বুধবার, ২৬ জুলাই, ২০২৩

তওবা - (পর্ব - ৫) প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে তওবা অপরিহার্য



তওবা - (পর্ব - ৫) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
 
প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে তওবা অপরিহার্য—
সকলের জন্যে তওবার অপরিহার্যতা নিম্নোক্ত আয়াত দ্বারা প্রমাণিত : 

>“হে মুমিনগণ, তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা কর, যাতে সফলকাম হও”। 

এ আয়াতে ব্যাপকভাবে সম্বোধন করা হয়েছে। বুদ্ধি-বিবেকের আলোকেও এই অপরিহার্যতা হৃদয়ঙ্গম করা যায়। কেননা, তওবার অর্থ হচ্ছে, যে পথ আল্লাহ থেকে দূরে এবং শয়তানের কাছে। সে পথ থেকে ফিরে আসা উচিত। এই ফিরে আসার কাজটি বুদ্ধিমান ব্যক্তি দ্বারাই সম্ভবপর। কাম, ক্রোধ ও অন্যান্য নিন্দনীয় স্বভাব হচ্ছে মানুষকে বিপথগামী করার জন্যে শয়তানের হাতিয়ার। এগুলো যখন পূর্ণতা লাভ করে, তখন মানুষের বুদ্ধি পূর্ণতা লাভ করে। সাধারণত চল্লিশ বছর বয়সে বুদ্ধি পূর্ণাঙ্গ হয়ে থাকে এবং তার ভিত্তি যৌবনে পা রাখার সাথে সাথে পূর্ণ হয়ে যায়। এ ভিত্তির সূচনা হয় সাত বছর বয়স থেকে। কিন্তু কাম ও ক্রোধ পূর্ব থেকেই বিদ্যমান থাকে। এগুলো হচ্ছে শয়তানের বাহিনী এবং বুদ্ধি ফেরেশতাদের বাহিনী। যখন উভয় বাহিনী মুখোমুখি হয়, তখন তাদের মধ্যে যুদ্ধ অবশ্যই সংঘটিত হয়। কেননা – এরা পরস্পর বিরোধী শক্তি। একের উপস্থিতিতে অন্যের কায়েম থাকা সম্ভব নয়। যেমন রাত ও দিন এবং অন্ধকার ও আলো একত্রে অবস্থান করতে পারে না। এ যুদ্ধে যে পক্ষ বিজয়ী হয়, সে অপর পক্ষের মূলোচ্ছেদ করে। কাম ও ক্রোধ শৈশবেই পূর্ণাঙ্গ হয়ে যায় বিধায় শয়তানের ব্যূহ বুদ্ধির পূর্বেই প্রতিষ্ঠিত  হয়ে যায়।

তাই স্বভাবতই কামনার দাবীর প্রতি মানুষের টান ও মোহ প্রবল হয়ে উঠে এবং এ থেকে উদ্ধার পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এরপর যখন বুদ্ধি প্রকাশ পায়, তখন যদি তা শক্তিশালী ও পূর্ণাঙ্গ না হয়, তবে যুদ্ধের ময়দান শয়তানের হাতেই থাকে এবং সে কোরআনে উল্লিখিত এই প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করে নেয় অর্থাৎ, 

>“আমি আদম সন্তানদেরকে অল্পসংখ্যক বাদে অবশ্যই বিপথগামী করব”।

পক্ষান্তরে যদি বুদ্ধি পূর্ণাঙ্গ ও শক্তিশালী হয়, তবে প্রথমে সে শয়তান বাহিনীর মূলোচ্ছেদ করতে শুরু করে। এ জন্যে কামনাকে চূর্ণ করে, অভ্যাস ত্যাগ করে এবং মনকে বলপূর্বক এবাদতে ফিরিয়ে আনে। 

বলা বাহুল্য, তওবার উদ্দেশ্য তাই। অর্থাৎ, ফিরে আসার কাজটি এখানেও পাওয়া যায়। যেহেতু কাম বুদ্ধির পূর্বে অস্তিত্ব লাভ করে, তাই যে কাজ বুদ্ধির পূর্বে করা হয়, তা থেকে ফিরে আসা অর্থাৎ তওবা করা প্রত্যেক মানুষের জন্যে অত্যাবশ্যক। সে নবী-রসূল কিংবা সাধারণ মানুষ যেই হোক। কাজেই এরূপ মনে করা উচিত নয় যে, তওবার প্রয়োজন বিশেষভাবে হযরত আদম (আঃ) এর জন্যেই ছিল; বরং এটা একটা আদি বিধান; যা মানুষ মাত্রের জন্যেই জরুরী। এর অন্যথা হওয়া সম্ভব নয়। অতএব, যে ব্যক্তি বালেগ হয়, সে যদি কুফর ও মূর্খতার উপর থাকে, তবে এসব বিষয় থেকে তওবা করা তার উপর ওয়াজিব। যদি সে পিতামাতার অনুগামী হয়ে মুসলমান হয়, তবে ইসলামের স্বরূপ সম্পর্কে অবশ্যই গাফেল ও অজ্ঞ। এ ক্ষেত্রে এই গাফলতি ও অজ্ঞতা থেকে তওবা করা ওয়াজিব। তাকে ইসলামের সঠিক অর্থ বুঝতে হবে। কেননা, তার পিতামাতার ইসলাম তার জন্যে উপকারী হবে না যে পর্যন্ত নিজে মুসলমান না হবে। ইসলামকে বুঝার পর নিজের অভ্যাস ও কামনা চরিতার্থ করার জন্যে অহেতুক স্বেচ্ছাচারপ্রীতি থেকে ফিরে আসা অপরিহার্য।অর্থাৎ, প্রত্যেক করণীয় ও বর্জনীয় কাজে আল্লাহ তা'আলার নির্ধারিত সীমা মেনে চলতে হবে। সীমার বাইরে এক পাও রাখা যাবে না। এ প্রকার তওবা সর্বাধিক কঠিন। অধিকাংশ লোক এতে অক্ষম হয়ে বরবাদ হয়ে যায়। 


উপরোক্ত আলোচনা থেকে জানা গেল যে, তওবা প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে ফরযে আইন৷ এরূপ কোন ব্যক্তির কল্পনা করা যায় না, যার তওবার প্রয়োজন নেই। হযরত আদম (আঃ) তওবা থেকে বেপরওয়া হননি। তেমনি তাঁর সন্তানরাও এ থেকে বেপরওয়া হতে পারেননা। এখন জানা দরকার যে, তওবা সর্বদা ও সর্বাবস্থায় ওয়াজিব। 


পরবর্তী পর্ব

তওবা সর্বদা ও সর্বাবস্থায় ওয়াজিব  

তওবা - (পর্ব - ৪) তওবা সম্পর্কে উক্তি সমূহ



তওবা - (পর্ব - ৪) 

📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

তওবা সম্পর্কে উক্তি সমূহ—
তওবা সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা, রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) ও পূর্ববর্তী মনীষীগণের উক্তি—

আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেন  : 

> “হে মুমিনগণ, তোমরা সম্মিলিতভাবে আল্লাহর সামনে তওবা কর — যাতে সফলকাম হও“। 

এখানে সকল ঈমানদারকে তওবা করার ব্যাপক আদেশ করা হয়েছে।

> “তোমরা যারা ঈমান এনেছো শুন, তোমরা আল্লাহর সামনে পরিষ্কার মনে তওবা কর।” 

এ আয়াতে “নাসূহ” শব্দ ব্যবহার করে বুঝানো হয়েছে যে, আল্লাহর জন্যে খাঁটি ও অবিমিশ্র তওবা কর। 

> “আল্লাহ ভালবাসেন তওবাকারীকে এবং ভালবাসেন পবিত্রতা অবলম্বনকারীকে ।” এ আয়াতটি তওবার ফযীলত জ্ঞাপন করে। 

রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন  : 

> “যে গোনাহ থেকে তওবা করে, সে সেই ব্যক্তির মত, যার কোন গোনাহ নেই।” 

এক হাদীসে দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা হয়েছে- এক ব্যক্তি সফর করতে করতে এক প্রতিকূল জায়গায় বিশ্রামের জন্যে যাত্রা বিরতি করল। সঙ্গে তার পাথেয় বহনকারী উট। লোকটি মাটিতে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পর জাগ্রত হয়ে দেখল তার উটটি নেই। সে ক্ষোভে ও দুঃখে ম্রিয়মাণ হয়ে উটটিকে খুঁজতে লাগল। অবশেষে যখন রৌদ্রতাপ, পিপাসা ও ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়ল, তখন মনে মনে বললঃ আমি যেখানে ছিলাম, সেখানেই চলে যাব এবং মৃত্যুর অপেক্ষায় শুয়ে থাকব। সেমতে সেখানে পৌঁছে মাথার উপর হাত রেখে শুয়ে পড়ল এবং তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পর চোখ খুলতেই দেখল পাথেয় বহনকারী উটটি শিয়রের কাছেই দাঁড়িয়ে আছে। উটটি ফিরে পাওয়ার কারণে এই ব্যক্তির যে আনন্দ হতে পারে, তার চেয়ে অনেক বেশী আল্লাহ তা'আলা মুমিন বান্দার তওবার কারণে আনন্দিত হন। 


> হযরত হাসান (রঃ) বর্ণনা করেন, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আঃ)-এর তওবা কবুল করলে পর ফেরেশতারা তাঁকে মোবারকবাদ দিল। হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁর কাছে এসে বললেনঃ হে আদম, আল্লাহ তা'আলা আপনার তওবা কবুল করায় আপনার কলিজা ঠাণ্ডা হয়েছে নিশ্চয়? হযরত আদম (আঃ) জওয়াব দিলেন জিবরাঈল, যদি তওবা কবুল করার পরও আমাকে সওয়াল করা হয়, তবে আমার ঠিকানা কোথায় হবে?

