শুক্রবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৩
মহব্বত (পর্ব- ৮) আল্লাহ্ তা'আলার প্রতি আগ্রহের প্রমাণ
মহব্বত (পর্ব- ৭) শওক তথা আগ্রহের স্বরূপ
শওক তথা আগ্রহের স্বরূপ -
যারা মহব্বতের বাস্তবতা অস্বীকার করে, তারা আগ্রহের স্বরূপকে অবশ্যই স্বীকার করে না। কেননা, আগ্রহ মাহবুবের প্রতিই হয়ে থাকে। আমরা এখনি প্রমাণ করব, যে আল্লাহ্ তা'আলাকে মহব্বত করে, আল্লাহর প্রতি তার আগ্রহ অবশ্যই থাকে এবং সে আগ্রহে বাধ্য। মহব্বত প্রমাণ করার জন্যে আমরা ইতিপূর্বে যে সব যুক্তির অবতারণা করেছি, বলা বাহুল্য, আগ্রহ প্রমাণ করার জন্যে সেগুলোই যথেষ্ট। অর্থাৎ, মাহবুব যখন দৃষ্টির অন্তরালে থাকে, তখন তার প্রতি আগ্রহ হওয়া অনিবার্য। এর ব্যাখ্যা এই যে, যে বস্তু একদিক দিয়ে উপলব্ধ এবং অন্যদিক দিয়ে উপলব্ধ নয়, তার প্রতিই আগ্রহ হওয়া সম্ভব। যে বস্তু কখনও উপলব্ধিতেই আসেনি, তার প্রতি আগ্রহ হওয়া অসম্ভব। এমনিভাবে যে বস্তু চূড়ান্ত পর্যায়ে উপলব্ধ হয়ে যায়, তার প্রতিও আগ্রহ থাকে না। চূড়ান্ত উপলব্ধি প্রত্যক্ষ করার মাধ্যমেই হয়ে থাকে।
মহব্বত (পর্ব- ৬) আল্লাহর মারেফতে মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধির ত্রুটি
আল্লাহর মারেফতে মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধির ত্রুটি -
পৃথিবীতে যা কিছু বিদ্যমান, সেগুলোর মধ্যে অধিকতর দৃশ্যমান ও প্রকৃষ্টতর হচ্ছেন আল্লাহ তা'আলা। তাই যাবতীয় মারেফতের মধ্যে আল্লাহর মারেফতই সর্বপ্রথম বোধগম্য হওয়া উচিত। কিন্তু ব্যাপার সম্পূর্ণ উল্টো প্রতীয়মান হয়। এর কারণ অবশ্যই জানা দরকার। আমরা আল্লাহ্ তা'আলাকে অস্তিত্ব জগতের সর্বাধিক দৃশ্যমান ও প্রকৃষ্টতর বলেছি। এর কারণ ব্যাখ্যা করার জন্যে আমরা একটি দৃষ্টান্তের অবতারণা করছি। যদি আমরা কোন মানুষকে লিখতে, সেলাই করতে অথবা অন্য কোন কাজ করতে দেখি, তবে তার জীবিত হওয়া আমাদের কাছে সর্বাধিক স্পষ্ট হবে। অর্থাৎ, তার জীবন, জ্ঞান ও ক্ষমতা আমাদের মতে তার অন্যান্য বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ গুণাবলীর তুলনায় অধিক স্পষ্ট হবে। কেননা, তার অভ্যন্তরীণ গুণাবলী যেমন, ক্রোধ, স্বাস্থ্য, রোগ ইত্যাদি তো আমরা জানিই না। আর বাহ্যিক গুণাবলীর মধ্যে কতক আমরা জানি না আর কতক আমাদের জানা হয়ে যায়। যেমন, জীবন, জ্ঞান, কর্মক্ষমতা, ইচ্ছা ইত্যাদি। অতঃপর আমরা যদি বিশ্বের দিকে লক্ষ্য করি, তবে আল্লাহ তা'আলার গুণাবলী আমাদের জানা হয়ে যায়। পাথর, ঢিলা, তরুলতা, বৃক্ষ, জীবজন্তু, ভূমণ্ডল, নভোমণ্ডল, সৌরজগত, জল, স্থল ইত্যাদি সকল বস্তু দ্বারা আল্লাহ তা'আলার অস্তিত্ব, কুদরত, জ্ঞান ইত্যাদি গুণাবলী প্রত্যক্ষ করা যায়। এগুলো সব এ বিষয়ের উজ্জ্বল প্রমাণ যে, একজন স্রষ্টা, পরিচালক ও সবকিছুকে গতিশীলকারী অবশ্যই বিদ্যমান। এ ধরনের সৃষ্টবস্তুর কোন শেষ নেই। তাই আল্লাহর অস্তিত্ব ও গুণাবলীর প্রমাণসমূহের শেষ নেই। যদি লেখকের জীবন, জ্ঞান ও কর্মক্ষমতা কেবল একটি প্রমাণ অর্থাৎ, তার হাতের নড়াচড়া দেখে প্রমাণিত ও স্পষ্ট হয়ে যায়, তবে আল্লাহর অস্তিত্ব ও জীব - কিরূপে স্পষ্ট হবে না। তাঁর অস্তিত্ব বুঝাবে না- এমন কোন বস্তুর থাকা সম্ভব নয়। আমাদের ভেতরেও এমন কোন বস্তু নেই এবং বাইরেও নেই। কেননা, বিশ্বের প্রতিটি কণা তার অবস্থার ভাষায় ডেকে বলছে, আমি আপনা-আপনি বিদ্যমান ও গতিশীল নই। আমার আবিষ্কর্তা ও গতিশীলকারী অন্য কেউ। আমাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গঠন, অস্থির গ্রন্থি, রক্ত-মাংস ইত্যাদি সবকিছুই একজন স্রষ্টার সাক্ষ্য দেয় বিধায় তিনি এতই স্পষ্ট হয়ে গেছেন যে, তাঁকে উপলব্ধি করতে মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি হতভম্ব হয়ে যায়। কেননা, দু’কারণে কোন বস্তুকে হৃদয়ঙ্গম করতে মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি অক্ষম। এক, সেই বস্তুর সত্তাগতভাবে অপ্রকাশ্য ও সূক্ষ্ম হওয়া। দুই, বস্তুর সীমাতিরিক্ত দৃশ্যমান ও প্রকট হওয়া। যেমন, বাদুড় রাতের অন্ধকারে দেখে এবং দিনের আলোতে দেখে না। এর কারণ এটা নয় যে, দিন রাতের তুলনায় অস্পষ্ট; বরং দিন এত বেশী স্পষ্ট যে, বাদুড়ের দুর্বল দৃষ্টি তাতে ধাঁধিয়ে যায়। সূর্যকিরণের তীব্রতা তার দৃষ্টিকে বিক্ষিপ্ত করে দেয়। যখন এর সাথে কিছু অন্ধকার মিশ্রিত হয় এবং প্রকাশ দুর্বল হয়, তখন বাদুড় দেখতে শুরু করে। অনুরূপভাবে আমাদের জ্ঞান-বুদ্ধি দুর্বল, আর আল্লাহ তা'আলার বিকাশে রয়েছে অসাধারণ চমক ও চূড়ান্ত দীপ্তি। এমনকি তাঁর বিকাশ দ্বারা প্রতিটি কণা দেদীপ্যমান। ফলে, এই অসাধারণ বিকাশই তাঁর গোপন ও অস্পষ্ট থাকার কারণ হয়ে গেছে। তীব্র প্রকাশের কারণে গোপন থাকার তত্ত্ব শুনে বিস্মিত হওয়া উচিত নয়। কেননা, বস্তুর বিকাশ ঘটে তার বিপরীত বস্তুর দ্বারা। যেমন, অন্ধকার আছে বলেই আমরা আলো উপলব্ধি করতে পারি। কিন্তু আল্লাহ তা'আলার অস্তিত্ব এত ব্যাপক ও বিস্তৃত যে, তাঁর কোন বিপরীত নেই। এ কারণেই মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি তাঁকে যথার্থভাবে উপলব্ধি করতে অক্ষম হয়ে পড়ে এবং তিনি চূড়ান্ত প্রকট হওয়া সত্ত্বেও মানুষের দৃষ্টিতে, অস্পষ্ট থেকে যান। কিন্তু যার অন্তর্দৃষ্টি তীক্ষ্ণ এবং শক্তিপ্রবল, সে আল্লাহ তা'আলা ছাড়া অন্য কোন কিছু দেখে না। সে বিশ্বাস করে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুই বিদ্যমান নেই। অন্যের যাবতীয় ক্রিয়াকর্ম তাঁর কুদরতের ফল এবং তাঁরই অনুগামী।
মহব্বত (পর্ব- ৫) মহব্বত ও মারেফতে মানুষের বিভিন্ন অবস্থা
মহব্বত ও মারেফতে মানুষের বিভিন্ন অবস্থা -
সকল ঈমানদার ঈমানে অভিন্ন হলেও মহব্বতে বিভিন্ন। কেননা, দুনিয়াতে মহব্বত ও মারেফত বিভিন্ন হয়ে থাকে। অধিকাংশ মানুষ আল্লাহ তা'আলার নামসমূহ ও গুণাবলীর মধ্য থেকে যা শুনে, তাই শিখে মুখস্থ করে নেয়। এর বেশী তারা কিছু জানে না। কেউ কেউ এসব নাম ও গুণের অর্থ এমন কল্পনা করে, যা থেকে আল্লাহ তা'আলা পবিত্র। বলা বাহুল্য, এরা পথভ্রষ্ট। আবার কেউ কেউ বাস্তব বিষয় সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হয় না এবং এসবের কোন অসার অর্থ কল্পনা করে না; বরং সরলভাবে বিশ্বাস স্থাপন করে, সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং যাবতীয় আলোচনা থেকে আত্মরক্ষা করে।সত্যি বলতে কি, এরাই “আসহাবে ইয়ামীন”! আর যারা প্রত্যেক নাম ও গুণের স্বরূপ সম্পর্কে যথার্থ অবগতি লাভ করে, তারা নৈকট্যশীল। আল্লাহ তা'আলা এই তিন প্রকার মানুষের কথা এ আয়াতে বর্ণনা করেছেন : “যদি তারা হয় নৈকট্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত, তবে তাদের জন্যে রয়েছে সুখ, রূযী ও নেয়ামতের বাগান। আর যদি তারা হয় আসহাবে ইয়ামীনদের অন্তর্ভুক্ত, তবে তাদের তরফ থেকে আপনার প্রতি সালাম। আর যদি তারা হয় পথভ্রষ্ট মিথ্যারোপকারীদের অন্তর্ভুক্ত, তবে তাদের আপ্যায়ন করা হবে উত্তপ্ত পানির দ্বারা এবং প্রবেশ করানো হবে জাহান্নামে।”
