মঙ্গলবার, ২ এপ্রিল, ২০২৪

নফল নামায (পর্ব - ১০) বুধবার রাত্রি ও দিনের নফল নামাজ

 

নফল নামায - (পর্ব - ১০)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
বুধবার  রাত্রি ও দিনের নফল নামাজ

বুধবার রাত্রির (মঙ্গলবার দিনগত) নামাজ- 
(১) হযরত ফাতেমা (রাঃ) এর রেওয়ায়েতে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : যেব্যক্তি বুধবার রাতে তিন সালাম সহকারে ছয় রাকআত নামায পড়ে- 
প্রত্যেক রাকআতে আলহামদু লিল্লাহর পর (কুলিল্লাহুম্মা মালিকিল মুলকি) এ থেকে দু’আয়াত পর্যন্ত পাঠ করে এবং 
নামাযান্তে বলে “জাযাল্লাহু মুহাম্মাদান আন্না মা-হুয়া আহদাহ্”  (আল্লাহ মুহাম্মদকে আমাদের পক্ষ থেকে যোগ্য প্রতিদান দিন।) 
আল্লাহ তার সত্তর বছরের গোনাহ ক্ষমা করবেন এবং তার জন্যে দোযখ থেকে পরিত্রাণপত্র লেখে দেবেন। 

(২) আরও বর্ণিত আছে, যেব্যক্তি বুধবার রাতে দু'রাকআত নামায পড়ে- প্রথম রাকআতে আলহামদু একবার , সূরা ফালাক দশ (১০) বার এবং দ্বিতীয় রাকআতে আলহামদুর পর সূরা নাস দশ (১০) বার।

 সালামের পর দশ (১০) বার এস্তেগফার এবং দশ (১০) বার দরূদ শরীফ পাঠ করে, তার সওয়াব লেখার জন্যে প্রত্যেক আকাশ থেকে সত্তর হাজার ফেরেশতা অবতরণ করে এবং কেয়ামত পর্যন্ত তার সওয়াব লেখতে থাকে। 

বুধবার দিনের নামাজ-
হযরত মুআ'য ইবনে জাবাল (রাঃ)-এর রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : যেব্যক্তি বুধবারে দ্বিপ্রহরের পূর্বে (১২) বার রাকআত নামায পড়ে এবং প্রত্যেক রাকআতে >আলহামদু ও আয়াতুল কুরসী এক একবার, 
>সূরা এখলাস, সূরা ফালাক ও নাস তিন বার করে পাঠ করে, 
তাকে আরশের কাছ থেকে ফেরেশতারা ডাক দিয়ে বলে হে আল্লাহর বান্দা আবার আমল কর। তোমার পূর্ব গোনাহ ক্ষমা করা হয়েছে। এ ছাড়া আল্লাহ তাআলা তার কবরের অন্ধকার ও সংকীর্ণতা ও কেয়ামতের কঠোরতা দূরীভূত করে দেবেন। সেদিন থেকেই তার জন্যে একজন পয়গম্বরের আমল উপরে উঠতে থাকবে। 

পরবর্তী পর্ব

নফল নামায (পর্ব - ৯) মঙ্গলবার রাত্রি ও দিনের নামাজ



নফল নামায - (পর্ব -৯ )
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
মঙ্গলবার  রাত্রি ও দিনের নামাজ

মঙ্গলবার  রাত্রি (সোমবার দিনগত রাতের) নামাজ-
(১) এ রাতে দু'রাকআত নামায পড়বে। প্রত্যেক রাকআতে আলহামদু, এখলাস, ফালাক ও নাস প্রতিটি পনর বার, সালামের পর আয়াতুল কুরসী পনর বার এবং এস্তেগফার পনর বার পাঠ করবে। 

(২) হযরত ওমর (রাঃ) এর রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : যেব্যক্তি মঙ্গলবার রাতে দু'রাকআত নামায পড়ে- প্রত্যেক রাকআতে একবার আলহামদু, সূরা কদর এবং এখলাস সাত সাত বার পাঠ করে, আল্লাহ তাআলা তাকে দোযখ থেকে মুক্তি দেন এবং কেয়ামতের দিন এ নামায তাকে জান্নাতের দিকে পথ প্রদর্শন করবে। 

মঙ্গলবার দিনের নামাজ-
হযরত আনাস (রাঃ)-এর রেওয়ায়েতে নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ “যেব্যক্তি মঙ্গলবার দিন দ্বিপ্রহরের কাছাকাছি সময়ে দশ রাকআত পড়ে, প্রত্যেক রাকআতে আলহামদু, আয়াতুল কুরসী এক একবার এবং সূরা এখলাস তিন বার পাঠ করে, তার সত্তর দিনের গোনাহ লেখা হবে না। সত্তর দিনের মধ্যে সে মারা গেলে শহীদের মর্তবা নিয়ে মারা যাবে এবং তার সত্তর বছরের গোনাহ মার্জনা করা হবে। 

পরবর্তী পর্ব

নফল নামায (পর্ব - ৮) সোমবার রাত্রি ও দিনের নফল নামাজ



নফল নামায - (পর্ব - ৮)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
সোমবার রাত্রি ও দিনের নফল নামাজ  

সোমবার রাত্রি রবিবার দিনগত রাত (সালাতে হাজত) -
হযরত আনাস (রাঃ)-এর রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : যেব্যক্তি সোমবার রাতে চার রাকআত নামায পড়ে- 
>প্রথম রাকআতে আলহামদু ও সূরা এখলাস দশ বার, 
>দ্বিতীয় রাকআতে আলহামদু ও সূরা এখলাস কুড়ি বার, 
>তৃতীয় রাকআতে আলহামদু ও সূরা এখলাস ত্রিশ বার এবং 
>চতুর্থ রাকআতে আলহামদু ও সূরা এখলাস চল্লিশ বার পাঠ করে। 

>এর পর সালাম ফিরিয়ে পঁচাত্তর বার সূরা এখলাস পড়ে নিজের ও পিতামাতার জন্যে মাগফেরাতের দোয়া করে এবং আল্লাহ তা'আলার কাছে নিজের প্রয়োজন ব্যক্ত করে, তার প্রার্থনা পূর্ণ করা আল্লাহ তাআলা নিজের উপর জরুরী করে নেন। 
এ নামাযকে সালাতে হাজত বলা হয়। 

সোমবার দিনের নামাজ--
(১) হযরত জাবের (রাঃ)-এর রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : যেব্যক্তি সোমবার দিন সূর্য উপরে উঠার পর দু'রাকআত পড়ে, প্রত্যেক রাকআতে সুরা (ফাতেহা) আলহামদু একবার, আয়াতুল কুরসী একবার, এখলাস, ফালাক ও নাস একবার করে পাঠ করে এবং সালামের পর দশ বার এস্তেগফার ও দশ বার দরূদ পাঠ করে, আল্লাহ তাআলা তার সকল গোনাহ মাফ করে দেন৷ 
(২) হযরত আনাস ইবনে মালেক (রাঃ)-এর রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : "যেব্যক্তি সোমবার দিন বার রাকআত পড়ে, প্রত্যেক রাকআতে আলহামদু ও আয়াতুল কুরসী এক একবার এবং নামায শেষে সূরা এখলাস ও এস্তেগফার ‘বার’ বার পড়ে, তাকে কেয়ামতের দিন অমুকের পুত্র অমুক কোথায়, উঠ এবং তোমার সওয়াব নাও, বলে আহ্বান করা হবে। অতঃপর প্রথম সওয়াবস্বরূপ তাকে এক হাজার বেহেশতী পোশাক দেয়া হবে। তার মাথায় মুকুট রাখা হবে। তাকে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হবে। তখন এক হাজার ফেরেশতা তার অভ্যর্থনার জন্যে পৃথক পৃথক উপঢৌকন নিয়ে আগমন করবে এবং তার সাথে সাথে থাকবে। 

