মঙ্গলবার, ২৫ জুলাই, ২০২৩

অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ৪) বিনয়

 

অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ৪)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

বিনয় —

আমরা যেখানে অহংকার ও গর্বের নিন্দা লিপিবদ্ধ করেছি, সেখানে কিছুটা বিনয়ের ফযীলত লেখাও সমীচীন মনে হয়।

রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন, –“ক্ষমার কারণে আল্লাহ তা'আলা কেবল বান্দার ইযযতই বৃদ্ধি করেন এবং আল্লাহর জন্যে যে বিনয়ী হয়, আল্লাহ তাকে উঁচুতে তুলে দেন।”


এক হাদীসে আছে, – ”প্রত্যেক ব্যক্তির সাথে দু'জন ফেরেশতা রয়েছে। তারা বলগার সাহায্যে তাকে নিমন্ত্রণ করে। যদি সে ব্যক্তি নিজেকে উঁচু করে, তবে ফেরেশতারা বলগা টেনে ধরে এবং বলে ইলাহী, তুমি এই ব্যক্তিকে নিচু করে দাও। আর যদি বিনয় ও আনুগত্য করে, তবে ফেরেশতারা দোয়া দেয় এবং বলে, ইলাহী, একে উঁচু কর।” 


আরও বলা হয়েছে- ”সে ব্যক্তি সুখী, যে দরিদ্র না হয়েও বিনয় করে, সৎপথে উপার্জিত ধন ব্যয় করে, অবহেলিত ও দরিদ্রদের প্রতি দয়া করে এবং জ্ঞানীদের সাথে সাক্ষাৎ করে।”


আবূ সালমা মুদায়নী তার পিতার কাছ থেকে বর্ণনা করেন যে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) রোযা রেখে মসজিদে কুবায় অবস্থান করছিলেন। ইফতারের সময় আমরা এক পিয়ালা দুধের সাথে সামান্য মধু মিশ্রিত করে পেশ করলাম । তিনি তা মুখে দিয়ে যখন মধুর স্বাদ আস্বাদন করলেন, তখন জিজ্ঞেস করলেন: এটা কি? আমরা বললাম : দুধের সাথে সামান্য মধু মিশ্রিত করেছি । তিনি পিয়ালা রেখে দিলেন এবং বললেন : আমি একে হারাম করি না । এরপর তিনি নিম্নোক্ত বাক্যাবলী উচ্চারণ করলেন

“যে আল্লাহর ওয়াস্তে বিনয় করে, আল্লাহ তাকে উঁচু করেন। যে অহংকার করে আল্লাহ তাকে নিচে নামিয়ে দেন । যে মধ্যপথ অবলম্বন করে, আল্লাহ তাকে ধনী করেন । যে অপব্যয় করে, আল্লাহ তাকে ফকীর করেন, আর যে আল্লাহর যিকির করে আল্লাহ তাকে বন্ধু করে নেন।”


এক হাদীসে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন-- ”আমার পালনকর্তা আমাকে দু'টি বিষয়ের যে কোন একটি বেছে নেয়ার ক্ষমতা দিলেন- হয় আমি দাস ও রসূল হব, না হয় বাদশাহ ও নবী হব। কিন্তু কোন্‌টি বেছে নিব তা নিয়ে সংশয় করলাম । ফেরেশতাদের মধ্যে আমার বন্ধু জিবরাঈল উপস্থিত ছিলেন । আমি তার দিকে মাথা তুলে তাকালে তিনি বললেন : আল্লাহর সামনে বিনয় করুন । সেমতে আমি আরয করলাম : আমি বান্দা ও রসূল হতে চাই।” 


হযরত মূসা (আ.)-এর প্রতি আল্লাহ তা'আলা এই মর্মে ওহী করেন যে, 

>"আমি এমন ব্যক্তির নামায কবুল করি, যে আমার মাহাত্ম্যের সামনে বিনয়ী হয়, আমার বান্দাদের সাথে অহংকার করে না, অন্তরে আমার ভয় রাখে, অষ্টপ্রহর আমাকে স্মরণ করে এবং আমার খাতিরে নিজেকে কামনা-বাসনা থেকে বিরত রাখে।" 


এক হাদীসে বলা হয়েছে : “মহত্ত্ব হচ্ছে খোদাভীতি, গৌরব হচ্ছে বিনয় এবং বিশ্বাস হচ্ছে ধনাঢ্যতা।”


হযরত ঈসা (আ.) বলেন, – "সুসংবাদ তাদের জন্যে, যারা দুনিয়াতে বিনয়ী হয়। তারা কিয়ামতে মিম্বরের উপর উপবেশন করবে। সুসংবাদ তাদের জন্যে, যারা দুনিয়াতে মানুষের মধ্যে শান্তি স্থাপন করে। কিয়ামতে তারা জান্নাতুল ফেরদাউসের অধিকারী হবে। সুসংবাদ তাদের জন্যে, যারা দুনিয়াতে আপন অন্তরকে পাক রাখে। কিয়ামতে তাদের আল্লাহর দীদার নসীব হবে।" 


অন্য এক হাদীসে আছে– ”চারটি বিষয় এমন রয়েছে, যা কেবল সে ব্যক্তি পায়, যাকে আল্লাহ বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করে নেন–

(১) চুপ থাকা- যা এবাদতের সূচনা, 

(২) আল্লাহর উপর ভরসা করা, 

(৩) বিনয় এবং 

(৪) সংসারবিমুখতা।


হযরত ইবনে আব্বাস বর্ণিত রেওয়ায়েতে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন :  "যে ব্যক্তি বিনয় অবলম্বন করে, আল্লাহ তা'আলা তাকে সপ্তম আকাশ পর্যন্ত উচ্চতা দান করেন।" 


রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) একদিন সাহাবায়ে কেরামকে বললেন : “ব্যাপার কি, আমি তোমাদের মধ্যে এবাদতের মিষ্টতা পাইনা কেন?"  তারা আরয করলেনঃ এবাদতের মিষ্টতা কি? তিনি বললেন : 'বিনয়'।


হযরত উমর (র.) বলেন : যখন বান্দা আল্লাহর ওয়াস্তে বিনয় অবলম্বন করে, তখন আল্লাহ্ তা'আলা তার জ্ঞান-গরিমা বাড়িয়ে দেন। আর যখন অহংকার ও যুলুম করে, তখন তাকে ভূগর্ভে বিলীন করে দেন এবং আদেশ করেন- দূর হ ! আল্লাহ তোকে দূর করেছেন। এরূপ ব্যক্তি স্বজ্ঞানে বড় হলেও মানুষের দৃষ্টিতে ছোট।


হযরত ফুযায়ল (রহ.)-কে কেউ বিনয় সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি বললেন :  "বিনয় হচ্ছে সত্যের সামনে বিনম্র ও অনুগত হওয়া যদিও সেই সত্য কোন বালক অথবা মূর্খের মুখ দিয়ে প্রকাশ পায়।" 


ইবনে মোবারক বলেন : "বিনয় হচ্ছে নিজেকে সে ব্যক্তির চেয়ে কম মনে করা, যে পার্থিব নেয়ামতে তোমার চেয়ে কম এবং নিজেকে সেই ব্যক্তির চেয়ে অধিক মনে করা, যে পার্থিব নেয়ামতে তোমার চেয়ে বেশী।" 


কাতাদাহ (রা.) বলেন : "যে ব্যক্তি ধন, রূপ অথবা জ্ঞান প্রাপ্ত হয়ে তাতে বিনয় করে না, কিয়ামতে এসব বিষয় তার জন্য শাস্তির কারণ হয়ে যাবে।" 