পরবর্তী পর্ব
আল্লাহর মারেফতে মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধির ত্রুটি
রবিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৩
তওবা - (পর্ব - ১৮) তওবায় গড়িমসি করার চিকিৎসা
তওবায় গড়িমসি করার চিকিৎসা
এখন বর্ণিত পাঁচটি কারণের প্রতিকার জানা দরকার। প্রথম কারণ অর্থাৎ শাস্তি অনুপস্থিত থাকার ক্ষেত্রে চিন্তা করবে যে, যা হওয়ার তা অবশ্যই হবে। যা ভবিষ্যত তা অতীত হয়ে যায়। গভীর দৃষ্টিতে দেখলে কিয়ামত সন্নিকটবর্তী। আরও চিন্তা করবে যে, আমরা দুনিয়াতে অনাগত আশংকার কারণে বর্তমানে কষ্ট ও শ্রম স্বীকার করি। উদাহরণতঃ কখনও দরিদ্র হয়ে যাব– এই ভয়ে জল ও স্থলে সফর করি এবং অর্থ উপার্জন করি। যদি কোন বিধর্মী চিকিৎসক কোন রোগীকে বলে দেয় ঠাণ্ডা পানি তোমার জন্যে ক্ষতিকর– এতে তোমার মৃত্যু হয়ে যাবে, তবে রোগীর কাছে ঠাণ্ডা পানি সর্বাধিক সুস্বাদু হলেও মৃত্যুর ভয়ে সে তা পরিত্যাগ করবে। অথচ মৃত্যুকষ্ট এক মুহূর্তের বেশী নয়। এখন চিন্তার বিষয় একজন বিধর্মীর কথায় কিভাবে রোগী সুস্বাদু বস্তু ত্যাগ করে অথচ তার চিকিৎসা যে সত্য ও অব্যর্থ, তার উপর কোন মো'জেযা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সুতরাং সে মনে মনে বলবে- পয়গম্বরগণের উক্তি, যা মো'জেযা দ্বারা সমর্থিত, একজন বিধর্মীর উক্তির চেয়েও কম বিশ্বাসযোগ্য হবে- এটা আমার বিবেকের কাছে গ্রহণীয় নয় অথবা আমার কাছে দোযখের আযাব মৃত্যুযন্ত্রণার তুলনায় হালকা হবে– এটাও মেনে নেয়া যায় না। কিয়ামতের প্রতিটি দিন দুনিয়ার দিনসমূহের তুলনায় পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান হবে।
এমনি ধরনের চিন্তাভাবনা দ্বারা দ্বিতীয় কারণেরও চিকিৎসা হতে পারে। অর্থাৎ, গোনাহ করার কারণ যদি আনন্দ উপভোগের প্রাবল্য হয়, তবে জোরপূর্বক তা পরিত্যাগ করবে এবং মনে মনে বলবে– ক্ষণস্থায়ী জীবনের আনন্দকে যখন আমি ত্যাগ করতে পারি না, তখন অনন্তকালীন আনন্দ কিরূপে বিসর্জন দেব? যদি সবরের সামান্য কষ্ট সহ্য করতে না পারি, তবে দোযখের অচিন্তনীয় কষ্ট কিরূপে সহ্য করব?
তৃতীয় কারণ অর্থাৎ তওবায় গড়িমসি করার চিকিৎসা হচ্ছে একথা চিন্তা করা যে, দোযখীরা বেশীর ভাগ এ ফরিয়াদই করবে যে, তারা তওবার সময়কে কেন বিলম্বিত করেছে? এ ছাড়া যে ব্যক্তি গড়িমসি করে, সে তার এখতিয়ার বহির্ভূত বিষয়ের উপর ভিত্তি করে এটা করে যাবে। অর্থাৎ, সে মনে করে নেয় যে, আরও অনেক দিন বাঁচবে। তখন তওবা করে নেবে। প্রশ্ন এই যে, সে জীবিত থাকবে– এটা কিরূপে জানল? তার মরে যাওয়ারও তো সম্ভাবনা রয়েছে। আর যদি জীবিতও থাকে, তবে গোনাহ ত্যাগ না করারও তো সম্ভাবনা রয়েছে। যেমন এ পর্যন্ত ত্যাগ করতে পারেনি। কারণ, কামনা-বাসনার প্রাবল্য তখনও থেকে যেতে পারে; বরং বেশী দিন অভ্যাসের কারণে তা আরও মযবুত হয়ে যাবে। এসব কারণে যারা গড়িমসি করে, তারা পরিণামে ধ্বংস হয়ে যায়।
উদাহরণতঃ এক ব্যক্তি একটি বৃক্ষ সমূলে উৎপাটিত করতে গিয়ে দেখল যে, বৃক্ষটি বেশ মযবুত। কঠিন পরিশ্রম ছাড়া উৎপাটিত করা যাবে না। সে মনে মনে বলল, একে আরও বছর খানেক এমনিতেই রেখে দেই। এরপর উপড়ে ফেলব। সে ভাবেনি যে, যতই দিন যাবে, বৃক্ষের মূল ততই মযবুত হবে এবং সে নিজে যতই বড় হবে, ততই দুর্বল হয়ে পড়বে। দুনিয়াতে এরূপ ব্যক্তির সমান নির্বোধ কেউ হবে না। যখন তার দেহে শক্তি ছিল এবং বৃক্ষ দুর্বল ছিল, তখন সে বৃক্ষটি উপড়ায়নি; বরং এমন সময়ের জন্যে ছেড়ে দিয়েছে, যখন বৃক্ষ হবে ইস্পাতকঠিন এবং সে হবে দুর্বল।
চতুর্থ কারণ অর্থাৎ, আল্লাহর রহমতের ভরসায় গোনাহ করা– এর চিকিৎসা পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে। এ বিষয়েরই অনুরূপ যে, কেউ নিজের ধনসম্পদ ব্যয় করে নিজেকে এবং পরিবারবর্গকে নিঃস্ব করে দেয় এবং আশা করে যে, আল্লাহ তা'আলা আপন কৃপায় কোন নির্জন জায়গায় ধনভাণ্ডারের সন্ধান বলে দেবেন। এরূপ ধনভান্ডার পাওয়া যদিও সম্ভব, মাঝে মাঝে এরূপ হয়ও, কিন্তু এর উপর ভরসা করে যে নিজের ধনসম্পদ বিনষ্ট করে, সে নিরেট বোকা। এমনিভাবে গোনাহ মাফ হওয়াও সম্ভব। কিন্তু এর উপর ভরসা করা মূর্খতা।
পঞ্চম কারণ অর্থাৎ রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর সত্যবাদিতায় সন্দেহ করে গোনাহ করা, এর চিকিৎসা সম্ভব। উদাহরণতঃ সন্দেহকারীকে বলা হবে— আখেরাত সম্পর্কিত যেসব বিষয়কে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) সত্য আখ্যায়িত করেছেন, সেগুলো তোমার মতে সম্ভবপর না, অসম্ভব? যদি সে উত্তরে সন্দেহের কথা জানায়, তবে তাকে বলা উচিত— যদি তুমি আপন গৃহে খাদ্যবস্তু রেখে যাও এবং কোন অচেনা ব্যক্তি এসে তোমাকে বলে : তোমার চলে যাওয়ার পর এ খাদ্যে বিষধর সর্প বিষ ছেড়ে দিয়েছে, তবে তুমি তার সত্যবাদিতায় সন্দেহ করে সেই খাদ্য খাবে, না সুস্বাদু হওয়া সত্ত্বেও ত্যাগ করবে? সে এ জবাবই দিবে যে, আমি এই খাদ্য খাব না। কারণ, আমি চিন্তা করব যদি সে মিথ্যা বলে থাকে, তবে ক্ষতি এতটুকুই হবে যে, খাদ্য খাওয়া হল না। এ ব্যাপারে সবর করা কঠিন হলেও সম্ভবপর। পক্ষান্তরে যদি সে সত্য বলে থাকে, তবে নির্ঘাত আমার মৃত্যু হবে, যা না খেয়ে সবর করার তুলনায় অত্যন্ত কঠিন।
এরপর সন্দেহকারীকে বলা হবে— সোবহানাল্লাহ, একজন অপরিচিত ব্যক্তির কথা তুমি মেনে নিতে পার, যা স্বার্থপরতার বশবর্তী হয়ে বলারও সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু মো'জেযা সমর্থিত হওয়া সত্ত্বেও পয়গম্বরের উক্তি এবং ওলী, পণ্ডিত, দার্শনিক ও সকল সুধী ব্যক্তির বাণী মেনে নিতে তোমার আপত্তি। মূর্খদের সাথে আমাদের কোন কথা নেই। যারা বুদ্ধিমান, তাদের মধ্যে এমন কেউ নেই, যে কিয়ামতে বিশ্বাস করে না এবং সওয়াব ও আযাবকে সঠিক মনে করে না- যদিও এগুলোর অবস্থা ও প্রকারভেদে মতানৈক্য রয়েছে। যদি তারা সত্যবাদী হয়, তবে তুমি অনন্তকাল আযাব ভোগ করবে। আর যদি তাদের কথা মিথ্যা হয়, তবে তোমার কোন ক্ষতি হবে না; কেবল কতিপয় কামনা-বাসনা থেকে তুমি এ দুনিয়াতে বঞ্চিত থাকবে।
