রবিবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০২৩

হকদারের হক (৮) সাধারণ মুসলমানের প্রতি কর্তব্য


হকদারের হক পর্ব- ৮
📚সৌভাগ্যের পরশমণি   ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

সাধারণ মুসলমানের প্রতি কর্তব্য
(১) প্রথম কর্তব্য : নিজের নিকট যাহা অপছন্দনীয় তাহা অপর মুসলমানের জন্যও পছন্দ না করা। রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন :
"সমগ্র মুসলমান একটি মানব-দেহস্বরূপ। ইহার (দেহের) একটি অঙ্গ ব্যথা পাইলে সমস্ত অঙ্গ ইহা অনুভব করে এবং সমস্ত অঙ্গই ব্যথিত হইয়া থাকে।" তিনি অন্যত্র বলেন:
"যে ব্যক্তি দোযখ হইতে রক্ষা পাইতে চাহে সে যেন কালেমা শাহাদাতের উপর (বিশ্বাস রাখিয়া) মৃত্যুরবণ করে এবং নিজে যেরূপ ব্যবহার অন্যের নিকট হইতে পছন্দ করে না তদ্রুপ ব্যবহার যেন সে নিজে অপরের সহিত না করে।"
হযরত মূসা (আ) আল্লাহর নিকট জিজ্ঞাসা করিলেনঃ ইয়া আল্লাহ্ ! আপনার বান্দাগণের মধ্যে বড় সুবিচারক কে? উত্তর হইল : যে ব্যক্তি স্বয়ং নিজের উপর সুবিচার করে।

(২) দ্বিতীয় কর্তব্য : হস্ত ও রসনা দ্বারা অপর মুসলমানকে কষ্ট না দেওয়া। রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞাসা করিলেনঃ হে লোকগণ ! মুসলমান কে, তোমরা জান কি? তাঁহারা উত্তর করিলেনঃ আল্লাহ্ ও আল্লাহর রাসূল উত্তম জানেন। তিনি বলিলেন :
"সেই ব্যক্তি মুসলমান যাহার হস্ত ও রসনা হইতে অপর মুসলমান নিরাপদে থাকে।" লোকে নিবেদন করিল : ইয়া রাসূলুল্লাহ্ ! কোন্ ব্যক্তি মুমিন? তিনি বলিলেনঃ
"সেই ব্যক্তি মু'মিন যাহা হইতে অন্যান্য মু'মিন নিজেদের প্রাণ ও ধন সম্বন্ধে নিশ্চিত থাকিতে পারে।" তাঁহারা আবার নিবেদন করিল : মুহাজির কে? তিনি বলিলেনঃ
"সেই ব্যক্তি মুহাজির যে মন্দ কার্য পরিত্যাগ করিয়াছে।" রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন :
"কোন মুসলমানের জন্য স্বীয় চক্ষু দ্বারা এমনভাবে ইশারা করা দুরস্ত নহে, যাহাতে অপর মুসলমান ব্যথা পায় এবং এমন কোন কার্য করাও দুরস্ত নহে যাহার কারণে অপর মুসলমান চিন্তান্বিত ও ভীত হয়।"
হযরত মুজাহিদ (রাঃ) বলেন যে, দোযখীদিগকে আল্লাহ্ পাঁচড়া রোগে আক্রান্ত করিবেন। তাহারা এত চুলকাইবে যে (তাহাদের মাংস খসিয়া) হাড় বাহির হইয়া পড়িবে। তখন আহ্বানকারী ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিবে : পরিশ্রম ও কষ্ট কিরূপ হইতেছে? তাহারা উত্তর দিবে : অত্যন্ত কঠিন ও ভীষণ। তখন তাহাদিগকে বলা হইবে : তোমরা দুনিয়াতে মুসলমানদিগকে কষ্ট দিতে এই কারণেই তোমাদের এই শাস্তি। রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : আমি বেহেশতে এক ব্যক্তিকে যেদিকে ইচ্ছা সেদিকে বিচরণ করিতে দেখিলাম।এই আমোদ-প্রমোদের অধিকার তাহার এই কারণে ভাগ্যে ঘটিয়াছে যে, যেন কাহারও কষ্ট না হয় এইজন্য সে রাস্তা হইতে একটি বৃক্ষ কাটিয়া ফেলিয়াছিল।
(৩) তৃতীয়ত কর্তব্যঃ কাহারও সহিত অহংকার না করা। কারণ অহংকারকারিগণকে আল্লাহ্ পছন্দ করেন না। রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : বিনয়ী হওয়ার জন্য আমার প্রতি ওহী অবতীর্ণ হইয়াছে যেন কেহই কাহারও উপর অহংকার না করে। এই জন্য রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বিধবাগণ ও মিসকীনদের নিকট গমন করিতেন এবং তাহাদের অভাব পূরণ করিতেন।
ফলকথা, কাহারও প্রতি অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখা উচিত নহে। সম্ভবতঃ সে ব্যক্তি আল্লাহর একজন প্রিয়পাত্র। কিন্তু তুমি তাহা জান না। আল্লাহ্ তাহার অনেক প্রিয়পাত্রকে গোপন রাখিয়াছেন যেন লোকজন তাঁহাদের সহিত মেলামেশা করিতে না পারে।
(৪) চতুর্থ কর্তব্য : কোন মুসলমান সম্বন্ধে পরোক্ষ নিন্দুকের কথায় কর্ণপাত না করা। কারণ সৎলোকের কথা শ্রবণ করা উচিত। পরোক্ষ নিন্দাকারী ফাসিক। হাদীস শরীফে আছে যে, কোন পরোক্ষ নিন্দাকারী বেহেশতে প্রবেশ করিবে না।
যে ব্যক্তি তোমার সম্মুখে অপরের নিন্দা করে, সে অপর লোকের নিকট তোমারও দুর্ণাম করিবে। পরোক্ষ নিন্দুক হইতে দূরে থাকিবে এবং তাহাকে মিথ্যাবাদী বলিয়া জ্ঞান করিবে।
(৫) পঞ্চম কর্তব্য : তিনদিনের অধিক কোন প্রিয়জনের সহিত কথাবার্তা বন্ধ না রাখা। কারণ রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন যে,
"তিনদিনের অধিক কোন মুসলমান ভ্রাতার সহিত কথাবার্তা বন্ধ রাখা দুরস্ত নহে। তাহাদের মধ্যে যে ব্যক্তি প্রথমে সালাম দেয় সে ব্যক্তিই উত্তম।" হযরত ইক্রামা (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ্ হযরত ইউসুফ (আঃ) কে বলেন : "আমি তোমার নাম ও মর্যাদা এই জন্য বৃদ্ধি করিয়াছি যে, তুমি তোমার ভাইদের অপরাধ ক্ষমা করিয়া দিয়াছ।" হাদীস শরীফে আরও বর্ণিত আছে :
"তুমি তোমার মুসলমান ভ্রাতার অপরাধ ক্ষমা করিলে আল্লাহ্ তোমার মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি করিবেন।"
(৬) ষষ্ঠ কর্তব্য : সৎ-অসৎ সকলের সহিত সদ্ব্যবহার করা ও তাহাদের উপকার করা। হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে "যাহার সহিত সম্ভব হয় সদ্ব্যবহার ও মঙ্গল কর, যদিও সে উহার উপযোগী নহে। কিন্তু তুমি উহা করার উপযোগী।" হাদীস শরীফে আরও বর্ণিত আছে :
"ঈমানের পরই সৃষ্টের সহিত সৌহার্দ্য স্থাপন করা এবং সৎ-অসৎ নির্বিশেষে সকলের মঙ্গল সাধন করা আসল বুদ্ধিমত্তার কাজ।"
হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন যে, কোন ব্যক্তি কথা-বার্তা বলার উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর হস্ত ধারণ করিলে সে ব্যক্তি নিজে হাত ছাড়িবার পূর্বে তিনি তাহার হস্ত ছাড়িতেন না এবং কেহ রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর সহিত আলাপ করিলে তিনি সম্পূর্ণরূপে তাহার দিকে মনোনিবেশ করিতেন ও কথা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি ধৈর্য ধারণ করিয়া থাকিতেন।
(৭) সপ্তম কর্তব্য : বয়োজ্যেষ্ঠগণকে সম্মান ও কনিষ্ঠগণকে স্নেহ করা। রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ
"যে ব্যক্তি বয়োজ্যেষ্ঠগণকে সম্মান করে না এবং কনিষ্ঠদিগকে দয়া ও স্নেহ করে না সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নহে। কারণ, শুভ্র কেশের প্রতি সম্মান আল্লাহ্ প্রতি সম্মান।" তিনি আরও বলেনঃ
"যে যুবক বয়োজ্যেষ্ঠগণের সম্মান করে, আল্লাহ্ সে যুবকগণকে তাহার বার্ধক্যের সময় তাহাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের তওফীক প্রদান করিবেন।" ইহা দীর্ঘায়ুর শুভ সংবাদ। বয়োজ্যেষ্ঠগণের প্রতি যুবকের সম্মান প্রদর্শন প্রমাণ করে যে, সে যুবকও দীর্ঘায়ু লাভ করিবে এবং বয়োজ্যেষ্ঠগণের প্রতি সে যে সম্মান প্রদর্শন করিত, উহার উত্তম বিনিময় পাইবে। রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) সফর হইতে ফিরিয়া আসিলে সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) তাহাদের অল্প বয়স্ক ছেলেদিগকে লইয়া তাঁহার খিদমতে হাজির হইতেন। তিনি বালকদিগকে স্বীয় বাহনের উপর উঠাইয়া কাহাকেও সম্মুখে বসাইতেন, কাহাকেও পিছনে বসাইতেন। সম্মুখের বালক গর্ব করিয়া বলিতঃ দেখ, রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে সম্মুখে বসাইয়াছেন এবং তোমাকে পশ্চাতে বসাইয়াছেন। নামকরণ ও দু'আর জন্য একটি শিশু ছেলেকে রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর খেদমতে হাজির করা হইল। তিনি শিশুটিকে কোলে তুলিয়া লইলেন। এরূপ স্থলে যদি কোন শিশু তাহার পবিত্র ক্রোড়ে পেশাব করিতে আরম্ভ করিত, তখন লোকে শোরগোল করিয়া শিশুটিকে তাহার কোল হইতে উঠাইয়া লইতে চাহিলে তিনি তাহাকে বাধা দিয়া বলিতেনঃ তাঁহাকে এই অবস্থায় থাকিয়া পেশাব করিতে দাও। তাহার পেশাব বন্ধ করিও না। শিশুর অভিভাবকের সম্মুখে তিনি সেই পেশাবযুক্ত কাপড় ধৌত করিতেন না। কারণ, হয়ত সে মনে কষ্ট পাইতে পারে। লোকটি বাহির হইয়া গেলে তিনি উহা ধুইয়া লইতেন। শিশু ছেলে দুগ্ধপোষ্য হইলে তাহার পেশাবযুক্ত বস্ত্র তিনি হালকাভাবে ধৌত করিতেন।
(৮) অষ্টম কর্তব্য : সকল মুসলমানের সহিত প্রফুল্ল বদনে সাক্ষাত করা এবং তাহাদের সহিত প্রফুল্ল থাকা। রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ
"আল্লাহ্ প্রফুল্লবদন ও সরলচিত্ত ব্যক্তিকে ভালবাসেন।" তিনি আরও বলেন : "যে নেক কার্যের দরুন পাপ মার্জনা করা হয় উহা সরল ব্যবহার, প্রফুল্লবদন ও মিষ্ট ভাষণ।"
হযরত আনাস (রা) বলেন যে, এক গরীব স্ত্রীলোক রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর পথরোধ করিয়া দাঁড়াইয়া নিবেদন করিলঃ আপনার খেদমতে আমার কিছু বলিবার আছে। হুযূর বলিলেনঃ এই গলির মধ্যে যেখানে ইচ্ছা বসিয়া পড়, আমিও বসিব। স্ত্রীলোকটি একস্থানে বসিল, হুযুরও বসিলেন। তাহার সকল বক্তব্য শেষ না করা পর্যন্ত তিনি তথায় বসিয়া রহিলেন।

(৯) নবম কর্তব্য : কোন মুসলমানের সহিত প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ না করা। হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে,
"তিনটি দোষ যাহার মধ্যে আছে সে ব্যক্তি যদিও নামায পড়ে এবং রোযা রাখে তথাপি সে মুনাফিক। তিনটি দোষ এই (১) মিথ্যা বলা, (২) প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করা এবং (৩) আমানত খেয়ানত করা।"

