রবিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৩

ক্রোধ উত্তেজিত হওয়ার কারণ

 

ক্রোধ, বিদ্বেষ ও ঈর্ষা (পর্ব- ৩)
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

ক্রোধ উত্তেজিত হওয়ার কারণ-
কি কারণে ক্রোধ উত্তেজিত হয় এবং কোন্ অবস্থায় গুপ্ত থাকে, উহা বুঝিয়া লওয়া দরকার। মনে কর, এক ব্যক্তির কোন বিশেষ একটি জিনিসের নিতান্ত প্রয়োজন; কিন্তু অপরে ইহা ছিনাইয়া লইতে চাহিলে প্রথমোক্ত ব্যক্তি ক্রুদ্ধ হইয়া থাকে। আর যে দ্রব্যের তাহার কোন দরকার নাই, যেমন কাহারও একটি কুকুর আছে এবং ইহা তাহার কোন উপকারেও আসে না, এরূপ স্থলে ইহা যদি কেহ অপহরণ করে বা মারিয়া ফেলে, তবে হয়ত কুকুরের মালিক ক্রুদ্ধ হইবে না। অপরপক্ষে আহার্য সামগ্রী, পরিধেয় বস্ত্র, ঘরবাড়ী, স্বাস্থ্য ইত্যাদি জীবন ধারণের অত্যাবশ্যক দ্রব্যাদি ব্যতীত মানুষ কখনও চলিতে পারে না। এমতাবস্থায়, এবং অন্ন-বস্ত্র ছিনাইয়া লইলে ক্রোধ অবশ্যই মাথা তুলিয়া দাঁড়াইবে। যাহার যত অধিক অভাব তাহার ক্রোধ তত অধিক এবং সে সেই পরিমাণে অসহায় ও দুঃখিত। মানুষ যে পরিমাণে স্বীয় অভাব ও আবশ্যকতা বর্জন করিবে সেই পরিমাণে সে আজাদী লাভ করিবে। আর যে পরিমাণে অভাব ও আবশ্যকতা বৃদ্ধি পাইবে, সেই পরিমাণে সে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকিবে। মানব সাধনার ফলে এত পরিমাণে স্বাধীনতা লাভ করিতে পারে যে, সে তখন জীবন ধারণের জন্য নিতান্ত আবশ্যক দ্রব্যাদির অভাব অনুভব করে। এই সময় মান-মর্যাদা ও ধনের অভাব তাহার মোটেই অনুভব হয় না। জগতের নানাবিধ অতিরিক্ত পদার্থের অভাব হইতেও সে তখন নিষ্কৃতি লাভ করে। সুতরাং মান-মর্যাদার হানি এবং ধন-দৌলত ও অতিরিক্ত দ্রব্যাদি হস্তগত না হওয়া বা অপহৃত হওয়ার নিমিত্ত তাহার অন্তরে তখন আর ক্রোধ উত্তেজিত হইয়া ওঠে না; ইহা তখন স্বতই লয়প্রাপ্ত হয়।
সম্মান লাভের প্রত্যাশী নহে, এমন ব্যক্তির অগ্রে অগ্রে কেহ পথ চলিলে বা সভাস্থলে তাহার অপেক্ষা উচ্চ আসনে বসিলে ইহাতে তাহার অন্তরে ক্রোধের সঞ্চার হয় না। ক্রোধোৎপত্তির কারণ অনুসন্ধান করিলে মানুষে মানুষে বিরাট প্রভেদ পরিলক্ষিত হয়। যাহাতে একের ক্রোধের সঞ্চার হয় অপরে ইহাতে লজ্জায় মাথা হেট করে। অধিকাংশ স্থানে মান-মর্যাদা ও ধন-দৌলত লইয়াই ক্রোধ উত্তেজিত হইয়া উঠে। নিতান্ত ঘৃণ্য ও তুচ্ছ ব্যাপার অবলম্বনেও কেহ কেহ ক্রুদ্ধ হয়। দাবা ও চৌসরক্রীড়া, কবুতর খেলা বা মদ্যপান প্রভৃতি নিকৃষ্ট ও জঘন্য কর্মে অভ্যস্ত লোকের এই সকল অপকর্মে কোন ত্রুটি ধরিলে তাহার ক্রুদ্ধ হইয়া উঠে। কেহ যদি এই প্রকৃতির লোককে বলে- “তুমি দাবা খেলায় তত দক্ষতা লাভ কর নাই, তুমি বেশী মদ পান করিতে অক্ষম, তবে সে ক্রুদ্ধ হয়। মান-সম্ভ্রম, ধন-দৌলত বা অন্যান্য ঘৃণ্য ও তুচ্ছ ব্যাপার অবলম্বনে যে সমস্ত ক্রোধের উৎপত্তি হয়, রিয়াযত দ্বারা মানুষ তৎসমুদয় হইতে নিষ্কৃতি লাভ করিতে পারে। কিন্তু জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি অবলম্বনে যে ক্রোধের উৎপত্তি হয় মানুষ ইহা হইতে নিস্তার লাভ করিতে পারে না এবং এই প্রকার ক্রোধের মূলোচ্ছেদ সঙ্গতও নহে।

স্থলবিশেষে ক্রোধ বাঞ্ছনীয়
মানব জীবনে নিতান্ত আবশ্যক দ্রব্যাদির অপচয় ও অপহরণজনিত ক্রোধ বাঞ্ছনীয়। কিন্তু যে স্থানে ক্রোধ মঙ্গলজনক সে স্থানে যেন মানুষ ক্রোধের উত্তেজনায় উন্মত্ত দিশাহারা না হয় এবং ধর্ম-বুদ্ধির বশীভূত থাকে, এইজন্য তাহার সাবধান হওয়া কর্তব্য। সাধনা দ্বারা মানুষ এই প্রকার ক্রোধের আজ্ঞাধীন করিতে সমর্থ হয়। ইহার মূলোৎপাটন অসম্ভব ও অসঙ্গত। রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) যে ক্রোধশূন্য ছিলেন না, ইহাই তাহার প্রকৃষ্ট প্রমাণ।

রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন- 
>“আমি (স্বভাব চরিত্রে) তোমাদের মত মানুষ; তোমরা যেরূপ ক্রোধ কর আমিও তদ্রূপ ক্রোধ করি। যদি আমি কাহাকেও অভিশাপ দেই, কটুবাক্য বলি বা আঘাত করি, তবে হে খোদা, আমার সেই কাজকে তাহার উপর তোমার রহমতের হেতু করিয়া লও।" 

হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আমর ইব্‌নে আছ রদিয়াল্লাহু আন্হু তখন নিবেদন করিলেন- “ইয়া রাসূলাল্লাহ্, আপনি ক্রুদ্ধ অবস্থায় যাহা বলিলেন উহাও আমি লিপিবদ্ধ করিতেছি।” তিনি বলেন- >“ইহাও লিখিয়া লও, যে আল্লাহ্ আমাকে সত্য রাসূল করিয়া পাঠাইয়াছেন, তাঁহার শপথ, আমি ক্রুদ্ধ হইলেও সত্য ব্যতীত কোন কথা আমার মুখ হইতে বাহির হয় না।” 

সুতরাং দেখা যাইতেছে, রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) এই কথা বলেন নাই যে, তাঁহার ক্রোধ ছিল না; বরং তাঁহারও ক্রোধ ছিল, কিন্তু ইহা সত্য ও ন্যায়-বিচারের সীমা অতিক্রম করিয়া যাইতে পারে নাই, তিনি ইহাই প্রকাশ করিয়াছেন।

একদা হযরত আয়েশা রদিয়াল্লাহু আন্হা ক্রুদ্ধ হইলেন দেখিয়া রাসূলে মাকবুল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন- “হে আয়েশা, তোমার শয়তান আসিয়াছে।” তিনি নিবেদন করিলেন- “ইয় রাসূলাল্লাহ্, আপনার কি শয়তান নাই?” উত্তরে হযরত (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বলিলেন- “হাঁ, আছে; তবে আল্লাহ্ তাহার উপর আমাকে বিজয়ী করিয়াছেন, সে আমার বশীভূত হইয়া রহিয়াছে; সৎকাজ ব্যতীত অন্য কোন কাজে সে আদেশ করে না।” এস্থলেও তিনি ইহা বলেন নাই যে, তাঁহার ক্রোধ প্রবৃত্তি ছিল না।

তাওহীদ প্রভাবে গুপ্ত ক্রোধ 
মানব হৃদয় হইতে ক্রোধের মূলোচ্ছেদ সম্ভবপর না হইলেও অবস্থাবিশেষে ইহা গুপ্ত থাকে। অল্প বা অধিক সময়ের জন্যই হউক, কাহারও হৃদয়ে তাওহীদ ভাব (আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস) প্রবল হইয়া তাহাকে তন্ময় করিয়া ফেলিলে সেই ব্যক্তি তখন যাহা কিছু সংঘটিত হইতে দেখে, উহা একমাত্র আল্লাহর দিক হইতেই সংঘটিত হইতেছে দেখিতে পায়। তেমন ব্যক্তির হৃদয়ে ক্রোধ অদৃশ্যভাবে থাকে এবং মোটেও উত্তেজিত হইয়া উঠে না। যেমন মনে কর, একে অপরের উপর পাথর নিক্ষেপ করিল। আহত ব্যক্তির অন্তরে ক্রোধ অদৃশ্যভাবে থাকিলেও সে কিছুতেই পাথরের উপর ক্রুদ্ধ হয় না। কারণ, সে জানে, জড় পাথরের কোন দোষ নাই; বরং পাথর নিক্ষেপকারীই অপরাধী। তদ্রূপ বিচার অপরাধীকে হত্যার আদেশ কলম দ্বারা লিখিলেও দণ্ডিত ব্যক্তি কলমের উপর ক্রুদ্ধ হয় না। কারণ, কলমের সাহায্যে দণ্ডাদেশ লিখিত হইলেও সে জানে যে, ইহা লেখকের আজ্ঞাধীন এবং তাহার স্বাধীন প্রবর্তনশক্তিতেই কলম পরিচালিত হইয়াছে ও ইহার নিজস্ব কোন ক্ষমতা নাই । তদ্রূপ, যাহার হৃদয়ে তাওহীদ ভাব প্রবল হইয়া তাহাকে তন্ময় করিয়া ফেলিয়াছে, সেই ব্যক্তি অবশ্যই জানে যে, সৃষ্টির মাধ্যমে যে কাজ সম্পন্ন হয়, ইহাতে সেই প্রাণীর কোন স্বাধীন ক্ষমতা নাই।
মানবের কয়েকটি বৃত্তির সমন্বয় ও সম্মিলিত চেষ্টায় কার্য সম্পন্ন হয়। ইহারা পরস্পর অধীনতার পাশে আবদ্ধ। বাহ্যদৃষ্টিতে দেখা যায় যে, হস্তপদাদি সঞ্চালনেই কার্য সম্পন্ন হয়। কিন্তু হস্তপদাদি সঞ্চালন শক্তির অধীন। শক্তি হস্তপদাদি ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে যে দিকে চালায় ইহারা সেইদিকে চলিলেও এই ব্যাপারে শক্তি স্বাধীন নহে। শক্তি ইচ্ছার অধীন। ইচ্ছা আবার মানবের আজ্ঞাধীন নহে। তাহার মনঃপুত হউক বা না হউক, ইচ্ছাকে তাহার উপর চাপাইয়া দেওয়া হইয়াছে। ইচ্ছার সহিত শক্তির সংযোগ ঘটিলে হস্তপদাদি সঞ্চালনে কার্য আবশ্য সম্পন্ন হইয়া থাকে। উল্লিখিত পাথর নিক্ষেপ কার্যের প্রতি লক্ষ্য করিলে বুঝা যাইবে যে, নিক্ষেপকারীর ইচ্ছানুসারে শক্তির সংযোগ হওয়াতেই হস্তপদাদি সঞ্চালনে পাথরটি ঐ ব্যক্তির উপর নিক্ষিপ্ত হইয়াছিল এবং উহার আঘাত হইত ব্যক্তি বেদনা অনুভব করিয়াছিল। পাথরটি স্বেচ্ছায় নিজ স্বাধীন ক্ষমতায় তাহাকে আঘাত করে নাই এবং এইজন্যই ইহার উপর কেহই ক্রুদ্ধ হয় না ।
আবার মনে কর, একমাত্র একটি ছাগলের দুগ্ধ দ্বারাই এক ব্যক্তি জীবিকা নির্বাহ করে। এমতাবস্থায়, ছাগলটি মরিয়া গেলে তাহার দুঃখ হয়, কিন্তু কাহারও উপর সে ক্ষুদ্ধ হয় না। আবার ছাগলটিকে কেহ বধ করিয়া ফেলিলেও তাওহীদভাবে তন্ময় ব্যক্তির পক্ষে তাহার উপর ক্রুদ্ধ না হওয়াই সঙ্গত। কারণ, তাওহীদের তন্ময়ভাব যাহাকে বিভোর করিয়া রাখিয়াছে, নিখিল বিশ্বের সকল কার্য কেবল আল্লাহর দিক হইতে সম্পন্ন হইতেছে সে দেখিতে পায়, সেই ব্যক্তি উক্ত পাথর নিক্ষেপকারী ও ছাগলবধকারী উভয়কেই বিশ্বনিয়ন্তা সর্বশক্তিমান আল্লাহ্ কর্তৃক পরিচালিত দেখিতে পাইয়া তাহাদের উপর কুপিত হইতে পারে না। কিন্তু তাওহীদের তন্ময়ভাব সর্বক্ষণ প্রবল থাকে না; বরং বিদ্যুৎ চমকের ন্যায় ইহা নিমিষেই বিলীন হইয়া যায়। তখন দৈহিক প্রকৃতির দাবি-দাওয়া এবং আন্তরিক প্রবৃত্তির প্রভাবে জাগতিক পূর্বসংস্কার আবার তাহার হৃদয়ে জাগিয়া উঠে। অধিকাংশ কামিল ব্যক্তির অন্তরে কোন কোন সময় এরূপ তাওহীদভাব আসে। তাহাদের অন্তর হইতে যে ক্রোধের মূলোচ্ছেদ হইয়াছে, তাহা নহে; বরং সৃষ্ট জীবের মাধ্যমে যে কাজ সম্পন্ন হইতেছে, ইহাতে সেই জীবের কোন স্বাধীন প্রবর্তনশক্তি নাই, এই বিশ্বাসে তাহাদের হৃদয়ে ক্রোধের সঞ্চার হয় না। তেমন ব্যক্তির প্রতি কেহ প্রস্তর নিক্ষেপ করিলেও তাহার অন্তরে ক্রোধ জাগিয়া উঠে না।

