রবিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৩

ঈর্ষা ও ইহার আপদ

    

ক্রোধ, বিদ্বেষ ও ঈর্ষা (পর্ব- ১১)
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

ঈর্ষা ও ইহার আপদ 
ক্রোধ হইতে বিদ্বেষ এবং বিদ্বেষ হইতে ঈর্ষা জন্মে। ঈর্ষা নিতান্ত অনিষ্টকর দোষসমূহের অন্যতম।

রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন- 

>“আগুন যেমন শুষ্ক কাষ্ঠ জ্বালাইয়া দেয়, ঈর্ষাও তদ্রূপ নেকীসমূহ ধ্বংস করিয়া ফেলে।” 

তিনি আরও বলেন “কেহই তিনটি বিষয় হইতে মুক্ত হইতে পারে না; (উহা এই) (১) বদগুমান (কুধারণা), (২) ঈর্ষা ও (৩) মন্দ ফাল (অর্থাৎ শুভাশুভ লক্ষণ-বিচার, যেমন শূণ্য কলসী, শিয়াল-কুকুরের ডাক, হাঁচি, টিকটিকি প্রভৃতিকে কুলক্ষণ বলিয়া গণ্য করা)। আমি তোমাদিগকে উহার প্রতিষেধক জানাইয়া দিতেছি; (তোমাদের মনে কাহারও সম্বন্ধে) বদগুমান হইলে মনে মনে ইহার সত্যতা অনুসন্ধানে লিপ্ত হইও না এবং অন্তরে ইহা পুষিয়া রাখিও না। মন্দ ফাল দেখিলে বিশ্বাস করিও না। ঈর্ষার উদ্রেক হইলে ইহার বশীভূত হইয়া হস্ত ও রসনা সঞ্চালন করিও না।” 

তিনি আরও বলেন 

>“হে মুসলমানগণ, যে বস্তু তোমাদের অগ্রগামী বহু জাতিকে ধ্বংস করিয়াছে, তাহা তোমাদের মধ্যে উৎপত্তি হইতে আরম্ভ করিয়াছে। উহা ঈর্ষা ও শত্রুতা। যে আল্লাহর হাতে মুহাম্মদের (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)  প্রাণ, তাঁহার শপথ, ঈমানদার না হওয়া পর্যন্ত তোমরা বেহেশতে যাইতে পারিবে না; আর তোমরা যে পর্যন্ত পরস্পরকে ভালবাসিবে না সেই পর্যন্ত তোমরা ঈমানদার হইতে পারিবে না। আর ভালবাসা কি উপায়ে লাভ করা যায়, তোমাদিগকে জানাইয়া দিতেছি- তোমরা পরস্পরকে প্রকাশ্যে সালাম দিতে থাক।”


হযরত মূসা আলায়হিস্ সালাম এক ব্যক্তিকে আরশের ছায়াতলে দেখিয়া মনে করিলেন যে, তিনি আল্লাহর নিকট উচ্চ মরতবার অধিকারী। তাঁহার সেই মরতবা লাভের ইচ্ছা হইলে তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন- “হে খোদা, এই ব্যক্তি কে এবং তাঁহার নাম কি?” আল্লাহ্ তাঁহার নাম ব্যক্ত না করিয়া তাঁহার কার্যকলাপের সংবাদ দিয়া বলিলেন- 

>“এই ব্যক্তি কখনও ঈর্ষা করে নাই, মাতাপিতার নাফরমানি করে নাই এবং একের কথা অপরের কানে লাগায় নাই।” 


হযরত যাকারিয়্যা আলায়হিস্ সালাম বলেন যে, আল্লাহ্ বলেন- 

>“ঈর্ষী ব্যক্তি আমার নিআমতের শত্রু এবং আমার বিধানের উপর বিরক্ত ও আমার বান্দাগণের মধ্যে আমি যেভাবে (আমার নিআমত) বন্টন করিয়া দিয়াছি, সে উহা পছন্দ করে না।”


রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন- 

>“ছয় প্রকার পাপের ফলে ছয় শ্রেণীর লোক বিনা বিচারে দোযখে যাইবে; (তাহা এই) 

(১) শাসনকর্তা অত্যাচারের জন্য; 

(২) আরববাসী- অন্যায় পক্ষপাতিত্বের জন্য; 

(৩) ধনবান ব্যক্তি অহঙ্কারের জন্য; 

(৪) বণিক- খিয়ানত অর্থাৎ বিশ্বাসঘাতকতা ও আত্মসাতের জন্য; 

(৫) গ্রাম্য গঁওয়ার লোক- অজ্ঞানতা ও মূর্খতার জন্য এবং 

(৬) আলিম ব্যক্তি ঈর্ষার জন্য।” 


হযরত আনাস রদিয়াল্লাহু আন্হু বলেন- “একদা আমরা রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) উনার নিকট উপবিষ্ট ছিলাম। তিনি বলিলেন 

>"বেহেশতী লোকদের অন্তর্ভুক্ত একজন এখন আসিতেছে।" আসার সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত এক ব্যক্তি তখন আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তাঁহার বাম হস্তে পাদুকা ঝুলিতেছিল এবং তাঁহার দাঁড়ি হইতে ফোঁটা-ফোঁটা ওযুর পানি পড়িতেছিল। দ্বিতীয় দিনও হযরত (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) এই কথাই বলিলেন, আর ঐ ব্যক্তিই আসিয়া উপস্থিত হইলেন। ক্রমাগত তিন দিবস এরূপ ঘটনাই ঘটিল। হযরত আবদুল্লাহ ইব্‌ন আমর ইবন আস সেই আনসারীর কার্য-কলাপ কিরূপ, জানিবার জন্য কৌতূহলী হইলেন। তিনি তাঁহার গৃহে যাইয়া বলিলেন— ‘আমি আমার পিতার সহিত ঝগড়া করিয়াছি। আপনার গৃহে তিন রাত্রি থাকিতে ইচ্ছা করি।' তিনি বলিলেন- 'আচ্ছা বেশ, তিনি (হযরত আবদুল্লাহ) ক্রমাগত তিন রজনী তাঁহার সংসর্গে অবস্থান করত তাঁহার ক্রিয়া-কলাপ লক্ষ্য করিলেন। যখনই তাঁহার নিদ্রা ভঙ্গ হইত তখনই তিনি আল্লাহর যিকির করিতেন; এতদভিন্ন তাঁহার অন্য কোন বিশেষ আমল (কাজ) তিনি দেখিতে পাইলেন না। তখন তিনি (হযরত আবদুল্লাহ্) বলিলেন- 'আমি স্বীয় পিতার সহিত ঝগড়া করি নাই; কিন্তু রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) আপনার সম্বন্ধে এইরূপ বলিলেন (সুসংবাদ দিলেন), এইজন্য আপনার ক্রিয়া-কলাপ জানিতে আসিয়াছিলাম।' তিনি (আনসারী) বলিলেন- 'আপনি যাহা দেখিলেন তদ্ব্যাতীত আমার আর কোন কার্য-কলাপ নাই।' হযরত আবদুল্লাহ (রঃ) চলিয়া যাইতে লাগিলে তাঁহাকে ডাকিয়া তিনি (আনসারী) বলিলেন- 'আরও একটি কথা আছে, আমি কাহারও সৌভাগ্যে ঈর্ষা করি নাই।' তিনি (হযরত আবদুল্লাহ) বলিলেন- 'তজ্জন্যই আপনার এই মরতবা।”


