সম্মান লাভের প্রত্যাশী নহে, এমন ব্যক্তির অগ্রে অগ্রে কেহ পথ চলিলে বা সভাস্থলে তাহার অপেক্ষা উচ্চ আসনে বসিলে ইহাতে তাহার অন্তরে ক্রোধের সঞ্চার হয় না। ক্রোধোৎপত্তির কারণ অনুসন্ধান করিলে মানুষে মানুষে বিরাট প্রভেদ পরিলক্ষিত হয়। যাহাতে একের ক্রোধের সঞ্চার হয় অপরে ইহাতে লজ্জায় মাথা হেট করে। অধিকাংশ স্থানে মান-মর্যাদা ও ধন-দৌলত লইয়াই ক্রোধ উত্তেজিত হইয়া উঠে। নিতান্ত ঘৃণ্য ও তুচ্ছ ব্যাপার অবলম্বনেও কেহ কেহ ক্রুদ্ধ হয়। দাবা ও চৌসরক্রীড়া, কবুতর খেলা বা মদ্যপান প্রভৃতি নিকৃষ্ট ও জঘন্য কর্মে অভ্যস্ত লোকের এই সকল অপকর্মে কোন ত্রুটি ধরিলে তাহার ক্রুদ্ধ হইয়া উঠে। কেহ যদি এই প্রকৃতির লোককে বলে- “তুমি দাবা খেলায় তত দক্ষতা লাভ কর নাই, তুমি বেশী মদ পান করিতে অক্ষম, তবে সে ক্রুদ্ধ হয়। মান-সম্ভ্রম, ধন-দৌলত বা অন্যান্য ঘৃণ্য ও তুচ্ছ ব্যাপার অবলম্বনে যে সমস্ত ক্রোধের উৎপত্তি হয়, রিয়াযত দ্বারা মানুষ তৎসমুদয় হইতে নিষ্কৃতি লাভ করিতে পারে। কিন্তু জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি অবলম্বনে যে ক্রোধের উৎপত্তি হয় মানুষ ইহা হইতে নিস্তার লাভ করিতে পারে না এবং এই প্রকার ক্রোধের মূলোচ্ছেদ সঙ্গতও নহে।
স্থলবিশেষে ক্রোধ বাঞ্ছনীয়
মানব জীবনে নিতান্ত আবশ্যক দ্রব্যাদির অপচয় ও অপহরণজনিত ক্রোধ বাঞ্ছনীয়। কিন্তু যে স্থানে ক্রোধ মঙ্গলজনক সে স্থানে যেন মানুষ ক্রোধের উত্তেজনায় উন্মত্ত দিশাহারা না হয় এবং ধর্ম-বুদ্ধির বশীভূত থাকে, এইজন্য তাহার সাবধান হওয়া কর্তব্য। সাধনা দ্বারা মানুষ এই প্রকার ক্রোধের আজ্ঞাধীন করিতে সমর্থ হয়। ইহার মূলোৎপাটন অসম্ভব ও অসঙ্গত। রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) যে ক্রোধশূন্য ছিলেন না, ইহাই তাহার প্রকৃষ্ট প্রমাণ।
রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন-
>“আমি (স্বভাব চরিত্রে) তোমাদের মত মানুষ; তোমরা যেরূপ ক্রোধ কর আমিও তদ্রূপ ক্রোধ করি। যদি আমি কাহাকেও অভিশাপ দেই, কটুবাক্য বলি বা আঘাত করি, তবে হে খোদা, আমার সেই কাজকে তাহার উপর তোমার রহমতের হেতু করিয়া লও।"
হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আমর ইব্নে আছ রদিয়াল্লাহু আন্হু তখন নিবেদন করিলেন- “ইয়া রাসূলাল্লাহ্, আপনি ক্রুদ্ধ অবস্থায় যাহা বলিলেন উহাও আমি লিপিবদ্ধ করিতেছি।” তিনি বলেন- >“ইহাও লিখিয়া লও, যে আল্লাহ্ আমাকে সত্য রাসূল করিয়া পাঠাইয়াছেন, তাঁহার শপথ, আমি ক্রুদ্ধ হইলেও সত্য ব্যতীত কোন কথা আমার মুখ হইতে বাহির হয় না।”