পরবর্তী পর্ব


নফল নামায (পর্ব - ৭) রবিবার দিন ও রাত্রির নফল নামাজ



নফল নামায - (পর্ব - ৭)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
রবিবার রাত্রি ও দিনের নফল নামাজ  

রবিবার রাত্রির নামাজ (শনিবার দিনগত রাত)
হযরত আনাস (রাঃ)-এর রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন, যেব্যক্তি রবিবার রাতে কুড়ি রাকআত নামায পড়ে- প্রত্যেক রাকআতে আলহামদুর পর সূরা এখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস একবার পাঠ করে নিজের পিতামাতার জন্যে একশ' বার মাগফেরাতের দোয়া করে,
[ربي اغفر لأمي وأبي] রব্বিগফিরলী আবি ওয়া উম্মী।

রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর প্রতি একশ' বার দরূদ প্রেরণ করে, নিজের শক্তি থেকে আলাদা হয়ে আল্লাহর শক্তির আশ্রয় প্রার্থনা করে, 
অতঃপর বলে -
 "أشهد أن لا إله إلا الله ,وأشهد أن آدم مصطفي الله وفطرته, إبراهيم خليل الله , عيسى روح الله , محمد (صلى الله عليه وسلم) حبيب الله"
উচ্চারণ : (আশহাদু আন- লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়া আশহাদু আন আদম মুস্তাফি আল্লাহ্ ওয়া ফিতরাত, ইব্রাহীম খলীলুল্লাহ্, ঈসা রুহুল্লাহ্ ওয়া মুহম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) হাবীবুল্লাহ্)
অর্থাত : 'আমি সাক্ষ্য দেই যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। আমি আরো সাক্ষ্য দেই, আদম আল্লাহর মনোনীত ও তাঁর ফিতরত, ইবরাহীম আল্লাহর খলীল, মূসা আল্লাহর সাথে বাক্যালাপকারী, ঈসা আল্লাহর রূহ এবং মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর হাবীব। 
সে তাদের সংখ্যা পরিমাণে সওয়াব পাবে, যারা আল্লাহ তাআলার সন্তান আছে বলে বিশ্বাস করে এবং যারা তা বিশ্বাস করে না। কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে শান্তিপ্রাপ্তদের সাথে উত্থিত করবেন এবং জান্নাতে পয়গম্বরগণের দলভুক্ত করবেন। 

রবিবার দিনের নামাজ-
হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ)-এর রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ যেব্যক্তি রবিবার দিন চার রাকআত পড়ে এবং প্রত্যেক রাকআতে আলহামদু (সুরা ফাতেহা) ও আমানার রাসূলু (সুরা বাকারা শেষের তিন আয়াত) একবার পাঠ করে, আল্লাহ তাআলা তার জন্যে খৃস্টান পুরুষ ও খৃস্টান নারীর সমসংখ্যক সওয়াব লেখবেন। তাকে একজন নবীর সওয়াব দেবেন এবং এক হজ্জ ও ওমরা তার জন্যে লিপিবদ্ধ করবেন। প্রত্যেক -রাকআতের বদলে হাজার নামাযের সওয়াব লেখবেন। প্রত্যেক অক্ষরের বিনিময়ে জান্নাতে একটি মেশকের শহর দেবেন।”  
হযরত আলী (রাঃ)-এর রেওয়ায়েতে রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : রবিবার দিন অধিক নামায পড়ে আল্লাহ তাআলার একত্ব ঘোষণা কর। (লা ইলাহা ইল্লল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকালাহু) তিনি এক, তার কোন শরীক নেই। 
অতএব যেব্যক্তি রবিবার দিন যোহরের ফরয ও সুন্নতের পর চার রাকআত পড়ে, 
প্রথম রাকআতে আলহামদু ও আলিফ লাম সেজদা এবং দ্বিতীয় রাকআতে আলহামদু ও সূরা মুলক পড়ে আত্তাহিয়্যাতু পাঠ করতঃ সালাম ফেরায়, এর পর দাঁড়িয়ে আরও দু'রাকআত পড়ে, প্রথম রাকআতে আলহামদু ও সূরা জুমুআ এবং দ্বিতীয় রাকআতেও এ সূরাই পড়ে, এর পর আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন ব্যক্ত করে, আল্লাহ তাআলার জন্যে তার প্রয়োজন মেটানো অপরিহার্য হয়ে যাবে।”


পরবর্তী পর্ব 

নফল নামায (পর্ব - ৩) চাশতের নামায


নফল নামায - (পর্ব - ৩)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

চাশতের নামায-
চাশতের নামায নিয়মিত পড়া একটি উত্তম আমল। এর সংখ্যা সর্বোচ্চ আট রাকআত বর্ণিত আছে। হযরত উম্মে হানী (রাঃ) বর্ণনা করেন, রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) চাশতের নামায আট রাকআত পড়েছেন এবং খুব দীর্ঘ করে ও উত্তমরূপে পড়েছেন। এ সংখ্যা অন্য কোন রাবী বর্ণনা করেননি। হযরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেন, নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) চাশতের নামায নিয়মিতভাবে চার রাকআত পড়েছেন এবং মাঝে মাঝে বেশীও পড়েছেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) বেশীর সীমা উল্লেখ করেননি। এ থেকে জানা যায়, তিনি চার রাকআত নিয়মিত পড়তেন- এর কম পড়তেন না এবং মাঝে মাঝে বেশীও পড়তেন। হযরত আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) চাশতের নামায ছয় রাকআত দু’ওয়াক্তে পড়তেন।

"উদয়ের পর সূর্য যখন সামান্য উপরে উঠতো, তখন তিনি দাঁড়িয়ে : দু'রাকআত পড়তেন। এরপর যখন সূর্যের কিরণ ছড়িয়ে পড়তো এবং সূর্য আকাশের পূর্ব প্রান্তে থাকত, তখন চার রাকআত পড়তেন। মোট কথা, সূর্য যখন অর্ধ বর্শা পরিমাণ উপরে উঠত, তখন দু'রাকআত পড়তেন এবং সূর্য যথেষ্ট উপরে উঠার পর চার রাকআত পড়তেন। সুতরাং চাশতের সময় এভাবে নির্ণীত হবে, সূর্যোদয় থেকে সূর্য ঢলে পড়া পর্যন্ত মোট সময়ের অর্ধেক হলে চাশত পড়া উচিত; যেমন সূর্য ঢলে পড়া থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত মোট সময়ের অর্ধাংশের সময় আসরের নামায পড়া হয়। অতএব আসরের সময়ের বিপরীত সময় হচ্ছে চাশতের সময়। এ সময়টি -চাশতের উত্তম সময়। নতুবা সূর্য উপরে উঠার পর থেকে দ্বিপ্রহরের পূর্ব পর্যন্ত যেকোন সময় চাশত পড়া যায়।