হযরত আওন ইব্‌ন আবদুল্লাহ (রঃ) এক বাদশাহকে উপদেশ প্রদান করিয়া বলিলেন— 

>“কখনও অহঙ্কার করিও না, কারণ অহঙ্কারেই সর্বপ্রথম পাপ হইয়াছিল; অহঙ্কারের জন্যই শয়তান হযরত আদম আলায়হিস সালামকে সিজদা করে নাই। লোভ হইতে দূরে থাক; কেননা, লোভই হযরত আদম আলায়হিস সালামকে বেহেশত হইতে বাহির করিয়াছিল। কখনও ঈর্ষা করিও না; কারণ ঈর্ষার জন্যই সর্বপ্রথম খুন হইয়াছিল; ইহারই প্রভাবে হযরত আদম আলায়হিস সালামের পুত্র স্বীয় ভ্রাতাকে বধ করিয়াছিল। আর হযরত সাহাবা রদিয়াল্লাহু আনহুমের জীবন-চরিত্র আলোচনা, আল্লাহ্ প্রশংসাবলী বর্ণনা বা নক্ষত্ররাজির প্রসঙ্গ হইলে নীরবে শ্রবণ কর, কথা বলিও না।”

হযরত বকর ইব্‌ন আবদুল্লাহ (রহঃ) বলেন- “এক ব্যক্তি প্রত্যেকদিন এক বাদশার সম্মুখে দণ্ডায়মান হইয়া বলিত- ‘সাধু ব্যক্তির সঙ্গে সদ্ব্যবহার কর, দুর্বৃত্তকে তাহার কার্যফলের উপর ছাড়িয়া দাও। কারণ, তাহার কু-কর্মই তাহাকে যথাযোগ্য শাস্তি প্রদান করিবে।' এই নীতিবাক্যের জন্য বাদশাহ তাহাকে ভালবাসিতেন। এক ব্যক্তি তৎপ্রতি ঈর্ষান্বিত হইয়া বাদশাহকে জানাইল- 'ইহার প্রমাণ কি?' সে বলিল ‘আপনি তাহাকে নিকটে আহবান করিয়া দেখুন, দুর্গন্ধ যাহাতে নাসিকায় প্রবেশ না করে তজ্জন্য সে হাত দ্বারা নাসিকা ঢাকিয়া রাখিবে।' অপরদিকে এই ঈর্ষান্বিত ব্যক্তি ঐ লোকটিকে স্বীয় গৃহে লইয়া যাইয়া কাঁচা রসুন মিশ্রিত খাদ্য অধিক পরিমাণে ভোজন করাইল। তৎপরই বাদশাহ তাহাকে নিকটে আহবান করিলেন। বাদশার নাসিকায় যাহাতে রসুনের দুর্গন্ধ প্রবেশ না করে তজ্জন্য সে হাত দ্বারা স্বীয় মুখ ঢাকিয়া রাখিল। বাদশাহ বুঝিলেন, ঐ ব্যক্তি সত্যই বলিয়াছে। বাদশাহর অভ্যাস ছিল যে, মহাপুরস্কার প্রদানের আদেশ ব্যতীত অন্য কিছুই স্বহস্তে লিখিতেন না। ঐ ব্যক্তির প্রতি বাদশাহ ক্রুদ্ধ হইয়া স্বহস্তে আদেশপত্র লিখিলেন— ‘পত্রবাহকের শিরচ্ছেদ করিয়া তাহার চর্মে ভূষি ভর্তি করত আমার নিকট প্রেরণ কর।' আদেশপত্রটি বাদশাহ নিজ হস্তে খামে পুরিয়া মোহর আঁটিয়া সেই ব্যক্তি মারফত তাঁহার এক কর্মচারীর নিকট প্রেরণ করিলেন। সেই ব্যক্তি আদেশপত্র হস্তে দরবার হইতে বহির্গত হইলে ঐ ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি দেখিতে পাইয়া তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল- 'ইহা কি?' সে বলিল ‘মহাপুরস্কারের আদেশপত্র।' ঐ ঈর্ষী ব্যক্তি তাহার নিকট হইতে তৎপর আদেশপত্রটি লইয়া গেল। সে ইহা ঐ কর্মচারীর হস্তে দিবামাত্র তিনি তাহাকে বলিলেন- 'ইহাতে তোমাকে হত্যা করিয়া তোমার চর্মে ভূষি ভর্তিপূর্বক বাদশাহর নিকট প্রেরণের আদেশ রহিয়াছে।' সে বলিল- 'সুবহানাল্লাহ্, এই আদেশ ত অপর এক ব্যক্তির উপর প্রদত্ত হইয়াছে। বিশ্বাস না হয় বাদশাহর নিকট জিজ্ঞাসা করিয়া দেখুন।' কর্মচারী বলিলেন ‘ইহাই বাদশাহর আদেশ, পুনরায় তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিব কেন?' অনন্তর কর্মচারী সেই ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তিকে হত্যা করিয়া ফেলিলেন। সেই ব্যক্তি পূর্ববৎ বাদশাহর সম্মুখে দন্ডায়মান হইয়া পরদিন সেই নীতিবাক্য উচ্চারণ করিল। বাদশাহ বিস্ময়ে তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন- 'ঐ পত্র কি করিলে?' সে বলিল- 'অমুক ব্যক্তি আমার নিকট হইতে চাহিয়া লইয়া গেল।' বাদশাহ বলিলেন- 'ঐ ব্যক্তি ত আমার নিকট বলিয়াছিল তুমি এইরূপ কথা বলিয়াছ।' সে উত্তর দিল- ‘আমি কখনও সেইরূপ কথা বলি নাই।' বাদশাহ আবার জিজ্ঞাসা করিলেন- 'আচ্ছা, তাহা হইলে সেই দিন তুমি মুখ ও নাসিকা হস্ত দ্বারা ঢাকিয়া রাখিয়াছিলে কেন?' সে বলিল- 'সেই ব্যক্তি আমাকে কাঁচা রসুন খাওয়াইয়া ছিল।’ বাদশাহ বলিলেন- 'তুমি যে প্রত্যহ বল- ‘দুর্বৃত্তের কর্মই তাহার শাস্তিদাতা' ইহা সত্যে পরিণত হইল।”


হযরত ইব্‌ন সীরান (রঃ) বলেন- “পার্থিব উন্নতিতে আমি কাহাকেও ঈর্ষা করি নাই। কারণ, সেই ব্যক্তি বেহেশতী হইয়া থাকিলে বেহেশতের নিআমতের তুলনায় দুনিয়া নিতান্ত তুচ্ছ। আর সেই ব্যক্তি দোযখী হইয়া থাকিলে তথায় আগুনে জ্বলিবে; দুনিয়ার সুখ-সম্পদে তাহার কি লাভ?” 

হযরত হাসান বসরী (রহঃ)-কে এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করিল— “মুসলমান কি ঈর্ষা করে?” তিনি বলিলেন- “হযরত ইয়াকুব আলায়হিস সালামের পুত্রগণের উপাখ্যান কি তুমি ভুলিয়া গিয়াছ? তবে যাহা আচরণে  প্রকাশ পায় না তেমন ঈর্ষা কোন ক্ষতি করে না।” 

হযরত আবূ দারদা রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন- “যে ব্যক্তি অধিক মৃত্যু চিন্তা করে সে না আনন্দিত হয়, না ঈর্ষা করে।”



পরবর্তী পর্ব

ঈর্ষার পরিচয়

ক্ষমার ফযীলত

  

  ক্রোধ, বিদ্বেষ ও ঈর্ষা (পর্ব- ১০)
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
ক্ষমার ফযীলত 
কেহ তোমার অনিষ্ট করিলে তুমি তাহার উপকার কর। ইহাই আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রকৃষ্টতম উপায়। ইহা সম্ভবপর না হইলে অন্ততঃপক্ষে তাহাকে ক্ষমা কর, কেননা, ক্ষমার ফযীলত অত্যন্ত বেশী। রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন- 

>“তিনটি বিষয়ে আমি শপথ করিতে পারি; (উহা এই যে) 

(১) সদকা দিলে ধন কমে না, তোমরা সদকা দাও। 

(২) যে ব্যক্তি অপরের অপরাধ মাফ করে কিয়ামত দিবসে আল্লাহ্ তাহাকে অধিক মর্যাদা দান করিবেন। 

(৩) যে ব্যক্তি নিজের জন্য ভিক্ষার পথ উন্মুক্ত করে, আল্লাহ্ তাহার জন্য দরিদ্রতার পথ উন্মুক্ত করিয়া দেন।” 


