সোমবার, ১৩ নভেম্বর, ২০২৩

জ্ঞান ও জ্ঞানার্জন (২৪) শিক্ষকের আদব

 

জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ২৪)
এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

শিক্ষকের আদব
জানা উচিত, জ্ঞানের ব্যাপারে মানুষের অবস্থা চার প্রকার, যেমন অর্থোপার্জনের ক্ষেত্রে মানুষের চার অবস্থা হয়ে থাকে। প্রথম, মানুষ অর্থ সৃষ্টি করে। তখন তাকে উপার্জনকারী বলা হয়। দ্বিতীয়, আপন উপার্জিত অর্থ সঞ্চয় করে, তখন সে ধনী হয়ে যায় এবং অন্যের মুখাপেক্ষী থাকে না। তৃতীয়, উপার্জিত অর্থ নিজের জন্যে ব্যয় করে, ফলে সে উপকৃত হয়। চতুর্থ, উপার্জিত অর্থ অন্যকে দেয়, তখন তাকে দাতা ও গুণী বলে গণ্য করা হয়। এই শেষ অবস্থা সকল অবস্থা থেকে শ্রেষ্ঠ।
জ্ঞানেরও তদ্রূপ চারটি অবস্থা রয়েছে-
এক, অর্জনের অবস্থা, দুই, অর্জিত জ্ঞানে এমন ব্যুৎপত্তি অর্জন করা যে, অন্যের কাছে জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন না থাকে, তিন, অর্জিত জ্ঞান সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে তদ্বারা নিজে উপকৃত হওয়া এবং চার, সে জ্ঞান দ্বারা অন্যের উপকার করা।
শেষোক্ত অবস্থা সকল অবস্থা থেকে শ্রেষ্ঠ। কারণ, যেব্যক্তি জ্ঞান অর্জন করে, আমল করে এবং মানুষকে জ্ঞানদান করে— আকাশ ও পৃথিবীর রাজত্বে তাকেই মহান বলা হয়। সে সূর্যের মত, অপরকে আলো দান করে এবং নিজেও আলোকময়। সে মেশকের মত, অপরকে সুগন্ধিতে আমোদিত করে এবং নিজেও সুগন্ধিযুক্ত। আর যেব্যক্তি অপরকে শিক্ষা দান করে, কিন্তু নিজে আমল করে না, সে শাণের মত, লোহাকে ধারালো করে কিন্তু নিজে কাটে না, অথবা সূচের মত, যে অন্যের জন্যে পোশাক তৈরী করে, কিন্তু নিজে উলঙ্গ থাকে। মানুষ যখন শিক্ষাদানে মশগুল হয়, তখন সে একটি বিরাট কাজের দায়িত্ব গ্রহণ করে। তাই এর আদব ও নিয়মাবলী স্মরণ রাখা উচিত।
প্রথম শিষ্টাচার, ওস্তাদ শাগরেদদেরকে সন্তানের মত স্নেহ করবে। যেমন রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন :
>"সন্তানের জন্যে যেমন পিতা, আমিও তোমাদের জন্যে তেমনি।"
অর্থাৎ, শিক্ষক শাগরেদদেরকে আখেরাতের আগুন থেকে বাঁচানোর নিয়ত করবেন। এটা পিতামাতার তাদের সন্তানদেরকে দুনিয়ার আগুন থেকে বাঁচানোর তুলনায় অধিক গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্যেই শিক্ষকের হক পিতামাতার চেয়ে বেশী। কেননা, পিতামাতা সন্তানের ধ্বংসশীল জীবনের কারণ, আর শিক্ষক অক্ষয় জীবনের কারণ। শিক্ষক না থাকলে পিতামাতার কাছ থেকে অর্জিত বিষয় সন্তানকে স্থায়ী ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিত, কিন্তু শিক্ষক বলতে আমরা এমন ব্যক্তিকে বুঝব, যে আখেরাত শাস্ত্র শিক্ষা দেয়। অথবা দুনিয়ার শাস্ত্র আখেরাতের নিয়তে শিক্ষা দেয়- দুনিয়ার নিয়তে নয়। কেননা, দুনিয়ার নিয়তে শিক্ষা দান করা মানে নিজে ধ্বংস হওয়া এবং অপরকে ধ্বংস করা। এমন শিক্ষকতা থেকে আল্লাহ হেফাযত করুন। এক পিতার পুত্ররা যেমন পারস্পরিক মহব্বত ও সম্প্রীতির সাথে থাকে এবং লক্ষ্য অর্জনে একে অপরকে সাহায্য করে, তেমনি এক ওস্তাদের শাগরেদদের মধ্যে বন্ধুত্ব ও ভালবাসা থাকা উচিত। আখেরাত উদ্দেশ্য হলে শাগরেদরা এমনি হয়। কিন্তু দুনিয়া লক্ষ্য হলে তাদের পরস্পরের মধ্যে হিংসা ও শত্রুতা হয়ে থাকে। যারা দুনিয়ার নেতৃত্ব লাভের শিক্ষা গ্রহণ করে, তারা আল্লাহ তা'আলার এ উক্তির বাইরে-
>"এ মুমিনগণ পরস্পরে ভাই ভাই" এবং তারা এ উক্তির বিষয়বস্তুর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত :
>"যারা বন্ধু, তারা সেদিন পরস্পরের শত্রু হবে; কিন্তু খোদাভীরুরা শত্রু হবে না।"
দ্বিতীয় শিষ্টাচার হচ্ছে, শিক্ষাদানের ব্যাপারে শরীয়তের কর্ণধার রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর অনুসরণ করবে। অর্থাৎ শিক্ষার জন্যে কোন পারিশ্রমিক চাইবে না, কোন বিনিময়ের নিয়ত করবে না এবং কৃতজ্ঞতাও প্রত্যাশা করবে না । বরং কেবল আল্লাহর ওয়াস্তে এবং তাঁর নৈকট্য লাভের জন্যে শিক্ষা দেবে। শাগরেদের প্রতি অনুগ্রহ হচ্ছে— এরূপ মনে করবে না; বরং শাগরেদদের অনুগ্রহভাজন হওয়া এবং এরূপ মনে করা জরুরী যে, তুমি তাদেরই কারণে গৌরবের অধিকারী হয়েছ। তারা তাদের আত্মশুদ্ধির কাজ তোমাকে সমর্পণ করেছে এবং তোমাকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের সুযোগ দিয়েছে; যেমন কোন ব্যক্তি তার ক্ষেত তোমাকে ধার দেয়, যাতে তুমি নিজের জন্যে তাতে ফসল উৎপন্ন কর।
বলাবাহুল্য, এখানে ক্ষেতওয়ালার উপকারের তুলনায় তোমার উপকার বেশী হবে । সুতরাং শিক্ষাদানে শাগরেদের তুলনায় ওস্তাদের সওয়াব যখন বেশী হয়, তখন শাগরেদের উপর অনুগ্রহ করার কোন মানে নেই। শাগরেদ না হলে ওস্তাদ এ সওয়াব কোথায় পেত? তাই সওয়াব ও প্রতিদান আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও কাছে চাওয়া উচিত নয় । আল্লাহ তা'আলা বলেন :
>“বলে দিন, আমি তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাই না।”
কেননা, ধনদৌলত ও দুনিয়ার সামগ্রী দেহের খাদেম এবং মনের সওয়ারী। তারা সকলেই এলেমের খেদমত করে। অতএব যেব্যক্তি এলেমের বিনিময়ে ধন-দৌলত চাইবে, তার দৃষ্টান্ত এমন, যেমন কারও জুতায় নাপাকী লেগে গেছে, সে তা পরিষ্কার করার জন্যে মুখে ঘষা দিয়ে নেয়। বলাবাহুল্য, এতে যে খেদমতের যোগ্য, তাকে খাদেম করা হয় এবং যে খাদেম তাকে খেদমত পাওয়ার যোগ্য করা হয়। এটা চরম বিপ্লব। এ ধরনের লোক কেয়ামতে অপরাধীদের সাথে মাথা নীচু করে আল্লাহ তা'আলার সামনে দন্ডায়মান হবে।
মোট কথা, গৌরব ও সম্মান ওস্তাদের প্রাপ্য। এখন দেখ, যারা বলে, আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য তাদের লক্ষ্য, ফেকাহ ও কালামশাস্ত্র শিক্ষাদানে তাদের দশা কি হবে? তারা ধন-সম্পদ ও প্রতিপত্তি ব্যয় করে এবং জায়গীর লাভের জন্যে রাজা-বাদশাহদের নানা রকম লাঞ্ছনা ভোগ করে। তারা এটা বৰ্জন করলে কেউ তাদেরকে জিজ্ঞেস করবে না এবং কেউ তাদের কাছে আসবে না। তদুপরি ওস্তাদ শাগরেদের কাছে আশা করে, সে তার প্রত্যেক বিপদে কাজে লাগবে, শুভাকাঙ্ক্ষীদেরকে সাহায্য করবে, অমঙ্গলকামীদের সাথে শত্রুতা রাখবে এবং তার জাগতিক প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রাদি গাধার ন্যায় বহন করবে। যদি শাগরেদ এসব বিষয়ে সামান্যও ত্রুটি করে, তবে ওস্তাদজী তার আন্তরিক দুশমন হয়ে যায়। এ ধরনের আলেম নেহায়েত নীচ ও হীন।
তৃতীয় শিষ্টাচার, ওস্তাদ শাগরেদকে উপদেশ দেয়ার ব্যাপারে কোন ত্রুটি করবে না। উদাহরণতঃ শাগরেদ যদি যোগ্যতা অর্জনের পূর্বে কোন মর্তবা লাভের পেছনে পড়ে অথবা জাহেরী এলেম অর্জন করার পূর্বে বাতেনী এলেমে ব্যাপৃত হতে চায়, তবে তাকে নিষেধ করবে। এরপর তাকে বলবে, জ্ঞান অন্বেষণ আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্যে করবে- প্রভাব প্রতিপত্তি অন্বেষণ ও গর্ব করার জন্যে নয়। এটা যে মন্দ, একথা যথাসম্ভব প্রথমেই তার মনে প্রতিষ্ঠিত করে দেবে। কেননা, পাপাচারী আলেমের মঙ্গল কম এবং অনিষ্ট বেশী হয়ে থাকে। সুতরাং যদি ওস্তাদ শাগরেদের অন্তর থেকে জেনে নেয়, সে দুনিয়া লাভের জন্যেই এলেম অর্জন করছে এবং ফেকাহশাস্ত্রে বিতর্ক করার এবং আহকামে মুনাযারার শিক্ষা লাভ করছে, তবে তাকে বিরত রাখবে এবং বলে দেবে, এগুলো আখেরাতের শিক্ষা নয় এবং এমন শিক্ষাও নয়, যার সম্পর্কে জনৈক বুযুর্গ বলেন : আমরা আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্যে এলেম শিখছি, কিন্তু এলেম আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্যে হতে অস্বীকার করেছে। এ ধরনের এলেম হচ্ছে এলমে তফসীর, এলমে হাদীস ও এলমে আখেরাত, যার মধ্যে পূর্ববর্তী মনীষীগণ মশগুল থাকতেন। যদি শাগরেদ দুনিয়ার উদ্দেশে এসব এলেম শেখে, তবে তাকে নিষেধ করবে না। কেননা, শাগরেদ ওয়ায়েয হওয়ার লোভে এবং মানুষকে তার দলভুক্ত করার আশায় এসব এলেম শিখতে তৎপর হয় এবং প্রায়ই শিক্ষাজীবনে এর পরিণতি সম্পর্কে অবগত হয়ে যায়। ফলে সে তার নিয়ত ঠিক করে নেয়। কারণ এর মধ্যে আল্লাহর ভয় সৃষ্টি এবং দুনিয়াকে তুচ্ছ ও আখেরাতকে বড় করে দেখার শিক্ষাও রয়েছে। এতে আশা করা যায়, পরিণামে শাগরেদ সঠিক পথে এসে যাবে।
ওস্তাদ যেসব বিষয়ের উপদেশ অন্যকে দেবে, সেগুলো নিজেও মেনে চলবে। শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে জনপ্রিয় হওয়া এবং জাঁকজমক সৃষ্টির বাসনা এমন, যেমন পাখী শিকারের জালের চারপাশে দানা ফেলে দেয়া হয়। আল্লাহ তা'আলা বান্দাদের এসব বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রেখেছেন। তিনি কামভাব সৃষ্টি করেছেন, যাতে এর মাধ্যমে মানুষের বংশ বিস্তার অব্যাহত থাকে। জাঁকজমকপ্রীতি সৃষ্টি করার কারণও তাই যে, এর মাধ্যমে শিক্ষাদীক্ষা কায়েম থাকবে। এটা উল্লিখিত শিক্ষাসমূহের মধ্যে হতে পারে। কিন্তু নিছক বিরোধপূর্ণ বিষয়াদি শিক্ষা করা এবং কালাম শাস্ত্রের কলহ বিবাদ আয়ত্ত করা এমন যে, মানুষ এগুলোতেই মশগুল থাকলে এবং অন্য শিক্ষা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে অন্তরের কঠোরতা, আল্লাহ থেকে গাফেল হয়ে গোমরাহীতে পড়ে থাকা ও জাঁকজমক প্রীতিই বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া কোন উপকার হবে না। তবে আল্লাহ তা'আলা আপন রহমতে যাকে বাঁচিয়ে নেন অথবা যে এগুলোর সাথে অন্য ধৰ্মীয় শিক্ষা ও মিলিয়ে নেয়, তার অবশ্য উপকার হতে পারে।
একবার সুফিয়ান সওরীকে কেউ দুঃখিত দেখে কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন : আমরা দুনিয়াদারদের জন্যে বাণিজ্য কেন্দ্র হয়ে গেছি। তারা এলেম শিক্ষা করার জন্যে আমাদের পেছনে পড়ে। এরপর যখন শিখে ফেলে, তখন বিচারক, গভর্নর অথবা দারোগা নিযুক্ত হয়ে যায়।
চতুর্থ শিষ্টাচার, শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে উত্তম ও সঠিক পন্থা হল, শাগরেদকে কুচরিত্র থেকে যতদূর সম্ভব ইঙ্গিতে ও সস্নেহে নিষেধ করবে। কঠোর ভাষায় এবং ধমকের সুরে শাসাবে না। কেননা, স্পষ্ট ভাষা ভয়ভীতির পর্দা সরিয়ে দেয় এবং বিরুদ্ধাচরণে সাহস যোগায়। সেমতে ওস্তাদকুল শিরোমণি রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন :
>“মানুষকে ছাগলের লেজ চূর্ণ করতে নিষেধ করা হলে তারা তা অবশ্যই চূর্ণ করবে আর বলবে, আমাদেরকে এ কাজ থেকে নিষেধ করার মধ্যে নিশ্চয়ই কোন রহস্য আছে।”
হযরত আদম ও হাওয়ার কাহিনী এ বিষয়ের চমৎকার সাক্ষী। কাহিনী জেনে নেয়ার জন্যে আমরা তোমাকে এটা স্মরণ করিয়ে দেইনি, বরং তুমি এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে সতর্ক হয়ে যাও। স্পষ্ট ভাষায় না বলার আরেক কারণ, যারা প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন ও মেধাবী, তারা ইঙ্গিতে বললেও অর্থ বুঝে নেয় এবং বুঝে নেয়ার খুশী তাদেরকে আমল করতে উৎসাহিত করে- যাতে অন্যেরা জানে, বিষয়টি তার বুদ্ধিমত্তায় ধরা পড়েছে।
পঞ্চম শিষ্টাচার, ওস্তাদ যে শাস্ত্র শিক্ষা দেয় তার উপরের শাস্ত্রসমূহের প্রতি শাগরেদের মন বীতশ্রদ্ধ করে না তোলা। উদাহরণতঃ যারা অভিধান শিক্ষা দেয়, তাদের অভ্যাস শাগরেদের সামনে ফেকাহকে মন্দ বলা এবং যারা ফেকাহ শিক্ষা দেয়, তাদের অভ্যাস হাদীস ও তফসীর শাস্ত্রের নিন্দা করা। তারা বলে হাদীস ও তফসীর নিছক ইতিহাসগত এবং শ্রবণের সাথে সম্পর্কযুক্ত। এতে বিবেকের কোন দখল নেই। কালামশাস্ত্রীরা ফেকাহকে ঘৃণা করে এবং বলে : ফেকাহশাস্ত্র একটি শাখাগত ব্যাপার। এতে মহিলাদের মাসিকের কথা বর্ণিত হয়। এটা কালাম শাস্ত্রের মর্যাদা কিরূপে পেতে পারে, যাতে আল্লাহর সেফাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়? ওস্তাদদের এ অভ্যাস খুবই মন্দ, যা থেকে বেঁচে থাকা উচিত। যে ওস্তাদ এক শাস্ত্র শিক্ষাদানের দায়িত্ব নেয়, তার উচিত শাগরেদের মনে তার উপরের শাস্ত্র শিক্ষা করার পথও খুলে দেয়া।
ষষ্ঠ শিষ্টাচার, ওস্তাদ যেন এমন কোন কঠিন বিষয় বর্ণনা না করেন, যা হৃদয়ঙ্গম করতে শাগরেদের জ্ঞানবুদ্ধি অক্ষম হয়ে পড়ে, যাতে শাগরেদ ওস্তাদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে না পড়ে অথবা তার বুদ্ধিবিভ্রাট না ঘটে। এ ব্যাপারে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর অনুসরণ করা উচিত। তিনি বলেন : আমরা পয়গম্বরগণ যেন মানুষকে তাদের স্তরে রেখে তাদের বুদ্ধি জ্ঞান অনুযায়ী তাদের সাথে কথা বলি- সেরূপ আদেশ আমাদেরকে দেয়া হয়েছে। সুতরাং শাগরেদ ভালরূপে বুঝবে- নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ওস্তাদ শাগরেদের সামনে কোন বিষয়ের স্বরূপ প্রকাশ করবে না। রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : যখন কেউ কোন সম্প্রদায়ের কাছে এমন কথা বলে, যা তাদের বোধগম্য নয়, তখন তাদের কিছু লোকের জন্য এটা ফেতনা হয়ে যায়। একবার হযরত আলী (রাঃ) তাঁর বুকের দিকে ইশারা করে বললেন : এর মধ্যে অনেক জ্ঞান-বিজ্ঞান রয়েছে, যদি এগুলোর সমঝদার থাকে। অর্থাৎ, আমি এসব জ্ঞান বিজ্ঞান প্রকাশ করি না। কারণ, সমঝদার নেই। তিনি সত্যই বলেছেন : নেক বান্দাদের অন্তর রহস্যের আধার। এ থেকে জানা গেল, আলেম যা জানে, তা যে কোন ব্যক্তির কাছে প্রকাশ করা উচিত নয়। এটা তখন, যখন শিক্ষার্থী বুঝে, কিন্তু উপকৃত হওয়ার যোগ্যতা রাখে না। আর যখন বুঝেই না, তখন তার কাছে না বলা অধিক সঙ্গত। ঈসা (আঃ) বলেন : শূকরের গলায় মণি-মাণিক্য পরায়ো না। জ্ঞান-বিজ্ঞান মণি-মাণিক্যের চেয়ে উত্তম এবং যেব্যক্তি জ্ঞানকে খারাপ মনে করে, সে শূকরের চেয়ে অধম, এজন্যেই জনৈক বুযুর্গ বলেছেন : প্রত্যেককে তার বুদ্ধির মাপকাঠি অনুযয়ী মাপ এবং তদনুযায়ী তার সাথে কথা বল, যাতে তুমি তার কাছ থেকে বেঁচে থাক এবং এবং সে তোমার দ্বারা উপকৃত হয়। নতুবা সে মনোবলের সংকীর্ণতার কারণে মানবে না। জনৈক ব্যক্তি এক আলেমকে কোন কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি জওয়াব দিলেন না। প্রশ্নকারী বলল : আপনি কি রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর এ হাদীস শুনেননি, "যেব্যক্তি উপকারী এলেম গোপন করে, কেয়ামতে তার মুখে আগুনের লাগাম পরানো হবে"। আলেম বললেন : লাগামের কথা রাখ এবং চলে যাও। যদি কোন সমঝদার আসে এবং এলেম গোপন করি, তখন সে আমাকে লাগাম পরিয়ে দেবে। আল্লাহ তাআলা বলেন :
>"তোমরা তোমাদের ধন-সম্পদ নির্বোধদের হাতে সমর্পণ করো না। এতে হুশিয়ার করা হয়েছে, এলেম যেব্যক্তিকে খারাপ করে দেয় এবং বিভ্রান্তিতে ফেলে, তাকে এলেম থেকে বিরত রাখা উত্তম।" অযোগ্য ব্যক্তিকে কোন বস্তু দেয়া যোগ্যকে না দেয়ার তুলনায় কম জুলুম নয়; বরং উভয় কাজ সমান জুলুম।
সপ্তম শিষ্টাচার, যখন শাগরেদের অবস্থা জানা যায় যে, তার বুদ্ধি-শুদ্ধি কম, তখন ওস্তাদ তাকে তার উপযুক্ত স্কুল বিষয় বলে দেবেন এবং এতে সূক্ষ্ম কথাও আছে, একথাও তাকে বলবেন না। কেননা, এরূপ বললে সেই স্থূল বিষয়ে শাগরেদের আগ্রহ স্তিমিত হয়ে যাবে। তার মন বিক্ষিপ্ত হবে এবং বলবে, তাকে শিক্ষাদানে কুণ্ঠাবোধ করা হচ্ছে। নিজের ধারণায় প্রত্যেক ব্যক্তি মনে করে, সে প্রতিটি সূক্ষ্ম জ্ঞানের উপযুক্ত । প্রত্যেকেই আল্লাহ তাআলার প্রতি এজন্যে সন্তুষ্ট যে, আল্লাহ তাকে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান বুদ্ধি দান করেছেন। অথচ বাস্তবে সেই বেশী নির্বোধ, যে তার বুদ্ধি পূর্ণ হওয়ার ধারণায় বেশী আনন্দিত হয়। এ থেকে জানা যায়, সাধারণ লোকদের মধ্যে যদি কেউ শরীয়ত অনুসারী হয় এবং পূর্ববর্তী মনীষীদের কাছ থেকে বর্ণিত বিশ্বাসসমূহ নতুন ব্যাখ্যা ছাড়াই তার অন্তরে প্রতিষ্ঠিত থাকে, তবে তার বিশ্বাসকে বিক্ষিপ্ত করা উচিত নয়; বরং তাকে তার কাজে মশগুল থাকতে দেয়া উচিত। কেননা, তার সামনে বাহ্যিক ব্যাখ্যা উল্লেখ করা হলে সে সাধারণের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যাবে এবং বিশিষ্ট লোকদের মধ্যে দাখিল হওয়া তার জন্যে সহজ হবে না। ফলে তার মধ্যে ও গোনাহের মধ্যে যে আড়াল ছিল, তা দূর হয়ে যাবে। এর পর সে পুরোপুরি অবাধ্য শয়তান হয়ে নিজে ধ্বংস হবে এবং অন্যকেও ধ্বংস করবে। সুতরাং সাধারণের সামনে সূক্ষ্ম জ্ঞানের স্বরূপ বর্ণনা করা উচিত নয়; বরং তাদেরকে কেবল এবাদত এবং যেসব কাজ তারা করে, তাতে ঈমানদারী শিক্ষা দেয়া সমীচীন। কোরআনের বিষয়বস্তু অনুযায়ী জান্নাতের আগ্রহ এবং দোযখের ভয় দ্বারা তাদের অন্তর পূর্ণ করে দেয়া উচিত। তাদের সামনে কোন সন্দেহের অবতারণা করা যাবে না। কেননা, অধিকাংশ সন্দেহ তাদের মনে আটকে থাকে এবং তা বের হওয়া কঠিন হয়। ফলে তারা বরবাদ হয়ে যায়। সারকথা, সাধারণ লোকদের জন্যে বিতর্কের দ্বার উন্মোচিত করা উচিত নয়।
অষ্টম শিষ্টাচার, ওস্তাদ স্বীয় এলেম অনুযায়ী আমল করবেন। তার কথা ও কাজের মধ্যে গরমিল থাকতে পারবে না। কারণ, এলেম অন্তরের চক্ষু দ্বারা জানা যায়, আর আমল বাহ্যিক চক্ষু দ্বারা। বাহ্যিক চক্ষু দ্বারা দেখে এমন লোক অনেক। এমতাবস্থায় আমল এলেমের বিপরীত হলে হেদায়েত হবে না। যেব্যক্তি নিজে এক কাজ করে এবং অপরকে তা ক্ষতিকারক বলে করতে নিষেধ করে, মানুষ তার সাথে উপহাস করে এবং সেই কাজ করতে অধিক আগ্রহী হয়। তারা বলে, এ কাজটি ভাল ও আনন্দদায়ক না হলে ওস্তাদজী করেন কেন? ওস্তাদ ও শাগরেদ বাঁশ ও তার ছায়ার মত। যদি বাঁশ নিজে সোজা না হয়, তবে ছায়া সোজা হবে কিরূপে? আল্লাহ তাআলা বলেন :
>তোমরা কি লোকদেরকে সৎকাজের আদেশ কর এবং নিজেদেরকে ভুলে যাও?"
এতদসত্ত্বেও আলেমের উপর গোনাহের শাস্তি জালেমের তুলনায় বেশী হয়। কেননা, আলেম গোনাহে লিপ্ত হলে এক বিশ্ব গোনাহে লিপ্ত হয়ে যায়। মানুষ তার অনুসরণ করে। যেব্যক্তি কোন কুরীতি আবিষ্কার করে, তার উপর নিজের এবং যারা এ কুরীতির অনুসরণ করে তাদের গোনাহ্ বর্তে থাকে। এ জন্যেই হযরত আলী (রাঃ) বলেন : দু'ব্যক্তি আমার কোমর ভেঙ্গে দিয়েছে— এক, সেই আলেম, যে তার ইজ্জত হারিয়ে ফেলেছে এবং প্রকাশ্যে গোনাহে লিপ্ত হয়েছে। দুই, সেই মূর্খ, যে দরবেশ হওয়ার ভান করছে। কেননা, মূর্খ দরবেশ হয়ে মানুষকে ধোঁকা দেয় এবং আলেম গোনাহ্ করে বিভ্রান্তি ছাড়ায়।