তখনই তাঁর প্রতি ওহী আগমন করল- হে আদম, তুমি তোমার সন্তানদের জন্যে দুঃখকষ্টও রেখে গেলে এবং তওবাও। অতএব, তাদের মধ্যে যে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব, যেমন তোমার ডাকে সাড়া দিয়েছি। আর যে আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে, আমি কৃপণতা করব না। কেননা, আমার নাম “করীব” (নিকটবর্তী) এবং “মুজীব” (সাড়া দানকারী)। হে আদম, আমি তওবাকারীদেরকে কবর থেকে যখন উত্থিত করব, তখন তারা আসতে থাকবে এবং সুসংবাদ শুনতে থাকবে। তারা যে দোয়া করবে, তা কবুল হবে। 

মোটকথা, তওবার সংজ্ঞা হচ্ছে বর্তমানে গোনাহ পরিত্যাগ করা এবং ভবিষ্যতে তা না করার জন্যে সংকল্পবদ্ধ হওয়া, সাথে সাথে অতীতের ত্রুটি-বিচ্যুতি পূরণ করে নেয়া। 

এই তওবা তাৎক্ষণিকভাবে ওয়াজিব। কেননা, গোনাহকে ক্ষতিকর মনে করা ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং যে ব্যক্তি গোনাহ পরিত্যাগ করে না, তার মধ্যে ঈমানের এই অংশটি অনুপস্থিত। 

নিম্নোক্ত হাদীসে এ কথাই বুঝানো হয়েছে— 

> “যিনাকার ব্যক্তি যখন যিনা করতে থাকে, তখন সে ঈমানদার থাকে না। অর্থাৎ যিনা যে আল্লাহর অসন্তোষ সৃষ্টিকারী একটি গোনাহ, এ বিষয়ের ঈমান যিনাকারের মধ্যে থাকে না। এর অর্থ এই নয় যে, তার মধ্যে মূল ঈমানই থাকে না; অর্থাৎ আল্লাহর অস্তিত্ব স্বীকার করা। অতএব বুঝা গেল, আল্লাহকে জানা, তাঁর একত্ব স্বীকার করা, তাঁর গুণাবলী, ঐশী গ্রন্থসমূহ এবং রসূলগণের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা যিনার পরিপন্থী নয়। তাই যিনার কারণে এই ঈমান বিনষ্ট হবে না। 

উদাহরণতঃ কোন চিকিৎসক রোগীকে বলল  : এটা বিষ। এটা খেয়ো না। যদি রোগী সেই বস্তু খেয়ে ফেলে, তবে বলা হবে যে, সে চিকিৎসকের এ কথাটির সত্যতা স্বীকার করে না এবং এর অর্থ এই হবে না যে  সে চিকিৎসকের অস্তিত্ব এবং তার চিকিৎসক হওয়া বিশ্বাস করে না। এ থেকে জানা গেল যে, গোনাহগার ব্যক্তি পূর্ণ ঈমানদার হয় না এবং ঈমান একই বস্তু বিশ্বাস করার নাম হয় না; বরং এর সত্তরের উপর শাখা রয়েছে। তন্মধ্যে সর্বোচ্চ শাখা হচ্ছে কালেমা তাইয়েবার সাক্ষ্য দেয়া এবং নিম্নতম শাখা হচ্ছে রাস্তা থেকে ক্ষতিকর বস্তু সরিয়ে দেয়া৷ 


ঈমানের সঠিক দৃষ্টান্ত হচ্ছে মানুষ। আত্মার অনুপস্থিতিতে যেমন মানুষ মানুষ হয় না, তেমনি একত্ববাদ স্বীকার না করলে ঈমান ঈমান হয় না। যে ব্যক্তি কেবল তাওহীদ ও রেসালতের সাক্ষ্য দেয় এবং আমলে ত্রুটি করে, সে এমন মানুষের মত, যার হাত, পা, চক্ষু, কর্ণ ইত্যাদি বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নেই। এরূপ মানুষের মৃত্যু যেমন অতি নিকটে, তেমনি যে ব্যক্তি কেবল কালেমা তাইয়েবা ও রেসালতের সাক্ষ্য দেয়, সেও এই অবস্থার কাছাকাছি। সামান্য ঝড়ো হাওয়ায় তার ঈমানের বৃক্ষ সমূলে উৎপাটিত হয়ে যায়। অর্থাৎ মৃত্যুদূতের আগমনের সময় যে ভীতিপ্রদ পরিস্থিতির উদ্ভব হয়, তার কারণে ঈমান উধাও হয়ে যায়। দুর্বল ঈমান এই পরিস্থিতি বরদাশত করতে পারে না । এরূপ মুমিনের “খাতেমা” তথা জীবনাবসান শুভ না হওয়ার আশংকা থাকে। খাতেমার সময় সেই ঈমানই বাকী থাকে, যার ভিত্তি সার্বক্ষণিক আনুগত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। 

কোন কোন গোনাহগার ব্যক্তি আনুগত্যশীল ব্যক্তিকে বলে, আমার মধ্যে ও তোমার মধ্যে পার্থক্য কি? তুমিও ঈমানদার, আমিও ঈমানদার। যেমন লাউগাছ দেবদারু গাছকে বলেছিল, আমিও বৃক্ষ, তুমিও বৃক্ষ। কাজেই আমাদের মধ্যে কোন তফাৎ নেই। কিন্তু জওয়াবে দেবদারু গাছ বলেছিল, নামের অভিন্নতার এই বিভ্রান্তি তোমার তখন দূর হবে, যখন কালবৈশাখীর ঝড় আসবে। তখন তোমার শিকড় উপড়ে যাবে এবং পাতা ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। আর আমি পূর্ববৎ সগর্বে দাঁড়িয়ে থাকব। সুতরাং গোনাহগার ব্যক্তি যদি দোযখ বাসকে ভয় না করে এবং মৃত্যুর পরওয়া না করে, তবে তাকে বলা হবে দেখ, সুস্থ-সবল ব্যক্তি অসুখ-বিসুখের আশংকা করে এবং যখন অসুস্থ হয়ে যায়, তখন মৃত্যুকে  ভয় করে। এমনিভাবে গোনাহগারেরও উচিত অশুভ খাতেমাকে ভয় করা। যদি খোদা না করুন, খাতেমা খারাপ হয়, তবে দোযখের অগ্নিতে থাকা জরুরী। কেননা, ঈমানের জন্যে গোনাহ তেমনি, যেমন দেহের জন্যে ক্ষতিকর খাদ্য। ক্ষতিকর খাদ্য পাকস্থলীতে একত্রিত হয়ে আস্তে আস্তে পিত্তাদির মেযাজ বিগড়াতে থাকে, যা মানুষ টের পায় না। এরপর হঠাৎ সে রুগ্ন হয়ে পড়ে এবং মৃত্যুবরণ করে। গোনাহ ঈমানের মধ্যে এমনিভাবে প্রভাব বিস্তার করে এবং একদিন ঈমানকেই ডুবিয়ে দেয়। সুতরাং ধ্বংসশীল দুনিয়াতে মৃত্যুর ভয়ে যখন বিষাক্ত ও ক্ষতিকর খাদ্য না খাওয়া তাৎক্ষণিক ওয়াজিব, তখন চিরন্তন ধ্বংসের ভয়ে ধ্বংসাত্মক কাজকর্ম না করা আরও উত্তমরূপে তাৎক্ষণিক ওয়াজিব হবে।


বিষপানকারী স্বীয় ভুলের জন্যে অনুতপ্ত হয়ে যেমন তৎক্ষণাৎ উদরকে বিষমুক্ত করার জন্যে বমি করতে অথবা অন্য কোন উপায় অবলম্বন করতে সচেষ্ট হয়, তেমনিভাবে যে গোনাহ করে, তার জন্যে গোনাহ থেকে তৎক্ষণাৎ ফিরে আসা ওয়াজিব। 

এরপর যতদিন সে জীবিত থাকে, ততদিন এই ক্ষতিপূরণ করতে সচেষ্ট হবে। সুতরাং গোনাহগারের উচিত দ্রুত তওবার প্রতি মনোনিবেশ করা। নতুবা গোনাহের বিষক্রিয়ার ফলে ঈমানের আত্মা প্রভাবিত হয়ে যাবে। এরপর ওয়ায-নসীহত কোন উপকারে আসবে না এবং গোনাহগার ব্যক্তি ধ্বংসপ্রাপ্তদের তালিকাভুক্ত হয়ে নিম্নোক্ত আয়াতের প্রতীক হয়ে যাবে-  

> “আমি তাদের গলদেশে চিবুক পর্যন্ত বেড়ি পরিয়েছি, ফলে তারা ঊর্ধ্বমুখী হয়ে গেছে। আমি তাদের সামনে ও পেছনে প্রাচীর স্থাপন করেছি' এবং তাদের দৃষ্টি আচ্ছন্ন করে দিয়েছি। ফলে, তারা দেখতে পায় না। আপনি তাদেরকে সতর্ক করুন বা না করুন, তারা ঈমান আনবে না।” 

এ আয়াতগুলো কাফেরদের সম্পর্কে বলা হয়েছে- এরূপ মনে করে বিভ্রান্ত হওয়া ঠিক নয়। কেননা, পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে যে, ঈমানের শাখা সত্তরেরও বেশী এবং যিনাকার মুমিন অবস্থায় যিনা করে না। এ থেকে জানা যায়, যে ব্যক্তি শাখার অনুরূপ ঈমান থেকে বঞ্চিত হবে, সে খাতেমার সময় মূল ঈমান থেকেও বঞ্চিত হবে, যেমন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যা আত্মার শাখা, তা না থাকলে মানুষের মূল আত্মাও বিলুপ্ত হয়ে যায়। কেননা, শাখা ব্যতীত মূল কায়েম থাকতে পারে না।