গুরুতর কাজের চাপে লুক্কায়িত ক্রোধ

যাহাকে তাওহীদ ভাবাবেশ তন্ময় করে নাই, এমন ব্যক্তিও কোন গুরুতর কাজে নিবিষ্ট থাকিলে তাহার হৃদয়েও ক্রোধ জাগিয়া উঠে না; বরং লুক্কায়িত থাকে। হযরত সালমান রদিয়াল্লাহু আন্হুকে এক ব্যক্তি গালি দিল। তিনি তাহাকে বলিলেন- কিয়ামতের দিন আমার পাপের পাল্লা ভারী হইলে তুমি যাহা বলিতেছ আমি তদপেক্ষা মন্দ, কিন্তু পাপের পাল্লা হাল্কা হইলে তোমার কথায় আমার কি ভয়?” হযরত রাবী' ইব্‌নে খায়সাম (রহঃ)-কে কেহ গালি দিলে তিনি বলিলেন- “বেহেশ্ত ও আমার মধ্যে এক দুর্গম গিরিপথ রহিয়াছে। আমি ইহা অতিক্রমে ব্যাপৃত আছি। অতিক্রম করিতে পারিলে আমি তোমার গালিকে ভয় করি না; কিন্তু অতিক্রম করিতে না পারিলে আমার দুর্দশার তুলনায় তোমার গালি অত্যন্ত কম।” এই দুই মহামনীষী পরকালের চিন্তায় এমন বিভোর ছিলেন যে, অপরের গালিতেও তাঁহাদের ক্রোধ জাগে নাই।

হযরত আবূ বকর রদিয়াল্লাহু আন্হুকে এক ব্যক্তি গালি দিলে তিনি তাহাকে বলিলেন- “আমার অবস্থার যেটুকু তোমার অজ্ঞাত তাহা তুমি যাহা বলিতেছ তদপেক্ষা অধিক।” স্বীয় দোষ-ত্রুটি পর্যবেক্ষণে তিনি এত অধিক ব্যাপৃত ছিলেন যে, অপরের গালি শুনিয়াও তাঁহার ক্রোধ জন্মে নাই। 

হযরত মালিক ইব্‌নে দীনার (রঃ)-কে এক রমণী কপট ধার্মিক বলিয়া সম্বোধন করিল। তিনি সেই রমণীকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন- “হে পুণ্যবতী, তুমি ভিন্ন আর কেহই আমাকে চিনিতে পারে নাই।” 

হযরত শা'বী (রঃ)-কে এক ব্যক্তি নিন্দা করিতেছিল। তিনি ইহা শুনিয়া বলিলেন “তুমি সত্য বলিয়া থাকিলে আল্লাহ্ যেন আমাকে মাফ করেন; আর তুমি মিথ্যা বলিয়া থাকিলে আল্লাহ্ যেন তোমাকে মাফ করেন।” এই সকল দৃষ্টান্তে প্রমাণিত হয় যে, মানুষ কোন গুরুতর কাজ বা চিন্তায় মগ্ন থাকিলে ক্রোধ বশীভূত ও লুক্কায়িত থাকে।

আবার কেহ যদি বিশ্বাস করে, যে ব্যক্তি ক্রোধ করে না, আল্লাহ্ তাহাকে ভালবাসেন, তবে তাঁহার ভালবাসা লাভের লালসায় উত্তেজনা প্রবল কারণ দেখা দিলেও সেই ব্যক্তি ক্রুদ্ধ হয় না। যেমন মনে কর, কেহ কোন রমণীর প্রতি প্রেমাসক্ত; কিন্তু সেই রমণীর সন্তান তাহাকে গালি দেয়। এমতাবস্থায়, যদি সে জানে যে, উক্ত সন্তানের গালি সহ্য করিলে প্রেমাস্পদ তাহাকে ভালবাসিবে, তবে সেই রমণীর প্রতি আসক্তি তাহাকে এইরূপ তন্ময় করিয়া তোলে যে সে তাহার সন্তান প্রদত্ত দুঃখ-কষ্ট অম্লান বদনে সহ্য করে এবং উক্ত সন্তানের কোনরূপ দুর্ব্যবহার তাহার হৃদয়ে ক্রোধের সঞ্চার করে না।
ক্রোধ দমনের উপায় বর্ণিত হইল। তন্মধ্যে যে কোনটি অবলম্বনে ক্রোধকে মারিয়া ফেলা আবশ্যক। অসম্ভব হইলে ইহাকে এত দুর্বল করিয়া ফেলিবে যেন উহা অবাধ্য না হয় এবং ধর্ম-বুদ্ধির বিরুদ্ধাচরণ না করে।


পরবর্তী পর্ব
ক্রোধ বিনাশক ব্যবস্থা

ক্রোধ ও লোভ সৃষ্টির কারণ ও ক্ষতি



 ক্রোধ, বিদ্বেষ ও ঈর্ষা (পর্ব- ২)
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

ক্রোধ ও লোভ সৃষ্টির কারণ ও ক্ষতি
প্রয়োজনের সময় অস্ত্ররূপে ব্যবহৃত হওয়ার উদ্দেশ্যে আল্লাহ্ মানব হৃদয়ে ক্রোধ সৃজন করিয়াছেন, যেন কোন অনিষ্টের কারণ তাহার সম্মুখীন হইলে ক্রোধ তৎক্ষণাত ইহা বিদূরিত করিতে পারে। লোভ সৃজনেও এই একই উদ্দেশ্য রহিয়াছে। ইহাও অস্ত্রের ন্যায় মানুষের কাজে আসিবে এবং মঙ্গলজনক বস্তু তাহার দিকে আকর্ষণ করিবে, উহাই আল্লাহর উদ্দেশ্য। এই দুই প্রবৃত্তি মানবজীবনে অপরিহার্য। কিন্তু উহা সীমা অতিক্রম করিয়া বৃদ্ধি পাইলে তাহার সকল অনিষ্টের কারণ হইয়া উঠে।

অতি ক্রোধ বুদ্ধি-বিনাশক-

ক্রোধ সীমা অতিক্রম করিয়া বাড়িয়া গেলে মানব হৃদয়ে আগুনের মত জ্বলিয়া উঠে। ইহার ধোঁয়া মস্তিষ্ক পূর্ণ করিয়া দিলে বুদ্ধি ও নিপুণতার কার্যালয় অন্ধকারাবৃত্ত হইয়া যায়। বুদ্ধি তখন অকর্মণ্য হইয়া পড়ে। ফলে, মানুষের হিতাহিত জ্ঞান লোপ পায়। গুহা ধুমে পরিপূর্ণ হইয়া অন্ধকারাচ্ছন্ন হইলে যেমন কিছুই নয়ন- গোচর হয় না, তেমনি ক্রোধের সময় মস্তিষ্ক কুঠরীর অবস্থাও তদ্রূপ হইয়া থাকে। ক্রোধের এইরূপ আধিক্য নিতান্ত জঘণ্য। ক্রোধের সময় মানব হিতাহিত নির্ণয়ে অক্ষম হয় বলিয়াই বুযুর্গগণ ইহাকে 'গোলে আকল' অর্থাৎ বুদ্ধি-বিনাশক বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন।


অত্যল্প ক্রোধ ক্ষতিকর-

ক্রোধ সীমা ছাড়াইয়া অত্যন্ত কমিয়া গেলেও - ক্ষতিকর। কারণ, ক্রোধই মানুষকে অন্যায় ও গর্হিত কর্মের বিরুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করে এবং জগতে ধর্ম প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে কপটতা ও নাস্তিকতার বিরুদ্ধে মুসলমানের অন্তরে প্রেরণা যোগায়। আল্লাহ্ তা'আলা তিনি রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-উনাকে লক্ষ্য করিয়া বলেন :

>“কাফির ও মুনাফিকদের সহিত জিহাদ করুন এবং তাহাদের উপর কর্কশ ব্যবহার করুন।” [তখনকার পরিস্থিতিতে এই ব্যাবহার জরুরী ছিল]

সাহাবা রদিয়াল্লাহু আন্হুমের প্রশংসা করিয়া আল্লাহ্ বলেন : 

>“তাহারা কাফিরদের উপর বড় কঠিন।”  এই সমস্তই ক্রোধের অবশ্যম্ভাবী ফল।


ক্রোধের মধ্যম অবস্থা কাম্য-

উল্লিখিত বর্ণনা হইতে প্রমাণিত হয়, ক্রোধের আধিক্য ও অত্যল্পতা কাম্য নহে; বরং এতদুভয়ের মধ্যবর্তী ধর্মবুদ্ধির অধীন ইহার সাম্যভাবাপন্ন অবস্থাই কাম্য। কেহ কেহ মনে করেন, ক্রোধের মূলোৎপাটন রিয়াযতের উদ্দেশ্য। ইহা ভুল ধারণা। কারণ, ক্রোধ মানবের অপরিহার্য অস্ত্রস্বরূপ এবং তাহার জীবদ্দশায় লোভের ন্যায় ক্রোধের মূলোচ্ছেদও অসম্ভব। তবে কোন বিশেষ ধর্ম বা ভাবে মানব তন্ময় হইলে ক্রোধের আত্মগোপন সম্ভবপর এবং তখনই সে মনে করে ক্রোধের মূলোৎপাটন হইয়াছে।