পরবর্তী পর্ব-
ভাল ও মন্দ আলেমের পরিচয়

বুধবার, ৮ নভেম্বর, ২০২৩

জ্ঞান ও জ্ঞানার্জন (২৩) শিক্ষার্থীর আদব



জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ২৩)
এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

শিক্ষার্থীর আদব
শিক্ষার্থীর আদব অনেক হলেও সেগুলো মোটামুটি দশ ভাগে বিভক্ত।
প্রথম আদব,
শিক্ষার্থী নিজেকে হীন চরিত্র ও মন্দ অভ্যাস থেকে পবিত্র রাখবে। কেননা, শিক্ষা হচ্ছে অন্তরের এবাদত, আভ্যন্তরীণ সংশোধন এবং আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভের উপায়। বাহ্যিক এবাদত নামায যেমন বাহ্যিক নাপাকী থেকে বাহ্যিক পবিত্রতা ছাড়া দুরস্ত হয় না, তেমনি আভ্যন্তরীণ এবাদত অর্থাৎ, এলেম দ্বারা অন্তরের এবাদতও মন্দ চরিত্র এবং নাপাক অভ্যাস থেকে পাক হওয়া ছাড়া দুরস্ত হয় না। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন :
>“ধর্ম-কর্ম পরিচ্ছন্নতার উপর ভিত্তিশীল।"
সুতরাং বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ উভয় প্রকার পরিচ্ছন্নতা প্রয়োজন। আল্লাহ তাআলা বলেন : >“মুশরিকরা নাপাক”।
এতে বুদ্ধিমানদের অবহিত করা হয়েছে যে, পবিত্রতা ও অপবিত্রতা বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের উপরই নির্ভরশীল নয়, যা চোখে পরিদৃষ্ট হয়। বস্তুতঃ মুশরিকরা গোসলও করে, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন কাপড়-চোপড়ও পরিধান করে, অথচ তাদের অভ্যন্তরভাগ নাপাক থাকে। নাপাকী এমন বিষয়কে বলে, যা থেকে মানুষ বেঁচে থাকতে চায়৷ আভ্যন্তরীণ নাপাকী থেকে বেঁচে থাকা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, এ নাপাকী পরিণামের দিক দিয়ে মারাত্মক। এ জন্যেই রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন :
>“যে গৃহে কুকুর রয়েছে তাতে ফেরেশতা প্রবেশ করে না।”
অন্তর মানুষের একটি গৃহ, যাতে ফেরেশতাদের যাতায়াত, প্রভাব ও অবস্থান হয়ে থাকে। ক্রোধ, কামনা, পরশ্রীকাতরতা, হিংসা, অহংকার, আত্মম্ভরিতা ইত্যাদি হচ্ছে ক্ষ্যাপা কুকুর সদৃশ। অতএব অন্তরে যদি এসব কুকুর থাকে, তবে তাতে ফেরেশতাদের যাতায়াত কিরূপে হবে? শিক্ষার নূরও আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের মাধ্যমে অন্তরে পৌঁছান। সেমতে আল্লাহ তা'আলা বলেন : “কোন মানুষের যোগ্যতা নেই যে, আল্লাহ তার সাথে কথা বলবেন; কিন্তু ওহীর মাধ্যমে অথবা যবনিকার অন্তরাল থেকে পাঠিয়ে দেন তিনি কোন পয়গামবাহক; সে তাঁর আদেশে যা ইচ্ছা পৌঁছে দেয়।”
অনুরূপভাবে জ্ঞান সংক্রান্ত রহমতের দায়িত্বেও “ফেরেশতাগণ নিয়োজিত। তারা নিন্দনীয় অভ্যাস থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পাক পবিত্ৰ। সুতরাং তারা পাক জায়গাই দেখে এবং তাদের কাছে রক্ষিত আল্লাহ তাআলার রহমতের ভাণ্ডার পবিত্র অন্তরেই ভরে দেয়।
আমরা একথা বলি না যে, উল্লিখিত হাদীসে গৃহের অর্থ অন্তর এবং কুকুরের অর্থ ক্রোধ ও নিন্দনীয় অভ্যাসসমূহ বোঝানো হয়েছে। এরূপ বললে বাতেনিয়া সম্প্রদায় আপত্তি করবে, তোমরা আমাদেরকে যা করতে নিষেধ কর, এখন নিজেরাই তা করছ। বরং আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, এ হাদীসে এ বিষয়টির প্রতি হুশিয়ারী উচ্চারণ করা হয়েছে। বাহ্যিক শব্দ পরিবর্তন করে আভ্যন্তরীণ অর্থ গ্রহণ এক কথা এবং বাহ্যিক অর্থ বহাল রেখে আভ্যন্তরীণ অর্থের প্রতি হুশিয়ারী অবলম্বন ভিন্ন কথা। দ্বিতীয়টি জ্ঞানার্জনের পদ্ধতি। আলেম ও সৎকর্মশীল ব্যক্তিদের এটাই নিয়ম৷ কেননা, জ্ঞানার্জনের অর্থ হল, যে বিষয় অন্যদেরকে বলা হয় তা কেবল তাদের মধ্যেই সীমিত না রাখা; বরং নিজেও তার মাধ্যমে উপদেশ গ্রহণ করা। যদি কোন বুদ্ধিমান ব্যক্তি অন্যের উপর বিপদ দেখে, তবে সে একে নিজের জন্যে শিক্ষা মনে করে এবং সেও বিপদের লক্ষ্য হতে পারে বলে বুঝে নেয়। কারণ, দুনিয়াতে পরিবর্তন হতেই থাকে। সুতরাং অন্যের অবস্থা দেখে নিজের দিকে খেয়াল করা এবং দুনিয়া সম্পর্কে চিন্তা করা একটি উৎকৃষ্ট শিক্ষা।
অনুরূপভাবে মানব নির্মিত গৃহ থেকে তুমিও অন্তরের দিকে খেয়াল কর, যা আল্লাহ তাআলার একটি গৃহ বিশেষ। কুকুর তার মন্দ অভ্যাস অর্থাৎ, হিংস্রতা ও অপবিত্রতার কারণে নিন্দনীয়- আকার আকৃতির কারণে নয়। তুমি কুকুর থেকে তার হিংস্রতার ধ্যান কর এবং জেনে নাও, যে অন্তর ক্রোধ, লোভ-লালসা, দুনিয়ার জন্যে কলহ-বিবাদ এবং ধন-সম্পদের জন্যে মানুষকে অপমান করা ইত্যাদি কুঅভ্যাসে পরিপূর্ণ, সে অন্তর আভ্যন্তরীণ কুকুর এবং বাহ্যিক অন্তর। জ্ঞানের নূর অভ্যন্তরভাগ দেখে, বাইরের অঙ্গ নয়।
সুতরাং যদি কেউ বলে, অনেক লোক কুচরিত্রের অধিকারী হয়েও জ্ঞান . অর্জন করেছে, তবে এর জওয়াব, এটা কখনও হতে পারে না। যেব্যক্তি কুচরিত্রের অধিকারী, সে আখেরাতে উপকারী ও চিরন্তন সৌভাগ্যের কারণ সত্যিকার জ্ঞান কখনও অর্জন করতে পারবে না। সে এ জ্ঞান থেকে অনেক মনযিল দূরে থাকবে। কারণ, এ জ্ঞানের সূচনাতেই শিক্ষার্থী জানবে, গোনাহ মারাত্মক সর্বনাশা বিষ। তুমি কখনও কাউকে জেনেশুনে মারাত্মক বিষ সেবন করতে দেখেছ কি? তুমি যে জ্ঞানের কথা শুনেছ, সেটা মানুষের একটি প্রথাগত বিষয়। তারা এটা মুখে উচ্চারণ করে এবং কখনও অন্তরে বার বার বলে। সত্যিকার জ্ঞানের উপর এর কোন দখল নেই। হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ) বলেন : অধিক বর্ণনা দ্বারা জ্ঞান হয় না; বরং জ্ঞান অন্তরে গুপ্ত একটি নূর।
জনৈক বুযুর্গ বলেন : জ্ঞান হচ্ছে কেবল আল্লাহর ভয়। কেননা আল্লাহ্ তাআলা বলেন :
>“একমাত্র জ্ঞানীরাই আল্লাহকে ভয় করে।”
এখানে আল্লাহ্ তাআলা জ্ঞানের বিশেষ পরিণতির দিকে ইঙ্গিত করেছেন। এদিক দিয়েই জনৈক অনুসন্ধানবিদ এ বাক্যের অর্থ করেছেন-“আমরা আল্লাহ্ ছাড়া অন্য উদ্দেশে জ্ঞান লাভ করেছিলাম। কিন্তু জ্ঞান আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্যে হতে অস্বীকার করেছে।”এর মর্মার্থ, জ্ঞান আমাদের অর্জিত হয়নি এবং এর স্বরূপ আমাদের সামনে উদঘাটিত হয়নি। কেবল বাহ্যিক শব্দ ও বাক্য অর্জিত হয়েছে।
যদি বল, আমরা অনেক অনুসন্ধানী আলেম ও ফেকাহবিদকে দেখি, তাঁরা শাখা ও মূলনীতিতে সেরা বিশেষজ্ঞরূপে গণ্য হয়; অথচ তাদের চরিত্র খারাপ তবে এর জওয়াব হচ্ছে, তুমি যখন জ্ঞানের স্তর ও আখেরাতের জ্ঞান সম্পর্কে অবগত হবে, তখন বুঝতে পারবে, যে জ্ঞানে তারা মশগুল রয়েছেন, সেটা জ্ঞান হিসাবে খুব কমই উপকারী। জ্ঞান কেবল আল্লাহর উদ্দেশ্যে অর্জন করলেই এবং আল্লাহর নৈকট্য উদ্দেশ্য হলেই এর উপকার পাওয়া যায়। এদিকে আমরা ইতিপূর্বে ইঙ্গিত করেছি এবং সত্বরই এ অধ্যায়ে আরও সবিস্তার বর্ণনা করা হবে।