হযরত কা'ব (র.) বলেন : "আল্লাহ তা'আলা বান্দাকে দুনিয়াতে যে নেয়ামত দান করেন, সে যদি তার শোকর করে এবং আল্লাহর ওয়াস্তে বিনয় প্রদর্শন করে, তবে আল্লাহ তা'আলা সেই নেয়ামতের উপকার তাকে দুনিয়াতেও দান করেন এবং আখেরাতেও তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। 

পক্ষান্তরে যদি বান্দা সেই নেয়ামতের শোকর এবং বিনয় প্রদর্শন না করে, তবে আল্লাহ তা'আলা দুনিয়াতেও তার উপকার মওকুফ রাখেন এবং আখেরাতে তার জন্যে জাহান্নামের স্তর খুলে দেন।"


হযরত সোলায়মান (আ.)-এর রীতি ছিল যে, তিনি সকালে বড়লোক, ধনাঢ্য ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের দিকে মনোযোগ দিতেন, এরপর ফকীর ও মিসকীনদের মধ্যে আসতেন এবং তাদের কাছে এই বলে বসে যেতেন যে, মিসকীন মিসকীনদের মধ্যেই এসেছে।


বর্ণিত আছে, একবার ইউসুফ, আইয়ুব ও হাসান (রহ.) পথে বের হলেন। চলতে চলতে বিনয় সম্পর্কে আলোচনা শুরু হল। হযরত হাসান জিজ্ঞেস করলেন: "বিনয় কি জান?- বিনয় হল গৃহ থেকে বের হওয়ার পর পথিমধ্যে যে মুসলমানের সাথে দেখা হয়, তাকে নিজের চেয়ে উত্তম মনে করা।" 


হযরত মুজাহিদ বলেন: যখন নূহ (আ.)-এর সম্প্রদায় মহাপ্লাবনে নিমজ্জিত হল, তখন প্রত্যেক পাহাড় একে অপরের সাথে পাল্লা দিয়ে উঁচু হতে লাগল। কিন্তু জুদী পাহাড় বিনয় অবলম্বন করল। আল্লাহ তা'আলা তাকে উচ্চ মর্যাদা দান করলেন এবং নূহ (আ.)-এর নৌকা তার উপর অবস্থান নিল। 


যিয়াদ নুমায়রী বলেনঃ "যে দরবেশের মধ্যে বিনয় নেই, সে ফলহীন বৃক্ষসদৃশ।" 


হযরত আবূ ইয়ায়ীদ বুস্তামী (রহ.) বলেন :  "ব্যক্তি যতক্ষণ মনে করে যে, মানুষের মধ্যে তার চেয়েও নিকৃষ্ট কেউ আছে, ততক্ষণ সে অহংকারী।" লোকেরা প্রশ্ন করল : তা হলে বিনয়ী কখন হবে? তিনি বললেন: যখন নিজের জন্যে কোন স্থান ও মর্যাদা চিন্তা না করে। মানুষ যে পরিমাণে আল্লাহকে ও নিজেকে চিনে, সে পরিমাণে বিনয়ী হয়। 


ইয়াহইয়া ইবনে খালেদ বারমাকী (রহ.) বলেন : "ভদ্রলোক এবাদতকারী হলে বিনয়ী হয় এবং নির্বোধ ও অভদ্র ব্যক্তি এবাদতকারী হলে নিজেকে বুযুর্গ মনে করতে থাকে।" 


হযরত ইয়াহইয়া ইবনে মুয়ায বলেনঃ "যে ব্যক্তি ধন-সম্পদের কারণে তোমার সাথে অহংকার করে, তার সাথে তোমার অহংকার করাই বিনয়।" 

আল্লাহ তা'আলা আমাদের সকলকে বিনয় দান করুন। আমিন॥


পরবর্তী পর্ব

অহংকারের স্বরূপ ও তার লাভ-লোকসান

অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ৩) অহংকারের নিন্দা


  

অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ৩)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

অহংকারের নিন্দা —

পবিত্র কোরআনুল কবিমে বহু স্থানে আল্লাহ তা'আলা অহংকার ও অহংকারীদের নিন্দা বর্ণনা করেছেন। যেমন এরশাদ হয়েছে :

 “যারা পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে দাম্ভিকতা করে, আমি তাদেরকে আমার নিদর্শনাবলী থেকে হটিয়ে দিব”।  

   

“এমনিভাবে আল্লাহ অন্তরে মোহর এঁটে দেন প্রত্যেক দাম্ভিক অবাধ্যের”।


“তারা ফয়সালা চাইতে লাগল এবং ব্যর্থ হল প্রত্যেক অবাধ্য হটকারী”।


 “আল্লাহ অহংকারীদেরকে ভালবাসেন না”।


“তারা মনে মনে খুব অহংকার করে এবং মারাত্মক সীমালঙ্ঘন করে”।


 “নিশ্চয় যারা আমার এবাদতে অহংকার করে, তারা লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে”।


মোটকথা, অহংকারের নিন্দা কোরআন মজীদে বহু জায়গায় বর্ণিত হয়েছে । 

রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন– “যার অন্তরে সরিষাদানা পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে দাখিল হবে না এবং যার অন্তরে সরিষাদানা পরিমাণ ঈমান থাকবে, সে দোযখে প্রবেশ করবে না”।


আবূ সালমা ইবনে আবদুর রহমান বর্ণনা করেন– একবার হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ও আবদুল্লাহ ইবনে উমর মারওয়ায় একত্রিত হলেন। সেখানে কিছুক্ষণ অবস্থানের পর প্রথমোক্ত জন চলে গেলেন এবং শেষোক্ত জন দাঁড়িয়ে কাঁদতে লাগলেন। লোকেরা কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন : আবদুল্লাহ ইবনে আমর আমাকে একটি হাদীস শুনিয়ে গেলেন যে, রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে তিনি বলতে শুনেছেন, 

“যে ব্যক্তির অন্তরে একটি সরিষাদানা পরিমাণ অহংকার থাকবে, আল্লাহ তা'আলা তাকে অধোমুখী করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন”।


অন্য এক হাদীসে এরশাদ হয়েছে, – "মানুষ নিজেকে এত উঁচুতে নিয়ে যায় যে, পরিণামে সে অহংকারীদের তালিকাভুক্ত হয়ে যায়। ফলে যে শাস্তি অহংকারীরা পায়, তা সে-ও পায়।"


হযরত সোলায়মান (আ.) একদিন মানুষ, জিন ও পশুপক্ষীদেরকে ময়দানে সমবেত হতে আদেশ করলেন। সেমতে দু'লাখ মানুষ, জিন ইত্যাদি সমবেত হল। অতঃপর হযরত সোলায়মান (আ.) এত উঁচুতে উঠলেন যে, ফেরেশতাদের তাসবীহ তাঁর শ্রুতিগোচর হল। এরপর তাঁকে নিম্নে নামানো হল, এমনকি তাঁর পদযুগল সমুদ্র স্পর্শ করল। সেখানে তিনি এই আওয়াজ শুনতে পেলেন— "যদি তোমাদের প্রভু অর্থাৎ সোলায়মানের অন্তরে কণা পরিমাণও অহংকার থাকে, তবে তাকে যতটুকু উপরে উঠানো হয়েছে, তার চেয়েও বেশী পাতালে নামিয়ে দেব।"


বর্ণিত আছে, জান্নাত ও দোযখের মধ্যে কথোপকথন হল। দোযখ বলল : আমি অহংকারী ও শক্তিধরদেরকে পাব। জান্নাত বললঃ তা হলে আমি কি অপরাধ করলাম যে, দুর্বল ও অক্ষমরাই আমার মধ্যে স্থান পাবে? 

