রবিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

তওবা - (পর্ব - ১৪) তওবাকারীর গোনাহ হয়ে গেলে কি করবে?



তওবা - (পর্ব - ১৪) 
তওবাকারীর গোনাহ হয়ে গেলে কি করবে?

যদি তওবাকারী কোন গোনাহ করে ফেলে, তবে তার উপর দুটি বিষয় ওয়াজিব। প্রথমত, সে তওবা ও অনুতাপ করবে। দ্বিতীয়ত, এ গোনাহকে মিটিয়ে ফেলার জন্যে তার বিপরীত কোন পুণ্যকাজ করবে। উপরে এর পদ্ধতি বর্ণিত হয়েছে। যদি খাহেশের প্রাবল্যের কারণে মন ভবিষ্যতে গোনাহ বর্জন করার সংকল্প না করে, তবে সে যেন প্রথম ওয়াজিবটি পালনে ব্যর্থ হয়। এমতাবস্থায় দ্বিতীয় ওয়াজিবটিও বর্জন করা সমীচীন হবে না। বরং পুণ্যকাজ সম্পন্ন করে পাপমোচন করার উপায় করতে হবে। এতে কমপক্ষে এটা তো হবে যে, সে পাককাজের সাথে পুণ্যকাজেরও সম্পাদনকারী সাব্যস্ত হবে। যে সকল পুণ্যকাজ দ্বারা পাপমোচন হয়ে থাকে, সেগুলো অন্তর অথবা জিহ্বা অথবা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা সম্পাদিত হয়। সুতরাং যা দ্বারা পাপ কাজ করা হয়, পুণ্যকাজও তা দ্বারাই সম্পাদন করতে হবে। উদাহরণতঃ যদি পাপকাজ অন্তর থেকে প্রকাশ পায়, তবে তা মোচন করার জন্যে আল্লাহ তা'আলার দরবারে কান্নাকাটি ও ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে এবং পলাতক গোলামের ন্যায় নিজেকে লাঞ্ছিত করতে হবে, যাতে সকলের কাছে স্বীয় লাঞ্ছনা প্রকাশ হয়ে পড়ে। এছাড়া, অন্তরে এবাদত ও মুসলমানদের শুভেচ্ছার মনোভাব পোষণ করতে হবে।

জিহ্বা দ্বারা গোনাহের কাফ্ফারার উপায় এই যে, স্বীয় অন্যায় ও অপরাধ স্বীকার করবে এবং বলবে- “পরওয়ারদেগার, আমি নিজের প্রতি অন্যায় করেছি এবং কুকর্ম করেছি। অতএব আমার পাপকর্মসমূহ মার্জনা করুন।


এছাড়া সওয়াব অধ্যায়ে লিখিত সকল প্রকার এস্তেগফার বলতে থাকবে।

অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা কাফ্ফারা আদায় করার পদ্ধতি এই যে, এগুলো দ্বারা সদকাসহ অন্যান্য সকল প্রকার এবাদত পালন করবে। 

হাদীসে বর্ণিত আছে— মানুষ যখন পাপ কাজের পশ্চাতে আটটি কাজ করে, তখন আশা করা যায়, তার সেই পাপ মাফ হয়ে যাবে। এগুলোর মধ্যে চারটি কাজ অন্তর দ্বারা সম্পাদিত হয়। 

(১) তওবা করা অথবা তওবার সংকল্প করা, 

(২) গোনাহ থেকে বেঁচে থাকা ভাল মনে হওয়া, 

(৩) গোনাহের শাস্তিকে ভয় করতে থাকা এবং 

(৪) গোনাহ মার্জিত হওয়ার আশা করা। 

অবশিষ্ট চারটি কাজ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা সম্পাদিত হয়— 

(১) গোনাহের পর দু'রাকআত নামায পড়া, 

(২) এই নামাযের পর সত্তর বার এস্তেগফার এবং একশ' বার “সোবহানাল্লাহিল আযীম ওয়া বিহামদিহী” পাঠ করা, 

(৩) কিছু দান-খয়রাত করা এবং 

(৪) একটি রোযা রাখা। 

কোন কোন রেওয়ায়েতে আছে। পূর্ণাঙ্গ উযু করে মসজিদে যাবে এবং দু'রাকআত নামায পড়বে। কতক রেওয়ায়েতে চার রাকআতের উল্লেখ আছে। এক হাদীসে বলা হয়েছে— যখন কেউ পাপ কাজ করে, তখন তার উচিত এরূপ পুণ্যকাজ করা, যাতে কাটাকাটি হয়ে যায়। গোপন পাপের বিনিময়ে গোপন পুণ্যকাজ করবে এবং প্রকাশ্য পাপের বদলে প্রকাশ্য পুণ্য কাজ করবে। এ কারণেই বলা হয়েছে যে, গোপনে দান-খয়রাত করলে রাতের গোনাহ মাফ হয় এবং প্রকাশ্য দান-খয়রাত দ্বারা দিনের গোনাহ মিটে যায়। অন্য এক হাদীসে বর্ণিত আছে, জনৈক ব্যক্তি রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর খেদমতে আরয করল : আমি একজন মহিলার সাথে কিছু করেছি— তবে যিনা করিনি। এখন এ সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলার যা বিধান, তা আমার উপর প্রয়োগ করুন। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) লোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন : তুমি আমার সাথে ফজরের নামায পড়নি? সে বলল : হাঁ পড়েছি। 

তিনি বললেন : পুণ্য কাজ পাপ কাজকে খেয়ে ফেলে। 

এ থেকে জানা গেল যে, মহিলাদের সাথে যিনার নিচে যা কিছু করা হয়, তা সগীরা গোনাহ। কারণ, এটা নামায দ্বারা মিটে যায়। কবীরা গোনাহ নামায দ্বারা মিটে না।


মোট কথা, মানুষের উচিত প্রত্যহ আপন ত্রুটিসমূহ একত্রিত করে নফসের কাছ থেকে হিসাব নেয়া এবং এগুলোকে মিটানোর জন্যে পরিশ্রম সহকারে সমপরিমাণ পুণ্য কাজ করা।

হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি গোনাহ থেকে এস্তেগফার তথা ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং অব্যাহতভাবে গোনাহ করে যায়, সে যেন আল্লাহ তা'আলার সাথে রং-তামাশা করে। সুতরাং অব্যাহত গোনাহ সত্ত্বেও এস্তেগফার কিরূপে উপকারী হবে? জনৈক বুযুর্গ বলেন : আমি আমার মৌখিক এস্তেগফার থেকেও এস্তেগফার করি। কেউ কেউ বলেন : শুধু মুখে এস্তেগফার পড়া মিথ্যুকদের তওবা। হযরত রাবেয়া বলেন : আমাদের এস্তেগফারের জন্যে অনেক এস্তেগফার দরকার। এখন প্রশ্ন হল, এসব রেওয়ায়েতে কোন্ এস্তেগফার বুঝানো হয়েছে? এর জওয়াব এই যে, এস্তেগফারের মাহাত্ম্য সম্পর্কে অসংখ্য রেওয়ায়েত বর্ণিত আছে। আল্লাহ পাক রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর শারীরিক উপস্থিতির যে প্রভাব বর্ণনা করেছেন, এস্তেগফারের প্রভাবও তাই ব্যক্ত করেছেন। এস্তেগফারের এর চেয়ে বড় মাহাত্ম্য আর কি হবে? এরশাদ হয়েছে–

“আপনার উপস্থিতিতে আল্লাহ তাদেরকে শাস্তি দেবেন না এবং আল্লাহ তাদের শাস্তিদাতা নন যে পর্যন্ত তারা এস্তেগফার করে।”


এ কারণেই কোন কোন সাহাবী বলতেন : আমাদের জন্যে দুটি আশ্রয় ছিল। তন্মধ্যে একটি আশ্রয় উঠে গেছে; অর্থাৎ জনাব সরওয়ারে কায়েনাত (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর উপস্থিতি এখন আর আমাদের মধ্যে নেই। আর দ্বিতীয় আশ্রয় ‘এস্তেগফার’ এখনও আমাদের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। যদি এটাও বিদায় নেয়, তবে আমরা ধ্বংস হয়ে যাব। এখন শুনুন, যে এস্তেগফার মিথ্যুকদের তওবা, তা কেবল মৌখিক এস্তেগফার; অর্থাৎ যার মধ্যে অন্তরের সংযোগ মোটেই নেই। যেমন, মানুষ অভ্যাসগতভাবে অনবধানতার ছলে “আস্তাগফিরুল্লাহ” বলে দেয় অথবা দোযখের বর্ণনা শুনে “নাউযুবিল্লাহ” উচ্চারণ করে, অথচ অন্তরে এর কোন প্রভাব থাকে না। এই এস্তেগফারে কেবল জিহ্বা নড়াচড়া করে। এতে কোন উপকার নেই। হাঁ, যদি এর সাথে আল্লাহর প্রতি আন্তরিক কাকুতি-মিনতি ও বিনয়ভাব যোগ হয় এবং সত্যিকার ইচ্ছা, খাঁটি নিয়ত ও পূর্ণ আগ্রহ সহকারে মাগফেরাত কামনা করা হয়, তবে এটা নিঃসন্দেহে একটি পুণ্য কাজ। 


এস্তেগফারের মাহাত্ম্য সম্পর্কিত রেওয়ায়েতসমূহে এই এস্তেগফারই উদ্দেশ্য । বলা হয়েছে—

“যে ব্যক্তি এস্তেগফার করে, সে অব্যাহতভাবে গোনাহকারী নয়- যদি দিনে সত্তর বারও গোনাহ করে”।

এ হাদীসে এস্তেগফারের অর্থ আন্তরিক এস্তেগফার। তওবা ও এস্তেগফারের অনেকগুলো স্তর রয়েছে। প্রাথমিক স্তরগুলোও উপকার থেকে খালি নয়— যদিও শেষ স্তর পর্যন্ত পৌছা নসীব না হয়। এ কারণেই হযরত সহল তস্তরী (রহঃ) বলেন : বান্দার সর্বাবস্থায় তার প্রভুর প্রয়োজন। তাই সকল বিষয়ে প্রভুর দিকে রুজু করা তার জন্যে উত্তম। উদাহরণতঃ সে যদি গোনাহে লিপ্ত হয়, তবে এরূপ প্রার্থনা করবে : ইলাহী, আমার রহস্য ফাঁস করো না। গোনাহ সমাপ্ত হওয়ার পর এরূপ দোয়া করবে : প্রভু, আমার তওবা কবুল কর এবং তওবার পর আরয করবে : ইলাহী, আমাকে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার প্রভূত শক্তি দান কর। এমনিভাবে বান্দা যখন কোন উত্তম কাজ করবে, তখন অনুনয় করে বলবে, আল্লাহ, আমার এ আমলটি কবুল কর। 

জনৈক ব্যক্তি হযরত সহলকে জিজ্ঞেস করল : যে এস্তেগফার গোনাহকে বিলীন করে দেয়, সেটি কোনটি? তিনি বললেন : প্রথমে এস্তেজাবত; এরপর এনাবত, এরপর তওবা। 

এস্তেজাবতের অর্থ হচ্ছে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমলসমূহ; যেমন দু'রাকআত নামায ও দোয়া। 

এনাবতের মানে হচ্ছে অন্তরের আমলসমূহ; যেমন সত্যিকার ইচ্ছা, খাঁটি নিয়ত ইত্যাদি। 

আর তওবার উদ্দেশ্য হচ্ছে সৃষ্টিকে ছেড়ে স্রষ্টার প্রতি মনোনিবেশ করা।


তওবাকারী আল্লাহর বন্ধু— এই হাদীস সম্পর্কে হযরত সহলকে প্রশ্ন করলে তিনি বললেন : বন্ধু তখন হয়, যখন এই আয়াতে উল্লিখিত বিষয়সমূহ তার মধ্যে পাওয়া যায়, “তওবাকারী, এবাদতকারী, শোকরকারী..........। তিনি আরও বললেন : বন্ধু তাকে বলা হয়, যে বন্ধুর অপ্রিয় বিষয়সমূহের ধারে-কাছেও যায় না। সারকথা এই যে, তওবার ফলাফল দুটি— এক, গোনাহকে এমনভাবে বিলুপ্ত করা যেন সে গোনাহ করেইনি এবং দুই, বন্ধু হয়ে যাওয়ার জন্যে মর্তবা লাভ করা। অন্তর দ্বারা ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং পুণ্যকাজ দ্বারা ক্ষতিপূরণ করা যদিও প্রাথমিক স্তরে অব্যাহত গোনাহের সমস্যার সমাধান করে না, তথাপি উপকার থেকে খালি নয়। সুতরাং এরূপ ধারণা করা সঙ্গত নয় যে, এরূপ এস্তেগফার ও পুণ্যকাজ করা-না করা উভয় সমান। বরং অধ্যাত্মবিদগণ নিশ্চিতরূপে জানেন যে, আল্লাহ তা'আলার এই উক্তি যথার্থ—

কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা দেখতে পাবে। সৎকর্মের প্রত্যেক অণুতে কিছু না কিছু প্রভাব অবশ্যই থাকে, যেমন নিক্তির একদিকে একটি চাউল রেখে দিলে কিছু না কিছু ঝুঁকে পড়বে। একটি চাউলের কোন প্রভাব না থাকলে দ্বিতীয় চাউল রেখে দিলেও কোন প্রভাব না হওয়া উচিত। এ থেকে জরুরী হয়ে পড়ে যে, বেশী পরিমাণ চাউল রাখলেও পাল্লা ঝুঁকবে না। অথচ এটা বাস্তবের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। অণু পরিমাণ সৎকর্মের অবস্থাও তদ্রূপ। এর দ্বারাও আমলের দাঁড়িপাল্লা অবশ্যই প্রভাবিত হয়। অতএব, সামান্য পরিমাণ সৎকর্ম ও অণু পরিমাণ এবাদতকে হেয় মনে করে বর্জন করা উচিত নয় এবং কোন সামান্য গোনাহকে সামান্য মনে করে তা করে ফেলা সমীচীন নয়। কেননা, বলা হয়, “কণা কণা বালুকায় সাহারা সৃজন।” আমাদের মতে মুখে এস্তেগফার বলাও পুণ্যের অন্তর্ভুক্ত। কেননা, কোন মুসলমানের গীবত অথবা অনর্থক কথা বলার জন্যে জিহ্বাকে নাড়াচাড়া করার তুলনায় সে সময় অনবধানতার সাথে এস্তেগফার উচ্চারণ করা নিঃসন্দেহে উত্তম। আর চুপ থাকার তুলনায়ও উত্তম।

জনৈক মুরীদ তার মুরশিদ আবু উসমান মাগরেবীর খেদমতে আর করল : আমার জিহ্বা মাঝে মাঝে যিকির ও কোরআন পাঠ করতে শুরু করে; অথচ আমার অন্তর গাফেল থাকে। মুরশিদ বললেন : আল্লাহর শোকর কর। তিনি তোমার একটি অঙ্গকে পুণ্য কাজে নিয়োজিত করে দেন— কুকর্ম ও অনর্থক কাজে অভ্যস্ত করেন না। নিঃসন্দেহে এই বুযুর্গের উক্তি সত্য। কেননা, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যদি স্বাভাবিক বিষয়াদির মত পুণ্যকাজে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তবে এটা অনেক গোনাহ থেকে আত্মরক্ষার কারণ হয়ে যায়। উদাহরণতঃ এস্তেগফারে অভ্যস্ত ব্যক্তি যখন কারও মুখে মিথ্যা কথা শুনবে, তৎক্ষণাৎ বলে উঠবে— ‘আস্তাগফিরুল্লাহ।” আর অনর্থক কথায় অভ্যস্ত ব্যক্তি মিথ্যা শুনে মন্তব্য করবে- তুমি বড় মিথ্যাবাদী। অথবা এক ব্যক্তি “নাউযুবিল্লাহ” বলায় অভ্যস্ত। সে কোন দুষ্টের দুষ্টামি শুনে অভ্যাসবশত বলে উঠবে— “নাউযুবিল্লাহ”। যদি সে অনর্থক ভাষণে অভ্যস্ত হত, তবে বলত— তোমার প্রতি আল্লাহর অভিসম্পাত। এখানে একটি কথা বলার কারণে সে গোনাহগার হবে এবং অপর কথাটি বলার কারণে গোনাহ থেকে বেঁচে থাকবে। বেঁচে থাকা জিহ্বার পুণ্যকাজে অভ্যস্ত হওয়ারই প্রভাব।


“আমাদের এস্তেগফারের জন্য অনেক এস্তেগফার দরকার”– হযরত রাবেয়ার এ উক্তির উদ্দেশ্য এই যে, আমাদের এস্তেগফারে অন্তর গাফেল থাকে এবং শুধু জিহ্বা নড়াচড়া করে। অন্তরের এই গাফলতির কারণে এ ধরনের এস্তেগফার দরকার। জিহ্বার নড়াচড়ার নিন্দা করা এ উক্তির উদ্দেশ্য নয়; বরং আন্তরিক গাফলতিকে তিরস্কার করা লক্ষ্য। এর কারণেই এস্তেগফারের প্রয়োজন দেখা দেয়।


মোটকথা, কণা পরিমাণ পুণ্যকাজ এবং সামান্যতম গোনাহকেও হেয় ও তুচ্ছ মনে করা উচিত নয়। হযরত ইমাম জাফর সাদেক (রহঃ) এরশাদ করেন— আল্লাহ তা'আলা তিনটি বিষয়কে তিনটি বিষয়ের ভিতর লুক্কায়িত রেখেছেন। 

(১) তিনি নিজের সন্তুষ্টিকে এবাদতের ভেতর গোপন রেখেছেন। সুতরাং কোন এবাদতকে তুচ্ছ মনে করো না। তুমি যাকে তুচ্ছ মনে করবে, হয়তো তার মধ্যে আল্লাহর সন্তুষ্টি লুক্কায়িত রয়েছে।

(২) তিনি আপন গযবকে গোনাহের ভেতরে গোপন রেখেছেন। সুতরাং কোন গোনাহকে ক্ষুদ্র মনে করো না। হয়তো এর মধ্যেই আল্লাহর গযব লুক্কায়িত রয়েছে।

(৩) তিনি আপন বন্ধুত্বকে বান্দাদের ভেতরে গোপন রেখেছেন। অতএব, কোন বান্দাকে অবজ্ঞা করো না । হয়তো আল্লাহর বন্ধু সে-ই।

হযরত জাফর সাদেক অতঃপর আরও বলেন : “এজাবত” তথা সাড়াদানকেও আল্লাহ তা'আলা দোয়ার ভেতরে গুপ্ত রেখেছেন। সুতরাং কোন দোয়া বর্জন করো না। হয়তো সাড়াদান তার মধ্যেই লুক্কায়িত রয়েছে।


পরবর্তী পর্ব
অব্যাহত গোনাহের প্রতিকার

তওবা - (পর্ব - ১৩) তওবার ব্যাপারে মানুষের স্তরভেদ



তওবা - (পর্ব - ১৩) 
তওবার ব্যাপারে মানুষের স্তরভেদ 

জানা উচিত যে, তওবার ব্যাপারে তওবাকারীদের চারটি স্তর রয়েছে।

প্রথম স্তর এই যে, গোনাহগার ব্যক্তি গোনাহ থেকে তওবা করে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাতে অটল থাকবে। পূর্বে যে সকল ত্রুটি করেছিল, সেগুলো পূরণ করবে এবং পুনরায় সেই সমস্ত ত্রুটি-বিচ্যুতি ছাড়া গোনাহ করার কথা কল্পনাও করবে না, যেগুলো থেকে মানুষ নবী না হলে অভ্যাসগত ভাবে মুক্ত হয় না। একেই বলা হয় তওবায় অবিচল থাকা এবং এরই নাম “তাওবাতুন্নাসূহ” (খাঁটি তওবা)। এরূপ মনকেই কোরআন পাকে “নাফসে মুতমায়িন্নাহ” (প্ৰশান্ত মন) বলা হয়েছে, যে তার পরওয়ারদেগারের সামনে সন্তুষ্টচিত্তে উপস্থিত হবে এবং পরওয়ারদেগারও তার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন। নিম্নোক্ত হাদীসে এরূপ তওবাকারীদের প্রতিই ইঙ্গিত করা হয়েছে– “আল্লাহর যিকিরের প্রতি লোভী ব্যক্তিরা অগ্রগামী হয়েছে। যিকির তাদের বোঝা নামিয়ে দিয়েছে। ফলে, তারা কিয়ামতের ময়দানে হালকা-পাতলা হয়ে পৌঁছেছে”। এতে ইঙ্গিত রয়েছে যে, তাদের উপর বোঝা ছিল; কিন্তু যিকিরের ফলে তাদের বোঝা নেমে গেছে।


দ্বিতীয় স্তর এমন তওবাকারীর, যে মৌলিক এবাদত পালনে এবং সকল কবীরা গোনাহ বর্জনে সুদৃঢ় থাকে। এতদসত্ত্বেও এমন গোনাহ থেকে মুক্ত নয়, যা ইচ্ছা ব্যতিরেকেই হয়ে যায়। অর্থাৎ, আপন কাজকর্মে এরূপ গোনাহ্ করে ফেলে, পূর্ব থেকে যায় ইচ্ছা থাকে না। যখন সে এ ধরনের গোনাহ্ করে ফেলে, তখন নিজেকে তিরস্কার করে লজ্জিত হয় এবং ভবিষ্যতে এরূপ গোনাহের ধারে-কাছে না যাওয়ার প্রতিজ্ঞা করে। এরূপ মনকে ‘নাফসে লাওয়ামা' (তিরস্কারকারী মন) বলা সমীচীন। কেননা, অনিচ্ছাকৃত কুকর্মের কারণে এই মন নিজেকে ধিক্কার দেয়। যদিও প্রথম স্তরটি সর্বশ্রেষ্ঠ, কিন্তু এই স্তরও যে উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন, তাতে দ্বিমতের অবকাশ নেই। অধিকাংশ তওবাকারীর অবস্থা এমনি হয়ে থাকে। কেননা, কুপ্রবৃত্তি মানুষের মজ্জাগত একটি উপাদান। এ থেকে মুক্ত থাকা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু মানুষ চেষ্টা করে পাপের তুলনায় পুণ্য বেশী করতে পারে, যাতে তার পুণ্যের পাল্লা ভারী হয়। এরূপ তওবাকারীর জন্যে আল্লাহ তা'আলা ওয়াদা করেছেন - “যারা ছোটখাটো বিষয় ছাড়া বড় গোনাহ ও অশ্লীল কাজকর্ম থেকে বেঁচে থাকে, তারা ক্ষমা পাবে। নিশ্চয় তোমার পালনকর্তার ক্ষমা বিস্তৃত।”


মানুষ ইচ্ছা ছাড়াই যে সব সগীরা গোনাহ করে ফেলে, সেগুলো “লামাম” তথা ছোটখাটো বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত। আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন : “আর তারা, যারা কোন অশ্লীল কর্ম করলে অথবা নিজেদের প্রতি অন্যায় করলে আল্লাহকে স্মরণ করে, অতঃপর নিজেদের গোনাহের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে”।

এখানে নিজেদের প্রতি অন্যায় করা সত্ত্বেও যে তাদের প্রশংসা করা হয়েছে, তা এজন্যেই যে, তারা পরবর্তী সময়ে অনুতাপ করেছে এবং নিজেদের তিরস্কৃত করেছে। এরই অনুরূপ স্তরের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে এই হাদীসে, –

“তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম ব্যক্তি, যে গোনাহে লিপ্ত হলে তওবা করে।”

অন্য হাদীসে আছে-

“মুমিন গমের শীষের মত- কখনও গোনাহ থেকে ফিরে আসে আবার কখনও তৎপ্রতি ঝুঁকে পড়ে।”

এক হাদীসে আরও বলা হয়েছে : “কখনও কখনও গোনাহ করা ঈমানদারের জন্যে জরুরী”। এসব রেওয়ায়েত থেকে নিশ্চিতরূপে প্রমাণিত হয় যে, এই পরিমাণ অপরাধের কারণে তওবা ভঙ্গ হয় না এবং এরূপ অপরাধ গোনাহে অবিচলদের অন্তর্ভুক্ত নয়। সুতরাং এরূপ তওবাকারীদেরকে নিরাশ করা ফেকাহবিদদের উচিত নয়। ফেকাহবিদ তো তাকেই বলা হয়, যে মানুষকে ত্রুটি-বিচ্যুতি ও গোনাহ করার কারণে সৌভাগ্যের স্তরে পৌছার ব্যাপারে হতাশাগ্রস্ত করে না। হাদীসে বর্ণিত আছে—

“সকল আদম সন্তান গোনাহগার। তবে উত্তম গোনাগার তারা, যারা তওবা করে ও ক্ষমা প্রার্থনা করে।”

আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেন- 

“এসব লোকেরা তাদের পুরস্কার দ্বিগুণ পাবে। কারণ, তারা সবর করে এবং পাপকর্মকে সৎকর্মের দ্বারা প্রতিহত করে”। এখানে বলা হয়েছে যে, তারা পাপের পরে পুণ্য করে। এরূপ বলা হয়নি যে, তারা পাপ মোটেই করে না।


তৃতীয় স্তর হল তাদের, যারা তওবা করে কিছুকাল তাতে অটল থাকে। এরপর কোন গোনাহের খাহেশ প্রবল হয়ে যায় এবং তা ইচ্ছাকৃতভাবে করে ফেলে। কিন্তু এতদসত্ত্বেও তারা যথারীতি এবাদত পালনে সর্বদা তৎপর থাকে এবং খায়েশ থাকা সত্ত্বেও অন্যান্য গোনাহ বর্জন করে। কেবল এক অথবা দু' গোনাহের ব্যাপারে তারা অক্ষম থাকে এবং এগুলো থেকেও তওবা করার ইচ্ছা মনে মনে পোষণ করে। কিন্তু আজ-কাল করে তা পিছিয়ে দেয়। এরূপ লোকদের শানে আল্লাহ পাক বলেন :

“কিছু লোক তাদের গোনাহ স্বীকার করে। তারা একটি পুণ্যকাজ করে এবং অপরটি পাপকাজ”।

আশা করা যায়, এরূপ লোকদের তওবা আল্লাহ তা'আলা কবুল করবেন। কিন্তু যেহেতু তারা টালবাহানা করে তওবাকে পিছিয়ে দেয়, এ কারণে তাদের পরিণতি বিপজ্জনকও হতে পারে। কে জানে, তওবার আগেই তাদের মৃত্যু এসে যায় কিনা! এরপর আল্লাহর যা ইচ্ছা, তাই প্রকাশ পেতে পারে। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা আপন কৃপায় তাদের ক্ষতিপূরণ করে নেবেন অথবা তাদের দুর্ভাগ্যই প্রবল হয়ে পড়বে। আল্লাহ বলেন :