পরবর্তী পর্ব

প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে তওবা অপরিহার্য

তওবা - (পর্ব - ৩) তওবার ফযীলত ও আবশ্যকতা



তওবা - (পর্ব - ৩) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

তওবার ফযীলত ও আবশ্যকতা—
কোরআনের আয়াত ও হাদীস শরীফ দ্বারা তওবার আবশ্যকতা প্রমাণিত। যার অন্তশ্চক্ষু উন্মুক্ত এবং যার বক্ষ ঈমানের আলোকে আলোকিত, তার কাছেও এর প্রয়োজনীয়তা সুস্পষ্ট। এরূপ ব্যক্তি অজ্ঞতার অন্ধকারের মধ্যেও এই আলোকের সাহায্যে সম্মুখে অগ্রসর হতে পারে। প্রতি পদক্ষেপে একজন পথপ্রদর্শক সঙ্গে থাকা তার জন্য জরুরী নয়। যারা আল্লাহর পথে চলে, তাদের কেউ কেউ অন্ধ হয়ে থাকে। কারও সাহায্য ব্যতিরেকে সম্মুখে পা বাড়াতে পারে না। আবার কেউ কেউ চক্ষুষ্মান হয়ে থাকে। একবার পথে পা রাখলে আপনা-আপনিই অগ্রসর হতে থাকে। 

প্রথম প্রকার লোক ধর্মের পথে প্রতি পদক্ষেপে কোরআনের আয়াত অথবা হাদীস শুনার মুখাপেক্ষী হয়। পরিষ্কার আয়াত অথবা হাদীস পাওয়া কঠিন হলে মাঝে মাঝে তারা হতভম্ব হয়ে পড়ে। কঠোর পরিশ্রম করা এবং দীর্ঘায়ু লাভ করা সত্ত্বেও তাদের ভ্রমণ সংক্ষিপ্ত হয়ে থাকে এবং পদক্ষেপও ছোট হয়। 

পক্ষান্তরে দ্বিতীয় প্রকার লোকের বক্ষ আল্লাহ তা'আলা দ্বীনের জন্য উন্মুক্ত করে দেন বিধায় তারা সামান্য ইঙ্গিত পেয়েই কঠিন কঠিন পথ অতিক্রম করতে সক্ষম হয়। তারা কোরআন পাকের এই আয়াতের অনুরূপ-

>“আগুনের ছোঁয়া না পেয়েও তার তৈল যেন জ্বলতে থাকে।”

  অর্থাৎ, সামান্য ইঙ্গিতই তাদের জন্যে যথেষ্ট হয়। আর পূর্ণরূপে বলে দেয়ার পর তাদের অবস্থা এই দাঁড়ায়--

>“আলোর উপর আলো।”  

আল্লাহ যাকে ইচ্ছা, তাঁর আলোর পথ দেখান। এরূপ লোকদের জন্যে প্রতিক্ষেত্রে কোরআন ও হাদীসের প্রয়োজন নেই। তারা তওবার আবশ্যকতা জানতে চাইলে প্রথমে অন্তশ্চক্ষুর আলোকে তওবা কি তা দেখে, অতঃপর আবশ্যকতার অর্থ বুঝে, এরপর উভয়টিকে মিলিয়ে জেনে নেয় যে, তওবার প্রয়োজনীয়তা প্রমাণিত। 


উদাহরণতঃ তারা প্রথমে জানে যে, ওয়াজিব ও জরুরী তাই, যা চিরন্তন সৌভাগ্য পর্যন্ত পৌঁছা এবং চিরন্তন ধ্বংস থেকে আত্মরক্ষার জন্যে জরুরী। 

এরপর তারা বুঝে যে, কিয়ামতে আল্লাহর দীদার ব্যতীত কোন সৌভাগ্য নেই। যে এ থেকে বঞ্চিত হয়, সে হতভাগ্য। এতটুকু জানার পর তাদের কোন সন্দেহ থাকে না যে, আল্লাহর নৈকট্য লাভ করার জন্যে সেই পথ থেকে ফিরে আসতে হবে, যে পথ আল্লাহ থেকে দূরে নিয়ে যায়। 

বলা বাহুল্য, এই পথ থেকে ফিরে আসা তিনটি বিষয় দ্বারা অর্জিত হবে— জ্ঞান, অনুশোচনা ও সংকল্প। 

কেননা, যে পর্যন্ত এ বিষয়ের জ্ঞান না হবে যে, গোনাহ আল্লাহ থেকে দূরে সরে পড়ার কারণ, সে পর্যন্ত অনুশোচনা হবে না। আর অনুশোচনা না হওয়া পর্যন্ত ফিরে আসার প্রশ্নই উঠে না। 

যে ব্যক্তি ঈমানের আলোকে আলোকিত, তার তওবা এভাবেই হয়। কিন্তু যে ব্যক্তি এই স্তরে উন্নীত নয়, তার জন্য তাকলীদ ও অনুসরণের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। সে অনুসরণের মাধ্যমে ধ্বংসের কবল থেকে আত্মরক্ষা - করতে পারে। এখন এই তওবা সম্পর্কে আল্লাহ পাক, রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী  ওয়া সাল্লাম) ও পূর্ববর্তী মনীষীগণের উক্তি প্রণিধানযোগ্য। 



পরবর্তী পর্ব

তওবা সম্পর্কে উক্তি সমূহ

তওবা - (পর্ব - ২) তওবার স্বরূপ




তওবা - (পর্ব - ২) 
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

তওবার স্বরূপ—
জানা উচিত যে, তিনটি ধারাবাহিক বিষয়ের সমন্বয়ে তওবা অস্তিত্ব লাভ করে। এক- জ্ঞান, দুই- অনুশোচনা এবং তিন- বর্তমানে ও ভবিষ্যতে গোনাহ বর্জন করা এবং অতীত দিনসমূহের ক্ষতিপূরণ করে নেয়া। এই তিন বিষয়ের সমষ্টিকে পরিভাষায় তওবা বলা হয়। 

প্রায়শ কেবল অনুশোচনাকেই তওবা বলা হয়। আর জ্ঞানকে তার ভূমিকা এবং গোনাহ বর্জনকে ফলাফল আখ্যা দেয়া হয়। এদিক দিয়েই রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি  ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন - 

“অনুশোচনা হচ্ছে তওবা”। কেননা, অনুশোচনার অবশ্যই কোন কারণ থাকবে এবং পরবর্তীতে এর কিছু ফলাফলও প্রকাশ পাবে। সুতরাং অনুশোচনা যা মধ্যবর্তী বিষয় ছিল, তাই আপন কারণ ও ঘটনার স্থলাভিষিক্ত হয়ে গেল। 

এদিক দিয়েই জনৈক বুযুর্গ তওবার সংজ্ঞায় বলেন : তওবা হচ্ছে সাবেক গোনাহের জন্যে অনুশোচনার অনলে অন্তরের বিগলিত হওয়া এ সংজ্ঞায় কেবল মর্মবেদনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। 

কেউ কেউ এই মর্মবেদনার পরিষ্কার উল্লেখ করে বলেছেন যে, তওবা একটি অগ্নি, যা অন্তরে প্রজ্বলিত হয় এবং একটি বেদনা, যা অন্তর থেকে বিচ্ছিন্ন হয় না। 

কেউ কেউ গোনাহ বর্জনের দিকে লক্ষ্য করে বলেছেন, তওবা হচ্ছে অনাচারের পোশাক খুলে ফেলে সরলতা ও হৃদ্যতার শয্যা পাতা। 

সহল ইবনে আবদুল্লাহ তস্তরী (রঃ) বলেন নিন্দনীয় কর্মকাণ্ডকে প্রশংসনীয় কর্মকাণ্ডে বদলে দেয়ার নাম তওবা। এটা নির্জনবাস, মৌনতা ও হালাল ভক্ষণ ছাড়া সহজলভ্য নয়। সম্ভবত এ সংজ্ঞায় তৃতীয় বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। তওবার প্রথম বিষয় জ্ঞানের উদ্দেশ্য হচ্ছে একথা জানা যে, গোনাহের ক্ষতি অসামান্য এবং অনেক গোনাহ মানুষ ও তার প্রেমাস্পদ আল্লাহর মধ্যে আড়াল হয়ে যায়। বলা বাহুল্য, এই জ্ঞানের ফল স্বরূপ অন্তরে অনুশোচনার উৎপত্তি হয়। 

তওবার সংজ্ঞা প্রসঙ্গে আরও অনেক উক্তি বর্ণিত আছে। আমাদের বর্ণিত উপরোক্ত তিনটি বিষয় সম্যক জেনে নেয়ার পর এটা কঠিন হবে না যে, অন্যরা তওবার সংজ্ঞা প্রসঙ্গে যা কিছু বলেছে, তার কোনটিতেই উপরোক্ত তিনটি বিষয় এক সাথে পাওয়া যায় না। অথচ তওবার বাস্তব স্বরূপ জানাই উদ্দেশ্য- শব্দ নয়।