হযরত আয়েশা রদিয়াল্লাহু আন্হা বলেন- “যাহারা রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি অন্যায় করিয়াছে, তাহাদের নিকট হইতে প্রতিশোধ গ্রহণ করিতে আমি কখনও তাঁহাকে দেখি নাই; কিন্তু আল্লাহর সম্বন্ধে কেহ অন্যায় করিলে তাঁহার ক্রোধের পরিসীমা থাকিত না। তাঁহার ইচ্ছাধীন কার্যের মধ্যে যাহা মানবজাতির জন্য অধিক সহজ দেখিতেন, তাহাই তিনি গ্রহণ করিতেন। কিন্তু কখনও তিনি পাপকার্য অবলম্বন করিতেন না।”


হযরত আকাবা ইব্‌ন আমের রদিয়াল্লাহু আন্হু বলেন- “রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) আমার হস্ত ধারণপূর্বক বলিলেন- 

>"সংসারী লোক ও আখিরাতের পথিক, উভয়ের জন্য যে-ভাব উত্তম, তাহা তোমাকে জানাইয়া দিতেছি। তোমার সহিত কেহ সম্বন্ধ কর্তন করিতে চাহিলে তুমি তাহার সঙ্গে মিলিত হও; তোমাকে কেহ বঞ্চিত করিলে তুমি তাহাকে দান কর।”

রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন- “হযরত মূসা আলায়হিস্ সালাম আল্লাহর নিকট নিবেদন করিলেন— হে আল্লাহ্, আপনার বান্দাগণের মধ্যে কোন্ ব্যক্তি আপনার অধিক প্রিয়?' উত্তর হইল- 

>‘শাস্তি দানের শক্তি থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি শত্রুকে মা'ফ করে।” 

রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন- 

>“যে ব্যক্তি অত্যাচারীর উপর অভিশাপ দিল সে তাহার প্রাপ্য অংশ গ্রহণ করিল।”


রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) কুরায়শ জাতিকে পরাজিত করিয়া পবিত্র মক্কা শরীফ দখল করিলে কুরায়শগণ তাঁহার প্রতি নিজেদের অবিচার, অত্যাচার স্মরণ করিয়া নিতান্ত ভীত ও জীবনে নিরাশ হইয়া পড়িল। কিন্তু রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) কা'বা শরীফের দ্বারদেশে স্বীয় পবিত্র হস্ত স্থাপনপূর্বক তাহাদিগকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন- 

>“আল্লাহ্ এক, অদ্বিতীয়; তাঁহার শরীক নাই। তিনি অঙ্গীকার সত্যে পরিণত করিলেন ও স্বীয় বান্দাগণকে জয়ী করিলেন এবং স্বীয় দুশমনদিগকে পরাস্ত ও বিধ্বস্ত করিলেন। (হে কুরায়শগণ) অদ্য তোমরা কী দেখিতেছ এবং কী বলিতেছ?” 

কুরায়শগণ একবাক্যে নিবেদন করিল “ইয়া রাসূলাল্লাহ্, আজ সকল ক্ষমতাই আপনার করতলগত, ক্ষমা প্রার্থনা ব্যতীত আমাদের আর কী বলিবার আছে? আমরা আপনার দয়াপ্রার্থী।” তাহাদের কথা শুনিয়া রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলিলেন- 

>“আমার ভাই ইউসুফ আলায়হিস্ সালাম স্বীয় ভ্রাতাগণের উপর ক্ষমতা লাভ করিয়া যাহা বলিয়াছিলেন আমিও তাহাই বলিতেছি: আজ তোমাদের উপর ভৎসনা করিবার কিছুই নাই।” 

ইহা বলিয়া তিনি কুরায়শদিগকে জানমালের নিরাপত্তা প্রদান করিলেন।


রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন- 

>“কিয়ামতের দিন সমস্ত লোক উত্থিত হইলে এক ঘোষণাকারী ঘোষণা করিবে- 'যাহাদের পুরস্কার আল্লাহর নিকট রহিয়াছে, তাহারা উঠ।' কয়েক সহস্র লোক উঠিবে এবং বিনা হিসাবে বেহেশতে চলিয়া যাইবে। কারণ, তাহারা (দুনিয়াতে) আল্লাহর বান্দাদের অপরাধ মাফ করিয়া দিত।” 

হযরত মুআবিয়া বলেন- “ক্রোধের সময় ধৈর্য ধারণ কর, তাহা হইলে প্রচুর অবসর পাইবে। আবার অবসরকালে প্রতিশোধ গ্রহণের যথেষ্ট ক্ষমতা থাকিলেও (শত্রুকে) ক্ষমা কর।"


খলীফা হিশামের নিকট এক অপরাধীকে আনয়ন করা হইলে প্রশ্ন করিবার পূর্বেই সে স্বীয় দোষ প্রক্ষালনের উদ্দেশ্যে যুক্তি-প্রমাণাদি প্রদর্শন করিতে লাগিল। খলীফা বলিলেন— “তুমি আমার সম্মুখে প্রমাণাদি উপস্থাপিত করিতে আরম্ভ করিলে?” অপরাধী কুরআন শরীফের এই আয়াত আবৃত্তি করিল 

>“হাশরের মাঠে (আল্লাহ্র সম্মুখে) সমস্ত প্রাণী আনয়ন করা হইবে; তাহারা নিজ নিজ জীবনের জন্য তর্ক-বিতর্ক আরম্ভ করিবে।” সে আরও বলিল- 

>“কিয়ামত দিবস মহাবিচারক আল্লাহর সম্মুখে জবাবদিহিকালে তা বান্দা প্রমাণাদি উপস্থাপিত করিতে পারিবে; এমতাবস্থায়, আমি আপনার সম্মুখে প্রমাণাদি উপস্থাপিত করিতে পারিব না কেন?” খলীফা হিশাম  বলিলেন- “বেশ এস, কি বলিতে চাও বল।”


হযরত ইব্‌ন মাউদ রদিয়াল্লাহ্ আন্হুর একটি দ্রব্য চোরে লইয়া গেল। সমবেত লোকগণ চোরকে অভিশাপ দিতে লাগিল। তিনি তাহাদিগকে অভিশাপ করিতে নিষেধ করিয়া বলিলেন- “হে খোদা, চোর কোন অভাবের তাড়নায় দ্রব্যটি চুরি করিয়া থাকিলে তাহার মঙ্গল কর; কিন্তু পাপ কার্যে সাহস বর্ধন নিমিত্ত চুরি করিয়া থাকিলে ইহাই যেন তাহার শেষ পাপ বলিয়া লিখিত হয়।” অর্থাৎ তৎপর যেন সেই ব্যক্তি আর পাপ না করে।


হযরত ফুযায়ল (রঃ) বলেন- “চোরে এক ব্যক্তির ধন চুরি করিয়া লইয়া গেল। কা'বা শরীফ তওয়াফকালে দেখিতে পাইলাম, তিনি কাঁদিতেছেন। আমি তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম- 'হে মহাত্মন! আপনি কি অপহৃত ধনের জন্য কাঁদিতেছেন?' তিনি বলিলেন- ‘না, বরং আমি যেন দেখিতেছি, হাশরের মাঠে ঐ ব্যক্তি আমার সহিত দণ্ডায়মান রহিয়াছে; কিন্তু সে ঐ চুরি কার্যের কোন সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারিতেছে না। এইজন্য দুঃখিত হইয়া আমি কাঁদিতেছি।” 


খলীফা আবদুল মালিক ইব্‌ন মারওয়ানের নিকট কতিপয় যুদ্ধবন্দীকে আনয়ন করা হইল। তখন একজন বুযুর্গ তথায় অবস্থান করিতেছিলেন। তিনি খলীফাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন- “তুমি যাহা চাহিলে, আল্লাহ্ তোমাকে তাহা দান করিয়াছেন, অর্থাৎ তোমাকে বিজয়ী করিয়াছেন। এখন আল্লাহ্ যাহা চাহেন, তাহা তুমি দাও, অর্থাৎ তাহাদিগকে ক্ষমা কর।” ইহা শুনিয়া খলীফা সকল বন্দীকে মাফ করিয়া দিলেন। 