আমাদের এই আলোচনা হযরত আলী (রাঃ)-এর উক্তির অনুরূপ তিনি আখেরাতের ব্যাপারে সন্দেহকারী জনৈক ব্যক্তিকে বলেছিলেন : যদি তোমার কথা ঠিক হয়, তবে আমরা ও তুমি সকলেই বেঁচে যাব। পক্ষান্তরে আমাদের বিশ্বাস সঠিক হলে আমরা রক্ষা পাব এবং তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে।
(সমাপ্ত)
প্রথম পর্ব
তওবা - (পর্ব - ১৭) খাহেশের প্রতিকার
খাহেশের প্রতিকার
রোগী যখন কোন ক্ষতিকর বস্তুর প্রতি অত্যধিক আগ্রহান্বিত হয়, তখন প্রথমে সে সেই বস্তুর ক্ষতি সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হবে। এরপর সেই বস্তুটিকে তার দৃষ্টি থেকে উধাও করে দিতে হবে। এর পরিবর্তে রোগী অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিকর কোন বস্তু ব্যবহার করবে, যা আকারে প্রথম বস্তুর অনুরূপ হবে। এরপর দ্বিতীয় বস্তুটিও বর্জন করবে এবং এ বর্জনে সবর করবে। মোটকথা, সবরের তিক্ততা সর্বাবস্থায় অপরিহার্য। গোনাহের প্রতি খাহেশের চিকিৎসাও এমনি ভাবে হওয়া উচিত। উদাহরণতঃ যদি কোন যুবকের কামোত্তেজনা থাকে এবং সে তার চক্ষু, অন্তর ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে কামপ্রবৃত্তি চরিতার্থ করা থেকে বিরত রাখতে সক্ষম না হয়, তবে প্রথমে তার এই গোনাহের ক্ষতি সম্পর্কে অবহিত হওয়া উচিত। অর্থাৎ, কোরআন ও হাদীসে এ সম্পর্কে যে শাস্তিবাণী বর্ণিত রয়েছে, সেগুলো জেনে নেবে। যখন ভয় বেড়ে যাবে, তখন যে সব কারণে কামভাব উত্তেজিত হয়, সেগুলো থেকে সরে যাবে। যদি কোন কিছু দেখা অথবা সম্মুখে পাওয়ার কারণে কামভাব উত্তেজিত হয়, তবে তার চিকিৎসা সেই বস্তু থেকে পালিয়ে একান্তবাস অবলম্বন করা। আর যদি কামোত্তেজনা সুস্বাদু ও পুষ্টিকর খাদ্যের কারণে হয়, তবে তার চিকিৎসা ক্ষুধার্ত থাকা ও সর্বদা রোযা রাখা।
বলা বাহুল্য, উভয় চিকিৎসা সবরের মুখাপেক্ষী। সবর ভয় ছাড়া, ভয় জ্ঞান ছাড়া এবং জ্ঞান অন্তর্দৃষ্টি ও চিন্তা-ভাবনা ছাড়া অর্জিত হয় না। সুতরাং প্রথমে ওয়াযের মজলিসে হাযির হয়ে একাগ্রচিত্তে ওয়ায শ্রবণ করা উচিত। এরপর যা শুনবে, তা বুঝার জন্যে চিন্তা-ভাবনা করবে। এতে নিঃসন্দেহে ভয় সৃষ্টি হবে। ভয় প্রবল হলে তার সাহায্যে সবর অর্জিত হবে। ফলে, চিকিৎসার আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে। এর সাথে সংযুক্ত হবে আল্লাহর তাওফীক।
অতএব, যে ব্যক্তি মনোযোগসহ শ্রবণ করবে এবং আল্লাহকে ভয় করবে, আল্লাহ ক্রমান্বয়ে তার কাজ সহজ করে দেবেন। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি মনোনিবেশ করবে না এবং ভাল কথাকে মিথ্যা মনে করবে, আল্লাহ ক্রমান্বয়ে তার কাজ কঠিন করে দেবেন।
এখন প্রশ্ন হয় যে, উপরোক্ত বক্তব্যের সারমর্ম ঈমানে গিয়ে ঠেকে। কেননা, সবর ব্যতীত গোনাহ বর্জন করা সম্ভব নয়। সবর ভয় ছাড়া এবং ভয় জ্ঞান ছাড়া অর্জিত হয় না। জ্ঞান তখন অর্জিত হয়, যখন গোনাহের ক্ষতিকে সত্য বলে বিশ্বাস করে। গোনাহের ক্ষতিকে সত্য বলে বিশ্বাস করা হুবহু আল্লাহ ও রসূলকে সত্য বলে বিশ্বাস করা। এরই নাম ঈমান। অতএব সারকথা হল, যে ব্যক্তি অব্যাহত গোনাহ করে, সে এজন্যে করে যে, তার ঈমান নেই। এর জওয়াব এই যে, অব্যাহতভাবে গোনাহ করার ফলে ঈমান বিলুপ্ত হয়ে যায় না; বরং ঈমানের দুর্বলতার কারণে এ গোনাহ হয়ে থাকে। কারণ, ঈমানদার মাত্রই একথা স্বীকার করে যে, গোনাহ আল্লাহ থেকে দূরত্বের এবং পারলৌকিক শাস্তির কারণ। এরপরেও একাধিক কারণে মানুষ গোনাহ করে থাকে।
প্রথম কারণ, যে শাস্তির কথা বলা হয়, তা অনুপস্থিত এবং অদৃশ্য। মানুষ মজ্জাগতভাবে উপস্থিত বস্তু দ্বারা যতটুকু প্রভাবিত হয়, ততটুকু অনুপস্থিত বস্তু দ্বারা হয় না। তাই প্রতিশ্রুত বিষয়ের প্রভাব মানুষের উপর উপস্থিত বিষয়ের তুলনায় দুর্বল হয়ে থাকে।
দ্বিতীয় কারণ, যে খাহেশ তথা কামভাব গোনাহের কারণ, তার আনন্দ ও স্বাদ নগদ হয়ে থাকে। নগদ আনন্দ অনাগত ভয়ের কারণে ত্যাগ করা স্বভাবতই কঠিন হয়ে থাকে। সেমতে আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেন : “তোমরা আসলে পার্থিব জীবনকে ভালবাস এবং পরকালকে উপেক্ষা কর।”
এ বিষয়টি হাদীস দ্বারাও প্রমাণিত। বলা হয়েছে—
“অতএব, যে ব্যক্তি মনোযোগসহ শ্রবণ করবে এবং আল্লাহকে ভয় করবে, আল্লাহ ক্রমান্বয়ে তার কাজ সহজ করে দেবেন। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি মনোনিবেশ করবে না এবং ভাল কথাকে মিথ্যা মনে করবে, আল্লাহ ক্রমান্বয়ে তার কাজ কঠিন করে দেবেন।”
অর্থাৎ, অপ্রিয় বিষয়সমূহ দ্বারা জান্নাতকে এবং কামনা-বাসনা দ্বারা জাহান্নামকে ঘিরে রাখা হয়েছে।
অন্য এক হাদীসে এরশাদ হয়েছে—“আল্লাহ তা'আলা জাহান্নাম সৃষ্টি করে ফেরেশতা জিবরাঈলকে আদেশ করলেন, গিয়ে দেখে আস। জিবরাঈল জাহান্নাম পরিদর্শন করে আরয করলেন : আপনার ইযযতের কসম, যে কেউ এর অবস্থা শুনবে, সে কখনও এতে প্রবেশ করবে না। এরপর আল্লাহ তা'আলা জাহান্নামকে কামনা-বাসনা দ্বারা আবৃত করে দিলেন এবং জিবরাঈলকে আদেশ করলেন : এবার গিয়ে দেখে আস। তিনি দেখার পর আরয করলেন : আপনার ইযযতের কসম, এখন আমার আশংকা হয়, কেউ এতে প্রবেশ না করে ক্ষান্ত হবে না। এরপর জান্নাত সৃষ্টি করে জিবরাঈলকে তা দেখতে বলা হল। তিনি দেখার পর আরয করলেন : আপনার ইযযতের কসম, যে কেউ এর অবস্থা শুনবে, সে এতে প্রবেশ করতে চাইবে। এরপর আল্লাহ তা'আলা জান্নাতকে অপ্রিয় বিষয়াদির দ্বারা আবৃত করে জিবরাঈলকে দেখতে বললেন। তিনি দেখে আরয করলেন : এখন আমি আশংকা করি, কেউ এতে প্রবেশ করতে পারবে না । এ থেকে বুঝা গেল, কামনা-বাসনার উপস্থিতি এবং আযাব বিলম্বিত হওয়া এ দুটিই অব্যাহত গোনাহের উন্মুক্ত কারণ; যদিও মূল ঈমান বিদ্যমান থাকে।
যে রোগী তীব্র পিপাসার কারণে বরফের পানি পান করে, সে মূল চিকিৎসা বিজ্ঞানকে অস্বীকার করে না এবং পানি তার জন্যে ক্ষতিকর– এ বিষয়টিও অস্বীকার করে না। কিন্তু কামনা-বাসনা প্রবল থাকার কারণে ভবিষ্যত কষ্ট ও ক্ষতি মেনে নেয়া সহজ হয়ে যায়।
তৃতীয় কারণ, গোনাহগার মুমিন ব্যক্তি সর্বদাই তওবার ইচ্ছা পোষণ করে এবং নিজের পাপসমূহকে পুণ্যের দ্বারা মিটিয়ে দিতে চায়। কিন্তু মনে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার আশা প্রবল থাকার কারণে সে সর্বক্ষণ তওবা বিলম্বিত করে।
চতুর্থ কারণ, মুসলমান মাত্রই বিশ্বাস করে যে, গোনাহ এমন শাস্তির কারণ হয় না, যা মাফ হওয়া অসম্ভব। তাই সে গোনাহ করে এবং আল্লাহর কৃপার উপর ভরসা করে তা মাফ হওয়ার প্রত্যাশা রাখে।