পরবর্তী পর্ব

ক্রোধ উত্তেজিত হওয়ার কারণ

ক্রোধ- বিদ্বেষ ও ক্রোধ দমনের ফজিলত

 

ক্রোধ, বিদ্বেষ ও ঈর্ষা (পর্ব- ১)
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

ক্রোধ, বিদ্বেষ, ঈর্ষা এবং উহা হইতে পরিত্রাণের উপায়--

ক্রোধ সীমা ছাড়াইয়া প্রবল হইয়া উঠিলে জঘণ্য হইয়া থাকে। অগ্নি ক্রোধের মূল এবং অন্তরের উপর ইহার প্রভাব। 

শয়তানের সহিত ক্রোধের সম্বন্ধ রহিয়াছে, সে স্বয়ং বলিয়াছে-

>“তুমি আমাকে অগ্নি হইতে সৃজন করিয়াছ এবং তাহাকে (আদমকে) মৃত্তিকা হইতে সৃজন করিয়াছ।”

আগুন সর্বক্ষণ গতিশীল ও চঞ্চল; আর মাটি ধীর ও শান্ত। ক্রোধান্ধ ব্যক্তির সহিত হযরত আদম আলায়হিস্ সালামের সমস্ত সম্বন্ধ ছিন্ন হইয়া শয়তানের সঙ্গে তাহার সম্বন্ধ স্থাপিত হয়।


হযরত ইবনে ওমর রদিয়াল্লাহু আনহু রাসূলে মাকবুল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-উনাকে জিজ্ঞাসা করিলেন- “ইয়া রাসূলাল্লাহ্, আল্লাহর ক্রোধ হইতে আমাকে দূরে রাখিতে পারে, এরূপ কোন কাজ আছে?” তিনি বলিলেন- 

>“তাহা এই যে, তুমি ক্রুদ্ধ হইবে না।” 

তিনি আবার নিবেদন করিলেন- “ইয়া রসূলাল্লাহ্, আমাকে এরূপ একটি সংক্ষিপ্ত কাজের কথা বলিয়া দিন যাহাতে আমি উত্তম পরিণামের আশা করিতে পারি।

রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বলিলেন- 

>“স্বেচ্ছায় ক্রুদ্ধ হইও না”।

তিনি বারবার একই প্রশ্ন করিতেছিলেন এবং রসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) প্রত্যেক বারই ঐ উত্তর দিতেছিলেন। 

রসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন- 

>“সির্কা যেরূপ মধু ধ্বংস করে, ক্রোধ তদ্রূপ ঈমান ধ্বংস করে।” 


হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম হযরত ইয়াহ্ইয়া আলায়হিস্ সালামকে বলিলেন- “ক্রুদ্ধ হইও না।” তিনি বলিলেন- “ইহা সম্ভবপর নহে; কেননা, আমি মানুষ।” হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম বলিলেন-'ধন জমা করিও না।” তিনি বলিলে- "হাঁ, ইহা সম্ভবপর।”


ক্রোধ দমনের ফজিলত--

ক্রোধের মূলোচ্ছেদ মানবের পক্ষে সম্ভবপর নহে। কিন্তু ক্রোধ দমন করা নিতান্ত আবশ্যক। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন :

>“এবং ক্রোধ সংবরণকারী ও মানবের মার্জনাকারীকে (আল্লাহ্ ভালবাসেন)”।

যাহারা ক্রোধ দমন করিতে পারে এই আয়াতে আল্লাহ্ তাহাদের প্রশংসা করিয়াছেন।

রসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন- 

>“যে ব্যক্তি ক্রোধ দমন করে আল্লাহ্ তা’আলা তাহার উপর হইতে স্বীয় আযাব বিদূরিত করেন। যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি কর্তব্য পালনে স্বীয় ত্রুটি স্বীকার করে, তিনি তাহার ত্রুটি মাফ করেন এবং যে ব্যক্তি রসনা (জিহ্বা) সংযত রাখে আল্লাহ্ তাহার গোপনীয় দোষ লুক্কায়িত রাখেন।" 

তিনি আরো বলেন- 

>“যে ব্যক্তি ক্রোধ সংবরণ করিতে পারে কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তাহার অন্তর সন্তোষ দ্বারা ভরপুর করিয়া দিবেন।” তিনি আরও বলেন- 

>“দোযখের একটি দ্বার আছে; এই দ্বার দিয়া শরীয়ত বিরুদ্ধ ক্রোধ প্রকাশকারী ব্যতীত আর কেহই প্রবেশ করিবে না।" তিনি আরো বলেন- 

>“লোক চুমুকে যাহা পান করে, উহার মধ্যে ক্রোধ পান (সংরবণ) অপেক্ষা আর কোন বস্তু পানই আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় নহে। যে ব্যক্তি ক্রোধ দমন করে, আল্লাহ্ তাহার অন্তর ঈমান দ্বারা পরিপূর্ণ করিয়া দেন।”


হযরত ফুযায়ল ইব্‌নে আইয়ায (রঃ), হযরত সুফিয়ান সাওরী (রঃ) এবং আরও কতিপয় বুযুর্গ একবাক্যে বলেন- “ক্রোধের সময় সহিষ্ণুতা এবং লোভের সময় ধৈর্য অপেক্ষা উৎকৃষ্ট কাজ আর কিছুই নাই।” 

এক ব্যক্তি হযরত ওমর ইবনে আবদুল আযীয (রঃ)-কে কটু কথা বলিল। তিনি মস্তক অবনত করিয়া বলিলেন- “আমাকে তুমি ক্রুদ্ধ করত শয়তান কর্তৃক আমাকে স্বীয় মর্যাদা হইতে নামাইয়া লইতে চাহিতেছ? ক্ষমতা ও প্রভুত্বের গর্বে আজ আমি তোমার উপর ক্রুদ্ধ হইলে কল্য কিয়ামত দিবস তুমি আমা হইতে প্রতিশোধ গ্রহণ করিবে, ইহা কখনও হইতে পারে না।” এই বলিয়া তিনি নীরব রহিলেন। 


একজন নবী আলায়হিস্ সালাম লোকদিগকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন- “এমন কেহ আছে কি, যে আমার উপদেশসমূহ পালন করিবে ও প্রতিজ্ঞা করিবে যে, কখনও ক্রুদ্ধ হইবে না এবং আমার তিরোধানের পর আমার প্রতিনিধি হইয়া থাকিতে ও বেহেশতে আমার সমান মর্যাদা পাইতে আশা করে?” 

এক ব্যক্তি স্বীকার করিলেন এবং ঐরূপ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইলেন। তিনি এই ব্যক্তি দ্বারা আরও দুইবার প্রতিজ্ঞা করিয়া লইলেন। অনন্তর সেই ব্যক্তি দৃঢ়তার সহিত স্বীয় প্রতিজ্ঞা পালন করত উক্ত নবী আলায়হিস্ সালামের প্রতিনিধি হইলেন এবং জগতে ‘যুলকুল্‌' অর্থাৎ দায়িত্ব পালক নামে প্রসিদ্ধি লাভ করিলেন



পরবর্তী পর্ব

ক্রোধ ও লোভ সৃষ্টির কারণ ও ক্ষতি

শনিবার, ১৫ জুলাই, ২০২৩

যিনা ও কুদৃষ্টি থেকে আত্মরক্ষা করা

 উদর ও লজ্জাস্থানের খাহেশের প্রতিকার (পর্ব - ৯)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

যিনা ও কুদৃষ্টি থেকে আত্মরক্ষা করা 
জানা উচিত, লজ্জাস্থানের খাহেশ সর্বাধিক প্রবল এবং উত্তেজনার মুহূর্তে জ্ঞান-বুদ্ধির সর্বাধিক অবাধ্য। এর ফলাফল খুবই লজ্জাজনক। মানুষ যে এ খাহেশ থেকে বেঁচে থাকে, তার কারণ হয় অক্ষমতা, না হয় লোকনিন্দার ভয়, না হয় লজ্জা শরম, না হয় মান-ইযযত রক্ষা করা। এগুলোর মধ্যে কোনটিতেই সওয়াব নেই। কারণ, এতে মনের এক আনন্দকে অন্য আনন্দের উপর অগ্রাধিকার দেয়া হয় মাত্র। হাঁ, এসব বাধার মধ্যেও একটি ফায়দা আছে। তা হচ্ছে, মানুষ গোনাহ্ থেকে বেঁচে থাকে, তা যে কোন কারণেই বেঁচে থাকুক। কিন্তু উচ্চ মর্তব্য ও সওয়াব তখন অর্জিত হবে, যখন সকল প্রকার সামর্থ্য সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কেউ শুধু আল্লাহর ভয়ে যিনা থেকে বিরত থাকে, বিশেষতঃ যখন সত্যিকার খাহেশ বিদ্যমান। এটা সিদ্দীকগণের স্তর। তাই রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন : যে আশেক হয়ে সাধু থাকে এবং এশক গোপন রাখে, অতঃপর মারা যায়, সে শহীদ। তিনি আরও বলেন : সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তা'আলা কেয়ামতের দিন আরশের ছায়াতলে স্থান দেবেন। সেদিন অন্য কোন ছায়া থাকবে না। তাদের মধ্যে একজন সে ব্যক্তি, যাকে কোন সম্ভ্রান্ত রূপবতী নারী নিজের দিকে আহ্বান করে, সে জওয়াবে বলে : আমি বিশ্বপালক আল্লাহকে ভয় করি। সামর্থ্য এবং আগ্রহ সত্ত্বেও যুলায়খার সাথে হযরত ইউসুফ (আঃ)-এর কিস্সা প্রসিদ্ধ ও সুবিদিত। আল্লাহ তা'আলা পাক কালামে এ জন্যে তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এ ব্যাপারে হযরত ইউসুফ (আঃ) সকল সৎ ও সাধু পুরুষের ইমাম। 