মন্তব্য:- [সূর্য উদয়ের ২০ মিনিটf পর (২+২) চার রাকাত ইশরাক এবং দশটার পর যাওয়ালের (পশ্চিমে হেলা) পূর্বে চার রাকাত চাশত নামাজের উপযুক্ত সময় ।]


পরবর্তী পর্ব

নফল নামায (পর্ব - ২) পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সুন্নত সমুহ 📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন



নফল নামায - (পর্ব - ২)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সুন্নত সমুহ
(১) ফজরের সুন্নত
পাঞ্জেগানা নামাযের মধ্যে ফজরের সুন্নত দু'রাকআত। এ সম্পর্কে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : “ফজরের দু'রাকআত দুনিয়া ও দুনিয়াস্থিত সবকিছু অপেক্ষা উত্তম।” এর সময় সোবহে সাদেক থেকে শুরু হয়ে যায়। আকাশের কিনারায় ফজরের পূর্বে বিস্তৃত শুভ্র রেখাকে সোবহে সাদেক বলা হয়। শুরুতে এটা চেনা খুবই কঠিন। এর জন্যে চন্দ্রের উদয় অস্তের সময় জানতে হবে। প্রতি মাসে দু'বার চন্দ্র দ্বারা সোবহে সাদেক চেনা যায়। ছাব্বিশতম রাতে চাঁদ সোবহে সাদেকের সাথে উদিত হয় এবং দ্বাদশতম রাতে চাদের অস্ত যাওয়ার সাথে সাথে প্রায় সোবহে সাদেক হয়ে যায়। যে আখেরাত তলব করে, তার জন্যে চাঁদের এসব মনযিল চেনা জরুরী। এতে রাত্রিকালীন সময়ের পরিমাণ ও সোবহে সাদেক চেনা যায়। যখন ফজরের ফরয সময় শেষ হয়, তখন সুন্নতের সময়ও শেষ হয়ে যায়। অর্থাৎ, সূর্যোদয়ের সময় এরপর নামায পড়া যায় না। ফরযের পূর্বে এ দু'রাকআত পড়া সুন্নত। মসজিদে আসার পর যদি ফরযের তকবীর হয়ে যায়, তবে ফরয নামাযেই শামিল হয়ে যাবে। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ “নামাযের তকবীর হয়ে গেলে ফরয ছাড়া কোন নামায পড়া যাবে না।” ফরয নামায শেষ হলে সুন্নত পড়ে নেবে। সূর্যোদয়ের পূর্বে পড়লে তাও আদায় হবে। কেননা, সময়ের মধ্যে সুন্নত ফরযের অনুগামী। তবে জামাআত ফওত না হলে এ সুন্নত ফরযের পূর্বে পড়া সুন্নত। 

মোস্তাহাব এই, এ সুন্নত গৃহে সংক্ষেপে পড়ে মসজিদে যাবে এবং দু'রাকআত তাহিয়্যাতুল মসজিদ পড়ে বসে যাবে। ফরয পড়া পর্যন্ত কোন নামায পড়বে না । এর পর সূর্যোদয় পর্যন্ত যিকিরে মশগুল থাকবে।

(২) যোহরের সুন্নত
যোহরের সুন্নত ছয় রাকআত। ফরযের পূর্বে চার রাকআত এবং পরে দু'রাকআত। এ দু'রাকআত সুন্নতে মোআক্কাদা। হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) থেকে রেওয়ায়েত করেন, যেব্যক্তি সূর্য ঢলে পড়ার (যাওয়াল) পর চার রাকআত নামায পড়ে এবং তার কেরাআত, রুকু ও সেজদা ভালরূপে করে, তার সাথে সত্তর হাজার ফেরেশতা নামায পড়ে এবং রাত্রি পর্যন্ত তার জন্যে মাগফেরাতের দোয়া করে। 

(৩) আসরের সুন্নত
আসরের পূর্বে চার রাকআত নফল নামায। হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ)-এর রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন  : “আল্লাহ সেই বান্দার প্রতি রহম করুন যে আসরের পূর্বে চার রাকআত পড়ে।” সুতরাং রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর দোয়ায় দাখিল হওয়ার আশা নিয়ে এই চার রাকআত পড়া মোস্তাহাব। তিনি যোহরের দু'রাকআতের অনুরূপ নিয়মিতভাবে আসরের এই চার রাকআত পড়েন নি।

(৪) মাগরিবের সুন্নত-
মাগরিবের ফরযের পর দু'রাকআত সুন্নত। এক্ষেত্রে একটি ভিন্ন রেওয়ায়েত উবাই ইবনে কাব, ওবাদা ইবনে সামেত, আবু যর, যায়দ ইবনে সাবেত প্রমুখ সাহাবী থেকে বর্ণিত আছে যে, মাগরিবের ফরযের পূর্বে আযান ও একামতের মাঝখানে দু'রাকআত দ্রুত পড়ে নেয়া উচিত। কোন কোন সাহাবী বলেনঃ আমরা মাগরিবের পূর্বে দু'রাকআত পড়তাম। ফলে নতুন আগন্তুক মনে করত, আমরা মাগরিব পড়ে নিয়েছি। এটা আসলে এই হাদীসের ব্যাপকতার মধ্যে দাখিল- “প্রত্যেক দু'আযান অর্থাৎ, আযান ও একামতের মধ্যে নামায রয়েছে। যে চায় সে পড়ুক।” হযরত ইমাম আহমদ (রহঃ) এই দু'রাকআত পড়তেন। কিন্তু লোকেরা এজন্যে তাঁর সমালোচনা শুরু করলে তিনি তা পরিত্যাগ করেন। 
>নিজস্ব মত--
[(এ থেকে বুঝা যায় মাগরিবের ফরযের পূর্বে কোন নামাজ নেই) পরে দুরাকাত সুন্নত। সুন্নতের পরে দু’রাকাত নফল। হানিফি মাজহাবে ইহাই নিয়ম]

(৫) মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী নফল নামায ও সুন্নতে মোআক্কাদা। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর কর্ম দ্বারা এর রাকআত সংখ্যাদ্বয় বর্ণিত আছে। এ নামাযের সওয়াব অনেক। কোন কোন তফসীরবিদ বলেনঃ এ (তাদের পার্শ্ব নিদ্রার স্থান থেকে আলাদা থাকে।) আয়াতে ঐ নামাযই বুঝানো হয়েছে। নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ “যে মাগরিব ও এশার মাঝখানে নামায পড়ে, তার এ নামায আল্লাহর দিকে রুজুকারীদের নামায।”  তিনি আরও বলেন : “যেব্যক্তি মাগরিব ও এশার মাঝখানে নিজেকে মসজিদে আবদ্ধ রাখে এবং নামায ও কোরআন পাঠ ছাড়া অন্য কোন আলাপ-আলোচনা না করে, আল্লাহ তাআলা তার জন্যে জান্নাতে দুটি প্রাসাদ তৈরী করেন, যা পরস্পরের একশ' বছরের দূরত্বে অবস্থিত। তার জন্যে উভয় প্রাসাদের মধ্যস্থলে এত বৃক্ষ রোপণ করেন, দুনিয়ার সকল বাসিন্দা তাতে ঘুরাফেরা করতে চাইলে তাদের জন্যে স্থান সংকুলান হবে।” 