(১০) দশম কর্তব্য : প্রত্যেককে তাহার পদমর্যাদা অনুযায়ী সম্মান করা। যে ব্যক্তি সমাজে সম্মানিত তাহাকে যথেষ্ট সম্মান করিবে। কোন ব্যক্তিকে আড়ম্বরপূর্ণ পরিচ্ছদে অশ্বে আরোহিত এবং পরিপাটিপূর্ণ অবস্থায় দেখিলে বুঝিতে হইবে, তিনি একজন উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি। হযরত আয়েশা (রাঃ) এক সফরে আহারে বসিয়াছেন। এমন সময় এক ফকীর আসিয়া উপস্থিত হইলে তিনি বলিলেন : তাহাকে একটি রুটি দিয়া দাও। কিন্তু তখনই এক অশ্বারোহী আসিয়া উপস্থিত হইলে তাঁহাকে ডাকিয়া বসাইতে বলিলেন। উপস্থিত লোকগণ বলিলেন : আপনি ফকীরকে ত্যাগ করিয়া আমীরকে ডাকিয়া আনিলেন! হযরত আয়েশা (রা) বলিলেন : আল্লাহ্ প্রত্যেককে ভিন্ন ভিন্ন মর্যাদা দান করিয়াছেন। সেই মর্যাদার প্রাপ্য হক পালনের প্রতি আমাদের লক্ষ্য রাখা উচিত। ফকীর এক রুটিতেই সন্তুষ্ট হইয়া থাকে, আমীরের সহিত এইরূপ আচরণ সমীচীন নহে। তাঁহার সহিত এইরূপ ব্যবহার করিতে হইবে যাহাতে তিনি সন্তুষ্ট হন। হাদীস শরীফে আছে :
"কোন সম্প্রদায়ের সম্মানিত ব্যক্তি তোমার নিকট আগমন করিলে তাঁহার সম্মান কর।"
রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর দরবার শরীফে কোন সম্মানী ব্যক্তি আগমন করিলে তিনি তাঁহাদিগকে নিজের পবিত্র চাদর পাতিয়া বসাইতেন। তাঁহার বৃদ্ধা দুধ মাতা একদা তাঁহার নিকট আগমন করিলে তিনি তাঁহাকে নিজের চাদর বিছাইয়া বসিতে দিলেন এবং বলিলেন : মারহাবা, মাতা : আপনার যাহা ইচ্ছা বলুন, আমি প্রদান করিব। তৎপর গনীমতের মালের যে অংশ তিনি পাইয়াছিলেন তাহা সম্পূর্ণ তাঁহাকে প্রদান করিলেন। পুণ্যশীলা ভাগ্যবতী মহিলা উহা হযরত উসমান (রাঃ)-র নিকট এক লক্ষ দিরহাম মূল্যে বিক্রয় করিয়া ফেলিলেন।
(১১) একাদশ কর্তব্য : মুসলমানদের মধ্যে পরস্পর বিবাদ-মীমাংসা করিয়া দেওয়ার চেষ্টা করা। রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ কোন কার্য রোযা, নামায ও সাদৃকা হইতে উত্তম, আমি তোমাদিগকে বলিয়া দিব কি ? লোকেরা নিবেদন করিল: অনুগ্রহপূর্বক বলুন। তিনি বলিলেন :
"মুসলমানদের মধ্যে (পরস্পর ঝগড়া-বিবাদ হইলে) মীমাংসা করিয়া দেওয়া।" হযরত আনাস (রা) বলেন যে, একদা রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বসিয়া নিজে নিজে হাসিতে ছিলেন। হযরত উমর (রা) তখন নিবেদন করিলেন : আমার পিতামাতা আপনার প্রতি উৎসর্গ হউক, হুযূরের হাসিবার কারণ জানিতে পারি কি ? হুযূর বলিলেন
"কিয়ামত দিবস আমার উম্মতের মধ্য হইতে দুই ব্যক্তি মহাপ্রতাপশালী আল্লাহ্ তা'আলার সম্মুখে নতজানু হইয়া থাকিবে। তাহাদের একজন বলিবে : ইয়া আল্লাহ্! এই ব্যক্তি আমার উপর অত্যাচার করিয়াছে; ইহার বিচার করুন। বিবাদীকে আল্লাহ্ বলিলেন : তাহার প্রাপ্য দিয়া দাও। সে (বিবাদী) নিবেদন করিবেঃ ইয়া আল্লাহ! আমার সমস্ত পূণ্য তো অন্য দাবীদারগণ লইয়া গিয়াছে। আমার নিকট এখন কিছু নাই। বাদীকে আল্লাহ্ বলিবেন : এখন তুমি কি করিবে? তাহার নিকট তো কোন নেকী নাই। বাদী বলিবে : আমার গুনাহ্ তাহাকে অর্পণ করুন। তখন বাদীর গুনাহ্ বিবাদীর মাথায় চাপাইয়া দেওয়া হইবে। কিন্তু ইহাতেও বাদীর প্রাপ্য আদায় হইবে না। এতটুকু বলিয়া রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) রোদন করিলেন এবং বলিলেন : ইহাই একটি ভীষণ দিন, যখন প্রত্যেকে স্বীয় পাপের বোঝা দূরে সরাইতে চাহিবে (অতঃপর পূর্বের কথা আরম্ভ করিয়া হুযূর বলিলেন) : সেই সময় পরম করুণাময় আল্লাহ্ বলিবেন : মস্তক উত্তোলন কর; বলত তুমি কি দেখিতেছ? সে নিবেদন করিবে : ইয়া আল্লাহ! রৌপ্যনির্মিত নগর দেখিতেছি। ইহাতে মহামূল্য রত্ন ও মণিমুক্তা খচিত স্বর্ণের প্রাসাদসমূহ দৃষ্টিগোচর হইতেছে। (ইয়া আল্লাহ্) কোন নবী, শহীদ কিংবা সিদ্দীক কি ইহার অধিকারী? আল্লাহ্ বলিবেনঃ যে ব্যক্তি ইহার মূল্য দিবে সেই ইহার মালিক হইবে। বাদী নিবেদন করিবে। : হে বিশ্বপ্রভু! ইহার মূল্য কাহারও পক্ষে দেওয়া সম্ভব? আল্লাহ্ বলিবেন : তুমি দিতে পার। বাদী বলিবে : ইয়া আল্লাহ্! কিরূপে দিতে পারি? উত্তর হইবে : তুমি তোমার এই ভ্রাতার অপরাধ ক্ষমা করিয়া দিলে ইহার মূল্য দেওয়া হইল। বাদী (আনন্দে আত্মহারা হইয়া নিবেদন করিবে : হে করুণাময়! আমি তাহার অপরাধ ক্ষমা করিয়া দিলাম। তখন আদেশ হইবে : উঠ ও তাহার হস্ত ধারণ কর এবং তোমরা উভয়ে বেহেশতে চলিয়া যাও। এতটুকু বলিয়া রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : আল্লাহ্‌কে ভয় কর এবং মানুষের মধ্যে পরস্পর সন্ধি করিয়া দাও। কারণ, আল্লাহ কিয়ামত দিবস মুসলমানদের মধ্যে সন্ধি করিয়া দিবেন।
(১২) দ্বাদশ কর্তব্য : মুসলমানের সকল ত্রুটি ও গোপনীয় দোষ গোপন রাখা। কারণ, হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, যে ব্যক্তি এই জগতে মুসলমানগণের দোষ-ত্রুটি গোপন রাখিবে, কিয়ামত দিবস আল্লাহ্ তাহার গুনাগুলি গোপন রাখিবেন। হযরত আবূবকর (রাঃ) বলেন : আমি যখন কাহাকেও গ্রেফতার করি, সে চোরই হউক কিংবা শরাব-খোরই হউক, তখন আমি এই আশা পোষণ করিয়া থাকি যে, আল্লাহ্ যেন তাহার অশ্লীল পাপ গোপন রাখেন।
রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন :
"হে লোকগণ! তোমরা কেবল মুখে কালেমা পড়িয়াছ : এখনও তোমাদের অন্তরে ঈমান আসে নাই। লোকদের গীবত (পরোক্ষ নিন্দা) করিও না, তাহাদের গোপনীয় দোষ-ত্রুটি অনুসন্ধান করিও না। যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের দোষ-ত্রুটি ব্যক্ত করে, আল্লাহ্ তাহার দোষ-ত্রুটি ব্যক্ত করিয়া দেন যাহাতে সে অপদস্ত হয়, যদিও তাহার গৃহে হউক।"
হযরত ইব্‌ন মাসউদ (রা) বলেনঃ আমার স্মরণ আছে, যখন সর্বপ্রথম লোকে এক ব্যক্তিকে চুরি কার্যে গ্রেফতার করিয়া তাহার হাত কাটিবার জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট আনয়ন করিল, তখন হুযূরের নূরানী চেহারার বর্ণ পরিবর্তিত হয়ে গেল। লোকে জিজ্ঞাসা করিল : ইয়া রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)! আপনি এই কার্যে অসন্তুষ্ট হইয়াছেন? হুযুর বলিলেনঃ কেন হইব না? আপন ভ্রাতার সহিত শত্রুতা সাধনে আমি শয়তানের সাহায্যকারী কেন হইব? তোমরা যদি চাহ যে, আল্লাহ্ তোমাদিগকে ক্ষমা করেন ও তোমাদের গুনাহ্ গোপন রাখেন এবং মার্জনা করেন তবে তোমরাও লোকের গুনাহ গোপন রাখ। কারণ, বিচারকের সম্মুখে অপরাধী পৌছিলে যথাবিহিত দণ্ডবিধান ব্যতীত উপায়ান্তর থাকিবে না। হযরত উমর (রাঃ) এক রজনীতে নগরের অবস্থা পরিদর্শনের জন্য বাহির হইলেন, এমন সময় তিনি এক গৃহ হইতে গানের আওয়াজ শুনিতে পাইলেন। তৎক্ষণাৎ তিনি ছাদের উপর দিয়া গৃহে প্রবেশ করতঃ দেখিত পাইলেন, জনৈক পুরুষ এক কূলটা রমণীর সহিত মদ্য পান করিতেছে। তখন তিনি বলিলেন হে আল্লাহর দুশমন! তুমি ধারণা করিয়াছিলে তোমার এই পাপ আল্লাহ্ গোপন রাখিবেন। তখন সে ব্যক্তি নিবেদন করিল : হে আমীরুল মু'মিনীন! তাড়াতাড়ি করিবেন না। আমি যদি একটি পাপ করিয়া থাকি, আপনি কিন্তু তিনটি পাপ করিলেন । আল্লাহ্ বলেন :
“তোমরা পরস্পর দোষ অনুসন্ধান করিয়া বেড়াইও না”। আপনি অপরের দোষ অনুসন্ধান করিয়াছেন। আল্লাহ্ বলেন-“তোমরা গৃহের দ্বার দিয়া গৃহে প্রবেশ কর”। কিন্তু আমার গৃহের কপাট বন্ধ দেখিয়া আপনি ছাদের উপর দিয়া গৃহে প্রবেশ করিয়াছেন। আল্লাহ্ বলেন, "যতক্ষণ পর্যন্ত গৃহস্বামীর অনুমতি না পাও এবং গৃহের অধিবাসীদিগকে সালাম না কর ততক্ষণ তোমার নিজ গৃহ ভিন্ন অপরের গৃহে প্রবেশ করিও না"। অথচ আপনি বিনা অনুমতিতে আমার গৃহে প্রবেশ করিয়াছেন এবং সালামও দেন নাই। হযরত উমর (রাঃ) বলিলেন : আমি ক্ষমা করিলে তুমি তওবা করিবে কি? সে নিবেদন করিল : হ্যাঁ, তওবা করিব এবং আর কখনও এমন কাজের নিকটবর্তী হইব না। তিনি ক্ষমা করিলেন এবং সে তওবা করিল।
রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন :
"যে ব্যক্তি কান পাতিয়া কাহারও এমন কথা শ্রবণ করে যাহা তাহাকে ব্যতীত (অপরের নিকট) বলা হইতেছে, কিয়ামত দিবস সীসা গলাইয়া তাহার কানে ঢালিয়া দেওয়া হইবে"।
(১৩) ত্রয়োদশ কর্তব্য : মিথ্যা অপবাদের স্থান হইতে দূরে থাকা যেন মুসলমানের অন্তর তোমার প্রতি মন্দ ধারণা পোষণ করা হইতে এবং তাহাদের রসনা তোমার দোষ রটনা হইতে রক্ষা পায়। কেননা, যে ব্যক্তি কোন পাপের কারণ হয় সে সেই পাপের অংশীদার হইয়া পড়ে।
রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: যে ব্যক্তি স্বীয় মাতাপিতাকে গালি দেয়, সে কেমন? লোকে নিবেদন করিল : ইয়া রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)! এমন কাজ কে করিবে, যে নিজের মাতাপিতাকে গালি দিবে? হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন :
"যে ব্যক্তি অপর কাহারও মাতাপিতাকে গালি দেয় এবং তদুত্তরে সেই ব্যক্তি তাহার মাতাপিতাকে গালি দেয়, তবে সে যেন নিজের মাতাপিতাকেই গালি দিল।"
হযরত উমর (রা) বলেন যে, যে স্থানে বসিলে লোকে দোষারোপ করিতে পারে এমন স্থানে বসিলে যদি তোমার প্রতি কেহ মন্দ ধারণা পোষণ করে তবে তাহাকে তিরস্কার করা তোমার জন্য দুরস্ত নহে।
কোন এক রমযান মাসের শেষভাগে একদা রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) উম্মুল মু'মিনীন হযরত সুফিয়া (রা) সহিত মসজিদে আলাপ করিতেছিলেন। এমন সময় তথায় একজন লোক আসিয়া পড়িল। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) লোকটিকে ডাকিয়া বলিলেনঃ তিনি আমার স্ত্রী। হযরত সুফিয়া (রাঃ) নিবেদন করিলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)! লোকে অপরের প্রতি মন্দ ধারণা পোষণ করিতে পারে; কিন্তু আপনার প্রতি (মন্দ ধারণা পোষণ) করিতে পারে না। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেনঃ শয়তান মানবদেহে এমনভাবে চলাফেরা করিতে পারে যেমন শিরা-উপশিরার রক্ত চলাচল করিয়া থাকে।
হযরত উমর (রা) জনৈকা স্ত্রীলোকের সহিত এক পুরুষকে পথিমধ্যে আলাপ করিতে দেখিয়া তাহাকে দুররা মারিলেন। লোকটি নিবেদন করিলঃ ইয়া আমীরুল মু'মিনীন! এই মহিলা আমার স্ত্রী। হযরত উমর (রা) বলিলেন : তবে তুমি এমন স্থানে কেন আলাপ করিতেছ না যেখানে কেহ দেখিতে না পায়?
(১৪) চতুর্দশ কর্তব্য : পদমর্যাদাশীল ও ক্ষমতাবান হইলে অপরের জন্য সুপারিশ করিতে দ্বিধা না করা।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাহাবায়ে কিরাম (রা)-কে সম্বোধন করিয়া বলেন : তোমাদের কেহ আমার নিকট কিছু প্রার্থনা করিলে আমার ইচ্ছা হয় তৎক্ষণাৎ দিয়া দেই। কিন্তু এইজন্য বিলম্ব করিয়া থাকি যে, তোমাদের মধ্যে কেহ তজ্জন্য সুপারিশ করিয়া উহার বিনিময় প্রাপ্ত হও। অতএব তোমরা সুপারিশ কর এবং সওয়াব অর্জন কর। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলেন :
"কোন সদকা মৌখিক সদকা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট নহে। নিবেদন করা হইল : ইয়া রাসূলুল্লাহ! মৌখিক সদকা কি? হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন : সেই সুপারিশ যাহা কাহারও প্রাণরক্ষা করে, কাহারও উপকার করে অথবা কাহাকেও কষ্ট হইতে রক্ষা করে।
(১৫) পঞ্চদশ কর্তব্য : কোন মুসলমানের অনুপস্থিতিতে কেহ তাহাকে গালি দিতে আরম্ভ করিলে এবং তাহার ধন-সম্পত্তি কিংবা মান-সম্ভ্রম নষ্ট করিতে উদ্যত হইলে তাহার স্থলবর্তী হইয়া তাহার পক্ষ হইতে প্রতিউত্তর প্রদান করা ও তাহাকে অত্যাচার-উৎপীড়ন হইতে রক্ষা করা।
রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : যে স্থানে কেহ কোন মুসলমানকে গালি দেয় এবং তাহকে অপমান করিবার প্রয়াস পায় সেখানে যে ব্যক্তি উক্ত মুসলমানের সাহায্য করিবে আল্লাহ্ উক্ত সাহায্যকারীকে এমন স্থানে সাহায্য করিবেন, যেখানে সে সাহায্যের জন্য একান্তভাবে মুখাপেক্ষী হইবে। আর কেহ কোন মুসলমানকে অপমান করিতে উদ্যত হইলে যে মুসলমান তাহার সাহায্য করে না আল্লাহ্ এইরূপ ব্যক্তিকে এমন স্থানে অপমানিত ও ধ্বংস করিবেন যে স্থানে সাহায্যের জন্য সে নিতান্ত প্রত্যাশী হইয়া থাকিবে।
(১৬) ষোড়শ কর্তব্য : ঘটনাচক্রে কোন অসৎ লোকের সংসর্গে আবদ্ধ হইয়া পড়িলে অব্যাহতি হওয়া না পর্যন্ত তাহার সহিত শিষ্টাচার রক্ষা করিয়া চলা এবং সামনাসামনি তাহার সহিত কঠোর ও কর্কশ ব্যবহার না করা।হযরত ইব্‌ন আব্বাস (রা) "তাহারা ভাল দ্বারা মন্দের প্রতিশোধ করিয়া থাকে।” আয়াতের তফসীরে সালাম ও ভদ্র ব্যবহার দ্বারা অসত্যের প্রতিদান দেওয়াকে বুঝাইয়াছেন। হযরত আয়েশা (রা) বলেন : এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর দরবার শরীফে হাযির হওয়ার অনুমতি চাহিল। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেনঃ তাহাকে অনুমতি দাও। আর এই লোকটি তাহার কওমের মধ্যে অত্যন্ত অসৎ। সেই ব্যক্তি দরবারে আগমন করিলে হুযূর (সা) তাহার সহিত এমন ব্যবহার করিলেন যাহাতে তাহাকে হুযূরের নিকট খুব মর্যাদাবান বলিয়া আমার মনে হইল। লোকটি বাহির হইয়া গেলে আমি নিবেদন করিলাম : ইয়া রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)! আপনি অসৎ লোকটিকে অসৎ বলিয়াও বর্ণনা করিলেন, আবার তাহার এত খাতিরও করিলেন। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন : হে আয়েশা (রা)! কিয়ামত দিবস সেই ব্যক্তি আল্লাহর নিকট সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট হইবে যাহার ক্ষতির আশংকায় লোকে তাহাকে খাতির করিয়া থাকে।
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, অশ্লীলভাষী লোকদের কটুবাক্য হইতে নিজের মান-সম্ভ্রম রক্ষার জন্য ব্যয় করা হয় তাহা সকার মধ্যে গণ্য। হযরত আবূ দারদা (রা) বলেন : এমন অনেক লোক আছে যাহাদের সম্মুখে আমরা প্রফুল্ল বদনে থাকি। কিন্তু আমাদের অন্তর তাহাদিগকে লানত করিতে থাকে।
(১৭) সপ্তদশ কর্তব্য : দরিদ্রগণের সহিত সঙ্গদান করা ও তাহাদের সহিত বন্ধুত্ব রাখা এবং আমীরদের সহিত সংসর্গ পরিত্যাগ করা।
রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : মৃতদের নিকটে বসিও না। সাহাবায়ে কিরাম (রা) নিবেদন করিলেন : ইয়া রাসূলুল্লাহ! তাহারা কে ? হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : আমীর লোক হযরত সুলাইমান (আ) স্বীয় রাজ্যের যেখানে দরিদ্র লোক দেখিতে পাইতেন সেখানেই তাহাদের সহিত বসিয়া পড়িতেন এবং বলিতেন : মিসকীন মিসকীনগণের পার্শ্বে বসিল। হযরত ঈসা (আ)-কে ‘ইয়া মিসকীন' বলিয়া সম্বোধন করিলে তিনি যত সন্তুষ্ট হইতেন অপর কোন নামেই তত সন্তুষ্ট হইতেন না।
রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) দু'আ করিতেন : ইয়া আল্লাহ্! আমাকে আজীবন মিসকীন রাখিয়েন। যখন আমাকে মৃত্যু দান করিবেন, মিসকীন অবস্থায় মৃত্যু দান করিয়েন। আর যখন পুনরুত্থান করিবেন, মিসকীনদের সঙ্গে আমাকে পুনরুত্থান করিয়েন। হযরত মূসা (আ) নিবেদন করিলেনঃ ইয়া আল্লাহ্! কোথায় আপনাকে অন্বেষণ করিব ? উত্তর আসিল : ভগ্নহৃদয় লোকদের নিকট ।
