস চলে গেল। 


সায়ীদ ইবনে মুসাইয়িব বলেন : রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেছেন, পূর্বকালে প্রেরিত সকল নবী সম্পর্কেই শয়তান আশা করত যে, নারীর ফাঁদে ফেলে তাঁদেরকে ধ্বংস করে দেবে। আমার কাছেও নারীর চেয়ে অধিক বিপজ্জনক কোন কিছু নেই। তাই আমি মদীনা মুনাওয়ারায় আপন গৃহ ছাড়া কারও গৃহে যাই না অথবা আপন কন্যার গৃহে জুমুআর দিন কেবল গোসল করতে যাই। 

জনৈক বুযুর্গ বলেন : শয়তান নারীকে বলে, তুমি আমার অর্ধেক বাহিনী। তুমি আমার তীর, যা কখনও লক্ষ্যভেদ করতে ব্যর্থ হয় না। তুমি আমার রহস্য। তুমি আমার দারোয়ান ও দূত। অর্থাৎ শয়তানের অর্ধেক বাহিনী হচ্ছে খাহেশ এবং অর্ধেক বাহিনী ক্রোধ। কিন্তু নারীর খাহেশ হচ্ছে সর্ববৃহৎ। এই খাহেশের তিনটি স্তর আছে- স্বল্পতা, বাহুল্য ও সমতার স্তর। বাহুল্য হচ্ছে, নারীর প্রতি এমন খাহেশ হওয়া যে, জ্ঞান-বুদ্ধি লোপ পায়, সাধনা ও আখেরাতের পথ থেকে বঞ্চিত করে দেয় অথবা দ্বীনদার পশ্চাতে ফেলে কুকর্মে লিপ্ত করে দেয়। এই পর্যায়ের খাহেশ অত্যন্ত নিন্দনীয়। স্বল্পতার স্তর হচ্ছে পুরুষত্বহীন হয়ে যাওয়া। এটাই নিন্দাযোগ্য ও খারাপ। সমতার স্তর হচ্ছে প্রশংসনীয়। তা হল, নারীর খাহেশ সর্বদা জ্ঞান-বুদ্ধি ও শরীয়তের আইনের অধীনে থাকবে। এতে বাড়াবাড়ি দেখা দিলে ক্ষুধা ও বিবাহের মাধ্যমে তা প্রতিহত করতে হবে। হাদীসে আছে- 

“যুবকগণ, অবশ্যই বিবাহ কর। যে সক্ষম নয় সে যেন রোযা রাখে। রোযা তার জন্যে খাসী হওয়ার মত।


(৮) মুরীদের বিবাহ করা না করা

রিয়ার বিপদাপদ


 উদর ও লজ্জাস্থানের খাহেশের প্রতিকার (পর্ব - ৬)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

রিয়ার বিপদাপদ

জানা উচিত, খাহেশ বর্জনকারী ব্যক্তি এমন দু'টি বিপদের সম্মুখীন হয়, যা সাধের বস্তু খাওয়ার চেয়েও অধিক ক্ষতিকর। প্রথম হচ্ছে, নফস কোন কোন খাহেশ ত্যাগ করতে পারে না। কিন্তু কেউ জানুক, এটাও চায় না। তাই নির্জনে সে বস্তুটি খেয়ে নেয়- জনসমাবেশে খায় না। একে বলা হয় “শেরকে খফী” তথা গোপন শেরক। জনৈক আলেমকে কোন দরবেশের হাল জিজ্ঞেস করা হলে তিনি চুপ করে রইলেন। লোকেরা বলল : তার কোন দোষ আপনি জানেন? তিনি বললেন : সে একান্তে এমন বস্তু খায়, যা প্রকাশ্যে খায় না। মোট কথা, এটা খুব বড় বিপদ । কেউ খাহেশের মহব্বতে লিপ্ত হয়ে গেলে তার উচিত তা প্রকাশ করে দেয়া। 'সাচ্চা হাল' একেই বলা হয়। এতে শুধু এটাই জানা যাবে যে, আমলের দোষে সাধনা ভণ্ডুল হয়ে গেছে। পক্ষান্তরে কোন দোষ গোপন করে তার বিপরীতে জনসমক্ষে পূর্ণতা প্রকাশ করলে দু'টি ক্ষতি হবে; যেমন মিথ্যা বলে তা গোপন করলে দু'টি মিথ্যা হয়ে যায়। দু'টি সত্যিকার তওবা না করা পর্যন্ত কেউ এরূপ ব্যক্তির প্রতি সন্তুষ্ট হয় না । এ কারণেই আল্লাহ পাক মোনাফেকদের আযাব বেশী বলে এরশাদ করেছেন। কেননা, কাফের প্রকাশ্যে কুফর করে; কিন্তু মোনাফেক কুফর করে তা গোপন করে। অতএব গোপন করা দ্বিতীয় কুফর হল। সে মানুষের দৃষ্টিকে আল্লাহর দৃষ্টির চেয়ে অধিক প্রখর বলে বিশ্বাস করে আপন কুফর গোপন করে। তাই সে দ্বিগুণ আযাবের যোগ্য হয়। বিভুজ্ঞানীগণ খাহেশ এমনকি, গোনাহে লিপ্ত হয়ে যান; কিন্তু রিয়ায় গ্রেফতার হন না। তাঁরা আপন দোষত্রুটি গোপন করেন না; বরং পূর্ণ বিভুজ্ঞান হচ্ছে, খাহেশকে আপন নফস থেকে আল্লাহর ওয়াস্তে দূর করবে এবং বাহ্যতঃ মানুষের বিশ্বাস হ্রাস করার জন্যে খাহেশ প্রকাশ করবে। জনৈক বুযুর্গ সাধের মামুলী বস্তু এনে গৃহে লটকিয়ে রাখতেন; অথচ খেতেন না, যাতে গাফেল লোক তাঁর কাছে এসে ভিড় না জমায় এবং তাঁকেও খাহেশ পূজারী মনে করে। দরবেশের বড় কৃতিত্ব হচ্ছে দরবেশীতে দরবেশী করা; অর্থাৎ দরবেশীর বিপরীত প্রকাশ করা। এটা সিদ্দীকগণের কাজ। এরূপ ব্যক্তি সেই ব্যক্তির মত, যাকে কেউ কিছু দিলে প্রকাশ্যে তা গ্রহণ করে; কিন্তু পরে গোপনে মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেয়। বলাবাহুল্য, তার অন্তর দু'বার বিনয়ী হয়। এক, বাহ্যতঃ গ্রহণ করার লাঞ্ছনা মেনে নেয়ার সময় এবং দুই, গোপনে ফেরত দেয়ার কালে আপন অভাব অব্যাহত রাখার সময়। এই স্তর অর্জিত হওয়া পর্যন্ত নিজেকে অপূর্ণ জ্ঞান করা এবং খাহেশ প্রকাশ করা উচিত। শয়তান তাকে এই বলে ধোকা দিতে চাইবে যে, এ খাহেশ প্রকাশ করলে অন্যেরাও তোমার অনুসরণ করবে। সুতরাং গোপন করার মধ্যেই অপরের সংশোধন

নিহিত। অথচ বাস্তবে অপরের সংশোধন লক্ষ্য হলে আপন নফসের সংশোধন অগ্রে এবং অধিক গুরুত্বপূর্ণ হত। এতে বুঝা গেল, উদ্দেশ্য রিয়া ছাড়া কিছুই নয়।


দ্বিতীয় রিপদ হচ্ছে, খাহেশ বর্জনে সক্ষম; কিন্তু সাধু বলে পরিচিতি হওয়ার আকাঙ্ক্ষী। এমতাবস্থায় খাদ্যের খাহেশ, যা আসলে দুর্বল, তা তো বর্জন করা হল; কিন্তু সুখ্যাতির খাহেশ, যা অধিক অনিষ্টকর- তার খপ্পরে পড়া হল। একে বলা হয় গোপন খাহেশ। এটা খাদ্যের খাহেশ অপেক্ষা অধিক জোরালো। কেউ নিজের মধ্যে এ ধারার খাহেশ অনুভব করার পর যদি একে অধিক জোরালো মনে করে খাদ্যের খাহেশ মিটিয়ে নেয় এবং খেয়ে ফেলে, তবে এটা তার জন্যে উত্তম। হযরত আবু সোলায়মান বলেন : তোমার সামনে যখন বর্জন করা সাধের খাদ্য আসে, তখন তা থেকে সামান্য খেয়ে নাও, নফসের চাহিদা মোতাবেক খেয়ো না। এতে দু'টি উপকারিতা আছে। এক, খাহেশ থাকবে না এবং দুই, নফস আকাঙ্ক্ষার মধ্যে থেকে যাবে। হযরত ইমাম জাফর (রহঃ) বলতেন : আমার সামনে কোন খাহেশের বস্তু এলে আমি আপন নফসকে দেখি। যদি প্রকাশ্যে আকাঙ্ক্ষা করতে দেখি, তবে খাইয়ে দেই। বাধা দেয়ার চেয়ে এটা ভাল । আর যদি দেখি, গোপনে আকাঙ্ক্ষা করে এবং প্রকাশ্যে বর্জনকারী হতে চায়, তবে খাওয়া বর্জন করি- কখনও খাই না । এ থেকে গোপন খাহেশের জন্যে নফসকে সাজা দেয়ার পদ্ধতি জানা গেল । মোট কথা, খাদ্যের খাহেশ ত্যাগ করে গোপন খাহেশে লিপ্ত হওয়া এমন, যেমন কেউ বিচ্ছুকে ভয় করতঃ সাপের কাছে চলে যায়। কেননা, রিয়ার ক্ষতি খাদ্যের খাহেশের ক্ষতির তুলনায় অনেক বেশী।


(৭) লজ্জাস্থানের খাহেশ

ক্ষুধা ও তার ফযীলতে মিতাচার


উদর ও লজ্জাস্থানের খাহেশের প্রতিকার (পর্ব– ৫)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

