সোমবার, ২৪ জুলাই, ২০২৩

ঈর্ষার ক্ষতি হইতে অব্যাহতির উপায়


ক্রোধ, বিদ্বেষ ও ঈর্ষা (পর্ব- ১৫
) শেষ পর্ব
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

ঈর্ষার ক্ষতি হইতে অব্যাহতির উপায় 
অশেষ সাধনা দ্বারাও তোমার অন্তর হইতে শত্রু-মিত্রের প্রভেদ জ্ঞান একেবারে বিনাশ করিতে পারিবে না; উভয়ের সম্পদ ও বিপদে তোমার অন্তরে পার্থক্য উপলব্ধি করিবে। তোমার হৃদয়ে স্বাভাবিকভাবেই শত্রুর সম্পদে কিছুটা ভার বোধ হইবে। এই স্বভাবগত মনোভাব পরিবর্তন করা মানব-ক্ষমতার বহির্ভূত। কিন্তু দুইটি কাজ তাহার ক্ষমতাধীন রহিয়াছে; যথা : 

(১) শত্রুর প্রতি স্বাভাবিক বিরক্তি বাক্যে ও কর্মে কখনও প্রকাশ না করা এবং 

(২) জ্ঞান ও বুদ্ধির বিচারে সেই স্বাভাবিক মনোভাবের প্রতি ঘৃণা পোষণ করা। সেই মনোভাব নিতান্ত জঘন্য এবং মন হইতে উহা বিলুপ্ত হউক, একান্তভাবে এই কামনা করা। 

এই দ্বিবিধ কাজ করিতে পারিলে স্বাভাবিক ঈর্ষার মনোভাবের জন্য আল্লাহর বিচারে কেহই দায়ী হইবে না।

কেহ কেহ বলেন- ঈর্ষার ভাব বাক্যে ও কর্মে প্রকাশ না করাই যথেষ্ট। ইহার প্রতি আন্তরিক ঘৃণা পোষণ না করিলেও আল্লাহর বিচারে দায়ী হইবে না। এই অভিমত ঠিক নহে। ঈর্ষার প্রতি ঘৃণা না রাখিলে আল্লাহর বিচারে দায়ী হইতে হইবে। কারণ, ঈর্ষা হারাম। ইহা হৃদয়ের কাজ, দেহের কাজ নহে। কেহ যদি কোন মুসলমানের দুঃখ কামনা করে এবং তাহার আনন্দে দুঃখিত হয়, তবে সে অবশ্যই আল্লাহর বিচারে দায়ী হইবে। কিন্তু সেই ভাবের প্রতি আন্তরিক ঘৃণা পোষণ করত ইহা গুপ্ত রাখিলে সে ঈর্ষার আপদ হইতে অব্যাহতি পাইবে।


উপরে বর্ণিত হইয়াছে, অসীম সাধনায়ও মানব-হৃদয় হইতে শত্রু-মিত্রের প্রভেদ জ্ঞান একেবারে বিলুপ্ত হয় না। কিন্তু তাওহীদভাবে প্রবল হইয়া যাঁহাকে একেবারে তন্ময় করিয়া ফেলিয়াছে, যিনি ইহার প্রভাবে সকল মানুষকে আল্লাহর গোলামরূপে দেখিতে পান এবং সমস্ত ক্রিয়া-কলাপ একমাত্র আল্লাহ্ হইতেই সমাধা হইতে দর্শন করেন, কেবল এইরূপ ব্যক্তিই শত্রু-মিত্রের প্রভেদ জ্ঞান ভুলিয়া যাইতে পারেন। কিন্তু এইরূপ উন্নত মনোভাব নিতান্ত বিরল; বিদ্যুতের ন্যায় চমকিয়া নিমিষেই মিলাইয়া যায়; দীর্ঘকাল স্থায়ী হয় না।


পরিশেষে আল্লাহ্ তা'আলার কাছে এই দোয়া রহিল তিনি যেন আমাদেরকে এই সব বিষয় থেকে বিপদমুক্ত রাখেন। লিখকের (ইমাম গাজ্জালী রহঃ। কষ্টের যথাযত বিনিময় দান করন। আমিন।


(সমাপ্ত)

প্রথম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন


ঈর্ষা পোষণে শয়তানের প্ররোচণা


 
     ক্রোধ, বিদ্বেষ ও ঈর্ষা (পর্ব- ১৪)
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

ঈর্ষা পোষণে শয়তানের প্ররোচণা
উল্লিখিত আয়াতের নির্দেশ অনুযায়ী সদ্ব্যবহারে শত্রুতা বিনাশের চেষ্টা করিলে শয়তান নানাপ্রকার প্ররোচণা দিতে থাকিবে। সে বলিবে- “শত্রুর সহিত নম্র ব্যবহার এবং তাহার প্রশংসা করিলে সে তোমাকে দুর্বল মনে করিবে।” আল্লাহর আদেশ তুমি শ্রবণ করিলে এবং শয়তানের প্রতারণা সম্পর্কেও তোমাকে জানাইয়া দেওয়া হইল। এখন তোমার স্বাধীন ক্ষমতা অনুসারে তুমি যাহা ইচ্ছা তাহাই করিতে পার।

উপরে যে ঔষধের ব্যবস্থা দেওয়া হইল উহা নিতান্ত প্রয়োজনীয় ও উপকারী; কিন্তু খুব তিক্ত। ব্যক্তি বুঝিতে পারিয়াছে যে, তাহার ইহলৌকিক ও পারলৌকিক মঙ্গল ইহাতেই নিহিত রহিয়াছে এবং ঈর্ষাই ইহলৌকিক ও পারলৌকিক শান্তি ধ্বংসের মূল, সেই ব্যক্তিই এইরূপ তিক্ততা সহ্য করিতে সমর্থ হয়। তিক্ততা ও কষ্ট সহ্য করিতে হয় না, এমন ঔষধ নাই। অতএব সুমিষ্ট ঔষধের আশা পরিত্যাগ করত তিক্ত ঔষধই সেবন করিতে হইবে; অন্যথায় ক্রমান্বয়ে রোগ বৃদ্ধি পাইয়া অবশেষে ততোধিক কষ্টে জীবন ধ্বংস করিবে।


পরবর্তী পর্ব

ঈর্ষার ক্ষতি হইতে অব্যাহতির উপায় 

ঈর্ষা দমনের উপায়


 
    ক্রোধ, বিদ্বেষ ও ঈর্ষা (পর্ব- ১৩)
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
ঈর্ষা দমনের উপায়
ঈর্ষা অন্তরের কঠিন ব্যাধি। ইহার জ্ঞানমূলক ও অনুষ্ঠানমূলক ঔষধ রহিয়াছে।
জ্ঞানমূলক ঔষধ
ঈর্ষার অপকারিতা উপলব্ধি করা। ঈর্ষার ফলে ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তির ইহ-পরকালের ক্ষতি হইয়া থাকে; কিন্তু বিদ্বেষভাজন ব্যক্তির কোনই ক্ষতি হয় না, বরং ইহ-পরকালের তাহার লাভ হইয়া থাকে।

ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তির ক্ষতি
আল্লাহ্ বিধানে মানবের উপর অহরহ নিআমত বৰ্ষিত হইতেছে। কিন্তু ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি অপরের সম্পদ দেখিয়া সর্বদা মনঃকষ্টে ও দুঃখে জ্বলিয়া-পুড়িয়া মরিতে থাকে। সে স্বীয় শত্রুকে যেরূপ দুঃখ ও মনঃকষ্টে জর্জরিত দেখিতে চাহিয়াছিল সে নিজেই তদ্রুপ দুঃখ যন্ত্রণায় কালাতিপাত করে।
ঈর্ষার যন্ত্রণার ন্যায় আর কোন যন্ত্রণাই নাই। অতএব অপরের অমঙ্গল কামনায় নিজকে দুঃখে ও মনস্তাপে জর্জরিত করা অপেক্ষা নির্বোধের কাজ আর কি হইতে পারে? অপরের ঈর্ষাতে বিদ্বেষভাজন ব্যক্তির কোনই ক্ষতি হয় না। কারণ, আল্লাহ্ যাহার অদৃষ্টে যে-সম্পদ বিধিবদ্ধ করিয়াছেন, ইহা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অপরিবর্তিত থাকিবে, পরিমাণে ইহার হ্রাস-বৃদ্ধি ও সময়ের দিকে আর অগ্র-পশ্চাৎ কিছুই সংঘটিত হইবে না। কেননা, সৃষ্টির প্রারম্ভে যে অদৃষ্টলিপি বিধিবদ্ধ হইয়াছে তদনুসারেই মানুষ সম্পদপ্রাপ্ত হইয়া থাকে। কেহ কেহ ইহা বুঝিতে অক্ষম হইয়া সম্পদ লাভের কারণস্বরূপ শুভলক্ষণ ও নক্ষত্ররাজির উল্লেখ করিয়া থাকে, কিন্তু সকলেই একবাক্যে স্বীকার করিয়াছে যে, অদৃষ্ট অপরিবর্তনশীল।