[যতটুকু ধারনা লেখক এখানে আওয়াবিনের নামাজ বুঝাতে চেয়েছন, কারণ মাগরিবের  ও এশার   সুন্নত (‘সংখ্যাদ্বয়’ শব্দ দ্বারা)  তিনি পূর্বেই উল্লেখ করেছেন।

(৬) এশার সুন্নত ও নফল-
এশার ফরযের পর চার রাকআত সুন্নত। হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এশার পর চার রাকআত পড়ে শুয়ে পড়তেন। রসূলে করীম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ নামায একটি সুরক্ষিত কল্যাণ। যার ইচ্ছা কম নিক এবং যার ইচ্ছা বেশী নিক। এ থেকে জানা গেল, প্রত্যেকেই নফল নামায ততটুকু অবলম্বন করবে, যতটুকু তার কল্যাণের প্রতি আগ্রহ থাকে। উপরোক্ত বর্ণনা থেকে একথা প্রকাশ পেয়েছে, নফলসমূহের মধ্যে কতক অধিক মোআক্কাদ (জোরদার) এবং কতক কম মোআক্কাদ। সুতরাং অধিক মোআক্কাদ নফল ছেড়ে দেয়া মোটেই সমীচীন নয়। কেননা, নফল নামায ফরযের জন্যে পরিপূরক হয়ে থাকে। কাজেই নফল বেশী না পড়লে ফরয ত্রুটিযুক্ত ও অসম্পূর্ণ থেকে যাওয়া বিচিত্র নয়।

[এখানে উল্লেখ করা জরুরী যে হানিফি মাযহাব অনুযায়ী এশার পর দু’রাকাত সুন্নতে মোয়াক্কাদা এবং দু রাকাত নফল পূর্বের সুন্নতের কথা মাগরিবের নামাজের সাথে উল্লেখ হয়েছে]

বেতের ওয়াজিব-
(৭) বেতেরের নামায। হযরত আনাস (রাঃ) বলেন  : রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এশার পরে তিন রাকআত বেতের পড়তেন। প্রথম রাকআতে ‘সুরা আলা’ দ্বিতীয় রাকআতে ‘কাফিরূন’ এবং তৃতীয় রাকআতে ‘সূরা এখলাস’ পাঠ করতেন। এক হাদীসে আছে, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বেতেরের পর দু'রাকআত বসে বসে পড়তেন এবং নিদ্রার পূর্বে দু'রাকআত পড়তেন। প্রথম রাকআতে সূরা যিলযাল এবং দ্বিতীয় রাকআতে তাকাসুর পাঠ করতেন। রাত্রিকালীন নফল নামাযের শেষে বেতের পড়া উত্তম। সুতরাং তাহাজ্জুদের পরে বেতের পড়া ভাল। 
[এখানে উল্লখ্য যে, যারা উক্ত সুরা সমুহ না জানেন নিজের যে কোন জানা সুরা পড়তে সমস্যা নেই]

পরবর্তী পর্ব

নফল নামায (পর্ব - ১) নফল নামাজ বিবরণ



নফল নামায - (পর্ব - ১)
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

নফল নামাজের বিবরণ
প্রকাশ থাকে যে, ফরয ছাড়া আরও তিন প্রকার নামায রয়েছে সুন্নত, মোস্তাহাব ও তাতাব্বু । সুন্নত নামায বলতে আমাদের উদ্দেশ্য সেসব নামায, যেগুলো রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) নিয়মিতভাবে আদায় করেছেন; যেমন ফরয নামাযসমূহের পরবর্তী সুন্নত নামাযসমূহ, চাশতের নামায ও তাহাজ্জুদ ইত্যাদি । যে পথে চলা হয়েছে, তাকে বলা হয় সুন্নত । অতএব রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) যে পথে নিয়মিত চলেছেন, তাই হবে সুন্নত । মোস্তাহাব বলে আমাদের উদ্দেশ্য সেই নামায, যার মাহাত্ম্য হাদীসে বর্ণিত রয়েছে । কিন্তু রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) থেকে তা নিয়মিত পড়া বর্ণিত নেই । যেমন, গৃহ থেকে বের হওয়া ও গৃহে আগমনের সময়কার নামায । তাতাব্বু বলে আমরা সেই নামায বুঝিয়েছি, যা সুন্নত ও মোস্তাহাবের আওতায় পড়ে না; অর্থাৎ এ নামাযের পক্ষে বিশেষ কোন হাদীস নেই । কিন্তু বান্দা আল্লাহর সাথে মোনাজাতে উৎসাহী হয়ে এ নামায পড়ে । এই তিন প্রকার নামাযকেই নফল নামায বলা হয় । কেননা, নফল শব্দের অর্থ অতিরিক্ত । বলাবাহুল্য, এই তিন প্রকার নামায ফরযের অতিরিক্ত । এসব উদ্দেশ্য প্রকাশ করার জন্য আমরা উপরোক্ত তিনটি পরিভাষা নির্দিষ্ট করেছি । কেউ এই পরিভাষা বদলে দিতে চাইলে তাতে আমাদের কোন আপত্তি নেই । কেননা, উদ্দেশ্য বুঝে নেয়ার পরে শব্দের কোন গুরুত্ব থাকে না । উপরোক্ত প্রকারত্রয়ের মধ্যে প্রত্যেক প্রকারের বিভিন্ন স্তর রয়েছে । এসব স্তরের মর্যাদায়ও পার্থক্য রয়েছে । যেমন, রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-এর নিয়মিত পড়ার মধ্যে এবং এগুলোর হাদীসের মধ্যেও সহীহ্ ও মশহুরের পার্থক্য রয়েছে । এর ভিত্তিতেই আমরা বলি, জামাআতের সুন্নতসমূহ একান্তের সুন্নত অপেক্ষা উত্তম । জামাআতের সুন্নতসমুহের মধ্যে সর্বোত্তম হচ্ছে ঈদের নামায, এর পর সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণের নামায, এর পর বৃষ্টির জন্য নামায । একান্তের সুন্নতসমূহের মধ্যে সর্বোত্তম হচ্ছে বেতেরের নামায, এর পর ফজরের সুন্নত, এর পর অন্যান্য নামাযের সুন্নত ।

প্রকাশ থাকে যে, নফল নামাযসমূহ দু'প্রকার- (১) কারণের সাথে সম্পর্কযুক্ত; যেমন, সূর্যগ্রহণ ও বৃষ্টির নামায এবং (২) সময়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত । সময়ের পুনরাবৃত্তির সাথে সাথে এসব নফল নামাযেরও পুনরাবৃত্তি হয় । এই প্রকার নফল আটটি- পাঞ্জেগানা নামাযসমূহের নফল নামায পাঁচটি এবং তিনটি হচ্ছে চাশতের নামায, মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী নফল নামায এবং তাহাজ্জুদের নামায ৷ 