ক্ষুধা ও তার ফযীলতে মিতাচার

জানা উচিত, সকল অবস্থা ও চরিত্রের মধ্যে মধ্যবর্তিতাই চূড়ান্ত লক্ষ্য এবং স্বল্পতা ও বাহুল্য নিন্দনীয়। ক্ষুধার ফযীলত সম্পর্কে আমরা যা কিছু লিখে এসেছি, এতে কেউ যেন মনে না করে যে, এর বাহুল্যই উদ্দেশ্য। আসল কথা হচ্ছে, মানুষের মন যে সকল বস্তু চূড়ান্ত পর্যায়ে কামনা করে এবং তাতে কিছু অনিষ্ট থাকে, সেখানে শরীয়ত অতিমাত্রায় নিষেধবাণী উচ্চারণ করে, যাতে মূর্খরা বুঝে নেয় যে, সর্বাবস্থায় বিষয়টি থেকে বেঁচে থাকাই উদ্দেশ্য এবং যথাসম্ভব মনের চাহিদার বিপরীত আমল করা লক্ষ্য। কিন্তু বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী ব্যক্তি বুঝে নেয়, মিতাচারের স্তরই কাম্য । উদাহরণতঃ অত্যধিক উদরপূর্তি কোন মনের চাহিদা হলে শরীয়ত তার সামনে পূর্ণমাত্রায় ক্ষুধার গুণ ও প্রশংসা বর্ণনা করে, যাতে মন কোনরূপে তার চাহিদা থেকে বিরত থেকে মিতাচারের স্তর অর্জন করে নেয়। কেননা, মনের চাহিদার সম্পূর্ণ মূলোৎপাটন সম্ভবপর নয়। অতএব এমন কোন সীমা অবশ্যই থাকা দরকার, যার আমল শরীয়তের দৃষ্টিতে প্রশংসনীয় হবে। উদাহরণতঃ রাত্রি জাগরণ ও রোযা সম্পর্কে শরীয়তে অতিমাত্রায় গুণকীর্তন করা হয়েছে। কিন্তু যখন রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) জানলেন, কিছু সংখ্যক লোক সদাসর্বদা রোযা রাখে এবং সারারাত জেগে নামায পড়ে, তখন তিনি তাদেরকে নিষেধ করে দিলেন। এ থেকে জানা গেল, উদ্দেশ্য কেবল সমতার স্তর। সুতরাং খাওয়ার ব্যাপারে উত্তম ও মিতাচার হচ্ছে, এতটুকু খাবে, যদ্ধারা পাকস্থলী ভারী না হয় এবং ক্ষুধার কষ্ট অনুভূত না হয়। কেননা, খাদ্যের উদ্দেশ্য হচ্ছে জীবন রক্ষা করা এবং এবাদতের শক্তি অর্জন করা। পাকস্থলী ভারী হয়ে গেলে যেমন এবাদত হতে পারে না, তেমনি ক্ষুধার কষ্টও অন্তরের কাজে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অতএব এমনভাবে খাবে যাতে খাদ্যের বোঝা অনুভূত না হয়, যাতে ফেরেশতাদের অনুরূপ হওয়া যায়। ফেরেশতাদেরও খাদ্যের বোঝা ও ক্ষুধার কষ্ট মালুম। তাদের অনুসরণ করাই মানুষের জন্যে পূর্ণতার স্তর। ভোজনে তৃপ্তি ও ক্ষুধা থেকে কেউ নিষ্কৃতি পেতে পারে না। তাই উভয় অবস্থা থেকে অধিকতর দূরবর্তী স্তরটিই মধ্যবর্তী স্তর, যাকে সমতা বলা হয়। স্বল্পতা ও বাহুল্য থেকে মধ্যবর্তী স্তরে ফিরে যাওয়া এমন, যেমন লোহার একটি উত্তপ্ত বৃত্তকে মাটিতে রেখে একটি পিঁপড়াকে তার মধ্যস্থলে ছেড়ে দিলে পিঁপড়াটি বৃত্তের উত্তাপ থেকে আত্মরক্ষা করতে চতুর্দিক দিয়ে বের হয়ে যেতে চাইবে। কিন্তু সকল দিকেই উত্তাপ বিদ্যমান। সে কোন দিক দিয়ে বের হতে পারবে না এবং ইতস্ততঃ ছুটাছুটি করতে থাকবে। অবশেষে এই বৃত্তের ব্যাসার্ধে পৌঁছে থেমে সে সকল দিকের উত্তাপ থেকে অধিকতর দূরত্বে থাকবে। এমনিভাবে খাহেশও মানুষকে চতুর্দিক বেষ্টন করে রয়েছে। মানুষ পিঁপড়ার মত তার বৃত্তের মধ্যে পড়ে আছে। এই বৃত্ত অতিক্রম করে বের হয়ে যাওয়া মানুষের পক্ষে অসম্ভব। অথচ মানুষ ফেরেশতাদের অনুরূপ হতে চায়। এটা তখনই সম্ভব, যখন মানুষ খাহেশ থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকে। সমতা সকল দিক থেকে সমান দূরে বিধায় সকল অবস্থা ও চরিত্রে সমতাই কাম্য হওয়া উচিত। নিম্নোক্ত হাদীসে এই সমতাই উদ্দেশ্য “মধ্যবর্তী বিষয়ই সর্বোত্তম”। নিম্নোক্ত আয়াতেও এই সমতার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে : “খাও, পান কর এবং অপচয় করো না।”


সুতরাং মানুষ যখন ক্ষুধা ও তৃপ্তি উভয়টি অনুভব করবে, তখন নফস হালকা থাকবে, এবাদত ও চিন্তা ভাবনা সহজ মনে হবে এবং আমল করতে সক্ষম হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে নফস অবাধ্য, খাহেশের প্রতি আগ্রহী এবং বাহুল্যের প্রতি ঝুঁকে থাকে বিধায় সমতা অর্জন করা সহজ হয় না এবং এতে কোন উপকারও হয় না। তখন বরং ক্ষুধা দ্বারা তাকে অধিক মাত্রায় পীড়িত করা উচিত; যেমন ঘোড়াকে পোষ মানানোর জন্যে প্রথম তাকে ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্ত রাখা হয় এবং খুব কষাঘাত করা হয়। এরপর ঘোড়া পোষ মানে এবং প্রভুর ইচ্ছানুযায়ী কাজ করে। পোষ মানার পর ঘোড়াকে সকল কষ্ট থেকে মুক্তি দিয়ে সমতার পর্যায়ে ছেড়ে দেয়া হয়। এই রহস্যের ভিত্তিতেই মুরশিদ মুরীদকে এমন কাজ করতে বলে, যা সে নিজে করে না। উদাহরণতঃ সে মুরীদকে ক্ষুধার্ত থাকতে অথবা খাহেশ বর্জন করতে আদেশ করে; অথচ সে নিজে ক্ষুধার্ত এবং খাহেশ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকে না। কেননা, সে আপন নফসের সংশোধন সমাপ্ত করেছে। এখন নফসকে কষ্ট দেয়ার কোন প্রয়োজন নেই। অধিকাংশ অবস্থায় নফস খাহেশের পূজারী, দুষ্ট, অবাধ্য ও এবাদতবিমুখ হয় বিধায় তাকে ক্ষুধার্ত রাখাই সমীচীন। দুব্যক্তিই সর্বদা ক্ষুধার্ত থাকা হতে বিরত থাকে। এক, সিদ্দীক; তার ক্ষুধার্ত থাকার প্রয়োজন নেই; কারণ তার নফস সৎপথে প্রতিষ্ঠিত । দুই, নির্বোধ; সে নিজেকে সিদ্দীক মনে করে সংশোধনের উপযুক্ত মনে করে না। এটা একটা বড় ধোঁকা বৈ কিছু নয়। সে প্রায়ই কোন সিদ্দীককে এ ব্যাপারে পরওয়া না করতে দেখে নিজেও তেমনি করতে থাকে। দৃষ্টান্তস্বরূপ কোন রুগ্ন ব্যক্তি জনৈক রোগমুক্ত সুস্থ ব্যক্তিকে কোন বস্তু খেতে দেখে। এরপর সেও নিজেকে সুস্থ মনে করে সেই বস্তু খেয়ে ফেলে এবং মৃত্যুমুখে পতিত হয়।


রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর জন্যেও খাদ্যের পরিমাণ এবং সময় নির্দিষ্ট ছিল না। হযরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেন, তিনি এত বেশী রোযা রাখতেন যে, আমরা মনে করতাম, বোধ হয় আর কখনও রোযা ছাড়বেন না। আবার কখনও রোযাবিহীন দিন এত বেশী হত যে, আমরা ধারণা করতাম, বোধ হয় আর কোন দিন রোযা রাখবেন না। তিনি গৃহে পৌঁছে খাবার আছে কি না জিজ্ঞেস করলে যদি “হাঁ” বলা হত, তবে খেয়ে নিতেন। নতুবা বলতেন : আজ তো আমি রোযা রেখেছি। এমনিভাবে তাঁর সামনে কোন খাদ্য পেশ করা হলে তিনি বলতেন : আমি তো রোযা রাখতে চেয়েছিলাম। আচ্ছা, নিয়ে এস। 

সহল তস্তরীকে কেউ জিজ্ঞেস করল : শুরুতে আপনার অবস্থা কিরূপ ছিল? জওয়াবে তিনি অভাবনীয় কষ্ট করার কথা উল্লেখ করলেন। এমনকি, তিনি বললেন : দীর্ঘ দিন আমি বড়ই গাছের পাতা খেয়ে জীবন যাপন করেছি। তিন বছর ডুমুর ফল চূর্ণ করে খেয়েছি এবং তিন বছরে তিন দেরহামের খাদ্য খেয়েছি। এরপর তাঁকে প্রশ্ন করা হল : বর্তমানে আপনার খাদ্য কি? তিনি বললেন : এখন কোন সীমা ও সময় নির্দিষ্ট নেই। এর অর্থ এই নয় যে, এখন অনেক খাই। বরং উদ্দেশ্য হচ্ছে, খাওয়ার কোন পরিমাণ ও সময় নির্দিষ্ট নেই। যে সময় যে পরিমাণ জরুরী এবং সমীচীন মনে করি, খেয়ে নেই।


হযরত মারুফ কারখীর কাছে লোকেরা উৎকৃষ্ট খাদ্য প্রেরণ করত। তিনি খেয়ে নিতেন। লোকেরা বলল : আপনার ভাই বশীর এরূপ খাদ্য খান না। তিনি বললেন : বশীরকে পরহেযগারী বাধা দেয়। আমাকে মারেফত প্রশস্ত করে রেখেছে। তিনি আরও বললেন : আমি আল্লাহর মেহমান। তিনি যখন খাওয়ান, খেয়ে নেই। যখন উপবাস রাখেন, সবর করি। আমার ওযর আপত্তি করার প্রয়োজন কি?


