বিনয় —
আমরা যেখানে অহংকার ও গর্বের নিন্দা লিপিবদ্ধ করেছি, সেখানে কিছুটা বিনয়ের ফযীলত লেখাও সমীচীন মনে হয়।
রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন, –“ক্ষমার কারণে আল্লাহ তা'আলা কেবল বান্দার ইযযতই বৃদ্ধি করেন এবং আল্লাহর জন্যে যে বিনয়ী হয়, আল্লাহ তাকে উঁচুতে তুলে দেন।”
এক হাদীসে আছে, – ”প্রত্যেক ব্যক্তির সাথে দু'জন ফেরেশতা রয়েছে। তারা বলগার সাহায্যে তাকে নিমন্ত্রণ করে। যদি সে ব্যক্তি নিজেকে উঁচু করে, তবে ফেরেশতারা বলগা টেনে ধরে এবং বলে ইলাহী, তুমি এই ব্যক্তিকে নিচু করে দাও। আর যদি বিনয় ও আনুগত্য করে, তবে ফেরেশতারা দোয়া দেয় এবং বলে, ইলাহী, একে উঁচু কর।”
আরও বলা হয়েছে- ”সে ব্যক্তি সুখী, যে দরিদ্র না হয়েও বিনয় করে, সৎপথে উপার্জিত ধন ব্যয় করে, অবহেলিত ও দরিদ্রদের প্রতি দয়া করে এবং জ্ঞানীদের সাথে সাক্ষাৎ করে।”
আবূ সালমা মুদায়নী তার পিতার কাছ থেকে বর্ণনা করেন যে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) রোযা রেখে মসজিদে কুবায় অবস্থান করছিলেন। ইফতারের সময় আমরা এক পিয়ালা দুধের সাথে সামান্য মধু মিশ্রিত করে পেশ করলাম । তিনি তা মুখে দিয়ে যখন মধুর স্বাদ আস্বাদন করলেন, তখন জিজ্ঞেস করলেন: এটা কি? আমরা বললাম : দুধের সাথে সামান্য মধু মিশ্রিত করেছি । তিনি পিয়ালা রেখে দিলেন এবং বললেন : আমি একে হারাম করি না । এরপর তিনি নিম্নোক্ত বাক্যাবলী উচ্চারণ করলেন
“যে আল্লাহর ওয়াস্তে বিনয় করে, আল্লাহ তাকে উঁচু করেন। যে অহংকার করে আল্লাহ তাকে নিচে নামিয়ে দেন । যে মধ্যপথ অবলম্বন করে, আল্লাহ তাকে ধনী করেন । যে অপব্যয় করে, আল্লাহ তাকে ফকীর করেন, আর যে আল্লাহর যিকির করে আল্লাহ তাকে বন্ধু করে নেন।”
এক হাদীসে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন-- ”আমার পালনকর্তা আমাকে দু'টি বিষয়ের যে কোন একটি বেছে নেয়ার ক্ষমতা দিলেন- হয় আমি দাস ও রসূল হব, না হয় বাদশাহ ও নবী হব। কিন্তু কোন্টি বেছে নিব তা নিয়ে সংশয় করলাম । ফেরেশতাদের মধ্যে আমার বন্ধু জিবরাঈল উপস্থিত ছিলেন । আমি তার দিকে মাথা তুলে তাকালে তিনি বললেন : আল্লাহর সামনে বিনয় করুন । সেমতে আমি আরয করলাম : আমি বান্দা ও রসূল হতে চাই।”
হযরত মূসা (আ.)-এর প্রতি আল্লাহ তা'আলা এই মর্মে ওহী করেন যে,
>"আমি এমন ব্যক্তির নামায কবুল করি, যে আমার মাহাত্ম্যের সামনে বিনয়ী হয়, আমার বান্দাদের সাথে অহংকার করে না, অন্তরে আমার ভয় রাখে, অষ্টপ্রহর আমাকে স্মরণ করে এবং আমার খাতিরে নিজেকে কামনা-বাসনা থেকে বিরত রাখে।"
এক হাদীসে বলা হয়েছে : “মহত্ত্ব হচ্ছে খোদাভীতি, গৌরব হচ্ছে বিনয় এবং বিশ্বাস হচ্ছে ধনাঢ্যতা।”
হযরত ঈসা (আ.) বলেন, – "সুসংবাদ তাদের জন্যে, যারা দুনিয়াতে বিনয়ী হয়। তারা কিয়ামতে মিম্বরের উপর উপবেশন করবে। সুসংবাদ তাদের জন্যে, যারা দুনিয়াতে মানুষের মধ্যে শান্তি স্থাপন করে। কিয়ামতে তারা জান্নাতুল ফেরদাউসের অধিকারী হবে। সুসংবাদ তাদের জন্যে, যারা দুনিয়াতে আপন অন্তরকে পাক রাখে। কিয়ামতে তাদের আল্লাহর দীদার নসীব হবে।"
অন্য এক হাদীসে আছে– ”চারটি বিষয় এমন রয়েছে, যা কেবল সে ব্যক্তি পায়, যাকে আল্লাহ বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করে নেন–
(১) চুপ থাকা- যা এবাদতের সূচনা,
(২) আল্লাহর উপর ভরসা করা,
(৩) বিনয় এবং
(৪) সংসারবিমুখতা।
হযরত ইবনে আব্বাস বর্ণিত রেওয়ায়েতে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন : "যে ব্যক্তি বিনয় অবলম্বন করে, আল্লাহ তা'আলা তাকে সপ্তম আকাশ পর্যন্ত উচ্চতা দান করেন।"
রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) একদিন সাহাবায়ে কেরামকে বললেন : “ব্যাপার কি, আমি তোমাদের মধ্যে এবাদতের মিষ্টতা পাইনা কেন?" তারা আরয করলেনঃ এবাদতের মিষ্টতা কি? তিনি বললেন : 'বিনয়'।
হযরত উমর (র.) বলেন : যখন বান্দা আল্লাহর ওয়াস্তে বিনয় অবলম্বন করে, তখন আল্লাহ্ তা'আলা তার জ্ঞান-গরিমা বাড়িয়ে দেন। আর যখন অহংকার ও যুলুম করে, তখন তাকে ভূগর্ভে বিলীন করে দেন এবং আদেশ করেন- দূর হ ! আল্লাহ তোকে দূর করেছেন। এরূপ ব্যক্তি স্বজ্ঞানে বড় হলেও মানুষের দৃষ্টিতে ছোট।
হযরত ফুযায়ল (রহ.)-কে কেউ বিনয় সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি বললেন : "বিনয় হচ্ছে সত্যের সামনে বিনম্র ও অনুগত হওয়া যদিও সেই সত্য কোন বালক অথবা মূর্খের মুখ দিয়ে প্রকাশ পায়।"
ইবনে মোবারক বলেন : "বিনয় হচ্ছে নিজেকে সে ব্যক্তির চেয়ে কম মনে করা, যে পার্থিব নেয়ামতে তোমার চেয়ে কম এবং নিজেকে সেই ব্যক্তির চেয়ে অধিক মনে করা, যে পার্থিব নেয়ামতে তোমার চেয়ে বেশী।"
কাতাদাহ (রা.) বলেন : "যে ব্যক্তি ধন, রূপ অথবা জ্ঞান প্রাপ্ত হয়ে তাতে বিনয় করে না, কিয়ামতে এসব বিষয় তার জন্য শাস্তির কারণ হয়ে যাবে।"
হযরত কা'ব (র.) বলেন : "আল্লাহ তা'আলা বান্দাকে দুনিয়াতে যে নেয়ামত দান করেন, সে যদি তার শোকর করে এবং আল্লাহর ওয়াস্তে বিনয় প্রদর্শন করে, তবে আল্লাহ তা'আলা সেই নেয়ামতের উপকার তাকে দুনিয়াতেও দান করেন এবং আখেরাতেও তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন।
পক্ষান্তরে যদি বান্দা সেই নেয়ামতের শোকর এবং বিনয় প্রদর্শন না করে, তবে আল্লাহ তা'আলা দুনিয়াতেও তার উপকার মওকুফ রাখেন এবং আখেরাতে তার জন্যে জাহান্নামের স্তর খুলে দেন।"
হযরত সোলায়মান (আ.)-এর রীতি ছিল যে, তিনি সকালে বড়লোক, ধনাঢ্য ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের দিকে মনোযোগ দিতেন, এরপর ফকীর ও মিসকীনদের মধ্যে আসতেন এবং তাদের কাছে এই বলে বসে যেতেন যে, মিসকীন মিসকীনদের মধ্যেই এসেছে।
বর্ণিত আছে, একবার ইউসুফ, আইয়ুব ও হাসান (রহ.) পথে বের হলেন। চলতে চলতে বিনয় সম্পর্কে আলোচনা শুরু হল। হযরত হাসান জিজ্ঞেস করলেন: "বিনয় কি জান?- বিনয় হল গৃহ থেকে বের হওয়ার পর পথিমধ্যে যে মুসলমানের সাথে দেখা হয়, তাকে নিজের চেয়ে উত্তম মনে করা।"
হযরত মুজাহিদ বলেন: যখন নূহ (আ.)-এর সম্প্রদায় মহাপ্লাবনে নিমজ্জিত হল, তখন প্রত্যেক পাহাড় একে অপরের সাথে পাল্লা দিয়ে উঁচু হতে লাগল। কিন্তু জুদী পাহাড় বিনয় অবলম্বন করল। আল্লাহ তা'আলা তাকে উচ্চ মর্যাদা দান করলেন এবং নূহ (আ.)-এর নৌকা তার উপর অবস্থান নিল।
যিয়াদ নুমায়রী বলেনঃ "যে দরবেশের মধ্যে বিনয় নেই, সে ফলহীন বৃক্ষসদৃশ।"
হযরত আবূ ইয়ায়ীদ বুস্তামী (রহ.) বলেন : "ব্যক্তি যতক্ষণ মনে করে যে, মানুষের মধ্যে তার চেয়েও নিকৃষ্ট কেউ আছে, ততক্ষণ সে অহংকারী।" লোকেরা প্রশ্ন করল : তা হলে বিনয়ী কখন হবে? তিনি বললেন: যখন নিজের জন্যে কোন স্থান ও মর্যাদা চিন্তা না করে। মানুষ যে পরিমাণে আল্লাহকে ও নিজেকে চিনে, সে পরিমাণে বিনয়ী হয়।
ইয়াহইয়া ইবনে খালেদ বারমাকী (রহ.) বলেন : "ভদ্রলোক এবাদতকারী হলে বিনয়ী হয় এবং নির্বোধ ও অভদ্র ব্যক্তি এবাদতকারী হলে নিজেকে বুযুর্গ মনে করতে থাকে।"
হযরত ইয়াহইয়া ইবনে মুয়ায বলেনঃ "যে ব্যক্তি ধন-সম্পদের কারণে তোমার সাথে অহংকার করে, তার সাথে তোমার অহংকার করাই বিনয়।"
আল্লাহ তা'আলা আমাদের সকলকে বিনয় দান করুন। আমিন॥
পরবর্তী পর্ব