পরবর্তী পর্ব

যাকাত (পর্ব– ১১) সদকা গ্রহণ করা উত্তম না যাকাত

যাকাত পর্ব– ১১
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

সদকা গ্রহণ করা উত্তম না যাকাত
ইবরাহীম খাওয়াস, জুনায়দ বাগদাদী প্রমুখ বুযুর্গের অভিমত হচ্ছে, যাকাতের তুলনায় সদকার অর্থ গ্রহণ করা উত্তম। কেননা, যাকাতের অর্থ গ্রহণ করলে মিসকীনদের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করা হয়। এছাড়া যাকাতের হকদার হওয়ার জন্যে যেসকল বিশেষণ ও শর্ত উল্লিখিত আছে, সেগুলো নিজের মধ্যে থাকে না। সদকার মধ্যে এ ব্যাপারে অবকাশ বেশী। কেউ কেউ বলেন: যাকাত গ্রহণ করা উচিত- সদকা নয়। কেননা, যাকাত গ্রহণ করলে মানুষকে ফরয আদায়ে সাহায্য করা হয়। সকল মিসকীন যাকাত নেয়া ত্যাগ করলে সকল মানুষ গোনাহগার হবে। এছাড়া যাকাত কারও অনুগ্রহ নয়। এটা মালদারের যিম্মায় আল্লাহর ওয়াজেব হক। এর মাধ্যমে অভাবী বান্দাদের রুজি অর্জিত হয়। আরও কারণ, যাকাত অভাবের কারণে গ্রহণ করা হয়। অভাব প্রত্যেক ব্যক্তির নিশ্চিতরূপে জানা থাকে। কিন্তু সদকা গ্রহণ করা দ্বীনদারীর কারণে হয়। কেননা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দাতা তাকেই সদকা দেয়, যার দ্বীনদারী সম্পর্কে তার বিশ্বাস থাকে। 
এক্ষেত্রে সত্য হচ্ছে, এ বিষয়টি প্রত্যেক ব্যক্তির অবস্থা অনুযায়ী বিভিন্ন রূপ হয়। যে ধরনের অবস্থা প্রবল এবং যেরূপ নিয়ত হয়, সেই ধরনের বিধান হয়ে থাকে। সুতরাং যদি কোন ব্যক্তি সন্দেহ করে, তার মধ্যে যাকাতের হকদার হওয়ার শর্ত আছে কিনা, তবে তার যাকাত গ্রহণ না করা উচিত। আর যদি নিজেকে হকদার বলে নিশ্চিতরূপে জানে, তবে যাকাত গ্রহণ করতে পারে। উদাহরণতঃ এক ব্যক্তির যিম্মায় ঋণ আছে, যা সে উত্তম পথে ব্যয় করেছে। এখন ঋণ শোধ করার কোন উপায় নেই। এরূপ ব্যক্তি নিশ্চিতরূপেই যাকাতের হকদার। তাকে সদকা ও যাকাতের মধ্যে এখতিয়ার দেয়া হলে সে চিন্তা করবে- যদি আমি এই সদকা গ্রহণ না করি, তবে মালিক সদকা করবে না। এমতাবস্থায় সে সদকাই গ্রহণ করবে। আর যদি যাকাত নিলে মিসকীনদের কোন অসুবিধা না হয়, তবে সদকা ও যাকাত প্রত্যেকটি গ্রহণ করবে। এতদসত্ত্বেও নফসকে হেয় করার ব্যাপারে যাকাত গ্রহণের প্রভাব সম্ভবতঃ অনেক বেশী।

(সমাপ্ত)
প্রথম পর্ব

রবিবার, ৩১ মার্চ, ২০২৪

যাকাত (পর্ব– ১০) সদকা গোপনে ও প্রকাশ্যে গ্রহণ করা


যাকাত পর্ব– ১০

📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
সদকা গোপনে ও প্রকাশ্যে গ্রহণ করা

সদকা গোপনে ও প্রকাশ্যে গ্রহণ করা-
আধ্যাত্ম পথের পথিকগণ মতভেদ করেছেন, সদকা গোপনে বা প্রকাশ্যে গ্রহণ করার মধ্যে কোনটি উত্তম। কারও মতে গোপনে গ্রহণ করা উত্তম এবং কেউ বলেন, প্রকাশ্যে গ্রহণ করা ভাল। আমরা প্রথমে উভয় বিষয়ের উপকারিতা ও অপকারিতা বর্ণনা করব, এর পর যা সত্য তার ব্যাখ্যা করব। প্রকাশ থাকে যে, গোপনে সদকা গ্রহণ করার উপকারিতা পাঁচটি।

(১) গ্রহীতার গোপনীয়তা বজায় থাকে। প্রকাশ্যে গ্রহণ করলে ভদ্রতার পর্দা ছিন্ন হয়ে যায়, অভাব প্রকাশ হয়ে পড়ে এবং সওয়াল করার ভীতি দূর হয়ে যায়।
(২) গোপনে সদকা গ্রহণ করলে মানুষের অন্তর ও মুখ নিরাপদ থাকে। কেননা, প্রকাশ্যে গ্রহণ করলে মানুষ তার প্রতি হিংসা করে অথবা তার গ্রহণ অপছন্দ করে একথা ভেবে যে, সে ধনী হওয়া সত্ত্বেও সদকা গ্রহণ করেছে অথবা বেশী পরিমাণে গ্রহণ করেছে। হিংসা ও কুধারণা বড় গোনাহ। মানুষকে এসব গোনাহ থেকে নিরাপদ রাখা উত্তম।
আবু আইউব সুখতিয়ানী (রহঃ) বলেন: আমি নতুন বস্ত্র পরিধান করি না এই আশংকায়, কোথাও প্রতিবেশীদের মনে হিংসা সৃষ্টি না হয়ে যায়। অন্য এক দরবেশ বলেন: আমি আমার ভাইদের খাতিরে অধিকাংশ বস্তুর ব্যবহার বর্জন করি, যাতে তারা একথা না বলে যে, তার কাছে এটা কোথেকে এল? ইবরাহীম তায়মীর গায়ে নতুন জামা দেখে কেউ জিজ্ঞেস করল : এটা আপনি কোথায় পেলেন? তিনি বললেন: আমার ভাই' খায়সামা আমাকে পরিধান করিয়েছে। যদি জানতাম, তার পরিবারের লোকেরা এটা জানে, তবে কখনও কবুল করতাম না।