উপরোক্ত চারটি বিষয়ই মূল ঈমান থাকা সত্ত্বেও গোনাহের কারণ হয়ে থাকে।
হাঁ, মাঝে মাঝে পঞ্চম একটি কারণেও মানুষ গোনাহ করে থাকে, যদ্দরুন মূল ঈমানেই ত্রুটি দেখা দেয়। তা এই যে, গোনাহগার ব্যক্তি মূলত রসূল (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর সত্যবাদিতায় সন্দেহ পোষণ করে। এরই নাম কুফর।
তওবায় গড়িমসি করার চিকিৎসা
তওবা - (পর্ব - ১৬) ওয়াযের উপকারী পদ্ধতি
ওয়াযের উপকারী পদ্ধতি
এখন আমরা ওয়াযের উপকারী পদ্ধতি বর্ণনা করব। যদিও এটা নাতিদীর্ঘ, কিন্তু আমরা কয়েক প্রকার বিষয়বস্তু উল্লেখ করব, যাতে মানুষ অব্যাহত গোনাহ বর্জন করতে সক্ষম হবে। ওয়াযে চার প্রকার বিষয়বস্তু বর্ণনা করা জরুরী।
প্রথমত, কোরআন মজীদে গোনাহগারদের ভীতি প্রদর্শনের জন্যে যে সকল আয়াত বর্ণিত হয়েছে, সেগুলো বর্ণনা করবে। এমনিভাবে এই বিষয়বস্তু সম্বলিত হাদীস ও রেওয়ায়েতসমূহ উল্লেখ করবে। উদাহরণতঃ রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন - প্রত্যহ সকালে ও সন্ধ্যায় দু'জন ফেরেশতা একে অপরের কথার জওয়াব দেয়। এক ফেরেশতা বলে : মানবকুল সৃজিত না হলেই ভাল হত ! অন্য ফেরেশতা বলে : চমৎকার হত যদি মানবকুল তাদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য জানতে পারত ! প্রথম ফেরেশতা বলে : তারা যখন সৃষ্টির উদ্দেশ্য জানল না, তখন যদি নিজেদের জ্ঞান দ্বারাই আমল করে নিত !
এক রেওয়ায়েতে আছে, ভাল হত যদি তারা পরস্পর বসে জানা বিষয়গুলোর চর্চা করত ! অন্য ফেরেশতা বলে : তারা যদি আপন কুকর্ম থেকে তওবা করে নিত !
জনৈক বুযুর্গ বলেন : বান্দা যখন গোনাহ করে, তখন ডানদিকের ফেরেশতা বামদিকের ফেরেশতাকে বলে : ছয় ঘন্টা পর্যন্ত এই গোনাহটি লিপিবদ্ধ করো না।
যদি এ সময়ের মধ্যে সে তওবা ও এস্তেগফার করে নেয়, তবে লিপিবদ্ধ করা হয় না। নতুবা আমলনামায় লিখে নেয়া হয়। কেউ কেউ বলেন : গোনাহ করার সময় বান্দা যে জায়গায় থাকে, সেই জায়গার মাটি আল্লাহর দরবারে আরয করে- আদেশ হলে আমি তাকে গিলে ফেলি। তার মাথার উপরের আকাশ আল্লাহর কাছে বলে- আদেশ হলে আমি তার উপর ভেঙ্গে পড়ি! কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তাদের উভয়কে বলেন, আমার বান্দা থেকে বিরত থাক। তোমরা তাকে সৃষ্টি করনি। তোমরা সৃষ্টি করলে তার প্রতি তোমাদের দয়া হত। হয়তো সে তওবা করবে এবং আমি ক্ষমা করে দেব, অথবা এই গোনাহের বিনিময়ে কোন সৎকর্ম করবে এবং আমি এ গোনাহকেও পুণ্যে পরিবর্তিত করে দেব।
নিম্নোক্ত আয়াতে এটাই বুঝানো হয়েছে – “নিশ্চয় আল্লাহ ধারণ করে রাখেন আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীকে যাতে টলে না যায়। যদি এগুলো টলে যায়, তবে তিনি ব্যতীত কেউ এগুলোকে ধারণ করতে সক্ষম নয়”।
হযরত উমর (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে— মোহরকারী ফেরেশতা আরশের সন্নিকটে অপেক্ষমাণ রয়েছে। যখন কোন বড় ধরনের দুষ্কর্ম সংঘটিত হয় এবং হারাম বস্তুসমূহকে হালাল মনে করা হয়, তখন আল্লাহ তা'আলা সেই ফেরেশতাকে পাঠিয়ে দেন। সে মানুষের অন্তরে মোহর লাগিয়ে যায়। ফলে, অন্তরের অভ্যন্তরস্থ বিষয়সমূহ সেখানেই থেকে যায়— প্রকাশের পথ পায় না। হযরত মুজাহিদ বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে— অন্তর হাতের খোলা তালুর মত। যখন মানুষ গোনাহ করে, তখন একটি আঙ্গুল বন্ধ হয়ে যায়। অবশেষে একে একে সবগুলো আঙ্গুল বন্ধ হয়ে যায়। এটা অন্তরের তালা। গোনাহের নিন্দা ও তওবাকারীদের প্রশংসায় এমনি ধরনের রেওয়ায়েত বহুল পরিমাণে বর্ণনা করা উচিত।
দ্বিতীয় বর্ণনাযোগ্য বিষয় হচ্ছে পয়গম্বর ও পূর্ববর্তী বুযুর্গগণের কাহিনী যে, ভুলভ্রান্তির কারণেই তাদের উপর কেমন বিপদাপদ এসেছে ! এ ধরনের কাহিনী অন্তরে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে এবং উপকার অনুভূত হয়।
উদাহরণতঃ হযরত আদম (আঃ) ভুলের কারণে কতই না কষ্ট ভোগ করেছেন! জান্নাত থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। বর্ণিত আছে, তিনি যখন নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণ করলেন, তখন দেহ থেকে জান্নাতী পোশাক উড়ে গেল এবং তিনি উলঙ্গ হয়ে পড়লেন। অতঃপর আরশের উপর থেকে আওয়াজ এল : তোমরা উভয়ে আমার কাছ থেকে নেমে যাও। যে আমার অবাধ্য, তার ঠিকানা আমার কাছে হতে পারে না। হযরত আদম (আঃ) কেঁদে বিবি হাওয়াকে বললেন : একটি মাত্র ভ্রান্তির প্রথম পরিণতিতে আমরা প্রেমাস্পদের কাছ থেকে বিতাড়িত হলাম।
বর্ণিত আছে, সোলায়মান ইবনে দাউদ (আঃ)-ও আল্লাহর ক্রোধের শিকার হয়েছিলেন। এর কারণ ছিল সেই চিত্র, যার পূজা তাঁর গৃহে চল্লিশ দিন পর্যন্ত করা হয়েছিল। কেউ কেউ বলেন : তার একটি ছিল এই যে, জনৈকা মহিলা তার পিতার অনুকূলে মোকদ্দমায় রায় দেয়ার জন্যে তাঁকে বলেছিল এবং তিনি তাই করবেন বলে ওয়াদা করেছিলেন। কিন্তু পরে সেরূপ করেননি। কারও মতে অপরাধ ছিল এই যে, সেই মহিলার খাতিরে তার পিতাকে মামলায় জিতিয়ে দেয়ার ইচ্ছা জাগ্রত হয়েছিল।
মোটকথা, এরূপ একটি ভ্রান্তির বিনিময়ে চল্লিশ দিনের জন্যে তাঁর রাজত্ব ছিনিয়ে নেয়া হয় এবং তিনি দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। খাওয়ার জন্যে হাত প্রসারিত করলে খাদ্যবস্তু উধাও হয়ে যেত। তিনি মানুষকে বলতেন : আমাকে খাবার দাও। আমি সোলায়মান ইবনে দাউদ। জওয়াবে মানুষ তাকে প্রহার করে তাড়িয়ে দিত। রেওয়ায়েতে আছে, এক বৃদ্ধার কাছে খাদ্য চাইলে সে তাকে শাসিয়ে দিল এবং মুখে থুথু নিক্ষেপ করল। অন্য এক রেওয়ায়েতে আছে,এক বৃদ্ধা নোংরা পানির একটি পাত্র তাঁর মাথায় ঢেলে দিল। অতঃপর আল্লাহর নির্দেশে তাঁর আংটি মাছের পেট থেকে বেরিয়ে এল এবং চল্লিশ দিন পর তিনি আংটি পরিধান করলেন। তখন পক্ষীকুল পুনরায় তাঁর মাথার উপর ছায়া করে দাঁড়িয়ে গেল এবং জিন, শয়তান বন্য জন্তুরা কাছে এসে গেল। তাদের কেউ কেউ পূর্ববর্তী ধৃষ্টতার জন্যে ক্ষমাপ্রার্থী হলে তিনি বললেন : অতীত কৃতকর্মের জন্যে তোমাদের বিরুদ্ধে আমার কোন অভিযোগ নেই। এটা ছিল একটি অবশ্যম্ভাবী ঐশী বিষয়।
বর্ণিত আছে, আল্লাহ তা'আলা ওহীর মাধ্যমে হযরত ইয়াকুব (আঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেন : বলতে পার, আমি তোমার কলিজার টুকরা ইউসুফকে তোমার কাছ থেকে কেন বিচ্ছিন্ন করেছি? তিনি আরয করলেন : জানি না। এরশাদ হল : কারণ, তুমি তার ভাইদেরকে বলেছিলে-
“আমার ভয় হয় বাঘ তাকে খেয়ে ফেলবে অথচ তোমরা থাকবে অসতর্ক”