(১৮) অষ্টাদশ কর্তব্য : মুসলমানের মন সন্তুষ্ট করিতে ও তাহাদের অভাব মোচন করিতে চেষ্টা করা।রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের অভাব মোচন করিল সে যেন সমস্ত জীবন আল্লাহ্র খেদমত করিল। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের চক্ষু উজ্জ্বল করিবে কিয়ামত দিবস আল্লাহ্ তাহার চক্ষু উজ্জ্বল করিবেন। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলেনঃ যে ব্যক্তি দিবাভাগে বা রাত্রিকালে এক ঘন্টা সময় কোন মুসলমানের অভাব মোচনের জন্য ব্যয় করে, তাহার অভাব মোচন হউক, বা না হউক এই এক ঘণ্টাকাল তাহার জন্য দুই মাস মসজিদে অবস্থানপূর্বক একমাত্র আল্লাহ্র ইবাদতে লিপ্ত থাকা অপেক্ষা উত্তম। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ যে ব্যক্তি কোন বিষণ্ন লোককে শান্তি প্রদান করে বা অত্যাচারিত লোককে অত্যাচার হইতে রক্ষা করে, আল্লাহ্ তাহাকে তিয়াত্তরটি ক্ষমা প্রদান করিবেন। হুযূর (সা) বলেনঃ তোমরা আপন ভাইকে সাহায্য কর; সে অত্যাচারী হউক কিংবা অত্যাচারিত হউক। সাহাবায়ে কিরাম (রা) নিবেদন করিলেন : ইয়া রাসূলুল্লাহ! অত্যাচারী হইলে তাহাকে কিরূপে সাহায্য করিবে ? হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ কোন মুসলমানের মন সন্তুষ্ট করা অপেক্ষা কোন ইবাদতই আল্লাহর নিকট অধিক পছন্দনীয় নহে। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : দুইটি স্বভাব অপেক্ষা নিকৃষ্ট পাপ আর নাই । আল্লাহর সহিত শরীক করা এবং মানুষকে কষ্ট দেওয়া। আর দুইটি স্বভাব অপেক্ষা উৎকৃষ্ট ইবাদত আর নাই-আল্লাহর উপর ঈমান আনয়ণ করা এবং মানুষকে আরাম প্রদান করা। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : মুসলমানের ব্যথায় যে ব্যক্তি ব্যথিত না হয় সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নহে।
হযরত ফুযায়ল (র)-কে ক্রন্দন করিতে দেখিয়া লোকে ইহার কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন : তিনি বলিলেন : ঐ সকল নিঃস্ব মুসলমানের জন্য আমি ক্রন্দন করিতেছি যাহারা আমার উপর অত্যাচার করিয়াছে। কিয়ামতের ময়দানে তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করা হইবে-তোমরা অত্যচার করিয়াছিলে কেন ? তখন তাহারা অপদস্থ হইবে এবং তাহাদের কোন ওযর-আপত্তিই গৃহীত হইবে না। হযরত মারূফ কাযী (র) বলেন : যে ব্যক্তি প্রত্যহ তিনবার প্রার্থনা করিবে ইয়া আল্লাহ্! মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর উম্মতের অবস্থা ভাল করিয়া দাও। ইয়া আল্লাহ্! মুহাম্মদ (সা)-এর উম্মতের প্রতি দয়া বর্ষণ কর। ইয়া আল্লাহ্! মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর উম্মতকে সচ্ছলতা দান কর। তাহার নাম আবদালগণের মধ্যে লিখিত হইবে।
(১৯) ঊনবিংশ কর্তব্য : কোন মুসলমানের নিকট পৌছামাত্র কথা বলিবার পূর্বে সর্বাগ্রে সালাম মুসাফাহা করা। রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, সালামের পূর্বে কেহ কথা বলিলে সে সালাম না করা পর্যন্ত তাহার উত্তর দিবে না। এক ব্যক্তি সালাম ব্যতীত রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট উপস্থিত হইলেই তিনি তাহাকে আদেশ করিলেন তুমি বাহির হইয়া যাও এবং সালাম করিয়া পুনরায় প্রবেশ কর।
হযরত আনাস (রা) বলেন : আমি আট বৎসর রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর খিদমত করার পর তিনি আমাকে বলিলেন-হে আনাস! তাহারা (অর্থাৎ ওযু গোসল) উত্তমরূপে করিও যেন তাহার আয়ূ দীর্ঘ হয়। আর কোন মুসলমানের নিকট পৌছামাত্র অগ্রে তাহাকে সালাম কর যেন তোমার সওয়াব বৃদ্ধি পায় এবং যখন নিজ গৃহে প্রবেশ কর তখন নিজ পরিবারের লোকদিগকে সালাম কর। তাহাতে তোমার গৃহে প্রচুর মঙ্গল হইবে।
একব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর দরবারে উপস্থিত হইয়া বলিল : সালামুন আলাইকুম। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন : তাহার জন্য দশটি সওয়াব লিখিত হইবে। দ্বিতীয় ব্যক্তি উপস্থিত হইয়া বলিল : সালামুন আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেনঃ তাহার জন্য বিশটি সওয়াব লিখিত হইবে। তৃতীয় ব্যক্তি আসিয়া বলিলঃ সালামুন আলায়কুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেনঃ তাহার জন্য ত্রিশটি সওয়াব লিখিত হইবে।
রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন :
"গৃহে প্রবেশকালে সালাম কর এবং বাহির হওয়ারকালেও সালাম কর। পূর্বের সালাম পরের সালাম অপেক্ষা উৎকৃষ্ট নহে"। হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন :
"দুই মুসলমান যখন পরস্পর মুসাফাহা করে তখন সত্তরটি রহমত তাহাদের মধ্যে ভাগ করিয়া দেওয়া হয়। তন্মন্ধে যে ব্যক্তি অধিকতর প্রফুল্লবদনে মিলিত হয় তাহার অংশে ঊনসত্তরটি রহমত পড়ে। আর যখন দুইজন মুসলমান পরস্পর সালাম করে তখন একশতটি রহমত তাহাদের মধ্যে ভাগ করিয়া দেওয়া হয়। যে ব্যক্তি অগ্রে সালাম করে তাহার ভাগে নব্বইটি এবং যে ব্যক্তি সালামের জওয়াব দেয় তাহার ভাগে দশটি রহমত পড়ে।
বুযর্গগণের হস্ত চুম্বন করা সুন্নত। হযরত আবূ উবায়দা ইন জাররাহ (রা) আমীরুল মুমেনীন হযরত উমর ফারুক (রা) হস্ত চুম্বন করিয়াছিলেন। হযরত আনাস (রা) বলেন : আমি রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে জিজ্ঞাসা করিলাম আমরা কোন বন্ধুর নিকট গমন করিলে (তাহার সম্মানার্থে মস্তক অবনত করতঃ) পৃষ্ঠদেশ বাঁকাইব কি? হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন-না। আমি আবার নিবেদন করিলাম তাহার হস্ত চুম্বন করিব কি? হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন-না। আবার নিবেদন করিলাম-মুসাফাহা করিব কি ? হুযূর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন -হ্যাঁ। কিন্তু কোন প্রাপ্তবয়স্ক বন্ধু বিদেশ ভ্রমণ হইতে প্রত্যাবর্তন করিলে তাহাকে চুম্বন ও আলিঙ্গন করা সুন্নত। রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর সম্মানার্থে কেহ দণ্ডায়মান হইলে তিনি সন্তুষ্ট হইতেন না।
হযরত আনাস (রা) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) অপেক্ষা অধিক প্রিয় আমাদের আর কেহ ছিলেন না। তাঁহার (সম্মানের) জন্য আমরা দণ্ডায়মান হইতাম না। আমরা জানিতাম এই কার্যে তিনি অসন্তুষ্ট হইতেন। কিন্তু যেখানে দাঁড়াইবার প্রথা হইয়া গিয়াছে, সেখানে সোজা দাঁড়াইয়া সম্মান প্রদর্শনে কোন ক্ষতি নাই। কাহারও সম্মুখে জোড়হস্তে দণ্ডায়মান হওয়া নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ লোক তাহার সম্মুখে জোড়হস্তে দাঁড়াইয়া থাকুক আর সে নিজে বসিয়া থাকুক, ইহা যে ব্যক্তি পছন্দ করে, তাহাকে বলিয়া দাও, সে যেন দোযখে নিজের স্থান করিয়া লয়।
(২০) বিংশতি কর্তব্য : হাঁচিদাতার উত্তর দেওয়া। হযরত ইব্‌ন মাসউদ (রা) বলেন : রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আমাদিগকে শিক্ষা দিয়াছেন--হাঁচিদাতা 'আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন' বলিবে ও শ্রবণকারী ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ' বলিবে এবং আবার সেই ব্যক্তি (হাঁচিদাতা) “ইয়ারহামুকাল্লাহ লী ওয়ালাকুম বলিবে। কিন্তু যে ব্যক্তি হাঁচির পর ‘আল্হামদুলিল্লাহ' বলিবে না সে ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ' দু'আ পাওয়ার অধিকারী হইবে না।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) হাঁচি দিবার আওয়ায দমন করিয়া অনুচ্চস্বর হাঁচিতেন এবং হাঁচির সময় মুখের উপর হাত রাখিতেন। পায়খানা বা প্রস্রাব করিবার সময় কাহারও হাঁচি আসিলে 'আলহামদু লিল্লাহ' মনে মনে বলিবে। হযরত ইবরাহীম নখঈ (রা) বলেন যে, এই সময় মুখে বলিলেও কোন ক্ষতি নাই।
হযরত কা'বুল আহবার (র) বলেন যে, হযরত মূসা (আ) নিবেদন করিয়াছিলেন : ইয়া আল্লাহ্! আপনি কি নিকটে যে, আস্তে কথা বলিব অথবা আপনি কি দূরে যে, উচ্চস্বরে কথা বলিব? উত্তর আসিল : যে ব্যক্তি আমাকে স্মরণ করে আমি তাহার সঙ্গে থাকি। তিনি আবার নিবেদন করিলেন ইয়া ইলাহী! আমার বিভিন্ন অবস্থা হইয়া থাকে; যেমন স্ত্রী-সহবাস ও পায়খানা-প্রসাবজনিত অপবিত্রাবস্থা। এমতাবস্থায় আপনাকে স্মরণ করা বে-আদবী। উত্তর আসিল : সকল অবস্থায় আমাকে স্মরণ কর এবং কোনরূপ আশংকা করিও না।
(২১) একবিংশতি কর্তব্য : বন্ধু-বান্ধব না হইলেও পরিচিত রুগ্ন ব্যক্তির তত্ত্বাবধান করা।
রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ যে ব্যক্তি রুগ্ন ব্যক্তির তত্ত্বাবধান করিবে সে বেহেশতে যাইবে এবং তত্ত্বাবধান করিয়া প্রত্যাবর্তনের সময় তাহার জন্য সন্ধ্যা পর্যন্ত দু'আ করিবার উদ্দেশ্যে সত্তর হাযার ফেরেশতা নিযুক্ত হইয়া থাকে।
পীড়িত ব্যক্তিকে দেখিবার সুন্নত তরীকা এই : স্বীয় হস্ত পীড়িত ব্যক্তির হস্ত বা ললাটের উপর রাখিবে, অবস্থাদি জিজ্ঞাসা করিবে এবং এই দু'আ পড়িবে।
‎بسم الله الرحمن الرحيم - أعيدك بالله الأحد الصمد الذي لم يلد ولم يولد – ولم يكن له كفوا أحد من شر ما تجد
পরম করুণাময় ও দয়ালু আল্লাহর নামে আরম্ভ করিতেছি। তুমি যে কষ্ট অনুভব করিতেছ তাহা হইতে আমি তোমার জন্য একক ও অভাবশূণ্য আল্লাহর আশ্রয় ভিক্ষা করিতেছি, যিনি কাহাকেও জন্ম দেন নাই এবং নিজেও কাহার কর্তৃক জাত নহেন এবং যাহার কোনাই সমকক্ষ নাই ।
হযরত উসমান (রা) বলেন যে, একবার তিনি পীড়িত হইলে রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) কয়েকবার তশরীফ আনয়ন করতঃ উপরি-উক্ত দু'য়াই পাঠ করিয়াছিলেন, নিম্নলিখিত দু'আ পাঠ করা,
‎أعوذ بعزة الله وقدرته من شر ما أجد
আমি যে কষ্ট অনুভব করিতেছি তাহা হইতে আল্লাহর ইযযত ও ক্ষমতার আশ্রয় গ্রহণ করিতেছি।
এবং ‘কেমন আছ’ বলিয়া কেহ জিজ্ঞাসা করিলে আল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ না করা পীড়িত ব্যক্তির জন্য সুন্নত।
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, কোন লোক পীড়িত হইলে তাহার উপর আল্লাহ্ দুইজন ফেরেশতা নিযুক্ত করেন। তাঁহারা লক্ষ্য করেন, কেহ খোঁজ-খবর লইতে আসিলে পীড়িত ব্যক্তি শোকর করে, না অভিযোগ করে। সে যদি শোকর করে এবং বলে ‘আল হামদুলিল্লাহ', ভাল আছি তবে আল্লাহ বলেন : এখন আমার প্রতি কর্তব্য এই-যদি আমার বান্দাকে ইহলোক হইতে উঠাইয়া লই, তবে রহমতের সহিত উঠাইয়া লইব এবং বেহেশতে স্থান দিব। আর যদি আরোগ্য দান করি তবে এই পীড়ার কারণে তাহার গুনাহসমূহ ক্ষমা করিয়া দিব। যে রক্ত-মাংস পীড়ার পূর্বে তাহার দেহে ছিল এখন তাহাকে তদপেক্ষা উৎকৃষ্ট রক্ত-মাংস দান করিব।
হযরত আলী (রা) বলেন যে, পেটে বেদনা হইলে স্বীয় স্ত্রীর মোহরের অর্থ হইতে কিছু লইয়া তদ্বারা মধু ক্রয়পূর্বক বৃষ্টির পানিতে মিশাইয়া পান করিলে উক্ত বেদনা আরোগ্য হয়। কারণ আল্লাহ্ বৃষ্টির পানিতে মুবারক, মধুকে রোগ নিরাময়ক এবং স্ত্রীর ক্ষমাকৃত মোহরকে প্রিয় ও সুস্বাদু করিয়াছেন। এই তিন জিনিসের সমন্বয় সাধিত হইলে নিঃসন্দেহে রোগ উপশম হইবে।
ফলকথা, অভিযোগ ও অধৈর্য প্রকাশ না করা এবং পীড়ার কারণে পাপ মোচনের আশা রাখা পীড়িত ব্যক্তির কর্তব্য। ঔষধ সেবনকালে ঔষধের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্র উপর ভরসা রাখিতে হইবে, ঔষধের উপর নহে।
পীড়িত ব্যক্তির তত্ত্বাবধানের নিয়ম : পীড়িত ব্যক্তির গৃহ-দ্বারে যাইয়া অনুমতি চাহিবে। দরজার সম্মুখে না দাঁড়াইয়া একপার্শ্বে দাঁড়াইবে। ধীরে ধীরে দ্বারে আঘাত করিবে। ‘হে গোলাম’ বলিয়া ডাকাডাকি করিবে না। ভিতর হইতে কেহ 'কে' বলিয়া জিজ্ঞাসা করিলে 'আমি' বলিয়া উত্তর দিবে না; (বরং নিজের পরিচয় প্রকাশ করিবে)। ‘হে গোলাম’, ওহে বয়’ ইত্যাদি বলিয়া ডাকাডাকির পরিবর্তে সশব্দে ‘সুবহানাল্লাহ’ ও 'আলহামদুলিল্লাহ' বলিবে। এই নিয়ম কেবল রোগীর গৃহে প্রবেশকালে প্রতিপাল্য নহে; বরং সর্বত্রই গৃহে প্রবেশের অনুমতি চাওয়া অথবা আগমন-বার্তা জানাইবার জন্য এই নিয়ম পালন করিবে।
রোগীর নিকট অধিকক্ষণ বসিয়া থাকিবে না। রোগীর অবস্থা সম্বন্ধে অধিক প্রশ্ন করিয়া তাহাকে বিরক্ত করিবে না। রোগ আরোগ্যের জন্য দু'আ করিবে। রোগীকে দেখিয়া নিজে দুঃখিত ও ব্যথিত হইয়াছ বলিয়া প্রকাশ করিবে। গৃহের অভ্যন্তরে প্রকোষ্ঠসমূহ ও দেয়ালের প্রতি দৃষ্টিপাত করিবে না ।
(২২) দ্বাবিংশ কর্তব্য : জানাযার সহিত গমন করা। রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ যে ব্যক্তি জানাযার সহিত গমন করে সে এক কীরাত সওয়াব পাইয়া থাকে। দাফন করা পর্যন্ত দণ্ডায়মান থাকিলে দুই কীরাত সওয়াব পাওয়া যাইবে এবং প্রত্যেক কিরাত ওহুদ পর্বতের সমান হইবে।
জানাযার সহিত গমনের নিয়ম: জানাযার সহিত গমনকালে নীরব থাকিবে, হাসিবে না। উপদেশ গ্রহণ করিবে, নিজ মৃত্যুর কথা স্মরণ করিবে। হযরত আমাশ (রা) বলেন: যখন আমরা জানাযার অনুগমন করিতাম তখন বুঝিতাম না যে, কাহার নিকট শোক প্রকাশ করিব। কারণ, প্রত্যেককে অন্যজন হইতে অধিক বিষণ্ণ বলিয়া মনে হইত।
কতিপয় লোক এক মৃতের জন্য শোক প্রকাশ করিতেছিল। ইহা দেখিয়া এক বুযর্গ বলিলেন : নিজের চিন্তা কর। কারণ, মৃত ব্যক্তি তিনটি বিপদ কাটাইয়া গিয়াছে। সে (১) মালাকুল মওতের চেহারা দর্শন করিয়াছে, (২) মৃত্যু-যন্ত্রণা ভোগ করিয়াছে এবং (৩) অন্তিমকালের ভীতি অতিক্রম করিয়াছে। রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ তিনটি বস্তু মৃত ব্যক্তির পশ্চাতে গমন করে- (১) বন্ধু-বান্ধব, (২) ধন-সম্পদ ও (৩) আমল (কর্ম)। বন্ধু-বান্ধব ও ধন-সম্পদ তো ফিরিয়া আসে, আমল তাহার সঙ্গে থাকিয়া যায়।
(২৩) ত্রয়োবিংশ কর্তব্য : কবর যিয়ারতে যাওয়া, মৃতদের জন্য মাগফিরাতের দু'আ করা এবং নিজে উপদেশ গ্রহণ করা।
চিন্তা করিবে, এই সকল লোক আমার পূর্বে ইহলোক ত্যাগ করিয়াছে। আমাকেও অতিসত্বর যাইতে হইবে এবং মাটির নিচে শয়ন করিতে হইবে।
হযরত সুফিয়ান সওরী (র) বলেন: যে ব্যক্তি কবরকে অধিক স্মরণ করিবে তাহার কবর বেহেশেতের উদ্যানসমূহের একটি উদ্যান হইবে। আর যে ব্যক্তি কবরকে ভুলিয়া যাইবে তাহার কবর দোযখের গহ্বরসমূহের একটি গহ্বর হইবে।
হযরত রাবী— ইব্‌ন খসীম (র) তাবেঈগণের মধ্যে একজন বুযর্গ ছিলেন। তাহার মাযার তূষ নগরে অবস্থিত। তিনি স্বীয় বাসগৃহে একটি কবর খনন করিয়া লইয়াছিলেন। যখনই আল্লাহর স্মরণ হইতে তাঁহার মনে কথঞ্চিত উদাসীনতা উপলব্ধি করিতেন তখনই তিনি কবরে যাইয়া শয়ন করিতেন। কিছুক্ষণ পর বলিতেন : ইয়া ইলাহী! আমাকে পুনরায় দুনিয়াতে প্রেরণ কর যাহাতে আমি নিজে পাপসমূহের সংশোধন ও প্রায়াশ্চিত্ত করিয়া লইতে পারি। তৎপর কবর হইতে উঠিয়া বলিতেন : হে রাবী'! আল্লাহ্ তোমাকে পুনরায় দুনিয়াতে পাঠাইয়াছেন। যত্নবান হও সেই সময়ের পূর্বে যখন তুমি আর দুনিয়ায় আগমনের অনুমতি পাইবে না।
হযরত উমর (রা) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) কবরস্থানে গমনপূর্বক একটি কবরের নিকট বসিলেন এবং খুব ক্রন্দন করিলেন : আমি হুযূরের নিকট ছিলাম। আমি নিবেদন করিলাম ইয়া রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)! আপনি রোদন করেন কেন? হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন, ইহা আমার আম্মার কবর। আমি তাঁহার কবর যিয়ারত করিতে এবং তাঁহার জন্য ক্ষমা চাহিতে আল্লাহর অনুমতি প্রার্থনা করিয়াছিলাম। আল্লাহ্ কবর যিয়ারতের অনুমতি দিলেন। সন্তানসুলভ ভালবাসা হৃদয়ে উথলিয়া উঠিয়াছে; এইজন্য রোদন করিতেছি।
ইসলামের দৃষ্টিতে এক মুসলমানের উপর অপর মুসলমানের যে কর্তব্য রহিয়াছে তাহা উপরে বর্ণিত হইল। এতদ্ব্যতীত প্রতিবেশীর প্রতি স্বতন্ত্র কর্তব্য রহিয়াছে।