সাহাবী হযরত সোলায়মান ইবনে ইয়াসার (রাঃ) অসাধারণ সুশ্রী যুবক ছিলেন। তাঁর গৃহে জনৈকা মহিলা আগমন করে তাঁর সাথে কুকর্ম করার ইচ্ছা প্রকাশ করলে তিনি অস্বীকার করেন এবং গৃহ থেকে পালিয়ে যান। তিনি রাত্রে স্বপ্নে হযরত ইউসুফ (আঃ)-কে দেখে আরজ করলেন : আপনি ইউসুফ? উত্তর হল : হাঁ, আমি সেই ইউসুফ, যে ইচ্ছা করেছিল, আর তুমি সেই সোলায়মান, যে ইচ্ছাও করেনি। এই সাহাবীরই আর একটি আশ্চর্যজনক কাহিনী বর্ণিত আছে। তা হচ্ছে, একবার একজন সঙ্গীসহ তিনি মদীনা থেকে হজ্জের উদ্দেশে রওয়ানা হলেন। আবওয়া নামক স্থানে পৌঁছার পর তাঁর সঙ্গী কিছু কেনাকাটা করার জন্যে বাজারে চলে গেল। তিনি তাঁবুতে একাকী বসে রইলেন। জনৈকা বেদুঈন মহিলার দৃষ্টি তাঁর অনন্য রূপ সৌন্দর্যের উপর পতিত হতেই সে মনে প্রাণে তাঁর প্রতি আসক্ত হয়ে গেল এবং পাহাড় থেকে নেমে একেবারে তাঁর সামনে এসে দণ্ডায়মান হল। মহিলা নিজেও রূপ-সৌন্দর্যে ছিল চন্দ্র-সূর্যবৎ অপরূপা। সে বোরকা উত্তোলন করে চন্দ্র-সূর্যের সংযোগ ঘটাতে বিলম্ব করল না। অতঃপর সে বলল : আমাকে কিছু দিন। সোলায়মান মনে করলেন, খাবার চাইছে, তাই রুটি দেয়ার জন্য হাত বাড়ালেন। সে বলল : আমি এটা চাই না। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যা হয়, আমি তাই কামনা করি। তিনি বললেন : তোমাকে শয়তান আমার কাছে পাঠিয়েছে। অতঃপর তিনি আপন মস্তক দুই হাঁটুর মাঝখানে রেখে সজোরে ক্রন্দন শুরু করে দিলেন। মহিলা তাঁর এই করুণ অবস্থা দেখে ব্যর্থতার গ্লানি বহন করে আপন গৃহে চলে গেল। সঙ্গী বাজার থেকে ফিরে এসে দেখল, কাঁদতে কাঁদতে সোলায়মানের চক্ষুদ্বয় ফুলে গেছে এবং কণ্ঠস্বর ভেঙ্গে গেছে। সে জিজ্ঞেস করল, আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি ব্যাপারটি এড়িয়ে যেতে চাইলেন। বললেন : কিছুই নয়। আমার কন্যার কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। সঙ্গী বলল : না, ব্যাপার অন্যকিছু। তিন মনযিল পথ অতিক্রম করার সময় তো আপনার কন্যার কথা একবারও মনে পড়ল না। আজ হঠাৎ মনে পড়বে কেন? মোট কথা, অনেক পীড়াপীড়ি করে জিজ্ঞেস করার পর সোলায়মান বেদুঈন মহিলার ঘটনা বলে দিলেন। সঙ্গী বাজার সওদার থলে রেখে অঝোরে কান্না শুরু করে দিল । তিনি কারণ জিজ্ঞেস করলে সে বলল : আমার কান্নার কারণ হচ্ছে, যদি আপনার স্থলে আমি থাকতাম তবে সবর করতে পারতাম না, গোনাহে লিপ্ত হয়ে যেতাম। কিছুক্ষণ পর্যন্ত উভয়েই কাঁদলেন । অতঃপর তাঁরা মক্কায় পৌঁছলেন। তওয়াফ ও সায়ীর পর যখন তাঁরা হাজারে আসওয়াদের কাছে এলেন, তখন সোলায়মান ইবনে ইয়াসার উপবিষ্ট অবস্থায় তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লেন। তিনি স্বপ্নে জনৈক দীর্ঘদেহী, সুশ্রী, জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পরিহিত, আতরমাখা ব্যক্তিকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন : আপনি কে? তিনি বললেন : আমি ইউসুফ। সোলায়মান আরজ করলেন : যুলায়খার সাথে আপনার আচরণ খুবই বিস্ময়কর। ইউসুফ (আঃ) বললেন : আবওয়ার মহিলার সাথে তোমার আচরণ আরও বেশী আশ্চর্যজনক।


হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) বর্ণনা করেন, আমি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর পবিত্র মুখ থেকে শুনেছি, প্রাচীনকালে তিন ব্যক্তি সফরে বের হয়েছিল। তারা রাতের বেলায় একটি গুহায় অবস্থান গ্রহণ করে।ঘটনাক্রমে একটি বিরাট প্রস্তরখণ্ড পাহাড়ের উপর থেকে পড়ে গুহার মুখ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিল। তারা একে অপরকে বলল : আপন আপন সৎকর্ম স্মরণ করে আল্লাহ্ তা'আলার কাছে দোয়া কর। সৎকর্মের বরকতে এই পাথর সরে যেতে পারে। সেমতে তাদের একজন হাত তুলে বলল : ইলাহী, তুমি জান, আমার পিতামাতা বৃদ্ধ ছিলেন। আমি সন্ধ্যায় প্রথমে তাদেরকে আহার করিয়ে দিতাম, এরপর সন্তান-সন্ততি ও গৃহপালিত গবাদিপশুকে আহার দিতাম। একদিন গবাদিপশুর খাদ্য যোগাড় করতে বিলম্ব হওয়ায় আমি দেরীতে বাড়ী পৌঁছলাম। অতঃপর গাভীর দুধ দোহন করে তা পিতামাতার কাছে নিয়ে দেখি, তাঁরা ঘুমিয়ে পড়েছেন। ডেকে জাগানো আমি ভাল মনে করলাম না। তাই দুধের পেয়ালা হাতে নিয়ে আমি পর্যন্ত তাঁদের শিয়রে দাঁড়িয়ে রইলাম। সন্তানরা আমার পায়ে লুটিয়ে পড়েছে; কিন্তু আমি পিতামাতার পূর্বে তাদেরকে খাবার দেয়া ভাল মনে করিনি। সকালে যখন তারা পান করলেন, তখন অন্যদেরকে দিলাম। ইলাহী, যদি তুমি জান, এ কাজ আমি কেবল তোমার সন্তুষ্টির জন্যে করেছি, তবে এ বিপদ থেকে মুক্তি দাও। এ দোয়ার বরকতে পাথরটি এই পরিমাণ সরে গেল যে, আকাশ দৃষ্টিগোচর হল। 


দ্বিতীয় জন দোয়ায় বলল : ইলাহী, তুমি জান, আমি আমার পিতৃব্য-কন্যার প্রতি আশেক ছিলাম। আমি তার কাছে মিলনের বাসনা প্রকাশ করলে সে অস্বীকৃতি জানাল। এরপর দুর্ভিক্ষের সময় নিদারুণ কষ্টে পড়ে সে আমার কাছে আগমন করল। সে অস্বীকার করবে না। আমি তাকে এই শর্তে একশ' বিশটি স্বর্ণমুদ্রা দিলাম। সে আমার কথা মেনে নিল; কিন্তু আমি যখন তার সাথে অপকর্মে লিপ্ত হতে চাইলাম, তখন বলল : আল্লাহকে ভয় কর। আমার বেইজ্জতী করো না। এতে আমি ভীত হয়ে পড়লাম এবং তাকে ছেড়ে দিলাম। তাকে যা দিয়েছিলাম, তাও ফেরত নিলাম না । ভালবাসাও যথারীতি কায়েম রাখলাম। ইলাহী, যদি আমি কেবল তোমার ভয়ে এ কাজ করে থাকি, তবে এর বরকতে এ বিপদ দূর করে দাও। এরপর পাথরটি আরও সামান্য সরে গেল। কিন্তু বের হওয়ার পথ হল না।

তৃতীয় জন বলল : ইলাহী, আমি একবার কয়েকজন মজুরকে কাজে নিয়োগ করেছিলাম এবং সকলের মজুরিই শোধ করে দিয়েছিলাম, কিন্তু জনৈক মজুর তার মজুরি রেখেই চলে গেল। তার অনুপস্থিতিতে আমি তার অর্থ কারবারে নিয়োগ করায় তা বেড়ে অনেক হয়ে গেল। অনেক দিন পর যখন সে মজুরি চাইতে এল, তখন আমি অনেকগুলো উট, গরু ও ছাগল দেখিয়ে বললাম : এগুলো সব তোমার। সে বলল : আপনি আমার সাথে ঠাট্টা মস্করা করছেন? আমি বললাম : ঠাট্টা নয়। এগুলো তোমার মজুরির অর্থ দিয়ে ব্যবসা করে অর্জিত হয়েছে। এগুলো নিয়ে যাও। সে জন্তুগুলো হাঁকিয়ে নিয়ে গেল এবং কিছুই রেখে গেল না। ইলাহী, যদি আমি এ কাজ তোমার সন্তুষ্টির জন্যে করে থাকি, তবে আমাদেরকে এ বিপদ থেকে উদ্ধার কর। তার এই দোয়ার পর পাথরটি সম্পূর্ণ সরে গেল এবং তারাও গন্তব্য পথে রওয়ানা হয়ে গেল। যে নিজেকে যিনা থেকে বাঁচিয়ে রাখে তার হচ্ছে এই ফযীলত। তারই নিকটবর্তী সে ব্যক্তি, যে চোখের যিনা থেকে নিরাপদ থাকে। কেননা, যিনার সূচনা চোখ দ্বারাই হয়। তাই চোখ সংযত রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ ও দুরূহ কাজ। কিন্তু একে হালকা মনে করা হয়, তেমন ভয় করা হয় না। অথচ সব বিপদের উৎসমূল হচ্ছে চোখ। যদি ইচ্ছা ব্যতিরেকে একবার দেখা হয়, তবে তার জন্যে শাস্তি নেই; কিন্তু পুনর্বার দেখার মধ্যে শাস্তি আছে। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন :-“প্রথম বার দেখা তোমার জন্যে জায়েয এবং দ্বিতীয় বার দেখা বিপদ”! এখানে চোখের দেখাই উদ্দেশ্য। 

আলা ইবনে যিয়াদ বলেন : নারীর চাদরের উপরও দৃষ্টি নিক্ষেপ করো না। কেননা, দৃষ্টি অন্তরে খাহেশের বীজ বপন করে। মানুষ যখন কোন নারীর উপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, তখন দ্বিতীয় বার না তাকানোটা খুবই বিরল। রূপের ধারণা দৃষ্টিতে থাকলে দ্বিতীয় বার দেখতে মন চাইবে। তখন নিজের মনে সাব্যস্ত করে নেবে যে, পুনর্বার দেখা নিছক বোকামি। কেননা, দ্বিতীয় বার দেখলে যদি মুখমণ্ডল ভাল মনে হয়, তবে নফসে খাহেশ হবে, অথচ সে পাওয়ার নয়। অতএব পরিতাপ ছাড়া আর কি হাতে আসবে। আর যদি মুখমন্ডল বিশ্রী মনে হয় তবে যে উদ্দেশে দেখা; অর্থাৎ আনন্দ লাভ, তা অর্জিত হবে না। কেবল মজাবিহীন গোনাহে লিপ্ত হবে। পক্ষান্তরে যদি না তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে নেয়া হয় তবে মনের উপর থেকে অনেক বিপদ টলে যায়। চোখের ত্রুটির পর যদি কেউ সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও নিজেকে যিনা থেকে বাঁচিয়ে নেয়, তবে এটা বড় শক্তিমত্তা ও অসাধারণ তওফীকের কাজ হবে। আবু বকর ইবনে আবদুল্লাহ মুযানী রেওয়ায়াত করেন, জনৈক কসাই তার প্রতিবেশীর বাঁদীর প্রতি আশেক হয়ে যায়। বাঁদীর মালিক তাকে কার্যোপলক্ষে অন্য গ্রামে প্রেরণ করলে কসাই তার পিছু নেয় এবং আপন কুমতলব প্রকাশ করে। বাঁদী বলল : যতটুকু তুমি আমাকে চাও আমি তার চেয়ে বেশী তোমাকে চাই। কিন্তু অপকর্ম থেকে আমাকে মাফ কর। কারণ, আমি আল্লাহকে ভয় করি। কসাই বলল : তুমি আল্লাহকে ভয় করলে আমি করব না কেন? অতঃপর সে তওবাকারী হয়ে বাড়ীর পথে রওয়ানা হল। পথিমধ্যে সে দারুণ পিপাসায় মরণোন্মুখ হয়ে পড়ল। এমন সময় বনী ইসরাঈলের একজন পয়গম্বরের দূতের সাথে তার সাক্ষাৎ হল। দূত অবস্থা জিজ্ঞেস করলে সে পিপাসার কথা জানাল। দূত বলল : আমি তুমি মিলে দোয়া করি, যাতে গ্রামে পৌঁছা পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা মেঘমালা দ্বারা আমাদেরকে ছায়া দান করেন। কসাই বলল : দোয়া করার মত কোন নেক কাজ আমি করিনি। তুমিই দোয়া কর। দূত বলল : আচ্ছা, আমিই দোয়া করি। তুমি কেবল 'আমীন' বলবে। অতঃপর দূত দোয়া আরম্ভ করল এবং কসাই আমীন বলে গেল। অবশেষে এক খণ্ড মেঘ তাদের মাথার উপর চলতে লাগল এবং তার গ্রামে পৌঁছে গেল। কসাই যখন আলাদা হয়ে তার গৃহের দিকে চলতে লাগল, তখন মেঘখণ্ডটিও তার সাথে যেতে লাগল। দূত বলল : তুমি তো বলছিলে, তোমার কোন নেক আমল নেই। তাই আমি দোয়া করেছিলাম। এখন মেঘখণ্ড তোমার সাথে চলল কিরূপে? তোমার অবস্থা আমাকে খুলে বল। কসাই তওবার ঘটনা বর্ণনা করলে দূত বলল : আল্লাহর কাছে তওবাকারীর এমন মর্তবা, যা অন্য কারও নেই ।