সুতরাং দেখা যাইতেছে, রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) এই কথা বলেন নাই যে, তাঁহার ক্রোধ ছিল না; বরং তাঁহারও ক্রোধ ছিল, কিন্তু ইহা সত্য ও ন্যায়-বিচারের সীমা অতিক্রম করিয়া যাইতে পারে নাই, তিনি ইহাই প্রকাশ করিয়াছেন।
একদা হযরত আয়েশা রদিয়াল্লাহু আন্হা ক্রুদ্ধ হইলেন দেখিয়া রাসূলে মাকবুল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন- “হে আয়েশা, তোমার শয়তান আসিয়াছে।” তিনি নিবেদন করিলেন- “ইয় রাসূলাল্লাহ্, আপনার কি শয়তান নাই?” উত্তরে হযরত (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বলিলেন- “হাঁ, আছে; তবে আল্লাহ্ তাহার উপর আমাকে বিজয়ী করিয়াছেন, সে আমার বশীভূত হইয়া রহিয়াছে; সৎকাজ ব্যতীত অন্য কোন কাজে সে আদেশ করে না।” এস্থলেও তিনি ইহা বলেন নাই যে, তাঁহার ক্রোধ প্রবৃত্তি ছিল না।
তাওহীদ প্রভাবে গুপ্ত ক্রোধ
মানব হৃদয় হইতে ক্রোধের মূলোচ্ছেদ সম্ভবপর না হইলেও অবস্থাবিশেষে ইহা গুপ্ত থাকে। অল্প বা অধিক সময়ের জন্যই হউক, কাহারও হৃদয়ে তাওহীদ ভাব (আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস) প্রবল হইয়া তাহাকে তন্ময় করিয়া ফেলিলে সেই ব্যক্তি তখন যাহা কিছু সংঘটিত হইতে দেখে, উহা একমাত্র আল্লাহর দিক হইতেই সংঘটিত হইতেছে দেখিতে পায়। তেমন ব্যক্তির হৃদয়ে ক্রোধ অদৃশ্যভাবে থাকে এবং মোটেও উত্তেজিত হইয়া উঠে না। যেমন মনে কর, একে অপরের উপর পাথর নিক্ষেপ করিল। আহত ব্যক্তির অন্তরে ক্রোধ অদৃশ্যভাবে থাকিলেও সে কিছুতেই পাথরের উপর ক্রুদ্ধ হয় না। কারণ, সে জানে, জড় পাথরের কোন দোষ নাই; বরং পাথর নিক্ষেপকারীই অপরাধী। তদ্রূপ বিচার অপরাধীকে হত্যার আদেশ কলম দ্বারা লিখিলেও দণ্ডিত ব্যক্তি কলমের উপর ক্রুদ্ধ হয় না। কারণ, কলমের সাহায্যে দণ্ডাদেশ লিখিত হইলেও সে জানে যে, ইহা লেখকের আজ্ঞাধীন এবং তাহার স্বাধীন প্রবর্তনশক্তিতেই কলম পরিচালিত হইয়াছে ও ইহার নিজস্ব কোন ক্ষমতা নাই । তদ্রূপ, যাহার হৃদয়ে তাওহীদ ভাব প্রবল হইয়া তাহাকে তন্ময় করিয়া ফেলিয়াছে, সেই ব্যক্তি অবশ্যই জানে যে, সৃষ্টির মাধ্যমে যে কাজ সম্পন্ন হয়, ইহাতে সেই প্রাণীর কোন স্বাধীন ক্ষমতা নাই।