হযরত ইবরাহীম ইবনে আদহাম একদিন অনেক প্রকারের খাদ্য তৈরী করিয়ে কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে দাওয়াত করেন। তাঁদের মধ্যে আওযায়ী এবং সুফিয়ান সওরীও ছিলেন। খাদ্য সামগ্রীর আড়ম্বর দেখে সুফিয়ান সওরী বললেন : হে আবু ইসহাক, আপনি কি অপব্যয়ের আশংকা করেন না? ইবরাহীম বললেন : খাদ্যের মধ্যে অপব্যয় হয় না। পোশাক-পরিচ্ছদ ও গৃহের আসবাবপত্রের মধ্যে অপব্যয় হয়।


অতএব যে ব্যক্তি শুনে ও অনুকরণ করে জ্ঞান অর্জন করে, সে প্রকৃত কারণ বুঝে না। সে ইবরাহীম ইবনে আদহামের এই অবস্থা শুনে; আবার মালেক ইবনে দীনারের এই অবস্থা দেখে যে, তাঁর গৃহে বিশ বছর পর্যন্ত নিমক আসেনি। আবার সিররী সকতী সম্পর্কে সে পাঠ করে যে, তাঁর নফস চল্লিশ বছর পর্যন্ত আঙ্গুরের নির্যাস খাওয়ার সাধ পোষণ করে; কিন্তু তিনি তা খাননি। এসব শুনে ও পাঠ করে এ ব্যক্তি এগুলোর মধ্যে পরস্পর বিরোধিতা দেখতে পায়। সে হয়রান হয়ে বিশ্বাস করতে থাকে, এই বুযুর্গগণের মধ্যে কেউ না কেউ নিশ্চিতই ভ্রান্ত ছিলেন। কিন্তু যে চক্ষুষ্মান ব্যক্তির সামনে জ্ঞানের সকল রহস্য উন্মোচিত, সে জানে, সকলেই সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তবে অবস্থা ও সময়ভেদে তাঁদের আমল বিভিন্নরূপ ছিল। এসব বিভিন্ন অবস্থা শুনে সাবধানী ব্যক্তি বুঝে নেয়, সে মারেফতের স্তরে পৌঁছেনি। তাই এই বুযুর্গানের মত বেপরওয়া হওয়া তার উচিত নয়। তার নফস মালেক ইবনে দীনার অথবা সিররী সকতীর নফসের মত আনুগত্যশীল নয়, যাঁরা পার্থিব আনন্দ বিসর্জন দিয়েছিলেন। ফলে সে তাঁদেরই অনুসরণ করতে থাকে। পক্ষান্তরে দাম্ভিক অহংকারী ব্যক্তি এভাবে চিন্তা করে- আমার নফস ইবরাহীম ইবনে আদহাম ও মারুফ কারখীর নফস অপেক্ষা অধিক নাফরমান নয়।

অতএব আমিও তাঁদের অনুসরণ করে খাদ্যের নিয়মনীতি শিকায় তুলে রাখব। আমিও আল্লাহর মেহমান। সুতরাং বাছবিচারের প্রয়োজন নেই। এক্ষেত্রে নির্বোধদের সাথে সাথে শয়তানেরও অনেক দখল আছে। খাদ্য গ্রহণ করা না করা এবং শখের বস্তু খাওয়া না খাওয়া কেবল এমন ব্যক্তির জন্যেই শোভনীয়, যে বেলায়েত ও নবুওয়তের নূর দ্বারা দেখে। এই নূর তখনই অর্জিত হয় যখন কেউ নফসের খাহেশ থেকে মুক্ত হয়ে যায় এবং অভ্যাসের দাসত্ব থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে সে যখন খায়, তখনও তাতে কোন মহৎ নিয়ত থাকে এবং যখন না খায়, তখনও তা নিয়ত থেকে খালি হয় না। এমতাবস্থায় খাওয়া না খাওয়া উভয়টি আল্লাহর ওয়াস্তে হবে। এ ব্যাপারে হযরত ওমর (রাঃ)-এর সাবধানতা দৃষ্টির সামনে রাখা উচিত। তাঁর জানা ছিল, রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) মধু পছন্দ করতেন এবং তা সাগ্রহে খেতেন। কিন্তু হযরত ওমর (রাঃ) আপন নফসকে রসূলূল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর নফসের অনুরূপ মনে করেননি। ফলে লোকেরা যখন তাঁর সামনে মধুর ঠাণ্ডা শরবত পেশ করল, তখন তিনি পাত্রটি আপন হাতের মধ্যে ঘুরাচ্ছিলেন আর বলছিলেন : “এটা পান করলে এর স্বাদ কিছুক্ষণের মধ্যে বিলীন হয়ে যাবে; কিন্তু এর হিসাব নিকাশ বাকী থেকে যাবে”। এরপর আমি পান করব না' বলে পাত্রটি ফিরিয়ে দিলেন। 

মুরীদকে এসব রহস্য সম্পর্কে অবগত না করাই মুরশিদের উচিত। তাকে কেবল ক্ষুধার্ত থাকতে বলবে এবং সমতার কথাও বলবে না। কারণ, সে সমতা অর্জন করতে কিছু ত্রুটি করবে। সুতরাং চূড়ান্ত পর্যায়ের ক্ষুধার কথা বললে কমপক্ষে সমতা অর্জিত হয়ে যাবে। এ কথাও মুরীদকে বলবে না যে, কামেল সাধক সাধনা থেকে মুক্ত ও বেপরওয়া হয়ে যায়। এতে শয়তান সর্বক্ষণ তাকে কুমন্ত্রণা দেবে - তুমি তো কামেল হয়ে গেছ। এতে কোন ত্রুটি নেই। সবই অর্জিত হয়ে গেছে। 

হযরত ইবরাহীম খাওয়াস মুরীদকে সাধনা করতে বললে নিজেও তার সাথে সাধনা করতেন, যাতে সে মনে না করে যে, নিজে তো কিছু করেন না, আমাকে করতে বলেন।


প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে সমতা কোনটি, তা এক গোপন বিষয়। তাই কোন অবস্থাতেই যেন সাবধানতা হাতছাড়া না হয়। হযরত ওমর (রাঃ) একবার আপন পুত্র আবদুল্লাহকে দেখলেন, সে গোশত ও ঘি রুটির সাথে খাচ্ছে। তিনি তৎক্ষণাৎ তাকে দোররা দিয়ে মারলেন এবং বললেন : কোন দিন দুধ দিয়ে, কোন দিন ঘি দিয়ে, কোন্‌দিন তেল দিয়ে, কোনদিন লবণ দিয়ে এবং কোন দিন কোন কিছু ছাড়াই শুকনো রুটি খাবে। এ থেকে সমতা কাকে বলে জানা গেল। সব সময় গোশত এবং খাহেশের বস্তু খাওয়া বাহুল্য ও অপব্যয়ের মধ্যে দাখিল। পক্ষান্তরে গোশত সম্পূর্ণরূপে বর্জন করা স্বল্পতা ও দীনতার মধ্যে গণ্য। মাঝে মাঝে খেয়ে নেয়া মধ্যবর্তী স্তর ও সমতা।


(৬) রিয়ার বিপদাপদ

উদরের খাহেশ চূর্ণকারী সাধনা


 উদর ও লজ্জাস্থানের খাহেশের প্রতিকার (পর্ব– ৪)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

উদরের খাহেশ চূর্ণকারী সাধনা 

উদর ও খাদ্যের ব্যাপারে মুরীদের উচিত চারটি বিষয় নির্দিষ্ট করে নেয়া  (১) খাদ্যের পরিমাণ, (২) খাদ্যের সময়, (৩) খাদ্যের শ্রেণী এবং (৪) পরহেযের স্তর। শেষোক্ত বিষয়টি আমরা হালাল ও হারাম অধ্যায়ে বর্ণনা করেছি। এখানে প্রথমোক্ত তিনটি বিষয় উল্লেখ করা হচ্ছে। প্রথম কথা, খাদ্যের পরিমাণ হ্রাস করতে হবে এবং এতে ধাপে ধাপে সাধনা করতে হবে, যাতে একটি অনুমানে পৌঁছা যায়। কারণ, অতিভোজনে অভ্যস্ত কোন ব্যক্তি যদি হঠাৎ খাদ্য হ্রাস করে দেয়, তবে কষ্টও বেশী হবে এবং দুর্বলতা হেতু সাধনা সহ্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে। সুতরাং অল্প অল্প করে খাদ্য হ্রাস করতে হবে। উদাহরণতঃ যদি কেউ দু'রুটি খায় এবং তা হ্রাস করে এক রুটিতে আনতে চায়, তবে পূর্ণ এক মাস সময়ের মধ্যে তা হ্রাস করা যায়। প্রথমে দু'রুটির পরিমাণ ওযন করবে। এর পর প্রত্যহ এক রুটির ওযনের ত্রিশ ভাগের এক ভাগ হ্রাস করবে। অথবা লোকমার গণনার মাধ্যমেও এটা করা যায়। এভাবে কোন ক্ষতি অথবা বিরূপ প্রভাবের আশংকা নেই। খাদ্যের পরিমাণের চারটি স্তর আছে। 