ইন্‌জীল কিতাবে আছে ‘যে-ব্যক্তি নিজ নির্যাতকের অপরাধ ক্ষমার জন্য আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে তাহার নিকট শয়তান পরাজিত হয়।” অর্থাৎ শয়তান তাহাকে পাপকর্মে প্ররোচিত করিতে সমর্থ হয় না।


মোটকথা, ক্রোধভাজন ব্যক্তিকে ক্ষমা করিয়া দেওয়া উচিত এবং প্রত্যেক কাজে নম্রতা অবলম্বন করা কর্তব্য। তাহা হইলে মানব-মনে ক্রোধের সঞ্চার হইতে পারে না।


রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন- 

>“যাহাকে আল্লাহ্ নম্রতা প্রদান করিয়াছেন, তাহাকে তিনি দুনিয়া ও আখিরাতে লাভবান করিয়াছেন। আর যাহাকে তিনি নম্রতাগুণে বঞ্চিত করিয়াছেন, সে ইহ-পরকালের মঙ্গল হইতে বঞ্চিত রহিয়াছে।” 


তিনি অন্যত্র বলেন- 

>“আল্লাহ্ সদয় সহনশীল এবং সদয় সহনশীল ব্যক্তিকে তিনি ভালবাসেন। তিনি সদয় সহনশীলতার জন্য যাহা দান করেন, কঠোরতা প্রদর্শন করিলে তাহা দান করেন না।” 

রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) হযরত আয়েশা রদিয়াল্লাহু আন্হাকে বলেন- 

>“প্রত্যেক কাজে নম্রতার দিকে দৃষ্টি রাখিবে; কেননা নম্রতাযোগে যে কাজ করা হয় তাহা সম্পন্ন হয়, আর যে কাজে নম্রতা থাকে না তাহা নষ্ট হয়।”


পরবর্তী পর্ব

ঈর্ষা ও ইহার আপদ

বিদ্বেষের তারতম্য অনুসারে মানুষের শ্রেণীবিভাগ

   

ক্রোধ, বিদ্বেষ ও ঈর্ষা (পর্ব- ৯)
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

বিদ্বেষের তারতম্য অনুসারে মানুষের শ্রেণীবিভাগ 
বিদ্বেষভাবের তারতম্য অনুসারে মানুষ তিন শ্রেণীতে বিভক্ত :

প্রথম শ্রেণী—সিদ্দীকগণ। তাঁহাদের মনে কাহারও প্রতি বিদ্বেষ জাগরিত হইলে কঠোর সাধনা ও পরিশ্রমে তাঁহারা ইহার মূলোচ্ছেদ করিয়া থাকেন। তাঁহারা বিরাগভাজন ব্যক্তির উপকার করেন এবং পূর্বাপেক্ষা অধিক ঘনিষ্ঠতার সহিত তাহার সঙ্গে মিলিত হন।

দ্বিতীয় শ্রেণী—পরহেযগারগণ। তাঁহারা বিরাগভাজন ব্যক্তির ইষ্ট ও অনিষ্ট কিছুই করেন না। অর্থাৎ বিদ্বেষভাব তাঁহাদের মানসিক অবস্থার কোন পরিবর্তন ঘটাইতে পারে না।

তৃতীয় শ্রেণী—ফাসিক যালিম। তাহারা বিদ্বিষ্ট ব্যক্তির অনিষ্ট সাধনের নিমিত্ত সর্বদা সচেষ্ট থাকে।


পরবর্তী পর্ব
ক্ষমার ফযীলত

ক্রোধজনিত মানসিক পরিবর্তন

  

ক্রোধ, বিদ্বেষ ও ঈর্ষা (পর্ব- ৮)
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

ক্রোধজনিত মানসিক পরিবর্তন
ক্রোধের ফলে বিরাগভাজন ব্যক্তির প্রতি সাধু এবং নিষ্পাপ ব্যক্তিরও মানসিক পরিবর্তন দেখা দেয়। বিরাগভাজন ব্যক্তির উপকার, কাজকর্মে সাহায্য-সহযোগিতা ও তাহার সহিত নম্র ব্যবহার আর পূর্বের ন্যায় করা হয় না। এমন কি তাহার সহিত একত্রে উপবেশন করত আল্লাহর যিকির এবং তাহার কল্যাণের জন্য দোয়া করিতেও মন লাগে না। এই সকল কারণে ক্রোধের বশীভূত হইলে সাধু পুরুষদেরও মরতবা হ্রাসপ্রাপ্ত হয় এবং তাঁহাদের বিস্তর ক্ষতি সাধিত হয়।
📚


হযরত আবূ বকর রদিয়াল্লাহু মিস্তাহ্ নাম জনৈক নিকট-আত্মীয়পোয্য ছিলেন। তিনি হযরত আয়েশা রদিয়াল্লাহু আন্হা সম্পর্কে মিথ্যা অপবাদে যোগদান করিলে হযরত আবূ বকর (রঃ) তাঁহার ভরণ-পোষণ রহিত করিয়া শপথ করেন যে, তাঁহাকে আর কখনও জীবিকা প্রদান করিবেন না। এই উপলক্ষে আল্লাহ্ বলেন: 

>“এবং যেন শপথ না করে তোমাদের মধ্যে (আল্লাহর) অনুগ্রহপ্রাপ্ত শ্ৰেষ্ঠ ব্যক্তি এই বিষয়ে যে, দিবে না স্বজন ও দরিদ্র এবং আল্লাহর পথে গৃহত্যাগী লোকদিগকে এবং উচিত যে, ক্ষমা করে ও দোষ ছাড়িয়া দেয়া আল্লাহ্ তোমাদিগকে ক্ষমা করেন ইহা কি তোমরা চাও না?" 

(সূরা নূর, রুকু ৩, পারা ১৮)। 

ইহা শুনিয়া হযরত আবূ বকর রদিয়াল্লাহু আন্হু বলেন- “আল্লাহ্ শপথ, আমি অবশ্যই ইহা ভালবাসি।” তৎপর তিনি আবার মিস্তার ভরণ-পোষণ করিতে লাগিলেন।



পরবর্তী পর্ব

বিদ্বেষের তারতম্য অনুসারে মানুষের শ্রেণীবিভাগ 

গুপ্ত ক্রোধের আপদ এবং বিদ্বেষজাত মনোভাব

  

ক্রোধ, বিদ্বেষ ও ঈর্ষা (পর্ব- ৭)
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
গুপ্ত ক্রোধের আপদ এবং বিদ্বেষজাত মনোভাব

 ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সততার বশবর্তী হইয়া বিরাগভাজন ব্যক্তিকে ক্ষমা করত ক্রোধ দমন করিলে তুমি পরম ভাগ্যবান। কিন্তু ক্ষমতার কারণে বা স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে ক্রোধ চাপা রাখিলে ইহা তোমার অন্তরে বিকৃত হইয়া দ্বেষ-বিদ্বেষের সৃষ্টি করিবে। রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন : 

>“মুমিন কখনও বিদ্বেষপরায়ণ হইতে পারে না।" 

দ্বেষ-বিদ্বেষ ক্রোধের পুত্রস্বরূপ। দ্বেষ-বিদ্বেষ হইতে আবার আট প্রকার ধর্ম ধ্বংসকর মনোভাব জন্মিয়া থাকে। ইহাদিগকে ক্রোধের পৌত্র বলা যাইতে পারে।


বিদ্বেষজাত মনোভাব 

বিদ্বেষজাত মনোভাব আট প্রকার। 

প্রথম- ঈর্ষা। ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি সুখে যাতনা ও দুঃখে আনন্দ পায়। 