একজন নবী (আঃ) এক সম্রাজ্ঞীর শাসন-উৎপীড়নে অসহ্য হইয়া তাহার বিরুদ্ধে আল্লাহর নিকট অভিযোগ জানাইলেন। ইহার উত্তরে ওহী অবতীর্ণ হইল  “অদৃষ্টলিপি পরিবর্তিত হইবে না। এই সম্রাজ্ঞীর রাজত্বকাল আরও বাকী আছে; তুমি ইচ্ছা করিলে অন্যত্র চলিয়া যাইতে পার।” 

অপর একজন নবী (আঃ) বিপদাপদে জর্জরিত হইয়া উহা মোচনের জন্য আল্লাহর নিকট বহু প্রার্থনা ও রোদন করিলেন। তৎপর এই মর্মে ওহী অবতীর্ণ হইল 
>“যে দিবস আমি যমীনের সহিত আসমানের সামঞ্জস্য বিধান করিয়াছি, সেই দিবস উহাও তোমার অদৃষ্টে বিধিবদ্ধ হইয়াছে। তোমার জন্য পূর্ব বিধান রহিত করিয়া আবার নতুন বিধান লিপিবদ্ধ করিতে বল কি?”

ফলকথা এই, ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তির ইচ্ছার প্রভাবেই বিদ্বেষভাজন ব্যক্তির সম্পদ বিদূরিত হয় না। তাহা হইলে ইহার ক্ষতি প্রকারান্তরে ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তির উপরই আবার ঘুরিয়া আসিবে এবং তাহার স্বীয় সম্পদও বিলুপ্ত হইবে। যেমন মনে কর, তুমি কাহারও সম্পদ দেখিয়া ঈর্ষা করিলে এবং ইহাতে তাহার সম্পদ নষ্ট হইল, এখন তোমার সম্পদ দর্শনেও ত অপর কেহ ঈর্ষা করিতে পারে? এমতাবস্থায়, তোমার সম্পদও বিলুপ্ত হওয়া উচিত। আবার দেখ, ঈর্ষাতে বিদ্বিষ্ট ব্যক্তির অনিষ্ট হইলে কাফিরদের ঈর্ষার ফলে মুসলমানগণ ঈমানরূপ পারলৌকিক অমূল্য সম্পদ হইতে বঞ্চিত হইত। কিন্তু ইহা হয় নাই। কাফিরদের কামনা সম্বন্ধে আল্লাহ্ বলেন-
>“আহলে কিতাবের কেহ কেহ তোমাদিগকে বিপথগামী করিয়া দিতে অন্তরের সহিত কামনা করে।” (সূরা আল ইমরান, রুকূ ৭. পারা ৩)।

ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তির ইহজগতে ভীষণ মনঃকষ্ট এবং পরজগতে ভয়ানক ক্ষতি হইয়া থাকে। আল্লাহ্ তাঁহার মঙ্গলময় বিধানে যাহা উত্তম বিবেচনা করিতেছেন তাহাই পূর্ণ কৌশলের সহিত সম্পন্ন করিতেছেন। বিশ্ব-কারখানায় তাঁহার যে কৌশল জীবন্তভাবে প্রচলিত থাকিয়া অহরহ কাজ করিয়া যাইতেছে, তিনি ভিন্ন উহার গুপ্ত রহস্য বুঝিবার ক্ষমতা আর কাহারও নাই। কিন্তু ঈর্ষী ব্যক্তি এই মঙ্গলজনক বিধানের প্রতি অসন্তুষ্ট এবং তাঁহার বন্টন-নীতিও সে মানিয়া লইতে পারে না। সুতরাং এই অসন্তুষ্টি ও অসম্মতির দরুণ আগুন তাহার হৃদয়ে সর্বদা জ্বলিতে থাকে। তাওহীদের আমানতে মুমিনকে সম্মানিত করা হইয়াছে। এমতাবস্থায়, আল্লাহ্ বিধানের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করা অপেক্ষা অধিক খিয়ানত এই আমানতে আর কি হইতে পারে? 
শয়তান মুসলমানের চিরশত্রু, মুসলমানের অমঙ্গল কামনাই তাহার একমাত্র কাজ। ঈর্ষার বশবর্তী হইয়া এক মুসলমান অপর মুসলমানের অমঙ্গল করিলে সে শয়তানের কাজে শরীক হইল। মুসলমানের পক্ষে ইহা অপেক্ষা দুর্ভাগ্যের বিষয় আর কি হইতে পারে?
ঈর্ষী ব্যক্তি দুঃখকষ্টে নিপতিত থাকুক, বিদ্বেষভাজন ব্যক্তি ইহা কামনা করিতে পারে। ঈর্ষার ন্যায় কষ্টদায়ক আর কিছুই নাই। সুতরাং ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি সর্বদা মানসিক যন্ত্রণা ও কষ্ট ভোগ করে বলিয়া তাহার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হইল। ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি একাধারে যালিম ও মযলুম, বরং তাহার ন্যায় মযলুম আর কেহই নাই। বিদ্বেষভাজন ব্যক্তির দিক হইতে বিবেচনা করিলে সে যালিম; আর সেই ঈর্ষার ফলে সে নিজেই দুঃখকষ্টে জর্জরিত হয় বলিয়া সে মযলুম। ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তির মৃত্যুর সংবাদে বা সে ঈর্ষা হইতে মুক্তি পাইয়াছে জানিলে বিদ্বেষভাজন ব্যক্তি দুঃখিত হইয়া থাকে। কারণ, সম্পদে অপরে তাহাকে ঈর্ষা করুক এবং ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি দুঃখকষ্টে নিপীড়িত হউক, ইহাই সে কামনা করিয়া থাকে।
বিদ্বেষভাজন ব্যক্তির পারলৌকিক লাভের দিকে লক্ষ্য কর। সে ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি দ্বারা অত্যাচারিত। ঈর্ষার বশীভূত হইয়া কেহ কাহারও নিন্দা করিলে, অপ্রিয় কথা বলিলে এবং কাজ-কারবারের কোন ক্ষতি করিলে ঈর্ষী ব্যক্তির আমলনামা হইতে সওয়াব লইয়া বিদ্বেষভাজন ব্যক্তিকে প্রদান করা হইবে। আর তাহার সওয়াব না থাকিলে বিদ্বেষভাজন ব্যক্তির পাপ ঈর্ষী ব্যক্তির স্কন্ধে চাপানো হইবে। ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি বিদ্বেষভাজন ব্যক্তির পার্থিব সম্পদের বিলোপ কামনা করে। কিন্তু ইহাতে তাহার সম্পদ বিলোপ হয় না, বরং তাহার পারলৌকিক সম্পদ বৃদ্ধি পাইয়া থাকে। অপরপক্ষে, ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি ঈর্ষার দরুণ ইহকালে ভীষণ যন্ত্রণা ও কষ্টভোগ করে, আর পারলৌকিক আযাবের উপকরণস্বরূপ তাহার পাপরাশি পুঞ্জীভূত হইতে থাকে। ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি নিজকে স্বীয় বন্ধু ও বিদ্বেষভাজন ব্যক্তির শত্রু বলিয়া মনে করে, কিন্তু বাস্তবপক্ষে সে স্বীয় শত্রু এবং বিদ্বেষভাজন ব্যক্তির বন্ধু। কেননা, ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি ইহলোকে নিজেকে দুঃখকষ্টে জর্জরিত করিয়া রাখে এবং পরলোকে তাহাকে কঠিন শাস্তির উপযোগী করিয়া তোলে। আলিম ও পরহেযগার ধনবানগণ সৎকর্মে ধন ব্যয় করিতেছে দেখিয়া কেহ তাহাদিগকে আন্তরিক ভালবাসিলে সে স্বয়ং গুণী ও সৎকর্মী না হইলেও সওয়াব পাইবে। কিন্তু মানবের পরম শত্রু শয়তান ইহা সহ্য  করিবে কিরূপে? অতএব, সে লোককে ঈর্ষার বশীভূত করিয়া তাহার সওয়াব নষ্ট করত পরম আনন্দ লাভ করিয়া থাকে। 
আলিম ও দীনদার সৎকর্মী লোকদিগকে ভালবাসা সওয়াব লাভের সহজ উপায়। যে ব্যক্তি তাহাদিগকে ভালবাসিবে কিয়ামতের দিন সে তাহাদের সঙ্গেই অবস্থান করিবে। বুযুর্গগণ বলিয়াছেন- যে ব্যক্তি নিজে আলিম বা ইলম শিক্ষার্থী অথবা আলিম ও ইলম শিক্ষার্থীদিগকে ভালবাসে, সেই সওয়াবের অধিকারী; কিন্তু ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি সওয়াব লাভের এই ত্রিবিধ উপায় হইতেই বঞ্চিত।