প্রথম স্থর, এতটুকু কম, যাতে জীবনটা কোন রকমে বেঁচে যায়। এটা সিদ্দীকগণের স্তর। সহল তস্তরী (রহঃ)ও একেই পছন্দ করেন । তিনি বলেন : আল্লাহ্ তাআলা জীবন, বুদ্ধি-বিবেচনা ও শক্তি- এই তিনটি বিষয় দ্বারা এবাদত করান। যদি বান্দা জীবন ও বুদ্ধি-বিবেচনা বিলুপ্ত হওয়ার আশংকা করে, তবে আহার করবে- রোযা রাখবে, মাঝে মাঝে রোযা ছাড়াও থাকবে। খাদ্য নিজের কাছে না থাকলে তালাশ করবে। আর যদি এ দু'টি বিলুপ্ত হওয়ার আশংকা না হয়- কেবল শক্তি বিনষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা হয়, তবে খাদ্যের কোন পরওয়া করবে না, যদিও দুর্বলতার কারণে বসে বসে নামায পড়তে হয়। এক্ষেত্রে বিশ্বাস করতে হবে যে, উপবাসের দুর্বলতার কারণে বসে নামায পড়া খাদ্যের শক্তি দ্বারা দাঁড়িয়ে নামায পড়ার তুলনায় উত্তম। কেউ তার খাদ্যের অবস্থা জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন : আমি সারা বছরে তিন দেরহামের খাদ্য খাই। এক দেরহামের বিনিময়ে আঙ্গুরের ঘন রস ক্রয় করি, এক দেরহাম দিয়ে চাউলের আটা এবং এক দেরহাম দিয়ে ঘি কিনে নেই। এর পর সবগুলো মিলিয়ে তিনশ' ষাটটি বড়ি তৈরি করে নেই। প্রতি রাতে এক বড়ি দিয়ে ইফতার করি। তবে আজকাল সময়ের কোন পরিমাণ নির্দিষ্ট নেই। জনৈক সংসারত্যাগী সম্পর্কে বর্ণিত আছে, তিনি আপন খাদ্য সাড়ে তিন মাশা পর্যন্ত পৌঁছিয়ে ছিলেন।


দ্বিতীয় স্তর হচ্ছে, দিনে-রাতে পাঁচ ছটাক পরিমাণে খাদ্য খাবে । সম্ভবত এটা অধিকাংশ লোকের এক-তৃতীয়াংশ পেটের সমান হবে, যা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। হযরত ওমর (রাঃ)-এর অভ্যাস তাই ছিল। তিনি সাত লোকমা অথবা নয় লোকমা খেতেন।


তৃতীয় স্তর হচ্ছে, সারা দিনে আড়াই পোয়া পরিমাণে আহার করবে। এটা পেটের এক-তৃতীয়াংশের বেশী এবং খুব সম্ভব দু-তৃতীয়াংশের সমান । এমতাবস্থায় এক-তৃতীয়াংশ পেট পানীয়ের জন্য থেকে যাবে।


চতুর্থ স্তর হচ্ছে, আরও বাড়িয়ে এক সের পর্যন্ত আহার করবে। এর বেশী খাওয়া অপব্যয়ের মধ্যে দাখিল এবং খোদায়ী আদেশের বিপরীত। এখানে বুঝা দরকার, অধিকাংশের দিকে লক্ষ্য করে উপরোক্ত স্তরসমূহ বর্ণিত হয়েছে। নতুবা খাদ্যের পরিমাণ ব্যক্তি, বয়স ও সংশ্লিষ্ট কাজকর্মের দিকে লক্ষ্য করে প্রত্যেকের জন্যে আলাদা ।


পঞ্চম স্তর হচ্ছে, সত্যিকার খাহেশ হলে আহার করবে এবং সত্যিকার খাহেশ বাকী থাকা অবস্থায় হাত গুটিয়ে নেবে; কিন্তু এক রুটি অথবা দু’রুটির পরিমাণ নির্দিষ্ট না করলে সত্যিকার খাহেশের শেষ সীমা প্রকাশ পাবে না। তবে সত্যিকার খাহেশের আলামত এই লিখিত আছে যে, যে কোন রুটি পেলে তা খেয়ে নেয়া। যদি নির্দিষ্ট রুটি মনে চায় কিংবা তরকারিও কামনা করে, তবে খাহেশ সত্যিকার হবে না ।

আরেকটি আলামত হচ্ছে, থুথু ফেললে তাতে মাছি বসবে না। অর্থাৎ থুথুর মধ্যে তৈলাক্ততা না থাকায় বুঝা যায়, পাকস্থলী শূন্য। সুতরাং সত্যিকার খাহেশের পরিচয় কঠিন। সুতরাং মুরীদের জন্যে এটাই উত্তম যে, খাদ্যের একটি পরিমাণ নির্দিষ্ট করে নেবে, যাতে যে এবাদত সে করে, তা সুন্দররূপে আনজাম দিতে পারে- তাতে দুর্বল না হয়ে পড়ে। এ সীমায় পৌঁছে যাওয়ার পর খাহেশ বাকী থাকলেও থেমে যাবে এবং পরিমাণ বাড়াবে না।


সারকথা, খাদ্যের বিশেষ পরিমাণ নির্ধারণ সম্ভবপর নয়। কেননা, অবস্থা ও ব্যক্তিভেদে প্রত্যেকের জন্যে আলাদা আলাদা সীমা রয়েছে। তবে সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে এক দলের অভ্যাস ছিল, তাঁরা সপ্তাহে এক ছা' গম আহার করতেন এবং খেজুর খেলে সপ্তাহে দেড় ছা' খেতেন। চার মুদে এক ছা' হয়। প্রতি মুদ আড়াই পোয়ার সমান। এভাবে এক দিনের খাদ্য হয় গম আধা মুদের কিছু বেশী। খেজুর বেশী হওয়ার কারণ এ থেকে বীচি বের হয়ে যায়। এ পরিমাণটি পেটের এক-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি। হযরত আবু যর গেফারী (রাঃ) রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর প্রকাশ্য-জীবদ্দশায় প্রতি সপ্তাহে তিন সের যব খেতেন । রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর ওফাতের পরও তাই আহার করতেন। তিনি বলতেন : আল্লাহর কসম, আমি সারা জীবন এই পরিমাণ বৃদ্ধি করব না । আমি প্রিয় হাবীব (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি  : “কেয়ামতের দিন সেই ব্যক্তি আমার অধিক নিকটে থাকবে, যে আমৃত্যু বর্তমান অবস্থার উপর কায়েম থাকবে”। তিনি কতক সাহাবীর উদ্দেশ্যে বলতেন : তোমরা রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর রীতিনীতি বদলে ফেলেছ। এখন যব শোধন করে খাও, চাপাতি রুটি তৈরী কর এবং দুধ, তরকারি ও নানা রকম খাদ্য খাও। পোশাক সকালে এক প্রকার ও বিকালে এক প্রকার পরিধান কর। এগুলো রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর আমলে কোথায় ছিল? সুফফাবাসীদের খাদ্য ছিল প্রত্যহ দু'জনের জন্যে তিন পোয়া খোরমা। এতে বীচিও রয়েছে, যা বাদ দেয়ার পর পরিমাণ খুব কম থেকে যেত।


দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, খাদ্যের সময় নির্দিষ্ট করা; অর্থাৎ একবার খাওয়ার পর কতক্ষণ পর পুনরায় খাবে। এতে তিনটি স্তর রয়েছে। প্রথম স্তর, তিন দিন অথবা আরও বেশী সময় খাবে না। কোন কোন সাধক এ ক্ষেত্রে এত সাধনা করেছেন যে, এই মেয়াদ ত্রিশ দিন, চল্লিশ দিন পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছেন। আলেমগণের মধ্যে অনেকের অবস্থা এরূপ। উদাহরণতঃ মুহাম্মদ ইবনে ওমর ওরফী, আবদুর রহমান ইবনে ইবরাহীম তায়মী, সোলায়মান খাওয়াস, সহল তস্তরী, ইবরাহীম ইবনে আহমদ খাওয়াস প্রমুখ। হযরত আবু বকর (রাঃ) ছয় দিন নির্দিষ্ট করতেন। সুফিয়ান সওরী ও ইবরাহীম ইবনে আদহাম তিন দিন নির্দিষ্ট করতেন । তাঁরা সকলেই উপদেশ দ্বারা আখেরাতে সাহায্য চাইতেন। জনৈক আলেম বলেন : যে ব্যক্তি আল্লাহর ওয়াস্তে চল্লিশ দিন কিছু না খায়, তার কাছে কতক খোদায়ী রহস্য উন্মোচিত হয়ে যায়। দ্বিতীয় স্তর হচ্ছে, দু' থেকে তিন দিন পর্যন্ত নির্দিষ্ট করা। এটা অভ্যাস বহির্ভূত নয়; বরং সম্ভবপর । সামান্য চেষ্টা সাধনা করলেই এই স্তর অর্জন করা যায় । তৃতীয় স্তর হচ্ছে, দিন ও রাতের মধ্যে একবার খাবে। এর বেশী হলে তা অপব্যয় হবে। সর্বদা তৃপ্ত অবস্থায় থাকা এবং ক্ষুধা অনুভব না করা বিলাসীদের কাজ, সুন্নত বিরোধী। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন : “রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) সকালে খেলে সন্ধ্যায় খেতেন না এবং সন্ধ্যায় খেলে সকালে খেতেন না”। বড় বড় বুযুর্গগণও এ নিয়ম পালন করতেন। তারা দিনে একবার খাদ্য গ্রহণ করতেন। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে সম্বোধন করে বলেন : “তুমি অপব্যয় থেকে বেঁচে থাক। প্রত্যহ দু'বার খাওয়া অপব্যয়ের মধ্যে দাখিল। প্রত্যেক দু'দিনে একবার খাওয়া মারাত্মক; কিন্তু প্রত্যহ একবার খাওয়া উভয়ের ঠিক মধ্যবর্তী স্তর। আল্লাহর কিতাবে এটা প্রশংসিত।”


অতএব, যে ব্যক্তি দিবারাত্রির মধ্যে একবার খেতে চায়, তার জন্যে তাহাজ্জুদের পর সোবহে সাদেকের পূর্বে অর্থাৎ সেহরীর সময়ে খাওয়া মোস্তাহাব। এতে দিনের বেলায় উপবাস করার কারণে রোযা হয়ে যাবে। এছাড়া রাতেও তাহাজ্জুদের জন্যে উঠা সহজ হবে।