হকদারের হক (৭) সংসর্গ ও বন্ধুত্বের কর্তব্য


হকদারের হক পর্ব- ৭
📚সৌভাগ্যের পরশমণি   ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

সংসর্গ ও বন্ধুত্বের কর্তব্য
বিবাহ বন্ধনে যেমন স্ত্রী ও পুরুষের উপর পরস্পর কতকগুলি কর্তব্য আরোপিত হয়, তদ্রূপ ভ্রাতৃত্ব এবং সংসর্গের বন্ধন প্রতিষ্ঠিত হইলেও ভ্রাতৃত্বের উপর কতগুলি কর্তব্য আরোপিত হইয়া থাকে। রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : দুই ভাইয়ের উদাহরণ এইরূপ দুই হাতের ন্যায় যাহার একটি অপরটিকে ধৌত করিয়া দেয়।
সংসর্গ ও বন্ধুত্বের কর্তব্য দশ শ্রেণীতে বিভক্ত
(১) সংসর্গ ও বন্ধুত্বের প্রথম কর্তব্য হল- ধন-সম্পদের মধ্যে। যাঁহারা ভাই-বন্ধুর হককে অগ্রগণ্য বলিয়া মনে করেন, এমনকি নিজের অংশও তাহাদিগকে প্রদান করেন তাঁহারা বন্ধুত্বের কর্তব্য আদায়ে সর্বোচ্চ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। যেমন মদীনার আনসারগণ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ তা’আলা বলেন “এবং তাহারা নিজেদের অপেক্ষা (মুহাজিরগণকে) অগ্রবর্তী রাখে যদিও নিজেরা ক্ষুধার্তই থাকুক না কেন”।
যাহারা ভাই-বন্ধুকে নিজতুল্য মনে করে এবং স্বীয় ধনকে নিজের ও তাহাদের সকলের ধন বলিয়া মনে করে তাহারা বন্ধুত্বের কর্তব্য সম্পাদনে দ্বিতীয় শ্রেণীর অন্তর্গত। যাহারা ভাই-বন্ধুকে গোলাম ও খাদিমের ন্যায় মনে করে এবং নিজের প্রয়োজনের অতিরিক্ত বস্তু তাহাদিগকে অযাচিতভাবে দান করে, তাহারা সর্বনিম্ন শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। ভাই-বন্ধুগণকে যদি এইরূপ বস্তুই তোমার নিকট হইতে চাহিয়া লইতে হয় তবে তুমি তাহাদের বন্ধু শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত রহিলে না। কারণ এমতাবস্থায় তোমার অন্তরে বন্ধুর দুঃখ-কষ্টের প্রতি সমবেদনা মোটেই নাই; এই বন্ধুত্ব আন্তরিক নহে, ইহা অভ্যাসজনিত সংসর্গ এবং ইহার কোনই মূল্য নাই।
হযরত উতবাতুল গোলাম (রাঃ)-এর এক বন্ধু ছিলেন। বন্ধু তাঁহাকে একদিন বলিলেন : আমার চারি হাজার দিরহামের প্রয়োজন। তিনি বলিলেন : আইস, দুই ៖ হাজার দিরহার গ্রহণ কর। বন্ধু অন্যদিকে মুখ ফিরাইয়া বলিলেনঃ তোমার লজ্জা হয় না? আল্লাহর ওয়াস্তে বন্ধুত্বের দাবী করিতেছ, অথচ পার্থিব ধন-সম্পদকে উহার উপর প্রাধান্য দিতেছ।
এক বাদশাহের নিকট লোকে কতিপয় সূফী ব্যক্তির পরোক্ষ নিন্দা করিল। ফলে এই সমস্ত সূফী ব্যক্তিকে হত্যা করার নির্দেশ হইল। হযরত আবুল হাসান নূরী (রহঃ)-ও তাঁহাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি অগ্রসর হইয়া বলিলেন : সর্বাগ্রে আমাকে হত্যা করুন। বাদশাহ জিজ্ঞাসা করিলেন : আপনি সর্বাগ্রে অগ্রসর হইলেন কেন? তিনি বলিলেন : এ সমস্ত সূফী আমার ভাই-বন্ধু। আমার ইচ্ছা, অন্ততঃ এক মুহূর্তকাল পূর্বে নিজের জীবনের বিনিময়ে মুহূর্তের জন্য তাঁহাদের জীবন রক্ষা করি। বাদশাহ বলিলেন : সুবহানাল্লাহ্! যাঁহারা এরূপ মনুষ্যত্বের অধিকারী তাঁহাদিগকে হত্যা করা দুরস্ত নহে। ইহা বলিয়া তিনি সকলকে মুক্তি দিলেন।
হযরত ফতেহ মুসেলী (রহঃ) একদা এক বন্ধুর গৃহে গিয়া দেখিলেন বন্ধু ঘরে নাই। তাঁহার পরিচারিকাকে বলিলেন : তোমার প্রভুর ক্যাশ বাক্সটি আন। পরিচারিকা ইহা উপস্থিত করিলে তিনি আবশ্যক পরিমাণে টাকা-পয়সা উহা হইতে চাহিয়া লইয়া গেলেন । গৃহে ফিরিয়া এই সংবাদ শ্রবণে প্রভু এত আনন্দিত হইলেন যে, তৎক্ষণাৎ সে দাসীকে আযাদ করিয়া দিলেন।
এক ব্যক্তি হযরত আবূ হুরাইয়া (রাঃ)-এর নিকট গিয়া বলিতে লাগিল : আমি আপনার সহিত বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করিতে ইচ্ছা করি। তিনি বলিলেন : ভ্রাতৃত্বের কর্তব্য আপনার জানা আছে কি? আগন্তুক বলিলঃ না। তিনি বলিলেন : ভ্রাতৃত্বের হকসমূহের মধ্যে একটি হক এই যে, তোমার স্বর্ণ-রৌপ্যের উপর তুমি আমা অপেক্ষা বেশী হকদার হইবে না। আগন্তুক বলিলঃ আমি এখনও এই স্তরে উপনীত হই নাই। তিনি বলিলেন : ব্যাস্ তবে সরিয়া পড়। এ কার্য তোমার দ্বারা হইতে পারে না।
হযরত ইব্ন উমর (রাঃ) বলেন : এক সাহাবীর নিকট এক ব্যক্তি ভাজা করা গোশ্ত প্রেরণ করিল। তিনি বলিলেনঃ আমার অমুক বন্ধু খুব অভাবগ্রস্ত। তাহাকে দেওয়া উত্তম এবং (এই বলিয়া) গোশ্তগুলি তাঁহার নিকট পাঠাইয়া দিলেন। তথায় পৌছিলে তিনি তদ্রূপ উহা তাঁহার অপর এক বন্ধুর নিকট পাঠাইয়া দিলেন। তিনি আবার তাঁহার অন্য বন্ধুর নিকট পাঠাইয়া দিলেন। মোটকথা, এইরূপে ঘুরিতে ঘুরিতে গোশ্ত আবার প্রথম বন্ধুর নিকট আসিয়া উপস্থিত হইল।
হযরত মাসরূক (রঃ) ও হযরত খুসাইমা (রঃ)-এর মধ্যে বন্ধুত্ব ছিল। তাঁহারা উভয়েই ঋণগ্রস্থ ছিলেন। তাঁহারা একে অন্যের ঋণ গোপনভাবে পরিশোধ করিলেন যে, কোন বন্ধুই তাহা জানিতে পারেন নাই।
হযরত আলী (রাঃ) বলেন : কোন গরীবকে একশত দিরহাম দান করা অপেক্ষা কোন বন্ধুর জন্য বিশ দিরহাম ব্যয় করাকে আমি উৎকৃষ্টতর মনে করি। রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) অরণ্য হইতে দুইটি মিসত্তয়াক কাটিয়া লইলেন। তন্মধ্যে একটি ছিল বাঁকা ও অপরটি সোজা। তাঁহার সঙ্গে এক সাহাবীকে সোজা মিসওয়াকটি দিয়া দিলেন এবং নিজে বাঁকাটি রাখিলেন। সাহাবী নিবেদন করিলেন : ইয়া রাসূলুল্লাহ্ ! এই মিসওয়াকটি ভাল। ইহা আপনার নিজের জন্য রাখুন। তিনি বলিলেন : কেহ কাহারও সহিত ক্ষণকাল সঙ্গদান করিলেও কিয়ামত দিবসে জিজ্ঞাসা করা হইবে, সাহচর্যের হক আদায় করা হইয়াছে, না নষ্ট করা হইয়াছে। রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর এই উক্তিতে এইদিকে ইঙ্গিত রহিয়াছে যে, নিজের ক্ষতি স্বীকার করিয়াও অপরের উপকার করা বন্ধুত্বের কর্তব্য। রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ পরস্পর দুই বন্ধুর মধ্যে যে ব্যক্তি অপরকে অধিক দয়া ও সাহায্য করে আল্লাহ্ তাহাকে অধিক ভালবাসেন।