মানবের কয়েকটি বৃত্তির সমন্বয় ও সম্মিলিত চেষ্টায় কার্য সম্পন্ন হয়। ইহারা পরস্পর অধীনতার পাশে আবদ্ধ। বাহ্যদৃষ্টিতে দেখা যায় যে, হস্তপদাদি সঞ্চালনেই কার্য সম্পন্ন হয়। কিন্তু হস্তপদাদি সঞ্চালন শক্তির অধীন। শক্তি হস্তপদাদি ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে যে দিকে চালায় ইহারা সেইদিকে চলিলেও এই ব্যাপারে শক্তি স্বাধীন নহে। শক্তি ইচ্ছার অধীন। ইচ্ছা আবার মানবের আজ্ঞাধীন নহে। তাহার মনঃপুত হউক বা না হউক, ইচ্ছাকে তাহার উপর চাপাইয়া দেওয়া হইয়াছে। ইচ্ছার সহিত শক্তির সংযোগ ঘটিলে হস্তপদাদি সঞ্চালনে কার্য আবশ্য সম্পন্ন হইয়া থাকে। উল্লিখিত পাথর নিক্ষেপ কার্যের প্রতি লক্ষ্য করিলে বুঝা যাইবে যে, নিক্ষেপকারীর ইচ্ছানুসারে শক্তির সংযোগ হওয়াতেই হস্তপদাদি সঞ্চালনে পাথরটি ঐ ব্যক্তির উপর নিক্ষিপ্ত হইয়াছিল এবং উহার আঘাত হইত ব্যক্তি বেদনা অনুভব করিয়াছিল। পাথরটি স্বেচ্ছায় নিজ স্বাধীন ক্ষমতায় তাহাকে আঘাত করে নাই এবং এইজন্যই ইহার উপর কেহই ক্রুদ্ধ হয় না ।
আবার মনে কর, একমাত্র একটি ছাগলের দুগ্ধ দ্বারাই এক ব্যক্তি জীবিকা নির্বাহ করে। এমতাবস্থায়, ছাগলটি মরিয়া গেলে তাহার দুঃখ হয়, কিন্তু কাহারও উপর সে ক্ষুদ্ধ হয় না। আবার ছাগলটিকে কেহ বধ করিয়া ফেলিলেও তাওহীদভাবে তন্ময় ব্যক্তির পক্ষে তাহার উপর ক্রুদ্ধ না হওয়াই সঙ্গত। কারণ, তাওহীদের তন্ময়ভাব যাহাকে বিভোর করিয়া রাখিয়াছে, নিখিল বিশ্বের সকল কার্য কেবল আল্লাহর দিক হইতে সম্পন্ন হইতেছে সে দেখিতে পায়, সেই ব্যক্তি উক্ত পাথর নিক্ষেপকারী ও ছাগলবধকারী উভয়কেই বিশ্বনিয়ন্তা সর্বশক্তিমান আল্লাহ্ কর্তৃক পরিচালিত দেখিতে পাইয়া তাহাদের উপর কুপিত হইতে পারে না। কিন্তু তাওহীদের তন্ময়ভাব সর্বক্ষণ প্রবল থাকে না; বরং বিদ্যুৎ চমকের ন্যায় ইহা নিমিষেই বিলীন হইয়া যায়। তখন দৈহিক প্রকৃতির দাবি-দাওয়া এবং আন্তরিক প্রবৃত্তির প্রভাবে জাগতিক পূর্বসংস্কার আবার তাহার হৃদয়ে জাগিয়া উঠে। অধিকাংশ কামিল ব্যক্তির অন্তরে কোন কোন সময় এরূপ তাওহীদভাব আসে। তাহাদের অন্তর হইতে যে ক্রোধের মূলোচ্ছেদ হইয়াছে, তাহা নহে; বরং সৃষ্ট জীবের মাধ্যমে যে কাজ সম্পন্ন হইতেছে, ইহাতে সেই জীবের কোন স্বাধীন প্রবর্তনশক্তি নাই, এই বিশ্বাসে তাহাদের হৃদয়ে ক্রোধের সঞ্চার হয় না। তেমন ব্যক্তির প্রতি কেহ প্রস্তর নিক্ষেপ করিলেও তাহার অন্তরে ক্রোধ জাগিয়া উঠে না।
গুরুতর কাজের চাপে লুক্কায়িত ক্রোধ