ঈর্ষাপরায়ণ লোকের অবস্থা নিতান্ত নির্বোধ ব্যক্তিসদৃশ। 
মনে কর, এক নির্বোধ অপরের প্রতি প্রস্তর নিক্ষেপ করিতে লাগিল। কিন্তু প্রস্তর বিদ্বেষভাজন ব্যক্তির দেহে না লাগিয়া ঘুরিয়া আসিয়া নিক্ষেপকারীর ডান চক্ষুর উপর পতিত হইল এবং তাহার একটি চক্ষু নষ্ট হইয়া গেল। ইহাতে সেই ব্যক্তি ক্রুদ্ধ হইয়া আবার খুব জোরে প্রস্তর নিক্ষেপ করিল। এবারও প্রস্তরটি ফিরিয়া আসিয়া তাহার অপর চক্ষু নষ্ট করিয়া দিল। সে আবার ততোধিক জোরে প্রস্তর নিক্ষেপ করিল, ইহা ফিরিয়া আসিয়া তাহার মস্তক ভাঙ্গিয়া ফেলিল। এইরূপে বারবার প্রস্তর নিক্ষেপ করিতে করিতে সেই ব্যক্তি স্বীয় দেহ ক্ষত-বিক্ষত করিল। বিদ্বেষভাজন ব্যক্তি অক্ষত দেহে নিরাপদে থাকিয়া প্রস্তর নিক্ষেপকারীর দুরাবস্থা দর্শনে হাসিতে লাগিল। ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তিরও ঠিক এইরূপ দুরাবস্থা ঘটিকা থাকে। শয়তান তাহার এই দুর্গতি দেখিয়া উপহাস করিতে থাকে।
ঈর্ষা হইতে উল্লিখিত আপদসমূহ দেখা দেয়। তদুপরি ঈর্ষার বশবর্তী হইয়া কেহ অপরের নিন্দা করিলে, মিথ্যা বলিলে বা সত্য কথা অস্বীকার করিলে, তাহার উপর বিদ্বেষভাজন ব্যক্তির দাবী অধিকতর বৃদ্ধি পাইবে এবং মহাবিচারের দিনে তাহার আমলনামা হইতে সেই পরিমাণে সওয়াব বিদ্বেষভাজন ব্যক্তিকে দেওয়া হইবে। অতএব ঈর্ষার যে সকল ক্ষতির কথা উল্লেখ করা হইল উহা ভালরূপে হৃদয়ঙ্গম করিয়া লইতে পারিলে বুদ্ধিমান মানুষ হলাহল বিবেচনায় ইহা পরিত্যাগ করিতে বাধ্য হইবে। এই সকল বোধকেই ঈর্ষা ব্যাধির জ্ঞানমূলক ঔষধ বলে।

ঈর্ষাপরায়ণ লোকের অনুষ্ঠানমূলক ঔষধ
কঠোর পরিশ্রম ও চেষ্টায় মন হইতে ঈর্ষার কারণগুলি বাহির করিতে হইবে। ক্রোধের বর্ণনাকালে বলা হইয়াছে, অহঙ্কার, ওজ্ব অর্থাৎ নিজেকে নিজে ভাল মনে করা, শত্রুতা, প্রভুত্ব ও সম্মান কামনা, ধনলিপ্সা ইত্যাদি ঈর্ষার মূল কারণ। অতএব, এই কুপ্রবৃত্তিসমূহ হৃদয় হইতে উৎপাটন করিয়া ফেলিবে। এই প্রকার কার্যকে জোলাপ বা বহিষ্কারক ঔষধ বলে। ইহা ব্যবহারের মাধ্যমে ঈর্ষার মূলসমূহ উৎপাটন করিয়া ফেলিলে মনে ঈর্ষা স্থান পাইবে না। অন্তরে ঈর্ষার ভাব উদ্ভব হইলে বিরুদ্ধাচরণে ইহার প্রতিরোধ করিবে। ইহা কাহাকেও তিরস্কার করিতে বলিলে তাহার প্রশংসা করিবে, অহঙ্কার করিতে আদেশ করিলে নম্রতা দেখাইবে, কাহারও সম্পদ বিনাশের চেষ্টায় তৎপর হইতে বলিলে বা কাহারও সঙ্গে শত্রুতা করিবার উস্কানি দিলে বন্ধুভাবে তাহার সাহায্য করিবে।
অগোচরে বিদ্বেষভাজন ব্যক্তির প্রশংসা কীর্তন ও তাহার কার্যে সহায়তা তুল্য উপকারী ঈর্ষার প্রতিষেধক আর কিছুই নাই। এইরূপে অসাক্ষাতে কাহারও প্রশংসা ও সাহায্য করিলে সেই ব্যক্তির অন্তর আনন্দে পুলকিত হইয়া উঠিবে। সেই আনন্দের ছায়া তোমার অন্তরে যাইয়া পড়িবে এবং ইহাতে তোমার হৃদয়ও আনন্দে উদ্ভাসিত হইয়া উঠিবে। তাহা হইলে ঈর্ষা আর কখনও অন্তরে জাগিবে না এবং শত্রুতাও তিরোহিত হইবে; যেমন আল্লাহ্ বলেন :
>“তুমি পাপকে সেই স্বভাব দ্বারা দূর কর যাহা অতি উত্তম। (এইরূপ করিলে) পরে তোমার ও যাহার (যে ব্যক্তির) মধ্যে শত্রুতা আছে, অকস্মাৎ যেন সে (তোমার) অন্তরঙ্গ বন্ধু হইয়া যাইবে।” (সূরা হামীম সিজদা, রুকু ৫, পারা ২৪)।


পরবর্তী পর্ব

ঈর্ষা পোষণে শয়তানের প্ররোচণা

ঈর্ষার পরিচয়


 
   ক্রোধ, বিদ্বেষ ও ঈর্ষা (পর্ব- ১২)
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

ঈর্ষার পরিচয় 
অপরের সুখ-সম্পদ দর্শনে অসন্তুষ্ট হইয়া মনে কষ্ট অনুভব করা এবং তাহার সেই সুখ-সম্পদ দূর হওয়ার কামনাকে ঈর্ষা বলে। ঈর্ষা হারাম। হাদীসের বিভিন্ন উক্তি, আল্লাহর কার্য ও বিধানের প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তির অসন্তোষ প্রকাশ এবং অপরের সুখ-সম্পদে তাহার ঈর্ষা উদ্রেকের জঘন্য ও ক্ষতিকর মনোভাব ঈর্ষা হারাম হওয়ার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। যে সম্পদ তুমি লাভ করিতে পার নাই, অপরের ভাগ্যে ঘটিয়াছে দেখিয়া তাহা লোপ হউক, তোমার এই মনোভাবকে জঘন্য ও কদর্য ব্যতীত আর কী বলা যাইতে পারে?
📚