তুমি বাঘের ভয় করেছ, আমার আশা করনি। তুমি ভাইদের গাফলতির কথা চিন্তা করেছ, আমার হেফাযতের প্রতি লক্ষ্য করনি। আল্লাহ পাক আবার প্রশ্ন করলেন : তুমি জান, আমি ইউসুফকে কেন ফেরত দিয়েছি? তিনি আরয করলেন : না, জানি না। এরশাদ হল : তুমি বলেছিলে- “হয়তো আল্লাহ তাদের সকলকে আমার কাছে নিয়ে আসবেন। তুমি আরও বলেছিলে-
“যাও এবং ইউসুফ ও তার ভাইকে খোঁজ কর। তোমরা আল্লাহর কৃপা থেকে নিরাশ হয়ো না”।
এতে করে তুমি আমার আশা করেছিলে। তাই আমি তোমাদের মিলন ঘটিয়েছি।
অনুরূপভাবে হযরত ইউসুফ (আঃ) জেলখানায় শাহী মুসাহিবকে বলেছিলেন : তোমার প্রভুকে আমার আটকে থাকার কথাটি স্মরণ করিয়ে দিয়ো। তিনি হয়তো আমাকে মুক্তি দেবেন। আল্লাহ তা'আলা এ ঘটনাটি এভাবে উল্লেখ করেছেন- “অতঃপর শয়তান তাকে প্রভুর কাছে উল্লেখ করার বিষয়টি বিস্মৃত করে দিল। ফলে, ইউসুফকে আরও কয়েক বছর জেলে থাকতে হল”।
কোরআন ও হাদীসে বর্ণিত এ ধরনের অসংখ্য গল্প কেবল কিসসা-কাহিনীর জন্যে নয়; বরং এগুলোতে সচেতন ও চক্ষুষ্মান ব্যক্তিদের জন্যে মূল্যবান শিক্ষা রয়েছে। তারা এগুলো দেখে অনুধাবন করতে পারবে যে, পয়গম্বরগণের ছোট ছোট পদস্খলন যখন মার্জিত হয়নি, তখন অন্যদের কবীরা গোনাহ কিরূপে মাফ হবে?
তবে পয়গম্বরগণের সাজা দুনিয়াতে হয়ে গেছে— আখেরাতে কোন পাকড়াও হবে না। এটা তাঁদের বৈশিষ্ট্য। যারা হতভাগ্য, দুনিয়াতে তাদেরকে অবকাশ দেয়া হয়, যাতে পুরামাত্রায় গোনাহ করে নেয়। দুনিয়ার শাস্তি হাল্কা এবং আখেরাতের শাস্তি কঠোরতর। হতভাগাদের কুকর্ম এমনি কঠোর আযাবের যোগ্য। এ কারণেও তাদেরকে দুনিয়াতে অবকাশ দেয়া হয়।
এ ধরনের কথাবার্তা অব্যাহত গোনাহকারীদের সামনে অধিক পরিমাণে বলা উচিত। তওবায় উদ্বুদ্ধ করার জন্যে এটা প্রায়শ উপকারী হয়ে থাকে।
তৃতীয় প্রকার বিষয়বস্তু একথা বর্ণনা করা যে, দুনিয়াতে বান্দা যে সকল বিপদাপদে পতিত হয়, সেগুলো গোনাহের কারণে হয়ে থাকে। মানুষ প্রায়ই আখেরাতের ব্যাপারে অলসতা করে; কিন্তু মূর্খতাবশত পার্থিব শাস্তিকে অধিক ভয় করে। অতএব, এ ধরনের মানুষকে এ ধরনের বিষয়বস্তুর দ্বারা হেদায়াতের পথে আনা জরুরী। কেননা, অধিকাংশ সময় গোনাহের অমঙ্গল দুনিয়াতেই মানুষের উপর আপতিত হয়; যেমন হযরত · সোলায়মান (আঃ)-এর কাহিনীতে ব্যক্ত হয়েছে। এমনকি, মাঝে মাঝে গোনাহের দরুন মানুষের রূযী-রোযগার সংকীর্ণ হয়ে যায়। কখনও মানুষের মনে সম্মান ও প্রতিপত্তি হ্রাস পায়। ফলে শত্রু প্রবল হয়ে যায়। হাদীসে আছে, গোনাহ করার কারণে বান্দা রিযিক থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়।
হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ) বলেন : আমার জানা মতে গোনাহের কারণে মানুষ বিদ্যাশিক্ষা ভুলে যায়। এক হাদীসে এ বিষয়টি এভাবে ব্যক্ত হয়েছে— "যে ব্যক্তি গোনাহ করে, তার জ্ঞানবুদ্ধি তার কাছ থেকে বিছিন্ন হয়ে যায় এবং কখনও ফিরে আসে না"।
জনৈক বুযুর্গ বলেন : মুখমণ্ডল বিশ্রী হওয়া এবং ধনসম্পদ হ্রাস পাওয়ার নাম লা'নত তথা অভিসম্পাত নয়; বরং অভিসম্পাত হল এক গোনাহ থেকে বের হয়ে তারই অনুরূপ অথবা তদপেক্ষা বড় গোনাহে লিপ্ত হয়ে পড়া। বাস্তবে তিনি ঠিকই বলেছেন। কারণ, লা'নতের শাব্দিক অর্থ হচ্ছে বঞ্চিত করা এবং রহমত থেকে দূরে ঠেলে দেয়া। মানুষ যখন সৎকাজের তাওফীক পায় না, তখন রহমত থেকে দূরেই সরে পড়ে। এছাড়া প্রত্যেক গোনাহ অন্য গোনাহের দিকে আহ্বান করে এবং বৃদ্ধি পেতে থাকে। অবশেষে মানুষ তার আত্মিক খাদ্যরূপী রিযিক থেকে বঞ্চিত হয়। অর্থাৎ, আলেমদের কাছে বসা এবং সৎকর্মীদের সাথে চলাফেরা করা। আল্লাহ তা'আলা এরূপ ব্যক্তির প্রতি অসন্তুষ্ট থাকেন, যাতে সৎকর্মীগণও তার প্রতি নারাজ থাকে।
জনৈক অধ্যাত্মবিদের ঘটনায় বর্ণিত আছে যে, তিনি পরনের কাপড় উপরে তুলে কর্দমাক্ত পথে চলে যাচ্ছিলেন এবং পদযুগল শক্ত করে মাটিতে রাখছিলেন, যাতে পিছলে না যান। কিন্তু তার পা পিছলে গেল এবং তিনি কাদায় পড়ে গেলেন। এরপর তিনি উঠে কাদার মধ্যেই কেঁদে কেঁদে অগ্রসর হচ্ছিলেন এবং বলছিলেন : বান্দার অবস্থা হুবহু তাই। সে সর্বদা গোনাহ থেকে বেঁচে চলে। অবশেষে একাধিক গোনাহে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এরপর গোনাহের মধ্যে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। এ উক্তি থেকে বুঝা যায়, এক গোনাহ থেকে অন্য গোনাহে লিপ্ত হওয়াও গোনাহের অন্যতম শাস্তি ।
মোটকথা, আল্লাহওয়ালাদের মতে দুনিয়ার বিপদাপদ গোনাহের শাস্তির অন্তর্ভুক্ত। সেমতে হযরত ফুযায়ল (রহঃ) বলেন : মানুষ যখন দুনিয়ার দুর্বিপাকে পড়ে, তখন তার জানা উচিত যে, এটা তার গোনাহেরই কারণে।
জনৈক বুযুর্গ বলেন : যদি আমার গাধার অভ্যাসও বিগড়ে যায়, তবে আমি এটাই মনে করব যে, এটা আমারই ত্রুটি-বিচ্যুতির ফল।
জনৈক আল্লাহ-ওয়ালা বলেন : আমি আমার গোনাহের শাস্তি গৃহের ইঁদুরের মধ্যেও আছে বলে জানি।
জনৈক সূফী বর্ণনা করেন— আমি সিরিয়ায় একজন অপরূপ সৌন্দর্যের অধিকারী খৃস্টান বালককে দেখে দাঁড়িয়ে গেলাম এবং অপলক দৃষ্টিতে তার সৌন্দর্য সুধা পান করতে লাগলাম। ইতিমধ্যে আমার কাছে ইবনে জালা দামেশকী আগমন করলেন এবং আমার হাত ধরলেন। আমি এভাবে ধরা পড়ে যাওয়ায় ভীষণ লজ্জিত হলাম। অতঃপর কথা বানিয়ে বললাম : এই বালকের মুখাবয়ব দেখে আমি বিস্মিত হয়ে ভাবছিলাম, এমন অনিন্দ্য সুন্দর মুখও জাহান্নামের অগ্নিতে প্রজ্বলিত হবে? জানি না, এর পেছনে আল্লাহর কি হেকমত। একথা শুনে ইবনে জালা আমার হাতে চিমটি কেটে বললেন : কয়েক দিন পর তুমি এর শাস্তি পেয়ে যাবে। সূফী বলেন : ত্রিশ বছর পর আমি এর শাস্তি পেয়েছি।
আবূ সোলায়মান দারানী (রহঃ) বলেন : স্বপ্নদোষ হওয়াও গোনাহের একটি শাস্তি। তিনি আরও বলেন : নামাযে জামাত না পাওয়ার বিষয়টিও কোন গোনাহ করার কারণে প্রকাশ পায়।
এক হাদীসে আছে, “যামানার যে বিষয় তোমাদের খারাপ লাগে, তাকে তোমাদের আমল বিকৃত করারই ফল মনে কর”।
আবু আমর ইবনে হুলওয়ান তার কাহিনীতে লিখেনঃ একদিন আমি নামায পড়ছিলাম, এমন সময় আমার অন্তরে কামভাব মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। আমি এ সম্পর্কে অনেকক্ষণ চিন্তা করলাম এবং শেষ পর্যন্ত তা সমকামিতার খাহেশে রূপান্তরিত হয়ে যায়। আমি তৎক্ষণাৎ মাটিতে পড়ে গেলাম এবং আমার সমস্ত শরীর কাল হয়ে গেল। লোকলজ্জার ভয়ে আমি তিনদিন পর্যন্ত ভেতরে গা-ঢাকা দিয়ে রইলাম এবং হাম্মামে গিয়ে সাবান দিয়ে শরীর ধৌত করলাম। কিন্তু কালো রঙ বাড়তেই থাকল।