দ্বিতীয়— শামাতাত অর্থাৎ অপরের দুঃখ ও বিপদে আনন্দ প্রকাশ করা। (ঈর্ষার মত ইহা আন্তরিক লুক্কায়িত ভাব নহে; ইহা কথাবার্তায় ও ক্রিয়াকলাপে প্রকাশিত হয়)। 

তৃতীয় বিমুখতা অর্থাৎ বিরাগভাজন ব্যক্তির প্রতি অপ্রসন্ন থাকা। তাহার সহিত কথা না বলা; এমন কি সালামের জওয়াবও না দেওয়া। 

চতুর্থ - অবজ্ঞা। ইহাতে মানুষ বিরাগভাজন ব্যক্তিকে হেয় ও তুচ্ছ বলিয়া মনে করে। 

পঞ্চম বিরাগভাজন ব্যক্তির প্রতি অবজ্ঞা বাহিরে প্রকাশ পায় এবং লোক বিরাগভাজন ব্যক্তির কুৎসা, নিন্দা ও গুপ্ত দোষ প্রকাশে পঞ্চমুখ হয় এবং তৎপ্রতি নানারূপ মিথ্যা ও অশ্লীল বাক্য প্রয়োগ করিতে থাকে। 

ষষ্ঠ- বিরাগভাজন ব্যক্তির দোষ বিদ্বেষ-পরায়ণ ব্যক্তি লোকসমাজে প্রকাশ করে, ইহা লইয়া সমালোচনা করে এবং তাহাকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে। 

সপ্তম - বিরাগভাজন ব্যক্তির প্রাপ্য আদায় ও তাহার নিকট হইতে গৃহীত ঋণ পরিশোধে অবহেলা দেখা দেয়; তাহার সহিত আত্মীয়তা ছেদন করা হয় এবং তাহার কোন হক নষ্ট হইয়া থাকিলে ইহা প্রত্যর্পণ করা হয় না বা ক্ষমাও চাওয়া হয় না। 

অষ্টম- বিরাগভাজন ব্যক্তিকে যাতনা প্রদান, এমন কি সুযোগ পাইলে তাহাকে হত্যার বাসনা বিদ্বেষভাজন ব্যক্তির অন্তরে জাগিয়া উঠে এবং সে অপরকেও তাহার বিরুদ্ধে তদ্রূপ কার্যে উত্তেজিত করিয়া তোলে।



পরবর্তী পর্ব

ক্রোধজনিত মানসিক পরিবর্তন

অপ্রিয় বাক্য শ্রবণকারীর কর্তব্য

 

ক্রোধ, বিদ্বেষ ও ঈর্ষা (পর্ব- ৬)
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
অপ্রিয় বাক্য শ্রবণকারীর কর্তব্য

কাহারও অত্যাচার বা অপ্রিয় বাক্যের উত্তর না দিয়া নীরব থাকাই উত্তম। কিন্তু এইরূপ স্থলে নীরব থাকা ওয়াজিব নহে। কিন্তু প্রত্যেক কথার জওয়াব দিবারও অনুমতি নাই। গালির পরিবর্তে গালি দেওয়া এবং গীবতের পরিবর্তে গীবত করা জায়েয নহে। কেননা, এই সমস্ত কারণে শরীয়তের শাস্তি বিধান অপরাধীর উপর ওয়াজিব হইয়া পড়ে। কিন্তু কটু বাক্যের উত্তরে এমন কটুবাক্য বলার অনুমতি আছে যাহাতে মিথ্যার লেশমাত্রও নাই। ইহা কেছাছ সদৃশ্য। (অপরাধ প্রবণতা নিবারণের উদ্দেশ্যে তুল্য পরিমাণ প্রতিশোধ গ্রহণ ও যথাবিহিত শাস্তির বিধানকে কেছাছ বলে)।


রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন- 

>“যে দোষ তোমার মধ্যে আছে ইহার উল্লেখ করিয়া তোমাকে কেহ গালি দিলে তাহার দোষ উল্লেখ করত উত্তর দিও না।” 

কিন্তু এই হাদীসের নির্দেশ অনুসারে গালি বা ব্যভিচার সম্বন্ধে কোন বিষয়ের উল্লেখ না হইলে ঐ ব্যক্তির উত্তর না দিয়া বিরত থাকা ওয়াজিব নহে। ইহার প্রমাণ এই যে, রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন-

>“পরস্পর ঝগড়ার সময় যাহা বলা হইয়া থাকে ইহার পাপ অত্যাচারিত ব্যক্তি সীমা অতিক্রম না করা পর্যন্ত আরম্ভকারীর উপর থাকে।”


হযরত আয়েশা রদিয়াল্লাহু আন্হা বলেন- “রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) আমাকে অধিক ভালবাসেন এবং আমার প্রতি তাঁহার আসক্তি অত্যধিক বলিয়া আমার সপত্নীগণ হযরত ফাতিমা রাযিয়াল্লাহু আন্হাকে হযরত (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট নিবেদন করিয়া বলিয়া পাঠান যেন তিনি সকলকে তুল্যরূপে ভালবাসেন। হযরত ফাতিমা রদিয়াল্লাহু আন্হা আসিয়া হযরত (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-কে নিদ্রিত দেখিতে পাইলেন। তিনি জাগ্রত হইলে হযরত ফাতিমা রদিয়াল্লাহু আন্হা তাঁহাকে নিবেদন জানাইলেন। হযরত (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) আবার বলিলেন- 'আমি আয়েশাকে অত্যন্ত ভালবাসি, তোমরাও তাহাকে তদ্রূপ ভালবাস।' হযরত ফাতিমা রদিয়াল্লাহু আন্হা প্রত্যাবর্তন করিয়া আমার সপত্নীদিগকে সমস্ত কথা জানাইলেন, কিন্তু তাঁহারা ইহাতে সন্তুষ্ট হইলেন না। আমার অপর সপত্নী হযরত যয়নব রদিয়াল্লাহু আন্হাকে সকলে মিলিয়া হযরত (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট পাঠাইলেন। তাঁহাকে হযরত আমার সমান ভালবাসিতেন বলিয়া তিনি দাবি করিতেন। তিনি (হযরত যয়নব) আসিয়াই অপ্রিয় বাক্যে বলিতে আরম্ভ করিলেন- 'আবূ বকরের কন্যা এইরূপ, আবূ বকরের কন্যা ঐরূপ।' আমি চুপ ছিলাম। তৎপর রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) জওয়াব দিবার জন্য আমাকে অনুমতি দিলেন। অনুমতি লাভ করিয়া আমিও ঐ প্রকার অপ্রিয় বাক্যে জওয়াব দিতে লাগিলাম। জওয়াব দিতে আমার মুখ শুষ্ক হইয়া গেল। অনন্তর তিনি (হযরত যয়নব) পরাজিত হইলেন। রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) তখন বলিলেন- “হে যয়নব, তিনিই আবূ বকরের কন্যা।” অর্থাৎ তর্ক-বিতর্কে তুমি তাঁহাকে পরাস্ত করিতে পারিবে না। উল্লিখিত ঘটনা হইতে প্রমাণিত হয় যে, মিথ্যা না হইয়া সত্য হইলে অপ্রিয় কথায় উত্তর দিবার অনুমতি আছে; যেমন- হে নির্বোধ, হে জাহিল, লজ্জা কর, নীরব থাক, প্রভৃতি। এইরূপ বাক্য কটু হইলেও অসত্য নহে। কারণ, কেহই একেবারে নির্বুদ্ধিতা ও অজ্ঞতাশূন্য হইতে পারে না। কিন্তু অশ্লীল কথা যেন রসনা হইতে বাহির না হয় তজ্জন্য ক্রোধের সময় বিশেষ প্রয়োজন হইলে এমন কথা বলিবার অভ্যাস করিবে যাহা নিতান্ত জঘন্য নহে; যেমন হতভাগ্য, অপদার্থ, অসভ্য, গাধা ইত্যাদি।

তবে ঝগড়া-বিবাদকালে উত্তর দিলে ন্যায়ের গণ্ডির ভিতর থাকা নিতান্ত দুষ্কর। এইজন্য উত্তর না দিয়া নীরবতা অবলম্বন করাই উত্তম।


রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) উনার সম্মুখে এক ব্যক্তি হযরত আবূ বকর রদিয়াল্লাহু আনহুকে অপ্রিয় বাক্য বলিতে লাগিল। কিন্তু তিনি নীরব ছিলেন। তিনি অবশেষে উত্তর দিতে আরম্ভ করিলে রাসূলে মাকবুল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) উঠিয়া দাঁড়াইলেন। হযরত আবূ বকর (রদিয়াল্লাহু আনহু) নিবেদন করিলেন- “ওগো আল্লাহর রাসূল, এতক্ষণ ত আপনি বসিয়া ছিলেন, কিন্তু আমি উত্তর দিতে আরম্ভ করিতেই আপনি গাত্রোখান করিলেন?” তিনি বলিলেন-

>“তুমি নীরব থাকা পর্যন্ত ফেরেশতাগণ তোমার পক্ষ হইতে জওয়াব দিতেছিল। (তুমি জওয়াব দিতে আরম্ভ করিলে) শয়তান আগমন করিল। শয়তানের সহিত উপবেশন করাকে আমি ঘৃণা করি।"

রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন- 

>“আল্লাহ্ বিভিন্ন ধাতে মানব সৃষ্টি করিয়াছেন। কতক লোক এরূপ যে, তাহারা বিলম্বে ক্রুদ্ধ হয় ও বিলম্বে শান্ত হয়, কতক লোক ইহার বিপরীত, তাড়াতাড়ি ক্ষুদ্ধ হয় এবং তাড়াতাড়ি শান্ত হয়। তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম যে বিলম্বে ক্ষুদ্ধ হয় এবং তাড়াতাড়ি শান্ত হয়। আর তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি নিকৃষ্ট যে তাড়াতাড়ি ক্রুদ্ধ হয়, কিন্তু বিলম্বে শান্ত হইয়া থাকে।”



পরবর্তী পর্ব

গুপ্ত ক্রোধের আপদ এবং বিদ্বেষজাত মনোভাব

ক্রোধ-উপশমমূলক উপায়



ক্রোধ, বিদ্বেষ ও ঈর্ষা (পর্ব- ৫)
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

ক্রোধ-উপশমমূলক উপায়

ক্রোধের মূল কারণসমূহ উৎপাটনের জন্য উল্লিখিত ব্যবস্থা জোলাপ সদৃশ। উহা অবলম্বনেও ক্রোধের মূলোৎপাটন করিতে না পারিলে ক্রোধ উত্তেজিত হইয়া উঠিলেই তৎক্ষণাত শান্ত করা আবশ্যক। এইজন্য এক প্রকার মবরাম্ল শরবত তাহাকে পান করিতে হইবে। ইহা নম্রতার মাধুর্য ও সহিষ্ণুতার অম্লত্বের মিশ্রণে প্রস্তুত হইয়া থাকে। আর ইলম ও আমলের সহযোগে একই মাজন প্রস্তুত করিলে, ইহা সকল কুস্বভাবের মহৌষধ হইয়া থাকে।


ক্রোধ-প্রতিষেধকরূপে ইলম

ক্রোধের অনিষ্টকারিতা ও ইহা নিবারণের সওয়াব সম্পর্কে কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফের উক্তিসমূহ বুঝিয়া হৃদয়ঙ্গম করিয়া লইবে। ইহাই ক্রোধ প্রতিষেধক জ্ঞানমূলক উপায়। এইরূপ কতিপয় উক্তি উপরে বর্ণিত হইয়াছে। তৎপর ভাবিবে, অন্যের উপর তোমার যতটুকু ক্ষমতা রহিয়াছে, এই তুলনায় তোমার উপর আল্লাহর ক্ষমতা অনন্ত ও অসীম। তুমি ক্রোধে উত্তেজিত হইয়া অপরের কতটুকু ক্ষতি করিতে পারিবে? আল্লাহ্ তোমার ক্ষতি অনায়াসে অতি সহজে করিতে পারেন। অদ্য তুমি কাহারও উপর ক্রুদ্ধ হইলে কিয়ামতের দিন আল্লাহর ক্রোধ হইতে তুমি কিরূপে রক্ষা পাইবে?


একদা রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) এক ভৃত্যকে কোন কাজ উপলক্ষে পাঠাইলেন। ভৃত্য অত্যন্ত বিলম্বে ফিরিয়া আসিলে তিনি তাহাকে বলিলেন 

>“শেষ বিচার দিবস না থাকিলে আমি তোমাকে প্রহার করিতাম।” 

ইহা বলিবার পরই তিনি নিজকে সম্বোধন করিয়া মনে মনে বলিতে লাগিলেন- “তোমার কাজটি যেরূপে সম্পন্ন করা আল্লাহর ইচ্ছা ছিল, ঠিক সেইরূপে সম্পন্ন হইয়াছে; তোমার অভিপ্রায় অনুযায়ী হয় নাই, ইহাই কি তোমার ক্রোধের কারণ? তাহা হইলে ত আল্লাহর প্রভুত্বের বিরুদ্ধে ঝগড়া করা হইল!”


প্রিয় পাঠক, উল্লিখিত পারলৌকিক কারণেও ক্রোধ দমন না হইলে স্বয়ং সাংসারিক যুক্তি অবলম্বনে মনে মনে চিন্তা করিবে; তুমি উত্তেজিত হইলে প্রতিপক্ষও উত্তেজিত হইয়া তোমা হইতে প্রতিশোধ গ্রহণ করিতে পারে। শত্রুকে অবহেলা করা সমীচীন নহে। আরও মনে কর, কোন দাস বা দাসী ঠিকভাবে কর্তব্য পালন করে না, আবার কখন কখনও পলায়ন করে। ক্রোধের বশবর্তী হইয়া তাহাকে তিরস্কার করিলে সে ছলনা ও প্রতারণা করিতে পারে। আর ক্রোধের সময় মানুষ কিরূপ জঘণ্য মূর্তি ধারণ করে, ইহাও একবার স্মরণ কর। তখন তাহার বাহ্য আকার পরিবর্তিত হইয়া কুশ্রী ও কদর্য হইয়া পড়ে। সেই মূর্তি দর্শনে মনে হয় যেন, উত্তেজিত ব্যাঘ্র কোন জন্তুকে আক্রমণের উপক্রম করিয়াছে। ক্রোধের সময় মানুষের বাহ্য আকারে যেরূপ পরিবর্তন দেখা যায়, তাহার আন্তরিক অবস্থারও তদ্রূপ পরিবর্তন ঘটিয়া থাকে। তখন মনে হয় যেন তাহার ভিতরে আগুন জ্বলিতেছে। ক্রোধের সময় সে ক্ষুধিত কুকুরের ন্যায় হইয়া থাকে।

কেহ ক্রোধ দমন করিতে চাহিলে অধিকাংশ সময় শয়তান তাহাকে প্ররোচণা দিয়া বলে- “ক্রোধ দমন করিলে তোমার দুর্বলতা প্রকাশ পাইবে, অপমান হইবে, প্রভাব-প্রতিপত্তি হ্রাস পাইবে এবং লোকচক্ষে তুমি হেয় বলিয়া প্রতিপন্ন হইবে।” তখন শয়তানকে এইরূপ উত্তর দিয়া নিরস্ত করিবে- “নবীগণের (আঃ) সৎস্বভাব অর্জন এবং আল্লাহর সন্তোষ লাভে সমর্থ হইলে যে সম্মানের অধিকারী হওয়া যায়, সংসারে তদপেক্ষা অধিক সম্মানের আর কিছুই হইতে পারে না। কাহারও উপর ক্রুদ্ধ হওয়ার ফলে কল্য কিয়ামতের দিন হেয় ও তুচ্ছ হওয়া অপেক্ষা অদ্য ক্ষণস্থায়ী সংসারে হেয় ও তুচ্ছ হওয়া আমার পক্ষে উত্তম।”