দ্বিতীয় আদব,
শিক্ষার্থী সাংসারিক কাজকর্মের সাথে সম্পর্ক হ্রাস করবে এবং আত্মীয়-স্বজন ও মাতৃভূমি থেকে দূরে থাকবে। কেননা সকল সম্পর্কই বিঘ্ন সৃষ্টিকারী ও বাধাদানকারী। আল্লাহ তা'আলা কোন মানুষের মধ্যে দু'টি মন সৃষ্টি করেননি। ফলে চিন্তা বিভক্ত থাকলে জ্ঞানের প্রকৃত স্বরূপ উদ্ঘাটনে ত্রুটি দেখা দেবে। এজন্যেই কেউ বলেছেন : শিক্ষা তোমাকে তার সামান্য অংশও দেবে না, যে পর্যন্ত না তুমি তাতে সমস্ত মন প্রাণ নিবিষ্ট করবে। তুমি এরূপ করলে জ্ঞান তোমাকে যে সামান্য অংশ দেবে, তাও উপকারী কিনা জানা নেই। যে চিন্তা অনেক কাজে বিভক্ত থাকে, তা নালার পানির মত ছড়িয়ে পড়ে। এর কিছু অংশ মাটি শুষে ফেলে এবং কিছু শুকিয়ে বাতাসের সাথে উড়ে যায়। ফলে ক্ষেতে পৌছার মত পানি থাকে না।

তৃতীয় আদব,
শিক্ষার্থী জ্ঞানের কারণে অহংকার করবে না এবং শিক্ষকের উপর শাসন চালাবে না; বরং নিজের ব্যাপার সর্বাবস্থায় পুরোপুরি শিক্ষকের ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেবে। তার উপদেশ তেমনি মান্য করবে, যেমন মূর্খ রোগী দয়ালু ও বিচক্ষণ ডাক্তারের কথা মান্য করে। শিক্ষাগুরুর সাথে বিনয়াবনত ব্যবহার করা উচিত এবং তাঁর সেবা দ্বারা সওয়াব ও গৌরব কাম্য হওয়া দরকার। শা'বী (রঃ) বর্ণনা করেন, হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রাঃ) জানাযার নামায পড়লে তাঁর খচ্চর তাঁর নিকটে আনা হয়, যেন তিনি তাতে সওয়ার হন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) আগমন করলেন এবং খচ্চরের সাথে সংলগ্ন লোহার আংটি চেপে ধরলেন। যায়েদ ইবনে সাবেত বললেন : হে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর চাচাত ভাই! আপনি লোহার আংটি ছেড়ে দিন। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বললেন : আলেম ও মহান ব্যক্তিদের সাথে এমনি ব্যবহার করার নির্দেশ আমি পেয়েছি। যায়েদ ইবনে সাবেত (রাঃ) তাঁর হস্ত চুম্বন করে বললেন : আমরাও আমাদের পয়গম্বরের পরিবার-পরিজনের সাথে এমনি ব্যবহার করার আদেশ পেয়েছি। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন : খোশামোদ করা ঈমানদারের চরিত্র নয়; কিন্তু জ্ঞান অন্বেষণে খোশামোদ করা যায়। সুতরাং শিক্ষার্থীর অহংকার করা উচিত নয়। প্রসিদ্ধ ও সুবিদিত আলেমের কাছেই পড়ব- অন্যের কাছে নয়- এটাও শিক্ষার্থীর এক প্রকার অহংকার। এটা নির্বুদ্ধিতা বৈ নয়। কেননা, জ্ঞান মুক্তি ও সৌভাগ্যের কারণ। যেব্যক্তি কোন ইতর হিংস্র জন্তু থেকে আত্মরক্ষা করতে চায়, সে এ বিষয়ে পার্থক্য করবে না যে, তাকে আত্মরক্ষার কৌশল কোন স্বনামখ্যাত ব্যক্তি না অজ্ঞাত ব্যক্তি বলে দেবে। বলাবাহুল্য, যারা আল্লাহ তা'আলাকে জানে না, তাদের জন্যে অগ্নিরূপী সর্বগ্রাসী শত্রুর ক্ষতি প্রত্যেক হিংস্র প্রাণীর ক্ষতির তুলনায় ভয়ংকর হবে। জ্ঞান ঈমানদারের হারানো সম্পদ; যেখানে তা পাবে, সেখান থেকেই সৌভাগ্য মনে করে গ্রহণ করবে। কেউ এ জ্ঞান তার কাছে পৌছালে, সে যেই হোক তার অনুগ্রহ স্বীকার করবে। মোট কথা, বিনয়াবনত হওয়া ও কান লাগানো ছাড়া জ্ঞান অর্জিত হয় না। আল্লাহ তা'আলা বলেন : >“এতে সে ব্যক্তির চিন্তা করার অবকাশ রয়েছে, যার অন্তর আছে অথবা যে মনোনিবেশ সহকারে শ্রবণ করে।”
অন্তর থাকার উদ্দেশ্য জ্ঞানের যোগ্যতা ও অনুধাবন করার প্রতিভা থাকা। অনুধাবনে সক্ষম হওয়াই যথেষ্ট নয়, যে পর্যন্ত না মনোনিবেশ সহকারে শুনবে। যাতে কানে যা কিছু ফেলা হয়, তা ভালরূপে শুনে বিনয়, শোকর, আনন্দ ও প্রতিজ্ঞা সহকারে কবুল করে নেয়। ওস্তাদের সামনে শাগরেদদের এমন থাকা উচিত, যেমন নরম মাটি, যার উপর অনেক বৃষ্টি পড়ে এবং মাটি সব পানি পান শুষে। ওস্তাদ কোন নিয়ম বললে শাগরেদ তার অনুসরণ করবে, নিজের মতামত খাটাবে না। কেননা, ওস্তাদ ভুল করলেও তা শাগরেদের নির্ভুলতা অপেক্ষা তার জন্যে অধিক উপকারী। অভিজ্ঞতা দ্বারা এমন সূক্ষ্ম বিষয় জানা যায়, যা শুনলে অবাক লাগে। কিন্তু তার উপকারিতা অনেক। উদাহরণতঃ অনেক গরম মেজাজের রোগীর চিকিৎসা চিকিৎসকরা গরম ওষুধ দ্বারাই করেন, যাতে রোগীর মধ্যে চিকিৎসার গুরুভার সহ্য করার মত উত্তাপ সৃষ্টি হয়ে যায়। কিন্তু যারা চিকিৎসা শাস্ত্রে অভিজ্ঞ নয়, তারা একথা শুনে আশ্চর্যবোধ করে। আল্লাহ তা'আলা হযরত খিযির ও মূসা (আঃ)-এর ঘটনায় বিষয়টি ব্যক্ত করেছেন। হযরত খিযির বললেন : “আপনি আমার সাথে থেকে ধৈর্য ধরতে পারবেন না। আপনি এমন বিষয় দেখে ধৈর্য ধরবেনই বা কেমন করেও যার তত্ত্ব আপনার আয়ত্বাধীন নয়?”
এরপর হযরত খিযির মূসা (আঃ)-কে শর্ত দিলেন, চুপ থাকতে হবে এবং আমি নিজে না জানানো পর্যন্ত প্রশ্ন করা চলবে না। “অতএব আপনি যদি আমার সাথে থাকেন, তবে কোন বিষয়ে আমাকে প্রশ্ন করবেন না, যে পর্যন্ত না আমি নিজে আপনাকে বলি।” কিন্তু হযরত মূসা (আঃ) সবর করতে পারলেন না, বার বার তাঁকে প্রশ্ন করতে থাকলেন। অবশেষে এটাই তাঁদের মধ্যে বিচ্ছেদের কারণ হয়ে গেল।
সারকথা, যে শাগরেদ তার ওস্তাদের মোকাবিলায় নিজের মত ও ক্ষমতা অব্যাহত রাখে, সে তার উদ্দেশ্য থেকে বঞ্চিত হয়। অবশ্য আল্লাহ তা'আলা এক আয়াতে বলেছেন :
>“তোমাদের জ্ঞান না থাকলে জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞেস করো।”
এ থেকে জিজ্ঞেস করার অনুমতি জানা যায়। এর উদ্দেশ্য, বাস্তবে জিজ্ঞেস করা বৈধ। কিন্তু যেসব বিষয় জিজ্ঞেস করার অনুমতি ওস্তাদ দেন সেগুলোই জিজ্ঞেস করতে হবে। কেননা, যে কথা অনুধাবন করার ক্ষমতা তোমার নেই, তা জিজ্ঞেস করা খারাপ। এ কারণেই হযরত খিযির মূসা (আঃ)-কে জিজ্ঞেস করতে বারণ করেছিলেন।
মোট কথা, সময়ের পূর্বে জিজ্ঞেস করা উচিত নয়। তোমার কি প্রয়োজন এবং তা কখন বলা উচিত, সে সম্পর্কে ওস্তাদ অবহিত রয়েছেন। যে পর্যন্ত বলার সময় না আসে, জিজ্ঞেস করার সময়ও আসে না। হযরত আলী (রাঃ) বলেন : আলেমের হক, তাকে অনেক প্রশ্ন করো না, জওয়াবের ব্যাপারে দোষারোপ করো না, যখন সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে তখন পীড়াপীড়ি করো না এবং সে ভুল করলে তাকে ক্ষমা মনে কর। যে পর্যন্ত আলেম আল্লাহর আদেশের হেফাযত করে, তার প্রতি সম্মান প্ৰদৰ্শন করা নিজের জন্য অপরিহার্য মনে কর। তার সামনে উপবেশন করো না।

চতুর্থ আদব,
শিক্ষার্থী প্রাথমিক অবস্থায় মানুষের মতভেদ শোনা থেকে বেঁচে থাকবে, সে দুনিয়ার জ্ঞান অন্বেষণ করুক অথবা আখেরাতের জ্ঞান। কেননা, মতভেদ শুনলে প্রাথমিক শিক্ষার্থীর জ্ঞান-বুদ্ধি বিহ্বল, চিন্তাধারা বিক্ষিপ্ত ও মতামত শিথিল হয়ে পড়ে এবং উপলব্ধি ও সূচনার ব্যাপারে সে নিরাশ হয়ে যায়। প্রথমে সে ওস্তাদের পছন্দনীয় কোন পন্থা বিশ্বাস করবে, এরপর অন্যান্য মাযহাব ও তাদের সন্দেহ শুনবে। যদি তার ওস্তাদ এক মত অবলম্বন করার ব্যাপারে পাকাপোক্ত না হয় এবং এক মাযহাব থেকে অন্য মাযহাব পাল্টানো ও তাঁদের উক্তি বর্ণনা করাই তাঁর অভ্যাস হয়, তবে এরূপ ওস্তাদ থেকে বেঁচে থাকা উচিত। কেননা, এরূপ ওস্তাদ হেদায়াত করে কম এবং পথভ্রষ্ট করে বেশী। অন্ধ কি অন্ধকে পথ দেখাতে পারে? যে নিজেই হারিয়ে গেছে, সে অন্যকে পথ দেখাবে কেমন করে?
প্রাথমিক শিক্ষার্থীকে সন্দেহের পেছনে পড়তে বারণ করা, কোন নও মুসলিমকে কাফেরদের সাথে মেলামেশা করতে বারণ করারই মত। আর যে শিক্ষা সমাপ্ত করেছে, তাকে মতভেদসমূহে উৎসাহিত করা এমন, যেমন শক্ত ঈমানদারকে কাফেরদের সাথে দেখা সাক্ষাতে উৎসাহিত করা হয়। কেননা, প্রত্যেক কাজের জন্যে উপযুক্ত লোক দরকার। এ জন্যেই ভীরু কাপুরুষকে কাফেরদের উপর হামলা করতে বলা হয় না; বরং বীরপুরুষকে এ কাজের জন্য ডাকা হয়। এ সূক্ষ্ম তত্ত্ব সম্পর্কে গাফেল হয়ে কোন কোন দুর্বল লোক ধারণা করে যে, শক্ত লোকদের তরফ থেকে বর্ণিত শৈথিল্যে তাদের অনুসরণ করা জায়েয। তারা বুঝেনি যে, শক্ত লোকদের কাজ কারবার দুর্বল লোকদের কাজ কারবার থেকে আলাদা । এ সম্পর্কে জনৈক শায়খ বলেন : যেব্যক্তি আমাকে প্রথম অবস্থায় দেখেছে, সে যিন্দীক তথা খোদাদ্রোহী হয়ে গেছে। কারণ, শেষ অবস্থায় আমল বাতেনের মধ্যে অবস্থান গ্রহণ করে এবং বাহ্যিক অঙ্গ ফরয ক্রিয়াকর্ম ছাড়া অন্যান্য আন্দোলন থেকে স্তব্ধ হয়ে যায়। দর্শকরা মনে করে, এটা শৈথিল্য ও অকর্মণ্যতা। অথচ বাস্তবে তা নয়; বরং এটা অন্তরের পর্যবেক্ষণের আওতায় সার্বক্ষণিক যিকিরে ব্যাপৃত থাকা, যা সর্বোত্তম আমল। দুর্বল ব্যক্তি অঙ্গের বাহ্যিক অবস্থা দেখে এটাকে পদস্খলন মনে করে এবং নিজেও তদ্রূপ করে। তার দৃষ্টান্ত এমন, যেমন কোন ব্যক্তি এক গ্লাস পানিতে সামান্য নাপাক বস্তু ফেলে দেয় এবং বলে, সমুদ্রের জন্যে যা বৈধ তা গ্লাসের জন্যে আরও উত্তমরূপে বৈধ হওয়া উচিত। লোকটি জানে না যে, সমুদ্র তার শক্তির মাধ্যমে নাপাকীকে পানিতে পরিণত করে ফেলে এবং সমুদ্র প্রবল হওয়ার কারণে নাপাকীও সমুদ্রের মত হয়ে যায়। কিন্তু সামান্য নাপাকীই গ্লাসে প্রবল থাকে। সেটা গ্লাসকে নিজের মত নাপাক করে দেয়। এমনি ধরনের যুক্তির ভিত্তিতে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর জন্যে এমন বিষয় জায়েয সাব্যস্ত হয়েছে, যা অন্যের জন্যে জায়েয নয়। উদাহরণতঃ তাঁর জন্যে চার জনের অধিক স্ত্রী গ্রহণ করা বৈধ হয়েছে। কেননা, তাঁকে যে শক্তি দান করা হয়েছিল, তার সাহায্যে তিনি স্ত্রীদের মধ্যে 'আদল' তথা সমতা বিধান করতে পারতেন- তাঁদের সংখ্যা যতই হোক না কেন। অন্য ব্যক্তি অল্প কয়েকজনের মধ্যেও ন্যায়বিচার করতে পারে না। বরং তাদের মধ্যকার ক্ষতি স্বয়ং তাকেও গ্রাস করবে; অর্থাৎ স্ত্রীদের মনোরঞ্জন করতে গিয়ে সে আল্লাহ তাআলার নাফরমানী করে বসবে। যেব্যক্তি ফেরেশতাকে কর্মকারের অনুরূপ মনে করে, সে সফলকাম হবে কি?