পরবর্তী পর্ব

তওবার ফযীলত ও আবশ্যকতা


তওবা (পর্ব- ১) আধ্যাত্ম পথের সূচনা



তওবা (পর্ব- ১)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

আধ্যাত্ম পথের সূচনা
প্রকাশ থাকে যে, গোনাহ থেকে তওবা করে আল্লাহ তা'আলার দিকে প্রত্যাবর্তন হচ্ছে আধ্যাত্ম পথের সূচনা এবং ওলীগণের অমূল্য সম্পদ। সাধকগণ প্রথমে এ পথেই পা বাড়ান। যারা সত্য পথ থেকে বিচ্যুত, তাদের জন্যে এ প্রত্যাবর্তনই হচ্ছে সৎপথে অটল থাকার চাবিকাঠি। নৈকট্যশীলদের জন্যে এটাই আল্লাহর মনোনয়ন লাভের দিকচক্রবাল। পরগম্বরগণের জন্যে বিশেষত আমাদের আদি পিতা আদম (আঃ)-এর জন্যে এটাই সৌভাগ্য লাভের উৎস। মানুষ আদম সন্তান বিধায় তার তরফ থেকে গোনাহ হয়ে যাওয়া অসম্ভব নয়। কিন্তু যদি পিতা ক্ষতিপূরণ করে থাকে এবং দোষ সংশোধনে আত্মনিয়োগ করে থাকে, তবে পুত্রেরও উচিত উভয় বিষয়ে পিতার অনুরূপ হওয়া। এখন হযরত আদম (আঃ) এর অবস্থার প্রতি লক্ষ্য করলে জানা যায়, তিনি (ভুল বসত) আল্লাহ তা'আলার নাফরমানীর পর অনুশোচনার দাবানলে দগ্ধীভূত হয়েছেন এবং সুদীর্ঘকাল পর্যন্ত লজ্জাশ্রু প্রবাহিত করেছেন। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, যদি কোন ব্যক্তি কেবল নাফরমানী করার ব্যাপারে তাঁকে আপন পথপ্রদর্শক ও অনুসৃত মনে করে এবং তওবার ধারে কাছেও না যায়, তবে সে নিতান্তই ভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট। বরং মূল কথা হচ্ছে কেবল কল্যাণকর্মে আত্মনিবেদিত হওয়া নৈকট্যশীল ফেরেশতাগণের বৈশিষ্ট্য আর শুধু অকল্যাণের দাস হয়ে থাকা শয়তানের স্বভাব। বস্তুত অকল্যাণে জড়িয়ে পড়ার পর কল্যাণের দিকে ফিরে আসা মানুষের ধর্ম। কারণ, মানুষের মজ্জায় কল্যাণ ও অকল্যাণ উভয় বিষয়ের সংমিশ্রণ রয়েছে। যে ব্যক্তি কল্যাণের দিকে ফিরে এসে অকল্যাণের ক্ষতিপূরণ করে নেয়, বাস্তবে সে-ই মানুষ। যদি সে গোনাহ করার পর তওবা করে, তবে তার আদম সন্তান হওয়ার প্রমাণ শক্তিশালী হয়। পক্ষান্তরে যদি সে গোনাহ ও নাফরমানীর উপর অটল থাকে, তবে সে শয়তানের সাথে আপন বংশগত সম্পর্ক স্থাপনে সচেষ্ট হয়। 

আর শুধু সৎকর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে ফেরেশতার সাথে সম্পর্কযুক্ত হওয়া মানুষের জন্যে সম্ভবপর নয়। কেননা, তার খমীর তথা মৌলিক উপাদানের মধ্যে পাপ-পুণ্য এমন শক্তভাবে মিশ্রিত রয়েছে যে, তার আলাদা হওয়া দু'উপায়েই সম্ভবপর। অনুতাপের উত্তাপ দ্বারা অথবা দোযখের আগুন দ্বারা। 

বলা বাহুল্য, দোযখের আগুন সহ্য করার তুলনায় দুনিয়াতে অনুতাপের অনলে দগ্ধ হওয়া মানুষের জন্যে সহজতর। সুতরাং গোনাহ করার পর মানুষের উচিত দ্রুত তওবার দ্বারস্থ হওয়া। নতুবা মৃত্যুর পর এ সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাবে। শরীয়তে তওবার এই গুরুত্বের পরিপ্রেক্ষিতে এর স্বরূপ, সময়কাল, শর্ত, কারণ, লক্ষণ, ফলাফল, বাধাবিপত্তি ইত্যাদি বিষয়ে সবিস্তারে আলোচনা করা জরুরী। নিম্নে চারটি পরিচ্ছেদে এ বিষয়গুলো বর্ণনা করা হবে ।




পরবর্তী পর্ব

তওবার স্বরূপ 

মঙ্গলবার, ২৫ জুলাই, ২০২৩

(অহংকার ও আত্মপ্রীতি পর্ব- ১২) আত্মপ্রসাদের প্রতিকার



অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ১২)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

আত্মপ্রসাদের প্রতিকার 
জানা উচিত যে, প্রত্যেক রোগের প্রতিকার হবে তার কারণের বিপরীত কারণকে সম্মুখে আনা। আত্মপ্রসাদের কারণ যেহেতু অজ্ঞতা, তাই তার প্রতিকার হবে সেই জ্ঞান, যা অজ্ঞতার বিপরীত। অজ্ঞতাবশত যে সকল বিষয় নিয়ে মানুষ আত্মপ্রসাদে লিপ্ত হয়, সেগুলো মোটামুটি আট প্রকার।


(১) রূপ, সৌন্দর্য, স্বাস্থ্য, অঙ্গসৌষ্ঠব ইত্যাদি নিয়ে আত্মপ্রসাদ অনুভব করা। এর চিকিৎসা তাই, যা আমরা রূপলাবণ্য নিয়ে অহংকার করার বেলায় উল্লেখ করেছি। অর্থাৎ, নিজের আদি-অন্ত অপবিত্রতার কথা চিন্তা করবে এবং অনুধাবন করবে যে, এর আগে কত অপরূপ সৌন্দর্যশালীরা মাটিতে মিশে গেছে এবং কবরে তাদের দেহ কেমন দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে গেছে।


(২) শক্তিসামর্থ্য নিয়ে আত্মপ্রসাদ অনুভব করা; যেমন কোরআনে উল্লিখিত আদ সম্প্রদায়ের লোকেরা বলেছিল,

>আমাদের চেয়ে অধিক শক্তিধর আর কে?’ এর চিকিৎসা এ কথা হৃদয়ঙ্গম করা যে, একদিনের জ্বরে শক্তিশালী মানুষ নিঃশক্তি হয়ে যায়।


(৩) আপন বুদ্ধিমত্তা ও দূরদর্শিতা নিয়ে আত্মপ্রসাদ অনুভব করা। এর ফলে মানুষ নিজের মতামতকে বহাল রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করে এবং যে তার বিরুদ্ধে বলে, তাকে মূর্খ জ্ঞান করে। এর চিকিৎসা হল, স্রষ্টার পক্ষ থেকে যে বুদ্ধিমত্তা দান করা হয়েছে, তজ্জন্যে তাঁর শোকর করবে এবং চিন্তা করবে যে, তার মস্তিষ্কে সামান্য রোগ দেখা দিলে এমন পাগল হয়ে যেতে পারে, যার পেছনে বালকেরা হাসি-তামাশা করবে। এছাড়া নিজের বুদ্ধিমত্তা ও জ্ঞান-গরিমাকে কম মনে করবে। মনে রাখবে, যার বুদ্ধিমত্তায় ত্রুটি থাকে, সে নিজে কখনও সেই ত্রুটি জানতে পারে না।


(৪) বংশমর্যাদা নিয়ে আত্মপ্রসাদ অনুভব করা। যেমন কতক সৈয়দ বংশীয় ব্যক্তি আত্মপ্রসাদবশত মনে করে, বংশ-গরিমা এবং পূর্বপুরুষদের দৌলতে তাদের মাগফেরাত হয়ে যাবে। আবার কেউ কেউ মনে করে, সকল মানুষ তাদের বাঁদী-গোলাম। এর চিকিৎসা একথা চিন্তা করা যে, আমি কর্ম ও চরিত্রে বংশের কৃতী পুরুষদের বিরুদ্ধাচরণ করেছি। এ সত্ত্বেও ধারণা করি যে, তাদের স্তরে পৌঁছে গেছি। এটা নিছক মূৰ্খতা। আমার গুরুজনদের মধ্যে তো আত্মপ্রসাদ ছিল না; বরং তারা নিজেদেরকে তুচ্ছ এবং সকল মানুষকে বড় মনে করতেন।

আল্লাহর আনুগত্য ও উত্তম অভ্যাস দ্বারাই তো তারা গৌরব অর্জন করেছিলেন- বংশমর্যাদা দ্বারা নয়। অতএব, আমাকেও সেই গৌরব অর্জন করতে হবে। গৌরব খোদাভীতি দ্বারা অর্জিত হয়। বংশমর্যাদা দ্বারা নয়। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা বলেন :

>”তোমাদের মধ্যে সেই আল্লাহর কাছে অধিক সম্মানী, যে অধিক খোদাভীরু।”

এ আয়াতের শানে নুযূল এই যে, মক্কা বিজয়ের দিন হযরত বেলাল (রাঃ) আযান দিলে হারেছ ইবনে হেশাম, সোহায়ল ইবনে উমর ও খালেদ ইবনে উসায়দ সবিস্ময়ে বলল : এই কাফ্রী ক্রীতদাস আযান দেয় ! কোরআন পাকে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি নিকট-আত্মীয়দেরকে সতর্ক করার আদেশ অবতীর্ণ হলে তিনি একজন একজন করে সকলকে নাম ধরে ডাকলেন। এমনকি বললেন : হে মোহাম্মদ তনয়া ফাতেমা এবং সফিয়্যা বিনতে আবদুল মুত্তালিব, তোমরা নিজের জন্যে নিজেই আমল কর। এটা মনে করো না যে, আমি তোমাদেরকে রক্ষা করতে পারব। যে ব্যক্তি এসব বিষয় অনুধাবন করবে, সে কখনও বংশমর্যাদার অহমিকায় লিপ্ত হবে না।