তৃতীয় যে বিষয়টি নির্দিষ্ট করা দরকার, তা হচ্ছে খাদ্যের প্রসার। জানা দরকার, সর্বোত্তম খাদ্য হচ্ছে গমের আটা। এটা শোধিত অবস্থায় পাওয়া গেলে তা স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে দাখিল হয়ে যায়। মধ্যম খাদ্য হচ্ছে যবের শোধিত আটা এবং নিম্নস্তরের খাদ্য যবের অশোধিত আটা। উৎকৃষ্ট ব্যঞ্জন হচ্ছে গোশ্ত ও মিষ্টি, মধ্যম গোশতবিহীন শুরবা এবং নিম্নস্তরের হচ্ছে লবণ ও সিরকা। অধ্যাত্ম পথের পথিকদের অভ্যাস, তারা কখনও ব্যঞ্জন খান না; মনোলোভা সুস্বাদু খাদ্য থেকেও তারা বিরত থাকেন । কেননা, এতে নফসের আস্ফালন ও কঠোরতা বাড়ে এবং মনে দুনিয়ার আনন্দ ও বিলাস আসন পেতে নেয়। ইয়াহইয়া ইবনে মুয়ায বলেন : হে সাধকবৃন্দ! যদি জান্নাতের ওলীমা খেতে চাও, তবে দুনিয়াতে নফসকে যত বেশী সম্ভব অনাহারে রাখ। এখানে ক্ষুধা যত বেশী হবে, ততই সেখানকার খাদ্য খাওয়ার খাহেশ বৃদ্ধি পাবে। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন : “আমার উম্মতের মধ্যে অসৎ তারা, যারা ধনৈশ্বর্যের মধ্যে লালিত-পালিত এবং এর উপরই বড় হয়। তাদের সাহসিকতা কেবল নানা রকম খাদ্য এবং বিভিন্ন পোশাক-পরিচ্ছদ। তারা গলা ফাটিয়ে কথাবার্তা বলে”।


আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আঃ)-কে এরশাদ করেন : স্মরণ রাখ, তোমাকে কবরে থাকতে হবে। সেখানে অনেক খাহেশ থেকে বঞ্চিত থাকবে। পূর্ববর্তী বুযুর্গগণ সুস্বাদু খাদ্যকে খুব ভয় করতেন এবং একে দুর্ভাগ্যের আলামত মনে করতেন। তাই হযরত ওমর (রাঃ) ঠাণ্ডা পানির শরবত পান করেননি এবং বলতেন : আমাকে এর হিসাবের সাথে জড়িত করো না। 

হযরত নাফে' (রঃ) বর্ণনা করেন, ইবনে ওমর (রাঃ) একবার অসুস্থ হয়ে টাটকা মাছ খাওয়ার বাসনা প্রকাশ করেন। মদীনায় অনেক খোঁজাখুঁজির পরও তা পাওয়া গেল না । কয়েকদিন পর যখন পাওয়া গেল, তখন দেড় দেরহাম দিয়ে কিনে এনে রান্না করা হয়। অতঃপর একটি রুটির উপর মাছটি রেখে হযরত ইবনে ওমরের সামনে পেশ করা হয়। ইতিমধ্যে জনৈক ভিক্ষুক দরজায় এসে হাঁক দিল। হযরত ইবনে ওমর খাদেমকে বললেন : মাছটি রুটিতে জড়িয়ে ভিক্ষুককে দিয়ে দাও। খাদেম আরজ করল : জনাব, অনেক দিন থেকে যখন মাছ খেতে আপনার মন চাইছিল, তখন পাওয়া যায়নি। এখন পাওয়ার পর দেড় দেরহাম দিয়ে কিনে আপনার জন্যে রান্না করেছি। আপনি বললে ভিক্ষুককে এর মূল্য দিয়ে দেই। তিনি বললেন : না, এ মাছটি রুটিতে জড়িয়ে তাকে দিয়ে দাও। অতঃপর খাদেম গিয়ে ভিক্ষুককে বলল : তুমি এটি এক দেরহামের বিনিময়ে বিক্রয় করবে? ভিক্ষুক সম্মতি দিলে খাদেম এক দেরহাম তাকে দিয়ে মাছটি আবার তাঁর সামনে হাযির করল এবং বলল : এ মাছটি এক দেরহাম দিয়ে কিনে এনেছি। তিনি বললেন : ভিক্ষুকের কাছ থেকে দেরহাম ফেরত না নিয়ে মাছটি রুটিসহ তাকে দিয়ে এস। আমি রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি : যে ব্যক্তির কোন খাহেশ হয়, অতঃপর তাকে বাধা দেয় এবং ত্যাগ স্বীকার করে অন্যকে সমর্পণ করে, আল্লাহ্ তা'আলা তাকে ক্ষমা করবেন।


হযরত ওমর (রাঃ) একবার সংবাদ পান যে, ইয়াযীদ ইবনে আবু সুফিয়ান নানা রকম খাদ্য আহার করেন। সেমতে তিনি ইয়াযীদের খাদেমকে বললেন : তার রাতের খাদ্য প্রস্তুত হয়ে গেলে আমাকে সংবাদ দিও। খাদেম তাই করল। হযরত ওমর (রাঃ) ইয়াযীদের গৃহে চলে গেলেন। যখন খাদ্য এল, তখন প্রথমে “ছরীদ” (গোশতের শুরুয়া) আনা হল। হযতর ওমরও তার সাথে আহার করলেন। এরপর ভাজা করা গোশত আনা হলে ইয়াযীদ হাত বাড়ালেন; কিন্তু হযরত ওমর (রাঃ) হাত গুটিয়ে নিলেন এবং বললেন : হে ইয়াযীদ ইবনে আবু সুফিয়ান! তোমার এখানে এক খাদ্যের পর আরেক খাদ্য হয় নাকি? আল্লাহর কসম, যদি তুমি পূর্ববর্তীদের সুন্নত ছেড়ে দাও, তবে তাদের গোটা তরীকা থেকে তুমি আলাদা হয়ে যাবে। ইয়াসার ইবনে ওমায়র (রঃ) বলেন : আমি কোন দিন হযরত ওমরের জন্যে আটা শোধন করিনি। কখনও করে থাকলে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে করেছি। ওতবা (রাঃ) আটাগুলো রৌদ্রে রেখে দিতেন। শুকিয়ে গেলে খেয়ে নিতেন এবং বলতেন : একখন্ড রুটি ও নিমক খেয়ে থাকা উচিত, যাতে আখেরাতে ভাজা করা গোশত ও উৎকৃষ্ট খাদ্য পাওয়া যায়। তিনি একটি মাটির কলসী থেকে পানি পান করতেন, যা সারাদিন রৌদ্রে পড়ে থাকত। তাঁর বাঁদী বলত : আটা দিয়ে দিলে আমি রুটি তৈরী করে এবং পানি ঠাণ্ডা করে দেব। ওতবা জওয়াবে বলতেন : ক্ষুধার কুকুরকে দমন করা উদ্দেশ্য। সে এভাবেও দমিত হয়ে যায়।


শাকীক ইবনে ইবরাহীম বলেন : একদিন আমি যখন মক্কায় রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর জন্মস্থানের নিকটে অবস্থিত আলইয়াল বাজার দিয়ে গমন করছিলাম, তখন ইবরাহীম ইবনে আদহামকে রাস্তার ধারে বসে ক্রন্দন করতে দেখলাম। আমিও পথ ছেড়ে তাঁর কাছে গিয়ে বসলাম, এবং ক্রন্দনের কারণ জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন : ভাল আছি, যাও। অবশেষে আমি দ্বিতীয় ও তৃতীয় বার জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন : কারও কাছে না বললে বলতে পারি। আমি বললাম : ঠিক আছে, বলব না, আপনি বলুন। তিনি বললেন : তিরিশ বছর ধরে আমার মনে “হারীরা” খাওয়ার সাধ ছিল। কিন্তু আমি সর্বপ্রযত্নে মনকে তা থেকে বিরত রেখেছি। গতকাল রাতে যখন আমি বসে বসে ঝিমুচ্ছিলাম, তখন সবুজ পেয়ালা হাতে এক ব্যক্তি আগমন করল। পেয়ালা থেকে হারীরার সুগন্ধি বের হয়ে এল। আমি সাহস করে নফসকে বাধা দিলাম। লোকটি পেয়ালা আমার নিকটে রেখে বলল : ইবরাহীম, খাও। আমি বললাম : আমি আল্লাহর ওয়াস্তে এটা ছেড়ে দিয়েছি। খাব না। সে বলল : যদি আল্লাহ তাআলাই খাওয়ান, তবে খাওয়া উচিত। আমি এর কোন জওয়াব দিতে পারলাম না এবং কাঁদতে লাগলাম। লোকটি আবার বলল : নাও, খাও। আমি বললাম : খানা কোত্থেকে এল, এ কথা না জানা পর্যন্ত খেতে আমাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে। সে বলল : খাও, এটা তোমার জন্যে প্রদত্ত হয়েছে। আমাকে আদেশ করা হয়েছে, হে ইসফের, এ পেয়ালাটি নিয়ে যাও এবং ইবরাহীমের নফসকে খাইয়ে দাও। সে অনেক দিন ধরে নফসকে বাধা দিয়ে যাচ্ছে। এখন আল্লাহ্ তার প্রতি রহম করেছেন। হে ইবরাহীম, স্মরণ রাখ, আমি ফেরেশতাদের মুখে শুনেছি, যে ব্যক্তি দান গ্রহণ করে না, সে পরে তা তালাশ করেও পায় না। আমি বললাম : যদি তাই হয়, তবে আমি তোমার সম্মুখে আছি। এর সমাধান আল্লাহ তাআলাই দেবেন। এরপর আর এক ব্যক্তি দৃষ্টিগোচর হল । সে প্রথম ব্যক্তিকে কিছু দিয়ে বলল : তুমিই আপন হাতে খাইয়ে দাও। সেমতে সে আমার মুখে লোকমা দিতে শুরু করল। শেষ পর্যন্ত আমি ঘুমিয়ে পড়লাম । জাগ্রত হয়ে আমি মুখে হারীরার স্বাদ অনুভব করলাম।


শাকীক বলেন : ইবরাহীম এ কথা শেষ করতেই আমি বললাম : আপনার হাতটি দেখান তো। আমি তাঁর হাত ধরে চুম্বন করলাম এবং বললাম : হে আল্লাহ্! যাঁরা আপন খাহেশকে পূর্ণরূপে দাবিয়ে রাখে, তুমি তাদের সাধ পূর্ণ করে দাও। তুমিই অন্তরে বিশ্বাস দান কর এবং অন্তরকে প্রশান্ত রাখ । অধম বান্দা শাকীকের প্রতিও কৃপাদৃষ্টি দাও। এরপর শাকীক হযরত ইবরাহীম ইবনে আদহামের হাত আকাশের দিকে উত্তোলন করে বললেন : ইলাহী, এই হাত ও এই হাতের মালিকের বরকতে এবং ইবরাহীমকে প্রদত্ত অনুগ্রহের বরকতে এই মিসকীন বান্দার প্রতি অনুগ্রহ কর। সে তোমারই কৃপা, অনুগ্রহ ও রহমতের মুখাপেক্ষী, যদিও এর যোগ্য নয়। এরপর তিনি সেখান থেকে রওয়ানা হয়ে হরম শরীফে প্রবেশ করলেন।