আল্লাহ তা'আলা জান্নাতকে বললেন : "তুমি আমার রহমত। আমি যাকে ইচ্ছা তোমার মাধ্যমে রহমত দেব।" অতঃপর দোযখকে বললেন : "তুই আমার আযাব। আমি যাকে ইচ্ছা, তোর মাধ্যমে আযাব দেব এবং জান্নাত ও দোযখ উভয়কে পরিপূর্ণ করে দেব।" 


এক হাদীসে এরশাদ হয়েছে— “দুষ্ট বান্দা সে-ই, যে জবরদস্তি ও সীমালঙ্ঘন করে এবং সর্বশক্তিমানকে ভুলে যায়। দুষ্ট বান্দা সেই, যে যুলুম করে ও অহংকার করে এবং মহান আল্লাহর প্রতি মনোযোগ দেয় না। মন্দ বান্দা সেই, যে ভ্রান্তি ও ক্রীড়াকৌতুকে মত্ত থাকে এবং কবরে মাটি হয়ে যাওয়ার কথা স্মরণ করে না। অধম বান্দা সেই, যে অবাধ্যতায় সীমা ছাড়িয়ে যায় এবং সূচনা ও পরিণতির কথা একবারও ভেবে দেখে না।” 


হযরত ছাবেত (র.) বলেন : জনৈক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে আরয করল – অমুক ব্যক্তি সাংঘাতিক অহংকারী। তিনি বললেন : তার কি মৃত্যু নেই?

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (র.)-এর বাচনিক রেওয়ায়েতে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন, হযরত নূহ (আ.)-এর ওফাত নিকটবর্তী হলে তিনি আপন পুত্রদ্বয়কে ডেকে বললেন : আমি তোমাদেরকে দুটি বিষয় থেকে নিষেধ করছি এবং দুটি বিষয়ের আদেশ করছি। শিরক ও অহংকার থেকে নিষেধ করছি এবং কালেমায়ে তাইয়েবার আদেশ করছি। কেননা, আকাশ ও পৃথিবী এবং এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু যদি এক পাল্লায় রাখা হয় এবং কালেমায়ে তাইয়েবা অন্য পাল্লায় রাখা হয়, তবে কালেমায়ে তাইয়েবার পাল্লাই ভারী হবে। দ্বিতীয় যে বিষয়ের আদেশ করছি, তা হচ্ছে “সোবহানাল্লাহি ওয়া বেহামদিহী”। কেননা, এরই মাধ্যমে প্রত্যেক বস্তুকে রিযিক দেয়া হয়।


হযরত ঈসা (আ.) এরশাদ করেন, "মোবারক সেই বান্দা, যাকে আল্লাহ তা'আলা তাঁর কিতাব শিক্ষা দেন এবং সে নিরহংকার হয়ে দুনিয়া ত্যাগ করে।" 


অন্য এক হাদীসে আছে- “কিয়ামতের দিন অহংকারীরা পিপীলিকার আকৃতিতে পুনরুত্থিত হবে। মানুষ তাদেরকে, পদতলে পিষ্ট করে চলবে। সর্বপ্রকার লাঞ্ছনা তাদেরকে ঘিরে রাখবে। দোযখীদের পুঁজ ও কাদা তাদেরকে পান করতে দেয়া হবে”। 


হযরত আবূ হুরায়রা (র.)-এর রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন: – “প্রতাপশালী ও অহংকারী লোক কিয়ামতে পিঁপড়ার আকারে উত্থিত হবে। মানুষ তাদেরকে পায়ের নিচে পিষ্ট করবে। কেননা, তারা দুনিয়াতে আল্লাহকে হেয় মনে করেছিল”।


মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসে বলেন : আমি  বেলাল ইবনে আবী বুরদার কাছে  গিয়ে বললাম, তোমার পিতা আমার কাছে তার পিতার বাচনিক রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-এর এই হাদীসটি বর্ণনা করেছিলেন– "দোযখে ‘মুহিব’ নামক একটি জঙ্গল আছে। আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা অহংকারীরা তাতে বাস করুক। সুতরাং হে বেলাল, তুমি নিজেকে অহংকারমুক্ত রাখ।" 


অন্য এক হাদীসে বলা হয়েছে – "যে ব্যক্তি তিনটি বিষয় থেকে মুক্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করবে, সে জান্নাতে দাখিল হবে- (১) অহংকার, (২) ফরয এবং (৩) খিয়ানত তথা বিশ্বাস ভঙ্গকরণ।


অহংকারের নিন্দায় মনীষীদের উক্তি — 

অহংকারের নিন্দায় অনেক মনীষীর উক্তিও বর্ণিত আছে। 

হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (র.) বলেন : "এক মুসলমান যেন অন্য মুসলমানকে হেয় জ্ঞান না করে। কেননা, মুসলমানদের মধ্যে যে ক্ষুদ্র, সে আল্লাহর কাছে বড়।" 


ওয়াহাব (রহঃ) বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে আদম (আলাইহিস্সালাম)-কে সৃষ্টি করার পর তার দিকে তাকিয়ে বললেন : "অহংকারী ব্যক্তির জন্যে তুমি (জান্নাত) হারাম।" 


হযরত হাসান (রহঃ) বলেন : আশ্চর্যের বিষয়, মানুষ প্রত্যহ একবার অথবা দু'বার আপন হাতে পায়খানা ধৌত করে, এরপরও অহংকার করে এবং আকাশ ও পৃথিবীতে যিনি প্রতাপশালী তাঁর মোকাবিলা করে। 


হযরত মোহাম্মদ ইবনে হুসায়ন ইবনে আলী (র.)  বলেনঃ "মানুষের অন্তরে যে পরিমাণে অহংকার আসে, সেই পরিমাণের জ্ঞানবুদ্ধি হ্রাস পায়। অহংকার কম হলে বুদ্ধির ক্ষতিও কম হবে এবং বেশী হলে বেশী।" 


হযরত সালমান (র.)-কে কেউ জিজ্ঞেস করল : সেই কুকর্ম কোন্‌টি যার উপস্থিতিতে সৎকর্ম উপকারী হয় না? তিনি বললেন : অহংকার । 


হযরত নোমান ইবনে বশীর (রহ.) বলেন : "শয়তানের অনেক ফাঁদ রয়েছে। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে আল্লাহর নেয়ামত পেয়ে অহংকার করা এবং খেয়ালখুশির অনুসরণ করা।" 


একবার জনৈক উৎকৃষ্ট পোশাক পরিহিত যুবক হযরত হাসান (র.) এর সম্মুখ দিয়ে গমন করলে তিনি তাকে ডেকে বললেন : মানুষ তার যৌবন ও সৌন্দর্য নিয়ে গর্ব করে। মনে করা উচিত যে, কবর দেহকে আবৃত করেছে এবং কৃতকর্ম সামনে এসেছে। যাও, অন্তরের চিকিৎসা কর। বান্দার অন্তর সংশোধিত হোক– এটাই আল্লাহ তা'আলার কাম্য।


বর্ণিত আছে, একবার খলীফা মনোনীত হওয়ার পূর্বে হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীয (রহ.) হজ্জ করেন। হযরত লাউস (রহ.) তাঁর চালচলনে কিছুটা অহংকার লক্ষ্য করলেন। তিনি তার পেটের এক পার্শ্বে অঙ্গুলি দিয়ে খোঁচা মেরে বললেন : যার পেট বিষ্ঠায় পরিপূর্ণ, তার চালচলন এমন হয় না । হযরত উমর ক্ষমাপ্রার্থী হয়ে বললেন : চাচা, এ চালচলন শিক্ষা দেয়ার জন্যে আমার বড়রা আমার প্রতিটি অঙ্গে প্রহার করেছে । 


মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসে আপন পুত্রকে অহংকার করতে দেখে কাছে ডেকে বললেন : তুমি কে জান? তোমার মাকে আমি দু'শ' দেরহাম দিয়ে ক্রয় করেছিলাম । আর তোমার পিতা এমন যে, আল্লাহ তা'আলা মুসলমানদের মধ্যে এরূপ লোক বেশী সৃষ্টি না করলেই ভাল হয় ।


বর্ণিত আছে, মুতারিক ইবনে আবদুল্লাহ (রহ.) মুহাল্লাবকে রেশমী জুব্বা পরিধান করে গর্ব করতে দেখে বললেন : হে আল্লাহর বান্দা, তোমার এই চলনকে আল্লাহ ও তাঁর রসূল পছন্দ করেন না। 


মুহাল্লাব বলল : আপনি জানেন, আমি কে? মুতারিক বললেন : হাঁ, জানি। প্রথমে তুমি নাপাক বীর্য ছিলে এবং পরিণামে নাপাক মাটি হয়ে যাবে। বর্তমানে ময়লা বহন করে ফিরছ। মুহাল্লাব একথা শুনে চলে গেল এবং গর্ব পরিত্যাগ করল।

আল্লাহ আমাদেরকে এই মারাত্মক ব্যাধি থেকে রক্ষা করুন। আমিন ॥


পরবর্তী পর্ব 

বিনয়

অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ২) কাপড় ঝুলিয়ে অথবা সদর্পে চলা


  
অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ২)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহ.)

কাপড় ঝুলিয়ে অথবা সদর্পে চলা—

রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন:

“আল্লাহ্ তা'আলা এমন ব্যক্তির প্রতি দৃষ্টিপাত করবেন না, যে লুঙ্গি হেঁচড়িয়ে সদর্পে চলে”। (অহংকার করে চলে)


যায়েদ ইবনে আসলাম (র.) রেওয়ায়েত করেন- আমি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (র.)-এর খেদমতে গেলাম। তখন আবদুল্লাহ ইবনে ওয়াকেদ নতুন পোশাক পরিধান করে তার কাছ দিয়ে চলে গেলেন তিনি বললেন : বৎস! লুঙ্গি আরও উঁচুতে পরিধান কর। আমি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-উনি বলতে শুনেছি, "যে কেউ সদর্পে লুঙ্গি টেনে চলবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা তার প্রতি দৃষ্টিপাত করবেন না।"

 

বর্ণিত আছে, একদিন রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) নিজের হাতের তালুতে থুথু নিক্ষেপ করলেন, অতঃপর তাতে অঙ্গুলি রেখে বললেন : আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেন, 

"হে আদম সন্তান ! তুমি কি আমার কবল থেকে বেঁচে যাবে? আমি তোমাকে এরই মত বস্তু থেকে সৃষ্টি করেছি। এরপর যখন তোমাকে সবল ও বলিষ্ঠ করেছি, তখন পোশাক পরে এমন সদর্পে চল যে, পৃথিবী পর্যন্ত আর্তনাদ করে । তুমি ধন সঞ্চয় কর এবং কাউকে কিছু দাও না । যখন প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়, তখন বলতে শুরু কর, আমি দান-খয়রাত করব । সেটা কি দান-খয়রাতের সময়?" 


এক হাদীসে রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন: - "যখন আমার উম্মত অহংকার করে চলতে শুরু করবে এবং পারস্য ও রোমবাসীরা তাদের খেদমত করতে থাকবে, তখন আল্লাহ তা'আলা তাদের এককে অপরের উপর চাপিয়ে দেবেন।" 


অন্য এক হাদীসে এরশাদ হয়েছে, - "যে ব্যক্তি আপন মনে মনে বড় সাজে এবং দর্প ভরে চলে, সে যখন আল্লাহর কাছে যাবে, তখন আল্লাহ তার প্রতি ক্রুদ্ধ হবেন।"


আবূ বকর হুযালী বর্ণনা করেন, একবার আমরা কয়েকজন হযরত হাসান বসরী (রহ.) এর কাছে উপবিষ্ট ছিলাম। এমন সময় শাসক ইবনে আহতাম সেখান দিয়ে পায়খানায় যাচ্ছিল । সে কয়েকটি রেশমী কোর্তা পরিধান করেছিল, যা পায়ের গোছার উপর ভাঁজে ভাঁজে রাখা ছিল । তার চলনভঙ্গিতে দর্প ও অহংকার পরিস্ফুট ছিল । হযরত হাসান বসরী একবার তার দিকে তাকিয়ে বললেন : এই নাক বাড়ানো, কোমর বাঁকানো এবং গ্রীবা ঘুরানোর জন্যে আফসোস । হে নির্বোধ ! তুমি ডানে-বামে ঘুরে ঘুরে কি দেখছ? তোমার ডানে-বামে আল্লাহর নেয়ামতরাজি রয়েছে, সেগুলোর তুমি শোকর আদায় করনি । ইবনে আহতাম একথা শুনে ফিরে এল এবং তার কাছে ক্ষমা চাইতে লাগল । তিনি বললেন : আমার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে না । আল্লাহর সামনে তওবা কর । তুমি কি আল্লাহ তা'আলার এই উক্তি পাঠ করনি – “গর্বভরে পদচারণা করো না। কেননা, তুমি যমীনকে বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং লম্বা হয়ে পর্বতশিখরে পৌঁছতে সক্ষম হবে না”।


পরবর্তী পর্ব

অহংকারের নিন্দা


অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ১) অহংকার ও আত্মপ্রীতি মারাত্মক ব্যাধি

 

অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ১) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

অহংকার ও আত্মপ্রীতি মারাত্মক ব্যাধি —
রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন যে, 

আল্লাহ তা'আলা বলেন : 

“অহংকার আমার চাদর এবং মহত্ত্ব আমার  পরিধেয়। যে ব্যক্তি এ দুটি বিষয়ে আমার সাথে বিরোধ করে, আমি তাকে চুরমার করে দেব”। 


অন্য এক হাদীসে আছে : 

“তিনটি বিষয় বিনাশকারী। (১) কৃপণতা, মানুষ যার অনুগত হয়। (২) মানসিক প্রবৃত্তি, মানুষ যার অনুগামী হয়। (৩) আত্মপ্রীতি।” 


অতএব, অহংকার ও আত্মপ্রীতি মারাত্মক ব্যাধি। অহংকারী ও আত্মপ্রিয় ব্যক্তি রুগ্ন এবং আল্লাহর দুশমন। 


এ খণ্ডে বিনাশকারী বিষয়সমূহ বর্ণনা করাই আমাদের উদ্দেশ্য বিধায় অহংকার ও  আত্মপ্রীতি সম্পর্কে আলোচনা করা নেহায়েত জরুরী। নিম্নে দুটি বিষয়কে পৃথক পৃথক বর্ণনা করা হচ্ছে।


পরবর্তী পর্ব

কাপড় ঝুলিয়ে অথবা সদর্পে চলা 

 বিসমিল্লাহে আস্সালাতু ওয়া আস্সালামু আলাইকা আলা রসূলিহিল করীম, ওয়া আলিহী, ওয়া আসহাবিহী আজমাঈন। কারবালার ইতিহাসের অনেক বই পরিলক্ষিত হয়। যাচায় পূর্বক 'শামে কারবালা' বইটি আমার কাছে উত্তম মনে হল তাই আমার বন্ধু-বান্ধবের পড়ার সুবিধার্থে আমি পর্বাকারে উপস্থাপন করার ইচ্ছা পোষন করলাম। বইতে যাহা আছে তাহাই হুবহু লিখে যাব। তাই এই লিখার কোন জবাবদিহিতা আমার নেইল যদি কপি করতে ভুলত্রুটি হয়ে থাকে তার জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী।