(৫) যালেম রাজা-বাদশাহের বংশধর প্রকাশ করে আত্মপ্রসাদ অনুভব করা। এটাও চরম মূর্খতা এবং এর চিকিৎসা এই যে, সেই রাজা-বাদশাহদের যুলুম ও অত্যাচারের কথা চিন্তা করবে এবং এর কারণে তারা যে আল্লাহর গযবে পতিত হয়ে দোযখের ইন্ধন হয়ে গেছে একথাও চিন্তা করবে। কিয়ামতে তাদের দুরবস্থার একটি চিত্রও কল্পনা করবে যে, তারা যে সব লোকের উপর যুলুম করেছিল, তারা তাদেরকে জড়িয়ে ধরবে এবং মাথার চুল ধরে উপুড় করে টেনে জাহান্নামে নিয়ে যাবে। এটা কল্পনা করলে নিজেই আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইবে এবং বলবে- শূকর ও কুকুরের সাথে আত্মীয়তা ভাল- এদের সাথে নয়।

মোটকথা, যালেম রাজা-বাদশাহদের বংশধরকে যদি আল্লাহ যুলুম থেকে বাঁচিয়ে রাখেন, তবে তারা তজ্জন্যে শোকর করবে। তাদের পিতৃপুরুষ মুসলমান হলে তাদের জন্যে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে।


(৬) অধিক সন্তান-সন্ততি, চাকর-নওকর ও বন্ধু-বান্ধব নিয়ে আত্মপ্রসাদ অনুভব করা; যেমন হুনায়ন যুদ্ধে মুসলমানরা নিজেদের সংখ্যাধিক্যের কারণে বলেছিল, আজ আমরা পরাজিত হব না। এর প্রতিকার এটা ধ্যান করা যে, সকলেই আল্লাহর অক্ষম বান্দা। কেউ নিজের লাভ-লোকসানের মালিক নয়। আল্লাহ বলেন : “অনেক ক্ষুদ্র দল আল্লাহর আদেশে বৃহৎ দলের উপর বিজয়ী হয়েছে।”


(৭) ধন-সম্পদ নিয়ে আত্মপ্রসাদ অনুভব করা। যেমন, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) একবার দেখলেন, জনৈক ধনী ব্যক্তির কাছে এক ফকীর এসে বসতেই সে তার কাপড় টেনে সংকুচিত হয়ে বসল। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) ধনী ব্যক্তিকে বললেন : তুমি কি আশংকা কর যে, তার দরিদ্রতা তোমার মধ্যে সংক্রমিত হয়ে যাবে? বলা বাহুল্য, এটা ছিল ধনের আত্মপ্রসাদ। এর চিকিৎসা এই যে, ধন-সম্পদের বিপদাপদ, এতে অপরের হকের আধিক্য, ফকীরদের ফযীলত এবং জান্নাতে তাদের অগ্রগামিতার কথা চিন্তা করবে। আরও চিন্তা করবে যে, ধন-দৌলত সকালে আসে, বিকালে চলে যায়। এর কোন মৌলিকতা নেই। অনেক কাফেরও অগাধ ধন-সম্পদের মালিক।


(৮) আপন ভ্রান্ত মত নিয়ে আত্মপ্রসাদ অনুভব করা। এরূপ ব্যক্তি সম্পর্কেই আল্লাহ তা'আলা বলেন :

>”যার জন্যে তার কুকর্মকে সুসজ্জিত করা হয়। অতঃপর সে তাকে সৎকর্ম দেখে।”

অন্য আয়াতে বলা হয়েছে :

>”তারা ধারণা করে যে, তারা খুব সৎকর্ম করছে।” 


রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন- 

>”ভ্রান্ত মত নিয়ে আত্মপ্রসাদ এ উম্মতের শেষ যুগে হবে।” 

এ সর্বনাশা বদ অভ্যাসের কারণে পূর্ববর্তী উম্মতরা ধ্বংস হয়ে গেছে। কারণ, এর কারণেই ভিন্ন ভিন্ন মত ও পথের সৃষ্টি হয়েছে। প্রত্যেকেরই বিশ্বাস যে, সেই খুব জ্ঞানী। অতঃপর সে তার মত ও পথ নিয়েই খুশী থাকে। দুনিয়াতে অনেক বেদআতী ও পথভ্রষ্ট ব্যক্তি আপন আপন বেদআত ও পথভ্রষ্টতাকে শক্তভাবে আঁকড়ে থাকে। এর কারণ এটাই যে, তারা আপন ভ্রান্ত মত নিয়ে আত্মপ্রসাদে লিপ্ত।


বেদআত নিয়ে আত্মপ্রসাদ অর্থ এই, যে বিষয়ের প্রতি খাহেশ ও মন ধাবিত হয়, তাকে ভাল ও সত্য বলে ধারণা করা। এ প্রকার আত্মপ্রসাদের চিকিৎসা তুলনামূলকভাবে কঠিন। কেননা, যার মতামত ভ্রান্ত, সে তার ভ্রান্তি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থাকে। সুতরাং যাকে রোগই মনে করে না, তার চিকিৎসা কিরূপে করবে? কিন্তু যারা সাধক ও বিভুজ্ঞানী তারা মূর্খতা সম্পর্কে অবগত করতে পারে এবং তা দূর করতে পারে। যদি সে মূর্খতা নিয়েও আত্মপ্রসাদে মগ্ন থাকে, তবে সাধকের কথায়ও কর্ণপাত করবে না; বরং সাধককেও দোষী মনে করবে। এমতাবস্থায় তার চিকিৎসা কিরূপে হবে? তবে একটি মোটামুটি চিকিৎসা আছে। তা এই যে, প্রত্যেকেই আপন মতকে অভ্রান্ত মনে করবে না; বরং বিশ্বাস করবে যে, তার মতও ভ্রান্ত হতে পারে। এ ছাড়া বিরোধপূর্ণ মাযহাবসমূহ নিয়ে মাথা ঘামাবে না; বরং বিশ্বাস করবে যে, আল্লাহ এক। তাঁর কোন শরীক নেই। তিনি দেখেন ও শুনেন। তাঁর রসূল সত্য। যা কিছু তিনি নিয়ে এসেছেন, তা সত্য ৷ আল্লাহ আমাদের সকলকে যাবতীয় পথভ্রষ্টতা থেকে রক্ষা করুন।

(সমাপ্ত)

[আমিন ! ইয়া রব্বে মোস্তফা সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম]


প্রথম পর্ব

অহংকার ও আত্মপ্রীতি মারাত্মক ব্যাধি


অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ১১) আত্মপ্রসাদের সংজ্ঞা ও স্বরূপ



অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ১১)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

আত্মপ্রসাদের সংজ্ঞা ও স্বরূপ--

প্রকাশ থাকে যে, কোন না কোন পূর্ণতার গুণের মধ্যেই আত্মপ্রসাদ হয়ে থাকে। যে ব্যক্তি নিজের মধ্যে কোন পূর্ণতার গুণ আছে বলে বিশ্বাস করে, তার অবস্থা ত্রিবিধ হতে পারে। এক, সেই পূর্ণতার গুণটি বিলুপ্ত হওয়ার অথবা বিকৃত হওয়ার ভয় লেগে থাকবে। এরূপ হলে তা আত্মপ্রসাদ হবে না। দুই, বিলুপ্ত হওয়ার ভয়ে ভীত থাকবে না; কিন্তু সেটিকে আল্লাহর পক্ষ থেকে নেয়ামত বলে বিশ্বাস করবে। এরূপ হলেও তাকে আত্মপ্রসাদ বলা হবে না। তিন, বিলুপ্ত হওয়ারও ভয় থাকবে না এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে নেয়ামত বলেও বিশ্বাস করবে না; বরং সেটিকে নিজস্ব কৃতিত্ব ও গুণ মনে করেই আনন্দিত হবে । একেই বলা হবে আত্মপ্রসাদ। 

অতএব, আত্মপ্রসাদের সংজ্ঞা এই দাঁড়াল যে, কোন পূর্ণতার গুণকে বড় মনে করে প্রসন্ন হওয়া এবং সেটি যে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে একটি দান, একথা বেমালুম ভুলে যাওয়া। এর সাথে যদি আল্লাহর উপর প্রতিদান দেয়া হক হয়ে গেছে বলে মনে দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করে, তবে তাকে বলা হবে গর্ব, যা আত্মপ্রসাদের উপরের স্তর। দুনিয়াতেও এমনটি হয় যে, এক ব্যক্তি কাউকে কোন কিছু দিয়ে সেটাকে বড় কাজ মনে করে। এতটুকুতে কেবল আত্মপ্রসাদ হয়। কিন্তু যদি সে এই দেয়ার বদলে তার কাছে কোন খেদমত আশা করে, তবে একে বলা হয় গর্ব। আল্লাহ বলেন : >“কারও প্রতি বেশী পাওয়ার আশায় অনুগ্রহ করো না”।


এই আয়াতের তাফসীরে হযরত কাতাদাহ (রাঃ) বলেন : আপন কর্ম দ্বারা গর্ব করো না। হাদীসে আছে–

>”গর্বকারীর নামায তার মাথা অতিক্রম করে না; অর্থাৎ আল্লাহর কাছে পৌঁছে না।”