পারলৌকিক কার্যে প্রতিযোগিতা মঙ্গলজনক 

অপরের সম্পদ লাভে যদি তুমি অসন্তুষ্ট না হও এবং ইহা নষ্ট হওয়ার কামনাও না কর, অথচ তুমি সেইরূপ সম্পদ পাইতে চাও, তবে তোমার এই প্রকার মনোভাবকে গিত্তা (প্রতিদ্বন্দ্বিতা) এবং মুনাফাসা (প্রতিযোগিতা) বলে। পারলৌকিক কার্যে উহা উত্তম, বরং অবশ্য কর্তব্য। আল্লাহ্ বলেন :

>“আর লালসাকারিগণের পক্ষে এইরূপ জিনিসের প্রতি লালসা করা উচিত।” 

আল্লাহ্ অন্যত্র বলেন :

>“তোমরা আপন প্রভুর ক্ষমার দিকে ধাবিত হও।” 

অর্থাৎ “দৌড়িয়া চল, একজন অপরজন অপেক্ষা অগ্রসর হইতে চেষ্টা কর।”


রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন- 

>“দুইটি স্থলে ঈর্ষা হইয়া থাকে। প্রথম- আল্লাহ্ কোন ব্যক্তিকে ধন ও জ্ঞান উভয়ই দান করিয়াছেন, সে স্বীয় ধন জ্ঞান অনুসারে সদ্ব্যবহার করে; অপর ব্যক্তিকে তিনি ধন ব্যতীত শুধু জ্ঞান দান করিয়াছেন, তেমন ব্যক্তি যদি সেই ব্যক্তিকে দেখিয়া বলে- “আল্লাহ্ আমাকেও ধন দান করিলে আমিও তাহার ন্যায় (সৎকার্যে) ব্যয় করিতাম” তাহা হইলে এই দুই ব্যক্তিই সমান সওয়াব পাইবে। আর কেহ যদি পাপকার্যে ধন অপচয় করে এবং অপর ব্যক্তি (ইহা দেখিয়া) বলে- 'আমার ধন থাকিলে আমিও তদ্রূপ (পাপ কার্যে) অপচয় করিতাম', তাহা হইলে এই দুই ব্যক্তিই সমান পাপী হইবে।” 

এই হাদীসে প্রথমোক্ত স্থলে প্রথম ব্যক্তির ধন-দৌলতের সমান দ্বিতীয় ব্যক্তির ধন লাভের ইচ্ছাকে ‘মুনাফাসাত' না বলিয়া ‘হাসাদই' বলা হইয়াছে। কিন্তু ইহাতে প্রথম ব্যক্তির ধন-দৌলত লাভে দ্বিতীয় ব্যক্তির মনে বিরক্তি, অসন্তোষ ও সেই ধন বিলুপ্তির কামনা নাই।বিরক্তি কোন স্থলেই জায়েয নহে।


কুকর্ম সহায়ক সম্পদের বিনাশ-কামনা সঙ্গত 

কাহারও সম্পদ বিলোপের কামনা সঙ্গত নহে; কিন্তু যে সম্পদ দুরাচার ও অত্যাচারীর হস্তগত হইলে তাহাদের অপকর্ম ও অত্যাচারের কারণ হয়, উহার বিলোপ কামনা জায়েয। বাস্তবপক্ষে, ইহা সম্পদ বিলোপের কামনা নহে, বরং অপকর্ম ও অত্যাচারের প্রতিরোধ কামনামাত্র। কিন্তু দুরাচার ও অত্যাচারীর সম্পদ বিনাশের কামনা বাস্তবপক্ষে তাহাদের অপকর্ম ও অত্যাচার প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে হইল কিনা ইহা বুঝিবার উপায় এই— তাহারা তওবা করিয়া অপকর্ম ও অত্যাচার হইতে নিরস্ত হইলে তাহাদের সম্পদ বিলোপের কামনা তোমাদের অন্তরে যদি না থাকে, তবে মনে করিবে, ইহা পাপকর্ম প্রতিরোধের জন্যই ছিল। কিন্তু তখনও তোমাদের অন্তরে তাহাদের সম্পদ বিলোপের কামনা থাকিলে বুঝিবে, ইহা ঈর্ষা ব্যতীত আর কিছুই নহে।

সম্পদের অসমতায় ঈর্ষার উৎপত্তি

এ স্থলে একটি সুক্ষ্ম বিষয় বর্ণনা করা হইতেছে। মনে কর, আল্লাহ্ কাহাকেও কোন বিশেষ সম্পদ দান করিলেন। অপর ব্যক্তিও এইরূপ সম্পদের জন্য লালায়িত হইল, কিন্তু কিছুতেই সে ইহা লাভ করিতে পারিল না। এমতাবস্থায়, সম্পদের অসমতা দেখিয়াই তাহার মন বিরক্ত হইয়া উঠিল। তখন সম্পদশালীর সম্পদ বিনাশ হইয়া অসমতা বিদূরীত হইলে তাহার মনঃকষ্ট দূর হইতে পারে। অপরের সম্পদ দেখিলেই মানব মনে ইহার অভিলাষ হয়। কিন্তু ইহা অর্জনে অসমর্থ হইয়া অপরের সম্পদ বিনাশের কামনা করাই ক্ষতিকর বলা চলে না। কিন্তু এইরূপ সম্পদ প্রত্যাশী ব্যক্তি সম্পদশালীর বিষয়ে অবাধ ক্ষমতা পাইলেও সে ইহা বিনাশ না করিলে বা ছিনাইয়া না লইলে মনে করিবে, তাহার হৃদয়ে ঈর্ষা নাই। এমতাবস্থায়, অপরের সমান সম্পদ লাভের কামনা অন্তরে থাকিলেই সে আল্লাহর বিচারে দায়ী হইবে না।



পরবর্তী পর্ব

ঈর্ষা দমনের উপায়

রবিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৩

ঈর্ষা ও ইহার আপদ

    

ক্রোধ, বিদ্বেষ ও ঈর্ষা (পর্ব- ১১)
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

ঈর্ষা ও ইহার আপদ 
ক্রোধ হইতে বিদ্বেষ এবং বিদ্বেষ হইতে ঈর্ষা জন্মে। ঈর্ষা নিতান্ত অনিষ্টকর দোষসমূহের অন্যতম।

রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন- 

>“আগুন যেমন শুষ্ক কাষ্ঠ জ্বালাইয়া দেয়, ঈর্ষাও তদ্রূপ নেকীসমূহ ধ্বংস করিয়া ফেলে।” 

তিনি আরও বলেন “কেহই তিনটি বিষয় হইতে মুক্ত হইতে পারে না; (উহা এই) (১) বদগুমান (কুধারণা), (২) ঈর্ষা ও (৩) মন্দ ফাল (অর্থাৎ শুভাশুভ লক্ষণ-বিচার, যেমন শূণ্য কলসী, শিয়াল-কুকুরের ডাক, হাঁচি, টিকটিকি প্রভৃতিকে কুলক্ষণ বলিয়া গণ্য করা)। আমি তোমাদিগকে উহার প্রতিষেধক জানাইয়া দিতেছি; (তোমাদের মনে কাহারও সম্বন্ধে) বদগুমান হইলে মনে মনে ইহার সত্যতা অনুসন্ধানে লিপ্ত হইও না এবং অন্তরে ইহা পুষিয়া রাখিও না। মন্দ ফাল দেখিলে বিশ্বাস করিও না। ঈর্ষার উদ্রেক হইলে ইহার বশীভূত হইয়া হস্ত ও রসনা সঞ্চালন করিও না।” 