পঞ্চম আদব,
শিক্ষার্থী কোন উৎকৃষ্ট শাস্ত্রই না দেখে পরিত্যাগ করবে না। এতটুকু দেখবে যাতে তার উদ্দেশ্য ও মূল লক্ষ্য সম্পর্কে অবগত হওয়া যায়। এর পর যদি জীবনে কুলায়, তবে সে সম্পর্কে পূর্ণতা অর্জনের চেষ্টা করবে। নতুবা অধিক গুরুত্বপূর্ণ শাস্ত্রে আত্মনিয়োগ করে তাতে পূর্ণতা অর্জন করবে এবং অবশিষ্ট শাস্ত্রগুলো অল্প বিস্তর অর্জন করবে। কেননা, শাস্ত্র একে অপরের সহায়ক ও পরস্পর জড়িত। কোন শাস্ত্র শিক্ষা না করা শত্রুতাবশতই হতে পারে। কেননা, মানুষ যা করতে পারে না তার প্রতি বিরূপ হয়ে থাকে। আল্লাহ্ তা'আলা এরশাদ করেন : “যখন তাঁর হেদায়েতে তারা পথে আসে না, তখন বলবে- এটা একটা সনাতন মিথ্যা।”
জনৈক কবি বলেন, রোগের কারণে যার মুখের স্বাদ তিক্ত হয়ে যায়, সে মিঠা পানিকেও তিক্ত মনে করে। মোটকথা, উৎকৃষ্ট শাস্ত্র স্তর অনুযায়ী বান্দাকে আল্লাহ তা'আলার পথের, পথিক করে দেয় অথবা পথ চলায় কিছু না কিছু সাহায্য করে।

ষষ্ঠ আদব,
শিক্ষণীয় শাস্ত্রসমূহের মধ্য থেকে কোন একটি সহসা অবলম্বন করবে না; বরং ক্রমের দিকে লক্ষ্য রাখবে। যেটি অধিক গুরুত্বপূর্ণ, সেটি থেকে শুরু করবে। কারণ, জীবন প্রায়শঃ সকল শাস্ত্ৰ আয়ত্ত করার জন্যে যথেষ্ট নয়। তাই সাবধানতা হচ্ছে, প্রত্যেক বস্তু থেকে উৎকৃষ্টটি অর্জন করবে এবং তা থেকে অল্প নিয়েই সন্তুষ্ট থাকবে। অল্প জ্ঞান দ্বারা যে শক্তি অর্জিত হয়, তা সর্বোত্তম শিক্ষা তথা আখেরাত বিষয়ক শিক্ষার উভয় প্রকার মোআমালা ও মোকাশাফায় ব্যয় করবে।
এলমে মোআমালার অভীষ্ট লক্ষ্য হচ্ছে এলমে মোকাশাফা এবং এর পরিণতি হচ্ছে আল্লাহ্ তা'আলার মারেফাত। এলমে মোকাশাফা বলে আমাদের উদ্দেশ্য সে বিশ্বাস নয়, যা জনসাধারণ বাপ-দাদার কাছ থেকে শুনে এসেছে অথবা মুখস্থ করে নিয়েছে। কালাম শাস্ত্রের পদ্ধতিও উদ্দেশ্য নয়, যাতে প্রতিপক্ষের মোকাবিলায় কথা টিকিয়ে রাখা হয়। কালাম শাস্ত্রীদের উদ্দেশ্য এতটুকুই। বরং এলমে মোকাশাফা বলে আমাদের উদ্দেশ্য হল এক প্রকার প্রত্যয়, যা সেই নূরের ফল, যা আল্লাহ তাআলা বান্দার অন্তরে স্থাপন করে দেন, যখন বান্দা সাধনা করে তার অন্তরকে অপবিত্রতা থেকে পবিত্র করে। অবশেষে বান্দা হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর ঈমানের মর্তবা পর্যন্ত পৌঁছে যায়, যার সাক্ষ্য নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এভাবে দিয়েছেন—
যদি আবু বকরের ঈমান সারা বিশ্বের ঈমানের সাথে ওজন করা হয়, তবে আবু বকরের ঈমানই ভারী হবে। আশ্চর্যের বিষয়, কিছু লোক শরীয়তের প্রবর্তক রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর কাছ থেকে এ ধরনের উক্তি শ্রবণ করার পর এর অনুরূপ যা কিছু শুনে, তাকে ঘৃণা করে এবং বলে যে, এগুলো সূফীদের অনর্থক ও দুর্বোধ্য কথাবার্তা।
সারকথা, তোমার সেই রহস্য জানার লোভ করা উচিত যা ফেকাহবিদ এবং কালামশাস্ত্রীদের সাহস ও আয়ত্তের বাইরে। এর অন্বেষণে লোভী না হয়ে তুমি এর পথ পাবে না।
মোট কথা, সর্বশ্রেষ্ঠ ও সবকিছুর মূল লক্ষ্য যে শাস্ত্র, তা হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার মারেফাত। এটা অতল সাগর। এতে সর্বাগ্রে রয়েছেন পয়গম্বরগণ, এর পর তাঁদের সাথে সম্পর্কযুক্ত ব্যক্তিবর্গ। বর্ণিত আছে, পূর্ববর্তী দার্শনিকগণের মধ্যে দু'জন দার্শনিকের চিত্র এক উপাসনালয়ে পরিদৃষ্ট হয়। তাদের একজনের হাতে রাখা একটি চিরকুটে লেখা ছিল : যদি তুমি সকল বিষয় সংশোধন করে নাও, তবে মনে করো না যে, একটি বিষয়ও সংশোধন করতে পেরেছ, যে পর্যন্ত না আল্লাহ তাআলার পরিচয় লাভ কর এবং তাঁকেই সকল কারণের মূল কারণ ও স্রষ্টা না জান। অপর হাতে রাখা চিরকুটে লিখিত ছিল : আল্লাহ তা'আলার মারেফাতের পূর্বে আমি পানি পান করতাম এবং পিপাসার্ত থাকতাম। অবশেষে যখন তাঁর মারেফাত অর্জিত হল তখন পানি পান করা ছাড়াই পিপাসা নিবৃত্ত হয়ে গেল।

সপ্তম আদব,
এমন কোন শাস্ত্রে পা রাখবে না, যে পর্যন্ত না তার আগে যেসব শাস্ত্র জানা দরকার সেগুলোর উপর পূর্ণ দক্ষতা অর্জিত হয়। কেননা, শাস্ত্রসমূহ এক জরুরী ক্রম অনুসারে বিন্যস্ত এবং এক শাস্ত্ৰ অন্য শাস্ত্রের পথ। যে এই ক্রম ও স্তরের প্রতি লক্ষ্য রাখে, সেই তওফীক প্রাপ্ত হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন :
>“আমি যাদেরকে কিতাব দিয়েছি, তারা তা যথার্থই পাঠ করে।”
অর্থাৎ, এলেম ও আমলের দিক দিয়ে এক শাস্ত্রে পাকাপোক্ত না হওয়া পর্যন্ত অন্য শাস্ত্রের দিকে অগ্রসর হয় না। যে শাস্ত্র অধ্যয়ন করবে তাতে তার উপরের শাস্ত্রে উন্নতি করার নিয়ত রাখবে। যদি কোন শাস্ত্রে মতভেদ হয় অথবা তাতে কয়েকজনই ভুল করে অথবা এলেম অনুসারে আমল না করে, তবে সে শাস্ত্র অর্থহীন বলে আখ্যায়িত করো না। যেমন কেউ কেউ চিকিৎসকের ভুল দেখে চিকিৎসা শাস্ত্রকে অকেজো মনে করে, জ্যোতিষীর কথাবার্তা ঘটনাচক্রে সত্য হতে দেখে কিছু লোক এর নির্ভুলতায় বিশ্বাসী হয় এবং কিছু লোক অন্য জ্যোতিষীর ভুল জেনে একে অকেজো বলে। অথচ তারা সকলেই ভ্রান্ত। বস্তুতঃ বিষয়টির বাস্তবতা স্বতন্ত্র দৃষ্টিতে যাচাই করে নেয়া উচিত। কেউই কোন শাস্ত্রে এতটুকু ব্যুৎপত্তির অধিকারী হয় না যে, তার যাবতীয় খুঁটিনাটি বিষয় সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হয়ে যাবে। এজন্যেই হযরত আলী (রাঃ) বলেন : মানুষকে দেখে সত্য চেনার চেষ্টা করো না; বরং সত্যকে জেনে নাও। এরপর সত্যপন্থীদেরকে আপনা আপনি জেনে যাবে।

অষ্টম আদব,
শাস্ত্রসমূহ যে কারণে একটি অপরটি থেকে শ্রেষ্ঠ, তা জানতে হবে। শ্রেষ্ঠত্ব দু'বিষয়ের কারণে হয়- ফলাফলের শ্রেষ্ঠত্বের কারণে এবং শক্তিশালী প্রমাণের কারণে। উদাহরণতঃ ধর্মশাস্ত্র ও চিকিৎসাশাস্ত্র দেখলে দেখা যায়, প্রথমটির ফলাফল অনন্ত জীবনের সুখ এবং দ্বিতীয়টির ফলাফল ধ্বংসশীল জীবনের সুখ। সুতরাং এদিক দিয়ে ধর্ম শিক্ষা শ্রেষ্ঠ। কেননা, তার ফলাফল শ্রেষ্ঠ। অংকশাস্ত্র ও জ্যোতিষশাস্ত্রের প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, অংকশাস্ত্রের প্রমাণসমূহ পাকাপোক্ত ও শক্তিশালী। সুতরাং এটা জ্যোতিষশাস্ত্র থেকে শ্রেষ্ঠ। যদি অংকশাস্ত্রকে চিকিৎসাশাস্ত্রের সাথে মিলিয়ে দেখি, তবে চিকিৎসাশাস্ত্র অংকশাস্ত্র থেকে শ্রেষ্ঠ, যদিও চিকিৎসাশাস্ত্রের অধিকাংশই আন্দাজ অনুমান মাত্র।
এ বক্তব্য থেকে বুঝা গেল, আল্লাহ্, ফেরেশতা, কিতাব ও রসূলের পরিচয় বিষয়ক শাস্ত্রই হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ শাস্ত্র। আর যেসব শাস্ত্র এ শাস্ত্র পর্যন্ত পৌছার উপায় ও মাধ্যম, সেগুলোও শ্রেষ্ঠ। কাজেই এ শাস্ত্র ছাড়া অন্য কোন শাস্ত্রের প্রতি আগ্রহ ও লোভ করা তোমার উচিত নয়।

নবম আদব,
শিক্ষা দ্বারা শিক্ষার্থীর উদ্দেশ্য হবে নিজের অভ্যন্তরকে সদগুণাবলী দ্বারা সজ্জিত করা এবং পরিণামে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ এবং ফেরেশতা ও ঊর্ধ্ব জগতের নৈকট্যশীলদের প্রতিবেশিত্ব অর্জন করা। শিক্ষার উদ্দেশ্য নেতৃত্ব, ধন-সম্পদ, জাঁকজমক, নির্বোধদের সাথে বিতর্ক এবং সমকক্ষদের উপর গর্ব করা না হওয়া উচিত। জ্ঞানের দ্বারা যার নিয়ত থাকে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন, তার পক্ষে অবশ্যই এমন জ্ঞান অন্বেষণ করা দরকার, যা এই উদ্দেশের নিকটবর্তী। অর্থাৎ তার আখেরাত বিষয়ক শাস্ত্র গ্রহণ করা উচিত। কিন্তু এতদসত্ত্বেও কিতাব ও সুন্নতের সাথে সম্পর্কযুক্ত ফতোয়াশাস্ত্র, অভিধানশাস্ত্র, ব্যাকরণশাস্ত্র ইত্যাদিকে ঘৃণার চোখে দেখতে পারবে না। এগুলো ফরযে কেফায়া শ্রেণীভুক্ত জ্ঞান। আমরা আখেরাত বিষয়ক শাস্ত্রের প্রশংসায় যে অতিরিক্ত গুরুত্ব আরোপ করেছি, এতে মনে করো না যে, উপরোক্ত শাস্ত্রসমূহ মন্দ। যারা এসব শাস্ত্রে আলেম, তারা তাদের মতই, যারা মাটির হেফাযত করে এবং আল্লাহর পথে জেহাদ করে। অর্থাৎ, তাদের কেউ যুদ্ধ করে, কেউ সাহায্য করে, কেউ তাদের পানি পান করায় এবং কেউ তাদের সওয়ারীর হেফাযত করে। আল্লাহর বাণীসমূহকে তুলে ধরা নিয়ত হলে তাদের কেউই সওয়াব থেকে বঞ্চিত নয়। আলেমগণের অবস্থাও তদ্রূপ। আল্লহ্ তাআলা বলেন-
>“তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার এবং যারা আলেম, আল্লাহ তাদের মর্তবা উচ্চ করেন।”
অর্থাৎ আল্লাহর কাছে তাদের অনেক মর্তবা।
মোট কথা, আলেমগণের শ্রেষ্ঠত্ব আপেক্ষিক। কারও তুলনায় বেশী এবং কারও তুলনায় কম। তাঁরা স্বয়ং হেয় নয়। সুতরাং এরূপ ধারণা করা উচিত নয় যে, যে এলেম উচ্চ মর্তবার নিম্নে, তা মূল্যহীন। বরং জানা উচিত যে, সর্বোচ্চ মর্তবা পয়গম্বরগণের, এর পর মজবুত আলেমগণের, এরপর সৎকর্মশীল বান্দাগণের, তাদের স্তর অনুযায়ী। সারকথা, যে কণা পরিমাণ সৎকর্ম করবে তার সওয়াব সে পাবে। যেব্যক্তি এলেম দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাইবে, তার এলেম যাই হোক না কেন, তার জন্যে উপকারী হবে এবং তার মর্তবা অবশ্যই উচ্চ করবে।