“কসম মানুষের এবং যিনি তাকে সুঠাম করেছেন, অতঃপর তাকে তার অসৎকর্ম ও সৎকর্মের জ্ঞান দান করেছেন। সে সফলকাম হবে, যে নিজেকে পবিত্র করবে এবং সে-ই ব্যর্থ হবে, যে নিজেকে কলুষিত করবে।”

সুতরাং বান্দা যখন কোন গোনাহে লিপ্ত হয় এবং গোনাহ থাকে নগদ আর তওবা থাকে বাকীর খাতায়, তখন এটা তার দুর্ভাগ্যের লক্ষণ। এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে “বান্দা সত্তর বছর পর্যন্ত জান্নাতীদের অনুরূপ আমল করে। ফলে, মানুষ তাকে জান্নাতী বলতে শুরু করে এবং তার মধ্যে ও জান্নাতের মধ্যে মাত্র অর্ধ হাত ব্যবধান থেকে যায়। কিন্তু ভাগ্যলিপি প্ৰবল হয় এবং সে দোযখীদের মত আমল করতে থাকে এবং অবশেষে দোযখে পতিত হয়।


চতুর্থ স্তর এমন তওবাকারীর, যারা তওবার পর কিছুদিন তাতে অটল থাকে, এরপর এক গোনাহ অথবা অনেক গোনাহে লিপ্ত হয়ে পড়ে এবং অন্তরে তওবা করার ইচ্ছা থাকে না অথবা গোনাহের জন্যে আফসোস করে না। এরূপ ব্যক্তি গোনাহে অবিচলদের অন্তর্ভুক্ত। এরূপ নফসকে বলা হয় “নাফসে আম্মারা বিসসু” (কুকর্মের আদেশদাতা নফস)। তার পরিণাম মন্দ হওয়ার সমূহ আশংকা রয়েছে। খোদা না করুন, পাপকর্মেই তার জীবনের অবসান ঘটলে সে হবে চরম হতভাগা। পক্ষান্তরে অন্তিম অবস্থা ভাল হলে দোযখ থেকে মুক্তির আশা করা যাবে– যদিও তা কিছুকাল শাস্তি ভোগ করার পর হয়।


পরবর্তী পর্ব

তওবাকারীর গোনাহ হয়ে গেলে কি করবে?

তওবা - (পর্ব - ১২) বান্দার হক সম্পর্কিত তওবা



তওবা - (পর্ব - ১২)
বান্দার হক সম্পর্কিত তওবা

পক্ষান্তরে যে সকল গোনাহ বান্দার হক সম্পর্কিত, সেগুলোতেও আল্লাহ তা'আলার হক থাকে। কারণ, আল্লাহ তা'আলা বান্দার সাথে যুলুম তথা অন্যায় আচরণ করতে নিষেধ করেছেন। 


অতএব, যে ব্যক্তি অপরের প্রতি যুলুম করে, সে প্রথমে আল্লাহ তা'আলার বিরোধিতা করে। এ ধরনের গোনাহে আল্লাহর হক পূরণ করার উপায় হচ্ছে অনুতাপ ও দুঃখ করা এবং ভবিষ্যতে এরূপ গোনাহ না করা। এ ছাড়া, এ ধরনের গোনাহের বিপরীত পুণ্যকাজ করা। 

উদাহরণতঃ কারও মনে কষ্ট দিয়ে থাকলে তার প্রতি অনুগ্রহ করা। কারও ধন-সম্পদ ছিনিয়ে থাকলে তার কাফফারা স্বরূপ নিজের হালাল ধন-সম্পদ খয়রাত করা। কারও গীবত ও তিরস্কার করে থাকলে তার প্রশংসা কীর্তন করা। কোন মানুষকে হত্যা করে থাকলে ক্রীতদাস মুক্ত করা। কেননা, এটাও এক ধরনের জীবন দান।


তবে বান্দার হক সম্পর্কিত গোনাহসমূহে কেবল অনুতাপ করা এবং বিপরীত সৎকর্ম করাই যথেষ্ট নয়; বরং এ ক্ষেত্রে বান্দার হক আদায় করাও জরুরী। যদি বান্দার হক প্রাণনাশের সাথে সম্পর্ক হয়, যেমন কাউকে ভুলক্রমে খুন করে থাকলে তার তওবা হচ্ছে রক্ত বিনিময় আদায় করা। প্রাপক ব্যক্তিবর্গকে রক্তবিনিময় না দেয়া পর্যন্ত খুনী ব্যক্তি অপরাধমুক্ত হবে না।


আর যদি ইচ্ছাকৃতভাবে খুন করে থাকে, তবে এর তওবা “কেসাস” তথা খুনের বদলে খুন দ্বারাই গ্রহণীয় হবে। 


যদি হত্যার ব্যাপারটি অজানা থাকে, তবে হত্যাকারীর জন্যে ওয়াজিব নিহত ব্যক্তির ওলীর কাছে হত্যার কথা স্বীকার করা এবং আত্মসমর্পণ করা। এরপর সে ক্ষমা করুক অথবা হত্যার বদলে হত্যা করুক। এ ছাড়া, হত্যাকারী কিছুতেই পাপমুক্ত হবে না। 


এখানে হত্যার বিষয় গোপন করা সম্পূর্ণ নাজায়েয। কিন্তু যিনা, চুরি, মদ্যপান ইত্যাদি আল্লাহর হক সম্পর্কিত গোনাহের ক্ষেত্রে তওবার জন্যে গোপনীয়তা ফাঁস করা এবং শাস্তির জন্যে ওলীর কাছে আত্মসমর্পণ করা জরুরী নয়; বরং এসব ক্ষেত্রে ওয়াজিব হচ্ছে আল্লাহ যেমন গোপন রেখেছেন, তেমনি গোপন থাকতে দেয়া এবং নিজের শাস্তি নিজেই সাব্যস্ত করা। যেমন, পাপমোচনের জন্যে নানা রকম সাধনায় রত হওয়া। কেননা, আল্লাহর হক কেবল তওবা ও অনুতাপ দ্বারা মাফ হতে পরে। যদি এসব ক্ষেত্রে তওবাকারী আপন গোনাহ আদালতে পেশ করে শাস্তি গ্রহণ করে, তবে তওবা সঠিক ও যথার্থ হবে এবং আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে!


হাদীসে বর্ণিত আছে যে, মায়েয ইবনে মালেক (র.) রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)-উনার খেদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করলেন: ইয়া রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) আমি নিজের উপর ভয়ানক যুলুম করেছি। আমি যিনা করেছি। হুযুর, আমাকে পাপমুক্ত করুন। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) তার কথায় কর্ণপাত করলেন না। দ্বিতীয় দিন তিনি এসে আবারও সে কথার পুনরাবৃত্তি করলেন। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহেওয়া আলিহী ওয়াসাল্লাম) এবারও তার কথা কানে তুললেন না। যখন তৃতীয় দিন এসে একই কথা আরয করলেন, তখন রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) তার জন্যে গর্ত খনন করালেন এবং পাথর মেরে মেরে তার জীবনের অবসান ঘটালেন। তার সম্পর্কে মুসলমানরা দু'দলে বিভক্ত হয়ে গেল। এক দল বলছিল : মায়েযের মৃত্যু পাপে পরিবেষ্টিত অবস্থায় হয়েছে। পক্ষান্তরে অপর দলের অভিমত ছিল মায়েযের তওবার মত খাঁটি কোন তওবা নেই। 


রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) দ্বিতীয় দলের সমর্থন করে বললেনঃ মায়েয এমন তওবা করেছে, যা সমগ্র উম্মতের মধ্যে বিভাজ্য হতে পারে।


অনুরূপভাবে খামেদিয়া মহিলার ঘটনাও সুবিদিত। সে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম)- উনার খেদমতে হাযির হয়ে আরয করল : আমি যিনা করেছি। আপনি আমাকে পবিত্র করুন। তিনি তার কথা শুনেও শুনলেন না। পরদিন সে আবার আরয করল : আপনি আমাকে পবিত্র করেন না কেন? আপনি কি আমাকে মায়েযের মত মনে করেন? আল্লাহর কসম, আমার তো গর্ভও হয়ে গেছে। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করলেন: তোমার গর্ভস্থ সন্তান ভূমিষ্ঠ না হওয়া পর্যন্ত তোমাকে “হদ” তথা আল্লাহর নির্ধারিত শাস্তি দেয়া যাবে না। এরপর সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে সে তাকে একটি কাপড়ে জড়িয়ে উপস্থিত করল এবং আরয করল : হুযুর ! আমার সন্তান হয়ে গেছে ! এবার আমাকে শাস্তি দিয়ে পবিত্র করুন। 

রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ যাও, তোমার সন্তান যখন দুধ খাওয়া ছেড়ে দিবে, তখন দেখা যাবে। অতঃপর শিশুটি যখন দুধ খাওয়া ছেড়ে খাদ্য খেতে শুরু করল, তখন খামেদিয়া তাকে নিয়ে আবার উপস্থিত হল। শিশুর হাতে তখন একখণ্ড রুটি ছিল ! খামেদিয়া আরয করল : ইয়া রসূলাল্লাহ ! (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) সে দুধ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে এবং রুটি খেতে শুরু করেছে। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) শিশুটিকে একজন মুসলমানের হাতে সমর্পণ করলেন এবং খামেদিয়ার জন্য গর্ত খনন করালেন। অতঃপর তাকে লক্ষ্য করে পাথর ছোঁড়ার জন্য মুসলমানদেরকে আদেশ দিলেন। খালেদ ইবনে ওলীদ এসে যখন তার মাথায় একটি পাথর ছুঁড়ে মারলেন, তখন রক্তের ছিটা এসে তার মুখমণ্ডলে পতিত হল। তিনি উত্তেজিত হয়ে খামেদিয়াকে গালি দিলেন। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) তার গালি শুনে বললেন : খালেদ গালি দিয়ো না। সেই আল্লাহর কসম, যার কবযায় আমার প্রাণ, এই মহিলা এমন তওবা করেছে যে, জরিমানা আদায়কারীর মত পাপিষ্ঠ ব্যক্তি এরূপ তওবা করলে তারও মাগফেরাত হয়ে যাবে। (হাদীসে “মক্স” শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এর অর্থ সেই জরিমানা, যা উশর আদায়কারী মানুষের কাছ থেকে গ্রহণ করত। এরূপ জরিমানা আদায়কারী সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, সে জান্নাতী হবে না।)

বান্দার হকসমূহের মধ্যে যদি কারও ধনসম্পদ চুরি, ডাকাতি, প্রতারণা, আত্মসাৎ, ঠকানো ইত্যাদির মাধ্যমে বিনষ্ট করে, তবে এ থেকে তওবা করার বিশেষ পদ্ধতি রয়েছে। এতে প্রাপ্তবয়স্ক ও অপ্রাপ্তবয়স্ক সকলেই সমান। অর্থাৎ সকলকেই তওবা করতে হবে। সুতরাং জীবনের শুরু থেকে তওবার দিন পর্যন্ত পাই পাই করে হিসাব করবে এবং দেখবে তার যিম্মায় কার কত পাওনা হয়েছে। এরপর এসব পাওনা নামে নামে লিপিবদ্ধ করবে এবং পাওনাদারদের খোঁজে বাড়ী থেকে বের হয়ে পড়বে। অতঃপর তাদের কাছ থেকে মাফ করিয়ে নেবে। অথবা যার যা পাওনা, তা শোধ করে দেবে। যদি যথাসাধ্য চেষ্টার পর সকল পাওনাদার অথবা তাদের ওয়ারিসদেরকে তালাশ করা সম্ভব না হয়, তবে বিপুল পরিমাণে সৎকর্ম করবে, যাতে কিয়ামতের দিন এসব সৎকর্মের সওয়াব দিয়ে পাওনাদারদের পাওনা শোধ করা যায়। সুতরাং মানুষের পাওনার পরিমাণ অনুযায়ী সৎকর্ম করা চাই। যদি সৎকর্ম দ্বারা সকল পাওনা শোধ না হয়, তবে পাওনাদারদের গোনাহ তার উপর চাপিয়ে দেয়া হবে। ফলে, সে অপরের গোনাহের বদলে জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করবে। যদি কারও ধনসম্পদে হালাল ও হারাম মিশে যায়, তবে আন্দাজ করে হারাম মাল বের করে খয়রাত করে দেবে।