তিনি আরও বলেন 

>“হে মুসলমানগণ, যে বস্তু তোমাদের অগ্রগামী বহু জাতিকে ধ্বংস করিয়াছে, তাহা তোমাদের মধ্যে উৎপত্তি হইতে আরম্ভ করিয়াছে। উহা ঈর্ষা ও শত্রুতা। যে আল্লাহর হাতে মুহাম্মদের (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)  প্রাণ, তাঁহার শপথ, ঈমানদার না হওয়া পর্যন্ত তোমরা বেহেশতে যাইতে পারিবে না; আর তোমরা যে পর্যন্ত পরস্পরকে ভালবাসিবে না সেই পর্যন্ত তোমরা ঈমানদার হইতে পারিবে না। আর ভালবাসা কি উপায়ে লাভ করা যায়, তোমাদিগকে জানাইয়া দিতেছি- তোমরা পরস্পরকে প্রকাশ্যে সালাম দিতে থাক।”


হযরত মূসা আলায়হিস্ সালাম এক ব্যক্তিকে আরশের ছায়াতলে দেখিয়া মনে করিলেন যে, তিনি আল্লাহর নিকট উচ্চ মরতবার অধিকারী। তাঁহার সেই মরতবা লাভের ইচ্ছা হইলে তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন- “হে খোদা, এই ব্যক্তি কে এবং তাঁহার নাম কি?” আল্লাহ্ তাঁহার নাম ব্যক্ত না করিয়া তাঁহার কার্যকলাপের সংবাদ দিয়া বলিলেন- 

>“এই ব্যক্তি কখনও ঈর্ষা করে নাই, মাতাপিতার নাফরমানি করে নাই এবং একের কথা অপরের কানে লাগায় নাই।” 


হযরত যাকারিয়্যা আলায়হিস্ সালাম বলেন যে, আল্লাহ্ বলেন- 

>“ঈর্ষী ব্যক্তি আমার নিআমতের শত্রু এবং আমার বিধানের উপর বিরক্ত ও আমার বান্দাগণের মধ্যে আমি যেভাবে (আমার নিআমত) বন্টন করিয়া দিয়াছি, সে উহা পছন্দ করে না।”


রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন- 

>“ছয় প্রকার পাপের ফলে ছয় শ্রেণীর লোক বিনা বিচারে দোযখে যাইবে; (তাহা এই) 

(১) শাসনকর্তা অত্যাচারের জন্য; 

(২) আরববাসী- অন্যায় পক্ষপাতিত্বের জন্য; 

(৩) ধনবান ব্যক্তি অহঙ্কারের জন্য; 

(৪) বণিক- খিয়ানত অর্থাৎ বিশ্বাসঘাতকতা ও আত্মসাতের জন্য; 

(৫) গ্রাম্য গঁওয়ার লোক- অজ্ঞানতা ও মূর্খতার জন্য এবং 

(৬) আলিম ব্যক্তি ঈর্ষার জন্য।” 


হযরত আনাস রদিয়াল্লাহু আন্হু বলেন- “একদা আমরা রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) উনার নিকট উপবিষ্ট ছিলাম। তিনি বলিলেন 

>"বেহেশতী লোকদের অন্তর্ভুক্ত একজন এখন আসিতেছে।" আসার সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত এক ব্যক্তি তখন আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তাঁহার বাম হস্তে পাদুকা ঝুলিতেছিল এবং তাঁহার দাঁড়ি হইতে ফোঁটা-ফোঁটা ওযুর পানি পড়িতেছিল। দ্বিতীয় দিনও হযরত (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) এই কথাই বলিলেন, আর ঐ ব্যক্তিই আসিয়া উপস্থিত হইলেন। ক্রমাগত তিন দিবস এরূপ ঘটনাই ঘটিল। হযরত আবদুল্লাহ ইব্‌ন আমর ইবন আস সেই আনসারীর কার্য-কলাপ কিরূপ, জানিবার জন্য কৌতূহলী হইলেন। তিনি তাঁহার গৃহে যাইয়া বলিলেন— ‘আমি আমার পিতার সহিত ঝগড়া করিয়াছি। আপনার গৃহে তিন রাত্রি থাকিতে ইচ্ছা করি।' তিনি বলিলেন- 'আচ্ছা বেশ, তিনি (হযরত আবদুল্লাহ) ক্রমাগত তিন রজনী তাঁহার সংসর্গে অবস্থান করত তাঁহার ক্রিয়া-কলাপ লক্ষ্য করিলেন। যখনই তাঁহার নিদ্রা ভঙ্গ হইত তখনই তিনি আল্লাহর যিকির করিতেন; এতদভিন্ন তাঁহার অন্য কোন বিশেষ আমল (কাজ) তিনি দেখিতে পাইলেন না। তখন তিনি (হযরত আবদুল্লাহ্) বলিলেন- 'আমি স্বীয় পিতার সহিত ঝগড়া করি নাই; কিন্তু রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) আপনার সম্বন্ধে এইরূপ বলিলেন (সুসংবাদ দিলেন), এইজন্য আপনার ক্রিয়া-কলাপ জানিতে আসিয়াছিলাম।' তিনি (আনসারী) বলিলেন- 'আপনি যাহা দেখিলেন তদ্ব্যাতীত আমার আর কোন কার্য-কলাপ নাই।' হযরত আবদুল্লাহ (রঃ) চলিয়া যাইতে লাগিলে তাঁহাকে ডাকিয়া তিনি (আনসারী) বলিলেন- 'আরও একটি কথা আছে, আমি কাহারও সৌভাগ্যে ঈর্ষা করি নাই।' তিনি (হযরত আবদুল্লাহ) বলিলেন- 'তজ্জন্যই আপনার এই মরতবা।”


হযরত আওন ইব্‌ন আবদুল্লাহ (রঃ) এক বাদশাহকে উপদেশ প্রদান করিয়া বলিলেন— 

>“কখনও অহঙ্কার করিও না, কারণ অহঙ্কারেই সর্বপ্রথম পাপ হইয়াছিল; অহঙ্কারের জন্যই শয়তান হযরত আদম আলায়হিস সালামকে সিজদা করে নাই। লোভ হইতে দূরে থাক; কেননা, লোভই হযরত আদম আলায়হিস সালামকে বেহেশত হইতে বাহির করিয়াছিল। কখনও ঈর্ষা করিও না; কারণ ঈর্ষার জন্যই সর্বপ্রথম খুন হইয়াছিল; ইহারই প্রভাবে হযরত আদম আলায়হিস সালামের পুত্র স্বীয় ভ্রাতাকে বধ করিয়াছিল। আর হযরত সাহাবা রদিয়াল্লাহু আনহুমের জীবন-চরিত্র আলোচনা, আল্লাহ্ প্রশংসাবলী বর্ণনা বা নক্ষত্ররাজির প্রসঙ্গ হইলে নীরবে শ্রবণ কর, কথা বলিও না।”