(২) সংসর্গ ও বন্ধুত্বের দ্বিতীয় কর্তব্য হল- সর্বাবস্থায় অভিলাষ ও প্রার্থনা করিবার পূর্বেই সন্তুষ্ট চিত্তে বন্ধুর সাহায্য করা। প্রাচীন কালের বুযর্গগণের এইরূপ অভ্যাস ছিল যে, তাঁহারা প্রত্যহ বন্ধুগণের দ্বারে গমনপূর্বক গৃহবাসিগণকে জিজ্ঞাসা করিতেন : আপনারা কি করিতেছেন? লাকড়ী, আটা, তৈল, লবণ ইত্যাদি প্রয়োজনীয় জিনিস গৃহে মওজুদ আছে কিনা? তাঁহারা ভ্রাতৃ-বন্ধুগণের কার্যকে নিজেদের কার্যের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ ও আবশ্যক বলিয়া মনে করিতেন এবং তাহাদের কোন কার্য করিতে পারিলে অত্যন্ত আনন্দিত হইতেন।
হযরত হাসান বসরী (রহঃ) বলেনঃ ধর্ম-ভ্রাতা আমার নিকট স্ত্রী ও সন্তান-সন্তুতি অপেক্ষা অধিক প্রিয় কারণ, তাহারা ধর্ম স্মরণ করাইয়া দেয় এবং স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দুনিয়া স্মরণ করাইয়া দেয়।
হযরত আতা (রহঃ) বলেনঃ তিন দিন পর পর স্বীয় বন্ধুগণের খোঁজ-খবর লও। বন্ধু পীড়িত থাকিলে সেবা কর। কোন কার্যে লিপ্ত থাকিলে সাহায্য কর এবং আল্লাহর যিকির হইতে অসতর্ক থাকিলে স্মরণ করাইয়া দাও।
হযরত জাফর ইবন মুহাম্মদ (রঃ) বলেন : শত্রু আমা হইতে নির্লিপ্ত না হওয়া পর্যন্ত আমি তাহার অভাব মোচনে অতি তাড়াতাড়ি করিয়া থাকি। এমতাবস্থায় বন্ধুদের জন্য আমার কি করা উচিত!
প্রাচীনকালের জনৈক বুযর্গ স্বীয় বন্ধুর মৃত্যুর পর চল্লিশ বৎসর পর্যন্ত তাঁহার পরিবারবর্গের সেবা করিয়া বন্ধুত্বের কর্তব্য পালন করিয়াছিলেন।
(৩) সংসর্গ ও বন্ধুত্বের তৃতীয় কর্তব্য হল ভাই-বন্ধুগণের সহিত প্রিয়বাক্য বলা এবং তাহাদের দোষ-ত্রুটি গোপন করা: - বন্ধুর পশ্চাতে কেহ তাহাকে অন্যায় বলিলে ইহার যথাযথ উত্তর দিবে এবং মনে করিবে, বন্ধু অন্তরালে থাকিয়া সব শুনিতেছে। বন্ধু সর্বদা তোমার পশ্চাতে থাকুক, ইহা তুমি যেমন কামনা কর, তুমিও তদ্রূপ তাহার পশ্চাতে থাকিবে। চালাকি করিবে না। বন্ধু কিছু বলিলে তাহা মানিয়া লইবে, কোনরূপ প্রতিবাদ করিবে না। তাহার গোপন কথা কাহারও নিকট প্রকাশ করিবে না। এমনকি বন্ধুত্ব ভঙ্গ হইয়া গেলেও প্রকাশ করিবে না। বন্ধুর গোপন কথা প্রকাশ করিয়া দেওয়া মন্দ স্বভাবের পরিচায়ক। তাহার স্ত্রী, সন্তানাদি ও বন্ধু-বান্ধবের নিন্দা করিবে না। কেহ তাহার দোষ-ত্রুটি উল্লেখ করিলে উহা তাহার নিকট বলিবে না। কারণ, বলিলে তুমি তাহাকে কষ্ট দিলে। কিন্তু লোক বন্ধুর প্রশংসা করিলে ইহা তাহার নিকট গোপন করিবে না। কেননা বন্ধুর প্রশংসা গোপন করা তাহার প্রতি হিংসার প্রমাণ। বন্ধু তোমার নিকট কোন অপরাধ করিয়া থাকিলে তজ্জন্য কোনরূপ অভিযোগ না করিয়া তাহাকে ক্ষমা করিয়া দিবে এবং আল্লাহর ইবাদতে স্বীয় দোষ-ত্রুটি স্মরণ করিবে। তাহা হইলে তামার নিকট কেহ অপরাধ করিলে ইহাকে বিস্ময়কর বলিয়া মনে করিবে না এবং ইহাও বুঝিবে যে, সংসারে নির্দোষ ও ত্রুটিহীন মানুষ কখনই খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না। একেবারে নির্দোষ ব্যক্তির সঙ্গলাভ করিতে চাহিলে মানব সমাজ ছাড়িয়া দিতে হইবে। হাদীস শরীফে আছে যে, মু'মিন ব্যক্তি সর্বদা অপরের ত্রুটির পশ্চাতে কোন উপযুক্ত ওযর (কারণ) আছে বলিয়া মনে করে। আর মুনাফিক সর্বদা অপরের দোষ-ত্রুটি অন্বেষণ করিতে থাকে।

বন্ধুর একটি উপকারের বিনিময়ে তাহার দশটি ত্রুটি গোপন করিয়া রাখা উচিত। রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : অসৎ বন্ধু হইতে (আল্লাহর সমীপে) আশ্রয় প্রার্থনা করা উচিত। কারণ, দোষ-ত্রুটি দেখিলে সে প্রকাশ করিয়া দেয় এবং কোন ভাল আচরণ দেখিলে উহা গোপন করিয়া রাখে।
(১) বন্ধুর কোন অপরাধ ক্ষমার যোগ্য হইলে তাহা ক্ষমা করিয়া দিবে এবং তাহার প্রতি ভাল ধারণা পোষণ করিবে। কারণ কাহারও প্রতি মন্দ ধারণা পোষণ করা হারাম। রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : আল্লাহ্ মু'মিনগণের চারি বস্তু অপরের উপর হারাম করিয়াছেন--ধন, প্রাণ মান-মর্যাদা ও কুধারণা পোষণ।
হযরত ঈসা (আঃ) বলেন : তোমরা সেই ব্যক্তির সম্বন্ধে কি মনে কর যে, তাহার নিদ্রিত ভ্রাতার গুপ্ত অঙ্গ হইতে কাপড় সরাইয়া তাহাকে উলঙ্গ করিতে থাকে? লোকে বলিল : ইয়া রাসূলুল্লাহ! ইহাকে কে সঙ্গত মনে করিবে? তিনি বলিলেনঃ তোমরাই বরং মনে করিয়া থাক। কারণ, তোমরা তোমাদের ভাই-বন্ধুদের ত্রুটি প্রকাশ করিয়া থাক যেন অপর লোকে উহা জানিতে পারে।
বুযর্গগণ বলেন : কাহারও সহিত তুমি বন্ধুত্ব স্থাপনের ইচ্ছা করিলে প্রথমে তাহাকে ক্রোধান্বিত করিয়া গোপনে তাহার নিকট লোক পাঠাও, যে তথায় তোমার আলোচনা করিবে। ইহাতে ঐ ব্যক্তি যদি তোমাদের কোন গোপন কথা প্রকাশ করে তবে বুঝিবে সে বন্ধুত্ব স্থাপনের উপযোগী নহে। বুযর্গগণ আরও বলেন : যে ব্যক্তি আল্লাহর ন্যায় তোমার গোপন কথা জানিয়াও অপরের নিকট প্রকাশ করে না, তাহার সহিত বন্ধুত্ব স্থাপন কর। এক ব্যক্তি তাহার এক বন্ধুর নিকট নিজের কোন গুপ্ত বিষয় ব্যক্ত করতঃ তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল : আমি যাহা বলিলাম তাহা তোমার স্মরণ আছে কি? সে ব্যক্তি বলিলঃ না, ভুলিয়া গিয়াছি।
বুযুর্গগণ বলেন : যে ব্যক্তি চারি অবস্থায় তোমার বন্ধুত্ব ভুলিয়া যায় সে বন্ধুত্বের উপযোগী নহে (১) আনন্দের সময়, (২) ক্রোধের সময়, (৩) লোভের সময় এবং (৪) প্রবৃত্তির তাড়নার সময়, এই চারি সময়ে বন্ধুত্বের কর্তব্য ভুলিয়া যাওয়া উচিত নহে।
হযরত আব্বাস (রাঃ) স্বীয় পুত্র হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ)-কে বলেন : আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর (রাঃ) তোমাকে স্বীয় বন্ধুরূপে গ্রহণ করিয়াছেন এবং প্রবীণগণের উপর তোমাকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করিয়াছেন, সাধারণ পাঁচটি উপদেশ স্মরণ রাখিও (১) তাঁহার গোপন তথ্য কাহারও নিকট প্রকাশ করিও না, (২) তাঁহার সম্মুখে কাহারও গীবত করিও না, (৩) তাঁহার নিকট কোন মিথ্যা কথা বলিও না, (৪) তাঁহার আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করিও না, (৫) তোমা কর্তৃক কোন বিশ্বাষঘাতকতার কার্য যেন তিনি কখনও দেখিতে না পান।
বন্ধুর সহিত তর্ক-বিতর্ক ও মতভেদ করা অপেক্ষা অপর কিছুই বন্ধুত্বের পক্ষে এত অধিক ক্ষতিজনক নহে। বন্ধুর কোন কথায় প্রতিবাদ করিলে ইহার অর্থ এই দাঁড়ায় যে, তুমি যেন তাহাকে নির্বোধ ও মুর্খ এবং নিজেকে বুদ্ধিমান ও মহাজ্ঞানী মনে করিয়া তাহার প্রতি অহংকার ও অবজ্ঞা প্রদর্শন করিতেছ। এইগুলি শত্রুতার নিদর্শন, বন্ধুত্বের পরিচায়ক নহে। রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, :
"তোমরা আপন ভ্রাতার কোন কথায় প্রতিবাদ করিও না। তাহাকে বিদ্রূপ করিও না, তাহার সহিত কোন প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করিও না।"
বুযর্গগণ বলেন : তুমি তোমার বন্ধুকে ‘চল' বলিলে সে যদি জিজ্ঞাসা করে, কত দূর এবং কোথায় যাইতে হইবে; তবে সে বন্ধুত্বের উপযোগী নহে। তাহার উচিত অন্য কিছুই না বলিয়া তোমার সঙ্গে তৎক্ষণাৎ যাত্রা করা।
হযরত আবূ সুলাইমান দারানী (রঃ) বলেনঃ আমার এক বন্ধু ছিলেন। যাহাকিছু তাঁহার নিকট চাহিতাম তাহাই তিনি দিয়া দিতেন। একবার তাঁহার নিকট বলিলাম, অমুক বস্তু আমার প্রয়োজন আছে। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন : ‘কতটুকু প্রয়োজন?' ইহার পর আমার অন্তর হইতে তাঁহার বন্ধুত্বের আস্বাদ হ্রাস পাইতে লাগিল।
মোটকথা, বন্ধুর কথা ও কার্যের সহিত যথাসম্ভব ঐক্য ও আনুকুল্য রক্ষা করিয়া চলিতে পারিলেই বন্ধুত্ব স্থায়ী থাকে।

(৪) সংসর্গ ও বন্ধুত্বের চতুর্থ কর্তব্য হল- কথায় বন্ধুর প্রতি প্রীতি ও ভালবাসা প্রকাশ করিবে। রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন- “তোমাদের মধ্যে কেহ কাহাকে ভালবাসিলে তাহাকে উহা জানাইয়া দাও”।
তিনি এই উদ্দেশ্যে ইহা বলিয়াছেন যে, বন্ধু উহা জানিতে পারিলে তাহার হৃদয়েও ভালবাসা জন্মিবে। এমতবস্থায় বন্ধুর প্রতি ঐ ব্যক্তির ভালবাসা দ্বিগুণ বৃদ্ধি পাইবে। সকল অবস্থাতেই বন্ধুর খোঁজ-খবর লইবে, সুখ-দুঃখে তাহার অংশীদার হইবে। বন্ধুকে সম্বোধন করিতে হইলে উত্তম নামে সম্বোধন করিবে। তাহার কোন উপাধি বা পদবী থাকিলে ইহা ধরিয়া ডাকিবে। সম্ভবত : এই উপাধি তাহার খুব প্রিয় হইয়া থাকিবে।
হযরত উমর (রাঃ) বলেন : বন্ধুর বন্ধুত্ব ত্রিবিধ কারণে দৃঢ় হইয়া থাকে। (১) প্রিয় নামে সম্বোধন করিলে, (২) দর্শনমাত্র নিজে তাহাকে প্রথমে সালাম করিলে, (৩) আগে বন্ধুকে বসাইয়া পরে নিজে বসিবে। এতদ্ব্যতীত বন্ধুর অগোচরে তাহার পছন্দনীয় প্রশংসাবাদ করিবে। এইরূপে তাহার স্ত্রী, সন্তানাদি এবং তাহার আত্মীয়-স্বজনেরও প্রশংসা করিবে। এইরূপ ব্যবহার বন্ধুত্ব সুদৃঢ় হইয়া থাকে। আর বন্ধুকৃত উপকারের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিবে।
হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ – যে ব্যক্তি স্বীয় বন্ধুর সদিচ্ছার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না সে সৎকার্যের কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করিবে না।
বন্ধুর অনুপস্থিতিতে তাহাকে সাহায্য করা আবশ্যক। কেহ তাহার দোষারোপ করিলে উহা খণ্ডন করা উচিত। বন্ধুকে নিজের ন্যায় মনে করিবে। তোমার সম্মুখে তোমার বন্ধুকে অপর লোকে মন্দ বলিলে যদি তুমি কিছুই না বল তবে যেন লোকে তাঁহাকে প্রহার করিতে দেখিয়া তুমি তাহাকে সাহায্য না করিয়া নীরব হইয়া রহিলে। বরং প্রহার যন্ত্রণা অপেক্ষা বাক্যাঘাত অধিক যন্ত্রণাদায়ক।
কোন জ্ঞানী ব্যক্তি বলেনঃ বন্ধুর অগোচরে আমার সম্মুখে কেহ তাহার সন্বন্ধে আলোচনা করিলে আমি মনে করি, তিনি যেন উপস্থিত থাকিয়া সমস্তই শুনিতেছেন এবং তিনি উপস্থিত থাকিলে যেরূপ উত্তর দিতাম আমি তদ্রুপ উত্তরই দিয়া থাকি।
হযরত আবু দারদা (রাঃ) একস্থানে দুইটি আবদ্ধ বলদকে শায়িত দেখিলেন। কিন্তু ইহাদের একটি যখন উঠিয়া দাঁড়াইল তখন অপরটিও উঠিয়া দাঁড়াইল। ইহাতে তিনি অভিভূত হইয়া রোদন করিতে লাগিলেন এবং বলিলেনঃ ধর্ম-ভাই-বন্ধুগণও এইরূপ হইয়া থাকে (একজন দাঁড়াইলে অপরজনও দাঁড়ায় এবং একজন চলিতে আরম্ভ করিলে অপরজনও চলে)। দাঁড়ানো ও গমনে একে অন্যের অনুবর্তী হয়।