কথিত আছে, মালেক ইবনে দীনার (রঃ) চল্লিশ বছর পর্যন্ত অন্তরে দুধের স্পৃহা নিয়েও দুধ পান করেননি। একদিন তাঁর কাছে খোরমা হাদিয়াস্বরূপ এলে লোকেরা তা খাওয়ার জন্যে তাঁকে পীড়াপীড়ি করল । তিনি বললেন : তোমরাই খেয়ে নাও। আমি চল্লিশ বছর এর স্বাদ গ্রহণ করিনি। তিনি বলেন : আমি পঞ্চাশ বছর ধরে দুনিয়া ত্যাগ করেছি। আমার অন্তর চল্লিশ বছর ধরে দুধ পান করার সাধ পোষণ করে আসছে। কিন্তু আল্লাহর কসম, আমি সারা জীবন তা পান করব না। ক্রীতদাস ওতবা বলেন : সাত বছর পর্যন্ত আমার মন গোশত খাওয়ার খাহেশ করতে থাকে। অবশেষে আমি এই ভেবে লজ্জাবোধ করলাম যে, মনের খাহেশ আর কত মুলতবী রাখব। সাত বছর তো হয়ে গেছে। অতঃপর একদিন একখন্ড গোত নিয়ে ভাজা করলাম এবং তা রুটিতে জড়িয়ে নিলাম। মুখে দেয়ার আগে একটি বালককে দেখে জিজ্ঞেস করলাম : তুমি কি অমুকের পুত্র নও, যে মারা গেছে? সে বলল : হাঁ। অতঃপর আমি গোশ্ত জড়ানো রুটিটি তাকে দিয়ে দিলাম । বর্ণিত আছে, বালকের হাতে রুটি সঁপে দিয়ে তিনি কেঁদে কেঁদে এই আয়াত পাঠ করতে থাকেন- “তারা খাদ্যের মহব্বত সত্ত্বেও মিসকীন, পিতৃহীন এতীম ও বন্দীকে খাদ্য খাওয়ায়”। এরপর তিনি কখনও গোশ্ত খাননি ।

জাফর ইবনে নসর বলেন : হযরত জুনায়েদ আমাকে কিছু আঞ্জীর ফল কিনে আনতে বললেন। আমি কিনে আনলে তিনি ইফতারের সময় তা মুখে দিলেন এবং সাথে সাথে ফেলে দিলেন। আমি এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন : অন্তরের কানে গায়েব থেকে আওয়াজ এসেছে, তুমি আমার খাতিরে এটি ছেড়ে দিয়েছিলে । আবার খাবে?


সালেহ্ বলেন : আমি আতা সলমীর খেদমতে আরজ করলাম : আমি আপনার জন্যে একটি বস্তু প্রেরণ করতে চাই। কিন্তু শর্ত হচ্ছে, আপনি ফেরত দিতে পারবেন না। তিনি বললেন : ভাল কথা। আমি আমার পুত্রের হাতে ঘি ও মধুর সাথে ছাতু মিশ্রিত করে পাঠিয়ে দিলাম এবং বলে দিলাম. যতক্ষণ তিনি না খান, সেখানেই থাকবে। তিনি খেলেন। এর পরের দিন আমি আবার প্রেরণ করলাম। কিন্তু তিনি না খেয়ে ফেরত পাঠিয়ে দিলেন। সেমতে আমি রাগতস্বরে তাঁকে বললাম : সোবহানাল্লাহ! আপনি আমার হাদিয়া ফেরত দিয়েছেন। তিনি আমাকে রাগ করতে দেখে বললেন : রাগের কোন কথা নেই। একবার তো আমি তোমার আবদার রেখেছি। দ্বিতীয় বার যখন তুমি প্রেরণ করলে তখন আমি অনেক খেতে চেয়েছি, কিন্তু সম্ভব হয়নি। যখনই আমি খাওয়ার ইচ্ছা করতাম তখনই এ আয়াত মনে পড়ে যেত-“চুমুক দেয় এবং গলাধঃকরণ করতে পারে না। সালেহ্ বলেন : আমি কেঁদে কেঁদে বললাম : হায়! আমি এক জায়গায় এবং আপনি অন্য জায়গায় আছেন । .


জনৈক আবেদ তাঁর এক আপনজনকে দাওয়াত করে এনে কয়েকটি রুটি সামনে রেখে দিলেন। লোকটি রুটিগুলো ওলট-পালট করে খাওয়ার জন্যে ভাল রুটি বেছে নিতে লাগল। আবেদ বললেন : এ কি করছ? তুমি জান না, যে রুটিটি তুমি বাদ দিয়েছ, সেটি কতজন কারিগরের হাত হয়ে তোমার কাছে এসেছে। প্রথমে মেঘমালা থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে। বৃষ্টি দ্বারা মৃত্তিকা ও চতুষ্পদ জন্তু সতেজ হয়েছে। অনেক মানুষে কাজ করেছে। এরপর এ রুটি তোমার কাছে এসেছে। এখন তুমি ওলট-পালট করছ এবং খাওয়ায় আগ্রহ দেখাচ্ছ না। হাদীসে বলা হয়েছে :

“রুটি গোলাকার হয়ে তোমার সামনে আসে না যে পর্যন্ত তাতে তিন'শ ষাট জন কারিগর কাজ না করে। প্রথম কারিগর হচ্ছে মীকাঈল (আঃ), যে পানিকে রহমতের ভাণ্ডার থেকে মেপে দেয়। এরপর সেই সকল ফেরেশতা, যারা মেঘমালা হাঁকিয়ে নিয়ে যায়। এরপর রয়েছে সূর্য, চন্দ্র এবং আকাশের ফেরেশতাকুল। সর্বশেষ কারিগর হচ্ছে রুটি প্রস্তুতকারী। যদি তুমি আল্লাহ্’র নেয়ামতসমূহ গণনা কর, তবে শেষ করতে পারবে না।


জনৈক বুযুর্গ বলেন : আমি কাসেম জাওরীর কাছে যেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, বৈরাগ্য কি? তিনি বললেন : তুমি এ সম্পর্কে কি শুনেছ? আমি কয়েকটি উক্তি উদ্ধৃত করলে তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। আমি বললাম : এ সম্পর্কে আপনার উক্তি কি? তিনি বললেন : উদর হচ্ছে মানুষের দুনিয়া। একে যতটুকু নিয়ন্ত্রণ করবে ততটুকু বৈরাগ্য অর্জিত হবে এবং যে পরিমাণ একে বাধা না দেবে, সেই পরিমাণ তুমি দুনিয়ার করায়ত্ত হয়ে যাবে।


এসব গল্প থেকে জানা গেল, আমাদের বর্ণিত উপকারিতাসমূহ অর্জনের উদ্দেশেই বুযুর্গগণ খাহেশ থেকে বিরত রয়েছেন এবং উদরপূর্তি করে আহার বর্জন করেছেন। মাঝে মাঝে এর কারণ এটাও ছিল যে, তাঁরা খাদ্যদাতার রুযী হালাল ও স্বচ্ছ মনে করতেন না। জানা উচিত, মন যা চায় তাই প্রয়োজনের অন্তর্ভুক্ত নয়। আবু সোলায়মান দারানী বলেন : লবণও খাহেশ বা কামনার বস্তু। কারণ, এটা রুটির অতিরিক্ত। রুটির অতিরিক্ত সবকিছুই বাড়তি এবং খাহেশের মধ্যে দাখিল। এটা চূড়ান্ত নীতি। কেউ এতে সক্ষম না হলে তার উচিত কমপক্ষে আপন নফস সম্পর্কে গাফেল এবং খাহেশের মধ্যে নিমজ্জিত না হওয়া। যা মনে চায়, তাই খাওয়া এবং যা খুশী তাই করা অপব্যয়ের জন্যে যথেষ্ট। তাই বিরতিহীনভাবে গোশত ভক্ষণ ত্যাগ করা উচিত। হযরত আলী (রাঃ) বলেন : যে ব্যক্তি চল্লিশ দিন পর্যন্ত গোশত বর্জন করে, সে বদস্বভাব হয় এবং যে চল্লিশ দিন অবিরত গোশত খায়, সে কঠোর প্রাণ হয়ে যায়। সার কথা, নফসকে বৈধ খাদ্যসামগ্রীর খাহেশের মধ্যেও ফেলা উচিত নয়। যদি কেউ দুনিয়াতে সকল খাহেশ পূর্ণ করে নেয়, তবে কেয়ামতে তাকে বলা হবে,  এজীবনেই তোমরা তোমাদের মজা নিঃশেষ করে দিয়েছে এবং ভোগ করে নিয়েছ। (এখন কি চাও? ) পার্থিব দুনিয়াতে নফসের বিরুদ্ধে জেহাদ করে যে পরিমাণ খাহেশ বর্জন করা হবে, আখেরাতে সেই পরিমাণ লোভনীয় সামগ্রী পাওয়া যাবে। বসরার জনৈক বুযুর্গ বিশ বছর পর্যন্ত চাউলের রুটি ও মাছ খাওয়ার সাধ পোষণ করতে থাকেন; কিন্তু নফসের উপর মোজাহাদা করে নিজেকে তা থেকে বিরত রাখেন । ওফাতের পর কেউ তাঁকে স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞেস করল : আল্লাহ তাআলা আপনার সাথে কিরূপ ব্যবহার করেছেন? তিনি বললেন : যেসকল নেয়ামত প্রাপ্ত হয়েছি, সেগুলো বর্ণনা করার ক্ষমতা আমার নেই। সর্বপ্রথম আমাকে যা দেয়া হয়েছে, তা ছিল চাউলের রুটি ও মাছ। আমাকে বলা হয়েছে- আজ যে পরিমাণ ইচ্ছা বেহিসাব খেয়ে নাও। আল্লাহ স্বয়ং বলেন : “স্বচ্ছন্দে খাও ও পান কর, বিগত দিনে যা পাঠিয়েছিলে তার কারণে”।