সোমবার, ২৪ জুলাই, ২০২৩

ঈর্ষার ক্ষতি হইতে অব্যাহতির উপায়


ক্রোধ, বিদ্বেষ ও ঈর্ষা (পর্ব- ১৫
) শেষ পর্ব
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

ঈর্ষার ক্ষতি হইতে অব্যাহতির উপায় 
অশেষ সাধনা দ্বারাও তোমার অন্তর হইতে শত্রু-মিত্রের প্রভেদ জ্ঞান একেবারে বিনাশ করিতে পারিবে না; উভয়ের সম্পদ ও বিপদে তোমার অন্তরে পার্থক্য উপলব্ধি করিবে। তোমার হৃদয়ে স্বাভাবিকভাবেই শত্রুর সম্পদে কিছুটা ভার বোধ হইবে। এই স্বভাবগত মনোভাব পরিবর্তন করা মানব-ক্ষমতার বহির্ভূত। কিন্তু দুইটি কাজ তাহার ক্ষমতাধীন রহিয়াছে; যথা : 

(১) শত্রুর প্রতি স্বাভাবিক বিরক্তি বাক্যে ও কর্মে কখনও প্রকাশ না করা এবং 

(২) জ্ঞান ও বুদ্ধির বিচারে সেই স্বাভাবিক মনোভাবের প্রতি ঘৃণা পোষণ করা। সেই মনোভাব নিতান্ত জঘন্য এবং মন হইতে উহা বিলুপ্ত হউক, একান্তভাবে এই কামনা করা। 

এই দ্বিবিধ কাজ করিতে পারিলে স্বাভাবিক ঈর্ষার মনোভাবের জন্য আল্লাহর বিচারে কেহই দায়ী হইবে না।

কেহ কেহ বলেন- ঈর্ষার ভাব বাক্যে ও কর্মে প্রকাশ না করাই যথেষ্ট। ইহার প্রতি আন্তরিক ঘৃণা পোষণ না করিলেও আল্লাহর বিচারে দায়ী হইবে না। এই অভিমত ঠিক নহে। ঈর্ষার প্রতি ঘৃণা না রাখিলে আল্লাহর বিচারে দায়ী হইতে হইবে। কারণ, ঈর্ষা হারাম। ইহা হৃদয়ের কাজ, দেহের কাজ নহে। কেহ যদি কোন মুসলমানের দুঃখ কামনা করে এবং তাহার আনন্দে দুঃখিত হয়, তবে সে অবশ্যই আল্লাহর বিচারে দায়ী হইবে। কিন্তু সেই ভাবের প্রতি আন্তরিক ঘৃণা পোষণ করত ইহা গুপ্ত রাখিলে সে ঈর্ষার আপদ হইতে অব্যাহতি পাইবে।


উপরে বর্ণিত হইয়াছে, অসীম সাধনায়ও মানব-হৃদয় হইতে শত্রু-মিত্রের প্রভেদ জ্ঞান একেবারে বিলুপ্ত হয় না। কিন্তু তাওহীদভাবে প্রবল হইয়া যাঁহাকে একেবারে তন্ময় করিয়া ফেলিয়াছে, যিনি ইহার প্রভাবে সকল মানুষকে আল্লাহর গোলামরূপে দেখিতে পান এবং সমস্ত ক্রিয়া-কলাপ একমাত্র আল্লাহ্ হইতেই সমাধা হইতে দর্শন করেন, কেবল এইরূপ ব্যক্তিই শত্রু-মিত্রের প্রভেদ জ্ঞান ভুলিয়া যাইতে পারেন। কিন্তু এইরূপ উন্নত মনোভাব নিতান্ত বিরল; বিদ্যুতের ন্যায় চমকিয়া নিমিষেই মিলাইয়া যায়; দীর্ঘকাল স্থায়ী হয় না।


পরিশেষে আল্লাহ্ তা'আলার কাছে এই দোয়া রহিল তিনি যেন আমাদেরকে এই সব বিষয় থেকে বিপদমুক্ত রাখেন। লিখকের (ইমাম গাজ্জালী রহঃ। কষ্টের যথাযত বিনিময় দান করন। আমিন।


(সমাপ্ত)

প্রথম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন


ঈর্ষা পোষণে শয়তানের প্ররোচণা


 
     ক্রোধ, বিদ্বেষ ও ঈর্ষা (পর্ব- ১৪)
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

ঈর্ষা পোষণে শয়তানের প্ররোচণা
উল্লিখিত আয়াতের নির্দেশ অনুযায়ী সদ্ব্যবহারে শত্রুতা বিনাশের চেষ্টা করিলে শয়তান নানাপ্রকার প্ররোচণা দিতে থাকিবে। সে বলিবে- “শত্রুর সহিত নম্র ব্যবহার এবং তাহার প্রশংসা করিলে সে তোমাকে দুর্বল মনে করিবে।” আল্লাহর আদেশ তুমি শ্রবণ করিলে এবং শয়তানের প্রতারণা সম্পর্কেও তোমাকে জানাইয়া দেওয়া হইল। এখন তোমার স্বাধীন ক্ষমতা অনুসারে তুমি যাহা ইচ্ছা তাহাই করিতে পার।

উপরে যে ঔষধের ব্যবস্থা দেওয়া হইল উহা নিতান্ত প্রয়োজনীয় ও উপকারী; কিন্তু খুব তিক্ত। ব্যক্তি বুঝিতে পারিয়াছে যে, তাহার ইহলৌকিক ও পারলৌকিক মঙ্গল ইহাতেই নিহিত রহিয়াছে এবং ঈর্ষাই ইহলৌকিক ও পারলৌকিক শান্তি ধ্বংসের মূল, সেই ব্যক্তিই এইরূপ তিক্ততা সহ্য করিতে সমর্থ হয়। তিক্ততা ও কষ্ট সহ্য করিতে হয় না, এমন ঔষধ নাই। অতএব সুমিষ্ট ঔষধের আশা পরিত্যাগ করত তিক্ত ঔষধই সেবন করিতে হইবে; অন্যথায় ক্রমান্বয়ে রোগ বৃদ্ধি পাইয়া অবশেষে ততোধিক কষ্টে জীবন ধ্বংস করিবে।


পরবর্তী পর্ব

ঈর্ষার ক্ষতি হইতে অব্যাহতির উপায় 

ঈর্ষা দমনের উপায়


 
    ক্রোধ, বিদ্বেষ ও ঈর্ষা (পর্ব- ১৩)
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
ঈর্ষা দমনের উপায়
ঈর্ষা অন্তরের কঠিন ব্যাধি। ইহার জ্ঞানমূলক ও অনুষ্ঠানমূলক ঔষধ রহিয়াছে।
জ্ঞানমূলক ঔষধ
ঈর্ষার অপকারিতা উপলব্ধি করা। ঈর্ষার ফলে ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তির ইহ-পরকালের ক্ষতি হইয়া থাকে; কিন্তু বিদ্বেষভাজন ব্যক্তির কোনই ক্ষতি হয় না, বরং ইহ-পরকালের তাহার লাভ হইয়া থাকে।

ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তির ক্ষতি
আল্লাহ্ বিধানে মানবের উপর অহরহ নিআমত বৰ্ষিত হইতেছে। কিন্তু ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি অপরের সম্পদ দেখিয়া সর্বদা মনঃকষ্টে ও দুঃখে জ্বলিয়া-পুড়িয়া মরিতে থাকে। সে স্বীয় শত্রুকে যেরূপ দুঃখ ও মনঃকষ্টে জর্জরিত দেখিতে চাহিয়াছিল সে নিজেই তদ্রুপ দুঃখ যন্ত্রণায় কালাতিপাত করে।
ঈর্ষার যন্ত্রণার ন্যায় আর কোন যন্ত্রণাই নাই। অতএব অপরের অমঙ্গল কামনায় নিজকে দুঃখে ও মনস্তাপে জর্জরিত করা অপেক্ষা নির্বোধের কাজ আর কি হইতে পারে? অপরের ঈর্ষাতে বিদ্বেষভাজন ব্যক্তির কোনই ক্ষতি হয় না। কারণ, আল্লাহ্ যাহার অদৃষ্টে যে-সম্পদ বিধিবদ্ধ করিয়াছেন, ইহা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অপরিবর্তিত থাকিবে, পরিমাণে ইহার হ্রাস-বৃদ্ধি ও সময়ের দিকে আর অগ্র-পশ্চাৎ কিছুই সংঘটিত হইবে না। কেননা, সৃষ্টির প্রারম্ভে যে অদৃষ্টলিপি বিধিবদ্ধ হইয়াছে তদনুসারেই মানুষ সম্পদপ্রাপ্ত হইয়া থাকে। কেহ কেহ ইহা বুঝিতে অক্ষম হইয়া সম্পদ লাভের কারণস্বরূপ শুভলক্ষণ ও নক্ষত্ররাজির উল্লেখ করিয়া থাকে, কিন্তু সকলেই একবাক্যে স্বীকার করিয়াছে যে, অদৃষ্ট অপরিবর্তনশীল।

একজন নবী (আঃ) এক সম্রাজ্ঞীর শাসন-উৎপীড়নে অসহ্য হইয়া তাহার বিরুদ্ধে আল্লাহর নিকট অভিযোগ জানাইলেন। ইহার উত্তরে ওহী অবতীর্ণ হইল  “অদৃষ্টলিপি পরিবর্তিত হইবে না। এই সম্রাজ্ঞীর রাজত্বকাল আরও বাকী আছে; তুমি ইচ্ছা করিলে অন্যত্র চলিয়া যাইতে পার।” 

অপর একজন নবী (আঃ) বিপদাপদে জর্জরিত হইয়া উহা মোচনের জন্য আল্লাহর নিকট বহু প্রার্থনা ও রোদন করিলেন। তৎপর এই মর্মে ওহী অবতীর্ণ হইল 
>“যে দিবস আমি যমীনের সহিত আসমানের সামঞ্জস্য বিধান করিয়াছি, সেই দিবস উহাও তোমার অদৃষ্টে বিধিবদ্ধ হইয়াছে। তোমার জন্য পূর্ব বিধান রহিত করিয়া আবার নতুন বিধান লিপিবদ্ধ করিতে বল কি?”

ফলকথা এই, ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তির ইচ্ছার প্রভাবেই বিদ্বেষভাজন ব্যক্তির সম্পদ বিদূরিত হয় না। তাহা হইলে ইহার ক্ষতি প্রকারান্তরে ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তির উপরই আবার ঘুরিয়া আসিবে এবং তাহার স্বীয় সম্পদও বিলুপ্ত হইবে। যেমন মনে কর, তুমি কাহারও সম্পদ দেখিয়া ঈর্ষা করিলে এবং ইহাতে তাহার সম্পদ নষ্ট হইল, এখন তোমার সম্পদ দর্শনেও ত অপর কেহ ঈর্ষা করিতে পারে? এমতাবস্থায়, তোমার সম্পদও বিলুপ্ত হওয়া উচিত। আবার দেখ, ঈর্ষাতে বিদ্বিষ্ট ব্যক্তির অনিষ্ট হইলে কাফিরদের ঈর্ষার ফলে মুসলমানগণ ঈমানরূপ পারলৌকিক অমূল্য সম্পদ হইতে বঞ্চিত হইত। কিন্তু ইহা হয় নাই। কাফিরদের কামনা সম্বন্ধে আল্লাহ্ বলেন-
>“আহলে কিতাবের কেহ কেহ তোমাদিগকে বিপথগামী করিয়া দিতে অন্তরের সহিত কামনা করে।” (সূরা আল ইমরান, রুকূ ৭. পারা ৩)।

ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তির ইহজগতে ভীষণ মনঃকষ্ট এবং পরজগতে ভয়ানক ক্ষতি হইয়া থাকে। আল্লাহ্ তাঁহার মঙ্গলময় বিধানে যাহা উত্তম বিবেচনা করিতেছেন তাহাই পূর্ণ কৌশলের সহিত সম্পন্ন করিতেছেন। বিশ্ব-কারখানায় তাঁহার যে কৌশল জীবন্তভাবে প্রচলিত থাকিয়া অহরহ কাজ করিয়া যাইতেছে, তিনি ভিন্ন উহার গুপ্ত রহস্য বুঝিবার ক্ষমতা আর কাহারও নাই। কিন্তু ঈর্ষী ব্যক্তি এই মঙ্গলজনক বিধানের প্রতি অসন্তুষ্ট এবং তাঁহার বন্টন-নীতিও সে মানিয়া লইতে পারে না। সুতরাং এই অসন্তুষ্টি ও অসম্মতির দরুণ আগুন তাহার হৃদয়ে সর্বদা জ্বলিতে থাকে। তাওহীদের আমানতে মুমিনকে সম্মানিত করা হইয়াছে। এমতাবস্থায়, আল্লাহ্ বিধানের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করা অপেক্ষা অধিক খিয়ানত এই আমানতে আর কি হইতে পারে? 
শয়তান মুসলমানের চিরশত্রু, মুসলমানের অমঙ্গল কামনাই তাহার একমাত্র কাজ। ঈর্ষার বশবর্তী হইয়া এক মুসলমান অপর মুসলমানের অমঙ্গল করিলে সে শয়তানের কাজে শরীক হইল। মুসলমানের পক্ষে ইহা অপেক্ষা দুর্ভাগ্যের বিষয় আর কি হইতে পারে?
ঈর্ষী ব্যক্তি দুঃখকষ্টে নিপতিত থাকুক, বিদ্বেষভাজন ব্যক্তি ইহা কামনা করিতে পারে। ঈর্ষার ন্যায় কষ্টদায়ক আর কিছুই নাই। সুতরাং ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি সর্বদা মানসিক যন্ত্রণা ও কষ্ট ভোগ করে বলিয়া তাহার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হইল। ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি একাধারে যালিম ও মযলুম, বরং তাহার ন্যায় মযলুম আর কেহই নাই। বিদ্বেষভাজন ব্যক্তির দিক হইতে বিবেচনা করিলে সে যালিম; আর সেই ঈর্ষার ফলে সে নিজেই দুঃখকষ্টে জর্জরিত হয় বলিয়া সে মযলুম। ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তির মৃত্যুর সংবাদে বা সে ঈর্ষা হইতে মুক্তি পাইয়াছে জানিলে বিদ্বেষভাজন ব্যক্তি দুঃখিত হইয়া থাকে। কারণ, সম্পদে অপরে তাহাকে ঈর্ষা করুক এবং ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি দুঃখকষ্টে নিপীড়িত হউক, ইহাই সে কামনা করিয়া থাকে।
বিদ্বেষভাজন ব্যক্তির পারলৌকিক লাভের দিকে লক্ষ্য কর। সে ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি দ্বারা অত্যাচারিত। ঈর্ষার বশীভূত হইয়া কেহ কাহারও নিন্দা করিলে, অপ্রিয় কথা বলিলে এবং কাজ-কারবারের কোন ক্ষতি করিলে ঈর্ষী ব্যক্তির আমলনামা হইতে সওয়াব লইয়া বিদ্বেষভাজন ব্যক্তিকে প্রদান করা হইবে। আর তাহার সওয়াব না থাকিলে বিদ্বেষভাজন ব্যক্তির পাপ ঈর্ষী ব্যক্তির স্কন্ধে চাপানো হইবে। ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি বিদ্বেষভাজন ব্যক্তির পার্থিব সম্পদের বিলোপ কামনা করে। কিন্তু ইহাতে তাহার সম্পদ বিলোপ হয় না, বরং তাহার পারলৌকিক সম্পদ বৃদ্ধি পাইয়া থাকে। অপরপক্ষে, ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি ঈর্ষার দরুণ ইহকালে ভীষণ যন্ত্রণা ও কষ্টভোগ করে, আর পারলৌকিক আযাবের উপকরণস্বরূপ তাহার পাপরাশি পুঞ্জীভূত হইতে থাকে। ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি নিজকে স্বীয় বন্ধু ও বিদ্বেষভাজন ব্যক্তির শত্রু বলিয়া মনে করে, কিন্তু বাস্তবপক্ষে সে স্বীয় শত্রু এবং বিদ্বেষভাজন ব্যক্তির বন্ধু। কেননা, ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি ইহলোকে নিজেকে দুঃখকষ্টে জর্জরিত করিয়া রাখে এবং পরলোকে তাহাকে কঠিন শাস্তির উপযোগী করিয়া তোলে। আলিম ও পরহেযগার ধনবানগণ সৎকর্মে ধন ব্যয় করিতেছে দেখিয়া কেহ তাহাদিগকে আন্তরিক ভালবাসিলে সে স্বয়ং গুণী ও সৎকর্মী না হইলেও সওয়াব পাইবে। কিন্তু মানবের পরম শত্রু শয়তান ইহা সহ্য  করিবে কিরূপে? অতএব, সে লোককে ঈর্ষার বশীভূত করিয়া তাহার সওয়াব নষ্ট করত পরম আনন্দ লাভ করিয়া থাকে। 
আলিম ও দীনদার সৎকর্মী লোকদিগকে ভালবাসা সওয়াব লাভের সহজ উপায়। যে ব্যক্তি তাহাদিগকে ভালবাসিবে কিয়ামতের দিন সে তাহাদের সঙ্গেই অবস্থান করিবে। বুযুর্গগণ বলিয়াছেন- যে ব্যক্তি নিজে আলিম বা ইলম শিক্ষার্থী অথবা আলিম ও ইলম শিক্ষার্থীদিগকে ভালবাসে, সেই সওয়াবের অধিকারী; কিন্তু ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি সওয়াব লাভের এই ত্রিবিধ উপায় হইতেই বঞ্চিত।