ক্রোধ প্রতিষেধক জ্ঞানমূলক উপায় বর্ণনা করিতে যাইয়া উপরে কতিপয় উপমার অবতারণা করা হইল। তদ্রূপ আরও দৃষ্টান্ত তোমরা নিজে নিজেই বুঝিয়া লইবে। 


ক্রোধ প্রতিষেধক আমল 


ক্রোধের সময় বলিবে

>(আউযুবিল্লাহ্ মিনাশ-শায়তানির রাযিম)

“বিতাড়িত শয়তান হইতে আমি আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করিতেছি।” তুমি দণ্ডায়মান থাকিলে বসিয়া পড়িবে, আর বসিয়া থাকিলে শয়ন করিবে। ইহা সুন্নত। ইহাতেও ক্রোধ দমন না হইলে ঠাণ্ডা পানি দ্বারা ওযু করিবে। কেননা, রাসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন- 

>“ক্রোধ আগুন হইতে জন্মে, পানিতে ইহা দমন হয়।” 

হাদীস শরীফে উক্ত আছে- 

>“(ক্রোধের সময়) কপাল মাটিতে রাখিয়া সিজদা করিবে এবং মনে করিবে যে, তুমি মাটি হইতে সৃষ্ট, আল্লাহর নগণ্য দাস। (মাটি হইতে সৃষ্ট দাসকে মাটির ন্যায় সহিষ্ণু হওয়া আবশ্যক)। এইরূপ দাসের পক্ষে ক্রোধ শোভা পায় না।”


একদা হযরত ওমর রদিয়াল্লাহু আন্হু ক্রুদ্ধ হইলে নাকে দিবার জন্য পানি চাহিয়া বলিলেন- 

>“ক্রোধ শয়তান হইতে আসে, নাকে পানি দিলে চলিয়া যায়।” 


হযরত আবূ যর রদিয়াল্লাহু আন্হু একদা এক ব্যক্তিকে বলিলেন- 

“ইয়া ইব্‌নাল হামরা”। অর্থাৎ হে লোহিত জননীর পুত্র। এইরূপ আহ্বানে ইহাই প্রকাশ পাইল যে, ঐ ব্যক্তি দাসীর পুত্র। তৎপর রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলিলেন- “হে আবূ যর, আমি শুনিলাম, তুমি অদ্য এক ব্যক্তিকে তাহার মাতার সম্বন্ধে উল্লেখ করিয়া দোষারোপ করিয়াছ। হে আবূ যর, জানিয়া রাখ, 

>"পরহেযগারীতে অধিক না হইলে তুমি কোন কৃষ্ণ বা লোহিত মানুষ অপেক্ষা উৎকৃষ্ট নও।” 

হযরত আবূ যর রদিয়াল্লাহু আন্হু ইহা শুনিয়া ক্ষমা প্রার্থনার উদ্দেশ্যে ঐ ব্যক্তির নিকট গমন করিলেন। সেই ব্যক্তি সহাস্য বদনে তাঁহার সম্মুখে আসিয়া সালাম দিলেন।


হযরত আয়েশা রদিয়াল্লাহু আন্হা ক্রুব্ধ হইলে রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) তাঁহার নাসিকা মুবারক ধারণপূর্বক বলিতেন- হে আয়েশা, বল-


اللَّهُم رَبِ النَّبِيِّ مُحَمَّدٍ - اغْفِرْ لِي ذَنْبِي وَأَذْهِبْ غَيْظَ قَلْبِي وَأَجِرْنِي مِنْ مُضَلاتِ الْفِتْنِ

>“হে আল্লাহ, আমার নবী মুহাম্মদের  (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) প্রভু, আমার গোনাহ্ মা'ফ করুন, অন্তরের ক্রোধ দূর করিয়া দিন এবং আমাকে পথ-ভ্রান্তির বিপদাপদ হইতে রক্ষা করুন।” ক্রোধের সময় এই দোয়া পাঠ করাও সুন্নত। 

[এখানে শিক্ষনীয় যে আল্লাহ্ তা'আলাকে মুহম্মদের রব সম্বোধন করা নবী (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)  উনার শিক্ষা ।দোয়ার পূর্বে  যেমন বলা "ইয়া রব্বি মুস্তফা" বিশেষ মর্যাদার উপমা]



অপ্রিয় বাক্য শ্রবণকারীর কর্তব্য

ক্রোধ বিনাশক ব্যবস্থা

 

ক্রোধ, বিদ্বেষ ও ঈর্ষা (পর্ব- ৪)
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
ক্রোধ বিনাশক ব্যবস্থা

ক্রোধ দমনের জন্য ব্যবস্থা অবলম্বন ও সাধনা অবশ্য কর্তব্য। কারণ, ক্রোধেই অধিকাংশ মানুষকে দোযখে লইয়া যায় এবং ইহা হইতেই জগতে অশান্তি, কলহ-বিবাদ ও যুদ্ধ বিগ্রহের সৃষ্টি হয়। ক্রোধ দমনের দুইটি উপায় আছে। 

প্রথম- ক্রোধ বহিষ্কারক উপায়। ইহা জোলাপের মত ক্রোধরূপ ব্যাধির জড় ও মূল অন্তর হইতে বাহির করিয়া দেয়। 

দ্বিতীয়- ক্রোধ উপশমমূলক উপায়। ইহা ‘শিকাবীন' নামক অম্লরস ও মধু বা চিনি মিশ্রিত পানীয় সদৃশ। ইহা ব্যাধির তীব্র দোষসমূহ উপশম করে ও উগ্র স্বভাবকে সাম্যভাবাপন্ন করিয়া তোলে।


ক্রোধ বহিষ্কারক উপায়--

সর্বাগ্রে ক্রোধ সঞ্চারের কারণ নির্ণয় করিবে এবং তৎপর ইহার মূলোচ্ছেদ করিবে। ইহাই ক্রোধ বহিষ্কারক উপায়। পাঁচটি কারণে ক্রোধের সঞ্চার হয়;  যথা : (১) অহঙ্কার, (২) ওজ্ব অর্থাৎ নিজে নিজকে উত্তম ও গুণবান বলিয়া মনে করা, (৩) কৌতুক, (৪) তিরস্কার এবং (৫) ধনলিপ্সা ও প্রভুত্বপ্রিয়তা।


ক্রোধ-বহিষ্কারক উপায়ের প্রথম ধাপ-

অহঙ্কার ক্রোধ সঞ্চারের অন্যতম প্রধান কারণ। অহঙ্কারী ব্যক্তি কথাবার্তা ও কাজকর্মের অপরের নিকট হইতে প্রত্যাশিত সম্মান না পাইলেই ক্রোধে উত্তেজিত হইয়া উঠে। অতএব বিনয়ী ব্যবহারে অহঙ্কার চূর্ণ করিতে হইবে। তোমার হৃদয়ে অহঙ্কার দেখা দিলে চিন্তা করিবে, তুমি আল্লাহর একটি নগণ্য দাসমাত্র; দাসের পক্ষে অহঙ্কার শোভা পায় না। আরও বুঝিবে যে, সৎস্বভাবেই দাসত্ব হইয়া থাকে; অহঙ্কার অসৎস্বভাবের অন্তর্গত। সুতরাং অহঙ্কার দাসত্বের দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন ঘটায়। বিনয় ব্যতীত অন্য কিছুতেই অহঙ্কার বিনাশ করা যায় না।


ক্রোধ-বহিষ্কারক উপায়ের দ্বিতীয় ধাপ--

ক্রোধ সঞ্চারের দ্বিতীয় কারণ খোদপছন্দী বা নিজে নিজকে উত্তম ও গুণবান বলিয়া মনে করা। ইহা বিদূরিত করিতে হইলে স্বীয় পরিচয় লাভ করিবে। অহঙ্কার ও খোদপছন্দী দূর করিবার উপায় যথাস্থানে বণিত হইবে।