এ কারণেই আবু সালমান (রহঃ) বলেন : একটি খাহেশ ত্যাগ করা এক বছর রোযা রাখা ও রাত্রি জাগরণ অপেক্ষা অধিক উপকারী। আল্লাহ আমাদেরকেও মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর ওসিলায় স্বীয় সন্তুষ্টির তওফীক দান করুন।


পরবর্চী পর্ব

(৫) ক্ষুধা ও তার ফযীলতে মিতাচার-

ক্ষুধার উপকারিতা ও তৃপ্তির বিপদাপদ


 উদর ও লজ্জাস্থানের খাহেশের প্রতিকার (পর্ব– ৩)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন  ✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

ক্ষুধার উপকারিতা ও তৃপ্তির বিপদাপদ
এক্ষণে প্রশ্ন হয়, ক্ষুধার এত ফযীলত কোত্থেকে এল এবং এর কারণ কি ? ক্ষুধা দ্বারা কেবল পাকস্থলী দুঃখ ও কষ্টই ভোগ করে। যদি কষ্টের মধ্যেই ফযীলত নিহিত থাকে, তবে যারা আত্মহত্যা করে অথবা আপন দেহের মাংস কাটে অথবা এমনি ধরনের কোন কান্ড করে, তাদের অধিক সওয়াব হওয়া উচিত। এর জওয়াব হচ্ছে, এটা এমন, যেমন কেউ ওষুধ সেবন করে সুস্থ হওয়ার পর মনে করতে থাকে যে, ওষুধের মধ্যে যে তিক্ততা ছিল, তাতেই আমি সুস্থ হয়েছি। এর পর আরও অধিক তিক্ত ওষুধ খেতে শুরু করে। অথচ এটা ভ্রান্তি ছাড়া কিছু নয়। ওষুধের উপকারিতা তিক্ততার কারণে নয়। বরং ওষুধের মধ্যে একটি বৈশিষ্ট্য আছে, যা চিকিৎসকরা জানে। এমনিভাবে ক্ষুধার মধ্যে যেসব উপকারিতা রয়েছে, সেগুলো আলেমগণ জানেন। যে কেউ এর উপকারিতা বিশ্বাস করে নিজের জন্যে অবলম্বন করবে, সে নিঃসন্দেহে উপকৃত হবে, যদিও উপকারের কারণ তার মজানা থাকে। যেমন ঔষধ সেবনকারী কারণ না জানলেও ওষুধের উপকার পায়। কিন্তু যারা আপন জ্ঞানভান্ডার সমৃদ্ধ করতে চায়, তাদের জন্য নিম্নে আমরা ক্ষুধার দশটি উপকারিতা লিখে দিচ্ছি।


প্রথম উপকারিতা, ক্ষুধা দ্বারা অন্তরের পরিচ্ছন্নতা, স্বভাবের তীক্ষ্ণতা এবং অন্তর্দৃষ্টির পূর্ণতা অর্জিত হয়। এর বিপরীতে তৃপ্তি স্থূলবুদ্ধিতা জন্ম দেয়, মেধা বিনষ্ট করে এবং মস্তিষ্কে নেশার মত পৌঁছে চিন্তা-ভাবনার জায়গাকে ঘিরে ফেলে। ফলে অন্তর ভারী হয়ে চিন্তার দিকে ধাবিত হয় না এবং দ্রুত অনুভব করতে পারে না। শিশুরা বেশী খেলে তাদের স্মরণশক্তিতে ত্রুটি দেখা দেয়। হযরত আবু সোলায়মান (রহঃ) বলেন : ক্ষুধা অবলম্বন করা উচিত। এতে নফস লাঞ্ছিত এবং অন্তর সূক্ষ্ম হয়ে আসমানী জ্ঞান লাভের যোগ্য হয়। রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন : তোমাদের অন্তরকে কম হাসি ও কম তৃপ্তি দ্বারা পুনরুজ্জীবিত কর এবং পবিত্র কর ক্ষুধা দ্বারা। এতে তোমাদের অন্তর সাফ ও নরম হবে।”


হযরত ইবনে আব্বাসের রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন : যে পেট ভরে আহার করে ও নিদ্রা যায়, তার অন্তর কঠোর হয়ে যায়। অন্য এক রেওয়ায়েতে তিনি বলেন, প্রত্যেক বস্তুর যাকাত আছে। দেহের যাকাত ক্ষুধা।


হযরত শিবলী (রহঃ) বলেন : যখনই আমি আল্লাহর ওয়াস্তে ক্ষুধার্ত থেকেছি, তখনই অন্তরে প্রজ্ঞা ও শিক্ষার একটি দরজা খোলা পেয়েছি, যা পূর্বে পাইনি।


হযরত আবু ইয়াযীদ বোস্তামী (রহঃ) বলেন : ক্ষুধা একটি মেঘ । এর কারণে বান্দার অন্তরে হেকমতের বৃষ্টি বর্ষিত হয়। রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন : প্রজ্ঞার নূর হচ্ছে ক্ষুধা, আল্লাহ থেকে দূরত্ব হচ্ছে পেট ভরে খাওয়া এবং আল্লাহর নৈকট্য হচ্ছে মিসকীনদের ভালবাসা ও তাদের কাছে থাকা। তোমরা পেট ভরে খেয়ো না। খেলে অন্তর থেকে প্রজ্ঞার নূর নিভে যাবে। যে ব্যক্তি রাত্রি বেলায় সামান্য আহার করে নামায পড়ে, তার আশেপাশে সকাল পর্যন্ত বেহেশতের হুর থাকে।


দ্বিতীয় উপকারিতা হচ্ছে, অন্তরের নম্রতা, যা দ্বারা অন্তরের যিকিরের ত্রুটি অনুভব করা যায়। প্রায়ই এমন হয় যে, অন্তরের উপস্থিতিসহ মুখে যিকির চালু থাকে; কিন্তু অন্তর তাতে প্রভাবিত হয় না। অন্তর ও প্রভাবের মধ্যে যেন আন্তরিক কঠোরতা আড়াল হয়ে যায়। আবার কোন সময় অন্তরে যিকিরের খুব প্রভাব পড়ে এবং মোনাজাতে আনন্দ পাওয়া যায়। এর বাহ্যিক কারণ পাকস্থলী খালি হওয়া। আবু সোলায়মান দারানী (রহঃ) বলেন : আমি এবাদতে তখনই অধিক মিষ্টতা পাই, যখন আমার পিঠ পেটের সাথে লেগে থাকে। তিনি আরও বলেন : অন্তর যখন ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্ত থাকে, তখন পরিষ্কার ও পাতলা থাকে। পক্ষান্তরে যখন পেট ভর্তি থাকে, অন্ধ ও স্থূল হয়ে যায়।


তৃতীয় উপকারিতা হচ্ছে, বিনয় ও বশ্যতা অর্জিত হওয়া এবং দর্প ও অহংকার দূর হওয়া। ক্ষুধা দ্বারা নফস যতটুকু নম্র ও লাঞ্ছিত হয়, অন্য কোন কিছু দ্বারা ততটুকু হয় না। ক্ষুধার অবস্থায় নফস দুর্বল হয়ে যখন এক খন্ড রুটি ও এক চুমুক পানি পায় না, তখন মালিকের আনুগত্য করে ও অক্ষম হয়ে থাকে। নিজেকে অক্ষম অপারগ মনে করা এবং আল্লাহ ত’আলাকে পরাক্রমশালী মনে করার মধ্যেই মানুষের সৌভাগ্য নিহিত। তাই সর্বক্ষণ ক্ষুধার্ত হয়ে আল্লাহ তা'আলার দিকে প্রত্যাশী থাকা নেহায়েত জরুরী। এ কারণেই যখন দুনিয়া ও তার সমস্ত ভান্ডার রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর সামনে পেশ করা হয়েছিল, তখন তিনি মুখ ফিরিয়ে নেন এবং বলেন-

“না, বরং আমি একদিন ক্ষুধার্ত থাকব ও একদিন তৃপ্তি সহকারে খাব। যখন ভুখা থাকব, তখন সবর করব ও আনুগত্য করব। আর যখন পেট ভরে খাব, তখন শোকর করব”।


চতুর্থ উপকারিতা হচ্ছে, খোদায়ী আযাব ও বিপদগ্রস্তদের কষ্ট বিস্মৃত না হওয়া। কেননা, যারা পেট ভরে খায়, তারা ক্ষুধার্ত ও ক্ষুধা উভয়টি ভুলে যায়। হুশিয়ার ব্যক্তি কোন বিপদ দেখেই আখেরাতের বিপদ স্মরণ করে। সে পিপাসা দেখে কেয়ামতের মাঠে পরকালে পিপাসা স্মরণ করে এবং ক্ষুধা দেখে দোযখীদের ক্ষুধা স্মরণ করে। দোযখীরা ভুখা অবস্থায় কন্টকযুক্ত বৃক্ষ খাদ্য হিসেবে পাবে এবং পিপাসার সময় পুঁজ পাবে। যে ব্যক্তি কখনও ক্ষুধা ও পিপাসার কষ্ট না করে, সে আখেরাতের আযাব ভুলে যায়। 

হযরত ইউসুফ (আঃ)-কে লোকেরা জিজ্ঞেস করল : আপনি ভুখা থাকেন কেন, আসমান ও যমীনের ধন-ভান্ডার তো আপনার করায়ত্ত? তিনি বললেন : আমি আশংকা করি, পেট ভরে আহার করলে ভুখাদেরকে ভুলে যাব। এ থেকে বুঝা গেল, ভুখা ও অভাবগ্রস্তদেরকে স্মরণ করাও ক্ষুধার অন্যতম উপকারিতা। কারণ, ক্ষুধা থেকে দয়া, অন্নদান ও মানুষের প্রতি অনুকম্পা জন্ম লাভ করে।


পঞ্চম উপকারিতা হচ্ছে, খাহেশ চূর্ণ করা এবং “নফসে আম্মারা” তথা কুকর্মের আদেশদাতা নফসের বিরুদ্ধে জয়লাভ করা। এ উপকারিতাটি সর্ববৃহৎ। বলা বাহুল্য, সকল গোনাহের মূল কারণ হচ্ছে খাহেশ ও শক্তি, যার উপাদান খাদ্য ও আহার্য। খাদ্য হ্রাস করলে যাবতীয় খাহেশ ও শক্তি দুর্বল এবং নিস্তেজ হয়ে পড়ে। মানুষের সৌভাগ্য সবটুকুই নফসকে কাবু করে রাখার মধ্যে এবং দুর্ভাগ্য সবটুকুই নফসের কাবুতে চলে যাওয়ার মধ্যে নিহিত। সেমতে অবাধ্য ঘোড়া যেমন দানাপানি না দিলে কাবুতে থাকে, তেমনি নফসকে ভুখা রাখলে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। 