ঈর্ষাপরায়ণ লোকের অবস্থা নিতান্ত নির্বোধ ব্যক্তিসদৃশ। 
মনে কর, এক নির্বোধ অপরের প্রতি প্রস্তর নিক্ষেপ করিতে লাগিল। কিন্তু প্রস্তর বিদ্বেষভাজন ব্যক্তির দেহে না লাগিয়া ঘুরিয়া আসিয়া নিক্ষেপকারীর ডান চক্ষুর উপর পতিত হইল এবং তাহার একটি চক্ষু নষ্ট হইয়া গেল। ইহাতে সেই ব্যক্তি ক্রুদ্ধ হইয়া আবার খুব জোরে প্রস্তর নিক্ষেপ করিল। এবারও প্রস্তরটি ফিরিয়া আসিয়া তাহার অপর চক্ষু নষ্ট করিয়া দিল। সে আবার ততোধিক জোরে প্রস্তর নিক্ষেপ করিল, ইহা ফিরিয়া আসিয়া তাহার মস্তক ভাঙ্গিয়া ফেলিল। এইরূপে বারবার প্রস্তর নিক্ষেপ করিতে করিতে সেই ব্যক্তি স্বীয় দেহ ক্ষত-বিক্ষত করিল। বিদ্বেষভাজন ব্যক্তি অক্ষত দেহে নিরাপদে থাকিয়া প্রস্তর নিক্ষেপকারীর দুরাবস্থা দর্শনে হাসিতে লাগিল। ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তিরও ঠিক এইরূপ দুরাবস্থা ঘটিকা থাকে। শয়তান তাহার এই দুর্গতি দেখিয়া উপহাস করিতে থাকে।
ঈর্ষা হইতে উল্লিখিত আপদসমূহ দেখা দেয়। তদুপরি ঈর্ষার বশবর্তী হইয়া কেহ অপরের নিন্দা করিলে, মিথ্যা বলিলে বা সত্য কথা অস্বীকার করিলে, তাহার উপর বিদ্বেষভাজন ব্যক্তির দাবী অধিকতর বৃদ্ধি পাইবে এবং মহাবিচারের দিনে তাহার আমলনামা হইতে সেই পরিমাণে সওয়াব বিদ্বেষভাজন ব্যক্তিকে দেওয়া হইবে। অতএব ঈর্ষার যে সকল ক্ষতির কথা উল্লেখ করা হইল উহা ভালরূপে হৃদয়ঙ্গম করিয়া লইতে পারিলে বুদ্ধিমান মানুষ হলাহল বিবেচনায় ইহা পরিত্যাগ করিতে বাধ্য হইবে। এই সকল বোধকেই ঈর্ষা ব্যাধির জ্ঞানমূলক ঔষধ বলে।

ঈর্ষাপরায়ণ লোকের অনুষ্ঠানমূলক ঔষধ
কঠোর পরিশ্রম ও চেষ্টায় মন হইতে ঈর্ষার কারণগুলি বাহির করিতে হইবে। ক্রোধের বর্ণনাকালে বলা হইয়াছে, অহঙ্কার, ওজ্ব অর্থাৎ নিজেকে নিজে ভাল মনে করা, শত্রুতা, প্রভুত্ব ও সম্মান কামনা, ধনলিপ্সা ইত্যাদি ঈর্ষার মূল কারণ। অতএব, এই কুপ্রবৃত্তিসমূহ হৃদয় হইতে উৎপাটন করিয়া ফেলিবে। এই প্রকার কার্যকে জোলাপ বা বহিষ্কারক ঔষধ বলে। ইহা ব্যবহারের মাধ্যমে ঈর্ষার মূলসমূহ উৎপাটন করিয়া ফেলিলে মনে ঈর্ষা স্থান পাইবে না। অন্তরে ঈর্ষার ভাব উদ্ভব হইলে বিরুদ্ধাচরণে ইহার প্রতিরোধ করিবে। ইহা কাহাকেও তিরস্কার করিতে বলিলে তাহার প্রশংসা করিবে, অহঙ্কার করিতে আদেশ করিলে নম্রতা দেখাইবে, কাহারও সম্পদ বিনাশের চেষ্টায় তৎপর হইতে বলিলে বা কাহারও সঙ্গে শত্রুতা করিবার উস্কানি দিলে বন্ধুভাবে তাহার সাহায্য করিবে।
অগোচরে বিদ্বেষভাজন ব্যক্তির প্রশংসা কীর্তন ও তাহার কার্যে সহায়তা তুল্য উপকারী ঈর্ষার প্রতিষেধক আর কিছুই নাই। এইরূপে অসাক্ষাতে কাহারও প্রশংসা ও সাহায্য করিলে সেই ব্যক্তির অন্তর আনন্দে পুলকিত হইয়া উঠিবে। সেই আনন্দের ছায়া তোমার অন্তরে যাইয়া পড়িবে এবং ইহাতে তোমার হৃদয়ও আনন্দে উদ্ভাসিত হইয়া উঠিবে। তাহা হইলে ঈর্ষা আর কখনও অন্তরে জাগিবে না এবং শত্রুতাও তিরোহিত হইবে; যেমন আল্লাহ্ বলেন :
>“তুমি পাপকে সেই স্বভাব দ্বারা দূর কর যাহা অতি উত্তম। (এইরূপ করিলে) পরে তোমার ও যাহার (যে ব্যক্তির) মধ্যে শত্রুতা আছে, অকস্মাৎ যেন সে (তোমার) অন্তরঙ্গ বন্ধু হইয়া যাইবে।” (সূরা হামীম সিজদা, রুকু ৫, পারা ২৪)।