দশম আদব,
কোন্ শিক্ষা আসল উদ্দেশ্যের নিকটবর্তী এবং কোটি দূরবর্তী, তা জানতে হবে; যাতে নিকটবর্তীকে দূরবর্তীর উপর অগ্রাধিকার দেয়া এবং জরুরী জ্ঞান অবলম্বন করা যায়। জরুরী জ্ঞান অর্থ সে শিক্ষা যা তোমাকে চিন্তাশীল করবে।
বলাবাহুল্য, দুনিয়া ও আখেরাতে একমাত্র তোমার অবস্থাই তোমাকে চিন্তাশীল করে। দুনিয়ার ভোগবিলাস ও আখেরাতের সুখ-শান্তি একত্রে অর্জন করা তোমার পক্ষে সম্ভব নয়। কোরআন পাকে একথা বর্ণিত হয়েছে এবং অন্তর্দৃষ্টিও এর পক্ষে সাক্ষ্য দেয়। তাই জ্ঞানই অনন্তকাল স্থায়ী হয়, সেটাই জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ। এমতাবস্থায় দুনিয়া হবে একটি মনযিল; দেহ হবে বাহন আর আমল হবে উদ্দেশ্যের দিকে চলা। উদ্দেশ্য আল্লাহ্ তা'আলার দীদার ব্যতীত অন্য কিছু নয়। কেননা, সকল সুখ ও আনন্দ এতেই নিহিত। তবে পৃথিবীর কম লোকই এর মূল্য অনুধাবন করে।
জ্ঞানকে আল্লাহ তাআলার সাক্ষাৎ ও দীদারের সাথে তুলনা করে দেখলে তা তিন প্রকার।
দীদারের যা উদ্দেশ্য তা পয়গম্বরগণ অন্বেষণ করতেন এবং তাঁরাই এটা বুঝতেন। সে দীদার উদ্দেশ্য নয়, যা জনসাধারণ ও কালামশাস্ত্রীদের মস্তিষ্কে আসে। একটি দৃষ্টান্তের মাধ্যমে তুমি এলেমের এই প্রকারত্রয় হৃদয়ঙ্গম করতে পারবে।
দৃষ্টান্ত এই— কোন গোলামকে বলা হল, যদি তুমি হজ্জ কর এবং হজ্জের ক্রিয়াকর্ম পূর্ণরূপে পালন কর, তবে তুমি মুক্ত হয়ে যাবে এবং রাজত্বও লাভ করবে। আর যদি তুমি হজ্জের উদ্দেশে রওয়ানা হও এবং পথে কোন বাধার সম্মুখীন হও, তবে তুমি মুক্ত হয়ে যাবে কিন্তু রাজত্ব পাবে না। এখন এই গোলাম তিন প্রকার কাজের সম্মুখীন হবে- প্রথমতঃ সফরের সাজসরঞ্জাম প্রস্তুত করা অর্থাৎ, উট ক্রয়, মশক তৈরী ও খাদ্যশস্য সংগ্রহ, দ্বিতীয়তঃ দেশ ত্যাগ করে কা'বা গৃহের দিকে রওয়ানা হওয়া এবং তৃতীয়তঃ হজ্জের ক্রিয়াকর্মে আত্মনিয়োগ করা এবং এক একটি রোকন ক্রমানুসারে আদায় করা। এই তিনটি অবস্থা এবং এহরাম ও বিদায়ী তওয়াফ শেষ হওয়ার পর গোলাম আযাদী ও রাজত্বের অধিকারী হবে। প্রত্যেক অবস্থায় এই গোলামের অনেক স্তর রয়েছে। এখন যেব্যক্তি এখনও পাথেয় ও সওয়ারী প্রস্তুত করার কাজে লিপ্ত, অথবা চলা শুরু করেছে, সে সৌভাগ্যের এতটুকু কাছাকাছি হবে না, যতটুকু সেব্যক্তি হবে যে হজ্জের ক্রিয়াকর্ম শুরু করে দিয়েছে। কেননা, সে দুই অবস্থা অতিক্রম করে খুব কাছে পৌঁছে গেছে। অনুরূপভাবে জ্ঞানও তিন প্রকার।
এক প্রকার সফরের সাজসরঞ্জাম ক্রয় করার মত। এটা হচ্ছে চিকিৎসা ও ফেকাহ শিক্ষা এবং দুনিয়াতে দেহের উপযোগিতার সাথে সংশ্লিষ্ট জ্ঞানসমূহ।
দ্বিতীয় প্রকার শিক্ষা প্রান্তরে চলা ও উপত্যকা অতিক্রম করার মত। এটা হচ্ছে বদভ্যাসের ময়লা থেকে বাতেনকে পাক-পবিত্র করা এবং এমন উচ্চ মর্তবায় পৌঁছা, যেখানে তওফীকপ্রাপ্ত ব্যক্তি ছাড়া কেউ পৌঁছতে পারে না। এসব বিষয় পথ চলার অন্তর্ভুক্ত। এগুলোর জ্ঞান অর্জন করা পথের মনযিলসমূহ জানার মত। অতিক্রম না করে কেবল মনযিল ও পথ জেনে নেয়া যেমন যথেষ্ট নয়, তেমনি চরিত্র শুদ্ধ না করে কেবল চরিত্র শুদ্ধির উপায় জেনে নেয়াও যথেষ্ট নয়। জ্ঞান ছাড়া চরিত্র শুদ্ধি হতে পারে না।
তৃতীয় প্রকার জ্ঞান হজ্জ ও হজ্জের রোকনসমূহের মত। এটা হচ্ছে আল্লাহ তা'আলা, তাঁর গুণাবলী ও ফেরেশতার জ্ঞান এবং এলমে মোকাশাফায় বর্ণিত বিষয়াদির জ্ঞান। এ প্রকার শিক্ষার পর মুক্তি ও সৌভাগ্য অর্জিত হয়। কিন্তু নিরাপত্তা এ পথের প্রত্যেক পথিকেরই অর্জিত হয় যদি তার উদ্দেশ্য সৎ হয়। যারা আল্লাহ তা'আলার আরেফ, তাদের ছাড়া অন্য কেউ সৌভাগ্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছতে পারে না। তারাই নৈকট্যশালী হয় এবং তাদের উপরই রহমত, সুখ ও জান্নাতের নেয়ামত বর্ষিত হয়। যারা পূর্ণতার স্তর থেকে দূরে থেকে যায়, তাদের নাজাত ও নিরাপত্তা অর্জিত হয়। সেমতে আল্লাহ তা'আলা বলেন :
>“অতঃপর যদি সে নৈকট্যশালীদের অন্তর্ভুক্ত হয়, তবে তার জন্যে রয়েছে সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য ও জান্নাতের নেয়ামত। আর যদি সে হয় ডান দিকের লোকদের অন্তর্ভুক্ত, তবে তাদের তরফ থেকে আপনার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক।”
আর যারা উদ্দেশের প্রতি মনোযোগী হয় না এবং সেদিকে চলে না, অথবা চললেও আনুগত্য ও দাসত্বের নিয়তে চলে না; বরং জাগতিক স্বার্থ উদ্ধারের জন্যে চলে, তারা বাম দিকের লোকদের অন্তর্ভুক্ত; অর্থাং পথভ্ৰষ্ট হবে। তাদের জন্যে বলা হয়েছে :
>“তারা উত্তপ্ত পানি দ্বারা আপ্যায়িত হবে এবং জাহান্নামে প্রবিষ্ট হবে।”
মোট কথা, এলমে মোকাশাফার পরে সৌভাগ্য তথা সিদ্ধি লাভ হয়। আর এলমে মোকাশাফা এলমে মোআমালার পরে আসে। অর্থাৎ আখেরাতের পথে চলা এবং গুণাবলীর উপত্যকাসমূহ অতিক্রম করার পর এলমে মোকাশাফা অর্জিত হয়। আমরা চিকিৎসা ও ফেকাহশাস্ত্রকে হজ্জের জন্যে পাথেয় ও সওয়ারী প্রস্তুত করার সাথে তুলনা করেছি। এর কারণ, আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য লাভের জন্যে তাঁর দিকে অন্তর চলে, দেহ নয়। আমাদের মতে অন্তর সেই মাংসপিন্ড নয় যা চোখে উপলব্ধ হয়; বরং এটা আল্লাহ তা'আলার এক রহস্য। এটা ইন্দ্রিয় দ্বারা উপলব্ধ হয় না। কখনও একে রূহ এবং কখনও নফসে মুতমায়িন্নাহ বলা হয়। শরীয়ত একে কলব তথা অন্তর বলে ব্যক্ত করে। কেননা, অন্তর হচ্ছে এ রহস্যের প্রথম সওয়ারী এবং অন্তরের মাধ্যমে সমগ্র দেহ তার সওয়ারী ও হাতিয়ারে পরিণত হয়। এলমে মোকাশাফা দ্বারা এ রহস্যের অবস্থা চমৎকাররূপে জানা যায়। এ রহস্য প্রকাশযোগ্য নয়; বরং এ সম্পর্কে আলোচনা করার অনুমতি নেই। বেশীর বেশী এতটুকু বলার অনুমতি আছে যে, এটি একটি উৎকৃষ্ট বিষয়, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়াদির তুলনায় শ্রেষ্ঠ এবং খোদায়ী নির্দেশ। সেমতে আল্লাহ্ বলেন-
>“তারা আপনাকে রূহ সম্পর্কে প্রশ্ন করে। বলে দিন, রূহ্ আমার পালনকর্তার নির্দেশের অংশ।” উদ্দেশ্য এই যে, রূহ তার পালনকর্তার দিকে ধাবিত হয়। আল্লাহ্ তাআলাই এর উৎস এবং তাঁর দিকেই সে প্রত্যাবর্তন করে। দেহ এ রূহের সওয়ারী, যাতে সওয়ার হয়ে সে চলে। আল্লাহর পথে দেহ অন্তরের জন্যে এমন, যেমন হজ্জের পথে দেহের জন্যে উট অথবা পানির মশক। অতএব যে আমলের উদ্দেশ্য দেহের কল্যাণ সাধন, সেটা সওয়ারীর কল্যাণসমূহের অন্তর্ভুক্ত।
বলাবাহুল্য, চিকিৎসাশাস্ত্রের উদ্দেশ্যও দেহের কল্যাণ সাধন। কেননা, দৈহিক স্বাস্থ্যের দেখাশোনার জন্যে চিকিৎসাশাস্ত্রের প্রয়োজন হয়। ধরে নাও, মানুষ যদি একা থাকত, তবে তার চিকিৎসাশাস্ত্রের প্রয়োজন হত- ফেকা প্রয়োজন হত না। কিন্তু মানুষকে এমনভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে যে, সে একাকী অবস্থায় জীবিত থাকতে পারে না। আহারের জন্যে হালচাষ, বপন এবং অন্ন ও বাসস্থান অর্জন প্রভৃতি একাকী সমাধা করা সম্ভব হতে পারে না। এর জন্যে অন্যের সাথে মেলামেশা করা ও সাহায্য চাওয়া জরুরী। মানুষ যখন পরস্পরে মেলামেশা করেছে এবং কামনা বাসনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, তখন পরস্পরে কলহ-বিবাদ ও মারামারি করে বরবাদ হতে শুরু করেছে। এ কলহ বিবাদই তাদের ধ্বংসের কারণ হয়েছে, যেমন দেহের পিত্তাদি বিগড়ে গেলে মানুষের মৃত্যু ঘটে থাকে। চিকিৎসাশাস্ত্রের মাধ্যমে পিত্তাদির দূষিত হওয়া থেকে নিরাপদ থাকা যায় এবং শাসন ও ন্যায়বিচারের মাধ্যমে বাহ্যিক ফ্যাসাদ দূর করে কামনা বাসনায় সমতা আনয়ন করা। পিত্তাদিতে সমতা কায়েম রাখার নিয়ম কানুন জানাকে ফেকাহশাস্ত্র বলা হয়। উভয়টি দেহের হেফাযতের জন্যে অন্তরের বাহন হয়। সুতরাং যেব্যক্তি কেবল ফেকাহ্ ও চিকিৎসাশাস্ত্রেই নিয়োজিত থাকে এবং নফসের উপর মোজাহাদা বা সাধনা না করে, সে যেন উট ক্রয় করে তার প্রতিপালনেই কেবল ব্যস্ত থাকে; কিন্তু হজ্জের পথে পা বাড়ায় না। যারা আত্মার সংশোধন তথা এলমে মোকাশাফার পথে চলমান, তাদের সাথে এই ফেকাহশাস্ত্রীদের তুলনা এমন, যেমন যারা হজ্জের রোকনসমূহ পালনে লিপ্ত, তাদের সাথে সে ব্যক্তির তুলনা, যে উট কিনে সেটিকে কেবল ঘাস খাওয়াচ্ছে- হজ্জের পথে রওয়ানা হচ্ছে না।
সুতরাং এ বিষয়টি প্রথমেই চিন্তা কর এবং সে ব্যক্তির উপদেশ মান্য কর, যে তোমার কাছে এর কোন মজুরি চায় না এবং যে সততঃ এতে মগ্ন রয়েছে। কঠোর পরিশ্রম ছাড়া তোমার জন্যে এ বিষয়টি অর্জিত হবে না। জনসাধারণ ও বিশিষ্ট লোকদের কাছ থেকে আলাদা হওয়ার জন্যে তোমাকে পূর্ণ সাহসিকতা প্রদর্শন করতে হবে এবং কেবল নিজের খেয়াল-খুশী অনুযায়ী তাদের অনুসরণ থেকে বিরত থাকতে হবে। শিক্ষার্থীর জন্যে এতটুকু আদবই যথেষ্ট মনে হয়।

পরবর্তী পর্ব-

জ্ঞান ও জ্ঞানার্জন (২২) মোনাযারা থেকে উদ্ভূত বিপদ



জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ২২)
এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