কুৎসা রটনা, গীবত ইত্যাদির মাধ্যমে অপরের মনে কষ্ট দিলে তার তওবা হল, যাদের মনে কষ্ট দিয়ে থাকবে তাদের প্রত্যেককে তালাশ করে মাফ করিয়ে নেয়া। যদি তাদের কেউ মারা গিয়ে থাকে অথবা নিরুদ্দেশ থাকে, তবে তার তওবা এ ছাড়া কিছুই নয় যে, পুণ্যকর্ম অনেক করবে, যাতে কিয়ামতে বিনিময়ে দিতে পারে। যাকে তালাশ করে পাওয়া যায়, সে যদি মনের খুশীতে মাফ করে দেয়, তবে এটা তার অপরাধের কাফফারা হয়ে যাবে। কিন্তু যে অপরাধ করেছে এবং মুখে যা যা বলেছে, তা মাফ চাওয়ার সময় বর্ণনা করা ওয়াজিব। অস্পষ্ট মাফ করানো যথেষ্ট হবে না। কেননা, এমনও হয় যে, নিজের উপর অপরের বাড়াবাড়ির কথা জানার পর মাফ করতে মন চায় না এবং কিয়ামতেই বিনিময় নেয়ার কথা চিন্তা করা হয়। তবে যদি এমন কোন অপরাধ করে থাকে, যা বর্ণনা করলে প্রতিপক্ষ মনে ব্যথা পাবে, তবে বুঝতে হবে মাফ করানোর পথ রুদ্ধ। তবে এটা সম্ভব যে, অস্পষ্ট মাফ করিয়ে নিবে এবং পরে যে ত্রুটি থেকে যাবে,তা পুণ্য কর্মের দ্বারা পূরণ করে নেবে। অপরাধ উল্লেখ করার পর প্রতিপক্ষ যদি মাফ করতে সম্মত না হয়, তবে শাস্তি অপরাধীর ঘাড়ে থেকে যাবে। কেননা, প্রতিপক্ষের হক এখনও বহাল রয়েছে। এমতাবস্থায় অপরাধীর উচিত তার সাথে নম্র ব্যবহার করা, তার খেদমত করা এবং তার প্রতি ভালবাসা ও সৌহার্দ প্রকাশ করা। এতে প্রতিপক্ষের মন তার প্রতি নরম হবে। কেননা, কথায় বলে, মানুষ অনুগ্রহের দাস। ফলে, শেষ পর্যন্ত সে মাফ করতে সম্মত হয়ে যাবে। যদি এরপরও মাফ না করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকে, তবে তার নম্রতা ও সদ্ব্যবহার মাঠে মারা যাবে না; বরং এগুলো পুণ্যকর্ম হয়ে যাবে, যা দ্বারা কিয়ামতে বিনিময় দেখা যাবে।


বুখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) বলেন : পূর্ববর্তী উম্মতসমূহের মধ্যে এক ব্যক্তি ৯৯টি খুন করেছিল। অতঃপর সে মানুষের কাছে জিজ্ঞেস করল : বর্তমান যুগে সর্ববৃহৎ আলেম কে? লোকেরা বলল : অমুক সন্ন্যাসী। সে তার কাছে গেল এবং বলল : আমি ৯৯টি খুন করেছি। আমার তওবা কবুল হবে কি? সন্ন্যাসী জওয়াব দিল না। সে সন্ন্যাসীকেও হত্যা করে খুনের সংখ্যা একশতে উন্নীত করে নিল। সে পুনরায় লোকদেরকে জিজ্ঞেস করল : এখন সেরা আলেম কে? লোকেরা জনৈক আলেমের নাম বললে সে তার কাছে গেল এবং বলল : আমি একশ' জনকে হত্যা করেছি। আমার তওবা কবুল হবে কি না? আলেম বলল : তওবা কবুল হওয়ার ব্যাপারে কোন বাধা নেই। যখনই তওবা করবে, কবুল হবে। তুমি অমুক জায়গায় যাও। সেখানে কিছু লোক আল্লাহর এবাদতে নিয়োজিত রয়েছে। তুমিও তাদের সাথে এবাদতে মগ্ন থাক এবং কখনও দেশে ফিরে যেয়ো না। লোকটি অর্ধেক পথ অতিক্রম করতেই মৃত্যু এসে তার সামনে উপস্থিত হল। তখন রহমত ও আযাবের ফেরেশতারা আগমন করল! তাদের মধ্যে বিতর্ক হল। রহমতের ফেরেশতারা বলল : এ ব্যক্তি তওবা করে এবং আন্তরিকভাবে আল্লাহর প্রতি মনোযোগী হয়ে এসেছে। সুতরাং তার রূহ কবয করার অধিকার আমাদের। আযাবের ফেরেশতারা বলল : সে কোন দিন কোন ভাল কাজ করেনি। তাই আমরাই তার রূহের হকদার। ইতিমধ্যে জনৈক ফেরেশতা মানুষের বেশে সেখানে উপস্থিত হল। ফেরেশতাদের উভয় পক্ষ তাকে তাদের ব্যাপারে সালিস করে নিল। সে বললঃ এই ব্যক্তির উভয় দিকের দূরত্ব মেপে নেয়া উচিত। যেদিকের দূরত্ব কম হবে, তাকে সেই দিকের গণ্য করতে হবে। দূরত্ব মেপে দেখা গেল, যেদিকে সে যেতে চেয়েছিল, সেদিকের দূরত্ব অর্ধ হাত কম।ফলে, রহমতের ফেরেশতারাই তার রূহ কবয করে নিল। এ থেকে জানা গেল, মুক্তি তখনই পাওয়া যাবে, যখন সৎকর্মের পাল্লা ভারী হবে যদিও তা সামান্যই হয়। এ কারণেই তওবাকারীর জন্যে অধিক পরিমাণে সৎকর্ম করা জরুরী।


ভবিষ্যতকালের জন্যে তওবাকারীর উচিত আল্লাহ তা'আলার সাথে সেই গোনাহ না করার পাকাপোক্ত অঙ্গীকার করা। 

উদাহরণতঃ রোগী রুগ্নাবস্থায় জানতে পারল যে, অমুক ফল তার জন্যে ক্ষতিকর। অতঃপর সে দৃঢ় সংকল্প করল যে, সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত কখনও সেই ফল খাবে না। তার এই সংকল্প তখন তো পাকাপোক্তই হয়ে থাকে- যদিও অন্য সময় খাহেশ প্রবল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অতএব, তওবা করার সময় তওবাকারী পাকাপোক্ত সংকল্প করবে। নতুবা তাকে তওবাকারী বলা হবে না। তার এই সংকল্প শুরুতে তখন পূর্ণ হবে, যখন সে নির্জনবাস, নীরবতা, স্বল্প আহার, স্বল্প নিদ্রা ও হালাল খাদ্য অবলম্বন করবে। যদি তার কাছে উত্তরাধিকার সূত্রে হালাল উপার্জন বিদ্যমান থাকে অথবা সে জীবন যাপন উপযোগী কোন পেশা করে, তবে এ নিয়েই সন্তুষ্ট থাকা উচিত। কেননা, হারাম খাদ্য সকল গোনাহের মূল। হারাম ভক্ষণে অবিচল থাকলে তওবাকারী হবে কিরূপে? যদি তওবাকারী নির্জনবাস অবলম্বন না করে, তবে তওবায় “ইস্তেকামাত” তথা দৃঢ়তা পূর্ণাঙ্গ হবে। কেবল কিছুসংখ্যক গোনাহ যথা মদ, যিনা ও ছিনতাই থেকে তওবা করবে! এটা সর্বাবস্থায় তওবা নয়; বরং কারও কারও মতে এরূপ তওবা জায়েযই নয়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, কতক গোনাহ পরিত্যাগ করা মোটেই উপকারী নয়। কেননা, আমরা জানি, গোনাহ বেশী হলে আযাব বেশী এবং কম হলে আযাব কম হবে। পক্ষান্তরে একদল উপরোক্ত তওবাকে জায়েয বলে থাকে। এর অর্থ এরূপ যে, কতক গোনাহ থেকে তওবা করেই মুক্তি ও সাফল্য অর্জন করা যায়। কেননা, মুক্তি ও সাফল্য বাহ্যত দু'-তিনটি গোনাহ ত্যাগ করলেই অর্জিত হয় না। তবে আল্লাহ তা'আলার গোপন ক্ষমা-রহস্য আমাদের আলোচ্য বিষয় নয়।

কতক গোনাহ থেকে তওবা করার তিনটি সম্ভাব্য প্রকার রয়েছে। --

প্রথম প্রকার হল শুধু কবীরা গোনাহ থেকে তওবা করা এবং সগীরা গোনাহ থেকে না করা ! এটা সম্ভব। কেননা, তওবাকারী জানে, কবীরা গোনাহ আল্লাহর কাছে গুরুতর। এ কারণে তিনি দ্রুত ক্রুদ্ধ হন। পক্ষান্তরে সগীরা গোনাহে ক্ষমা পাওয়ার আশা প্রবল। এই জানার কারণে এটা সম্ভব যে, সে কেবল বড় গোনাহ থেকে তওবা করবে এবং তজ্জন্য অনুতপ্ত হবে। পূর্ববর্তী যুগে অনেক তওবাকারী অতিক্রান্ত হয়েছে; অথচ তাদের মধ্যে কেউ নিষ্পাপ ছিল না। এ থেকে বুঝা যায়, তওবার জন্যে নিষ্পাপ হওয়া জরুরী নয়।


দ্বিতীয় প্রকার হল কতক কবীরা গোনাহ থেকে তওবা করা এবং কতক থেকে না করা। এটাও বাস্তবসম্মত। কেননা, মানুষ বিশ্বাস করে, কবীরা গোনাহসমূহের মধ্যে স্তরভেদ রয়েছে। কিছু কবীরা গোনাহ তীব্র এবং কিছু অপেক্ষাকৃত হাল্‌কা। উদাহরণতঃ কেউ হত্যা, লুণ্ঠন, যুলুম ও অপরের অধিকার হরণ থেকে এই মনে করে তওবা করে যে, এগুলো বান্দার হক, যা কখনও মাফ হবে না। পক্ষান্তরে আল্লাহর হক থেকে তওবা করে না এই বিশ্বাসের কারণে যে, এটা ক্ষমাযোগ্য।


তৃতীয় প্রকার হল, একাধিক সগীরা গোনাহ থেকে তওবা করা। কিন্তু কবীরা গোনাহ থেকে জানা সত্ত্বেও তওবা না করা এবং অবিচল থাকা। যেমন, কেউ মাহরাম নয়— এমন নারীর প্রতি দৃষ্টিপাত অথবা গীবত থেকে তওবা করে, কিন্তু মদ্যপান থেকে তওবা করে না। এটাও সম্ভবপর। কেননা, প্রত্যেক ঈমানদার ব্যক্তি গোনাহকে ভয় করে এবং স্বীয় কার্যকলাপের জন্যে অনুতপ্ত হয়। কেউ কম, কেউ বেশী। গোনাহে যে পরিমাণে আনন্দ পাওয়া যায়, সেই পরিমাণে ভয় কম হয়। ফলে, অধিক আনন্দদায়ক গোনাহে আনন্দ প্রবল এবং ভয় দুর্বল হয়ে থাকে। পাপাচারী ব্যক্তি কখনও এমন মাদকাসক্ত হয় যে, সবর করতে পারে না; কিন্তু গীবত, পরনিন্দা ও পরনারীর প্রতি তাকানোর খাহেশ তার মধ্যে মোটেই থাকে না। তার মধ্যে খোদাভীতি এমন থাকে, যা দ্বারা দুর্বল আগ্রহের মূলোৎপাটন করতে পারে কিন্তু প্রবল আগ্রহে পারে না। এই ভয়ের কারণে সে এমন কাজকর্ম বর্জন করে, যার প্রতি আগ্রহ কম। সে মনে মনে বলে, যদি শয়তান কতক গোনাহে আমাকে কাবু করে ফেলে, তবে তারই কাবুতে থাকা আমার জন্যে উচিত হবে না; বরং কতক গোনাহে তার সাথে জেহাদ করে আমাকে বিজয়ী হতে হবে। হয়তো এই বিজয় আমার অন্য গোনাহের জন্যে কাফ্ফারা হয়ে যাবে। পাপাচারীর মনে এই ধারণা না থাকলে তার নামায পড়া ও রোযা রাখার কারণ বোধগম্য হয় না। যদি তাকে বলা হয় : তুমি যে নামায পড়, তা আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্যে হলে নাজায়েয, আর আল্লাহর জন্যে হলে পাপাচারকে আল্লাহর জন্যে বর্জন কর, তবে সে এর জবাবে একথাই বলবে যে, আল্লাহ আমাকে দুটি আদেশ দিয়েছেন। যদি আমি উভয়টি অমান্য করি, তবে দুটি আযাব ভোগ করতে হবে। আমি একটি আদেশ পালনের ক্ষেত্রে শয়তানকে পরাভূত করার শক্তি রাখি এবং অপরটি পালনে শয়তানকে পরাস্ত করতে অক্ষম। তাই যে বিষয়ে শক্তি আছে, সে জেহাদ করে আমি শয়তানকে ব্যর্থ করে দেই। আমি আশা করি, আল্লাহ তা'আলা এই জেহাদকে সে গোনাহের কাফফারা করে দেবেন, যাতে আমি অক্ষম। মোটকথা, এটা নিঃসন্দেহে সম্ভবপর; বরং প্রত্যেক মুসলমানের অবস্থা তাই। এমন মুসলমান কে, যার মধ্যে এবাদত ও গোনাহের সহ-অবস্থান নেই? এর কারণ উপরোক্ত বক্তব্য ছাড়া আর কিছুই নয় ।