তিনদিন পর রঙ পরিষ্কার হল এবং আমি তলব পেয়ে রিক্কা থেকে হযরত জুনায়দ বাগদাদীর খেদমতে বাগদাদ গেলাম। তিনি আমাকে দেখেই বললেন : ছিঃ ছিঃ তোমার লজ্জা হল না। আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে তুমি কামভাবে মত্ত হলে, যা তোমাকে আল্লাহর সম্মুখে উপস্থিতি থেকে বঞ্চিত করে দিয়েছে। যদি আমি দোয়া না করতাম এবং তোমার পক্ষ থেকে তওবা না করতাম, তবে এই কালো রঙ নিয়েই তুমি আল্লাহর কাছে যেতে। আমি বিস্মিত হলাম যে, হযরত জুনায়দ আমার অবস্থা কিরূপে জানলেন! আমি তো রিক্কায় ছিলাম আর তিনি ছিলেন বাগদাদে।
এখানে জানা দরকার যে, মানুষ যখন গোনাহ করে, তখন তার অন্তরের চেহারা কালো হয়ে যায়। যদি সে ভাগ্যবান হয়, তবে কালো রঙ বাইরের দেহেও ফুটে উঠে, যাতে সে গোনাহ থেকে বিরত হতে পারে। পক্ষান্তরে হতভাগ্য হলে কালো রঙ ভেতরেই থেকে যায় এবং শেষ পর্যন্ত সমগ্র অন্তর্ভাগ কালো হয়ে সে দোযখের উপযুক্ত হয়ে যায়।
গোনাহের ফলস্বরূপ দুনিয়াতে যে দারিদ্র্য ও রোগ-ব্যাধি আসে, এ সম্পর্কে অনেক হাদীস ও রেওয়ায়েত বর্ণিত আছে। কিন্তু আল্লাহর অনুগত বান্দার অবস্থা ভিন্ন। তার উপর কোন বিপদাপদ এলে, তা তার গোনাহের কাফফারা হয় এবং এ জন্যে সবর করলে তার মর্তবা বেড়ে যায়।
চতুর্থ বর্ণনাযোগ্য বিষয়বস্তু হচ্ছে আলাদা আলাদা গোনাহের জন্যে শরীয়তে যে শাস্তি উল্লিখিত হয়েছে, ওয়াযে তা বর্ণনা করা। উদাহরণতঃ মদ্যপানের অনিষ্ট, যিনা, চুরি, হত্যা, গীবত, অহমিকা এবং হিংসার কুফল আলাদা আলাদা বর্ণনা করবে। এদের প্রত্যেকটি সম্পর্কে অসংখ্য রেওয়ায়েত বর্ণিত আছে। কিন্তু লক্ষ্য রাখতে হবে, যে ব্যক্তি যে বিষয়ের উপযুক্ত, তার কাছে সেই বিষয়ই বর্ণনা করতে হবে। বিচক্ষণ ডাক্তার যেমন প্রথমে নাড়ী, বর্ণ, গতিবিধি ইত্যাদি পরীক্ষা করে রোগের অভ্যন্তরীণ কারণ জেনে নেয়, এরপর চিকিৎসা করে, আলেমকেও তেমনি অবস্থার ইঙ্গিত দ্বারা মানুষের গোপন দোষগুণ জেনে তাই বর্ণনা করতে হবে, যাতে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর পূর্ণ অনুসরণ হয়।
বর্ণিত আছে, এক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-এর খেদমতে হাযির হয়ে আরয করল ইয়া রসূলাল্লাহ! (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) আমাকে কিছু উপদেশ দিন। তিনি বললেন :
“তোমার কর্তব্য অপরের ধনসম্পদ থেকে নিরাশ হওয়া। এটাই ধনাঢ্যতা। তুমি লোভ-লালসা থেকে বেঁচে থাক। কেননা, এটা উপস্থিত দারিদ্র্য। বিদায়ী ব্যক্তির ন্যায় নামায পড়। আর এমন কথাবার্তা থেকে বেঁচে থাক, যার জন্যে ক্ষমা চাইতে হয়।”
অন্য এক ব্যক্তি উপদেশ প্রার্থনা করলে তিনি বললেন : মিথ্যা কথা বলো না। আরও এক ব্যক্তি উপদেশ চাইলে তিনি বললেন : ক্রুদ্ধ হয়ো না।
জনৈক ব্যক্তি মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসে'কে বলল : আমাকে উপদেশ দিন। তিনি বললেন : আমার উপদেশ হল, তুমি দুনিয়া ও আখেরাতে বাদশাহ হয়ে থেকো। লোকটি বলল : এটা আমার জন্যে কিরূপ সম্ভবপর হবে? তিনি বললেন : দুনিয়াতে সংসার অনাসক্তিকে নিজের জন্যে অপরিহার্য করে নাও।
এখানে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) প্রথম ব্যক্তির মধ্যে অপরের ধন-সম্পদের প্রতি লোভ-লালসার আলামত প্রত্যক্ষ করেছেন। তাই তাকে তেমনি আদেশ করেছেন। দ্বিতীয় ব্যক্তির মধ্যে তিনি কথাবার্তার হেরফের লক্ষ্য করেছেন । তাই তাকে মিথ্যা বলতে নিষেধ করেছেন। তৃতীয় ব্যক্তির মধ্যে তিনি ক্রোধের আলামত জানতে পেরেছেন। তাই তাকে ক্রোধ পরিহার করার উপদেশ দিয়েছেন। মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসে'ও তার উপদেশপ্রার্থীর মধ্যে অন্তর্দৃষ্টির আলোকে লালসার চিহ্ন দেখতে পেয়েছেন এবং তদনুযায়ী উপদেশ দিয়েছেন। মোটকথা, প্রার্থীর অবস্থা অনুযায়ী কথাবার্তা হওয়া উচিত—বক্তার যোগ্যতা অনুযায়ী নয়।
হযরত মোয়াবিয়া একবার হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে লিখলেন : আমার জন্যে সংক্ষিপ্ত উপদেশ সম্বলিত একখানা পত্র লিপিবদ্ধ করুন। হযরত আয়েশা পত্রে লিখলেন : আমি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি “যে ব্যক্তি মানুষের অসন্তুষ্টির পরওয়া না করে আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি কামনা করে, আল্লাহ তা'আলা তাকে মানুষের কোপানল থেকে রক্ষা করেন। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আল্লাহর অসন্তুষ্টির পরওয়া না করে মানুষের সন্তুষ্টি চায়, আল্লাহ তাকে মানুষের কাছেই সঁপে দেন।” এ পত্রে হযরত আয়েশার জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তা লক্ষণীয় যে, তিনি কিভাবে সে বিপদটিই উল্লেখ করেছেন, যাতে শাসকবর্গ ও আমীর-উমারা লিপ্ত থাকে। অর্থাৎ, মানুষের পক্ষপাতিত্ব করা ও তাদের সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দেয়া। একবার তিনি আমীর মোয়াবিয়াকে লিখেছিলেন- “আল্লাহকে ভয় করতে থাক। কেননা, আল্লাহকে ভয় করলে তিনি তোমাকে মানুষের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করবেন। কিন্তু মানুষকে ভয় করলে আল্লাহর সামনে তোমার কোন জারিজুরি চলবে না।”
এসব রেওয়ায়েত থেকে বুঝা যায়, অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে গোপন দোষ-গুণ জেনে নেয়া ওয়ায়েযের জন্যে অত্যাবশ্যক, যাতে উপযুক্ত অবস্থা ও সময়ের চাহিদা অনুযায়ী জরুরী বিষয়টি বর্ণনা করা যায়। প্রত্যেক ব্যক্তিকে যাবতীয় উপদেশ বলে দেয়া সম্ভব নয়। এ ছাড়া যে বিষয় বর্ণনা করার প্রয়োজন নেই, তাতে মশগুল হওয়ার অর্থ সময় নষ্ট করা। এখানে প্রশ্ন হল, যে ব্যক্তি জনসমাবেশে ওয়ায করে, তার কি করা উচিত? জওয়াব এই যে, এমতাবস্থায় এমন বিষয়বস্তু বর্ণনা করবে যাতে সকল মানুষ শরীক; অর্থাৎ, এমন প্রয়োজনীয় বিষয়, যা জানা সবারই জন্যে উপকারী। শরীয়তের বিষয়াদিতে এটা সম্ভব। কেননা, শরীয়তের বিষয়সমূহ একদিকে যেমন খাদ্য, অপরদিকে তেমনি ঔষধি। খাদ্য সকলের জন্যে এবং ঔষধি রোগগ্রস্তদের জন্যে। এরূপ ওয়াযের দৃষ্টান্ত এই— ‘এক ব্যক্তি হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ)-এর কাছে উপদেশ প্রার্থনা করলে তিনি বললেন : আল্লাহর ভয়কে নিজের জন্যে অপরিহার্য করে নাও। সকল কল্যাণের মূল এটাই। জেহাদকে নিজের জন্যে অত্যাবশ্যকীয় করে নাও। ইসলামে একেই বৈরাগ্য বলা হয়। সদাসর্বদা কোরআন মজীদ পাঠ কর। এটা তোমার জন্যে পৃথিবীতে আলোকবর্তিকা হবে এবং ঊর্ধ্বজগতের স্মারক হবে। ভাল কথা না হলে চুপ করে থাক। এর মাধ্যমে তুমি শয়তানের উপর বিজয়ী হবে।”