মোটকথা, যে গর্ব করে, সে আত্মপ্রদাসও অনুভব করে। কিন্তু যে আত্মপ্রসাদ অনুভব করে, তার জন্যে গর্ব করা জরুরী নয়। কেননা, আত্মপ্রসাদ হয় কেবল নেয়ামতকে বড় জানা এবং নেয়ামতদাতাকে ভুলে যাওয়া দ্বারা। এতে প্রতিদান আশা করার শর্ত নেই। অপরপক্ষে প্রতিদান আশা করা ছাড়া গর্ব হয় না। সুতরাং কেউ যদি কবুল হওয়ার আশায় দোয়া করে, অতঃপর কবুল না হওয়াকে মনে মনে খারাপ বিশ্বাস করে, তবে সে গর্বকারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।



আত্মপ্রসাদের প্রতিকার

অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ১০) আত্মপ্রসাদের ক্ষতি



অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ১০)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

আত্মপ্রসাদের ক্ষতি

আত্মপ্রসাদ অহংকারের অন্যতম কারণ বিধায় আত্মপ্রসাদ যদি আল্লাহ তা'আলার সাথে সম্পর্কযুক্ত হয়, তবে এর কারণে মানুষ কোন কোন গোনাহকে স্মরণই করে না। যদি স্মরণ করে, তবে তাকে সাগীরা তথা ক্ষুদ্র গোনাহ জেনে তা পূরণে সচেষ্ট হয় না; বরং মনে করে নেয় যে, এতো মাফই হয়ে যাবে। এছাড়া মানুষ নিজের এবাদত ও আমলকে বড় মনে করে তাতে সন্তুষ্ট থাকে, আল্লাহর প্রতি অনুগ্রহ মনে করে এবং আল্লাহর নেয়ামত বিস্তৃত হয়। যখন কেউ নিজের আমলের কারণে আত্মপ্রসাদে লিপ্ত হয়, তখন সে সেই আমলের বিপদ সম্পর্কে অন্ধ হয়ে যায়। আর যে ব্যক্তি আমলের বিপদ সম্পর্কে অজ্ঞ থাকে, তার অধিকাংশ প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। কেননা, বাহ্যিক আমল পাক-সাফ ও সংমিশ্রণমুক্ত না হলে তা খুবই কম উপকারী হয়ে থাকে। যার উপর ভয় প্রবল থাকে, সেই আমলের বিপদ খোঁজ করে। যে আত্মপ্রসাদে লিপ্ত, সে অহেতুক নির্ভীক হয়ে থাকে। সে আল্লাহর আযাব থেকে নিজেকে মুক্ত মনে করে। এ কারণেই সে নিজের প্রশংসা নিজেই করতে থাকে। যে ব্যক্তি আপন মতামত ও বুদ্ধিমত্তার ব্যাপারে আত্মপ্রীত, সে পরামর্শ গ্রহণ ও জিজ্ঞাসা করে জেনে নেয়া থেকে বঞ্চিত থাকে। সে নিজের চেয়ে বড় পণ্ডিত ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করাকে দূষণীয় জ্ঞান করে এবং কোন উপদেশদাতার কথায় কর্ণপাত করে না; বরং অপরকে মূর্খতুল্য মনে করে। তার নিজস্ব মতামতটি যদি ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পর্কিত হয়, তবে এর কারণে সে চিরতরে বরবাদ হয়ে যায়।



পরবর্তী পর্ব

আত্মপ্রসাদের সংজ্ঞা ও স্বরূপ

অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ৯) আত্মপ্রসাদের নিন্দা



 অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ৯)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

আত্মপ্রসাদের নিন্দা
আত্মপ্রসাদের নিন্দা কোরআন পাক ও হাদীস শরীফে বিধৃত হয়েছে। সেমতে আল্লাহ তা'আলা বলেন :

>“হুনায়ন যুদ্ধে তোমরা নিজেদের সংখ্যাধিক্য নিয়ে আত্মপ্রসাদে লিপ্ত হলে বটে, কিন্তু তা তোমাদের কোনই উপকার করেনি।” 

এখানে আত্মপ্রসাদ নিন্দার ভঙ্গিতে উল্লেখ করা হয়েছে। >“তারা ধারণা করল, তাদের দুর্গসমূহ তাদেরকে আল্লাহর হাত থেকে রক্ষা করবে। অতঃপর আল্লাহর শাস্তি এমন জায়গা থেকে তাদের কাছে আসল যার কল্পনাও তারা করেনি।”


এ আয়াতে কাফেরদের দুর্গ নিয়ে আত্মপ্রসাদের নিন্দা করা হয়েছে। এক হাদীসে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) তিনটি বিষয়কে বিনাশকারী বলে অভিহিত করেছেন। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে আত্মপ্রসাদ। 

হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ) বলেন : দুটি বিষয় ধ্বংসাত্মক-একটি নৈরাশ্য, অপরটি আত্মপ্রসাদ। এরূপ বলার কারণ এই যে, সৌভাগ্য দুটি বিষয় দ্বারাই অর্জিত হয় একটি চেষ্টা ও অধ্যবসায়, অপরটি কর্মতৎপরতা। নিরাশ ব্যক্তি চেষ্টা করে না, আর যে আত্মপ্রসাদে লিপ্ত, সে নিজেকে সৌভাগ্যশালী বলে বিশ্বাস করে। তাই অর্জন করা থেকে বিরত থাকে। 

আল্লাহ তা’আলা বলেন : (পালা তু্যাক্কু আনফুছাহুম)

ইবনে জুরায়জের মতে এর অর্থ কেউ যেন কোন সৎকাজ করে এ কথা না বলে যে, সে করেছে। যায়দ ইবনে আসলাম বলেন : নিজেকে সৎকর্মপরায়ণ বলে বিশ্বাস করো না। এটা আত্মপ্রসাদ। 

উহুদ যুদ্ধে হযরত তালহা (রাঃ) রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-কে শত্রুর আঘাত থেকে মুক্ত রাখার জন্যে তাঁর উপর পড়ে গিয়েছিলেন, যাতে শত্রুর আঘাত তাঁর নিজের গায়েই লাগে। ফলে, তাঁর হাতের তালু ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল এবং রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) অক্ষত ছিলেন। এটা একটা মহৎ প্রচেষ্টা ছিল বিধায় তাঁর দৃষ্টিতেও পরবর্তী সময়ে এর যথেষ্ট মাহাত্ম্য ছিল। হযরত উমর (রাঃ) নিজের অন্তর্দৃষ্টি দ্বারা তাঁর এই আত্মপ্রসাদ জেনে নেন এবং বলেন : রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর জন্যে তালহার হাত ক্ষতবিক্ষত হওয়ার পর থেকেই তার মধ্যে আত্মপ্রসাদ পরিলক্ষিত হচ্ছে। 

এখানে লক্ষণীয় বিষয় এই যে, এমন পুণ্যবান সাহাবীও যখন আত্মপ্রসাদ থেকে বাঁচতে পারলেন না, তখন দুর্বলচেতা মানুষ সাবধানতা অবলম্বন না করলে তাদের কি দশা হবে ! 

হযরত মুতরিফ (রহঃ) বলেন : আমি যদি সারারাত নাক ডাকিয়ে ঘুমাই এবং সকালে এই গাফলতির জন্যে অনুতাপ করি, তবে এটা সারারাত তাহাজ্জুদ পড়ে সকাল বেলায় আত্মপ্রসাদ বা আত্মতৃপ্তিতে লিপ্ত হওয়ার চেয়ে ঢের উত্তম। রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন :

>“যদি তোমরা গোনাহ না কর, তবে আমি তোমাদের জন্যে এর চেয়েও মারাত্মক বিষয়ের আশংকা করি। সেটা হচ্ছে আত্মপ্রসাদ। 

এখানে আত্মপ্রসাদকে সকল গোনাহের চেয়ে বড় বলা হয়েছে। 

বিশর ইবনে মনসুর (রহঃ) সদা এবাদতে মগ্ন থাকতেন। ফলে তাকে দেখলে আল্লাহ ও কিয়ামতের কথা স্মরণ হত। একদিন তিনি দীর্ঘক্ষণ নামায পড়লেন। জনৈক ব্যক্তি পিছন থেকে তাকে দেখল। সালাম ফিরানোর পর তিনি লোকটিকে বললেন : তুমি আমার যে অবস্থা দেখেছ, তাতে আশ্চর্যান্বিত হয়ো না। অভিশপ্ত ইবলীসও ফেরেশতাদের মধ্যে থেকে দীর্ঘকাল পর্যন্ত এবাদত করেছিল। কিন্তু তার পরিণাম কি হয়েছে, তাতো তোমার অজানা নেই। হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে কেউ প্রশ্ন করল : মানুষ কখন খারাপ হয়? তিনি বললেন : “যখন সে নিজেকে ভাল মনে করতে থাকে”। 


আল্লাহ তা'আলা বলেন : >“তোমরা অনুগ্রহ প্রকাশ করে ও কষ্ট দিয়ে আপন সৎকর্ম বাতিল করো না।”

অনুগ্রহ প্রকাশ করা হচ্ছে দানকে বড় মনে করার ফল। বলা বাহুল্য, কোন আমলকে বড় মনে করাই আত্মপ্রসাদ বা আত্মপ্রীতি। অতএব জানা গেল যে, আত্মপ্রীতি নিশ্চিতই মন্দ কাজ।



পরের পর্ব

আত্মপ্রসাদের ক্ষতি 

অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ৮) অহংকারের প্রতিকার ও বিনয় অর্জনের উপায়



অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ৮)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏼ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