জনৈক বুযুর্গকে লোকেরা বলল : আপনি তো দুর্বল হয়ে পড়েছেন। এখন নফসের খেদমত করেন না কেন? তিনি বললেন : নফস দ্রুত আস্ফালন করতে থাকে এবং খুব দুষ্টামি করে। সে অবাধ্য হয়ে কোথাও আমাকে বিপদে না ফেলে দেয়, তাই তার খেদমত করি না। কোন গোনাহ করার চেয়ে নফসের সাথে কঠোরতা করাকেই আমি উত্তম মনে করি। 

হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন : রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর পরে সর্বপ্রথম যে বেদআতটি মাথাচাড়া দিয়ে উঠে, তা ছিল, মানুষ তৃপ্ত হয়ে আহার করতে শুরু করল। পেট ভরে খেলে অবশ্যই তাদের নফস দুনিয়ার দিকে জোর দেখাবে। জনৈক বুযুর্গ বলেন : ক্ষুধা আল্লাহ্ তা'আলার একটি ভাণ্ডার। এর সামান্যতম কাজ হচ্ছে লজ্জাস্থানের খাহেশ ও কথা বলার খাহেশ বিলোপ করা। কারণ, ভুখার মন বেশী কথা বলতে চায় না। ফলে সে মুখের আপদ তথা গীবত, অশ্লীলতা, মিথ্যাকথন ইত্যাদি থেকে নিরাপদ থাকে। 

যিনার ক্ষতি কারও কাছে গোপন নয়; কিন্তু ক্ষুধা দ্বারা মানুষ এর অনিষ্ট থেকেও নিরাপদ থাকে। পেট ভরে আহার করলে এই খাহেশ জোরদার হয়। আল্লাহর ভয়ে এ থেকে বিরত থাকলেও দৃষ্টিকে ফেরানো যায় না। এটাও যিনার মধ্যে দাখিল। 

জনৈক দার্শনিক বলেন : যে মুরীদ পানাহারের শাসনে সবর করে, এক বছরকাল আধা পেট রুটি খায় এবং তাতে কোন দিলপছন্দ বস্তু মিশ্রিত না করে,আল্লাহ তা'আলা তার মন থেকে নারীর চিন্তা দূর করে দেন।


ষষ্ঠ উপকারিতা হচ্ছে, নিদ্রা দূর হওয়া এবং অধিক সময় জাগ্রত থাকা। কেননা, যে পেট ভরে খায়, সে অনেক পানি পান করে। অধিক পানি পান করার কারণে নিদ্রা বেশী আসে। কোন কোন বুযুর্গ এ কারণেই আহারের সময় মুরীদকে বলতেন : বেশী আহার করো না। বেশী আহার করলে পানি বেশী পান করবে এবং নিদ্রা বেশী হবে।


সপ্তম উপকারিতা হচ্ছে, ক্ষুধা দ্বারা এবাদত অব্যাহত রাখা সহজ হয়। কেননা, স্বয়ং আহার করা অধিক এবাদতের পথে এ কারণে বাধা যে, এর জন্যে সময় ব্যয় করা প্রয়োজন। আটা ইত্যাদি ক্রয় করা ও রুটি তৈরী করার মধ্যেও বেশ সময় লেগে যায়। এ সময়কে যিকির, মোনাজাত ইত্যাদিতে ব্যয় করলে উপকার বেশী হত। হযরত সিররী (রহঃ) বলেন : আমি জুরজানীর কাছে ছাতু দেখে জিজ্ঞেস করলাম : আপনার ছাতু খাওয়া ও রুটি না খাওয়ার কারণ কি? তিনি বললেন, হিসাব করে দেখেছি, রুটি তৈরী করতে যে অতিরিক্ত সময় লাগবে তাতে সত্তর বার সোবহানাল্লাহ বলা যায়। তাই চল্লিশ বছর ধরে আমি রুটি খাওয়া ত্যাগ করেছি। চিন্তার বিষয়, তিনি সময় নষ্ট হওয়ার কথা কোথায় চিন্তা করেছেন এবং সময় নষ্ট হতে দেননি। এমনিভাবে মানুষের প্রত্যেকটি শ্বাস একটি অমূল্য সম্পদ। এর দ্বারা আখেরাতের অক্ষয় ভাণ্ডার অর্জন করা উচিত। এটা সময়কে আল্লাহর যিকর ও আনুগত্যে ব্যয় করার মাধ্যমে হয়। এছাড়া অধিক খাদ্য গ্রহণ করলে সব সময় পাকসাফ থাকা যায় না এবং মসজিদে অবস্থান করা যায় না। কেননা, বার বার পেশাব করার জন্যে যেতে হয়।


অষ্টম উপকারিতা হচ্ছে, দৈহিক সুস্থতা ও রোগব্যাধি প্রতিরোধ করা। কেননা, রোগব্যাধির কারণ হচ্ছে, অধিক ভোজন, যে কারণে অকর্মণ্য পিত্তাদি পাকস্থলী ও শিরায় একত্রিত থাকে। এর পর রোগী এবাদত করতে সক্ষম হয়না। মন সর্বদা উদ্বিগ্ন থাকে এবং জীবন তিক্ত হয়ে যায়। 


বর্ণিত আছে, খলীফা হারুনুর রশীদ একবার ভারত, রোম, ইরাক ও আবিসিনিয়া— এই চার দেশ থেকে চার জন খ্যাতনামা চিকিৎসককে একত্রিত করে জিজ্ঞেস করলেন : আপনারা এমন ওষুধের কথা বলুন যদ্দ্বারা কোন রোগ হয় না। 

ভারতীয় চিকিৎসক বলল : আমার মতে এরূপ ওষুধ হচ্ছে কাল হরীতকী। 

ইরাকী চিকিৎসক বলল : আমার মতে এটা হচ্ছে তেরাতীয়ক। 

রোমীয় চিকিৎসক গরম পানির কথা বলল। 

তাদের মধ্যে সর্বাধিক বিজ্ঞ ছিল আবিসিনীয় চিকিৎসক। সে বলল : হরীতকী খেলে পাকস্থলী সংকীর্ণ হয়ে যায়। এটাও একটা রোগ। তেরাতীযকের ফলে পাকস্থলী নরম হয়। এটা আলাদা ব্যাধি। গরম পানিতে পাকস্থলী দুর্বল হয়ে পড়ে, যা রোগ ছাড়া কিছু নয়। 

খলীফা জিজ্ঞেস করলেন : তা হলে আপনার মতে এরূপ ওষুধ কোনটি? সে জওয়াবে বলল : আমার মতে যে ব্যবস্থার ফলে রোগ হয় না, তা হচ্ছে, আহার তখন করবে, যখন খাহেশ হয় এবং খতম তখন করবে, যখন খাহেশ বাকী থাকে। সকলেই তার কথা মেনে নিল।


জনৈক আহলে কিতাব আলেমের সামনে এ হাদীসটি বর্ণনা করা হয়  -“পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাদ্যের জন্যে, এক-তৃতীয়াংশ পানীয়ের জন্যে এবং এক-তৃতীয়াংশ শ্বাসের জন্যে।


আলেম আশ্চর্যান্বিত হয়ে বললেন : স্বল্পভোজন সম্পর্কে এর চেয়ে অধিক মযবুত উক্তি আমি আর শুনিনি। এ উক্তি নিশ্চয়ই কোন দার্শনিকের মনে হয়। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন : “উদরপূর্তি মূল রোগ, পরহেয করা মূল ওষুধ। দেহ যে যে বিষয়ে অভ্যস্ত হয়, তারই অভ্যাস গড়ে তোল।”

আমাদের মতে এ হাদীসটি চিকিৎসকের নিকট অধিক আশ্চর্য মনে হওয়ার যোগ্য।


নবম উপকারিতা হচ্ছে, ব্যয় কম হওয়া। কেননা, যে অল্প ভোজন করবে, তার জন্যে অল্প সামগ্রী যথেষ্ট হবে। মুমিন ব্যক্তির কর্তব্য খরচ কম করা। জনৈক আলেম বলেন : আমি আমার অধিকাংশ প্রয়োজন এভাবে পূর্ণ করি যে, সেগুলো বাদ দিয়ে দেই। এতে অন্তর খুবই স্বস্তি পায়। 

হযরত ইবরাহীম ইবনে আদহাম (রহঃ) আপন সহচরদের কাছে খাদ্যদ্রব্যের দর জিজ্ঞেস করতেন। তারা দুর্মূল্যের কথা বললে তিনি বলতেন : খাওয়া বর্জন করে সস্তা করে নাও।


দশম উপকারিতা হচ্ছে, কম আহারের কারণে যে খাদ্য বেঁচে যাবে, তা সদকা-খয়রাতে ব্যয় করা যাবে। মানুষ যে পরিমাণ খাদ্য খেয়ে নেয়, তা মাটি ও পায়খানা হয়ে যায়। আর যে পরিমাণ সদকা করে, তা আল্লাহর রহমত লাভের জন্যে ভাণ্ডার হয়ে থাকে। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) এক ব্যক্তির ভুঁড়ির দিকে আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করে বললেন : যদি এই পরিমাণ অন্যের পেটে যেত, তবে তোমার জন্যে মঙ্গলজনক হত। অর্থাৎ, তুমি যদি আপন খাদ্য হ্রাস করে অন্যকে খাওয়াতে, তবে তা আখেরাতের জন্য ভাণ্ডার হত। 


হযরত হাসান বসরী (রহঃ) বলেন : আল্লাহর কসম, আমরা এমন লোক দেখেছি, যাদের কাছে সামান্যই খাদ্য ছিল। ইচ্ছা করলে তারা সবটুকু খেতে পারতেন; কিন্তু তারা বলতেন : আমরা সবটুকু নিজেদের পেটে দেব না। কিছু আল্লাহর জন্যেও রেখে দেব।


পরবর্তী পর্ব

উদরের খাহেশ চূর্ণকারী সাধনা

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...