আহমদ ইবনে সায়ীদ তাঁর পিতার বাচনিক বর্ণনা করেন- কুফায় আমাদের কাছে একজন সুগঠন, সুশ্রী ও সৎস্বভাবের আবেদ বসবাস করত। তিনি বেশীর ভাগ সময় মসজিদেই অতিবাহিত করতেন। জনৈকা রূপসী বুদ্ধিমতী মহিলা তাঁকে দেখে প্রেমাসক্ত হয়ে পড়ল এবং দীর্ঘ দিন পর্যন্ত প্রেম অন্তরে গোপন রাখল। একদিন আবেদ যখন মসজিদে গমন করছিলেন, তখন মহিলা তাঁর পথ আগলে দাঁড়িয়ে বলতে লাগল : আপনাকে আমি কিছু বলতে চাই, প্রথমে তা শুনে নিন, এরপর মনে যা চায় করুন। কিন্তু আবেদ কিছুই না বলে সোজা চলে গেলেন। ঘরে ফেরার পথে মহিলা আবার তাঁর পথ আগলে দাঁড়াল এবং বলল : আমার কথা শুনে যান। আবেদ মথা নত করল এবং অনেকক্ষণ পর বলল : এটা অপবাদের জায়গা। কেউ আমাকে অপবাদ দিক, আমি তা ভাল মনে করি না। মহিলা বলল : আমি আপনার অবস্থা না জেনে এখানে দাঁড়াইনি । খোদা না করুন, কেউ আমার পক্ষ থেকে খারাপ কিছু জানুক। কিন্তু এহেন কাজে আমার নিজেরই আসতে হল। আমি জানি, মানুষ তিলকে তাল বানায়। আপনারা আবেদ সম্প্রদায় আয়নার মত। সামান্য বিষয়েই আপনাদের গায়ে দোষ লেগে যায়। আমার একশ' কথার এক কথা হল, আমি আপনার প্রতি প্রেমাসক্ত। এখন আমার আপনার ব্যাপারটি আল্লাহ তা'আলাই নিষ্পত্তি করুন। যুবক আবেদ এ কথা শুনে গৃহে চলে গেলে। তিনি দিশেহারা অবস্থায় নামায পড়তে চাইলেন; কিন্তু পারলেন না। অবশেষে এক চিরকুট লেখে গৃহ থেকে বের হয়ে পড়লেন। দেখলেন, মহিলা পথিমধ্যে পূর্বের জায়গায়ই দণ্ডায়মান আছেন। তিনি চিরকুটটি মহিলার দিকে নিক্ষেপ করে আপন গৃহে ফিরে এলেন- চিরকুটের বিষয়বস্তু ছিল এই :


“বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।

হে নারী! জেনে রাখ, যখন বান্দা আল্লাহর নাফরমানী করে, তখন আল্লাহ সহ্য করেন। যখন পুনর্বার করে তখনও দোষ গোপন রাখেন। কিন্তু যখন গোনাহে গা ভাসিয়ে দেয় তখন এমন গযব নাযিল করেন, যা পৃথিবী, আকাশ, পাহাড় ও বৃক্ষলতা কোন কিছুই সহ্য করতে পারে না। সুতরাং এমন গযব সহ্য করার ক্ষমতা কার? তুমি যে কথা বলেছিলে, তা যদি মিথ্যা হয়, তবে সেদিনকে স্মরণ কর যখন আকাশমণ্ডলী গলিত তামার আকার ধারণ করবে, পাহাড়-পর্বত ধুনা তুলার মত হবে এবং সর্বশক্তিমান আল্লাহর ক্রোধ ও প্রতাপ এমন প্রচণ্ড হবে যে, সকল মানুষ হাঁটু গেড়ে পড়ে থাকবে। আমার অবস্থা হচ্ছে, আমি নিজেকে সংশোধন করতে অক্ষম। পক্ষান্তরে যদি আমার উক্তি সত্য হয়, তবে এমন চিকিৎসকের সন্ধান দিচ্ছি, যিনি সকল ব্যথা নিরাময় এবং মারাত্মক ব্যাধির চিকিৎসা করবেন। তিনি হচ্ছেন আল্লাহ জাল্লা শানুহু । খাঁটি মনে তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তন করা উচিত। তোমার পক্ষ থেকে আমার জন্যে এ আয়াতটিই যথেষ্ট :

“তাদেরকে সতর্ক করে দিন আসন্ন দিন সম্পর্কে, যখন কষ্টের কারণে তাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত হবে। জালেমদের জন্যে কোন অন্তরঙ্গ বন্ধু নেই এবং সুপারিশ গ্রাহ্য হয় এমন কোন সুপারিশকারীও নেই। চোখের অপব্যবহার এবং অন্তরের গোপন বিষয় আল্লাহ জানেন”।

এ আয়াত থেকে পলায়নের উপায় নেই। ইতি -


কয়েকদিন পরে এই মহিলা আবার এসে পথিমধ্যে দণ্ডায়মান হল। আবেদ তাকে দূর থেকে দেখেই গৃহপানে ফিরে যাবার ইচ্ছা করলেন। 

মহিলা বলল : চলে যান কেন? আজই শেষ সাক্ষাৎ। এরপর আল্লাহ তা'আলার কাছেই দেখা হবে। এরপর সে খুব কান্নাকাটি করল এবং বলল : যে আল্লাহর হাতে আপনার প্রাণ, আমি তাঁর কাছে দোয়া করি, তিনি যেন আপনার সমস্যাটি আমার জন্যে সহজ করে দেন। কিন্তু আমাকে কোন উপদেশ দিন। আবেদ বললেন : নিজেকে নফসের কবল থেকে বাঁচিয়ে রাখ এবং এ আয়াতটি মনে রেখ :

“তিনিই তোমাদেরকে রাতের বেলায় ওফাত দেন এবং দিনে যা কর, তা জানেন”।


মহিলা আঁচলে মুখ লুকিয়ে প্রথম বারের চেয়েও অধিক কান্না শুরু করল। এরপর আপন গৃহে চলে গেল। কয়েকদিন আল্লাহর এবাদতে মশগুল থাকার পর সে দুঃখেই ইন্তেকাল করল। আবেদ তাকে স্মরণ করে কাঁদত। লোকেরা জিজ্ঞেস করত : আপনিই তো তাকে নিরাশ করেছেন। এখন কাঁদেন কেন? আবেদ বলতেন, সূচনাতেই তাকে প্রত্যাখ্যান করে আল্লাহর কাছে নিজের জন্যে ভাণ্ডার করেছি। এখন তা বিনষ্ট হয় কি না, তাই ভেবে কাঁদি।


প্রথম পর্ব

 উদর ও লজ্জাস্থানের খাহেশের প্রতিকার


মুরীদের বিবাহ করা না করা


 উদর ও লজ্জাস্থানের খাহেশের প্রতিকার (পর্ব- ৮)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

মুরীদের বিবাহ করা না করা

প্রথম অবস্থায় মুরীদের বিবাহের ঝামেলায় পড়া উচিত নয়। কারণ, এটা আখেরাতের পথে বাধা সৃষ্টি করবে। মুরীদ স্ত্রীর মহব্বতে আটকা পড়ে যাবে। এ বিষয় থেকে ধোকা খাওয়া উচিত নয় যে, রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) অনেক বিবাহ করেছিলেন। কেননা, স্ত্রীর মহব্বত দূরের কথা, দুনিয়ার সকল বস্তু মিলেও তাঁর অন্তরকে আল্লাহ তাআলার দিক থেকে ফেরাতে পারত না। আল্লাহর মহব্বতে তাঁর মগ্নতা এতদূর ছিল যে, মাঝে মাঝে যখন মহব্বতের উত্তাপ অন্তরে উথলে উঠত, তখন অন্তর বিস্ফারিত হওয়ার আশংকা দেখা দিত। তিনি তখন হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর ঊরুতে করাঘাত করে বলতেন, কিছু কথাবার্তা বল। তাঁর কথাবার্তার ফলে উত্তাপ কিছুটা প্রশমিত হত। সুতরাং অন্য কোন ব্যক্তি নিজেকে রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে তুলনা করতে পারে না। করলে সে ধোকা খাবে।


মোট কথা, প্রাথমিক পর্যায়ে অবিবাহিত থাকাই মুরীদের জন্যে উপযুক্ত। 

আবু সোলায়মান বলেন : যে বিবাহ করে, সে দুনিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ে। আমি এমন কোন মুরীদ দেখিনি যে বিবাহ করে পূর্বাবস্থায় বহাল রয়েছে। যে কোন বস্তু আল্লাহ্ থেকে বিরত রাখে- স্ত্রী হোক, অর্থ হোক অথবা সন্তান-সন্ততি হোক, তাকেই অলক্ষুণে মনে করা উচিত। তবে মুরীদের অবিবাহিত থাকা তখন পর্যন্তই শোভনীয়, যে পর্যন্ত খাহেশ জোরালো না হয়। খাহেশ প্রবল হতে দেখলে প্রথমে ক্ষুধা ও সার্বক্ষণিক রোযা দ্বারা তা দমন করবে। এতেও দমিত না হলে খাহেশকে শান্ত করার জন্যে বিবাহ করবে। নতুবা দৃষ্টি ফিরিয়ে রাখা সম্ভব হবে না এবং উদ্দেশ্য বিঘ্নিত হবে। দৃষ্টির গোনাহ সগীরা গোনাহসমূহের মধ্যে অনেক বড়। এ থেকে কবীরা গোনাহ্ও হয়ে থাকে। যে তার দৃষ্টি আয়ত্তে রাখতে পারে না, সে তার দ্বীনদারীরও হেফাযত করতে পারে না। 

হযরত ঈসা (আঃ) বলেন : তাকানো থেকে বেঁচে থাক। এর কারণে অন্তরে খাহেশের বীজ পড়ে এবং এতটুকু অনর্থই যথেষ্ট। হযরত সায়ীদ ইবনে জোবায়র বলেন : কেবল দৃষ্টির কারণে হযরত দাউদ (আঃ) অনর্থে লিপ্ত হন। এ কারণেই হযরত সোলায়মান (আঃ) এরশাদ করেন : সিংহ ও সর্পের পেছনে যেয়ো; কিন্তু নারীর পেছনে যেয়ো না। 

হযরত ইয়াহইয়া (আঃ)-কে কেউ জিজ্ঞেস করল : যিনার সূচনা কিভাবে হয়? তিনি বললেন : দেখা ও বাসনা করার মাধ্যমে। 

হযরত ফোযায়ল এরশাদ করেন, ইবলীস বলে : দৃষ্টি আমার প্রাচীন তীর ধনুক, যা কখনও ভুল করে না। দৃষ্টি সম্পর্কে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর উক্তিসমূহ নিম্নরূপ-

>“দৃষ্টি ইবলীসের তীরসমূহের মধ্যে একটি বিষাক্ত তীর। যে আল্লাহ তা'আলার ভয়ে এটি পরিত্যাগ করে, আল্লাহ্ তা'আলা তাকে এমন ঈমান দেবেন, যার মিষ্টতা সে অন্তরে অনুভব করবে”।