অহংকারের প্রতিকার ও বিনয় অর্জনের উপায়

উপরোক্ত আলোচনা থেকে জানা গেল যে, অহংকার একটি ধ্বংসমূলক বিষয়। খুব কম মানুষই এ থেকে মুক্ত। এই অহংকার দূর করা ফরযে আইন। কেবল বাসনা করলেই এটা দূর হবে না; বরং এমন ঔষধ প্রয়োগ করতে হবে, যা তাকে সমূলে উৎপাটিত করে দেয়। দ্বিবিধ উপায়ে এর প্রতিকার সম্ভব। 

(১) অন্তরে নিহিত এর মূল শিকড় উপড়ে ফেলে এবং (২) যে সকল কারণে মানুষ অহংকার করে, সেগুলোকে দূর করে। 

মূল শিকড় উপড়ে ফেলার জন্যে দু'রকম চিকিৎসা দরকার একটি শিক্ষাগত ও অপরটি কর্মগত।




শিক্ষাগত চিকিৎসা

শিক্ষাগত চিকিৎসা এই যে, মানুষ নিজেকে চিনবে এবং আল্লাহ তা'আলাকে চিনবে। এতেই ইনশাআল্লাহ অহংকার দূর হয়ে যাবে। কেননা, মানুষ যখন নিজেকে যথাযথরূপে চিনবে, তখন বিশ্বাস করবে যে, সে নিজে সকল হেয় বস্তুর চেয়েও হেয়তম এবং সকল সামান্য বস্তুর চেয়েও সামান্যতম। অনুনয়, বিনয় ও লাঞ্ছনা ছাড়া কোন কিছুই তার প্রাপ্য নয়। এরপর যখন আল্লাহ তা'আলাকে চিনবে, তখন জানতে পারবে বড়ত্ব ও মহত্ত্ব আল্লাহ ছাড়া আর কারও জন্যে শোভনীয় নয়।


আল্লাহকে চিনা ও তার মাহাত্ম্য অনুধাবন করার বিষয়টি দীর্ঘ আলোচনা সাপেক্ষ। কেননা, এটাই এলমে মুকাশাফার চূড়ান্ত সীমা। যদিও আত্মজ্ঞান অর্জন করাও দীর্ঘ ব্যাপার। কিন্তু আমরা এখানে এ বিষয়বস্তু সম্পর্কে এতটুকু আলোচনা করব, যতটুকু বিনয় অর্জনের ক্ষেত্রে উপকারী। বলা বাহুল্য, এর জন্যে কোরআন পাকের একটি আয়াতের গূঢ়তত্ত্ব হৃদয়ঙ্গম করে নেয়াই যথেষ্ট। আয়াতটি এই : 

>“মানুষ ধ্বংস হোক! সে কত যে অকৃতজ্ঞ! তিনি তাকে কি বস্তু দ্বারা সৃষ্টি করেছেন? বীর্য দ্বারা তিনি তাকে সৃষ্টি করেছেন, পরে তার বিকাশ সাধন করেছেন, অতঃপর তার জন্যে পথ সহজ করে দিয়েছেন, অতঃপর তার মৃত্যু ঘটান এবং কবরস্থ করেন। এরপর যখন ইচ্ছা তিনি তাকে পুনরুত্থিত করবেন।”


এ আয়াতে মানুষের প্রথম সৃষ্টি, পরিণতি ও মধ্যবর্তী অবস্থার কথা উল্লিখিত হয়েছে । মানুষ এসব অবস্থা চিন্তা করলে আয়াতের অর্থ হৃদয়ঙ্গম হয়ে যাবে।


উদাহরণতঃ প্রথম অবস্থায় মানুষের কোন উল্লেখও ছিল না। সে ছিল নাস্তির পর্দায় আবৃত। দীর্ঘকাল এ অবস্থাই অব্যাহত থাকে। নাস্তির সূচনা কখন হয়েছে, তাও জানা নেই। যে বস্তু অস্তিত্বহীন, তার চেয়ে অধিক নিকৃষ্ট ও ঘৃণিত আর কি হবে? জন্মের পূর্বে মানুষ এরূপই ছিল। এরপর আল্লাহ তা'আলা তাকে একটি হীন বস্তু অর্থাৎ মৃত্তিকা দিয়ে গড়ে তুলেন এবং অপবিত্র বস্তু অর্থাৎ বীর্য দ্বারা সৃষ্টি করেন। অতঃপর বীর্য থেকে জমাট রক্ত এবং জমাট রক্ত থেকে মাংসপিণ্ডে পরিণত করেন। এরপর অস্থি গঠন করেন এবং অস্থিকে মাংস ও ত্বকের আবরণ দান করেন। এ সব স্তর অতিক্রম করার পর মানুষ পৃথিবীতে উল্লেখযোগ্য হয়েছে। এরপরও জন্মের সাথে সাথে তার মধ্যে অনেক নিচ স্বভাব বিদ্যমান ছিল। অর্থাৎ, প্রথমে তাকে পাথরের ন্যায় জড় অবস্থায় সৃষ্টি করা হয়। সে কোন কিছু শুনত না, দেখত না, হৃদয়ঙ্গম করত না, নড়াচড়া করত না, কথা বলত না এবং কোন কিছু ধরত না। এক কথায়, সে যেন জীবন্ত ছিল না। সে ছিল শক্তিশালী হওয়ার পূর্বে নিঃশক্তি, জ্ঞানী হওয়ার পূর্বে অজ্ঞান, চক্ষুষ্মান হওয়ার পূর্বে অন্ধ, শ্রবণকারী হওয়ার পূর্বে বধির, বক্তা হওয়ার পূর্বে মূক, পথপ্রাপ্ত হওয়ার পূর্বে পথভ্রষ্ট এবং সমর্থ হওয়ার পূর্বে অসমর্থ। আয়াতে এ কথাই বুঝানো হয়েছে। অন্য এক আয়াতে বলা হয়েছে :

>“জীবন লাভের পূর্বে কিছু সময় অতিবাহিত হয়েছে, যখন মানবসত্তা উল্লেখযোগ্য কিছু ছিল না। আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মিলিত বীর্য থেকে তাকে পরীক্ষা করার জন্যে।” 

বলা বাহুল্য, এখানেও পূর্বোক্ত বক্তব্য বিধৃত হয়েছে।

সৃষ্টি করার পর আল্লাহ তা'আলা মানুষের পথ সহজ করে তার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, যা এ বাক্যে ব্যক্ত হয়েছে। এতে মানুষ আমৃত্যু যা কিছু অর্জন করে, তার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে-

>”তাকে সৃষ্টি করেছি মিলিত বীর্য থেকে তাকে পরীক্ষা করার জন্যে। অতঃপর আমি তাকে করেছি শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন। আমি তাকে পথের নির্দেশ দিয়েছি। হয় সে কৃতজ্ঞ হবে, না হয় অকৃতজ্ঞ।”


সুতরাং যে মানুষের জন্ম ও জন্ম পরবর্তী অবস্থা এই, তার জন্যে গর্ব ও অহংকার করা কেমন করে বৈধ হবে? সে তো বাস্তবে নিকৃষ্ট থেকে নিকৃষ্টতর এবং দুর্বল থেকে দুর্বলতম সত্তা। হাঁ, মানুষ যদি পূর্ণাঙ্গ সৃজিত হত, তার সব কাজ তারই এখতিয়ারভুক্ত থাকত এবং সে আপন ক্ষমতায় চিরঞ্জীব হত, তবে আপন সূচনা ও পরিণতি বিস্মৃত হয়ে অবাধ্য ও অহংকারী হওয়া তার জন্যে শোভা পেত। কিন্তু এখন অবস্থা অন্য রকম। তার স্বল্পকালীন জীবনে মারাত্মক রোগ-ব্যাধি এবং বিভিন্ন বিপদাপদ তাকে ঘিরে রাখে। ক্ষুধা, পিপাসা, জরামৃত্যু আরও কত প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে তাকে দিন অতিবাহিত করতে হয়। নিজের লাভ-লোকসান, ইষ্ট ও অনিষ্টের এখতিয়ার তার নেই। সে অনেক কিছু জানতে চায়; কিন্তু অজ্ঞ থাকে। অনেক কিছু বিস্মৃত হতে চায়, কিন্তু পারে না। সার কথা, মানুষের অন্তর ও মন তার আয়ত্তের বাইরে। সে এমন বস্তু কামনা করে, যাতে তার ধ্বংস নিহিত এবং এমন বস্তুকে বর্জন করতে চায়, যাতে তার জীবন লুক্কায়িত। সে এমন খাদ্যকে সুস্বাদু মনে করে, যা খেয়ে বদহজমিতে ভোগে, মৃত্যুবরণ করে এবং তিক্ত ঔষধ, যা উপকারী ও জীবনদানকারী, তা খেতে চায় না। এমতাবস্থায় সে যদি নিজেকে চিনে, তবে অবশ্যই জানতে পারবে যে, তার চেয়ে হীন ও নিকৃষ্ট আর কিছু নেই। সুতরাং অহংকার করা মূর্খতা বৈ নয়।

এরপর যখন মানুষের মৃত্যু হবে, তখন সে পূর্বে যেরূপ জড় পদার্থ ছিল, তেমনি জড় পদার্থে পরিণত হবে। সে হবে একটি চেতনা ও অনুভূতিহীন কাঠামো। তাকে মাটিতে পুঁতে রাখা হবে। তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গলে যাবে, অস্থিসমূহ পচে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। বিভিন্ন কীট কিলবিল করে তার দেহকে খেয়ে ফেলবে। তখন কোন প্রাণী তার কাছে ভিড়বে না। মানুষ তাকে নাপাক মনে করবে এবং তীব্র দুর্গন্ধের কারণে তার কাছ থেকে দূরে পালাবে। কত ভাল হত যদি এই অবস্থায় মাটি হয়ে যাওয়ার পর সে মুক্তি পেত। কিন্তু এখানেই কাহিনীর শেষ নয়। সে পুনরুজ্জীবিত হবে। দেহের বিচ্ছিন্ন অংশসমূহ পুনরেকত্রিত হয়ে সে কবর থেকে উঠবে এবং কিয়ামতকে উপস্থিত দেখতে পাবে। সে দেখবে, আকাশ বিদীর্ণ, পৃথিবী পরিবর্তিত, পর্বতমালা ইতস্তত বিক্ষিপ্ত, তারকারাজি নিষ্প্রভ এবং সূর্য গ্রহণে আবৃত। সর্বত্র অন্ধকারই অন্ধকার। তার সামনে আমলনামা রাখা হবে এবং বলা হবে এটা পাঠ কর। সে বলবে : এটা কিসের আমলনামা? 