এখানে প্রশ্ন হয়, যদি কোন ব্যক্তি যিনা করে, এরপর সে পুরুষত্ব হারিয়ে ফেলে এবং তদবস্থায় যিনা থেকে তওবা করে, তবে তার তওবা দুরস্ত হবে কি না? এর জওয়াব এই যে, তওবা দুরস্ত হবে না। কেননা, তওবা এমন অনুতাপকে বলা হয়, যা থেকে এমন কাজ বর্জন করার সংকল্প উৎপন্ন হয়, যা করার ক্ষমতা তওবাকারীর রয়েছে। আর যে কাজ করার ক্ষমতাই নেই, তা তো আপনা-আপনিই অন্তর্হিত হয়ে যায়, বর্জন করার কারণে অন্তর্হিত হয় না। হ্যাঁ, পুরুষত্ব হারানোর পর যদি সে যিনার ক্ষতি সম্পর্কে সম্যক অবগতি লাভ করে এবং তজ্জন্যে তার মধ্যে এমন দুঃখ ও অনুতাপ উথলে উঠে যে, তার মধ্যে পুরুষত্ব থাকলেও তা এই অনুতাপের সামনে পরাভূত হয়ে যেত, তবে এমতাবস্থায় আশা করা যায় যে, আল্লাহ তা'আলা তাকে মাফ করে দেবেন এবং এই অনুতাপ তার কাফফারা হয়ে যাবে। সারকথা এই যে, অন্তর থেকে গোনাহের অন্ধকার দূর হওয়ার জন্যে দুটি বিষয় দরকার— এক, অনুতাপের জ্বালা এবং দুই, গোনাহ বর্জনের জন্যে ভবিষ্যতে কঠোর সাধনা। বর্ণিত ক্ষেত্রে পুরুষত্বহীনতার কারণে সাধনা হতে পারে না। কিন্তু যদি অনুতাপই এমন শক্তিশালী হয় যে, সাধনা ছাড়াই গোনাহের অন্ধকার দূর করে দেয়, তবে এটা অসম্ভব নয়। অন্যথায় বলতে হবে, তওবাকারীর তওবা তখন কবুল হয়, যখন সে তওবার পর কিছুদিন জীবিত থাকে এবং এই দিনগুলোতে কয়েকবার সেই গোনাহের ব্যাপারে নফসের বিরুদ্ধে জেহাদ করে নেয়। কিন্তু শরীয়তের কোথাও এরূপ শর্ত বুঝা যায় না। 


পরবর্তী পর্ব

তওবার ব্যাপারে মানুষের স্তরভেদ 

তওবা - (পর্ব - ১১) পূর্ণাঙ্গ তওবা ও তার শর্তাবলী

 

তওবা - (পর্ব - ১১)
পূর্ণাঙ্গ তওবা ও তার শর্তাবলী

পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে যে, তওবা সেই অনুশোচনাকে বলা হয়, যার ফলস্বরূপ সংকল্প অস্তিত্ব লাভ করে। নিজের এবং প্রেমাস্পদের মাঝে গোনাহের প্রাচীর খাড়া হওয়ার জ্ঞান হচ্ছে এই অনুশোচনার কারণ। সুতরাং তওবার অংশ হচ্ছে জ্ঞান, অনুশোচনা ও সংকল্প। এই অংশত্রয়ের প্রত্যেকটির জন্যে রয়েছে পূর্ণাঙ্গতার পরিচয় ও স্থায়িত্বের শর্তাবলী। এগুলো বর্ণনা করা জরুরী। জ্ঞানের বর্ণনা হচ্ছে তওবার কারণ বর্ণনার নামান্তর, যা পরে উল্লিখিত হবে। এখানে প্রথমে অনুশোচনা বলা হয় অন্তরের ব্যথাকে, যা প্রেমাস্পদকে হারানোর সংবাদ শুনে সৃষ্টি হয়। এর পরিচয় হচ্ছে অত্যধিক দুঃখ ও বেদনা হওয়া, অশ্রু বিসর্জন করা এবং প্রচুর কান্নাকাটি করা; যেমন কেউ আপন সন্তান অথবা কোন প্রিয়জনের বিপদ সম্পর্কে অসহ্য যন্ত্রণা অনুভব করে এবং প্রচুর কান্নাকাটি করে।


এখন প্রশ্ন হল নিজের প্রাণের চেয়ে অধিক প্রিয় আর কি, জাহান্নামের অগ্নির চেয়ে বড় বিপদ আর কি এবং গোনাহের চেয়ে বেশী আযাব নাযিল হওয়ার প্রমাণ কোন্‌টি? বরং একজন মানুষ যাকে চিকিৎসক বলা হয়, সে যদি কোন ব্যক্তিকে বলে দেয়, তোমার পুত্র দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছে এবং সে অতিসত্ত্বর মারা যাবে, তবে তৎক্ষণাৎ সে দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে পরে এবং কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। অথচ পুত্র প্রাণাধিক প্রিয় নয় এবং ডাক্তারও আল্লাহ ও রসূলের চেয়ে অধিক জ্ঞানী ও সত্যবাদী নয়। এ থেকে জানা গেল যে, মানুষের উচিত নিজের দুরবস্থার জন্যে অধিক দুশ্চিন্তা ও দুঃখ করা। দুঃখ, দুশ্চিন্তা ও অনুতাপ যত বেশী হবে, সে পরিমাণে গোনাহ দূর হওয়ার আশা করা যাবে। মোটকথা, অন্তরের বিনম্রতা এবং অশ্রুপাত হল বিশুদ্ধ অনুশোচনার লক্ষণ। হাদীসে বর্ণিত আছে, তওবাকারীদের সংসর্গ অবলম্বন কর। তাদের অন্তর খুব নরম থাকে। অন্তরে গোনাহের স্বাদের পরিবর্তে তিক্ততা প্রতিষ্ঠিত হওয়াও অনুশোচনার একটি লক্ষণ। 


বর্ণিত আছে, বনী ইসরাঈলের এক ব্যক্তি গোনাহ করার পর অনেক বছর পর্যন্ত এবাদতে মশগুল থাকে। কিন্তু তওবা কবুল হওয়ার কোন লক্ষণ প্রকাশ পেল না। অগত্যা সে সমসাময়িক পয়গম্বরের কাছে সুপারিশ প্রার্থী হল। পয়গম্বর আল্লাহর দরবারে তার জন্য দোয়া করলেন। আল্লাহ পাক এরশাদ করলেন: আমার ইযযত ও প্রতাপের কসম, যদি ভূ-পৃষ্ঠের সকলেই তার জন্যে সুপারিশ করে, তবুও আমি তার তওবা কবুল করব না- যতক্ষণ পর্যন্ত যে গুনাহ থেকে সে তওবা করেছে, তার স্বাদ তার অন্তরে থাকবে।

এখানে কেউ প্রশ্ন করতে পারে যে, গোনাহ স্বাভাবিকভাবেই মানুষের কাছে সুস্বাদু হয়ে থাকে। সুতরাং এর তিক্ততা অন্তরে প্রতিষ্ঠিত হবে কিরূপে? জওয়াব এই যে, মনে কর কেউ বিষ মিশ্রিত মধু পান করল। অধিক মিষ্ট হওয়ার কারণে সে পান করার সময় বিষ টের পেল না। এরপর সে অসুস্থ হয়ে পড়ল, চুল বিক্ষিপ্ত হয়ে গেল এবং সর্বাঙ্গ শক্ত হয়ে গেল। এখন যদি কেউ তার সামনে পূর্ববৎ বিষ মিশ্রিত মধু পেশ করে এবং সেও চরম ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্ত হয়, তবে সে এই মধুকে ঘৃণা করবে কি না? যদি বল করবে না তবে এটা অভিজ্ঞতার পরিপন্থী। নিয়ম এই যে, এহেন কষ্ট ভোগ করার পর যদি কেউ খাঁটি মধুও পেশ করে, তবে একরূপ রঙ দেখে তা-ও প্রত্যাখ্যান করবে। কথায় বলে চুন খেয়ে মুখ পুড়লে দৈ দেখলেও ভয় লাগে। অতএব, তওবাকারী ব্যক্তি অন্তরে গোনাহের যে তিক্ততা অনুভব করে, তাও এমনিভাবে বুঝা দরকার। প্রথমে সে জানে, প্রত্যেক গোনাহের স্বাদ মধুর মত মিষ্ট। কিন্তু তার প্রতিক্রিয়া বিষের অনুরূপ। এরূপ বিশ্বাস না হওয়া পর্যন্ত তওবা খাঁটি ও সাচ্চা হয় না। কিন্তু এরূপ বিশ্বাস খুব বিরল। তাই তওবা এবং তওবাকারীও বিরল। সকলেরই এক অবস্থা। তারা আল্লাহর প্রতি বিমুখ এবং গোনাহে অবিচল


এখন সংকল্প সম্পর্কে বলা যাক। এটা অনুশোচনা থেকে উৎপন্ন হয় এবং তিনটি কালের সাথেই এর সম্পর্ক। 

বর্তমানকালে সংকল্পের অর্থ এই যে, যে নিষিদ্ধ কাজ করে যাচ্ছে, তা বর্জন করবে এবং যে ফরয কর্ম করার উদ্যোগ নিয়েছে, তা তখনই আদায় করে নেবে। অতীতকালে সংকল্পের মানে এই যে, পূর্বে যে ত্রুটি হয়ে গেছে, তা পূরণ করবে। 

ভবিষ্যতকালে সংকল্পের উদ্দেশ্য হল মৃত্যু পর্যন্ত এবাদত-বন্দেগী অব্যাহত রাখবে এবং গোনাহ বর্জন করবে।

অতীতকালের সাথে সম্পর্কের দিক দিয়ে তওবা বিশুদ্ধ হওয়ার শর্ত এই যে, চিন্তা করে বের করবে কোন্ দিন সে বালেগ হয়েছিল। এটা জানা হয়ে গেলে সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত যতটুকু বয়স হয়েছে, তার এক এক বছর, মাস ও দিনের মধ্যে খোঁজ করে দেখবে কোন্ এবাদতে সে ত্রুটি করেছে অথবা কি পরিমাণ গোনাহ করেছে। যদি জানা যায় যে, কতক নামায সে পড়েনি, তবে সেই নামাযের কাযা পড়বে। এরূপ নামাযের সঠিক সংখ্যা জানা না গেলে বালেগ হওয়ার দিন থেকে হিসাব করে যে পরিমাণ নামায নিশ্চিতরূপে আদায় করা হয়েছে, সেগুলো বাদ দিয়ে অবশিষ্ট নামাযের কাযা পড়বে। এরূপ নামাযের সংখ্যা আন্দাজ করে নেয়াও জায়েয। রোযার ক্ষেত্রেও এভাবে আন্দাজ করে নেবে, কয়টি রোযা রাখা হয়নি। এরপর সেগুলোর কাযা করে নেবে। যাকাত না দিয়ে থাকলে নিজের সমস্ত ধন -সম্পদকে দেখবে, কবে থেকে তার মালিকানায় এসেছে। তবে এতে বালেগ হওয়ার শর্ত নেই। কেননা, নাবালেগের মালেও যাকাত ফরয হয়। অতঃপর হিসাব করে প্রবল ধারণা অনুযায়ী যে পরিমাণ যাকাত ওয়াজিব হবে, তা আদায় করে দেবে। এ হচ্ছে এবাদতে খোঁজাখুঁজি করে ত্রুটি জানা ও তা পূরণ করার পদ্ধতি।


গোনাহের ক্ষেত্রে উপায় এই যে, বালেগ হওয়ার শুরু থেকে তওবার দিন পর্যন্ত নিজের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গোনাহ দিন ও ঘন্টায় চিন্তা করবে এবং পৃথক পৃথক গোনাহ সম্পর্কে অবগতি লাভ করবে। এরপর দেখবে এসব গোনাহের কোন্ কোন্‌টি আল্লাহর হক সম্পর্কিত এবং কোন্ কোন্‌টি বান্দার হক সম্পর্কিত। যে সকল গোনাহ্ আল্লাহর হক সম্পর্কিত, সেগুলো থেকে তওবার উপায় হচ্ছে দুঃখ ও অনুতাপ করা এবং প্রত্যেক গোনাহের বিনিময়ে সৎকর্ম করা। এমতাবস্থায় যে পরিমাণ গোনাহ হবে, সে পরিমাণে সৎকর্ম করতে হবে। কারণ, হাদীসে আছে — "তুমি যেখানেই থাক, আল্লাহকে ভয় কর এবং গোনাহের পশ্চাতে সৎকর্ম সম্পাদন কর;" বরং কোরআন পাকে বলা হয়েছে, “সৎকর্ম পাপকে মিটিয়ে দেয়”।

এই বিনিময়ের কয়েকটি দৃষ্টান্ত এই যে, যদি কেউ বাদ্যযন্ত্র শুনে থাকে, তবে তার বিনিময়ে ততক্ষণ কোরআন, ওয়ায অথবা যিকর শুনবে। মসজিদে নাপাক অবস্থায় বসে থাকলে, ততক্ষণ এতেকাফের নিয়তে বসে এবাদতে মশগুল হবে। উযু ছাড়া কোরআন মজীদ স্পর্শ করে থাকলে তার সম্মান করবে, অধিক পরিমাণে তেলাওয়াত করবে এবং চুম্বন করবে। মদ্যপান করে থাকলে হালাল উপার্জনের শরবত সদকা করবে। উদ্দেশ্য এই যে, প্রত্যেক গোনাহের বিপরীত পদ্ধতি দ্বারা সেই গোনাহের বিপরীত সৎকর্মের আলো ছাড়া দূর হবে না। উদাহরণতঃ কাল রঙ দূর করতে হলে সাদা রঙ প্রয়োগ করতে হবে। উত্তাপ ও শৈত্য দ্বারা তা দূর হবে না। গোনাহ দূর করার জন্যে এ পদ্ধতি অধিক ফলপ্রসূ ও সহজ – যদিও এক প্রকার এবাদত অব্যাহতভাবে করতে থাকলেও কিছুটা ফল লাভের আশা আছে। বিপরীত পদ্ধতি দ্বারা গোনাহ দূর হওয়ার কারণ এই যে, দুনিয়ার মোহ সকল গোনাহের মূল শিকড়। দুনিয়ার অনুগামী হওয়ার প্রভাবে অন্তর দুনিয়ার প্রতি তুষ্ট থাকে এবং তৎপ্রতি আগ্রহান্বিত হয়। 