>“আমি আমার পরে পুরুষদের জন্যে নারীদের চেয়ে অধিক ক্ষতিকর কোন ফেতনা ছেড়ে যাইনি”।

>”তোমরা দুনিয়ার ফেতনা ও নারীদের ফেতনা থেকে বেঁচে থাক। বনী ইসরাঈলের প্রথম ফেতনা নারীদের পক্ষ থেকেই ছিল”। 

>”প্রত্যেক মানুষের জন্যে যিনার কিছু অংশ আছে। কেননা, চক্ষুদ্বয় যিনা করে। তাদের যিনা হচ্ছে দৃষ্টিপাত করা। হস্তদ্বয় যিনা করে। তাদের যিনা হচ্ছে স্পর্শ করা। পদদ্বয় যিনা করে, তাদের যিনা হচ্ছে হাঁটা। মুখ যিনা করে, তার যিনা হচ্ছে বলা। অন্তর ইচ্ছা ও বাসনা করে। লজ্জাস্থান তাকে সত্যে পরিণত অথবা মিথ্যা প্রতিপন্ন করে।” 

আল্লাহ্ তা'আলা বলেন :

“মুমিনদেরকে বলে দিন, তারা যেন দৃষ্টি নত রাখে এবং লজ্জাস্থান হেফাযত করে”।


হযরত উম্মে সালামা (রাঃ) বলেন : একবার অন্ধ ইবনে মকতুম (রঃ) রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে আসতে চাইলেন। তখন আমি ও মায়মুনা রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে বসা ছিলাম। তিনি আমাদেরকে পর্দা করতে বললেন। আমরা বললাম, সে তো অন্ধ। পর্দা করার প্রয়োজন কি? তিনি বললেন : তোমরা তো তাকে দেখ।


এ থেকে জানা গেল, নারীদের অন্ধের কাছে বসা এবং বিনা প্রয়োজনে তার সাথে কথা বলা জায়েয নয়। আজকাল এটা প্রচলিত আছে। হাঁ, প্রয়োজনের সময় নারী পুরুষের সাথে কথা বলতে অথবা দেখতে পারে।


যদি মুরীদের অবস্থা এমন হয় যে, সে নারীদের থেকে তো দৃষ্টি ফিরিয়ে রাখতে পারে; কিন্তু বালকদের থেকে দৃষ্টি ফেরাতে পারে না; তবুও বিবাহ করা উত্তম। কেননা, বালকদের সৌন্দর্যপ্রীতির মধ্যে অনিষ্ট বেশী। কোন নারীর প্রতি মন আকৃষ্ট হয়ে গেলে তাকে বিবাহ করে মনের আশা পূরণ করা সম্ভব। কিন্তু বালকদের দ্বারা এটা সম্ভবপর নয়। এ কারণেই বালককে কুদৃষ্টিতে দেখা হারাম। এক্ষেত্রে মানুষ খুব শৈথিল্য প্রদর্শন করে এবং পরিণামে ধ্বংসের মুখে পড়ে। জনৈক তাবেয়ী বলেন : যুবক সাধকের সাথে শ্মশ্রুবিহীন বালকের উঠাবসা আমি হিংস্র জন্তুর চেয়েও অধিক ভয় করি। হযরত সুফিয়ান সওরী বলেন : যদি কোন ব্যক্তি খাহেশবশতঃ কোন বালকের পায়ের অঙ্গুলিতেও সুড়সুড়ি দেয়, তবুও সে সমকামী হবে। 

জনৈক বুযুর্গ বলেন : এই উম্মতে তিন প্রকার সমকামী হবে। কেউ তো কেবল দেখবে, কেউ করমর্দন করবে এবং কেউ কুকর্মই করবে। এ থেকে বুঝা গেল, দৃষ্টির কারণে বড় বড় বিপদের উদ্ভব ঘটে। সুতরাং যখন আপন দৃষ্টি ফেরাতে এবং চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবে না, তখন বিবাহ করাই তার জন্যে শ্রেয়ঃ। অধিকাংশ মানুষের যৌন উত্তেজনা ক্ষুধার কারণে হ্রাস পায় না। সেমতে জনৈক বুযুর্গ বর্ণনা করেন, সাধনার প্রথম পর্যায়ে একবার আমার উপর খাহেশ প্রবল হয়ে গেলে আমি আল্লাহর দরবারে খুব কান্নাকাটি করলাম। স্বপ্নে এক ব্যক্তিকে দেখলাম, তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করছেন, তোমার কি অবস্থা? আমি ঘটনা বর্ণনা করলে তিনি বললেন : এগিয়ে এস। আমি এগিয়ে গেলাম । তিনি আপন হাত আমার বুকের উপর রাখলেন। আমি এর শীতলতা অন্তরে ও দেহে অনুভব করলাম। সকালে ঘুম থেকে জেগে নিজের মধ্যে সেই যৌন উত্তেজনা পেলাম না। এক বছর কাল এ অবস্থা বহাল রইল। এরপর আবার প্রাবল্য দেখা দিল । আমি আবার হাহুতাশ করলে স্বপ্নে এক ব্যক্তিকে দেখলাম। সে বলল : যদি তুমি তোমার ঘাড় কাটাতে সম্মত হও, তবে আমি তোমার চিকিৎসা করি। আমি বললাম : উত্তম। সে বলল : ঘাড় নত কর। আমি ঘাড় নত করলে সে একটি নূরের তরবারি দিয়ে আমার ঘাড়ে আঘাত করল। আমার নিদ্রা ভঙ্গ হল। এক বছর কাল আবার সুস্থ থাকার পর পুনরায় সেই রোগ দ্বিগুণ বেগে দেখা দিল। এ অবস্থায় এক ব্যক্তিকে স্বপ্নে দেখলাম, সে আমার বক্ষ ও পাঁজরের মাঝখানে বসে আমাকে বলছে : যে বিষয়টি দূর করা আল্লাহর অভিপ্রেত নয়, তা দূর করার জন্য আর কতদিন কাকুতি মিনতি করবে? এরপর আমি জাগ্রত হয়ে বিবাহ করলাম এবং সন্তানাদি হল। এখন সেই খাহেশের জোর আর নেই।


সুতরাং মুরীদের বিবাহ করার প্রয়োজন দেখা দিলে বিবাহের শুরুতে নিয়ত ভাল রাখবে এবং পরিণামে জরুরী হক আদায় করবে। নিয়ত ভাল রাখার আলামত হচ্ছে, কোন সম্বলহীন ধর্মপরায়ণা মহিলাকে বিবাহ করবে, বিত্তশালিনী তালাশ করবে না। জনৈক বুযুর্গ বলেন : বিত্তশালিনী মহিলাকে বিবাহ করার অনিষ্ট পাঁচটি, (১) মোহরানা বেশী হওয়া, (২) স্বামী গৃহে গমনে ইতস্ততঃ করা, (৩) সেবা না করা, (৪) অধিক ব্যয়ভার বহন করা এবং (৫) ত্যাগ করতে মনে চাইলে বিত্তের লোভে তা না পারা। পক্ষান্তরে সম্বলহীনাকে বিবাহ করার মধ্যে এরূপ কোন অনিষ্ট নেই। 

জনৈক বুযুর্গ বলেন : চারটি বিষয়ে নারীর পুরুষের চেয়ে কম হওয়া চাই। নতুবা সে পুরুষকে হেয় মনে করবে। চারটি বিষয় এই : বয়সে, দৈহিক গড়নে, অর্থকড়িতে এবং বংশ মর্যাদায়। পক্ষান্তরে চারটি বিষয়ে নারীর পুরুষের চেয়ে বেশী হওয়া দরকার- সৌন্দর্যে, শিষ্টাচারে সংযমে এবং চরিত্রে। 

পরিণামে জরুরী হক আদায়ের আলামত হচ্ছে সদা সদাচার প্রদর্শন করা। 

জনৈক মুরীদ বিবাহ করে সদা সর্বদা স্ত্রীর সেবাযত্ন করতে থাকে। অবশেষে স্ত্রী লজ্জিত হয়ে তার পিতা-মাতাকে বলল : আমি আমার স্বামীর সদাচারে বিস্মিত হয়েছি। এত বছর ধরে তার গৃহে যখনই পায়খানা করতে যাই তখনই সে বদনা আমার পূর্বে সেখানে রেখে দেয়। অন্য একজন বুযুর্গ জনৈকা রূপসী মহিলাকে বিবাহ করেন। স্বামী গৃহে যাওয়ার সময় নিকটবর্তী হলে স্ত্রী বসন্ত রোগে আক্রান্ত হল। তার পরিবারের লোকজন মহাচিন্তায় পড়ল, এখন স্বামী তাকে পছন্দ করবে না। বুযুর্গ ব্যক্তি সংবাদ পেয়ে প্রথমে চক্ষু রোগের বাহানা করলেন, এরপর অন্ধ সেজে গেলেন। স্ত্রী স্বামী গৃহে এসে বিশ বছর সদ্ভাবে সংসার করার পর মারা গেল। এরপর বুযুর্গ ব্যক্তি চক্ষু খুললেন। লোকেরা এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন : আমি ইচ্ছা করেই অন্ধ সেজেছিলাম যাতে শ্বশুরালয়ের লোকেরা দুঃখ না করেন। এতে সকলেই পরম বিস্ময় প্রকাশ করে বলল : এমন সদাচারী লোক দুনিয়াতে দ্বিতীয়জন আর নেই। 


জনৈক সুফী এক বদমেযাজ মহিলাকে বিবাহ করে সর্বদাই তার কটূক্তি সহ্য করতে থাকেন। লোকেরা বলল : আপনি এই মহিলাকে তালাক দেন না কেন? তিনি বললেন : আশংকা হয়, অন্য কোন ব্যক্তি তার হাতে নিপীড়িত হবে। অতএব মুরীদ বিবাহ করলে এরূপই হওয়া উচিত। আর যদি বিবাহ ছাড়া থাকতে পারে এবং বিবাহের কারণে আখেরাতের পথে বিঘ্ন সৃষ্টি হবে মনে করে, তবে বিবাহ না করাই উত্তম।


বর্ণিত আছে, মুহাম্মদ ইবনে সোলায়মান হাশেমীর দৈনিক আমদানী ছিল আশি হাজার দেরহাম। তিনি বসরার আলেমগণের কাছে এ মর্মে পত্র লেখলেন : আমি কোন মহিলাকে বিবাহ করতে চাই । আপনারা পছন্দ করে দিন। সকলেই একমত হয়ে তাঁকে জওয়াব দিলেন, রাবেয়া বসরীয়াকে বিবাহ করাই আপনার জন্যে উপযুক্ত। সেমতে তিনি রাবেয়া বসরীয়াকে এভাবে পত্র লেখলেন :

বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। হামদ ও সালাতের পর আবেদন হল, আল্লাহ তাআলা আমাকে আজ দৈনিক আশি হাজার দেরহাম আমদানী দিয়েছেন। আশা করা যায়, কিছু দিন পরেই আমদানী বৃদ্ধি পেয়ে দৈনিক এক লাখ দেরহাম হয়ে যাবে। যদি তুমি আমাকে মঞ্জুর কর, তবে এই ধন-সম্পদ সমস্তই তোমার হবে। —ইতি