হযরত বকর ইব্‌ন আবদুল্লাহ (রহঃ) বলেন- “এক ব্যক্তি প্রত্যেকদিন এক বাদশার সম্মুখে দণ্ডায়মান হইয়া বলিত- ‘সাধু ব্যক্তির সঙ্গে সদ্ব্যবহার কর, দুর্বৃত্তকে তাহার কার্যফলের উপর ছাড়িয়া দাও। কারণ, তাহার কু-কর্মই তাহাকে যথাযোগ্য শাস্তি প্রদান করিবে।' এই নীতিবাক্যের জন্য বাদশাহ তাহাকে ভালবাসিতেন। এক ব্যক্তি তৎপ্রতি ঈর্ষান্বিত হইয়া বাদশাহকে জানাইল- 'ইহার প্রমাণ কি?' সে বলিল ‘আপনি তাহাকে নিকটে আহবান করিয়া দেখুন, দুর্গন্ধ যাহাতে নাসিকায় প্রবেশ না করে তজ্জন্য সে হাত দ্বারা নাসিকা ঢাকিয়া রাখিবে।' অপরদিকে এই ঈর্ষান্বিত ব্যক্তি ঐ লোকটিকে স্বীয় গৃহে লইয়া যাইয়া কাঁচা রসুন মিশ্রিত খাদ্য অধিক পরিমাণে ভোজন করাইল। তৎপরই বাদশাহ তাহাকে নিকটে আহবান করিলেন। বাদশার নাসিকায় যাহাতে রসুনের দুর্গন্ধ প্রবেশ না করে তজ্জন্য সে হাত দ্বারা স্বীয় মুখ ঢাকিয়া রাখিল। বাদশাহ বুঝিলেন, ঐ ব্যক্তি সত্যই বলিয়াছে। বাদশাহর অভ্যাস ছিল যে, মহাপুরস্কার প্রদানের আদেশ ব্যতীত অন্য কিছুই স্বহস্তে লিখিতেন না। ঐ ব্যক্তির প্রতি বাদশাহ ক্রুদ্ধ হইয়া স্বহস্তে আদেশপত্র লিখিলেন— ‘পত্রবাহকের শিরচ্ছেদ করিয়া তাহার চর্মে ভূষি ভর্তি করত আমার নিকট প্রেরণ কর।' আদেশপত্রটি বাদশাহ নিজ হস্তে খামে পুরিয়া মোহর আঁটিয়া সেই ব্যক্তি মারফত তাঁহার এক কর্মচারীর নিকট প্রেরণ করিলেন। সেই ব্যক্তি আদেশপত্র হস্তে দরবার হইতে বহির্গত হইলে ঐ ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি দেখিতে পাইয়া তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল- 'ইহা কি?' সে বলিল ‘মহাপুরস্কারের আদেশপত্র।' ঐ ঈর্ষী ব্যক্তি তাহার নিকট হইতে তৎপর আদেশপত্রটি লইয়া গেল। সে ইহা ঐ কর্মচারীর হস্তে দিবামাত্র তিনি তাহাকে বলিলেন- 'ইহাতে তোমাকে হত্যা করিয়া তোমার চর্মে ভূষি ভর্তিপূর্বক বাদশাহর নিকট প্রেরণের আদেশ রহিয়াছে।' সে বলিল- 'সুবহানাল্লাহ্, এই আদেশ ত অপর এক ব্যক্তির উপর প্রদত্ত হইয়াছে। বিশ্বাস না হয় বাদশাহর নিকট জিজ্ঞাসা করিয়া দেখুন।' কর্মচারী বলিলেন ‘ইহাই বাদশাহর আদেশ, পুনরায় তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিব কেন?' অনন্তর কর্মচারী সেই ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তিকে হত্যা করিয়া ফেলিলেন। সেই ব্যক্তি পূর্ববৎ বাদশাহর সম্মুখে দন্ডায়মান হইয়া পরদিন সেই নীতিবাক্য উচ্চারণ করিল। বাদশাহ বিস্ময়ে তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন- 'ঐ পত্র কি করিলে?' সে বলিল- 'অমুক ব্যক্তি আমার নিকট হইতে চাহিয়া লইয়া গেল।' বাদশাহ বলিলেন- 'ঐ ব্যক্তি ত আমার নিকট বলিয়াছিল তুমি এইরূপ কথা বলিয়াছ।' সে উত্তর দিল- ‘আমি কখনও সেইরূপ কথা বলি নাই।' বাদশাহ আবার জিজ্ঞাসা করিলেন- 'আচ্ছা, তাহা হইলে সেই দিন তুমি মুখ ও নাসিকা হস্ত দ্বারা ঢাকিয়া রাখিয়াছিলে কেন?' সে বলিল- 'সেই ব্যক্তি আমাকে কাঁচা রসুন খাওয়াইয়া ছিল।’ বাদশাহ বলিলেন- 'তুমি যে প্রত্যহ বল- ‘দুর্বৃত্তের কর্মই তাহার শাস্তিদাতা' ইহা সত্যে পরিণত হইল।”


হযরত ইব্‌ন সীরান (রঃ) বলেন- “পার্থিব উন্নতিতে আমি কাহাকেও ঈর্ষা করি নাই। কারণ, সেই ব্যক্তি বেহেশতী হইয়া থাকিলে বেহেশতের নিআমতের তুলনায় দুনিয়া নিতান্ত তুচ্ছ। আর সেই ব্যক্তি দোযখী হইয়া থাকিলে তথায় আগুনে জ্বলিবে; দুনিয়ার সুখ-সম্পদে তাহার কি লাভ?” 

হযরত হাসান বসরী (রহঃ)-কে এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করিল— “মুসলমান কি ঈর্ষা করে?” তিনি বলিলেন- “হযরত ইয়াকুব আলায়হিস সালামের পুত্রগণের উপাখ্যান কি তুমি ভুলিয়া গিয়াছ? তবে যাহা আচরণে  প্রকাশ পায় না তেমন ঈর্ষা কোন ক্ষতি করে না।” 

হযরত আবূ দারদা রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন- “যে ব্যক্তি অধিক মৃত্যু চিন্তা করে সে না আনন্দিত হয়, না ঈর্ষা করে।”



পরবর্তী পর্ব

ঈর্ষার পরিচয়

ক্ষমার ফযীলত

  

  ক্রোধ, বিদ্বেষ ও ঈর্ষা (পর্ব- ১০)
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
ক্ষমার ফযীলত 
কেহ তোমার অনিষ্ট করিলে তুমি তাহার উপকার কর। ইহাই আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রকৃষ্টতম উপায়। ইহা সম্ভবপর না হইলে অন্ততঃপক্ষে তাহাকে ক্ষমা কর, কেননা, ক্ষমার ফযীলত অত্যন্ত বেশী। রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন- 

>“তিনটি বিষয়ে আমি শপথ করিতে পারি; (উহা এই যে) 

(১) সদকা দিলে ধন কমে না, তোমরা সদকা দাও। 

(২) যে ব্যক্তি অপরের অপরাধ মাফ করে কিয়ামত দিবসে আল্লাহ্ তাহাকে অধিক মর্যাদা দান করিবেন। 

(৩) যে ব্যক্তি নিজের জন্য ভিক্ষার পথ উন্মুক্ত করে, আল্লাহ্ তাহার জন্য দরিদ্রতার পথ উন্মুক্ত করিয়া দেন।” 


হযরত আয়েশা রদিয়াল্লাহু আন্হা বলেন- “যাহারা রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি অন্যায় করিয়াছে, তাহাদের নিকট হইতে প্রতিশোধ গ্রহণ করিতে আমি কখনও তাঁহাকে দেখি নাই; কিন্তু আল্লাহর সম্বন্ধে কেহ অন্যায় করিলে তাঁহার ক্রোধের পরিসীমা থাকিত না। তাঁহার ইচ্ছাধীন কার্যের মধ্যে যাহা মানবজাতির জন্য অধিক সহজ দেখিতেন, তাহাই তিনি গ্রহণ করিতেন। কিন্তু কখনও তিনি পাপকার্য অবলম্বন করিতেন না।”


হযরত আকাবা ইব্‌ন আমের রদিয়াল্লাহু আন্হু বলেন- “রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) আমার হস্ত ধারণপূর্বক বলিলেন- 

>"সংসারী লোক ও আখিরাতের পথিক, উভয়ের জন্য যে-ভাব উত্তম, তাহা তোমাকে জানাইয়া দিতেছি। তোমার সহিত কেহ সম্বন্ধ কর্তন করিতে চাহিলে তুমি তাহার সঙ্গে মিলিত হও; তোমাকে কেহ বঞ্চিত করিলে তুমি তাহাকে দান কর।”

রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন- “হযরত মূসা আলায়হিস্ সালাম আল্লাহর নিকট নিবেদন করিলেন— হে আল্লাহ্, আপনার বান্দাগণের মধ্যে কোন্ ব্যক্তি আপনার অধিক প্রিয়?' উত্তর হইল- 

>‘শাস্তি দানের শক্তি থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি শত্রুকে মা'ফ করে।” 

রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন- 

>“যে ব্যক্তি অত্যাচারীর উপর অভিশাপ দিল সে তাহার প্রাপ্য অংশ গ্রহণ করিল।”


রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) কুরায়শ জাতিকে পরাজিত করিয়া পবিত্র মক্কা শরীফ দখল করিলে কুরায়শগণ তাঁহার প্রতি নিজেদের অবিচার, অত্যাচার স্মরণ করিয়া নিতান্ত ভীত ও জীবনে নিরাশ হইয়া পড়িল। কিন্তু রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) কা'বা শরীফের দ্বারদেশে স্বীয় পবিত্র হস্ত স্থাপনপূর্বক তাহাদিগকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন- 

>“আল্লাহ্ এক, অদ্বিতীয়; তাঁহার শরীক নাই। তিনি অঙ্গীকার সত্যে পরিণত করিলেন ও স্বীয় বান্দাগণকে জয়ী করিলেন এবং স্বীয় দুশমনদিগকে পরাস্ত ও বিধ্বস্ত করিলেন। (হে কুরায়শগণ) অদ্য তোমরা কী দেখিতেছ এবং কী বলিতেছ?” 