(৩) গোপনে দান গ্রহণ করলে দাতাকে গোপনে আমল করতে সাহায্য করা হয়। বলাবাহুল্য, দান গোপনে করাই উত্তম। অতএব এ ব্যাপারে গ্রহীতা দাতাকে সাহায্য করলে উত্তম কাজে সাহায্য করা হবে, যা নিঃসন্দেহে ভাল। দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের প্রচেষ্টা ছাড়া গোপনে দান হতে পারে না। ফকীর নিজের অবস্থা প্রকাশ করে দিলে দাতার অবস্থাও প্রকাশ হয়ে পড়বে।
এক ব্যক্তি জনৈক আলেমকে প্রকাশ্যে কিছু দান করলে তিনি গ্রহণ করলেন না। অন্য এক ব্যক্তি তাকে গোপনে কিছু দান করলে তিনি গ্রহণ করলেন। অতঃপর এ কারণ জিজ্ঞাসিত হলে তিনি বললেন: দ্বিতীয় ব্যক্তি তার খয়রাতে আদব ও নিয়মের প্রতি লক্ষ্য রেখেছে- গোপনে দিয়েছে। তাই আমি কবুল করেছি।
এক ব্যক্তি জনৈক দরবেশ সুফীকে জনসমাবেশে কিছু দান করলে দরবেশ তা ফিরিয়ে দিলেন। লোকটি বলল: যে বস্তু আপনাকে আল্লাহ তাআলা দিলেন, তা গ্রহণ করলেন না কেন? দরবেশ বললেন: যে বস্তু একান্তভাবে আল্লাহর ছিল, তাতে অপরকে শরীক করে নিয়েছ। কেবল আল্লাহর দেখা তুমি যথেষ্ট মনে করনি। কাজেই তোমার শেরক আমি তোমার কাছেই ফিরিয়ে দিলাম।
জনৈক সাধক এক বস্তু গোপনে কবুল করে নিলেন, যা তিনি প্রকাশ্যে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। দাতা এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন: প্রকাশ্যে দেয়ার কারণে তুমি আল্লাহর নাফরমানী করেছিলে। তাই আমি তোমাকে সাহায্য করিনি। এখন গোপনে দেয়ার কারণে তুমি আল্লাহর আনুগত্য করেছ। তাই আনুগত্যের কাজে আমি তোমাকে সাহায্য করেছি।
সুফিয়ান সওরী (রহঃ) বলেন: যদি আমি জানতাম, কোন ব্যক্তি দান করে তার আলোচনা করবে না এবং অন্যের কাছে বলবে না, তবে আমি তার দান গ্রহণ করতাম।
(৪) গোপনে গ্রহণ করলে গ্রহীতা অপমান ও লাঞ্ছনা থেকে বেঁচে থাকে। প্রকাশ্যে গ্রহণ করলে লাঞ্ছনা হয়। নিজেকে লাঞ্ছিত করা ঈমানদার ব্যক্তির জন্যে শোভন নয়। কোন আলেমকে গোপনে কেউ কিছু দিলে তিনি তা গ্রহণ করতেন এবং প্রকাশ্যে দিলে গ্রহণ করতেন না। তিনি বলতেন: প্রকাশ্যে নেয়ার মধ্যে এলেমের লাঞ্ছনা এবং আলেমগণের বেইযযতী হয়। তাই আমি দুনিয়ার ধন-সম্পদকে উঁচু করে বিনিময়ে এলেম ও আলেমগণকে নীচু করি না।
(৫) গোপনে গ্রহণ করলে শরীকানার সন্দেহ থেকে মুক্ত থাকা যায়। কারণ, রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: যেব্যক্তির কাছে কোন উপঢৌকন আসে, তার কাছে যত লোক থাকে, তারা সকলেই উপঢৌকনে শরীক থাকে। স্বর্ণ-রৌপ্য হলেও তা উপঢৌকন। কেননা, রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন : মানুষের দেয়া উত্তম উপঢৌকন হচ্ছে রূপা অথবা খাদ্য, যা খাওয়ানো হয়। এতে রূপাকেও উপঢৌকন বলা হয়েছে। এ থেকে জানা গেল, জনসমাবেশে সকলের সম্মতি ছাড়া বিশেষ কোন ব্যক্তিকে কিছু দেয়া মাকরূহ। সকলের সম্মতি সন্দিগ্ধ বিধায় একান্তে দিলে এই সন্দেহ থেকে মুক্ত থাকা যায়।

এখন সদকা প্রকাশ্যে গ্রহণ করা এবং অন্যের কাছে তার আলোচনা করার মধ্যে যেসকল উপকারিতা রয়েছে, সেগুলো বর্ণিত হচ্ছে। এতে চারটি উপকারিতা আছে।

(১) সদকা প্রকাশ্যে গ্রহণ করলে আন্তরিকতা ও সততা প্রকাশ পায়, নিজের অবস্থা সম্পর্কে অপরকে ধোঁকা দেয়া হয় না এবং রিয়া থেকে মুক্ত থাকা যায়। কারণ, এতে বাস্তব অবস্থাই প্রকাশ পায়। এরূপ হয় না যে, বাস্তব অবস্থা অন্যরূপ এবং লোক দেখানোর উদ্দেশে তা প্রকাশ করা হয় না।

(২) প্রকাশ্যে গ্রহণ করলে জাঁকজমকপ্রীতি দূর হয়ে যায়, দাসত্ব ও দীনতা প্রকাশ পায়, অহংকার ও অভাবমুক্ততার দাবী থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যায় এবং মানুষের দৃষ্টিতে হেয় হওয়া যায়। এ কারণেই জনৈক সাধক তাঁর শিষ্যকে বলেন: সদকা সর্বাবস্থায় প্রকাশ্যে নেবে। এরূপ করলে তোমার ব্যাপারে মানুষ দু'দলে বিভক্ত হয়ে যাবে। এক দল হবে, যাদের মনে তোমার কোন মর্যাদা থাকবে না। এট তো অভীষ্ট লক্ষ্যই। কেননা, এটা তোমার ধর্মের নিরাপত্তার জন্য অধিক উপকারী। আরেক দল হবে, যাদের মনে তোমার প্রতি সহানুভূতি বেশী হবে। কারণ, তুমি আপন অবস্থা ঠিক ঠিক প্রকাশ করে দিয়েছ। এটা তোমার ভাইয়ের কাম্য। কারণ, তার উদ্দেশ্য বেশী বেশী সওয়াব পাওয়া। সে যখন তোমাকে মহব্বত বেশী করবে তখন সে সওয়াবও অবশ্যই পাবে। এ সওয়াব তুমিও পাবে। কেননা, তার সওয়াব বেশী হওয়ার কারণ তুমিই।

(৩) প্রকাশ্যে সদকা গ্রহণ করলে তওহীদকে শেরক থেকে বাঁচানো যায়। কেননা, সাধকের দৃষ্টি মহান আল্লাহ ব্যতীত অন্য দিকে নিবদ্ধ হয় না। গোপনও প্রকাশ্য তার জন্যে সমান। এ অবস্থার পরিবর্তন তওহীদে শেরকের নামান্তর।
জনৈক বুযুর্গ বলেন: যেব্যক্তি গোপনে গ্রহণ এবং প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করত, আমরা তার দোয়ার কোনই মূল্য দিতাম না। উপস্থিত অথবা অনুপস্থিত মানুষের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করা হালের ক্ষতি বৈ নয়। দৃষ্টি সর্বদা এক আল্লাহর দিকে নিবিষ্ট থাকা উচিত। কথিত আছে, জনৈক বুযুর্গ তাঁর মুরীদগণের মধ্যে একজনের প্রতি অধিক আকৃষ্ট ছিলেন। এটা অন্য মুরীদদের কাছে দুঃসহ মনে হলে বুযুর্গ ব্যক্তি তাদের কাছে সেই মুরীদের শেষ্ঠত্ব প্রকাশ করতে চাইলেন। সেমতে প্রত্যেক মুরীদকে একটি করে মুরগী দিয়ে তিনি বললেন: প্রত্যেকেই আপন আপন মুরগী এমন জায়গা থেকে জবাই করে আনবে, যেখানে অন্য কেউ না দেখে। সকল মুরীদ গিয়ে আপন আপন মুরগী জবাই করে আনল। কিন্তু সেই মুরীদ জীবিত মুরগী নিয়ে এল। বুযুর্গ তাকে কারণ জিজ্ঞেস করলে সে বলল: আমি এমন কোন জায়গা খুঁজে পেলাম না, যেখানে কেউ দেখে না। কেননা, আল্লাহ্ তাআলা সর্বত্রই দেখেন। বুযুর্গ ব্যক্তি মুরীদগণকে বললেন: এ কারণেই আমি তার প্রতি অধিক আকৃষ্ট। সে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন কিছুর প্রতি ধ্যান দেয় না।