(৫) সংসর্গ ও বন্ধুত্বের পশ্চম কর্তব্য হল- বন্ধুর প্রয়োজনীয় দীনী ইল্‌ম (ধর্ম বিদ্যা) তাহাকে শিক্ষা দেওয়া। কারণ, দুনিয়ার দুঃখ-কষ্ট হইতে রক্ষা করা অপেক্ষা তাহাকে দোযখের অগ্নি হইতে রক্ষা করা বহুগুণে শ্রেয়। ইল্‌ম শিক্ষা করিয়া তদনুযায়ী আমল না করিলে তাহাকে উপদেশ দিবে এবং আল্লাহর ভয় প্রদর্শন করিবে। কিন্তু নির্জনে উপদেশ দিবে। ইহাতে বন্ধুর প্রতি তোমার অনুগ্রহ প্রমাণিত হইবে। কারণ, লোক-সম্মুখে উপদেশ দিলে বন্ধু লজ্জা পাইবে। মিষ্ট ভাষায় উপদেশ দিবে, শক্ত কথায় নহে। রাসুলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : এক মু'মিন অপর মু'মিনের দর্পণস্বরূপ। এই হাদীসের মর্ম এই যে, স্বীয় দোষ-ত্রুটি একে অপরের নিকট হইতে জানিয়া লইবে। বন্ধু যদি অনুগ্রহপূর্বক তোমার দোষ-ত্রুটি নির্জনে তোমাকে জানাইয়া দেয় তবে এই অনুগ্রহের জন্য তাহার প্রতি তোমার কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত, অসন্তুষ্ট হওয়া কখনই সঙ্গত নহে। ইহার উদাহরণ এইরূপ-যেমন কোন ব্যক্তি তোমাকে জানাইয়া দিল যে, তোমার কাপড়ে সাপ অথবা বিচ্ছু রহিয়াছে। এমতাবস্থায় তাহার প্রতি তুমি অসন্তুষ্ট হইবে না, বরং যে উপকার সে করিয়াছে তজ্জন্য তাহার প্রতি তুমি কৃতজ্ঞ থাকিবে।
সমুদয় মন্দ স্বভাব মানুষের মধ্যে সাপ-বিচ্ছু সদৃশ। এই সমস্তের দংশন যন্ত্রণা কবরে আত্মার উপরে প্রকাশ পাইবে। উহাদের দংশন দুনিয়ার সাপ-বিচ্ছুর দংশন হইতে বহুগুণে অধিক যন্ত্রণাদায়ক হইবে। কারণ, দুনিয়ার সাপ-বিচ্ছুর দংশন দেহের উপর হইয়া থাকে । হযরত উমর (রা) বলেনঃ আল্লাহর রহমত তাহার উপর বর্ষিত হউক যিনি আমার দোষ-ত্রুটি আমার সম্মুখে উপহারস্বরূপ তুলিয়া ধরেন।
হযরত উমর (রাঃ), হযরত সালমান (রাঃ)-এর নিকট আগমন করিলেন। তিনি বলিলেন : ভাই-সালমান! সত্য সত্য বলুন, অপছন্দনীয় কোন্ কোন্ বিষয় আমার মধ্যে দেখিয়াছেন বা শুনিয়াছেন। হযরত সালমান (রাঃ) বলিলেনঃ এ বিষয়ে আমাকে ক্ষমা করুন। হযরত উমর (রাঃ) বলিলেন : আপনাকে অবশ্যই বলিতে হইবে। তিনি অত্যাধিক পীড়াপীড়ি করার পর হযরত সালমান (রাঃ) বলিলেনঃ আমি শুনিয়াছি, এক ওয়াক্তে আপনার দস্তরখানে দুই প্রকার খাদ্য আনীত হয় এবং আপনার দুইটি পিরহান আছে, একটি দিবাভাগে ও অপরটি রাত্রিকালে ব্যবহারের জন্য। হযরত উমর (রাঃ) বলিলেন : এই দুইয়ের কোনটিই সত্য নহে। আর কিছু শুনিয়াছেন কি? তিনি উত্তরে বলিলেনঃ না।
হযরত হুযাইফা মারআশী (রঃ) হযরত আসবাত (রাঃ)-কে পত্রযোগে জানাইলেন : আমি শুনিলাম, তুমি নিজের ধর্মকে দুই হাব্বার বিনিময়ে বিক্রয় করিয়া ফেলিয়াছ। অর্থাৎ তুমি বাজারে কোন বস্তু ক্রয় করিতে চাহিলে বিক্রেতা উহার মূল্য এক দাঙ্গা দাবি করিয়াছিল। কিন্তু তুমি উহা দুই হাব্বার বিনিময়ে চাহিয়াছিলে। বিক্রেতা তোমাকে চিনিত বলিয়া দুই হাব্বাতেই তোমাকে দিয়া দিল। তোমার ধার্মিকতা ও পরহিযগারীর কারণে অনুগ্রহ করতঃ অল্প মূল্যে সে জিনিসটি তোমাকে দিল। মোহের আবরণ মস্তক হইতে খুলিয়া ফেল এবং মোহ-নিদ্রা হইতে জাগ্রত হও।
যে ব্যক্তি কুরআর শরীফ পাঠ ও ধর্ম-বিদ্যা অর্জন করতঃ দুনিয়ার দিকে আকৃষ্ট হইয়া পড়ে, আমার আশংকা হয় সে আল্লাহর কালাম লইয়া উপহাস করিতেছে। উপদেশদাতার প্রতি যে ব্যক্তি কৃতজ্ঞ হয়, বুঝা যায় যে, তাহার হৃদয়ে ধর্মের প্রতি অনুরাগ আছে। আল্লাহ্ তা’আলা মিথ্যাবাদীদের সম্পর্কে বলেন :
“আর কিন্তু তোমার উপদেষ্টাগণকে ভালবাস না।”
যে ব্যক্তি উপদেষ্টাগণকে ভালবাসে না, এইজন্য অহংকার, আত্মাভিমান তাহার ধর্ম ও বুদ্ধির উপর প্রবল হইয়া উঠে। মানুষ যখন নিজের দোষ-ত্রুটি মোটেই বুঝে না তখনই এইরূপ হইয়া থাকে। কিন্তু নিজের দোষ-ত্রুটি বুঝিলে তাহাকে আকারে-ইঙ্গিতে উপদেশ দেওয়া উচিত, স্পষ্ট ভাষায় লোক সম্মুখে উপদেশ দেওয়া উচিত নহে। আর বন্ধু যে অপরাধ কেবল তোমার নিকট করিয়াছে তাহা গোপন রাখা ও তৎসম্বন্ধে অজ্ঞ সাজিয়া থাকাই উত্তম। কিন্তু এইরূপ অপরাধ গোপন রাখার শর্ত এই যে, বন্ধু হইতে তোমার মন যেন ফিরিয়া না যায়। আর যদি একান্ত ফিরিয়া যায় তথাপি বন্ধুর প্রতি তাহার অগোচরে অসন্তুষ্ট হওয়া বন্ধু-বিচ্ছেদ অপেক্ষা শ্রেয়। কিন্তু ঝগড়া-বিবাদ এবং বাক-বিতণ্ডার আশংকা থাকিলে বিচ্ছেদই শ্রেয়। উক্ত অবস্থায় বিচ্ছেদ না ঘটাইয়া সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখার উদ্দেশ্য এই হওয়া উচিত যে, ভাই-বন্ধুদের দুর্ব্যবহারের কষ্ট সহ্য করিলে নিজের স্বভাব সংশোধিত হইবে, সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখিলে পার্থিব উপকার হইবে, এইরূপ উদ্দেশ্য থাকা উচিত নহে।
হযরত আবূ বকর কাত্তানী (রঃ) বলেন : আমার এক বন্ধু ছিলেন : তাঁহার ব্যবহারে আমার মনে কষ্ট ছিল। মনের এই কষ্ট যেন দূরীভূত হয় এই জন্য তাহাকে কিছু দান করিলাম, কিন্তু কোন ফল হইল না। অবশেষে তাহার হস্ত ধারণপূর্বক একদিন তাঁহাকে আমার গৃহে লইয়া আসিলাম এবং বলিলাম : আপনার পায়ের তালু আমার মুখমণ্ডলের উপর স্থাপন করুন। তিনি বলিলেন : ইহা কখনই হইতে পারে না। আমি বলিলাম : আপনাকে অবশ্যই ইহা করিতে হইবে; বিনা কারণেই করিতে হইবে। অগত্যা অনিচ্ছা সত্ত্বেও তিনি বাধ্য হইয়া স্বীয় পায়ের তালু আমার মুখের উপর স্থাপন করিলেন। ইহাতে আমার মনের সেই কষ্ট দূরীভূত হইল।
হযরত আবূ আলী রিবাতী (রঃ) বলেন : একবার আমি হযরত আবদুল্লাহ্ রাযীর সঙ্গীরূপে সফরে বাহির হইলাম। তিনি বলিলেনঃ সফরে সরদার কে হইবে? আমি-না তুমি? আমি বলিলাম আপনি হইবেন। তিনি বলিলেনঃ তাহা হইলে আমি যাহা বলিব তাহাই তোমাকে মানিতে হইবে। আমি বলিলাম : আপনার নির্দেশ শিরোধার্য করিয়া লইব। তৎপর তিনি একটি পেটরা চাহিলেন এবং তাহা আনিয়া উপস্থিত করিলাম। তিনি আমাদের পাথেয় দ্রব্য, কাপড়-চোপড় সমস্ত উহাতে পুরিয়া স্বীয় স্কন্ধে তুলিয়া লইলেন এবং যাত্রাপথে বাহির হইয়া পড়িলেন। আমি তাঁহাকে বার বার অনুরোধ করিয়া বলিলাম, গাঠুরিঠা আমার নিকট দিন, আপনি ক্লান্ত হইয়া পড়িলেন। কিন্তু তিনি কিছুতেই শুনিলেন না এবং বলিলেন : তুমি তাবেদার (আজ্ঞাবহ), সরদারের উপর তাবেদারের হুকুম চালাইবার অধিকার নাই।সফরে একবার সারারাত্রি বৃষ্টি হইতেছিল। তিনি আমার মাথার উপরে একখানি কম্বল ধরিয়া সারারাত্রি দণ্ডায়মান রহিলেন। যেন আমার শরীরে বৃষ্টির পানি পড়িতে না পারে। আমি কোন কথা বলিতে গেলেই তিনি বলিতেন : মনে রাখিও আমি সরদার তুমি তাবেদার। আমি মনে মনে বলিতে লাগিলামঃ হায়! তাঁহাকে যদি আমি সরদার না বানাইতাম ।
(৬) সংসর্গ ও বন্ধুত্বের ষষ্ট কর্তব্য হল,- বন্ধুর ত্রুটি ক্ষমা করা। বুযর্গগণ বলেন : তোমার কোন বন্ধু তোমার নিকট কোন অপরাধ করিলে উহা হইতে তাহাকে অব্যাহতি প্রদানের জন্য তাহার পক্ষের সত্তর প্রকার ওযর তুমি নিজের মন হইতে উপস্থিত করিবে। ইহাতেও যদি তোমার মন তাহাকে ক্ষমা করিতে প্রস্তুত না হয় তবে স্বীয় মনকে বলিবে, তোর স্বভাব অত্যন্ত মন্দ এবং তুই নিতান্ত নীচ বংশজাত। তোর বন্ধু সত্তর ওযর পেশ করিল, তবুও তুই তাহাকে ক্ষমা করিতে পারিস না। সেই অপরাধ পাপজনক হইয়া থাকিলে উহা বর্জনের জন্য তাহাকে নম্রভাবে উপদেশ দিবে। এইরূপ অপরাধ সে পুনরায় না করিলে তুমি তাহার প্রতি এমন ভাব দেখাইবে যে, তুমি যেন সেই সম্বন্ধে বিন্দু-বিসর্গও অবগত নও। কিন্তু বারবার সেই অপরাধ করিতে থাকিলে তুমিও তাহাকে উপদেশ দিতে থাকিবে। বারবার উপদেশ দেওয়া সত্ত্বেও কোন ফল না হইলে এমতাবস্থায় কর্তব্য সম্বন্ধে সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ)-এর মধ্যে মতভেদ আছে। হযরত আবু যর (রা) বলেন যে, এমতাবস্থায় বন্ধুত্ব ছিন্ন করা উচিত। কারণ, প্রথমে আল্লাহর উদ্দেশ্যেই বন্ধুত্ব স্থাপিত হইয়াছিল। সুতরাং এখন আল্লাহর উদ্দেশ্যেই বন্ধুত্ব ছিন্ন করা আবশ্যক। হযরত আবু দারদা (রাঃ) প্রমুখ কতিপয় সাহাবী বলেন যে, তেমন অবস্থায়ও বন্ধুত্ব ছিন্ন করা সমীচীন নহে। কারণ, আশা করা যায় যে, সে ঐ গুনাহ্ পরিত্যাগ করিতে পারে। কিন্তু এমন ব্যক্তির সহিত প্রারম্ভেই বন্ধুত্ব স্থাপন না করা উচিত ছিল।
একবার বন্ধুত্ব স্থাপন করতঃ উহা ছিন্ন করা সমীচিন নহে। হযরত নখঈ (রঃ) বলেন, পাপের কারণে বন্ধুকে পরিত্যাগ করিও না। কারণ, হয়ত আজ সে পাপ করিতেছে, কাল করিবে না। হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, আলিমের দোষকে উপেক্ষা কর। তাহার প্রতি আস্থা হারাইও না এবং তাহার সহিত বন্ধুত্ব ছিন্ন করিও না। আশা করা যায় যে, তদ্রুপ পাপ হইতে তিনি শীঘ্রই ফিরিয়া আসিবেন।
কথিত আছে, প্রাচীনকালের দুই বুযর্গের মধ্যে পরস্পর বন্ধুত্ব ছিল। তাহাদের একজন কামপ্রবৃত্তির তাড়নায় কাহারও প্রতি প্রেমাসক্ত হইয়া পড়েন এবং স্বীয় বন্ধুকে বলিলেন : আমার হৃদয় প্রণয় রোগে আক্রান্ত হইয়া পড়িয়াছে। তুমি ইচ্ছা করিলে ভ্রাতৃত্ব বর্জন এবং বন্ধুত্ব ছিন্ন করিতে পার। বন্ধু বলিলেন আল্লাহ্ করুন, একটি মাত্র পাপের কারণে আমি তোমার সহিত বন্ধুত্ব ছিন্ন করিব ! লা হাউলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ্, এক প্রণয় রোগের দরুন ভালবাসার সম্পর্ক কর্তন করিব। বরং তিনি দৃঢ়তার সহিত শপথ করিলেন যে, যতদিন পর্যন্ত সর্ব রোগের নিরাময় কর্তা আল্লাহ্ তাহার বন্ধুর প্রণয় রোগ আরোগ্য না করেন ততদিন তিনি পানাহার করিবেন না; সম্পূর্ণ উপবাস থাকিবেন। চল্লিশ দিন তিনি কোন প্রকার খাদ্য বা পানীয় গ্রহণ করিলেন না। তৎপর বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করিলেন: এখন আপনার অবস্থা কেমন ? বন্ধু উত্তর করিলেন : সেই একই অবস্থা, একই রকম বেদনা হা- হুতাশ। তিনি তৎপর পানাহার না করিয়া দিন দিন কৃশ হইতে কৃশতর হইতে লাগিলেন : অনন্তর বন্ধু যখন তাহাকে জানাইলেন যে, আল্লাহর অনুগ্রহে তাহার প্রণয় রোগ দূরীভূত হইয়াছে তখন তিনি আল্লাহ্‌কে ধন্যবাদ দিলেন এবং পানাহার করিলেন।
এক ব্যক্তিকে লোকে জিজ্ঞাসা করিল : আপনার বন্ধু ধর্ম পথ ত্যাগ করতঃ পাপে লিপ্ত হইয়া রহিয়াছে। আপনি তাহার সহিত বন্ধুত্ব ছিন্ন করেন না কেন? তিনি উত্তর দিলেন : আজ তাহার বন্ধুর নিতান্ত প্রয়োজন। কারণ, তিনি ধ্বংসের পথে চলিয়াছেন। এমতাবস্থায় আমি তাহাকে বর্জন করিব কিরূপে? বরং ইহাই তাহাকে সাহায্য কবিবার প্রকৃষ্ট সময়। সদয় উপদেশ প্রদানে তাহাকে দোষখ হইতে রক্ষা করা কর্তব্য।
কথিত আছে, বনী ইসরাঈল বংশের দুই ব্যক্তি পরস্পর বন্ধুত্ব সূত্রে আবদ্ধ ছিলেন। তাঁহারা উভয়েই এক পাহাড়ে ইবাদত করিতেন। একদা কোন প্রয়োজনীয় দ্রব্য ক্রয়ের জন্য তাঁহাদের একজন বাজারে গমন করেন। তথায় তাঁহার দৃষ্টি অকস্মাৎ এক কূলটা রমণীর প্রতি পতিত হওয়ায় তাহার প্রেমে আকৃষ্ট হইয়া তিনি তথায়ই রহিয়া গেলেন। এইরূপে কয়েক দিন অতিবাহিত হইয়া গেল। তখন অপর বন্ধু তাহার খোঁজে বাহির হইয়া পড়িলেন। ঘটনা শ্রবণ করতঃ তিনি তাঁহার নিকট যাইয়া উপস্থিত হইলেন। কূলটা রমণীর প্রেমাসক্ত ব্যক্তি লজ্জিত হইয়া বলিলেন : তুমি কে? আমি তোমাকে চিনি না। তিনি বলিলেন : প্রিয় ভ্রাতাঃ উদ্বিগ্ন হইও না। অদ্যকার ন্যায় এত ভালবাসা তোমার প্রতি ইতিপূর্বে কখনই ছিল না। এই কথা বলিয়া তিনি তাঁহাকে আলিঙ্গন করতঃ চুম্বন করিলেন। ইহাতে তিনি বুঝিতে পারিলেন যে, বন্ধুর অনুগ্রহ দৃষ্টি হইতে তিনি তখনও বঞ্চিত হন নাই। তৎক্ষণাৎ তিনি তওবা করিলেন। এবং বন্ধুর সহিত চলিয়া গেলেন।
উপরিউক্ত বর্ণনা হইতে বুঝা যায় যে, হযরত আবু যর (রাঃ) মত অর্থাৎ পাপাসক্ত বন্ধুর সহিত বন্ধুত্ব ছিন্ন করা নিরাপত্তার নিকটবর্তী হইতে হযরত আবু দরদা (রাঃ) মত অর্থাৎ তওবা করতঃ সৎপথে প্রত্যাবর্তনের আশায় পাপাসক্ত বন্ধুর বন্ধুত্ব ছিন্ন না করা অধিকতর ফিকাহ শাস্ত্রসম্মত ও অধিকতর সূক্ষ্ম দৃষ্টি প্রসূত। কারণ, বন্ধুর সহানুভূতি অবশেষে পাপাসক্ত ব্যক্তির তওবার কারণ হইয়া দাঁড়ায়। অপর পক্ষে পাপ-পংকিলে লিপ্ত হইয়া মানব যখন আত্ম সংশোধনে অক্ষম ও অপারগ হইয়া পড়ে তখনই তাহার ধর্মবন্ধুর সাহায্য ও সহানুভূতির সর্বাধিক প্রয়োজন। সুতরাং তাহাকে ত্যাগ করা যায় কিরূপে?
বন্ধুত্ব স্থাপনের পর পাপাসক্ত হইয়া পড়িলে বন্ধুত্ব বর্জন না করা ফিকাহ শাস্ত্রসম্মত বলার কারণ এই যে, উভয়ের স্থাপিত বন্ধুত্ব আত্মীয়তার বিধানের অন্তর্ভুক্ত। পাপের কারণে আত্মীয়তা ছিন্ন করা দুরস্ত নহে। এই জন্য আল্লাহ্ বলেন :
“যদি আত্মীয়-স্বজন তোমার প্রতি নাফরমানী করে তবে বলিয়া দাও, আমি তোমার কার্যের প্রতি অসন্তুষ্ট।”
এ স্থলে নাফরমানের প্রতি অসন্তুষ্ট হওয়ার জন্য আল্লাহ্ বলেন নাই।
হযরত আবু দারদা (রা)-কে লোকে জিজ্ঞাসা করিল : আপনার ভ্রাতা পাপ করে। আপনি তাহাকে দুশমন বলিয়া গণ্য করেন না কেন? তিনি বলিলেনঃ আমি তাহার পাপের প্রতি তো অসন্তুষ্ট। কিন্তু সে আমার ভাই (তাহার প্রতি অসন্তুষ্ট হইতে পারি কিরূপে?)
পাপাচারী ব্যক্তির সহিত বন্ধুত্ব স্থাপন না করাই উচিত। কারণ, বন্ধুত্ব স্থাপন করতঃ ইহা ছিন্ন করা প্রতারণা (খেয়ানত) কিন্তু বন্ধুত্ব স্থাপন না করা প্রতারণা নহে। আর বন্ধুত্ব ছিন্ন করিলে বন্ধুত্ব স্থাপনের পর যে অধিকার প্রাপ্য হইয়াছিল তাহা লংঘন করা হয়। সমস্ত আলিমই এ বিষয়ে একমত পোষণ করেন।
তোমার বন্ধু তোমার নিকট কোন অপরাধ করিয়া থাকিলে তাহাকে ক্ষমা করিয়া দেওয়াই উত্তম। অপরাধ করিয়া সে যদি দোষ-স্খলণের জন্য কারণ দর্শায় এবং তুমি ইহাকে মিথ্যা বলিয়া বুঝিতে পার তথাপি উহা মানিয়া লইবে।
রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন:
“যে ব্যক্তি স্বীয় ভ্রাতার ওযর গ্রহণ করে না সে ব্যক্তি রাস্তায় মুসলমানগণের নিকট হইতে খিরাজ আদায়কারীর ন্যায় পাপী (সাধারণত অমুসলমানগণের নিকট হইতে নির্ধারিত হারে যে ভূমিকর আদায় করা হয় তাহাকে খিরাজ বলে)। তিনি আরও বলেন : মুসলমান শীঘ্র অসন্তুষ্ট হয় এবং শীঘ্র সন্তুষ্ট হইয়া থাকে।
হযরত আবু সুলাইমান দারানী (রঃ) স্বীয় মুরীদকে বলেন : তোমার কোন বন্ধু হইতে কোন অন্যায় আচরণ লক্ষ্য করিলে তাহাকে তিরস্কার করিবে না। তিরস্কার করিলে তুমি হয়ত এমন কথা শুনিবে যাহা সে অন্যায় আচরণ হইতে অধিক পীড়াদায়ক। সেই মুরীদ বলেন : আমি যাচাই করিয়া হযরত পীর সাহেবের উক্ত উপদেশ অনুযায়ী ব্যবহার পাইয়াছি।
(৭) সংসর্গ ও বন্ধুত্বের সপ্তম কর্তব্য হল,- বন্ধুর জীবদ্দশায় ও তাহার মৃত্যুর পরও তাহার জন্য দু'আ করা। নিজের স্ত্রী-পুত্র-পরিবারের জন্য যেমন দু'আ করিয়া থাক তদ্রুপ তাহার স্ত্রী-পুত্র-পরিবারের জন্যও দু'আ করিবে। বস্তুত বন্ধুর জন্য দু'আ প্রকারান্তরে নিজের জন্যই হইয়া থাকে।
রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : যে ব্যক্তি স্বীয় ভ্রাতার অগোচরে তাহার মঙ্গলের জন্য দু’আ করিয়া থাকে, ফেরেশতাগণ তাহার মঙ্গলের জন্য ঠিক তদ্রুপ দু'আ করিয়া থাকেন। অপর এক রেওয়ায়েতে বর্ণিত আছে যে, তখন স্বয়ং আল্লাহ্ দু’আকারী বন্ধুকে উদ্দেশ্য করিয়া বলেন : আমি প্রথমে তোমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করিব। রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : অগোচরে বন্ধুগণের জন্য দু'আ আল্লাহ্ প্রত্যাখ্যান করেন না।
হযরত আবু দারদা (রাঃ) বলেনঃ আমি সিজদায় সত্তরজন বন্ধুর নাম করিয়া তাঁহাদের জন্য দু'আ করিয়া থাকি। বুযর্গগণ বলেনঃ তোমার মৃত্যুর পর ওয়ারিশগণ যখন তোমার পরিত্যক্ত ধন-সম্পত্তি বন্টনে ব্যস্ত থাকে তখন যে তোমার জন্য দু'আ করে এবং পরকালে আল্লাহ্ তোমার সহিত কিরূপ ব্যবহার করেন, এই আশংকায় যে বিহ্ববল থাকে সে ব্যক্তিই তোমার বন্ধু।
রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন :
"মৃত ব্যক্তির দৃষ্টান্ত পানিতে নিমজ্জমান ব্যক্তির ন্যায়। নিমজ্জমান ব্যক্তি যেমন অবলম্বন পাওয়ার আশায় হাতড়াইয়া থাকে, মৃত ব্যক্তিও তদ্রুপ স্ত্রী-সন্তান-সন্ততি এবং বন্ধুদের প্রতীক্ষায় থাকে।"
আর জীবিতদের দু'আ নূরের পাহাড় হইয়া মৃতের কবরসমূহে পৌছিয়া থাকে। হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, নূরের ভাণ্ডে করিয়া দু'আ মৃতদের সম্মুখে উপস্থিত করা হয় এবং বলা হয়, ইহা অমুকের পক্ষ হইতে তোমার নিকট উপহার। জীবিত লোকে উপহার পাইয়া যেরূপ সন্তুষ্ট হইয়া থাকে, মৃত ব্যক্তিও তদ্রুপ সন্তুষ্ট হইয়া থাকে।