কুরায়শগণ একবাক্যে নিবেদন করিল “ইয়া রাসূলাল্লাহ্, আজ সকল ক্ষমতাই আপনার করতলগত, ক্ষমা প্রার্থনা ব্যতীত আমাদের আর কী বলিবার আছে? আমরা আপনার দয়াপ্রার্থী।” তাহাদের কথা শুনিয়া রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলিলেন- 

>“আমার ভাই ইউসুফ আলায়হিস্ সালাম স্বীয় ভ্রাতাগণের উপর ক্ষমতা লাভ করিয়া যাহা বলিয়াছিলেন আমিও তাহাই বলিতেছি: আজ তোমাদের উপর ভৎসনা করিবার কিছুই নাই।” 

ইহা বলিয়া তিনি কুরায়শদিগকে জানমালের নিরাপত্তা প্রদান করিলেন।


রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন- 

>“কিয়ামতের দিন সমস্ত লোক উত্থিত হইলে এক ঘোষণাকারী ঘোষণা করিবে- 'যাহাদের পুরস্কার আল্লাহর নিকট রহিয়াছে, তাহারা উঠ।' কয়েক সহস্র লোক উঠিবে এবং বিনা হিসাবে বেহেশতে চলিয়া যাইবে। কারণ, তাহারা (দুনিয়াতে) আল্লাহর বান্দাদের অপরাধ মাফ করিয়া দিত।” 

হযরত মুআবিয়া বলেন- “ক্রোধের সময় ধৈর্য ধারণ কর, তাহা হইলে প্রচুর অবসর পাইবে। আবার অবসরকালে প্রতিশোধ গ্রহণের যথেষ্ট ক্ষমতা থাকিলেও (শত্রুকে) ক্ষমা কর।"


খলীফা হিশামের নিকট এক অপরাধীকে আনয়ন করা হইলে প্রশ্ন করিবার পূর্বেই সে স্বীয় দোষ প্রক্ষালনের উদ্দেশ্যে যুক্তি-প্রমাণাদি প্রদর্শন করিতে লাগিল। খলীফা বলিলেন— “তুমি আমার সম্মুখে প্রমাণাদি উপস্থাপিত করিতে আরম্ভ করিলে?” অপরাধী কুরআন শরীফের এই আয়াত আবৃত্তি করিল 

>“হাশরের মাঠে (আল্লাহ্র সম্মুখে) সমস্ত প্রাণী আনয়ন করা হইবে; তাহারা নিজ নিজ জীবনের জন্য তর্ক-বিতর্ক আরম্ভ করিবে।” সে আরও বলিল- 

>“কিয়ামত দিবস মহাবিচারক আল্লাহর সম্মুখে জবাবদিহিকালে তা বান্দা প্রমাণাদি উপস্থাপিত করিতে পারিবে; এমতাবস্থায়, আমি আপনার সম্মুখে প্রমাণাদি উপস্থাপিত করিতে পারিব না কেন?” খলীফা হিশাম  বলিলেন- “বেশ এস, কি বলিতে চাও বল।”


হযরত ইব্‌ন মাউদ রদিয়াল্লাহ্ আন্হুর একটি দ্রব্য চোরে লইয়া গেল। সমবেত লোকগণ চোরকে অভিশাপ দিতে লাগিল। তিনি তাহাদিগকে অভিশাপ করিতে নিষেধ করিয়া বলিলেন- “হে খোদা, চোর কোন অভাবের তাড়নায় দ্রব্যটি চুরি করিয়া থাকিলে তাহার মঙ্গল কর; কিন্তু পাপ কার্যে সাহস বর্ধন নিমিত্ত চুরি করিয়া থাকিলে ইহাই যেন তাহার শেষ পাপ বলিয়া লিখিত হয়।” অর্থাৎ তৎপর যেন সেই ব্যক্তি আর পাপ না করে।


হযরত ফুযায়ল (রঃ) বলেন- “চোরে এক ব্যক্তির ধন চুরি করিয়া লইয়া গেল। কা'বা শরীফ তওয়াফকালে দেখিতে পাইলাম, তিনি কাঁদিতেছেন। আমি তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম- 'হে মহাত্মন! আপনি কি অপহৃত ধনের জন্য কাঁদিতেছেন?' তিনি বলিলেন- ‘না, বরং আমি যেন দেখিতেছি, হাশরের মাঠে ঐ ব্যক্তি আমার সহিত দণ্ডায়মান রহিয়াছে; কিন্তু সে ঐ চুরি কার্যের কোন সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারিতেছে না। এইজন্য দুঃখিত হইয়া আমি কাঁদিতেছি।” 


খলীফা আবদুল মালিক ইব্‌ন মারওয়ানের নিকট কতিপয় যুদ্ধবন্দীকে আনয়ন করা হইল। তখন একজন বুযুর্গ তথায় অবস্থান করিতেছিলেন। তিনি খলীফাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন- “তুমি যাহা চাহিলে, আল্লাহ্ তোমাকে তাহা দান করিয়াছেন, অর্থাৎ তোমাকে বিজয়ী করিয়াছেন। এখন আল্লাহ্ যাহা চাহেন, তাহা তুমি দাও, অর্থাৎ তাহাদিগকে ক্ষমা কর।” ইহা শুনিয়া খলীফা সকল বন্দীকে মাফ করিয়া দিলেন। 

ইন্‌জীল কিতাবে আছে ‘যে-ব্যক্তি নিজ নির্যাতকের অপরাধ ক্ষমার জন্য আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে তাহার নিকট শয়তান পরাজিত হয়।” অর্থাৎ শয়তান তাহাকে পাপকর্মে প্ররোচিত করিতে সমর্থ হয় না।


মোটকথা, ক্রোধভাজন ব্যক্তিকে ক্ষমা করিয়া দেওয়া উচিত এবং প্রত্যেক কাজে নম্রতা অবলম্বন করা কর্তব্য। তাহা হইলে মানব-মনে ক্রোধের সঞ্চার হইতে পারে না।


রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন- 

>“যাহাকে আল্লাহ্ নম্রতা প্রদান করিয়াছেন, তাহাকে তিনি দুনিয়া ও আখিরাতে লাভবান করিয়াছেন। আর যাহাকে তিনি নম্রতাগুণে বঞ্চিত করিয়াছেন, সে ইহ-পরকালের মঙ্গল হইতে বঞ্চিত রহিয়াছে।” 


তিনি অন্যত্র বলেন- 

>“আল্লাহ্ সদয় সহনশীল এবং সদয় সহনশীল ব্যক্তিকে তিনি ভালবাসেন। তিনি সদয় সহনশীলতার জন্য যাহা দান করেন, কঠোরতা প্রদর্শন করিলে তাহা দান করেন না।” 

রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) হযরত আয়েশা রদিয়াল্লাহু আন্হাকে বলেন- 

>“প্রত্যেক কাজে নম্রতার দিকে দৃষ্টি রাখিবে; কেননা নম্রতাযোগে যে কাজ করা হয় তাহা সম্পন্ন হয়, আর যে কাজে নম্রতা থাকে না তাহা নষ্ট হয়।”


পরবর্তী পর্ব

ঈর্ষা ও ইহার আপদ

বিদ্বেষের তারতম্য অনুসারে মানুষের শ্রেণীবিভাগ

   