পরবর্তী পর্ব

ঈর্ষা পোষণে শয়তানের প্ররোচণা

ঈর্ষার পরিচয়


 
   ক্রোধ, বিদ্বেষ ও ঈর্ষা (পর্ব- ১২)
📚সৌভাগ্যের পরশমণি ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

ঈর্ষার পরিচয় 
অপরের সুখ-সম্পদ দর্শনে অসন্তুষ্ট হইয়া মনে কষ্ট অনুভব করা এবং তাহার সেই সুখ-সম্পদ দূর হওয়ার কামনাকে ঈর্ষা বলে। ঈর্ষা হারাম। হাদীসের বিভিন্ন উক্তি, আল্লাহর কার্য ও বিধানের প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তির অসন্তোষ প্রকাশ এবং অপরের সুখ-সম্পদে তাহার ঈর্ষা উদ্রেকের জঘন্য ও ক্ষতিকর মনোভাব ঈর্ষা হারাম হওয়ার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। যে সম্পদ তুমি লাভ করিতে পার নাই, অপরের ভাগ্যে ঘটিয়াছে দেখিয়া তাহা লোপ হউক, তোমার এই মনোভাবকে জঘন্য ও কদর্য ব্যতীত আর কী বলা যাইতে পারে?
📚


পারলৌকিক কার্যে প্রতিযোগিতা মঙ্গলজনক 

অপরের সম্পদ লাভে যদি তুমি অসন্তুষ্ট না হও এবং ইহা নষ্ট হওয়ার কামনাও না কর, অথচ তুমি সেইরূপ সম্পদ পাইতে চাও, তবে তোমার এই প্রকার মনোভাবকে গিত্তা (প্রতিদ্বন্দ্বিতা) এবং মুনাফাসা (প্রতিযোগিতা) বলে। পারলৌকিক কার্যে উহা উত্তম, বরং অবশ্য কর্তব্য। আল্লাহ্ বলেন :

>“আর লালসাকারিগণের পক্ষে এইরূপ জিনিসের প্রতি লালসা করা উচিত।” 

আল্লাহ্ অন্যত্র বলেন :

>“তোমরা আপন প্রভুর ক্ষমার দিকে ধাবিত হও।” 

অর্থাৎ “দৌড়িয়া চল, একজন অপরজন অপেক্ষা অগ্রসর হইতে চেষ্টা কর।”


রাসূলে মাকবূল (সল্লল্লাহু আলায়হে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) বলেন- 

>“দুইটি স্থলে ঈর্ষা হইয়া থাকে। প্রথম- আল্লাহ্ কোন ব্যক্তিকে ধন ও জ্ঞান উভয়ই দান করিয়াছেন, সে স্বীয় ধন জ্ঞান অনুসারে সদ্ব্যবহার করে; অপর ব্যক্তিকে তিনি ধন ব্যতীত শুধু জ্ঞান দান করিয়াছেন, তেমন ব্যক্তি যদি সেই ব্যক্তিকে দেখিয়া বলে- “আল্লাহ্ আমাকেও ধন দান করিলে আমিও তাহার ন্যায় (সৎকার্যে) ব্যয় করিতাম” তাহা হইলে এই দুই ব্যক্তিই সমান সওয়াব পাইবে। আর কেহ যদি পাপকার্যে ধন অপচয় করে এবং অপর ব্যক্তি (ইহা দেখিয়া) বলে- 'আমার ধন থাকিলে আমিও তদ্রূপ (পাপ কার্যে) অপচয় করিতাম', তাহা হইলে এই দুই ব্যক্তিই সমান পাপী হইবে।” 

এই হাদীসে প্রথমোক্ত স্থলে প্রথম ব্যক্তির ধন-দৌলতের সমান দ্বিতীয় ব্যক্তির ধন লাভের ইচ্ছাকে ‘মুনাফাসাত' না বলিয়া ‘হাসাদই' বলা হইয়াছে। কিন্তু ইহাতে প্রথম ব্যক্তির ধন-দৌলত লাভে দ্বিতীয় ব্যক্তির মনে বিরক্তি, অসন্তোষ ও সেই ধন বিলুপ্তির কামনা নাই।বিরক্তি কোন স্থলেই জায়েয নহে।


কুকর্ম সহায়ক সম্পদের বিনাশ-কামনা সঙ্গত 

কাহারও সম্পদ বিলোপের কামনা সঙ্গত নহে; কিন্তু যে সম্পদ দুরাচার ও অত্যাচারীর হস্তগত হইলে তাহাদের অপকর্ম ও অত্যাচারের কারণ হয়, উহার বিলোপ কামনা জায়েয। বাস্তবপক্ষে, ইহা সম্পদ বিলোপের কামনা নহে, বরং অপকর্ম ও অত্যাচারের প্রতিরোধ কামনামাত্র। কিন্তু দুরাচার ও অত্যাচারীর সম্পদ বিনাশের কামনা বাস্তবপক্ষে তাহাদের অপকর্ম ও অত্যাচার প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে হইল কিনা ইহা বুঝিবার উপায় এই— তাহারা তওবা করিয়া অপকর্ম ও অত্যাচার হইতে নিরস্ত হইলে তাহাদের সম্পদ বিলোপের কামনা তোমাদের অন্তরে যদি না থাকে, তবে মনে করিবে, ইহা পাপকর্ম প্রতিরোধের জন্যই ছিল। কিন্তু তখনও তোমাদের অন্তরে তাহাদের সম্পদ বিলোপের কামনা থাকিলে বুঝিবে, ইহা ঈর্ষা ব্যতীত আর কিছুই নহে।

সম্পদের অসমতায় ঈর্ষার উৎপত্তি

এ স্থলে একটি সুক্ষ্ম বিষয় বর্ণনা করা হইতেছে। মনে কর, আল্লাহ্ কাহাকেও কোন বিশেষ সম্পদ দান করিলেন। অপর ব্যক্তিও এইরূপ সম্পদের জন্য লালায়িত হইল, কিন্তু কিছুতেই সে ইহা লাভ করিতে পারিল না। এমতাবস্থায়, সম্পদের অসমতা দেখিয়াই তাহার মন বিরক্ত হইয়া উঠিল। তখন সম্পদশালীর সম্পদ বিনাশ হইয়া অসমতা বিদূরীত হইলে তাহার মনঃকষ্ট দূর হইতে পারে। অপরের সম্পদ দেখিলেই মানব মনে ইহার অভিলাষ হয়। কিন্তু ইহা অর্জনে অসমর্থ হইয়া অপরের সম্পদ বিনাশের কামনা করাই ক্ষতিকর বলা চলে না। কিন্তু এইরূপ সম্পদ প্রত্যাশী ব্যক্তি সম্পদশালীর বিষয়ে অবাধ ক্ষমতা পাইলেও সে ইহা বিনাশ না করিলে বা ছিনাইয়া না লইলে মনে করিবে, তাহার হৃদয়ে ঈর্ষা নাই। এমতাবস্থায়, অপরের সমান সম্পদ লাভের কামনা অন্তরে থাকিলেই সে আল্লাহর বিচারে দায়ী হইবে না।



পরবর্তী পর্ব

ঈর্ষা দমনের উপায়

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...