হযরত লোকমান (আঃ) তাঁর পুত্রকে বলেছিলেন : আলেমদের সামনে বিনয়াবনত হয়ে বস, তাদের সাথে তর্ক করো না। করলে তারা তোমাকে খারাপ মনে করবে। দুনিয়াতে জীবন ধারণ করা যায় এই পরিমাণ সম্পদ রেখে অবশিষ্ট উপার্জন আখেরাতের জন্যে ব্যয় কর। সংসার-ধর্ম সম্পূর্ণ বর্জন করো না। তাহলে নিজের বোঝা অন্যের ঘাড়ে চাপাতে হবে এবং অপরের গলগ্রহ হতে হবে। রোযা এমনভাবে রাখ, যা দ্বারা কামশক্তি দমিত হয়— এমন ভাবে রেখো না, যা দ্বারা নামাযে বিঘ্ন দেখা দেয়। কেননা, নামায রোযা অপেক্ষা উত্তম। নির্বোধের কাছে বসো না এবং দ্বিমুখী মানুষের সাথে মেলামেশা করো না। নিজের ধন হারিয়ে অপরের ধনের হেফাযত করো না । বলা বাহুল্য, মৃত্যুর পূর্বে যে ধন দান করা হয়, তা নিজের ধন এবং মৃত্যুর সময় যে ধন রেখে যাওয়া হয়, তা অপরের ধন। প্রিয় বৎস, যে দয়া করে, তার প্রতি দয়া করা হয়। যে চুপ থাকে, সে নিরাপদ থাকে। যে ভাল কথা বলে, সে সওয়াব পায়। যে মন্দ কথা বলে, সে গোনাহগার হয়। যে রসনা সংযত করে না, সে অনুতাপ করে।
অব্যাহত গোনাহের চিকিৎসার দ্বিতীয় স্তম্ভ হচ্ছে সবর। এর প্রয়োজন এ কারণে হয় যে, রোগীর রোগ বৃদ্ধির একমাত্র কারণ হচ্ছে ক্ষতিকর বস্তুর ব্যবহার। এই ব্যবহার দু'কারণে হয়ে থাকে- (১) ক্ষতি সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং (২) খাহেশের আতিশয্যে ক্ষতির প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করা। ক্ষতি সম্পর্কে অজ্ঞতা ও গাফলতির প্রতিকার উপরে বর্ণিত হয়েছে। এখন শুধু খাহেশের প্রতিকার বাকী।
পরবর্তী পর্ব
খাহেশের প্রতিকার
তওবা - (পর্ব - ১৫) অব্যাহত গোনাহের প্রতিকার
অব্যাহত গোনাহের প্রতিকার
প্রকাশ থাকে যে, মানুষ দুই প্রকার।
(১) এমন মানুষ, যাদের মন্দ কাজ-কর্মের প্রতি প্রবণতা নেই এবং যারা অনিষ্ট থেকে বেঁচে থাকা এবং পুণ্যের উপরই লালিত-পালিত হয়। এরূপ মানুষ সম্পর্কে হাদীসে বলা হয়েছে–
“তোমার পরওয়ারদেগার এমন যুবককে পছন্দ করেন, যার মূর্খতা ও হাস্য-কৌতুকের প্রবণতা নেই”। কিন্তু এ ধরনের মানুষ বিরল ও দুষ্প্রাপ্য।
(২) দ্বিতীয় প্রকার এমন মানুষ, যারা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকে না। এদের এক প্রকার অব্যাহতভাবে গোনাহকারী এবং দ্বিতীয় প্রকার তওবাকারী। এখানে আমাদের উদ্দেশ্য অব্যাহত গোনাহের প্রতিকার ও চিকিৎসার বর্ণনা করা।
'বলা বাহুল্য, চিকিৎসা ছাড়া আরোগ্যলাভ সম্ভব হয় না। যেহেতু রোগের কারণসমূহের বিপরীত কাজ করার নাম চিকিৎসা, তাই যে ব্যক্তি রোগের কারণ সম্পর্কে জ্ঞাত হবে না, সে চিকিৎসার ব্যাপারেও অজ্ঞাত থাকবে। কারণজনিত রোগের চিকিৎসা হচ্ছে সেই কারণকে নির্মূল ও নিষ্ক্রিয় করে দেয়া। প্রত্যেক বস্তু তার বিপরীত বস্তু দ্বারা নিষ্ক্রিয় হয়। এখন অব্যাহত গোনাহের প্রতি লক্ষ্য করলে জানা যাবে এর কারণ হচ্ছে গাফলতি তথা অনবধানতা ও খাহেশ। তন্মধ্যে গাফলতি সকল অনিষ্টের মূল। সেমতে আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেন :
“এরাই গাফেল। বস্তুত আখেরাতে এরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে”।
অতএব গাফলতি ও খাহেশের বিপরীত বিষয় দ্বারাই অব্যাহত গোনাহের প্রতিকার করতে হবে। গাফলতির বিপরীত বিষয় হচ্ছে সচেতনতা এবং খাহেশের বিপরীত বিষয় খাহেশ-উদ্দীপক বিষয়াদি বর্জনে সবর করা। সুতরাং অব্যাহত গোনাহের চিকিৎসা এমন ঔষধ দ্বারা করতে হবে, যার মধ্যে সচেতনতার মিষ্টতা ও সবরের তিক্ততা উভয়টি বিদ্যমান।
জানা উচিত যে, সকল জ্ঞান ও সচেতনতাই আন্তরিক রোগের চিকিৎসা। কিন্তু প্রত্যেক রোগের জন্যে এক বিশেষ জ্ঞান নির্দিষ্ট রয়েছে। আমরা এখানে অব্যাহত গোনাহের সেই বিশেষ জ্ঞান সম্পর্কে আলোচনা করব, যা এ রোগে ফলপ্রদ। তবে সহজে বুঝার জন্যে দৈহিক রোগের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করব।
প্রথমেই জানা দরকার যে, রোগীকে কয়েকটি বিষয়ে বিশ্বাসী হতে হয়।
প্রথমত, মানতে হবে যে, রোগ ও সুস্থতা উভয়টির জন্যে কিছু কিছু কারণ রয়েছে, যা আল্লাহ পাক আমাদের এখতিয়ারে রেখে দিয়েছেন। এতে মূল চিকিৎসার প্রতি বিশ্বাস জন্মে। যার এই বিশ্বাস নেই, সে রোগ-ব্যাধির চিকিৎসাও করায় না এবং মৃত্যুর উপযুক্ত হয়ে যায়। অনুরূপভাবে অব্যাহত গোনাহ রোগে প্রথমে মূল শরীয়তের প্রতি ঈমান থাকা চাই। অর্থাৎ, বিশ্বাস থাকতে হবে যে, পারলৌকিক সৌভাগ্যেরও একটি কারণ আছে, যাকে এবাদত বলা হয় আর পারলৌকিক দুর্ভাগ্যেরও একটি কারণ আছে, যাকে পাপ বলা হয়।
দ্বিতীয়ত, কোন বিশেষ চিকিৎসকের প্রতি রোগীর এরূপ আস্থা থাকা দরকার যে, সে চিকিৎসা শাস্ত্রে পারদর্শী ও বিচক্ষণ। তার দেয়া ঔষধ সঠিক কাজ করে। সে কখনও ভুল চিকিৎসা করে না। এমনিভাবে যারা অব্যাহত গোনাহে লিপ্ত, তাদের ঈমান থাকতে হবে যে, রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম) সত্যবাদী। তিনি যা বলেছেন, বাস্তবে তাই হবে। চুল পরিমাণ ব্যতিক্রম হবে না।
তৃতীয়ত, রোগীর উচিত চিকিৎসক যেসব ফল খেতে নিষেধ করে, সেগুলো না খাওয়া এবং যেসব ক্ষতিকর বিষয় থেকে বিরত থাকতে বলে, সেগুলো থেকে বিরত থাকা, যাতে পরহেয না করার ভয় অন্তরে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। এমনিভাবে অব্যাহত গোনাহে লিপ্ত ব্যক্তিদের সে সমস্ত আয়াত ও হাদীস শ্রবণ ও মান্য করা উচিত, যেগুলোতে “তাকওয়া” তথা পরহেযগারীর প্রতি উৎসাহ প্রদান এবং গোনাহে লিপ্ত হওয়ার ব্যাপারে হুশিয়ারী উচ্চারণ করা হয়েছে। এতে অন্তরে ভয় সৃষ্টি হবে এবং সবর শক্তিশালী হবে, যা এই চিকিৎসার পরবর্তী স্তম্ভ।
চতুর্থত, রোগীর উচিত চিকিৎসক তার বিশেষ রোগের জন্য যা বলে দেয় এবং যে সকল বস্তু নিষিদ্ধ করে দেয়, সেগুলোর প্রতি খুব মনোযোগী হওয়া। অর্থাৎ, প্রথমে সে নিজের অবস্থা, ক্রিয়াকর্ম ও পানাহারের বিবরণ চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নেবে যে, কোন্ বস্তু তার বিশেষ রোগের জন্য ক্ষতিকর। কেননা, প্রত্যেক রোগীর প্রত্যেক বস্তু পরিত্যাগ করা জরুরী নয়। বরং প্রত্যেক বিশেষ রোগের জন্যে বিশেষ চিকিৎসা রয়েছে। এমনিভাবে প্রত্যেক মানুষ সকল খাহেশ ও সকল গোনাহে লিপ্ত হয় না। প্রত্যেক মোমেন ব্যক্তি বিশেষ এক গোনাহ্ অথবা বিশেষ কিছু গোনাহে লিপ্ত থাকে। তার প্রথমে জানতে হবে এর দ্বারা ধর্মের কতটুকু ক্ষতি হয়। এরপর জানা দরকার এ থেকে সবর কিভাবে করা যায় এবং যে গোনাহ হয়েছে, তা কিভাবে মিটানো যায় !