ক্রোধ, বিদ্বেষ ও ঈর্ষা (পর্ব- ৯)
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

বিদ্বেষের তারতম্য অনুসারে মানুষের শ্রেণীবিভাগ 
বিদ্বেষভাবের তারতম্য অনুসারে মানুষ তিন শ্রেণীতে বিভক্ত :

প্রথম শ্রেণী—সিদ্দীকগণ। তাঁহাদের মনে কাহারও প্রতি বিদ্বেষ জাগরিত হইলে কঠোর সাধনা ও পরিশ্রমে তাঁহারা ইহার মূলোচ্ছেদ করিয়া থাকেন। তাঁহারা বিরাগভাজন ব্যক্তির উপকার করেন এবং পূর্বাপেক্ষা অধিক ঘনিষ্ঠতার সহিত তাহার সঙ্গে মিলিত হন।

দ্বিতীয় শ্রেণী—পরহেযগারগণ। তাঁহারা বিরাগভাজন ব্যক্তির ইষ্ট ও অনিষ্ট কিছুই করেন না। অর্থাৎ বিদ্বেষভাব তাঁহাদের মানসিক অবস্থার কোন পরিবর্তন ঘটাইতে পারে না।

তৃতীয় শ্রেণী—ফাসিক যালিম। তাহারা বিদ্বিষ্ট ব্যক্তির অনিষ্ট সাধনের নিমিত্ত সর্বদা সচেষ্ট থাকে।


পরবর্তী পর্ব
ক্ষমার ফযীলত

ক্রোধজনিত মানসিক পরিবর্তন

  

ক্রোধ, বিদ্বেষ ও ঈর্ষা (পর্ব- ৮)
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

ক্রোধজনিত মানসিক পরিবর্তন
ক্রোধের ফলে বিরাগভাজন ব্যক্তির প্রতি সাধু এবং নিষ্পাপ ব্যক্তিরও মানসিক পরিবর্তন দেখা দেয়। বিরাগভাজন ব্যক্তির উপকার, কাজকর্মে সাহায্য-সহযোগিতা ও তাহার সহিত নম্র ব্যবহার আর পূর্বের ন্যায় করা হয় না। এমন কি তাহার সহিত একত্রে উপবেশন করত আল্লাহর যিকির এবং তাহার কল্যাণের জন্য দোয়া করিতেও মন লাগে না। এই সকল কারণে ক্রোধের বশীভূত হইলে সাধু পুরুষদেরও মরতবা হ্রাসপ্রাপ্ত হয় এবং তাঁহাদের বিস্তর ক্ষতি সাধিত হয়।
📚


হযরত আবূ বকর রদিয়াল্লাহু মিস্তাহ্ নাম জনৈক নিকট-আত্মীয়পোয্য ছিলেন। তিনি হযরত আয়েশা রদিয়াল্লাহু আন্হা সম্পর্কে মিথ্যা অপবাদে যোগদান করিলে হযরত আবূ বকর (রঃ) তাঁহার ভরণ-পোষণ রহিত করিয়া শপথ করেন যে, তাঁহাকে আর কখনও জীবিকা প্রদান করিবেন না। এই উপলক্ষে আল্লাহ্ বলেন: 

>“এবং যেন শপথ না করে তোমাদের মধ্যে (আল্লাহর) অনুগ্রহপ্রাপ্ত শ্ৰেষ্ঠ ব্যক্তি এই বিষয়ে যে, দিবে না স্বজন ও দরিদ্র এবং আল্লাহর পথে গৃহত্যাগী লোকদিগকে এবং উচিত যে, ক্ষমা করে ও দোষ ছাড়িয়া দেয়া আল্লাহ্ তোমাদিগকে ক্ষমা করেন ইহা কি তোমরা চাও না?" 

(সূরা নূর, রুকু ৩, পারা ১৮)। 

ইহা শুনিয়া হযরত আবূ বকর রদিয়াল্লাহু আন্হু বলেন- “আল্লাহ্ শপথ, আমি অবশ্যই ইহা ভালবাসি।” তৎপর তিনি আবার মিস্তার ভরণ-পোষণ করিতে লাগিলেন।



পরবর্তী পর্ব

বিদ্বেষের তারতম্য অনুসারে মানুষের শ্রেণীবিভাগ 

গুপ্ত ক্রোধের আপদ এবং বিদ্বেষজাত মনোভাব

  

ক্রোধ, বিদ্বেষ ও ঈর্ষা (পর্ব- ৭)
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
গুপ্ত ক্রোধের আপদ এবং বিদ্বেষজাত মনোভাব

 ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সততার বশবর্তী হইয়া বিরাগভাজন ব্যক্তিকে ক্ষমা করত ক্রোধ দমন করিলে তুমি পরম ভাগ্যবান। কিন্তু ক্ষমতার কারণে বা স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে ক্রোধ চাপা রাখিলে ইহা তোমার অন্তরে বিকৃত হইয়া দ্বেষ-বিদ্বেষের সৃষ্টি করিবে। রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন : 

>“মুমিন কখনও বিদ্বেষপরায়ণ হইতে পারে না।" 

দ্বেষ-বিদ্বেষ ক্রোধের পুত্রস্বরূপ। দ্বেষ-বিদ্বেষ হইতে আবার আট প্রকার ধর্ম ধ্বংসকর মনোভাব জন্মিয়া থাকে। ইহাদিগকে ক্রোধের পৌত্র বলা যাইতে পারে।


বিদ্বেষজাত মনোভাব 

বিদ্বেষজাত মনোভাব আট প্রকার। 

প্রথম- ঈর্ষা। ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি সুখে যাতনা ও দুঃখে আনন্দ পায়। 

দ্বিতীয়— শামাতাত অর্থাৎ অপরের দুঃখ ও বিপদে আনন্দ প্রকাশ করা। (ঈর্ষার মত ইহা আন্তরিক লুক্কায়িত ভাব নহে; ইহা কথাবার্তায় ও ক্রিয়াকলাপে প্রকাশিত হয়)। 

তৃতীয় বিমুখতা অর্থাৎ বিরাগভাজন ব্যক্তির প্রতি অপ্রসন্ন থাকা। তাহার সহিত কথা না বলা; এমন কি সালামের জওয়াবও না দেওয়া। 

চতুর্থ - অবজ্ঞা। ইহাতে মানুষ বিরাগভাজন ব্যক্তিকে হেয় ও তুচ্ছ বলিয়া মনে করে। 

পঞ্চম বিরাগভাজন ব্যক্তির প্রতি অবজ্ঞা বাহিরে প্রকাশ পায় এবং লোক বিরাগভাজন ব্যক্তির কুৎসা, নিন্দা ও গুপ্ত দোষ প্রকাশে পঞ্চমুখ হয় এবং তৎপ্রতি নানারূপ মিথ্যা ও অশ্লীল বাক্য প্রয়োগ করিতে থাকে। 

ষষ্ঠ- বিরাগভাজন ব্যক্তির দোষ বিদ্বেষ-পরায়ণ ব্যক্তি লোকসমাজে প্রকাশ করে, ইহা লইয়া সমালোচনা করে এবং তাহাকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে। 

সপ্তম - বিরাগভাজন ব্যক্তির প্রাপ্য আদায় ও তাহার নিকট হইতে গৃহীত ঋণ পরিশোধে অবহেলা দেখা দেয়; তাহার সহিত আত্মীয়তা ছেদন করা হয় এবং তাহার কোন হক নষ্ট হইয়া থাকিলে ইহা প্রত্যর্পণ করা হয় না বা ক্ষমাও চাওয়া হয় না। 

অষ্টম- বিরাগভাজন ব্যক্তিকে যাতনা প্রদান, এমন কি সুযোগ পাইলে তাহাকে হত্যার বাসনা বিদ্বেষভাজন ব্যক্তির অন্তরে জাগিয়া উঠে এবং সে অপরকেও তাহার বিরুদ্ধে তদ্রূপ কার্যে উত্তেজিত করিয়া তোলে।



পরবর্তী পর্ব

ক্রোধজনিত মানসিক পরিবর্তন

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...