অতএব, মুসলমান ব্যক্তির উপর এমন বিপদ আসা জরুরী, যা দ্বারা তার অন্তর দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কেননা, দুঃখ ও বেদনার কারণে অন্তর দুনিয়া থেকে আলাদা হয়ে যায়। এটাও তার জন্যে গোনাহের কাফফারা হয়ে যায়।


হাদীসে আছে, কতক গোনাহের জন্য কেবল দুঃখ ও বেদনাই হয়ে থাকে। হযরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণিত এক রেওয়ায়েতে এরশাদ হয়েছে— যখন বান্দার গোনাহ বেশী হয়ে যায় এবং কাফফারার জন্যে আমল থাকে না, তখন আল্লাহ তা'আলা তাকে অনেক দুঃখ ও কষ্টে ফেলে দেন এবং এ দুঃখ-কষ্টই তার গোনাহের কাফ্ফা হয়ে যায়।


এখানে প্রশ্ন হতে পারে যে, মানুষের দুঃখ-কষ্ট অধিকাংশ ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি ও জাঁকজমকের কারণে হয়ে থাকে। এটা গোনাহ। সুতরাং গোনাহের কাফফারা গোনাহ কিরূপে হবে? এর জওয়াব এই যে, ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততির মহব্বত গোনাহ এবং এগুলো থেকে বঞ্চিত থাকা এ গোনাহের বিনিময়। মহব্বতের চাহিদা অনুযায়ী ভোগ করলে পূর্ণ দোষী হত। 

বর্ণিত আছে, হযরত জিবরাঈল বন্দীশালায় হযরত ইউসুফ (আঃ)-এর কাছে গমন করলে তিনি জিবরাঈলকে জিজ্ঞেস করলেন : সেই দরদী বৃদ্ধ অর্থাৎ হযরত এয়াকুব (আঃ)-কে কি অবস্থায় রেখে এসেছেন? জিবরাঈল (আঃ) বললেন : তিনি আপনার জন্যে যে দুঃখ সয়েছেন, তা এমন একশ' জন মহিলার দুঃখের সমান, যাদের সন্তান মারা গেছে। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন : তিনি আল্লাহর কাছে এই দুঃখ-কষ্টের সওয়াব কি পরিমাণে পাবেন? উত্তর হল : তিনি শহীদের অনুরূপ সওয়াব পাবেন। এ থেকে বুঝা গেল, দুঃখ-কষ্টও আল্লাহর হকের কাফ্ফারা হয়ে থাকে।


পরবর্তী পর্ব

বান্দার হক সম্পর্কিত তওবা

শনিবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

তওবা - (পর্ব - ১০) সগীরা গোনাহ কিরূপে কবীরা হয়ে যায়



তওবা - (পর্ব - ১০)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

সগীরা গোনাহ কিরূপে কবীরা হয়ে যায়—

জানা উচিত যে, সগীরা গোনাহ কয়েকটি কারণে কবীরা হয়ে যায়। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে অব্যাহতভাবে করে যাওয়া। এ কারণেই বলা হয়েছে যে, কোন গোনাহ অব্যাহতভাবে করা হলে তা সগীরা নয় এবং যে কোন গোনাহ এস্তেগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) সহকারে করা হলে তা কবীরা নয়। এর সারমর্ম এই যে, যদি কোন ব্যক্তি একটি কবীরা গোনাহ করে বিরত থাকে এবং অন্য কবীরা গোনাহ না করে, তবে এতে ক্ষমা পাওয়ার আশা অধিক সেই সগীরা গোনাহের তুলনায়— যা অব্যাহতভাবে করা হয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ যদি শক্ত পাথরের উপর এক এক ফোটা পানি অব্যাহতভাবে পতিত হতে থাকে, তবে এক সময়ে পাথরে চিহ্ন দেখা দেবে । পক্ষান্তরে যদি সকল ফোটার পানি একত্রিত করে এক সাথে সেই পাথরের উপর ঢেলে দেয়া হয়, তবে কোন চিহ্ন দেখা দেবে না। অব্যাহতভাবে করার এই প্রভাবের প্রতি লক্ষ্য করেই রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহী ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন– “সর্বোত্তম আমল তাই, যা অব্যাহতভাবে করা হয়। যদিও তা পরিমাণে কম হয়। এ হাদীস থেকে জানা গেল যে, স্থায়ী আমল কম হলেও উপকারী। এর বিপরীতে আরও জানা গেল যে, অনেক আমল যা মানুষ একবারে করে নেয়, তা অন্তরের পবিত্রতায় কম উপকারী হয়ে থাকে। এমনিভাবে সগীরা গোনাহ যদি অব্যাহতভাবে করা হয়, তবে তা অন্তরকে মলিন ও তমসাচ্ছন্ন করার ব্যাপারে অধিক প্রভাবশালী হবে। তবে একথা ঠিক যে, অগ্রে ও পশ্চাতে সগীরা গোনাহ না করে সহসাই কবীরা গোনাহ করার দৃষ্টান্ত খুবই বিরল। উদাহরণতঃ হত্যাকারী সহসাই কাউকে হত্যা করে না যে পর্যন্ত পূর্ব থেকে শত্রুতা না হয়। এমনিভাবে প্রত্যেক কবীরা গোনাহ করার মধ্যে প্রাসঙ্গিকভাবে শুরুতে ও শেষে সগীরাও করা হয়। যদি কোন ক্ষেত্রে সগীরা ব্যতিরেকেই সহসা কবীরা গোনাহ হয়ে যায় এবং পুনর্বার তা না করা হয়, তবে সম্ভবত এই কবীরা গোনাহ মাফ হওয়ার আশা সেই সগীরার তুলনায় বেশী, যা আজীবন করা হয়। সগীরা গোনাহ কবীরা হয়ে যাওয়ার আরও একটি কারণ হচ্ছে গোনাহকে ছোট মনে করা। কেননা, এটাই নিয়ম যে, মানুষ নিজের গোনাহকে যত বড় মনে করবে, আল্লাহ তা'আলার কাছে তা ততই ছোট হবে এবং গোনাহকে যত সগীরা মনে করবে, তা ততই কবীরা হবে : কারণ, গোনাহকে বড় মনে করা এ বিষয়ের প্রমাণ যে, অন্তরে গোনাহের প্রতি বিতৃষ্ণা ও ঘৃণা বিদ্যমান রয়েছে। ফলে, অন্তরে এর প্রভাব বেশী হয় না। পক্ষান্তরে গোনাহকে ছোট মনে করলে বুঝা যায়, অন্তরে এর প্রতি টান রয়েছে। এ কারণেই অন্তরে এর প্রভাব বেশী হয়। আর এ কারণেই মানুষ অসাবধানতায় কোন পাপ করে ফেললে তজ্জন্য পাকড়াও করা হয় না। কেননা, এ অবস্থায় অন্তর প্রভাবিত হয় না। হাদীস শরীফে আছে, “ঈমানদার ব্যক্তি তার গোনাহকে এমন মনে করে যেন মাথার উপর একটি পাহাড় এসে গেছে এবং এক্ষণি তা মাথার উপর পড়ে যাবে। পক্ষান্তরে মুনাফিক তার গোনাহকে এমন মনে করে– যেন নাকের ডগায় মাছি বসেছে এবং তাকে উড়িয়ে দিয়েছে। ঈমানদারের অন্তরে গোনাহের এই গুরুত্বের কারণ এই যে, সে আল্লাহ তা'আলার প্রতাপ সম্পর্কে সম্যক অবগত। যখন সে চিন্তা করে যে, এই গোনাহের মাধ্যমে সে কার অবাধ্যতা করেছে, তখন সগীরা গোনাহও তার দৃষ্টিতে কবীরা প্রতিভাত হয়। বর্ণিত আছে, আল্লাহ তা'আলা কোন এক নবীকে এই ওহী প্রেরণ করেন যে, উপঢৌকন কম;এদিকে লক্ষ্য করো না, বরং দেখ– যে প্রেরণ করেছে সে কতটুকু মহান। তোমার পাপ ছোট– এদিকে দেখো না, বরং ভেবে দেখ, এ পাপ করে তুমি কার মোকাবিলা করেছ ? এদিক দিয়েই জনৈক সাধক বলেন : সগীরা গোনাহের কোন অস্তিত্বই নেই। যে বিষয়ে আল্লাহ তা'আলার বিরোধিতা হয়, তা কবীরা-ই বটে৷ 


সগীরা গোনাহ কবীরা হয়ে যাওয়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে গোনাহ করে উল্লসিত হওয়া এবং গর্ব করা। অতএব, মানুষ সগীরা গোনাহের যত বেশী স্বাদ পাবে, ততই তা কবীরা হবে। অন্তরকে তমসাচ্ছন্ন করার ব্যাপারে তার প্রভাবও বেশী হবে। এমনকি কতক গোনাহগার তাদের গোনাহের জন্যে বাহবা পেতে চায় এবং গোনাহ করে খুব আস্ফালন করে। উদাহরণতঃ কোন কোন ব্যবসায়ী বলে- দেখ, আমি খারাপ মাল কিভাবে চালিয়ে দিলাম এবং ক্রেতাকে ধোকা দিয়ে দিলাম। বলা বাহুল্য, এসব কারণে সগীরা গোনাহ কবীরা হয়ে যায়। আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে সময় দেয়া ও সহ্য করাকে তাঁর অনুগ্রহ মনে করে নিলেও সগীরা গোনাহ কবীরা হয়ে যায়। এই অনুগ্রহ মনে করার কারণে গোনাহগার ব্যক্তি গোনাহ বর্জন করতে অলসতা করে। সে জানে না যে, এই সময় দেয়ার পেছনে আল্লাহ তা'আলার উদ্দেশ্য হচ্ছে আরও বেশী গোনাহ করে নিক। সুতরাং বাস্তবে যা ক্রোধের কারণ, তাকেই অনুগ্রহের কারণ মনে করে নেয়া হয়। আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেন- “তারা মনে মনে বলে : আমাদের কথার কারণে আল্লাহ আমাদেরকে শাস্তি দেন না কেন”? তাদের জন্যে জাহান্নাম যথেষ্ট। তারা তাতে প্রবেশ করবে। এটা অত্যন্ত মন্দ জায়গা। গোনাহ করে তা বলে বেড়ানো অথবা অপরের সামনে গোনাহ করার কারণেও সগীরা গোনাহ কবীরা হয়ে যায়। কেননা, এতে প্রথমত, আল্লাহর পক্ষ থেকে যে গোপন রাখা হয়, তা ভেঙ্গে দেয়া হয়। দ্বিতীয়ত, অপরকে এ গোনাহের প্রতি উৎসাহিত করা হয়। ফলে, এক গোনাহের মধ্যে যেন দু’গোনাহ হয়ে যায়। হাদীসে বর্ণিত আছে, সকল মানুষের দোষ মার্জনা করা হবে ; কিন্তু যারা গোনাহ করে ফাঁস করে দেয়, তাদেরকে ক্ষমা করা হবে না। অর্থাৎ কেউ রাতের বেলায় দোষ করল, যা আল্লাহ তা'আলা গোপন রাখলেন। কিন্তু সকালে গাত্রোখান করে সে আল্লাহর পর্দাকে ছিন্ন করল এবং আপন গোনাহ প্রকাশ করে দিল। এরূপ ব্যক্তির দোষ মার্জনা করা হবে না। গুণ প্রকাশ করা, দোষ গোপন করা এবং গোপন বিষয় ফাঁস না করা বান্দার প্রতি আল্লাহ তা'আলার অন্যতম নেয়ামত। যে ব্যক্তি নিজের দোষ প্রকাশ করে দেয়, সে এই নেয়ামতের নাশোকরী করে। জনৈক বুযুর্গ বলেন  প্রথমত, মানুষের কোন গোনাহ না করা উচিত। যদি করেও, তবে অপরকে উৎসাহিত না করা উচিত। গোনাহগার ব্যক্তি আলেম ও অনুসৃত হলেও সগীরা গোনাহ কবীরা হয়ে যায়। আলেম ব্যক্তি যখন কোন সগীরা গোনাহ করে এবং তার অনুসরণে অন্যরাও তা করতে থাকে, তখন এ গোনাহ আলেম ব্যক্তির জন্যে কবীরা হয়ে যাবে। 

উদাহরণতঃ রেশমী বস্ত্র পরিধান করা, সন্দেহযুক্ত ধনসম্পদ গ্রহণ করা, শাসকবর্গের কাছে আসা-যাওয়া করা, তাদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করা এবং মুসলমানের মর্যাদাহানি করা ইত্যাদি। 