(৮) সংসর্গ ও বন্ধুত্বের অষ্টম কর্তব্য হল বন্ধুত্বের প্রতিদান হক কখনও না ভোলা। বন্ধুত্বের হক না ভোলার অর্থ ইহাও যে, বন্ধুর মৃত্যুর পর তাহার স্ত্রী-পুত্র, পরিবার-পরিজন ও তাহার বন্ধুবর্গের খোঁজ-খবর লইতে হইবে।
এক বৃদ্ধা রাসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর দরবারে উপস্থিত হইলে তিনি তাঁহার অতিশয় সম্মান প্রদর্শন করিলেন। সমবেত সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) ইহাতে বিস্মিত হইলে হুজুর (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলিলেন : এই মহিলা বিবি খাদীজা (রাঃ)-এর জীবদ্দশায় আমাদের এখানে আসিত।
বন্ধুত্বের কর্তব্য সম্পাদন করা ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। বন্ধুর মৃত্যুর পর তাহার পরিবারবর্গ, দাস-দাসী, শিষ্য প্রভৃতি যে সমস্ত লোকের তাহার সহিত সম্পর্ক ছিল, তাহাদের সকলের প্রতি অনুগ্রহ দৃষ্টি রাখাও বন্ধুর প্রতি বিশ্বস্ততার মধ্যে গণ্য। বন্ধুর প্রতি যেরূপ ভালবাসা ও অনুগ্রহ ছিল তাহাদের প্রতি তদপেক্ষা অধিক অনুগ্রহ করা কর্তব্য। উচ্চ পদ, ধন-দৌলত এমনকি রাজ্যলাভের পরও বন্ধুর প্রতি পূর্ব নম্রতা সৌজন্য প্রদর্শন করা, তাহার সহিত অহংকার না করা এবং সর্বদা বন্ধুত্ব দৃঢ় রাখা ও কোন কারণেই বন্ধুত্ব ছিন্ন না করাকে বন্ধুত্বের হক আদায় করা বলে। কারণ, ভাই- ই-বন্ধুদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটান শয়তানের বড় কাজ যেমন আল্লাহ্ বলেন-
"অবশ্যই শয়তান তাহাদের মধ্যে বিবাদ বাধাইয়া দেয়।" অন্যত্র হযরত ইউসুফ (আ) এর উক্তি উদ্ধৃত করিয়া পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ বলেন
"শয়তান আমার ও আমার ভাইগণের মধ্যে বিবাদ বাধাইবার পর....”
বন্ধুর বিরুদ্ধে কেহ কিছু বলিলে ইহাতে কর্ণপাত না করা এবং যাহারা ঐরূপ বলে তাহাদিগকে মিথ্যাবাদী মনে করাও বন্ধুর প্রতি বিশ্বস্ততার নিদর্শন। বন্ধুর শত্রুকে ভাল না বাসা; বরং তাহাকেও নিজের শত্রু মনে করা বন্ধুত্বের পরিচয়। কারণ, যে ব্যক্তি বন্ধুর শত্রুকে ভালবাসে তাহার বন্ধুত্ব দুর্বল।