মোনাযারা থেকে উদ্ভূত বিপদ-
প্রকাশ থাকে যে, নিজে প্রবল হওয়া, অপরকে নিশ্চুপ করা, নিজের গুণগরিমা প্রকাশ করা, মানুষের মধ্যে শুদ্ধভাষিতা, বাগ্মিতা ও গর্ব প্রদর্শন করা এবং মানুষের মন নিজের দিকে আকৃষ্ট করা ইত্যাদি হীন উদ্দেশে যে মোনাযারা করা হয়, তা আল্লাহ তাআলার কাছে নিন্দনীয় ও শয়তানের কাছে প্রশংসনীয় বদঅভ্যাসসমূহের উৎস হয়ে থাকে। অহংকার, হিংসা, আত্মম্ভরিতা, লোভ-লালসা, জাঁকজমকপ্রিয়তা ইত্যাদি আভ্যন্তরীণ অনিষ্টের সম্পর্ক মোনাযারার সাথে এমন, যেমন যেনা, গালি-গালাজ, হত্যা, চুরি ইত্যাদি বাহ্যিক অনিষ্টের সম্পর্ক মদ্যপানের সাথে। কোন ব্যক্তিকে মদ্যপান এবং এসব কুকর্ম করার ক্ষমতা দেয়া হলে যেমন সে মদ্যপানকে সামান্য মনে করে তা করে বসবে, এরপর মাতাল অবস্থায় অবশিষ্ট কুকর্মগুলো করে ফেলবে, তেমনি যার মনে অপরকে নিশ্চুপ করার আগ্রহ, মোনাযারায় জয়ী হওয়ার বাসনা এবং জাঁকজমক ও অহংকারপ্রীতি প্রবল থাকে, তার মনে সকল প্রকার লুকিয়ে থাকে এবং যাবতীয় বদভ্যাস মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। হাদীস ও কোরআনের আলোকে আমরা এসব বদভ্যাসের নিন্দা তৃতীয় খন্ডে বর্ণনা করব। এখানে কেবল এমন কতিপয় বদভ্যাস বর্ণিত হচ্ছে, যেগুলো মোনাযারা থেকে উদ্ভূত হয়। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে হিংসা। এ সম্পর্কে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন :
>“হিংসা সৎকর্মসমূহকে খেয়ে ফেলে যেমন আগুন কাঠকে জ্বালিয়ে ছাই করে দেয়।”
যেব্যক্তি মোনাযারা করে, সে হিংসা থেকে মুক্ত হয় না। কারণ, সে কখনও জয়ী হয় এবং কখনও পরাভূত হয়। কখনও তার যুক্তির প্রশংসা করা হয় আবার কখনও প্রতিপক্ষের যুক্তি প্রশংসিত হয়। যে পর্যন্ত পৃথিবীতে এক ব্যক্তিও এমন থাকবে, যে জ্ঞান গরিমা ও মোনাযারায় স্বনামখ্যাত অথবা মোনাযারাকারীর ধারণায় তার যুক্তিই অধিক শক্তিশালী, সে পর্যন্ত অবশ্যই সে হিংসা পোষণ করবে, প্রতিপক্ষের কাছ থেকে ফিরে কেবল মোনাযারাকারীর দিকে আকৃষ্ট হোক এমনটা পছন্দ করবে। সত্য বলতে কি, হিংসা একটি জ্বলন্ত আগুন। যে এতে লিপ্ত হয়, সে দুনিয়াতে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির মধ্যে কালাতিপাত করে। আখেরাতের আযাব আরও বেশী ভয়ংকর। তাই হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন :
"জ্ঞান যেখানেই পাও, অর্জন কর। ফেকাহবিদদের যেসকল উক্তি একে অপরের বিরুদ্ধে, সেগুলো গ্রহণ করো না। তারা পালের ছাগলের ন্যায় লড়াই করে।"
দ্বিতীয় বদভ্যাস হচ্ছে অহংকার করা। এ সম্পর্কে রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন : “যেব্যক্তি অহংকার করে, আল্লাহ্ তা'আলা তাকে হেয় করেন। আর যে বিনয়ী হয় আল্লাহ্ তাকে উঁচু করেন।”
হাদীসে কুদসীতে বলা হয়েছে :
>“মাহাত্ম্য আমার পরিধেয় এবং বড়ত্ব আমার চাদর। যেব্যক্তি এতদুভয়ের মধ্য থেকে কোন একটিতে আমার সমকক্ষতার আকাঙ্ক্ষা করে, আমি তাকে ভেঙ্গে চুরমার করে দেই।”
মোনাযারাকারীরা তাদের সমসাময়িক ও সমপর্যায়ের লোকদের সাথে অহংকার,বড়ত্ব অন্বেষণ এবং আপন যোগ্যতার চেয়ে বড় আসন লাভের বাসনা থেকে মুক্ত থাকে না। এমনকি, সভাপতির আসনের নিকটে অথবা দূরের জায়গায় বসার জন্যে পর্যন্ত লড়াই করে এবং পথ সংকীর্ণ হলে আগে যাওয়ার জন্যে খুনাখুনিতে লিপ্ত হয়। মাঝে মাঝে তাদের কতক অনভিজ্ঞ ও প্রতারক ব্যক্তি বলে থাকে, এলেমের ইযযত রক্ষা করাই তাদের লক্ষ্য। ঈমানদার ব্যক্তি নিজেকে লাঞ্ছিত করতে পারে না। এটা শরীয়তে নিষিদ্ধ। এই বাহানায় তারা বিনয়কে লাঞ্ছনা বলে মনে করে। অথচ আল্লাহ তাআলা ও পয়গম্বরগণ বিনয়ের প্রশংসা করেছেন। যে অহংকার আল্লাহ্ তাআলার কাছে নিন্দনীয়, তারা তাকে ধর্মের সম্মানরূপে আখ্যায়িত করে এবং শব্দ পরিবর্তন করে মানুষকে পথভ্রষ্ট করে। এটা এলেম ও হেকমত শব্দকে পরিবর্তন করে অন্য অর্থ করারই মত।
আর একটি বদভ্যাস হচ্ছে পরশ্রীকাতরতা। খুব কম মোনাযারাকারীই এ দোষ থেকে মুক্ত থাকে। অথচ রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : “ঈমানদার ব্যক্তি পরশ্রীকাতর হতে পারে না।” এর নিন্দায় অনেক কিছু বর্ণিত আছে। মোনাযারাকারী ব্যক্তি যখন কাউকে দেখে যে, সে প্রতিপক্ষের কথায় মাথা নাড়ে এবং তার কথা ভালরূপে শুনে না, তখন সে উদ্বিগ্ন হয় এবং তার প্রতি পরশ্রীকাতর হয়ে পড়ে।
আর একটি কুঅভ্যাস হচ্ছে গীবত তথা পরনিন্দা। আল্লাহ তাআলা একে মৃত ভাইয়ের মাংস ভক্ষণের সাথে তুলনা করেছেন। মোনাযারাকারী ব্যক্তি এরূপ মাংস ভক্ষণেই অভ্যস্ত হয়ে থাকে। সে সর্বদা প্রতিপক্ষের কথাবার্তা উদ্ধৃত করে তার নিন্দা করে। সে চরম সাবধানী হলে এটা করে যে, প্রতিপক্ষের কথা সত্য সত্য বর্ণনা করে- মিথ্য বলে না, কিন্তু এতেও এমন কথা বর্ণনা করে না, যদ্বারা তার দোষ, হেরে যাওয়া এবং মানহানি ঘটতে পারে। বলাবাহুল্য, এ ধরনের আলোচনা গীবতেরই অন্তর্ভুক্ত। আর যদি মিথ্যা বলে, তবে সেটা তো পুরোই অপবাদ, যা গীবত থেকেও জঘন্য।
অপর একটি বদভ্যাস হচ্ছে আত্মপ্রশংসা। এ সম্পর্কে আল্লাহ্ তা’আলা বলেন :
তোমরা আত্মপ্রশংসা করো না। কে মোত্তাকী সেটা আল্লাহ্ই ভাল জানেন।
জনৈক দার্শনিককে জিজ্ঞেস করা হয় : মন্দ সত্য কোনটি? তিনি বললেন : আত্মপ্রশংসা করা। যেব্যক্তি মোনাযারা করে, সে শক্তি-সামর্থ্য ও সমকক্ষদের উপর শ্রেষ্ঠত্বে অগ্রণী হওয়ার ব্যাপারে নিজের প্রশংসা নিজেই করে থাকে। বরং মোনাযারার মাঝখানে বলে উঠে- এ ধরনের বিষয় আমার কাছে গোপন থাকতে পারে না। এগুলো আমার নখদর্পণে। আমি হাদীস ও নীতিশাস্ত্রে পারদর্শী। সে এমনি ধরনের আরও অনেক কথাবার্তা কখনও আস্ফালনের ছলে এবং কখনও নিজের মতবাদ চাপিয়ে দেয়ার উদ্দেশে বলে থাকে। বলাবাহুল্য, আস্ফালন এবং দর্প প্রদর্শন করা শরীয়ত ও বিবেকের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ।
ছিদ্রান্বেষণও মোনাযারা থেকে উদ্ভূত একটি কুঅভ্যাস। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন : “তোমরা ছিদ্রান্বেষণ করো না।” মোনাযারাকারী ব্যক্তি প্রতিপক্ষের ত্রুটিবিচ্যুতি ও দোষ অন্বেষণ করে ফিরে। এমনকি, তার শহরে কোন মোনাযারাকারীর আগমনের সংবাদ পেলে সে এমন ব্যক্তির খোঁজ করে, যে তার আভ্যন্তরীণ অবস্থা বলে দিতে পারে। সে তাকে জিজ্ঞেস করে করে দোষ জেনে নেয় এবং প্রয়োজনে সেগুলো প্রকাশ করে প্রতিপক্ষকে লজ্জা দেয়। এমনকি, তার শৈশবকালীন অবস্থা এবং দৈহিক দোষ যেমন টেকো হওয়া ইত্যাদিও জেনে নেয়। এর পর মোনাযারার সময় তাকে সামান্যও প্রবল হতে দেখলে প্রথমে সম্ভ্রমের খাতিরে ইশারা ইঙ্গিতে সেসব দোষ বর্ণনা করে। অন্যরাও এ বিষয়টি পছন্দ করে এবং স্বয়ং মোনাযারাকারী এক একটি সূক্ষ্ম অস্ত্ররূপে গণ্য করে। পক্ষান্তরে দুর্মুখ হলে প্রকাশ্যে ও স্পষ্ট ভাষায় সেসব দোষ উল্লেখ করতে দ্বিধা করে না।
অপরের দুঃখে আনন্দিত হওয়া এবং আনন্দে দুঃখ করাও একটি বদ অভ্যাস, যা মোনাযারাকারীর মধ্যে পাওয়া যায়। অথচ যে নিজের জন্যে যা পছন্দ করে, মুসলমান ভাইয়ের জন্যে তা পছন্দ করে না, সে ঈমানদারদের চরিত্র থেকে বহু মনযিল দূরে অবস্থান করে। অতএব যেব্যক্তি গুণগরিমা প্রকাশ করে গর্ব করে, তার কাছে অবশ্যই তা ভাল লাগবে, যা তার সমকক্ষ ও গুণগরিমায় অংশীদারদের কাছে খারাপ লাগে। তাদের মধ্যে এমন শত্রুতা হবে, যেমন সতীনদের মধ্যে হয়ে থাকে। এক সতীন দূর থেকে অপর সতীনকে দেখে যেমন ক্ষেপে উঠে এবং মলিন হয়ে যায়, তেমনি মোনাযারাকারী ব্যক্তি যখন অপরকে দেখে, তখন তার চেহারা বিবর্ণ হয়ে যায় এবং চিন্তায় বিক্ষিপ্ততা এসে যায়; যেন সামনে ভূত এসে গেছে অথবা কোন হিংস্র জন্তুর সম্মুখীন হয়ে গেছে। তাদের মধ্যে সে মহব্বত ও মুখ কোথায়, যা খাঁটি আলেমগণের পারস্পরিক সাক্ষাতের সময় হয়ে থাকে? যেরূপ ভ্রাতৃত্ববোধ, সহানুভূতি ও সুখে দুঃখে শরীক থাকার কথা আলেমগণ থেকে বর্ণিত আছে, তা তাদের মধ্যে কোথায়? এমনকি, শাফেয়ী (রঃ) বলেন : গুণী ও জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গের মধ্যে একটি নিকট আত্মীয়তার সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে। এখন আমরা জানি না, যাদের মধ্যে এলেম ও শিক্ষা একটি চূড়ান্ত শত্রুতার কারণ হয়ে গেছে, তারা ইমাম শাফেয়ী (রঃ)-এর মযহাব অনুসরণের দাবী করে কিরূপে? এটা কিরূপে সম্ভব, গর্ব, অহংকার ও শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের স্পৃহা থাকা সত্ত্বেও তাদের মধ্যে মহব্বত ও সম্প্রীতি কায়েম থাকবে? এটা কখনও হতে পারে না। এ মোনাযারা যে মন্দ, তা জানার জন্যে এতটুকুই যথেষ্ট যে, মোনাযারা তোমার কাছ থেকে মুমিনদের অভ্যাস ছাড়িয়ে নিয়ে মোনাফিকদের অভ্যাসের সাথে তোমাকে জড়িয়ে দেয়।
আরেকটি বদভ্যাস হচ্ছে নেফাক তথা কপটতা। এর অনিষ্ট প্রমাণসাপেক্ষ নয়। যারা মোনাযারা করে, তাদের কপটতাও করতে হয়। উদাহরণতঃ প্রতিপক্ষ অথবা তার বন্ধু ও অনুসারীদের সাথে সাক্ষাত হলে অপারগ হয়ে মুখে তাদের সাথে বন্ধুত্ব প্রকাশ করা হয়, তাদের প্রতি আগ্রহ ব্যক্ত করা হয় এবং তাদের মর্তবায় বিশ্বাস প্রকট করা হয়। অথচ বক্তা নিজে ও সম্বোধিত ব্যক্তি এবং অন্য যারা শুনে, সকলেই জানে, এ সব বানোয়াট, প্রতারণা, মিথ্যা ও দুষ্কর্ম বৈ কিছু নয়। বাহ্যতঃ মুখে বন্ধু হলেও আন্তরিকভাবে একে অপরের শত্রু। আল্লাহ তাআলা এহেন বদভ্যাস থেকে আপন আশ্রয়ে রাখুন।
নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন : যখন মানুষ এলেম শিক্ষা করে তদনুযায়ী আমল ছেড়ে দেয় এবং মুখে বন্ধু হয়ে থাকে, কিন্তু অন্তরে পরস্পরের শত্রু হয় এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে, তখন আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি অভিসম্পাত করেন, তাদেরকে বধির করে দেন এবং তাদের দৃষ্টিশক্তি বিলোপ করেন। অভিজ্ঞতার আলোকেও অবশ্যই এমনটি হতে দেখা গেছে।
আরেকটি বদভ্যাস হচ্ছে সত্য কথার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ ও সে সম্পর্কে লড়াই করার স্পৃহা।
মোনাযারাকারীদের কাছে সর্বাধিক মন্দ বিষয় হচ্ছে প্রতিপক্ষের মুখ থেকে সত্য প্রকাশ পাওয়া। এরূপ হলে মোনাযারাকারী তা অস্বীকার করা ও না মানার জন্যে সাধ্যানুযায়ী উঠে পড়ে লেগে যায় এবং যতদূর সম্ভব তা প্রতিহত করার জন্যে ধোঁকা ও প্রতারণার আশ্রয় নেয়। ফলে সত্য বিষয়ে লড়াই করা তার মজ্জাগত অভ্যাসে পরিণত হয়। যখনই কোন কথা কানে পড়ে, তখনই তাতে আপত্তি তোলার কথা ভাবতে থাকে। ক্রমশঃ এ বিষয়টি কোরআন পাকের দলীলসমূহে এবং শরীয়তের ভাষায়ও তার মনে প্রবল হয়ে যায়। সে এক দলীলের মোকাবিলা অন্য দলীল দ্বারা করে। অথচ বাতিলের মোকাবিলায়ও লড়াই ঝগড়া করতে শরীয়তে নিষেধ করা হয়েছে। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এক হাদীসে বলেন :
>“যেব্যক্তি বাতিলপন্থী হয়ে ঝগড়া বর্জন করে, আল্লাহ তা'আলা তার জন্যে জান্নাতের এক কোণে গৃহ নির্মাণ করেন। আর যেব্যক্তি সত্যপন্থী হয়ে কলহ বর্জন করে, আল্লাহ তাআলা তার জন্যে জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তরে একটি গৃহ নির্মাণ করেন।"
আল্লাহ্ তাআলা স্বয়ং তাঁর নিজের উপর মিথ্যা বলা এবং সত্য বিষয় মিথ্য প্রতিপন্ন করাকে সমপর্যায়ভুক্ত করেছেন। সেমতে তিনি বলেন :
>“সে ব্যক্তির চেয়ে বড় জালেম কে, যে আল্লাহর উপর মিথ্যা গড়ে এবং সত্য বিষয়কে তার কাছে আসার পর মিথ্যা বলে জাহির করে।"
>“সে ব্যক্তির চেয়ে বড় জালেম কে, যে আল্লাহর বিরুদ্ধে মিথ্যা ভাষণ দেয় এবং সত্য আসার পর তাকে মিথ্যা বলে?“
আর একটি বদভ্যাস হচ্ছে রিয়া তথা লোক দেখানো ভাব।
এটা অধিক দুরারোগ্য ব্যাধি। এর দ্বারা সর্ববৃহৎ কবীরা গোনাহ প্রকাশ পায়। এ সম্পর্কে রিয়া অধ্যায়ে বর্ণনা করা হবে।
বর্ণিত দশটি আভ্যন্তরীণ দোষই সকল অনিষ্টের মূল।
সম্ভ্রমশীল নয় - এমন লোকদের মধ্যে যেসব অনিষ্ট হয়ে যায়, সেগুলো এর অতিরিক্ত। উদাহরণতঃ এমনভাবে বিতর্ক করা যে, হাতাহাতি, ঠেলাঠেলি, কিলঘুষি, কাপড় ছিঁড়ে ফেলা, পিতামাতাকে ও ওস্তাদদেরকে মন্দ বলা এবং গালিগালাজ করার উপক্রম হয়ে যায়। এ ধরনের লোক মনুষ্যত্বের গণ্ডির বাইরে। যারা বুদ্ধিমান ও সম্ভ্রমশীল, তাদের মধ্যে এ দশটি অনিষ্ট অবশ্যই থাকে। হাঁ, মাঝে মধ্যে কোন মোনাযারাকারী এগুলোর মধ্যে কতক বদভ্যাস থেকে বেঁচেও থাকে, যদি তার প্রতিপক্ষ তার চেয়ে নিম্নস্তরের হয় অথবা অনেক বেশী উঁচু স্তরের হয়, অথবা তার শহর থেকে দূরে বসবাস করে। আর যার প্রতিপক্ষ সমকক্ষ, নিকটে বসবাসকারী ও সমস্তরের হয়, সে এই দশটি বদভ্যাস থেকে মুক্ত হয় না। এ দশটি বদভ্যাস থেকে আরও দশটি কুকাণ্ড প্রকাশ পায়, যার প্রত্যেকটির বিস্তারিত বিবরণ দীর্ঘ মনে করে আমরা এখানে উল্লেখ করছি না। উদাহরণতঃ নাক সিঁটকানো, রুষ্টতা, শত্রুতা, লোভ-লালসা, জাঁকজমক, আস্ফালন, ধনী ও সরকারী কর্মচারীদের সম্মান এবং তাদের কাছে আসা-যাওয়া, তাদের হারাম ধন সম্পদ গ্রহণ, নিষিদ্ধ পোশাকে সজ্জিত হওয়া, গর্ব অহংকারভরে অপরকে হেয় মনে করা, বেশী কথা বলা, মন থেকে ভয় ও আশা তিরোহিত হওয়া, এমন গাফেল হওয়া যে, নামাযে দাঁড়িয়ে কত রাকআত পড়েছে এবং কি পড়েছে তা মনে না থাকা, কার কাছে মোনাজাত করছে, তাও বোধশক্তিতে না থাকা। মোনাযারাকারী ব্যক্তি সারাজীবন মোনাযারা সম্পর্কিত এলেমের মধ্যে ডুবে থাকে এবং উত্তম বাক্য বলা, ছন্দপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করা, বিরল কথাবার্তা স্মরণ করা ইত্যাদিতে ব্যাপৃত থাকে। অথচ এগুলো আখেরাতে কোন উপকারে আসবে না।
মোনাযারাকারীদের বিভিন্ন স্তর রয়েছে। তাদের মধ্যে যেব্যক্তি অধিক ধার্মিক ও জ্ঞানী, তার মধ্যেও এসব বদভ্যাসের উপকরণ সঞ্চিত থাকে। সে মোজাহাদার মাধ্যমে একে গোপন রাখে। এই খারাপ অভ্যাসগুলো সে ব্যক্তির মধ্যেও বিদ্যমান থকে, যে ওয়াজ নসীহতে মশগুল থাকে, যদি ওয়াজ দ্বারা তার উদ্দেশ্য জনপ্রিয়তা অর্জন এবং ধন-দৌলত ও সম্মান অর্জন করা হয়।
যদি কোন ব্যাক্তবিচারকের পদ লাভ, ওয়াকফ সম্পাত্তর মুতাওয়াল্লী হওয়া এবং সমকক্ষদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করার উদ্দেশে এলেম, মযহাব ও ফতোয়ায় নিয়োজিত থাকে, তবে তার মধ্যে এসব অভ্যাস অপরিহার্যরূপে পাওয়া যাবে। মোট কথা, যেব্যক্তি আখেরাতের সওয়াব ছাড়া অন্য কিছুর উদ্দেশে আলেম হবে, তার মধ্যেই এ সমস্ত বদভ্যাস পাওয়া যাবে। এ জন্যেই রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : কিয়ামতে মানুষের মধ্যে কঠোরতর আযাব সেই আলেমের হবে, যাকে আল্লাহ্ তাআলা তার এলেম দ্বারা কোন উপকার পৌঁছাননি। এক্ষেত্রে তার এলেম উপকার না করে বরং ক্ষতি করেছে। যে এলেম অন্বেষণ করে তার অবস্থা সে ব্যক্তির মত, যে দুনিয়াতে রাজত্ব অন্বেষণ করে। যদি ঘটনাক্রমে রাজত্ব না পায় তবে আশা করা যায় না যে, সে অন্য লোকদের মত বেঁচে থাকবে; বরং তাকে অবশ্যই বড় বড় লাঞ্ছনার সম্মুখীন হতে হবে। যদি বল, মোনাযারার অনুমতি দেয়ার মধ্যে উপকারিতা রয়েছে, এতে এলেম অন্বেষণের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি হয়, যা না থাকলে এলেম মিটে যাবে। তবে আমি বলব, তোমার এ কথা এক দিক দিয়ে ঠিক, কিন্তু উপকারী নয়। কারণ ছেলেদেরকে খেলার বল, ডাংগুলি ও খেলাধুলার প্রতিশ্রুতি না দিলে তারা মক্তবের প্রতি আগ্রহী হয় না। এতে খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী হওয়া উত্তম হয়ে যায় না। এমনিভাবে জাঁকজমকপ্রীতি না হলে এলেম মিটে যাবে- এ বাক্য এ কথা বুঝায় না যে, যেব্যক্তি জাঁকজমক অন্বেষণ করবে, সে মুক্তি পাবে। বরং সে তো তাদেরই একজন যাদের সম্পর্কে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন:
>“আল্লাহ্ তাআলা এমন লোকের মাধ্যমেও এ দ্বীনকে শক্তিশালী করেন, যাদের দ্বীনে কোন অংশ নেই।”
অন্যত্র বলেন :
>“আল্লাহ তা'আলা পাপাচারী ব্যক্তির মাধ্যমে এ দ্বীনকে শক্তি দান করেন।”
এ থেকে জানা গেল, যারা জাঁকজম প্রিয়, তারা নিজেরা তো ধ্বংস হয় বটে, কিন্তু কখনো কোন সময় তাদের দ্বারা অন্যদের মঙ্গল হয়, যদি তারা অন্যদেরকে সংসার বর্জনের আহ্বান জানায়। এটা এরূপ নেতাদের মধ্যে হয়, যাদের অবস্থা বাহ্যতঃ পূর্ববর্তী মনীষীগণের বাহ্যিক অবস্থার অনুরূপ হয়; কিন্তু অন্তরে জাঁকজমকপ্রিয়তা লুক্কায়িত থাকে। তাদের দৃষ্টান্ত মোমবাতির মত। সে নিজে জ্বলে পুড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, কিন্তু অন্যেরা তার কাছ থেকে আলো লাভ করে। অর্থাৎ, এই নেতাদের ধ্বংসের মাধ্যমে অন্যদের মঙ্গল সাধিত হয়। কিন্তু যদি কোন নেতা সংসার অন্বেষণে উৎসাহ দেয়, তবে তাকে জ্বলন্ত অগ্নি মনে করতে হবে, সে নিজে প্রজ্বলিত এবং অপরকে জ্বালিয়ে ভস্ম করে দেয়।
মোট কথা, আলেমগণ তিন শ্রেণীতে বিভক্ত- (১) যারা নিজেরাও ধ্বংস হবে এবং অপরকেও ধ্বংস করবে। তারা এমন আলেম, যারা প্রকাশ্যে দুনিয়া অন্বেষণ করে এবং দুনিয়ার প্রতি মনোনিবেশ করে।
(২) যারা নিজেরাও ভাগ্যবান এবং অপরকেও ভাগ্যবান করে। তারা এমন আলেম, যারা মানুষকে যাহের ও বাতেন উভয় ক্ষেত্রে আল্লাহ্ তাআলার প্রতি আহ্বান করে।
(৩) যারা নিজেরা ধ্বংস হবে; কিন্তু অপরকে ভাগ্যবান করে। তারা এমন আলেম, যারা মানুষকে আখেরাতের দিকে আহ্বান করে এবং বাহ্যতঃ নিজেরাও সংসার নির্লিপ্ত; কিন্তু তাদের অন্তরে মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় হওয়া এবং জাঁকজমকের বাসনা লুক্কায়িত থাকে।
এখন তুমি নিজের ব্যাপারে চিন্তা কর, কোন্ শ্রেণীতে রয়েছ এবং কিসের উপকরণ সংগ্রহে লিপ্ত রয়েছ- দুনিয়ার না আখেরাতের? এটা মনে করো না যে, যেব্যক্তি আল্লাহর জন্যে খাঁটি নয়, আল্লাহ্ তাকে কবুল করবেন। ইনশাআল্লাহ্ আমরা রিয়া অধ্যায়ে বরং গোটা তৃতীয় খণ্ডে এমন আলোচনা করব, যাতে তুমি নিঃসন্দেহ হয়ে যাবে।