যাহাকে তাওহীদ ভাবাবেশ তন্ময় করে নাই, এমন ব্যক্তিও কোন গুরুতর কাজে নিবিষ্ট থাকিলে তাহার হৃদয়েও ক্রোধ জাগিয়া উঠে না; বরং লুক্কায়িত থাকে। হযরত সালমান রদিয়াল্লাহু আন্হুকে এক ব্যক্তি গালি দিল। তিনি তাহাকে বলিলেন- কিয়ামতের দিন আমার পাপের পাল্লা ভারী হইলে তুমি যাহা বলিতেছ আমি তদপেক্ষা মন্দ, কিন্তু পাপের পাল্লা হাল্কা হইলে তোমার কথায় আমার কি ভয়?” হযরত রাবী' ইব্নে খায়সাম (রহঃ)-কে কেহ গালি দিলে তিনি বলিলেন- “বেহেশ্ত ও আমার মধ্যে এক দুর্গম গিরিপথ রহিয়াছে। আমি ইহা অতিক্রমে ব্যাপৃত আছি। অতিক্রম করিতে পারিলে আমি তোমার গালিকে ভয় করি না; কিন্তু অতিক্রম করিতে না পারিলে আমার দুর্দশার তুলনায় তোমার গালি অত্যন্ত কম।” এই দুই মহামনীষী পরকালের চিন্তায় এমন বিভোর ছিলেন যে, অপরের গালিতেও তাঁহাদের ক্রোধ জাগে নাই।
হযরত আবূ বকর রদিয়াল্লাহু আন্হুকে এক ব্যক্তি গালি দিলে তিনি তাহাকে বলিলেন- “আমার অবস্থার যেটুকু তোমার অজ্ঞাত তাহা তুমি যাহা বলিতেছ তদপেক্ষা অধিক।” স্বীয় দোষ-ত্রুটি পর্যবেক্ষণে তিনি এত অধিক ব্যাপৃত ছিলেন যে, অপরের গালি শুনিয়াও তাঁহার ক্রোধ জন্মে নাই।
হযরত মালিক ইব্নে দীনার (রঃ)-কে এক রমণী কপট ধার্মিক বলিয়া সম্বোধন করিল। তিনি সেই রমণীকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন- “হে পুণ্যবতী, তুমি ভিন্ন আর কেহই আমাকে চিনিতে পারে নাই।”
হযরত শা'বী (রঃ)-কে এক ব্যক্তি নিন্দা করিতেছিল। তিনি ইহা শুনিয়া বলিলেন “তুমি সত্য বলিয়া থাকিলে আল্লাহ্ যেন আমাকে মাফ করেন; আর তুমি মিথ্যা বলিয়া থাকিলে আল্লাহ্ যেন তোমাকে মাফ করেন।” এই সকল দৃষ্টান্তে প্রমাণিত হয় যে, মানুষ কোন গুরুতর কাজ বা চিন্তায় মগ্ন থাকিলে ক্রোধ বশীভূত ও লুক্কায়িত থাকে।
আবার কেহ যদি বিশ্বাস করে, যে ব্যক্তি ক্রোধ করে না, আল্লাহ্ তাহাকে ভালবাসেন, তবে তাঁহার ভালবাসা লাভের লালসায় উত্তেজনা প্রবল কারণ দেখা দিলেও সেই ব্যক্তি ক্রুদ্ধ হয় না। যেমন মনে কর, কেহ কোন রমণীর প্রতি প্রেমাসক্ত; কিন্তু সেই রমণীর সন্তান তাহাকে গালি দেয়। এমতাবস্থায়, যদি সে জানে যে, উক্ত সন্তানের গালি সহ্য করিলে প্রেমাস্পদ তাহাকে ভালবাসিবে, তবে সেই রমণীর প্রতি আসক্তি তাহাকে এইরূপ তন্ময় করিয়া তোলে যে সে তাহার সন্তান প্রদত্ত দুঃখ-কষ্ট অম্লান বদনে সহ্য করে এবং উক্ত সন্তানের কোনরূপ দুর্ব্যবহার তাহার হৃদয়ে ক্রোধের সঞ্চার করে না।
ক্রোধ দমনের উপায় বর্ণিত হইল। তন্মধ্যে যে কোনটি অবলম্বনে ক্রোধকে মারিয়া ফেলা আবশ্যক। অসম্ভব হইলে ইহাকে এত দুর্বল করিয়া ফেলিবে যেন উহা অবাধ্য না হয় এবং ধর্ম-বুদ্ধির বিরুদ্ধাচরণ না করে।
পরবর্তী পর্ব
ক্রোধ বিনাশক ব্যবস্থা