মানুষ আলেমের এ ধরনের দোষের সনদ পেশ করে থাকে। আলেম মরে যায় কিন্তু তার অনিষ্ট অব্যাহত থাকে। বলা বাহুল্য, যে ব্যক্তির সাথে সাথে তার পাপও মরে যায়, সে চমৎকার ব্যক্তি। হাদীসে আছে— যে ব্যক্তি কুপ্রথা চালু করে , সে নিজে সেই কাজ করার জন্যে গোনাহগার হবে এবং অন্য যারা এ কাজ করবে, তাদের পাপও তার উপর বর্তাবে এমতাবস্থায় যে, তাদের পাপ হ্রাস করা হবে না। অর্থাৎ যারা করবে তাদের পাপ আলাদা হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি সেই আমল লিখি, যা তারা অগ্রে পাঠায় এবং সেই আমল, যার চিহ্ন তাদের পেছনে থাকে”। 

এখানে ‘পেছনের চিহ্ন’ বলে সেই আমলকে বুঝানো হয়েছে, যা আমলকারীর মৃত্যুর পরও অব্যাহত থাকে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন আলেমের দুর্ভোগ অপরের অনুসরণের কারণে হয়ে থাকে। সে ভুল করলে তওবা করে নেয় ; কিন্তু মানুষ এরপরও তার অনুসরণ করতে থাকে এবং কাজটিকে ছড়াতে থাকে। জনৈক বুযুর্গ বলেন : আলেমের দোষ নৌকা ভেঙ্গে যাওয়ার মত। এতে নৌকা নিজেও নিমজ্জিত হয় এবং যাত্রীদেরকেও ডুবিয়ে দেয়। বনী ইসরাঈলের জনৈক আলেম মানুষকে বেদআত শিক্ষা দিয়ে গোমরাহ করত। পরবর্তীতে তার তওবা নসীব হয় এবং সে দীর্ঘকাল পর্যন্ত মানুষের সংস্কারে নিয়োজিত থাকে। আল্লাহ তা'আলা সমসাময়িক পয়গম্বরের কাছে এই মর্মে ওহী পাঠালেন যে, তাকে বলে দাও, 

“যদি তুমি কেবল আমারই দোষ করতে, তবে আমি তোমাকে মাফ করে দিতাম। কিন্তু তুমি তো বহু মানুষকে গোমরাহ করেছ, যে কারণে আমি তাদেরকে দোযখে নিক্ষেপ করেছি"। 

এ থেকে বুঝা গেল, আলেমদের দুটি বিষয় করা উচিত। প্রথমত, তারা মূলতই গোনাহ বর্জন করবে। দ্বিতীয়ত, যদি গোনাহ হয়ে যায়, তবে তা প্রকাশ করবে না। 

আলেমদের গোনাহের শাস্তি যেমন বেশী হয়, তেমনি তাদের পুণ্যকর্মের সওয়াবও অন্যদের অনুসরণের কারণে বেশী হয়। উদাহরণতঃ যদি আলেম বাহ্যিক সাজসজ্জা ও দুনিয়ার মোহ বর্জন করে এবং অল্প দুনিয়া নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে, তার এই রীতি অন্যরাও অবলম্বন করে, তবে অন্যরা যে পরিমাণ সওয়াব পাবে, তার সমস্তই সে-ও পাবে।


পরবর্তী পর্ব—

পূর্ণাঙ্গ তওবা ও তার শর্তাবলী

তওবা - (পর্ব - ৯) জান্নাত ও দোযখের স্তর পাপ ও পুণ্যের স্তরের উপর নির্ভরশীল

 


তওবা - পর্ব - ৯
জান্নাত ও দোযখের স্তর পাপ ও পুণ্যের স্তরের উপর নির্ভরশীল 

📚এহইয়াউ উলুমিদ্দীন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)


প্রকাশ থাকে যে, দুনিয়ার জীবন আখেরাতের মোকাবিলায় জাগরণের মোকাবিলায় স্বপ্নের মত। হাদীস দ্বারা এটা প্রমাণিত। 

বলা হয়েছে— মানুষ নিদ্রিত। যখন তারা মরে যাবে, জাগ্রত হবে। জাগরণের বিষয় যখন স্বপ্নে আসে, তখন তা দৃষ্টান্তের মত মনে হয়। ফলে, তা'বীর তথা ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়। এমনিভাবে আখেরাতের জাগরণে যে অবস্থা হবে, তা দুনিয়ার স্বপ্নে দৃষ্টান্তস্বরূপই প্রকাশ পেতে পারে। অর্থাৎ, স্বপ্নের মত এ অবস্থাও ব্যাখ্যা সাপেক্ষ হবে। এখানে আমরা স্বপ্নের ব্যাখ্যা সম্পর্কিত তিনটি কাহিনী নমুনাস্বরূপ উল্লেখ করছি। 

বর্ণিত আছে, এক ব্যক্তি হযরত ইবনে সীরীনের খেদমতে এসে আরয করল : আমি স্বপ্নে দেখেছি, আমার হাতে একটি নামাঙ্কিত মোহর রয়েছে। তা দ্বারা আমি মানুষের মুখে এবং যৌনাঙ্গে মোহর করছি। তিনি বললেন : মনে হয় তুমি মুয়াযযিন, রমযানে সোবহে সাদেক হওয়ার পূর্বে আযান দাও। লোকটি বলল : আপনি ঠিকই  বলেছেন। 


অন্য এক ব্যক্তি এসে বলল  : আমি স্বপ্নে দেখেছি তৈলকে তৈলবীজের মধ্যে ঢালছি। তিনি বললেনঃ তুমি কোন বাদী ক্রয় করে থাকলে তার অবস্থা তদন্ত করে দেখ। মনে হয় সে তোমার জননী। কেননা, তৈলের মূল হচ্ছে তৈলবীজ। এ থেকে বুঝা যায় যে, লোকটি তার মূল অর্থাৎ জননীর কাছে যায়। এরপর লোকটি তদন্ত করে জানতে পারল যে, তার বাঁদী বাস্তবিকই তার জননী ছিল। 


অন্য এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলঃ আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, মোতির হার শূকরের গলায় পরিধান করাচ্ছি। হযরত ইবনে সীরীন বললেন : মনে হয় তুমি জ্ঞানের বিষয়াদি অযোগ্য লোকদেরকে শিখিয়ে যাচ্ছ। বাস্তবে তাই ছিল। এসব ব্যাখ্যা থেকে জানা গেল রূপক বিষয়বস্তুকে কিভাবে বর্ণনা করা হয়। রূপক বিষয় বলে আমাদের উদ্দেশ্য এমন বিষয়, যাকে প্রতীক হিসেবে দেখলে শুদ্ধ ও সঠিক মনে হয়, আর বাহ্যিক আকৃতির প্রতি লক্ষ্য করলে মিথ্যা মনে হয়। উদাহরণতঃ প্রথম স্বপ্নের ব্যাখ্যায় যদি মুয়াযযিন কেবল বাহ্যিক আংটির প্রতি দেখত এবং তা দ্বারা মোহর করা বুঝত, তবে এ স্বপ্নকে মিথ্যা মনে করতে বাধ্য হত। কেননা, এ কাজ সে কখনও করেনি। কিন্তু মর্ম ও প্রতীকের প্রতি লক্ষ্য করার ফলে স্বপ্নটি সত্য হয়ে গেল। কারণ, মোহর করার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে বাধা দেয়া। মুয়াযযিন রমযান মাসে সোবহে সাদেকের পূর্বে আযান দিয়ে মানুষকে পানাহারে বাধা দিত। 

পয়গম্বরগণকে আদেশ করা হয়েছে তারা যেন মানুষের সাথে তাদের বুদ্ধির পরিমাপ অনুযায়ী কথাবার্তা বলেন। মানুষের বুদ্ধির পরিমাপ এই যে, তারা নিদ্রিত। নিদ্রিত ব্যক্তির কাছে বস্তুর স্বরূপ রূপক আকারেই উদঘাটিত হয়। তাই পয়গম্বরগণও মানুষের সাথে রূপক ভঙ্গিতে কথাবার্তা বলেন, যাতে তারা মূল উদ্দেশ্য বুঝে নেয়, যদিও বাহ্যিক শব্দ দ্বারা অন্য কিছু অর্থ হয়। মৃত্যুর পর মানুষ যখন জাগ্রত হবে, তখন বুঝবে, পয়গম্বরগণের কথা ঠিকই ছিল। 

উদাহরণতঃ হাদীসে বলা হয়েছে– "মুমিনের অন্তর আল্লাহর দু'অঙ্গুলির মধ্যস্থলে অবস্থিত” আলেমগণ ব্যতীত কেউ এ হাদীসের মর্ম বুঝে না। মূর্খদের দৃষ্টি কেবল এর শাব্দিক অর্থের উপর থাকে। কেননা, তারা ‘তাড়ীল’ নামক তাফসীর সম্পর্কে অজ্ঞ। ফলে, তারা শাব্দিক অর্থ অনুযায়ী আল্লাহ তা'আলার হাত ও অঙ্গুলি সপ্রমাণ করে। (নাউযুবিল্লাহ) 

এমনিভাবে অপর এক হাদীসে আছে - “আল্লাহ আদমকে নিজের আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন”  এতে মূর্খরা কেবল বাহ্যিক আকৃতি ও রং বুঝে নিয়ে আল্লাহ তা'আলাকেও এমনি মনে করে। অথচ তিনি এ সকল বিষয় থেকে পবিত্র। এসব কারণেই কতক লোক আল্লাহ তা'আলার গুণাবলীর ব্যাপারে দারুণ 

হোঁচট খেয়েছে। এমনকি, তারা আল্লাহর কালামকে অক্ষর ও শব্দভুক্ত মনে করে নিয়েছে। আখেরাতের বিষয় সম্পর্কে যে সকল দৃষ্টান্ত হাদীসে বর্ণিত রয়েছে কেউ কেউ সেগুলোকে অস্বীকার করে একারণে যে, তাদের কাছে বাহ্যিক শব্দই উদ্দেশ্য। আর বাহ্যিক শব্দের মাঝে বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যায়। উদাহরণতঃ হাদীসে আছে– “কিয়ামতের দিন মৃত্যুকে সাদা ভেড়ার আকারে উপস্থিত করে যবাহ করা হবে”। ধর্মদ্রোহী বোকারা এটা মানে না এবং পয়গম্বরণের প্রতি মিথ্যারোপ করে। প্রমাণ এই যে, মৃত্যু একটি অশরীরী বস্তু, আর ভেড়া শরীরী। অতএব, অশরীরী বস্তুর শরীরী হয়ে যাওয়া অসম্ভব। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা এসব নির্বোধকে আপন রহস্যাবলীর মারেফত থেকে অনেক ক্রোশ দূরে রেখেছেন। 

তিনি বলেনঃ “কেবল বিজ্ঞ ব্যক্তিরাই এসব রহস্য হৃদয়ঙ্গম করতে পারে”। মূর্খরা একথাও জানে না যে, কেউ যদি কাউকে বলে :  আমি স্বপ্নে একটি ভেড়া দেখেছি, যাকে মানুষ মহামারী বলে। ভেড়াটি পরে যবাহ হয়ে গেছে। একথা শুনে শ্রোতা জওয়াব দিল :  তুমি চমৎকার স্বপ্ন দেখেছ। মনে হয়, মহামারী খতম হয়ে যাবে। কেননা, যবাহ করা জন্তুর ফিরে আসা কল্পনাতীত। এখানে ব্যাখ্যাদাতাও সত্যবাদী এবং যে স্বপ্ন দেখেছে, সে-ও সত্যবাদী। আসলে স্বপ্ন দেখানো যে ফেরেশতার কাজ, সে নিদ্রিত ব্যক্তিকে “লওহে মাহফুযের” বিষয়টি দৃষ্টান্তের অনুরূপ বুঝিয়ে দিয়েছে। কেননা, নিদ্রিত ব্যক্তির পক্ষে দৃষ্টান্ত ছাড়া বুঝা সম্ভব ছিল না। এখন আমরা আসল উদ্দেশ্যের দিকে ফিরে আসছি। আমাদের উদ্দেশ্য এই যে, পাপ ও পুণ্যের ভিত্তিতে জান্নাত ও দোযখের স্তরসমূহের বিভাজন দৃষ্টান্ত ছাড়া বুঝা অসম্ভব। সুতরাং আমরা যে দৃষ্টান্ত বর্ণনা করব, তা দ্বারা অর্থ ও উদ্দেশ্য বুঝে নিতে হবে, আকার ও শব্দের পেছনে পড়া যাবে না"।

আখেরাতে মানুষের অনেক প্রকার হবে। সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্যে তাদের স্তর ও উপলব্ধির সীমাহীন তফাৎ হবে। যেমন, দুনিয়ার সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্যের ব্যাপারে তাদের তফাতের অন্ত নেই। এ ব্যাপারে দুনিয়া ও আখেরাতে কোন পার্থক্য নেই। কেননা, উভয় জগতের পরিচালক একমাত্র লা-শরীক আল্লাহ। তার চিরন্তন তরীকা ও পদ্ধতিও একই রকম। যেহেতু আমরা স্তরসমূহ গণনা করতে অক্ষম, তাই এগুলোর শ্রেণী সীমিত করে বর্ণনা করছি।


কিয়ামতের দিন মানুষ চার শ্রেণীতে বিভক্ত হবে। 

প্রথম ধ্বংসপ্রাপ্ত, দ্বিতীয় শাস্তিপ্রাপ্ত, তৃতীয় মুক্তিপ্রাপ্ত এবং চতুর্থ সফলকাম।