পরবর্তী পর্ব

জ্ঞান ও জ্ঞানার্জন (২১) মোনাযারা


জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ২১)
এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

মোনাযারা
জানা উচিত, একশ্রেণীর আলেম কোন কোন সময় মানুষকে এই বলে বিভ্রান্ত করে যে, তাদের মোনাযারা বা বিতর্ক করার উদ্দেশ্য এমন বিষয়ে আলোচনা, যাতে সত্য প্রস্ফুটিত হয়ে উঠে। কেননা সত্য কাম্য। চিন্তায় একে অন্যের সাহায্য করা এবং অনেক লোকের ঐকমত্য হওয়া নিঃসন্দেহে উপকারী। সাহাবায়ে কেরামও এ উদ্দেশ্যেই পরস্পর পরামর্শ করতেন। উদাহরণতঃ তাঁরা দাদা বিদ্যমান থাকলে পৌত্রদের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া, মদ্যপানের শাস্তি, ফরায়েযের মাসআলা ইত্যাদি বিষয়ে পরস্পর পরামর্শ করতেন। ইমাম শাফেয়ী, আহমদ, মুহাম্মদ, মালেক, আবু ইউসুফ (রহঃ) প্রমুখ ইমাম থেকে বর্ণিত মতভেদও এ বিষয়ে সহায়ক। আমি তোমাকে এ বিভ্রান্তির অন্তর্নিহিত রহস্য বলে দিচ্ছি, সত্য বিষয়ে একে অপরের কাছে সাহায্য চাওয়া অবশ্যই ধর্মসিদ্ধ। কিন্তু এর জন্যে কয়েকটি শর্ত ও আলামত রয়েছে।
প্রথম, মোনাযারা যেহেতু ফরযে কেফায়া। কাজেই যেব্যক্তি ফরযে আইন সমাপ্ত করেনি, তার পক্ষে এতে ব্যাপৃত হওয়া উচিত নয়। যা উপর ফরযে আইন রয়েছে, সে যদি ফরযে কেফায়ায় ব্যাপৃত হয় এবং বলে, তার উদ্দেশ্য সত্যান্বেষণ, তবে সে মিথ্যাবাদী। সে সে ব্যক্তিরই মত, যে নিজে নামায পড়ে না এবং বস্ত্র বয়নে ব্যাপৃত থেকে বলে : আমার উদ্দেশ্য যারা উলঙ্গ অবস্থায় নামায পড়ে এবং পোশাক পায় না, তাদের সতর আবৃত করা। কেননা, এরূপ হওয়া সম্ভবপর এবং বাস্তবে কখনও এরূপ হয়েও থাকে। যেমন, ফেকাহবিদগণ বলেন, তাদের বিরোধপূর্ণ বিষয়সমূহ বাস্তবে সংঘটিত হওয়া সম্ভবপর, যদিও কম সংঘটিত হয়। আজ যারা মোনাযারায় ব্যাপৃত থাকে তারা সর্বসম্মতিক্রমে ফরযে আইন বিষয়সমূহ বর্জন করে বসেছে। যদি কারও উপর তাৎক্ষণিকভাবে কোন আমানত আদায় করা ওয়াজেব হয়ে থাকে এবং সে তাতে অবহেলা করার বাহানারূপে নামায পড়তে থাকে, যা বাহ্যতঃ সর্বোত্তম সওয়াবের কাজ, তবে বলাবাহুল্য, এ নামায দ্বারা সে আল্লাহ তাআ'লার নাফরমানই হবে। এ থেকে জানা গেল, আনুগত্যের কোন কাজ করাই মানুষের আনুগত্যশীল হওয়ার জন্যে যথেষ্ট নয়, যে পর্যন্ত না তাতে সময়, শর্ত ও ধারাবাহিকতা লক্ষ্য রাখা হয় ।
দ্বিতীয় শর্ত হচ্ছে, মোনাযারা অপেক্ষা অন্য কোন ফরযে কেফায়া অধিক গুরুত্বপূর্ণ না দেখা। যদি অন্য কোন ফরযে কেফায়া অধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়, এরপরও মোনাযারায় ব্যাপৃত হয়, তবে সে নাফরমান হবে। তার দৃষ্টান্ত এমন, যেমন কোন ব্যক্তি একদল মানুষকে পিপাসায় কাতর হতে দেখে, কেউ যাদের খবর নেয় না। কিন্তু সে তাদেরকে পানি পান করাতে সক্ষম। এমতাবস্থায় সে পানি পান না করিয়ে যদি শিংগা লাগানোর কৌশল শিক্ষা করতে ব্যাপৃত হয় এবং বলে, এটা শিক্ষা করা ফরযে কেফায়া; শহরে এরূপ কুশলী ব্যক্তি না থাকলে শহরবাসীরা রোগে কষ্ট পাবে। যদি তাকে কেউ বলে, শহরে শিংগা লাগানোর লোক পর্যাপ্ত পরিমাণে বিদ্যমান আছে, তবে সে বলে, এতে এ কাজটি যে ফরযে কেফায়া, তা তো বিলুপ্ত হয় না। মোট কথা, যেব্যক্তি এরূপ করে এবং নেহায়েত জরুরী কাজটি করে না, অর্থাৎ পিপাসার্ত মুসলমানদেরকে পানি পান করায় না, তার অবস্থা এ ব্যক্তির মতই, যে মোনাযারাকে ফরযে কেফায়া মনে করে তাতে ব্যাপৃত থাকে এবং অন্য যেসব ফরযে কেফায়া কেউ পালন করে না, তাতে তৎপর হয় না।
উদাহরণতঃ ফতোয়ার কথাই বলা যাক, এর জন্যে অনেক লোক রয়েছে। প্রত্যেক শহরে কিছু না কিছু ফরযে কেফায়া পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। যেমন অধিকাংশ শহরে মুসলমান চিকিৎসক নেই, যার সাক্ষ্য চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয়াদিতে শরীয়তের আইনে গ্রাহ্য হয়। অথচ ফেকাহবিদদের মধ্যে কারও চিকিৎসা শাস্ত্রের প্রতি উৎসাহ নেই।
অনুরূপভাবে সৎকাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করা একটি ফরযে কেফায়া। যারা মোনাযারা করে, তাদের অধিকাংশই মোনাযারার মজলিসে রেশমী পোশাক অথবা রেশমী ফরাশ বিছানো দেখে। অথচ সে এমন বিষয়ে মোনাযারা করে, যার বাস্তব অস্তিত্ব নেই। যদিও থাকে, তবে তার বর্ণনাকারী থাকে অনেক। এরপরও তারা বলে, তারা ফরযে কেফায়ায় মশগুল হয়ে আল্লাহ্ তাআলার নৈকট্য কামনা করে।
হযরত আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, জনৈক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করল : সৎকাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ কখন বর্জিত হবে? তিনি বললেন : “যখন তোমাদের চেয়ে উত্তম লোকদের মধ্যে শৈথিল্য দেখা দেবে, বড়দের মধ্যে নির্লজ্জতা ও ছোটদের মধ্যে রাজত্ব চলে আসবে এবং নীচদের মধ্যে ফেকাহ্ তথা ধর্মীয় জ্ঞান।”
তৃতীয় শর্ত হচ্ছে, যে মোনাযারা করবে তার মুজতাহিদ হতে হবে। অর্থাৎ নিজের অভিমত অনুসারে ফতোয়া দেয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে। ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আযম (রঃ) প্রমুখের মযহাবের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে ফতোয়া দেবে না। এমনকি, সে যদি সত্য বিষয়টি ইমাম আযমের মযহাব থেকে জানতে পারে, তবে ইমাম শাফেয়ীর বক্তব্য বর্জন করবে এবং সত্য যা জানবে তদনুযায়ী ফতোয়া দেবে। সাহাবায়ে কেরাম ও ইমামগণ তাই করতেন। যেব্যক্তি ইজতিহাদের স্তরে উন্নীত হয়, তাকে কোন প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা হলে সে তার ইমামের উক্তি বর্ণনা করে দেয়। তার ইমামের মযহাবে কিছু দুর্বলতা জানতে পারলে সে তা বর্জন করে না। এরূপ ব্যক্তির মোনাযারায় ফায়দা নেই।
চতুর্থ শর্ত হচ্ছে, মোনাযারা এমন বিষয়ে করবে, যা হয়ে গেছে অথবা সত্বরই হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কেননা, সাহাবায়ে কেরাম এমনি ধরনের ঘটনাবলীতে পরামর্শ করেছেন, যা নতুন সংঘটিত হত অথবা প্রায়ই সংঘটিত হত। যেমন, ফরায়েযের বিষয়সমূহ। কিন্তু আজকাল যারা মোনাযারা করে, তাদেরকে এরূপ করতে দেখা যায় না। যেসব ব্যাপারে মানুষ প্রায়ই লিপ্ত হয়, সেগুলোর তথ্যানুসন্ধানে তারা প্রয়াস চালায় না; বরং এমন ব্যাপার তালাশ করে, যাতে কোন না কোন দিক দিয়ে বিবাদের অবকাশ থাকে। যেসকল ঘটনা সচরাচর ঘটে থাকে, সেগুলো প্রায়ই ছেড়ে দেয়া হয় এবং বলা হয়, এ বিষয়টি হাদীসের সাথে সম্পর্কযুক্ত অথবা এটা নিতান্ত ছোটখাট ব্যাপার। আশ্চর্যের বিষয়, উদ্দেশ্য তো সত্যানুসন্ধান, অথচ হাদীসের দোহাই দিয়ে বিষয়টি ছেড়ে দেয়া হয় অথবা ছোটখাট বিষয় বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়! সত্য বিষয়ে তো সংক্ষিপ্ত আলোচনা করে অভীষ্টে পৌছে যাওয়াই কাম্য হয়ে থাকে। দীর্ঘ আলোচনা কাম্য নয়।
পঞ্চম শর্ত, মজলিসে এবং আমীর ও শাসকদের সামনে মোনাযারা করা অপেক্ষা নির্জনতায় ও একান্তে মোনাযারা করা উত্তম মনে হতে হবে। কেননা, নির্জনতায় সাহস, চিন্তা-ভাবনা একত্রিত ও পরিষ্কার থাকে এবং সত্য বিষয় দ্রুত অনুধাবন করা যায়। পক্ষান্তরে লোকজনের সামনে নিজেকে প্রকাশ করার প্রেরণা মাথাচাড়া দিয়ে উঠে এবং প্রত্যেকেই নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপন্ন করতে উৎসাহী হয়ে যায়- সত্যপন্থী হোক বিংবা মিথ্যাপন্থী। সকলেই জানে, এখন মোনাযারাকারীরা মজলিস ও জনগণের সমাবেশেই বিতর্কে প্রবৃত্ত হতে অধিক আগ্রহী। একজন অন্যজনের সাথে বহু দিন থাকে, কিন্তু একান্তে কোন বক্তৃতা দেয় না; কিংবা একজন কিছু জিজ্ঞেস করলে অন্যজন জওয়াব দেয় না। যদি কোন আমীর ব্যক্তি উপস্থিত থাকে অথবা জনসমাগম হয়, তবে বক্তৃতার কোন দিক বাকী রাখে না, যাতে প্রমাণিত হয়, সে একজন জবরদস্ত বক্তা।
ষষ্ঠ শর্ত, সত্য বিষয়ের অন্বেষণে এমন অবস্থা হতে হবে, যেমন কেউ হারানো বস্তু অন্বেষণ করে। হারানো বস্তুটি তার হাত দিয়ে পাওয়া যাক বা অন্যের হাত দিয়ে- তাতে কোন পার্থক্য থাকে না। বিতর্কে নিজেকে প্রতিপক্ষের সাহায্যকারী মনে করতে হবে; বিপরীত ও শত্রুপক্ষ নয়। সে ভ্রান্তি প্রকাশ করে দিলে অথবা সত্য বিষয় বলে দিলে তার কাছে কৃতজ্ঞ হবে।
উদাহরণতঃ হারানো বস্তুর অন্বেষণে যদি কেউ এক পথে চলতে থাকে এবং অন্য এক ব্যক্তি তাকে অন্য সড়কে যেতে বলে, তবে সে সেই ব্যক্তিকে কৃতজ্ঞতাস্বরূপ ধন্যবাদ জানায়। তাকে মন্দ বলে না; বরং তার প্রতি খুশী হয়। সাহাবায়ে কেরামের পরামর্শের অবস্থা তাই ছিল। সেমতে এক মহিলা হযরত ওমর (রাঃ)-এর ভাষণের মধ্যে বাধা দিয়ে তাঁকে সত্য বিষয় অবগত করালে তিনি বললেন : মহিলা ঠিক বলছে এবং পুরুষ (অর্থাৎ, আমি) ভুল করেছি। অন্য এক ব্যক্তি হযরত আলী (রাঃ)-কে কিছু জিজ্ঞেস করলে তিনি তার জওয়াব দিলেন। লোকটি বলল : আমীরুল মুমিনীন, মাসআলাটি এরূপ নয়; বরং এরূপ। হযরত আলী (রাঃ) বললেন : তোমার কথাই ঠিক। আমি ভুল করেছি। প্রত্যেক জ্ঞানী ব্যক্তির উপরও জ্ঞানী রয়েছে। হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ) হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-কে সে কথা বলে দিলেন যা থেকে তিনি বিচ্যুত হয়ে পড়েছিলেন। তখন আবু মূসা বললেন : যতদিন এ আলেম তোমাদের মধ্যে রয়েছেন, ততদিন আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করো না।
ঘটনাটি এই : এক ব্যক্তি হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করল : এক ব্যক্তি আল্লাহর পথে জিহাদ করল এবং মারা গেল। তার কি অবস্থা হবে? তিনি বললেন : ‘সে জান্নাতে থাকবে।' তখন আবু মূসা (রাঃ) কূফার শাসনকর্তা ছিলেন। হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ) প্রশ্নকারীকে বললেন : আমীরকে পুনরায় জিজ্ঞেস কর। সম্ভবতঃ তিনি তোমার প্রশ্ন বুঝেননি। লোকটি পুনরায় জিজ্ঞেস কললেন। আমীর আবারও একই জওয়াব দিলেন। হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ) বললেন : আমি বলি, যদি সে মারা যায় এবং সত্যে পৌঁছে থাকে, তবে জান্নাতী হবে। হযরত আবু মূসা বললেন : আপনার কথাই ঠিক। বাস্তবে সত্যান্বেষী ব্যক্তির পক্ষে এরূপ ন্যায়সঙ্গত কথাই বলা উচিত। আজকাল এ ধরনের কথা কোন সামান্য ফেকাহবিদের কাছে কেউ বর্ণনা করলেও সে মানবে না; বরং বলবে- এ মাসআলায় সত্যে পৌঁছার কথা বলার কোন প্রয়োজন নেই । কারণ এটা সবাই জানে। মোট কথা আজকালকার মোনাযারাকারীদেরকে লক্ষ্য কর, যদি প্রতিপক্ষের মুখ দিয়ে সত্য প্রকাশ পায়, তবে তাদের মুখমণ্ডল কেমন কাল হয়ে যায়। এরপর গোপনে গোপনে যতদূর সম্ভব, এ সত্য অস্বীকার করার চেষ্টা করে। যেব্যক্তি তাদেরকে অভিযুক্ত করে, তার সারা জীবন তার নিন্দা চর্চা করতে থাকে। তার পরও মোনাযারায় নিজেদেরকে সাহাবায়ে কেরামের অনুরূপ বলতে তাদের লজ্জা করে না।
সপ্তম শর্ত, মোনাযারায় শরীক ব্যক্তি যদি এক প্রমাণ থেকে অন্য প্রমাণের দিকে যায় এবং এক আপত্তির বদলে অন্য আপত্তি পেশ করতে চায়, তবে তাকে বাধা দেয়া উচিত নয়। পূর্ববর্তী মনীষীগণের মোনাযারা এরূপই হত। বিতর্কের নবাবিষ্কৃত সূক্ষ্ম বিষয়াদি তাদের মোনাযারায় অনুপস্থিত ছিল। কেননা, সত্য বিষয়ের দিকে প্রত্যাবর্তন করা সর্বদাই মিথ্যার বিপরীত হয়ে থাকে। আর সত্য বিষয় কবুল করা ওয়াজেব।
অথচ মোনাযারার মজলিসে দেখা যায়, সারাক্ষণ একে অপরের কথা খণ্ডনে এবং বিবাদ বিসম্বাদে লিপ্ত থাকে। উদাহরণতঃ এক ব্যক্তি তার ধারণায় কোন মূল বিধানের একটি কারণ বর্ণনা করলে অন্য ব্যক্তি জওয়াব দেয় : মূল বিষয়ে এ বিধান হওয়ার কারণ এটিই, এর প্রমাণ কি? উত্তরে সে বলে : আমার তো তাই মনে হয়। তুমি যদি অন্য কোন সুস্পষ্ট কারণ জান, তবে বর্ণনা কর। আমিও ভেবে দেখব। এরপর আপত্তিকারী পীড়াপীড়ি করে বলে : কারণ অন্যটি; আমি তা জানি কিন্তু বলব না। কেননা, বলা আমার জন্যে জরুরী নয়। এরপর পীড়াপীড়ি সত্ত্বেও সে তা বর্ণনা করে না এবং মোনাযারার মজলিসে হট্টগোল হতে থাকে। আপত্তিকারী ব্যক্তি বুঝে না যে, 'আমি জানি কিন্তু বলব না'- তার একথা 'শরীয়ত বিরোধী' মিথ্যার নামান্তর। কেননা, যদি বাস্তবে কারণটি তার অজানা থাকে এবং কেবল প্রতিপক্ষকে অপারগ করে দেয়ার জন্যে জানার দাবী করে, তবে সে ফাসেক, মিথ্যাবাদী, আল্লাহ্ নাফরমান এবং তাঁর ক্রোধের পাত্র।
পক্ষান্তরে যদি সে আপন দাবীতে সত্যবাদী হয়, তবুও সে ফাসেক। কারণ, সে একটি জানা শরীয়তগত বিষয় গোপন করে। অথচ তার মুসলমান ভাই তা জেনে চিন্তাভাবনা করার জন্যে তাকে জিজ্ঞেস করছে। এটা সর্ববাদিসম্মত কথা যে, মানুষ ধর্মের যা কিছু জানে, কারও জিজ্ঞাসার পর তা বলা ও প্রকাশ করা ওয়াজেব। এখন সাহাবায়ে কেরামের পরামর্শ ও পূর্ববর্তী আলেমগণের বক্তব্য দেখে বিচার করা দরকার, তাদের মধ্যে এ ধরনের বিষয় শুনা গেছে কি? তাদের কেউ কখনও এক প্রমাণ থেকে অন্য প্রমাণে যেতে নিষেধ করেছেন কি? তারা কি কিয়াস ছেড়ে সাহাবীর উক্তি অবলম্বন করতে এবং হাদীস ছেড়ে আয়াত অবলম্বন করতে নিষেধ করেছেন? তাঁদের সকল মোনাযারা এমন হত যে, তাঁরা অন্তরে যা চিন্তা করেছেন, মুখে হুবহু তা বর্ণনা করেছেন, অতঃপর তা নিয়ে সকলে মিলে চিন্তাভাবনা করেছেন।
অষ্টম শর্ত, মোনাযারা এমন ব্যক্তির সাথে করতে হবে, যার কাছ থেকে উপকার আশা করা যায় এবং যে জ্ঞানের বিষয়ে ব্যাপৃত। আজকাল প্রায়শঃ দেখা যায়, যারা মোনাযারা করে তারা বড় বড় আলেমের সাথে মোনাযারা করতে ভয় পায়। আশংকা এই করা হয় যে, সত্য বিষয় তার মুখ দিয়ে বের হয়ে পড়লে মোনাযারাকারীর প্রকৃত অবস্থা ফাঁস হয়ে পড়বে। ফলে যারা অজ্ঞানী তাদের সাথে মোনাযারা করার উৎসাহ বেশী দেখা যায়, যাতে তাদের সামনে বাতিলকেই সপ্রমাণ করা যায়।
মোনাযারার এই আটটি শর্ত ছাড়া আরও অনেক সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম শর্ত রয়েছে, কিন্তু এই আটটি শর্ত দ্বারাই তুমি মোনাযারাকারীর প্রকৃত অবস্থা জানতে পারবে, সে আল্লাহ্ জন্যে মোনাযারা করে না অন্য কোন কারণে। সারকথা, শয়তান মানুষের অন্তরকে ঘিরে রেখেছে। বাস্তবে শয়তান হল মানুষের সর্ববৃহৎ দুশমন ও ধ্বংসকামী। যেব্যক্তি এই শয়তানের সাথে মোনাযারা করে না এবং অন্য লোকের সাথে এমন বিরোধপূর্ণ বিষয়ে মোনাযারায় প্রবৃত্ত হয়, যাতে ইজতিহাদকারী সত্য বিষয়ে পৌছে অথবা সত্য বিষয়ে পৌছার সওয়াবে অংশীদার হয়, সে শয়তানের ক্রীড়নক এবং খাঁটি লোকদের জন্যে একটি শিক্ষা।