ক্রোধ-বহিষ্কারক উপায়ের তৃতীয় ধাপ – 

ক্রোধ সঞ্চারের তৃতীয় কারণ কৌতুক। কাহাকেও কৌতুক করিলে অধিকাংশ সময় সেই ব্যক্তি উত্তেজিত হইয়া উঠে। সুতরাং এইরূপ অপকর্মে সময়ের অপচয় না করিয়া বরং আখিরাতের সম্বল সংগ্রহ কার্যে ও সৎস্বভাব অর্জনে নিজকে ব্যাপৃত রাখিবে এবং কৌতুক হইতে বিরত থাকিবে। কৌতুকের ন্যায় উপহাস, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপেও ক্রোধ জন্মে। তুমি কাহাকেও উপহাস ও ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করিলে সে-ও তোমাকে তদ্রূপ করিবে। এইরূপে তোমার নিজের সম্মান নিজেই নষ্ট করিবে। অতএব এইরূপ কৌতুক, উপহাস ও ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ হইতে নিরস্ত থাকা নিতান্ত আবশ্যক।


ক্রোধ-বহিষ্কারক উপায়ের চতুর্থ ধাপ – 

কাহাকেও তিরস্কার করিলে তিরস্কারকারী ও তিরস্কৃত ব্যক্তি এই উভয়ের হৃদয়েই ক্রোধের উদ্রেক হয়। ইহা হইতে অব্যাহতি লাভের উপায় এই মনে করিবে, নিজে দোষমুক্ত না হইয়া অপরের দোষ ধরিয়া তিরস্কার করা শোভা পায় না। অপরপক্ষে, দোষমুক্ত ব্যক্তিই বা অপরকে তিরস্কার করিয়া নিজেকে কলঙ্কিত করিবে কেন? অতএব তিরস্কার করা কাহারও পক্ষে সঙ্গত নহে।


ক্রোধ বহিষ্কারক উপায়ের পঞ্চম ধাপ — 

যদিও সংসারযাত্রা নির্বাহ করিতে অধিকাংশ স্থলেই মানবের ধন, প্রভুত্ব ও মান-সম্ভ্রমের দরকার হইয়া পড়ে, তথাপি ধন-লিপ্সা ও প্রভুত্বপ্রিয়তাই ক্রোধ উৎপত্তির অন্যতম কারণ। কৃপণের নিকট হইতে এক কপর্দক গ্রহণ করিলেও সে ক্রুদ্ধ হয়, আর অতি লোভীর নিকট হইতে এক গ্রাস অন্ন লইলেও সে ক্রোধে উত্তেজিত হইয়া উঠে। ধনাসক্তি ও প্রভুত্ব কামনা মন্দ স্বভাবের অন্তর্গত এবং ক্রোধের মূল কারণ। ধনাসক্তি ও প্রভুত্ব কামনা দমনের জ্ঞানমূলক ও অনুষ্ঠানমূলক উপায় রহিয়াছে।


জ্ঞানমূলক উপায়— 

ধনাসক্তি ও প্রভুত্ব কামনার আপদ, কদর্যতা এবং ইহ-পরকালে ইহাদের অনিষ্ট সাধন সম্পর্কে সম্যক উপলব্ধি করত ইহাদের প্রতি আন্তরিক ঘৃণার উদ্রেক করিবে।


অনুষ্ঠানমূলক উপায়— 

উক্ত প্রবৃত্তিদ্বয়ের বিরুদ্ধাচরণে প্রবৃত্ত হইবে; ইহারা যে বিষয়ে তোমাকে উত্তেজিত করিতে চেষ্টা করে, ইহা হইতে তুমি বিরত থাকিবে। প্রবৃত্তির বিরুদ্ধাচরণে যে শুধু ধনাসক্তি ও প্রভুত্বপ্রিয়তা নিবৃত্ত হয় তাহাই নহে, বরং ইহা সকল প্রকার কুস্বভাব নিবারণের উপায়। ‘রিয়াযত’ বিষয় বর্ণনাকালে প্রথম অধ্যায়ে ইহার বিস্তৃত আলোচনা হইয়াছে।


ক্রোধান্ধ ব্যক্তির সংসর্গে ক্রোধ সঞ্চার—

মানব অন্তরে ক্রোধ বদ্ধমূল হওয়ার অপর একটি প্রধান কারণ রহিয়াছে। যাহারা ক্রোধকে মহিমা ও বীরত্বের কারণ বলিয়া মনে করে এবং ইহাতে গর্ব অনুভব করে, এইরূপ ক্রোধান্ধ লোকের সংসর্গে যাহারা প্রতিপালিত হয় তাহাদের অন্তরে ক্রোধরূপ ব্যাধি সংক্রামিত হয় এবং পরিশেষে ইহা তাহাদিগকে চির রুগ্ন করিয়া ফেলে। ক্রোধান্ধ ব্যক্তিগণ ক্রোধের মাহাত্ম্য বর্ণনা করিতে যাইয়া বলে- “অমুক সাধু পুরুষ এক কথায় এক ব্যক্তিকে মারিয়া ফেলিয়াছেন, অমুকের জানমাল ধ্বংস করিয়াছেন, কাহার সাধ্য যে, তাঁহার কথার প্রতিবাদ করে। সিংহপুরুষ বটে, যে কেহ তাঁহার রোষে পতিত হইয়াছে সেই ধ্বংস হইয়াছে। সিংহপুরুষ এইরূপই হইয়া থাকেন; কাহাকেও ক্ষমা করিয়া ছাড়িয়া দেওয়াকে তাঁহারা অপমান, অক্ষমতা ও অনুপযুক্ততার কারণ বলিয়া মনে করেন।” ক্রোধান্ধ ব্যক্তিগণের মুখে ক্রোধের এইরূপ প্রশংসাবাদ শ্রবণ করিয়া তাহাদের নব সঙ্গিগণের অন্তরেও পরিশেষে ক্রোধ বদ্ধমূল হইয়া পড়ে।


ক্রোধ কুকুরের স্বভাব। কিন্তু ক্রোধান্ধগণ ইহাকে বীরত্ব ও বাহাদুরির কারণ বলিয়া মনে করে। মানবের প্রশংসনীয় গুণাবলী, যাহা পয়গম্বরগণের স্বভাব, যেমন সহিষ্ণুতা, ধৈর্য, ক্ষমা প্রভৃতিকে তাহার অনুপযুক্ততা ও কাপুরুষতার লক্ষণ বলিয়া থাকে। ইহাই শয়তানের কাজ। সে প্রতারণা দ্বারা প্রশংসনীয় গুণের কুৎস রটনা করত মানুষকে সৎস্বভাব অর্জনে বিরত রাখে এবং জঘণ্য দোষের গুণকীর্তন করত অসৎস্বভাবের দিকে তাহাকে আহ্বান করে। জ্ঞানীগণ জানেন, ক্রোধের সহিত বীরত্বের কোন সম্বন্ধ নাই। তাহা হইলে অবলা নারী, অসহায় শিশু, দুর্বল বৃদ্ধ এবং রুগ্ন ব্যক্তির কখনও ক্রোধের সঞ্চার হইত না। কিন্তু ইহা অবিদিত নহে যে, তাহারা তাড়াতাড়ি উত্তেজিত হইয়া থাকে। ক্রোধ বিজয়ীগণের ন্যায় বীরপুরুষ আর নাই। নবী ও কামিল দরবেশগণই সেই বীরত্বের অধিকারী। পাহলোয়ান, তুর্কী সিপাহীগণ সিংহ-ব্যাঘ্রাদি প্রাণীর হিংস্র বলে বলীয়ান হইলেও ক্রোধ দমন ক্ষেত্রে তাহাদের কোনই বীরত্ব নাই।

প্রিয় পাঠক, এখন ভাবিয়া দেখ, নবী ও দরবেশগণের গুণে ভূষিত হওয়া তোমার পক্ষে গৌরবের বিষয়, না নির্বোধ অজ্ঞদের ন্যায় হওয়া সঙ্গত।



পরবর্তী পর্ব

ক্রোধ-উপশমমূলক উপায়

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...