(৪) প্রকাশ্যে সদকা গ্রহণ করলে শোকরের সুন্নত আদায় হয়। আল্লাহ্ তাআলা বলেন : "তুমি তোমার পালনকর্তার নেয়ামত বর্ণনা কর"। নেয়ামত গোপন করা অকৃতজ্ঞতার শামিল। যারা আল্লাহর নেয়ামত গোপন করে, আল্লাহ তাদের নিন্দা করেন এবং কৃপণ আখ্যা দেন। বলা হয়েছেঃ "যারা কৃপণতা করে, মানুষকে কৃপণতা করতে আদেশ করে এবং আল্লাহ প্রদত্ত অনুগ্রহ গোপন করে।
রসূলে আকরাম (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: আল্লাহ তাআলা যখন কোন বান্দাকে নেয়ামত দেন, তখন বান্দাকে সেই নেয়ামতের উপযোগী দেখাও পছন্দ করেন।
এক ব্যক্তি জনৈক সাধককে গোপনে কিছু দিলে সাধক আপন হাত উঁচু করে বললেন: এটা দুনিয়ার বস্তু। এটা প্রকাশ্যে দেয়া উত্তম। আখেরাতের কাজ গোপন করা উত্তম। এ কারণেই জনৈক বুযুর্গ বলেন: তোমাকে জনসমাবেশে কিছু দেয়া হলে তুমি তা গ্রহণ কর। এর পর একান্তে তা ফেরত দিয়ে দাও। সদকার ক্ষেত্রে শোকরের প্রতি উৎসাহ বর্ণিত আছে। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: "যে মানুষের শোকর করে না, সে আল্লাহরও শোকর করে না। শোকর প্রতিদানের স্থলবর্তী হয়ে থাকে। রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: "কেউ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করলে তুমি তার প্রতিদান দাও। প্রতিদান সম্ভব না হলে উত্তমরূপে তার প্রশংসা কর এবং সেই পর্যন্ত দোয়া কর, যে পর্যন্ত প্রতিদান হয়ে গেছে বলে তোমার বিশ্বাস না জন্মে। মুহাজিরগণ মদীনায় রসূলুল্লাহ্ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-কে শোেকর সম্পর্কে প্রশ্ন করলেন: ইয়া রসূলাল্লাহ্, আমরা আনসারদের চেয়ে উত্তম লোক দেখিনি। আমরা তাঁদের কাছে এলে তাঁরা আপন বিষয়-সম্পত্তি আমাদের মধ্যে বন্টন করে দিয়েছেন। আমাদের আশংকা হচ্ছে, সব সওয়াব তাঁরাই নিয়ে যাবেন। রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: না, তা নয়। তোমরা যে তাঁদের শোকর করেছ এবং প্রশংসা করেছ, এতে প্রতিদান হয়ে গেছে।
এসব উপকারিতা জানার পর এখন জানা দরকার, এ সম্পর্কে বর্ণিত মতভেদ মূল বিষয়বস্তুর মধ্যে নয়; বরং এটা হাল তথা অবস্থার মতভেদ।
এ ক্ষেত্রে সত্য এই যে, গোপনে গ্রহণ করা সর্বাবস্থায় উত্তম অথবা প্রকাশ্যে গ্রহণ করা ভাল, একথা নিশ্চিতরূপে বলা যায় না। বরং এটা নিয়তের বিভিন্নতার কারণে বিভিন্ন হয়ে থাকে। হাল ও ব্যক্তির পার্থক্যের কারণে নিয়ত আলাদা আলাদা হয়ে যায়। এমতাবস্থায় এখলাসবিশিষ্ট ব্যক্তির উচিত নিজের দেখাশুনা করা এবং বিভ্রান্তিতে না পড়া। এ ব্যাপারে মনের প্রতারণা ও শয়তানের ধোঁকা থেকে বেঁচে থাকতে হবে। প্রকাশ্যে গ্রহণ করার তুলনায় গোপনে গ্রহণ করার কারণসমূহের মধ্যে ধোঁকা প্রতারণা বেশী রয়েছে- যদিও উভয়ের মধ্যেই প্রতারণা আছে। গোপনে গ্রহণ করার মধ্যে প্রতারণার কারণ, মন গোপনে গ্রহণ করার প্রতি আগ্রহী থাকে। কারণ, এতে জাঁকজমক ও মর্যাদা বহাল থাকে। মানুষের দৃষ্টিতে সম্মান ঠিক থাকে। কেউ মিসকীনকে ঘৃণার দৃষ্টিতে এবং দাতাকে তার প্রতি অনুগ্রহকারী ও নেয়ামতদানকারীরূপে দেখে না। এই রোগ মনের মধ্যে গোপন থাকে এবং শয়তান এর মাধ্যমে উপকারিতা প্রকাশ করে। এমনকি, পূর্ববর্ণিত পাঁচটি উপকারিতাকেই গোপনে গ্রহণ করার কারণরূপে উল্লেখ করে।

প্রকাশ্যে গ্রহণ করার প্রতিও মন আগ্রহী থাকে। কারণ, এতে দাতার মন প্রফুল্ল হয় এবং সে দানে উৎসাহিত হয়। এখানে শয়তান বলে, শোকর আদায় করা সুন্নত এবং গোপন রাখা রিয়া। এমনকি, শয়তান পূর্বোল্লিখিত চারটি উপকারিতাকেও প্রমাণস্বরূপ পেশ করে, যাতে প্রকাশ্যে গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করা যায়।

অতএব ফয়সালা এই যে, দাতাকে দেখতে হবে। যদি সে শোকর ও প্রকাশ্যে দেয়া পছন্দ করে, তবে তার দান গোপন রাখবে এবং শোকর করবে না। কেননা, শোকর তলব করা একটি জুলুম। এই জুলুমের কাজে তাকে সাহায্য না করা চাই। পক্ষান্তরে যদি দাতা শোকর পছন্দ না করে, তবে গ্রহীতা তার শোকর করবে এবং দান প্রকাশ করবে। এ কারণেই রসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর সামনে লোকেরা এক ব্যক্তির প্রশংসা করলে তিনি বললেন: তোমরা তাকে মেরে ফেলেছ। সে শুনলে কল্যাণ প্রাপ্ত হবে না। অথচ রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) মানুষের প্রশংসা তাদের উপস্থিতিতে করতেন। কারণ, তিনি তাদের ব্যাপারে আস্থাশীল ছিলেন, এ প্রশংসা তাদের জন্যে ক্ষতিকর হবে না। বরং তাদের সৎ কাজের প্রতি উৎসাহ আরও বৃদ্ধি করবে। উদাহরণতঃ তিনি এক ব্যক্তিকে বললেন: সে গেঁয়ো লোকদের সর্দার। অন্য এক ব্যক্তি সম্পর্কে বললেন: তোমাদের কাছে কোন সম্প্রদায়ের সর্দার আগমন করলে তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন কর। এক ব্যক্তির কথাবার্তা রসূলুল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম)-এর খুব ভাল লাগলে তিনি বললেনঃ নিঃসন্দেহে কিছু বর্ণনা জাদু হয়ে থাকে। মুমিনের প্রশংসা করা হলে তার অন্তরে ঈমান বৃদ্ধি পায়।