পরববর্তী পর্ব

জ্ঞান ও জ্ঞানার্জন (২০) তর্কশাস্ত্রে মানুষের মনোযোগী হওয়ার কারণ



 জ্ঞান জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানদানের মাহাত্ম্য (পর্ব- ২০)
এহইয়াউ উলুমিদ্দিন - ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

তর্কশাস্ত্রে মানুষের মনোযোগী হওয়ার কারণ-
প্রকাশ থাকে যে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর পরে খোলাফায়ে রাশেদীন খেলাফতের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। তাঁরা ছিলেন একাধারে আলেম বিল্লাহ (আল্লাহ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞানী), তাঁর বিধি-বিধান সম্পর্কে পরিজ্ঞাত এবং বিরোধপূর্ণ বিষয়ে ফতোয়া দানের ব্যাপারে পারদর্শী। এ কারণেই ফেকাহবিদদের কাছ থেকে সাহায্য নেয়ার প্রয়োজন তাঁদের কমই হত। কেবল যেসব ব্যাপারে পরামর্শ ছাড়া উপায় ছিল না, সেগুলোতেই ফেকাহবিদদের প্রয়োজন দেখা দিত। এজন্যই আলেমগণ একনিষ্ঠভাবে আখেরাত বিষয়ক শাস্ত্রেই নিয়োজিত ছিলেন এবং তাঁদের অন্য কোন বৃত্তি ছিল না। তাঁরা আইনের খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে আলোচনা এবং এ নিয়ে বিতর্ক এড়িয়ে চলতেন এবং এ দায়িত্ব একে অপরের উপর ন্যস্ত করতেন। তাঁরা সর্বপ্রযত্নে আল্লাহ তা'আলার দিকে মনোযোগী ছিলেন। তাদের জীবনালেখ্য থেকে এ কথাই জানা যায়।

পরবর্তী পর্যায়ে এক শ্রেণীর আলেম যোগ্যতা এবং বিধি-বিধান ও ফতোয়া সম্পর্কে প্রগাঢ় জ্ঞান ছাড়াই শাসন কর্তৃত্বের বিভিন্ন দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ফলে তাদেরকে বাধ্য হয়ে ফেকাহবিদদের সাহায্য গ্রহণ করতে হয় এবং সর্বাস্থায় তাদেরকে সঙ্গে রাখার প্রয়োজন দেখা দেয়। তখন তাবেয়ী আলেমগণের মধ্যে যাঁরা অবশিষ্ট ছিলেন, তাঁরা প্রথম যুগের রীতি-নীতিতে অভ্যস্ত, খাঁটি দ্বীনের অনুসারী এবং পূর্বসূরিদের পদাংক অনুসরণকারী ছিলেন।
ফলে শাসকবর্গ তাঁদেরকে ডাকলে তাঁরা পালিয়ে ফিরতেন এবং পৃষ্ঠ প্রদর্শন করতেন। তাই বিচার বিভাগ ও শাসন বিভাগের বিভিন্ন পদ দান করার জন্যে শাসকবর্গ আলেমগণকে পীড়াপীড়ি করত। খলীফা, ইমাম ও প্রশাসন সবাই আলেমগণের তোয়াজ করতেন, কিন্তু আলেমগণ তাদের হাতে ধরা দিতেন না। সমসাময়িক লোকেরা যখন আলেমগণের এই সম্মান প্রত্যক্ষ করল, তখন তারা এলেম হাসিল করার প্রতি মনোনিবেশ করল, যাতে শাসকবর্গের কাছে সম্মান ও প্রতিপত্তি লাভ করা যায়। তারা ফতোয়া শাস্ত্রের প্রতি ঝুঁকে পড়ল এবং নিজেদেরকে শাসকবর্গের সামনে উপস্থাপন করল। তাদের সাথে পরিচিত হয়ে বিভিন্ন পদ ও পুরস্কার লাভ করল।
কিছু সংখ্যক তো এর পরেও বঞ্চিত রইল এবং কিছু সংখ্যকের উদ্দেশ্য সফল হল। যারা সফল হল, তারাও চাওয়ার লাঞ্ছনা এবং অনাহূত অবস্থায় দন্ডায়মান হওয়ার অবমাননা থেকে বাঁচতে পারল না। মোট কথা, যে ফেকাহবিদগণ পূর্বে প্রার্থিত ছিল, তারা এখন প্রার্থী হয়ে গেল। পূর্বে যারা শাসকবর্গের হাতে ধরা দিত না এবং সম্মানিত ছিল, এখন তাদের কাছে এসে তারা লাঞ্ছিত হন। কিন্তু এর পরেও যেসব আলেম তওফীকপ্রাপ্ত হলেন, তাঁরা সর্বদাই এই লাঞ্ছনা থেকে মুক্ত রইলেন। সে যুগে মানুষের অধিকাংশ মনোযোগ ফতোয়া ও বিচার বিভাগের সাথে সংশ্লিষ্ট শাস্ত্রের প্রতি নিবদ্ধ ছিল। কেননা, পদ ও শাসনক্ষমতা লাভে এরই প্রয়োজন ছিল বেশী। তাদের পরে আকায়েদের রীতিনীতি সম্পর্কে মানুষের আলোচনা শুনে কিছু সংখ্যক শাসকের মনে কারণসমূহের প্রমাণাদি শুনার আগ্রহ সৃষ্টি হল। জনসাধারণ যখন জানতে পারল, এই শাসকগণ কালাম শাস্ত্রের মোনাযারা ও বিতর্কের প্রতি আগ্রহী, তখন তারা এরই চর্চা শুরু করে দিল। এতে অনেক গ্রন্থ রচিত হল এবং বিতর্কের পদ্ধতি, প্রতিপক্ষের বক্তব্যে আপত্তি উত্থাপনের পন্থা আবিষ্কৃত হল। তারা মনে করল, আল্লাহর দ্বীনের পক্ষ থেকে মন্দ বিষয়সমূহ প্রতিহত করা, সুন্নতের পক্ষ থেকে লড়াই করা এবং বেদআতের মূলোৎপাটন করাই আমাদের লক্ষ্য। যেমন- তাদের পূর্বসূরি ফেকাহবিদগণ বলতেন, তাদের উদ্দেশ্য ফতোয়া উত্তমরূপে জানা এবং মুসলমানদের প্রয়োজনীয় বিধি-বিধানের দায়িত্ব নেয়া।
এর কিছুকাল পরে এমন শাসকশ্রেণী আগমন করল, যারা কালাম শাস্ত্রের গবেষণা পছন্দের দৃষ্টিতে দেখল না। কারণ, এতে বিতর্কের দ্বার খুলে যাওয়ায় পারস্পরিক বিদ্বেষ ও কলহ সৃষ্টি হয়। এমনকি, খুনাখুনি এবং জনপদ পর্যন্ত ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু তারা ফেকাহ সম্পর্কিত মোনাযারা, বিশেষতঃ ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আযম (রহঃ)-এর মাযহাবের উত্তম বিধান জানার প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করে। সেমতে জনসাধারণ কালাম শাস্ত্র ও অন্যান্য শাস্ত্র বাদ দিয়ে এই ইমামদ্বয়ের মধ্যে বিরোধীয় মাসআলাসমূহের প্রতি ঝুঁকে পড়ে।
ইমাম মালেক, আহমদ ও সুফিয়ান সওরী (রহঃ)-এর মধ্যেকার মতভেদসমূহের প্রতি তারা তেমন কঠোর মনোভাব প্রদর্শন করেনি। তারা নিজেদের খামখেয়ালীতে একথা বুঝে নেয় যে, তাদের উদ্দেশ্য শরীয়তের সূক্ষ্ম বিষয়াদি বের করা, দ্বীনের কারণসমূহ সপ্রমাণ করা এবং ফতোয়ার মূলনীতির ভিত্তি স্থাপন করা। এ সম্পর্কে তারা অনেক গ্রন্থ রচনা করে, যাতে নানারকম বিতর্ক লিপিবদ্ধ করা হয়। জনসাধারণ এখন পর্যন্ত এ নীতিই অনুসরণ করে আসছে। জানি না, আমাদের পরবর্তী যমানায় আল্লাহ তা'আলা কি অবধারিত করে রেখেছেন। মোট কথা, মতভেদ ও মোনাযারার প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার এটাই ছিল কারণ। যদি শাসকশ্রেণী এগুলো ছাড়া অন্য কোন শাস্ত্রের প্রতি আগ্রহী হয়ে যায়, তবে আলেমরাও তাদের অনুগামী হবে এবং এ বাহানা পেশ করা থেকে বিরত হবে না যে, যে শাস্ত্রে তারা মশগুল রয়েছে সেটা ধর্মীয় শাস্ত্র এবং আল্লাহ তাআ'লার নৈকট্য ছাড়া তাদের অন্য কিছু কাম্য নয়।

পরবর্তী পর্ব

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...