বলা বাহুল্য, এ সমস্ত বিষয়ের জ্ঞান বিশেষভাবে আলেমদের কাছ থেকেই লাভ করা যায়, যারা পয়গম্বরগণের ওয়ারিস। সুতরাং গোনাহগার ব্যক্তি যখন নিজের গোনাহ জেনে নেয়, তখন তার এই রোগের চিকিৎসা কোন চিকিৎসক অর্থাৎ আলেমে দ্বীন দ্বারা শুরু করা উচিত। রোগী যদি নিজের রোগ জানতে না পারে, তবে আলেমের উচিত তাকে তার রোগের কথা বলে দেয়া। এর উপায় এই যে, প্রত্যেক আলেম এক একটি মহল্লা অথবা গ্রামের দায়িত্ব নেবে এবং সেখানকার অধিবাসীদেরকে ধর্ম বিষয়ে শিক্ষাদান করবে। তাদের জন্যে যেসব বিষয় উপকারী এবং যেসব বিষয় ক্ষতিকর, তা পৃথক পৃথক ভাবে বলে দেবে। সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্যের কারণসমূহ স্পষ্টভাবে বর্ণনা করবে। সে এই অপেক্ষায় থাকবে না যে, কেউ এসে নিজের রোগের কথা তাকে বলবে; বরং স্বয়ং মানুষকে ডেকে এনে উপদেশ দেবে। কেননা, আলেম সমাজ পয়গম্বরগণের সুযোগ্য উত্তরাধিকারী। পয়গম্বরগণ মানুষকে মূর্খতার উপর ছেড়ে দেননি; বরং তাদেরকে সমাবেশে একত্রিত করেছেন এবং স্পষ্ট ভাষায় উপদেশ দিয়েছেন। শুরুতে তাদের ঘরে ঘরে উপস্থিত হয়েছেন এবং এক একজনকে তালাশ করে হেদায়াত করেছেন। কেননা, যারা অন্তরের রোগী, তারা তাদের রোগের অবস্থা জানে না। যেমন, কারও মুখমন্ডলে যদি ধবলকুণ্ঠের দাগ থাকে এবং তার কাছে আয়না না থাকে, তবে সে তার রোগের অবস্থা জানতে পারবে না যে পর্যন্ত অন্য কেউ তাকে বলে না দেয়। এটা সকল আলেমের উপর ফরযে আইন। শাসকবর্গের কর্তব্য প্রত্যেক গ্রামে ও মহল্লায় একজন করে দ্বীনদার ফেকাহবিদ আলেম নিযুক্ত করা। যদি কোন ব্যক্তি আলেমের বর্ণিত চিকিৎসা গ্রহণ করতে অস্বীকার করে, তবে তাকে শাসকদের হাতে সোপর্দ করা উচিত, যাতে তারা তার অনিষ্ট থেকে জনগণকে রক্ষা করে। যেমন কেউ বদ্ধ পাগল হয়ে গেলে তাকে পাগলা গারদে পাঠিয়ে দেয়া হয়, যাতে তার উৎপাত থেকে জনসাধারণ রক্ষা পায়।
আন্তরিক রোগ দৈহিক রোগের তুলনায় অনেক বেশী। এর কারণ তিনটি। প্রথমত, অন্তরের রোগী জানে না যে, সে রোগী। দ্বিতীয়ত, এ রোগের পরিণতি দুনিয়াতে প্রত্যক্ষ হয় না। দৈহিক রোগের পরিণতি মৃত্যু তো সকলেই প্রত্যক্ষ করে। গোনাহের পরিণতি অন্তরের মৃত্যু, যা দুনিয়াতে জানা যায় না। তাই গোনাহের প্রতি ঘৃণা কম হয়ে থাকে। তৃতীয়ত, এ রোগের চিকিৎসক দুর্লভ। কারণ, এ রোগের চিকিৎসক হচ্ছে আলেম সম্প্রদায়। বর্তমান যুগে তারা নিজেরাই কঠিন রোগে আক্রান্ত। যেহেতু প্রায় সকলেই রোগাক্রান্ত, তাই তাদের রোগের ক্ষতি ও কুফল প্রকাশমান নয়। তারা মানুষকে বিভ্রান্ত করে এবং এমন কথা বলে, যা দ্বারা তাদের রোগ আরও বেড়ে যায়।
বলা বাহুল্য, সর্বনাশা রোগ হচ্ছে দুনিয়ার মোহ আর এ রোগটিই চিকিৎসক তথা আলেমদের ভেতরে প্রবল। তারা মানুষকে দুনিয়ার মোহ থেকে সতর্ক করে না এই ভয়ে যে, কেউ যদি বলে দেয় অপরকে উপদেশ না দিয়ে নিজে আত্মরক্ষা করুন! এ কারণেই রোগটি ব্যাপকাকারে ছড়িয়ে পড়েছে এবং মানুষ ধ্বংসের পথে অগ্রসর হচ্ছে। না আছে ঔষধ, না আছে চিকিৎসকের নাম-নিশানা। তারা যখন ওয়ায করে, তখন বেশীর ভাগ উদ্দেশ্য এটাই থাকে যে, কোনরূপে মানুষ তাদের প্রতি আকৃষ্ট হোক। এটা মানুষকে মাগফেরাতের আশায় আশান্বিত করা ছাড়া হতে পারে না। তাই ওয়াযের মধ্যে আশার কারণসমূহ ও রহমতের প্রমাণসমূহ অধিক বর্ণনা করা হয়। এরূপ ওয়ায শুনে যখন মানুষ ঘরে ফিরে, তখন গোনাহের সাহস আরও বৃদ্ধি পায় এবং আল্লাহর অনুকম্পার উপর ভরসা বেড়ে যায়। যদিও আশা ও ভয় উভয়টিই প্রতিকার; কিন্তু দু'ব্যক্তির জন্যে, যারা পৃথক পৃথক রোগে আক্রান্ত। যে ব্যক্তির মধ্যে ভয় এত প্রবল যে, সংসারধর্ম বিসর্জন দিতে চায় এবং যে কাজ করতে অক্ষম, তার সাথে নিজেকে জড়িত করে ফেলে, এরূপ ব্যক্তির অধিক ভয়কে আশার কারণসমূহ বর্ণনা করে হ্রাস করা উচিত, যাতে তার ভয় ভারসাম্যের পর্যায়ে চলে আসে। কিন্তু যে ব্যক্তি গোনাহে নিমজ্জিত থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর কৃপার উপর গর্বিত, তার চিকিৎসা ভয়ের কারণসমূহ বর্ণনা করা ছাড়া অন্য কিছু নয়। মোটকথা, চিকিৎসকদের নষ্টামির কারণে রোগ দুরারোগ্য হয়ে গেছে।
পরবর্তী পর্ব
ওয়াযের উপকারী পদ্ধতি
বিবাহ (৩৫) কন্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ
বিবাহ (পর্ব – ৩৫) 📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.) কন্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...
-
অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ৮) এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) অহংকারের প্রতিকার ও বিনয় অর্জনের উপায় উপরোক্ত আলোচনা থেকে জানা গেল যে,...
-
অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ৫) এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) অহংকারের স্বরূপ ও তার লাভ-লোকসান— অহংকার দু'প্রকার। একটি বাহ্যিক, অপ...
-
অহংকার ও আত্মপ্রীতি (পর্ব- ৩) এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) অহংকারের নিন্দা — পবিত্র কোরআনুল কবিমে বহু স্থানে আল্লাহ তা'আলা ...