সুফিয়ান সওরী বলেন: যেব্যক্তি নিজেকে সম্যক চেনে, মানুষের প্রশংসা তার জন্যে ক্ষতিকর হয় না। সারকথা, জনসমাবেশে গ্রহণ করা এবং একান্তে না করা উত্তম ও নিরাপদ পন্থা। হাঁ, যদি মারেফত কামেল হয় এবং প্রকাশ্যে গ্রহণ ও গোপনে গ্রহণ উভয়টি সমান হয়ে যায়, তবে গোপনে গ্রহণ করার মধ্যেও দোষ নেই। কিন্তু এরূপ ব্যক্তি অত্যন্ত বিরল। আলোচনায় আছে- বাস্তবে পাওয়া ভার। আল্লাহ আমাদেরকে সাহায্য করুন এবং তওফীক দান করুন।

পরবর্তী পর্ব
সদকা গ্রহণ করা উত্তম না যাকাত

যাকাত (পর্ব– ৯) নফল সদকা সম্পর্কে সাহাবায়ে কেরাম ও বুযুর্গগণের উক্তি



যাকাত পর্ব– ৯
📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)

নফল সদকা সম্পর্কে সাহাবায়ে কেরাম ও বুযুর্গগণের উক্তি-
ওরওয়া ইবনে যুবায়র (রাঃ) বলেন: হযরত আয়েশা (রাঃ) পঞ্চাশ হাজার দেরহাম খয়রাত করেন অথচ তাঁর কোর্তায় তালিই থাকত।
হযরত ওমর (রাঃ) বলতেন: ইলাহী, ধনসম্পদ ও ধনাঢ্যতা আমাদের মধ্যে উত্তম ব্যক্তিকে দান করুন। সম্ভবতঃ সে তা আমাদের অভাবগ্রস্তদেরকে পৌঁছাবে।
আবদুল আজীজ ইবনে ওমায়র (রহঃ) বলেন : নামায মানুষকে অর্ধেক পথে পৌঁছায়, রোযা বাদশাহের দ্বারে নিয়ে যায় এবং সদকা বাদশাহের সামনে উপস্থিত করে।
ইবনে আবিল জা'দ (রহঃ) বলেন: সদকা মানুষ থেকে সত্তর প্রকার অনিষ্ট দূর করে। প্রকাশ্যে সদকা দেয়ার তুলনায় গোপনে দেয়ায় সত্তর গুণ বেশী সওয়াব। সদকা সত্তর শয়তানের চোয়াল বিদীর্ণ করে।
হযরত ইবনে মসউদ (রাঃ) বলেন: এক ব্যক্তি সত্তর বছর আল্লাহ তাআলার এবাদত করার পর কোন একটি কবীরা গোনাহ করায় তার এবাদত বাতিল করে দেয়া হল। অতঃপর সে এক মিসকীনের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় তাকে এক খন্ড রুটি সদকা করল। ফলে আল্লাহ তার অপরাধ মার্জনা করে সত্তর বছরের এবাদত বহাল করে দিলেন।
লোকমান (আঃ) তাঁর পুত্রকে বললেন: তুমি যখন কোন গোনাহ কর, তখন সদকা করবে।
ইয়াহইয়া ইবনে মুআয (রহঃ) বলেনঃ সদকার দানা ব্যতীত কোন দানা দুনিয়ার পাহাড়ের সমান হয়ে যায় বলে আমার জানা নেই। সদকার দানা অবশ্যই এতটুকু হয়ে যায়।
আবদুল আজীজ ইবনে আবী রুয়াদ বলেন: প্রথম যমানায় বলা হত, তিনটি বিষয় জান্নাতের ভান্ডারসমূহের মধ্যে দাখিল- রোগ গোপন করা, সদকা গোপন করা এবং বিপদাপদ গোপন করা।
হযরত ওমর (রাঃ) বলেনঃ আমলসমূহ একে অপরের উপর গর্ব করল। সদকা বলল: আমি তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।
আবদুল্লাহ (রহঃ) চিনি খয়রাত করতেন এবং বলতেন: আমি দেখলাম, আল্লাহ তাআলা বলেন: "তোমরা প্রিয় বস্তু ব্যয় না করা পর্যন্ত পূর্ণ নেকী পাবে না"। আমি চিনি ভালবাসি, একথা আল্লাহ তাআলা জানেন।
নখয়ী (রহঃ) বলেন: আল্লাহর জন্যে যে বস্তু দেব তাতে কোন দোষ থাকা আমার পছন্দনীয় নয়।
ওবায়েদ ইবনে ওমায়ের (রহঃ) বলেন: কেয়ামতের দিন মানুষ সকল দিন অপেক্ষা অধিক ক্ষুধার্ত, পিপাসার্ত ও উলঙ্গ অবস্থায় উত্থিত হবে। অতঃপর যেব্যক্তি দুনিয়াতে আল্লাহর জন্যে ক্ষুধার্তকে আহার দিয়ে থাকবে, আল্লাহ তাকে পেট ভরে আহার করাবেন। যেব্যক্তি আল্লাহর জন্যে বস্ত্রহীনকে বস্ত্র পরিধান করিয়ে থাকবে, আল্লাহ তাকে বস্ত্র পরিধান করাবেন।
হযরত হাসান বসরী (রহঃ) বলেন: আল্লাহ তাআলা ইচ্ছা করলে তোমাদের সকলকে ধনাঢ্য করে দিতেন- তোমাদের মধ্যে ফকীর থাকত না। কিন্তু তিনি একজনকে অপরজন দ্বারা পরীক্ষা করেছেন।
শা'বী (রহঃ) বলেন: ফকীর ধনীর সদকার যতটুকু মুখাপেক্ষী, যদি ধনী তার তুলনায় আপন সদকার সওয়াবের অধিক মুখাপেক্ষী না হয়, তবে তার সদকা অনর্থক। এ সদকা তার মুখে নিক্ষেপ করা হবে।
ইমাম মালেক (রহঃ) বলেন: যে পানি সদকা করা হয় এবং মসজিদে পান করানো হয়, তা থেকে ধনী ব্যক্তি পান করলে আমরা দোষ মনে করি না। কেননা, যে পানি সদকা করে, সে পিপাসার্তদের জন্যে সদকা করে। বিশেষভাবে ফকীর-মিসকীনকে সদকা করার নিয়ত তার থাকে না।
কথিত আছে, জনৈক দাস বিক্রেতা এক বাঁদী সঙ্গে নিয়ে হযরত হাসান বসরীর কাছ দিয়ে গমন করলে তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন: তুমি এই বাঁদী এক দুই দেরহামের বিনিময়ে বিক্রয় করতে সম্মত আছ কি? সে বলল: না। হাসান বসরী (রঃ) বললেন: যাও, আল্লাহ তাআলা তো এক পয়সা ও এক লোকমা সদকা করার বিনিময়ে বেহেশতের হুর দিতে সম্মত আছেন।

পরবর্তী পর্ব

বিবাহ (৩৫) কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ

বিবাহ  (পর্ব – ৩৫)  📚এহইয়াউ উলুমিদ্দিন ✍🏻ইমাম গাজ্জালী (রহ.)  কন‍্যার বিয়েতে আদব সংক্রান্ত উপদেশ — পিতামাতার উপর কন্যা সন্তানের হক তাদেরক...