উত্তর হবে- তোমার জীবদ্দশায় তোমার কাঁধে দু'জন ফেরেশতা নিয়োজিত ছিল। তুমি যা বলতে এবং যে কাজ করতে, তা তারা লিখে রাখত। তোমার ছোট-বড় সকল আমল এতে লিপিবদ্ধ রয়েছে। তুমি ভুলে গেলে কি হবে, আল্লাহ ভুলে যাননি। এখন চল এবং হিসাব-নিকাশ দাও। একথা শুনতেই সে ব্যাকুল হয়ে পড়বে। এরপর আমলনামা পাঠ করে বলবে— হায় হায়! এতে তো ছোট-বড় সকল গোনাহই বিদ্যমান। এ হচ্ছে সকল মানুষের শেষ পরিণতি, যা (ثُمَّ إِذَا شَاءَ أَنشَرَهُ)-এ বাক্যে ব্যক্ত হয়েছে। 

এখন চিন্তার বিষয় এই যে, যে মানুষের এই অবস্থা, অহংকারের সাথে তার কি সম্পর্ক থাকতে পারে? আস্ফালন করা ও বড়াই করা তো দূরের কথা, তার তো এক মুহূর্তও আনন্দিত হওয়া উচিত নয়। এ হচ্ছে অহংকারের শিক্ষাগত চিকিৎসার বর্ণনা।




কর্মগত চিকিৎসা

এখন কর্মগত চিকিৎসা হল, প্রকাশ্যে বিনয় অবলম্বন করা এবং সকল মানুষের সাথে বিনম্র ব্যবহার ও সদাচরণ করা। যেমন আমরা ইতিপূর্বে সৎকর্মপরায়ণদের অবস্থা বর্ণনা করেছি। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নত ও রীতিনীতির অনুসরণ করবে। 


বর্ণিত আছে, তিনি মাটিতে বসে আহার করতেন এবং বলতেন : আমি আল্লাহর বান্দা। তাই বান্দার মতই আহার করি। 

হযরত সালমান ফারেসী (রাঃ)-কে কেউ জিজ্ঞেস করল : আপনি নতুন বস্ত্র পরিধান করেন না কেন? তিনি বললেন : আমি গোলাম; যেদিন মুক্তি পাব, সেদিন নতুন পোশাক পরিধান করব। এখানে মুক্তি বলে তিনি কিয়ামতের মুক্তি বুঝিয়েছেন।


বিনয় কর্মের মাধ্যমে পূর্ণতা লাভ করে। তাই আরব জাতিকে ঈমান ও নামাযের আদেশ করা হয়েছিল। কেননা, বিনয় ও নম্রতা তাদের স্বভাবের বিপরীত ছিল। এমনকি, কারও হাত থেকে বেত পড়ে গেলে তা উঠানোর জন্যে তারা নত হত না। জুতার ফিতা খুলে গেলে তা নুয়ে বেঁধে নিত না। সেমতে হাকীম ইবনে হেযাম যখন প্রথম বায়আত হয়েছিল, তখন রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে শর্ত করেছিল যে, সে রুকু-সেজদা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে করবে। তিনি এ শর্ত মেনে নিয়েছিলেন। পরে অবশ্য হাকীম বুঝতে পারে এবং পাক্কা নামাযী হয়ে কামালাতের শীর্ষে পৌঁছান। মোটকথা, আরব জাতির কাছে সেজদা করা ও নত হওয়া ছিল চরম অপমানজনক। তাই নামাযের আদেশ হয়, যাতে তাদের অহংকার চূর্ণ হয় এবং অন্তরে বিনয় আসন গাড়ে। বলা বাহুল্য, নামাযের রুকূ, সেজদা ও দণ্ডায়মান থাকার মধ্যে পুরোপুরি বিনয়ভাব বিদ্যমান রয়েছে। এদিক দিয়েই নামাযকে “ধর্মের স্তম্ভ” আখ্যা দেয়া হয়েছে।


দ্বিতীয় উপায় হচ্ছে অহংকারের কারণসমূহ দূর করার মাধ্যমে অহংকারের প্রতিকার করা। প্রথমত বংশ মর্যাদার কারণে যে ব্যক্তি অহংকার করে, তার দুটি বিষয় জানা উচিত। এক, বংশ নিয়ে গর্ব করা নিছক মূর্খতা। কেননা, অন্যের গুণ-গরিমা দ্বারা নিজের সম্মান হওয়া অর্থহীন। সুতরাং যে বংশের গর্ব করে, সে যদি নীচ স্বভাবের হয়, তবে অন্যের গুণ-গরিমা তার নীচ স্বভাবকে ঢেকে রাখবে কিরূপে। বরং যে ব্যক্তির বংশ নিয়ে গর্ব করে, সে জীবিত থাকলে একথাই বলত যে, শ্রেষ্ঠত্ব আমার মধ্যে রয়েছে। তুই তো আমার প্রস্রাবের কীট। তোর মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব কোত্থেকে এল? দ্বিতীয় বিষয় এই যে, সে তার সত্যিকার বংশ চেনার চেষ্টা করবে এবং বাপ-দাদার কথা চিন্তা করবে। তার বাপ তো এক ফোঁটা নাপাক বীর্য এবং দাদা নিকৃষ্ট মৃত্তিকা। অতএব, যার মূল হচ্ছে নিকৃষ্ট মৃত্তিকা, যা পদতলে পিষ্ট হতে থাকে, সে অহংকার কিরূপে করতে পারে?                

অহংকারের অপর কারণ রূপ-লাবণ্য। এর চিকিৎসা এই যে, মানুষ তার অভ্যন্তর ভাগকে বুদ্ধির দৃষ্টিতে দেখবে জন্তু-জানোয়ারের ন্যায় কেবল বাহ্যিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করবে না। অভ্যন্তর ভাগের প্রতি লক্ষ্য করলে এমন ঘৃণ্য বিষয়াদি দৃষ্টিগোচর হবে, যা দ্বারা রূপের অহংকার নিমেষে বিলীন হয়ে যাবে। উদাহরণতঃ মানুষের সর্বাঙ্গ নোংরামিতে পূর্ণ। তার পেটে রয়েছে মল, মূত্রাশয়ে মূত্র, নাকে শ্লেষ্মা, মুখে থুথু, কানে ময়লা, ধমনীতে রক্ত, ত্বকে পুঁজ এবং বগলে দুর্গন্ধ। এ ছাড়া সে দিনে একবার অথবা দু’বার নিজের হাতে পায়খানা ধৌত করে এবং প্রত্যহ একবার অথবা দু'বার পেটের জঞ্জাল দূর করার জন্যে পায়খানায় যায়। পায়খানা তো দেখলেও ঘৃণা লাগে, স্পর্শ করা অথবা নাকে ঘ্রাণ নেয়া তো দূরের কথা। এ সব বিষয় মানুষের জন্যে অপরিহার্য করে দেয়া হয়েছে, যাতে সে সর্বদা আপন নাপাকী ও নীচতা ধ্যান করতে থাকে।


হযরত আনাস (রাঃ) বলেন : খলীফা আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ) আমাদেরকে আমাদের নীচতা ও অপবিত্রতা স্মরণ করাতে যেয়ে বলতেন, মনে রেখ, তোমরা প্রস্রাবের পথ দিয়ে দু’বার নির্গত হয়েছ। সুতরাং মানুষ যখন চিন্তা করবে যে, সে নোংরা বস্তু থেকে সৃজিত হয়েছে, নোংরা বস্তুর মধ্যেই জীবন কাটিয়েছে এবং মৃত্যুর পরও নোংরা বস্তুই হয়ে যাবে, তখন নিজের রূপ-লাবণ্যকে গর্বের বস্তু মনে করবে না।


অহংকারের আরও একটি কারণ হচ্ছে দৈহিক শক্তি ও বল। এর প্রতিকার এই যে, মানুষ সাধারণত যে সকল রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়, সেগুলোর কথা চিন্তা করবে। উদাহরণতঃ যদি একটি শিরায়ও ব্যথা দেখা দেয়, তবে মানুষ অক্ষমদের চেয়েও হীনতম হয়ে যায়। আরও চিন্তা করা উচিত যে, যদি কোন মশা নাকে ঢুকে যায় অথবা পিঁপড়া কানে প্রবেশ করে, তবে এটাও মৃত্যুর কারণ হতে পারে। পায়ে কাঁটা ফুটলেও মানুষ শক্তিহীন হয়ে যায়। একদিনের জ্বরে অনেক দিনের শক্তি-সামর্থ্য বিনষ্ট হয়ে যায়। অতএব, যে ব্যক্তি একটি কাঁটাও সহ্য করতে পারে না এবং মশা ও পিঁপড়া থেকে আত্মরক্ষা করতে পারে না, শক্তি নিয়ে গর্ব করা তার পক্ষে শোভা পায় না।



বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...