হযরত রাবেয়া বসরীয়া এই পত্রের জওয়াবে লেখলেন : বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম, হামদ ও না'তের পর জানাচ্ছি, সংসার নির্লিপ্ততার মধ্যেই অন্তরের শান্তি ও দেহের সুখ নিহিত এবং দুনিয়ার প্রতি আগ্রহ দুঃখ ও অশান্তির কারণ। পত্র পাওয়ার সাথে সাথে আপনার উচিত পরকালের পাথেয় সংগ্রহ করা এবং পরকালের চিন্তায় মগ্ন হওয়া। আপনি নিজেই নিজের ওছি হয়ে যান, যাতে ত্যাজ্য সম্পত্তি বণ্টনের জন্যে অন্যকে ওছি নিযুক্ত করার প্রয়োজন না থাকে। সারা জীবন রোযা রাখুন এবং মৃত্যুর সময় ইফতার করুন। আমার অবস্থা হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা যদি আমাকে আপনার সমপরিমাণ অথবা আরও কয়েকগুণ বেশী ধন-সম্পদ দিয়ে দেন, তবুও এক মুহূর্ত আল্লাহকে স্মরণ না করে থাকতে পারব না। - ইতি


এ থেকে জানা যায়, যে বিষয় আল্লাহর স্মরণে অন্তরায় হয়, তা ত্রুটিযুক্ত। সুতরাং মুরীদ তার অন্তরের অবস্থা সম্পর্কে গভীর চিন্তা করবে। অবিবাহিত থাকা সম্ভব না হলে বিবাহ করা উত্তম। এ রোগের তিনটি প্রতিকার রয়েছে— প্রথম অনাহারে থাকা দ্বিতীয়, দৃষ্টি সংযত রাখা এবং তৃতীয়, অন্তরকে এমন কাজে ব্যস্ত রাখা, যাতে আচ্ছন্ন রাখে। এ তিনটি তদবীরে কোন উপকার না হলে সর্বশেষে বিবাহ করতে হবে। এতে এ রোগের মূল উৎপাটিত হয়ে যায়। এ কারণেই পূর্ববর্তী বুযুর্গগণ তাড়াহুড়া করে কন্যাদের বিবাহ দিতেন। সায়ীদ ইবনে মুসাইয়িব বলেন :

“শয়তান কারও তরফ থেকে নিরাশ হয় না। সে নারীদের দ্বারা অবশ্যই ফাঁদ পাতে”।


হযরত সায়ীদ ইবনে মুসাইয়িবের বয়স যখন চৌরাশি বছরে পৌঁছে, তখন তাঁর একটি চক্ষু নষ্ট হয়ে যায় এবং অপর চক্ষু থেকেও পানি ঝরতে থাকে । তখনও তিনি বলতেন : আমি নারীদের চেয়ে অধিক অন্য কিছুকে ভয় করি না। 

আবদুল্লাহ ইবনে আবী ওদায়া বলেন : আমি তাঁর কাছে গিয়ে বসতাম। কয়েক দিন যাইনি। এরপর একদিন গেলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এ কয়দিন কোথায় ছিলে? আমি বললাম : আমার স্ত্রী মারা গিয়েছিল। তাই হাযির হতে পারিনি। তিনি বললেন : তুমি আমাকে খবর দিলে না কেন? এরপর আমি প্রস্থানোদ্যত হলে তিনি বললেন : খুব তো চলে যাচ্ছ; কিন্তু জিজ্ঞেস করি, পরে বিয়ে শাদী করলে কি না? আমি আরজ করলাম : হুযুর, আমি গরীব মানুষ। আমাকে কে কন্যা দান করবে। তিনি বললেন : আমি দিচ্ছি। আমি সবিস্ময়ে বললাম : আপনি ! তিনি বললেন : হাঁ। অতঃপর খোতবা পাঠ করে সামান্য মোহরানার বিনিময়ে আপন কন্যার বিবাহ আমার সাথে সম্পন্ন করে দিলেন। আমি আহ্লাদে আটখানা হয়ে সেখান থেকে চলে এলাম এবং কারও কাছ থেকে কিছু কর্জ নেয়ার কথা ভাবছিলাম। ইতিমধ্যে মাগরিবের সময় হয়ে গেল। আমি নামায পড়ে গৃহে ফিরে এলাম। বাতি জ্বালিয়ে রুটি ও তেল নিয়ে ইফতার করতে বসলাম। এমন সময় দরজা থেকে করাঘাতের শব্দ কানে ভেসে এল। আমি জিজ্ঞেস করলাম : কে? জওয়াব এল : সায়ীদ। আমি ভাবনায় পড়ে গেলাম, কোন্ সায়ীদ হতে পারে! সায়ীদ ইবনে মুসাইয়িব হবেন, তা কল্পনায়ও ছিল না। কারণ, তিনি চল্লিশ বছর ধরে মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও যাওয়া সম্পূর্ণ মওকুফ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু দরজা খুলেই দেখি, সায়ীদ ইবনে মুসাইয়িব দণ্ডায়মান। আমি ধারণা করলাম, বোধ হয় কোন সাংঘাতিক প্রয়োজনে আমার কাছে এসেছেন । আমি আরজ করলাম : আমাকে ডেকে নিলেন না কেন? তিনি বললেন : তোমার কাছে আসাই সমীচীন মনে হল। আমি বললাম : আদেশ করুন। তিনি বললেন : তুমি বিবাহ করেছ। এখন একাকী শয়ন করবে- এটা আমার কাছে ভাল মনে হয়নি। তাই তোমার স্ত্রীকে তোমার কাছে পৌঁছে দিতে এসেছি। আমি ভাল করে দেখতেই দেখি, বাস্তবে সেই ভাগ্যবতী কন্যা সলজ্জ ভঙ্গিতে তাঁর পেছনেই দণ্ডায়মান রয়েছে। তিনি তার হাত ধরে ভিতরে ঠেলে দিয়ে দরজা বন্ধ করে চলে গেলেন । এদিকে কন্যাটি লজ্জা শরমের আতিশয্যে মাটিতে পড়ে গেল। আমি দরজা খুব ভাল করে বন্ধ করে দিলাম। অতঃপর যে পেয়ালায় রুটি ও তেল রাখা ছিল, তা বাতির কাছ থেকে সরিয়ে দিলাম, যাতে স্ত্রীর দৃষ্টিগোচর না হয়। এরপর গৃহের ছাদে উঠে প্রতিবেশীদেরকে ডাক দিলাম। সকলেই একত্রিত হয়ে জিজ্ঞেস করল : ব্যাপার কি? আমি বললাম : সায়ীদ ইবনে মুসাইয়িব আজ দিনের বেলায় তাঁর কন্যার বিবাহ আমার সাথে সম্পন্ন করেছেন। এখন রাতের বেলায় অপ্রত্যাশিতভাবে তিনি তাঁর কন্যাকে এখানে রেখে গেছেন। লোকেরা সবিস্ময়ে জিজ্ঞেস করল : সায়ীদ তোমাকে বিবাহ করিয়েছেন? আমি বললাম : হাঁ। তারা বলল : তাঁর কন্যা এখন তোমার গৃহে? আমি বললাম : হাঁ। অতঃপর তারা সকলেই তার কাছে গেল। আমার মা সংবাদ পেয়ে এলেন এবং বললেন : তিন দিন পর্যন্ত তুই বউ মাকে স্পর্শ করতে পারবি না। যদি করিস কখনও তোর মুখ দেখব না। এই তিন দিনে আমরা তাকে ঠিক করে নেব। মায়ের আদেশমত আমি তিন দিন আলাদা রইলাম। এরপর যখন তাকে দেখলাম, তখন পরমাসুন্দরী, কালামুল্লাহর হাফেয, সুন্নতের আলেম এবং স্বামীর হক সম্পর্কে বেশ ওয়াকিফহাল পেলাম। একমাস পর্যন্ত সায়ীদ ইবনে মুসাইয়িব আমার গৃহে এলেন না এবং আমিও তাঁর কাছে গেলাম না। একমাস পর যখন গেলাম, তখন তিনি ভক্তদের বৃত্তের মধ্যে উপবিষ্ট ছিলেন। আমি সালাম করলে তিনি শুধু জওয়াব দিলেন এবং কিছু বললেন না। ভক্তদের প্রস্থানের পর আমাকে জিজ্ঞেস করলেন : তোমার স্ত্রীর অবস্থা কি? আমি বললাম : খুব ভাল। তিনি বললেন : মর্জির খেলাফ কোন কিছু পেলে লাঠি দিয়ে খবর নেবে। আমি গৃহে চলে এলাম। এরপর তিনি বিশ হাজার দেরহাম আমার কাছে পাঠিয়ে দিলেন। এ ছিল সেই কন্যা, যাকে খলীফা আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ান তার খেলাফত কালে আপন পুত্রবধূরূপে গ্রহণ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সায়ীদ ইবনে মুসাইয়িব অস্বীকৃত হন। এরপর খলীফা মিথ্যা অভিযোগে তাঁকে একশ' বেত্রদণ্ডে দণ্ডিত করেন এবং কনকনে শীতের মধ্যে এক কলসী ঠাণ্ডা পানি তাঁর গায়ে ঢেলে দেন। এছাড়া কম্বলের কোর্তাও পরিধান করান। এসব কারণে কন্যাকে রাতেই স্বামী গৃহে বিদায় দেয়া পূর্ণ ধার্মিকতা ও সাবধানতার পরিচায়ক ছিল। (আল্লাহ তাঁকে উত্তম প্রতিদান দিন।)


পরবর্তী পর্ব

(৯) যিনা ও কুদৃষ্টি থেকে আত্মরক্ষা করা 

লজ্জাস্থানের খাহেশ

 


 উদর ও লজ্জাস্থানের খাহেশের প্রতিকার (পর্ব- ৭)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

লজ্জাস্থানের খাহেশ
প্রকাশ থাকে যে, দুটি উপকারিতা অর্জনের জন্যে মানুষকে স্ত্রী সহবাসের খাহেশে লিপ্ত করা হয়েছে। 
প্রথম হচ্ছে এর দ্বারা আনন্দ ও সুখ লাভ করে মানুষ পরকালের আনন্দ এবং সুখ স্মরণ করবে। কেননা, এই আনন্দ ও সুখ দীর্ঘস্থায়ী হলে দেহের আনন্দসমূহের মধ্যে সর্বাধিক শক্তিশালী হত; যেমন অগ্নি সর্বাধিক কষ্ট দায়ক। ফলে এই আনন্দ মানুষকে জান্নাতের জন্যে আগ্রহান্বিত করত। জান্নাতের আগ্রহ দোযখের ভয় ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সুখ ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য কষ্ট ছাড়া সম্ভবপর নয়। অতএব দুনিয়াতে যখন কেউ স্ত্রী সহবাসের আনন্দ ও সুখ উপভোগ করবে, তখন জেনে নেবে যে, জান্নাতের সুখও এমনি ধরনের অথবা এর চেয়েও উৎকৃষ্ট। দ্বিতীয় উপকারিতা হচ্ছে, পৃথিবীতে মানুষের বংশ পরম্পরা অব্যাহত রাখা। এ দু'টি উপকারিতা ছাড়া এই খাহেশের মধ্যে বিপদাপদ ও অপকারিতা এত বেশী যে, মানুষ একে নিয়ন্ত্রণ করে সমতার পর্যায়ে না রাখলে তার দ্বীন দুনিয়া উভয় বরবাদ হয়ে যায়।

“পরওয়ারদেগার, আমাদেরকে এমন বোঝা দিয়ো না, যার শক্তি আমাদের নেই”।

এই আয়াতের তফসীরে কেউ কেউ লেখেন, এখানে “শক্তির অধিক বস্তু” বলে সহবাসের তীব্র খাহেশ বুঝানো হয়েছে। এতে সন্দেহ নেই যে, মানুষের এই খাহেশ যখন উত্তেজিত হয়ে উঠে, তখন তার দুই তৃতীয়াংশ জ্ঞান বুদ্ধি লোপ পায়। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) দোয়ায় বলতেন :

“আল্লাহ, আপনার কাছে আশ্রয় চাই আমার কান, চক্ষু অন্তর ও বীর্যের অনিষ্ট থেকে”।


তিনি আরও বলেন : “নারী শয়তানের জাল। এই খাহেশ না থাকলে নারীরা পুরুষদের উপর রাজত্ব করতে পারত না।