(৯) সংসর্গ ও বন্ধুত্বের নৰম কর্তব্য হল,- বন্ধুত্বের মধ্য হইতে লৌকিকতা উঠাইয়া দেওয়া এবং একাকী যেরূপভাবে থাকিতে অভ্যস্ত, বন্ধুর সহিতও তদ্রুপই থাকা। এক বন্ধু অপর বন্ধুর সহিত আচার-ব্যবহারে সামাজিক শিষ্টাচারের প্রতি লক্ষ্য রাখিলে বুঝা যাইবে যে, তাহাদের মধ্যে পূর্ণ বন্ধুত্ব স্থাপিত হয় নাই।
হযরত আলী (রাঃ) বলেন : যে বন্ধুর নিকট তোমার ওযর পেশ করিবার ও লৌকিকতা প্রদর্শনের প্রয়োজন হয়, সেই বন্ধুদের মধ্যে নিকৃষ্টতম। হযরত জুনাইদ (রহঃ) বলেন : আমি অনেক বন্ধু দেখিয়াছি। কিন্তু এমন বন্ধুযুগল দেখি নাই যাহাদের একের পদমর্যাদা অপরের বিষণ্নতার কারণ হইয়াছে। তবে তাহাদের কাহারও মধ্যে কোন দোষ-ত্রুটি থাকিলে স্বতন্ত্র কথা।
বুযর্গগণ বলেন : দুনিয়াদার লোকের সহিত শিষ্টাচার রক্ষা করিয়া চলিবে। আর পরলোক প্রিয় ধর্মপরায়ণ লোকের সহিত ওজনসুলভ এবং আরিফগণের (অন্তদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি) সহিত তোমার ইচ্ছানুরূপ আচার-ব্যবহার করিবে। কতিপয় সুফী এই শর্তে একত্রে বাস করিতেন যে, তাহাদের মধ্যে কেহ সর্বদা রোযা রাখিলে বা রোযা না রাখিলে অথবা সারারাত্রি নিদ্রা গেলে বা সারারাত্রি নামায পড়িলে তাহাদের কেহই অপরের নিকট উহার কারণ জিজ্ঞাসা করিবেন না।
ফলকথা, আল্লাহর উদ্দেশ্যে বন্ধুত্বের অর্থ অন্তরঙ্গতা এবং যেখানে অন্তরঙ্গতা রহিয়াছৈ সেখানে লৌকিকতার স্থান নাই ।
(১০) সংসর্গ ও বন্ধুত্বের দশম কর্তব্য হল,- সমস্ত বন্ধুর সম্মুখে নিজকে সর্বাপেক্ষা অধম বলিয়া মনে করা; তাহাদের নিকট হইতে কোন স্বার্থলাভের আশা না করা। তাহাদের নিকট কোন বিষয় গোপন না করা এবং তাহাদের প্রতি সর্ববিধ কর্তব্য সম্পাদন করিতে থাকা।
হযরত জুনাইদ (রহঃ)-এর সম্মুখে এক ব্যক্তি বারবার বলিতেছিল : আজকাল বন্ধু দুর্ভল। তিনি উত্তর দিলেন : তুমি যদি এমন বন্ধুর অনুসন্ধান কর, যে কেবল তোমার খেদমত করিবে তোমার শোক-দুঃখে সহানুভূতি প্রকাশ করিবে, তবে এমন বন্ধু দুর্লভ বটে। কিন্তু যদি এমন বন্ধু অন্বেষণ কর যাহার খেদমত তুমি করিবে এবং যাহার দুঃখে তুমি সহানুভূতি প্রকাশ করিবে তবে এমন বন্ধু অনেক আছে।
বুযর্গগণ বলেন : যে ব্যক্তি নিজকে বন্ধুগণের মধ্যে উত্তম মনে করে সে নিজে পাপী হইবে এবং তৎসঙ্গে অপর বন্ধুকেও পাপী করিবে। আর যে ব্যক্তি নিজকে অপর বন্ধুর সমকক্ষ মনে করিবে সে নিজেও মনঃকষ্ট ভোগ করিবে এবং তাহার বন্ধুও মনঃকষ্ট পাইবে। কিন্তু সে নিজকে সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট মনে করিলে সকল বন্ধুই শান্তি ও আরামে থাকিবে। হযরত আবু মুআবিয়াতুল আসওয়াদ (রঃ) বলেন : আমার সকল বন্ধুই আমা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। তাঁহারা আমাকে প্রাধান্য দিয়া থাকেন এবং আমার শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করিয়া থাকেন।
ঘনিষ্ঠতার বিভিন্ন শ্রেণী অনুযায়ী তাহাদের প্রতি কর্তব্যও বিভিন্ন প্রকার হইয়া থাকে। আল্লাহর সহিত বন্ধুত্বের ঘনিষ্ঠতা সর্বাপেক্ষা দৃঢ়তম। এই ঘনিষ্ঠতার কর্তব্যসমূহ ইতিপূর্বে বর্ণিত হইয়াছে। যাহার সহিত বন্ধুত্ব নাই, কেবল ধর্ম সম্পর্ক বিদ্যমান, তাহার প্রতিও কতিপয় কর্তব্য রহিয়াছে।

পরবর্তী পর্ব

হকদারের হক (৬) বন্ধুত্বের যোগ্যতা


হকদারের হক পর্ব- ৬
📚সৌভাগ্যের পরশমণি   ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

বন্ধুত্বের যোগ্যতা
যোগ্যতা : সকল মানুষই সংসর্গ ও বন্ধুত্বের যোগ্য নহে; বরং সংসর্গ এমন লোকের সহিত রাখা উচিত যাহার মধ্যে তিনটি গুণ আছে।
(১) বুদ্ধিমত্তা। কারণ, নির্বোধের সংসর্গে কোন কল্যাণের আশা নাই। নির্বোধের সহিত বন্ধুত্ব স্থায়ী হয় না এবং পরিণামে তিক্ততা বৃদ্ধি পায়। কেননা নির্বোধ বন্ধুর উপকার করিতে গিয়া অজ্ঞানতাবশতঃ এমন কাজ করিয়া বসিতে পারে যাহা তাহার অকল্যাণের কারণ হইয়া পড়ে। বুযর্গগণ বলেনঃ নির্বোধ হইতে দূরে থাকা সওয়াব এবং তাহার চেহারা দর্শন করা গুনাহ্। যাহাদের কার্যের হিতাহিত জ্ঞান নাই এবং বলিয়া দিলেও বুঝে না, তাহারাই নির্বোধ।
দ্বিতীয় গুণ :
সৎস্বভাব ও সচ্চরিত্রতা। কারণ, অসৎস্বভাবের লোকের সংসর্গে শান্তি লাভের আশা করা যায় না। যখন তাহার অসৎস্বভাব প্রবল হইয়া উঠিবে তখন সে তোমার প্রতি তাহার বন্ধুত্বের সকল কর্তব্য বিনাদ্বিধায় পদদলিত করিয়া ফেলিবে।
তৃতীয় গুণ :
সততা ও ধর্মপরায়ণতা। কারণ, যে ব্যক্তি পাপে অদম্য হইয়া পড়িয়াছে, এবং যে ব্যক্তি আল্লাহ্‌কে ভয় করে না তাহাকে বিশ্বাস করা উচিত নহে। আল্লাহ্ কুরআন শরীফে বলেন :
“এইরূপ ব্যক্তির অনুসরণ করিবে না যাহার অন্তরকে আমার যিকির হইতে গাফিল করিয়া দিয়াছে এবং যে স্বীয় প্রবৃত্তির অনুগমন করিয়া থাকে। বিদআতী লোক হইতে দূরে থাকা উচিত। কারণ, তাহার বিদআতের আপদ অপরের উপর প্রভাব বিস্তার করে। অধুনা এক শ্রেণীর বিদআতী গজাইয়া উঠিয়াছে। তাহাদের অপেক্ষা জঘন্য বিদআতী আর নাই। তাহারা বলে : আল্লাহর বান্দাগণকে বাধা প্রদান করা এবং তাহাদিগকে পাপ ও দুষ্কর্ম হইতে বিরত রাখার কোন প্রয়োজন নাই। কারণ, কোন লোকের সঙ্গেই আমাদের শত্রুতা নাই এবং তাহাদের উপর আমরা শাসকও নহি। এই উক্তিতে নিজের জন্য সর্ববিধ কার্য জায়েয করিয়া লওয়ার বীজ নিহিত রহিয়াছে এবং ইহা খোদাদ্রোহিতার মূল। আর ইহা জঘন্যতম বিদআত। এইরূপ বিদআতী লোকদের সহিত মেলামেশা করা কখনই সঙ্গত নহে। কারণ, এই শ্রেণীর বিদআত কুপ্রবৃত্তির পরিপোষক। শয়তান ইহার সাহায্য করিয়া ঐ প্রকার মনোভাবকে বেশ ভালভাবে সাজাইয়া তাহাদের সহিত মেলামেশাকারীর অন্তরে বসাইয়া দিবে এবং অল্পদিনের মধ্যেই তাহাকে স্পষ্ট ইবাহতী (অবৈধ কাজকে বৈধকারী) বানাইয়া দিবে।
হযরত ইমাম জাফর সাদিক (রহঃ) বলেন : পাঁচ প্রকার লোকের সংসর্গ পরিত্যাগ কর। (১) মিথ্যাবাদী। কারণ, তাহার দ্বারা তুমি সর্বদা প্রতারিত হইবে। (২) নির্বোধ। কেননা, নির্বোধ ব্যক্তি তোমার উপকার করিতে গিয়া অজ্ঞানতাবশতঃ তোমার অপকার করিয়া ফেলিবে। (৩) কৃপণ কেননা, কৃপণ নিতান্ত প্রয়োজনকালে তোমার সহিত বন্ধুত্ব বর্জন করিবে। (৪) ভীরু। কারণ এইরূপ ব্যক্তি প্রয়োজনের সময় তোমাকে পরিত্যাগ করিবে। (৫) ফাসিক, কারণ, ফাসিক এক লোকমার বিনিময়ে কিংবা তদপেক্ষা অল্পমূল্যে তোমাকে বিক্রয় করিয়া ফেলিবে।
লোকে জিজ্ঞাসা করিল : এক লোকমা অপেক্ষা অল্প কি? তিনি বলিলেনঃ এক লোকমা-লাভের আশা। হযরত জুনাইদ (রহঃ) বলেন : কুস্বভাবী আলিমের বন্ধুত্ব অপেক্ষা সৎস্বভাবী ফাসিকের বন্ধুত্ব আমার নিকট অধিক পছন্দনীয়।
উপরিউক্ত গুণসমূহ সমষ্টিগতভাবে একই ব্যক্তির মধ্যে খুব কমই পাওয়া যায়। অতএব বন্ধুত্বের উদ্দেশ্য কি, বুঝিতে হইবে। কেবল ভালবাসা ও সখ্যতা তোমার উদ্দেশ্য হইলে সচ্চরিত্রবান লোক অন্বেষণ কর। ধর্মীয় কল্যাণ উদ্দেশ্য হইলে পরহিযগার আলিমের অনুসন্ধান কর এবং পার্থিব মঙ্গল উদ্দেশ্য হইলে দানশীল ও দয়ালু ব্যক্তির তালাশ কর। তাহাদের প্রত্যেকের জন্য ভিন্ন ভিন্ন শর্ত আছে।
সমাজে তিন শ্রেণীর লোক আছে। এক প্রকার লোক খাদ্যবস্তুর ন্যায় নিত্য প্রয়োজনীয়। তাহাদের ছাড়া লোকের চলে না। অপর এক শ্রেণীর লোক ঔষধসদৃশ। কোন সময় তাহাদের প্রয়োজন হয় না। কিন্তু মানুষ তাহাদের ফাঁদে পড়িয়া যায়। অতএব তাহাদিগ হইতে বাঁচিয়া থাকার জন্য চেষ্টা করা আবশ্যক। মোটকথা এমন লোকের সহিত সংসর্গ রাখা উচিত যাহার দ্বারা তোমার অথবা তোমার দ্বারা তাহার ধর্মীয় কল্যাণ সাধিত হয়।

পরবর্তী পর্ব

হকদারের হক (৫) আল্লাহর শত্রুর শ্রেণী বিভাগ

 

হকদারের হক পর্ব- ৫
📚সৌভাগ্যের পরশমণি   ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
আল্লাহর শত্রুর শ্রেণী বিভাগ
আল্লাহর শত্রুগণ বহু শ্রেণীতে বিভক্ত। সুতরাং তাহাদের প্রতি ক্রোধ পোষণ ও কঠোরতা অবলম্বনেও তারতম্য ঘটিয়া থাকে।
প্রথম শ্রেণী : কাফিরগণ এ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। মুসলমানগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ-বিগ্রহে রত কাফিরদের প্রতি শত্রুতা স্বতঃই ফরয। তাহাদিগকে (যারা যুদ্ধে লিপ্ত) হত্যা করিতে হইবে।
দ্বিতীয় শ্রেণী : যিম্মী অর্থাৎ জান-মালের নিরাপত্তার প্রতিদানে জিযিয়া কর দান করতঃ ইসলামী রাষ্ট্রের আশ্রয়ে বসবাসকারী অমুসলমানগণ এই শ্রেণীর অন্তর্গত। তাহাদের সহিতও শত্রুতা ফরয। তাহাদের সহিত এরূপ ব্যবহার করিতে হইবে যেন তাহারা গুনাহর পাত্র হইয়া থাকে এবং সম্মান না পায় ও তাহাদের জীবনযাত্রা সংকীর্ণ করিয়া রাখিবে। তাহাদের সহিত বন্ধুত্ব স্থাপন করা মাকরূহ তাহরীমা। এমনকি হারাম হওয়ার সম্ভাবনাও রহিয়াছে। এই সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন :
“যাহারা আল্লাহ্ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে, আপনি তাহাদিগকে সে সমস্ত লোকের সহিত বন্ধুত্ব স্থাপন করিতে দেখিবেন না যাহারা আল্লাহ্ ও তদীয় রসূলের বিরোধী।”
যিম্মীদের উপর নির্ভর করা তাহাদিগকে মুসলমানের উপর শাসক ও বিচারকরূপে নিযুক্ত করা কবীরা গুনাহ্ এবং এইরূপ করিলে ইসলামের অবমাননা করা হয়।
তৃতীয় শ্রেণী : বিদআতীলোক যাহারা মানুষকে শরীয়ত বহির্ভুত নূতন নূতন অপকার্যের প্রতি আহ্বান করে তাহারা এই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। তাহাদের সহিতও শত্রুতা প্রকাশ করা আবশ্যক যেন লোকের মনে তাহাদের প্রতি ঘৃণার উদ্রেক হয়। তাহাদিগকে সালাম না দেওয়া, তাহাদের সঙ্গে কথাবার্তা না বলা এবং তাহাদের সালামের জওয়াব না দেওয়াই উত্তম। কারণ, তাহারা বিদআতের প্রতি আহ্বান করিলে লোকে যদি ঐদিকে ঝুঁকিয়া পড়ে তবে বিদআতের পাপ সমাজে বিস্তার লাভ করিবে এবং ঝগড়া-ফাসাদ সৃষ্টি হইবে। কিন্তু বিদআতী ব্যক্তি সাধারণ লোক হইলে এবং সে অপরকে বিদআতের দিকে আহ্বান না করিলে তাহার প্রতি তদ্রূপ কার্য করা অতি সহজ।
চতুর্থ শ্রেণী : এমন পাপী যাহাদের পাপের দরূন মানবের দুঃখ-কষ্ট হইয়া থাকে তাহারা এই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। যেমন— অত্যচার, মিথ্যা সাক্ষ্য গ্রহণ ও পক্ষপাতিত্ব করিয়া বিচার করা; কাহারো কুৎসা রটনা করা, পরনিন্দা করা। মানুষের মধ্যে পরস্পর ঝগড়া-বিবাদ বাধাইয়া দেওয়া। এই শ্রেণীর পাপীদিগ হইতে বিমুখ থাকা এবং তাহাদের প্রতি কঠোর ব্যবস্থা করা অতি উত্তম কার্য। তাহাদের সহিত বন্ধুত্ব স্থাপন করা ঘৃণ্য কার্য এবং একেবারে হারাম করা হয় নাই। কারণ তাহা হইলে সমাজে বাস করা কষ্টকর হইত।
পঞ্চম শ্রেণী : মদ্যপায়ী ও পাপে লিপ্ত এমন লোকগণ এই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত যাহাদের পাপের দরুন অপর লোকের কোন প্রকার দুঃখ-কষ্ট হয় না। এমন লোকের সহিত আচরণ অধিকতর সহজ। সংশোধনের আশা থাকিলে এমন লোকের সহিত নম্র ব্যবহার করা এবং তাহাদিগকে সদুপদেশ প্রদান করা উত্তম। অন্যথায় তাহাদিগ হইতে বিমুখ থাকাই উত্তম। কিন্তু তাহাদের সালামের জওয়াব দেওয়া উচিত এবং তাহাদিগকে অভিশাপ দেওয়া সঙ্গত নহে। রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর যমানায় এক ব্যক্তি কয়েকবার মদ্য পান করে। এই জন্য তাহাকে যথাবিহিত শাস্তি প্রদান করা হয়। এক সাহাবী (রঃ) তাহাকে অভিশাপ করিয়া বলিলেন : তাহার ফাসাদ আর কতদিন চলিবে? রাসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) তাঁহাকে অভিশাপ করিতে নিষেধ করিয়া বলিলেন : শয়তান তাহার শত্রুতার জন্য যথেষ্ট; তুমিও শয়তানের সাহায্যকারী হইও না।

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...