দুনিয়াতে এর দৃষ্টান্ত এই যে, কোন বাদশাহ যুদ্ধ করে কোন দেশ জয় করলে তার অধিবাসীদের কতককে হত্যা করে— এরা প্রথম শ্রেণী, কতককে দীর্ঘকাল জেলে আটকে রাখে— এরা দ্বিতীয় শ্রেণী, কতককে ছেড়ে দেয় — এরা তৃতীয় শ্রেণী এবং কতককে পুরস্কৃত করে — এরা চতুর্থ শ্রেণী।


বাদশাহ ন্যায়পরায়ণ হলে এসব আচরণ বিনা কারণে হবে না। হত্যা তাদেরকেই করবে, যারা তার অধিকারকে অস্বীকার করবে এবং তার বন্ধুর শত্রু হবে। 

জেলে তাদেরকে পাঠাবে— যারা তার আধিপত্য স্বীকার করবে; কিন্তু আনুগত্য ও খেদমতে ত্রুটি করবে। 

মুক্তি তাদেরকে দেবে, যারা কেবল তার বশ্যতা মেনে নেবে। 

পুরস্কৃত তাদেরকে করবে, যারা আজীবন তার খেদমত ও সহযোগিতায় দিনাতিপাত করবে। 

এরপর এটাও জরুরী যে, যে যেরূপ খেদমত করবে, সে অনুপাতেই সে পুরস্কার পাবে। হত্যাও বিভিন্ন প্রকার বের হবে। কারও শুধু গর্দান নেয়া হবে এবং কাউকে নাক, কান ও হাত-পা কেটে হত্যা করা হবে। অর্থাৎ অস্বীকারের স্তর অনুযায়ী হত্যাও বিভিন্ন স্তর হবে। 

অনুরূপভাবে যাদেরকে জেল দেয়া হবে, তাদেরও বিভিন্ন স্তর হবে— কাউকে কম সময়ের এবং কাউকে বেশী সময়ের। বলা বাহুল্ , প্রত্যেক শ্রেণীর স্তর অসংখ্যা ও অগণিত হতে পারে। অনুরূপভাবে কিয়ামতে এই চার শ্রেণীর স্তর অসংখ্য হবে। 

উদাহরণতঃ চতুর্থ শ্রেণী যারা সফলকাম হবে, তাদের কেউ জান্নাতে আদনে, কেউ জান্নাতে মাওয়ায় এবং কেউ জান্নাতুল ফেরদাউসে দাখিল হবে। শাস্তিপ্রাপ্ত শ্রেণীর মধ্যে কেউ অল্পদিন, কেউ হাজার বছর এবং কেউ সাত হাজার বছর শাস্তি ভোগ করবে। এরা সকলের পেছনে দোযখ থেকে বের হবে।

 এখন আমরা প্রত্যেক শ্রেণীর স্তর বিভাজন বর্ণনা করার প্রয়াস পাব। 

প্রথম শ্রেণী ধ্বংসপ্রাপ্তদের স্থর– 

তারা সে লোক, যারা আল্লাহর রহমত প্রার্থনা করে না। কেননা, উল্লিখিত দৃষ্টান্তে বাদশাহর কাছে তারাই হত্যাযোগ্য ছিল, যারা বাদশাহের সন্তুষ্টি, সম্মান ও পুরস্কার প্রার্থনা করত না। 

বলা বাহুল্য, এটা হচ্ছে কাফেরদের শ্রেণী। তারা আল্লাহর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে কেবল দুনিয়ার পূজারী হয়ে থাকে এবং আল্লাহ, তাঁর রসূল ও ঐশী গ্রন্থসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে। কেননা, আল্লাহর নৈকট্যশীল হওয়া এবং তাঁর দীদারের গৌরব অর্জন করাই হচ্ছে পারলৌকিক সৌভাগ্য। ঈমান ব্যতীত এই নেয়ামত অর্জন করা সম্ভব নয়। কাফেররা এটা অস্বীকার করে। তাই তারা এই নেয়ামত থেকে চিরতরে বঞ্চিত থাকবে।


 দ্বিতীয় শ্রেণী শাস্তিপ্রাপ্তদের স্থর। 

তারা সেই লোক, যারা মূলত ঈমানদার ; কিন্তু ঈমান অনুযায়ী আমলে ত্রুটি করে। উদাহরণতঃ তারা ঈমান রাখে যে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও এবাদত করা যাবে না। এখন যদি কেউ আপন প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, তবে তার উপাস্য সেই প্রবৃত্তিই হবে। সে কেবল মুখে মুখে তাওহীদ বলে। সত্যিকার তাওহীদ তার মধ্যে নেই। সত্যিকার তাওহীদ তখন হবে, যখন “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলার পর আল্লাহ ব্যতীত সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং সরল পথে কায়েম থাকে, যা এই আয়াতে বর্ণিত হয়েছে— “নিশ্চয় যারা বলে, আমাদের রব আল্লাহ্, এরপর সুদৃঢ় থাকে। প্রত্যেক মানুষের মধ্যে সরলপথ থেকে কিছু না কিছু বিচ্যুতি অবশ্যই রয়েছে। কারণ, প্রত্যেকেই প্রবৃত্তির অনুসরণ অবশ্যই করে— যদিও তা সামান্য ব্যাপারে হয়। ফলে, নৈকট্যের স্তরেও ত্রুটি দেখা দেয়। সুতরাং প্রত্যেকেরই শাস্তি হবে। কিন্তু এই শাস্তির তীব্রতা ও স্বল্পতা ঈমানের শক্তি এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ কমবেশী হওয়ার উপর নির্ভরশীল হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন : "তোমাদের প্রত্যেকেই সেটা অতিক্রম করবে। এটা তোমার পালনকর্তার অনিবার্য সিদ্ধান্ত। এরপর আমি খোদাভীরুদেরকে উদ্ধার করব এবং যালেমদেরকে সেথায় নতজানু অবস্থায় রেখে দেব”। 

এ কারণেই আগেকার দিনের বুযুর্গগণ ভয় করতেন এবং বলতেন  : আল্লাহর ওয়াদা অনুযায়ী দোযখ ভোগ নিশ্চিত এবং রক্ষা পাওয়া সন্দেহযুক্ত। এটাই আমাদের ভয়ের কারণ। হাদীসদৃষ্টে জানা যায়, সকলের শেষে যে ব্যক্তি দোযখ থেকে বের হবে, সে সাত হাজার বছর পরে বের হবে। কেউ কেউ মুহূর্তের মধ্যে দোযখের ওপারে চলে যাবে। কেউ বিদ্যুৎ গতিতে চলে যাবে। তাদের এক দণ্ডও দোযখে অবস্থান করতে হবে না। এক দণ্ড এবং সাত হাজার বছরের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন অনেক স্তর রয়েছে।- 

এখন আমরা বলছি, যে ব্যক্তি মূল ঈমানকে শক্তিশালী করে সকল কবীরা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকবে, সকল ফরয কর্ম অর্থাৎ পাঞ্জেগানা নামায উত্তমরূপে আদায় করবে এবং মাত্র কয়েকটি সগীরা গোনাহই তার যিম্মায় থাকবে, যা সে উপর্যুপরি করেনি, মনে হয় তার কেবল হিসাবই নেয়া হবে— কোন প্রকার আযাব হবে না। হিসাবের সময় তার পুণ্যের পাল্লা ভারী হয়ে যাবে। কেননা, হাদীসে বর্ণিত আছে, পাঞ্জেগানা নামায, জুমআ এবং রমযানের রোযা মধ্যবর্তী সকল গোনাহের জন্যে কাফফারা হয়ে যায়। কবীরা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকা যে সগীরা গোনাহের জন্যে কাফফারা হয়ে যায়, একথা কোরআনের আয়াত দ্বারাই প্রমাণিত। কাফফারা হওয়ার সর্বনিম্ন স্তর হচ্ছে হিসাব রোধ করতে না পারলেও আযাব রোধ করা। সুতরাং এরূপ ব্যক্তি হিসাব শেষ হওয়ার পর সুখে থাকবে। যে ব্যক্তি একটি অথবা বেশী কবীরা গোনাহ করে এবং ফরয কর্মও কতক বর্জন করে, সে মৃত্যুর পূর্বে খাটি তওবা করলে এমন হয়ে যাবে, যেমন সে কোন গোনাহই করেনি। আর যদি তওবার পূর্বে মারা যায়, তবে মৃত্যুর সময় তার অবস্থা আশংকাজনক হবে। উপর্যুপরি গোনাহ করা অবস্থায় মারা গেলে তার ঈমান না থাকা বিচিত্র নয়"।


তৃতীয় শ্রেণী মুক্তিপ্রাপ্তদের স্থর– 

তারা সেই লোক, যারা কেবল আযাব থেকে বেঁচে যাবে। তারা কোন খেদমত করেনি তাই পুরস্কার পাবে না এবং কোন দোষও করেনি তাই আযাবও হবে না। এ অবস্থা কাফেরদের মধ্য থেকে উন্মাদ, বালক ও অজ্ঞানদের হবে এবং সেসব লোকের হবে, যাদের কাছে জনপদ থেকে আলাদা থাকার কারণে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছেনি। এরূপ লোকেরা না আল্লাহকে জানে, না তাঁকে অস্বীকার করে। ফলে, এবাদত ও গোনাহ কিছুই করে না। একারণেই তারা জান্নাতেও থাকবে না এবং দোযখেও যাবে না ; বরং জান্নাত ও দোযখের মধ্যবর্তী এক জায়গায় অবস্থান করবে, যাকে শরীয়তের পরিভাষায় ‘আ’রাফ’ বলা হয়। এটা কোরআনের আয়াত ও হাদীস দ্বারা নিশ্চিতরূপে প্রমাণিত। তবে বিশেষ কোন সম্প্রদায় সম্পর্কে বলা হয় যে, তারাও অকাট্যরূপে আ'রাফে থাকবে — এটা অনিশ্চিত ; যেমন কাফেরদের বালকদের আ'রাফে থাকা অকাট্য নয়। কারণ বালকদের ব্যাপারে হাদীসও বিভিন্নরূপ বর্ণিত রয়েছে। একবার জনৈক বালক মারা গেলে হযরত আয়েশা (রাঃ) বললেন : সে জান্নাতের পাখীদের অন্যতম। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কিরূপে জানলে ? এতে ব্যাপারটি অস্পষ্ট হয়ে গেল। 


চতুর্থ শ্রেণী সফলকাম যারা তাদের স্থর:

তারা সে লোক, যারা অনুকরণ ছাড়াই আল্লাহ তা'আলাকে চিনে নেয়। তারাই নৈকট্যশীল ও অগ্রগামী। তারা বর্ণনাতীত নেয়ামত ও সম্ভোগপ্রাপ্ত হবে। এ সম্পর্কে কোরআনে যা উল্লিখিত হয়েছে, তাই বর্ণনা করা যায়। আল্লাহর বর্ণনার অধিক কে কি বলবে ? যেহেতু এ জগতে এর বিস্তারিত বর্ণনা অসম্ভব, তাই আল্লাহ তা'আলা সংক্ষেপে বলে দিয়েছেন : 

“তাদের চক্ষু শীতল হওয়ার জন্য আল্লাহ তাদের জন্যে যা যা গোপন রেখেছেন, তা কেউ জানে না”।

এক হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ পাক এরশাদ করেন : 

“আমি আমার সৎকর্মপরায়ণ বান্দাদের জন্যে এমন বস্তু প্রস্তুত রেখেছি, যা কোন চক্ষু দেখেনি, কোন কর্ণ শুনেনি এবং কোন মানুষের কল্পনায় উদয় হয়নি”।

খোদাপ্রেমিকদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সে অবস্থাই হয়, যা এ জগতে কোন মানুষের কল্পনায় আসতে পারে না। জান্নাতের হুর, প্রাসাদ, ফলমূল, দুধ, মধু, পানীয়, কংকন ও অলংকারের প্রতি তাদের আদৌ কোন মোহ থাকে না। তাদেরকে এসব বস্তু দেয়া হলে তারা এতেই সন্তুষ্ট থাকবে না ; বরং দীদার তথা আল্লাহকে দেখার আনন্দ লাভ করার জন্যে তারা উদগ্রীব থাকবে, যা হবে চূড়ান্ত সৌভাগ্য ও অপার আনন্দ। একারণেই হযরত রাবেয়া বসরীকে যখন জিজ্ঞেস করা হল, জান্নাতে আপনার ঔৎসুক্য কি হবে ? তখন তিনি বললেন : প্রথমে গৃহকর্তা, এরপর গৃহ। মোটকথা, খোদাপ্রেমিকদের অন্তর গৃহকর্তা অর্থাৎ আল্লাহ পাকের মহব্বতেই ডুবে থাকে৷ গৃহ অর্থাৎ জান্নাতের সাজ-সজ্জার প্রতি তাদের মোটেই ভ্রূক্ষেপ নেই। এমনকি, এই মহব্বতের কারণে তারা নিজেদের সম্পর্কেও বেখবর থাকে। ফলে, দৈহিক কষ্ট অনুভব করে না। এ অবস্থাকে বলা হয় ‘ফানা ফিল মাহবুব’ ( প্রেমাস্পদে লীন)। 



পরবর্তী পর্ব

সগীরা গোনাহ কিরূপে কবীরা হয়ে যায়

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...