বর্ণিত আছে, হযরত মূসা (আঃ) এক মজলিসে উপবিষ্ট ছিলেন, এমন সময় ইবলীস আগমন করল। তার মস্তকে বহুরঙ্গের চাকচিক্যময় টুপি। মূসা (আঃ)-এর নিকটবর্তী হয়ে সে টুপি খুলে রেখে দিল। অতঃপর সালাম করল। মূসা (আঃ) জিজ্ঞেস করলেন : তুমি কে? সে আরজ করল : আমি ইবলীস। তিনি বললেন : তোমার মৃত্যু হোক, এখানে আসার কারণ কি? ইবলীস বলল : আল্লাহর কাছে আপনার বিশেষ সম্মান ও মর্যাদা রয়েছে। তাই আপনাকে সালাম করতে এসেছি। মূসা (আঃ) বললেন : আচ্ছা, বল তো, মানুষ কি কাজ করলে তুমি তার উপর প্রবল হয়ে যাও? ইবলীস আরজ করল : যখন মানুষ নিজেকে বড় এবং গোনাহ ভুলে গিয়ে নিজের আমলকে বেশী মনে করতে থাকে, তখন সে আমার করায়ত্ত হয়ে যায়। আমি আপনাকে দুইটি বিষয়ে সতর্ক করছি। প্রথম, বেগানা নারীর সাথে নির্জনে যাবেন না। কেননা, যে পুরুষ বেগানা নারীর সাথে একান্তে থাকে, আমি স্বয়ং সেখানে যাই. চেলাদেরকে পাঠাই না। এরপর এই পুরুষকে কুকর্মে লিপ্ত করে দেই। 

দ্বিতীয়, আল্লাহর সাথে যে অঙ্গীকার করেন তা পূর্ণ করুন এবং যাকাত ও সদকার জন্যে নির্দিষ্ট মাল বণ্টন করে দিন। কারণ, মানুষ খয়রাতের জন্যে যে অর্থ আলাদা করে, আমি তাতেও নানা জটিলতা সৃষ্টি করি, যাতে সে তার নিয়ত পূর্ণ করতে না পারে। এরপর ইবলীস চলে গেল। 


সায়ীদ ইবনে মুসাইয়িব বলেন : রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেছেন, পূর্বকালে প্রেরিত সকল নবী সম্পর্কেই শয়তান আশা করত যে, নারীর ফাঁদে ফেলে তাঁদেরকে ধ্বংস করে দেবে। আমার কাছেও নারীর চেয়ে অধিক বিপজ্জনক কোন কিছু নেই। তাই আমি মদীনা মুনাওয়ারায় আপন গৃহ ছাড়া কারও গৃহে যাই না অথবা আপন কন্যার গৃহে জুমুআর দিন কেবল গোসল করতে যাই। 

জনৈক বুযুর্গ বলেন : শয়তান নারীকে বলে, তুমি আমার অর্ধেক বাহিনী। তুমি আমার তীর, যা কখনও লক্ষ্যভেদ করতে ব্যর্থ হয় না। তুমি আমার রহস্য। তুমি আমার দারোয়ান ও দূত। অর্থাৎ শয়তানের অর্ধেক বাহিনী হচ্ছে খাহেশ এবং অর্ধেক বাহিনী ক্রোধ। কিন্তু নারীর খাহেশ হচ্ছে সর্ববৃহৎ। এই খাহেশের তিনটি স্তর আছে- স্বল্পতা, বাহুল্য ও সমতার স্তর। বাহুল্য হচ্ছে, নারীর প্রতি এমন খাহেশ হওয়া যে, জ্ঞান-বুদ্ধি লোপ পায়, সাধনা ও আখেরাতের পথ থেকে বঞ্চিত করে দেয় অথবা দ্বীনদার পশ্চাতে ফেলে কুকর্মে লিপ্ত করে দেয়। এই পর্যায়ের খাহেশ অত্যন্ত নিন্দনীয়। স্বল্পতার স্তর হচ্ছে পুরুষত্বহীন হয়ে যাওয়া। এটাই নিন্দাযোগ্য ও খারাপ। সমতার স্তর হচ্ছে প্রশংসনীয়। তা হল, নারীর খাহেশ সর্বদা জ্ঞান-বুদ্ধি ও শরীয়তের আইনের অধীনে থাকবে। এতে বাড়াবাড়ি দেখা দিলে ক্ষুধা ও বিবাহের মাধ্যমে তা প্রতিহত করতে হবে। হাদীসে আছে- 

“যুবকগণ, অবশ্যই বিবাহ কর। যে সক্ষম নয় সে যেন রোযা রাখে। রোযা তার জন্যে খাসী হওয়ার মত।


(৮) মুরীদের বিবাহ করা না করা

রিয়ার বিপদাপদ


 উদর ও লজ্জাস্থানের খাহেশের প্রতিকার (পর্ব - ৬)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

রিয়ার বিপদাপদ

জানা উচিত, খাহেশ বর্জনকারী ব্যক্তি এমন দু'টি বিপদের সম্মুখীন হয়, যা সাধের বস্তু খাওয়ার চেয়েও অধিক ক্ষতিকর। প্রথম হচ্ছে, নফস কোন কোন খাহেশ ত্যাগ করতে পারে না। কিন্তু কেউ জানুক, এটাও চায় না। তাই নির্জনে সে বস্তুটি খেয়ে নেয়- জনসমাবেশে খায় না। একে বলা হয় “শেরকে খফী” তথা গোপন শেরক। জনৈক আলেমকে কোন দরবেশের হাল জিজ্ঞেস করা হলে তিনি চুপ করে রইলেন। লোকেরা বলল : তার কোন দোষ আপনি জানেন? তিনি বললেন : সে একান্তে এমন বস্তু খায়, যা প্রকাশ্যে খায় না। মোট কথা, এটা খুব বড় বিপদ । কেউ খাহেশের মহব্বতে লিপ্ত হয়ে গেলে তার উচিত তা প্রকাশ করে দেয়া। 'সাচ্চা হাল' একেই বলা হয়। এতে শুধু এটাই জানা যাবে যে, আমলের দোষে সাধনা ভণ্ডুল হয়ে গেছে। পক্ষান্তরে কোন দোষ গোপন করে তার বিপরীতে জনসমক্ষে পূর্ণতা প্রকাশ করলে দু'টি ক্ষতি হবে; যেমন মিথ্যা বলে তা গোপন করলে দু'টি মিথ্যা হয়ে যায়। দু'টি সত্যিকার তওবা না করা পর্যন্ত কেউ এরূপ ব্যক্তির প্রতি সন্তুষ্ট হয় না । এ কারণেই আল্লাহ পাক মোনাফেকদের আযাব বেশী বলে এরশাদ করেছেন। কেননা, কাফের প্রকাশ্যে কুফর করে; কিন্তু মোনাফেক কুফর করে তা গোপন করে। অতএব গোপন করা দ্বিতীয় কুফর হল। সে মানুষের দৃষ্টিকে আল্লাহর দৃষ্টির চেয়ে অধিক প্রখর বলে বিশ্বাস করে আপন কুফর গোপন করে। তাই সে দ্বিগুণ আযাবের যোগ্য হয়। বিভুজ্ঞানীগণ খাহেশ এমনকি, গোনাহে লিপ্ত হয়ে যান; কিন্তু রিয়ায় গ্রেফতার হন না। তাঁরা আপন দোষত্রুটি গোপন করেন না; বরং পূর্ণ বিভুজ্ঞান হচ্ছে, খাহেশকে আপন নফস থেকে আল্লাহর ওয়াস্তে দূর করবে এবং বাহ্যতঃ মানুষের বিশ্বাস হ্রাস করার জন্যে খাহেশ প্রকাশ করবে। জনৈক বুযুর্গ সাধের মামুলী বস্তু এনে গৃহে লটকিয়ে রাখতেন; অথচ খেতেন না, যাতে গাফেল লোক তাঁর কাছে এসে ভিড় না জমায় এবং তাঁকেও খাহেশ পূজারী মনে করে। দরবেশের বড় কৃতিত্ব হচ্ছে দরবেশীতে দরবেশী করা; অর্থাৎ দরবেশীর বিপরীত প্রকাশ করা। এটা সিদ্দীকগণের কাজ। এরূপ ব্যক্তি সেই ব্যক্তির মত, যাকে কেউ কিছু দিলে প্রকাশ্যে তা গ্রহণ করে; কিন্তু পরে গোপনে মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেয়। বলাবাহুল্য, তার অন্তর দু'বার বিনয়ী হয়। এক, বাহ্যতঃ গ্রহণ করার লাঞ্ছনা মেনে নেয়ার সময় এবং দুই, গোপনে ফেরত দেয়ার কালে আপন অভাব অব্যাহত রাখার সময়। এই স্তর অর্জিত হওয়া পর্যন্ত নিজেকে অপূর্ণ জ্ঞান করা এবং খাহেশ প্রকাশ করা উচিত। শয়তান তাকে এই বলে ধোকা দিতে চাইবে যে, এ খাহেশ প্রকাশ করলে অন্যেরাও তোমার অনুসরণ করবে। সুতরাং গোপন করার মধ্যেই অপরের সংশোধন

নিহিত। অথচ বাস্তবে অপরের সংশোধন লক্ষ্য হলে আপন নফসের সংশোধন অগ্রে এবং অধিক গুরুত্বপূর্ণ হত। এতে বুঝা গেল, উদ্দেশ্য রিয়া ছাড়া কিছুই নয়।


দ্বিতীয় রিপদ হচ্ছে, খাহেশ বর্জনে সক্ষম; কিন্তু সাধু বলে পরিচিতি হওয়ার আকাঙ্ক্ষী। এমতাবস্থায় খাদ্যের খাহেশ, যা আসলে দুর্বল, তা তো বর্জন করা হল; কিন্তু সুখ্যাতির খাহেশ, যা অধিক অনিষ্টকর- তার খপ্পরে পড়া হল। একে বলা হয় গোপন খাহেশ। এটা খাদ্যের খাহেশ অপেক্ষা অধিক জোরালো। কেউ নিজের মধ্যে এ ধারার খাহেশ অনুভব করার পর যদি একে অধিক জোরালো মনে করে খাদ্যের খাহেশ মিটিয়ে নেয় এবং খেয়ে ফেলে, তবে এটা তার জন্যে উত্তম। হযরত আবু সোলায়মান বলেন : তোমার সামনে যখন বর্জন করা সাধের খাদ্য আসে, তখন তা থেকে সামান্য খেয়ে নাও, নফসের চাহিদা মোতাবেক খেয়ো না। এতে দু'টি উপকারিতা আছে। এক, খাহেশ থাকবে না এবং দুই, নফস আকাঙ্ক্ষার মধ্যে থেকে যাবে। হযরত ইমাম জাফর (রহঃ) বলতেন : আমার সামনে কোন খাহেশের বস্তু এলে আমি আপন নফসকে দেখি। যদি প্রকাশ্যে আকাঙ্ক্ষা করতে দেখি, তবে খাইয়ে দেই। বাধা দেয়ার চেয়ে এটা ভাল । আর যদি দেখি, গোপনে আকাঙ্ক্ষা করে এবং প্রকাশ্যে বর্জনকারী হতে চায়, তবে খাওয়া বর্জন করি- কখনও খাই না । এ থেকে গোপন খাহেশের জন্যে নফসকে সাজা দেয়ার পদ্ধতি জানা গেল । মোট কথা, খাদ্যের খাহেশ ত্যাগ করে গোপন খাহেশে লিপ্ত হওয়া এমন, যেমন কেউ বিচ্ছুকে ভয় করতঃ সাপের কাছে চলে যায়। কেননা, রিয়ার ক্ষতি খাদ্যের খাহেশের ক্ষতির তুলনায় অনেক বেশী।


(৭) লজ্জাস্থানের খাহেশ

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...